অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
১৮ এপ্রিল
দিন ঠিক কত ঘণ্টায় হয়? একটা মাসে ঠিক কতদিন থাকে? উত্তরটা ব্যক্তিবিশেষের উপরে নির্ভর করে আলাদা হওয়া উচিত।
ঠিক যেমন আজকাল আমার মনে হয়, দিন যেন শেষই হয় না।
একটা বালিঘড়ির বালি পড়া যেন মাঝপথে থেমে গেছে। সময়কে একটা খাঁচার পাখির মতো বন্দি করে রাখলে যেরকম হয়, ঠিক তেমনই। সবকিছু থেমে গেছে।
আর তখন প্রত্যেকটা থেমে-থাকা মুহূর্ত আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি ব্যর্থ, আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
আগে এরকম মনে হত না।
আমি কোনোদিন পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম না। বলা যায় অতি সাধারণ। সেরকম হলে যা হয়, গ্র্যাজুয়েশন করে চাকরির অপেক্ষায় বসে আছি। প্রতিবছর নানান পরীক্ষা দিই। কিন্তু সাফল্য আর আসে না।
আগে প্রত্যেকবার রেজাল্ট বেরোনোর পরে বাবা খুব আশা করে জিজ্ঞেস করত। এখন দেখি, আমি উত্তর দিতে যতটা লজ্জা পাই, বাবা তার থেকে বেশি লজ্জা পায় এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে।
তবে আমি আশা না হারিয়ে আবার চেষ্টা করি। যেরকম আরও অনেকে করে। বাবার ম্রিয়মাণ মুদির দোকানে বসে আরও ম্রিয়মাণ আশা নিয়ে আবার পরের বছরের জন্য পড়াশোনা শুরু করি।
মনে হয়, এই বার বার ব্যর্থতা এখন যেন আমার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। লটারির টিকিট কাটার পরে যেমন না-পাওয়াটাই অভ্যেস হয়ে দাঁড়ায়।
বন্ধু আমার সেভাবে কেউ নেই। ছোটোবেলা থেকেই আমি একা একা থাকতে ভালোবাসতাম। একজনই বন্ধু ছিল। খুব বন্ধু। কিন্তু সে-ও হারিয়ে গেল হঠাৎ করে। রাজু। রাজুর কথা তো তোমাদের আগেই বলেছি।

ছোটোবেলা থেকে আমরা দুজনে একসঙ্গে সব জায়গায় যেতাম। ও ছিল ঠিক আমার মতো। আমার মতো একা। আমার মতো চুপচাপ। স্কুলের পরে আমরা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পুকুরধারে গিয়ে বসতাম। কোনোদিন বা যেতাম বটতলার মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে।
ওর একটা অদ্ভুত অন্য জগৎ ছিল। সেই জগতে ও হারিয়ে যেত। আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে-থাকা গাছগাছালি, পাখপাখালিকে যেভাবে ও দেখতে পেত, আমি কখনো সেভাবে দেখতে পেতাম না। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা রোদ্দুরের নকশা ও অবাক হয়ে দেখত। ওর চোখে গাছের পাতায় বিছিয়ে-রাখা মাকড়সার জালে জলের ফোঁটা মুক্তো হয়ে উঠত। বাতাসে তিরতির করে কাঁপতে-থাকা পাতাগুলো মোৎজার্টের মতো সুরকার হয়ে উঠত। মনে হত ও যেন কোনো ম্যাজিশিয়ানের শো মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে। ওর সঙ্গে থাকলে ওর চোখেই অন্য অজানা জগৎটাকে দেখতে পেতাম।
ওর বাবা-মা ছিল না। কিছু দূরে একটা অনাথ আশ্রমে থাকত। অন্যদের মুখে শুনেছিলাম, ওর যখন দিন দশেক বয়স—কে যেন ওকে গ্রামের চার্চের বাইরে কাপড়ে মুড়ে রেখে গিয়েছিল। ওখানকার ফাদার মোজেস ওকে কুড়িয়ে এনে অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেন।
ওখানে কাছাকাছি স্কুল না-থাকায় আমাদের স্কুলে অনেকটা পথ হেঁটে পড়তে আসত। সব সময় যেন এক অজানা আনন্দে বিভোর হয়ে থাকত। মাঝেমধ্যে কী যেন দেখে নিজের মনে বিড়বিড় করে হেসে বলে উঠত, ভারী মজা। মনে হত, ও যেন পাখিদের মধ্যে কথাও বোঝে। শুনতে পায় চারপাশের প্রকৃতির মধ্যে মিশে-থাকা সেসব শব্দ, যা আমরা কেউ শুনতে পাই না।
ও বলত, আমার একটাই ঈশ্বর। সেটা হল প্রকৃতি, সেজন্য তাকে বোঝা এত শক্ত। কিন্তু জরুরিও। দেখ, যারা ওর কথা আর গান শুনতে চায়, তাদের জন্য উনি যেন সব সুরের আয়োজন চারদিকে করে রেখেছেন। সামনের দুটো গাছ দেখিয়ে বলে উঠত, কে বলতে পারে, ওই যে দুই গাছের মধ্যে দিয়ে যে পথ চলে গেছে, সেটাই হয়তো গিয়ে পৌঁছেছে অন্য কোনো ছায়াপথে।
বলে বিভোর হয়ে আবার শুনত।
এ ছাড়া ওর আরেক অসামান্য ক্ষমতা ছিল। ও যেকোনো সংকেত উদ্ধার করতে পারত। ওর কাছ থেকেই শিখেছিলাম সাংকেতিক বার্তায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতে। আমাদের মধ্যের সে কথা আমি আর ও ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না।
ও বলেছিল, ওর আর আমার মধ্যে এই সংকেতের ভাষা হবে শান্তির ভাষা। যদি কোনোদিন খারাপ দিন আসে, ভালো লোকেদের উপর অন্যায়-অত্যাচার হয়, তখন আমাদের এই ভাষার দরকার হবে।
এভাবেই একদিন ও উদ্ধার করতে পারল ভয়নিচের ম্যানাস্ক্রিপ্টের থেকে এক অজানা ভাষা। এটা নাকি ইংল্যান্ডের এক জিনিয়াস রজার বেকন লিখেছিলেন ১২০০ সাল নাগাদ। এত বছর ধরে সেই সাংকেতিক ভাষায় লেখা বই এর অর্থ কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। কিন্তু ও পেরেছিল।
পেরেছিল সেই বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে-থাকা ভাষা উদ্ধার করতে। সেই ভাষাই ওকে শেখাল পিঁপড়েদের কথা বুঝতে, ওদের সঙ্গে কথা বলতে। ও-ই বলেছিল যে-এই ভাষায় এক পিঁপড়ে আরেকটার সঙ্গে কথা বলে। এই ভাষা লক্ষ লক্ষ পিঁপড়েকে সংঘবদ্ধ করতে শেখায়। শুধু পিঁপড়ে কেন, মৌমাছি, ভিমরুল এদেরও ভাষা নাকি একই রকম।
কিন্তু এসব করতে গিয়ে ও পড়াশোনা ছেড়ে দিল। অথচ ও ছিল ক্লাসের সেরা ছাত্র। বরাবর ফাস্ট হত। কিন্তু সেসব ছেড়ে হারিয়ে গেল সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে। তারপরে একদিন হঠাৎ করে আমাদের গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথায় চলে গেল অনেক খুঁজেছি তারপরে, ওর অনাথ আশ্রমে, আশপাশের গ্রামে, কোথাও খুঁজে পাইনি।
ও জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল আমাকে। সেজন্য ওর চলে যাওয়ার পরে সে স্বপ্নই আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। বুঝলাম আমার চারদিকের বাস্তব অনেক কঠিন। বিশেষ করে আমার মতো একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য, যার পা দুর্বল, পোলিও আক্রান্ত। যে সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারে না।
তারপর থেকে রাজুর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। মাঝে দশ বছর কেটে গেছে।
জানি না রাজুর কোনো বিপদ হয়েছে কি না। ও কী করে যে আমাকে ভুলে গেল এটা আমার খুব অবাক লাগে, রাগও হয়।
এই বিপদের সময়ে ও যদি আমার পাশে থাকত, তাহলে আমার এতটা অসহায় লাগত না। এত ভয়ও লাগত না।
১৫ মে
এবারে গরম আরও বেশি পড়েছে। তবে আমাদের গ্রামে তার জন্য খুব অসুবিধে হয় না। চারদিকে বড়ো বড়ো গাছ। গাছের ছাওয়ায় গিয়ে বসলেই তখন আর গরম লাগে না। সেরকমই আজ বাসুদার পুকুরের ধারে একটা গাছের তলায় অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। ঠিক যেমন আমি আর রাজু বসে থাকতাম। চোখ বন্ধ করে পাতার গানের সুর শুনলাম। কত অজানা-অচেনা শব্দ ধরা পড়ল। কত পাখির ডাক। বেশ খানিকক্ষণ বসার পরে মনটা একটু স্থির হল।
আসলে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। এত কিছুর চাপ নেওয়া খুব শক্ত।
কিছুদিন হল, বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে মাঝেমধ্যে জ্বর আসত। দু-সপ্তাহ আগে জানা গেছে ব্লাড ক্যান্সার। লিউকেমিয়া। তবে শুরুর দিক। ভালো চিকিৎসা হলে ঠিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কী করব, কিচ্ছু বুঝছি না। কোনো একটা ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু আমাদের অত টাকা কোথায়? মা বহু বছর আগে মারা গেছে। যখন আমি স্কুলে পড়তাম। এসব আমাকেই করতে হবে শহরের হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে। বাবা অবশ্য যেতে চায় না। জানে চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার। সে টাকা আমাদের নেই।
আমাদের ছোটো মুদির দোকান থেকে খুবই কম আয় হয়। আগে যা হত, এখন আরও কমে গেছে। আসলে এখানে এখন দুটো বড়ো বড়ো স্টোর হয়েছে। তাদের স্টক অনেক বেশি। আমাদের দোকানে অনেক কিছুই থাকে না। তার মধ্যে এক নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে। সমস্যা শুরু হয়েছিল গত বেশ কয়েক বছর ধরেই। তবে এখন সেটা ভালো করে বোঝা যাচ্ছে।
আমাদের এই গ্রাম বাংলাদেশের থেকে বেশি দূরে নয়। অনেক নতুন নতুন লোক তাই মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, যারা ওপার থেকে আসে। থেকেও যায়। বেশ কয়েক বছর ধরেই বেশ কিছু খারাপ লোক আস্তানা গেড়েছিল এই গ্রামে। রাজনৈতিক মদতে তারা এখন বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
আমাদের গ্রামে একটা শিশুদের শিক্ষা ও বিকাশকেন্দ্র ছিল। বহু বছরের। হঠাৎ করে সেটা ভেঙে এখন ওখানে একটা মদের দোকান হয়েছে। বাবার মতো কয়েকজন সেটা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল এখানকার পঞ্চায়েতে। তারপর থেকে ওরা আমাদের উপরে খেপে গেছে।
বাবা এমনিতে বেশ নিরীহ গোবেচারা মানুষ। কিন্তু একই সঙ্গে সততার প্রতি এমন একটা গভীর টান আছে যে কোনোরকম অন্যায় সহ্য করে না। প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করে না। সে প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক-না কেন!
তবে এদের বিরুদ্ধে আমাদের মতো সাধারণ লোকেদের কিছুই করার থাকে না। উলটে এখন আমাদের এখানে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরে ওরা দু'দিন দোকানে এসেও ভয় দেখিয়ে অপমান করে গেছে। আজও এসেছিল কয়েকজন মিলে। আমাদের দোকানে রাখা বিস্কুটের বাক্সটা টেনে নিয়ে বেশ কয়েকটা খেয়ে বাকি বিস্কুটগুলো সামনের রাস্তায় ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।
বাবা দেখি, চুপ করে বসে আছে। চলে যাওয়ার পরেও বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল না। তারপরে বলে উঠল, এখন আর সৎ লোকদের বাঁচার কোনো উপায় নেই। আমরা মনে হয় না এই গ্রামে বেশিদিন থাকতে পারব।
২২ মে
সামনে এখন অনেক জল। আমার দিকে আরও এগিয়ে আসছে। একটু একটু করে কোমরের উপরে উঠছে। জোয়ার আসছে। আমি সাঁতার ভালো জানি না বলে আমার যে ভয়টা চিরকাল ছিল, সেটা এখন আর নেই।
যখন কেউ সবকিছু হারিয়ে ফেলে, তখন তার নতুন করে হারানোর কোনো ভয় থাকে না। আমার এখন ঠিক সেরকম অবস্থা।
এর জন্য আমি কাউকে দায়ী করি না। এর জন্য আমিই দায়ী। এর জন্যে দায়ী আমার দুর্বল পা, স্বাভাবিক বুদ্ধি—কমন সেন্সের অভাব।
বাবার শরীর গত কয়েকদিনে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল। সেটা নিয়েই গত পরশু পাশের শহরের হাসপাতালে এসেছিলাম বাবার সব টেস্ট রিপোর্ট আর ডাক্তারের চিঠি নিয়ে। কিন্তু ওরা ভরতি নিল না। কারণ ওরা জানে, আমরা চিকিৎসার টাকা দিতে পারব না।
কিন্তু চিকিৎসা কিছু একটা করতেই হবে। বাড়িতে, ব্যাঙ্কে সব মিলিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় হল। সেটা নিয়েই আজ এসেছিলাম। কিন্তু ওরা দু-লক্ষ টাকার কম ডিপোজিট নিয়ে ভরতি করবে না। অনেক অনুরোধেও রাজি হল না।
বেরিয়ে আসব, গেটের কাছে দেখি, হাসপাতালের পোশাকে দুজন কর্মচারী দাঁড়িয়ে আছে। আমার কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে তাকিয়ে ওরা হয়তো আমার অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরেছে।
আমার সব কথা ওরা ধৈর্য ধরে শুনল। তারপরে একজন বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, কেন হবে না! এত বড়ো অন্যায়। সবার ঠিক চিকিৎসার অধিকার আছে। ভরতি করতেই হবে।
ঠিক এটাই আমি বলতে চাইছিলাম।
বলল, হাসপাতালের প্রধানের সঙ্গে কথা বলবে, যাতে আমার বাবাকে ভরতি করা যায়। বলে আমার থেকে পুরো টাকাটা চেয়ে নিয়ে নিল। তারপরে ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে ওরা দুজনে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকল।
কিন্তু সেই যে ঢুকল, দুজনেই দেখি, আর ফেরে না। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরে আবার রিসেপশনে গিয়ে কথা বললাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম পুরোটাই লোক-ঠকানো। এরকম ঘটনা আগেও হয়েছে। কিন্তু তাহলে কী করে এরা হাসপাতালের মধ্যেই হাসপাতালের কর্মচারীদের পোশাকে ঘুরছিল, বুঝলাম না। চেহারা-মুখের বর্ণনা দেওয়ার পরেও ওরা কেউ চিনতে পারল না। অথচ ওরা তো এখানেই ছিল। বুঝলাম, কিছুই করা যাবে না।
আমার শরীর খুব খারাপ লাগছিল। তাহলে কি আমার বোকামিতে বাবাকে ভরতি করার যে সামান্য সম্ভাবনা ছিল, তাও আর সম্ভব হবে না? তা ছাড়া দোকান চালানোর জন্য এরপরে ধার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর আমি বা আমার বাবা—আমরা কেউ কোনোদিন লোকের কাছে ধার চাওয়ার কথা ভাবতেও পারি না। এখন ঠিক করে নিয়েছি, কী করতে হবে। আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না। সে জন্যে এখানে এসেছি। পাশের নদীতে।
জল বাড়ছে। আমার দিকে এগিয়ে আসছে একটা বড়ো জলস্রোত, বড় ঢেউ এগিয়ে আসছে আমার দিকে। হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই মনে হল, পায়ের তলার মাটি যেন হারিয়ে গেছে। দূর থেকে কিছু লোকের চিৎকার কানে এলে। আমি বুঝলাম, আমি জলের তলায় একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছি। হাত-পা ছুড়ে ভেসে থাকার খানিকক্ষণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু জলের স্রোত আমাকে তখন আরও গভীর জলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আরও দূরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন বুঝছি, এটা আমি চাইনি। বাবা কী করবে আমার মৃত্যুর খবর পেলে? মুহূর্তের ভুলে এরকম ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছিলাম। প্রাণপণ চেষ্টা করলাম হাত-পা ছুড়ে ঘাটের দিকে ফেরার। কিন্তু যেন আরও দূরে সরে যাচ্ছি ঘাটের থেকে। একই সঙ্গে আমার পুরো শরীর এখন জলের তলায়। মাথা ডুবে যাওয়ায় নাকে-মুখে জল ঢুকছে। একটু একটু করে যেন জ্ঞান হারাচ্ছি আমি। সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমার চেতনা, আমার চেনাজানা পৃথিবী। মুছে যাচ্ছে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের রেখাগুলো।
মনে হল আমি যেন মারা যাচ্ছি। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। যেন আমার মতো সুখী মানুষ আর কেউ নেই। কোনো চিন্তা নেই, কোনো ভাবনা নেই। কী অপূর্ব এক অপার্থিব শান্তি। মনে হল, একটা অন্ধকার টানেল দিয়ে কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছি। তারপরে হঠাৎ মুখের উপরে পড়ল উজ্জ্বল এক আলো। এত উষ্ণতা মাখা সে উজ্বল আলো যে মনে হল, এ আলোয় আমি চিরকাল থাকতে পারি।
তারিখ জানি না
এটা কোথায়? আমি একটা সমুদ্রের ধারে বসে আছি। পায়ের কাছে হালকা সামান্য উষ্ণ জলের ঢেউ এসে মিশছে। চারদিকে মিহি সাদা বালি। আমি কোনোদিন সমুদ্র দেখিনি। একেই কি সমুদ্রতট বলে?
এরকম দেখেছি শুধু সিনেমায়। অনেক ভিডিয়োতে। অভাবের সংসারে কখনো কোনোদিন যাওয়া হয়নি।
মনে আছে, একবার বাবা পুরী যাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু শেষে কী কারণে যেন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
এখানে আমি এলাম কী করে?
জলে ভেসে কি আমি নদীর অন্য ধারে গিয়ে উঠেছি? কিন্তু সামনে এটা তো নদী নয়। তাহলে অন্যদিক দেখা যেত। সামনে যদ্দূর দেখা যাচ্ছে শুধু জল আর জল। এত সমুদ্র!
চেনা কোনো জায়গার সঙ্গে এর মিল খুঁজে পেলাম না।
মাথার উপরের আকাশ ঘন নীল। শুধু ছেঁড়া কিছু সাদা মেঘ ভাসছে।
উঠে দাঁড়ালাম। পা যেন মিহি বালির মধ্যে ডুবে আছে। কী আরাম! আমাদের গ্রামের মতো এখানে গরম নেই। মিষ্টি হাওয়া বইছে।
এটা কি কোনো দ্বীপ? সমুদ্রতট দিয়ে কিছুটা হাঁটার পর দ্বীপের ভিতরদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুটা হাঁটার পর দেখতে পেলাম সমুদ্রের ধার দিয়ে পর পর কিছু বাড়ি। সব এক ধরনের। কিন্তু বাড়ির রংগুলো আলাদা আলাদা, লাল, নীল, হলুদ, সবুজ— কত রঙের। কী সুন্দর সুন্দর দোতলা বাড়ি। আমাদের গ্রামের পল্টুদার বাগানবাড়ি যেরকম, সেরকম!
প্রত্যেকটা বাড়ি ঘিরে পাইনের বন। তা ছাড়া বট, অশ্বত্থ, নারকেল, খেজুর গাছও আছে। কিন্তু আশপাশে কোনো লোক দেখতে পেলাম না।
একটা বাড়ির দরজা দেখি খোলা। কেউ আছে কি বাড়িতে! জিজ্ঞেস করতে এগিয়ে গেলাম। অবাক হলাম। বাড়ির দরজা হাটখোলা। কিন্তু ভেতরে কোনো লোক নেই।
ঢুকেই সামনে একটা বড়ো ঘর পড়ল।
দেখি একটা টেবিলের উপরে নানান খাবার সাজানো। তার মধ্যে অনেকগুলোই আমার বেশ পছন্দের খাবার। লুচি, মাংস, কাটলেট।
খুব খিদে পেয়েছিল। সারাদিন শহরে ঘুরেছি। কিছু খাওয়া হয়নি। সকালে শুধু মুড়ি খেয়ে বেরিয়েছিলাম।
তা ছাড়া এরকম চমৎকার চিংড়ির কাটলেট আগে কোনোদিন খাইনি। এমন লুচি আর কষা মাংসও খাইনি। কিছুক্ষণ আগেই যেন করা হয়েছে। গরম লুচি। ক-টা লুচি খেলাম কে জানে! শেষ লুচিটা খাচ্ছি, চোখে একটা সাদা কাগজ পড়ল। দূরে টেবিলের উপরে রাখা আছে। হাতে নিয়ে উলটে দেখি তাতে একটা কবিতার কয়েকটা লাইন। সেটা পড়ার পরেই কী হল জানি না, ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম।
তাতে লেখা ছিল।
রোজ দেখি খেয়ে গেছে, জানিনেকো কারা সে—
কালকে যা হয়ে গেল ডাকাতির বাড়া সে!
পাঁচখানা কাটলেট লুচি তিন গন্ডা,
গোটা দুই জিবেগজা, গুটি দুই মন্ডা,
আরও কত ছিল পাতে আলুভাজা ঘুগনি—
ঘুম থেকে উঠে দেখি পাতখানা শূন্যি!
তাই আজ খেপে গেছি—আর কত পারব?
এতদিন সয়ে সয়ে এইবারে মারব।
খাড়া আছি সারাদিন হুঁশিয়ার পাহারা,
দেখে নেব রোজ রোজ খেয়ে যায় কাহারা।
পালিয়ে আসার আগে খেয়াল হল, আরে এত সুকুমার রায়ের সেই 'চোর ধরা' কবিতা। মনে পড়তেই ছুটতে ছুটতে বেশ হাসি পেল। এখানে আবার কে লিখল সেই কবিতা! কোন পাগল লোক থাকে ওই বাড়িতে! আমি আবার ঠিক তারই খাবার খেয়ে ফেলেছি। পরে দেখে কী করবে কে জানে! নিজের মনে খানিক হেসে নিলাম।
এই কবিতাটা আমার খুব প্রিয় ছিল। পুরো কবিতাটা এখনও মুখস্থ আছে সুকুমার রায়ের অন্য অনেক কবিতার মতোই।
পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, কেউ পিছু নিয়েছে কি না! না, কেউ আসছে না।
আমি কোথায় এসে পড়েছি, কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু সবই যেন আমার পছন্দের। যেন আমার স্বপ্নরাজ্যে এসেছি। কী সুন্দর ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা। দু-ধার দিয়ে নানান রঙের গাছ। তাতে আবার সব বিভিন্ন ধরনের ফুল।
বেশ কিছু হাঁস, হাঁসের বাচ্চা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত পাখি এখানে! কোকিল, দোয়েল, তিতির, কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরি, টিয়া। দূরে গাছে একটা বিশাল রাজধনেশ পাখি বসে আছে। কিছু দূরে একটা ময়ূর ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এত সুন্দরও কোনো জায়গা হয়?
কিন্তু কোনো লোক নেই কেন! হঠাৎ খেয়াল হল, দূরে একটা বেঞ্চিতে একটা লোক কালো পাঞ্জাবি পরে বসে আছে। লোকটা হাতে একটা খাতা আর পেন নিয়ে বসে কী যেন ভাবছে। কবি বা লেখক হবে হয়তো।
লোকটার সামনে গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, এই জায়গাটার নাম কী? এটা বারাসাত থেকে কতদূরে? এখান থেকে বারাসাতের বাস পাওয়া যাবে?
কিন্তু লোকটা মুখ তুলে তাকাতেই ভয়ে আর প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার করলাম না—
লোকটার চোখে-মুখে বিরক্তি।
কী আশ্চর্য, এরকমও মিল হতে পারে! অবিকল সুকুমার রায়ের সেই 'গোঁফ চুরি' কবিতার বডেড়াবাবুর মতো দেখতে। মাথাভরা টাক। শুধু দু-কানের পাশে কিছু চুল। কপালে বেশ কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে আমাকে দেখে। খ্যাংড়া কাঠির মতো বিশাল গোঁফ। আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছে।
হেড আফিসের বড়োবাবু লোকটি বড়োই শান্ত,
তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনো জানত?
আমার মনে এই দুটো লাইন যেন সঙ্গে সঙ্গে চলে এল। আর জিজ্ঞেস না করে, সরে এলাম। লোকটা কীসব বিড়বিড় করে বলে আবার কী সব লিখতে শুরু করল।
আর তখনই চোখে পড়ল কিছু দূরের হালকা হলুদ রঙের বাড়িটা। তার দরজায় দেখলাম বড়ো বড়ো করে লেখা আমার আরেক প্রিয় কবিতার কয়েকটা লাইন, যা দেখলেই আমার সবার আগে আমার বন্ধু রাজুর কথা মনে পরে।
একটা অঙ্কের উত্তরে ঠিক এই কবিতাটা লেখার জন্য স্কুলে রাজু অঙ্কের শিক্ষক সৌজন্যবাবুর কাছে খুব বকুনি খেয়েছিল। ওর ধাঁধার মাধ্যমে হেঁয়ালি করে সবকিছু বলার বা উত্তর দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। একটা অঙ্কের উত্তর ২১ আসায় ও তার বদলে লিখেছিল এই কবিতা।
যেসব লোকে পদ্য লেখে,
তাদের ধরে খাঁচায় রেখে,
কানের কাছে নানান সুরে
নামতা শোনায় একশো উড়ে,
সামনে রেখে মুদির খাতা—
হিসেব কষায় একুশ পাতা।
একুশে আইন— কবিতার কয়েকটা লাইন লিখে বোঝাতে চেয়েছিল যে সে অঙ্কের উত্তর 'একুশ'। প্রথমে না বুঝে সৌজন্যবাবু খুব রেগে গিয়েছিলেন রাজুর উপরে।
কিন্তু কোনো জায়গায় বাড়ির দেওয়ালে এরকম কবিতা লেখা থাকতে আমি কখনো দেখিনি।
তা ছাড়া এখানে সবকিছুর সঙ্গে সুকুমার রায়ের ছড়ার এরকম যোগাযোগ কেন? রাজু থাকলে দেখে খুব মজা পেত। আপনমনে 'রাজু' বলে উঠলাম।
দেখি, ইতিমধ্যে দরজা দিয়ে কে একজন বেরিয়ে আসছে। একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। কিন্তু তারপরেই সেই অতি পরিচিত হাঁটা, মাথা ভরতি ঝাঁকড়া চুল, আর মুখের হাসিটা দেখে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।
তারপরে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, রাজু!
রাজু আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। একটু যেন মোটা হয়েছে।
—রাজু! তুই এখানে? ছুটে গেলাম ওর দিকে।
ওর মুখে সেই চেনা হাসি। ওর সেই সারল্য।
—আমি তো এখানেই থাকি। তুই এসেছিস শুনে ছুটে এলাম।
—মানে? তুই এখানে থাকিস? এই জায়গার নাম কী? এরকম কোনো জায়গা আছে, সেটাই জানতাম না? কী সুন্দর। সবকিছু যেন আমার ইচ্ছের মতো। এটা বারাসাত থেকে কতদূর? আমিই বা কী করে এলাম?
—আরে দাঁড়া। ওয়েট কর। এতগুলো প্রশ্ন। তুই আগে চুপ করে বোস। চল, ওই বেঞ্চিতে গিয়ে বসি। গল্প করা যাক। কতদিন তোর সঙ্গে গল্প হয়নি।
বলে আমাকে নিয়ে বাড়ির সামনে একটা ভারী সুন্দর কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। এখান থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে।
মাথার উপর দিয়ে দুটো কাক ক্যা ক্যা করে উড়ে গেল। তাদের যেতে দেখে ও হেসে বলে উঠল, এই দুটো সারাক্ষণ ঝগড়া করে যায়।
বুঝলাম, ও কিছুই পালটায়নি।
বলে উঠলাম, কতদিন তোকে খুঁজেছি। তুই যে হাবড়া স্টেশনে বসে ছবি আঁকতিস, সেখানেও গেছি কতদিন। কেউই জানে না তুই এখন কোথায়।
—হ্যাঁ, আসলে এই ভাষা শেখাটা অনেকটা নেশার মতো। তোকে তো বলেছিলাম, আমি পিঁপড়েদের ভাষা শিখে নিয়েছিলাম। ওরা সবাই ভালো। ওদের থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। এখনও আমার সঙ্গে ওদের নিয়মিত কথা হয়। আমি ইচ্ছেমতো ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারি।
কিন্তু ওই যে 'ভয়নিচ ম্যানাস্ক্রিপ্ট', সেখানে আরেকটা ভাষার কথাও ছিল। তবে সে ভাষাটা উদ্ধার করতে আরও সময় লাগল। রজার বেকন লোকটা সত্যি জিনিয়াস ছিল।
—সেটা আবার কীসের ভাষা?
—বলছি। একটু বাদে। সেটা উনি যে পুরোটা জানতেন তা নয়। কিন্তু শুরুটা উনি করেছিলেন। পুরোটা বুঝে উঠতে পারেননি। আমি তার পরের অংশটা আবিষ্কার করি। সেটা আবিষ্কার, হ্যাঁ, আবিষ্কারই বলা চলে। সেজন্যেই আমাকে গ্রাম ছাড়তে হয়। এই ভাষাটা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী। কী জন্য ব্যবহার করা হয়, সেটা আমি প্রথমে বুঝিনি। কিন্তু ব্যবহার শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম। আর সে ভাষা শিখেছিলাম বলেই তো তোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম। এখন আর ভয় নেই তোর, আমি সঙ্গে আছি। ওরাও সঙ্গে থাকবে।
—ওরা মানে?
—বলছি। তার আগে এই জায়গাটা ভালো করে দেখাই। সবার আগে আমার বাড়িতে চল।
দুপুরে রাজুর বাড়িতে কাটালাম। ওর বাগানটা বেশ বড়ো। নানান ধরনের গাছ। চেনা-অচেনা নানান পাখির কূজনে বাগান যেন মুখর হয়ে আছে। ওর পড়ার ঘরে দেখলাম বইয়ের স্তূপ। তার মধ্যে অনেক বই সংকেতের উপরে। বুঝলাম, এই বিষয়ে আমার বন্ধুর উৎসাহ সামান্যতম কমেনি।
বলে উঠলাম, তোর কি এখনও সব সাংকেতিক বার্তার অর্থ খুঁজে বার করতে ভালো লাগে?
—হ্যাঁ, ওটাই তো আমার নেশা, আমার জীবন। আমাদের চারদিকে অজস্র সংকেত ছড়িয়ে আছে। কিন্তু কিছু সংকেত উদ্ধার করা খুব শক্ত। প্রকৃতি চায় না যে তার সব রহস্য আমরা কোনোদিন জেনে যাই। তা ছাড়া ওদের সঙ্গে আমার সব কথা তো এরকম সাংকেতিক ভাষাতেই হয়।
—কাদের সঙ্গে? আচ্ছা, তুই যে সমানে 'ওরা', 'ওদের' বলে যাচ্ছিস, ওরা কারা?
—আচ্ছা, তোর কী মনে হয়, এই মহাবিশ্বে শুধু আমরাই একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী? শুধু এই পৃথিবী ছাড়া এই মহাবিশ্বে অন্য কোথাও প্রাণ নেই?
—হ্যাঁ, সেরকম কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা-ই না?
—আচ্ছা, তোর কী ধারণা, সত্যিকারের বুদ্ধিমান কোনো অ্যালিয়েন কোনোদিন সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করবে? সেটা না-করাই তো ওদের বুদ্ধিমত্তার সব থেকে বড়ো প্রমাণ।
যদি বলি, এই বিশ্বের সব খেতে শুধু একরকম ফসল হয়, শুধু একরকম ফুল হয়, তুই সেটা বিশ্বাস করবি! নিশ্চয়ই করবি না! মহাবিশ্বের মধ্যে এই পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র বুদ্ধিমান জীব, এটা ভাবাও ঠিক সেরকমই।
অ্যালিয়েন আছে। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও পেরেছি। যদি এবার বলি, এই অ্যালিয়েনরা এমন একটা উন্নততম সাংকেতিক ভাষা তৈরি করেছে, যা শুধু অত্যন্ত বুদ্ধিমান হলেই বোঝা সম্ভব, সেটা জানলেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব, তাহলে?
এই ভাষা জানলে শুধু ওদের সঙ্গে যোগাযোগ নয়, আরও অনেক কিছু করা যায়, যেমন তোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম।
—কী বলছিস? আর সে ভাষা তুই জেনে গেছিস? ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিস?
—হ্যাঁ, এখন জেনে গেছি। সে বিষয়ে পরে আরও বলব। তবে তার আগে তোকে আরেকটু দেখাই এই জায়গাটা। তুই বাড়ির কথা বল। গ্রামের কথা বল।
এবারে আমাদের মধ্যে অন্য অনেক কথা হল। অনেক গল্প। অনেক দিনের জমে-থাকা গল্প। গ্রামে এখন কী হয়েছে, কীভাবে কিছু খারাপ লোক আমাদের গ্রামের সবার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে, সেসব নানান কথা। একই সঙ্গে অনেকদিন পরে আবার আমরা বাগানে বসে একসঙ্গে পাখির ডাক, গাছ-ফুল-পাতার গল্পও শুনলাম।
—আমার এই জগৎটা খুব ভালো লাগে। কারণ কী জানিস?
—সে তো লাগবেই, এমন সুন্দর পরিবেশ, এমন সুন্দর সমুদ্র, বাড়ি, সবকিছুই খুব সুন্দর এখানে।
ও হেসে বলে উঠল, আরে না, না, সেজন্য নয়। এ জগতে চারদিকে ছড়িয়ে আছে ধাঁধা, সংকেত। ঠিক যেজন্য তুই ওই কবিতা দেখে আমার কথা ভাবতে পারলি, আমকে খুঁজে বার করতে পারলি, এখানে ঠিকভাবে ডিকোড করতে পারলে সবকিছু খুঁজে পাওয়া যায়।
—সেরকম আবার হয় নাকি!
ও হেসে বলে উঠল, হ্যা, এখানে তো হয়। আচ্ছা, চারদিকে কত সংকেত ছড়িয়ে থাকে, তা জানিস? আমাদের বিশ্বেই ধর। আমরা খবর রাখি না বলে জানি না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলও নির্ধারণ করেছিল সংকেত উদ্ধারের ক্ষমতা, সেটা নিশ্চয়ই জানিস। তুই জোহানেস ট্রিথেমিয়াসের নাম শুনেছিস?
ঘাড় নাড়িয়ে না বলতে ও বলে উঠল, ট্রিথেমিয়াস ছিল খুব প্রতিভাবান একজন ম্যাথামেটিশিয়ান, যিনি ক্রিপ্টোগ্রাফির উপরে প্রথম বই লেখেন। নাম ছিল 'স্টেগ্যানোগ্রাফিয়া'। ভ্যাটিকান অর্থাৎ চার্চ থেকে নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় ওই বইটাকে ঘোষণা করলেও বইটা খুব জনপ্রিয় হয় ওঠে। কোনো সাংকেতিক বার্তা কীভাবে গোপনভাবে পাঠানো যায়, সে বিষয়ে নানান পদ্ধতি বলা হয়েছিল বইটাতে।
ভয়নিচের ম্যানাস্ক্রিপ্টের বাইরে এরকম অনেক সংকেত রহস্য আমাদের চারদিকে লুকিয়ে আছে আর নানান কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে গোপনে কিছু খবর পাঠানো যায়। সে বার্তা অন্যরা পেলেও কিছু বুঝতে পারবে না।
—কিন্তু তুই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা কী বলছিলি?
—হ্যাঁ, বলছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একদিকে তখন ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স, অন্যদিকে জার্মানি। দু-দিকেই প্রচুর হতাহত। দীর্ঘ যুদ্ধ চলছে, তো চলছেই। এত সেনা মারা যাচ্ছে যে যার দিকে কমবয়সি সেনা বেশি পড়ে থাকবে, সে-ই জিতবে। আমেরিকা যদি কোনো একটা দিকে যোগ দেয়, তাহলে একটা নির্ণায়ক ফলাফল হবে। কিন্তু আমেরিকা দু-দিক থেকেই সমদূরত্ব রেখে নিউট্রাল থাকতে চাইছিল। ইউরোপে যুদ্ধ যত বেশিদিন চলে, তাতে আমেরিকার লাভও তত বেশি। দু-তরফেই অস্ত্রের সাপ্লাই আসে ওদের থেকে। তাতে ওদের ব্যাবসা আরও ফুলেফেঁপে উঠছিল।
ঠিক সেই সময় একটা সাংকেতিক বার্তা উদ্ধার হল, আর তার জন্য পালটে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভবিষ্যৎ। ওই সাংকেতিক বার্তার আড়ালে লুকোনো তথ্য জানার পরেই আমেরিকা আর নিরপেক্ষ না থেকে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের দিকে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
—কী ছিল সেই সংকেতে?
—জার্মানি একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজ পাঠিয়েছিল মেক্সিকোর কাছে যে মেক্সিকো সাহায্য করলে জার্মানি মেক্সিকোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমেরিকা আক্রমণ করবে। প্রতিদানে টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা, আরও কিছু জায়গা মেক্সিকোকে আমেরিকার থেকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জার্মানি।
এসব সাংকেতিক মেসেজ পাঠানো হত জার্মানির এক বিশেষ কোডবুকের সাহায্য নিয়ে, যার নাম ছিল '০০৭৫'। কিন্তু জার্মানি থেকে মেক্সিকো টেলিগ্রাফের মাধ্যমে পাঠানো সেই মেসেজ দুই ক্রিপ্টোগ্রাফার উইলিয়াম মন্টগোমারি ও নাইজেল ডি গ্রে উদ্ধার করে ফেলেন। সে খবর আমেরিকার কাছে যায়। তখনই আমেরিকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দিকে যোগ দেয়। ওরা যুদ্ধ জেতে।
দেখ, সামান্য একটা সাংকেতিক বার্তা এভাবে একটা যুদ্ধের ফলাফল পালে দিল।
—বাপস রে! সত্যি তাই, তুই এখন ওখানে না-থাকায় এসব কথা জানতেই পারি না।
—এরকম কত যে উদাহরণ আছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সব বড়ো ঘটনার পিছনেই খোঁজ নিলে দেখবি, এরকম কোনো সাংকেতিক বার্তা আছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা জানিই না।
বলে ফের বলে উঠল, এই যে ধর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার যোগদান, তার মূলেও কী ছিল বল তো?
—জাপানের পারল হার্বারে অ্যাটাক?
—হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। সেখানেও কিন্তু ব্রিটিশ কোডব্রেকাররা আগে থেকেই জাপানের কোড ব্রেক করে জানতে পেরেছিল যে এরকম হবে। কিন্তু ইচ্ছে করে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বা জানায়নি, যাতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্ক রুজভেল্টের জন্যযুদ্ধে যোগ দেয় ও জাপান আক্রমণ করে। ওই ঘটনায় ২৪০০ আমেরিকার সেনা মারা যায়। সেজন্য আমেরিকার জাপান আক্রমণ না করে কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু ইচ্ছে করলেই আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়া যেত।
বলতে পারিস, ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, অনেক রাজারাজড়ার, সেনাপতি বা রাজনীতির লোকের থেকেও এসব ক্রিপ্টোলজিস্টের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারাই ইতিহাস পালটেছে বার বার।
—কীরকম? সে আবার কী করে হয়? যুদ্ধ তো হয় রাজাদের মধ্যে, সেনার মধ্যে।
—ধর এডওয়ার্ড ওয়াইলসের কথা। অসম্ভব প্রতিভাবান ক্রিপ্টোলজিস্ট। আমি যখন ওর কাজ দেখি, ওর প্রতিভা দেখে খুব অবাক হই। সেই সময়ে সুইডেনের একটা পরিকল্পনা ছিল ইংল্যান্ডে বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ শুরু করার। সেজন্য আড়ালে থেকে বিভিন্ন ঘটনা ঘটাচ্ছিল। একটা ৩০০ পাতার জটিল সংকেত উদ্ধার করে সেটা এডওয়ার্ড ওয়াইলস বুঝতে পেরে যায়, ও সেটা যাতে না হয়, সে ব্যাপারে রাজাকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলে।
এভাবে একের পর এক সংকেত উদ্ধার করে এডওয়ার্ড ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে। ও এই সংকেত উদ্ধারের কাজটাকে প্রায় ফ্যাক্টরির পর্যায়ে নিয়ে যায়। ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান, পোর্তুগীজ, জার্মান, ইতালিয়ান, গ্রিক, ডাচ, সুইডিশ— পৃথিবীর যেকোনো ভাষাতেই সাংকেতিক বার্তা থাকুক-না কেন, সেটা থেকে সহজ সরল ইংরেজিতে সেই সংকেতের আসল অর্থ ও একদিনের মধ্যে বার করে নিতে পারত। সেজন্যে সেই সময়ে ইংল্যান্ড সারা বিশ্বের মধ্যে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই সংকেত উদ্ধারের ক্ষমতা এতটাই দরকারি ছিল, আজও আছে।
একটা উদাহরণ দিই। ১৭৬১-তে স্পেনের দূতেদের মধ্যে এক গোপন সাংকেতিক বার্তা উদ্ধার করে এডওয়ার্ড বুঝতে পারে যে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধে স্পেন ফ্রান্সের দিকে যোগ দেবে। বুঝতেই পারছিস, এরকম খবরের তাৎপর্য কত?
কিন্তু সেই এডওয়ার্ডও সারাজীবন চেষ্টা চালিয়ে গেছে এই ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ বা ভাষা উদ্ধারের জন্য, যার কথা আমি আগেই বললাম। পারেনি শেষে।
পরে সাংকেতিক বার্তা আদানপ্রদানের কাজ করেছে অনেক ক্রিপ্টোলজিস্ট স্পাই বা গুপ্তচর, যাদের জন্য অনেক দেশের ভবিষ্যৎ, এই বিশ্বরাজনীতি, ক্ষমতার চালচিত্র—সব পালটে গেছে।
—ক্রিপ্টোলজিস্ট স্পাই?
—হ্যাঁ, ঠিক এরকম একজন স্পাইয়ের কথা বলি, যাকে এখনও এত বছর পরেও চিহ্নিত করা যায়নি। কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছি, সে কে ছিল। বলতে পারিস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বা জার্মানির হারের মূলেও সে ছিল। তার কোড নেম ছিল 'ওয়েরদার'। এই কোড নেমের আড়ালে আসলে কে ছিল, সেটা কেউ আজও বুঝতে পারেনি।
কিন্তু তার মাধ্যমেই জার্মানির সব খবর চলে যেত রাশিয়ার কাছে, স্ট্যালিনের কাছে, অনেক আগে থেকে। এমনকী জার্মান আর্মি কুরস্কে কবে আসবে, সঙ্গে ক-টা ট্যাঙ্ক থাকবে, কত সেনা থাকবে, এসব আগে থেকেই এভাবে জেনে যেত রাশিয়ান আর্মি। জার্মানির যুদ্ধের সব কলাকৌশল, প্রস্তুতি—সব ডিটেলস এভাবেই পৌঁছে যেত রাশিয়ার মিলিটারির কাছে। পুরো এই তথ্য আদানপ্রদান হত জটিল সাংকেতিক বার্তায়। আমি সেসব উদ্ধার করে পরে বুঝতে পারি যে 'ওয়েরদার' আর কেউ নয়, ছিল স্বয়ং মার্টিন বোরম্যান, হিটলারের ডেপুটি, কিন্তু আসলে ছিল রাশিয়ার স্পাই, যার খোঁজ নাৎসিরা পায়নি। শুধু ভেবে দেখ, সরকারের কেন্দ্রে বসে আছে একজন অন্য দেশের গুপ্তচর, তাও আবার জার্মানির মতো এক দেশে হিটলারের চোখের সামনে যে হিটলার নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করত না। এরপরে আর কেউ জিততে পারে! সেই অসাধারণ প্রতিভাবান গুপ্তচর মার্টিন বোরম্যানও এই মহাবিশ্বের গোপন সাংকেতিক ভাষা খুঁজতে খুঁজতে শেষে ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ২৭ বছর পরে রাশিয়ায় আত্মহত্যা করে।
আমি সেসব তথ্য জানতে পেরেছি, যদিও সারা বিশ্বের সামনে এটা এখনও রহস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উনি কোথায় ছিলেন, কোথায় গেলেন তা আজও কেউ জানে না। আমি কিন্তু সব জানতে পেরেছি। সাংকেতিক বার্তা উদ্ধারের ক্ষমতা থাকলে এই সুবিধে, তুই সবকিছুর পিছনের আসল সত্যটা জানতে পারবি।
—কিন্তু আমাকে আজ হঠাৎ করে এসব বলছিস কেন?
ও মুচকি হেসে পাশের কৃষ্ণকমল ফুলটাতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, এর থেকেই বুঝতে পারছিস, যদি কোনো শক্তি সত্যিকারের শক্তিশালী হয়, তাহলে তারা এমন সাংকেতিক বার্তায় কথা বলবে, যা আর কেউ বুঝতে পারবে না। যার সাংকেতিক বার্তা যত উন্নত হবে, সে তত শক্তিশালী হবে। সেজন্যই ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝা এত শক্ত। এটা কোনো জীবের বুদ্ধিমত্তা বিচার করার এক মাপকাঠিও বলতে পারিস।
আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম।
একটু থেমে রাজু ফের বলে উঠল, আমি আসলে এসব বিষয় নিয়ে সব সময় মেতে থাকি বলে তোকেও অনেক কথা বলে ফেললাম। অন্য প্রসঙ্গে যাই। তোর কার কথা সব থেকে বেশি মনে পড়ে?
আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম, হঠাৎ করে? কে জানে! আমি নিজেই ঠিক জানি না।
ও মুচকি হেসে বলে উঠল, তোর বলার দরকার নেই। আমি জানি। তাহলে চল, বাইরে ঘুরে আসি। তুই একটা সারপ্রাইজের জন্য রেডি থাক।
আমরা এবারে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মনে হচ্ছে, এই দ্বীপটা যেন সত্যি সেরা সবকিছু দিয়ে সাজানো হয়েছে। কী নেই এখানে! কী মিষ্টি ঠান্ডা হাওয়া বইছে। দূরে সামান্য পাহাড়, উপত্যকা, জঙ্গল দেখা যাচ্ছে। মাথার উপরে নীল আকাশ। বাতাসে জুঁই আর গোলাপের মিষ্টি গন্ধ মিশে আছে।
আমরা রাস্তা দিয়ে এগোতে থাকলাম। এখানে কিন্তু কোনো লোকের দেখা পেলাম না। কিছুটা এগোনোর পরে যে জায়গায় এসে পৌঁছোলাম, সেখানে আমাদের গ্রামের মতোই চেনা নানান গাছ। একটা বড়ো পুকুর, পুকুরের ঘাট। পুকুরের জল কাচের মতো এত স্বচ্ছ পরিষ্কার যে একদম নীচ অব্দি দেখা যাচ্ছে।
উলটোদিকে একটা নীল রঙের বাড়ি। নীল রং আমার মা-র খুব পছন্দ ছিল। সে বাড়ির কিছু ঘরে আলো জ্বলছে।
রাজু বলে উঠল, চল, ওই বাড়িটাতে যাওয়া যাক, দেখা যাক কে থাকে!
আমি বলে উঠলাম, ধুর, ওরকম যার-তার বাড়িতে ঢুকে যাওয়া যায় নাকি! কী বলছিস!
রাজু শুনে মুচকি হাসল। বলে উঠল, হতেও তো পারে যে তুই তাকে চিনিস!
আমি ওর সঙ্গে বাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজা বন্ধ।
আমাকে বলে উঠল, এখানে এটাই নিয়ম। সব বাড়ির দরজা খুলবে তখনই, যখন তুই বাড়ির জন্যে ঠিক কোড বলবি। বা বাড়িতে যে থাকে, তাকে ঠিকভাবে ডাকবি। ঠিক যেমন আমার সময়ে তুই প্রায় খেয়াল না করেই আমার নাম বলেছিলি। ওটা শুনেই আমি এগিয়ে এসেছিলাম।
—তা তুই বলে দে-না। তুই নিশ্চয়ই জানিস। আমি কী করে জানব!
রাজু ঘাড় নাড়ল— উঁহু, আমি বললে চলবে না। তুই কী করে এ বাড়িতে ঢুকবি? আমাকে তো সবাই চেনেই। ভেবে বল।
আমি চুপ করে ছিলাম খানিকক্ষণ। কিছুই মাথায় আসছিল না। কিন্তু বাড়ির বাইরের বাগান, সূর্যমুখী আর জুঁই ফুলের গাছটা দেখে আপনা থেকে কেন জানি বলে উঠলাম, মা। মা-র খুব পছন্দ ছিল এই দুই ফুল।
বলতেই দরজা খুলে গেল। খোলা দরজা দিয়ে রাজু আমাকে নিয়ে ঢুকল। কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকে একটা ঘরে ঢুকতেই বুঝলাম এটা রান্নাঘর। এ ঘরে আলো একটু কম।
সেই ঘরে ঢুকেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম। ঘরের অন্য প্রান্তে মা দাঁড়িয়ে আছে। রান্না করছে। মা-র বেশি শাড়ি ছিল না। সেই যে হালকা নীল শাড়িটা পরে রান্না করত, সেই শাড়িটাই পরে আছে।
আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। মা কী করে এখানে আসবে মৃত্যুর এত বছর পরে! কিন্তু এত সত্যি মা। হ্যাঁ, স্পষ্ট, আমার মা আমার থেকে দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
আমার দিকে ঘুরে তাকিয়েছে। চোখে জল। চোখ ছলছল করছে।
—বাবুন!
—মা তুমি?— ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম মা-কে। —তুমি এখানে কী করে?
মা-র চোখে জল, একসঙ্গে হাসি।
কত কতদিন বাদে দেখলাম মা-কে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার অবিশ্বাসের চোখে তাকালাম। এ কী করে হয়! মা তো মারা গিয়েছিল যখন আমি ক্লাস সিক্সে। হঠাৎ করে কদিনের জ্বরে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
তারপরে কত দিনরাত মা-কে খুঁজেছি। মা-র জন্য কত রাত একা কেঁদেছি। একসময় পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছিলাম এজন্য।
রাজু বলার পরেই আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলাম। সেই মা, আমার সামনে! মা-কে আমি স্পর্শ করতে পারছি। রাজুকে জিজ্ঞেস করে উঠলাম, এ কী করে সম্ভব!
রাজুর চোখেও জল। শুধু বলে উঠল, না। সেসব কথা পরে বলব। এখন বলা যাবে না।
আমিও আর কিছু বললাম না। আজ অনেক কিছুই হচ্ছে, যাকে লজিক দিয়ে বোঝানো যায় না। কিছু সময় হৃদয়ের কাছে বুদ্ধির হার মানা ভালো।
সেইদিন, সেই সারারাত শুধু মা-র আর রাজুর সঙ্গে কথা হল। কত কথা। মা-র সেই সরল প্রশ্নগুলো—ঠিক করে খাস তো?
—মন দিয়ে পড়াশোনা করছিস তো?
বললাম যে সেসব পর্যায় আমি অনেকদিন আগে পেরিয়ে এসেছি। এখন চাকরি খুঁজছি।
—বড্ড রোগা হয়ে গেছিস। ঠিক সময়মতো খাচ্ছিস তো? বলেছি না সকালে খালি পেটে একদম বেশিক্ষণ থাকবি না।
—মা, আমি আগের থেকে অনেক মোটা হয়েছি, সবাই বলে। তুমি সব সময় আমাকে রোগাই দেখো।
আমাদের মধ্যে কথা চলতেই থাকে। কত বছরের জমে-থাকা কথা। কত বছরের অপ্রাপ্তি, কত বছরের স্বপ্ন। মা ঠিক আগের মতোই আছে।
ভোর যখন হয়ে এল, তখনও বুঝিনি যে অনেক কথাই বলা হয়নি। আমরা তখনও ওই কিচেনে বসে গল্প করে যাচ্ছি। মায়ের হাত ধরে কথা বলে যাচ্ছি তখনও। এই হাত আমি কখনো ছাড়ব না।
রাজু হঠাৎ বলে উঠল, এবারে যেতে হবে। আর সময় নেই।
—কোথায় যেতে হবে? আমি এখানেই থাকতে চাই। বাবাকেও এখানে নিয়ে আসব।
—তা তো হয় না। তোকে এবারে সব বোঝাই। এবারে তুই আবার ভালো করে চারদিকে চেয়ে দেখ। কেউ কোথাও নেই।
চারদিকে তাকালাম।
মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু হারিয়ে গেল ফের। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, মা— মা কোথায়?
দেখি, শুধু রাজু দাঁড়িয়ে আছে, আমি সেই সমুদ্রের ধারে বসে আছি।
রাজু বলে উঠল, ওরা চাইলে তোর পছন্দের জগৎ তৈরি করে দিতে পারে। যা দেখছিলি— যা শুনছিলি, সব ওরা তোর জন্যেই করেছিল। এটা তোর তৈরি করা জগৎ, তুই যা চাইছিলি মনের গভীর থেকে, সেটা বুঝেই ওরা ঠিক সেরকম তৈরি করে দিচ্ছিল।
আমার কথাতেই ওরা অনুরোধ রেখেছে। ওদের তৈরি মেটাভার্স শুধু তোর জন্য, যার আসল কোনো অস্তিত্ব নেই। ওরা এটা পারে। এটা না করলে তুই ফিরে আসতেও পারতিস না।
—কারা ওরা? আমি কোথায় ফিরে আসব?
—ওরা অন্য জগতের লোক। বহু ছায়াপথ দূরের এক গ্রহে ওরা থাকে। কিন্তু আমার ভাষার মাধ্যমে আমার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ থাকে। তোকে বলছিলাম না। এ এক ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ—সাংকেতিক ভাষা। যা বিশ্বের সেরা ক্রিপ্টোগ্রাফাররা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উদ্ধার করার চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু পারেনি। আমাকে 'ভয়নিচ ম্যানাস্ক্রিপ্ট' কিছুটা সাহায্য করেছিল। রজার বেকন এ নিয়ে বেশ ভালো কাজ করেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত এই ভাষা নিজে উদ্ধার করতে পারেনি। একইভাবে যাদের সবার কথা বললাম, এরা সবাই একটু একটু করে এগিয়েছিল, কিন্তু কেউ শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি। মজার কথা কী জানিস, আমাদের শ্রুতিবেদ-এও এর উল্লেখ আছে। হয়তো সে সময়ে কোনো সাধু বা ঋষি এটা জানতেন। কিন্তু পরে এই জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছিল। আমার কাজে সেসব সাহায্য করেছে। সে ভাষা জানি বলেই তোকে বাঁচাতে পেরেছি।
—মানে? আমার কী হয়েছিল?
—তুই মারা গিয়েছিলি জলে ডুবে। তখনই আমি আসি। তোর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আচ্ছা, তোর খেয়াল হল না এতক্ষণ তোর সঙ্গে ক্র্যাচ নেই? তুই দিব্যি হেঁটেচলে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছিস। এবারে তোর জেগে ওঠার সময়। ভালো থাকিস। মনে রাখবি। সঙ্গে আছি। তুই ভয় পাস না।
ভালো লোকেরা চুপ করে থাকলে শুধু অন্যায়ের কথাই শোনা যায়। আমি তোর সঙ্গেই এবারে যাব আমাদের গ্রামে। ওরাও সঙ্গে থাকবে, সামনে না এলেও। তবে বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকলেও ওরা পারে না, এমন কিছু হয় না।
—কিন্তু তুই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলি কী করে? আমি এখন তাহলে কোথায়?
—তুই ছিলিস সীমান্ত অঞ্চলে। জীবন-মৃত্যুর সীমান্ত অঞ্চলে। আমি সে সময় তোর কথা শুনে সেখান থেকে তোকে উদ্ধার করি। এসবই সম্ভব হয়েছে আমি ওই ভাষা জানি বলে। মৃত্যুর পরে কিছুক্ষণ সবাইকে ওই ভাষায় যোগাযোগ করা যায়। সেজন্যেই সম্ভব হল।
—কিন্তু মা?
রাজু আমার হাতটা জড়িয়ে ধরল। বলে উঠল, যারা চলে যায়, তাদের আর ফেরানো যায় না। এটা মৃত্যুর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুধু সম্ভব। যতক্ষণ মানুষ সীমান্ত অঞ্চলে থাকে।
—তুই বার বার আমি মরে গেছিস বলছি। কিন্তু আমি তো দিব্যি বেঁচে আছি।
উত্তরটা রাজুর থেকে এল না। রাজু চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেছে। মনে হল, দূর থেকে কিছু লোকের গলা শুনতে পাচ্ছি।
একটু একটু করে যেন সেসব অচেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।
—ছেলেটার জ্ঞান ফিরে আসছে।
—হ্যাঁ, আবার হার্টবিট চালু হয়েছে।
—কী আশ্চর্য! আমি তো ভেবেছিলাম, ছেলেটা মারাই গেছে। এতক্ষণ নাড়ি পাচ্ছিলাম না।
—ওই, ওই তো চোখের পাতা নড়ছে!
—কী আশ্চর্য! একেই বলে, রাখে হরি, মারে কে!— আরেকটা গলা।
চোখ খুলে দেখি, অনেকগুলো মুখ আমার কাছে ঝুঁকে দেখছে।
—বেঁচে গেছে। বেঁচে গেছে। —কে যেন চিৎকার করে উঠল।
—দূরে দূরে। ওকে একটু ভালো করে নিশ্বাস নিতে দাও। ভিড় কোরো না— কে যেন পাশ থেকে বলে উঠল।
২৫ মে
দু-দিন হল গ্রামে ফিরে এসেছি। নদী আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। আমি জলের তলায় ডুবে গিয়েছিলাম। একদম শেষ মুহূর্তে কিছু লোক আমাকে সাঁতরে গিয়ে উদ্ধার করে। তবে তারা আশাই করেনি যে আমি প্রাণ ফিরে পাব। প্রায় মিনিট পাঁচেক নাকি আমার কোনো হার্টবিট ছিল না। মৃত বলে ধরে নিয়েছিল।
ভাগ্যিস তাদের মধ্যে কেউ চেনাজানা ছিল না। তা না হলে এই খবর বাবার কাছে গেলে যে কী খারাপ লাগত বাবার।
বাকিটা হয়তো স্বপ্ন ছিল। ঠিক যেরকম হয় শুনেছি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যাকে 'নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স' বলে।
শুনেছি, মানুষ মৃত্যুর পরমুহূর্তে তার প্রিয়জনদের দেখে, সব থেকে প্রিয় মুহূর্তগুলোকে দেখে। সেরকমই হয়েছিল হয়তো। তবে এত জীবন্ত স্বপ্ন আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। মনে হচ্ছে যেন সেসব সত্যি ছিল।
তবে একটা জিনিষ হয়েছে। আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি জীবন কত মূল্যবান। এত সহজে জীবনসংগ্রামে হার স্বীকার করতে নেই। সে কথা বোঝাতেই হয়তো আমার স্বপ্নজগতে রাজু এসেছিল। মা এসেছিল।
একটা জিনিস তবে অবাক লেগেছে। যে কথাগুলো রাজু আমাকে বলেছিল, সেই কথাগুলো? এখনও কিছু নাম মনে আছে। কী করে সেগুলো জানলাম?
আমি গতকাল গ্রামের লাইব্রেরিতে গিয়ে একটা বই পেলাম, নাম 'ক্যান ইউ ক্র্যাক দ্য এনিগমা কোড'। তাতে রাজুর সব কথা না পেলেও 'ওয়েরদার'-এর কথাটা দেখলাম। যদিও মার্টিন বোরম্যান যে ওয়েরদার—এরকম কোনো কথা সেখানে লেখা নেই। ভেবে দেখলাম সবকিছুতে লজিক খোঁজার দরকার নেই। কিছু জিনিস রহস্যই থাকুক।
বলতে নেই, সেই স্বপ্ন আমি বার বার দেখতে চাই। আমার মা-কে যদি এরকমভাবে আরও কিছুক্ষণের জন্য ফিরে পাই। এরকম একটা স্বপ্ন জীবনের অর্থ পালটে দিতে পারে।
ও হ্যাঁ, বাস্তবের জীবনটা তবে অবশ্য এত সহজ—সোজা নয়। কিন্তু মনে হল যেন তার মোকাবিলা করার জন্যে মনের জোর পেয়ে গেছি।
আজ সকালে পাড়ার হেবোদা তার দুই শাগরেদকে নিয়ে এসেছিল। আমি আর বাবা দুজনেই ছিলাম দোকানে। হুমকি দিয়ে গেল। বলেছে, আমাদের এক মাস সময় দিচ্ছে। তার মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। পরিবর্তে ও দু-লাখ টাকা দেবে।
আমাদের বাড়ির জমির দামই তার থেকে অনেক বেশি। আসলে আমার বাবা—ঠাকুরদা, ঠাকুরদার বাবা এখানেই থাকত। সেজন্য বাড়িটা গ্রামের প্রায় কেন্দ্রে বলা যায়। আমাদের অবস্থা খারাপ হলেও বাড়িটা বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে।
শুনেছি, আমাদের জায়গায় ও আরও আশপাশের বেশ কিছু জমি নিয়ে একটা বড়ো শপিং মল হবে। এখানকার ও আরও আশপাশের সব এলাকার মধ্যে সব থেকে বড়ো শপিং মল।
সেজন্যই এত হুমকি। তার সঙ্গে তো আগের ঘটনাটা আছেই।
বাবার শরীর এমনিতেই খারাপ। এসব দেখার পরে আরও খারাপ হয়ে পড়েছিল।
ভাবছি, এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাব। এদের সঙ্গে ঝগড়া-মারপিট করে তো আর এখানে থাকা যাবে না। দু-লাখ টাকা দিলে সেটা দিয়ে অন্তত বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে। আমার এক দূর সম্পর্কের পিসি আছে কলকাতায়। সেখানে গিয়ে কিছুদিন থাকা যাবে। তার পরে দেখা যাবে।
বাড়ি ফিরে বাবার পাশে বেশ খানিকক্ষণ বসেছিলাম। বাবার বেশ ভালোই জ্বর আছে। আর একটানা কাশি। তার মধ্যেই আস্তে আস্তে বলে উঠল, জানিস, আমি তেমন পড়াশোনার সুযোগ পাইনি। সারাজীবন কেটে গেছে ওই একটা ছোটো দোকান দিয়ে। আর এই বাড়ির আশ্রয়ে। তুই যাতে পড়াশোনা করে মানুষ হোস, সেটাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। তবে কোনোদিন কোনো ব্যাপারে জোর করতেও চাইনি। যেটা তোর পক্ষে সম্ভব, সেটাই হবি সৎপথে থেকে। কিন্তু কোনো অন্যায় সহজে মেনে নিলে পাপ হয়।
অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে; তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে। ওদের ভয়ে এ বাড়ি ছেড়ে দিস না।
—কিন্তু কী আর করব, বাবা! ওরা কত শক্তিশালী, তা তো তুমি জানো। যদি আমাদের গ্রামে কোনো সাহসী লোক থাকত যে আমাদের সাপোর্ট করত, তাহলেও হত। সবাই ওদের ভয়ে বেঁচে-মরে পড়ে আছে। ওরা সব রাজনীতি করে, ওদের সঙ্গে বড়ো বড়ো নেতার যোগাযোগ আছে। তাদের সরাসরি সাপোর্ট আছে। আমাদের কথা কে শুনবে!
বাবা আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল, তবু কাল একবার পুলিশ থানায় গিয়ে জানাস। কমপ্লেন করে আসিস। আইন-আদালত বলে একটা জিনিস আছে তো! নাকি সব জঙ্গলের রাজত্ব! ওদের উপরে ভরসা রাখতেই হবে। এটা আমাদের পিতৃপুরুষের ভিটে। তাদের আশীর্বাদ মিশে আছে এ মাটিতে। এই বয়সে আমি আর কোথায় যাব!
বাবাকে কথা দিলাম, কাল থানায় যাব। বাড়ি কোনোভাবে বিক্রি করব না।
২৬ মে
থানায় গিয়ে কোনো লাভ হল না। বেশ খানিকক্ষণ বাইরে বসে অপেক্ষা করতে হল। তারপরে দেখি, ও.সি. দিগম্বরবাবুর ঘর থেকে বেশ কয়েকজন বেরিয়ে আসছে। তার মধ্যে হেবো ও হেবোর দলের কয়েকজন আছে। বেরোনোর সময় বেশ হালকা চালের হাসির কিছু কথা ভেসে এল ঘরের ভেতর থেকে।
বুঝলাম, অফিসারের সঙ্গে বেশ ভালোই আলাপ আছে এদের। আমার দিকে একবার কটমট করে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল।
শুনলাম, হেবো আমাকে শুনিয়ে ওর দলের আরেকজনকে আমাকে উদ্দেশ করে বলছে, দরকার হলে ল্যাংড়ার হাত দুটোও ভেঙে দিতে হবে।
আরও প্রায় এক ঘণ্টা বাদে ও.সি.-র দেখা পেলাম। বেশ জাঁদরেল চেহারার রাশভারী ভদ্রলোক। গম্ভীর গলায় না শুনেই বলে উঠলেন, কী ব্যাপার! সব ব্যাপারে থানায় ছুটে এলেই কি কাজ হবে! আমার আর কোনো কাজ নেই!
আমি খুব সংক্ষিপ্তভাবে ঘটনাটা বলার চেষ্টা করলাম।
আমাকে কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে উনি বলে উঠলেন, কী দরকার এদের সঙ্গে ঝামেলা করার? ধরো, তোমাকে মেরে ফেলল, কী করবে? জলে নেমে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করতে নেই। যা বলছে, শুনে নাও। না হয় আরও দশ হাজার বেশি যাতে বাড়ির জন্য দেয়, সেটা আমি বলে দিতে পারি। এটাই যে দিচ্ছে, তা-ই বড়ো ভাগ্য। বাড়িটা কেড়ে নিলেই বা কী করতে!
পুলিশের মুখে এ কথা শুনে অবাক লাগল।
আমি বললাম, সেজন্যই তো তো থানায় জানাতে আসা!
সেটা শুনে উলটে আমাকে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,বাড়ির কাগজপত্র ঠিক নেই, আমাদের বাড়ি, আমাদের বাড়ি বলা।
আমি বলে উঠলাম, আমরা এখানে তিন পুরুষ ধরে আছি। একশো বছর!
—সে তোমরা তিন পুরুষ আছ নাকি বর্ডার পার করে দু-দিন আগে বাসা গেড়েছ, সেসব হিসেব তো বেঁচে থাকলে হবে, তা-ই না! যা বললাম, সেটা করো।
গলা একটু নরম করে ফের বলে উঠলেন, আরে ওরকম ভালো শপিং মল হলে তুমিও বাবাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে পারবে। যাও, আমার আর সময় নষ্ট কোরো না।
বুঝলাম, আর কিছু বলে লাভ হবে না। উনিও ওদের দলে। বাড়ি চলে এলাম।
সকাল থেকে থানায় যাওয়ার জন্য দোকান বন্ধ। বেশিক্ষণ বন্ধ রাখা যাবে না। এমনিতেও খদ্দের কমে এসেছে। দোকান নিয়মিত খোলা না থাকলে আরও কমে যাবে। খানিকক্ষণ বাবার সঙ্গে বাড়িতে থেকে আবার দোকানে এসে বসলাম। এরকম সময়ে যদি সেই স্বপ্নের মতো রাজুকে পাশে পাওয়া যেত।
ও ভয় না পেয়ে ঠিক আমার পাশে থাকত।
বিকেলের দিকে দেখি, আমার দোকানের দিকে ছজন গুন্ডা টাইপের লোক এগিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে দুজনকে চিনি। হেবোর দলের লোক। সব কজনেরই বেশ তাগড়াই চেহারা। সঙ্গে পাশের পাড়ার মাধবকাকু। আমাদের দোকানের নিয়মিত খদ্দের।
লোকগুলো দেখি, দোকানের সামনে মাধবকাকুকে এনে জিজ্ঞেস করছে, আপনি এখান থেকেই কোল্ড ড্রিঙ্কসটা নিয়েছিলেন? শিয়োর?
মাধবকাকু দেখি কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, হ্যাঁ, এখান থেকেই নিয়েছিলাম।
সত্যি তা-ই, সকালে মাধবকাকু নিয়েছিল কোকের বোতলটা।
হঠাৎ দেখি, একটা মড়া টিকটিকি হাতে ঝুলিয়ে পেচো বলছে, এই টিকটিকিটা এর মধ্যে ছিল। মাধবকাকুর ছেলে এখন এজন্যে হাসপাতালে।
এটা যে হতে পারেই না, তা আমি জানি।
পাশ থেকে একজন বলে উঠল, এসব নকল কোলা। ফাঁকা বোতলে ভরার সময় টিকটিকিটা এসে পড়েছিল। বলি, এসব ব্যাবসা কতদিন করা হচ্ছে!
এরপরে কেউ আমাকে বলার সুযোগ পর্যন্ত দিল না। দোকান থেকে জিনিসপত্রগুলো ছুড়ে ছুড়ে রাস্তায় ফেলে দিল। পেচো এগিয়ে এসে দোকান থেকে আমাকে টেনে বার করে আমার গালে এক রামথাপ্পড় মেরে, তারপরে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিল।
তার পরের দশ মিনিট কী হল বলা মুশকিল। কেউ পা দিয়ে লাথি মারছে তো কেউ আবার মুখে ঘুসি। একটা লোক আবার হাতে একটা লাঠি দিয়ে আমার পায়ে দুবার সজোরে মারল। চারদিকে লোক জমায়েত হলেও কেউই আমার সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল না।
প্রায় আধমরা অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার সময় বলে উঠল, দশ দিনের মধ্যে বাড়ি খালি না করে বেরিয়ে না গেলে লাশ পড়ে থাকবে।
বুঝলাম পুরোটাই সাজানো। তবে কিছু বলার শক্তি আমার ছিল না। ওরা চলে যাওয়ার প্রায় পাঁচ মিনিট বাদে গ্রামের পরিচিত কিছু লোক এগিয়ে এল। আমাকে টেনে তুলে ক্র্যাচটা এগিয়ে দিল। বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিল। সারা শরীর আমার তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কেউ কেউ আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিল, কিন্তু আমি নিজেই যেতে চাইলাম না।
এরা সবাই নিরীহ মানুষ। এদের কারোই এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সৎসাহস নেই। সবাই জানে এটা সাজানো ঘটনা। তবুও।
বাড়িতে ঢুকে লুকিয়ে অন্য ঘরে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবার অসহায় দৃষ্টির সামনে পড়ে গেলাম। বাবা ঘরে তক্তার উপরে শুয়ে আছে আর জ্বরের বিকারের মধ্যে তখনও বলে যাচ্ছে, অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে; তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।
আমি জানি, আমাকে কী করতে হবে। আমি এ অন্যায় মেনে নেব না। আমি পঙ্গু হতে পারি, কিন্তু দুর্বল নই।
তবু আমি অন্য ঘরে গিয়ে কেঁদে ফেললাম। এতো অসহায় কোনদিন বোধ করিনি। কী করব একা! সঙ্গে অসুস্থ বাবা। অর্থবল নেই, লোকবলও নেই যে কোনো আদালতে যাব।
ঠিক তখনই চোখে পড়ল পড়ার টেবিলের উপরে রাখা সাদা কাগজটা। এটা কোথা থেকে এল?
একটা সাদা কাগজে একটা পরিচিত সুকুমার রায়ের কবিতা।
অভয় দিচ্ছি শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?
বসলে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা!
আমি আছি, গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে
সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।
কাগজটার উলটোদিকে কয়েকটা অর্থহীন অক্ষর টাইপ করা।
'ছি ব চ লমু রে ন স ঙ্গে মা কা কে হ রু কে আ'
এ রাজু ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না।
আনন্দে সব ব্যথা মুহূর্তে ভুলে গেলাম। রাজু কি তাহলে সত্যি আছে?
অর্থাৎ ও আমাকে জানাতে চাইছে, 'ভয় পেয়ো না'। ঠিক সেই নামের সুকুমার রায়ের ছড়ার থেকে এই অংশটা নেওয়া হয়েছে।
হঠাৎ যেন সব সাহস খুঁজে পেলাম। চারদিকে তাকালাম— রাজু কি এখানেই আছে?
তবে উল্টোদিকের কাগজে লেখা অক্ষরগুলোর কোন মানে খুঁজে পেলাম না।
'ছি ব চ লমু রে ন স ঙ্গে মা কা কে হ রু কে আ'
কিন্তু তখনই হঠাৎ খেয়াল হল। কীভাবে আমরা দুজনের মধ্যে দরকারি কোনো কথা সাংকেতিকভাবে একজন আরেকজনকে পাঠাব সে ব্যাপারে বহু বছর আগে ও আমাকে বলে গিয়েছিল। তারপরে দুবার এরকম সাংকেতিক বার্তা আদানপ্রদানও করেছি ওর সঙ্গে। তবে সেসব দশ বছরের আগের কথা।
কিন্তু এর জন্যে লাগবে একটা দেশলাই বাক্স। অন্য ঘর থেকে একটা দেশলাই বাক্স নিয়ে এলাম।
ও বলেছিল 'ব' অক্ষরটা আমার আর ওর মধ্যে 'কি ওয়ার্ড'। আমরা যখন একজন আরেকজনকে সেই বার্তা পাঠাব সংকেতের মাধ্যমে, সেটা ঠিকভাবে বোঝার জন্য লাগবে শুধু একটা দেশলাই বাক্স। 'ব' অক্ষরটা যেখানে থাকবে, সেখান থেকে শুরু করতে হবে।
দেশলাইয়ের চারদিকে ওই অক্ষর-লেখা কাগজ জড়িয়ে নেওয়ার সময় 'ব' অক্ষরটা যাতে উপরের একদম বাঁদিকের শুরুর অক্ষর হয়। সেটা করার পরে দেশলাইয়ের দুইপাশের দিকে অর্থাৎ বারুদ-লাগানো অংশে যে অক্ষরগুলো থাকবে, শুধু সেটুকু পড়তে হবে, বাকিটা বাদ দিয়ে।
ঠিক সেটাই করলাম।
এবারে সেই লেখার অর্থ খুঁজে পেলাম— 'সঙ্গে আছি'।
চোটের যন্ত্রণা সত্ত্বেও হেসে উঠলাম। ও যে বেঁচে আছে, এখানেই কোথাও আছে, এর থেকে বড়ো প্রমাণ আর কিছু হয় না। শুধু দুটো ছোটো শব্দ আমার সব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিল।
কিন্তু ও আছে কোথায়? সামনে আসছে না কেন?
২৭ মে
পরের দিন সকালে হেবোর সঙ্গে দশজন লোক এল আমাদের বাড়িতে। সব কজনকে দেখলেই ভয় লাগে। এরা যে গুন্ডামি ছাড়া কিছু করে না, খেলাচ্ছলে লোক খতম করতে পারে, তা এদের চেহারা দেখেই বোঝা যায়।
হেবো ব্যাগ থেকে টাকার একটা বড়ো বান্ডিল বার করে বাবার গায়ে ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠল, দু-লাখ দশ হাজার আছে।
বলে সামনে একটা চেয়ার টেনে হেবো বসে বলে উঠল, এই কাগজগুলোতে সাইন করতে হবে, কাকু। ব্যাপারটা আমি ক্লিন রাখতে চাই।
বলে বেশ কয়েকটা আইনি কাগজ এগিয়ে দিল বাবার দিকে।
বাবা একবার কাগজে চোখ বুলিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠল, কিন্তু আমি তো বাড়ি বিক্রি করব না।
—মানে? বাড়ি বিক্রি করবেন না মানে? কাল ছেলের কী অবস্থা করেছি, দেখেছেন তো? ওটা শুধু সিনেমার বিজ্ঞাপন ছিল। পুরো সিনেমাটা দেখাব নাকি!— হেবো গর্জে উঠল হিংস্রভাবে।
আমি বলে উঠলাম, বাবা যেটা বলছেন, সেটা বোঝা তো খুব সহজ। আমরা বাড়ি বিক্রি করব না। আমরা এখানেই থাকব।
হেবোর চোখ জ্বলে উঠল।
—হুম, বাপ-ব্যাটায় খুব সাহস বেড়ে গেছে দেখছি। ঠিক আছে, আড়াই লাখে রফা। এবারে না রাজি হলে একটা টাকাও দেব না। জবরদখল করব। যেরকম আমরা অনেক করি। দেখি, ল্যাংড়া কী করে! আর তোর তো যা অবস্থা, আজ নয়তো কাল এমনিতেই টেঁসে যাবি।—বাবাকে লক্ষ করে নোংরাভাবে বলে উঠল কথাটা।
—না, আমরা বাড়ি বিক্রি করব না। আড়াই লাখেও নয়। আমরা এখন কোনোভাবেই এ বাড়ি বিক্রি করব না। —আমি আবার বলে উঠলাম।
—আচ্ছা, দেখা যাবে। আমাকে তো চিনিস না চাঁদু। কালকের মধ্যে তোদের কী করে তাড়াই দেখবি! তোরা এই গ্রামে কী করে থাকিস, দেখে নেব।
আমি শান্তভাবে বলে উঠলাম, আমরা থাকব। শুধু থাকব, তা-ই নয়। এখানে, আমাদের এই গ্রামে কোনো অন্যায় কাজ করতে দেব না। বেআইনি বোমা তৈরির যে ক-টা কারখানা হয়েছে, সেটা বন্ধ করব। সীমান্ত থেকে মেয়ে, ড্রাগ, সোনা পাচার সব বন্ধ করব।
বাবা অবাক দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। বেশ বুঝতে পারলাম, সে দৃষ্টিতে একটা বিস্ময় আর প্রশংসা একই সঙ্গে মিশে আছে। যেন বলছে, কী করে তোর এত সাহস হল বল তো! শাবাশ।
আমার কথা শুনে অট্টহাসি করে উঠল হেবো আর তার সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল ওর পোষা গুন্ডার দল।
হাসতে হাসতে বলে উঠল, ল্যাংড়ার তো ভারী সাহস! —বলে উঠে দাঁড়িয়ে কদর্যভাবে আমার হাঁটার ভঙ্গি দেখিয়ে বলে উঠল, একা হাঁটতে পারে না। আর আমাদের বোমা তৈরির কারখানা বন্ধ করবে!
'হা হা' করে সঙ্গে হাসতে লাগল হেবোর দল।
হেবো ফের লাল চোখ করে ওর ভারী গলায় বলে উঠল, আচ্ছা, কী করে এরপরে আর এখানে একদিনও থাকিস, দেখে নেব। আমার একটা এথিকস আছে। আমি সক্কাল সক্কাল খুনজখম করে হাত ময়লা করতে চাই না। ছয় ঘণ্টা সময় দিলাম ভাবার।
ওরা সব দুমদাম করে বেরিয়ে গেল।
বাবা দেখি, উত্তেজনায় কাঁপছে। চোখে জল। অশক্ত দু-হাত দিয়ে আমার বাঁ হাত চেপে ধরেছে।
শুধু শান্ত গলায় বলে উঠল, যত কম ক্ষমতাই থাকুক-না কেন, আমাদের সত্যের পথে থাকতে হবে। আমরা আমাদের পথ তৈরি করি। সেখানে একটা ছোটো ইটেরও অনেক গুরুত্ব আছে। না হয় আমরা প্রথম ইটটা পেতে দিয়ে যাব অন্যায়ের বিরুদ্ধে। খুব ভালো কাজ করেছিস বাবুন।
আমার বাবা মাধ্যমিকের পরে পড়ার সুযোগ পায়নি। তবু এত ভালো শিক্ষক আমি আর কোনোদিন দেখিনি।
কিছুক্ষণ বাদে আবার আরেকটা সরু কাগজ পেলাম টেবিলের উপরে, কোথা থেকে কখন এল বুঝতে পারলাম না। আগের বারের থেকেও ছোটো হরফে বেশ কিছু টাইপ করা অক্ষর। দেশলাইয়ের গায়ে কাগজটা জড়াতে, আসল অর্থ খুঁজে পেলাম। দেখলাম তাতে লেখা 'পিপীলিকা বাহিনী প্রস্তুত। '
২৮ মে
তখন রাত ক-টা হবে, জানি না। হঠাৎ দেখি, দরজায় কে যেন জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে।
বাবা অসুস্থ। এত আওয়াজে শরীর খারাপ লাগবে। এত রাতে কে এল! প্রথমেই ওদের কথা মনে এল। সারাদিন আসেনি। এখন কি ওরা ফিরে এসেছে?
ঘড়িতে দেখলাম রাত দেড়টা। নিশ্চয়ই এত রাতে ভালো কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি।
বাইরে উকি মেরে দেখি ঠিক তা-ই। প্রায় জনা কুড়ি লোক বাইরে জড়ো হয়েছে। কয়েকজনের হাতে লাঠি, ছোরা। একজনের হাতে একটা মশালজাতীয় কিছু, তাতে আগুন জ্বলছে। সঙ্গে মনে হল কয়েকটা ক্যান। ওগুলোতে কি কেরোসিনজাতীয় কিছু আছে আগুন লাগানোর জন্য?
এবারে সত্যি ভয় লাগল। ওরা তার মানে আমরা না বেরোলে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে। আমাদের পুড়ে মরতে হবে। আর বেরোলে পিটিয়ে মারবে।
আমি অবলম্বন ছাড়া হাঁটতেও পারি না। এসব দেখে আশপাশের কেউ যে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না, সে বিষয়েও নিশ্চিত।
আর রাতে করছে অর্থাৎ কেউ দেখে ফেললে, তাকেও ওরা জ্যান্ত রাখবে না। এমনিতেও আজ সরু কাস্তের মতো একফালি চাঁদ, সেটাও মেঘের আড়ালে।
দরজা খুলব কি খুলব না, ভাবতে-না ভাবতেই দেখি, দরজা ভেঙে দুদ্দাড় করে কয়েকজন ঘরে ঢুকে পড়েছে।
এসে ঘরের এক-একটা জিনিষ বাইরে ছুড়ে ফেলতে শুরু করল।
কিন্তু তার ঠিক পরমুহূর্তে যা হল, তা বুঝিয়ে বলা মুশকিল।
দেখি, লোকগুলো নাচতে শুরু করেছে। শুধু যারা ঘরের ভেতরে ছিল, তারাই নয়। বাইরে যারা আছে, তারাও।
বেশ অন্য ধরনের নাচ। আমি খুব কম সিনেমাই দেখেছি। তবে আমার দেখা কোনো হিন্দি বা বাংলা সিনেমার নাচের মতো নয়। আর সঙ্গে 'উরিবাবা' 'উরিবাবা' করে গানও জুড়েছে। হয়তো কোনো সাম্প্রতিক সিনেমার গান।
নাচতে নাচতে দেখি, হাতের লাঠি, ছোরা ছুড়ে ফেলে জামা-প্যান্ট খুলতে শুরু করল।
সে দৃশ্য ঠিক কহতব্য নয়।
তারপরে বুঝলাম ব্যাপারটা। আসলে মশালের আলোর বাইরে অন্ধকার থাকার জন্য ভালো করে বুঝিনি। মনে হল, ওদের গায়ের মধ্যে অজস্র পিঁপড়ে যেন চলেফিরে বেড়াচ্ছে। আর তাদের কামড়ের জন্যই ওরা অমন নাচতে শুরু করেছে।
ব্যাপারটা বেশিক্ষণ চলল না। মিনিট দশেকের মধ্যে সামনের রাস্তা একেবারে পরিষ্কার শুনশান। শুধু কিছু লাঠি, ক্যান, ছোরা রাস্তায় পড়ে আছে।
২৯ মে
পরের দিন সকাল সকাল থানা থেকে ডাক এল। তবে এমনিতেই যাব ভেবেছিলাম। হামলার কথা জানাতে।
আমি থানায় ঢুকতেই দিগম্বরবাবু যেন হুংকার করে উঠলেন। দেখি ওর চোখ টকটকে লাল।
আমাদের গ্রামের যাত্রাপালায় যে লোকটা রাবণের পার্ট করে, তার থেকেও এঁকে বেশি ভালো মানাত ওই রোলে।
—এসব কী হচ্ছে?
—স্যার, কী হচ্ছে মানে?
—শুনলাম, তোমাদের বাড়িতে কথা বলতে, বোঝাতে এই গ্রামের সজ্জন কিছু লোক গিয়েছিল। তাদের উপরে তোমরা নাকি আক্রমণ করেছ?
—মানে স্যার? কিছুই বুঝলাম না। আমাদের বাড়িতে হামলা হল। ওরা কী করে চোট পেল, কে জানে!
—আচ্ছা, চালাকি হচ্ছে, দেখাব? —বলে দেখি, দিগম্বরবাবু একজনকে ঘরে ডেকে নিলেন।
এ লোকটাকে দেখিনি আগে। তবে কাল রাতে নির্ঘাত ওই দলে ছিল।
লোকটা দেখি, কাঁদো কাঁদো মুখে জামা খুলে দাঁড়াল। সারা গা লাল হয়ে ফুলে গেছে। সত্যি এরকম কখনো আগে দেখিনি।
—কী করে হল? কী করেছিলে? স্বীকার না করলে কীভাবে সব কথা আদায় করতে হয়, সে আমি জানি।
—জানি না। মনে হচ্ছে তো কাঠপিঁপড়ের কামড়।
লোকটা হাউমাউ করে বলে উঠল, উফফ সে কী যন্ত্রণা, কী বোঝাব। একশোটা একসঙ্গে। নির্ঘাত এরাই কিছু করেছে। আমাদের গায়ে ছেড়ে দিয়েছে।
বলে উঠলাম, স্যার, আপনি কোনোদিন শুনেছেন, কাঠপিঁপড়ে পোষ মানে!
—হ্যাঁ, তা ঠিক। তা হয় না। সেরকম ঠিক শুনিনি।
—তাহলে আমি কী করে ওদের পোষ মানাব বলুন? আর আমিও তো সেখানেই ছিলাম, যখন ওরা সব শান্তভাবে এসে বোঝাচ্ছিল। আমাকে কেন কামড়াল না বলুন? কাঠপিঁপড়ে কি লোক দেখে কামড়ায়! আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না যে ওরা কাল মাঝরাতে এসে বোঝাতে গিয়ে তারপরে ওরকম নাচ শুরু করল কেন!
—হুম। যাক গে, আমি কিন্তু আমার এখানে অন্যায় কিছু বরদাস্ত করি না। যদি দেখি, এর পিছনে তোমার কোনো হাত আছে, তাহলে ছেড়ে দেব না। চামড়া খুলে নেব।
বুঝলাম, এবারে সরাসরি সত্যিটা বলার সময় এসেছে।
বলে উঠলাম, কিন্তু আপনি তো অন্যায়ের সমর্থনই সমানে করছেন। আমাদের ভয় দেখিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হচ্ছে, বাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেটা জেনেও সে বিষয়ে আপনি তো কোনো কিছুই করছেন না। এরা কারা, এরা কাদের দলের লোক, এরা কী ধরনের কাজ করে, তা আপনি ভালোই জানেন। এটাও জানেন যে গত কয়েক বছর ধরে এখানে যেসব নানান অসামাজিক কাজ হচ্ছে, তাতে এরাই যুক্ত আছে। কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন এদের বিরুদ্ধে?
—চোওওওপ, চোওওওপ— দিগম্বরবাবু দেখি, উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন।
সেই চোখরাঙানি অগ্রাহ্য করে বলে উঠলাম, এখানে যে বর্ডারের ওধার থেকে অন্যায়ভাবে ড্রাগ, সোনা, মেয়ে চালান আসে, এখানে বেআইনিভাবে বোমা তৈরি হয়, এগুলো তো কোনোদিন থামানোর চেষ্টা করেননি। সবাই আপনার কাছে জানিয়েও পুলিশের কাছে কোনো সাহায্য পায় নি।
দিগম্বরবাবু যেন কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না রাগে। চোখ আরও লাল হয়ে উঠল। ফ্যাসফেসে গলায় বলে উঠলেন, খুব বাড় বেড়েছে দেখছি। আমাকে চেনো না। কাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে, ভাবতেও পারবে না। এমনভাবে পা ভেঙে দেব যে ক্র্যাচ নিয়েও হাঁটতে পারবে না। এখানে অনেকে বীরত্ব দেখাতে এসে রাতারাতি হারিয়ে গেছে, তা জানো তো!
—হ্যাঁ, সে জানি। রহিমকাকা, বাসুদেবদার মতো লোকেরা যারাই এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে, তাদের কিছুদিন পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আপনাদের দায়িত্ব তো আমাদের রক্ষা করা। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে আপনাদের মতো অসৎ পুলিশের জন্যই আমাদের গ্রাম ছাড়তে হয়।
দিগম্বরবাবু মনে হয়, রাগে কী করবেন বুঝে না পেয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। যেকোনো সময়ে মনে হল, ফেটে পড়তে পারেন রাগে।
আমিও আর দাঁড়ালাম না।
ক্র্যাচ নিয়ে সোজা থানা থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রথমবার মনে হল, আমি যেন কোনো কিছুর ভরসা ছাড়াই হাঁটতে শিখে গেছি।
৩ জুন
যতই মুখে বলি-না কেন, আর এ গ্রামে থাকার ইচ্ছে ছিল না। এভাবে ভয়ে ভয়ে এদের বিরোধিতা করে কতদিন থাকা যায়? বাবাও এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। কবে চলে যাবে, কে জানে!
লোকে অনেক কথা মনে রাখে না। দশ বছর আগে রাজু আমাকে দিয়ে গিয়েছিল পাল বংশের গুপ্তধনের হদিশ।
এই গ্রামেই লুকোনো ছিল রাজা রামপালের সম্পদ। দুটো মোহর ভরতি ঘড়া। এইসব খারাপ লোক যখন এখানে প্রথম আসতে শুরু করল, তখন তারা এসেছিল এসব গুপ্তধনের সন্ধানেই।
ওদের কাছে ছিল এই গুপ্তধনের হদিশ, যা সাংকেতিক ভাষায় লেখা ছিল।
রাজুকে ওরা ধরে নিয়ে যায়। ওরা খবর পেয়েছিল যে রাজু যেকোনো সংকেত উদ্ধার করতে পারে। কিন্তু রাজু কখনো অন্যায়কে সমর্থন করে না। সেজন্য ওর উপরে অনেক অত্যাচার করলেও ওদেরকে এই সংকেতের অর্থ উদ্ধার করে দেয়নি। শেষে ওরা ভাবে যে ও বোধহয় এই সংকেত উদ্ধার করতে পারবে না। অনেক মারধরের পরে ছেড়ে দেয়।
ও কিন্তু জানত, সেই গুপ্তধন কোথায় আছে। ও সেটা উদ্ধার করতে পেরেছিল। আমাকে সেটা জানিয়ে যায়। আমি সেই গুপ্তধন উদ্ধার করে সরকারের হাতে তুলে দিই। সেই টাকাতে এখান থেকে কিছু দূরে একটা হাসপাতাল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোথায় কী! দশ বছরেও সে হাসপাতালের কাজ শেষ হয়নি। সে টাকার একটা বড়ো অংশ খারাপ লোকেদের হাতেই শেষে চলে গেছে। যেজন্য এত কষ্টস্বীকার করে রাজু ওদের বলেনি, সেই উদ্দেশ্যই শেষে সফল হয়নি।
সেটা হলে বা তার থেকে কিছু মোহর রেখে দিলে, আজ আমার বাবাকে কোথায় কীভাবে চিকিৎসা করাব, সেটা নিয়ে এত ভাবতে হত না।
এসব ভেবে মন আরও খারাপ হয়ে গেল। এক-একটা দিন বাবা আরও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার বলেছিল, ঠিক চিকিৎসা হলে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু কোথায় পাব এত টাকা!
আমার মন খারাপ হলে পুকুরধারে গিয়ে বসি।
সেটাই করলাম আজও। পুকুরধারে বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি, মোহনকাকু খুব জোর পায়ে আমার দিকে আসছে। চোখে-মুখে ভয়।
আমাকে দূর থেকে ডেকে বলে উঠল, শিগগির দোকানে যা। ওরা তোদের দোকানে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে যতটা পারলাম, জোরে এগোলাম দোকানের দিকে।
কিন্তু কাছে গিয়েই থমকে দাঁড়ালাম। আগুন জ্বলছে পুরো দোকান ঘিরে।
অনেক চেষ্টার পরে যখন আগুন থামল, তখন সব শেষ। পুড়ে শেষ হয়ে গেছে দোকান। দোকানের সব জিনিসপত্রও।
আর আমাদের কিছুই রইল না। জানি না এসব ধারে কেনা জিনিসের দামই বা শোধ দেব কী করে। চুপ করে অনেকক্ষণ বসে রইলাম দোকানের সামনে। শুধু যেন কঙ্কাল পড়ে আছে।
আমি আর থানায় গেলাম না। জানিয়ে কী লাভ? অনেকক্ষণ পরে বাড়ি পৌঁছে বাবাকে কিছু বললাম না। এ খবর জানলে বাবা আরও ভেঙে পড়বে। বলা যায়, আমাদের আজ থেকে আর কোনো সহায়সম্বল থাকল না। আগামীকালও এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। বাবা হয়তো ভাববে, দোকান যাচ্ছি না কেন। সেজন্য বিকেলে বেরোব, ঠিক সে সময় একটার পর একটা কান-ফাটানো আওয়াজ। শুধু একবার নয়, বার বার। যেন কেউ বার বার বোমা ফাটাচ্ছে।
আওয়াজটা আসছিল গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে। বোমা তৈরির ফ্যাক্টরিতে কীভাবে জানি আগুন লেগে গেছে। একই সঙ্গে ফ্যাক্টরিতে যেসব বোমা মজুত ছিল, সেগুলো ফাটতে শুরু করেছে। লোক ছুটোছুটি করছে।
দেড় ঘণ্টার পরে সব শান্ত হল। দেখলাম, ওদিকের আকাশ যেন ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে।
রাতের দিকে পুরো খবরটা পেলাম। কীভাবে আগুন লাগল, এতগুলো বোমা বিস্ফোরণ হল, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
এর মধ্যেই এক বিশেষ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরকারি তদন্তদল আমাদের গ্রামে এসে পৌঁছেছে।
তারা আমাদের গ্রামের হেবো, হেবোর দলের অনেক লোকজন ও আরও এসবের পিছনে থাকা বড়ো বড়ো পান্ডাকে অ্যারেস্ট করেছে। দুজন বড়োমাপের নেতাকেও নাকি এসবের জন্য কলকাতা ও বর্ধমান থেকে অ্যারেস্ট করেছে। সরকারি তদন্তকারী সংস্থার কাছে নাকি এদের সব অপরাধের তথ্যপ্রমাণও আছে।
শুনলাম, এই গ্রাম থেকেই কোনো একজন এই সরকারি তদন্তকারী সংস্থার কাছে এসব জানিয়েছিল। শুধু জানিয়েছিল তা-ই নয়, এদের সব কর্মকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণও তুলে দিয়েছে। আর এই বেআইনি বোমা ফ্যাক্টরিতে বিস্ফোরণের জন্য সেটা আরও সবার কাছে, এমনকী মিডিয়ায় কাছেও পৌঁছে গেছে।
অনেকের ধারণা, সেই ব্যক্তি হলাম আমি। আমার জন্যই সরকারি তদন্তকারী সংস্থা খবর পেয়েছে।
আমি নিজে অবশ্য বুঝতে পারছিলাম না যে রাজু এত তাড়াতাড়ি এসব কী করে করল।
আমরা এখন এই গ্রামেই থাকতে পারব। তবে সবকিছু আবার করে শুরু করতে হবে। আমাকে পারতেই হবে।
আকাশের দিকে তাকালাম। রাত হয়ে আসছে। কিন্তু তবু যেন আজ অনেক বেশি আলো।
৪ জুন
পুকুরধারে বসে ছিলাম। গোধূলির কমলা আলো এসে পড়েছে সামনের গাছের মাথায়। কমে-আসা আলোয় আলো-আঁধারির খেলা শুরু হয়েছে।
এতদিন বাদে শান্তি। একই সঙ্গে এত আনন্দ আগে কখনো পাইনি।
এসবই ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখি, কিছু দূরে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। রাজু?
চেঁচিয়ে ডেকে উঠলাম।
—রাজু? কোথায় ছিলিস এতদিন? আগে দেখা করিসনি কেন?
ও দেখি, চুপ করে পাশে এসে বসল। ওর হাতে একটা ডায়েরি।
আস্তে আস্তে বলে উঠল, খুব ভালো লাগছে, তা-ই না! দেখলি, কত সহজে সব ক'জন ধরা পড়ল। একটা ফুটোনৌকো ডোবানোর জন্য বড়ো ঝড়ের দরকার হয় না। আপনা থেকেই ডোবে।
সায় দিয়ে বলে উঠলাম,কী যে আনন্দ হচ্ছে। এসব খারাপ কাজ যে বন্ধ করা গেছে, এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে!
—শোন, যেজন্যে এলাম। তোকে শুধু একটা জিনিস দিয়ে যেতে চাই। এটা আমার লেখা ডায়েরি। এতে তোর আর আমার অনেক ছোটোবেলার কথাই লেখা আছে। আর এর মধ্যে সাংকেতিকভাবে লুকিয়ে রাখা আছে একটা খুব বড়ো গুপ্তধনের হদিশ। আসলে পাল বংশের প্রায় সব ধনরত্নই কিছু দূরের একটা গ্রামে লুকিয়ে রাখা আছে। আগের বারে যা পেয়েছিলাম, সেটা এর তুলনায় কিছুই নয়। তবে এটা সাংকেতিক ভাষায় লিখেছি। শুধু তুই এটা উদ্ধার করতে পারবি। অন্য কেউ পারবে না।
হেসে ফের বলে উঠল, ভাবছিস, সরাসরি জানাতেই তো পারতাম, তা-ই না! কিন্তু আমি চাই, তুই এই সংকেতের জগৎকে একটু একটু করে বুঝতে শিখিস। তাহলে আমার সঙ্গেও সহজে যোগাযোগ করতে পারবি। পড়ে দেখ।
হাতে নিয়ে খাতাটা পড়তে শুরু করলাম। রাজুর মুক্তোর মতো হাতের লেখা। কিছুটা পড়ে বলে উঠলাম এসব সংকেত আমি উদ্ধার করতে পারব না।
—আহা, চেষ্টা করেই দেখ-না। এত সহজে ছেড়ে দিলে হয়?
আবার কিছুটা পড়লাম। মিনিট পাঁচেক। এবারে মনে হল, কিছুটা বুঝলাম।
—এর মধ্যে কিছু বানান ভুল আছে। তুই তো কখনো বানান ভুল করিস না!—অবাক হয়ে বলে উঠলাম।
—ঠিক বলেছিস। আর কিছু লক্ষ করলি?
—আর মনে হচ্ছে, কিছু জায়গায় যা লিখেছিস, যেমন ধর ওই একসঙ্গে কালীপুজোর সময়ে চকোলেট বোমা ফাটানোর কথা, সেরকম কিছু তো আমরা কখনো করতাম না। আমরা দুজনেই শব্দবাজি পছন্দ করতাম না। তুই এরকম লিখলি কেন? নিশ্চয়ই এর মধ্যেও কিছু সংকেত আছে, তা-ই না!
—এই তো গোপনীয় কোড বা সাইফার বুঝতে শিখে গেছিস। ঠিক বলেছিস। দেখ এটা অন্য কারো পক্ষে বোঝা বা জানা সম্ভব নয়। শুধু আমি বা তুই এটা জানি। যেসব শব্দে দেখবি, এরকম বানান ভুল আছে, আর যেসব জায়গায় আমার আর তোর ছোটোবেলার কথা ভুল লেখা আছে, সেসব শব্দের মধ্যেই এই গুপ্তধনের সন্ধান আছে। আরও কী কী করতে হবে তা তুই জানিসই। তুই এটা রাখ। আমি জানি, তুই এটা উদ্ধার করতে পারবি। তোর কাছে এই গুপ্তধন থাকলে, আমি নিশ্চিত যে সেটা সবার ভালো কাজে লাগবে।
—কিন্তু আমার আর নিজের টাকার কী দরকার আছে!
ও হেসে উঠল। বলে উঠল, তোর যে দরকার নেই, কোনোদিন দরকার হবে না, তা আমি জানি। তুই এটা দিয়ে এই গ্রামে একটা ভালো স্কুল করিস। একটা কেন, আমার ধারণা, বেশ কয়েকটা ভালো স্কুল হতে পারে এর টাকায়। ভালো পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার থেকে বড়ো শক্তিশালী আর কিছু হয় না।
আর তোর নিজের দরকার না হলেও মেসোমশাইকে তুই আবার ওই হাসপাতালে নিয়ে যাস। ওখানে এবারে আর তোর ভরতি করতে অসুবিধে হবে না। আমি সেসব ব্যবস্থা করে এসেছি। শুধু তোকে গিয়ে এবারে তোর আর মেসোমশাইয়ের পরিচয়পত্র দেখাতে হবে।
—মানে? সেটা আবার কীভাবে করলি?
—কেন, আমার কি টাকা নেই!—বলে একটু থেমে ফের বলে উঠল, আমাকে চলে যেতে হবে। তুই কিন্তু নিজের উপরে সব সময় ভরসা রাখবি। প্রকৃতির যেকোনো সুন্দর কিছুই কিন্তু তোর মতোই পারফেক্ট নয়। সেটা খেয়াল করেছিস? আমরা কোনো গাছ দেখে যখন খুব সুন্দর বলি, তখন দেখবি সে গাছটা অন্য সব গাছের থেকে অন্যরকম, ঠিক তোর মতোই অন্যরকম, সবার থেকে আলাদা। আর চিন্তা করিস না। মেসোমশাই ঠিক সুস্থ হয়ে যাবেন। কালকেই ভরতি করে দিস।
আমার গলা অবরুদ্ধ হয়ে এল। যাক, এবারে তাহলে বাবার চিকিৎসা করা যাবে। কী চিন্তার মধ্যে ছিলাম। কী করে ও জানল এতো কিছু!
—কিন্তু তুই কবে ফিরে আসবি এখানে?
ও দেখি একটু উদাস হয়ে গেলো। তারপরে বলে উঠল, আমি আসলে যেখানে আছি, সেখান থেকে ইচ্ছেমতো ফিরে আসা যায় না। কিন্তু মনে রাখবি, আমি তোর সঙ্গে আছি। আজ আসি। তোকে ওই ডায়েরিটা দিতেই এসেছিলাম।
একটু থেমে ও আস্তে আস্তে ফের বলে উঠল, জানিস, সব সংকেত আমি উদ্ধার করতে পারি। কিন্তু এখনও আমার মায়ের রাখা সেই রুমালের নকশা উদ্ধার করতে পারিনি। ফাদার যখন আমাকে পেয়েছিল, আমার পাশে যে রুমালটা পাওয়া গিয়েছিল, সেই রুমালের নকসা। আজও কিন্তু আশা ছাড়িনি। যখন ওই সংকেত উদ্ধার করতে পারব, তখনই হয়তো খুঁজে নিতে পারব আমার মা-কে। পারতেই হবে। ভালো থাকিস। আর পারলে একবার ও.সি.-র সঙ্গে দেখা করিস।
—কেন? উনি তো একেবারে খেপে আগুন হয়ে আছেন আমার উপরে। সব সাঙ্গোপাঙ্গ ধরা পড়ে গেছে। সব বাড়তি রোজগারের উপায় বন্ধ হয়ে গেছে।
—আহা, গিয়েই দেখ-না। বলেছিলাম না আমার বন্ধু অ্যালিয়েনরা সবাই খুব শান্ত। সম্পূর্ণ ননভায়োলেন্সে বিশ্বাস করে। তবে ওরা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। ঠিক যেমন তোর জন্য তোর পছন্দমতো জগৎ তৈরি করেছিল। গত পরশু বোমার ফ্যাক্টরির লোকেদের জন্য কালীপুজোর পরিবেশ তৈরি করেছিল, যাতে ওদের মনে হয় ওইসব মারাত্মক বোমা হল সামান্য শব্দবাজি। এখন ওরা ওই দিগম্বরবাবুর জন্য আবোল-তাবোলের জগৎ তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে উনি পড়ে থাকবেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।
—মানে?
—গিয়েই দেখ-না। যাই। আবার কোনোদিন দেখা হবে। আমার টাইম ফুরিয়ে এসেছে। —বলে রাজু উঠে দাঁড়াল। তারপরে দ্রুতপায়ে পুকুরের পাশ দিয়ে আবার কোথায় উধাও হয়ে গেল।
আমাকে থানা অব্দি যেতে হল না। পথেই দিগম্বরবাবুর সঙ্গে দেখা হল। দেখি, আমাকে প্রায় লক্ষ না করেই পাশ দিয়ে হাত তুলে বলতে বলতে চলেছেন—
আয় রে ভোলা খেয়াল-খোলা
স্বপনদোলা নাচিয়ে আয়
আয় রে পাগল আবোল-তাবোল
মত্ত মাদল বাজিয়ে আয়।
তারপরে একটু থেমে আবার হাত তুলে নাচতে নাচতে বলে উঠলেন—
আয় যেখানে খ্যাপার গানে
নাইকো মানে নাইকো সুর।
আয় রে যেথায় উধাও হাওয়ায়
মন ভেসে যায় কোন সুদূর।
নাচতে নাচতে কোথায় যেন চলে গেলেন।
২৫ জুলাই ২০২২
কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন