অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
—আরেকটু জোরে গাড়ি চালাও, দেরি হয়ে যাবে যে!
—যা রাস্তা, চারদিকে যেরকম জ্যাম, দেখছই তো। এর থেকে আর জোরে চালানো যাচ্ছে না।
—কিন্তু দেরি হয়ে যাবে যে! এগারোটার মধ্যে ওখানে পৌঁছোতেই হবে।
—তার অনেক আগে পৌঁছে যাব। এত টেনশন কোরো না। তুমি সবেতেই বেশি টেনশন করো।
দেবাশিস নিশ্চিত ছিল দেরি হবে না। প্রায় আধ ঘণ্টা আগেই পৌঁছে যাবে যাদবপুর। অনেকটা পথ বলে বেশ খানিকটা বাড়তি সময় হাতে রেখে বেরিয়েছে।
কিন্তু ঠিক যা ভয় করেছিল, সেটাই হল। কলকাতায় সবকিছুই আনপ্রেডিক্টেবল। আরও কিছুটা আগে গিয়েই দেবাশিস দেখল সামনের রাস্তার অর্ধেকটা বন্ধ। কাজ হচ্ছে। বাকি অর্ধেক রাস্তা দিয়ে দু-দিকের ট্র্যাফিক পাশ করানো হচ্ছে। সেজন্য বেশ কিছুটা রাস্তা ভালো জ্যাম হয়েছে। সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কচ্ছপের গতিতে এগোচ্ছে। তার মধ্যে এদিক-ওদিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে বা গাড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটা সাংঘাতিক অবস্থা হয়েছে যে তাতে দু-দিকের গাড়িই আটকে গেছে। একেবারে দাবার স্টেলমেট কন্ডিশন। কারো কিছু করার নেই।
এবারে নিজেই উত্তেজনায় ঘামতে শুরু করল। পাশে অনীতাও ছটফট করছে। ফের বলে উঠল, কবে থেকে বলছি। এতটা রাস্তা। ভোর ভোর বেরিয়ে পরে ওখানে পৌঁছে অপেক্ষা করতে পারতাম। বাবুর কতটা খারাপ লাগবে যদি দেখে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গ্র্যাজুয়েশনের কনভোকেশনের সময় আমরা কেউ ওখানে নেই।
দেবাশিস আর অনীতার এক ছেলে। ভালোনাম রজত। আদরের ডাকনাম বাবু। এমন কোনো দিন যায় না, এমন কোনো ঘণ্টা কাটে না যেখানে 'বাবু'কে নিয়ে আলোচনা হয় না। কিন্তু সেই 'বাবু' গত চার বছর হস্টেলে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করছে। শুধু বছরে সামান্য কিছুদিন ওর সঙ্গে দেখা করা যায়। তার মধ্যে আজকের দিন আবার অত্যন্ত স্পেশাল। গ্র্যাজুয়েশনের কনভোকেশন ফাংশন।
গত বেশ কিছুদিন থেকেই দুজনের চোখে ঘুম নেই। শুধু আজকের দিনটার অপেক্ষা। কতদিন বাদে আবার বাবুকে দেখা যাবে।
আর সেই আজকের দিনেই এরকম হতে হল। একজন ট্র্যাফিক পুলিশ কিছু দূরে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে এদিকে নজর রাখছিল। যেন এই চরম অব্যবস্থা নিজের পক্ষে আর সামলানো সম্ভব নয় বলে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।
গাড়ির জানলা নামিয়ে সেই পুলিশটার উদ্দেশে গালাগাল করে উঠল দেবাশিস— ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন! সব গাড়ি আটকে গেছে। যত্তসব ইরেসপন্সিবল ইনকমপিটেন্ট লোক। শুধু ঘুস খেতে জানে!
