অরি, জেগে ওঠ

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

সামনের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বালির উপরে চুপ করে বসে ছিল ঋষি। দূরে এখন একটা মাছ ধরার ডিঙিনৌকো দেখা যাচ্ছে। খুব সম্ভবত মাছ ধরে ফিরছে। কলকাতার এত কাছে যে এরকম সুন্দর জায়গা আছে, তা ও কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। বাড়ির থেকে ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে সমুদ্র। ড্রয়িং রুমের প্রশস্ত জানলা দিয়েই সমুদ্র দেখা যায়। মনে হয় যেন দেওয়ালে কোনো নামী শিল্পী সমুদ্রের ছবি এঁকে দিয়েছে। এরকম বাড়ি শুধু সিনেমার পরদায় দেখা যায়।

এক সপ্তাহের জন্য মা-বাবার সঙ্গে ও এখানে এসেছে। এ বাড়িটা কিছুদিন আগে ওর বাবা কিনেছে। এই প্রথম ওর এখানে আসা।

কিন্তু ও বাড়িতে বসে থাকার পাত্র নয়। এ ক-দিন মাঝেমধ্যেই সকাল-সন্ধে গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে যায় সৈকতে। বালির মধ্যে পায়ের পাতা ডুবিয়ে বসে থাকে। বিচের বালি এত মিহি যে হাতে ধরে রাখা যায় না। শরীর আস্তে আস্তে বালির মধ্যে ঢুকে যায়। এদিকটা খুব নির্জন। বেশি লোক আসে না। শুধু মাঝেমধ্যে লাল কাঁকড়ার দল দেখা যায়। গত দু-দিন ভোরে সূর্যোদয় দেখেছে। লালচে হয়ে-ওঠা আকাশের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে উজ্জ্বল সোনার থালার মতো সূর্য উঁকি দেয়। জলের উপর দিয়ে সেই আলোর রক্তরেখা ওকে এসে ছুঁয়ে যায়। শরীরে ও মনে।

ওর বয়েসি ছেলেদের তুলনায় অনেকটাই শান্ত ঋষি। একা একা অনেকটা সময় কাটাতে ভালোবাসে।

পরীক্ষায় প্রথম হলে কী চাই, বাবা জিজ্ঞেস করেছিল। ও বলেছিল, সমুদ্রের ধারে কোনো জায়গায় যেতে চায়।

বাবা মুচকি হেসেছিল। তারপরেই নাকি অনেক ভেবেচিন্তে বাবা এ বাড়িটা কিনে ফেলেছে। আসলে ঋষির বাবা খুব বড়ো ব্যবসায়ী। ওর মা-ও একজন খুব বড়ো সরকারি অফিসার। এক ছেলে। তাই চাইতে-না চাইতেই সবকিছু পেয়ে যায় ঋষি। ও মুখ ফুটে কিছু চায়, সেটার জন্যই যেন সবাই অপেক্ষা করে। অবশ্য এটাও ঠিক যে ঋষি এবারেও পরীক্ষাতে প্রথম হয়েছে। বরাবরের মতো। ও সবকিছুতেই সেরা। পড়াশোনা, খেলাধুলো সবেতেই। ওর মধ্যে একটা জেদ আছে। যেটাই ধরে, সেটাতেই ও সবার থেকে ভালো করে।

নাকি অন্য কিছু? ও কি সত্যিই খুব প্রতিভাবান, যেরকম সবাই ওকে বলে!

এই যেমন কয়েক সপ্তাহ ক্লাবে ব্যাডমিন্টন খেলতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই সবাইকে হারাতে শুরু করেছে। এমনকী কয়েকদিন আগে ওই ক্লাবের চ্যাম্পিয়নকেও হারিয়েছে। সবকিছুই যেন ও খুব সহজে পেয়ে যায়। এই সেদিন স্কুল প্রতিযোগিতায় ও যখন ১০০ মিটার দৌড়োনোয় প্রথম হল, ও সেই চেনা কথাটাই আবার শুনল। গেমটিচার বিজয়বাবু এগিয়ে এসে বললেন, নাহ, তুমি সবেতেই সেরা।

কথাটা শুনলে ওর আগে বেশ ভালো লাগত। কিন্তু ও লক্ষ করেছে, আজকাল যেন সবাই ওকে এ কথাটা বলছে। ও কী করে সবকিছু এত সহজে পারে, সেটা ও নিজেই বুঝে ওঠে না। আগের মতো সবকিছু জেতার পরে সে আনন্দও তাই পায় না।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে বালির উপরে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঠিক তখনই ও সেই একই স্বপ্নটা আবার যেন দেখতে পেল। একটা ছোটো ঘর। ঘরের মধ্যে ও আটকে পড়েছে। ঘরটা বেশ অন্ধকার। ঘরের বাইরে থেকে কারা যেন ঘরের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। জোরে জোরে ডাকছে, 'অরি, জেগে ওঠ। বেরিয়ে আয়।' কিন্তু কিছুতেই ও যেন বেরোতে পারছে না। উঠে দাঁড়াতেই পারছে না। এরকম স্বপ্ন ও আগেও দেখেছে।

ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিল। উঠেই খেয়াল করল যে মা কখন জানি পাশে বালির উপরে একটা চেয়ার টেনে এনে বসেছে। ওকে উঠতে দেখে বলে উঠেছে,কী কোনো বাজে স্বপ্ন?

—হ্যাঁ, মা, একটা খুব বাজে স্বপ্ন।

—কী স্বপ্ন?

—ও তেমন কিছু না। বলার মতো তেমন কিছু নয়। শুধু ভয় লাগছিল।

—না খেয়ে এত বেলা অব্দি বালির উপরে রোদের মধ্যে শুয়ে আছিস। দেখিস, শরীর খারাপ না হয়!

—আচ্ছা মা, এ বাড়িটা কি এখন থেকে আমাদের?

—হ্যাঁ, তোর বাবাকে তো জানিস। তোর কথাতেই কিনে ফেলল। কেন, ভালো লাগছে না?

—খুব ভালো লাগছে। তবে এখানে একটা কুকুর থাকলে ভালো হত। তা-ই না? কুকুরটা বেশ ছুটে ছুটে খেলতে পারত। আমি বল ছুড়ে ছুড়ে দিতাম। এতোটা জায়গা। খুব মজা হত।

পরের দিন সকালেই বাবা একটা সাদা ছোটো কুকুর নিয়ে হাজির। কুকুরটার মুখটা বেশ হাসি-হাসি। ল্যাব্রাডর। মাস দুয়েক বয়স। খুব সহজেই ঋষির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বিকেলের দিকে বেশ খানিকক্ষণ ওকে বিচে নিয়ে গিয়ে খেলল ঋষি। ওর নাম দিয়েছে রেসি। খুব জোরে দৌড়োয়। তবে একটা সমস্যা আছে নামটাতে। ঋষি আর রেসি। কেউ ঋষি—ডাকলেই রেসিও ছুটে যাচ্ছে।

ওর একটু অবাক লাগছিল। মা এত তাড়াতাড়ি কুকুরটাকে জোগাড় করল কী করে? কুকুরটা এত সুন্দর ট্রেনিং পেল কোথা থেকে? এত তাড়াতাড়ি ওর বন্ধুই বা হয়ে গেল কী করে? যেন ঠিক ওর জন্যেই রেসিকে তৈরি করা হয়েছে।

মা-কে সময়মতো এ ব্যাপারে জিজ্ঞেসও করল। মা ওর গাল টিপে আদর করে বলল, তুই চেয়েছিস, আর দেব না? কাল কিন্তু আমরা কলকাতায় ফিরব। ছুটি শেষ। সে খেয়াল আছে তো?

—আর রেসি?

—ও আমাদের সঙ্গেই যাবে। এখন থেকে আমাদের সঙ্গে থাকবে।

ছুটে গিয়ে ঋষি আনন্দে রেসিকে জড়িয়ে ধরল। রেসি ল্যাজ নেড়ে ওর গালটা চেটে দিল। একদিনের মধ্যেই খুব ভালো ভাব হয়ে গেছে রেসির সঙ্গে। কিন্তু তখনই রেসিকে আদর করার সময় হঠাৎ কাচের আয়নাতে ওর চোখ পড়ল। কে যেন তাতে লাল পেন দিয়ে লিখে রেখেছে— অরি, জেগে ওঠ।

ও চমকে উঠে মা-কে বলে উঠল, মা দেখো, যে ছেলেটাকে সেদিন স্বপ্নে দেখেছিলাম, তার নাম ছিল অরি। কে যেন 'অরি', 'অরি' বলে ডাকছিল। বলছিল, 'অরি, জেগে ওঠ'। দেখো, কে আবার আয়নার উপরে ঠিক সেটাই লিখে রেখেছে।

—কে? কোথায় লিখে রেখেছে?—অবাক হয়ে মা আয়নার দিকে তাকাল।

—ওই যে আয়নায়। —কিন্তু দেখাতে গিয়েই অবাক হল ঋষি। কোথাও কিছু তো নেই! তাহলে কি চোখের ভুল ছিল?

সেদিন রাতে ও আরেকটা স্বপ্ন দেখল।

একটা ছোটো ফ্ল্যাট। সেখানে একটা চেয়ার-টেবিলে বসে ও পড়াশোনা করছে। একটা মেয়ে ঘরে ঢুকে ওকে দাদা বলে ডেকে কী যেন দেখাল। ও মেয়েটাকে রেগে গিয়ে বলল পড়ার সময় বিরক্ত না করতে। কী একটা যেন খুব দরকারি পরীক্ষা আছে সামনে। কিছুই পড়া হয়নি। ও যা পড়ছে, সব ভুলে যাচ্ছে। চারদিকে মোটা মোটা বই। পাতা ওলটাতে গিয়ে দেখছে, তার অনেক কিছুই ও পড়তে শুরু করেনি।

ঘুম যখন ভাঙল, ঘরে ভোরের আলো বেশ দাপটের সঙ্গে ঢুকে পড়েছে। বেশ বেলা হয়ে গেছে। কিন্তু তবু এ স্বপ্ন এতটাই সত্যি, যে তার থেকে বাস্তবে ফিরে আসতে ওর কিছুটা সময় লেগে গেল। চুপ করে বেশ খানিকক্ষণ বসে রইল। শেষে রেসির 'কুঁই, কুঁই' ডাকে ও বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। রেসি বিচে যেতে চায় ওকে নিয়ে বল খেলার জন্য। খেলার অবশ্য বেশি সময় নেই। দুপুরেই ওরা কলকাতা ফিরবে।

দু-দিন বাদে ঋষির স্কুলে পেরেন্টস-টিচার মিটিং ছিল। সবার মুখেই ঋষির সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। এমন কোনো বিষয় নেই যাতে ঋষি প্রথম হয়নি। স্কুলে ওর মতো রেজাল্ট কেউ বহু বছর করেনি। সবারই অনেক আশা অকে ঘিরে।

বাবা-মা-ও খুব খুশি। স্কুল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় ওর পাশ দিয়ে একটা ছেলে লাল সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। ঋষি সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বাবা বলে উঠল—কী, ওরকম সাইকেল চাই?

মাথা নাড়িয়ে সায় দিল ঋষি।

পরের দিন ব্রেকফাস্টের সময় খবর পেল ঋষি। সাইকেল কেনা হয়ে গেছে। ড্রয়িং রুমের একপাশে নতুন লাল সাইকেলটা রাখা আছে। বাবা বলে উঠল— তোমাকে আগামী তিন দিন সাইকেল চালানো শেখার জন্য একজন লোক রেখেছি। তোমাকে প্র্যাকটিস করাবে।

—আজ চালাতে পারব না?

—না, কাল থেকে আসার কথা। কেন, আজ থেকে চালাতে চাও?

ওকে চুপ করে থাকতে দেখে বাবা ফের বলে উঠল, ঠিক আছে, দেখছি।

কয়েকটা ফোন করল বাবা। শেষে ব্যবস্থা হয়ে গেল। স্কুল থেকে ফেরার এক ঘণ্টার মধ্যেই সাইকেল চালানো শেখাতে একজন লোক এসে গেল। তারপরে ওকে নিয়ে বাড়ির লাগোয়া বিশাল বাগানে সাইকেল চালানো শেখাতে শুরু করল। চালাতে চালাতেই ও ভাবছিল, ওর বাবা-মা কী ভালো! যা চায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যায়! আর কেউ কি এত সহজে এসব পায়? কে জানে? কিছু বললেই হল, ঠিক যেন ম্যাজিকের মতো তার পরমুহূর্তে ওর সামনে সব জিনিস হাজির হয়ে যায়।

বাড়ির বাইরে গেটের সামনে দিয়ে একদল লোক যাচ্ছে। কোনোকিছুর দাবিদাওয়া নিয়ে চিৎকার করতে করতে যাচ্ছে। সাইকেল চালাতে চালাতেই তাদের হাতে প্ল্যাকার্ডটা দেখে চমকে উঠল ঋষি।

প্ল্যাকার্ডে লেখা—জেগে ওঠো। যাওয়ার সময় তারা যেন ঋষিকে প্ল্যাকার্ডটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল। সেটা দেখতে গিয়ে সাইকেল থেকে পড়েই গেল ও।

বাড়ির ভেতর ঢুকে মা-কে এটা বলতেই, মা বলে উঠল, আসলে আমার মতো সরকারি অফিসের উপরতলায় যারা কাজ করে, তাদের উপর সবার খুব রাগ। এরকম কোনো আন্দোলন হলেই, সবার আগে আমরাই ওদের লক্ষ্য হয়ে যাই। ওসব নিয়ে কিছু ভাবিস না।

কিন্তু প্ল্যাকার্ডে যে লেখা—জেগে ওঠো।—তার অর্থ কী? মা বলল,ওরা বলতে চাইছে, চারদিকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাতে সবাই জেগে ওঠে। কারোর কাছে যেটা অন্যায়, সেটাই অন্য অনেকের কাছে ঠিক, ন্যায়। এসব নিয়ে ভাবিস না! ভালো করে রাতে ঘুমোচ্ছিস না। তাই এসব আবোল-তাবোল ভাবছিস।

সত্যি তা-ই। এরকম সব স্বপ্ন দেখলে কি আর ভালো করে ঘুম আসে!

সেদিন রাতে আবার স্বপ্ন দেখল ঋষি। একটা অন্ধকার বাড়ি। ও তার মধ্যে বন্দি। বাইরে থেকে কারা যেন ওকে উদ্দেশ করে ডাকছে, জেগে ওঠ। জেগে ওঠ। বেরিয়ে আয়।

কিন্তু ও বেরোনোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না। বাড়িটা গোলকধাঁধার মতো। বার বার এক জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। বাইরে থেকে সবাই ডেকে যাচ্ছে। তার মধ্যে একটা যেন কোনো মহিলার কাতর কণ্ঠ। কী মিষ্টি যে ডাক, সে বোঝানো যাবে না। যেন কত জন্মের পরিচিত সে ডাক।

বার বার সে ডাক শোনা যাচ্ছে— অরি, বেরিয়ে আয়। জেগে ওঠ অরি। জেগে ওঠ।

শেষে যেন ও একটা পথ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু সে পথ দিয়ে খানিকটা এগোনোর পর হঠাৎ চোখে পড়ল তীব্র আলো। এত তীব্র আলো যে ও সামনে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।

স্বপ্ন ভেঙে গেল। বিছানার উপরে উঠে বসল ঋষি। কে এই অরি? কেন ওকে সবাই ওই নামে ডাকছে? এমনকী অরি নামের কোনো বন্ধুও তো নেই।

রাত চারটের সময় সেই যে ঘুম ভেঙে গেল আর ঘুম এল না। মা-কে ও স্কুলে যাওয়ার আগে ব্রেকফাস্টে জিজ্ঞেস করল,— মা, অরি বলে কাউকে চেনো তুমি?

মা অবাক হয়ে বলে উঠল,— না। কিন্তু কেন?

এবারে আর স্বপ্নের কথাটা না বলে থাকতে পারল না ঋষি। এরকম একটা সাদামাটা স্বপ্ন। কিন্তু কী যেন আছে সে স্বপ্নে! ঠিক যেন জীবনেরই মতো। ও কি অরি বলে কাউকে কোনোদিন জানত? কেনই বা একই রকম স্বপ্ন দেখছে বার বার! কেনই বা ওই ডাকটা এত আপনার বলে মনে হচ্ছিল? স্বপ্নের সব ডিটেল কি এত ভালোভাবে কখনো মনে থাকে?

মা হেসে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলে উঠল, অনেক সময় পড়াশোনার টেনশনের জন্য অনেকে এরকম স্বপ্ন দেখে। আমিও দেখেছি। কিন্তু তোর চিন্তার কী আছে? তুই তো পড়াশোনাতে এমনিতেই এত ভালো! তোর কি কোনো কিছুর কোনো অভাব আছে?

সত্যি কোনো কিছুর অভাব নেই ওর। অভাব কথাটাই ওর কাছে অজানা, অচেনা। সেই ছোটোবেলার থেকে।

স্কুলের লাগোয়া একটা খুব বড়ো ফুড স্টোর আছে। সেখানে অনেকরকম ফাস্ট ফুড, চকোলেট পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে স্কুল থেকে বেরিয়ে ও আর ওর বন্ধুরা ওখান থেকে খাবার কিনে খায়। অনেকদিনই ও অন্যদের জন্য খাবার কেনে। সবার অবস্থা ওর মতো ভালো নয়। সেদিন ও একাই ছিল। কয়েকদিন ধরে একটা বিশেষ ধরনের চকোলেটের বিজ্ঞাপন দেখছে। কী মনে হতে ও আজ সেটাই চেয়ে বসল। দোকানের কাকু ওকে প্রথমে 'না' বলেই পরক্ষণে বলে উঠল, দাঁড়াও, দেখছি। বলে কোথা থেকে ওটা বার করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দিল। এটা আগেও হয়েছে। ও যা চেয়েছে, দোকানকাকু ঠিক সেটাই সব সময় পেয়ে গেছে।

ও চকোলেট নিয়ে ভারী খুশি হয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ কে যেন আবার ওর নাম ধরে ডেকে উঠল। পরিষ্কার শুনতে পেল সেই একই মহিলা কণ্ঠে ডাক— অরি জেগে ওঠ। জেগে ওঠ। ঠিক সেদিনের সেই মহিলার গলা।

চমকে উঠে পিছনের দিকে তাকাল ঋষি। কই, কিছু তো নেই। দোকান থেকে চকোলেটটা নিয়ে, ওর হঠাৎ কী মনে হল— স্কুলে না গিয়ে, কিছু দূরে ব্যস্ত রাস্তা। ও তার দিকে এগিয়ে গেল। নাহ, এদিকে তো কেউ নেই। কিন্তু ডাকটা স্পষ্ট, তীব্র। সে ডাকের কাছে যেন বাকি সব বাস্তব ম্লান হয়ে গেছে। আবার শুনতে পাচ্ছে—অরি, জেগে ওঠ।

অবাক হয়ে দেখল, ব্যস্ত রাস্তার উপরে বড়ো বড়ো করে কে যেন লিখে রেখেছে—অরি, জেগে ওঠ। জেগে ওঠ।

বিশাল চওড়া রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি করে লেখা। যেন কারোর হাতের লেখা। একটা পথ দেখাচ্ছে কি ওই লেখা?

ওর কী যেন মনে হল! ব্যস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে ও লেখার উপর দিয়ে ছুটতে শুরু করল। খানিকক্ষণের জন্য ভুলে গেল রাস্তায় সমস্ত গাড়ির উপস্থিতি। চোখ ধাঁধিয়ে গেল আলোয় হঠাৎ করে। আশপাশের গাড়ির হর্ন, চিৎকার সব যেন হারিয়ে গেল।

অরি অবাক হয়ে চোখ খুলে দেখল— ওকে ঘিরে ঘরে কয়েকজন ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছে। একজন ডাক্তার ওকে দেখে বলে উঠল, তিন মাস কোমায় ছিল। আবার জ্ঞান ফিরে আসছে। মিরাকল। সত্যি মিরাকল।

কে যেন পাশ থেকে বলল, ওর আত্মীয়স্বজনকে খবর দেব? ওর মা তো অন্যদিনের মতো আজও সকাল থেকে বাইরে বসে আছে। ডাকব?

কিছুক্ষণের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন এক মহিলা। সাধারণ শাড়ি পরনে। চেহারায়—মুখে-চোখে ক্লান্তি আর অভাবের ছাপ।

অরি বলে মাথায় হাত রেখে ডাকতেই ঋষি বুঝল, এই ডাকই ও শুনত এতদিন ধরে।

ওই মহিলা ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কেঁদে যাচ্ছেন। বলে যাচ্ছেন, সবাই কি সবকিছু পায়, অরি! তুই জয়েন্টে পাশ করিসনি বলে এভাবে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করবি! আমাদের অভাব আছে, কষ্ট আছে। কিন্তু তার জন্য কি এত সহজে ভেঙে পড়তে হয়! জীবনে কি কোনো কিছু এত সহজে পাওয়া যায়! না পেলেই বা কী এসে যায়! এই তো সবাই বলেছিল, তুই আর ফিরে আসবি না। কিন্তু আমি জানতাম, তুই ফিরে আসবি। সেজন্য গত তিন মাস সবাই বলা সত্ত্বেও আশা হারাইনি। রোজ আমি আর তোর বোন এখানে বসে থাকি।

অস্পষ্টস্বরে ঋষি জিজ্ঞেস করে উঠল, বাবা?

চুপ করে রইলেন ওই মহিলা। শুধু চোখ ছলছল করে উঠল।

পাশ থেকে ডাক্তার বারণ করল, ম্যাডাম, এখন এত কথা বলবেন না। ও সবে জেগে উঠছে। এখন ওকে বিশ্রাম নিতে দিন।

১৪— জানুয়ারি২০২০

কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%