অচেনা মুখ

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

রাহুল

রাহুলের স্ত্রী শরণ্যা

আমার স্ত্রী গার্গী

আমার নাম ইন্দ্রনীল

রিনি রাহুলের মেয়ে

সুরজিৎ শরণ্যার প্রেমিক

প্রথম কেস—পল, মেরি

ডিটেকটিভ কনস্টেবল লিসা

জেসিকা

ডিটেকটিভ সার্জেন জেমস পারটন

দমদম ঘুঘুডাঙা থানা থেকে ও.সি. মোহিত সরকার

এইচ. আর. ম্যানেজার পিটার

এইচ. আর. ডিরেক্টর ম্যাথিউ

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ রাত এগারোটা

তোর সঙ্গে একটু আলাদা কথা আছে। আজ রাতে এখানে থাকতে পারবি?—রাহুলের এই একটা প্রশ্নে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পাঁচ ঘণ্টার আড্ডার পর ওর বাড়ি থেকে ঠিক বেরোনোর মুখে এই প্রশ্ন! একটু যেন দ্বিধা-জড়ানো গলায় আস্তে আস্তে বলে উঠল।

আমরা একে অন্যকে ঠিক কতটা জানি, সেটা নিয়েই আজকের আড্ডা ছিল।

পছন্দের খাওয়া থেকে শুরু করে পছন্দের জায়গা— কে অন্যের পছন্দ কতটা আন্দাজ করতে পারি— এসব নিয়ে চ্যালেঞ্জ। দেখা গেল আমি এসব ব্যাপারে সব থেকে খারাপ। সত্যি কথা বলতে কী, অন্যের মন বোঝা আমার কোনোদিনই ঠিকভাবে আসে না। এ যেন ঠিক আধুনিক কবিতার মতোই দুর্বোধ্য। আমি নেহাত কাঁচা এ ব্যাপারে।

রাহুলের বাড়ি আড্ডার খুব ভালো জায়গা। কলকাতার থেকে একটু দূরে মধ্যমগ্রামের কাছে প্রায় কুড়ি কাঠার উপরে বিশাল বাড়ি। বড়োরাস্তার থেকে খানিকটা দূরে। তাই শহরের কোলাহল এখানে যেন পৌঁছোয় না। বাগানে বসলে দু-একটা অচেনা পাখির ডাক মাঝেমধ্যে কানে আসে। আজ যেমন কিছু আগে একটা নীলকন্ঠি লাল বসন্তবৌরি দেখলাম।

রাহুল খুব মিশুকে ছেলে। আড্ডা পছন্দ করে। শনিবার হলেই আমরা ওর বাড়িতে চলে আসি। সন্ধে থেকে রাত অব্দি আড্ডা চলে। নিখাদ আড্ডা। এ জিনিসটা এখনকার দিনে কাজের চাপে বেশ রেয়ার হয়ে উঠেছে। কীভাবে জানি না ফোনের থেকে চোখ সরাতেও ভুলে যাই। কিন্তু এখানে এলে ফোনের কথাই আড্ডার মাঝে ভুলে যাই। সে আড্ডায় সাহিত্য থেকে দেশ-বিদেশের অর্থনীতি থেকে রাজনীতি কোনোটাই বাকি থাকে না। অবশ্যই এর পিছনে একটা বড়ো কারণ রাহুলের পড়াশোনা ও সব বিষয়ে আগ্রহ।

কথায় কথায় এমন একটা প্রসঙ্গ তুলবে যে সেটা নিয়ে তখন আমরা আলোচনা-তর্কে সবাই মেতে উঠি। আজ যেমন আলোচনা হচ্ছিল ল্যাম্বটনের ভারতের সার্ভে ও ম্যাপ তৈরি করা নিয়ে। ল্যাম্বটন ত্রিকোণমিতির বিশেষ জ্যামিতিক শেপের মাধ্যমে নির্ভুলভাবে কোনো জায়গা মাপার ব্যবস্থা করেছিলেন। বহু বছর এর উপরে কাজ করার পরে ১৮২৩ সালে উনি মারা যান। এভাবেই প্রথম ভারতের ম্যাপ নির্ভুলভাবে করা হয়। সে প্রসঙ্গ থেকে ভারতকে একসঙ্গে জুড়ে একটা রাষ্ট্রের পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ইংরেজদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা থেকে তর্কাতর্কি।

ওর মতো বন্ধুবৎসল ছেলে কমই হয়। যখন যা দরকার, একবার বললেই হল, ঠিক একটা ব্যবস্থা বার করে ফেলবে। একই সঙ্গে খুব প্রাণখোলা স্বভাবের। সবকিছু খুলে বলা যায়।

দেশ-বিদেশে আমিও যেমন নানা জায়গায় গেছি, একইভাবে ও নানান দেশে ঘুরে বেড়িয়েছে। অনেক সময় প্ল্যান করে গেছি যাতে বিদেশে একই জায়গায় থাকার সুযোগ হয়। আবার কখনোই বিদেশে দীর্ঘদিন থাকব বলে যাইনি। সেজন্য আমরা দুজনেই অন্য কোনো বিদেশি কোম্পানিতেও জয়েন করিনি।

এককথায় বলা যায়, ওকে আমার মতো ভালো কেউ চেনে না।

আজ আড্ডায় আমি, সুদীপ, রজত, পার্থ এসেছিলাম। অন্যদিন আমার সঙ্গে গার্গী আসে। গার্গী আমার স্ত্রী। আজ আসতে পারেনি। ছেলের পরীক্ষা চলছে। সেজন্য বাড়িতে এখন যুদ্ধের পরিস্থিতি। সে যুদ্ধ ছেড়ে সেনাপতি তো আর কোথাও যেতে পারে না। আমার মতো ছোটোখাটো সৈনিক অবশ্যই আসতে পারে।

পার্থ অবিবাহিত। সুদীপ, রজত ফ্যামিলি নিয়ে এসেছিল। কোথায় একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া যেতে পারে তা নিয়েও কিছুক্ষণ আলোচনা হল। এখনও তেমন গরম পড়েনি। এটাই এখন বেড়াতে যাওয়ার ভালো সময়।

কদিন বাদে পার্থ কানাডা যাবে। অন্তত এক বছরের জন্য। সে বিষয়েও কথা হল। আমি একসময় প্রায় দেড় বছর ছিলাম টরন্টোতে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিলাম। এমনকী তুষারঝড়ে আটকে পড়ার আজব অভিজ্ঞতা একবার হয়েছিল।

রাহুল একা থাকে। গত এক বছর ধরে শরণ্যার সঙ্গে ওর ডিভোর্সের মামলা চলছে। এক বছর আগে যখন প্রথম খবর পাই যে ও আর শরণ্যা আলাদা হয়ে যাচ্ছে, তখন খবরটা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। বেশ খারাপও লেগেছিল। ওদের বিয়ের আঠেরো বছরের মাথায় হঠাৎ করে এভাবে দুজনের পথ আলাদা হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। অনেক দিক দিয়ে বলা যায় ওরা ছিল আইডিয়াল কাপল। কী জন্য যে সম্পর্কটা ভাঙল, সেটা এখনও বুঝতে পারিনি।

এ ব্যাপারে রাহুল বিশেষ কথা বলতে চায় না। আমাকেও না।

আমি শরণ্যার সঙ্গে দেখা করে সে সময় কথা বলেছিলাম। শরণ্যার প্রতিক্রিয়ায় খানিকটা অবাকও হয়েছিলাম। ও যেন কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে চায়নি।

শুধু যে ছাড়াছাড়ি হয়েছে তা নয়, দুজনের মধ্যে যে যথেষ্ট তিক্ততা তৈরি হয়েছে, তা বুঝতে পারি। সে তিক্ততা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমেনি, আরও বেড়েছে। অতীত সম্পর্কের কোনো চিহ্ন ওরা পুরোনো খাতার ছেঁড়া পাতার মতো সঙ্গে রাখতে চায় না।

আড্ডা দিয়ে তারপরে রাতের খাবার খেয়ে উঠতে রাত দশটা বেজে গেল। আমি থাকি লেক গার্ডেনসে। এখন যেতে অন্তত দেড় ঘণ্টার মতো সময় লেগে যাবে। গল্প করতে করতে যে এতটা রাত হয়ে গেছে, খেয়াল করিনি।

বেরোতে যাব, এমন সময় রাহুল আমার কাছে এগিয়ে এসে আস্তে আস্তে বলে উঠল। তখনই ওই কথাটা বলে উঠল, তোর সঙ্গে একটু আলাদা কথা আছে। আজ রাতে এখানে থাকতে পারবি?

এরকম প্রস্তাবে বেশ অবাকই হলাম। তা ছাড়া ও যেভাবে সাধারণত কথা বলে, সেভাবেও বলেনি। যেন কী একটা দ্বিধা-শঙ্কা মিশে আছে গলার স্বরে।

আগে বলেনি। এখন হঠাৎ করে বাড়ি না ফিরলে গার্গী মারাত্মকরকম খেপে যাবে।

—না রে, আজ থাকা যাবে না। গার্গী এমনিতে খেপে আছে। ছেলের পরীক্ষা নিয়ে সাংঘাতিক বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। তার মধ্যে আমি আবার বাড়ি যদি না যাই। জাস্ট কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে! আর্জেন্ট কিছু?

ও কিছু কথা না বলে সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকাল। বলে উঠল,—হ্যাঁ, আর্জেন্ট। থাকলে খুব ভালো হত।

বুঝলাম, থাকতেই হবে। ও অহেতুক জোর খাটানোর ছেলে নয়। সত্যিকারের কিছু জরুরি কাজ না হলে ও এটা বলত না।

ঠিক করলাম, রাতে না গিয়ে ওর বাড়িতেই থেকে যাব। কাল সকালেই না হয় ফেরা যাবে। বাড়িতে জানিয়ে দিলাম।

উলটোদিক থেকে যতটুকু কথা হওয়ার ছিল, তার থেকেও কম কথা হল। গার্গী গম্ভীর থমথমে গলায় বলে উঠল, 'সে তোমার ব্যাপার।' বুঝতে পারলাম, কাল ফিরে কালবৈশাখীর সামনাসামনি পড়তে হবে।

সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পরে আবার আমি আর রাহুল ড্রয়িং রুমে এসে বসলাম।

ও দেখি, চুপ করে বসে আছে। রাহুল খুব আমুদে হলেও মাঝেমধ্যে ওকে খুব অন্যরকম লাগে। মনে হয় তখন যেন ওকে বুঝতে সময় লাগে। দাবার মিডল গেমে যেমন খুব পাকা দাবাড়ুর কৌশল বোঝা যায় না, ও তখন ঠিক তেমনই।

কিছুক্ষণ একটু উসখুস করে বলে উঠল, একটু স্কচ চলবে?— বুঝলাম, কিছু কথা বলতে ও দ্বিধা করছে। এমনিতেও আমি আর ও দুজনেই ড্রিঙ্ক করি না।

—এত রাতে?

—আরে, কাল তো অফিস নেই। সামান্য। —বলে ওই দুই গ্লাস রেডি করে একটা আমার সামনে দিয়ে বলল, একটা খবর আছে। কীভাবে বলব, জানি না। শরণ্যাকে গতকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। —বলে চুপ করে থাকল।

ওর চোখে কিন্তু তেমন কোনো টেনশনের অনুভূতি ধরা পড়ল না। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। ওদের সম্পর্ক শেষের দিকে যেভাবে খারাপের দিকে গিয়েছিল, তাতে ওর বিশেষ আবেগ না-থাকাই স্বাভাবিক।

—বলিস কী? কী করে জানলি?

—পুলিশ থেকে ফোন করেছিল। আমার সঙ্গে রিসেন্টলি দেখা হয়েছে কি না, জানতে চাইছিল।

—কী বললি?

—যেটা সত্যি, সেটাই বললাম। ওদের সামনে কথা লুকিয়ে লাভ কী? প্রায় কুড়ি দিন আগে রিনিকে দেখতে গিয়েছিলাম। বর্ধমানে। তখনই দু-তিন মিনিট ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। ব্যাস।

—কিন্তু, কী হতে পারে?

—সেটাই তো ভাবছি। কোথায় যেতে পারে?

—তুই বলেছিলি যে ওর সঙ্গে এখন অন্য একটা ছেলের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ছেলেটা নাকি ব্যাংঙ্কে কাজ করে। তার কথা পুলিশকে বলেছিস?

ওর মুখেই প্রথম শুনেছিলাম যে শরণ্যা নাকি এক অন্য একজনের প্রেমে পড়েছে। তার সঙ্গে নাকি বিয়ের আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। সেটাই হয়তো এ ডিভোর্সের মূলে। যদিও রাহুল সেটা কখনো স্পষ্ট করে বলেনি।

—না জেনে আরেকজনকে বিপদে ফেলার তো মানে হয় না। যেটুকু জানি, সেটুকুই বলেছি।

মনে মনে সত্যি ভালো লাগল। এটাই রাহুলের আসল পরিচয়। খুব ভদ্র ছেলে। যাকে পছন্দ করে না, তার সম্বন্ধেও একটা অদ্ভুত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সত্যি কথা বলার ক্ষমতা রাখে।

কথার মধ্যে হঠাৎ মাসিমা, মানে রাহুলের মা ঘরে এসেছেন। উনি উপরের ঘরে ছিলেন। বন্ধুদের মধ্যে আড্ডা হচ্ছে জেনে উনি আগে নীচে আসেননি। তবে আমাকে উনি ছেলের মতোই দেখেন। তাই নিশ্চয়ই শুধু আমার গলা পেয়ে এসেছেন। আমাদের কথা একটু থামল। উনি এখনও শরণ্যার নিখোঁজ হওয়ার খবরটা জানেন কি না জানি না।

রাহুল হঠাৎ করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল।

মা-কে উদ্দেশ, করে বলে উঠল, ইন্দ্রনীলকে আজ থাকতে রাজি করিয়েছি, মা। ওকে আটকে দিলাম। আজও এখানে থাকবে।

খুব ভালো করেছিস।—বলে মাসিমা আমাকে লক্ষ করে বলে উঠলেন, গার্গী ভালো আছে তো? অনেকদিন ওকে দেখিনি।

—হ্যাঁ, ভালো আছে। অনেকদিন মানে? এই তো চার সপ্তাহ আগে এসেছিল এখানে। ছেলের পরীক্ষা নিয়ে খুব ব্যস্ত আছে। এখন ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনার টেনশন। আমার থেকে ও-ই বেশি সব সময় টেনশন করে।

—কোন ক্লাস হল তোমার ছেলের?

—ক্লাস ফোর।

মাসিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে যাচ্ছে। পরে একদিন নিয়ে এসো। আমার তো আর নাতনির সঙ্গে ইচ্ছেমতো দেখা করার উপায় নেই।—বলে একটু থেমে ফের বলে উঠলেন, যাও, তোমরা গল্প করো। আমি যাই। রাত হয়ে গেছে। কাল সকালে কথা হবে।

বুঝতে পারলাম, উনি এই শরণ্যার ব্যাপারটা জানেন না এখনও।

রাহুলের বাবা মারা গেছেন প্রায় কুড়ি বছর হল। মাসিমা ধর্মকর্ম নিয়েই বেশি থাকেন। শরণ্যার সঙ্গে রাহুলের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরে আরও কেমন যেন আড়ালে সরে গেছেন।

বউ-শাশুড়ির মধ্যে খুব ভালোই সদ্ভাব ছিল। মেয়ের মতো দেখতেন। শরণ্যার মধ্যে একটা ছেলেমানুষি ছিল। তার জন্য সবাইকে খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিতে পারত। এই ডিভোর্সটাকে মাসিমা এখনও তাই ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।

মাসিমা চলে যাওয়ার পরে আবার আমরা কথায় ফিরে এলাম।

—তা ঠিক কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?

—গতকাল রাত আটটা নাগাদ বাজার করতে বেরোয়। ওদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে দমদম স্টেশনে। তারপর থেকেই খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

—সঙ্গে কোনো ফোন ছিল না?

—শুনেছি, ছিল না। বাড়িতে নাকি ফোন রেখে গিয়েছিল। আমিও একবার ওর নাম্বারে ফোন করেছিলাম। বলছে সুইচড অফ। দেখ, আমার সঙ্গে যা করেছে, তাতে আমি এ বিষয়ে নিজে থেকে বেশী কিছু করতে চাইছি না। তবে রিনিকে নিয়ে চিন্তায় আছি। একা বাড়িতে আছে দিদিমার সঙ্গে। কিন্তু বুঝতেই পারছিস, এখন হঠাৎ করে ওকে নিয়ে আসা যাবে না। কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সত্যি গত এক বছরে যা হয়েছে, তাতে রাহুলের পক্ষে আগ বাড়িয়ে কিছু করাটাই অস্বাভাবিক। অথচ ওদের দুজনের মধ্যে সব সময়ে কী সুন্দর সম্পর্ক ছিল। শরণ্যা সব সময় সুযোগ পেলেই রাহুলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করত। অবশ্য তার পিছনে বেশ কিছু কারণও ছিল। রাহুল খুব কেয়ারিং। সব ছোটোখাটো বিষয়েও খেয়াল রাখত।

কিন্তু এক বছর আগে যখন হঠাৎ শুনলাম যে শরণ্যা ঠিক করেছে, ও আর রাহুলের সঙ্গে থাকবে না, রিনিকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, সত্যি খুব অবাক হয়েছিলাম। যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে শুনেছিলাম যে এর পিছনে ওই ছেলেটার হাত ছিল।

—আচ্ছা, ওই ছেলেটার নাম যেন কী ছিল?

রাহুল স্কচে একবার আলতো চুমুক দিল। তারপর গভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, কী হবে তা দিয়ে?

—সবার আগে তো তার সঙ্গেই যোগাযোগ করে দেখা উচিত।

চুপ করে বসে রইল রাহুল। খানিক বাদে বলে উঠল, সুরজিৎ।

—তা এখনও নিশ্চয়ই যোগাযোগ ছিল!

—দেখ, এসব নিশ্চয়ই পুলিশ দেখবে। ওর আর সুরজিতের তো বিয়ের কথা হচ্ছিল। দিনক্ষণও দেখা হচ্ছিল শুনেছি।

কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। রাহুল অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। বুঝতে পারছি এটা ওর কাছে কতটা বেদনার। আসলে রাহুল শরণ্যাকে যথেষ্ট ভালোবাসত। সেটা আমি দেখেছি। দুজনেরই কম বয়সে বিয়ে। তারপরে আঠেরো বছর একসঙ্গে কাটিয়েছে, দেশ-বিদেশ একসঙ্গে ঘুরেছে। তারপরে হঠাৎ করে সুতো কেটে গেছে। পথ বদলে গেছে। ডিভোর্স তো অনেকই হয়। কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে যেভাবে তিক্ততা হঠাৎ করে গড়ে উঠেছিল, তা সচরাচর দেখা যায় না।

—একটু দাবা খেলবি?

বুঝতে পারছিলাম, ও মনটাকে অন্যদিকে ঘোরাতে চাইছে।

আমরা দুজনে এখনও সময় পেলেই দাবা খেলি। একটা সময় আমি ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। কিন্তু রাহুলও খুব ভালো খেলে। এখন মাঝেমধ্যে ওর কাছে হারি। ও মেন্সার মেম্বার। মেন্সার মেম্বার হওয়া খুব সহজ নয়। খুব হাই আই. কিউ. ছাড়া মেন্সার মেম্বার হওয়া সম্ভব নয়। ওর ইন্টেলিজেন্স সাধারণের থেকে অনেক বেশি।

সেজন্য ওর সঙ্গে খেলাটা বেশ উপভোগ করি। আজও সেটাও হল। একটা দীর্ঘ এন্ড গেমের পরে আমি যখন জিতলাম, তখন পাশে ব্লু লেবেল স্কচের এর বোতল প্রায় খালি হয়ে গেছে। রাত একটা। এবারে শুয়ে পড়তে হবে।

রাহুল যেন শুধু একবার বলে উঠল, শরণ্যা উধাও। সুরজিতের ভাগ্যে কী আছে, কে জানে!

কেন বলল, বুঝলাম না। বুঝলাম, নেশাটা ভালোই হয়েছে।

নীচে একতলায় ড্রয়িং রুমের পাশেই ওর পড়ার ঘর। সেটা বেশ বড়ো ঘর। একধারে বেশ বড়ো একটা খাট আছে। ওই ঘরটা আমার পছন্দ। যখনই এখানে থাকি, এই ঘরেই থাকি। আজও সেখানে শুয়ে পড়লাম।

রাহুল উপরে ওর শোয়ার ঘরে শুতে গেল।

কেন জানি না, মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। বাইরে জোর বৃষ্টি হচ্ছে। কলকাতার বৃষ্টি আমি বেশ উপভোগ করি। রূপকথার মতো যেন জানলার কাচের উপরে প্রেমিকার নিশ্বাস এসে পড়ছে। সঙ্গে বজ্রপাত। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ির পাশে বেশ খানিকটা জমি আছে। সেখানে রাহুল একটা ফুলের বাগান করেছে। বেশ কয়েকটা আম গাছ আছে। পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে বাগানটা দেখা যায়। পড়ার ঘরের সঙ্গে একটা বারান্দা আছে। অন্যদিকের দরজা খুলে বারান্দায় যাওয়া যায়। কিন্তু বাইরে যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে, তাতে এখন সে দরজা খোলা সম্ভব নয়।

ঘুম আসছিল না। পড়ার ঘরের একদিকে সার দিয়ে বইয়ের আলমারি। এ ঘরটা আমার এজন্যই পছন্দ। বই বার করে করে দেখতে লাগলাম। এখনকার লেখকদেরও অনেক বই আছে। একধার দিয়ে স্টিফেন কিং, জেফ্রি আর্চার, খালেদ হোসেনি যেমন আছে, তেমনই আছে বুদ্ধদেব গুহ, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, অনীশ দেবের লেখা। আমার মতো ওর এখনও সেই গল্পের বই পড়ার অভ্যেসটা ভালোই আছে।

বইয়ের আলমারির নীচের তাকটা সাধারণত তালাবন্ধ থাকে। কেন থাকে তা জানি না। হয়তো ওর কিছু দরকারি কাগজ আছে। আজ দেখলাম সেখানে তালায় চাবি লাগানো। হয়তো চাবিটা সরাতে ভুলে গেছে। একটু কৌতূহল হল। কী যেন মনে হল। চাবি ঘুরিয়ে নীচের তাকটা খুললাম।

নাহ, বই না। অ্যালবাম। বেশ কিছু ফোটো অ্যালবাম রাখা। ডিজিটাল যুগের আগে ক্যামেরায় তোলা সব ছবি প্রিন্ট করে এভাবেই অ্যালবামে রাখা থাকত। কত যত্ন নেওয়া হত প্রত্যেকটা ছবির পিছনে। ওর সঙ্গে অনেক দেশে গেছি। কিছু ছবিতে আমিও হয়তো থাকব। দেখার আগ্রহ বাড়ল।

তা ছাড়া আমাদের মধ্যে যেরকম সম্পর্ক, তাতে এসব ব্যাপারে পারমিশনের প্রশ্নটাও থাকে না।

বেশ কয়েকটা ওর বিয়ের অ্যালবাম। বিয়ের অজস্র ছবি। একটা অ্যালবামে ইংল্যান্ডের ছবি। কত সহজে অতীত হারিয়ে যায়। বেশ কিছু ছবিতে আমিও আছি। অনেক কথা মনে পড়ে গেল।

আমেরিকার বেশ কিছু জায়গার ছবি দেখলাম। সেখানেও আমি আছি। বেশ কিছু ছবিতে আমি আর গার্গীও আছি। বিভোর হয়ে দেখছিলাম। সময়ের খেয়াল ছিল না। যেন সেই সময়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। তাকটা বন্ধ করব ভাবছি, হঠাৎ পিছনের একটা ছোটো কালো অ্যালবামে চোখ পড়ল। যেন লুকিয়ে রাখা আছে।

অন্যগুলোর পিছনে আলাদা করে এটা লুকিয়ে রাখার কারণ কী! ওতে হয়তোওদের খুব পার্সোনাল ছবি আছে। এটা নিয়ে পরে মজা করা যাবে। কী যেন মনে হতে ওটা বার করলাম। বিদেশের নানান জায়গার ছবি মেশানো। ওই অ্যালবামের মধ্যে একটা খামে আলাদা কিছু ছবি আছে। খামটা খুলতে গিয়ে ছবিগুলো আমার অসাবধানতার জন্য মার্বেলের মেঝের উপরে এসে পড়ল।

কি কিন্তু এ ছবিগুলো কোথা থেকে এল? এ কাদের ছবি? খবরের কাগজ থেকে কাটা কিছু ছবিও এর মধ্যে আছে। এত যত্ন করে রাখা কেন!

পরমুহূর্তে আমার হার্টবিট যেন বেড়ে গেল।

এসব ছবি এখানে কেন রাখা? শুধু শখ! নাকি বিশেষ সংগ্রহ?

প্রত্যেকটা ছবির উপর আবার পেনসিলে একটা ছোটো সিম্বল আঁকা। কী জন্য আঁকা? ছবিগুলোর মধ্যে কিছু ছবি আমার চেনা। তাদের কেউই আজ জীবিত নয়। শুধু তা-ই নয়, তাদের কারো মৃত্যুই স্বাভাবিক নয়।

বুঝতে পারলাম, আমি নিজের চোখকে, নিজের মনকে বিশ্বাস করতে পারছি না। বিশেষ করে ওই ছবিগুলোর পিছনের গল্পগুলো যখন মনে পড়ছে।

বাইরে বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে পড়ছে। এর মধ্যে যদি দরজার বাইরে কেউ চলে আসে, পায়ের শব্দ পাব না। খামে ছবিগুলো রেখে, আবার ঠিক যেভাবে অ্যালবামের মধ্যে খামটা ছিল, ঠিক সেভাবে রেখে বন্ধ করে দিলাম।

মনে হল, কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই রাহুল, যাকে আমি ভাবতাম, আমার থেকে ভালো আর কেউ চেনে না, সে আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে উঠেছে।

ওদের মৃত্যুর সঙ্গে রাহুলের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

এক বছর আগে

১৮ মার্চ ২০১৯, দুপুর দুটো, সল্ট লেক

আমার উলটো দিকে শরণ্যা বসে আছে। সল্ট লেকের সেক্টর ফাইভের একটা ক্যাফেতে আমরা বসে আছি। এর আগেও আমরা কয়েকবার এখানে এসেছি। তবে তখন সঙ্গে রাহুল ছিল। এখন শরণ্যা একাই।

কয়েকদিন আগে খবরটা রাহুলের মুখে শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি। আঠেরো বছর বিয়ের পরে হঠাৎ করে বিবাহবিচ্ছেদ। সেটা এখনকার সময়ে খুব অস্বাভাবিক নয়, তাও জানি।

কিন্তু তা বলে রাহুল আর শরণ্যা? ভাবতেই পারছি না। এত সুন্দর সম্পর্ক পারস্পরিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব কম দম্পতির মধ্যে আজকাল দেখেছি। দুজনেই দুজনের খেয়াল রাখত সব সময়। মনে হত, দুজনে একে অপরকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। অফিসে রাহুলের টিফিন দেখে আমি হাসতাম। শরণ্যা এত সুন্দর করে গুছিয়ে দিত, মনে হত যেন সেই স্কুলের দিনেই রাহুল পড়ে আছে।

এত বছরে রাহুল কখনো শরণ্যাকে ছেড়ে এক সপ্তাহের বেশি থাকেনি। এ নিয়ে মজাও করতাম। বুঝতে পারি, দুজনের মধ্যে একটা গভীর আকর্ষণ এখনও আছে। একটা নতুন বইয়ের গন্ধের মতো ওদের প্রেম এখনও টাটকা। এমন একটা সহজ সুন্দর সম্পর্ক ছিল দুজনের মধ্যে যে দেখলেই ভালো লাগত।

শরণ্যার বিয়ে হয়েছিল খুব কম বয়সে। ১৮ বছর বয়সে, যখন ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সবে চান্স পেয়েছে। তখনই বিয়ে হয়ে যায়। এটা খুব কমই হয়। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্টুডেন্টদের ক্ষেত্রে। এর পিছনে অবশ্য একটা কারণ ছিল।

শরণ্যা মামাবাড়িতে ওর দিদিমার কাছে মানুষ। ওর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন মা মারা যায়। কীভাবে ঠিক জানি না। তারপর থেকে মামাবাড়িতে দিদিমার কাছে মানুষ। শুনেছি, মামা খুব ভালোবাসলেও, মামি শরণ্যাকে বিশেষ পছন্দ করত না। সেই মামিও নাকি মারা যায়। দিদিমারও বয়স হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল শরণ্যার বিয়ে দেখে যাবে, যাতে পরে কোনো অসুবিধেয় না পড়তে হয় শরণ্যাকে। সেজন্যই এত তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়।

শরণ্যার ছোটোবেলা নিশ্চয়ই তেমন সুখের হয়নি। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বিয়ে, এত সুখের সংসার। সেসব অস্বীকার করে ও এখন এরকম অনিশ্চিত এই জীবন খুঁজে নিচ্ছে কেন, কে জানে!

রাহুল ওর থেকে পাঁচ বছরের বড়ো। যখন বিয়ে হয়, তখন ও আমার সঙ্গে সবে চাকরিতে ঢুকেছে। তাই এসবই আমার চোখের সামনে দেখা। ওর বিয়েতেও গিয়েছি। বিয়ের প্রত্যেকটা ঘটনা মনে আছে। সেজন্য এ ঘটনা আমার কাছেও খুব বেদনার।

শরণ্যা ওয়াশরুম থেকে ঘুরে এসে আমার সামনে বসল। শরণ্যাকে উল্লেখ করে বলে উঠলাম, তুমি কী নেবে?

—না, না, আমি কিছু নেব না। আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।

—তা বললে হয়? তুমি তো ক্যাপুচিনো খাও, বলে দিচ্ছি।

নীরবে সায় দিল শরণ্যা।

অর্ডার দিয়ে ফিরে এসে টেবিলে বসলাম।

দেখলাম, শরণ্যা ওর উজ্বল চোখটকে রোদচশমার আড়ালে লুকিয়েছে। হয়তো ওর চোখের জল ও দেখাতে চায় না। ওর বয়স চল্লিশের কাছে হতে চলল। কিন্তু এখনও ওকে যথেষ্ট আকর্ষণীয় দেখতে। অনেক নামী নায়িকা বা মডেলের থেকে ওকে এখনও দেখতে ভালো। একটা অতি সাধারণ সালোয়ার-কামিজ পরা সত্ত্বেও এখানে যারাই ঢুকছে, তাদের মুগ্ধ দৃষ্টি একবার ওর দিকে ঘুরে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছি। মুখে আজ বিষণ্ণতা, যদিও ঠোঁটের লাল লিপস্টিক চোখ এড়াল না।

রাহুলকে অনেকবার জিজ্ঞেস করার পরে ও বলেছিল যে শরণ্যার সঙ্গে নাকি কোন এক ছেলের রিসেন্টলি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সেজন্য এই বিচ্ছেদ।

শরণ্যাকে দেখে যে কেউ প্রেমে পড়বে। শুধু সৌন্দর্য নয়, একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে, যেটা খুব সুন্দরী মহিলাদের মধ্যেও অনেক সময় থাকে না। ওর স্বভাবের উষ্ণতা এই আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যে কাউকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করবে। তা সে ছেলেটাকে শুধু দোষ দিতে পারি না। কিন্তু ওর দিক থেকে এটা কী করে ও হতে দিল? তাও আবার জীবনের এরকম এক প্রান্তে এসে, যেখানে তার প্রভাব ওদের মেয়ের উপরেও পড়বে!

আমার এ প্রসঙ্গটা তুলতে খারাপ লাগছিল। যদিও ফোনে বলেছিলাম যে ওর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাই। ও-ই বলেছিল যে ফোনে কথা বলবে না। আমার সঙ্গে এখানে দেখা করতে পারে। আমি ভেবেছিলাম, আমার এই দৌত্যে যদি এই ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লাগানো যায়।

খানিকক্ষণের অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে বলে উঠলাম,—এরকম কেন হল, শরণ্যা? তোমাদের এত সুখী সংসার? তোমরা দুজন দুজনকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। কেন এ সংসার ভাঙছ?

—আমি এ সম্পর্ক ভাঙছি, কে বলল?— ওর চোখ যেন জ্বলে উঠল মুহূর্তের জন্য। একটু থেমে ফের বলে উঠল, আমার আর কোনো উপায় ছিল না। ও তো তোমার খুব বন্ধু। কিন্তু তোমার বন্ধুকে তুমি কতটা জানো?

—খুব ভালো করে জানি। একজন সব থেকে প্রিয় বন্ধুর পক্ষে যতটা জানা সম্ভব। ওর মতো ছেলে খুব কমই হয়।

শরণ্যা চোখের রোদচশমাটা খুলে নিল। পাশে টেবিলের উপরে রেখে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আমিও তা-ই ভাবতাম। ভুল ভাবতাম। ওকে আমি এখনও চিনি না। তুমিও না।

—মানে? ওর দিক থেকে কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম?

—না, না, সেরকম কিছু নয়। একটু থেমে বলে উঠল, ধরো, তুমি হঠাৎ করে একজনের সম্বন্ধে এমন কিছু জানলে যাতে তার সম্বন্ধে তোমার সবরকম বিশ্বাস-ধারণা মুহূর্তে ভেঙে গুড়িয়ে গেল। তারপরে কি আর তার সঙ্গে থাকা যায়? সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে একটা বিশ্বাসের উপরে। সে বিশ্বাসেই যখন ধাক্কা লাগে।

—সে আবার কীরকম?

—তোমাকে আমি সেটা বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি, দোষটা আমার দিক থেকে নয়।

—মানে তুমি বলতে চাও, তোমার আর সুরজিতের মধ্যে কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি?

—আমি সেটা বলিনি। আমি সুরজিৎকে অনেক বছর ধরেই চিনি। কিন্তু সেটার জন্য কিছু ভাঙেনি। বলা যায়, ভাঙার পরেই সে আশ্রয় আমি খুঁজে নিয়েছি। যেরকম স্রোতে ভেসে-যাওয়া মানুষ ভাঙা গাছের ডালপালা বা কিছু একটা ধরে ভেসে থাকতে চায়, সেরকমই ধরো— বলে ও চুপ করে রইল।

খেয়াল করলাম, ওর চোখের নীচটা সামান্য ফুলে গেছে। বুঝতে পারলাম, এ নিয়ে ও সমানে কান্নাকাটি করছে।

—কিন্তু কোনোভাবে কি রাহুলের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়? অনেক সময়ে তাড়াহুড়োয় ভুল ডিসিশন হয়। সময় দিলে সেটা ঠিক করে নেওয়া যায়। তোমাদের মেয়ের কথা ভেবে দেখেছ?

ওর মায়াবী চোখ যেন ফের এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল। শুধু বলে উঠল,না, এখন আর সেটা কোনোভাবে সম্ভব নয়। কিছু জিনিস একবার ভাঙার পরে আর জোড়া যায় না।

এরপরে আর বেশি কিছু কথা বলা যায় না। আমরা ক্যাপুচিনোয় চুমুক দিতে দিতে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। তারপরে অন্য আলোচনায় চলে গেলাম।

ও শুধু শেষে বলে উঠল, আমি তোমার নাম্বার রেখে দেব। দরকার হলে ফোন করব। অনেক সময় কাছে থেকেও মানুষ চেনা যায় না। আবার অনেক দূরে থেকেও মানুষ চেনা যায়। তোমাকে আমি এখনও বিশ্বাস করি। তুমি চিরকাল আমার বন্ধুই থাকবে।

১৬ জুন ১৯৯৭, ডেনভার, কলোরাডো

—রাহুল বাড়িতে আছে?

—হ্যাঁ, এত সকালে কোথায় যাবে? —দরজা খুলে শরণ্যা বলে ওঠে,রোববার ঘুম থেকে উঠতে উঠতে ওর এগারোটা বেজে যায়। রাত অব্দি টিভি-তে কী সব প্রোগ্রাম দেখে। সকালে ওঠানোই যায় না।

দেখেই বোঝা যায়, শরণ্যা বেশ খানিকক্ষণ উঠে গেছে। গায়ে একটা হলুদ ড্রেস। পরিপাটি সাজ। লিপস্টিক, চোখে কাজল। শরণ্যাকে শুধু দেখতে যে ভালো তা-ই নয়, কী পরলে ওকে ভালো মানায়, সে সম্বন্ধে ওর খুব ভালো ধারণা আছে। বাড়ির বাইরে শুধু নয়, বাড়িতেও সব সময় পরিপাটি থাকে।

ওকে আমি বিয়ের পর থেকে এত বছর দেখছি। সেই একই রকম। আর রাহুল?

রাহুলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা প্রায় প্রাগৈতিহাসিক। দু-এক বছরের নয়। একই সঙ্গে আমরা এক আই. টি. কোম্পানিতে জয়েন করি। যে সময়ে জয়েন করি, সে সময়টাকে বলা যায় আই. টি. জগতের হামাগুড়ির সময়। কর্মীসংখ্যা তখন খুব কমই ছিল। আমার আর রাহুলের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আলাদা ছিল। তবে আগে থেকেই চিনতাম। ও ছিল আমাদের ব্যাচের জয়েন্টে প্রথম। আমি ছিলাম তৃতীয়। উচ্চমাধ্যমিকেও দুজনেরই প্রথম দশের মধ্যে র‌্যাঙ্ক ছিল।

পড়তাম পাশাপাশি উত্তর কলকাতার খুব নামকরা দুই স্কুলে। অনেক প্রতিযোগিতায় একদম শেষ পর্যায়ে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সেজন্য মুখ চেনা ছিল। নাম জানতাম। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা আমাদের মধ্যে অবশ্যই ছিল।

কিন্তু চাকরির আগে কখনো ভালো করে পরিচয় ছিল না। চাকরিতে এসে সে সুযোগ হল। একই ব্যাচে ওই সংস্থায় জয়েন করি। একটা নতুন অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করতে হবে। কাজটা সহজ ছিল না। দিনরাত জেগে একসঙ্গে কাজ করেছি। সেই তবে থেকে বন্ধুত্ব। কেন জানি না খুব সহজেই আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।

সেজন্যে আমরা অনেক সময়-অসময়েও একে অন্যের বাড়িতে গিয়ে হাজির হই।

এখন সকাল আটটা। বিদেশে ছুটির দিনে দেরি করে ওঠাটা প্রায় সব বাঙালির অভ্যেস। বাকি কদিনের সকাল সকাল ওঠা কমপেনসেট করে নেওয়া।

—ঠিক আছে। আমি পরে আসব।—বলে উঠি।

—না না, তা বললে হয়! আজ লুচি করব। তোমার জন্যই না হয় ওকে আজ সকাল সকাল তুলে দেব। এমনিতেও তোমার নাম শুনলেই হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে। আমার সঙ্গে তো ওর আর তেমন গল্প জমে না। তুমি বরঞ্চ গার্গীকেও ডেকে নাও। একসঙ্গে লুচি খাওয়া যাবে।

—ও এসব খায় না। ডায়েট করছে। সব অখাদ্য খাবারের উপরেই থাকে। স্যালাড, সেদ্ধ খাবার। লো-কার্ব ডায়েট। অনেক কায়দা আছে ওর। উলটে আমার এসব খাওয়া আজ বন্ধ হয়ে যাবে।

হেসে ওঠে শরণ্যা—ঠিক আছে, তুমি তো ভেতরে এসো। না হয় আমার সঙ্গেই খানিকক্ষণ গল্প করলে।

শরণ্যার পীড়াপীড়িতে ভেতরে এসে বসতেই হয়। আমার ফ্ল্যাটটাও একই কমপ্লেক্সে। ডেনভার শহরের সেন্টারের কাছে। ডেনভার ভারী সুন্দর শহর। বলা হয় মাইল হাই সিটি। শীতে প্রচুর বরফ পড়লেও, শীত এখানে মেঘের ভিড়ে মুখভার করে থাকে না। আমেরিকার মধ্যে সব থেকে বেশি রোদ ঝলমলে দিন এখানে। বরফ পড়লেও রোদের দাপটে চট করে ফের রাস্তা ছেড়ে দেয়।

আমরা এখানে এক বছর হল এসেছি। আমি আর রাহুল একই প্রোজেক্টে কাজ করি। ইন ফ্যাক্ট, একসঙ্গে কাজ করার ও থাকার সুযোগ হবে বলেই প্ল্যান করে এসেছি। দেশ থেকে এতদূরে বাকি সবাইকে ফেলে আসতে হয়েছে। সেখানে একজন খুব কাছের বন্ধু না হলে চলে! এখান থেকে ভারতে ফোন করাও বেশ কস্টলি। প্রতি মিনিটে প্রায় এক ডলার। সেজন্য বাড়ির দূরত্ব যেন আরও বেশি মনে হয়। মা-র সঙ্গেও খেয়াল করে মিনিট গুনে গুনে কথা বলতে হয়। সেখানে বাড়ির পাশে এক বন্ধুকে পেলে দূরে থাকার অনেক কষ্ট ভোলা যায়। সব বিষয়ে মন খুলে গল্প করা যায়।

সোফায় বসে শরণ্যাকে লক্ষ করে বলে উঠি, হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে গল্প করতে পারলে তো ভালো লাগবেই। দেখবে, কথা শুরু করলে এমনিতেই রাহুল উঠে চলে আসবে। সুন্দরী বউকে সব সময় চোখে চোখে রাখে।

বলতেই শরণ্যা খিলখিল করে হেসে উঠল, মোটেও না। সারাদিন আমার সঙ্গে কথা বলারই সময় পায় না। তা ছাড়া ওর তো বাড়িতে মনই টেকে না! সারাক্ষণ বাইরে বাইরে ঘুরছে। তা তোমার হাতে ওটা কী?— আমার কাগজ লক্ষ করে বলে উঠল।

—ও, এটা দেখাতেই তো এসেছিলাম। আজকের ডেনভার পোস্টে বেরিয়েছে।

—কী দেখি?

—এই লোকটাকে মনে পড়ে?

শরণ্যা দেখে অবাক হল। —না, কে লোকটা?—বলে একটু ভালো করে দেখে ফের বলে উঠল, আরে, কয়েক মাস আগে যার গাড়ির সঙ্গে আমাদের গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, সেই লোকটা না?

—একজ্যাক্টলি। একটু অস্পষ্ট হলেও ঠিক সেই মুখ। সেদিন কথা শুনেই মনে হয়েছিল, লোকটা ক্রিমিন্যাল হলেও অবাক হব না। ঠিক তা-ই। লোকটাকে আর ওর বড়ো মেয়েটাকে পুলিশ ধরেছে বউ খুনের মামলায়।

—বলো কী?

—হ্যাঁ, ছোটো করে লিখেছে। নাকি বিষ খাইয়ে হত্যা করেছিল কয়েকমাস আগে। পড়ে যা বুঝলাম খুব ইন্টারেস্টিং কেস। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে পুলিশ লোকটার নাগাল পেয়েছে। সেটা পড়াতেই এনেছিলাম।

এর মধ্যে পিছন থেকে রাহুলের গলা পেলাম।—দেখি সকাল সকাল কে আবার আমার বউয়ের সঙ্গে প্রেম করতে এসেছে?

—ওই দেখেছ। এবার থেকে আমি রোববার সকাল সকাল এসে যাব। তোর ঘুম ভাঙাতে। এজন্য সকালে তোর সঙ্গে টেনিস খেলা হয়ে ওঠে না। —এবার মজা ছেড়ে কাগজটা ওর সামনে ধরলাম—লোকটাকে মনে পড়ে?

রাহুল ঘরে গিয়ে চশমা পরে এল। তারপর কাগজটা একঝলক দেখেই বলে উঠল,—আরে, ব্যাটাকে মনে পড়বে না! এ তো সেই অন্য গাড়ির লোকটা। সেদিন যা রাগ হয়েছিল-না!

—ভাগ্যিস মাথা ঠান্ডা রেখেছিলে। —শরণ্যা বলে উঠল, এখানে যার-তার কাছে বন্দুক থাকে। এর কাছে তখন যে ছিল না, তা-ই বা কে বলতে পারে? যে এরকম বউকে খুন করতে পারে, সে যে ওদিন আরও কিছু ক্ষতি করেনি, সেটাইও ভাগ্য। শুধু গাড়ির উপর দিয়ে গেছে।

আমি বলে উঠলাম, হ্যাঁ, যেভাবে তোকে আচমকা চড় মেরেছিল এসে, তুই বলেই মাথা ঠান্ডা রাখতে পেরেছিলি। আমি তো আরেকটু হলে লোকটাকে তখনই মারতাম।

—এ তো আর আমাদের কলকাতা নয়। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। তা ছাড়া কে বলতে পারে, সেদিন হয়তো গাড়িতে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে যাচ্ছিল। তার মধ্যে আমাদের গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা। যাদের বউ থাকে, আমি তাদের এসব ছোটোখাটো অপরাধে ক্ষমা করে থাকি। —বলে আড়চোখে শরণ্যার দিকে তাকিয়ে হাসল রাহুল।

—দেখি, খবরটা ভালো করে পড়ি—বলে কাগজটা আমার হাত থেকে নিয়ে রাহুল পড়তে শুরু করে দিল।

শরণ্যা পাশ থেকে বলে উঠল, হ্যাঁ, ভালো করে পড়ো। দেখো, বউ-হত্যার কোনো ভালো উপায় শিখতে পারো কি না! তোমরা গল্প করো। আমি ততক্ষণ লুচি করে আনি।

সেদিনকার কথাটা সত্যি। ভাগ্যিস রাহুল মাথা গরম করেনি। না হলে সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড হত। রাহুলের অবশ্য এমনিতেই মাথা খুব ঠান্ডা।

টেবিলের উপরে ইকনমিস্ট ছিল। আমি ওটা হাতে নিয়ে পা টেবিলের উপরে আয়েশ করে তুলে দিয়ে পড়তে শুরু করলাম।

অনেক বাড়িতে গিয়ে কখনোই সহজ হওয়া যায় না। রাহুল-শরণ্যা দুজনেই এমন যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুলে যেতে হয় যে এটা আমার বাড়ি নয়। দুজনের ব্যবহারে একটা সহজ উষ্ণতা আছে, যা খুব তাড়াতাড়ি সবাইকে আপনার করে নেয়।

ঘটনাটা কী ছিল তা একটু বলি। এটা মাস ছয়েক আগের ঘটনা। খুব সম্ভবত ডিসেম্বরের মাঝামাঝির সময়কার ঘটনা। হঠাৎ বরফ পড়া শুরু হয়ে গেল। সেরকম বরফ পড়া আমি আগে কখনো দেখিনি। সারাদিন, সারারাত ধরে ঝুরঝুর করে তুলোর মতো বরফ পড়ছে। মনে হচ্ছে, বস্তা বস্তা তুলো কেউ যেন আকাশ থেকে ঢেলে দিচ্ছে। তারপরে রাতে সেই অনির্বচনীয় অনুভূতি। চারদিক যেন চাঁদের আলোয় ভাসছে। যেদিকে তাকাই শুধু বরফ আর বরফ। কোনো শিল্পী যেন পেন্টব্রাশে চারদিকে সাদা রং করে দিয়েছে। আমরা সবাই বাড়িতে বন্দি দু-দিন। ভেবেছিলাম, তারপরে বেশ কয়েকদিন লাগবে রাস্তা পরিষ্কার হতে। কিন্তু বরফ পড়া থামার পরের দিনই দেখলাম, রাস্তায় গাড়ি চলাচল শুরু হয়ে গেল।

আমার বরফের মধ্যে চালানোর বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই। তাই ঠিক করলাম, আমরা রাহুলের গাড়িতে করে দোকান-বাজার করে আসব। ও গাড়ি বেশ ভালো চালায়।

পথে সে এক কাণ্ড। বরফ পরিষ্কার করলেও জায়গায় জায়গায় হার্ড আইস। অনেক সময় বোঝা যায় না। রাহুল যথেষ্ট সতর্ক হয়ে চালাচ্ছিল। হার্ড আইসের উপরে ব্রেক কাজ করে না। কিন্তু একটা রেডলাইটে গাড়ি থামাতে গিয়ে হার্ড আইসে এমনভাবে স্কিড করল যে কোনোরকমে স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করে গাড়ি থামাতে হল। কোনোরকমে আগের গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা বাঁচানো গেল। কয়েক ইঞ্চি আগে থামানো গেছে। কিন্তু পিছনের গাড়িটা ঠিকমতো থামতে পারেনি। এসে সজোরে আমাদের গাড়িতে ধাক্কা দিল। রাহুল গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। আমিও নেমে এলাম। পিছনের গাড়ি থেকে বিশাল লম্বা-চওড়া একটা লোক নামল। অসম্ভব মোটা। ডাবল চিন। গলা-মুখ সব এক হয়ে গেছে।

অকথ্য সব গালাগাল দিতে দিতে কথা নেই, বার্তা নেই, সোজা এসে রাহুলের মুখে একটা সজোর থাপ্পড় মারল।

রাহুলের মুখ রাগে-অপমানে লাল হয়ে গেছে। তবু ও কীভাবে নিজেকে সামলাল জানি না। আমি লোকটাকে মারতে যাচ্ছিলাম। রাহুল ধমক দিল, কী করছিস? মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

আমাকে খেপে যেতে দেখে লোকটা আরও উত্তেজিত হয়ে কীসব গালাগাল করতে লাগল।

এর মধ্যে এক মহিলা, লোকটার স্ত্রীই হবে হয়তো, রাস্তায় বেরিয়ে এসে লোকটার সঙ্গে যোগ দিল। স্বভাবে সে-ও তার হাজব্যান্ডের মতোই। একই রকম খারাপ ভাষায় আমাদের বেশ খানিকক্ষণ গালাগাল দিয়ে গেল।

এ ধরনের ক্ষেত্রে পিছনের গাড়িরই দোষ হয়। তারই উপযুক্ত দূরত্ব রেখে চালানোর কথা। রাহুলের কোনো দোষই নেই। ওদেরই ইনসিয়োরেন্স থেকে খরচ দেওয়া উচিত। রাহুল অবশ্য সেসব কথা একবারও বলেনি। কিন্তু পুরো উলটো। যেন নিজের ভুল আড়াল করার জন্য লোকটা আরও চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করল।

আমাদের গাড়ির অবশ্য তেমন কোনো ক্ষতি ছিল না। ওদেরও সেরকম বড়ো কোনো ক্ষতি হয়নি। এক্ষেত্রে ঠান্ডা মাথায় ইনসিয়োরেন্স ডিটেলস শেয়ার করাই নিয়ম। বাকিটা তারাই দেখবে। লোকটা চেঁচামেচি করে গাড়ির ইনসিয়োরেন্স ডিটেলস না দিয়ে আবার গাড়িতে উঠে চালিয়ে দিল। আমরা এত হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে গাড়ির নাম্বারটা ছাড়া কিছু দেখিনি। এ বিষয়ে কমপ্লেন করাও হয়নি। কিন্তু চাইলে আমরা ওদের বিপদে ফেলতে পারতাম। বড়ো ধরনের ফাইনের মুখে পড়ত।

সেদিনের সে ঘটনার জন্য লোকটা সম্বন্ধে মনটা বেশ বিষিয়ে ছিল। খবরটা দেখে ভালোই লেগেছে।

জিজ্ঞেস করলাম রাহুলকে, কী লিখেছে?

—কেন, তুই পড়িসনি?

—না, ডিটেলসে পড়িনি। কী দেখলি?

রাহুল দেখি, খবরটা খুব মন দিয়ে পড়ল। তারপরে খানিক বাদে বলে উঠল,ইন্টারেস্টিং। লোকটা নাকি দুবছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। কিন্তু রিসেন্টলি কিছু গণ্ডগোল শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় স্ত্রী-র সঙ্গে। তাকেই নাকি জানুয়ারিতে খুন করার দায়ে ধরা পড়েছে। খুনের দায়ে লোকটার প্রথম পক্ষের মেয়েকেও ধরেছে।

তার মানে সেদিন যে মহিলা সঙ্গে ছিল, সে-ই নিশ্চয়ই দ্বিতীয় স্ত্রী। সে-ই নিশ্চয়ই খুন হয়েছে। কী অবস্থা। সেদিন গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সে-ও তো অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছিল।

রাহুল লেখাটা পড়া শেষ করে যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। শুধু একবার 'হুম' বলে অস্ফুট শব্দ করে উঠল।

আমার অবশ্য অন্যমনস্ক হওয়ার সুযোগ ছিল না। ডাইনিং টেবিলে ডাক পড়েছে। লুচি রেডি। সঙ্গে আলু-ফুলকপির তরকারি। দারুণ। দেশের বাইরে এরকম খাবার নিয়মিত পাওয়া যায় না।

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, রাত তিনটে, মধ্যমগ্রাম

অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম এল না। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে, টেনশনে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঘর অন্ধকার। কিন্তু তার থেকেও বেশি অন্ধকার যেন আমাকে ঘিরে ধরেছে। তার মধ্যেই খাটের উপরে চুপ করে বসে রইলাম নিজেকে অদৃশ্য করে। একটা চাপা উত্তেজনা যেন ভারী হয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুকের উপরে আরও বেশি করে চেপে বসেছে। বাইরে এখনও অঝোর বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে।

আমি যেটা ভাবছি, সেটা কি সত্যি? না, না, এ অসম্ভব। আমি রাহুলকে এত বছর ধরে চিনি। আমার ক্লোজেস্ট ফ্রেন্ড। এত বড়ো ভুল করব!

কিন্তু তাহলে এ ছবিগুলো এত যত্ন করে রাখা আছে কেন? যার মধ্যে তিনজনকে আমি ভালো করেই জানি। মুখগুলো আমার এত বছর বাদেও স্পষ্ট মনে আছে। বাকি কয়েকটা ফোটো কাদের, সেটা অবশ্য জানি না।

খুব সন্তর্পণে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। দরজায় কোনো লক নেই। দরজার নীচ দিয়ে কোনো আলো আসছে না। বাইরে তার মানে কোনো আলো জ্বলছে না। কেউ নির্ঘাত জেগে নেই। ঘরের আলো জ্বালালাম না। ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে বুককেসের সামনে মাটিতে বসে পড়লাম। আবার চাবি ঘুরিয়ে বইয়ের আলমারির নীচের তাক খুললাম। ডালাটা সাবধানে নিঃশব্দে তুলে একটা একটা করে অ্যালবাম নামাতে থাকলাম।

মনে রাখতে হবে, কোনটার পরে কোনটা ছিল। সেভাবেই মাটিতে সাজিয়ে রাখতে থাকলাম।

আগের বারে অবশ্য এত সাবধানে করি নি। তখন কিছু ভুল করে থাকতে পারি।

ওই ছোট অ্যালবামটা পিছনে ঠিক যেখানে ছিল, সেখানে রেখে দিয়েছিলাম। আবার বার করতে গিয়ে সামনের একটা অ্যালবাম পড়ে গেল। সামান্য আওয়াজ হল। চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালাম। নাহ, এই বৃষ্টির আওয়াজের মধ্যে সে আওয়াজ শোনা সম্ভব নয়। তবু হৃৎস্পন্দনের হার যেন বেড়ে গেল। যদি কেউ এসে যায়!

ফোনের আলো নিভিয়ে খানিকক্ষণ ওখানেই বসে থাকলাম। কেউ শুনতে পায় নি তো? বাইরে থেকে কেউ আসছে কি না বোঝার চেষ্টা করলাম। নাহ, কোনো পায়ের শব্দ নেই। ফের ফোনের টর্চের আলো ওই অ্যালবামে ফেললাম। খামে কয়েকটা ছবি ছিল। কয়েকটা খবরের কাগজ থেকে কাটা। কয়েকটা ক্যামেরায় তোলা। ফোনে সব ক-টা ছবি তুলে নিলাম। লক্ষ করলাম সব ক-টা ছবির উপরে একটা অদ্ভুত সিম্বল।

একটা চোখ। মাঝখান থেকে কাটা।

ছবিগুলো নিয়ে অ্যালবামগুলো আবার যেখানে যেখানে ছিল, ঠিক সেভাবে রেখে দিলাম। তাক বন্ধ করে চাবি আবার যেরকম লাগানো ছিল, ঠিক সেভাবেই রেখে দিলাম।

ছবিগুলো এখানে আছে কেন? সে রহস্য আমাকে বার করতেই হবে। এত আবোল-তাবোল ভাবছি, রাহুলকে জিজ্ঞেস করলেই সন্দেহ মিটে যায়। ওকে প্রায় সব কথাই বলা যায়। কিন্তু এটা সেরকম কথার মধ্যে পড়ে না।

ও যদি সত্যি ইনভলভড থাকে! সেক্ষেত্রে? শুধু শুধু একটা লোক এভাবে কয়েকজনের কাগজে ছাপা ছবি সংগ্রহ করে এত বছর ধরে এত যত্ন সহকারে গুছিয়ে রাখে?

নাহ, শুয়ে পড়াই ভালো। হাতঘড়িতে দেখলাম রাত দুটো। শুয়ে ঘুম এল না। আরও আধ ঘণ্টা কেটে গেল। এ ঘরে রাহুলের পার্সোনাল ল্যাপটপ থাকে। ওটা অন করে একবার দেখব কি! তাতে যদি কোনো তথ্য পাওয়া যায়। করাটা উচিত নয় জানি। কিন্তু এরকম রহস্যের সমাধান করার সুযোগ কি আর কোনোদিন আসবে?

উঠে কম্পিউটার অন করলাম। পাওয়ার অন পাসওয়ার্ড কী হতে পারে? ও আই. টি.-র লোক, খুব সহজ কোনো পাসওয়ার্ড রাখবে না। কয়েকবার চেষ্টা করলাম। ওর পছন্দের জিনিসের নাম, জন্মদিন, শরণ্যার নাম, বিভিন্ন কম্বিনেশন— ট্রাই করলাম। ওকে কি সত্যি আমি এখনও চিনি না! ব্যর্থ হয়ে আবার কম্পিউটার অফ করে শুয়ে পড়লাম।

এবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফোনে ইন্টারনেটে সার্চ করলাম। অনেক বছর কেটে গেছে। লোকটার নাম যেন কী ছিল? পল, না না, ডেভিড। খুঁজে পেতে অবশ্য সময় লাগল না।

ডেনভার ১৯৯৭ মার্ডার কেস বলে সার্চ করতেই, যেসব ঘটনার কথা খবরে খুঁজে পেলাম, তার মধ্যে ওই কেসটা খুঁজে পেতে সময় লাগল না। লোকটার নাম পল কোলাঞ্জেলো। ডেনভার পোস্টে ছবিটাও খুঁজে পেয়ে গেলাম। ফোনে তোলা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম। একই ছবি। হ্যাঁ, কাগজ থেকে কাটা এরই ছবি রাহুলের অ্যালবামে দেখলাম। ওর স্ত্রী-র নাম টনিয়া। তার ছবিটাও ঠিক চিনতে পেরেছি। দুটোই প্রকাশিত খবর থেকে নেওয়া। তার বাইরেও এদের দুজনের একসঙ্গে একটা কালারড ছবি আছে। সেটা ও কীভাবে জোগাড় করল?

এরপরে কেনিলওয়ার্থ ২০০৪ সাল, ইংল্যান্ড। একইভাবে জেসিকা স্মিথের নাম বার করতেও সময় লাগল না। সে ছবিটা অবশ্য অস্পষ্ট। ডেলি মেল-এ খবরটা বেরিয়েছে। ২০ জুন ২০০৪-এর খবরে। বলা হয়েছে যে যার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তার নাম জেসিকা স্মিথ। ৩১ বছরের মহিলা। না, অস্পষ্ট হলেও ছবিটা চিনতে ভুল হয়নি। জেসিকার মুখ এখনও আমার চোখে ভাসে। জেসিকা আমাদের সঙ্গেই কাজ করত। আরেকটা ছবিও পেলাম সেই অ্যালবামে। জেসিকা ও জেসিকার বয়ফ্রেন্ডের। ওর এরকম পার্সোনাল ছবি এখানে রাহুলের কাছে এল কী করে?

আমাদের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট টিমে সেক্রেটারির কাজ করত জেসিকা। কাজের বাইরে তেমন কোনো কথা হত না। ভারী মিষ্টি মেয়ে ছিল। নীল চোখ। সোনালি চুল।

তারপরে একদিন হঠাৎ করে অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। তিন দিন না-আসার পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। মেয়েটার বাবা-মা ইংল্যান্ডের কেন্টে থাকত। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম যে ও বোধহয় আর্জেন্ট কোনো কাজে সেখানে গেছে। তারাও কিছু না বলতে পারায় তারপরেই পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। সে সময় পুলিশ এসে আমাদের সবাইকে অনেক প্রশ্ন করেছিল। মনে আছে। শুনেছিলাম, জেসিকার এক বয়ফ্রেন্ডকে পুলিশ অনেক জেরা করেছিল। সে ছেলেটাও কিছু বলতে পারেনি।

এর পাঁচ মাস বাদে হঠাৎ আবার একদিন পুলিশ অফিসে এসে হাজির। তখনই জানতে পারি যে ওর ডেডবডি পাওয়া গেছে টাইল হিলে। আমাদের অফিস ছিল বার্মিংহ্যামে। সেখান থেকে জায়গাটা খুব দূরে নয়। একটা বাক্সের মধ্যে ওর কঙ্কাল পাওয়া যায়। মার্ডার।

হঠাৎ করে যখন জেসিকার মার্ডারের খবটা পেয়েছিলাম, খুব খারাপ লেগেছিল। এত হিংস্রভাবে কে ওকে মারতে পারে, ভাবতে পারিনি। মার্ডার কেসে শেষে কাকে ধরা হয়েছিল, সেটা জানা নেই। আমি সে বছরে জুনে দেশে ফিরে আসি। ভুলেই যাই এ ঘটনা।

কিন্তু রাহুলের কি কোনো মোটিভ থাকতে পারে এই খুনের পিছনে? কিছু কিছু ঘটনা মনে পড়ছে। সেগুলো বিক্ষিপ্তভাবে মনে আসতে লাগল।

এ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ২০০৪-এর জুলাই নাগাদ রাহুল ফিরে আসে ইংল্যান্ড থেকে। আমিও তার এক মাস পরে ফিরে আসি। প্রোজেক্ট থেকে ওকে তখন ছাড়তে চাইছিল না। ও মা-র শরীর খারাপ বলে ফিরে এসেছিল। মাসিমার শরীর অবশ্যই খারাপ ছিল, কিন্তু শুধু তা-ই কি? নাকি এ ঘটনার জন্যই? ও-ই কি যুক্ত ছিল এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে? আজ রাতে আর ঘুম হবে না। বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলাম।

কিন্তু ঘুম এল। সেদিন স্বপ্নে জেসিকাও এল।

১৮ জানুয়ারি ১৯৯৭, ডেনভার, কলোরাডো

শীতের সকাল। আজ বরফ পড়েনি। বাইরে আলো ঝলমল করছে। তার মধ্যে মাঝেমধ্যে ঠান্ডা কনকনে হাওয়া। ডেনভার পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকা। সেজন্য মাঝেমধ্যে আশপাশের বরফ ঢাকা রকি মাউন্টেন থেকে ঠান্ডা কনকনে হাওয়া হানা দেয়।

লিসা শিকাগোতে বড়ো হয়েছে। সেখানে বেশি বরফ পড়লে বেরোনো শক্ত হয়ে যেত। এখানে সেরকম নয়। বরফ যেমন প্রচুর পড়ে, সূর্যের আলোর কড়া মেজাজে সে বরফ গলেও যায় তাড়াতাড়ি।

ডিটেকটিভ কনস্টেবল লিসা এক বছর ডেনভারের পুলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে। কাল বিকেলে একটা নতুন কেস এসেছে। পুরো কোলাঞ্জেল ফ্যামিলি হাসপাতালে ভরতি। ডেনভারেই বহু বছর থাকে এই পরিবার। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। পল কোলাঞ্জেল কাছেই অ্যাস্পেনের একটা মাইনিং কোম্পানিতে কাজ করে। সে-ই একমাত্র সুস্থ আছে। তার পুরো পরিবার হাসপাতালে।

পরিবার বলতে স্ত্রী মেরি, দুই ছেলে, এক মেয়ে। তিন দিন আগে হাসপাতালে ভরতি হয়েছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল নতুন কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিষক্রিয়া।

বার বার বমি। হার্টবিট স্বাভাবিক নয়। সারা গায়ে হাতে-পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। এর মধ্যে মেরির অবস্থা সব থেকে খারাপ। মনে হচ্ছে, কোনোভাবে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম আক্রান্ত হয়েছে। বাঁচবে কি না সন্দেহ। অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপ হচ্ছে। যেকোনো সময় কোমায় চলে যেতে পারে। সে তুলনায় দুই ছেলে ও মেয়ের অবস্থা ভালো। কম বয়সের জন্য বিষক্রিয়ার থেকে খানিকটা বেরোতে পেরেছে। তাও যেকোনো সময়ে হাত বা পা কেটে ফেলতে হতে পারে। কোনো অচেনা বিষ খাবারে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। সকালে সেই ধারণা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। মেডিক্যাল রিপোর্ট এসেছে। রক্তে থ্যালিয়াম পাওয়া গেছে।

থ্যালিয়াম মানে পিরিয়ড টেবিলে ৮১ নাম্বারে থাকা বিপজ্জনক সেই মৌলিক।

লিসা কেস হিস্ট্রি যত্ন নিয়ে পড়ছিল। এরকম শক্ত কেস আগে ওর হাতে আসে নি। এর মধ্যে ওর বস মাইক ঘরে ঢুকল।

ওকে লক্ষ করে রিপোর্টটা দেখিয়ে মাইক বলে উঠল, থ্যালিয়াম জোগাড় করা সহজ নয় কিন্তু। সেটাই কী করে জোগাড় করল, বা কীভাবে কে মেশাল, সেটাই প্রথমে দেখতে হবে।

মাইকের বেশ সুখ্যাতি আছে ডিপার্টমেন্টে। মাঝারি হাইট। অ্যাথলেটিক চেহারা। খুব পরিশ্রমী। হাল ছাড়ে না কিছুতে। চেয়ার পাশে টেনে বসে বলে উঠল, মেরির হাজব্যান্ড পলের খুব একটা সুনাম নেই। খুব বদমেজাজি লোক। কিছুদিন আগে এক কলিগের সঙ্গে মারামারি করেছে অফিসে। শোনা যায়, মেরির সঙ্গেও সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। বলা যায়, কারো সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল না। ও-ই হল প্রাইম সাসপেক্ট।

—ওদের কিন্তু বেশি দিন বিয়ে হয়নি।

—হ্যাঁ, এক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। এটা দুজনেরই দ্বিতীয় বিয়ে। এ কেসটা নিয়ে তাড়াতাড়ি এগোতে হবে। আমি চাই, তুমি এখন ওদের বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নাও। পলকে জেরা করো। দরকার হলে ওর অফিসেও যাও। দেখো, ওর এই বিষ জোগাড় করার কোনো উপায় ছিল কি না। শুনেছি, পল ওইদিন কোথাও বেড়াতে গিয়েছিল। অ্যালিবাইটা ভালো করে চেক করো।

একটু থেমে মাইক ফের বলে উঠল, বাড়ির সবকিছু চেক করা হয়েছে? কোনো কিছুতে বিষ ছিল কি না।

—না, গতকাল বিকেলেই আমাদের দপ্তরে কেসটা এসেছে। তার আগে এর পিছনে নতুন কোনো ভাইরাস কি না ভাবা হচ্ছিল।

—মেন সাসপেক্ট মেরির হাজব্যান্ড পল হলেও মার্ডার কেসে সবাইকে সন্দেহ করবে। এমনকী ওদের ছেলে-মেয়েদেরও সন্দেহের বাইরে রাখবে না। সবারই কিছু না কিছু মোটিভ থাকতে পারে। আমি কিছু খোঁজখবর নিয়েছি।

—তা স্যার, এ কেসে আপনার সাহায্য পাব তো?

—অবশ্যই। আমার আরেকটা খুব দরকারি কেসে কাজ করতে হচ্ছে। ওই যে সিনেমা হলের শুটিং-এর কেসটা। ওটার তদন্তভার আমাকে নিতেই হবে। তা না হলে এটাই করতাম। তোমার ভালো এক্সপিরিয়েন্স হবে। যত সহজ কোনো কেস মনে হয়, ভেতরে ঢুকলে দেখবে সেটা হয়তো তত কঠিন। সেখানেও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। যেমন এখানে ধরো 'থ্যালিয়াম' জোগাড় করা অত সহজ কাজ নয়। সন্দেহ অনেককে করা যায়।

—হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন স্যার। আপনার ধারণা কী?

—এক, অবশ্যই পল প্রথম সন্দেহ। এটা ওর দ্বিতীয় বিয়ে। এক বছর আগে বিয়ে হয়। কিন্তু খবর পেয়েছি, নিয়মিত অশান্তি হত।

দুই, ওর বোন, পলের বোন অ্যানা। তার সঙ্গে মেরির মোটেও ভালো সম্পর্ক ছিল না। অ্যানার নিয়মিত ও বাড়িতে যাতায়াত ছিল। বিষ মেশানোর সুযোগ ছিল।

তিন, ওর ছেলে-মেয়েরা। দুই ছেলে মেরির দিক থেকে, মেয়ে পলের প্রথম পক্ষের। এরকম ক্ষেত্রে যখন দুটো পরিবার হঠাৎ করে এক জায়গায় চলে আসে, তখন ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনেক টেনশন তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রেও হচ্ছিল। সেরকমই খবর পেয়েছি। এদের মধ্যেও কেউ বিষ মেশাতে পারে। খেয়াল করো এরা কেউ মারাত্মক অসুস্থ নয়।

চার, পলের প্রথম স্ত্রী। তারও রাগ থাকা স্বাভাবিক। শুনেছি, খুব মারধর করত পল। প্রতিহিংসা? হয়তো পল লাকিলি সেদিন ছিল না।

পাঁচ, মেরির প্রথম স্বামী। এরকম অনেকেরই মোটিভ থাকতে পারে। এমনকী কোনো প্রতিবেশীও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। মোদ্দা কথা, কাউকেই সন্দেহের বাইরে রাখলে চলবে না।

—হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন স্যার। আপনি তো অনেক কিছুই জেনে নিয়েছেন এর মধ্যে। আমি সবরকম গ্রাউন্ড ওয়া এখনই শুরু করে দিচ্ছি। প্রথমেই ওই বাড়ির প্রত্যেকটা জিনিস টেস্ট করে দেখছি, কোথা থেকে বিষ আসতে পারে।

—গুড, হ্যাঁ, ওটা পেলেই সেটাতে বিষ মেশানোর সুযোগ কার কার ছিল, সেটা ভাবতে পারবে। আর থ্যালিয়াম নিয়ে একটু রিসার্চ করে নিয়ো। মনে রাখবে, পল মাইনিং কোম্পানির ল্যাবে কাজ করে। ওখানে এমন কোনো কিছু ছিল, যার থেকে থ্যালিয়াম পাওয়ার সুযোগ কোনো ছিল কি না, সেটাও দেখে নিয়ো।

—ও.কে. স্যার।

লিসা আগামীকাল ছুটি নেওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু এরকম অবস্থার মধ্যে সেটা আর বলা হল না। আজকেই এখন পলের বাড়িতে প্রথম যেতে হবে। একেই বলে ব্যাড লাক।

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭, ডেনভার, কলোরাডো

মাইক লিসার চেম্বারে ঢুকেই বলে, লিসা, তোমাকে আর এ কেসে বেশি সময় দিতে পারব না। খুব তাড়াতাড়ি এগোতে হবে। প্রায় এক মাস হয়ে গেল। উপরের থেকে চাপ আসছে। বলছে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে। —মাইকের মুখে স্পষ্ট অসন্তোষের ভাব। একটু শব্দ করেই কফির মাগটা লিসার সামনে টেবিলের উপরে রাখল।

—না স্যার, অনেক এগিয়েছি। আর এক মাসের মধ্যে নিশ্চিতভাবে একটা কিনারা করার যাবে।

—এক মাস?—মাইকেল একটা খুব খারাপ শব্দ উচ্চারণ করে পায়চারি করতে করতে বলে উঠল, আমার কাছে প্রতিঘণ্টায় কল আসছে, আর তুমি বলছ এখনও এক মাস? আর ইউ ক্রেজি? আমার এখন থেকে প্রতিদিন রিপোর্ট চাই। মেরির ব্রেনডেথ। কোমায়। সুস্থ হওয়ার কোনো আশাই নেই। দুই ছেলের একজন এখনও গুরুতর অসুস্থ, একজনের পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে, আর তুমি আরও এক মাস চাইছ! ঠিক কী কী কাজ এগিয়েছে, আমি এখনই জানতে চাই।

লিসা মাইককে এত রাগতে কখনো দেখেনি। নিশ্চয়ই উপরমহল থেকে সাংঘাতিক চাপ এসেছে। তা না হলে গত এক মাসে কী হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো খবর নেওয়ার সময় পায়নি মাইক। অবশ্য এটাও ঠিক, মাইক অন্য একটা কেস নিয়ে বেশ খানিকটা সময় অত্যন্ত ব্যস্ত ছিল।

লিসা বলতে থাকে, স্যার, আমাদের সব থেকে বেশি সময় লেগেছে ওই বিষ কোথা থেকে এসেছে, সেটা বুঝতে। প্রথমে আমরা বাড়ির প্রত্যেকটা জিনিস টেস্ট করে কোথাও থ্যালিয়াম পাইনি। তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। কী করে যে ওদের রক্তে থ্যালিয়াম এল, সেটা বুঝতে পারিনি। প্রথম ব্রেক পাই সার্চ শুরুর পাঁচ দিন বাদে।

—হ্যাঁ, সেটা শুনেছিলাম। কোকের বোতলে পেয়েছিলে তা-ই তো? —একটু যেন নরম হয়ে বলে উঠল মাইক।

—হ্যাঁ, সেটাই তো! কোকের বোতলে যে থ্যালিয়াম নাইট্রেট থাকবে, কে জানত! আরও তিনটে না-খোলা বোতলে একই জিনিস পাওয়া গিয়েছিল। কী করে জানি না 'থ্যালিয়াম নাইট্রেট'-এর গুঁড়ো মিশিয়ে আবার বোতল সিল করে দেওয়া হয়েছিল।

—আশ্চর্য! এটা তো সাধারণ কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়! তা কোকের পুরো ব্যাচ টেস্ট করেছিলে?

—হ্যাঁ, স্যার। সেখানে অনেক সময় লেগে গেল। বুঝতেই পারছেন খুব সহজে এসব টেস্ট করা যায় না, বিশেষ করে যখন এত বড়ো একটা কোম্পানির একটা রেপুটেশনের ব্যাপার এর সঙ্গে যুক্ত আছে। তা ছাড়া অন্য কোথাও এরকম কিছু হয়নি। কিছুদিন পরে পারমিশন পাই। সঙ্গে সঙ্গে ওদের ডিস্ট্রিবিউটরদের অফিসে যোগাযোগ করে পুরো ব্যাচ ট্র্যাক করে সব টেস্ট করা হয়। বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা খুব সেন্সিটিভ ছিল।

—কিছু পাওয়া গিয়েছিল?

—না, কোকের কোনো ব্যাচে কোথাও কিছু নেই। শুধু ওই বাড়ির আটটা বোতলে থ্যালিয়াম পাওয়া গেল। অর্থাৎ হয় সে বাড়ির কেউ, না হলে ওই বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল এরকম কেউ ওই বোতলে মিশিয়েছিল।

—তারপর? এর জন্য পলের উপরে সন্দেহ আরও বাড়ার কথা। ওর সে সময় সুযোগ ছিল। হয়তো দক্ষতাও ছিল। তা এখন কাকে কাকে সন্দেহের লিস্টে রেখেছ?

—অবশ্যই সবার আগে পল। পল সেই সময় বাড়িতে ছিল না। অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছিল। কিন্তু ওর পক্ষে কোকের বোতলে কিছু মেশানো সব থেকে সহজ কাজ ছিল।

—ওর এগেনস্টে কিছু ভালো মোটিভ পেয়েছ? কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

—বেশ কিছু দিন ধরেই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ভালো ছিল না। পল বেশ বদমেজাজি। কিছুদিন আগে একটা পাবে ওদের দুজনের মধ্যে বেশ ঝগড়াও হয়। অনেকে সেটা দেখেছে। মেরির দুই ছেলে। পল আবার তাদের খুব একটা পছন্দ করত না। মেরি সিগারেট খায়। সেটা পলের একেবারে পছন্দ ছিল না। মোদ্দা কথা, দুজনের মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ ভালোরকম অশান্তি দেখা দিয়েছিল। খবর পেয়েছি যে পল নাকি ওর এক অফিসের বন্ধুকে এও বলেছিল যে এই বিয়েটা করা ওর খুব বড়ো ভুল হয়েছে। এ ছাড়া মেরির নামে একটা বড়ো অঙ্কের লাইফ ইনসিয়োরেন্স দু-মাস আগে নিয়েছিল পল।

—কীরকম অ্যামাউন্টের?

—এক লক্ষ ডলারের।

—হুঁ। বেশ মোটা অঙ্কের। দ্যাট'স এক্সেলেন্ট মোটিভ। বউ মরলে ভালো লাভই হবে ওর। তারপর? কিন্তু এরকম বিষ পাওয়ার অন্য কোনো উপায় ছিল?

—সেটাই— থ্যালিয়াম সহজে পাওয়ার কথা নয়। আমরা ওর অফিসে গিয়ে খোঁজখবর করি। একটা ইদুর মারার বিষের ফাঁকা বোতল পেয়েছি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমেরিকার র‌্যাট পয়জন-এ থ্যালিয়াম নিষিদ্ধ। কিন্তু ওটা জার্মানি থেকে আনানো। তারা থ্যালিয়াম ব্যবহার করে কি না, সেটা জানতে চেয়ে আমরা ফ্যাক্স করি। কিছুদিন আগে উত্তর এসেছে।

—আছে তাতে?

—ছিল। কিন্তু সামান্য। যে বোতলটা পেয়েছি, তাতে অতটা থাকা সম্ভব ছিল না। এখনও সেটাই প্রশ্ন রয়ে গেছে। সেটা মিলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যারেস্ট করতাম। পলকে সন্দেহের আরেকটা কারণ আছে।

—কী?

—পল বাড়ি ফিরে এসে দেখে যে সবাই অসুস্থ। সবার বমি-জ্বর তখন শুরু হয়েছে। গায়ে-হাতে-পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু তবু সঙ্গে সঙ্গে ওদের কাউকে হাসপাতালে ভরতি করেনি? ভরতি করে প্রায় একদিন পরে। এত দেরি করল কেন? ইচ্ছে করে কি ও চাইছিল, যাতে বিষের প্রভাব আরও ছড়িয়ে পড়ে? মৃত্যুর সম্ভাবনা যাতে বাড়ে?

—অন্যরকমও হতে পারে। যদি নিজে না করে থাকে তাহলে বিষ মেশানো হয়েছে, সেটাই হয়তো বুঝতে পারেনি! সবারই আগে যে কেউ ফুড পয়জনিং ভাববে। ওর ক্ষেত্রেও সেটাই স্বাভাবিক। আর কারো উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

—পলের বোন অ্যানা। তার সঙ্গেও মেরির ভালো সম্পর্ক ছিল না। পল যেখানে থাকে, সে বাড়িটা আসলে পলের বাবার করা। সেদিন থেকে অ্যানার একটা অধিকার আছে ও বাড়ির উপর। কিন্তু মেরির তাতে আপত্তি ছিল। মেরি চাইত না যে অ্যানা এই বাড়িতে আসে। কিন্তু তবু অ্যানা প্রায় নিয়মিত আসত। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুবার। সে নিয়ে অশান্তি লেগে ছিল।

—অ্যানা কী কাজ করে, দেখেছ?

—নার্স। সেজন্য ওর পক্ষেও থ্যালিয়াম জোগাড় করা সম্ভব ছিল।

—তা-ই নাকি? থ্যালিয়াম-হাসপাতালে ব্যবহার করা হয়, জানতাম না তো?

—হ্যাঁ, কার্ডিয়াক স্ট্রেস টেস্টের জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তাতে থ্যালিয়াম থাকে। কিন্তু তাহলেও এতটা পরিমাণ জোগাড় করা সহজ ছিল না। তা ছাড়া রেডিয়োঅ্যাকটিভ কোনো কিছু একটু একটু করে জোগাড় করে এত সহজে নিয়ে আসাও সম্ভব ছিল না।

—কিন্তু পল আর অ্যানা মিলে তো কাজ করতেই পারে। তা-ই না?

—সেটা অবশ্যই হতে পারে। তবে এখানে আমার তৃতীয় সাসপেক্টের কথা বলতে হয়। তৃতীয়জন হল পলের মেয়ে এমিলি।

—ও, তার কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। এমিলি তো পলের প্রথম পক্ষের মেয়ে, তাই না?

—হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। এমিলির সঙ্গে সৎমা মেরির সম্পর্ক ভালো ছিল না। মেরির থেকেও ও বেশি অপছন্দ করত মেরির দুই ছেলেকে। ওদের স্বভাব ভালো ছিল না। সেটা নিয়ে নাকি এমিলির সঙ্গে ওদের বাড়িতে প্রায়শই অশান্তি হত।

—বা, একেবারে আইডিয়াল ফ্যামিলি। কাউকে দেখছি, বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু এমিলিও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল না?

—হ্যাঁ। কিন্তু অন্যদের মতো অতটা অসুস্থ হয়নি। এখন পুরোপুরি সুস্থ। ওর বক্তব্য, ও কোকে বরফ মিশিয়ে খায়। কোক খুব একটা পছন্দ করে না। সে জন্য কম খেয়েছিল। তার জন্যই হয়তো ওর বাড়াবাড়ি কিছু হয়নি। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন, ও কি জানত যে কোকে বিষ মেশানো আছে? তাই কম খেয়েছিল?

—তা সে মেয়ে কী করে?

—কেমিস্ট্রি নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে।

—ওরে বাবা! তার মানে থ্যালিয়াম কী তা ও ভালোভাবে জানত। কিন্তু ওর পক্ষেও থ্যালিয়াম জোগাড় করার কোনো সম্ভাবনা ছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।

—হ্যাঁ, স্যার, আমরা সেটাই দেখছি। এমনকী মেয়েটার বয়ফ্রেন্ডের পক্ষেও সে সম্ভাবনা ছিল কি না তা দেখছি।

—হ্যাঁ, দেখো। ল্যাব বা অন্য কোনো জায়গা থেকে কোনোভাবে ওর পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল কি না। আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড দ্য রিজনস বিহাইন্ড দ্য ডিলে নাউ। খুব সিম্পল কেস নয়। এদের বাইরে অন্য কাউকে সন্দেহ করছ?

—না, বাকি সব কজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মেরির প্রথম স্বামীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না, সেটাও দেখেছি। সে কখনো ওই বাড়িতে আসেনি। তা ছাড়া ওদের দুজনের মধ্যে ডিভোর্স প্রায় তিন বছর আগে হয়েছে, পলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার অনেক আগে। সেদিক থেকে ওদের দুজনের মধ্যে কোনো আকর্ষণ, বা ঘৃণা—কোনো কিছুই ছিল না।

—ঠিক আছে। এবারে তাহলে জাল গোটাতে শুরু করো। মনে রাখবে, কোনো ইনভেস্টিগেশনই পারফেক্ট হয় না। আর ঠিক দু-সপ্তাহ সময় দেব। তার মধ্যে আমি শুধু একজনের নাম শুনতে চাই। লাই ডিটেক্টর টেস্ট করেছ এদের প্রত্যেককে, তাতে কিছু এসেছে?

—না, স্যার, তাতে তেমন কিছু ধরা পড়েনি।

—ঠিক আছে। মনে রেখো তোমার সময় আর ঠিক দু সপ্তাহ।

কফির মাগটা নিয়ে আবার উঠে পড়ল মাইক। যেভাবে আস্তে করে দরজা টেনে দিল তাতে লিসা বুঝতে পারল, মাইক দেরির কারণটা বুঝেছে।

সত্যি আর কতদিন এই কেসটা নিয়ে বসে থাকবে লিসা। শেষের সুতো গোটাতেই হবে। মাইকের কথাটাই ঠিক। কোনো ইনভেস্টিগেশনই পারফেক্ট হয় না। সময়মতো একটা সিদ্ধান্তে আসতেই হয়। এক্ষেত্রে সেটা আর দু-সপ্তাহ। না, না, দিনের হিসেবে চললে চলবে না। বলা যায়, ঠিক ৩৩৬ ঘণ্টা আছে।

লিসা উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল।

১১ মার্চ ১৯৯৭, ডেনভার, কলোরাডো

অবশেষে কেস প্রায় সলভড। রিপোর্ট প্রায় তৈরি। শেষ কয়েকদিন কাজের চাপে ভালো করে ঘুম হয়নি। আজ অনেকটা হালকা লাগছে। ডেনভারের একটা পাবে এসেছে লিসা।

যাকে বলে জাল গোটানো, তা প্রায় শেষ। হ্যাঁ, এর পরেও কি কোনো প্রশ্ন নেই? অবশ্যই আছে। মানুষের চরিত্র খুব জটিল। অপরাধী শেষ পর্যন্ত কখনোই তার অপরাধ স্বীকার করবে না।

সেদিন মাইকের সঙ্গে এ কেসের ব্যাপারে আলোচনার সময়ই লিসার প্রথম সন্দেহ হয়, এটা বাবা-মেয়ে মিলে প্ল্যান করেনি তো? দুজনেরই লাভ এতে। দুজনে মিলে এ অপরাধ করতে পারে, এ সন্দেহ এর আগে হয়নি। সেজন্য সবকিছুর উত্তর মিলছিল না। অনেক সময় একই জিনিস দ্বিতীয়বার বললে বা তা নিয়ে আবার ভাবলে, তা মনের মধ্যে অন্য রঙে ধরা পড়ে।

আসলে লিসার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ছিল, পলের সঙ্গে কোথায় যেন খুনির সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইল মেলে না। পল বদমেজাজি, স্থুল মস্তিষ্কের মানুষ। দেখে মনে হয় লোকের সঙ্গে মারপিট করাই তার পক্ষে বেশি সম্ভব। সেখানে মারার এত উপায় থাকতে সে এরকম একটা জটিল উপায় বেছে নেবে, এত কিছু ভেবে সবকিছু করবে, সেটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিল। ঠান্ডা মাথায় ওর পক্ষে এভাবে কিছু করা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল লিসার।

কিন্তু এক প্লাস এক অনেক সময় দুইয়ের বেশি হয়। এক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। পলের মেয়ে এমিলি বেশ ইন্টেলিজেন্ট। কথায় কথায় যতই মেরির উপর ভালোবাসা দেখাক-না কেন, ও যে বেশ খুশি হয়েছে মেরির মৃত্যুতে তা বোঝা শক্ত ছিল না। একই সঙ্গে পড়াশোনায় বেশ ভালো। এ বিষয়ে অনেক কিছু জানে।

আসল লিড এল কয়েকদিন আগে।

এমিলির সঙ্গে ইদানীং এক রিসার্চ স্টুডেন্টের ভালো আলাপ হয়েছে। বয়ফ্রেন্ড। সে আবার বিষের উপরে গবেষণা করছে। তার ল্যাব থেকে বেশ কিছুটা থ্যালিয়াম পাওয়া যায়। তবে মনে হয় না সে ছেলেটা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। সেটার দরকারও ছিল না। এমিলির পক্ষে ওই ল্যাবের মধ্যে আসা কিছু শক্ত ছিল না। পলের মেয়ে এমিলি যদিও এ বিষয় সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। কিন্তু খুনি তো কখনোই তার খুনের কথা এত সহজে স্বীকার করে না। কতটা থ্যালিয়াম এভাবে সে সরিয়েছিল, সেটা অবশ্য বোঝা যায় নি।

শুধু তা-ই নয়, ঘটনার দিন কোক সবাইকে দিয়েছিল পলের মেয়ে এমিলি। সেটা মেরির ছোটোছেলে বলেছে। এমিলিও অস্বীকার করেনি। সেদিক থেকে ওর থেকে ভালো সুযোগ আর কারো ছিল না। ও হয়তো নিজে খুব সামান্য কোক নিয়েছিল, যাতে কিছুটা অসুস্থ হয়। সন্দেহের বাইরে থাকে।

একই সঙ্গে পল ওর মেয়ে এমিলিকে খুব ভালোবাসত। বাবার নির্দেশে এরকম কিছু করা ওর পক্ষে শক্ত ছিল না। পল অকুস্থলে ছিল না। কিন্তু নিশ্চয়ই এ কাজে, বিশেষ করে কোকে থ্যালিয়াম মেশানোর মতো টেকনিক্যাল কাজে ও আগেই সাহায্য করেছিল।

মাইকের কথা ঠিক। সব ইনভেস্টিগেশনেই কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এখানেও তাই হয়তো কিছু প্রশ্ন থেকে যাবে।

পাব-এ বিয়ার নিয়ে একটা টেবিলে একাই বসেছিল লিসা। টিভি স্ক্রিনে বেসবল দেখাচ্ছে। বসে বসে দেখছিল। হঠাৎ মনে হল, দূর থেকে এক ভারতীয় ছেলে ওর দিকে তাকাচ্ছে। আগেও যেন কোনদিন এই ছেলেটাকে দেখেছে লিসা। বেশ আকর্ষণীয় দেখতে। চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল, যেন অনেকটা টম ক্রুসের মতো দেখতে। একবার দেখলে বার বার আপনা থেকে চোখ চলে যায়। কিন্তু আবার দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল না। উঠে দাঁড়াল লিসা। না, ছেলেটা এখান থেকে কখন বেরিয়ে গেছে।

কিছু প্রশ্ন এখনও ওর মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। পল বা এমিলির পক্ষে কি কোকের বোতলে থ্যালিয়াম মিশিয়ে আবার করে সিল করা সম্ভব ছিল?

এমিলি কি জেনে-বুঝে সাংঘাতিক বিপদের কথা জেনেও ওই কোক খেতে পারত? ওকেও তো হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। অবশ্য ও জানত, সন্দেহের বাইরে থাকতে ওকেও খেতে হবে, কিছুটা অসুস্থ হতে হবে।

কিন্তু লিসা আদালতে প্রমাণ করতে পারবে তো? তবে এক, সব ক-টা গ্লাসেও কোকের বোতলে পাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্ট এমিলির সঙ্গে মিলে গেছে। তা ছাড়া ও নিজেই সবাইকে কোক দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। দুই, ওর বিষ মেশানোর সুযোগ ছিল। তিন, পল নিজে মাইনিং-এর কোম্পানিতে ড্রিলারের কাজ করে! ওর পক্ষে তো কোকের বোতলে এরকমভাবে ছোটো ফুটো করে মেশানো অবশ্যই সম্ভব। ঠিক যেরকম এখানে হয়েছিল।

নিশ্চিন্ত হয়ে আবার বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিল লিসা। দিনের শেষের গোধূলির রং-মাখা একটা মিষ্টি হাওয়া বইছে। নানান পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। বসন্ত খুব দূরে নেই।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সকাল ১০টা, মধ্যমগ্রাম

রাহুলের ডাকে ঘুম ভাঙল। ও দেখি, আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একটু যেন রহস্যময় হাসি।

চমকে উঠে বসলাম।

ও হাসতে হাসতে বলে উঠল, কাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছিস নিশ্চয়ই। তুই তো এত দেরি করে ওঠার ছেলে না। মুখ ধুয়ে চলে আয়। রান্নার মাসিকে তোর ফেভারিট মাংসের কিমা দিয়ে মোগলাই পরোটা করতে বলেছি। রেডি হল বলে!

কী বলব! চুপ করে থেকে একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসলাম। হেসেই মনে হল যেন কীরকম একটা মেকি হাসি হাসলাম। একরাতে, শুধু একটা রাতে যেন অনেক কিছু পালটে গেছে। সত্যি বলতে কী তখনও মনে হচ্ছিল, একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছিলাম। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে যেন বাস্তব ফিরে পাচ্ছি। কোনো ভিত্তি নেই। রাহুল এসব করতে পারে না।

আড়মোড়া ভেঙে উঠে প্রথমে ফোনটাই দেখলাম। না, ফোন লক করা আছে। কী ছবি তুলেছি, সেটা রাহুলের পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই চমকে উঠলাম। বুককেসের ড্রয়ারে চাবি আর লাগানো নেই। চাবিটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাহলে কি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গেছে ও, আমাকে কোনোরকম সন্দেহ করেছে? সেক্ষেত্রে কি আমার ওর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা দরকার?

খানিক বাদে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি, ও ড্রয়িং রুমের খাওয়ার টেবিলে বসে আছে। মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে।

টেবিলে বসলাম, কিন্তু কীরকম যেন দ্বিধা নিয়ে। গলা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে বলে উঠলাম, শরণ্যার কোনো খবর পেলি?

ও আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে চিন্তান্বিত গলায় বলে উঠল, না, এখনও পাইনি। আমি-ও তাই ভাবছিলাম। কী হয়ে থাকতে পারে! খানিক আগে পুলিশ আবার আমাকে ফোন করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই ওরা আমাকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে। আরেকটা ঘটনাও হয়েছে, সুরজিৎকে পাওয়া যাচ্ছে না।

এবার আমার চমকে ওঠার পালা।

—মানে? সুরজিৎ? শরণ্যার সেই বয়ফ্রেন্ড? এ আবার কখন জানলি?

—ওই এখনই। ফোন করেছিল সে ব্যাপারে। ওকে চিনি কি না? ফোনে যা কথা হল মনে হল, থানা থেকে ইনস্পেকটর এ বাড়িতেও আসবে। সকালেই আসবে।

—কাল তুই বললি যে ওর কথা তুই পুলিশের কাছে বলিসনি! তাহলে সুরজিতের কথা পুলিশ জানল কী করে? শরণ্যার বাড়ির লোকেরা বলেছে?

—তা-ই হবে হয়তো। নিশ্চয়ই তারপর থেকে পুলিশ ছেলেটার খোঁজ করেছে।

—তা কবে থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?

—ওই পরশু রাত থেকে।

—বলিস কী! একই সময় থেকে? মানে দুজনে একসঙ্গে উধাও! আজব ব্যাপার। সুরজিতের বাড়ির লোকেরা কিছু বলেছে?

—সে আমি কী করে জানব? বুঝতেই পারছিস, আমাকে পুলিশ সবকিছু বলবে না। সুরজিতের সঙ্গে ভালোমতো জড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে।

—কিন্তু ওর শরণ্যাকে নিয়ে পালানোর কী দরকার পড়ল?

কথার মধ্যে দেখি, মাসিমা খাওয়ার ঘরে ঢুকছেন। রাহুল চোখের ইশারায় আমাকে ইঙ্গিত করল, যাতে এ ব্যাপারে আর কোনো কথা না বলি।

আমাকে দেখে মাসিমা বলে উঠলেন,— সকাল থেকে কি দুই বন্ধুর মধ্যে খুব আড্ডা চলছে?

রাহুল বলে উঠল,—না, না, আড্ডা আর কোথায় হল। বাবুর উঠতে উঠতে দশটা বেজে গেল। এই এখনই কথা শুরু হল। —বলে একটা চেয়ার টেনে মাসিমাকে বসতে দিয়ে বলে উঠল,—বোসো মা। পুজো হয়ে গেল?

—হ্যাঁ, আমার আর পুজো। বাড়িতে বউমা নেই, নাতনি নেই, পুজো করে কী আর চাইব?— দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আবার মা, সেই এককথা।

—যা-ই হোক, কাল একবার ওদের বাড়ি ঘুরে আসিস। বউমা আর রিনির জন্য নারকেল নাড়ু করেছি। মেয়েটা খুব নাড়ু খেতে ভালোবাসে। দিয়ে আসিস।

বুঝলাম, মাসিমা খবরটা এখনও জানেন না যে শরণ্যাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এ বাড়িতে পুলিশ এলে ওঁর পক্ষে এ খবরটা আরও শকিং হবে। তা ছাড়া যদি এটা জানতে পারেন যে সংগত কারণেই পুলিশ রাহুলকে সন্দেহ করছে।

মোগলাই এসে গিয়েছিল। মাসিমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ও মোগলাই খেতে খেতে গত রাতের সব কথা দুঃস্বপ্নের মতো ভুলে গিয়েছিলাম।

—তা তুমি আজ থাকছ তো?

—না মাসিমা, আমাকে আজ যেতেই হবে। এই সকালেই যেতে হবে। আসলে প্ল্যান করে আসিনি।

—তোমাদের আজকাল সবকিছুতে প্ল্যান লাগে। রাহুল গত পরশু সন্ধেতে দারুণ দু-কেজির ইলিশ এনেছে। ওরকম চট করে পাওয়া যায় না। আমি রান্না করব। খেয়ে যাও।

—দু-কেজির ইলিশ? ওরেবাবা! সে আবার কোথায় পেলি?— রাহুলকে জিজ্ঞাসা করে উঠলাম।

উত্তর অবশ্য রাহুলের কাছ থেকে এল না। উত্তর এল মাসিমার কাছ থেকে—দমদম বাজার থেকে পরশু সন্ধেতে বাজার করে এসেছে। আমাদের মধ্যমগ্রামের বাজারে এত ভালো মাছ পাওয়া যায় না। দমদমেও পাওয়া যায় না। সেদিন নেহাত পেয়েছে।

দমদম। পরশু সন্ধে। এটুকু শোনার পরে আর ইলিশ মাছ খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। তার মানে রাহুল গত পরশু দমদমে গিয়েছিল। এই কথাটা আমাকে এতক্ষণ বলেনি কেন? তবে কি ওর কোনো যোগাযোগ আছে শরণ্যার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে!

বেশিক্ষণ ছিলাম না আর। আধ ঘণ্টা বাদে বেরিয়ে এলাম। রাহুল ফ্ল্যাটের দরজা অব্দি এসেছিল।

গাড়িতে বসে গাড়ি চালাতে শুরু করতে গিয়ে বুঝলাম, হাত কাঁপছে। অতীতের অনেক কিছু মনে পড়ে যাচ্ছে। ছবিগুলো চোখের সামনে ভাসছে। চুপ করে খানিকক্ষণ বসে রইলাম।

কাল রাতের বৃষ্টির পরে গরম কমে গেছে। কিন্তু বুঝতে পারলাম, তবু আমি ঘামছি। রাহুল দমদমে যাওয়ার এ কথা আমার থেকে লুকোল কেন? সেদিন কি ওর সঙ্গে শরণ্যার দমদমে দেখা হয়েছিল? সেদিন ওখান থেকেই তো উধাও হয়ে গেছে। আর সুরজিৎও কি রাহুলের জন্যেই কোনো বিপদে পড়েছে? নাকি শুধুই বেশি ভাবছি?

রাহুল কি বুঝে গেছে যে আমি কিছুটা জেনে গেছি? একটা এত বড়ো ক্রিমিন্যাল কি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড?

এসব ভাবছি, হঠাৎ কিছুটা নামানো গাড়ির জানলার কাচে টোকা। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। কখন জানি না রাহুল আমার গাড়ির জানলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

—কী, কিছু অসুবিধে হয়েছে?

আমি অপ্রস্তুতের হাসি হেসে বলে উঠলাম, না, আসলে এত সকালে এরকম ভারী খাওয়ার অভ্যেস নেই তো, তাই শরীরটা কীরকম করছে।

—তা ভেতরে একটু বসে যা।

—না, না, আর দেরি করব না। এখন যেতেই হবে। এরপরে আবার রাস্তায় জ্যাম হয়ে যাবে।

বুঝতে পারছিলাম, আমার অনেক কথার মধ্যেই ঠিক যুক্তি নেই। আজ রোববার। কিন্তু কেন জানি রাহুলকে ভয় লাগছিল। অপরাধী বলে মনে হতে শুরু করেছিল।

ঠিক যে জিনিসটা ভাবছিলাম, সেটা ও-ই বলে উঠল,—আসলে তোকে একটা কথা বলতে এলাম। আমার সঙ্গে সেদিন দমদমের বাজারে শরণ্যার দেখা হয়েছিল। কেন জানি পুলিশকে বলতে ভরসা পাইনি। তাই তোকেও বলিনি। আমার ধারণা, ওরা তোকেও আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করবে। এ কথাটা বলিস না।

আমি শুকনো মুখে কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়লাম। তারপরে ওকে হাত নেড়ে গাড়ি স্টার্ট করলাম। গাড়ি একটু গোঁ গোঁ করে উঠল, কিন্তু ব্যাক করল না। খেয়াল করলাম, এতটাই নার্ভাস হয়ে গেছি, যে গাড়ি গিয়ারে না দিয়ে নিউট্রালে রেখে শুধু অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিয়েছি। অটোম্যাটিক গাড়ি। বুঝতে পারছি, রাহুলের চোখে ধরা পড়ে যাচ্ছি। মাথা ঠান্ডা করে রিভার্সে দিয়ে এবারে সাবধানে গাড়ি পার্কিং থেকে বার করলাম।

হাত নেড়ে গলা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে বললাম, ভালো থাকিস।

কেন বললাম তাও জানি না।

গাড়ি ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন যশোর রোডে এসে পড়ল, বুঝতে পারলাম, এ অবস্থায় চালানো ঠিক হবে না। একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে খানিকক্ষণ বসে রইলাম। একটা রাতে অনেক কিছু পালটে গেছে।

দুটো জিনিষস এখন মাথার মধ্যে ঘুরছে। প্রথম, রাহুলের সঙ্গে তার মানে শরণ্যার পরশু রাতে দেখা হয়েছিল। তার পর পরই ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। ওদের সম্পর্ক কি আরও খারাপ হয়েছিল ইদানীং? কেন এ কথা আমার কাছে লুকিয়ে গেল রাহুল? বা পুলিশের কাছেও? একই সঙ্গে সুরজিৎ উধাও! মাসিমা না বললে জানতেও পারতাম না যে ও সেদিন দমদমে বাজার করত গিয়েছিল। সেটা আমার সামনে বলে ফেলার জন্যেই রাহুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

দুই, সুরজিতের কথা বলতে ও এত দ্বিধা করছিল কেন? সুরজিতও কি বিপদে?

রাহুল যদি আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকে থাকে, তাহলে ওর কাছে আরও কয়েকটা খুন করা কিছুই শক্ত নয়। হয়নো একটা বড়ো অচেনা সিরিয়াল কিলার এখন রাহুলের মধ্যে দিয়ে উঁকি মারছে। এবারে কি সব জেনে গেছি বলে আমি ওর শিকার হতে চলেছি? কিছু কথা মনে পড়ছিল।

গত বছরে শরণ্যা কি এ কথাই বলতে চেয়েছিল রাহুল সম্বন্ধে? কিন্তু তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল বলে রাহুল সম্বন্ধে এরকম কোনো কথা মাথায় আসেনি।

চমকে উঠলাম। গাড়ির হর্ন। একটা গাড়ি পিছনে দাঁড়িয়ে হর্ন দিচ্ছে। এখানে আর দাঁড়ানো যাবে না।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বিকেল ৪টা

ঘুম ভাঙল গার্গীর ডাকে। চোখে এখনও ঘুম জড়িয়ে।

ও একটা লাল ম্যাক্সি পরেছে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। 'লিপস্টিক এফেক্ট' বলে একটা কথা আছে। নাকি ইকনমিক রিসেশনের সময় লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায়, যাতে মহিলারা আরও আকর্ষণীয় দেখতে হয় ও তার উপর নির্ভর করে সহজে চাকরি পেতে পারে?

সেটা অবশ্য পুরোপুরি গার্গীর ক্ষেত্রে খাটে না। তবে পরার পিছনে সেইরকম কোনো একটা উদ্দেশ্য আছে। আমার সঙ্গে ফের কথা বলার চেষ্টা করা।

বাড়ি ফেরার পর থেকে বিশেষ কথা বলেনি। যা জিজ্ঞেস করছিলাম, সামান্য দু-একটা শব্দের উত্তরে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে ও কথা বাড়াতে চায় না। আমি আবার এসব বিষয়ে রাগ ভাঙতে খুব একটা পারি না। বুঝতেই পারছিলাম ওখানে রাত কাটিয়ে ফেরাটা একদম পছন্দ হয়নি। ছেলের উপরের রাগটা এখন আমার উপরে মেটাবে। তার পরীক্ষার প্রিপারেশন যত খারাপ হবে, আমার উপর ঝড়ঝাপটা তত বাড়বে।

কিন্তু লাল ম্যাক্সি আর লিপস্টিক ভালো লক্ষণ। ঝড় থামার পূর্বলক্ষণ। মেজাজ তাহলে একটু ঠান্ডা হয়েছে। ও চাইছে, আবার আমি কথা বলা শুরু করি। ওর দিক থেকে এখন ভাব করার চেষ্টা করছে। কথা বলা তার একটা পূর্বাভাস।

ঠিক তা-ই। এরকম সময়ে আরেকটু কঠিন হতে হয়। তাতে যে কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন হয়, তাতে রাগ খুব তাড়াতাড়ি অনুরাগে পরিণত হয়।

আমাকে একটু রাগত গলায় বলে উঠল,আর কত ঘুমোবে? ছুটির একটা দিন বন্ধুর বাড়িতে কাটিয়েছ। আরেকটা দিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দাও। কাল থেকে আবার অফিস। কথা বলার কোনো সময় নেই। ছেলে পাশ করল না, ফেল করল, কী এসে যায়। আমারই সব দায় পড়েছে। আমারও তোমার মতো পাঁচ দিন অফিস থাকে। কিন্তু সাত দিন কাজ।

বুঝতে পারলাম। এটা এখন ঠিক সময়। মাটি সামান্য নরম হয়েছে। নির্ঘাত বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার মতলবে আছে। বলে উঠলাম,— না, অনেক কাজ আছে। তবে তুমি কোথাও যেতে চাও?

—আর কি সময় হবে? এই এখনই তো ছ-টা বাজে। এখন আর কোথায় যাবে?

—কেন? এখনও অনেক জায়গাতেই যাওয়া যায়। চলো, চট করে মনিস্কোয়্যার ঘুরে আসি।

বুঝলাম। কথাটা মনে ধরেছে। মুখের ছায়া-ছায়া ভাবটা মুহূর্তে কেটে গেল।

বলে উঠল, ঠিক আছে। আমি চা করছি। তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।

বলে একটু থেমে বলে উঠল, ও, ভুলে গিয়েছিলাম। তোমার ফোনটা বাইরে পড়ে আছে। রিং হচ্ছিল কয়েকবার। দুবার দেখলাম, রাহুল ফোন করেছে। এখনও বন্ধুর সঙ্গে সব কথা শেষ হয়নি হয়তো।

—তা তুমি ধরোনি?

—আমি সেকেন্ড টাইম ধরেছিলাম। তুমি একবার ওকে ফোন করো। কিছু একটা কথা আর্জেন্টলি বলতে চায়। বেশিক্ষণ বোলো না আবার।

কথা বলতে বলতে ও বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আমি আরেকটু গড়াগড়ি করে উঠে পড়লাম। গার্গীকে তো আর বলা যাবে না যে গতকাল রাতে প্রায় ঘুমই হয়নি। ভোরের দিকে শুধু ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়েছি। এখনও ব্যাপারটা ভাবলে কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না। একেই বোধহয় ধর্মসংকট বলে।

এমন একটা কথা, যা কাউকেই বলা যাবে না। বলার পরে সেটা খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। গার্গীর থেকেও। এমন কিছু আমি করার কথা ভাবতে পারি না, যাতে রাহুল সামান্যতম বিপদে পড়ে। যখনই বিপদে পড়েছি, রাহুলকে সঙ্গে পেয়েছি। এই তো কিছুদিন আগের কথা। বেশ কয়েক বছর আগে একটা জমি কিনেছিলাম একটা নামকরা প্রোমোটারের থেকে।

কথা ছিল, কটেজ তৈরি করে দেবে। পরে বোঝা গেল পুরো ব্যাপারটাই ধাপ্পা। ওদিকে আমি আমার সঞ্চয়ের একটা বড়ো অংশ সেখানে দিয়ে বসে আছি। টাকা ফেরত পাব এমনও কোনো আশা নেই। শেষে রাহুলই নানান জায়গায় ঘুরে, শেষে কনজিউমার ফোরামে গিয়ে অনেক কিছু করে আমার টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করে। ও সঙ্গে না থাকলে আমি কিছুই পেতাম না।

ফোনটা দেখলাম।

একটা অচেনা নাম্বার থেকে দুবার ফোন। তারপরে রাহুলের নাম্বার থেকে ফোন।

রাহুলকে ফোন করলাম। বেশ খানিকক্ষণ রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না।

ফোনটা রেখে দিয়ে অন্য কাজে যাচ্ছিলাম, আবার ফোনটা বাজতে শুরু করল।

একটা অচেনা নাম্বার। ফোন ধরব কি ধরব না ভেবে শেষে ফোনটা নিলাম। উলটোদিকে ওরই গলা।

ধরেই বলে উঠল, ইন্দ্র, একটা খারাপ খবর আছে।

—কী?

—সুরজিৎ মারা গেছে। ওর মৃতদেহ ওর বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে।

—বলিস কী? কীভাবে কখন জানা গেল? কী কারণে মনে হচ্ছে?

—জানি না। পুলিশের কাছেই শুনেছি। আমাকে ফোন করেছিল। ওরা মৃত্যুর টাইম বোঝার চেষ্টা করছে। ন্যাচারালি ফরেনসিকসের মাধ্যমে টাইমটা ঠিক ধরে ফেলবে খুব তাড়াতাড়ি।

—কিছু বলল সে ব্যাপারে?

—না। আমাকে সে কথা বলবে না। বুঝতেই পারছিস, আমাকে ওরা সন্দেহ করছে। এসব ইডিয়টের কাছে আমি আর রাস্তার এক গুন্ডা সব একই জায়গায়।

—কিন্তু বাড়িতে মরে পড়ে আছে, আর কেউ খবরটা জানল না। ও কি একা থাকত?

—হ্যাঁ, ওর দেশের বাড়ি বর্ধমানে, যেখানে শরণ্যার বাড়ি। এখানে দমদমে একা থাকত।

—আর শরণ্যা?

—না, তার এখনও কোনো খবর নেই।

—তুই এখন কোথায়? বাড়িতে?

—না, আমি বাইরে থেকে ফোন করছি।

—পুলিশ তোকে ফোন করছিল কেন?

—বুঝতেই পারছিস, ওরা জানার চেষ্টা করছিল, আমার সঙ্গে ওর রিসেন্টলি দেখা হয়েছিল কি না।

—কিন্তু তোর সঙ্গে তো আর সুরজিতের দেখা হয়নি! শেষ কবে দেখা হয়েছিল?

উলটোদিক থেকে ও চুপ করে রইল। পিছনে অনেক লোকের আওয়াজ। মনে হয়, রাস্তার থেকে ফোন করছে। ঠিক শুনতে পেয়েছে তো? আবার প্রশ্নটা করে উঠলাম।

ও আস্তে আস্তে বলে উঠল, পরশু দিন দেখা হয়েছিল। দমদম স্টেশনে শরণ্যার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে আমরা ওর বাড়ি গিয়েছিলাম।

খানিকক্ষণ আমার গলা থেকে কোনো আওয়াজ বেরোল না। ও কি জানে, আমি ওর সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরেছি! বোধহয় না, তাহলে এটা ও আমাকেও বলত না। আগে তো এটা ও বলেনি। একটু একটু করে সব বেরোচ্ছে।

যাতে ওর কাছে ধরা পড়ে না যাই, তাই যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে বলে উঠলাম,— কিন্তু ওখানে গিয়েছিলি কেন? তোর সঙ্গে কোনোদিন সেরকম আলাপ ছিল না তো!

ও ফের বলে উঠল, শরণ্যা বলেছিল, ওর আর সুরজিতের কিছু দরকারি কথা বলার আছে আমার সঙ্গে। আর্জেন্ট। আমি সুরজিতের বাড়ি যেতে চাইছিলাম না। কিন্তু বার বার বলাতে রাজি হয়ে যাই। ওখানে গিয়ে কথা বলতে চাইছিল। সেজন্য গিয়েছিলাম। বেশিক্ষণ ছিলাম না। মিনিট কুড়ি বাদে বেরিয়ে আসি।

—তুই সেটা বলেছিস পুলিশকে?

—পাগল! আমি শরণ্যার সঙ্গে সেদিন দমদমে দেখা হওয়ার কথাই তো বলিনি! এখন তো সেটা বলাও যাবে না। তা ছাড়া কবে মারা গেছে, সেটাও জানি না। যদি সেই রাতেই কিছু হয়ে থাকে তাহলে কী সাংঘাতিক যে হবে, তা-ই ভাবছি! ভাবছি, কী করা যায়। শোন, তোকে হয়তো পুলিশ ফোন করবে। আমাকে কেন জানি না জিজ্ঞেস করছিল, পরশু রাতে কোথায় ছিলাম? আমি বলেছি যে আমি সন্ধেবেলায় তোর সঙ্গে পার্কস্ট্রিটে ফ্লুরিজ-এ ছিলাম।

—হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি? আমাকে জড়াচ্ছিস কেন এর মধ্যে?— জোরে বলেই খারাপ লাগল। বাড়ির অন্য কেউ বা গার্গী শুনে ফেললে কী ভাববে? ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে এলাম।

রাহুল তো এরকম কথায় কথায় মিথ্যে বলত না। হঠাৎ কী জন্য? নাকি ও সত্যি এতেও ইনভলড আছে!

—আমার আর কোনো উপায় নেই, ইন্দ্র। বলে ফেলেছি যে তুই সঙ্গে ছিলিস। তোর নাম্বার ওরা চেয়ে নিয়েছে। তোকে ফোন করবে হয়তো এ ব্যাপারে। প্লিজ হেল্প করিস। ফ্লুরিজ মনে রাখিস। ইচ্ছে করে বলেছি কারণ, ওখানে দুজন কাস্টমারের সংখ্যা বেশি। টাইমটা একটু ভেবে রাখিস। সাড়ে আটটা থেকে ন-টা।

আমি না বলতে পারি না। বিশেষ করে রাহুলের মতো একজনকে। সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম।

কিন্তু এবারে আমারই টেনশন হচ্ছে। হঠাৎ করে যেন প্রচণ্ড গরম লাগতে শুরু করেছে। রাহুলের ব্রেন ঠিক সেরকমই শার্প। এত কিছু ভেবে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছে! কিন্তু এখন উপায়?

ইতিমধ্যে ফোন বেজে উঠল। ফোন নিয়ে বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।

ফোন ধরতে উলটোদিক থেকে খসখসে গলায় কে যেন জোরে বলে উঠল, আপনি কি ইন্দ্রনীল ঘোষ বলছেন?

—হ্যাঁ। আপনি কে?

—আমি দমদম-ঘুঘুডাঙা থানা থেকে ও.সি. মোহিত সরকার বলছি। এখন কথা বলা যাবে?

—হ্যাঁ, বলুন।

—আচ্ছা, আপনি রাহুল সান্যালের বন্ধু, তা-ই তো?

—হ্যাঁ, অফিস কলিগ। —একটু দূরত্ব দেখানোর চেষ্টা করলাম।

—পরশু দিন আপনি কোথায় ছিলেন?

—অফিসে।

—সেটা কোথায়?

—সল্ট লেক সেক্টর ফাইভ।

—তারপরে? সন্ধের দিকে?

—তারপরে বাড়ি। না সোজা বাড়ি অবশ্য না, পার্কস্ট্রিটেএকটু আড্ডা দিয়ে বাড়ি।

—কোথায়?

—পার্কস্ট্রিটে ফ্লুরিজ।

—তা সেখানে আপনার সঙ্গে কি রাহুল ছিল?

—হ্যাঁ। আমরা মাঝেমধ্যেই যাই।

— সল্ট লেক থেকে একেবারে পার্কস্ট্রিট—অতটা দূর— শুধু ওই ফ্লুরিজ-এ খেতে?

—আসলে একটা মাঝামাঝি জায়গা আমার আর রাহুলের বাড়ির মধ্যে। তারপর যা হয় আর কী! মধ্য কলকাতার একটা আলাদা উষ্ণতা আছে তা-ই না!

—হুঁ।

কতটা বিশ্বাস করল কে জানে! কিন্তু আমি এদিকে ঘামতে শুরু করেছি। ধরা পড়ে গেলাম নাকি?

উলটে প্রশ্ন করে উঠলাম, আপনি হঠাৎ করে এসব জিজ্ঞাসা করছেন?

—আসলে একটা মার্ডার কেসের ব্যাপারে। হয়তো আপনার আরও সাহায্য লাগতে পারে।

—কার?

—সুরজিৎ মহান্তি। চেনেন? আপনার বন্ধুর এক্স-ওয়াইফ যার সঙ্গে এখন প্রেম করছিল। একটু থেমে ফের বলে উঠল, আপনার বন্ধুর যে এক্স-ওয়াইফ নিখোঁজ, সেটাও নিশ্চয়ই জানেন?

—হ্যাঁ, সেটা শুনেছি।

—তা আপনার বন্ধুকে কীরকম মনে হয়?

—ভালো। খুব ভালো। কেন?

—না, না। এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম। এই আর কী! একটা জিনিস মনে রাখবেন, কোনো ভুল তথ্য দিলে আপনি নিজেও বড়ো বিপদে পড়বেন। কোনো কিছু জানলে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে খবর দেবেন।

আরও কিছু কথা বলার পরে ছেড়ে দিল। মাথা ঘুরিয়ে চমকে উঠলাম। পিছনে গার্গী দাঁড়িয়ে আছে। কতটা কী শুনেছে কে জানে! কিন্তু উলটোদিকে যে ওসি ছিল, সেটা হয়তো বুঝেছে।

ওর দিক থেকে প্রশ্ন এল— কী হয়েছে রাহুলের?

১০

১৬ অক্টোবর ২০০৩, বার্মিংহ্যাম, ইংল্যান্ড

—আজ তোমাদের দুসগাপুজো না! কোথাও যাবে না? সারাদিন অফিস করবে?— জেসিকা ওর কেন্ট অ্যাক্সেন্টের ইংরেজিতে বলে উঠল।

অবাক হয়ে বলে উঠলাম, দুসগাপুজো নয়। দুর্গাপুজো।

—আয়াম সরি। টু ডিফিকাল্ট টুপ্রোনাউন্স ফর মি।

—কিন্তু তুমি কী করে দুর্গাপুজোর কথা জানলে? বইতে পড়েছ?

—না, না। রাহুলের কাছে শুনেছি। —বলে চোখের ইশারায় রাহুলকে দেখাল জেসিকা। মুখে একটা মিষ্টি হাসি।

অফিসে একটা লাঞ্চ করার আলাদা জায়গা আছে। সেখানেই আমি, রাহুল আর জেসিকা একসঙ্গে লাঞ্চ করছিলাম। জেসিকা আমাদের প্রোগ্রামের পি.এম.ও. বা প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অফিসে আছে। রাহুল এই পুরো বিশাল প্রোগ্রামটার প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। আমরা দু-বছরের জন্য ইংল্যান্ডে এসেছি। বার্মিংহ্যামেএকটা বড়ো রিটেলারের অফিস থেকে আমরা কাজ করেছি। এখানে একটা বড়ো বিজনেস ট্রান্সফর্মেশনের প্রোগ্রাম চলছে। সহজভাবে বলতে গেলে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত রিটেলার সেন্সবেরির ব্যাবসার খোলনলচে বদলে দিতে পারে এই প্রোগ্রাম। কীভাবে আরও বেশি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছোনো যায়, কীভাবে ছোটো ছোটো সংস্থার সঙ্গে পার্টনারশিপে নতুন পণ্য বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার কথা মাথায় রেখে চট করে বাজারে আনা যায়, এরকম নানান বিষয়ের উপরে এই প্রোগ্রাম। আরও অন্য দেশের নানান নতুন মার্কেটে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছোনোর জন্য।

এরকম ধররে বড়ো পরিবর্তন, যাকে বিজনেস ট্রান্সফর্মেশনে বলে সেটা অনেক সময়ই সংস্থার নিজেদের লোকেদের দিয়ে করা সম্ভব হয় না। এর জন্য অনেক অভিজ্ঞতা লাগে, পরিবর্তন আনতে পারে এরকম নেতৃত্ব অনুঘটক হিসেবে লাগে। সেজন্যই আমাদের মতো স্পেশালিস্ট কনসালটেন্টদের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে পুরো প্রোগ্রামের চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাহুলকে। রাহুলের সঙ্গেই কাজ করছে সেন্সবেরির একদম উপরমহলের বেশ কিছু কর্তা, যাতে এ প্রোগ্রাম সার্থক হয়।

এসব বড়ো প্রোগ্রামের একটা প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অফিস থাকে। এক্ষেত্রে ছজনের একটা টিম আছে। যার মধ্যে জেসিকাও আছে। এদের কাজ প্রোগ্রামের প্ল্যানিং, বিভিন্ন মিটিং কোঅর্ডিনেট করা থেকে পুরো টিমের খেয়াল রাখা যাতে তারা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে, পরস্পরের সঙ্গে প্রয়োজনমতো যোগাযোগ করতে পারে।

জেসিকা কেন্টের মেয়ে। বলা যায় একদম গ্রামের মেয়ে। শুনেছি, ওদের বাড়িতে অনেক ভেড়া, গোরু আছে। ওর বাবা এখনও চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত আছে।

সেজন্য জানি না কি না, জেসিকার মধ্যে এক অদ্ভুত সারল্য আছে। এখানকার অনেকের সঙ্গে একটু ভেবেচিন্তে কথা বলতে হয়। ইংরেজদের একটা অংশের মধ্যে সামান্য রেসিজম আছে। সেটা প্রচ্ছন্ন থাকলেও দূরত্বটা অনেক সময় বোঝা যায়। তাই সহজে মেশা যায় না। জেসিকার মধ্যে সেটা নেই। পাহাড়ি ঝরনার মতোই ওর ব্যবহার। ওকে খুব সহজে বোঝা যায়। একই সঙ্গে ভারত সম্বন্ধে জানতে সব সময় খুব আগ্রহী।

রাহুলই বলে উঠল, আগামীকাল অষ্টমী। সন্ধেবেলায় যাব। যেতে চাও? শাড়ি পরে যেতে হবে কিন্তু।

—শাড়ি, সে আবার কোথাও পাব?

আমি কিছু বলার আগে রাহুল বলে উঠল, সেটা নিয়ে চিন্তা কোরো না। শাড়ি আমি নিয়ে আসব তোমার জন্য। আমার বউয়ের শাড়ি। ওটাই পরে যেতে পারো।

—বাহ, দারুণ হবে তাহলে—বাচ্চাদের মতো খিলখিলিয়ে হেসে উঠল জেসিকা।

জেসিকা বেশ সুন্দরী। এখানে অবশ্য ওর মতো তন্বী সুন্দরী মাঝেমধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু সেটা নয়। ওর মুখের মধ্যে একটা অদ্ভুত সারল্য আছে, স্প্যানিশ সুন্দরীদের মতো শরীরে এক লাবণ্য আছে, সেটাই বোধহয় ওর সব থেকে বড়ো আকর্ষণ।

রাহুল ফের বলে উঠল, বেস্ট হবে, কাল অফিসের পরে আমার সঙ্গে আমার বাড়ি চলে আসবে। ওখানে আমার বউ শরণ্যার সঙ্গে তো তোমার আগে থেকেই আলাপ আছে। ও-ই সাজিয়ে দেবে। তারপরে একসঙ্গে আমরা ওখান থেকে পুজোয় চলে যাব।

আমার দিকে ফিরে বলে উঠল রাহুল, পথে তোকে আর গার্গীকেও তুলে নেব। তোদের গাড়িটার কী একটা সমস্যা হয়েছে না!

এটাই রাহুল। সব সময় সবার কথা খেয়াল রাখা। কীভাবে করে, জানি না।

এখানে শুরুতে অনেকেরই পছন্দ হয়নি যে একজন ভারতীয় এসে এরকম একটা বড়ো প্রোগ্রামের একদম প্রধান হর্তাকর্তা হয়ে বসেছে। বিশেষ করে নাক-উঁচু ইংরেজদের এটা একদম পছন্দ হয়নি।

কিন্তু এক মাসের মধ্যে রাহুলের ম্যাজিক্যাল টাচে সব ভেদাভেদ—দূরত্ব মুছে গেছে। কাজের পরিভাষায় আমরা একটা কথা বলি 'চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট'। যখনই এরকম একটা বড়ো প্রোগ্রাম হয়, অনেকের কাজ রাতারাতি অনেকটা বদলে যায়। সেজন্য একটা বড়ো বিরোধিতা আসে। হয়তো কিছু লোককে অন্য কোনো কাজে নেওয়া হবে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি যাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। এজন্য অনেকেই এ ধরনের প্রোগামকে ঠিকভাবে সাহায্য করে না। এমনিতেও সবাই পরিবর্তনকেই ভয় পায়। সামনাসামনি বাধা না দিলেও নানানভাবে যাতে কাজ না এগোয়, সে চেষ্টা করে। প্রথমদিকে এজন্য এ প্রোগ্রামের কোনো কাজই এগোচ্ছিল না। প্রায় এক বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু রাহুল আসার পরে সব বদলে গেছে। ও সংস্থার উপরের স্তরের লোকদের সঙ্গে যেমন কথা বলে তাদেরকে বোঝাতে পারে, তেমনই একদম কর্মীস্তরে গিয়ে খুব সহজে বন্ধুত্ব স্থাপন করে তাদের থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে নিতে পারে। তারা যাতে এ প্রোগ্রামে সবরকম সহযোগিতা করে তা নিশ্চিত করতে পারে। কার কীসে আগ্রহ, কী ব্যাপারে আপত্তি সব জানতে ওর দশ দিনও লাগেনি।

সেদিন শুনলাম, এই প্রোগ্রামের মূল বিরোধী ফিনান্স ডিরেক্টর রবের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলে তাকেও ওর দলে টেনে এনেছে।

সেদিন টাউন হলে এখানকার লেবার ইউনিয়নের এক নেতা ওকে এগিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ করেছিল, আমাদের যে এর জন্য অতিরিক্ত কাজ করতে হবে, তার বদলে আমরা কী পাব? কিছুদিন বাদে আমাদের অন্য কাজের সন্ধান করতে হবে, তা-ই তো?

আমাদের অফিসের আসা-যাওয়ার পথে কিছু দূরে একটা বন্ধ ম্যানুফাকচারিং প্ল্যান্ট আছে। সেটা একসময় নাকি খুব ভালো ফাউন্টেন পেন তৈরি করত। সারা বিশ্বজোড়া নাম ছিল তার।

রাহুল মুহূর্তের মধ্যে সে প্রসঙ্গ টেনে এনে বলে উঠল, আমরা চাই না যে আমরা ওই সংস্থার মতো হারিয়ে যাই। আমাদের জন্য এ প্রোগ্রাম এতটাই আবশ্যিক যে আমরা যদি না করি তাহলে আমাদের দশাও ওদের মতো হতে চলেছে।

বলে এগিয়ে গিয়ে ওই লোকটার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বলে উঠল, আগামীকাল তুমি নিজেও চাইবে, যাতে এই ফোন থেকে তুমি যেকোনো জিনিষস অর্ডার দিতে পারো, দোকানে না গিয়েই। এটা কিন্তু তুমি আগে ভাবোনি। আমাদের প্রয়োজন বদলে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা নিজেদের বদলাতে শিখিনি। সেখানেই একটা সংস্থা সেরা হয়ে ওঠে, কেউ টিঁকে থাকে, কেউ হারিয়ে যায়। আমি চাইব, তোমার মতো নেতা এ পরিবর্তনে নেতৃত্ব দাও, যাতে আমরা ঠিক পথে এগোই। এ পরিবর্তন তোমার—তোমাদের।

সহজ কথায় রাহুল বুঝিয়ে দিল যে এই পরিবর্তনের দায়িত্ব সবার, এবং এর জন্য ও সবার কাছ থেকে একই রকম সাহায্য চায়।

শুধু ওর কথায় নয়, ওর হাবেভাবেও এমন কিছু থাকে, যা সব দূরত্ব এক মুহূর্তে মুছে দেয়। এখন দেখি, সেই ইউনিয়ন লিডার লোকটা মাঝেমধ্যেই এসে ওকে নতুন নতুন আইডিয়া দেয়। এ প্রোগ্রাম রাতারাতি সবার স্বপ্নের প্রোজেক্ট হয়ে উঠেছে। এমনকী অনেকে নির্ধারিত সময়ের বাইরে রাত অব্দি কাজ করে নিয়মিত। এককথায় যাকে বলা যায় রাহুলের ম্যাজিক।

তবে জেসিকাকে শাড়ি পরলে বেশ ভালোই লাগবে। কে জানে, রাহুল এখানে কয়েক বছর থাকলে হয়তোএখানকার মেয়েদের মধ্যে শাড়ি পরা চালু হয়ে যাবে।

১১

২৪ অক্টোবর ২০০৩, রাহুলের বাড়িতে, কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড

শনিবার। এই একটা দিন আমরা হয় রাহুলের বাড়িতে, না হয় আমার বাড়িতে সবাই মিলে আড্ডা দিই। আমরা থাকি কেনিলওয়ার্থে। এটা মূলত উচ্চবিত্তদের শহর। বার্মিংহ্যামের কাছে। ১০০০ সাল নাগাদ গড়ে-ওঠা খুব পুরোনো শহর। আগেকার দিনের কাঠের কাজ করা টিউডর স্টাইলের অনেক বাড়ি শহর জুড়ে। এখানে বিখ্যাত কেনিলওয়ার্থ ক্যাসল আছে, যেখানে রানি প্রথম এলিজাবেথ বেশ কয়েকবার এসেছিলেন তাঁর বন্ধু 'আরল অফ লেস্টার' রবার্ট ডাডলের সঙ্গে দেখা করতে।

শহর জুড়ে বেশ কিছু পুরোনো দিনের দোকান, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, পাব, রেস্টুরেন্ট, চার্চ। সবকিছুই আছে পুরোনোর সঙ্গে ভারী সুন্দর গা মিলিয়ে। বেশ ছিমছাম শহর। বার্মিংহ্যামের মতো প্রচুর লোকের ভিড় এখানে নেই। শুধু আছে পাথরের রাস্তায় অতীতের রহস্যময়তা, বর্তমানের অভিজাত উপস্থিতি।

এখানে এখন দিনের বেলা খানিকটা কমে এসেছে। শীত পড়ছে। আজ আবার তার মধ্যে মন-খারাপ-করা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ঘোলাটে বর্ণহীন আকাশ। অনেক সময় শনিবারে দূরে একসঙ্গে কোথাও বেড়াতে চলে যাই। আজ সে উপায় ছিল না।

পুজোর পরে প্রথম দেখা। শরণ্যা আজ হলুদ রঙের লালপাড় শাড়ি পরেছে। খুব সুন্দর লাগছে ওকে ওই শাড়িতে।

আমাদের জন্য আগে থেকেই ঘুগনি আর শিঙাড়া করে রেখেছিল শরণ্যা। খেতে খেতে আড্ডা শুরু হল।

গার্গী কথায় কথায় হেসে বলে উঠল রাহুলকে, দাদার সেক্রেটারিকে দেখতে কিন্তু খুব সুন্দর। জেসিকাকে ভারী সুন্দর লাগছিল শাড়িতে। দারুণ ফিগার। তোর শাড়ি ছিল ওটা, তা-ই না? —জিজ্ঞেস করে উঠল শরণ্যাকে।

—হ্যাঁ, ওরা অফিস থেকে এখানে এসেছিল। শাড়ি আগে কোনোদিন পরেনি। হিমশিম খাচ্ছিল। আমি পরিয়ে দিলাম। মেয়েটা বেশ ভালো। একদম ছেলেমানুষ। ওর আমাদের মতো কোনো লজ্জা নেই। তবে শাড়িতে তেমন কিছু লাগছিল না। ওদের পোশাকেই ওদের বেশি মানায়।—শরণ্যা জানায়।

রাহুল বলে উঠল, ও কিন্তু আমার সেক্রেটারি নয়। ও আমাদের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অফিসে কাজ করে। এরকমভাবে যে নারীমূর্তি দিয়ে দুর্গাপুজো হয়, সঙ্গে আবার অসুর থাকে— এসব নিয়ে খুব ইন্টারেস্ট। আমাকে পরের দিন অফিসে নানা প্রশ্ন করছিল এসব নিয়ে। দশ হাত কেন, দশ হাতে কী কী আছে, কেন আছে। এসব নানান প্রশ্ন।

—দেখো আবার বেশি কথা বোলো না। তুমি এত সুন্দর কথা বলো যে আবার না তোমার প্রেমে পড়ে যায়।—গার্গী মজা করে বলে।

শরণ্যা আড়চোখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ঠিকই বলেছ। চিন্তা হচ্ছে এখন। প্রেমে আবার পোড়ো না। চোখে চোখে রাখব।

হেসে বলে উঠল শরণ্যা।

শরণ্যা ফের বলে উঠল, রাহুলের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যে সব মেয়েই চট করে প্রেমে পড়ে যেতে পারে। আমাকে তাই ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়।

গার্গী বলে উঠল, হ্যাঁ। একদম। —হেসে বলে উঠল, তা তুমিই বা কম কীসে। তোমার মতো সুন্দরী বউ থাকতে অন্য কারো দিকে কেন তাকাবে রাহুলদা? তা ছাড়া, শরণ্যার মতো এত গুণী মেয়েই বা কজন হয়! সবকিছুতেই এক্সপার্ট।

কথাটা ঠিক। শুধু ভালো রান্না করা, ভালো গান গাওয়া, ভালো নাচতে জানা এসবই নয়, শরণ্যা খুব সুন্দর ঘর সাজানোর জিনিষ বানায় নানান ছোটোখাটো ফেলে-দেওয়া জিনিস দিয়ে। আজই দেখলাম, একটা কী সুন্দর টেবিল ল্যাম্প বানিয়েছে নানান জিনিস দিয়ে, যার মধ্যে জলের বোতলও আছে।

রাহুল একটু অপ্রস্তুতের হাসি হেসে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল, আজ বেশ প্ল্যান করে আমাকে অ্যাটাক হচ্ছে তো! অন্য প্রসঙ্গে যাই। ভাবছিলাম, দু-সপ্তাহ পরে লং উইকএন্ডে লেক ডিস্ট্রিক্ট গেলে কীরকম হয়? আমার গাড়িতেই সবাই চলে যাব। ইন্দ্রর আর ড্রাইভ করতে হবে না।

—বাহ বেশ, দারুণ হবে ব্যাপারটা। আমার ড্রাইভ করতে ভালো লাগে না। বিশেষ করে ভালো ড্রাইভার পাচ্ছি যখন, তখন যাওয়াই যায়। —মজা করে বলে উঠলাম।

—তা তোমার মেন্সার মিটিংটায় যেতে হবে না! ওটা তো ওই শনিবারে ফেলেছে।—শরণ্যা বলে ওঠে।

—ভালো মনে করেছ। হ্যাঁ। ওটা একটু কথা বলে নিতে হবে। মনে হয় না কোনো অসুবিধে হবে।

—মেন্সার—সেটা কী?

—আরে, মেন্সার নাম শুনিসনি? আমি ওই ধাঁধা, পাজল এসব ভালো লাগে বলে ওদের একটা কম্পিটিশনে নাম দিয়েছিলাম। যা-ই হোক, আমাকে সিলেক্ট করেছে। ওদের মেম্বারদের একটা রেগুলার মিটিং হয়। মাসে একবার করে। আমরা যাই।

পাশ থেকে শরণ্যা বলে ওঠে, ও একটু বিনয় করে বলছে। এটা হল একটা অত্যন্ত হাই আই. কিউ.—মানুষদের ক্লাব। মেম্বারশিপ পাওয়া আদৌ সহজ নয়। নানান সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় ওদের ওখানে।

—তা-ই নাকি? সে তো দারুণ ব্যাপার।

শরণ্যা ফের বলে ওঠে,— ওকে আবার ওখানে মার্ডার মিস্ট্রির উপরে কিছু আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওই দিনে।

—বাহ, ওটা তো ওর ফেভারিট টপিক।

এ বিষয়ে বলে রাখি, আমার এই বন্ধুটি অত্যন্ত হাই আই. কিউ.-এর-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক সময় আমাকে বেশ অপ্রস্তুতে পড়তে হয় ওর জন্য। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু বুঝে ফেলে যে আশপাশের লোকেদের একটু ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা খুব স্বাভাবিক। তার মধ্যে আবার ওর সাংঘাতিক বই পড়ার শখ। বিশেষ করে মার্ডার মিস্ট্রির। আগাথা ক্রিস্টি থেকে এখনকার সব গোয়েন্দা কাহিনির পোকা।

শরণ্যা ফের বলে উঠল,—হ্যাঁ, কথা বলে নিয়ো। সবে জয়েন করেছ, এখনও নিয়মগুলো জানা নেই ঠিক।

—শুধু আমি একা! তোমার কথাটা খুব কায়দা করে চেপে গেলে! উনিও কিন্তু সিলেক্টেড হয়েছেন। মেন্সার মেম্বার। দুজনেরই যাওয়ার কথা।

—ওরেব্বাস! এ তো ডাবল পার্টির ব্যাপার। এসব তো জানা ছিল না।

—শরণ্যা হচ্ছে পাজল এক্সপার্ট। যেকোনো শক্ত পাজল চটপট সলভ করে ফেলে।

শরণ্যা কিছু বলল না। দেখলাম, লজ্জায় ওর কান লাল হয়ে গেছে।

১২

১৪ জানুয়ারি ২০০৪, বার্মিংহ্যাম, ইংল্যান্ড

আজ অফিসে কাজ করতে করতে পাশের জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ পড়ল। রাহুল, সঙ্গে জেসিকা। অফিসের বাইরে কিছুটা বাগান আছে। সেখানে হাঁটছে। একবার মনে হল যেন দুজনে দুজনের হাত ধরেছে। তারপরে মনে হল, রাহুল কী যেন বলছে জেসিকাকে। একটু উত্তেজিত। ওর কথা বলার ভঙ্গি থেকে অন্তত তা-ই মনে হল। তারপরে আবার দুজনে হাঁটতে থাকল। এই হাড় কাঁপানো শীতে বাইরে হাঁটা!

এখানে লাঞ্চের পরে কেউ হাটতে যেতেই পারে। কিন্তু তবু যেন কীরকম লাগল। চট করে এখানকার একজন স্থানীয় মেয়ে একজন ভারতীয় ছেলের এত কাছাকাছি আসে না। জেসিকার কি কোনোরকম দুর্বলতা আছে রাহুলের প্রতি!

হয়তো অস্বাভাবিক নয়। রাহুলকে শুধু যে দেখতে ভালো তা-ই নয়, ওর মধ্যে একটা খুব সহজাত ভদ্রতাবোধ—সৌজন্য আছে, কথাবার্তায় বুদ্ধির ছাপ আছে, যা খুব কমেরই মধ্যে পাওয়া যায়। তার বাইরে ওর আকর্ষণীয় কথা বলার ক্ষমতা, ন্যাচারাল সেন্স অফ হিউমার। কিন্তু একই সঙ্গে আমি রাহুলকে যতটা জানি, তাতে মনে হয়, ও শরণ্যাকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে পারবে না।

কিন্তু এটা কি শুধু জেসিকার দিক থেকে থাকা সম্ভব? নাহ, সেটাও হওয়া সম্ভব নয়। যদ্দূর জানি, জেসিকার এক বয়ফ্রেন্ড আছে। লিভ টুগেদারও করে। এমনকী মাঝেমধ্যে তার ছবিও আমাদের দেখায়।

অবশ্য এও হতেই পারে, ওরা দুজন শুধু ভালো বন্ধু। শুধু শুধু ভাবছি। ভারতীয় মেন্টালিটি।

খানিক বাদে রাহুল ফিরে এল। একটু মজা করেই বলে উঠলাম, কী রে, জেসিকার সঙ্গে কী গল্প হচ্ছিল?

ও দেখি, উলটে মজা করে বলে উঠল,— এই প্রেম, সুখ-দুঃখের গল্প। শীত কাটিয়ে জীবনে আসন্ন বসন্তে আসার কথা—বলে হেসে বলে উঠল, খুব জানলা দিয়ে দেখা হচ্ছিল। দেখিস, আবার শরণ্যাকে বলিস না। সেদিন ওর সামনে জেসিকার এমন প্রশংসা করেছিস, যে সত্যি আমায় চোখে চোখে রেখেছে।

বলে একটু থেমে ফের বলে উঠল, কী বলছিল আজ, জানিস?

—তোর সঙ্গে বিয়ের কথা?

—হচ্ছে তোর! বলছিল, ভারতীয়রা ধর্ম নিয়ে বেশি কথা বলে না কেন? ধর্ম নিয়ে কথা উঠলেই সবাই কেমন যেন সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। ভালো-মন্দ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে না কেন! সেটাই বোঝাচ্ছিলাম।

—কী বললি!

—বলছিলাম যে আমাদের দেশে এত বেশি সংখ্যক অশিক্ষিত লোক আছে যে তারা এ ধরনের আলোচনাকে অন্যভাবে নিতে পারে। শিক্ষা নেই বলে বিশেষ বিশেষ ধর্মের আচার-বিচার—কুসংস্কারগুলো মনের গভীরে ঢুকে গেছে। তাদের মনে হয়, অন্যরকম কিছু আলোচনা হলেই তাদের সে বিশ্বাসে আঘাত হানা হচ্ছে। সেজন্যে আমরা ধর্ম নিয়ে আলোচনা করি না। যাক গে, কাজের কথায় আসি। আমি ওর উপরে একটু খেপেই গিয়েছিলাম আজ। বলে কিনা মার্কের টিম বলেছে, ইউজার ট্রেনিং পরের এক মাসের মধ্যে নিতে পারবে না। আমাকে ভয়ে আগে বলেনি। এত বড়ো একটা খবর। আমি এখনই মিটিং অর্গানাইজ করতে বলেছি। পরের সপ্তাহ থেকেই ট্রেনিং শুরু করতে হবে। তা না হলে পুরো প্রোগ্রাম কয়েক মাস পিছিয়ে যাবে।

—রাজি না হলে! লোকটা খুব পাওয়ারফুল শুনেছি।

—সে যতই পাওয়ারফুল হোক-না কেন, আমার জানা দরকার পরের এক মাসের মধ্যে কী কারণে ওর টিমের আট ঘণ্টার ট্রেনিং সম্ভব নয়। না হলে কী হবে বুঝেছিস, কোনোভাবে ইউজার অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্টিং শুরু করা যাবে না। পুরো পলিটিকস। পুরো প্রোগ্রামের উপরে তার প্রভাব পড়বে।

—এসকালেট কর। চিফ অপারেটিং অফিসারের কাছে।

—ধুর, সব কি আর এসকালেট করলে হয়? তাতে কাজ আরও অনেক শক্ত হয়ে যায়। তার থেকে ওদের এমনভাবে বোঝাতে হবে, যাতে 'না' বলার সুযোগ না পায়।

১৩

২১ জানুয়ারি ২০০৪ বার্মিংহ্যাম, ইংল্যান্ড

—জেসিকার সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বলা যায়, কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। —কফির মেশিনে কফি নিতে নিতে রাহুল গম্ভীর গলায় বলে উঠল।

আজ এখানে সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। ঠান্ডাটাও একটু বেড়েছে। সকাল এখন সাড়ে আটটা। কিন্তু বাইরে তাকালে মনে হচ্ছে, দিন যেন শুরুই হয়নি। এখনও রাতের অন্ধকার। শুধু জানলার বাইরে রাস্তার আলোগুলোর কম্পমান ঘুমন্ত আলো কুয়াশার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে। তারাও যেন চোখ খুলে তাকায়নি। দেখলেই কীরকম যেন মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয়, কবে শীত কাটবে।

তার মধ্যে আবার এরকম একটা খবর।

—কেন, ফোন ধরছে না?

—সে তো গত তিন দিন ধরেই ফোনে পাচ্ছি না। প্রথমে ভাবছিলাম, হঠাৎ করে হয়তো কোনো কারণে বাড়ি চলে গেছে। কিন্তু আজ সকালে ওর বাড়ি থেকে খবর পেয়েছি, ও বাড়িতেও যায়নি।

—বাড়ি তো কেন্টে। কেউ খবর দিল?

—না, আমি গতকালও অফিসে ওকে না দেখে এখানকার এইচ. আর. ম্যানেজার পিটারকে জানিয়েছিলাম। এটাই নিয়ম জানিস নিশ্চয়ই। আমার কাছে কোনো খবর ছিল না। ভাবছিলাম, শরীর খারাপ হল কি না! ওদের কাছেই ওর বাড়ির নাম্বার ছিল। ফোন করে জানা গেল ওর বাবা-মা-ও একই রকম চিন্তিত। রোজ নাকি একবার অন্তত ফোন করত। কিন্তু চার দিন আগে শেষ ফোন করেছিল।

—চার দিন আগে মানে, এই সোমবার। সেদিন তো অফিসেও এসেছিল।

রাহুল যেন একটু খেয়াল করে বলে উঠল, হ্যাঁ, সেদিনই লাস্ট। সেদিন যাওয়ার সময়েও আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল। মনে আছে, সেদিন আমাদের অনেক রাত অব্দি মিটিং ছিল। মনে হয়, রাত করেই বেরিয়েছিল।

—ও থাকত কোথায়?

—টাইলস হিল বলে একটা জায়গা আছে, জানিস। ওখানেই। দু-তিন দিন গাড়িতে ড্রপ করেছিলাম বলে চিনি। একটা বাড়িতে ভাড়া থাকত।

—ওখানে ওরা খোঁজ করেছে?

—হ্যাঁ, বাড়িতেও নেই।

—তাহলে এবারে কী করবি?

—এবারে অফিস থেকে ওরা পুলিশে জানাবে। এখানকার নিয়মকানুন ঠিক জানা নেই। তা না হলে আমিই জানাতাম।

—আচ্ছা, ওর এক বয়ফ্রেন্ড ছিল না। তার সঙ্গে কোথাও যায়নি তো?

—না, তার সঙ্গেও ওরা কাল যোগাযোগ করেছে। সে-ও কিছুই জানে না। নাকি এক মাস আগে শেষ দেখা হয়েছে। মনে হল, সম্পর্কে একটু ভাঙন শুরু হয়েছিল। আমারও জেসিকার কথা শুনে মনে হয়েছিল, ছেলেটার সঙ্গে কিছুদিন ওর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না।

—তা তোর সঙ্গে এসব পার্সোনাল ব্যাপার শেয়ার করত? ওর সঙ্গে তো গত চার বছর ধরে ডেট করছিল না।

—ধুর, এখানে এরকম হামেশাই হয়। সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভেঙে যায়। সেদিক দিয়ে চার বছর অনেক সময়। অন্য কারোর সঙ্গে ইদানীং সম্পর্ক গড়ে উঠলেও অবাক হব না।

—তা তোর সঙ্গে আবার কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তো? এত চিন্তিত। —মজা করেই বলে উঠেছিলাম।

—ইন্দ্র, প্লিজ, ডোন্ট টক রাবিশ। —বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, এটা হাসিঠাট্টার সময় নয়।

চুপ করে গেলাম। বলাটা আমার সত্যি ঠিক হয়নি। ঘটনাটা যতই লাইটভাবে নিই-না কেন, চিন্তার কথা। কোনো খবর নেই প্রাণোচ্ছল মেয়েটার। সত্যি কোনো বিপদ হয়নি তো?

অফিসে ইতিমধ্যে দেখি, একজন পুলিশ সার্জেণ্ট ঢুকেছে। লোকটার সঙ্গে এইচ. আর. ডিরেক্টর ম্যাথিউ। রাহুলের সঙ্গে কথা বলে চায়। ওকে ডেকে নিয়ে একটা কনফারেন্স রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

ব্যাপারটা তাহলে বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে।

নাহ, আমার এরকম সস্তা ইয়ারকি করা উচিত হয়নি। আজ শুক্রবার। অফিসে একটা হালকা মেজাজ থাকে। দূর থেকে যারা আসে, তাঁরা অনেকেই শুক্রবার আসে না।

ঠিক আগের শুক্রবার এখানে আমাদের সঙ্গে এ সময় জেসিকা কফি খাচ্ছিল। বেশ হাসিখুশি ছিল। শেষ ওকে দেখেছি এই সপ্তাহে সোমবার। আমি সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে গিয়েছিলাম। মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে পড়ছে। সেদিন যখন বেরোই, তখন অফিস প্রায় ফাঁকা। একটা স্লাইড ডেকের উপরে রাহুল আর জেসিকা কাজ করছিল একটা কনফারেন্স রুমে। তখন অবশ্য অফিসে আরও অনেকে ছিল। শেষ ওকে কে দেখেছে, কে জানে?

বোর্ডের উপরে পিন দিয়ে অনেক টিম মিটিং-এর ছবি লাগানো আছে। কিছুদিন আগে আমরা এখানে একসঙ্গে দেওয়ালি পালন করেছিলাম। তার ছবিও আছে।

জেসিকাও সেখানে আছে। জিন্স প্যান্টের উপরে ছোটো লাল টপ। মুখে ভারী মিষ্টি হাসি। সত্যি আকর্ষণীয় ইয়োরোপিয়ান মেয়েদের ফিগার। মুখের মধ্যে স্প্যানিশ মেয়েদের নমনীয়তা আছে। অনেকের মধ্যে ঠিক রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আলতোভাবে রাহুলের কাঁধে ডান হাত রেখে। ছবি দেখেই মনে হচ্ছে, ওরা যেন অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। আশ্চর্য! এটা তো আগে চোখে পড়েনি। অফিসিয়াল ছবিতে এটা ঠিক স্বাভাবিক নয়।

১৪

৮ জুন ২০০৪, বার্মিংহ্যাম, ইংল্যান্ড

শনিবার। জুন মাসের শুরুর দিক। এ সময়টায় প্রকৃতি তার হৃদয়—বুদ্ধি সবকিছু উজাড় করে সাজিয়ে তোলে ইংল্যান্ডকে। আমার বাড়ির সামনেই একটা পার্ক। সেখানে সকালে হাঁটতে গিয়েছিলাম।

এখন ফুলের মরশুম। সারি দিয়ে হথহর্ন গাছ। সাদা থোকা থোকা ফুল হয়েছে তাতে। ফুলের পাপড়িতে গাছের তলার ঘাস হারিয়ে গেছে।

অন্য যেকোনোদিকে মাঠের ঘাস থেকে মাথা তুলে আছে হলুদরঙা ঘাসফুল। পাঁচটা করে পাপড়ি। ভারী সুন্দর দেখতে। খেয়াল করে হাঁটতে হয়, মনে হয়, এই ঘাসের উপরে পড়ে-থাকা মণিমাণিক্য পায়ের তলায় চাপা পড়ছে না তো!

দূর থেকে মাঝেমধ্যে নিয়মিত সময় অন্তর অন্তর কাঠঠোকরার ঠোকরানোর আওয়াজ ফিরে ফিরে আসছ। ছোটো ছোটো আপেল হয়েছে গাছে। কিছু গাছ আবার কমলালেবুতে ভরে আছে। পাখিদের, কাঠবেড়ালিদের, খরগোশদের এখন দিন জুড়ে উৎসব। চারদিকে তাকালেই ম্যাগপাই, শালিক, রংচঙে, রবিন, পাপিয়া, ব্ল্যাক বার্ড। গাছ ভরতি লাল বুনো চেরি হয়েছে। তা-ই ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে।

হঠাৎ দেখলাম, আমার সেলফোনটা বাজছে। রাহুলের ফোন। আজ ওর বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই কিছু বলবে।

ফোনটা ধরলাম। রাহুলের গলায় উত্তেজনার সুর।—ইন্দ্র, কভেন্ট্রি পুলিশ স্টেশনে আছি। একটা খুব খারাপ খবর আছে।

—কী? তোর কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?

—না, না, তার থেকেও খারাপ। জেসিকার বডি পাওয়া গেছে। শি ইজ ডেড।

—মানে? কী বলছিস?

—তুই একটু থানায় চলে আসবি?

—হ্যাঁ, আসছি। সোজা যাচ্ছি এখান থেকে। আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।

অ্যাড্রেস নিয়ে ট্যাক্সিতে করে পৌঁছোতে এক ঘণ্টা লাগল।

রাহুল বলেই রেখেছিল। যেতেই এক মহিলা পুলিশ আমাকে নিয়ে একটা ছোটো ঘরে গেল। গিয়ে দেখি, রাহুলও ওখানে বসে আছে। এইচ. আর. ম্যানেজার পিটারও আছে। ছোটো ঘর। ঘরে কীরকম যেন বিদঘুটে বমি-বমি গন্ধ। অবশ্য পুলিশ থানাতে খুব ভালো এয়ার সার্কুলেশন এক্সপেক্টেড নয়।

ডিটেকটিভ সার্জেন্ট জেমস পারটন তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে। সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে রাহুল আর পিটারকে আজই ডাকা হয়েছে। আমাকেও হয়তো ডাকতেন।

যা বুঝলাম তা হল এই। আজ থেকে চার দিন আগে এক ব্যক্তি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে গিয়ে একটা বড়ো কালো স্যুটকেস পড়ে থাকতে দেখে। সেটা এমন একটা নিচু জায়গায় আগাছার মধ্যে ফেলা ছিল যে কারো চোখে চট করে পড়ার কথা নয়। লোকটার কাছে গিয়ে লক্ষ করে দেখে যে সেটাকে ঘিরে পিঁপড়ের ভিড়। বাইরে একটা তালা লাগানো ছিল। লোকটা একসময় ব্রিটিশ মিলিটারিতে ছিল। সন্দেহ হতে তালা ভেঙে ফেলে। ডালা খুলে দেখে তার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ডিকম্পোজড একটা বডি। বলা যায়, তাতে কঙ্কাল ছাড়া কিছুই ছিল না। আর পোকার বাসা গড়ে উঠেছে সেখানে। এমনকী তার মধ্যে ভিকটিমের কোনো পোষাক বা কোনো আইডেন্টিটিও খুঁজে পায় না। জায়গাটা ছিল টাইল হিল স্টেশন থেকে মাইল দুয়েক দূরে।

যে-ই খুন করে থাকুক, খুব নিখুঁত কাজ করেছে।

জেমস বলে উঠল, মনে হয়, এই বডিটা অন্য কোথাও রাখা ছিল, পরে সরিয়ে এখানে ফেলে দেওয়া হয়।

—বলছেন, এই মঙ্গলবারে পেয়েছেন। আর আজ শনিবার। এ ক'দিন আমাদের জানাননি কেন?— পিটার বলে উঠলেন।

—বডি এত ডিকম্পোজড হয়ে গিয়েছিল যে বলতে পারেন ,শুধু কঙ্কালটাই ছিল। সেটা থেকে শনাক্ত করা সহজ ছিল না। এমনকী ওটা দশ বছর আগের কি না, সেটাও বোঝার উপায় ছিল না। জেসিকার মতো অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মিসিং হয়েছে গত দশ বছরে। সেজন্য প্রথমে জানা দরকার ছিল, খুনটা ঠিক কীরকম সময় নাগাদ হয়েছে সেটা আন্দাজ করার। সেজন্য আমরা মিসেস হার্পারকে খবর দিই।

—ফরেনসিক এন্টিমোলজিস্ট?— রাহুল বলে উঠল।

একটু অবাক হয়ে রাহুলের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল জেমস—ওকে চেনেন নাকি?

—না, না, এক্ষেত্রে ওইভাবে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করা সম্ভব। পোকার বাসা বললেন, তাই বললাম। অনুমান করেছি যে হয়ন্ত্রদ্ধ ফরেনসিক এন্টিমোলজিস্ট— এর দরকার ছিল।

অবাক হয়ে জেমস ফের বলে উঠল, বাহ, আপনার এ ব্যাপারে বেশ ভালো আইডিয়া আছে তো। হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। পোকার কলোনি, পোকার ডিম, ওদের সংখ্যা এসব দেখে খুনের সময় আন্দাজ করা যায়। তা বাক্সের ওই পোকার কলোনির বয়স দেখেই মিসেস হার্পার বললেন যে হত্যাটা গত ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে হয়েছে। আমরা তখন ওই সময়ের সব মিসিং পার্সন রেকরড চেক করতে গিয়ে যে ক-টা কেস পেলাম, তাদের জেন্ডার, বয়স, সকলের এর সঙ্গে তুলনা করে নিশ্চিত হই যে এটা আপনাদের জেসিকার। এবারে বুঝেছেন তো কেন আজ সকালে চার দিন বাদে ডাকলাম ইন ফ্যাক্ট, আজ সকালেই আমরা নিশ্চিত হয়েছি।

—কীভাবে মারা হয়েছে কিছু আন্দাজ করতে পেরেছেন?

—মাথার পিছনদিকে ফ্র্যাকচার। মনে হয়, মাথার পিছনদিক থেকে ভারী কিছু দিয়ে মারা হয়েছে। বেশ কয়েকবার। বুঝতেই পারছেন, আরও বেশ কিছু তথ্য আমাদের সামনে এসেছে। কিন্তু এ বিষয়ে আপনাদের সাহায্য লাগবে। আমি আপনাদের দরকার হলে এখানে ডাকব।

একটু থেকে সার্জেন্ট ফের বলে উঠলেন,আচ্ছা, কাউকে সন্দেহ হয়! মানে শেষ কয়েকদিন কেমন ছিল জেসিকা?

রাহুল বলে উঠল, অন্যরকম কিছু মনে হয়নি। একই রকম হাসিখুশি ছিল। মনে হয়নি কোনোরকম টেনশনে ছিল। তবে ওর এক বয়ফ্রেন্ড ছিল। তার সঙ্গে ওর শেষদিকে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল না। তাকে নিশ্চয়ই জেরা করেছেন। আচ্ছা, ওর বাবা-মা-কে জানিয়েছেন?

—হ্যাঁ, প্রথমে সকালে ওদেরই খবর দিই। আপনারা অফিস থেকে একটু কথা বলে নেবেন ওদের সঙ্গে। খুব ভেঙে পড়েছে। অবশ্য ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক।

—হ্যাঁ, অবশ্যই, আমরা অফিসে ফিরে ওদের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ করব না। কেন্টেওনাদের কাছে আমাদের অফিস থেকে লোকও যাবে।

ফের জেমস বলে উঠল, অফিসের সবার সঙ্গে ওর ভালো সম্পর্ক ছিল তো? কারোর সঙ্গে মনোমালিন্য? হয়েছিল ঘটনার আগে?

—না, না,— রাহুল ফের বলে উঠল, ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করাও শক্ত ছিল। সেরকম কিছু হলে ঠিক জানতে পারতাম।

—কী করে এতটা শিয়োর ছিলেন?

বুঝতে পারলাম, রাহুলের অতটা বলা উচিত হয়নি।

ওর হয়েই বলে উঠলাম, আসলে আমরা তিন-চারজন জেনারেলি অফিসের মধ্যে একসঙ্গে লাঞ্চ ইত্যাদি করতাম। তা ছাড়া ও আমাদের প্রোগ্রাম অফিসের মেম্বার হওয়ার জন্যে আমাদের প্রায় প্রতিঘণ্টায় কথা হত। সামান্য টেনশন হলে সেটা বুঝতে পারতাম। তবে—

—তবে কী?

একটু দোনামনা করে বলে উঠলাম, আসলে আমাদের প্রোগ্রামের কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল সে সময়। জেসিকা সেজন্য কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিল। বুঝতেই পারছেন, অনেকের ক্ষেত্রে এই প্রোগ্রামের জন্য কাজের পরিবর্তন মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। তারা বাধা দিচ্ছিল। অনেকের কাজের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন হয়ে যেত, সেটা যাতে তারা জানতে পারে আগে থেকে, সেসব বিষয়ে বেশ কিছু কমিউনিকেশনের দায়িত্বে ছিল জেসিকা।

—ইন্টারেস্টিং। তার জন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে বলছেন?

রাহুল উত্তর দিল, হ্যাঁ, হতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস, তার জন্য এরকম কাজ কেউ করবে না। ওর একার উপরে রাগ করার কথা নয়। তবে ওর বয়ফ্রেন্ডকে একটু ভালো করে জেরা করবেন। ইদানীং মনে হয়, ওদের মধ্যে কিছু ঝগড়াঝাঁটি মারপিটও হয়ে থাকতে পারে।

—হুঁ, সে তো দেখবই।

পাশ থেকে মিস্টার পিটার বলে উঠল, অচেনা কেউও তো হতে পারে? কোনোরকম ধর্ষণ হয়নি তো?

ঘাড় নাড়লেন সার্জেন্ট জেমস। —না, সেরকম কিছুর চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে এর কাছাকাছি একটা জায়গায় কিছু কাউন্সিল হাউস আছে। কাউন্সিল হাউসে আফ্রিকা থেকে আসা কিছু রেফিউজি আছে। আমরা এখানকার সব সন্দেহজনক লোকের খোঁজখবরও নেব। ওটা স্ট্যান্ডার্ড রুটিনের মধ্যে পড়ে। আমরা মার্ডার ওয়েপনটাও পাইনি।

আরও কিছু প্রশ্ন করলেন জেমস। আমাদের যার যা তথ্য ছিল, জানালাম। আমাদের কন্ট্রাক্ট নাম্বার রেখে দিলেন।

থানার থেকে বেরোলাম প্রায় দুপুর দুটো নাগাদ। রাহুল দেখলাম, খানিকক্ষণ কোনো কথা বলছে না। কী যেন ভাবছে। দুবার শরণ্যার ফোন-আসতেই কেটে দিল। আমি বলে উঠলাম, কীরে, ফোন ধরছিস না?

—ভালো লাগছে না রে ইন্দ্র। এক খুব প্রিয়জন যেন হঠাৎ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। খুব ভালো ছিল মেয়েটা। ভাবতে পারিস, ওর বাবা-মা-র কী অবস্থা হবে? আমিও যাব কেন্টে।

বলে আবার অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে থাকল। পথে আর তেমন কোনো কথাই হল না।

১৫

১৬ এপ্রিল ২০১৯, কলকাতা

মনিস্কোয়্যারে একটা সিনেমা দেখে বেরিয়ে এসে দেখি গার্গী সঙ্গে নেই। এই তো সঙ্গে সঙ্গে ছিল। কোথায় গেল!

একটু দূরে গিয়ে অপেক্ষা করলাম। ছুটির দিন। তাই যথেষ্ট ভিড় হয়েছে। কলকাতায় এই শপিং মলগুলো ছোটো ছোটো পরিবারের ছুটির দিনে সময় কাটানোর ভালো জায়গা। এরকম একটা অতি সাধারণ সিনেমা দেখতেও তাই এরকম ভিড়।

যা-ই হোক, খানিকক্ষণ বাদেই গার্গীর দেখা মিলল। সঙ্গে শরণ্যা।

আমাকে দেখে মুচকি হেসে শরণ্যা এগিয়ে এল। আরও রোগা হয়ে গেছে এই এক মাসে। হয়তো যেরকম মানসিক চাপে আছে, তার জন্যই। চোখের তলায় সামান্য কালি, তাতে অবশ্য আকর্ষণ কিছু কমেনি। আশপাশ থেকে যে-ই যাচ্ছে, সে-ই একবার ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে যাচ্ছে।

আমি বলে উঠলাম, চলো, কফি শপে বসে গল্প করা যাক।

আমরা তিনজন গিয়ে বসলাম।

গার্গী ওকে জিজ্ঞেস করে উঠল, একা এসেছ সিনেমা দেখতে?

—না, না, এমনি ঘুরতে এসেছি। আসলে বাড়িতে একদম ভালো লাগছিল না। রিনির স্কুলের এক বন্ধুর জন্মদিন। ও তাই বন্ধুর বাড়িতে সারাদিন থাকবে। পৌঁছে দিয়ে ভাবলাম, একবার ঘুরে যাই।—বলে মাথা নিচু করল। চোখের কোণ থেকে নেমে এল কয়েক ফোঁটা জল। ও কাঁদছে।

গার্গী ওর হাত চেপে ধরল। আমরা সান্ত্বনা দেওয়ার সামান্য চেষ্টা করলাম।

ও বলে উঠল, সবকিছু যেন কয়েকদিনের মধ্যে ওলটপালট হয়ে গেল। এত বছর একসঙ্গে কাটিয়েছি, অনেক কিছুই শুধু যেন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। এখন সবকিছুই যেন অন্যরকম লাগে, মানিয়ে নিতে পারি না।

চোখের কোণটা ফের রুমাল দিয়ে মুছে বলে উঠল, এই যে অটো করে এইটুকু পথ এলাম, তাতেও যেন সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগছিল। এমনকী নামার পর টাকা দিতে ভুলে গিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। খেয়াল ছিল না যে রাহুল সঙ্গে নেই।

গার্গী বলে উঠল, এখনও সময় আছে। এরকম সব সংসারেই হয়। মাঝেমধ্যে টেনশন। সবকিছু ফের দু-একদিনে ঠিক হয়ে যাবে।

—না, না, এ আর ঠিক হওয়ার নয়। —ও আস্তে আস্তে বলে উঠল, তোমরা ওকে চেনো না। ও যখন একবার সরে যায়, আর কিছুতে ফিরে আসে না। নদীর জল অন্য খাতে অনেক দূরে বয়ে গেছে এখন। ও অনেক দূরে চলে গেছে।

গার্গী বলে উঠল, অন্য কারো সঙ্গে রাহুলের সম্পর্ক?

—না, না, সেরকম কেন হবে!—একটু যেন অসন্তুষ্ট হয়ে বলে উঠল শরণ্যা।

আমি বলে উঠলাম, শরণ্যা, এখনও সময় আছে। তোমাদের মেয়ের জীবনও এর সঙ্গে জড়িত আছে। আমার উপর সে দায়িত্ব ছেড়ে দাও। আমি রাহুলকে ঠিক বুঝিয়ে দেব।

—না। ওর সঙ্গে কোনো কথা বলবে না। না, ওর মধ্যে একটা একদম অন্যরকম আরেক রাহুল আছে। তার কথা তোমরা কোনোদিন টেরও পাওনি। আমিই পাই নি। হয়তো কোনো একদিন সেই রাহুলের সন্ধান পাবে তোমরা।

—কীসের কথা বলছিস তুই? —গার্গী বলে উঠল, ও কি তোকে মারধর করে?

—না, না। সে অন্য এক কথা। তোমার জেসিকার কথা মনে পড়ে?

—জেসিকা, কোন জেসিকা?

আমি পাশ থেকে বলে উঠলাম, ইংল্যান্ডের সেই আমাদের প্রোজেক্টে যে ছিল, সেই জেসিকা?

সায় দিল শরণ্যা।

—জেসিকার কি কোনো খোঁজ পাওয়া গিয়েছে? তাকে নিয়ে এতদিন পরে হঠাৎ? কিছু ব্যাপার ছিল ওদের মধ্যে?—পরপর প্রশ্নগুলো করে উঠলাম।

—না, খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে উধাও হয়ে গেল, তাই না?— শরণ্যা বলে উঠল।

—হ্যাঁ। কিন্তু হঠাৎ করে এ কথা?

—না, সে কথা থাক। পাঁচ বছর আগে আমাদের ওই মধ্যমগ্রামের জমি কেনা নিয়ে কিছু ঝামেলা হয়েছিল, শুনেছ নিশ্চয়ই!

—হ্যা, ওই তো তোমাদের জমির পাশের ক্লাবটা, কী যেন নাম ছিল! তারা তো সেই জমির একটা অংশ জবরদখল করে বসেছিল। কিছুতেই বিক্রি করতে দিচ্ছিল না।

—হ্যাঁ, ওই তো মহম্মদ শেরিফ। ওখানকার বিখ্যাত মস্তান। সেই লোকটা করতে দিচ্ছিল না। পার্টির সঙ্গে খুব ভালো বোঝাপড়া ছিল ওর।

—হ্যাঁ, জানি, কেন, আবার সে সমস্যা তৈরি করছে নাকি!

—না, না, সে আর আছে নাকি সমস্যা তৈরি করার জন্য! গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। সেজন্যই ঝামেলা মিটে গিয়েছিল। বাকিদের সঙ্গে রাহুল কিছু টাকা দিয়ে বোঝাপড়া করে নিয়েছিল। কিন্তু সে থাকলে সেটা সম্ভব হত না। অবশ্যই ওদের ডিমান্ড তো আর ঠিক ছিল না।

—হ্যাঁ, সেটা ঠিক। আমি হলে মেটাতে পারতাম না। এটা রাহুল ঠান্ডা মাথায় করেছিল বলেই। তা না হলে অতো টাকা নষ্ট হত। এদিকে এসব রাজনীতির লোকেদের যা ক্ষমতা। কিন্তু হঠাৎ করে একথা!

—কোনো একদিন হয়তো জানবে, এর পিছনের আসল কথা। আসল রাহুলের কথা। তবে এ নিয়ে আজ আর আমি কিছু বলব না।

ওর কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে আমি আর গার্গী অন্য প্রসঙ্গে গেলাম। কিছুই বুঝতে পারলাম না।

১৬

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, দুপুর দুটো, কলকাতা

আজ মনে পড়ল কয়েক মাস আগে বলা শরণ্যার কথা। তখন কিছুই বুঝিনি। ভাবতেও পারিনি। জেসিকার কথা। শরণ্যা তাহলে কি জানতে পেরে গিয়েছিল সব কথা!

তাহলে কি সেই মহম্মদ শেরিফ, তাকেও সরিয়ে দিয়েছিল রাহুল? হ্যাঁ, মনে পড়ছে, সেরকম একটা ছবিও যেন ছিল ওখানে। আমি অবশ্য শেরিফকে দেখিনি। তখন শরণ্যার কথা শুনে একবারও মনে হয়নি এরকম কোনো সম্ভাবনার কথা।

আমার অ্যালবামে জেসিকার সঙ্গে রাহুলের কিছু ছবি ছিল। আমিও আছি। কিন্তু সেই ছবিগুলো এখন যেন অন্যভাবে সামনে এল। একটা ছবিতে দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। জেসিকার মুখে এক রহস্যময় হাসি।

কিছু কি হয়েছিল ওদের মধ্যে? যার জন্য পরে ওকে রাহুল সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। সে সুযোগ ওর ছিল। যথেষ্টই ছিল। ও জানত, ঠিক কোন পথ দিয়ে জেসিকা ঠিক কখন অফিস থেকে ফেরে। হয়তো সেদিন জেসিকাকে রাতে গাড়িতে পৌঁছে দিতেও পারে। কাকে ধরা হয়েছিল, শেষ অব্দি, জানা নেই!

জেসিকা কীভাবে খুন হয়েছিল, কাউকে ধরা হয়েছে কি না, সেটা আমাকে জানতে হবে। সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এখনও কিছু যোগাযোগ আছে আমার সেই প্রোজেক্টের কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে লিঙ্কডইন-এ কানেক্টেডও আছি।

অফিসে কাজে মন আসছিল না। এখন আমি ও রাহুল আলাদা অফিসে বসি। যদিও মাঝেমধ্যে দেখা হয়েই যায়। সিনিয়র লিডারশিপ মিটিং-এ।

কিছুক্ষণ বাদে দেখি, ফোন বাজছে। ইংল্যান্ডের ফোন। ফোন তুলে দেখি উলটোদিকে পিটার। পিটার সে সময় সেন্সবেরিতে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার ছিল। জেসিকার উধাও হওয়ার পরে পুরো তদন্তের সময়ে ও যথেষ্ট ইনভলভড ছিল। ও এখন অবশ্য সেই কোম্পানিতে নেই। ওকেই মেসেজ করেছিলাম লিঙ্কডইন থেকে পাওয়া ওর এখনকার ফোন নাম্বারে। লিখেছিলাম খুব জরুরি বলে। সেজন্যে আমাকে ফোন করেছে।

কিছুক্ষণ কথা হল জেসিকার ব্যাপারে। ও জানে না ঠিক কী হয়েছিল শেষে। কিন্তু যতটুকু জানে, শেষ অব্দি কেউই ধরা পড়েনি ওই কেসে। ওর বয়ফ্রেন্ডের বিরুদ্ধেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি শেষ অব্দি। ওর ধারণা, এখনও ওপেন কেসগুলোর মধ্যেই ওটা পড়ে।

আমার এ বিষয়ে এতদিন বাদে আগ্রহ দেখে ও খানিকটা অবাকই হয়েছিল। আমাকে উলটে প্রশ্ন করছিল এ ব্যাপারে। শুধু বললাম, এ বিষয়ে আমি আবার ফোন করব। আমার কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে যা এ তদন্তে সাহায্য করতে পারে। ও আমাকে জানাল, এ ব্যাপারে যেকোনো বিষয়ে আমাকে সবরকম সাহায্য করবে।

আমি নিজে এখন বুঝেছি, রাহুল কেন এত তাড়াহুড়ো করে দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিল। ও চায়নি ও এ তদন্তের ব্যাপারে কোনো কিছুতে জড়িয়ে পড়ুক। কী যেন ছিল সেই সার্জেন্টের নাম? তার সঙ্গে একবার যোগাযোগ করলে মন্দ হয় না।

আজ সন্ধেতে একটা খুব দরকারি কাস্টমার মিটিং আছে। আমেরিকার একটা বড়ো রিটেলারের গ্লোবাল চিফ ইনফর্মেশন অফিসার এবং চিফ ফিনানসিয়াল অফিসারের সঙ্গে। আমাদের কোম্পানির একটা খুব বড়ো একটা কন্ট্রাক্ট পাওয়া-না-পাওয়া অনেকটাই নির্ভর করবে এই মিটিংটার উপরে। এমনিতে আমেরিকাতেই যেতে হত মিটিংটার জন্য। হঠাৎ করে মিটিংটা ঠিক হওয়ায় যেতে পারিনি।

মিটিংয়ের আগে বেশ কিছু কাজ বাকি। টিমকে ডেকে নিলাম আমার চেম্বারে। যে বিষয়গুলো নিয়ে মূলত আলোচনা হবে, তার জন্য কিছু প্রস্তুতি দরকার। একই সঙ্গে দেখতে হবে কিছু স্পেশাল ডিসকাউন্ট দেওয়া যায় কি না।

মিটিংয়ের মধ্যে দু-দুবার আমার ফোনটা বেজে উঠল। যত দরকারি হোক-না কেন, আমি মিটিংয়ের মধ্যে কোনো ফোন ধরি না। সাইলেন্ট করে রাখি। কিন্তু তৃতীয়বার যখন একই নাম্বার থেকে ফোনটা এসে সমানে বাজতেই থাকল, বাধ্য হয়ে তুলে নিলাম।

উলটোদিকে দমদম-ঘুঘুডাঙ্গা থানা থেকে ও.সি. মোহিত সরকারের গলা।

—আপনাকে এখনই থানায় আসতে হবে।

একটু সময় নিয়ে টিমকে বাইরে যেতে বলে উত্তর দিলাম,—কী ব্যাপার বলুন তো?

—সবকিছু ফোনে বলা যাবে না। কিন্তু আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দেবেন। আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে শুধু শুধু আপনিই বিপদে পড়বেন। আমাদের কাছে খবর আছে যে রাহুল সেদিন দমদমে গিয়েছিল। ওকে দমদমের এক মাছওয়ালা দেখেছে। ম্যাডাম, মানে শরণ্যাও ওর সঙ্গে ছিল। আপনার বন্ধু কী করে একই সঙ্গে দুটো জায়গায় থাকতে পারে?

চুপ করে বসে রইলাম। এমনিতেও আমার মিথ্যে কথা বলার বিশেষ অভ্যেস নেই। ধরা পড়ে গেছি।

আমার গলার কাঁপুনি বাড়িয়ে দিয়ে পরের মন্তব্য এল—মিথ্যে কথা বলে আপনার নিজের বিপদ বাড়াবেন না। আপনার নিজের পরিবারের কথা ভাববেন। আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি, সুরজিতের বাড়ির কফির কাপে আমরা রাহুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেয়েছি। আপনি যদি এখনও বলেন ওর সঙ্গেই ছিলেন, তাহলে...

—আমি আসছি।

ফোন ছেড়েচুপ করে একটুক্ষণ বসে রইলাম। বাইরে টিম অপেক্ষা করছিল। বেরিয়ে এসে বললাম, একটা আর্জেন্ট কাজে বেরোতে হবে।

স্বপ্না আমার মুখের ফ্যাকাশে রঙ দেখে কিছু একটা আন্দাজ করেছিল। বলে উঠল—কিছু হয়েছে?

না বললেও বুঝতে পারলাম, আমার নার্ভাসনেস, অস্থিরতা ধরা পড়ে যাচ্ছে। মাথা কাজ করছে না।

১৭

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বিকেল চারটে, কলকাতা

—আপনি একটু খুলে বলুন সবকিছু, যতটুকু জানেন। —স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ও.সি. মোহিত সরকার।

লোকটাকে দেখেই কীরকম যেন অস্বস্তি লাগে। শার্টের উপরের বোতামগুলো খোলা। দু-হাতে বেশ কয়েকটা মাদুলি। চোখ দুটো দেখলেই মনে হয় যেন সারারাত মদ খাওয়ার পরে, এই সবে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে।

আমি ভেবেই রেখেছিলাম, ঠিক যতটুকু জানি, সেটুকুই বলব।

মিথ্যে কথা বলা ঠিক হবে না, আবার শুধু অনুমানের উপরে নির্ভর করে কোনো কথা বলে রাহুলকে কোনোরকম বিপদে ফেলাও উচিত হবে না।

লোকটা দেখলাম, খানিক বাদে উঠে ঘরে পায়চারি করছে। আর একটা কাঠি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করছে।

ফের চেঁচিয়ে প্রশ্ন করে উঠল,কী হল! আপনি কি টের পেয়েছিলেন যে আপনার বন্ধু ওর স্ত্রী-কে খুন করবে? তার প্রেমিককে খুন করবে?

—না।

—কিন্তু খুন করতে পারে না—যেভাবে আগের বারে বলেছিলেন, এখন কি সেটাই বিশ্বাস করেন?

চুপ করে বসে রইলাম। সত্যি এখন সে কথাটা জোর করে বলতে পারি না।

—লুক, মিস্টার ইন্দ্র। আপনি অতিশয় ভদ্রলোক। কিন্তু আমার আবার চোর-জোচ্চোর-খুনিদের নিয়ে কাজ। ধৈর্য কম। সবার জন্য একই ট্রিটমেন্ট। যা জানেন, চটপট বলে ফেলুন। আশা রাখব, আপনার সঙ্গে কোনো পুলিশি ট্রিটমেন্ট করতে হবে না। আপনাকে জানিয়ে রাখি, সুরজিতের কফিতে আমরা বিষ পেয়েছি। থ্যাল না থ্যালিয়াম জাতীয় কিছু! সেই থ্যালিয়াম ওর রক্তেও পাওয়া গেছে। খুব হাই চান্স রাহুলই এটা করেছে। এবং একইভাবে ওর এক্স-ওয়াইফ শরণ্যাকেও হয়তো খুন করেছে। মৃতদেহ শুধু পাওয়ার অপেক্ষায়। বেঁচে থাকলেও শরণ্যা হয়তো ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

—থ্যালিয়াম? আপনি নিশ্চিত?

—হ্যাঁ,আপনি এই নাম চেনেন! আমি এটার নাম আগে শুনিনি। বেশ রেয়ার মাল শুনলাম। ফরেনসিকসের লোকটা বলল। সাংঘাতিক বিষ, কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা যায়। তা আপনি এটার কথা শুনেছেন মনে হয়। রাহুলের কাছে?

শুনে চুপ করে রইলাম কিছুক্ষণ। তাহলে আর সন্দেহ নেই। এরপরে কি আর লুকোনো ঠিক হবে? আমি নিজে আরও জড়িয়ে যাব। আমি কী ভাবছি সেটা এখনই বলা দরকার। সব কিছু খুলে বলা দরকার।

আমার দিকে স্থির চোখে উনি তাকিয়ে ছিলেন। বলে উঠলেন— কী এত ভাবছেন? উগরে দিন। লকআপে দু-দিন থাকলে বুঝতে পারবেন এ কীরকম শক্ত ঠাঁই। আপনার চাকরির রেকর্ডও খারাপ হয়ে যাবে।

দু-তিন মিনিট বাদে বলতে বাধ্য হলাম আমার সন্দেহের কথা। আমেরিকার কথা, ইংল্যান্ডের কথা। শরণ্যার বলা কিছু কথা যেজন্য ওদের ডিভোর্স হয়েছিল। আমেরিকার সেই কেস, যেখানে থ্যালিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল। রাহুলের সে কাজ করার সুযোগ ছিল। জেসিকার কথা। একই সঙ্গে জানালাম, আমি ওদের বাড়ির আলমারির তাকে কী দেখেছি।

উনি শুনতে শুনতে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন। বেশ কিছু প্রশ্ন করছিলেন। আমার কাছ থেকে ইংল্যান্ডের কয়েকজনের ফোন নাম্বারও নিয়ে নিলেন।

সব শোনার পরে বলে উঠলেন, আমাদের পুলিশের লোক আপনার বন্ধুর উপরে সবসময় নজর রাখবে। কোথায় যায়। কী করছে। আপনি এখানে আসার ব্যাপারে কিছু বলবেন না। এখনই অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বার করছি না। যেরকম ঘোড়েল লোক, লইয়ার-টইয়ার ধরে ঠিক জামিন পেয়ে যাবে। আমার কাছে আরেকটু স্ট্রং এভিডেন্স চাই।

—আর শরণ্যার?

—সে আমরা খুঁজছি। আশা করি, ঠিক দু-একদিনের মধ্যে খোঁজ পেয়ে যাব। সে জীবিত থাকুক বা মৃত হোক। তবে বুঝতেই পারছেন শরণ্যার বেঁচে থাকার চান্স খুব কম। মালটা নির্ঘাত বউকে সরিয়ে দিয়েছে। —বলে একটু থেমে ঠোঁটের কোণে একটু মুচকি হাসি নিয়ে বলে উঠল, তা আপনারও বন্ধুর স্ত্রী-র উপরে একটু সফট কর্নার আছে দেখছি। আপনার সঙ্গেও কোনো ইন্টুমিন্টু ছিল নাকি?

এরকম নোংরা প্রশ্নে রেগে বলে উঠলাম, এত বছর ধরে দেখছি, এরকম ভালো মেয়ে, ওর জন্য কিছুটা চিন্তা থাকাটা স্বাভাবিক নয় কি? তা ওর ফোন ট্র্যাক করা গেছে?

—ফানটা তো বাড়িতেই রেখে গেছে। শুনলাম, ওই ফোন নাকি মেয়েটা অনেক সময় ক্যারি করতাম না। এখনকার দিনে ভাবা যায়!

একটু থেমে ফের ও.সি. বলে উঠল, আপনি যা বলেছেন, তাতে এত শুধু আমাদের থানার আওতায় রাখলে চলবে না। লালবাজারের ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টকেও পুরোপুরি ইনভলভ করতে হবে। আপনার সাহায্য লাগবে।

বলে একটু থেমে ফের বলে উঠলেন, বেশ হত যদি আমেরিকা-ইংল্যান্ডে যাওয়া যেত এরকম কেসের জন্য। সেসব তো আর হয় না। শুধু ঘাটশিলা আর বর্ধমান। আর গরমে পচা।

এরপরে যেটা করলেন সেটা আরও অদ্ভুত। টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটা নিয়ে খানিকক্ষণ কুলকুচি করে ঘরের এককোণে গিয়ে ফেলে দিলেন।

আমিও অনুমতি নিয়ে উঠে পড়লাম।

১৮

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, রাত দেড়টা, কলকাতা

দীর্ঘক্ষণ বেজে চলল সেল ফোনটা।

আমি বেশ রাত করে শুই। রাত তিনটে অব্দিও কোনো কোনোদিন জেগে থাকি। এটা আমাকে যারা ভালো করে জানে, আমার সঙ্গে মেশে, তারা জানে। কিন্তু তা বলে কেউ রাত দেড়টায় ফোন করে না। কিন্তু আজ ঠিক তা-ই হল।

পর পর দুবার বেশ কিছুক্ষণ বেজে ফোনটা ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। সোফায় বসে একটা বই পড়ছিলাম, উঠে গিয়ে ফোন নাম্বারটা দেখলাম। অফিসের কেউ ফোন করছে? অনেক সময় বিদেশের কেউ ভারতের সময় ঠিক আন্দাজ না করতে পেরে এরকম গভীর রাতে ফোন করে ফেলে। কিন্তু এটা ভারতেরই নাম্বার। কোনো কিছু আর্জেন্ট?

ফোনটা করার আগেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা ধরে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলাম, কে?

উলটোদিকে শরণ্যার গলা। খুব আস্তে। গলার স্বরে যেন ভয় মিশে আছে।

ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, তুমি একা আছ? আসলে বাধ্য হয়ে তোমাকে এত রাতে ফোন করছি।

—শরণ্যা! মাই গড! তুমি কোথায়? তোমাকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সবাই খুব চিন্তিত। আমি এখানে একাই আছি— বলতে পারো।— একটু উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম।

—বলছি। আচ্ছা, রাহুল তোমার কাছে নেই তো?

—না, না। তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পারো।

—তুমি কিছুই হয়তো জানো না। —একটু দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ পেলাম। ফের বলে উঠল, তোমার হয়তো রাহুল সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই। ও একজন সিরিয়াল কিলার। —ও থামল।

ভেবেছিল, আমি খবরটাতে হয়তো চমকে উঠব বা হেসে উঠব। কিন্তু সেরকম কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে ফের বলে উঠল, আমার মনে হয় রাহুল এবার আমাকেও মেরে ফেলবে। কারণ আমি সব জানি। অন্য কেউ জানে না।

—শুধু তুমি না। আমিও জানি। তা তুমি এখন কোথায় আছ?— ওকে জানালাম, অ্যাক্সিডেন্টালি কী কী দেখেছি ওই বুককেসের তাকে।

উলটোদিকে কিছুক্ষণের অস্বস্তিকর নীরবতা। আস্তে আস্তে ধরা গলায় ও বলল, আমিও কখনো ভেবে উঠতে পারিনি যে রাহুল এরকম।

ও বর্ধমানের একটা জায়গার ঠিকানা দিয়ে বলে উঠল, তুমি একটু পুলিশকে ইমিডিয়েটলি জানাতে পারবে?

—আমার সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ হয়েছে, কী করে জানলে?

—খবর পেয়েছি। কিন্তু আমি সরাসরি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। যদি আমাকেও কোনো কারণে সন্দেহ করে।

—তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আমি সব ব্যবস্থা করছি। আমি সবকিছু জেনে গেছি। পুলিশকেও এই সন্দেহের ব্যাপারে জানিয়েছি। ওরা জানে তুমি নিরপরাধ।

—ও, তাহলে আন্দাজ করতে পারছ, জানার পরে আমার পক্ষে ওর সঙ্গে আর একসঙ্গে থাকা সম্ভব হয়নি। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম। মনে হত, কবে আমারও ওই দশা হবে। এখন ঠিক সেটাই সত্যি হচ্ছে।

ফের বলে উঠি, চিন্তা কোরো না। আমি সব ব্যবস্থা করছি। তুমি যেখানে আছ, সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ো না। তোমাকে এই নাম্বারে পাওয়া যাবে তো? দরকার হলে পুলিশ যাতে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

—এতে কিছু অসুবিধে হবে না তো?— মৃদুস্বরে বলে উঠল। মনে হল, ও যেন কাঁদছে।

—না, না, এটুকু ভরসা তো করতেই হবে। আমি তো আছি।

অ্যাড্রেসটা নিলাম। শান্তিনিকেতনের একটা হোটেল।

তারপরেই ও.সি. মোহিত সরকারকে ফোন করলাম।

উনি শুনেই উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, এখনই পুলিশফোর্স পাঠিয়ে দেব। আর আপনি দেখুন তো আপনার বন্ধুকে ফোনে পাওয়া যায় কি না। ওকে এবারে অ্যারেস্ট করতেই হবে। শরণ্যা ও আপনার বয়ান ও অন্য সারকামস্টানশিয়াল এভিডেন্সের উপরে নির্ভর করে অ্যারেস্ট এখনই করা যেতে পারে। ও খুব ডেঞ্জারাস। কখন কী করে বসে, বা দেশ ছেড়ে পালায়, কে জানে! তার আগেই যা করার করতে হবে।

দু-বছর বাদে

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, কলকাতা

অবশেষে আদালত থেকে রাহুলের কেসের রায় বেরিয়েছে। IPC 302 ধারায় আজীবন কারাদণ্ড হতে পারত। কিন্তু এক্ষেত্রে যেভাবে একের পর এক খুন ঠান্ডা মাথায় করেছে, যেভাবে ওর অপরাধ দেশের বাইরেও ছড়িয়ে আছে, সেসব কথা মাথায় রেখে ওকে শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এমনকী রাহুল যে মানসিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, বিচার চলাকালীন সেটাও বোঝা গেছে।

ঠান্ডা মাথায় বদলা নিতেই একের পর এক খুন। সুপরিকল্পিত খুন। তার মধ্যে পলের দুই ছেলেকে পারমানেন্টলি পঙ্গু করার অভিযোগও আছে। আরও একটা খুনের খবর পাওয়া গেছে। মহম্মদ শেরিফ, সেই মধ্যমগ্রামের মস্তান, যে ওর বাড়ির জমি ছাড়ছিল না, তাকেও খুন করেছিল রাহুল। গাড়িচাপা দিয়ে।

জাজ এটাও বলেছেন যে প্রশ্নোত্তরের সময়ও কখনোই রাহুলের উত্তরে অনুতাপের সুর দেখা যায়নি। উলটে খুব ঠান্ডা মাথায় কীভাবে একের পর এক খুন করেছে, তার বিবরণ দিয়ে গেছে।

এরকম একজন অত্যন্ত উচ্চবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যে এত সহজে আরেকজনকে খুন করে ফেলতে পারে, যে অতি সহজে সবরকম প্রমাণ লোপাট করে দিতে পারে, সেরকম একজনকে কোনোদিন বাইরে যেতে দিলে তা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক।

তবে কলকাতা হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে অ্যাপিল করা হবে। আমরা করব।

এত কিছুর পরেও শরণ্যা শেষের দিকে ওকে যেভাবে সাপোর্ট করেছে, তা সত্যি দেখার মতো। এমনকী প্রশ্নোত্তরের সময় একাধিকবার শরণ্যাকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেছে।

তদন্তের সময় রাহুলের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড-আমেরিকা থেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে, পেশ করা হয়েছে। অকাট্য প্রমাণ। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রত্যেকটা খুন রাহুলেরই করা। এত নিখুঁতভাবে প্ল্যান করেছিল যে শরণ্যার পক্ষেও কোনো কিছু ধারণা করা সম্ভব হয়নি। আমিও যেমন ধারণা করতে পারিনি। আমি আর শরণ্যা সঙ্গে ছিলাম বলে এখন এসব রিলেট করতে পেরেছি। একটা সময়ে তদন্তের চাপে সব অপরাধও স্বীকার করে নিয়েছে।

আমার কাছে পুরোটা দুঃস্বপ্নের মতো। জীবনের এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। গত দুই বছরে আমি শুধু আমার সব থেকে প্রিয় বন্ধু হারিয়েছি তা-ই নয়, নিজের উপরে সব বিশ্বাসও হারিয়েছি। যাকে এত আপনার বন্ধু বলে মনে হত, সে যে এত অচেনা হবে, তার মধ্যে যে এরকম এক অন্ধকার মানুষ লুকিয়ে থাকবে, সেটা এখনও ভাবতে পারি না।

আজ ঠিক সেই দিন, যেদিন দু-বছর আগে আমি রাহুলের বাড়ি গিয়ে প্রথম এই কথা জানতে পেরেছিলাম। মাসিমা আর নেই। দশ মাস আগে এসবের মধ্যে মারা গেছেন। একদিক থেকে ভালো। ছেলের এই শাস্তির কথা জেনে যেতে হয়নি। জানলে সহ্য করতে পারতেন না।

আজ ছেলেকে নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলতে যাব, হঠাৎ ফোন এল। উলটোদিকে শরণ্যা। গলা ভারী। বোঝা গেল, এখনও কাঁদছে। গত সপ্তাহে শেষ কথা হয়েছে।

—আজ বিকেলের দিকে একটু সময় আছে?

—আজ বিকেলে অন্য জায়গায় যাওয়ার ছিল। আর্জেন্ট কিছু?

—না, সেরকম নয়। তবে—

—ঠিক আছে। আমি দেখছি।

সন্ধে সাতটার সময় শরণ্যার বাড়িতে এলাম। শরণ্যার মেয়ে রিনি ফোন নিয়ে গেম খেলছিল। এই হয়েছে এখন সব বাচ্চার। আমার ছেলেরও। সব সময় ফোন নিয়ে কিছু একটা করছে। ওদিকে ওর বাবা যে জেলে, তার সামনে আসন্ন মৃত্যু, এসব যেন কিছুই জানে না।

শরণ্যার বাড়িতে কাজের একটা মেয়ে থাকে সারাক্ষণ। তাকে আমার জন্য খাবার করতে বলে শরণ্যা আমার সঙ্গে ড্রয়িং রুমের এককোণে এসে বসল। তাকিয়ে দেখলাম ওর দিকে। চুল উসকোখুসকো। কোর্টে ওর মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করত না। সারাক্ষণ টেনশন। যেন রাহুলের অপমান, কষ্ট ওকে প্রতিমুহূর্ত বিব্রত করছে, কষ্ট দিচ্ছে।

বেশ বুঝতে পারতাম, ও এখনও রাহুলকে কতটা ভালোবাসে। বাইরে অজস্র প্রেসের লোকের ভিড়। গাড়ি থেকে বেরোতেই ওর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ত সাংবাদিকদের আর ক্যামেরাম্যানদের ভিড়।

এরকম মুখরোচক ঘটনা কলকাতার জনতা সাম্প্রতিককালে পায়নি। এমন একজন, যার কর্মকাণ্ড শুধু ভারতে সীমিত নয়, নানান দেশে। একই সঙ্গে এরকম একজন উচ্চশিক্ষিত প্রোফাইলের খুনি কলকাতা দেখেনি যে দেশ-বিদেশের পুলিস ফোর্সকে বোকা বানিয়েছে। এজন্য রাহুলের ভক্তসংখ্যাও কম নয়। বেশ কয়েকটা 'রাহুল ক্রাইম ফ্যান ক্লাব'ও তৈরি হয়েছে। একটা খুব নামী প্ল্যাটফর্মে ওয়েব সিরিজও হতে চলেছে আগামী দিনে রাহুলের কর্মকাণ্ডের উপরে।

ঘটনার কেন্দ্রে শরণ্যার মতো একজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় সুন্দরী মহিলা থাকায় সেটা মিডিয়ার কাছে ঘটনার আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।

এই গত দু-বছর কত ঝড়ঝাপটা গেছে শরণ্যার উপর দিয়ে। রাহুলের এই অপরাধ সামনে আসা, সেজন্য ডিভোর্স, যার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সেই সুরজিতের মৃত্যু।

কিন্তু এখনও ওর মধ্যে সেই অদ্ভুত আকর্ষণ। আজ মনে হল, একটু যেন আবার সেই আগের জৌলুস ফিরে পেয়েছে। তবে এখন ও আর আগের মতো ভালো পোশাক, সাজসজ্জা করে না। আমি আসব জেনেও মুখে সামান্যতম প্রসাধন নেই।

সোফার এককোণে নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে নিয়ে শরণ্যা বলে উঠল, ইন্দ্র, রাহুলকে বাঁচাতেই হবে।

ওর চোখ ছলছল করে উঠল।

—আমরা অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টে অ্যাপিল করব। দেখা যাক, সুপ্রিম কোর্ট যদি অন্য কোনোরকম সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক চেষ্টাই তো করলাম। আর কী-ই বা করার আছে?

শরণ্যা চুপ করে বসে রইল। জানলার দিকে মুখ করে।

তারপরে বলে উঠল, আমার ছোটোবেলাটা খুব অন্যরকম ছিল। আর পাঁচটা বাচ্চার মতো ঠিক সুখী ছিলাম না আমি। খুব ইনসিকিয়োর ফিল করতাম। তার অবশ্য কারণও ছিল। যখন পাঁচ বছর বয়েস, তখন মা মারা যায়। আমার জন্যেই। রাস্তার উলটোদিকে একটা বেলুনওয়ালা দাঁড়িয়ে ছিল, নানান রঙের বেলুন নিয়ে। মা-র হাত ছেড়ে ছুটে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলাম। খেয়াল করিনি যে একটা গাড়ি খুব জোরে আসছিল। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে মা ছুটে আসে, সেই অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। আমার এখন আর স্পষ্ট মনে নেই। তবে এখনও স্বপ্নে বার বার নানানভাবে ওই ঘটনা ধরা দেয়। মনে হয়, রাস্তার ধারে পড়ে আছি। চারদিকে রক্ত। অনেক লোকের ভিড়। চমকে উঠে বসি।

এর কিছুদিন বাদে আমি মামার বাড়ি চলে আসি। ওখানেই মানুষ। বাবা আবার বিয়ে করেন। কেন জানি না বাবা আমাকে পছন্দ করতেন না। হয়তো আমার জন্যে মা-কে হারিয়েছিল, সেজন্যে। আমার সঙ্গে খুব কম যোগাযোগ ছিল বাবার।

চুপ করে রইল শরণ্যা। বলে উঠল, এসব কথা তুমি নিশ্চয়ই জানতে না, ইন্দ্র। আমি আমার মা-র মৃত্যুর জন্য দায়ী। ভাবতে পারো!

—না, তা জানতাম না। রাহুলও বলেনি। কিন্তু একজন পাঁচ বছরের বাচ্চার আর কী দোষ থাকতে পারে এতে? এতে তোমার কোনো অপরাধ ছিল না। এসবই ভাগ্য।

—কিন্তু আমিই ছিলাম ওই মৃত্যুর পিছনে, তা-ই না! আমি যদি বোকার মতো কিছু না লক্ষ করে ওই বেলুন নিতে ছুটে না যেতাম, তাহলে হয়তো আমার মা আজও বেঁচে থাকত। সেজন্য বাড়ির সবাই আমাকে মুখে কিছু না বললেও বাবা অন্তত আমাকে ক্ষমা করেনি। শুধু আমার বিয়েতে এসেছিল। সেরকম কোনো যোগাযোগ রাখেনি তার পরেও।

আমার দিদিমা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু একই সঙ্গে একটা হয়তো লুকোনো রাগ, অভিমান ছিল আমার উপরে, হয়তো ওই একই কারণে। হাজার হোক নিজের মেয়েকে হারানো।

আমি থাকলাম মামার বাড়িতে সবার উপরে বোঝা হয়ে। মামা বাইরে বাইরে থাকত। থাকতাম মামির কাছে। কিন্তু মামির নিজের এক মেয়ে ছিল। কেন জানি না মামি আমাকে একদমই পছন্দ করত না। কখনোই আপনার মনে করত না। খুব বকাবকি, এমনকী সামান্য কারণে মারধরও করত। মনে হয়, আমি ওর নিজের মেয়ে বুনির থেকে অনেক বেশি সুন্দর দেখতে ছিলাম, পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম—এজন্যই হয়তো। কিন্তু সেটা তো আমার হাতে ছিল না। তারপরে একদিন হঠাৎ মামি মারা গেল। গ্যাস থেকে শাড়িতে আগুন লেগে।

—আচ্ছা, তুমি আজ হঠাৎ এসব বলছ কেন? কী একটা দরকারি বিষয় আছে বলছিলে!

আমি সত্যি একটু বিরক্ত হয়েই বলে উঠলাম। এসব গল্প শোনার জন্য আমি নিশ্চয়ই আজ ব্যাডমিন্টন খেলা ছেড়ে এখানে ছুটে আসিনি।

ও ফের বলে উঠল, কারণ আছে। যেটা বলতে যাচ্ছি, তার সঙ্গে এটা কানেক্টেড। সেজন্যেই বলছি। মামা বুঝতে পারল, একা ওর পক্ষে আমাকে আর ওর মেয়েকে মানুষ করা আর সম্ভব হবে না। দিদিমারও অনেক বয়স হয়েছিল। খুব কম বয়সে তখন মামা আমার বিয়ে দিয়ে দেয়। রাহুলের সঙ্গে। আমার বয়স তখন মোটে আঠেরো। বুঝতেই পারছ, আমার বয়সে কেউ সে সময়ে বিয়ে করত না। কিন্তু আমার তার জন্য কোনো অসুবিধে হয়নি। প্রথমবার মনে হল, ভালোবাসা কী তা যেন বুঝতে পারলাম। হঠাৎ যেন জীবনটা পালটে গেল। মনে হল যেন এক স্বর্গরাজ্যের সন্ধান পেয়ে গেছি।

আমার শ্বশুর-শাশুড়িও খুব ভালো ছিল। আমাকে নিজেদের মেয়ের মতো দেখত। হঠাৎ যেন এক ডুবন্ত মানুষ খড়কুটোর মতো কিছু একটা আঁকড়ে ধরে জীবন ফিরে পেল। আর রাহুল! রাহুল আমাকে খুব ভালোবাসত। এখনও বাসে। আমিও তা-ই।

—জানি। সে তোমাদের দেখলেই বোঝা যেত, কিন্তু ওর মধ্যে যে এরকম একজন জঘন্য অপরাধী লুকিয়ে আছে, সেটা কীভাবে জানবে!

আমার দিকে এবারে রহস্যজনকভাবে তাকাল শরণ্যা। চারপাশ একবার দেখে নিয়ে বলে উঠল,—ইন্দ্র, রাহুল যে খুনগুলো করেছে, সেগুলো অন্য কারো করার সুযোগ ছিল কি?

—না, সেসব তো খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে, আর কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তুমি কি পলের স্ত্রী-র হত্যার ঘটনার ক্ষেত্রে পলকে বা ওর মেয়েকে এখনও খুনি বলছ? জেসিকার ক্ষেত্রে অন্য কেউ? কিন্তু সেটা তো প্রমাণিত হয়নি! রাহুলও স্বীকার করে নিয়েছে।

—না, ওদের কথা বলছি না। এসব খুনে আরেকজন কমন ফ্যাক্টরও ছিল, তা-ই না?

—কী বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

—আচ্ছা, আমার পক্ষে কি সম্ভব ছিল না? আমিও তো সেসব জায়গাতে রাহুলের সঙ্গেই ছিলাম। হয়তো আমারও মোটিভ ছিল।

হঠাৎ ওর এই প্রশ্ন আমি প্রথমে বুঝতে না পেরে ফের বলে উঠলাম, কী বলছ?

—বলছি, আমার পক্ষেও এই খুনগুলো করা সম্ভব ছিল। —একটু থেমে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শরণ্যা ফের বলে উঠল—সত্যি কথা বলতে কী, আমিই করেছি। কারণ রাহুলের অপমান আমি সহ্য করতে পারি না। সেজন্য পল ও পলের বউকে মারতে চেয়েছিলাম।

এই মন্তব্যে হঠাৎ যেন আমার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল।

—কী বলছ!

—ঠিকই বলছি, ইন্দ্র। সব ক-টা খুনই আমার। রাহুলের কোনোদিনই কোনো ইনভলভমেন্ট ছিল না। ও জানতই না এসব কিছু।

—কিন্তু তুমি কেন এসব খুন করবে?

—রাহুল ছিল আমার সবকিছু। সবকিছু। এভরিথিং। সেজন্য যখনই কেউ রাহুলকে আঘাত করত বা আমার মনে হত, রাহুলকে কেউ আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছে, তখনই আমি তার উপর প্রতিশোধ নিতাম। জেসিকাকে রাহুল ভালোবাসতে শুরু করেছিল। তুমিও সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলে।

—কী সব বলছ? এসব বানিয়ে বলছ নিশ্চয়ই।

—ঠিকই বলছি। তুমি ভুলে গেছ। আমিও মেন্সার মেম্বার ছিলাম। ছোটোবেলা থেকেই আমার আই. কিউ. ছিল অন্য সবার থেকে অনেক বেশি। সেজন্য এসব নিখুঁতভাবে প্ল্যান করতেও আমার অসুবিধে হয়নি। নিখুঁতভাবে প্ল্যান করতে আমার খুব ভালো লাগত। কী কী হতে পারে ভেবে নিয়ে প্রত্যেকটা চাল আগে থেকে ভাবা, আমার উপরে যাতে কোনোরকম সন্দেহ না হয়, সেজন্য কাকে কাকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে হবে, সেটা ভেবে এগোনো, এসবই তারই অংশ।

রাহুল যখন তিন বছর আগে জানতে পারল আমার অপরাধের কথা, তখন ও আমাকে পুলিশের কাছে সারেন্ডার করতে বলল। সব অপরাধ স্বীকার করে নিতে বলল। অবশ্য মুখে সেটা বললেও আমার মনে হয়, ওর মধ্যে এ ব্যাপারে একটা দ্বিধা ছিল। কারণ ও জানত, আমার কী শাস্তি হতে পারে। একই সঙ্গে এর জন্যে আমাকে ও দূরে সরিয়ে দিয়েছিল মন থেকে। ভালোবাসার সম্পর্কটা একদম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমার তখনই মনে হল, দরকার হলে আমি যাতে ওকে অপরাধী হিসেবে সামনে নিয়ে আসতে পাবি, সেরকম একটা কিছু ভাবতে হবে। সেজন্যই আমিও তোমার মনে ওর প্রতি সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম, যাতে এরকম কোনো সময় এলে তোমাকে পাশে পাওয়া যায়। গার্গীকে ও আরও অন্যদের পাশে পাওয়া যায়। আমার ধারণা যে একদম মিলে যাবে, সেটা অবশ্য ভাবতে পারিনি।

কিন্তু বিশ্বাস করো, এসবই করেছিলাম, যাতে ও পুলিশের কাছে আমার অপরাধ কোনোদিন প্রকাশ না করে। প্রকাশ করতে ভয় পায়। এজন্য নয় যে ওকে অপরাধী সাব্যস্ত করার কোনো ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল। সুরজিৎকে আমার বিয়ে করার কোন ইচ্ছে ছিল না। ওকে কোনোদিন ভালোবাসিনি। কিন্তু সুরজিৎ বিয়ের জন্য খুব জোরাজুরি করায় বাধ্য হয়ে ওকে আমাকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল। একটু যেন রাহুলের উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই সেদিন রাহুলকে ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে ওকে এ ব্যাপারে ভয় দেখানো যায়।

একটু থামল শরণ্যা। ফের আস্তে আস্তে বলে উঠল, আমার মাথার ঠিক ছিল না। আসলে ভালোবাসা খুব অদ্ভুত এক জিনিস। যেকোনোভাবে, এমনকী ভয় দেখিয়ে এ ব্যাপারে ব্ল্যাকমেল করে যাতে রাহুলের ভালোবাসা ফিরে পাওয়া যায়, সে চেষ্টা আমি করেছি। একবার শুধু ওকে বলতে হত, যে ও আমাকে ক্ষমা করেছে, আমাকে ভালোবাসে। আমি সব প্রমাণ ফের লোপাট করে ওকে নিরপরাধ প্রমাণ করে দিতাম। শেষে ও সেটা মুখে বলেনি। কিন্তু প্রমাণ করে গেছে যে ও আমাকে সত্যি ভালোবাসে।

আমাকে বাঁচাতে গিয়ে যে ও সব অপরাধ নিজে স্বীকার করে নেবে, একবারও আমার উপরে সামান্যতম সন্দেহ হতে দেবে না, এটা আমার ধারণার বাইরে ছিল।

একটু উদাসী হয়ে গেল শরণ্যা। আমি আর ওর চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। অন্যদিকে তাকিয়ে ও বলে উঠল, রাহুল কোনোদিন আন্দাজও করতে পারেনি যে আমি এসবের পিছনে আছি। এতটাই সাবধানে করতাম। কিন্তু জেসিকার খুনের পরে রাহুল হয়তো কিছুটা সন্দেহ করেছিল, তবু ভাবতে পারেনি। তারপর তোমার মতো ওর হাতে একদিন এল এসব লুকোনো ছবি। সেখানে মহম্মদ শেরিফের ছবিও ছিল, যাকে তার কিছুদিন আগেই আমি খুন করেছি। মহম্মদ শেরিফ কিছুতেই আমাদের জমিতে বাড়ি করতে দিত না। ওকে সবাই যমের মতো ভয় পেত।

বেশ কিছু কারণে রাহুল সন্দেহ করছিল যে ওই খুনে, ওই গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে আমার হাত আছে। তারপরে ওইসব ছবি, ওই খাম একদিন ওর হাতে হঠাৎ করে এল। ও নিশ্চিত হয়ে যায়। বুঝতে পারে শুধু ওটাই নয়, আগের ওই খুনগুলোও আমার হাতে।

আমার ওই ছবিগুলো লুকিয়ে রেখে দেওয়া ঠিক হয়নি। কেন জানি না ওসব ছবি আমি ফেলতে পারিনি। মনে হত ওটাই আমার সাফল্যের চিহ্ন, আমার পাওয়া ট্রফি। এটাও তো একরকম শিল্প। যাকে খুন করা হচ্ছে, তাকে পরে দেখলে মনে হত যেন আমার এই খুন শিল্পের স্বীকৃতি পেয়েছে। আনন্দ পেতাম। যাকে মারব ঠিক করতাম, ওইরকম সিম্বল এঁকে আগে থেকে একটা লুকোনো স্ক্র্যাপবুকে রেখে দিতাম। ওই সিম্বলটা মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে ব্যবহার করা হত কারো অনিষ্ট চাওয়ার জন্য।

এসব দেখে রাহুল জানল যে আমিই এসব খুনের পিছনে। এমনকী এটাও জানতে পারল যে আমার মামির মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিল না। গ্যাস থেকে আগুন লেগে মামির মৃত্যু, সেখানেও ছিল আমার নিখুঁত প্ল্যান।

—কী সব বলছ!

—ভেবে দেখো ইন্দ্র। প্রত্যেকটা খুন ভেবে দেখো। অন্য কারোর হত্যা করার সুযোগ ছিল? হয় রাহুল, নয় আমার। এমনকী আমার সুযোগ ছিল আরও বেশি। ধরো পলের কেসটাই।

—কোকের বোতলে থ্যালিয়াম, তা-ই তো?

—হ্যাঁ। আচ্ছা, রাহুলকে কখনো বাড়ির কোনো কাজ করতে দেখেছ? অন্যদিকে তুমি নিশ্চয়ই জানো, বাড়ির অনেক জিনিস আমি নিজে হাতে বানাই ছোটোখাটো সব ফেলে-দেওয়া জিনিস দিয়ে, ফেলে-দেওয়া কোকের বোতল দিয়ে। কোকের বোতলের তলায় খুব ছোটো ফুটো করে আমিই ওতে সুতো দিয়ে থ্যালিয়াম ঢোকাই। পলের মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করি। ওদের বাড়িতে যাই। ওই বোতলগুলো আমিই ওদের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম।

আবার বলে উঠল শরণ্যা, রাহুল যখন তিন বছর আগে এসব প্রথম জানল, ওকে অনেক বোঝালাম, যে এসব ওর ভালোর জন্যেই। কিন্তু ও শুনতে চাইল না। ও চাইল আমার থেকে দূরে সরে যেতে। সেসব নিয়ে মনোমালিন্য এত বেড়ে গিয়েছিল যে আমি বাধ্য হয়ে ছেড়ে চলে আসি। ভেবেছিলাম, ও আমাকে আর ভালোবাসে না। ও পুলিশে সব জানিয়ে দেবে। সেজন্য আমি তারই প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভুল ভেবেছিলাম।

আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল শরণ্যা। একটা মোহময়ী দৃষ্টির মধ্যে যে এতটা শীতলতা থাকতে পারে, প্রথমবার ওর চোখে চোখ পড়তে বুঝলাম। চোখ সরিয়ে নিলাম।

—কিন্তু রাহুল কেন একবারও এসব কথা জেনেও বলল না! নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করল না?

—সেটাই তো! তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে ও এখনও আমাকে সত্যি ভালোবাসে। আমার জন্যে নিজের মৃত্যুস্বীকারেও ওর কোনো আপত্তি নেই। এমন একজনকে কীভাবে মরতে দিই, ইন্দ্র? আমাকে ওকে বাঁচাতেই হবে।

—কিন্তু কে আর তোমাকে বিশ্বাস করবে? এত কিছুর পরে! যেভাবে ও.সি. মোহিত সরকার ওয়াটারটাইট কেস বানিয়েছে রাহুলের বিরুদ্ধে, কেউ তোমার কথা বিশ্বাস করবে না। ভাববে, তুমি রাহুলকে খুব ভালোবাসো বলে, মিথ্যে কথা বলে ওকে বাঁচানোর চেষ্টা করছ।

একটু মুচকি হেসে উঠল শরণ্যা।

—বিশ্বাস করবে। কারণ ও.সি. মোহিত সরকার আর নেই। কয়েক ঘণ্টা আগে ওর মৃত্যু হয়েছে। থ্যালিয়াম বিষে। আমি ইচ্ছে করে আমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেখে এসেছি মোহিত সরকারের কফির কাপে। লোকটা ভালো ছিল না। রাহুল জেলে চলে যাওয়ার পর থেকে আমাকে অনেক অশালীন প্রস্তাব দিত। দু-সপ্তাহ আগে আমার বাড়িতে এসে রিনির সামনে আমার সঙ্গে অসভ্যতা করারও চেষ্টা করে, আমার গায়ে হাত দেয়, জোর করে বিছানায় নিয়ে যেতে চায়। তখনই ঠিক করি, ওকেও মারতে হবে। একই সঙ্গে খুনের ধরন বলে দেবে যে খুনি আমি। রাহুল সম্পূর্ণ নির্দোষ।

আজ মোহিত সরকার আমাকে নিরিবিলিতে পাওয়ার জন্যে একটা ফাইভ স্টার হোটেলে ডেকেছিল। সেখানে সেই হোটেলের রুমে সে কাজ সেরে এসেছি।

আমি কোথা থেকে এসব থ্যালিয়াম জোগাড় করি, সেটাও জানিয়ে দেব। আচ্ছা, ভেবে দেখো, আমরা অনেক কিছুরই বেসিকস ভুলে যাই। আমি চাকরি করিনি বটে, কিন্তু আমি একটা নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে যে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি, সেটা সবাই দিব্যি ভুলে গেছে। তুমিও।

এবারে জেসিকার কথায় আসি। জেসিকা রাহুলকে খুব ভালোবাসত, রাহুলও ওকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল। তখনই ঠিক করি, জেসিকাকে মারতে হবে। জেসিকার মাথার স্কালের পিছনটা ফরেনসিকস এক্সপার্টরা ভালো করে দেখলে বুঝতে পারত, জেসিকাকে ভারী কিছু দিয়ে পিছনদিক দিয়ে মারা হয়েছে। যে মেরেছে, সে বাঁহাতি। রাহুল বাঁহাতি নয়, আমি বাঁহাতি। তা ছাড়া রাহুলের তিনবার মারার দরকার পড়ত না।

এ ছাড়াও মহম্মদ শেরিফের মৃত্যুর সময়ে রাহুল কলকাতায় ছিল না। আমি সেটাও প্রমাণ করে দেব।

—কী সব বলছ শরণ্যা?— আমার গলায় অবিশ্বাস ও ভয়। গলা কেঁপে যায়।

—আমার আর মরতে কোনো ভয় নেই, ইন্দ্র। আমি যে জেনে গেছি, রাহুল আমাকে এখনও সব থেকে ভালোবাসে। নিজের প্রাণের থেকেও ভালোবাসে। সেজন্যেই এত সহজে ও সব অপরাধ মেনে নিয়েছে।

ফের বলে ওঠে, তুমি আর আমি মিলে নিশ্চয়ই আবার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারব রাহুলকে। এটা আমার দায়িত্ব। আমি জানি, আমি পারব। পারতেই হবে।

আমার চোখে ভয় দেখে ও মুচকি হেসে বলে উঠল, ভয় পেয়ো না ইন্দ্র। আমি সিরিয়াল কিলার নই। কারণ ছাড়া কাউকে মারি না। আর তোমার মতো একজন ভালোমানুষ বন্ধুকে তো কখনোই নয়। আমি শুধু ভালোবাসাকে কোনোদিন হারাতে চাইনি। তার জন্য যদি আরও দু-একটা খুন করতে হয়, আবারও করব।

দেখো, আমি রাহুলকে ফিরে পাবই। ওর ভালোবাসা আমাকে ফিরে পেতেই হবে। তারপরে আমার যা হওয়ার তা-ই হবে। তুমি আমার শাস্তির কথা ভাবছ? যদি মৃত্যুদণ্ড হয়! সে তো আমার পাঁচ বছরেই হয়েছিল।

১ মে ২০২২

কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড

অধ্যায় ১৬ / ১৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%