ভয়নিচের অজানা ভাষা

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

রাজর্ষি। আমি ওকে রাজু বলে ডাকতাম। ও ছিল অনেকটাই আমার মতো। আমার মতো একা। চুপচাপ। আমার স্কুলের সব থেকে প্রিয় বন্ধু। স্কুলের বেশির ভাগ সময়টাই আমার কাটত ওর সঙ্গে।

অবশ্য আমরা যে শুধু স্কুলেই একসঙ্গে থাকতাম তা নয়। স্কুলের পরে রোজই আমরা হাঁটতে হাঁটতে হয় পুকুরধারে গিয়ে, না হয় আমবাগানে, না হয় বটতলার মাঠে গিয়ে বসতাম। মাঝেমধ্যে ও যেন অন্য একটা জগতে হারিয়ে যেত। পুকুরের ধারে বসে জলের মধ্যে ব্যাঙাচিগুলোর লাফালাফি দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে যখন রোদ্দুর গড়িয়ে আসত, ও তখন অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকত। মনে হত যেন কারো ম্যাজিক শো দেখছে। আমি কিছু কথা বলতে গেলে ঠোঁটে আঙুল তুলে আমাকে কথা বলতে বারণ করত। আর উপরের গাছের দিকে দেখাত। আর সত্যি করেই তখন যেন ওর মতোই মুহূর্তের মধ্যে ওর চোখে অন্য জগৎটাকে দেখতে পেতাম। ধরা দিত সেই চোখের সামনের অজানা জগত।

গাছের পাতায় বিছিয়ে-রাখা মাকড়সার জালে আটকে-থাকা জলের ফোঁটা মুহূর্তে যেন মুক্তো হয়ে উঠত। পাতার উপরে হাত-পা তুলে নাচতে-থাকা ছোটো কালো পোকাকে দেখতে পেতাম। খানিক দূরে সবুজ পাতার উপরে ঝিমিয়ে পড়ে-থাকা ফড়িংটার মনের ভাব বুঝতে পারতাম। তিরতির করে হাওয়ায় কাঁপতে-থাকা পাতাগুলোর মধ্যের কথাও যেন শুনতে পেতাম। সেই সুরেলা শব্দের আড়ালে চড়ুই, দোয়েল, ঘুঘুর ডাকও যেন হারিয়ে যেত। ওদের সুরের সঙ্গে তাল-মেলানো হলুদ ঘাসফুলের মাথা নাড়া চোখে পড়ত। উপর থেকে ফুলের পাপড়ি নেমে আসত। আমাদেরকেও যেন ওদের উৎসবে কিছুক্ষণের জন্য শামিল করে নিত।

কখনো বা আমরা বটতলার মাঠের পাশে বসে একসঙ্গে খেলা দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম। আমি নিজে খেলতে পারতাম না। আর ওর নিজের খেলার আগ্রহ ছিল না। গোল হলে সে যে দলেরই হোক-না কেন, আমরা দুজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠতাম। আমাদের মতো একনিষ্ঠ দর্শক পেয়ে যেকোনো দলই খুশি হত, তা বলাই বাহুল্য। খেলা শেষ হলে ওরা যখন মাঠ থেকে বেরোত, আমি ওদের কাছ থেকে বলটা কয়েক মিনিটের জন্য চেয়ে নিতাম। বলটা হাতে ছুঁয়ে কী যে ভালো লাগত, বলে বোঝাতে পারব না। মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখতাম, আমিও ওদের মতোই বল নিয়ে ছুটে যাচ্ছি। একের পর একজনকে কাটিয়ে গোলে শট। গোল! ঘুম ভেঙে রোজ মন খারাপ হয়ে যেত। জানি, আমি ওদের মতো কোনোদিন ভালো খেলতে পারব না।

আরেকটা দিকেও আমাদের মিল ছিল। দুজনেরই স্কুল বিশেষ ভালো লাগত না। নিয়মমাফিক কিছুই ভালো লাগত না। তবে আমি পরীক্ষায় শেষের দিকে থাকলেও ও কিন্তু বেশ ভালো রেজাল্ট করত। বরাবর ফার্স্ট হত। কী করে করত, সেটা বুঝতে পারতাম না। মাঝেমধ্যে মনে হত, আগে থেকেই ও যেন সবকিছু জানে।

ওর বাবা-মা ছিল না। মাইল পাঁচেক দূরের একটা অনাথ আশ্রমে থাকত। ওখানে কাছাকাছি স্কুল না-থাকায় আমাদের এই স্কুলে ও অনেকটা হেঁটে পড়তে আসত। অন্যদের মুখে শুনেছিলাম ওর যখন দিন দশেক বয়স, কে যেন ওকে গ্রামের চার্চের বাইরে কাপড়ে মুড়ে রেখে গিয়েছিল। ওখানকার ফাদার মোজেস ওকে কুড়িয়ে অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেন। ওখানে অনাথ আশ্রমের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মানুষ হলেও ও কিন্তু ছিল একদম অন্যরকম। সব সময় একটা অজানা আনন্দে যেন বিভোর থাকত। আর মাঝেমধ্যে নিজের মনে বিড়বিড় করে হেসে বলে উঠত, ভারী মজা।

জিজ্ঞেস করলে বলে উঠত, শুনলি না, কী বলে গেল।

—কে?

—ওই যে—বলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখাত। দেখতাম, দূরে কোনো পাখি উড়ে যাচ্ছে। আমি ওকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, রাজু, তুই কি ওদের কথা বুঝতে পারিস?

—না, এখনও পারি না, তবে শেখার চেষ্টা করছি। শুধু মজার কথাগুলো যখন ওরা নিজেদের মধ্যে বলে আর নিজেদের মধ্যে ছোটোছোটো ব্যাপারে ঝগড়া করে, তখন ওদের হাবেভাবে যেন একটু একটু বুঝতে পারি। —বলে থেমে যেত। আবার যেন কীসের ভাবনার মধ্যে হারিয়ে যেত।

ও যে অন্যরকম, বলতে গেলে একদমই অন্যরকম— আস্তে আস্তে সেটা টের পেলাম।

আমার মনে হত, সবকিছুই যেন ও আগে থেকে জানে। কিন্তু প্রকাশ করতে চায় না। তখন আমরা ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমাদের নতুন একজন অঙ্কের টিচার এলেন স্কুলে। সৌজন্যবাবু। সৌজন্য পাত্র।

কয়েক দিনের মধ্যেই ওর একটা ডাকনাম আমাদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে উঠল। শূন্য। এর কারণ ওর কাছে যেকোনো পরীক্ষায় ভালো, খারাপ সব ছাত্রেরই একই অবস্থা হত। সব থেকে কম মার্কস শূন্য, সব থেকে বেশি মার্কসও শূন্য। আর উনি তা দেখে যেন ভারী তৃপ্তি পেতেন। নাম্বার বলার সময় ঠোঁটের কোণে একটা হাসি লেগে থাকত। আর সে আনন্দ পাওয়ার জন্যই কি না জানি না, মাঝেমধ্যেই পরীক্ষা নিতেন ক্লাসে।

তা উনি একদিন আমাদের ক্লাসে বেশ কিছু শক্ত শক্ত অঙ্ক দিলেন। সবার মতো রাজর্ষিও শূন্য পেল। কিন্তু রেজাল্ট দেওয়ার সময় সৌজন্যবাবু ওকে আলাদা করে ডাকলেন। ওর খাতা দেখে সৌজন্যবাবু খেপে আগুন। আমরা একটু অবাক হলাম। কারণ শূন্য পাওয়ার জন্য তো আর ওর উপরে ওর রাগ হওয়ার কোনো কারণ নেই। সেটাই নিয়ম।

ওকে সামনে ডেকে নিয়ে উনি চেঁচাতে শুরু করলেন, বলি, এটা কি ইয়ারকি হচ্ছে? তোমার সম্বন্ধে তো অনেক ভালো ভালো কথা শুনেছিলাম। তা তোমারও এই অবস্থা। এটা কী? অঙ্ক চেষ্টা করে পারোনি এক কথা, আর এসব হাবিজাবি লিখে রাখা আরেক কথা। অঙ্ক না করে এসব কী লিখেছ? বলি, কবি হওয়ার ইচ্ছে থাকলে বগলে খাতা নিয়ে এখনই রাস্তার ধারে বেলতলায় গিয়ে বসতে পারো।

বলে উনি আমাদের সবাইকে শুনিয়ে পড়তে শুরু করলেন, প্রথম অঙ্কের উত্তরের জায়গায় তুমি লিখেছ—

যেসব লোকে পদ্য লেখে

তাদের ধরে খাঁচায় রেখে

কানের কাছে নানান সুরে

নামতা শোনায় একশো উড়ে

সামনে রেখে মুদির খাতা

হিসেব কষায় একুশ পাতা।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম। আমাদের দিকে একবার কড়া চোখে তাকিয়ে উনি ফের বলে উঠলেন, তাও নিজের কবিতা হলে বুঝতাম। মূর্খ হয়ে সুকুমার রায়ের কবিতা লিখলে চলবে সারাজীবন?

আসলে সৌজন্যবাবু ছিলেন ওড়িশার লোক। আমাদের মতো উনিও ভেবেছিলেন, ওকে নিয়ে ঠাট্টা করেই রাজর্ষি বোধহয় এটা করেছে। 'উড়ে' বলে লিখেছে।

আমি নিজে একটু অবাকই হয়েছিলাম। কারণ কাউকে অপমান করে কোন কিছু করতে ওকে কোনোদিন দেখিনি। সব শিক্ষককে ও দারুণ শ্রদ্ধা করে। হঠাৎ করে এটা ও করতে যাবে কেন!

সৌজন্যবাবু ফের হুংকার করে উঠলেন, কী ব্যাপার? কী জন্য এসব রাবিশ লিখেছিলে?

রাজর্ষি মাথা নিচু করে বলে উঠেছিল, আসলে উত্তরটা ২১ এসেছিল, তাই ওই কবিতাটার কথাই মনে এসেছিল। তাই লিখে ফেলেছিলাম।

আমরাও সবাই বুঝলাম—ওই 'একুশে আইন'-এর কবিতাটা লেখার মূল কারণ। ওই অঙ্কের উত্তরও পেয়েছিল একুশ। আর একুশই ছিল ওই শক্ত অঙ্কটার ঠিক উত্তর।

সৌজন্যবাবুর মুখ যেন আনন্দে একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

উনি ফের বলে উঠলেন, তার পরের অঙ্কটার উত্তরে 'জল' লিখেছ? সেটা আবার কী? এর থেকে জলে ঝাঁপ দিলে ভালো করতে।

—আসলে উত্তরে ১৮ এসেছিল। ওটা জলের মলিকিউলার মাস নাম্বার বা ভরসংখ্যা। তাই জলের কথা মনে এল।

আমরা ক্লাস ফাইভে কেউই তার অর্থ বুঝিনি। তখন আমরা এসব কিছুই পড়িনি। পরে বুঝেছিলাম। কিন্তু স্যার তখন বুঝেছিলেন। ওই উত্তরটাও ঠিক। আর তাই আরও অবাক হয়ে ওর ঘাড়ে সস্নেহ হাত রেখে পরের প্রশ্নের উত্তরের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেছিলেন।

পরে দেখা গেল সব ক-টা অঙ্কের উত্তরই ঠিক। আর সব ক-টা অঙ্কের উত্তরই ও ভালোমতো কষে বার করেছে পিছনের পাতায়।

সৌজন্যবাবুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। ওঁর অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। আর শুধু তা-ই নয়, সংকেতের মাধ্যমে এমনভাবে লিখেছে যে অনেক পণ্ডিত লোকও সে সংকেতের অর্থ বুঝতে হিমশিম খাবে। এখানে বলে রাখি, সেদিনের বেশির ভাগ অঙ্কের প্রশ্নই ছিল অনেক উঁচু ক্লাসের।

পরে একদিন আমরা যখন বটতলার মাঠে বসে খেলা দেখছি, তখন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও এত কিছু জানে কী করে!

ও বলে উঠেছিল, জানিসই তো আমি অনাথ আশ্রমে থাকি। ওখানে বেশ কয়েকটা দাদা আছে, যারা উঁচু ক্লাসে পড়ে। আমি মাঝেমধ্যেই ওদের বইগুলো নিয়ে বসে যাই। নাড়াচাড়া করি। অনেক কিছু জানা যায়।

—তা তোর এসব শক্ত লাগে না। নিজে থেকে বুঝতে পারিস?

—না, শক্ত আর কী? আর তেমন শক্ত লাগলে ওদের জিজ্ঞেস করে জেনে নিই।

কথাটা ও এত সহজভাবে বলেছিল যেন যে-কেউ চাইলেই অন্য ক্লাসের বই পড়ে বুঝে নিতে পারে। আমি তো আমার ক্লাসের বই পড়েই বুঝতে পারতাম না।

এসব কথার মধ্যেও হঠাৎ করে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। বলে উঠল, এসব প্রশ্নের উত্তর তো অনেক সোজা। বিষয়টা একটু পড়ে নিলেই সব জানা যায়। কিন্তু অনেক কিছুর উত্তরই তো কোনো বইতে নেই। আর সেসব উত্তরই তো আমি খুঁজছি।

আমি অবাক হয়ে গেলাম। এমন কী থাকবে, যা বইতে নেই? বড়োদের বইতেও নেই!

ও উঠে দাঁড়াল। বলে উঠল, আয়, তোকে দেখাই। বলে মাঠের থেকে কিছু দূরে পার্থদের বাড়ির কাছে একটা বুড়ো হিমসাগর আম গাছের সামনে নিয়ে গেল আমাকে। জিজ্ঞেস করল, দেখতে পাচ্ছিস ওদের?

—কাদের?

—আরে, ওই ছোটো ছোটো লাল পিঁপড়েগুলোকে দেখ। সার বেঁধে কীরকম উঠছে। মাটির দিকে দেখিয়ে ও বলে উঠল, ওই ওখানে ওদের গর্ত। সেখান থেকে কীরকম সার বেঁধে গাছের উপর অব্দি উঠে গেছে। এবার একটা মজা দেখ। আমি ওদের যাওয়ার পথে সামান্য একটু বাধার সৃষ্টি করব।— বলে খানিক দূরের টিউবওয়েল থেকে হাতে করে খানিকটা জল নিয়ে এসে মাটির উপরে ওদের পথে ফেলে দিল। খুব সাবধানে সামান্য জল ফেলল, যাতে একটাও মারা না যায়। কিছু পিঁপড়ে শুধু ভেসে চলে গেল। খানিক বাদে ওরা আবার অন্য পথ দিয়ে ওই আম গাছের দিকে এগিয়ে গেল।

আমাকে এবার ও বলে উঠল, কী বুঝলি, কী হল?

—কী আবার? কয়েকটা পিঁপড়ে জলে ভেসে গেল আর তারপরে ওরা অন্য পথে এগিয়ে গেল।

রাজু হেসে উঠল। বলে উঠল, তুই সবই দেখেছিস। কিন্তু এটা ওরা কি করে করল তা ভাবিসনি। কয়েকটামাত্র পিঁপড়ে আক্রান্ত হল আর সঙ্গে সঙ্গে সে খবর চলে গেল অন্যদের কাছে।—গর্তের দিকে আঙুল তুলে বলে উঠল, ওই যারা ৪ ফুট দূরে, আছে তাদের সবার কাছেও ওই খবর চলে গেছে। এমনকী যে পিঁপড়েগুলো গাছের উপরে আছে, তাদের কাছেও খবর চলে গেছে। এটা কী করে সম্ভব হল বল তো? ওরা নিজেদের মধ্যে কী সুন্দর কথা বলে দেখেছিস? ওই ভাষা কি আর কোনো বইতে লেখা আছে? ওটাই শিখতে হবে। ভেবে দেখ, ওরা কত সুন্দরভাবে একসঙ্গে থাকে। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পিঁপড়ে। তুই এত মানুষকে কখনো একসঙ্গে দেখেছিস? একসঙ্গে একটা কাজ করতে দেখেছিস?

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলে উঠল,তাহলেই ভাব, ওরা কত এগিয়ে আছে! আর কত সুন্দর ওদের ভাষা।

আমি তখনও ওর কথার অর্থ বুঝছিলাম না। এ আর এমন কী শক্ত ব্যাপার! আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ও বলে উঠল, চল, এসব এখনই তোর মাথায় ঢুকবে না। আমরা খেলা দেখি গিয়ে।

আমরা আবার মাঠের দিকে ফিরে চললাম।

আমি তখন ক্লাস সেভেনে। হঠাৎ মা মারা গেল। কদিনের জ্বরে। হঠাৎ করে মনে হল, আমার পৃথিবীটাই যেন বদলে গেছে। মনে হল, আমাদের ছোটো সংসারটার শিকড় কেউ যেন হঠাৎ করে মাটি থেকে উপড়ে তুলে নিয়েছে। স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম। বাবাও তেমন কিছু বারণ করল না। এমনিতেই আমার পড়াশোনা ভালো লাগত না।

বাবার যে ছোটো টিমটিমে মুদির দোকানটা ছিল, সেখানে বসতে শুরু করলাম। বাবারও একটু সুবিধে হল। আমি রোজ খাতায় কেনা বেচার হিসেব করে দিই।

আর বেশির ভাগ সময় যখন দোকানে লোক আসে না, তখন উলটোদিকের বট গাছটার দিকে তাকিয়ে পাখিদের খেলা দেখি। বুঝতে পারি, রাজুর সঙ্গে থেকে থেকে ওদের ভাষা খানিকটা শিখেছি। ওদের কিছু কিছু কথা যেন বুঝতে পারি। পাখিগুলো যখন গাছে বসতে উড়ে আসে, নিজেদের মধ্যে কথা বলে, তখন ওদের হাবেভাবে, ডানার ওঠানো-নামানোতেই ওদের অনেক কথা বোঝা যায়। যখন রেগে থাকে, কাউকে আক্রমণ করতে চায়, ডানাটা যেন নীচে নামিয়ে কিছু লুকিয়ে রাখতে চায়। ওদের হাবভাব দেখে ঠিক বোঝা যায়, কখন ওরা আসল মারপিট শুরু করবে, কখন শুধুই বা ভয় দেখাতে চায়। কখন মজা করছে, কখন বা বন্ধুত্ব করতে চায়। ওদের মধ্যে দু-একটা পাখি মিথ্যেও ভালো বলে। এই যেমন সেদিন দেখি, একটা কাঠঠোকরা পাখি একটা বাবুইকে ভালো বাসা বানানোর জন্য কী সব বুঝিয়ে অন্য একটা গাছে পাঠিয়ে দিল। তারপরে দেখি, ওই গাছটার গুঁড়ি ঠুকরে ঠুকরে পোকা বার করে খাচ্ছে। বট গাছটায় কখন কোন পাখি আসে, সে রুটিনটাও আমার মুখস্থ হয়ে গেল।

এভাবে প্রায় এক মাস কেটে গেল। স্কুলে না গেলেও রাজুর সঙ্গে রোজই দেখা হত। ও স্কুলের পরে আমাদের দোকানে চলে আসত। তারপর ও আর আমি মিলে ভটচায্যিদের পুকুরধারে গিয়ে বসতাম। মাছ ধরা দেখতাম। ফাতনার ওঠা-নামা, ভেসে ওঠা। রোদ আর মেঘের আলোমছায়ার খেলা দেখতাম। আলো আরেকটু কমে এলে বাঁশের কচি পাতা চিবোতে চিবোতে বটতলার মাঠে বসে খেলা দেখতাম।

এ ক'দিন আমার মা চলে যাওয়ার পর থেকে অন্য অনেক কথা হলেও রাজু আমাকে কখনোই জিজ্ঞেস করেনি কেন আমি স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ারও কোনো চেষ্টা করেনি। একদিন হঠাৎ ওই পুকুরধারে বসে বলে উঠল, বুঝলি, ঝড় না এলে গাছের শিকড় শক্ত হয় না। ওই, ওই— সামনের বড়ো বট গাছটা দেখ। কত বছর পুরোনো। একশো-দেড়শো বছর তো বয়েস হবেই। কত ঝড়-জল ওর উপর দিয়ে গেছে। আর তাই ও কীরকম শক্ত শিকড় গেড়েছে দেখ। গাছ থেকে ঝুরি নেমে এসে মাটি আঁকড়ে ধরেছে। হাল ছাড়েনি। এটাই আসল শিক্ষা, বুঝলি। প্রত্যেকের জীবনেই ঝড় আসা উচিত। তা না হলে অনেক কিছু শেখা যায় না। জীবনের এই অন্ধকারে ঢাকা দিনগুলোই আমাদের আলোর সন্ধান দিয়ে যায়। আমাদের ভাবতে হবে, সেই ঝড়ের কাছে হেরে যাব কি না, নাকি এমনভাবে তৈরি হব, যাতে পরের ঝড়েও কিছু না হয়।

ও পকেট থেকে একটা ছোটো কাপড় বার করল। খুব পুরোনো একটা সাদা রুমাল। তাতে সেলাই করে কয়েকটা নকশা আঁকা।

—এটা কীজানিস?

—না। এটা কোথায় পেলি?

—আমাকে যখন চার্চের বাইরে পাওয়া গিয়েছিল, এ রুমালটাও তখন সেখানে পাওয়া গিয়েছিল। আমার মনে হয়, এটা আমার মা আমার জন্য রেখে গিয়েছিল। হয়তো এই নকশাটার অর্থ যখন খুঁজে পাব, তখনই আমার মা-কে খুঁজে পাব। আমি যাতে বড়ো হয়ে আমার মা-কে খুঁজে বার করতে পারি, সেজন্যই রেখে গিয়েছিল, তা-ই না?

—ঠিক বলেছিস।

দেখতে পেলাম, ওর চোখ ছলছল করে উঠল। ওর চোখে কখনো জল দেখিনি আগে।

বলে একটু থেমে ও ফের বলে উঠেছিল, কালকে আবার স্কুলে চলে আসিস। একটা মজা দেখাব।

—এতদিন বাদে হঠাৎ করে যাব কী করে! সবাই বকবে তো রে! প্রায় এক মাস কিছুই তো পড়িনি। সামনেই তো পরীক্ষা।

—আহা, এত ভাবিস কেন? আমি তো আছি। আর এই যে এক মাস স্কুলে যাসনি, তাতেও কি কম কিছু শিখেছিস?

সত্যি কথা বলতে আমি তখন এসব কথা বুঝিনি। শুধু আরেকবার মনে হয়েছিল ও অন্যরকম।

আর কী ভেবে জানি না আবার আমি পরের দিন স্কুলে গিয়েছিলাম। সেদিন টিফিনের বিরতিতে হঠাৎ আমাকে বলে উঠল, চল, তোকে যে বলেছিলাম, সেই মজার খেলাটা দেখাই।

বলে স্কুল থেকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে আমাকে একটা দেশলাই বাক্স আর একটা ছোটো কাগজ দিল। অবাক হয়ে ওটা দেখে বলে উঠলাম, এটা আবার কী?

কাগজটা একটা বড়ো কাগজ থেকে কাটা। ১ ইঞ্চি মতো চওড়া, চার ইঞ্চি লম্বা। ছোটো ছোটো করে বেশ কয়েকটা বাংলা অক্ষর তাতে লেখা আছে। কিন্তু কিছু কিছু অক্ষরের মধ্যে বেশি গ্যাপ থাকলেও পুরো লেখাতে কোনো অর্থবহ শব্দ নেই।

অচবট চকতলমেকাগাছেলিপি ঠেরনীচে

ও এবার ওই কাগজটা দেশলাই বাক্সের উপরে জড়িয়ে দিল। আর বলে উঠল, এটা আসলে একটা সাংকেতিক বার্তা। আজ থেকে আমি আর তুই যখন কোনো কথা বলব, এই দেশলাই বাক্সের সাহায্যেই বলব। দেশলাই বাক্স তো যেখানে ইচ্ছে পাওয়া যায়। শুধু মনে রাখবি, যেখানে 'ব' অক্ষরটা থাকবে, সেখান থেকে শুরু করবি আর সেটা দেশলাইয়ের পাশের দিকে প্রথম অক্ষর যেন হয়। এটা শুধু এ লেখাটার জন্যই নয়, আমার আর তোর মধ্যে ওটাই হবে কিওয়ার্ড। কী খেয়াল থাকবে তো?

—বলে ও ওই আবোল-তাবোল অক্ষর-লেখা কাগজটা দেশলাই বাক্সের উপর দিয়ে সেভাবে জড়িয়ে দিল।

আর তারপরে বলে উঠল,'ব' অক্ষরটা যেখানে থাকবে, সেখান থেকে শুরু করবি। আর দেশলাইয়ের ঠিক পাশের দুটো দিকে যেটুকু পাবি, সেটুকুই পড়বি। বাকি অংশতে, অর্থাৎ দেশলাইয়ের সামনে বা পিছনে যে লেখা থাকবে তা দেখবি না। আর সেটুকু অংশের মধ্যে অর্থপূর্ণ শব্দ খুঁজবি। একই শব্দের দুটো অক্ষরের মধ্যে ফাঁকও থাকতে পারে।

সেরকম করে দেখলাম। তাতে যে তিনটে শব্দ ধরা পড়েছে তা হল —

বট গাছের নীচে।

—বট গাছের নীচে—সে আবার কী?

—চল, গিয়ে দেখাই যাক-না। এখানে তো একটাই বট গাছ আছে।

এখানে বলে রাখি আমাদের স্কুলের পাশেই একটা খেলার মাঠ, আর সেখানে একটা বড়ো বট গাছ ছিল। সেখানে গিয়ে ও বলে উঠল, এবার মাটিটা একটু সরিয়ে দেখা যাক।

বট গাছের নীচে কিছুটা জায়গা জুড়ে আলগা মাটি ছিল। যেন কেউ কিছুক্ষণ আগেই খুঁড়ে কিছু রেখেছে। সেই আলগা মাটি খানিকটা সরাতেই আমি আমার পুরোনো ভাঙা টিফিন বক্সটা খুঁজে পেলাম। কিছুদিন আগে দিপু আমার থেকে মজা করে ওটা ছিনিয়ে নিয়েছিল। কোথায় রেখেছিল জানতাম না। ভারী দুষ্টু ছেলে। সব সময় অন্যদের খেপিয়ে তবে শান্তি পেত।

বলেছিল, ওই ভাঙা টিফিন বক্সটা এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখবে যে আমি আর কোনোদিন খুঁজে পাব না।

—তা তুই কী করে জানলি?

—আরে, আমি ওর পিছন পিছন লুকিয়ে এসে দেখে গিয়েছিলাম।

আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। আমার মায়ের গন্ধ এখনও লেগে আছে ওতে। ওতে করেই রোজ মা খাবার দিত।

রাজু শুধু বলে উঠেছিল, দেখলি, আমি আর তুই কীভাবে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলতে পারলাম। এই লেখা কাগজ অন্য কারোর হাতে গেলেও সে কিছুই বুঝতে পারত না। তবে আমাদের দুজনের কাছেই একই রকম দেশলাই বাক্স থাকতে হবে। আর জানতে হবে, কোন অক্ষরটা থেকে শুরু করতে হবে।

একসময় গ্রিকরাও এরকমভাবে কোডের মাধ্যমে কথা খুব গোপনীয় তথ্য পাঠাত। শত্রুপক্ষের হাতে গেলেও কেউ কিছু বুঝতে পারত না।

—তা আমরা কি যুদ্ধে যাচ্ছি? আমাদের এসব কোডের কি দরকার পড়বে?—আমি হেসে বলে উঠেছিলাম।

ও বলে উঠল—কে জানে কখন দরকার হবে? তবে এ সংকেতের ভাষা হবে শান্তির ভাষা। যদি কোনোদিন খারাপ দিন আসে, ভালো লোকেদের উপর অন্যায়-অত্যাচার করা হয়, সেদিন হয়তো আমাদের এ ভাষারই দরকার পড়বে।

আবার ওর কথা কিছুই বুঝলাম না।

যত দিন যাচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল, রাজর্ষি যেন অন্য একটা জগতে হারিয়ে যাচ্ছিল। ও যেন আরও চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল। কথা আরও কম বলত। তাও যা বলত, তা বলতে গেলে শুধুই আমার সঙ্গে। বেশির ভাগ সময় আমাদের স্কুলের লাইব্রেরিতে কাটাত। ওখানে কয়েকটা কম্পিউটার ছিল। ও সারাক্ষণ কী সব সার্চ করে দেখত ওতে। এটুকু শুধু বুঝতে পারতাম যে ও যা দেখত তা খেলার কিছু নয়। আবার পড়ার বই সম্পর্কিত কিছুও নয়।

একদিন ওকে দেখলাম খুব খুশি। বলে উঠল, কাজ ভালোই এগোচ্ছে। আর- একটু এগোলেই আমি ওদের ভাষা বুঝতে পারব। তবে যা ভেবেছিলাম, শুধু আমিই না, আমার আগে অনেকেই এ ভাষা শেখার চেষ্টা করেছে। ভাগ্যিস ওই 'ভয়নিচ ম্যানাস্ক্রিপ্ট'-এর কিছু অংশ নেটে পাওয়া গিয়েছিল। তা না হলে আমি জানতেও পারতাম না। ২০০ পাতার এই বইয়ের অর্থ আমেরিকার মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সও এত বছরে বার করতে পারেনি। এ বই কী নিয়ে লেখা, কেন লেখা, তার কারণ গত ৮০০ বছরেও কেউ উদ্ধার করতে পারেনি।

—ভয়নিচ? সেটা আবার কী?

ও একটু হেসে বলে উঠল, তুই অত বুঝবি না। সংক্ষেপে বলতে গেলে এটা একটা সংকেতে লেখা বই। খুব সম্ভবত ১২০০ সাল নাগাদ রজার বেকন নামের এক অসাধারণ প্রতিভাবান ইংরেজ এটা লিখেছিলেন। উনি ছিলেন এককথায় জিনিয়াস। বহু হাত ঘুরে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফের কাছেও এ বইটা যায়। এটা বহু বছর ধরে প্রাগে ছিল। তারপরে এটা ভ্যাটিকানে চার্চের হাতে আসে। সেখান থেকে এটা কেনে উইলফ্রিড ভয়নিচ নামের একজন পুরোনো বইয়ের ডিলার। বইটা অসাধারণ। রজার বেকনের সারাজীবনের রিসার্চের ফসল। আমি যা খুঁজছি, তার সম্বন্ধেও খানিকটা তথ্য আছে।

—তা তুই কী করে জানলি? এত বছর কেউ যা পড়তে পারেনি, তা তুই কী করে উদ্ধার করলি?

—আসলে যেকোনো কোড ব্রেক করতে গেলে, যে লিখেছিল, তাকে ভালো করে জানতে হয়। সে সময়টাকে ভালো করে বুঝতে হয়। 'কিওয়ার্ড'গুলো ভালো করে বুঝতে হয়। মনে আছে আমার আর তোর মধ্যে যেমন 'ব' অক্ষরটা একটা 'কিওয়ার্ড'। এটা তো অন্য কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাই 'কিওয়ার্ড' না জানলে সংকেত উদ্ধার এত শক্ত হয়ে যায়। আমি ওই বইয়ের 'কিওয়ার্ড'গুলো কিছুটা আবিষ্কার করেছি আর সেভাবেই মনে হয়, খানিকটা পড়তে পারছি। ইন্টারনেটে বইয়ের কিছু জায়গা তুলে দিয়ে সেটা পড়ে উদ্ধার করার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল। আর এর জন্য বড়োরকম পুরস্কারও ছিল। কিন্তু আমি তো আর সেজন্য বইটা পড়ছি না। আমি পড়ছি, যাতে আমি ওদের ভাষা ভালো বুঝতে পারি।

—কাদের ভাষা?

—কাদের ভাষা, সেটা তো এখনই বলা যাবে না। পুরো বইটা না পেলে এর পুরো অর্থ বুঝতে পারব, সেটাও এখনই বলা যাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় ভালো ল্যাটিন না-জানার জন্যও বুঝতে একটু অসুবিধে হয়েছে। আসলে এ বইটা পড়া এত শক্ত কেন জানিস? লেখার সময় পুরো অন্য একটা নতুন হরফ ব্যবহার করা হয়েছিল, যেটা এ বইয়ের বাইরে কোথাও ব্যবহার হয়নি। সেটা খানিকটা ল্যাটিন থেকে নেওয়া, খানিকটা গ্রিক থেকে নেওয়া, খানিকটা একদম অন্য ধরনের। আর সেই হরফটাই আমি উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।

—তা এখন ওটা আছে কোথায়?

—আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে ওটা রাখা আছে। আমি একটা পাতার অর্থ খুঁজে বের করে ওদের জানিয়েছি। আর বইয়ের আরও কিছু পাতা যাতে আমাকে পাঠানো হয়,তার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। ওরা আমার কাজে খুব খুশি। তাই আরও কিছু কিছু অংশ পাঠিয়েও দিয়েছে। দেখা যাক, কী হয়।

—তাই? কই, দেখা আমাকে।

ও আমাকে কম্পিউটারের আছে নিয়ে গেল। মেইল থেকে একটা ফাইল খুলে দেখাল। তাতে দেখলাম বেশ কিছু গাছ, ফুল, পাতার ছবি। কোনোটাই চেনা গাছ, ফুল বা পাতা নয়। আর তাতে অদ্ভুত সব রং। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, খয়েরি। কিন্তু ছবিগুলো এত যত্ন সহকারে সমস্ত ডিটেলসের সঙ্গে আঁকা যে দেখেই বোঝা যায় এটা সামান্য কোনো বই নয়। আর সামান্য কোনো কারণেও লেখা নয়। ছবির মাঝেমধ্যে লেখাও আছে।

ও ফের বলে উঠল,শুনেছি এরকম ১১৩টা সম্পূর্ণ অপরিচিত গাছ, ফুল,পাতার ছবি আছে। তুই বল। আমরা তো কত গাছ দেখেছি। এরকম একটা গাছ কখনো দেখেছি? আসলে একই গাছের থেকে ফুল, ডাল, পাতা নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। তোকে বইয়ের অন্য একটা সেকশন থেকে ছবি দেখাই। —বলে ও অন্য একটা ছবিতে গেল। —এটা অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল সেকশন।

কিছুই বুঝলাম না। কিছু বৃত্ত আঁকা। কিছু মহিলা, পুরুষের ছবি ওই বৃত্তের গায়ে। চাকার মতো দেখতে ছ-টা তারার ছবি।

আমাকে অবাক হয়ে দেখতে দেখে ও বলে উঠল, বহু লোক এটা পড়ে বোঝার চেষ্টা করেছে। পৃথিবীর সেরা ক্রিপ্টোগ্রাফাররাও এর অর্থ বুঝে উঠতে পারেনি। ক্রিপ্টোগ্রাফার মানে বুঝেছিস তো? যারা এরকম সাংকেতিক ভাষা নিয়ে চর্চা, গবেষণা করে। তবে এতে যে খুব মূল্যবান তথ্য লুকিয়ে রাখা আছে তা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। আর তাই সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফ প্রচুর মূল্যে তখনকার দিনে এই বই সংগ্রহ করেছিলেন।

—তা পৃথিবীর সেরা সেরা বিশেষজ্ঞ যেখানে পারল না, তুই পারবি?

ও হেসে বলে উঠল, পারতে তো হবেই। আর এটা জানলেই ওদের ভাষার সন্ধান পাব। এর আসল রহস্য হল এর অক্ষর, কৃত্রিম একটা ভাষা, যাকে তৈরি করা হয়েছিল শুধু এই বইয়ের জন্য। যে লিখেছে আর যার জন্য লেখা, তারা ছাড়া এই কৃত্রিম ভাষা আর কেউ জানত না। —এতটা বলে থামল রাজর্ষি।

কথা বলতে বলতেই দেখলাম, ও কয়েকজন মহিলার ছবি দেখে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। একদৃষ্টে আবার তাকিয়ে আছে কম্পিউটারের দিকে। শুধু বিড়বিড় করে যেন বলে উঠল, তা-ই তো, এটা তো ভেবে দেখিনি! 'ভদ্রমহিলা'কে যেন কী বলা হত ল্যাটিনে—ফেমিনা বা ম্যাট্রোনা। তার মানে ওরা কি—আবার যেন কথাটা হারিয়ে গেল। আমি আর কথা না বলে বেরিয়ে এলাম।

ওদিকে আমাদের গ্রাম যেন খুব তাড়াতাড়ি পালটে যাচ্ছিল। বেশ কিছু নতুন নতুন লোকের যাতায়াত শুরু হয়েছিল গ্রামে। কেন জানি না। তাদের মধ্যে অনেকে আমাদের গ্রামের ভাঙা রাজবাড়ির কাছাকাছি থাকা শুরু করল। দিনেদুপুরে ওখানে লোক দেখা যেতে লাগল। আর তাদের মুখ-চোখ দেখলেই মনে হয় চোর বা ডাকাত।

শুনেছিলাম, বহু আগে আমাদের গ্রামে নাকি এক খুব বড়ো রাজা থাকত। সেটা অবশ্য হাজার বছর আগের কথা।

একদিন রাজর্ষিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।

ও বলল, হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। ওরা কেন আসছে, জানিস? আমার মনে হয় গুপ্তধনের খোঁজে। লোকগুলোর চেহারা দেখে একটাকেও ভালো মনে হয় না।

আসলে কিছুদিন আগে কাগজে একটা লেখা বেরিয়েছিল এখানকার রাজবাড়ি নিয়ে। এখানে নাকি পাল রাজবংশের রামপাল ও তার পরেও রামপালের পরের কয়েক প্রজন্ম থাকত। রাজরাজড়াদের ব্যাপার বুঝতেই পারছিস। গুপ্তধন থাকার হাই চান্স। তারপর থেকেই ওদের আসা শুরু হয়েছে।

—তা ভালোই তো। ওরা গুপ্তধন খুঁজে পেলে আমাদের গ্রামটার চেহারাই পালটে যাবে। কী সুন্দর হত বলতো যদি এখানে ওই গুপ্তধনের টাকায় ভালো হাসপাতাল তৈরি হত। ভালো স্কুল তৈরি হত। আমাদের স্কুলের বিল্ডিংটারও যা অবস্থা, কোনদিন না ভেঙে পড়ে।

—তুই কী ভাবছিস, ওরা ওই গুপ্তধন দিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষদের জন্য কিছু করবে! ওরা আরও বন্দুক কিনবে, আরও বোমা কিনবে, আরও অনেক লোককে মারবে। ওরা আমাদের দেশের ভালো চায় না।

—তা সেটা তুই কী করে জানলি?

—আমি ওদের কথা লুকিয়ে শুনেছি। সবাই এসেছে গুপ্তধনের সন্ধানে। আর ওরা একই দলের লোক। ওদের একটা বড়ো অংশ সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে হয়, এ দেশে বড়ো কোনো টেররিজমের ঘটনা ঘটাতে চায়। তার জন্য দরকার অনেক টাকা। সেটা এই গুপ্তধন পেলে সহজেই ওদের হাতে চলে আসবে।

—ওরেবাবা! তোর কী সাহস! তা তোর কী মনে হয়? ওখানে গুপ্তধন সত্যি আছে?

—নিশ্চয়ই ওদের কাছে খবর আছে। তা না হলে কি আর ওরা এমনি এমনি আসত? আর ওদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। ওদের সঙ্গে কানাইও আছে।

কানাই হল আমাদের গ্রামের কুখ্যাত গুন্ডা। খুনোখুনি, মারামারি আর যত রকমের খারাপ কাজ হয়, তার মূল পান্ডা হল কানাই। বেশির ভাগ দোকান থেকে জোরজুলুম করে নিয়মিত টাকা আদায় করে। কেউ না দিলে দোকান ভেঙে দেয়।

—কী করা যায় বলত?

—আমরা আর কী করতে পারি? তবে ওদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। অত সহজে ওরা গুপ্তধনের সন্ধান পাবে না। এত বছর যা কেউ খুঁজে পায়নি, তা কি অত সহজে যেখানে-সেখানে মাটি খুঁড়লেই পাওয়া যায়?

এর কিছুদিন পরের কথা। চায়ের দোকানে দুটো লোক কথা বলছিল। একটা বেঞ্চির উপরে বসে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে কথা বলছিল। আমি পাশের একটা বেঞ্চিতে বসে একটা সদ্য-পাওয়া গল্পের বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম বিকেলের শেষ আলোর। তখন লাল হয়ে-যাওয়া আকাশটা যেভাবে সামনের বড়ো পুকুরে ডুব দেয়, আমার খুব ভালো লাগে। আর তাই মাঝেমধ্যে মুখ তুলে দেখছিলাম।

—এই ছেলেটা, শোন এদিকে।

হঠাৎ মনে হল, পাশের বেঞ্চির লোক দুটোর মধ্যে একজন আমাকে ডাকছে। ওদিকে তাকাতে আঙুল নেড়ে ডাকল।

কাছে যেতে বলে উঠল, আচ্ছা, তোর সঙ্গে যে ওই ছেলেটা থাকে, তার নাকি ভারী বুদ্ধি। তাকে বলিস তো আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা ওকে একটা কাগজ পড়তে দেব। তার অর্থ বুঝতে পারলে অনেক অনেক টাকা দেব। তোকেও দেব। পারবে বলে মনে হয়? অবশ্য কাজটা কিন্তু সোজা নয়।

আমি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম, পারবে না মানে, অবশ্যই পারবে। যা-ই লেখা থাকুক-না কেন, ও ঠিক বলে দেবে। ওর প্রচণ্ড বুদ্ধি। যেকোনো সংকেতের অর্থ উদ্ধার করে দিতে পারে।

লোক দুটোর মুখ যেন খুশিতে চকচক করে উঠল। মোটা কালো ভোঁতা মুখের লোকটা শুধু গম্ভীরভাবে বলে উঠল, ঠিকই শুনেছি তাহলে। তাহলে আজকেই ওকে চাই।

উত্তেজনার বশে বলে ফেলেছিলাম। আমার মনটা যেন হঠাৎ করে বলে উঠল, ভুল করেছি। ভুল করে ওদের বলে ফেলেছি। সামলাতে বলে উঠলাম, তবে সব সময় যে পারবেই, তেমন কোনো কথা নেই।

লোক দুটো একবার আমার দিকে কড়া চোখে তাকাল। তারপরে কিছু কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। দোকানের চায়ের দাম মিটিয়ে চলে গেল।

যা ভয় পেয়েছিলাম, ঠিক তা-ই।

এরপরে কয়েকদিন রাজর্ষির আর খোঁজ পেলাম না। আমি স্কুলে হেডস্যারকে জানালাম। উনি আমাকে অঙ্কের স্যার তরুণবাবুর সঙ্গে ওই অনাথ আশ্রমে পাঠালেন।

রাজর্ষি ওখানে নেই। শুনলাম, দু-দিন আগে সকালে ওর এক মামা এসে নিয়ে গেছে কয়েকদিনের জন্য। কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। ওর তো কোনো মামা আছে বলে জানতাম না। কিন্তু আমার কথাতে কেউ তেমন কান দিল না। আসলে ওকে নিয়ে চিন্তা করার কারো সময় ছিল না। আমি একা পুরো গ্রাম, আশপাশের এলাকা, যেখানে যেখানে যেতে পারে সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে এলাম। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না।

তিন দিন বাদে ও আবার স্কুলে এলো।

আমি যা ভয় পেয়েছিলাম, ঠিক তাই। ওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওরাই ধরে নিয়ে গিয়েছিল রাজর্ষিকে। কিন্তু কাউকে জানালে ওকে মেরে ফেলবে বলে ভয় দেখিয়েছে। তাই আমার বাইরে এ কথাটা আর কেউ জানল না। শুনলাম ওরা একটা খুব পুরোনো কাগজ নাকি ওকে দেখায়। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও রাজর্ষি সেটা পড়ে উদ্ধার করতে পারেনি। কয়েকদিন ওরা রাজর্ষিকে আটকে রাখে। পরে ছেড়ে দেয়।

ও যতই বলুক-না কেন, আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে ও পারেনি। ওকে আরও জিজ্ঞাসা করতে ও শুধু ওর জামাটা তুলে ধরল। দেখলাম সারা পিঠে বেল্ট দিয়ে মারার দাগ। তাকানো যায় না। বলে উঠল, পারলে কি আর এমনভাবে মার খেতে হত রোজ?

—তোকে ওরা মারত?—আমার মাথার মধ্যে যেন হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল। —কিন্তু কেন? তুই ওটা সলভ না করতে পারলে কী করার আছে?

ও কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল।

—কে? কে মারত তোকে?

—কানাই।

ক্লাস টেনের পরে ও আর পড়াশোনাই করল না। স্কুলে আসা ছেড়ে দিল। অনেকের ধারণা হয়েছিল যে ওর মাথা একদম খারাপ হয়ে গেছে। যে অত ভালো পড়াশোনায়, সে হঠাৎ করে এভাবে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয়।

যার পড়ার কথা ছিল না, সেই আমি কিন্তু ওর উৎসাহেই পড়া ছাড়িনি।

মাধ্যমিকে মোটামুটি ভালোই রেজাল্ট করলাম। আর তা নিয়ে ওর কীআনন্দ।

আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, জানতাম, তুই পারবি।

আমি অভিমানে ওর সঙ্গে মাঝে বেশ কিছুদিন কথা বলিনি। আসলে খুব রাগ হত যে ও হঠাৎ করে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। আমার কোনো কথাই শোনেনি।

তা আমি সে কথা বলতে ও হেসে বলে উঠল, পরীক্ষা দিইনি বটে, তবে পড়াশোনা কিন্তু ছাড়িনি। আমার ওদের নিয়ে পড়াশোনার জন্য অনেক সময় দরকার ছিল। পরীক্ষা দিলে তো আর সে সময় পেতাম না।

—কাদের নিয়ে?

ওর মুখে সেই চিরকালের ছেলেমানুষি হাসি। বলে উঠল, একদিন বুঝবি। তা আমি স্টেশনের কাছে একটা নতুন দোকান খুলেছি। একদিন চলে আয় দেখতে।

—দোকান? কীসের?

—দোকান ঠিক নয়। মাটির উপরে বসছি। ছবি বিক্রির।

—বলিস কীরে? তুই আবার ছবি আঁকতে শিখলি কবে? আর এত কিছু থাকতে ছবি আঁকার শখ আবার কবে থেকে হল?

—আসলে কিছু একটা করে পড়াশোনাটা চালাতে হবে তো! আর টাকা কোথায় পাব! তাই ভাবলাম, স্টেশনের সামনে বসে ছবি আঁকলে লোকে দু-একটা কিনবে। এখন আর অনাথ আশ্রমে থাকা যাবে না। একটা ছোটো ঘর ভাড়া করেছি। কোনোরকমে দু-বেলার খাওয়াটা চলে গেলেই হয়।

—তা তুই তো আরেকটু পড়াশোনা করে নিলেই ভালো চাকরি পেয়ে যেতিস। তার পাশাপাশি না হয় এসব করতিস। তোর মতো এরকম একজন ছাত্র পড়াশোনা ছেড়ে দিলে হয়! আমাদের টিচারদের সবার তোর জন্য মন খারাপ।

ও খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলে উঠল, আসলে সামনে সমুদ্র থাকলে, তখন আর পুকুরে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না। তা সে যাক গে। তুই ছবি দেখতে অবশ্যই আসিস একদিন।

গিয়েছিলাম। তবে বেশ কয়েকদিন বাদে। সেদিন সন্ধে হয়ে এসেছিল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে বসে দেখি, ও একমনে এঁকে চলেছে। দুটো নোংরা হাফপ্যান্ট-পরা বাচ্চা পাশে বসে আঁকা দেখছে। একজন উবু হয়ে বসে আছে। আরেকজন উপুড় হয়ে প্ল্যাটফর্মের উপরে শুয়ে গালের নীচে হাত দিয়ে ছবি আঁকা দেখছে। যেন এমন ছবি আগে কখনো দেখেনি।

রাজু এত মন দিয়ে আঁকছিল যে আমাকেও খেয়াল করেনি। আমিও চুপচাপ পাশে বসে দেখছিলাম। একটা অদ্ভুত ধরনের ছবি। একটা গাছের ডালের উপর দিয়ে সার বেঁধে বেশ কয়েকটা পিঁপড়ে হেঁটে চলেছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছোটো ছোটো পাতা। ছবিটা এত জীবন্ত, এত সুন্দর রঙের ব্যবহার যে দেখে মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না। ও যে কবে এত, ভালো ছবি আঁকতে শিখল, জানি না।

আমাকে দেখে ওর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলে উঠল, যাক, তাহলে রাগ একটু কমেছে। আমি তো ভাবছিলাম, তুই আসবিই না বুঝি।

—না, সত্যিই আসতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। নেহাত এদিকে এসেছিলাম তাই। তা তোর ছবি বিক্রি হয়?

—হ্যাঁ, ওই দিনে দুটো-তিনটে ছবি বিক্রি হয়। তাতেই ভালো চলে যায়। দাম কমই রেখেছি। এখানে তো আর সেরকম বড়োলোক কেউ কেনার নেই। তা ছবিগুলো কীরকম হচ্ছে দেখে বল তো!

ওর পাশে আরও বেশ কয়েকটা ছবি ছিল। দেখলাম। অবাক কাণ্ড। বেশিরভাগ সব পিঁপড়ের ছবি। কোনোটায় ফুলের উপরে বসে আছে। কোনোটায় শুধু একটাই পিঁপড়ে খাবার মুখে করে আনছে। কোনোটাতে আবার দুটো পিঁপড়ে নিজেদের মধ্যে মারপিট করছে। একটাতে বেশ কয়েকটা পিঁপড়ে পর পর হাত ধরাধরি করে দুটো ডালের মাঝের ফাঁকা অংশে একটা ব্রিজ তৈরি করে একটা ডাল থেকে আরেকটা ডালে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সব ক-টা ছবিতেই রঙের অদ্ভুত সুন্দর ব্যবহার। আর তাতে দারুণ সূক্ষ্মডিটেলসও ধরা পড়েছে।

একটা ছবি দেখে বলে উঠলাম, পিঁপড়েটা যেন হাসছে বলে মনে হচ্ছে। কী করে এরকম ছবি আঁকলি তুই?

ও দেখলাম, খুশি হয়ে নড়েচড়ে বসে বলে উঠল, যাক, আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে তোর একটু দৃষ্টিশক্তি হয়েছে দেখছি। আসলে যে কারো ছবি আঁকতে হলে তাদের কথা বুঝতে হবে আগে। তা না হলে কি আর আঁকা যায়? তারা মনে মনে কী ভাবছে, সেটা কি বোঝানো যায়?

—তা তুই কি ওদের কথা বুঝিস?

—হ্যাঁ, বুঝি না মানে! ওটাই তো শিখতে এত সময় লেগে গেল। ওই যে সামনে দেখ, এখনও একটা বসে আছে। আমার সঙ্গে খানিক আগেও কথা বলছিল।

আমি সত্যি দেখলাম, একটা কাঠপিঁপড়ে ও যে ছবিটা আঁকছে, তার মাথার কাছে বসে আছে। আর শুঁড় দোলাচ্ছে।

—ও এখন তোকে দেখছে খেয়াল করে। আমার সঙ্গে কথা বলছিস তো। আমি ওদেরকে কিছু কিছু জিনিস শিখিয়েছি। কীভাবে আমরা কথা বলি। কীভাবে আমরা মনের নানান ভাব প্রকাশ করি। হাসলে কি হয়, কাঁদলে কি হয়, হাঁচলে কি হয়—এরকম। এসব শিখতে ওদের সময় লাগবে। তবে একটা জিনিস দেখেছি, একজন শিখে ফেললে ওদের বাকিরাও সেটা খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারে। এদের মধ্যে দলবদ্ধভাবে শেখার প্রবণতা খুব বেশি। —ও বলে উঠল।

আমার কেমন যেন মনে হল ও আর স্বাভাবিক নেই। ওর কি সত্যি মাথা একদম খারাপ হয়ে গেছে! তা না হলে এরকম সব কথা বলে!

আরও আধ ঘণ্টা বাদে ওর ওই আঁকা শেষ হল। বাচ্চা দুটো এতক্ষণ কোনো কথা না বলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছবি দেখছিল। আমরা রাজুর বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম। স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা দূর। পাশে একটা ইটের ভাঁটা আছে। ও আর ওখানকার দুজন শ্রমিক একসঙ্গে থাকে একটা ছোটো বাড়িতে। কী করে ওর মতো একজন এদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পারে, সেটাই অবাক লাগল।

তা যা-ই হোক, পরের দিন আবার ওর ছবি আঁকা দেখতে গেলাম। আবার তার পরের দিন। এভাবে প্রায় রোজই যেতাম। ভাবতাম, এমনিতেও আর পড়ে কি হবে! আমার যা অবস্থা!

বিকেলের দিকে যেতাম আর সন্ধে অব্দি থাকতাম ওর সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারছিলাম, ও যা আঁকছে তা নেহাত ছবি নয়। একটা ভাষা। একটা সাংকেতিক ভাষা। সে ভাষা কে ঠিক বোঝে, তা আমার জানা নেই। তবে কেউ নিশ্চয়ই বোঝে। আর তাই ছবির মধ্যে খুব ছোটোখাটো ডিটেলসও এত যত্ন নিয়ে ও ফুটিয়ে তোলে।

ও মাটির উপরে বাবু হয়ে বসে যখন তুলির টানে রং করত, আমি এটুকু বুঝতাম যে ওর আঁকা ছবি পৃথিবীতে আঁকা বাকি সব ছবির থেকে একদম আলাদা। এখানে রং আর রেখায় ও যা আঁকে, তা হল অজানা এক ভাষা, অজানা এক হরফ। ওর ছবি দেখতে রোজই কোনো না কোনো দেড়-দু-বছরের খুব ছোটো বাচ্চা এসে বসত। আর আবিষ্ট হয়ে ওকে কোনোরকম বিরক্ত না করে বসে বসে ছবি আঁকা দেখত। তার কারণ কি এই যে ওরা তখনও অন্য কোনো ভাষা শেখেনি? আর তাই প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে-থাকা এই আদি অকৃত্রিম ভাষাকে তারা বুঝতে পারে! কে জানে?

আর দেখত পিঁপড়ের দল। অবাক হয়ে দেখতাম যে ও যেখানে আঁকে, সেখানে সেই জায়গায় ওকে ঘিরে পিঁপড়ে আর পোকার সংখ্যা অনেক বেশি। তারা শুধু যে ওর ছবিকে ঘিরে বসে থাকে তা-ই নয়, ওর হাতে, পায়ে, গায়ে ঘুরে বেড়ায়। আর তাতেও রাজু কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে ঘাড় নিচু করে এঁকে যায়।

ছবি যে একদম বিক্রি হত না, তা নয়। কিন্তু খেয়াল করতাম, কিছু ছবি ও বিক্রি করত না। যেগুলো বিক্রি করত, সেগুলো নিছক নানান রকমের জীবজন্তু, গাছপালার ছবি। সেগুলো ওর আঁকতে বেশি সময় লাগত না। কিন্তু তার বাইরে সারাদিন ধরে যেসব ছবি এত যত্ন নিয়ে আঁকত, সেগুলো ও আলাদা করে সরিয়ে রাখত। সেগুলো বিক্রির জন্য ছিল না। সেখানকার রং যেন চোখে দেখা রং নয়, জীবনের নানান ধরনের অনুভূতির রং। আর তাই সে রং অচেনা।

একদিন ও দেখলাম, একটা ছবি আঁকছে, যেখানে একদল লাল পিঁপড়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাঝে যে বৃত্ত, সেটার দু-দিকে দু-রকম রং। পিঁপড়েগুলো যেন কীরকম অদ্ভুতভাবে অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রত্যেকের মুখের প্রকাশ ভিন্ন। ছবিতে দূর থেকে একটা ছোটো জলের ধারা গড়িয়ে আসছে। ছবিটা এত সুন্দর, যে তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না।

জিজ্ঞেস করলাম, এর অর্থ কী?

—এটা হল বিভেদের রং। ওদের মধ্যে এখন আলোচনা হচ্ছে কে কোন দলের, কে কোন রঙের। জলের ধারায় অবশ্য সব রং মুছে যাবে। সব এক হয়ে যাবে।

ও আমাকে আঁকতে আঁকতে বলে উঠল, জানিস, বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসো কী বলেছিলেন? বলেছিলেন, 'যা তুমি ভাবতে পারবে, তা-ই সত্যি।' কথাটার অর্থ আগে বুঝিনি। এখন বুঝতে পারি।

বলে ও একটা অন্য ছবি বার করে দিল—এটা দেখেছিস?

ছবিটা আগে দেখিনি। একটা লোক উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। খালি গায়ে। আর লোকটার পিঠের উপর দিয়ে সারি সারি পিঁপড়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে কয়েকটা আবার আকাশের দিকে শুঁড় আর দু-হাত তুলে মুখ উপরের দিকে করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন যুদ্ধজয়ের পরে আনন্দে মেতেছে।

—কীরকম লাগল ছবিটা?

—অসাধারণ। কিন্তু লোকটাকে কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছে।

ও হেসে বলে উঠল, সবটাই কি আর আমি বলে দেব?

ও ফের বলে উঠল, জানিস, ১৩০০০-এর বেশি পিঁপড়ের প্রজাতি আছে। ওরা আমাদের অনেক আগে থেকে এ পৃথিবীতে আছে। ডাইনোসরদের সময় থেকে। উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু আর সামান্য কয়েকটা দ্বীপ বাদ দিলে ওরা পৃথিবীর বাকি সব প্রান্তে আছে। আমাদের থেকে বহু হাজারগুণ বেশি সংখ্যায় আছে। আর মানুষ যেখানে পৌঁছেছে, সঙ্গে সঙ্গে ওরাও সেখানে পৌঁছে গেছে। এই ধর আর্জেন্টাইন পিঁপড়ে। ওরা আগে থাকত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে। এখন সেখান থেকে ওরা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে—জাপানে, অস্ট্রেলিয়াতেও পৌঁছে গেছে। আর শুধু পৌঁছেছে যে তা-ই না! লক্ষ লক্ষ বসতিও তৈরি করে ফেলেছে। আর সেই এক-একটা বাসায় হাজারে হাজারে এরা থাকে।

আমার অবাক-হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ও বলে উঠল, তুই কখনো পাঁচ কোটি মানুষকে একসঙ্গে একই উদ্দেশে চালিত করতে পারবি? পাঁচ হাজার মানুষকেও এক পথে চালিত করতে গিয়ে বড়ো বড়ো নেতা হিমশিম খায়। এরা কিন্তু তা সহজেই পারে। চাইলে পাঁচ কোটি পিঁপড়ে যত শক্ত কাজই হোক-না কেন, একসঙ্গে করে ফেলতে পারে।

—কিন্তু ওরা তো এইটুকু এইটুকু?— আমি হেসে বলে উঠলাম।

—তাহলেই ভাব ওদের সুবিধে কত বেশি! যেখানে চায়, চলে যেতে পারে। লুকিয়ে থাকতে পারে। সরু সরু ফাটলের মধ্যে দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতে পারে। এই যে স্টেশনে বসে আছি, এখানেই একত্রিশ ধরনের পিঁপড়ে আছে। আর সংখ্যায় আছে প্রায় পঁচিশ লাখের মতো। ভেবে দেখ, কী হবে যদি এরা আমাদেরকে একসঙ্গে অ্যাটাক করে!

একটু থেমে বলে উঠল, সব থেকে বড়ো কথা কী জানিস। রজার বেকন যেটা লক্ষ করেছিলেন, সেটা ঠিক। আগে পিঁপড়ের এক প্রজাতির সঙ্গে আরেক প্রজাতির সম্পর্ক ভালো ছিল না। আর তাই ওরা নিজেদের মধ্যে সমানে মারপিট করত। কিন্তু তারপরে ওদের মধ্যে আসে উন্নত ভাষা। যে ভাষা খানিকটা তৈরি হয় রজার বেকনের হাতেই। ভয়নিচের ভাষা। আমরা সে ভাষা শিখে নিতে পারিনি। কিন্তু ওরা খুব দ্রুত শিখে নেয়। আর তারপর থেকেই ওদের আসল বিপ্লব শুরু হয়। আজকে আফ্রিকায় কী হচ্ছে, সে খবর ভারতে থাকা পিঁপড়েদের কাছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যায়। ওদের দলে কিন্তু মৌমাছি, ভিমরুল এরাও পড়ে। এদেরও একই ভাষা।

—তা তোকে এত কিছু বলছে কে?

—আমিও তো ওদের ভাষা জানি। আর তাই ওদের সঙ্গে আমার সারাক্ষণ কথা চলে।

কী বলব, বুঝলাম না। অবাক হয়ে দেখলাম—ছবির লোকটার পিঠের উপরে দুটো পিঁপড়ে দাঁড়িয়ে ঠিক একইভাবে শুঁড় আর হাত নাড়ছে। যেন আমাদেরই দেখিয়ে।

—আচ্ছা, লোকটা কে বল তো? ঘাড় ঘুরিয়ে শুয়ে থাকলেও পাশ থেকে যেন খুব চেনা লাগছে। লম্বা জুলপি, ছোটো করে ছাঁটা চুল, ঝোলা গোঁফ। চোখের নীচটা বসা।

—তোর তা দিয়ে কী হবে? ছবিতে একজন কাউকে আঁকলেই হল।—বলে ও হেসে উঠল।

আমি শুধু দেখলাম, শুধু দুটো নয়, আরও লাইন করে বেশ কয়েকটা পিঁপড়ে ওই ছবিটার দিকেই এগিয়ে আসছে।

ও আমাকে বলল, চল, আমি আজকে তোকে খাওয়াব। আজকে ভালোই রোজগার হয়েছে। —বলে আমাকে পাশের একটা দোকানে নিয়ে গেল। আমরা সেখানে মুড়ি আর চপ খেলাম।

রাত হয়ে এসেছিল। তাই তারপর আজ আর ওর সঙ্গে ওর বাড়ি না গিয়ে আমার বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

পরের দিন স্কুল ছিল না। বাবার দোকানে বসে ছিলাম। হঠাৎ বেলা এগারোটা নাগাদ রাস্তায় হইচই শুনে বাইরে এসে শুনি, কানাই মারা গেছে।

কৌতূহলবশত কানাহ-এর বাড়ির কাছে গিয়ে দেখি সেখানে বেজায় ভিড়। ওর দলের প্রচুর লোক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর তারা সবাই খুব উত্তেজিত। কানাইয়ের মতো খারাপ লোকেরই শাগরেদের সংখ্যা বেশি হয়। ভালো লোকের এরকম শাগরেদের দরকার হয় না। কানাই কী করে মারা গেছে,সেটাই রহস্য। ভোরবেলা উঠতে দেরি হচ্ছে দেখে ডাকতে গিয়ে ওর কাজের লোক দেখে, মাটির উপরে পড়ে আছে। সাড়া নেই। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকা হয়। কিন্তু তখনই প্রাণ ছিল না। শুধু নাকি সারা গায়ে লাল লাল দাগ। যেন পোকার কামড়।

আমি ওখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াইনি। কালকের ছবির ওই লোকটাকে কেন চেনা লেগেছিল, বুঝেছিলাম। ওটা ছিল কানাইয়েরই ছবি। নেহাত কানাইকে বেশি দেখিনি, তাই তখন খেয়াল হয়নি।

ভ্যানে করে স্টেশনে যখন পৌঁছালাম, তখন দেড়টা বাজে।

দেখি, রাজু ওই আগুন-লাগা রোদেও প্ল্যাটফর্মে বসে একমনে ছবি এঁকে যাচ্ছে। কয়েকটা লোক ওকে ঘিরে ওর আঁকা ছবি দেখছে। তাদের মধ্যে তিনটে ছোটো বাচ্চাও আছে। সবে কোনো ট্রেন এসেছে মনে হয়।

আমি খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলাম।

তারপর একা হলে জিজ্ঞেস করলাম, কালকের ওই ছবিটা কোথায়?

ও মুচকি হেসে বলে উঠল, নেই। তা তুই কানাইয়ের ওখান থেকে দেখে এলি নাকি?

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ও বলে উঠল, কীরকম দেখলি? আমি নিজেও জানি না কীভাবে ওরা আক্রমণ করে। শুধু জানি, ওরা দায়িত্ব নিলে ব্যর্থ হয় না। যাক, একটা খারাপ লোকের সংখ্যা কমল। আমার ওর উপর কোনো ব্যক্তিগত রাগ ছিল না। কিন্তু ওরা আমাদের দেশের অনেক বড়ো ক্ষতি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আর সময় ছিল না।

একটু থেমে ও জামার পকেট থেকে একটা সরু কাগজ বার করে বলে উঠল, এই কাগজটা রাখ। তোকে তো শিখিয়েছিলাম, কীভাবে আমার লেখা সংকেত বুঝতে হয়। ঠিক একইভাবে এটা পড়বি। বুঝতে পারবি, কোথায় রাখা আছে পাল বংশের গুপ্তধন। আগে অবশ্য আরও অনেক শক্ত জায়গায় ওটা লুকোনো ছিল। আমি নিজে ওটা উদ্ধার করে সরিয়ে রাখি। কীভাবে বুঝেছিলাম, জানিস?

—কীভাবে? ওই আমাকে দেওয়া কাগজটার মতো?

—না না, এখানে সংকেতের ভাষা অন্যরকম ছিল। বেকেট যেভাবে সাংকেতিক হাইরোগ্লিফস ব্যবহার করতেন—অনেকটা সেরকম স্টাইলেই। বেকেট কে জানিস?

—না, মিশরের কেউ?

—হাঁy, মিশরের। বলতে পারিস পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ক্রিপ্টোগ্রাফার হলেন বেকেট। উনি মিশরের বিশাল ধনী দ্বিতীয় খুমহোতেপের রাজকোষ রক্ষার ও সমাধি তৈরির দায়িত্বে ছিলেন। উনিই প্রথম প্রচলিত হাইরোগ্লিফসের বদলে সাংকেতিক হাইরোগ্লিফস ব্যবহার করেন। যাতে সবাই না বোঝে তাই দু-ধরনের টেকনিক ব্যবহার করেন। এক, সাংকেতিক ছবির ব্যবহার। যেমন ধর নৌকোর ছবি—যাকে মিশরীয় ভাষায় বলা হত 'খেনতে'। উনি ছবিতে যখন নৌকো ব্যবহার করেন, তার অর্থ কিন্তু অন্য। কে অধিকর্তা বা কে মূল বিষয়ের দায়িত্বে আছে তা বোঝাতে উনি নৌকোর ছবি ব্যবহার করেন। এ ছাড়া আরেকটা টেকনিক ব্যবহার করেন, যাকে বলে অ্যাক্রোফনি। কোনো পশুর ছবি ব্যবহার করে উনি আসলে সেই পশুর নামের প্রথম অক্ষর নির্দেশ করেন। ধরা যাক ষাঁড়—যার মিশরীয় নাম ছিল 'অ্যালেফ'। উনি 'অ্যা' বোঝাতে তা ব্যবহার করেন। বুঝলি? অজগরের ছবি এঁকে 'অ' বোঝানোর মতো।

—তা সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু তুই কী করে গুপ্তধন বার করলি?

—রাজা রামপালও একইভাবে সাংকেতিক ছবি এঁকে আর সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করে মোহর ভরতি ঘড়া মন্দিরের নীচে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি ওই দুষ্টু লোকগুলোকে কিছুই বলিনি। ওই কাগজে কী লেখা ছিল, কোথায় গুপ্তধন ছিল তা উদ্ধার করতে আমার কোনোই কষ্ট হয়নি। শুধু ওদেরকে বলে দিইনি। কারণ ওরা তো আর সেটা দিয়ে ভালো কোনো কাজ করত না। এখন যেখানে সরিয়ে রেখেছি, সেখান থেকে তোর পেতে কোনো অসুবিধে হবে না। বলতে পারিস, আমার সঙ্গে এতদিন থেকে কীরকম কী শিখলি তা পরীক্ষা করার জন্যই সরিয়ে রেখেছি। একজনের কাছে তোর কথা বলে একটা চাবি রেখে এসেছি। —বলে ও ফের ছড়ার সুরে বলে উঠল—

কারুর যদি দাঁতটি নড়ে,

চারটি টাকা মাশুল ধরে,

কারুর যদি গোঁফ গজায়,

একশো আনা ট্যাক্স চায়—

খুঁচিয়ে পিঠে গুঁজিয়ে ঘাড়,

সেলাম ঠোকায় একুশবার। ।

—কার কথা বলছি, বুঝলি তো?

আমি 'সুকুমার রায়' বলতে গিয়ে মাঝপথে বুঝতে পেরে বলে উঠলাম, সৌজন্য স্যার। ঠিক তো?

ও হেসে বলে উঠল, দারুণ! এই তো শিখে গেছিস। দেখ, আমি আর তুই ছাড়া এটা খুব কম লোকই বলতে পারত। তোকে যে কাগজটা দিয়েছিলাম, ওটা থেকে বাকিটা উদ্ধার করতে হবে। ওর কাছ থেকে চাবি নিয়ে সে চাবি দিয়ে কী খুলবি, কোথায় সেটা লুকোনো আছে, সেটাই লেখা আছে এই কাগজে। —বলে ও হাসল।

—কিন্তু এ তো তোর। আমি কী করব ওসব দিয়ে?

—এই তো! আমি টাকা দিয়ে কী করব? আমি তো ওদের ভাষা জানি। আরও নতুন নতুন অনেক ভাষা আমায় শিখতে হবে। আমি জানি, তুই ও টাকার সদব্যবহার করবি। তুইই তো বলতিস যে এখানে ভালো স্কুল হলে, ভালো হাসপাতাল হলে কত ভালো হত, তা-ই না? ভালো হাসপাতাল হলে, ভালো চিকিৎসাব্যবস্থা হলে তোরও তো পা দুটো স্বাভাবিক হত!

ও একটু থেমে থাকল, তারপরে বলে উঠল, তোকে আরেকটা ছবি দেখাই। কয়েকদিন আগেই আঁকা।

বলে অনেকগুলো ছবির তলা থেকে ও ছবিটা বার করে দিল—একটা ছেলে ফুটবল পায়ে ছুটে যাচ্ছে। মুখটা ঠিক আমার মতো। আমি রোজ যে লাল হাফহাতা শার্টটা পরি, ঠিক সেটাই পরে আছে। শুধু পা-টা তার একদম স্বাভাবিক। আমার মতো পোলিও আক্রান্ত সরু সরু দুর্বল পা নয়।

আমার চোখ ভিজে হয়ে উঠেছিল। ছবিটার রং-তুলির দাগ সব আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছিল।

ও বলে উঠল, মনে আছে, কতদিন আমরা দুজন বটতলার মাঠে বসে একসঙ্গে খেলা দেখতাম, তোর চোখের সেই স্বপ্ন আমি দেখিনি বুঝি? বার বার তুই গোল হলে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠতিস। বল পাশ দিয়ে গেলে উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে ওঠার চেষ্টা করতিস। আর তারপরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার বসে পড়তিস। আমি তোর সেসব না-বলা কথার ভাষা ঠিক বুঝতাম। এবারে তুই যেদিন খেলবি, আমিও সেদিন নামব। প্রথমবার ফুটবল। কী আর এমন শক্ত হবে বল! আর ওদেরকে বলে দেব। আমাদের হয়ে খেলবে। বিপক্ষ দলের সব প্লেয়ারের পা কামড়ে দেবে। বেশ হবে তা-ই না।—ও হেসে উঠল।

আরেকটা ট্রেন এর মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছিল। অনেক লোক ওঠা নামা করছিল। কিন্তু তাদের কারো কথা শুনতে পারছিলাম না।

ফের ওর গলা শুনলাম—যা তুই ভাবতে পারবি, মনে রাখবি, কাল সেটাই সত্যি হতে চলেছে। ঠিক এই ছবির মতো। আমি তো আজও আমার মায়ের রাখা রুমালের নকশা উদ্ধার করতে পারিনি। কিন্তু আজও আশা ছাড়িনি। হয়তো কোনোদিন পারব। আর তখনই ঠিক খুঁজে নিতে পারব আমার মা-কে।

আমি ওর সামনে কাঁদতে চাইছিলাম না। তাই চোখের জল লুকোতে উঠে দাঁড়ালাম। হাতে ভর দিয়ে পা টেনে শরীরটাকে উপরে তুলে আনলাম। আর তখনই আমাকে যেন লক্ষ-কোটির কোনো এক অজানা বাহিনী সমস্বরে বলে উঠল আমার মনের ভাষায়—ছোটো তন্ময়, ছোটো। তুমি পারবে। আমরা তোমার সঙ্গে আছি।

প্রথমবার, হ্যাঁ প্রথমবার মনে হল, আমিও ছুটতে পারি।

‘Everything you can imagine is real.’ – Pablo Picasso

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%