অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
অনিলিখা খুব অন্যমনস্কভাবে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। তারপর বলল, এরকম যদি হত যে, আমাদের বাঁ হাতটা যা করতে চায়, ডান হাতটা তাতে বাধা দেয়, বাঁ পা-টা যা করতে চায়, ডান পা-টা তার ঠিক উলটো করতে চায়, তাহলে কী সাংঘাতিক ব্যাপার হত তা-ই না?'
অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। আগে হলে বলতাম অকালবর্ষণ। এখন আর বলি না। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা দিনকে দিন যেন বেড়েই চলেছে। তা না হলে, পুজো গেল, এখনও এরকম বৃষ্টি!
অনিলিখা আমাদের দিকে মুখটা ঘুরিয়ে বলল, যা বৃষ্টি হচ্ছে, দরকারি কাজগুলো যে সারব, তার উপায় নেই। বৃষ্টিটা কমলেই বেরোত হবে।
—আরে, রোববারে এই বৃষ্টির দিনে আবার কেউ কাজের কথা ভাবে নাকি? চেয়ারে আধশোয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বিশ্বজিৎদা বলে উঠল, তাও আবার কলকাতায় বসে! তা হঠাৎ করে কী একটা কথা যেন বলল অনি? বাঁ হাত আর ডান হাত। দু'হাতের মধ্যে বিরোধ! সেরকম আবার হয় নাকি? ছোটোদের একটা গল্প পড়েছিলাম, একটা কয়োটকে নিয়ে। খানিকটা এরকমই। শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গভাবে সে সবচেয়ে দরকারি। আর তা-ই নিয়ে নিজেদের মধ্যে বেজায় ঝগড়া। শেষে এজন্য কয়োটকে মরতে হয়েছিল। তা ঘটনাটা কী? একটু খুলে বলো তো!
—নাহ, সে কথা থাক। অন্য একদিন হবে, অনেক কাজ আছে—অনিলিখা ওঠার উপক্রম করল।
আমিও সবার সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাম, কেন, আজকেই বলো-না! এরকম বৃষ্টির দিনেও যদি তোমার সময় না হয়, তবে আর কবে হবে? এমনিতেই তো তোমার দেখা আজকাল আর পাওয়াই যায় না, অনিলিখাদি! আজ এখানে, কাল সেখানে, বলো-না কী বলছিলে।
অনিলিখা চুপ করে বসে কী যেন ভাবল। ডান হাতে পরা ঘড়িটা একবার চট করে দেখে নিল। তারপর টেবিলের উপরে প্লেটে রাখা একটা পাঁপড়ভাজা হাতে তুলে নিয়ে কামড় দিয়ে বলে উঠল, এক বছর আগের কথা। তোদের মনে আছে বোধহয়, গত পুজোর ঠিক আগে ইতালি থেকে ফিরেছিলাম। দু-মাস মতো ছিলাম সেখানে। ইতালি বলতে আমরা সাধারণত রোম, পিসা, মিলান এসব জায়গাই বুঝি। আমি কিন্তু গিয়েছিলাম অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একটা শহরে। নাম জেনোয়া। খুব পুরোনো বন্দর শহর। কলম্বাসের জন্মস্থান। সমুদ্রপথে বাণিজ্যে প্রায় হাজার বছর ধরে একটা বড়ো ভূমিকা পালন করেছে এই শহর।
ওখানে পৌঁছোনোর পর প্রথম কয়েকদিন স্টেশন-লাগোয়া একটা হোটেলে ছিলাম। হোটেলটা ভালোই ছিল। কিন্তু দু-বেলা হোটেলের খাবার কি বেশি দিন ভালো লাগে! তাই এক-দেড় মাসের জন্য যদি কোনো ভালো ফ্ল্যাট ভাড়া পাওয়া যায়, তার সন্ধানে ছিলাম। কিছুদিন বাদে অফিসের কলিগ একটা বাড়ির খোঁজ দিল। অফিস থেকে এক মাইল হাঁটাপথ। বাড়িটা দেখে মোটামুটি পছন্দ হয়ে গেল। তারপরে বাকি দেড় মাস ওই ফ্ল্যাটেই ছিলাম।
বাড়িটা সম্বন্ধে বলার আগে তোদের জেনোয়া শহরের চরিত্রটা একটু বুঝিয়ে বলি। ইতালির অন্য পুরোনো শহরগুলোর মতো এখানেও পাথর দিয়ে বাঁধানো সরু সরু রাস্তা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে থমকে দাঁড়িয়ে দেখার মতো পুরোনো দিনের বাড়ি। তাক-লাগানো স্থাপত্য। ছড়িয়ে-থাকা হলুদ, গোলাপি, কমলা বাড়ি। সবুজ আর নীল খড়খড়ির জানলা।
তা এই পুরোনো বাড়িগুলোর ভিড়ে এই বাড়িটাও দিব্যি মিশে যায়। অন্তত একশো বছর পুরোনো তো হবেই। বড়োরাস্তার উপর গেট। গেট থেকে ঢুকে ডানদিকে বাড়ির দরজা। সে দরজা পেরলেই চওড়া মার্বেলের সিঁড়ি উপরে উঠে গিয়েছে। পাশে একটা বহু পুরোনো দিনের লিফট। দুটো লোহার দরজা টানলে আর উপরে ওঠার সুইচটা কয়েকবার টিপলে সাড়া মেলে। হঠাৎ ঘড়াৎ করে আওয়াজ হয়। বোঝা যায় লিফট উঠতে শুরু করেছে। গতি দেখলেই বোঝা যায়, যে লিফটটা যিনি বসিয়েছিলেন, তাঁর জীবনে অন্তত কোনো তাড়া ছিল না। আমার ফ্ল্যাটটা দোতলায়। লিফটের দুটো গেট খুলে বেরিয়ে এলে বাঁদিক-ডানদিকে দুটো ফ্ল্যাট। বাঁদিকের ফ্ল্যাটটা ছিল আমার ওই দেড় মাসের আস্তানা।
তা বাড়িটার পুরোটাই কি ভাড়া দেওয়া ছিল?— জিজ্ঞেস করলাম।
—না, চারতলা বাড়ি। একতলাটা বাড়িওয়ালার নিজের। বাকি প্রত্যেক তলায় দুটো করে ফ্ল্যাট। সিঁড়ির দু-পাশে। আমার ফ্ল্যাটে ঢুকলেই সামনে ড্রয়িং রুম। বাঁদিকে একটা সরু প্যাসেজ চলে গিয়েছে। প্যাসেজের ডানদিকে পর পর দুটো বড়ো বেডরুম। বাঁদিকে বাথরুম, কিচেন আর একটা ছোটো স্টোররুম। ফ্ল্যাটে বিশাল বিশাল খড়খড়ির জানলা। তারপরে কাচ। তবে খড়খড়ি খোলা অত সোজা ছিল না। দুটো জানলা দিয়ে মাঝেমধ্যে সামান্য আলো উঁকি দিত। এমনিতেও বাইরে প্রায় সব সময় মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ফ্ল্যাটে অমাবস্যার অন্ধকার কাটাতে প্রায় সারাদিনই আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। মাঝেমধ্যে দিন আর রাতের তফাতটা বুঝতে রান্নাঘরের কাচের জানলার বাইরে চোখ রাখতে হত। এখানেই শুধু ঘোরানো কাচের জানলাটাকে খড়খড়ির আড়ালে রাখা হয়নি। ওই জানলা দিয়ে খুব ভালো যে দৃশ্য দেখা যেত তা নয়। এটা ছিল বাড়ির পিছনের দিক। একচিলতে বাগান। শুধু বাড়িওয়ালার একতলার ফ্ল্যাটের মধ্যে দিয়ে যাওয়া যেত। এ বাগানে কয়েকটা মাঝারি সাইজের গাছ, কিছু ফুলের টব গোল করে রাখা। মাঝে সামান্য একটু সিমেন্ট-বাঁধানো জায়গা। একধারে জঞ্জাল ফেলার ডাস্টবিন। মোদ্দা কথা, এমন কিছু দৃশ্য নয় যে হাঁ করে তাকিয়ে থাকব। কিন্তু সেটাই হল একদিন।
ও বাড়িতে থাকতে শুরু করার ছ-সপ্তাহ পরের ঘটনা। রবিবার ছুটির দিন, রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি মুখ-গোমড়া আকাশ। নীচের দিকে তাকাতেই চোখ পড়ল একজন মধ্যবয়সি ভদ্রমহিলার উপরে। বাগানে একটা অ্যালুমিনিয়ামের চেয়ারে আধশোয়া অবস্থায়। হাতে একটা বই। ইতালিতে সুন্দরী মহিলার অভাব নেই। কিন্তু ওঁকে তাঁদের মধ্যেও আলাদা করে অনায়াসে খুঁজে পাওয়া যাবে। এককথায় অসামান্য সুন্দরী, ছাইরঙা ট্র্যাকসুটের উপরে একটা আকাশি নীল সোয়েটার পরা। উজ্জ্বল সোনালি চুল। চোখ, নাক, মুখ কাটা-কাটা। মুখে একটা অস্বাভাবিক স্বর্গীয় স্নিগ্ধতা। দেখে মনে হয়, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে।
ইনিই কি বাড়িওয়ালি? লুসি মাতারাজ্জি? বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় ওঁর সই, নাম দেখেছি। কিন্তু এজেন্টের মাধ্যমে হওয়ায় সরাসরি যোগাযোগ হয়নি। ঠিক করলাম, পরে একদিন গিয়ে আলাপ করব। এমন একজনের সঙ্গে আলাপ না-করাটাই ভুল হবে। তা তার জন্য অবশ্য বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না।
দু-দিন পরের ঘটনা। অফিস থেকে ফিরতে সন্ধে ছ-টা। কিছু আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। রাস্তা ভেজা। একটা কালো মেঘ হামাগুড়ি দিয়ে মাথার উপর এগিয়ে আসছে। আবার বৃষ্টি এল বলে! রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোগুলো সবে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে। রাস্তা থেকে বাড়ির মেন গেটটা খুলতেই দেখতে পেলাম, ঠিক আমার আগেই ওই মহিলা বাড়ির ভিতর ঢুকছেন। আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হেসে বললেন, বুয়োনা সেরা। কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো?
আমিও হেসে একই রকম সৌজন্য দেখালাম। ভদ্রমহিলা আবার বললেন, তোমার ফ্ল্যাটে কোনো অসুবিধে হলে আমাকে জানিও।'
আমিও জানালাম কোনো অসুবিধে নেই। ফ্ল্যাটে যদিও প্রচুর অপ্রয়োজনীয় আসবাব আছে, তার মধ্যে দিয়ে হাঁটাচলা বেশ দায়। খড়খড়িগুলোও ঠিকমতো খোলে না। কিন্তু এসব তো আর প্রথম আলাপেই বলা যায় না। আর থাকবও তো মাত্র কদিন।
চলো আমার সঙ্গে, একটু কফি খাবে।
প্রথম আলাপেই কফি থেকে যাওয়াটা কি ঠিক? তাই আপত্তি জানালাম। কিন্তু ভদ্রমহিলা আপত্তি শুনলেন না। প্রায় জোর করেই ওঁর ফ্ল্যাটে নিয়ে গেলেন।
পুরো একতলা জুড়েই ওঁর ফ্ল্যাট ভারী সুন্দর করে সাজানো-গোছানো। দামি কাঠের আসবাব। লেদার সোফাসেট। বেশ কয়েকটা ইনডোর প্লান্টও রয়েছে। দেওয়ালে বড়ো-বড়ো ইতালিয়ান ফ্রেস্কে পেন্টিং। অবাক হয়ে দেখছি, ভদ্রমহিলা পাশ থেকে বললেন, বেশির ভাগই আমার আঁকা।
পেন্টিংগুলো অসাধারণ। তা আপনি কি প্রফেশনাল আর্টিস্ট?
আমি ফ্লোরেন্সের আকাদেমি অফ আর্টস থেকে ছবি আঁকা শিখেছি। কিন্তু এটা আমার মূল পেশা নয়। নেশা বলতে পারো। এখানে জেনোয়া ইউনিভার্সিটিতে আমি ফিজিকস পড়াই। আর সময় পেলেই আঁকতে বসে যাই।'
তা আপনি এখানে একাই থাকেন?
হ্যাঁ, একাই থাকি।
আমাকে সোফায় বসিয়ে ভদ্রমহিলা রান্নাঘরে গেলেন। সামনের ফ্লেঞ্চ ইজেলে রাখা একটা বড়ো অয়েল পেন্টিং। একটু খেয়াল করতেই বুঝলাম পিছনের বাগানের। ছবির মাঝখানে সেই সিমেন্টের বেদি। বাঁদিকে একটা ছোটো মেপল গাছ। তার পাশে একটা ছোটো ফুলগাছ। তাকে কেন্দ্র করেই যেন আঁকাটা। ভারী সুন্দর বেগুনি রঙের ফুল এই গাছটায়। আর ছোটো-ছোটো লাল ফল। ছবিতে গাছটাকে ঘিরে একটা মাকড়সার জাল। তাতে যেন বৃষ্টির ফোঁটা আটকে আছে। অদ্ভুত সুন্দর তবে ছবিটা দেখে মনে হল অসমাপ্ত।
মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম, পায়ের শব্দে ঘোর কাটল। ভদ্রমহিলা ট্রে-তে করে খাবার আর কফি নিয়ে ঢুকলেন।
আপনার এই আঁকাটা ভারী সুন্দর।
হ্যাঁ, এখনও শেষ হয়নি। আরও কয়েকদিন লাগবে। শুধু ছুটির দিন পেলেই বসতে পারি। অন্যদিন তো আর আঁকা হয় না।
এটা তো আপনার পিছনের দিকের বাগানটা, তা-ই তো?
লুসি যেন একটু দ্বিধা করে বলে উঠলেন, আসলে এখানকার বেশির ভাগ বাড়ির লাগোয়া বাগান প্রায় একই রকম। কোনো না কোনো গাছ থাকবে, সিমেন্টের বেদি থাকবে। তা যাক গে। এই কেকটা খেয়ে কীরকম লাগল বলো তো! বাড়িতে বানানো। —বলে প্লেটটা সামনের টেবিলের উপর রাখলেন।
প্রায় এক ঘণ্টা ছিলাম সেদিন। এত বিদুষী ও বিনয়ী মহিলা খুব কমই দেখা যায়। শনিবার পুরো একটা দিন উনি একটা ওল্ডএজ হোমে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সঙ্গে কাটান। রোববার দিনটা কাটান বই পড়ে আর ছবি এঁকে। সব মিলিয়ে ওই এক ঘণ্টা আলাপের রেশ আমার সঙ্গে রয়ে গেল। আবার কোনো একদিন দেখা করতে আসার কথা দিয়ে বেরোলাম।'
এতটা শুনে বিশ্বজিৎদা গলা খাঁকরে বলে উঠল, ইতালির সব বাড়িতে একই রকম বাগান, সিমেন্টের বেদি, মেপল গাছ, গল্পের এই অংশটুকু কিন্তু ঠিক হজম হল না।
শুনে অনিলিখা মুচকি হেসে বলল, থাক! মন দিয়ে শুনছ যে, এটুকু অন্তত বোঝা যাচ্ছে। তবে ঠিকই বলেছ, ওই কথাটা আমারও একটু অদ্ভুত লেগেছিল। আর-একটা জিনিসও খুব অদ্ভুত লেগেছিল।
লুসি বাঁ হাতটা প্রায় ব্যবহারই করছিলেন না। কফি আর কেক নিয়ে যখন রান্নাঘর থেকে এলেন, তখনও ওই ভারী ট্রে-টা শুধু ডান হাতেই ধরে ছিলেন। আমার মনে হচ্ছিল যে, বাঁ হাতে কোনো অসুবিধে নেই তো! প্যারালিসিস জাতীয়? তা না হলে শুধু এক হাতে একটা বড়ো ট্রে নিয়ে আসা একটু অস্বাভাবিক।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম তা নয়। কারণ আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ছবিটার উপরে তুলির টান দিচ্ছিলেন মাঝে মাঝে বাঁ হাত দিয়ে।
ডান হাতটা অন্যদিকে সরানো।
এর ঠিক দু'দিন পরের ঘটনা। অফিসের দিন। বেলা বেশ ছোটো হয়ে গিয়েছে। সকাল সাতটাতেও অন্ধকার। চারদিকের বাড়িগুলোয় আলো জ্বলছে। এর মধ্যে রেডি হয়ে অফিসে বেরোতে বেশ কষ্টই হয়। তবু সেদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল। রান্নাঘরে ব্রেকফাস্টের আয়োজন করছিলাম। হঠাৎ নীচ থেকে কিছু একটা ভাঙার আওয়াজ পেলাম। দেখি আমার জানলার পাল্লাটা সামান্য খোলা, কখনো খুলে বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছি। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি অদ্ভুত দৃশ্য। লুসি বাগানের চেয়ারে বসে আছেন। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের কবজি জোর করে ধরে রেখেছেন। বাঁ হাতটা যেন সেই বাধা অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করছে। আঙুল তুলে সামনের ফুলগাছটার দিকে নির্দেশ করছে। ছবির সেই ফুলগাছটা, যাতে বেগুনি রঙের ফুল। বাঁ হাতটা বার বার উপরের দিকে উঠে আসছে আর ডান হাতটা আবার জোর করে সেটাকে নামিয়ে চেয়ারের হাতলে ধাক্কা মারছে। চেয়ারের নীচে ভাঙা কাপ, ডিশ। নির্ঘাত হাত থেকে পড়ে গিয়েছে আর তারই আওয়াজ আমি পেয়েছি।
অবাক হয়ে দেখছি, হঠাৎ দেখি, লুসি উঠে দাঁড়ালেন। দু-হাতের মধ্যে এই যুদ্ধে ওঁর সারা শরীর কাঁপছে। প্রায় ছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন। রাস্তার ধারে বাড়ি, বাইরে গাড়ি চলাচল শুরু করে গিয়েছে। এর মধ্যে নীচের তলায় কী হচ্ছে তা বোঝা খুব মুশকিল। ঘরে ঢোকার পর কোনো শব্দ পেলাম না।
এই ঘটনার কথা আমি কাউকে বলিনি। কারো শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার কথা অহেতুক অন্য কাউকে বলার প্রয়োজনই বা কী! অফিসের মধ্যে একটা ক্যাফে আছে, কফি মেশিনে নিজেই নানা ধরনের কফি তৈরি করে নেওয়া যায়। আমি কফি নিয়ে এক চুমুক দিয়েছি, হঠাৎ পাশ থেকে জিওভানির গলা শুনলাম।
বাড়িটা কেমন লাগছে অ্যানি?
এই অফিসে সবাই আমাকে অ্যানি বলে ডাকতে শুরু করেছে। কেন জানি না, বোধহয় ওদের ইতালির নামের কাছাকাছি হবে। জিওভানির দিকে মুখ ঘোরালাম।
ভালো, বেশ ভালো। বাড়িওয়ালির সঙ্গেও আলাপ হয়েছে, বেশ ভালো ভদ্রমহিলা।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, জিওভানিই আমাকে ওবাড়ির সন্ধান দিয়েছিল।'
জিওভানি আমার কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব ভালো মহিলা। আমার সঙ্গে অবশ্য খুব বেশি আলাপ নেই। কিন্তু একই কথা সবার মুখে শুনেছি। খুব নামকরা ফিজিসিস্ট। ওঁর লেখা বেশ কয়েকটা বইও আছে।
তা-ই? তা জানতাম না তো। তা উনি তো একা থাকেন?
ওঁর হাজব্যান্ড সুইস আল্পসে স্কি করতে গিয়ে মারা যান। অ্যাভালাঞ্চে। বডিও পাওয়া যায়নি। খুবই দুঃখজনক ঘটনা।
তা, লুসি তখন সঙ্গে ছিলেন না?
না। উনি কোনো একটা দরকারি কাজে এখানেই ছিলেন। এটা প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনা। তখন খবরের কাগজে ঘটনাটা খুব বড়ো করে বেরিয়েছিল। ওঁর হাজব্যান্ডও খুব বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। নামকরা ডাক্তার। নেফ্রোলজিস্ট। এর দেড় বছর পরে ওঁর ছেলে মারা যান রোড অ্যাক্সিডেন্টে। বুঝতেই পারছ, এ ধরনের খবর তো আর চট করে ভোলা যায় না। কখন কার ভাগ্যে যে কী থাকে, বলা মুশকিল।
তা তুমি এ খবরটা পেলে কী করে?
পারিবারিক সূত্রে ওঁর ছেলের মৃত্যুর খবরটা পেয়েছিলাম। লুসি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন। তা তো জানোই।
ওঁর হাজব্যান্ডের সঙ্গে তোমার পরিচয় ছিল?
তেমন কিছু না। দু-একবার পার্টিতে দেখা হয়েছে। ওঁকেও ভারী সুন্দর দেখতে। দেখার মতো কাঁধ পর্যন্ত সোনালি চুল। তেমনই অমায়িক।
অনিলিখা একটু থামল। চা-শিঙাড়া নিয়ে কাজের মাসি ঘরে ঢুকছে। বংশীর দোকানের মাংসের শিঙাড়া। তাই গল্পে একটু বাধা পড়ল। মিনিট পাঁচেক বাদে অনিলিখা ফের বলতে শুরু করল, এর পরের ঘটনাটা ঘটল কলকাতায় ফিরে আসার কয়েকদিন আগে। অফিস-ফেরত ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখি, আলো জ্বলছে না। অথচ বাইরের প্যাসেজে আলো জ্বলছে। কোনো এম. সি. বি. ট্রিপ করে থাকতে পারে। কিন্তু কোথায় সুইচবোর্ড আছে, খুঁজে পেলাম পা। কয়েকদিনের জন্য আসা, টর্চও নেই হাতের কাছে। অন্ধকারে ফ্ল্যাটের মধ্যে খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক হাতড়ে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, নীচে গিয়ে লুসির সঙ্গে কথা বলাই ঠিক হবে।
'সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসে লুসির ফ্ল্যাটের ডোর বেল বাজালাম।
মিনিট দুয়েক পরে লুসি বেরিয়ে এলেন। চোখ-মুখ দেখে মনে হল খুব ক্লান্ত। তবু আমাকে দরজা থেকে ফিরে যেতে দিলেন না। ওঁর চেনা এক ইলেকট্রিশিয়ানকে ফোন করে আমাকে প্রায় জোর করে ড্রয়িং রুমে এনে বসালেন।
তোমার ডিনার হয়েছে? আমার সঙ্গে ডিনার করে যাও। ব্রকোলি দিয়ে স্যালমন মাছ বেক করেছি। ইলেকট্রিশিয়ান আসতে আধ ঘণ্টা তো লাগবেই। অতক্ষণ তুমি অন্ধকার ফ্ল্যাটে বসে কী করবে?
আমি বিশেষ প্রতিবাদ করলাম না। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। একটু যে বাইরে ঘুরে আসব, তার উপায় নেই। ফ্ল্যাট অন্ধকার। এই অবস্থায় লুসির সঙ্গে গল্প করে মাঝের সময়টা কাটানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ইতালির রাজনীতি নিয়ে খানিকক্ষণ কথা হল। তারপর লুসি রান্নাঘরে গেলেন রান্নার বাকি অংশ শেষ করতে। আমি এতক্ষণ গল্পে মশগুল থাকায় খেয়াল করিনি। ক্যানভাসের সেদিনের সেই ছবিটা আর ওখানে নেই। এদিক-ওদিক খুঁজতে চোখ পড়ল পাশের কাগজ ফেলার বাস্কেটে। বেশ কয়েকটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো উঁকি মারছে। একটা বের করতেই বুঝলাম এটা সেই ছবিরই ছেঁড়া একটা অংশ। কী এমন ব্যাপার হতে পারে যে, লুসি নিজের আঁকা এত সুন্দর একটা ছবি টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে পারেন!
সব ক-টা টুকরো টেবিলের উপর রেখে জিগস পাজলের মতো একটার সঙ্গে একটা জুড়ে ফেললাম। প্রায় কুড়িটা টুকরো, কিন্তু জিগস পাজলের অভ্যাস থাকায় জুড়তে সময় লাগল না। আর জোড়ার পরেই চমকে উঠলাম। এত সুন্দর ছবিটাকে বেখাপ্পাভাবে একটা অংশ জোড়া হয়েছে। মোরগের ঝুঁটির মতো বেগুনি ফুলওয়ালা ওই গাছটার তলায় একটা লোক শুয়ে আছে, আর তার শরীরের উপর ছড়িয়ে পড়েছে ওই ফুল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওই অংশটা পরে আঁকা হয়েছে। লোকটার মুখ অন্যদিকে সামান্য ঘোরানো। লোকটার কাঁধ অবধি সোনালি চুল দেখে চমকে উঠলাম।
—তা এতে চমকে ওঠার কী আছে? বিশ্বজিৎদা বলল।
—চমকে উঠেছিলাম জিওভানির কথাটা মনে করে। ছবিটাতে কি লুসি ফ্রান্সিসকোকেই আঁকতে চেয়েছিলেন? কিন্তু হঠাৎ করে গাছের তলাতেই বা কেন?
'চিয়াও'—লুসির সম্বোধনে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, লুসি পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
এত মন দিয়ে জোড়া-দেওয়া ছবিটা দেখছিলাম যে, লুসি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়ালই করিনি। ওঁর মুখের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলাম। এ যেন অন্য লুসি। মুখটা ফ্যাকাশে সাদা। চোখের দৃষ্টিতে যেন রাগ আর বিস্ময়।
আমি কোনোরকমে বলতে পারলাম, আসলে ছবিটা এত সুন্দর, খোঁজ করতে গিয়ে চোখ পড়ল বাস্কেটে।
না, না, সে ঠিক আছে, লুসি যেন মুহূর্তে ফের স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছেন।
আসলে ছবিটা এত কষ্ট করে আঁকার পরে মনোমতো না হলে তখন খুব খারাপ লাগে। এটাও তা-ই। একদম পছন্দ হয়নি, তাই ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। রান্না শেষ, চলো, খেয়ে নিই।
লুসির কথা শুনে আমার খুব অবাক লেগেছিল। নিজের সৃষ্টিকে এভাবে কেউ নষ্ট করে দিতে পারে! যেভাবে কুচিকুচি করে ছিঁড়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে প্রচণ্ড রাগের মাথায় ছেঁড়া। তা আমি এ নিয়ে কোনো কথা না বাড়িয়ে ডিনারের উদ্দেশে এগোলাম।
সেদিন ডিনারের খানিক পরেই ইলেকট্রিশিয়ান এসে গিয়েছিল, তাকে নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিলাম। খানিকক্ষণের মধ্যে আলোও ফিরে এসেছিল। কিন্তু আমি লুসির ওই চোখের দৃষ্টিকে ভুলতে পারছিলাম না। কেন জানি না, লুসির তাৎক্ষণিক রিঅ্যাকশনটা আমার ভালো লাগেনি।
সেদিন রাতে লুসির হাজব্যান্ড ফ্রান্সিসকোর উপর ইন্টারনেটে খোঁজখবর নিলাম। পাঁচ বছর আগের ঘটনা। স্কি করার জন্য একটা গ্রুপের সঙ্গে সুইস আল্পসে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার আগের দিন রাতে ভারী বরফপাত হয়েছিল। যেখানে ওঁরা স্কি করছিলেন, সকালে সেদিন হঠাৎ করে অ্যাভালাঞ্চ হয়। ওঁদের গ্রুপের দুজনের মৃতদেহ পাওয়া গেলেও, ওঁকে পাওয়া যায়নি। অবশ্য এ ধরনের দুর্ঘটনায় মাঝেমধ্যে মৃতদেহ পাওয়াই যায় না। বরফের তলায় চাপা পড়ে যায়। পুলিশও এ বিষয়ে বিশেষ কিছু সন্দেহ করেনি। তবে একটা রহস্য ছিল। ফ্রান্সিসকোকে সেদিন সকালে কেউ স্কি করতে যেতে দেখেনি। আর তার আগের দিন ফ্রান্সিসকোর বাড়ি থেকে নাকি খবর এসেছিল আর্জেন্টলি ফিরে আসার জন্য। সে ব্যাপারে ফ্রান্সিসকো এক বন্ধুকে বলেওছিল। তবে লুসি সে কথা অস্বীকার করেন। বাড়ির দিক থেকে কোনো কারণই ছিল না, যার জন্য ফ্রান্সিসকোকে জরুরি তলব করার দরকার ছিল। তারপর এত বছর কেটে গিয়েছে। কেস ক্লোজড। লুসিকেও সন্দেহ করার কোনো কারণ পাওয়া যায়নি।'
সহেলি এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। হঠাৎ করে নড়েচড়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, তার মানে লুসি ওর হাজব্যান্ডকে মার্ডার করে ওই ফুলগাছের তলায় পুঁতে দিয়েছিল? আর তাই ছবিতে ভুল করে এঁকে ফেলেছিল, আর সেটা তুমি দেখে ফেলায়—মাই গড! তা, তারপর তুমি কী করলে?
অনিলিখা মুচকি হেসে বলে উঠল, 'এই তো! মার্ডার মিস্ট্রি বেশি পড়ার ফল। তবে তুই ঠিকই বলেছিস। আমারও ঠিক তা-ই মনে হয়েছিল। আর তাই সেই রাতেই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। সেই সঙ্গে আর-একটা কথাও বলে রাখি, যেটা তোদের জানা দরকার। তা হল, অ্যালিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম। লুসির ক্ষেত্রে বাঁ হাতটা ছিল অ্যালিয়েন হ্যান্ড।
—মানে? ওই হাতটা? লুসির কন্ট্রোলে ছিল না?
—ঠিক তা নয়। আমাদের মস্তিষ্কের বাঁদিক আর ডানদিকের মধ্যে পাওয়ার স্ট্রাগল হল এ অসুখের মূলকথা। এটা একটা বিরল ধরনের অসুখ। তবে হলে খুব বিপদ। মস্তিষ্কের বাঁদিকের নিয়ন্ত্রণ থাকে ডান হাত আর ডানদিকের নিয়ন্ত্রণে থাকে বাঁ হাত। তাই ঝগড়া বেধে যায় বাঁ হাত আর ডান হাতের মধ্যে। সাধারণত বাম মস্তিষ্ক বেশি শক্তিশালী বলে এক্ষেত্রে ডান হাতই জিতে থাকে।
লুসি যে এরকম একটা বিরল অসুখে ভুগছেন তা আমার মনে হয়েছিল। আর তাই এটাও মনে হয়েছিল যে, ওঁর অতীতের কোনো অপরাধের সাক্ষ্য বহন করছে ওঁর নিজেরই ডান মস্তিষ্ক আর বাঁ হাত।
ডান হাতের এই কৃতকর্ম ডান মস্তিষ্ক ও বাঁ হাত মেনে নিতে পারেনি। তাই সবকিছু চাপা দেওয়ার পরেও উনি ভুল করে বাঁ হাতে এঁকে ফেলন এমন একটা ছবি, যা ওঁর অতীতের কৃতকর্মের সাক্ষ্য বহন করে। আর ডান হাত সে ছবি তাই ছিঁড়ে ফেলে দেয়। ছবি ছেঁড়ার মধ্যেও এই পাওয়ার স্ট্রাগলের ছাপ স্পষ্ট। মনে রাখতে হবে, এক হাতে ছবিটা ছেঁড়া সহজ নয়। ছেঁড়া টুকরোগুলোকে দেখে আমারও তা-ই মনে হয়েছিল।
—তারপর কী হল? বিশ্বজিৎদা অধৈর্য হয়ে বলে ওঠে।
—আমার কাছে খবর পেয়ে পরদিন পুলিশ আসে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এই ছবিটা পায়। শুধু তা-ই নয়, আগেও বহুবার লুসি ওরকম ছবি এঁকেছেন। সেসব ছবির ছেঁড়া টুকরোও পুলিশ খুঁজে পায়। আর্টিস্ট হিসেবে বাঁ হাতই উনি ব্যবহার করতেন। তাই মূলত ছবিতেই সে প্রতিফলন ছিল। যতবার বাঁ হাত সে ছবি এঁকেছে, ডান হাত সময়মতো ছিঁড়ে ফেলেছে। লুকিয়ে রেখেছে। পুলিশের জেরার মুখে প্রথমদিকে লুসি নানারকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও পরে অপরাধ স্বীকার করে নেন। এসব কথা জিওভানির কাছে পরে শুনেছিলাম। ততদিনে দেশে ফিরে এসেছি।
পুলিশ লুসিকে অ্যারেস্ট করে। ফ্রান্সিসকোর মৃতদেহ অবশ্য পাওয়া যায়নি। ফুলগাছের তলা থেকেই নিশ্চয়ই ওটা পরে অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ তো আর বাড়ির উঠোনে চিরকাল নিজের স্বামীর ডেডবডি রেখে দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না। স্বাভাবিক। কিন্তু কোথায় ডেডবডিটা লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল, সে কথা লুসি হাজার জেরাতেও বলেননি।
কিন্তু কারণটা কী ছিল?
—না, সেটা আর জানা হয়নি। আমি তো তার কয়েকদিনের মধ্যে ফিরে আসি। তখন ইনভেস্টিগেশন তো সবে শুরু হয়েছিল। তবে যেটা সন্দেহ করা হচ্ছিল তা হল, লুসির এই অসুস্থতার কথা ফ্রান্সিসকো জানতে পেরেছিলেন আর তাই চিকিৎসার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। লুসি নিশ্চয়ই তা চাননি। কারণ, দুটো হাতই হয়তো চায়নি যে তাদের স্বাধীনতা এত সহজে চলে যাক। তা এসব অনেক সম্ভাবনাই কফির কাপ সামনে থাকলে আপনা-আপনি আলোচনায় চলে আসে। সত্যটা কী, তা আমি কয়েকদিন আগে পর্যন্ত জানতে পারিনি।
—লেট মি গেস,— বিশ্বজিৎদা বেশ, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল, এসবের মূলে থাকে মূলত টাকা। খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, ফ্রান্সিসকো মারা গেলে লুসির অর্থের দিক দিয়ে বড়ো করমের কোনো লাভ হত। বিমা জাতীয় কিছু। ঠিক কি না?
অনিলিখা মুচকি হেসে বলে উঠল, আগে খুনটাকে তো হতে দাও। যেখানে খুনই হয়নি, সেখানে সে রহস্যের সমাধান করবে কী করে? দিন কুড়ি আগে ইতালি থেকে একটা ফোন পাই। আমার নম্বর ওখানকার পুলিশের কাছে ছিল। ওরা জানায় যে লুসিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, ফ্রান্সিসকোর মৃতদেহ এতদিন বাদে সুইস আল্পসেই পাওয়া গিয়েছে। বরফের অনেক তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি ওখানে আর-একটা দুর্ঘটনা ঘটে। হারিয়ে-যাওয়া গ্রুপের খোঁজ করতে গিয়ে ফ্রান্সিসকোর বডিও পাওয়া যায়। ডি. এন. এ. টেস্টও কনফার্ম করছে যে, ওটা ফ্রান্সিসকোরই।
মানে? তার মানে এই মৃত্যুতে লুসির আদৌ কোনো হাত ছিল না? তাহলে এসব ছবির অর্থ?
—সব রহস্যের কি সমাধান হয়? হয়তো লুসির বাঁ হাত শুধু ডান হাতকে একটু বিপদে ফেলতে চাইছিল। শেষমেশ ডান হাতের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও বলতে পারো। কতদিন আর ডান হাতের শাসন মেনে চলবে? ওই ছবি আঁকাই ছিল বাঁ হাতের একমাত্র ভাষা। আর কনফার্মড না হলেও অনেকের সন্দেহ, ওইসব গাছ, বাগানের যত্ন নিত লুসির ডানহাত। তাই গাছেদের উপরেও একই সঙ্গে প্রতিশোধ। বলা বাহুল্য, পুলিশি তল্লাশিতে একটা গাছও আর টিকতে পারেনি। কী অদ্ভুত ধরনের রোগ ভাবা যায়?
—তা লুসি এখন কোথায়?
—যেখানে বহুদিন আগেই থাকার কথা ছিল। জেনোরায় মানসিক রোগীদের হাসপাতালে।—
অনিলিখা উঠে দাঁড়াল— যাই, বৃষ্টি প্রায় থেমে এসেছে। দেখি, দরকারি কাজগুলো সারতে পারি কি না!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন