স্বাধীনতা

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

পুনিতের বাবার একটা আজব শখ ছিল। ভারতের জাতীয় পতাকা আঁকা। একটা পাটকাঠির উপরে কাপড়ে আঁকা পতাকা লাগিয়ে গ্রামের সব বাচ্চাকে বিলি করত স্বাধীনতার দিনে। বিনে পয়সায়। পুনিতও অবশ্য একটা পেত। তবে ওর একটু হিংসেই হত। কী দরকার বাকি সবাইকে বানিয়ে দেওয়ার! ওদের নিজেদেরই তো অবস্থা এত খারাপ। আর কত পরিশ্রম! ওদেরও বাবা আছে, তা-ই না!

তা বাবাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পেত—বড়ো হলে বুঝবি। স্বাধীনতা বলে কথা! স্বাধীনতার দিনে সবার হাতে এই পতাকা থাকা দরকার। আর সবাই কি আর তোর বাবার মতো এত সুন্দর আঁকতে পারে! কী সুন্দর গেরুয়া আর সবুজ রংটা ফুটেছে দেখেছিস! আর পতাকার মধ্যে চক্রটা দেখেছিস! ঠিক ২৪টা দাগ থাকতে হবে ওর মধ্যে। ব্যাপারটা অত সহজ নয়, বুঝলি। স্বাধীনতার ব্যাপার।—বলে চুপ করে কী যেন ভাবত বাবা।

পরে আরেকটু বড়ো হলে পুনিতও বাবার সঙ্গে পতাকা বিলি করত। আর মাঝে-মধ্যেই বাবাকে প্রশ্ন করত, বাবা, স্বাধীনতা মানে কী?

বাবা হেসে বলত, আমি কি অত,শত বুঝি রে! তবে খুব বড়ো ব্যাপার। দেখিস না সব কিছু ছুটি থাকে। স্কুল ছুটি থাকে। অফিস ছুটি থাকে। এইদিন ভারত স্বাধীন হয়েছিল। তার আগে খুব দুষ্টু সাহেবরা আমাদের উপরে খুব অত্যাচার করত। আমার ঠাকুরদাও তো অনেক বছর জেল খেটেছিলেন স্বাধীনতার জন্য। তাই তো আমার বাবারও আর পড়াশোনা হয়নি। ওঁরা অন্য মাপের মানুষ ছিলেন। নিজেদের কথা ভাবতেন না। আমি তো শুধু পতাকা বানাই। পতাকা নিয়ে যখন হাঁটি, তখন মনে হয় ভয়ের কিছু নেই। আমার হাতেই এ দেশের দায়িত্ব। তাই কোনো অন্যায় যেন সহ্য না করি।

পুনিতের মাথায় এসব কিছুই ঢুকত না। দু-দিন বাদে আবার একই প্রশ্ন করত। তা শেষে একদিন ওর বাবা খুব ভেবেচিন্তে বলল, গ্রামের পুরোহিতমশাই মানিকবাবু খুব পণ্ডিত লোক। আর ওর তো অনেক বয়েসও হয়েছে। উনি নির্ঘাত জানবেন। ওকে জিজ্ঞেস করব গিয়ে।

ওরা তারপরে একদিন ভোর ভোর মানিকবাবুর বাড়ি গিয়ে এ প্রশ্নটা করল। উনি তখন দাঁত ব্রাশ করছিলেন। প্রথমে প্রশ্নটা শুনে ব্রাশ মুখ থেকে পড়ে গেলেও, খানিক বাদে সামলে বলে উঠলেন, তোরা তো কিছুই দেখলি না! আমার এখনও মনে পড়ে সেদিনের কথা। আমরা সবাই মাঝরাতে বড়োদের সঙ্গে বসে সেদিন রেডিয়োতে শুনেছিলাম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু বলছেন,আজ রাতে পৃথিবী যখন ঘুমোবে, স্বাধীন ভারত জেগে উঠবে।

সে কী আনন্দ চারদিকে! আমি তখন খুব ছোটো। আনন্দে না বুঝে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছিলাম। এর বেশি আর কিছু আর মনে নেই। কিন্তু কথাগুলো এখনও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়।

—তা দাদু, স্বাধীনতার মানে কী?—পুনিত আবার প্রশ্ন করে।

খানিকক্ষণ চুপ করে মানিকবাবু একটু যেন বিরক্ত হয়েই বলে উঠলেন, এই যে নিজের ইচ্ছেমতো চলছি-ফিরছি, কেউ এসে হঠাৎ ক রে পেটাচ্ছে না, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে না—এটাই স্বাধীনতা। তা তোদের কি মাথা খারাপ হল! সকাল সকাল বাবা-ছেলে মিলে চড়াও হয়েছিস এ প্রশ্ন নিয়ে! বলি, তোদের কি কিছু এসে যায় এতে! খেতমজুরি করিস! এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ! ওসব যারা রাজনীতি করে, তারা এসব ভাববে। তোরা তোদের কাজ কর।

ওরা খানিক বাদে বাড়ি ফিরে এল। পুনিতের প্রশ্ন আরও বেড়ে গেল। কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস আর ছিল না।

এর কয়েক মাসের মধ্যে হঠাৎ যে কী হল, দু-দিনের জ্বরে পুনিতের বাবা মারা গেল। বাবা কি আগেই টের পেয়েছিল? তা না হলে কেন তার আগের দিন পুনিতকে পাশে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে, আমি চলে গেলে কাকার কাছে শহরে চলে যাস। পড়াশোনাটা ভালো করে করিস। আর পতাকাটা সঙ্গে রাখিস।

বাবা মারা যাওয়ার পরে খুব কেঁদেছিল পুনিত। ওর মা আগেই মারা গিয়েছিল। গ্রামে আপনার বলতে আর কেউ রইল না। ওর কাকা শহরে একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। বাবা মারা যাওয়ার দিনকয়েক বাদে কাকা এসে ওকে শহরে নিয়ে গেল।

কাকার অবস্থাও বেশ খারাপ। তারপরে বড়ো শহর। খরচ অনেক বেশি। তাই থাকার জায়গা জুটলেও ওর পড়াশোনা আর হল না। স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। রোজগারের খোঁজে ও একটা চায়ের দোকানে কাজে ঢুকল। প্রথমে ভালো না লাগলেও পরে আস্তে আস্তে কাজটা ভালো লাগতে শুরু করল। চায়ের দোকানের পাশেই ছিল একটা বড়ো অফিস। আর সেখানে অনেক কমবয়েসি ছেলে-মেয়ে কাজ করে। ওর বেশ লাগে। কী সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পরে সবাই আসে। একসঙ্গে হইচই করে, আড্ডা মারে কাজের ফাঁকে। সব সময় মজায় থাকে।

চায়ের দোকান যার, তার নাম মুন্না। সে-ও বেশ ভালো লোক। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মজার মজার গল্প করে। তবু মাঝেমধ্যেই পুনিতের মন খুব খারাপ লাগে। ওর বয়স দশ। সারাজীবন কি এভাবেই কেটে যাবে চায়ের দোকানে? ও কি আর কিছু করবে না! মাথার উপর দিয়ে প্লেন গেলেই ও মাথা তুলে দেখে। ওতে করে নাকি হুস করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাওয়া যায়। ও কি কোনোদিন ওরকম প্লেন চড়তে পারবে! কে জানে!

কই, ও তো ওর ইচ্ছেমতো কিছুই করতে পারে না। ও কি তাহলে স্বাধীন নয়!

কদিন বাদে মুন্নাদাকেও প্রশ্নটা করল পুনিত। ও ভেবেছিল, মুন্নাদা হেসে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু তা না। মুন্নাদা একজন কাস্টমারকে বেগুনি দিচ্ছিল।

গলার স্বর একটু নামিয়ে ওকে বলে উঠল, আমিও ঠিক জানি না। এটা খুব বড়ো শহর। যাকে-তাকে এসব প্রশ্ন করলে কী ভাববে কে জানে! পুলিশ ও ধরতে পারে। লোক বুঝে জিজ্ঞেস করতে হবে।

সেদিনই বিকেলের দিকে মুন্নাদা একটা স্যুট-টাই-পরা লোকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠল, ওকে জিজ্ঞেস করা যাক। আমি ওকে চিনি। বেশ ভালো লোক।

তখন বিকেলের আলো ফুরিয়ে এসেছে। ঘর-ফেরা পাখিদের আওয়াজে কান পাতা দায়।

তা লোকটা প্রশ্নটা শুনে চায়ের প্লাস্টিকের কাপে একবার চুমুক দিল। তারপর সামনের গাছের পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে ধীরেসুস্থে বলে উঠল, ওই যে ওরা যেমন ইচ্ছে উড়তে পারছে, যেমন ইচ্ছে কাজ করতে পারছে, যেমন ইচ্ছে আওয়াজ করতে পারছে, সেটাই স্বাধীনতা। তার মানে অবশ্য এই নয় যে তুমি যা ইচ্ছে করতে পারবে। ধরো, তুমি তোমার চায়ের কাপটা আমার দিকে ছুড়ে মারলে, সেটা তো স্বাধীনতা নয়! সবকিছুই নিয়ম মেনে করতে হয়। তা না হলে সমাজ—দেশ—সব ভেঙে যায়।

পুরোটা না বুঝলেও পুনিতের এই কথাটা বেশ মনে লেগেছিল। আর তাই রোজ বিকেলের দিকে ওই ঘর-ফেরা পাখিদের দিকে তাকিয়ে দেখত ও। কীরকম খেয়ালখুশিমতো ওরা উড়ে বেড়ায়! দেখতে দেখতে ওর মনে পড়ত ওদের ছোটো বাড়িটার কথা। সরষের খেতের কথা! ওর বন্ধুদের কথা। ওর বাবার রং করার তুলিগুলোর কথা।

রাতের বেলা যখন কথা বলার কোনো লোক থাকত না, তখন পুনিতের খুব খারাপ লাগত। ওরও তো খেলতে ইচ্ছে করে, পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেসব করার কোনো উপায় তো নেই। তবে কোনো একটা দিন ও নির্ঘাত স্বাধীন হবে। আর তখন ঠিক ওই লোকটার মতো কথা বলবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে।

দেশ থেকে আসার সময় সঙ্গে করে বাবার তৈরি একটা পতাকা নিয়ে এসেছিল। রোজ রাতে তার উপরে খানিকক্ষণ হাত বোলাত। তারপরে মাথার কাছে নিয়ে শুত।

একদিন মুন্নাদা ওকে বলল, জানিস এই অফিসটাতে কাল স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বড়ো প্রোগ্রাম হবে। চারদিক তাই অত সাজিয়েছে। আমাদের দোকান তো কাল বন্ধ থাকবে। কিন্তু তুই আসিস। ওদের বলে অফিসে ঢুকে যাবি। ওরা তো তোকে রোজ দেখে। নির্ঘাত ঢুকতে দেবে। সব কথা জানতে পারবি তাহলে। দেখবি, পতাকা তোলা হবে।

পুনিত তো শুনে খুব খুশি। তা সেদিন ভোর হতে-না হতেই ওখানে হাজির। সঙ্গে সেই পতাকা। কিন্তু গেটের কাছে যেতেই অফিসের সিকিউরিটি এগিয়ে এল। ঢুকতে গেলে অফিসের কার্ড লাগবে। না থাকলে অফিসের কাউকে সঙ্গে থাকতে হবে। ও বেশ খানিকক্ষণ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। অনেক গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকল। কিন্তু তারা কেউই পুনিতকে খেয়াল করল না। ঘণ্টা দুয়েক বাদে ঢুকতে না পেয়ে ও ফিরে চলল বাড়ির পথে।

ওর হাতে ধরা পতাকাটা সবাই কৌতূহলের সঙ্গে দেখছিল। ও কিন্তু কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে মাথার উপরে নাড়তে নাড়তে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।

রাস্তায় অন্যদিনের মতো গাড়ির ভিড় নেই। অফিসপাড়া। বেশির ভাগই ছুটি। ফাঁকা রাস্তা। দু-চারজন হেঁটে যাচ্ছে। ওর সামনে কিছু দূরে এক কমবয়েসি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ভালো পোশাক পরা। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে মেয়েটার পাশ ঘেঁষে থামল। গাড়ি থেকে দুটো লোক নেমে মেয়েটার উপরে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে টেনে তোলার চেষ্টা করছিল ওরা।

ওর কী মনে হল কে জানে! শুধু বাবার কথাটা মনে পড়ল।

—বুঝলি, এ পতাকা হাতে থাকলে কোনো কিছুতে ভয় লাগে না। কারণ মনে হয় আমার হাতে এ দেশের দায়িত্ব।

ও চিৎকার করে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল গুন্ডা দুটোর উপরে। আশপাশে তো আরও লোক ছিল। তারা কেউ এগিয়ে এল না। লোক দুটোর গায়ে বেশ জোর। তবে পুনিতও অত সহজে হার মানতে নারাজ। যতবার লোক দুটো ওকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ও ততবার ফের উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল ওদের গায়ে। কিছু লোক মজা দেখার জন্য জড়ো হচ্ছিল। খানিক বাদে গতিক সুবিধের নয় বুঝে লোক দুটো কোনোরকমে গাড়িতে গিয়ে উঠল। আর উঠেই জোরে গাড়ি চালিয়ে দিল।

তবে তার আগেই ওদের একজন একটা ছোরা দিয়ে বেশ কয়েকটা কোপ দিয়ে গেছে পুনিতের হাতের উপরে। রক্তে ওর পুরো হাতটা লাল হয়ে গেছে। মেয়েটার কিছু ক্ষতি হয়নি। ভয়ে রাস্তায় বসে পড়েছে। আর অবাক চোখে পুনিতের দিকে তাকিয়ে আছে। এইটুকু একটা বাচ্চা!

পতাকাটাও দূরে পড়ে গেছে। টানা-হেঁচড়ায় ছিঁড়ে গেছে।

পুনিত রক্তে ভেজা হাতেই ছেঁড়া পতাকাটা রাস্তা থেকে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, জয় হিন্দ!

প্রথমবার ওর মনে হল ও স্বাধীন। জ্ঞান হারানোর আগে ও যেন স্পষ্ট দেখতে পেল বাবার রং করার তুলির দাগ। গেরুয়া, সবুজ—

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%