অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
—মনে হয় না আজ স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারবে। যেরকম ব্যস্ত আছেন।
অনিলিখার জন্য দরজা খুলেই গণেশ বলে উঠল।
গণেশের যথারীতি অফিসের পোশাক—সাদা শার্টের উপরে লাল টাই, কালো স্যুট। দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি কোনো কোম্পানির বোর্ড মিটিং থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এটা যে কলকাতার বাইরে মফসসলের একটা বাড়ি, যেখানে গণেশ বিজ্ঞানী মিস্টার পাইয়ের আপ্তসহায়ক, সেটা গণেশকে দেখে বোঝার কোনোরকম উপায় নেই। এটাই ওর অভ্যেস। এসব পোশাক পরলে নাকি কর্মদক্ষতা বাড়ে।
কলকাতা থেকে অনেক দূরে কল্যাণগড়ে অনিলিখা এসেছে মিস্টার পাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। সেটা জানার পরে কেউ দরজা খুলেই পরিচিত অতিথিকে এরকম কথা বলে না। কিন্তু গণেশের পক্ষে এ ধরনের কথা আদৌ অস্বাভাবিক নয়।
অনিলিখা অবশ্য এত সহজে দেখা না করে ফিরে যেতে রাজি নয়। বিশেষ করে মিস্টার পাইয়ের এই সেক্রেটারি-র কথা শুনে তো নয়ই। মুশকিল হল, মিস্টার পাই কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। বাড়ির ফোনও গণেশই আগে ধরে। সেজন্য এই রিস্কটা না নিয়ে কোনো উপায় থাকে না।
অনিলিখা গণেশকে ভালোই চেনে। লোকটা এমনিতে বেশ সাদাসিধে ভালোমানুষ হলেও মনে করে কারো আসা মানেই মিস্টার পাই—এর সময় নষ্ট,আর কিছুটা সময় নষ্ট মানেই মিস্টার পাইয়ের আরেকটা বড়ো আবিষ্কার থেকে পৃথিবীকে বঞ্চিত করা।
মুচকি হেসে অনিলিখা গণেশকে বলে ওঠে—ঠিক আছে। অনেকদিন দেখা হয়নি মিস্টার পাইয়ের সঙ্গে। এতদূর এসেছি যখন, একটু বসে যাই। তোমার সঙ্গেই না হয় দেখা হল।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভেতরে এসে বসুন। আমি স্যারকে অবশ্যই খবর দিচ্ছি। স্যার গত কয়েকদিন ধরে এত ব্যস্ত যে নাওয়া-খাওয়ার পর্যন্ত সময় নেই। এই তো অবিনাশবাবু গতকাল তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে শেষে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন।

—কেন কী ব্যাপারে এত ব্যস্ত?
—সে এক টপ সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট। আমি নিজেও ভালো করে জানি না।
অবশ্য জানলেও যে গণেশ সে ব্যাপারে কিছু বলত না, সেটা অনিলিখা ভালো করেই জানে। অনিলিখা তবু একটু উসকে দেয় জানার জন্যে— তা তুমি জানো না তো, কে আর জানবে?
—ওই, ওই যে লোহার বাক্সটা জুটেছে ইদানীং। লিও। লিওকে নিয়েই দিনরাত কাজ করছেন এই গত দেড় মাস ধরে। দুজনেরই ঘুমের দরকার হয় না। আমার থেকে এখন লিওই বেশি আপনার। — দীর্ঘশ্বাস ফেলল গণেশ।
লিওকে অনিলিখা ভালো করে চেনে। মিস্টার পাইয়ের হাতে তৈরি বুদ্ধিমান রোবট লিও। এরকম অসামান্য রোবট খুব কমই দেখেছে অনিলিখা। লিও যে গণেশের থেকে অনেক ভালো সহকারী, সে বিষয়ে অনিলিখার কোনও সন্দেহ নেই। মিস্টার পাইয়েরও নিশ্চয়ই সেই একই ধারণা।
সোফায় না বসে উঠে দাঁড়িয়ে মিস্টার পাইয়ের ড্রয়িং রুমের এক ধার দিয়ে সার-দেওয়া বুককেসগুলোর বই দেখতে দেখতে অনিলিখা বলে ওঠে—ঠিক আছে। দেখা না হলেও আমি কিছু মনে করব না। এমনিতেও আমার আগে জানিয়ে আসা উচিত ছিল। একদম না জানিয়ে এসে পড়েছি। আসলে বনগাঁতে আমার এক পিসি থাকেন। পথে ভাবলাম, মিস্টার পাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। কোভিডের জন্য অনেকদিন ওর সঙ্গে দেখা হয়নি।
—না, না। ভালো করেছেন। অন্তত আমার সঙ্গে তো দেখা হল। স্যারকেও জানাচ্ছি। আপনার ব্যাপার আলাদা।—একটু যেন নরম হয়েই গণেশ বলে ওঠে, অবিনাশবাবু এসেছিলেন স্যারের কাছে কোভিডের ভ্যাকসিনের বিষয়ে জানতে। এখনও নেননি। আগেও এ ব্যাপারে স্যার বুঝিয়েছিলেন। অবিনাশবাবুর বদ্ধমূল ধারণা, এর জন্য নাকি মানুষ আবার আস্তে আস্তে বাঁদরে পরিণত হয়ে যাবে। একদল মানুষকে বাঁদরে পরিণত করাই নাকি এই ভ্যাকসিনের মূল উদ্দেশ্য। স্যার এসব গালগল্প শুনলেই খেপে যান।
হেসে বলে ওঠে অনিলিখা, সর্বনাশ! এসব কথা আবার অবিনাশবাবুর মাথায় কে ঢোকাল। অবিনাশবাবু, মানে প্রতিবেশী সেই মোটাসোটা লম্বা-চওড়া ভদ্রলোক, তা-ই তো! খুব মজার লোক।
—হ্যাঁ, সেই ভদ্রলোক। যাই, আমি এখন স্যারকে আপনার আসার খবর জানাই। দেখি, উনি কী বলেন।
অনিলিখা বেশ কয়েক মাস পরে মিস্টার পাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আসলে কোভিডের জন্য আমেরিকায় আটকে পড়েছিল অনিলিখা। কলকাতায় ফেরার পরে এখনও দরকার না পড়লে তেমন কোথাও যায় না অনিলিখা।
মিস্টার পাইয়ের বাড়িতে এসে ঢুকলেই কীরকম যেন ভালো লাগে। কী দারুণ বই এর সংগ্রহ মিস্টার পাই এর। মনে হয় পুরো বাড়িটাই যেন লাইব্রেরি। বিশেষ করে দেশ-বিদেশের ও বাংলার কিশোর সাহিত্যের এমন সংগ্রহ এখন আর কোথাও দেখাই যায় না।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মিস্টার পাইয়ের দেখা মিলল। হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন। দেখে মনে হয় বেশ ক্লান্ত। চোখ-মুখ বসে গেছে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চশমার আড়ালে থাকা বড়ো বড়ো চোখেও ক্লান্তির ছাপ। চুল দেখলে বোঝা যায়, গত তিন মাস চুল কাটেননি।
—অনিলিখা! এ তো দারুণ সৌভাগ্য আমার! হঠাৎ করে! কোনো আর্জেন্ট কিছু?
—না, না, এই এদিকে এসেছিলাম। ভাবলাম, আপনার সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।
—খুব ভালো করেছ। একেবারে রাতে খেয়ে যাবে।
—না, না। রাত করলে মা খুব চিন্তা করবে। তা ছাড়া আপনিও ব্যস্ত আছেন।
—উহু, ওসব কোনো কথা শুনছি না। এতদিন বাদে এসেছ, বিশেষ করে আজকের মতো দিনে, তোমাকে এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেব ভেবেছ! অনেক গল্প হবে। এখনকার বাংলা সাহিত্য নিয়ে আড্ডা হবে। বেশ কয়েকটা ভালো লেখা পড়লাম রিসেন্টলি। সবার সঙ্গে তো আর সেসব নিয়ে আলোচনা করা যায় না।
অনিলিখা আড়চোখে গণেশের দিকে তাকায়। গণেশের মুখ সামান্য গম্ভীর। পাশে দাঁড়িয়ে শুনছে। স্যার যে অযথা এরকম সময় নষ্ট করবে—এটা আদৌ পছন্দ হচ্ছে না, সেটা ওর মুখ দেখলেই বেশ বোঝা যায়।
—তা আজকের দিনে কী! কোনো ভালো ইন্টারেস্টিং খবর আছে মনে হচ্ছে?
অনেক সময় মিস্টার পাইয়ের কাছে এমন কিছু খবর থাকে, যা কোনো সংবাদপত্রেও পাওয়া যায় না।
মিস্টার পাইয়ের ঠোঁটের কোণে একটু মুচকি হাসি দেখা দিল।
তারপরে হঠাৎ করে বলে উঠলেন, আচ্ছা অনিলিখা, তোমার কী মনে হয়! আমাদের পৃথিবীর বাইরে আর কি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে?
হঠাৎ করে এই প্রশ্নের অর্থ কী! এরকম কোনো প্রাণীর সন্ধান কি পেয়েছেন মিস্টার পাই?
অনিলিখা বলে ওঠে, থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা। এই লক্ষ-কোটি তারকাজগতের অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহের মধ্যে আর কোথাও যে কোনো প্রাণ নেই, সেটা ভাবা শক্ত। নিশ্চয়ই আছে। কোথাও না কোথাও আছেই।
—তবে তারা এখনও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না কেন?
—এর বেশ কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। এক, হয়তো এত দূরে দূরে সেসব জগৎ ছড়িয়ে আছে যে তারা জানে যে যোগাযোগ করে কোনো লাভ নেই। যদি কোনো মেসেজ পাঠানোর এক লক্ষ বছর পরে তার জবাব আসে, সেই যোগাযোগের আর সার্থকতা কী? অথবা হয়তো তারা পৃথিবীতে বুদ্ধিমান প্রাণের উপস্থিতি সম্বন্ধে এখনও জানে না। অথবা তারা জানলেও যোগাযোগের কোনো প্রয়োজন পড়েনি, সেটাও হতে পারে।
—গুড। তবে তার বাইরেও আরও কিছু কারণ থাকতে পারে।
—হ্যাঁ, সে তো অনেক কিছুই হতে পারে। হয়তো তারাও ভয় পায় পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ভাবে, কোনদিন না ওদের গ্রহ আক্রমণ করে বসে! অথবা হয়তো এরকম দূরে দূরে ছড়িয়ে-থাকা গ্রহে মেসেজ পাঠিয়ে উত্তর আসার আগেই সেই গ্রহে প্রাণ উধাও হয়ে যাচ্ছে। পরমাণু যুদ্ধ, নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ, পরিবেশ দূষণ—এরকম কিছু কারণে সে গ্রহ হয়তো ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে, অন্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠার আগেই।
—ভালো বলেছ। তবে আরও একটা কারণ থাকতে পারে। এবং সেটা আমাদের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার। তবে সেটা এখনই বলছি না। পরে বলব।
—তা হঠাৎ করে এই বিষয়! কোনো কারণ আছে?
—হ্যাঁ, বলছি একটু বাদে। —বলে একটু থেমে মিস্টার পাই ফের বলে উঠলেন, চলো, তোমাকে আমার ল্যাবে একটু নিয়ে যাই। ওখানে গিয়েই বলব। বুঝবে, কেন এ কথা বলছি।
বলে মিস্টার পাই উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে ল্যাবের দিকে এগিয়ে গেলেন। পিছন পিছন অনিলিখাও এগোয়।
মিস্টার পাইয়ের ল্যাবটা বিশাল। ওর বিশাল বাড়ির একদম অন্য প্রান্তে। এমন হরেকরকম যন্ত্র খুব কম জায়গায় দেখেছে অনিলিখা। যতবারই এসেছে, প্রত্যেকবারেই নতুন নতুন অনেক যন্ত্র দেখেছে। তার মধ্যে বেশ কিছু বিশ্বের উন্নততম ল্যাব ছাড়া কোথাও নেই। অনেক যন্ত্র অনিলিখার কাছেও অচেনা। মিস্টার পাইও কিছু নিজে হাতে তৈরি করেন।
ল্যাবের ভেতরে আরেকটা বিশাল কাচের ঘর। সেখানে ল্যাবের এককোণে লিও দাঁড়িয়ে আছে। গণেশ যতই লোহার বাক্স বলুক-না কেন, লিওকে দেখে যে ও মানুষ নয়, সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। মনে হয় বছর কুড়ির ভদ্র শিক্ষিত ছেলে। এটা আগে অনিলিখা দেখেনি। সেই কাচের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে লিও যেন কী সব করছে।
আরও কাছে এগিয়ে এল ওরা। কাচের ঘর থেকে নানান বিচিত্র রকমের আওয়াজ হচ্ছে। কাচের ঘরের মধ্যে কিছুটা অন্ধকার থাকায় ভেতরের কিছু ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, অনেক কিছুই যেন হচ্ছে কাচের ঘরের মধ্যে।
মিস্টার পাই এবারে মৃদুস্বরে লিওকে নির্দেশ দিলেন, ঘরের ভেতরের আলোটা জ্বালাও।
লিও একটা হালকা আলো জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে কাচের ঘরের ভেতরের আশ্চর্য সব কর্মকাণ্ড চোখের সামনে ধরা পড়ল। কাচের বাক্সটার উচ্চতা বারো ফুট। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় কুড়িফুট মতো হবে। একটা পাইপের মধ্যে দিয়ে সেই কাঁচের বাক্সের মধ্যে ছোটো পাথরের নুড়ি এসে ঢুকছে। ওই কাচের বাক্সের মধ্যে ঢোকার পরে সেই নুড়ি ছোটো ছোটো বিস্ফোরণে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেসব ধূলিকণা বাতাসে এসে মিশছে। তারপর তীব্র বেগে ঘুরপাক খাচ্ছে ঘরের মধ্যে।
—ওটা কি 'পার্টিকল অ্যাকসিলারেটর'? এত ছোটো? —কাচের ঘরের মধ্যে রাখা একটা ছোটো যন্ত্রের দিকে লক্ষ করে অনিলিখা বলে উঠল।
—হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। ওটা দিয়ে 'চার্জড প্রোটন' ওই ধুলোর কণার উপরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
—আপনার তৈরি এই 'পার্টিকল অ্যাকসিলারেটর'?
—পুরোটা নয়, কিছু অংশ। আচ্ছা, ওই নীচের পাত্রটা লক্ষ করো।
অনিলিখা লক্ষ করল, নীচে রাখা একটা ছোটোপাত্রে সামান্য জল জমেছে। কিন্তু মিস্টার পাই কী করছেন এসব দিয়ে? কী হচ্ছে এখানে?
লিওকে আগেও একবার দেখেছে। কিন্তু লিও এখন এতটাই ব্যস্ত যে একবার 'হ্যালো অনিলিখা' বলে তারপরেই আবার নিবিষ্ট হয়ে কাচের ঘরের পাশে রাখা একটা কন্ট্রোল সেন্টারে কী সব সুইচ ঝড়ের বেগে একটার পর একটা টিপে যাচ্ছে। ঘরের মধ্যের অবস্থা দেখে যেন সেটা ও করে যাচ্ছে।
এত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ লিওর মতো রোবটের পক্ষেই সম্ভব।
—কিন্তু এসব কী? অনিলিখা আবার অবাক হয়ে বলে উঠল।
—চলো, ড্রয়িং রুমে গিয়ে বলছি। ব্যাপারটা যতটা সরল করে বলা যায়।— বলে মিস্টার পাই আবার ফিরে চললেন ড্রয়িং রুমের দিকে।
ড্রয়িং রুমের সোফায় বসেই মিস্টার পাই বলে উঠলেন, বহু বছর ধরে আমার একটা প্রশ্ন ছিল। কীভাবে জল এল পৃথিবীতে? কীভাবে প্রথম সমুদ্র সৃষ্টি হল? শুধু আমার নয়, বিশ্বের সব বিজ্ঞানীর কাছেই এই প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই।
অনিলিখা বলে উঠল, হ্যাঁ, তা ঠিক। এখনও সে প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। শুরুতে যখন পৃথিবীর সৃষ্টি হল, তখন সূর্যের যা প্রতাপ, যা তাপ, তখন নিশ্চয়ই পৃথিবীও খুব গরম, গ্যাসীয় পিন্ড ছিল।
—একজ্যাক্টলি। তাহলে সেখানে জল এল কোথা থেকে বলো তো?
—হয়তো শুরুতে কোনো একটা বড়ো বরফের ধূমকেতু এসে পড়েছিল পৃথিবীতে। সেখান থেকেই শুরু।
—অবশ্যই। সেটা একটা পসিবিলিটি। কিন্তু সমস্যা হল, শুধু সেরকম ধূমকেতুর থেকে জল এলে পৃথিবীর জল অন্যরকম হত। ধূমকেতুর বরফের 'আইসোট্রপিক ফুটপ্রিন্ট' থেকে বোঝা যায়, সেখানকার জলে ডিউটিরিয়াম বা সাধারণ হাইড্রোজেনের দ্বিগুণ ভরবিশিষ্ট ভারী হাইড্রোজেন গ্যাস অনেক বেশি থাকে। আমাদের পৃথিবীর জলে ডিউটিরিয়াম প্রায় থাকেই না। তবে, তার বাইরেও এক বিশেষ ধরনের কার্বনসমৃদ্ধ 'সি টাইপ' অ্যাস্টরয়েড বা গ্রহাণুর থেকেও জল আসার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেখানেও একই সমস্যা। সেক্ষেত্রেও আমাদের জলে অনেক বেশি ডিউটিরিয়াম থাকত। অর্থাৎ শুধু ধূমকেতু বা 'সি টাইপ' গ্রহাণু থেকে জল এলে সেই জল অন্যরকম হত। অন্য কিছুও ছিল এই জলের রহস্যের পিছনে। কিন্তু সেটা কী? সেটাই বড় প্রশ্ন বা মিসিং লিঙ্ক।
ফের বলে উঠলেন মিস্টার পাই, নিশ্চয়ই তাহলে এই ধূমকেতু বা গ্রহাণুর জলের সঙ্গে এমন কোনো জল মিশেছিল যেখানে ডিউটিরিয়াম খুব কম ছিল, এখানকার জলের থেকেও কম। সব হয়তো মিলেমিশে আমাদের বিশ্বের জল হয়েছে। এটাই এই রহস্যের একমাত্র সমাধান হতে পারে, সেটা জানতাম।
কিছুদিন আগে আমার এক জাপানি বিজ্ঞানী বন্ধু আসাহির কাছে প্রথম শুনলাম এক নতুন ধরনের গ্রহাণুর ধুলোর কথা। ওদের পাঠানো মহাকাশযান 'হায়াবুসা'র মাধ্যমে এই নতুন ধরনের গ্রহাণুর অতিসূক্ষ্ম ধুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে। ওরা তার নাম দেয় 'ইটাকাওয়া'। আমার কেমন যেন সন্দেহ হয়।
ওকে ওই ধূলিকণা পাঠাতে বলি আমার পরীক্ষার জন্য। ওর পাঠানো ধুলোর কণা বিশ্লেষণ করে দেখি, যা ভেবেছিলাম, ঠিক তা-ই। ওই ধূলিকণাতেও জল আছে। আর শুধু আছে না, শুধুই সাধারণ জল। তাতে কোনো ডিউটিরিয়াম নেই। কিন্তু সেই সাধারণ জল ওই ধূলিকণায় এল কী করে? মহাবিশ্বে কোনো কিছুতে এরকম সাধারণ জল থাকা সম্ভব নয়।
আমি ব্যাপারটা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করি আমার ল্যাবে।
এখন বুঝেছি, সেটা হয়েছে সূর্য থেকে আসা সৌরঝড়ে থাকা চার্জড পার্টিকল, মূলত প্রোটনের সঙ্গে ওই ধূলিকণার ধাক্কার জন্য। 'চার্জড প্রোটন' এই ইটোকাওয়া গ্রহাণুর অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে ও তাদের চরিত্রে পরিবর্তন এনে সাধারণ জল তৈরি করেছে। এসবই আমি আমার ল্যাবে অবশ্য প্রমাণ করেছি।
প্রথমে একটা প্রোটন এসে ধাক্কা মেরে এই ধূলিকণার মধ্যে থাকা জলে 'হাইড্রক্সাইড' আয়ন তৈরি করেছে। তার অনেক পরে আরেকটা প্রোটন একইভাবে একই লক্ষ্যে ধাক্কা মেরে ডিউটিরিয়ামমুক্ত সাধারণ জল তৈরি করেছে, যা তার পরে ওই ধূলিকণার মারফত লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।
এতদিনে সে রহস্য সমাধান করতে পেরেছি। সেই জলই তৈরি হতে দেখলে আমার ল্যাবে। পুরো প্রসেসটাই আমার ওই ছোটো কাঁচের ঘরের মধ্যে হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা কোথায় জানো?
এটা র্যানডমভাবে করা যেতে পারে না। এসব জটিল প্রসেস যেন কেউ নিয়ন্ত্রণ করেছে, এখনও হয়তো করছে, ঠিক যেমন আমার ল্যাবে আমরা করছি। কিন্তু এই মহাবিশ্বে এটা কে করল পৃথিবীতে জল তৈরির জন্য! যেখানে সৌরঝড় পৌঁছোয়, সেখানেই কিন্তু এভাবে জল তৈরি করার সম্ভাবনা থাকতে পারে। প্রাণও তৈরি হতে পারে। কিন্তু পুরো প্রসেসটা খুব নিখুঁতভাবে পরিচালিত না করলে, সাধারণ জল সম্ভব নয়। সেটা হলে অন্য অনেক গ্রহেও প্রাণ থাকতে পারত।
—মানে? আপনি কী বলছেন, এটা কেউ পরিচালিত করছে? সেজন্য এই সৌরজগতের মধ্যে শুধু পৃথিবীতে এই জল আছে!
—সেটাই চিন্তার, অনিলিখা হয়তো আমরা সবাই একটা ল্যাবের মধ্যে বসে আছি। আমাদের উপরে কেউ সারাক্ষণ নজর রাখছে। হয়তো এই পৃথিবী, এই পরিবেশ, এই জলবায়ু সবই তার সৃষ্টির ল্যাব।
—এটা কিন্তু ভাবা বেশ শক্ত— হেসে উঠে অনিলিখা বলে ওঠে, শুধু সায়েন্স ফিকশনেই সম্ভব।
মিস্টার পাই ফের বলে উঠলেন, হতে পারে। পুরোটাই হয়তো অলীক কল্পনা। আরেকটা কথা বলি। এই যে নাসা থেকে কয়েক মাস আগে মহাবিশ্বে একটা টেলিস্কোপ পাঠানো হয়েছিল। শুরুর দিকে বেশ কাজ করছিল। তারপর কয়েকদিন আগে শুনলাম, সেটার সঙ্গে নাকি সবরকম যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে। সেটা যেভাবে কাজ করছিল, তাতে সৃষ্টির সব রহস্য বোঝা যেত। কে বলতে পারে, হয়তো এমন কেউ আছে, যে চায় না আমরা সেটা জানতে পারি।
চুপ করে রইলেন মিস্টার পাই। অন্যমনস্ক হয়ে অনিলিখার জন্যে কিছুক্ষণ আগে নিয়ে আসা শিঙাড়াটা প্লেট থেকে তুলে নিয়ে নিজেই খেতে খেতে ফের বলে উঠলেন, কিন্তু আমি যে সেই সৃষ্টির রহস্য জেনে গেছি, সেটা জানলে তারা নিশ্চয়ই খুশি হবে না। একদিক থেকে আমরা এটা জেনে গেলে আমরাও অন্য গ্রহে জল তৈরি করতে পারব। প্রাণ তৈরি করত পারব। আমরাই হয়ে উঠব ঈশ্বর।
এবারে শুকনো মুখে গণেশ এগিয়ে এল। —স্যার, আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি। আপনার উপরে নাকি একজন কেউ নজর রাখছে। অবিনাশবাবু এ কথা বলতে এসেছিলেন গতকাল। একজন লোক, তার কান নাকি শেয়ালের মতো। সে নাকি গত পরশু এসে দূর থেকে আমাদের ল্যাবের দিকে তাকিয়ে ছিল।
—অবিনাশবাবু আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন বুঝি?
অনিলিখা বুঝল, অবিনাশবাবুর আসার কথা গণেশ মিস্টার পাইকে আদৌ জানায়নি।
—হ্যাঁ, স্যার, আমি ওর অন্য সব কথার মতো এটাও আজগুবি কথা ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, ওটা হয়তো কোনো অ্যালিয়েন ছিল। বা এমন কেউ, যে আপনার এই রিসার্চের খবর পেয়েছে।
—ধুর! আরে ও হল মতি মল্লিক। মতির কানটা কীরকম না! ওকে আমি একটা ফাউন্টেন পেন কিনব বলে কিছু পেন নিয়ে আসতে বলেছিলাম। বলেছিলাম ল্যাবে আলো জ্বলা মানে আমি ব্যস্ত থাকব। ডিস্টার্ব না করে অন্য সময়ে আসতে। সে ব্যাপারেই এসেছিল নির্ঘাত।
অনিলিখা ফের বলে উঠল, তা আপনি কী ভাবছেন এই আবিষ্কার নিয়ে?
—আসলে এটা পুরোটাই এত সূক্ষ্ম গবেষণা, অবজার্ভেশন আর কন্ট্রোলের উপরে দাঁড়িয়ে আছে যে আমি পুরোটা লিখে রাখছি। বলতে পারো, পুরো প্রসেসটা আমাকে প্রমাণ করতে হবে। তারপরে ইচ্ছে আছে, এক-দু-মাসের মধ্যেই এ বিষয়টা কোনো একটা সায়েন্স কনফারেন্সে জানাব। তখন সারা বিশ্ব জল রহস্যের সমাধান করতে পারবে।
কথার মাঝে বাধা পড়ল। বাইরে কলিং বেল।
—স্যার, অবিনাশবাবু এসেছেন, দরজা খুলে দেব?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই।
খানিক বাদে অবিনাশবাবু এলেন। শুধু একা নয়, সঙ্গে ডান হাতে একটা খাঁচা ধরে আছেন। যদিও খাঁচাটাকে একটা লাল কাপড় দিয়ে মুড়ে রেখেছেন। তার ভেতরে কী আছে, তা দেখা যাচ্ছে না।
সোফায় বসেই বলে উঠলেন, আপনার জন্যে এবারে কল্যাণগড় ছাড়তে হবে দেখছি। কোনো খোঁজখবর নেই। দু-দিন এসে ফিরে গেলাম। এখানকার নতুন ও.সি. আলিম সাহেব আসার পর থেকেই আপনার উপরে কড়া নজর রাখছেন। আমাকেও একবার থানাতে ডেকে এনে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। ওর আগের ও.সি. দেবব্রতবাবু, তাকে তো আপনিই জঙ্গলমহলে ট্রান্সফার করে দিলেন।
—আমি! সে কী, আমি আবার তার কী করলাম!
—আপনি নয়তো কী? আপনার পোষা পঙ্গপাল।
—ওহো! সেই পঙ্গপালকাণ্ডের জন্য ওকে চলে যেতে হল।
—হ্যাঁ, নয়তো কী? কী কাণ্ড করেছিলেন! আপনার আবিষ্কারের বদান্যতায় মুখ্যমন্ত্রীর উপরে পঙ্গপালের দল সেবারে আক্রমণ করল। আপনাকে হাতের কাছে পেলে যে মুখ্যমন্ত্রী কী করতেন কে জানে!
—যা-ই হোক। আপনার খবর কী! আর আপনার সঙ্গে ওতে কী আছে?
—আরে ওটা দেখানোর জন্যেই তো এসেছিলাম। —বলে ভদ্রলোক খাঁচার উপরে থেকে চাদর সরিয়ে নিলেন।
তার মধ্যে ভারী অদ্ভুতদর্শন এক পাখি।
ফের বলে উঠলেন, এরকম পাখি কোনোদিন দেখেছেন! সেজন্যেই আপনাকে দেখাতে এনেছিলাম। কেউই এর নাম বলতে পারল না। আপনি যদি পারেন। আপনার অনেক অকাজের বিষয়ে অনেক জ্ঞান আছে দেখেছি। সেদিন আমি বিলুদের পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওখানেই পাখির বাচ্চাটাকে দেখলাম। অদ্ভুত পাখি। দেখি, আমার পিছু পিছু আসছে। দেখতে সেই সত্যজিৎ রায়ের গল্পের 'বৃহৎচঞ্চু'র মতো, নিয়ে এলাম। বিনা পয়সায় একটা ভালো পাখি হল।
অনিলিখা ও মিস্টার পাই খাঁচার পাশে বসে কাছ থেকে দেখল। সত্যি অদ্ভুত দেখতে। লম্বা নীল রঙের গলায় লাল রঙের ছোপ। লম্বা ধারালো ঠোঁট। মাথার উপরে যেন একটা হাড় উঠে আছে অনেকটা শিংয়ের মতো দেখাচ্ছে। হাইটে দেড় ফুট মতো হবে। পাখিটার চোখ দেখে কিন্তু হিংস্র মনে হয় না।
—এ তো দেখে অনেকটা ক্যাসুয়ারির মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক ক্যাসুয়ারির মতোও নয়, ক্যাসুয়ারি দেখতে অনেক হিংস্র হয়। —অনিলিখা বলে উঠল।
—খুব শান্ত পাখি। সবার সঙ্গে চটপট বন্ধুত্ব করে ফেলে। তবে এটা একেবারেই বাচ্চা। দু-দিন আগে যখন এনেছিলাম, তখন এর সাইজ এর অর্ধেক ছিল। মনে হয়, আরও বড়ো খাঁচা লাগবে শিগগিরি।
—বলেন কী! এত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছে!
—হ্যাঁ, সেজন্যেই পাখিটা কী জানতে চাই। দাঁড়ান, পাখিটাকে খাঁচা থেকে বার করে দেখাচ্ছি।
—উড়ে যাবে না তো?
—আরে না, না। আমার বাড়িতে এই কদিন ছেড়েই রেখেছি। মাঝে মধ্যে উড়লেও, বা বাইরে গেলেও ঠিক আবার খাঁচায় ফিরে আসে। খুব ইন্টেলিজেন্ট চটপটে পাখি। —বলে অবিনাশবাবু খাঁচা থেকে পাখিটা বার করলেন। অনিলিখা পাখিটার পাশে বসে ভালো করে দেখল। পাখিটার গায়ে হাত দিতেও বিরক্ত যেন হল না।
—সত্যি, খুব শান্ত পাখি। গায়ে হাত দিলেও কিছু বলে না।
—বললাম না, খুব শান্ত পাখি। এ কদিনে বাড়ির লোক হয়ে গেছে। এমনকী আমার ঝগড়াটে পোষা হুলোটার সঙ্গেও বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। অন্য সব পাখি দেখলে হুলোটা তেড়ে যায়। এটা দেখি, হুলোটার লোম ঠোঁট দিয়ে চুলকে দিচ্ছে। আর হুলোটাও আরামে চোখ বুজে শুয়ে আছে। তা আমি পাখিটার নাম দিয়েছি বৃহৎচঞ্চু।
—বাহ, কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ওই গল্পের পাখিটার মতো আবার এটা না আপনার হুলোকে আক্রমণ করে।
—না, না, এর চোখটা কীরকম শান্ত দেখেছেন। এখানে ঘুরেফিরে বেড়াবে। দেখবেন। কী শান্ত পাখি। আবার বললেই খাঁচায় ফিরে আসবে।
পাখিটা সত্যি বেশ অদ্ভুত। শরীরের তুলনায় পা-টা আর ঠোঁটটা বেশ খানিকটা বড়ো, শিকারি পাখির মতো। একটা একটা করে পা ফেলে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
বিভিন্ন কথার মাঝে অবিনাশবাবু মিস্টার পাইকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, আপনি কী সব কাজ করে বেড়ান। গত পরশু দূর থেকে দেখলাম, একটা লোক আপনার বাড়ির উপরে লক্ষ রাখছিল।
—হ্যাঁ, সে খবর গণেশ আমাকে দিয়েছে। সেটা কিছু নয়।
—তা আপনি এখন কীসের উপরে কাজ করছেন, বলুন তো!
—ওই ধরুন জল তৈরির কল।
—জল তৈরি! এখানে কল্যাণগড়ের ট্যাঙ্কের জল এত ভালো। অন্য জলের কী দরকার! আপনি এসব আবোল-তাবোল পরীক্ষানিরীক্ষা করে বেড়াচ্ছেন। মশাই, আপনার সব আবিষ্কার একশো বছর পিছিয়ে আছে।
অনিলিখা পাশে বসে কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসছিল। বলে উঠল, আপনি আছেন বলেই ভরসা। মাঝেমধ্যে দু-একটা ভালো আইডিয়া মিস্টার পাইকে দিতে পারতেন।
—দিই তো! আমার কথা শুনলে কবে বঙ্গসম্মান পেয়ে যেতেন। বলেছিলাম না?
কিন্তু ওর কথা শেষের আগেই অনিলিখা বলে উঠল, আচ্ছা, পাখিটা কোথায় গেল? তাকে তো দেখছি না।
সত্যি ঘরের মধ্যে আর বৃহৎচঞ্চু নেই। ভ্যানিশ!
ঠিক একই সঙ্গে ল্যাবের দিক থেকে একটা কিছুর যেন আওয়াজ এল। সবাই এগিয়ে গেল ল্যাবের দিকে। কী ব্যাপার! কিন্তু ল্যাবে ঢুকেই চমকে উঠল। বৃহৎচঞ্চু ল্যাবের মধ্যে উড়ছে। আর লিও যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বৃহৎচঞ্চুউড়ে গিয়ে কাচের ঘরের পাশের ওই কন্ট্রোল সেন্টারের সুইচগুলোর উপরে এসে বসল।
লিও কীরকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সরে দাঁড়াল। পাখিটা তারপর কনট্রোল সেন্টারের সুইচগুলো ঠোট দিয়ে ঠোকরাতে লাগল। দুটো সুইচ ধারালো ঠোট দিয়ে উপড়েও ফেলল।
হতভম্ব সবাই। অনিলিখা ও মিস্টার পাই ছুটে গেল পাখিটার দিকে। কিন্তু তার আগেই পাক খেয়ে পাখিটা সবার হতভম্ব চোখের সামনে আবার ল্যাব থেকে উড়ে বেরিয়ে গেল।
অবিনাশবাবু 'বৃহৎচঞ্চু' বলে ডাকতে ডাকতে পাখিটার পিছু পিছু ছুটে গেল। তার পিছু পিছু গণেশও। খানিক বাদে গণেশ ফিরে এসে বলে উঠল, রান্নাঘরের জানলা দিয়ে উড়ে বেরিয়ে গেল। অবিনাশবাবুও হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসেছেন।
অবিনাশবাবু অবাক হয়ে বলে উঠলেন, কী হচ্ছে এসব! আপনার বাড়িতে এসব দেখে আমার পোষা পাখিও পাগল হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া জানি না ওই লিও কী করেছে পাখিটার উপরে। এরকম শান্ত পাখি তা না হলে অশান্ত হয়ে ওঠে! কী ব্যাপার মিস্টার পাই?
মিস্টার পাইয়ের মুখ খুব গম্ভীর। কোনো উত্তর দিলেন না। লিও আবার ফিরে এসেছে কন্ট্রোল সেন্টারে। যেন সংবিৎ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু এখন পাখিটা যা ক্ষতি করে দিয়ে গেছে, তাতে কী হচ্ছে কে জানে!