সেই ট্র্যাফিক পুলিসটা দেবাশিসের চিৎকার শুনে প্রথমে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপরে রেগে গিয়ে দূর থেকে কী সব বলে উঠল।
পাশ থেকে অনীতা বলে উঠল, এখন আর কোনো কাণ্ড বাধিয়ো না। চলো, গাড়ি রেখে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে বাবুর ওখানে যাই।
মাথা একটু ঠান্ডা করে বলে উঠল দেবাশিষ, ট্যাক্সি কী উড়ে যাবে! সে-ও তো এখানে জ্যামে আটকে থাকবে।
—কিন্তু তোমার মতো ঢিকঢিক করে গাড়ি তো আর চালাবে না!
কোনো উত্তর দিল না দেবাশিস। সেটা যে কোনো সমাধান নয়, সেটা ভালোই জানে ও।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য যানজট একটু কমে এল। ঠিক সময়ের মিনিট পাঁচেক আগেই ওরা ওখানে পৌঁছে গেল। ইউনিভার্সিটির মধ্যে যে কনফারেন্স হলে আজ ছাত্রদের গ্র্যাজুয়েশন উপলক্ষে সমাবর্তন হবে, সেদিকে এগিয়ে গেল। বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীই দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে সাহায্য করছে। এগিয়ে দিচ্ছে।
যেটা দেখা যায় না সাধারণত, সেটাই এখানে হচ্ছে। নিয়মশৃঙ্খলা মেনে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে হলের দিকে। নিশ্চয়ই বাকিরাও সব অন্য ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মা-নিকটাত্মীয়।
একজন ছাত্রী ওদের দেখে এগিয়ে এল। তারপরে ওদের দুজনকে হলের মধ্যে ওদের নির্দিষ্ট সিট অব্দি এগিয়ে দিল।
অনীতা জিজ্ঞেস করে উঠল, কী নাম তোমার? কী সাবজেক্ট? কোথায় পড়ো?
—রিনি। সেকেন্ড ইয়ার ইলেকট্রিক্যাল। —বলে মিষ্টি হেসে বলে উঠল, আপনারা বসুন। এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠান শুরু হবে। আমি আসি!
মেয়েটা চলে যেতেই অনীতা বলে উঠল, কী মিষ্টি মেয়েটা। বাবুর থেকে তার মানে বছর দুয়েকের ছোটো হবে। এরকম একটা মেয়ে বউমা হলে কী সুন্দর হবে তা-ই না!
দেবাশিস হেসে বলে উঠল ধুর, এখনকার ছেলে-মেয়েরা কি আর এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে কেরিয়ার নষ্ট করে? তোমার সেই ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড।
খানিক বাদে অনুষ্ঠান শুরু হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এক-এক করে সব ছাত্রছাত্রীকে ডেকে নিচ্ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, অন্য সাবজেক্ট দিয়ে শুরু করেছেন। সবাই স্টেজের উপরে উঠে সার্টিফিকেট নিয়ে নেমে আসছে। হলের সামনের দিকে ছাত্রছাত্রীরা বসে আছে। তাদের পিছন থেকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ওখানেই কোথাও বাবু নির্ঘাত বসে আছে।
অনীতা অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। বলে উঠল— আচ্ছা, ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে শুরু করতে পারত। অন্য সব সাবজেক্টে কত স্টুডেন্ট। ইঞ্জিনিয়ারিংটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত। ওটা শেষ করে তারপরে বাকি সাবজেক্টগুলো দিতে পারত। আচ্ছা, বাবু সামনে ওখানে বসে আছে, তা-ই না! যাব একবার! কত দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আবার শান্ত করল দেবাশিসবাবু, হ্যাঁ, হয়ে যাওয়ার পরে তো দেখা হবেই। এখন আর কী করে দেখা করবে!
শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হল। রজতের সাবজেক্ট কম্পিউটার সায়েন্স। খানিকক্ষণের মধ্যেই ডাক এল রজত রায়, কম্পিউটার সায়েন্স। নাম শুনে উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠেছিল দেবাশিস।
পাশ থেকে অনীতা হাত ধরে টান দিল, বসে দেখো-না! কী হচ্ছে! লোকেরা কী ভাবছে!
কিন্তু পরক্ষণেই স্টেজে রজত উঠে এসেছে। সেটা দেখে অনীতাও উঠে দাঁড়াল— ওই, ওই তো বাবু। কী রোগা হয়ে গেছে, তা-ই না! ঠিকঠাক খায় না নির্ঘাত।
উপাচার্যকে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে সার্টিফিকেট নিল রজত। রজত তৃতীয় হয়েছে। সেজন্য একটা মেডেলও পেল। দুজনেই সমবেত সবার সঙ্গে হাততালি দিল।
একবার অনীতা জোরে চেঁচিয়ে উঠল, বাবু।
তারপরে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল। কিন্তু রজত ঠিক শুনেছে মা-র গলার ডাক। পুরস্কার নিয়ে স্টেজের উপর থেকে মা-কে লক্ষ করে দেখে একবার হেসে নেমে গেল স্টেজের অন্যদিক দিয়ে।
আবার পরের জনকে ডেকে নেওয়া হল।
এবারে দেখা করা যাবে রজতের সঙ্গে। সেরকমই কথা ছিল।
সিট ছেড়ে কনফারেন্সের হলঘরের থেকে বেরিয়ে এল ওরা। কিছু দূরে আরেকটা বিল্ডিং। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করা যাবে। বিল্ডিংটায় ঢুকে লবি পেরিয়ে একটা ঘরের দিকে এগিয়ে গেল ওরা।
সেই ঘরে অবশ্য ঢোকার সামান্য লাইন ছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
মিনিট দশেক বাদে ঘরে ডাক পড়ল। ঘরের মাঝবরাবর একটা কাঠের পার্টিশন। তার উপরের দিকটা কাচের। এখানেই কাচের অন্যদিক দিয়ে দেখা যাবে রজতকে অর্থাৎ বাবুকে। বসার একটা সোফা আছে। কাঁচের উলটোদিকে আধো অন্ধকার। একটা আলো জ্বললেও, ইচ্ছে করে যেন অন্ধকারকে কিছুটা জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ওদের বসার কিছুক্ষণ বাদে উলটোদিকে এসে বসল রজত। ওর চোখ-মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত।
কাচের মাঝে একটা মাইক্রোফোন আছে। তাই কথা বলতে হলে জোরে বলার দরকার হয় না।
—কেমন আছ তোমরা!— রজতই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল।
ওদের গলা আনন্দে-আবেগে অবরুদ্ধ হয়ে এসেছিল। ওরা তা-ই কিছু বলতে পারল না সঙ্গে সঙ্গে।
বাবু ফের বলে উঠল, মা, তুমি কিন্তু বুড়িয়ে গেছ। সব চুল পেকে গেছে।
অনীতা একটু সামলে ভারী গলায় বলে উঠল, তা বয়স হচ্ছে, বুড়িয়ে যাব না! তুইও তো একেবারে বদলে গেছিস। রোগা হয়ে গেছিস। চুলের আবার কীরকম কায়দা হয়েছে। দাড়ি রেখেছিস বাবার মতো।
—বাবা কিন্তু একই রকম আছে।
হেসে উঠল দেবাশিসবাবু।
অনীতা ছদ্মরাগ দেখিয়ে বলে উঠল, এই, এক নম্বর বাবার সাপোর্টার। বানিয়ে বানিয়ে বলা হচ্ছে। বাবা আমার থেকেও বেশি বুড়িয়ে গেছে। তবে বাবা এখনও খুব অ্যাকটিভ। সারাদিন যা ব্যস্ত থাকে। অফিস, তারপরে নানান জায়গায় যাওয়া। আমার আর কী কাজ! এবারে তুই তো চাকরি জয়েন করবি। ব্যাঙ্গালোরে চাকরি পেয়েছিস শুনেছি। কবে যেতে হবে?
—এক মাস বাদে। তবে ভাবছি, দেশে থাকব না। আমেরিকা চলে যাব। আমার ডেটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। ভালো একটা অফার পেয়েছি একটা ক্যালিফোর্নিয়া বে-সড স্টার্ট আপ-এর কাছ থেকে।
—সেটা আবার কী!
—ও তুমি বুঝবে না মা।
—আমি তোর মা, বুঝব না, মানে! ঠিক বুঝব। ঠিক করে বোঝা।
ওরা কথা বলতেই থাকল। কত কথা জমে গেছে এতদিনে।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্ধারিত আধ ঘণ্টা শেষ হয়ে গেল। একটা লোক এসে দাঁড়াল রজতের পিছনে। আর যে ঠিক এক মিনিট বাকি, সেটা নির্দেশ করে আবার সরে গেল। তার মানে আবার ঠিক এক মিনিট বাদেই হারিয়ে যাবে রজত।
অনীতার চোখে জল এসে গিয়েছিল। মাঝের কাচের উপরে হাত রেখে বলে উঠল, তোকে ভারী ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। কত বড়ো হয়ে গেলি। কিন্তু এত কম সময় দেখার সুযোগ পাই। ইচ্ছেমতো দেখাও করা যায় না।
রজত উঠে দাঁড়িয়েছে— আর সময় নেই, মা। এবারে যেতে হবে। ভালো থেকো তোমরা। আবার কয়েক মাস বাদে দেখা হবে।
দেবাশিসেরও চোখে জল এসে গিয়েছিল। বলে উঠল, ভালো থাকিস বাবু। সাবধানে থাকিস। কী করছিস, মাঝেমধ্যে খবর পাই। কিন্তু কথা বলা তো আর যায় না!
রজত কাচের উলটোদিকে দাঁড়িয়ে একবার কাচে হাত দিল, ঠিক যেখানে অনীতা হাত রেখেছিল, তার উলটোদিকে। যেন মাঝে কোনো কাচ নেই। যেন মা-র হাতকেই ছুঁয়েছে।
তারপরে ফের বলে উঠল, আমি সব সময় তোমাদের সঙ্গেই আছি। এই তো আবার কয়েক মাস বাদেই দেখা হবে।
ওর চোখ যেন ছলছল করে উঠল।
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
দেবাশিসবাবু ও অনীতা বসেই রইল আরও কিছুক্ষণ। দুজনের চোখেই জল।
আবার কতদিন বাদে দেখা হবে। তার মধ্যে কত কিছু হতে পারে। ততদিন ওরা বেঁচে থাকবে কি না কে জানে! কিন্তু তার আগে দেখা করা যাবে না। সেরকমই এগ্রিমেন্ট ছিল। মাঝের সময়টা কম করালে যে ভালো হত এখন সেটা ওরা বেশ বুঝতে পারে।
কিন্তু তাতে আরও অনেক খরচ বেশি পড়ত। তা ছাড়া ওরা সেটা রেকমেন্ডও করে না। কিছুটা দূরত্ব নাকি রাখতেই হয়। সময় এবং স্পেসে।
এমনিতেও দেবাশিস যা রোজগার করে, তার একটা বড়ো অংশ চলে যায় এই ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সংস্থার কাছে রজতকে এভাবে দেখার জন্য।
ওরা আরও খানিকক্ষণ বসে থেকে উঠে দাঁড়াল।
অনীতা বলে উঠল, কী ভালো হত, যদি বাবুকে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারতাম। কতদিন ছেলেটাকে ভালো করে দেখিনি।
বলে আবার স্বগতোক্তি করে উঠল, তবে ছেলেটা যে ভালো আছে, সেটাই আসল। ভালো চাকরিও পেয়েছে বলল আমেরিকায়।
দেবাশিসবাবু বলে উঠল, আমাদের ছেড়ে একদম একা থাকতে পারত না, মনে পড়ে? আর এখন। আবার আমেরিকা যাবে নাকি!
—কে যেতে দিচ্ছে ওকে আমেরিকা! আমি বোঝাব যাতে ও আমেরিকা না যায়। কী দরকার অতদূরে যাওয়ার? —একটু থেমে ফের বলে উঠল অনীতা, আচ্ছা, ওকে কোনোদিন বাড়িতে নিয়ে আসা যায় না!—অনীতা প্রশ্নটা করেই চুপ করে গেল। কারণ উত্তরটা ওর জানা। ওদের দুজনেরই জানা।
দেবাশিস খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ফের বলে উঠল, এই যে এটুকু পেয়েছি, তা-ই বা কম কীসে! তবে ওকে তো আর আমরা এর থেকে কাছে পেতে পারি না।
চুপ করে রইল ওরা। তারপরে দুজনের অচেনা দুটো ছায়া যেন এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে।
গাড়িতে উঠে অনীতা কাঁদতে শুরু করল। দেবাশিসের চোখেও জল।
দশ বছর আগে স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় রজত হঠাৎ মারা যায়। স্কুলে খেলার সময় অ্যাক্সিডেন্টে মাথায় চোট পেয়েছিল রজত। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পথেই মৃত্যু হয়। একটা দিন, সেই একটা দিন সব কিছু উলটে-পালটে দিয়ে চলে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে আঁকা একটা চন্দনের আলপনার যেরকম অবস্থা হয় ঝড়বৃষ্টির রাতে, ঠিক সেরকমই।
সেই মুহূর্তেই সবকিছু যেন থমকে গিয়েছিল ওদের। হারিয়ে গিয়েছিল বেঁচে থাকার সব উদ্দেশ্য। অনীতা শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারো সঙ্গে কথা বলত না বেশ কিছুদিন। এমনকী দেবাশিসও আত্মহত্যার কথাই ভেবেছিল। ঠিক সেই সময় এই সংস্থার কথা জানতে পারে ওরা।
রজত বড়ো হলে ঠিক কীরকম দেখতে হবে, ঠিক কীভাবে হাঁটবে-চলবে,কীভাবে কথা বলবে, কী কাজ করতে পারবে, ঠিক সে অনুযায়ী ওকে সামনে নিয়ে আসে এই সংস্থা। যা হতে পারেনি রজত, কিন্তু বেঁচে থাকলে যা হতে পারত, সেই সম্ভাবনার উপরে দাঁড়িয়ে ওরা রজতকে যেন ফের জীবন দেয়।
রজতের উপস্থিতি এখন শুধু এই ভার্চুয়াল জগতে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্য নিয়ে ও বড়ো হলে ঠিক কীরকম হত, সে গণনার উপরে আজ ওর জীবন দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো, হতে পারত এসব সম্ভাবনার উপরে দাঁড়িয়ে আছে ওর আজকের এই উপস্থিতি।
এই রজত যে ওদের 'বাবু' নয়, সেটাও এখন ভুলে গেছে দেবাশিস, অনীতা। বলা যায় চারদিকের বাস্তবের থেকেও ওদের কাছে বেশি সত্যি রজতের এই উপস্থিতি, রজতের এই অবাস্তবের জগৎ।
শুধু ওরা রজতকে কাছে পায় না। তবু এই যে পাওয়া, এটাই বা কম কীসের!
গাড়ি স্টার্ট করার সময় অনীতা ফের বলে উঠল, আচ্ছা, মেয়েটার নাম যেন কী ছিল! বেশ মেয়েটা।
—ধুর, তোমার সেই ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড। দেখো, ছেলে অলরেডি কার সঙ্গে প্রেম করে বসে আছে। আমার ছেলে না! —বলে মুচকি হাসল দেবাশিস।
৯ সেপ্টেম্বর ২০২১
কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন