বাইবেল ও একটা ছবি

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

কিছু ঘটনা থাকে, যা যেরকম হয়েছিল, অনুভূতির রং না চড়িয়ে ঠিক সেরকমভাবেই বলা উচিত। ঘটনার কমা, ফুলস্টপ, জায়গা, চরিত্র—সব এক রেখে ঘটনা ঠিকভাবে তুলে ধরলে পাঠকরাই শেষে কী হয়েছিল, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এক্ষেত্রে ঠিক কী হয়েছিল, সেটা আমিও জানি না। যে সম্ভাবনাগুলো থাকতে পারে, সেটা দিয়ে উপাদেয় গল্প তৈরি করা এক্ষেত্রে আমার উদ্দেশ্য নয়। সেটা পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

এটা কয়েক মাস আগের ঘটনা। আমি তখন আমেরিকায়। মে মাস।

হোটেলের রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্টের জন্য আমার ও আমার এক সহকর্মীর ঠিক সাতটার সময় দেখা করার কথা ছিল।

কিন্তু দেখি, সাতটা বেজে পনেরো মিনিট হয়ে গেছে। তবু তার দেখা নেই।

আমার সহকর্মী মুরলীকে এরকম দেরি করতে আগে কখনো দেখিনি। খুব পাঙ্কচুয়াল। মিনিট সেকেন্ডের কাঁটা মেনে চলে। সে তখনও আসেনি দেখে ব্রেকফাস্ট শুরু করে দিলাম। দেরি করলে চলবে না। কিছুক্ষণ বাদেই অফিসে বেরোতে হবে।

এমন সময় দেখি, আমার সেই সহকর্মী বন্ধু মুরলী প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসছে। এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমার টেবিলে বসেই বলে উঠল—কাল রাতে একটা বড়ো কাণ্ড হয়ে গেছে।

—কী কাণ্ড? পড়ে গেছ?

মুখ-চোখের চেহারা দেখলেই অবশ্য বোঝা যায় যে কিছু একটা হয়েছে। উসকো খুসকে চুল। দু-চোখভরা ক্লান্তি।

অবশ্য ক্লান্তি আমারও আছে। আমিও গত দশ দিনে আমেরিকার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত, এক স্টেট থেকে আরেক স্টেট মুরলীর সঙ্গে ছুটে বেড়াচ্ছি।

এখানে আমার ও আমার এই সহকর্মী মুরলীর সামান্য পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। আমি একটা বহুজাতিক কোম্পানির একটা ইউনিটের গ্লোবাল হেড। আমার সহকর্মী মুরলী পুরো আমেরিকার ব্যাবসার দায়িত্বে আছে। খুব বড়ো দায়িত্ব। আমাকেই রিপোর্ট করে।

কোনো বড়ো ধরনের ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে কোথাও? অফিসের বা ফ্যামিলি সংক্রান্ত। সবরকম প্রশ্নই এল মাথায়। কিন্তু যে উত্তরটা পেলাম, তার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না।

আশপাশে তাকিয়ে মুরলী বলে উঠল, সাংঘাতিক এক ভূতের পাল্লায় পড়েছিলাম গতকাল রাতে।

এরকম এক উচ্চপদস্থ পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি, যে গত তিরিশ বছরে নানান দায়িত্বপূর্ণ কাজ করেছে, সে লস অ্যাঞ্জেলেসের এক অভিজাত হোটেলের মধ্যে দাঁড়িয়ে যে এরকম কথা বলতে পারে, ভাবতে পারিনি!

—কী বললে? ভূত?

—হ্যাঁ, সেটা ছাড়া তো অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে না।

কাল অনেক রাতে এই হোটেলে এসে পৌঁছেছি। ডিনারেও একসঙ্গেই ছিলাম। সুতরাং ওর উপরে কোনো পানীয়ের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তা সত্ত্বেও ও ভূত কীভাবে দেখল?

মুরলী ফের বলে উঠল, এরকম ঘটনা আমার জীবনে আগে হয়নি। কাল রাতে আপনার সঙ্গে কথা বলার পরে শুতে গেলাম। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আমার ঘরটা হোটেলের একদম শেষদিকের একতলার একটা ঘর। তার পাশেই চার্চ আর চার্চের কবরখানা।

—হ্যাঁ, তা দেখেছি। সে তো অনেক জায়গাতেই থাকে। তারপরে?

—ক্লান্ত ছিলাম। শোয়ার পর পরই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একটা 'খটাস' করে মৃদু আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল।

আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। উঠে আলো জ্বালিয়ে দেখি, আমার খাটের পাশে বেডসাইড টেবিলের উপরের ড্রয়ারটা খুলে গেছে। ভাবলাম, কোনো কারণে হয়তো খুলে গেছে।

ঠিকভাবে বন্ধ করে শুলাম। দশ মিনিট বাদে আবার সেই শব্দ।

আবার আলো জ্বেলে দেখি, সেই একই ড্রয়ার খুলে গেছে। ড্রয়ারের ভেতরে একটা বাইবেল রাখা।

আবার ড্রয়ার বন্ধ করলাম।

কী কারণে দুবার খুলে গেল, সেটা বোঝার চেষ্টা করলাম। খানিকক্ষণ এবারে বসে থাকলাম। আবার খোলে কি না দেখার জন্যে।

খুলল না।

খোলার কোনো কারণও ছিল না।

আবার শুয়েছি। আধ ঘণ্টা বাদে আবার সেই একই শব্দ। ড্রয়ার আবার খুলে গেছে। শুধু তা-ই নয়। সঙ্গে ঘরের একটা আলোও জ্বলে উঠেছে।

—আলো?

—হ্যাঁ, ঘরের অন্যদিকে যেখানে সোফাটা আছে, তার পাশের আলো। ভাবুন, এটা কখনো স্বাভাবিক ব্যাপার হতে পারে?

—কোনোভাবে সুইচটা কি অন হয়ে যেতে পারে? তা ছাড়া, ভূতেরা অন্ধকারই বেশি পছন্দ করে। হঠাৎ করে আলো জ্বালাতে যাবে কেন!

আমার ঠাট্টাটা গায়ে না লাগিয়ে কাঁপা হাতে কাপ তুলে কফিতে এক ব্যস্ত চুমুক দিয়ে বলে উঠল, না, সেরকম কোনো সম্ভাবনা ছিল না। কোনোভাবেই সুইচ অন আপনা থেকে হতে পারে না। তা ছাড়া আলো জ্বালানোর একটা কারণ থাকতে পারে। যাতে আমি তাকে দেখতে পাই।

—হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে ড্রয়ারটা বার বার খোলার একটা ব্যাখ্যা আছে। হয়তো ঠিকভাবে লাগানো হয়নি। বইয়ের ভারে আস্তে আস্তে কিছুক্ষণ বাদে খুলে যাচ্ছে।

—আমার মনে হয় না সেটা হচ্ছিল। শুধু তা-ই নয়। আরও দুবার ওই আলোটাই হঠাৎ করে জ্বলে উঠল। টুওয়ে সুইচ। আমার বিছানার পাশের সুইচ দিয়ে নেভানো যাচ্ছিল। আমি ভয়ে আর খাট থেকে নামিনি। আরও দেড় ঘণ্টা এরকম ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা দেখে সোজা রিসেপশনে চলে গেলাম।

—রুম চেঞ্জ করার জন্য?

—হ্যাঁ, অত রাতে অনেক ঝামেলা করে রুম চেঞ্জ করেছি। রিসেপশনিস্ট প্রথমে বিশ্বাস করছিল না। এরকম ঘটনা নাকি ওই রুমে কখনো হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাত চারটেতে ঘুমোই অন্য ঘরে গিয়ে।

—সবকিছুরই ব্যাখ্যা হয়। আলোর ব্যাপারটারও একটা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা হয়। হয়তো ওই সুইচের উপরে এমন কিছু একটা রাখা ছিল, যার চাপে মাঝেমধ্যে জ্বলে উঠছিল। উঠে দেখলেই বুঝতে পারতে।

—সবকিছুর সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা হয় না—মুরলী যেন একটু রেগেই বলে উঠল, আমি নিশ্চিত এটা কোনো অতৃপ্ত আত্মা।

আমি বুঝলাম ওকে আর বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। এবারে মজার জন্যেই বলে উঠলাম, হয়তো কেউ চাইছিল, তুমি তার আত্মার শান্তির জন্যে বাইবেল পড়ো। সেজন্য বার বার বইটা বার করে দিচ্ছিল।

—কেন? কেন এরকম হবে?

—হয়তো বিশেষ কোনো অংশ পড়তে বলছিল। হয়তো ওই ঘরেই কেউ কোনোদিন মারা গিয়েছিল। বা পাশের কবরখানায় হয়তো এমন কেউ ছিল, যে চাইছিল সেই রাতে বাইবেল শুনতে। অথবা হয়তো এমন কেউ, যে তোমাকে আগে থেকেই চিনত।

ওর মুখটা দেখি, বেশ গম্ভীর হয়ে উঠল। মনে হল, এই ব্যাখ্যা ওর পছন্দ হয়েছে।

আমি আরেকটু ভয় দেখাতে বলে উঠলাম, তবে যে ঘরেই যাও-না কেন, এরকম আত্মা সহজে রেহাই দেয় না। আবার ফিরে আসবে। হয়তো তোমার সঙ্গে পরের ঘরেও যাবে।

—তা-ই নাকি?

দেখি, মুরলীর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠছে। ভিতুদের ভয় দেখিয়ে বেশ লাগে।

—তা কী উপায়? —ফের বলে উঠল।

একমাত্র উপায় হোটেল ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া। তবে সেরকম আবার হলে, তবেই।

অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ব্রেকফাস্ট শেষ করে রেডি হয়ে অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। সারাদিন আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। হোটেলে ফিরতে রাত হয়ে গেল। ও অন্য ঘরটায় যেখানে শিফট করেছিল,সেখানে শুতে গেল।

পরের দিন সকালে দেখি, আবার ব্রেকফাস্টের সময় ও আসছে না। কী ব্যাপার ভাবছি, ঠিক সেরকম সময় ওর ফোনটা পেলাম। এয়ারপোর্ট থেকে ফোন করেছে।

ও নাকি গতকাল রাতে যে ঘরে গিয়েছিল, সেখানেও রাত বারোটার থেকে একই রকম ঘটনা শুরু হয়েছিল, যার জন্য রাত দুটোর সময় হোটেল ছেড়ে চেক আউট করে বেরিয়ে যায়। রাত বলে আমাকে জানাতে পারেনি। বাকি রাত এয়ারপোর্টে কাটিয়ে সকালের ফ্লাইটে ফিরছে।

কী আশ্চর্য! এরকমও লোকজন হয়। ভূতে এভাবে বিশ্বাস করে! তবে কিছু একটা তো নিশ্চয়ই হয়েছে। তা না হলে এরকম ঘটনা ওর সঙ্গে আগেও হত।

আমি এবারে রিসেপশনে গিয়ে বললাম। এত বড়ো হোটেল। এসব কী শুরু হয়েছে এখানে যে আমার বন্ধুকে মাঝরাতে পালাতে হল?

রিসেপশনিস্টকে মহিলা না বলে বাচ্চা মেয়েও বলা যায়। বয়স বেশ কম। আঠেরোর কাছাকাছি। একেই এখানে এ কদিন দেখেছি।

আমি বলায় মেয়েটা অবাক হয়ে বলে উঠল, এরকম ঘটনা হোটেলের ইতিহাসে কখনো হয়নি। কী করে ওর কথা বিশ্বাস করি, বলুন।

বলে একটু থেমে ফের বলে উঠল, তবে একটা জিনিষ আপনি বলেননি। জানি না জানেন কি না। উনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ায় আমিও গিয়েছিলাম ঘরে। দুবারই। ওই যে ড্রয়ারের কথা বললেন, সেখানে শুধু বাইবেল ছিল না, একটা ছবিও ছিল। সে ছবিতে একজন ভারতীয় মহিলা ছিল। আমার মনে হয়, ওই ছবি দেখেই যেন উনি বেশি ভয় পেয়েছিলেন।

—ছবিটা আছে?

—প্রথমবার ছবিটা দেখে উনি ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। দ্বিতীয়বারেও অর্থাৎ গতকাল রাতেও ওই একই ছবি কোথা থেকে এল আমার দেখে একটু অবাক লেগেছিল, কিন্তু তারপরে তো উনি বেরিয়েই গেলেন। কাল রাতে বেরিয়ে যাওয়ার পরে খুঁজে দেখেছি। কিন্তু সেই ছবি নেই। অথচ ওটা যে ড্রয়ারে ছিল, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এক মধ্যবয়সি ভারতীয় মহিলা, আচ্ছা, উনি কি বিবাহিত?

—হ্যাঁ, কিন্তু স্ত্রী মারা গেছেন।

আমার আর মুরলীর ফেসবুকেও যোগাযোগ আছে। সে সূত্রে ওর কভার ছবিতে ওর স্ত্রী-র ছবিও দেখেছি। সেটা বার করে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,এই মহিলা কি?

—হ্যাঁ, এরকমই। —বলে আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে হোটেলের রিসেপশনিস্ট ফের বলে উঠল, হ্যাঁ, এই মহিলাই।

তা তার ছবি ড্রয়ারে রেখে ঘুমোচ্ছিল মুরলী? নাকি ওই ছবিটা ওখানে ও আশা করেনি?

রিসেপশনিস্ট মেয়েটা ফের বলে উঠল, আমার তো মনে হচ্ছিল, এই ছবিটা দেখেই ভয় পাচ্ছিল আপনার বন্ধু। যেন ওই ছবিটা ওখানে আছে, বিশ্বাস করতে পারছিল না!

শুনেছিলাম ওর স্ত্রী কয়েক মাস আগে ক্যান্সারে মারা গিয়েছিল।

কিন্তু স্ত্রী-র মৃত্যু কি সত্যি ক্যান্সারে হয়েছিল?

যা-ই হোক, এর দশ দিন বাদে আমার সেই সহকর্মী রিজাইন করে। সেখানে সে জানিয়েছিল যে ব্যক্তিগত কারণে ভারতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৩ আগস্ট ২০২২

কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%