ঘরের ভেতর থেকে অন্যরকম সব আওয়াজ হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে অন্ধকার থাকায় ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। কাচের ঘরের মধ্যে আলো জ্বালানোর পরে মিস্টার পাই কন্ট্রোল সেন্টারে কী সব করার চেষ্টা করলেন। মনে হল, সফল হলেন না।
হতাশায় কিছুক্ষণ বাদেই চিৎকার করে বলে উঠলেন, সব, সব নষ্ট করে দিয়েছে পাখিটা। পুরো গত ছ-মাসের কাজ নষ্ট। মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।
তারপরে ফের বলে উঠলেন, এক্ষুনি, এক্ষুনি আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে। যেকোনো সময় কাচের ঘরটা ভেঙে যেতে পারে। কিছু জিনিস খারাপ হয়ে যাওয়ায় পুরো প্রসেসটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
সত্যি তা-ই। কাচের ঘরের ভেতরে পাইপ থেকে গুলির মতো বেরিয়ে-আসা ছোটো ছোটো নুড়ি পাথর এখন আর গুঁড়ো না হয়ে সজোরে আছড়ে পড়ছে কাঁচের উপরে। একটু একটু করে কাচের কিছু অংশে ফাটল হচ্ছে। পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটরটা থেকে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সেটাও কাজ করছে না।
—আমাদের এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে হবে। এখনই।
লিও তবু দাঁড়িয়ে কিছু একটা করতে কাচ্ছিল।
—বেরিয়ে এসো লিও। দেরি হয়ে যাবে। সুইচগুলো কাজ করছে না। এত কম সময়ে ঠিক করা যাবে না।
সবাই মিলে ছুটে ল্যাব থেকে বেরিয়ে এল। আসার এক মিনিট পরেই একটা বিস্ফোরণ হল। যেন একটা শক্তিশালী বোমার আওয়াজ। পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল। ল্যাবের দরজা বন্ধ থাকলেও প্রায় একই সঙ্গে শোনা গেল ঝনঝন করে কাচ ভেঙে পড়ার আওয়াজ।
কিছুক্ষণ বাদে ল্যাবে উঁকি মেরে দেখা গেল ল্যাবের ভেতরের পুরো কাচের ঘরটা ভেঙে পড়েছে। ল্যাবের মধ্যে চারদিকে ধোঁয়া। অনেক যন্ত্রপাতি ভেঙে গেছে। কিছু কিছু জায়গায় আগুন জ্বলছে।
দশ দিন পরে
মোবাইলে নাম্বারটা দেখামাত্র অনিলিখা ফোনটা ধরল। মিস্টার পাই।
—কেমন আছেন মিস্টার পাই? সব ঠিক আছে?— অনিলিখা জানে, উনি ভালো থাকতে পারেন না। যেরকম ক্ষতি হয়েছে সেদিন। তবু জিজ্ঞেস করতে হয়।
—আর ঠিক থাকি! অবিনাশবাবুর মতো প্রতিবেশী থাকলে যা হয়। ওর ধারণা, আমি কিছু নিষিদ্ধ বোমা তৈরির চেষ্টা করছিলাম। কী করছিলাম, কেন করছিলাম—এসব নিয়ে তারপর থেকেই বার বার পুলিশের যাতায়াত শুরু হয়ে গেল। তাদের প্রশ্নে আমি জেরবার। কী করে এসব ওদের বোঝাই।
—কিছু বুঝতে পারলেন, কেন হল এরকম?
—হ্যাঁ, ইচ্ছে করেই করা হয়েছে। তা না হলে এই ধ্বংস করাটাও এত চট করে কারো পক্ষে করা সম্ভব হত না। সবের মূলে ওই পাখিটা।
—ওরকম কোনো পাখি আছে বলে আমার জানা নেই। আমি আসার পরে বেশ কিছু জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কোনো খোঁজ পাইনি। ওরকম পাখি কোথা থেকে এল হঠাৎ করে!
—আমিও কোনো খবর পাইনি ওই পাখিটার। অবিনাশবাবুর কাছেও ফিরে যায়নি ওই পাখি। যেমন হঠাৎ করে এসেছিল, সেরকম হঠাৎ করে উধাও। ওটা এখানকার নয়।
—মানে? পাখিটা কি অন্য কোনো অজানাজগতের!— প্রায় অসম্ভব একটা প্রশ্ন এখন মুখে আসতে সময় লাগল না।
চুপ করে থাকলেন মিস্টার পাই। প্রায় এক মিনিট নীরবতার পরে ফের বলে উঠলেন। —তবে আমার এই পরীক্ষা একেবারে ব্যর্থ হয়নি। আমার ধারণা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা একা নই। আমরা পৃথিবীর সবাই বোধহয় কোনো একটা পরীক্ষার অংশ। যারা এসব করছে, তারা চায় না আমরা বিশেষ কিছু রহস্যের সমাধান এখনই করে ফেলি। এমন কিছু করে বসি, যাতে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের নিয়ে কী করা হচ্ছে! আমরা গিনিপিগের জীবনযাপন করে নিজেদের ভাবছি খুব বুদ্ধিমান। নিজেদের একমাত্র বুদ্ধিমান জীব বলে ভাবছি। জানি, আমার এই কথাটা কোনো স্বাভাবিক মানুষ ভাবতে পারবে না। কিন্তু এখন আমি নিশ্চিত, ওই পাখিটা কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিল অবিনাশবাবুর মাধ্যমে। কিন্তু আসলে ওরা কারা? ওরা কি পৃথিবীতেই থাকে?
ফোনটা ছাড়ার আগে মিস্টার পাইয়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল অনিলিখা।
১৬ জানুয়ারি ২০২২
কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন