অনিলিখা ও বোহাস ক্যাসলের প্রেতাত্মা

অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

তন্ময় ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছিল। খানিক বাদে ফিরে এসে সোফায় বসে বিড়বিড় করে বলে উঠল, সতেরোটা বড়ো বড়ো কালো পিঁপড়ে। পর পর লাইন দিয়ে জানলা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে এল।

আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম, তো? তুই পিঁপড়ের সংখ্যাও আজকাল গুনতে শুরু করেছিস।

অন্যরা সবাই হেসে উঠল। আসলে হাসার কারণও ছিল। গত কয়েকদিন ধরে তন্ময়কে এ এক অদ্ভুত নেশায় পেয়েছে। সংখ্যার নেশায়। কথায় কথায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে আর কিছুক্ষণ বাদে বাদে একটা সংখ্যা আওড়াচ্ছে।

কিছুক্ষণ আগেই মাথার উপরে ঝাড়বাতির আলো দেখে বলে উঠেছে, ন,-ন'টা আলো। কোনো মানে হয় এতগুলো আলো একসঙ্গে জ্বালানোর!

আগের শনিবারে এখানে এসে বুককেসের সামনে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। আমরা প্রথমে খেয়াল করিনি। তারপরে হঠাৎ করে বলে উঠেছে,— বাহ, বুককেসের বিভিন্ন তাকে বইয়ের সংখ্যাগুলো তো বেশ ইন্টারেস্টিং। একদম উপরের তাকে ১৩, তার পরের তাকে ১৭ টা, একদম নীচের তাকে ২৩টা।

আমরা অবাক হয়ে বলে উঠেছিলাম, তাতে কী হয়েছে?

—সে কী! বুঝলি না। সব ক-টাই প্রাইম নাম্বার।

তা যা-ই হোক, এসবের জন্যই আজ আমাদের আলোচনা তন্ময়কে কেন্দ্র করে। আরও স্পেসিফিক্যালি বলতে গেলে তন্ময়ের এই সংখ্যায় অকারণ আগ্রহ নিয়ে।

তন্ময় নানানভাবে সংখ্যার তাৎপর্য নিয়ে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে আর আমরা ওকে একা পেয়ে অভিমন্যুর মতো একের পর এক যুক্তির জালে ঘিরে ধরেছি, এর মধ্যে বাইরে সেই চেনা জুতোর আওয়াজ।

আর তার পরক্ষণেই অনিলিখাদি ঘরে এসে ঢুকল। পরনে নীল সালোয়ার- কামিজ। হাতে ফোল্ডিং ছাতা।

জুতো খুলতে খুলতে বলে উঠল, সংখ্যার প্রতি এই আগ্রহটা কিন্তু হওয়াই স্বাভাবিক। অনেক রহস্যই শুধু এই সংখ্যার উপরে দাঁড়িয়ে থাকে।

এ যে মেঘ না চাইতেই জল। অনিলিখাদি যে আজ পুরো গল্প বলার মেজাজে আছে, তা বুঝতে আমাদের একটুও সময় লাগল না। এ ছাড়া আজকের দিনটা গল্পের জন্যও একদম পারফেক্ট। খানিক আগে বেশ একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। মার্চের শুরু। কয়েকদিন বেশ গরম পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির জন্যই এখন আবার যেন শীতের খানিকটা আমেজ ফিরে এসেছে।

কিছুক্ষণ বাদে গোপালদার দোকান থেকে অর্ডার দিয়ে আনানো ঠিক আঠেরোটা মাছের কচুরি সামনের টেবিলে রাখামাত্র অনিলিখাদি গল্প শুরু করল।

এরিক কার্লসনের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ স্টকহোমের এক ক্লাসিক্যাল কনসার্টে। কনসার্টের পরে একটা ডিনার ছিল। সেখানে আমার বন্ধু বিজ্ঞানী ইভাই আমাকে আলাপ করিয়ে দিল এরিকের সঙ্গে। শুনলাম এরিক সুইডেনের রাজপরিবারের সদস্য। তবে এরিক স্টকহোমের রাজপ্রাসাদে থাকে না। থাকে স্টকহোম থেকে প্রায় একশো মাইল দূরের একটা আইল্যান্ডে। এরিকের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। মাথাভরা টাক। চওড়া গোঁফ। উজ্জ্বল চোখের উপরে সাবেকি ডিজাইনের সোনার চশমা। বেশ ভারী গমগমে গলা।

আমি বলে উঠলাম, সুইডেনেও রাজপরিবার আছে?

—হ্যাঁ, রাজপরিবার কি শুধু ইংল্যান্ডেই আছে! ইয়োরোপের প্রায় সব দেশেই আছে। স্টকহোমের কেন্দ্রেই সুইডেনের রাজপরিবারের বিশাল রাজপ্রাসাদ আছে। তোদের সুইডেনের রাজপরিবার নিয়ে কিছু দরকারি কথা একটু বলে নিই। সুইডেনের লিখিত ইতিহাস খুব পুরোনো নয়। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সুইডেন দেশ হিসেবে মোটামুটি একটা পরিচয় পেতে থাকে। সে সময় থেকেই সুইডেনের রাজপরিবারের লিখিত ইতিহাস শুরু বলা যায়। তবে সে সময় সুইডেন বলতে বোঝানো হত বর্তমান সুইডেনের দক্ষিণের অংশ আর এখনকার ফিনল্যান্ডের কিছু অংশ।

ইয়োরোপের অন্য দেশের মতো মধ্যযুগে সুইডেনেও যুদ্ধ— রক্তারক্তি কিছু কম হয়নি। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ থেকে সুইডেনের সঙ্গে ডেনমার্ক আর নরওয়ের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। ১৫২০ সালে ডেনমার্কের এক রাজা দ্বিতীয় ক্রিস্টান সুইডেনের বনেদি পরিবারের সব সদস্যকে হত্যার আদেশ করেন। স্টকহোমের কেন্দ্রে এখনও সে ঘটনার স্মারক হিসেবে একটা মূর্তি আছে। সুইডেনের বনেদি পরিবারের একজন সদস্য সেদিন ওখানে ছিলেন না বলে বেঁচে যান। পরে সেই সদস্য গুস্তাভ ভাসা ১৫২৩ সালে সুইডেনের রাজা হন। স্বাধীন সুইডেন প্রতিষ্ঠা করেন। আজ যাঁর কথা বলব, সেই এরিক ওই বংশেরই সন্তান।

একটু আলাপ হতেই বুঝলাম যে এরিক খুব কম কথা বলার লোক। সুইডিশরা এমনিতেই কম কথা বলে। তবে ইনি আরও কম কথা বলেন। হাবেভাবে একটা রাজকীয় আভিজাত্য আছে। প্লেট থেকে প্রত্যেকটা খাবার নেওয়ার মধ্যেও রাজকীয় কিছু অলিখিত নিয়ম ও ভদ্রতা—সৌজন্য মেনে সবকিছু করছিলেন।

ইভাই বেশি কথা বলছিল। কথাপ্রসঙ্গে আমার সম্বন্ধেও অনেক কথা বলতে শুরু করে দিল। আমার বিভিন্ন রহস্য-অ্যাডভেঞ্চারের কথা। আমার বিষয়, আমার রিসার্চের কথা। ইভা আমাকে খুব পছন্দ করে। তাই কিছুটা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছিল আর কী!

এরিক কথা না বললেও খুব মন দিয়ে শুনছিলেন। মাঝেমধ্যে আমার অতীতের কিছু ঘটনা—যেমন সংকেত রহস্যের সময়ে পেরুর অভিজ্ঞতা নিয়েও দুটো প্রশ্ন করলেন। বেশ বুঝতে পারছিলাম, এ ধরনের ঘটনায় ওঁর যথেষ্ট আগ্রহ আছে। একই সঙ্গে যথেষ্ট পড়াশোনা ও ঘোরার অভিজ্ঞতাও আছে। লিমার আর্ট মিউজিয়ামের সামনের রাস্তার নামও দেখলাম ওঁর মনে আছে।

আমি নিজে অবশ্য আমার গল্প তেমন কিছু বলিনি। বলার অবস্থায় ছিলাম না বলাই ভালো। একটা আধচেরা বিশাল আধসেদ্ধ চিংড়ি কাঁটাচামচ দিয়ে খেতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলাম। এরিক রাজকীয় কায়দায় কীভাবে সেটাকে খান, সেটা মাঝে মধ্যে আড়চোখে দেখছিলাম। কিন্তু উনি এই জটিল কাজটা এত সহজে করে ফেললেন, বুঝলাম দীর্ঘ অনুশীলন ছাড়া আমার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। শেষে হাতই ব্যবহার করতে হল।

ওঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য মিডিয়ার বেশ কয়েকজন লোক অপেক্ষা করছিল। ডিনারের পরে আর তেমন কথা হল না।

ইভাই জানাল যে এরিক নাকি বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এ ছাড়া এখানকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতেও অনেক অর্থ অনুদান করেন।

ইভাকে জিজ্ঞেস করলাম, এরিকের ক্যাসল দেখতে যাওয়ার কোনো উপায় আছে কিনা।

ইভা বলে উঠল, আমিও কখনো যাইনি। স্টকহোম থেকে বেশ খানিকটা দূরে। প্রাইভেট আইল্যান্ড। খুব কম লোকই সে ক্যাসল দেখার সুযোগ পেয়েছে। সুইডেনের অন্য বেশ কিছু ক্যাসল আছে, যা দেখা যায়। বিশেষ দিন—বিশেষ সময়ে ঢোকাও যায়। স্টকহোমের প্রাসাদটাও দেখে আসতে পারো। ওটা খুব বড়ো। দারুণ। কিন্তু এরিকের ক্যাসলে সাধারণের যাওয়ার অনুমতি নেই।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, সুইডেনে অজস্র ছোটো ছোটো আইল্যান্ড আছে। বেশির ভাগ এই আইল্যান্ডগুলো ছোটো ছোটো ব্রিজের মাধ্যমে যুক্ত। এমনকী স্টকহোম বলতে আমরা যা বুঝি তাও কিন্তু এরকম বারোটা দ্বীপের সমষ্টি। তাই এরিক যে ক্যাসলে আছে, তা যে একটা বিচ্ছিন্ন আইল্যান্ডে, তাতে খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সুইডেনের লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথা খুব কম বললেও, টেলি যোগাযোগব্যবস্থায় সুইডেনের একটা বড়ো অবদান আছে। এরিকসনের মতো কোম্পানির তো এখানেই শুরু। এরিকসনের একটা বড়ো স্ট্যাচু আছে স্টকহোমের মেন স্টেশনের সামনেই। আমার কাজ ওখানে এরকম একটা কোম্পানি 'টেলিয়া'র সঙ্গে ছিল। মাত্র এক মাসের জন্য আসা। আবার যে এরিকের সঙ্গে দেখা হবে, এরকম কোনো আশা ছিল না। কিন্তু সেটাই হল। শুধু হল না, ঘটনাটার কথা মনে পড়লে এখনও আমার রোম খাড়া হয়ে যায়।

খেয়াল করিনি যে এর মধ্যে বাসন্তীদি কখন আমাদের সবার জন্য চা দিয়ে গেছে। অনিলিখা একটু থেমে চায়ের কাপে একবার চুমুক দিয়ে আবার শুরু করল।

তা যা বলছিলাম। এর কিছুদিন পরের কথা। শুক্রবার। অফিসে একটা মিটিং-এ আছি। হঠাৎ ফোন। প্রথমবার ধরলাম না। দ্বিতীয়বার একই নাম্বার থেকে আবার ফোন পাওয়ার পরে মিটিং থেকে বেরিয়ে ফোন ধরলাম। উলটোদিকে বেশ ভারী গলা। এরিকের। সেদিন আমার ফোন নাম্বার নিয়েছিলেন, কিন্তু এরকম ফোন কোনোদিন করবেন, তা আশা করিনি।

একটু দ্বিধা করে যেন এরিক বলে উঠলেন, তুমি কি আমার বাড়ি একটু আসতে পারবে? একটু জরুরি কথা ছিল। খুব জরুরি।

বলা বাহুল্য, যাওয়ার এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? আনন্দটা সামলে কোনোদিন যেতে পারি, জিজ্ঞেস করলাম।

—কাল, অর্থাৎ এই উইকএন্ডে যদি আমার বাড়িতে আসতে পারে, খুব ভালো হয়। তোমাকে আমি অবশ্য জোর করব না।

বুঝতে অসুবিধে হল না, উনি কিছু একটা বলতে দ্বিধা করছেন।

বলে উঠলাম, আমি একটু বাদে আপনাকে কনফার্ম করছি। কিন্তু কী ব্যাপার তা একটু বলতে পারবেন?

—সামনাসামনি বলব। আসবে কি না জানিয়ে দিলে, আমার সেক্রেটারি আপনাকে বাড়ির অ্যাড্রেস, কোথায় আসতে হবে, আমরা কোথা থেকে তোমাকে পিক আপ করব, সব জানিয়ে দেবে। দরকার হলে আমরা স্টকহোম থেকেও নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যে জানাবে।

জানাব বলে ফোন ছেড়ে দেওয়ার পরে ইভাকে ফোন করলাম।

ইভা শুনেই বলে উঠল, এ সুযোগ কেউ ছাড়ে! খুব কম লোকই ওঁর বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পায়। সুইডেনের সব থেকে পুরোনো ক্যাসলের মধ্যে এটা একটা। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ওটাই ছিল আসল রাজপ্রাসাদ। স্টকহোমের প্রাসাদ তো অনেক পরে হয়।

উইকএন্ডে বেশ কিছু কাজের প্ল্যান থাকলেও সেসব ক্যানসেল করে ফোন করে জানিয়ে দিলাম যে আমি যাচ্ছি। এর কিছুক্ষণ বাদেই ওঁর সেক্রেটারি এক মহিলার ফোন পেলাম। কীভাবে যাব, কোথায় আমাকে পিকআপ করা হবে, যাবতীয় তথ্য খুব সুন্দরভাবে মহিলা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন।

পরদিন ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়লাম। স্টকহোম থেকে দেড় ঘণ্টার ট্টেন। সুইডেন ও নরওয়ের বর্ডারের কাছে 'কিল' বলে এক স্টেশনে নামলাম। সেখানেই কথামতো আমার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। একটা বছর দশেকের পুরোনো রোলস রয়েস। এক বৃদ্ধ ড্রাইভার। সে-ও খুবই কম কথা বলে। খুব প্রত্যন্ত জায়গা। পাহাড়, উপত্যকা, জঙ্গল পেরিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা যাওয়ার পরে একটা ছোটো ব্রিজ পড়ল। ব্রিজ পেরিয়ে আমরা বোহাস আইল্যান্ডে ঢুকে গেলাম। শুনলাম প্রায় ছ-শো একর মতো জায়গা। পুরোটাই রাজপরিবারের অর্থাৎ এখন এরিকের। আইল্যান্ডের পাহাড়িপথ পেরিয়ে মিনিট পাঁচেক যেতেই দূরে অনেক উঁচুতে একটা ক্যাসল চোখে পড়ল।

পথে দুটো বড়ো গলফ কোর্স আর বেশ কিছু ছড়ানো-ছিটানো বাড়িও চোখে পড়ল।

এপ্রিলের শুরু। তীব্র শীতের থেকে সবে তখন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে সুইডেনের বন-প্রান্তর। মার্চেও এখানে অনেক জায়গা বরফে ঢাকা থাকে। উষ্ণতা থাকে শূন্যের অনেক নীচে। পাঁচ-ছ-ঘণ্টার বেশি দিনের আলোও থাকে না।

এপ্রিল পড়তেই দিনের সময় খানিকটা বেড়ে গেছে। আলো থাকছে সাড়ে সাতটা অব্দি। উষ্ণতা যদিও এখনও দশ ডিগ্রির নীচে থাকছে। বাইরে বেরোলে আমাকেও একটা লংকোট পরে থাকতে হচ্ছে। গাছে নতুন পাতা এসেছে। নানান রঙের ফুলে সেজে উঠেছে প্রকৃতি। ফুলের গন্ধে বাতাসে বসন্তের আগাম খবর।

পাহাড়ি পথ ধরে আরও মিনিট দশেক যাওয়ার পরে ক্যাসলটা সামনে এল। ক্যাসলটা আইল্যান্ডের মধ্যে একটু উঁচু জায়গায়। বেশ চড়াই পথ পেরিয়ে যেতে হল। একটা সময় মনে হয়, ক্যাসল অব্দি সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল। বাইরে থেকে জিনিসপত্র আনার কাজে রেললাইনটা ব্যবহার করা হত। ক্যাসল ঘিরে গভীর পরিখা। পরিখার উপরে ড্র-ব্রিজ আছে, যা দড়ি আর লিভারের সাহায্যে ওঠানো, নামানো যায়। শত্রু সেনা দূর থেকে দেখতে পেলে, আগে ওই ড্র-ব্রিজ তুলে নেওয়া হত। ড্র-ব্রিজের উপর দিয়ে আমার গাড়ি এগিয়ে চলল। একটা বড়ো গেট হাউসের মধ্যে দিয়ে ক্যাসলে ঢুকে পড়লাম।

ঢোকার পরেই যে কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল তা বলে বোঝানো মুশকিল। মনে হল যেন টাইম মেশিনে করে হঠাৎ করে দু-শো বছর পিছনে চলে এসেছি। গেট হাউস পেরোনোর কিছু পরেই ডানদিকে পার্কিং-এর জায়গা পড়ল। সেখানে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম।

দুর্গের চার ধার দিয়ে উঁচু প্রাচীর। প্রাচীরের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ফোকর আছে, যা দিয়ে আগে পাথর ছোড়া হত, তির মারা হত।

ক্যাসলের মধ্যে বেশ বড়ো ফুলের বাগান। একটা বড়ো জাপানিজ গার্ডেন আছে। আমি গাড়ি থেকে নেমে এসব দেখছি, এর মধ্যে কিছু দূর থেকে এক সামান্য পৃথুলা মাঝারি হাইটের বছর পঞ্চাশেকের মহিলা এগিয়ে এলেন।

মার্গারেট-এরিকের সেক্রেটারি। আমাকে আমার থাকার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে মার্গারেট জানালেন যে এক ঘণ্টা বাদে এরিক আমার সঙ্গে দেখা করবেন। কোনোরকম দরকার হলে যেন মার্গারেটকে জানাই।

সঙ্গের ব্যাগটা ঘরে রেখে মাঝের এই এক ঘণ্টা ক্যাসলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।

বহু পুরোনো এই ক্যাসল। তেরোশো সাল নাগাদ তৈরি। পরে অবশ্য বেশ কয়েকবার সংস্কার হয়েছে। ক্যাসল ঘিরে চারটে চারতলা টাওয়ার। টাওয়ারের উপরটা শঙ্কুর মতো। মনে হয়। টুপি পরে কোনো রোগা লোক যেন দাঁড়িয়ে আছে। টাওয়ারের গায়ে অনেক অ্যারোলুপ বা তির ছোড়ার জন্য খুব সরু আয়তাকার ফোকর। টাওয়ারগুলো থেকে ক্যাসলকে সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া হত। টাওয়ারের উপর থেকে আইল্যান্ডের প্রায় সব দিকে নজরদারি করা সম্ভব হত। টাওয়ারগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা প্রাচীরের উপর দিয়ে একটা প্রায় কুড়ি ফুট চওড়া পথের মাধ্যমে যুক্ত। ক্যাসলের বাইরের দেওয়াল শুনলাম চোদ্দো ফুট চওড়া।

এ ছাড়া ক্যাসলের সব থেকে উঁচু জায়গায় আছে একটা উঁচু টারেট বা চূড়া। টাওয়ার যেখানে নীচের মাটির উপরে খাড়া আছে, টারেট সেখানে তৈরি করা হয়েছে ক্যাসলের দেওয়ালের উপরে। দুটোই অবশ্য শত্রু সেনাকে দূর থেকে লক্ষ্য করার জন্য।

ক্যাসলের ভেতরে বেশ কয়েকটা বাড়ি। তার মধ্যে কিছু বাড়ি এখনও তাদের আগের চেহারায় পড়ে আছে। পাথরের কঙ্কাল নিয়ে। ইতিহাসের অজস্র আক্রমণের সাক্ষ্য রেখে। কিছু বাড়ী ঠিক করে নেওয়া হয়েছে ব্যবহারের জন্য। ক্যাসলের কিছু অংশ ঠিক পাঁচশো বছর আগেও যেরকম ছিল, ঠিক সেরকমই রাখা হয়েছে। তারই মধ্যে একটা বাড়ি এরিকের বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য। তাতেই আমার থাকা ঠিক হয়েছে। এরিক থাকেন আমার বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িতে।

ক্যাসলের ভেতরে একটা বড়ো চ্যাপেল আছে। এ ছাড়া আছে কাঠের তৈরি বিশাল ঘোড়ার আস্তাবল। তার একটা অংশ আগের মতো একই রকম রাখা হলেও কিছুটা অংশ জুড়ে এখন বিভিন্ন শৌখিন গাড়ি রাখা আছে। আরেকটা অংশ পরিবর্তন করে টি রুম করা হয়েছে।

পুরো ক্যাসলের মাঝবরাবর আছে বিশাল একটা বাড়ি, যেখানে আগে বিভিন্ন ধরনের উৎসবের আর নৈশভোজের আয়োজন করা হত। তার মধ্যে একটা বিশাল ওক রুম আছে। আমাদের কুড়িটা ড্রয়িং রুম জুড়লে যেরকম জায়গা হবে, সেরকম সাইজ ওক রুমটার। উচ্চতায় ঘরটা প্রায় ছ-তলা বাড়ির সমান।

এসব ক্যাসলের ইতিহাস মানেই যুদ্ধ আর রক্তপাতের ইতিহাস। শুনলাম, আঠেরোবার আক্রমণ করে মোটে একবার এ ক্যাসলের মধ্যে ঢুকতে পেরেছিল শত্রু সেনা।

আমার ঘরটা বিশাল। ঘরের ভেতরের দিকে ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বড়োরকম প্রভাব আছে। ঘরের মধ্যে একটা বাচ্চা মেয়ের পাথরের স্ট্যাচু। ঘরের উপরে কাঠের বিম দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। ঘরের গোল দেওয়ালের মধ্যে বেশ কয়েকটা আর্চ করে জানলা। জানলাগুলো একটু বেরিয়ে আছে। আর সেই জায়গায় বসার ব্যবস্থা আছে। সরু সরু জানলা। এগুলো আগে শত্রুর উপর লক্ষ রাখতে ব্যবহার করা হত। লাল-কালো টালির মেঝে। পুরো ঘরের দেওয়াল জুড়ে টালির উপরে আঁকা ছবি। কিছু ছবিতে যেন গল্প বলা হয়েছে। মেঝে আর দেওয়ালে লাল রং বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। বেশ কিছু অয়েল পেন্টিং রাখা আছে। বোঝাই যায় সেসব ছবি বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা।

অন্য কিছু ঘরেও গেলাম। এক-একটা ঘরে এক-এক রং বেশী ব্যবহার করা হয়েছে। একটা ঘরের দেওয়াল জুড়ে পাখি, লতাপাতার ছবি। সে ঘরের মেঝেতে সবুজ টালি ব্যবহার করা হয়েছে।

ঘরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কোনো অভাব নেই। তবে তাদের অতীতের চরিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ঘরের মধ্যে এখনও একটা বিশাল মার্বেল পাথরের ফায়ারপ্লেস। সেন্ট্রাল হিটিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফায়ারপ্লেসও চালু রাখা হয়েছে।

শুধু আমার ঘরে নয়, বাড়ির সর্বত্রই এই একই পরিচয়। নতুনের সঙ্গে সঙ্গে অতীতকে খুব সুন্দরভাবে ধরে রাখা হয়েছে। একটা জিনিষস খুব অবাক লাগছিল। পুরো পথে তেমন কোনো লোক দেখিনি। সেটা অবশ্য এজন্য হতে পারে যে এই আইল্যান্ডে এই ক্যাসলের বাইরে তেমন কিছু নেই। কিন্তু তার বাইরেও এত বড়ো একটা ক্যাসল দেখাশোনার জন্য যত সংখ্যক লোকজনের এখানে থাকার কথা, সেরকম সংখ্যক লোক চোখে পড়ল না। এসব দেশে যদিও ক্যাসলের সিকিউরিটির জন্য আমাদের দেশের মতো অত লোক থাকে না। সিসিটিভি-র মাধ্যমে ও আরও নানান সিকিউরিটি সিস্টেমের মাধ্যমে সুরক্ষা বজায় রাখা হয়।

এক ঘণ্টা বাদে একটা বিশাল ড্রয়িং রুমে এরিকের সঙ্গে দেখা হল। দেখেই মনে হল সেদিনের এরিকের সঙ্গে সামনের এরিকের যেন অনেক তফাত। চোখ বসে গেছে। মুখের মধ্যে যেন কীসের টেনশনের ছাপ। তাহলে কি ওঁর শরীর খারাপ হয়েছে?

উনি আস্তে আস্তে বলে উঠলেন, আমি জানি না তোমাকে এখানে ডাকা উচিত হল কি না। বিশেষ করে কাল রাতের ঘটনার পরে। মনে হচ্ছে, এই ক্যাসলের সেই অতীতের বিভীষিকা আবার ফিরে এসেছে। আমি তোমাকে এখানে থাকতে কোনো জোর করব না। সেদিন তোমার পরিচয় পেয়ে আমার মনে হয়েছিল তুমি হয়তো এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে। আমি এখানকার পুলিশে এখনই ব্যাপারটা জানাতে চাই না। কারণ এসব পুলিশের কর্ম নয়। একই সঙ্গে এ খবর সাধারণ জনতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, সেটাও আমি চাই না। অনেকেই এ ক্যাসলের ইতিহাস জানে। সে ঘটনা যদি আবার হয়, তাহলে এখানেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।

—সেটা কী? খুলে বলতে পারবেন। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। আমি কনফিডেনশিয়ালিটি মেন্টেন করব। কেউ জানবে না।

এরিক এবারে উঠে পাশের বুককেসের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা বই বার করে আমার হাতে দিলেন। বইটার নাম 'দ্য গোস্ট অফ বোহাস ক্যাসল'। বলে উঠলেন, লিখিত ইতিহাসে এ ক্যাসলে প্রথম এই প্রেতাত্মার হানার পরিচয় পাওয়া যায় সাড়ে চারশো বছর আগে। তারপর আবার এ ঘটনা ঘটে আজ থেকে প্রায় দু-শো কুড়ি বছর আগে। একই রকম। একই রকমভাবে সেই হানা। বেশ কিছু বই আছে সেই সময়ের ঘটনার উপরে।

সে সময় এখানে প্রায় পাঁচশো লোক ছিল এখানে। রাতারাতি এক প্রেতাত্মার আক্রমণে এক-এক করে এখানকার সব অধিবাসীর মৃত্যু হতে থাকে। বাধ্য হয়ে সে সময়ের রাজা এখান থেকে স্টকহোমে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তার এক ছেলেও সে সময়ে মারা গিয়েছিল। কোনোমতে একরাতে তখনকার রাজা অস্কার বারোজনকে নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারে। বাকি সবাই মারা যায়।

—কী হয়েছিল?

—বইটা পড়লে ডিটেলস পাবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে হঠাৎ করে কোন এক প্রেতাত্মার আক্রমণ শুরু হত। তাকে দেখা যেত না। মূলত অন্ধকারেই আক্রমণ করত বা একা পেলে আক্রমণ করত। মৃতদেহের সারা গায়ে থাকত গভীর আঁচড়ের দাগ। এখানে সে সময়ের এক আর্টিস্টের আঁকা একটা ছবি আছে। ওই যে সে ছবিটা।— বলে দেওয়ালে টাঙানো একটা বিশাল পেন্টিং-এর দিকে নির্দেশ করলেন এরিক।

চওড়ায় পনেরো ফুট, উচ্চতায় প্রায় বারো ফুটের বিশাল এক অয়েল পেন্টিং। সেটা গিয়ে দেখলাম। একটা লোক মাটিতে পড়ে আছে। তার সারা গায়ে কোনো পোশাক নেই। শুধু সারা শরীর জুড়ে গভীর আঁচড়ের দাগ। মাটিতে যেখানে পড়ে আছে, তার চার ধারে ঘর জুড়ে রক্তের দাগ। দূরে এক বিশাল ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হয় সে ছায়ামূর্তি কোনো নারীর।

এরকম ভয়ংকর একটা ছবি যে এখানে রাখা আছে, সেটা দেখে আমার একটু অবাক লাগল।

আমার মনের প্রশ্নটা বোধহয় উনি টের পেয়ে গিয়েছিলেন। উত্তর এসে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

এরিক বলে উঠলেন, ভাবছ তো যে এরকম একটা ছবি এখানে আছে কেন? আসলে এ ছবির মধ্যে এ ক্যাসলের পরিচয় লুকিয়ে আছে। এত বছর পরেও তাই কেউ এ ঘটনার কথা ভোলেনি। স্মরণকালের ইতিহাসে এটা মোটে দুবার ঘটে থাকলেও, এটা এমনই আতঙ্ক সঞ্চার করেছিল, যে এখনও সবাই এর কথা মনে রেখেছে। আমি অবশ্য চিরকালই এটাকে একটা গাঁজাখুরি গল্প ভেবে এসেছি।

—তা এর আগেও যখন হয়েছিল, মানে ওই সাড়ে চারশো বছর আগে, তখনও কি একই রকম ঘটনা ঘটেছিল?

—একদম একই রকম। শোনা যায়, দশ দিনের মধ্যে এই দ্বীপ পুরো খালি হয়ে যায়। তারপরে প্রায় দশ বছর কেউ এ দ্বীপে কেউ ছিল না। তখন এটা অন্যদিকের ভূখণ্ডের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। গল্প আছে যে ওই প্রেতাত্মা নাকি মাঝে জল থাকার জন্য অন্যদিকে যেতে পারেনি।

—ঠিক তাই আজও এই দ্বীপ অন্য সব জায়গা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন আছে। তা-ই তো? মাঝে শুধু একটাই ছোটো ব্রিজ।

—হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমি বা আমার পূর্বপুরুষরাও সাধারণের মতের বিরুদ্ধে কোনো আধুনিক বড়ো ব্রিজ তৈরি করিনি। একই সঙ্গে অবশ্য বিচ্ছিন্ন থাকার অনেক সুযোগ-সুবিধে আছে, সেটাও আমরা পেয়েছি। তা না হলে এখানে ট্যুরিস্টের ভিড় থাকত সব সময়। আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠত। প্রথমবারের ঘটনার খুব বিশদ বিবরণ অবশ্য পাওয়া যায় না। সে সময়ের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ফ্রিজ মাতসারের লেখা সুইডেনের ইতিহাসে এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন।

—তা আমাকে ডেকে আনার কারণের সঙ্গে কি অতীতের ওই দুই ঘটনার কোনো যোগাযোগ আছে? মানে আপনি কী বলতে চান, আবার ওই প্রেতাত্মাকে দেখা গেছে?

এবারে উনি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। সামনের ওয়াইনের গ্লাস থেকে সামান্য একটু খেলেন। তারপরে বলে উঠলেন, না, এখনও তাকে কেউ দেখেনি। তবে ওই একই রকম ঘটনা শুরু হয়েছে।

—মানে? কেউ মারা গেছে এখানে?

—গত দু-দিনে চারজন।

—সে কী? সেরকম কোনো খবর তো চোখে পড়েনি।

একটু চুপ করে একটু দূরে দাঁড়িয়ে-থাকা কাজের লোকটাকে আঙুলের ইশারায় ডেকে নিল এরিক। তার হাতে ধরা বিভিন্ন পানীয়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে আমি কোনোটা নিতে আগ্রহী কি না জিজ্ঞেস করলেন।

আমি একটা আপেল জুস নেওয়ার পরে লোকটা আবার দূরে সরে গেল। রাজবাড়ির অলিখিত অজস্র নিয়ম আছে, যা না থাকলে বোঝা যায় না। বোঝা যায় না যে প্রায় অদৃশ্য কিছু লোককে নিয়ে কীভাবে নিপুণভাবে কনসার্ট চালানো যায়। আমিও আগে এই লোকটার উপস্থিতি লক্ষ করিনি।

এরিক ফের বলে উঠলেন, আমরাই খবরটাকে মিডিয়ার কাছে রিলিজ হতে দিইনি। এ প্রেতাত্মাকে নিয়ে সাধারণ লোকেদের আগ্রহের অন্ত নেই। সুইডেনের অনেক জায়গায় 'বোহাস ক্যাসলের গোস্ট'-এর' নামে গেম শো পর্যন্ত আছে। লোকে এ খবর পেলে, মিডিয়া সামান্যতমভাবে আন্দাজ করতে পারলে আমাকে— শুধু আমি কেন, আমাদের সবাইকে, ইমিডিয়েটলি এখান থেকে চলে যেতে হবে। শুধু চারজন যে মারাই যে গেছে তা-ই নয়, তাদের আঘাতের চিহ্নও একই রকম। সারা গায়ে একই রকম গভীর আঁচড়ের দাগ।

—মৃত্যু কীসে বোঝা গেছে?

—রক্তক্ষরণ। এমনভাবে আঘাত যে কেউ মনে হয় না আক্রমণের পরে মিনিট দুয়েকের বেশি বেঁচেছে।

—তা তদন্ত করছে কে?

—এখানকার সুইডিশ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে কাজ করেছিলেন এরকম আমার চেনা দুজন আছেন। তাঁরা তদন্ত করছেন। আমি ইচ্ছে করে চাইনি যে এ বিষয়ে সাধারণ পুলিশ তদন্তে নামুক।—একটু থেমে ফের বলে উঠলেন,বুঝতেই পারছ, ওরা বড়ো হয়েছে এই প্রেতাত্মার কথা শুনে। ওরা এখনও তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। কাল রাতে কথা বলে আমার তো মনে হয়েছে যে ওরা যথেষ্ট বিভ্রান্ত। তোমাকে অবশ্য আমি এ তদন্তের বিষয়ে জোর করব না। কিন্তু তোমার সম্বন্ধে সব কথা শোনার পরে আমার মনে হয়েছে, তুমি হয়তো এ বিষয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। সত্যি কথা বলতে কী আমরা কেউই নিরাপদ নই। যেখানে আততায়ীকে চোখে দেখা যায় না, সেখানে তাকে ধরা কোনো সাধারণ গোয়েন্দার কাজ নয়। তুমি যদি এখানে থাকতে না চাও, বা এ রহস্যের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত না হতে চাও, তোমাকে আমার কর্মচারীরা সময়মতো স্টকহোম পৌঁছে দিয়ে আসবে। তবে তার আগে অবশ্যই তোমাকে হলফনামা দিতে হবে যে তুমি এ খবর কাকপক্ষীকেও দিতে পারবে না।

—কী করলে অনিলিখাদি?— প্রতীক নীরবতা ভঙ্গ করে প্রশ্ন করে উঠল।

—বুঝতেই পারছিস, এরকম একটা রহস্যের গন্ধ পাব, অথচ পালিয়ে চলে আসব, এটা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই দু-দিনের জন্য ক্যাসলে থেকে তদন্তে সাহায্য করব বলে কথা দিলাম।

—তো তারপর?

অনিলিখাদি ফের বলতে শুরু করল, উনি আমাকে আরও দুটো বই দিলেন। একটা ফ্রাঙ্ক বার্নাডের লেখা ভ্রমণকাহিনি। যেটা লেখা হয়েছিল প্রায় চারশো বছর আগে, প্রথমবারের ঘটনার কিছু পরে। অন্যটা দুশো কুড়ি বছর আগে লেখা ঐতিহাসিক ফ্রিৎজ মাতসারের। উনি সে সময় এখানে ছিলেন। যে বারোজন বেঁচে পালিয়ে যেতে পারেন, তাদের মধ্যে উনিও ছিলেন।

—তা এবারে কারা মারা গেছেন?— এরিককে প্রশ্ন করে উঠলাম।

—ওহো, যা ভুলো মন, তা-ই তো বলা হয়নি। আমার এখানে বেশ কিছু ঘোড়া আছে। সে ঘোড়ার দেখভাল করত ডেভিড। বছর চল্লিশেক বয়স। এখানে গত দশ বছর কাজ করত। তার মৃতদেহ পাওয়া যায় প্রথম গত পরশু। ক্যাসলের বাইরে এই আইল্যান্ডে ওর বাড়ি। একা থাকত। পরশু দিন দুপুরে ওর কোনো খবর না পেয়ে বাড়িতে লোক পাঠাই। ওরা গিয়ে কোনো সাড়া পায়নি। দরজা ভেজানো ছিল। তারপর দরজা খুলে ঢুকে দেখা যায় এই কাণ্ড। খাটের উপরে শুয়ে আছে। বোঝা যায়, ও কারোর উপস্থিতি টের পেয়েছিল। বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করেছিল। ওর রক্তাক্ত দেহ খাট থেকে আধশোয়া অবস্থায় ঝুলছিল।

—দ্বিতীয়জন?

—আমাদের বাড়ির দীর্ঘদিনের অস্ট্রেলিয়ান শেফ— রজার ফ্ল্যানাগান। সেটা এই ক্যাসলের এলাকার মধ্যে। বুঝতেই পারছ যে ক্যাসলের মধ্যে চট করে বাইরের কারোর পক্ষে আসা প্রায় অসম্ভব। ওর মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই আমি বিচলিত হয়ে উঠি। হয়েছে খুব সম্ভবত গত পরশু রাতে। রাত আটটার সময় ওকে শেষ দেখা যায়। কাল সকালে সাতটা নাগাদ ওর মৃতদেহ ও ক্যাসলের মধ্যে যে বাড়িতে থাকত, সে বাড়ির ছাদে ওঠার সিঁড়িতে পড়ে থাকতে পাওয়া যায়। একই রকম অবস্থায়। মনে হয়, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় কেউ যেন পিছন থেকে আক্রমণ করেছে।

—তা সিসিটিভি-তে কেউ ধরা পড়েনি?

—না, অনেক জায়গায় সিসিটিভি থাকলেও পুরো ক্যাসেল তো সিসি টিভিতে কভার করা নেই। কিছু জায়গায় প্রাইভেসির জন্যও বসানো হয়নি। ওখানে কোনো ক্যামেরা ছিল না। তবে ওই সময়ে বাইরে থেকে কেউ এসেছিল কি না তা চেক করতে বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা দেখা হয়েছে। কিন্তু কিছু পাওয়া যায়নি।

—তা বাকি দুজন?

—বাকি দুজনের মৃত্যুই কাল রাতে। তোমার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরে। সকালে বডি পাওয়া গেছে। দুজনের মৃতদেহই ক্যাসলের মধ্যে পাওয়া গেছে। একজন টেকনিশিয়ান— এখানকার পাম্প, বয়লার, ড্র-ব্রিজের মোটর— এসবের দেখাশোনা করত। অন্যজন এক মহিলা নার্স— এ ক্যাসলের মধ্যে একটা সার্জারি আছে। সেখানে কাজ করত।

—আচ্ছা, ডেডবডি দেখা যেতে পারে?

—হ্যা, অবশ্যই। সব ক-টা ডেডবডি এখনও এখানে আছে। মৃতদেহে ক্ষতচিহ্ন একই রকম। তোমাকে সার্জন হিউগো দেখাবেন। আমি ফোনে বলে দিচ্ছি।

কিছুক্ষণের মধ্যে সার্জন হিউগোর সঙ্গে এই আইল্যান্ডের একমাত্র প্রাইভেট হাসপাতালে গেলাম। সেটা অবশ্য ক্যাসলের বাইরে। ওখানেই মৃতদেহগুলো দেখলাম। ফরেনসিকসের জন্য ক্রিমেশন হয়নি। এত হিংস্রভাবে হত্যা করা হয়েছে যে এককথায় চোখে দেখা যায় না। খুব ধারালো ছুরিতে কেউ যেন দেহটাকে ফালা ফালা করে দিয়েছে। একটু খেয়াল করে দেখলেই অবশ্য বোঝা যায় যে এ আঘাত ছুরি দিয়ে নয়। তাতে আঘাতের যে ধরনের গভীরতা হত, বা যেভাবে আঘাত হত, এক্ষেত্রে সেরকম নয়। এটা খুব ধারালো নখের আঁচড়ে শুধু সম্ভব। এরকম আঘাতের পরে কেউ কয়েক মিনিটের বেশি বাঁচে না।

সব ক-টা হত্যাই সন্ধেবেলা হয়েছে।

এরপরে সার্জনকে নিয়ে হত্যাগুলো যেখানে যেখানে হয়েছে, সে জায়গাগুলো দেখে এলাম। ক্রাইম সিন আলাদা করা আছে। বুঝলাম, খুব যত্নের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আপাতত সন্দেহজনক কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি। হিউগোর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁরও মুখে-চোখে ভয়ের ছায়া। কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

সেদিন সন্ধেবেলাতে সাতটা নাগাদ আমার ঘরের ফোন বেজে উঠল।

এরিকের ফোন। —অনিলিখা আমার লাইব্রেরিতে আসবে? কয়েকটা বই দেখাতাম। তোমার কাজে লাগবে। একটু সাবধানে এসো। কাউকে পাঠাব কি?

এরিককে জোর দিয়ে কোনো দরকার নেই বলার পরেও মনের মধ্যে যে একটুও ভয় হচ্ছিল না, তা বলব না।

পাশের বিল্ডিং-এ এরিক থাকেন। মাঝের সামান্য পথ পাথরের রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। সূর্যাস্ত সবে হয়েছে। বাগানের আলোগুলো স্তিমিতভাবে জ্বলে উঠেছে। কেন জানি না মনে হচ্ছিল, এটুকু পথেও হঠাৎ করে কিছু হতে পারে। কেউ যেন আমার পিছু নিয়েছে। সেই ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। জোর পায়ে হেঁটে পাশের বিল্ডিং-এ ঢুকলাম। সেখানে একজন সিকিউরিটি আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাকে এরিকের লাইব্রেরি অব্দি এগিয়ে দিল।

এরিকের লাইব্রেরিতে ঢুকে সত্যি হকচকিয়ে গেলাম। এত বড়ো ব্যক্তিগত লাইব্রেরি আমি আগে দেখিনি। মনে হচ্ছে যেন ইতিহাসের পাতা থেকে কোনো ঘর বেরিয়ে এসেছে। বিশাল ঘরের উঁচু শিলিং অব্দি বই। বিশাল দেয়ালজোড়া আলমারি। ১৮৫০ সাল থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকার কালেকশন। অজস্র দুষ্প্রাপ্য বই।

এরিক ঘরের মধ্যে একটা লেদার সোফায় বসে বই পড়ছে।

আমার জন্য উনি একটা বড়ো চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি আলাদা করে রেখেছিলেন। আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন আমার পূর্বপুরুষ দ্বিতীয় অস্কারের ডায়েরি। ওর সময়ে এই ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে ২২০ বছর আগে। ওঁর কিছু অভিজ্ঞতার কথা লেখা আছে এখানে। আমি আগে পড়িনি। আজ খেয়াল হতে পড়ছিলাম। ওঁর ছেলে এলার্ড তো ওই প্রেতাত্মার হাতেই মারা যায়। পড়তে গিয়ে মনে হল তোমারও পড়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে এই জায়গাটা। —বলে আমার হাতে ডায়েরিটা এগিয়ে দিলেন একটা বিশেষ অংশ চিহ্নিত করে।

—তা উনি তো এ ঘটনার সময়ে অন্য জায়গায় চলে যান। তা-ই তো?

—হ্যাঁ, উনি ওঁর স্ত্রী, মেয়ে ও শেষ কয়েকজনকে নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। ছেলে ওই প্রেতাত্মার শিকার হওয়ার পর পরই। এটা প্রমাণ করে, আমরা যতই নিরাপত্তার কথা ভাবিনা কেন, আমরা কেউ নিরাপদ নই।

খেয়াল করলাম, ঘরের ভেতরে এককোণে একজন গার্ড মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

ডায়েরিটা হাতে নিলাম। চামড়ার কভার। আগেকার দিনের হাতে বানানো মোটা পাতার উপরে লেখা। হাতে নিলেই কীরকম শিহরন হয়।

ফের এরিক বলে উঠলেন,—ওহো! এটা তো ফ্রেঞ্চে লেখা। ওই সময়ে এখানে ফ্রেঞ্চ ভাষার ভালো চল ছিল। তুমি তো পড়তে পারবে না। তোমাকে আমি সংক্ষেপে পড়ে শোনাই।

—না না, আমি ফ্রেঞ্চ ভালোই জানি। আমার পড়তে কোনো অসুবিধে হবে না।

—বলে পড়তে শুরু করলাম। ভারী সুন্দর হাতের লেখা অস্কারের। পড়তে কোনো অসুবিধে হয় না। তবে প্রতিদিনের ডায়েরি উনি লেখেননি। বিশেষ কিছু দিনের কথা লিখেছেন। সেই বিশেষ দিনের লেখাটা আগে থেকেই এরিক আমার জন্য চিহ্নিত করে রেখেছিলেন। ওঁর এখান থেকে চলে যাওয়ার দু-দিন বাদে লেখা। ওই একটা দিনেই এখানকার ওই ঘটনা ধরা পড়েছে। তাতে লেখা—

''আমি কোনোদিনই বিশ্বাস করিনি যে এ ক্যাসলে কোনো প্রেতাত্মা আছে। বিজ্ঞানে বিশ্বাস করেছি। বন্ধু বিজ্ঞানী লিয়ামও বোধহয় আমার থেকে বেশি ভূতে বিশ্বাস করত। কিন্তু গত কয়েকদিনের ঘটনা যেন সব ওলট-পালট করে দিয়ে গেল। এখনও চোখের সামনে সে দৃশ্য ভাসছে। সেই অশরীরীর ছায়া। সেই একের পর এক মৃত্যু। নখের আঁচড়ে ফালা ফালা করে কাঁটা রক্তাক্ত দেহগুলো। বিশেষ করে এলার্ডের কথা। আমার প্রিয় ছোটোছেলে এলার্ডের কথা।

আমার মা আমার খুব কম বয়সে মারা যান। তাঁর কথা আমার বিশেষ মনে নেই। যার কাছে মূলত মানুষ হয়েছি, সেই গভর্নেস ফ্রেজার মুখে ছোটোবেলা থেকে প্রেতাত্মার গল্প শুনতাম। শুনেছি, বেশ কয়েকশো বছর আগে যখন এ ক্যাসল স্থাপিত হয়, সে সময়ে এ ঘটনা ঘটেছিল। ক্যাসলের কাজের জন্য অনেক দাস-দাসী এসেছিল এখানে। তাদের মধ্যে একজন ছিল এমিলি। তাকে নাকি দেখতে এত খারাপ ছিল যে দিনের বেলাতেও লোকে তাকে দেখে ভয় পেত।

সে প্রায় কারোর সঙ্গেই মিশত না। একা একা থাকত। নানান ধরনের কাঠের পুতুল বানাত। পরে আস্তে আস্তে অনেকের ধারণা হয় যে ও আসলে এক ডাইনি। সে সময় অনেক বাচ্চা এই আইল্যান্ড থেকে নিয়মিত হারিয়ে যেত। এরপর একদিন ওর বাড়ি থেকে অনেক ছোটো ছোটো হাড়-গোড় নাকি পাওয়া যায়। সন্দেহ করা হয় যে এগুলো সব সেই হারিয়ে-যাওয়া বাচ্চাগুলোর। ও নাকি তাদের মেরে খেয়ে নিত।

ওকে তখন এখানকার রাজা পুড়িয়ে মেরে ফেলার আদেশ দেন। আদেশমতো এ ক্যাসলের মধ্যেই সবার সামনে ওকে পোস্টের সঙ্গে বেঁধে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এমিলি আগুনে পোড়ার অসহ্য যন্ত্রণার সময় নাকি প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলে।

সেই থেকেই নাকি ওই প্রেতাত্মার আবির্ভাব, যাকে মাঝেমধ্যে দেখা যায়। এ আসলে আর কেউ নয়, এমিলি। যে এখনও মাঝেমধ্যে বেরিয়ে এসে ক্যাসলের সবার উপরে প্রতিশোধ নেয়। অনেক কিছু করেও ওই প্রেতাত্মার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়নি।

ছোটোবেলায় সেসব গল্প শুনে ভয় পেতাম। একটু বড়ো হতে মনে হয়েছিল যে এটা একটা সাধারণ গল্পের বেশি কিছু নয়। কিন্তু গত ক' দিনের ঘটনা আমার সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে গেল।

ঘটনার প্রথম শুরু আমাদের আস্তাবলে। চার দিন আগের ঘটনা। আমার ঘোড়ার দেখাশোনা করত আরশাদ। বেশির ভাগই ছিল হাঙ্গেরি থেকে আনা প্যালফ্রে ঘোড়া। সকালে ঘোড়া করে বেরোনো আমার নিয়মিত অভ্যেস। আরশাদ ঘোড়া রেডি করে ভোর ছ-টায় ক্যাসলের সামনে নিয়ে আসত। সেদিন দেরি দেখে লোক পাঠালাম। তখনই খুব খারাপ খবরটা পেলাম। আরশাদকে কে যেন হত্যা করেছে। রাতের দিকেই হয়েছে খুন। কী ব্যাপার দেখতে আমি নিজেই গেলাম ওর বাড়ি। কিন্তু বডি দেখেই শিউরে উঠলাম। এরকম নৃশংসভাবে কী খুন করবে? মনে হল যেন ছুরি দিয়ে কেউ শরীর ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। আমার সঙ্গে চার্চের পাদরি বেকেট ছিলেন। ওঁকে দেখে মনে হল যেন উনি খুব উদবিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

উনিই আমাকে প্রথম আলাদা করে বললেন, মনে হচ্ছে এ কোনো মানুষের করা খুন নয়। এ সেই প্রেতাত্মার কীর্তি। মনে হয়, সে আবার জেগে উঠেছে। সে এভাবেই খুন করে বলে শুনেছি।

আমি শুনে হেসে উড়িয়ে দিলাম। তখনও বুঝতে পারিনি যে কী হতে চলেছে। যাতে কোনোভাবে এ ধরনের গুজব না রটান, তাই পাদরি সাহেবকে বারণ করে দিলাম।

আমাদের ক্যাসলে প্রায় দু-শো লোক থাকে। তাদের সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হল যাতে কোনো অচেনা লোক দেখলেই খেয়াল করে। এ নিশ্চয়ই বাইরের কারোর কাজ।

এসব বাড়তি সতর্কতার পরেও পরের দিন পর পর দুটো একই রকম ঘটনা ঘটল। আমাদের ক্যাসলে মজা দেখানোর জন্য, গল্প শোনানোর জন্য এক জেস্টার থাকত, নাম ইয়ানে। ইয়ানে থাকত ক্যাসলের বাইরে একটা আলাদা বাড়িতে। খবর এল যে ওর রক্তাক্ত মৃতদেহ বাড়িতে পাওয়া গেছে। রাতে এখানে একটা ম্যাজিকের প্রোগ্রাম করেছিল। অনেক রাতে বাড়ি যায়। শরীর খুব ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে ফালা ফালা করে দেওয়া হয়েছে। এ যে সেই একই হত্যাকারীর চিহ্ন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমার সঙ্গে এ ক্যাসলে এক গুপ্ত বাহিনী থাকে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে এ ঘটনার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিলাম।

এর কয়েক ঘণ্টার পরে পরের হত্যার খবর পেলাম। এবারে রাতে নয়। ভরদুপুরে। এবারে আমাদের বাড়িতে। হত্যা হয়েছে লর্ড ব্যারনের মেয়ে মেরি। গত ছয় মাস ও এখানে থাকত। রাজপরিবারের রীতিনীতি জানতে, মার্জিত ব্যবহার ও আদবকায়দা শেখাতে এখানে অনেক বনেদি পরিবার তাদের সন্তানদের পাঠায়। আমাদের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। মেরি এখানে সেভাবেই এসেছিল। ভারী ভালো মেয়ে। আমাদের দিক থেকেও একটা বড়ো দায়িত্ব থাকে। খবরটা পেয়ে ছুটে গেলাম।

কাছে গিয়ে সে দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না। কে বা কারা যেন ওর উপরে আক্রমণ করেছে। সাদা পোশাক রক্তে এমনভাবে লাল হয়ে গিয়েছে যে একটা জায়গাও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে পোশাকের সাদা রং দেখা যাচ্ছে। ওই ঘরে এমন পাহারা ছিল যে বাইরের কারোর পক্ষে আসা অসম্ভব ছিল। বড়ো কাঠের দরজার সামনে সব সময় প্রহরী ছিল। বাইরে থেকে কারোর পক্ষে ঢোকা অসম্ভব।

সেই প্রহরী নাকি হঠাৎ ঘরের মধ্যে থেকে মেরির আর্তনাদ শুনতে পায়। কিন্তু ঢোকার পরেই দেখে এ দৃশ্য। তার চোখের সামনেই ছটফট করতে করতে মেরি মারা যায়। কিন্তু তখন ঘরে কেউ কোথাও নেই। ম্যাজিকের মতো আততায়ী চোখের সামনেই যেন উধাও হয়ে গিয়েছে। এখানে আততায়ী কে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না।

এরপর আর গুজব আটকানো যায়নি। কথাটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল যে আবার ক্যাসলে সেই প্রেতাত্মার আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমার সবরকম আশ্বাস সত্ত্বেও সেরাতেই একটা বড়ো অংশ দ্বীপ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমি বাধা দিইনি। যেখানে আমি আমার ক্যাসলের মধ্যেই কাউকে রক্ষা করতে পারছি না, সেখানে কীভাবে কাউকে থাকতে বাধ্য করব।

আশ্চর্যভাবে সে রাতটা নির্বিঘ্নে কাটল। প্রায় সারারাত জেগে কাটানোর পরে ভোরে উঠে খবর পেলাম যে আর নতুন কোনো হত্যা হয়নি।

সেদিন অর্থাৎ গত পরশুর সন্ধে থেকে আবার তার তাণ্ডব শুরু হল। প্রথম শুরু হল একজন পাহারাদারের মৃত্যু দিয়ে। সে ক্যালের দেওয়ালের প্যারাপেটে পাহারা দিচ্ছিল। তার মৃতদেহ পাওয়া যায় সন্ধে সাতটা নাগাদ। একই রকম অবস্থায়। সে দৃশ্য দেখে অন্য এক সৈনিক কোনোরকমে পালিয়ে এসেছিল। এরপর প্রায় প্রতি পাঁচ-দশ মিনিট বাদে বাদে মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। ঠিক মহামারির মতো।

পরিস্থিতি এরকম দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে কয়েক ঘণ্টার জন্য ড্র-ব্রিজ খুলে নেওয়া হবে যাতে ক্যাসলের মধ্যে সবার খোঁজ করা যেতে পারে। যাতে কতজন মারা গেছে, কতজন আছে, তার একটা পরিষ্কার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। বাইরের কেউ এসে থাকলে সে যাতে চট করে পালিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু তিন ঘণ্টাব্যাপী চিরুনি তল্লাশিতে অচেনা কাউকে খুঁজে তো পাওয়া গেলই না, উলটে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে-থাকা আরও আটটা মৃতদেহ পাওয়া গেল। কেউ টারেটে, কেউ টাওয়ারে, কেউ বা চ্যাপেলে। আবার ড্র-বিজ নামিয়ে দিলাম। যে শত্রুকে দেখা যায় না, তাকে সবাই ভয় পায়। বুঝলাম আমার কিছুই করার নেই। এক শুধু ভয় পাওয়া ছাড়া।

সবার মতো আমি আমার বাড়িতে ফিরে এলাম। চারদিকে কড়া প্রহরা। ঘন নিরাপত্তার বেষ্টনী। ফায়ারপ্লেস জ্বালিয়ে রাত ন-টা নাগাদ ড্রয়িং রুমে বসেছি, হঠাৎ মনে হল, সামনের দেওয়ালের উপর দিয়ে যেন একটা কালো ছায়া সরে গেল। সে ছায়া যে ওই প্রেতাত্মার ছিল, এখন আর তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। ঘরে আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে আমার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীজন ছিল, কিন্তু সে কিছু দেখতে পায়নি। তাকে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করলাম।

জনও আমি ঘরের মধ্যে সবকিছু তন্ন তন্ন করে দেখছি, ঠিক এর মধ্যে হঠাৎ উপর থেকে চিৎকার শুনতে পেলাম। আমার ছেলে এলার্ডের ঘর থেকে। উন্মাদের মতো ছুটে গেলাম উপরে। গিয়ে দেখি, এলার্ডের ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহ খাটের উপরে পড়ে আছে। সব শেষ। প্রাণ নেই।

আর থাকিনি ওই আইল্যান্ডে। ভোররাতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম বাকি সবাইকে নিয়ে। আমার সঙ্গে মোটে এগারোজন ছিল যারা ওই প্রেতাত্মার তাণ্ডব থেকে রক্ষা পেয়েছে। উফ কী বিভীষিকা। এখনও মনে হয় যেন হঠাৎ করে সে ছায়াকে দেখতে পাচ্ছি।

বেশ বিভোর হয়ে ডায়েরিটা পড়ছিলাম। হঠাৎ মনে হল, দেওয়ালে যেন একটা কালো ছায়া দ্রুত একদিক থেকে আরেক দিকে সরে গেল। চমকে দাঁড়িয়ে উঠলাম।

এরিক বলে উঠলেন, কী ব্যাপার অনিলিখা? কিছু হয়েছে?

—না না। আচ্ছা, আপনি কি কিছু দেখতে পেলেন? আমার মনে হল, একটা ছায়া যেন দেওয়ালের উপর দিয়ে সরে গেল।

—না। আমি তো কিছু দেখতে পেলাম না।

আমি কোনো কথা না বলে দেওয়ালের ওইদিকে উঠে এগিয়ে গেলাম। যদি কিছু দেখা যায়। কিন্তু কিছুই নেই। আমি কি ভুল দেখলাম? এটা কি অস্কারের ডায়েরি পড়ার প্রভাব?

দেওয়াল আলমারিতে অজস্র বই। তার মধ্যে বেশ কিছু বই পোকামাকড়ের উপরে। অবাক হয়ে বইগুলো নেড়েচেড়ে এরিককে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, আপনার কোনো পূর্বপুরুষের কি এসব বিষয়ে আগ্রহ ছিল?

—হ্যাঁ, ওই অস্কারের এক মেয়ে ছিল। উইলমা। তার এ বিষয়ে ও বিজ্ঞানে খুব আগ্রহ ছিল। একটা বড়ো ল্যাব ছিল তখনকার দিনে। তাতে এসব পোকামাকড় নিয়ে পরীক্ষা করতেন। চিরকাল অবিবাহিত ছিলেন।

—তা উনি কি ক্যাসলে ছিলেন ওই ঘটনার সময়ে?

—হ্যাঁ, ওঁর বয়স ছিল তখন দশ বছর। বাবার সঙ্গে সেরাতে পালিয়ে বাঁচেন। কিন্তু সেজন্যই নাকি উনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন না। ওরকম একটা ট্রমা দেখেছেন। এক বছরের ছোটো নিজের ভাইয়ের মৃতদেহ দেখেছেন। উনি ওঁর সম্পত্তির একটা বড়ো অংশ এন্টোমোলজির অর্থাৎ ওই পোকামাকড়ের রিসার্চের জন্য দান করে যান।

কথা বলতে বলতে জানলার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। এবার যেন আরও স্পষ্ট দেখলাম। একটা ছায়াশরীর বাইরের স্বল্পালোকিত ঘাসের উপর দিয়ে দ্রুত চলে গেল।

কিন্তু যা দেখলাম তা কি সত্যি? সত্যিই কি তাহলে কোনো প্রেতাত্মা আছে বোহাস ক্যাসলে?

সে রাতে কিছু হল না। পরের দিন বেলা এগারোটার সময় এরিকের সঙ্গে প্রথম দেখা হল। উনি এ বয়সেও প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ছোটেন। এরিকই জিজ্ঞেস করলেন আমি ওঁর সঙ্গে ক্যাসল দেখতে আগ্রহী কি না।

এ সুযোগ কে ছাড়ে! এরিকের সঙ্গে ক্যাসলের নানান অংশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। উনি একই সঙ্গে আমাকে ক্যাসলের বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস বলতে থাকলেন, যার প্রমাণ এখনও ক্যাসলের ভাঙা পাথরে রয়ে গেছে। বুঝতে পারছিলাম, পায়ের নীচের এই মাটি কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আর ষড়যন্ত্রের সাক্ষ্য থেকেছে। এরিক একটা রাত নিশ্চিন্তে কাটাতে পেরে যেন একটু এনার্জি পেয়েছেন। একজনকে দিয়ে একটা মধ্যযুগীয় তির ধনুক নিয়ে এনে টাওয়ারের অ্যারোলুপগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হত, কীভাবে তির ছোঁড়া হত, কতদূর যেত, তাও দেখালেন।

প্যারাপেটের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, হঠাৎ প্রায় পায়ের উপর দিয়ে একটা বিকটদর্শন বড়ো কালো মাকড়সা চলে গেল। আমি চমকে উঠেছিলাম। কীরকম যেন লোমশ চেহারা। বড়ো বড়ো পা ফেলে দ্রুত হারিয়ে গেল।

এরকম মাকড়সা তো আগে কখনো দেখিনি।

—হ্যাঁ, এটা এই আইল্যান্ডের স্পেশালিটি। এদের আরেক প্রজাতিও এখানে দেখা যায়। যদিও একসঙ্গে দেখা যায় না। এদের থেকে খানিকটা ছোটো। লালচে রঙের। কিন্তু ওরা অন্য সময়ে হয়। একই রকম লোমশ চেহারা। —বলতে বলতে থেমে গেলেন। কারণ উনি যেটা দেখছিলেন, আমিও তা-ই দেখছিলাম। আর কিছু বলার দরকার ছিল না।

কিছু দূরে ক্যাসলের পাথরের দেওয়ালের উপরে ঠিক একই রকম একটা লাল মাকড়সা। খুব আস্তে আস্তে হেঁটে দেওয়ালের একটা অ্যারোলুপের মধ্যে ঢুকে গেল। উনি ফের বলে উঠলেন,— এদের ভেনোম কিন্তু বেশ বিষাক্ত। অনেক বছর বাদে বাদে এদের দেখা যায় এই আইল্যান্ডে।

বলে উঠলাম,— এরকম মাকড়সা অন্য কোথাও দেখা যায়?

—নিশ্চিত নই। তবে আমার পড়াশোনামতো এরকম মাকড়সা খুব কমই দেখা যায়। তোমাকে উইলমার কথা বলছিলাম না! উইলমার অন্য পোকামাকড়ের সঙ্গে মাকড়সাতেও খুব আগ্রহ ছিল। এখানে একটা বড়ো ল্যাব আছে, সেখানে গেলে এরকম অনেক মাকড়সার প্রজাতির কথা জানতে পারবে।

—সেটা দেখা যেতে পারে?

—এসবের মধ্যে ওই ঘরটা দেখানো— একটু দ্বিধা করে উনি ফের বলে উঠলেন,— ঠিক আছে, আমি বলে দেব কাউকে তোমাকে ওই ল্যাবটা দেখাতে। চলো, তার আগে একটা ফিকা হোক।

ফিকা বলতে এখানে কফি ব্রেক বোঝানো হয়। এরিক টিপিক্যাল সুইডিশ লোকেদের মতো। প্রথমদিকে একটা বাড়তি কথা বলতেন না। যতক্ষণ না ভালো করে পরিচয় হয়, এঁরা আলাপে একটা বাড়তি শব্দও ব্যবহার করেন না। কিন্তু ভালো পরিচয় হয়ে গেলে, তখন আবার কোনো কথা বলতেই দ্বিধা করেন না। এখন যেমন এরিক কোনো কথা বলতেই দ্বিধা করছিলেন না।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ সেই ল্যাবটা দেখার সুযোগ হল। অদ্ভুত সে ঘর। নানান ধরনের পোকামাকড়, মাকড়সা, মৌমাছি, আরশোলা, ফড়িং—আরও কত কী সংরক্ষণ করে রাখা আছে। লেখা আছে, প্রায় পঞ্চাশ হাজার বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় এখানে সংরক্ষিত আছে। লেবেলের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে বিভিন্ন ধরনের তথ্য লেখা আছে। তার মধ্যে হাজারখানেক বিভিন্ন ধরনের প্রজাপতি, প্রায় পাঁচশোভিন্ন ধরনের গুবরেপোকা, বিভিন্ন ধরনের মৌমাছি, ঝিঁঝিপোকা, ফড়িং। খুঁজতে খুঁজতে দেখা পেয়ে গেলাম আমার সকালে দেখা দুটো মাকড়সারও।

উপরে লেখা লেবেলে দেখলাম, প্রথম মাকড়সা প্রজাতি নাকি প্রতি ১৩ বছর অন্তর অন্তর এ দ্বীপে দেখা যায়। অন্য প্রজাতির মাকড়সা দেখা যায় এ দ্বীপে প্রতি ১৭ বছর বাদে বাদে। অর্থাৎ দুটো মাকড়সাকে যে একই সঙ্গে দেখলাম, সেটা সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।

ইতিমধ্যে আমার সেল ফোনটা বেজে উঠল। এরিকের ফোন। উলটোদিকে এরিকের উত্তেজিত গলা। কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, তুমি কোথায়?

—আমি ল্যাবে একটু এসেছিলাম। খুব ভালো লাগল।

—এক্ষুনি ফিরে এসো। কোনো খোলা জায়গায় থেকো না। এখনই নিজের ঘরে ফিরে যাও। আবার ওর আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছে। ক্যাসলে তিনজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে এখানকার আবাসিক একজন অ্যাকাউন্ট্যান্টের বারো বছরের মেয়েও আছে। ও, তোমার সঙ্গে তো তার আলাপও হয়েছে। আয়ানের মেয়ে। তার মৃতদেহ পাওয়া গেছে ক্যাসলের চার নাম্বার বাড়িতে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে ল্যাব থেকে বেরিয়ে এলাম। তবে ঘরে না গিয়ে আগে চললাম ক্যাসলের সেই চার নাম্বার বাড়ির দিকে। আয়ানের সঙ্গে আমার গতকাল মিনিট পাঁচেক আলাপ হয়েছে। আমি যখন গতকাল এরিকের লাইব্রেরিতে ছিলাম, খানিকক্ষণের জন্য আয়ান এসেছিল। খুব খারাপ লাগল খবরটা পেয়ে।

এখানে এরকম পাঁচটা বাড়ি আছে, যেখানে ক্যাসলে কর্মরত সিনিয়র অফিসাররা থাকে। অবশ্য তাদের ঠিক কর্মচারী বলা যায় না, একসঙ্গে থাকতে থাকতে সবাই একটা বড়ো পরিবারের অংশ হয়ে গেছে। কিছু দূর যেতেই চার নাম্বার বাড়ির সামনে কয়েকজন লোকের ভিড় চোখে পড়ল। আয়ান এখানে তিরিশ বছর কাজ করেছে। স্ত্রী ও মেয়ে নিয়ে থাকত। যে ঘরে মেয়ের মৃতদেহ আছে, সেখানে ঘরের এককোণে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আয়ান কাঁদছে। চেয়ারে, খাটে অনেক রক্ত লেগে আছে। মেয়েটার সারা শরীর সাদা কাপড়ে ঢেকে খাটে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরের দুটো জানলাই বন্ধ, ঘরে একটা ফায়ারপ্লেস আছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, মেয়েটা ঘরেই ছিল। ল্যাপটপে খেলছিল। ঠিক একই রকম আঘাতের চিহ্ন। সারা শরীর কারো আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত।

ক্যাসলের বাইরে একটা বড়ো গলফ কোর্স আছে। বেরোনোর পরে শুনলাম, সেখানেও নাকি দুজনের ডেডবডি পাওয়া গেছে।

সন্ধে হয়ে আসছে। ঘরে ফেরামাত্র এরিকের সই করা একটা নোট পেলাম। ক্যাসলের সিকিউরিটি উপদেষ্টার থেকে নোটটা, তাতে এরিকের স্বাক্ষর। জরুরি মিটিং-এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে রাত এগারোটার এই দ্বীপ ছেড়ে দেওয়া হবে। বাসে করে এই আইল্যান্ড থেকে বার করে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। এখানে আর থাকা সম্ভব হবে না।

এরিককে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই এরিকের ফোন এল।

ক্লান্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম—আমারই ভুল। নিজের জেদে এখানে থেকে সবার বিপদ বাড়িয়ে দিয়েছি। আজকেই মনে হচ্ছে সেই রাত। সবে সে তাণ্ডব শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী স্টেফানের সঙ্গেও কথা হল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে সুইডেনের পুলিশের হাতে এ কেস তুলে দেওয়া হবে। এক ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাইকে তাদের বাড়ি বা পছন্দমতো জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আসা হবে। যাদের অন্য কোনো বাসস্থান নেই, তাদের জন্য আমি হোটেলের বন্দোবস্ত করেছি।—একটু থেমে উনি আবার বলে উঠলেন, আমি খুব দুঃখিত। তোমাকে এরকম একটা সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে শুধু শুধু টেনে এনেছি। এর মধ্যে দ্বীপের নানা জায়গায় আরও পাঁচটা ডেডবডি পাওয়া গেছে। শি ইজ অন এ র‌্যাম্পেজ। আমাদের কিছুই করার নেই। —লক্ষ করলাম, এরিকের গলা ভয়ে কাঁপছে।

—কিন্তু আপনি কোথায় যাবেন?

এরিকের গলা যেন দুঃখে বুজে এল— আসলে আমাদের অন্য কিছু বাড়ি আছে। আগে যদিও কোনোদিন থাকিনি। তবে রেডি করতে কিছুদিন লাগবে। আপাতত কিছুদিন হোটেলে গিয়ে উঠব।

আশ্বস্ত করার কোনো শব্দ খুঁজে পেলাম না। একই সঙ্গে এই রোবট, স্পেস সায়েন্স আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে একটা প্রেতাত্মার ভয়ে আমরা সবাই এই ক্যাসল ছেড়ে বেরিয়ে যাব, সেটাও মেনে নিতে পারছিলাম না।

ঠিক করলাম, যতই রিস্ক থাকুক, না কেন, এক-এক করে ক্যাসলের ভেতরের বিভিন্ন বাড়িতে যাব। হয়তো এর মধ্যেই কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে। সঙ্গে টর্চ আর ফোনটা শুধু নিলাম।

বাইরে ক্যাসলের সব আলো জ্বলে উঠেছে। সোনার কাজ করা পোস্টের উপরে ষড়ভুজের মতো আলোর শেড। আলোগুলো তার মধ্যে এমনভাবে জ্বলে উঠেছে যে মনে হচ্ছে অন্ধকারকে তার নিজস্ব জায়গা দেওয়ার জন্যই তাদের উপস্থিতি। এরকম কত যে দামি জিনিস ছড়িয়ে আছে এ ক্যাসলে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে এ যেন এক রূপকথার ছবি। বাইরে কোনো লোকজন দেখতে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে এ যেন ঘুমিয়ে-পড়া এক পঞ্চদশ শতাব্দীর শহর। ক্যাসলের বিভিন্ন বিল্ডিং-এর ঘরগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। কালো বেড়ালের চোখের মতো তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা টাওয়ারের দিকে এগিয়ে গেলাম। আজ সব খোলা, প্রহরাহীন। হয়তো খানিকক্ষণের মধ্যে পুলিশবাহিনী এসে পড়বে। কিন্তু মাঝের এ সময়টুকু সবাই তাদের সব থেকে নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ঘোরানো সরু সিঁড়ি টাওয়ারের উপরের দিকে উঠে গেছে। সিঁড়িতে অন্ধকার থাকায় টর্চ জ্বেলে এগিয়ে গেলাম। সিঁড়ির রেলিং ধরে ধরে চারটে তলা পেরিয়ে টাওয়ারের উপরে ছাদে উঠে এলাম।

এর উপর থেকে পুরো দ্বীপটা দেখা যায়। অবশ্য এখন যথেষ্ট অন্ধকার হয়ে গেছে। তার উপরে আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। কিছুই দেখা গেল না। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে এ যেন হাওয়ার স্পর্শ নয়, এমিলির প্রেতাত্মার তীক্ষ্ন নখের আঁচড়। শুনেছি, এই টাওয়ারের সামনেই একটা পোস্টে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল এমিলিকে। একা এমিলিকে নয়, এমিলির সঙ্গে ওর একমাত্র সন্তানও ছিল। ফ্রিৎজ মাতসারের লেখা বইটা ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছি। আসলে এমিলি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল। সে ডাইনি ছিল না। সে ছিল এক অতি সাধারণ মেয়ে যে রাজার অন্যায় কিছু কাজের প্রতিবাদ করেছিল। সে ছিল এ ক্যাসলের অবিচারের শিকার। এরকম কত অসহায় মানুষের রক্ত— আর্তনাদ যে মিশে আছে এ ক্যাসলের মাটিতে। সেখানে এমিলির আত্মা যে এ ক্যাসলের বাসিন্দাদের ক্ষমা করবে না, এ তো স্বাভাবিক।

ঠিক বলেছ— কে যেন একটু খোনা গলায় আমার কানের পাশে ফের বলে উঠল,—কী করে আমি ক্ষমা করি বলো তো!

চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালাম। কেউ তো নেই! মনের ভুল?

নামার সময় টাওয়ারের প্রত্যেকটা ঘরে আলো জ্বেলে দেখলাম। কিছুই খুঁজে পেলাম না। সত্যি কথা বলতে কী যতবার কোনো ঘরে আলো ফেলছিলাম, হৃৎস্পন্দন যেন বেড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, হঠাৎ আলোর ওপারে দেখব তাকে। এমিলির সেই বীভৎস প্রেতাত্মাকে। মুখে হয়তো তার এখনও রক্ত লেগে আছে। সে হয়তো আমার দিকে স্থিরভাবে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে খানিক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু সেটা দেখতে হয়নি। আলোয় ধরা পড়েছে শুধুই তার নীরব অনুপস্থিতি। পুরো টাওয়ারে কারোর দেখা পেলাম না।

টাওয়ার থেকে নেমে এবারে যে বিল্ডিং-এর মধ্যে 'ওক হল', সেদিকে এগিয়ে গেলাম। এখানেই ক্যাসলের সব থেকে বড়ো ইভেন্টগুলো হয়। এখানেই গত চারশ বছর ধরে রাজারাজড়ারা তাদের সন্মানিত অতিথিদের নৈশভোজের আয়োজন করতেন।

ওক কাঠের বিশাল দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। প্রসিদ্ধ ওক হল এখন আমার সামনে। বিশাল ঘরে শুধু কিছু আলো জ্বলছে। দূরে বিশাল মার্বেলের ফায়ারপ্লেস। দেওয়ালে টাঙানো বিভিন্ন দুর্মূল্য ছবি।

—আপনি কি কিছু খুঁজছেন?

প্রশ্নে চমকে উঠে দেখি, একজন সিকিউরিটি আমাকে দেখে বাইরে থেকে এগিয়ে এসেছে।

—হ্যাঁ, বেরিয়ে যাওয়ার আগে একটু ঘুরে দেখছি। আর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

লোকটা আমাকে কিছু না বলে একটু দূর থেকে আমার উপরে লক্ষ রাখতে লাগল। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। আমাকে তো চেনে না। ঘরে অনেক দুর্মূল্য জিনিষস আছে।

ওক রুমের ভেতরে শেষের দিকে একটা চওড়া ঘোরানো সিঁড়ি আছে। সেটা উপরে উঠে গেছে। কী মনে হল, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলাম। এখানে যখন কোনো পার্টি হত, তখন উপরে হয়তো কিছু বিশিষ্ট অতিথির বা রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা করে বসার ব্যবস্থা ছিল। ভারী সুন্দর কাঠের কাজ করা দেওয়াল।

আমি পিছনের লোকটার থেকে একটু এগিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল কীসের যেন আওয়াজ। সামনে থেকে আওয়াজটা আসছে। চমকে উঠলাম। মনে হল, একটা কালো ছায়া যেন সামনে থেকে চট করে সরে গেল। সতর্ক হয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। পা হঠাৎ করে পিছলে কাঠের মেঝেতে পড়ে গেলাম। মাটিতে চারদিকে রক্তের ধারা। কিছু দূরে একজন সিকিউরিটির দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। লোকটার প্রাণ আছে কি না দেখতে উবু হয়ে বসে পালস দেখার চেষ্টা করলাম। নাহ, প্রাণ নেই। কিন্তু শরীর এখনও গরম। মিনিটখানেক আগেই বলা যায়, আমার সামনেই এ ওই প্রেতাত্মার শিকার হয়েছে। দেখতে গিয়ে আর পিছলে পড়ে আমার সারা গায়ে রক্ত লেগে গেল। কীরকম শিরশিরিয়ে উঠল সারা গা।

ইতিমধ্যে পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখি, অন্য সিকিউরিটি এসে দাঁড়িয়েছে যার সঙ্গে আগে কথা বলেছিলাম। কিন্তু আমাকে ওরকম ডেডবডির সঙ্গে বসে থাকতে দেখে লোকটার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আমাকে লক্ষ করে কাঁপা হাতে বন্দুক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর লোকটা আস্তে আস্তে পিছু হাঁটতে শুরু করল।

আমাকেই এই আধো-অন্ধকারে ভূত ভাবছে নাকি? অবশ্য এটা ঠিক যে এখানে আলো এত কম যে আমাকে ভালো করে দেখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সহকর্মীর রক্তাক্ত দেহ ও নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছে।

হাত তুলে দাঁড়িয়ে কিছু বলার আগেই লোকটা এলোপাথাড়ি কয়েকটা গুলি চালিয়ে সিঁড়ি দিয়ে পাগলের মতো নামতে শুরু করল। উপর থেকে দেখতে পেলাম, সিঁড়ি দিয়ে নেমে ওক রুমের মধ্যে দিয়ে ছুটে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ওটা কী? মাঝপথে কাঠের ফ্লোরের উপরে একটা জায়গা জুড়ে যেন জমাট-বাধা অন্ধকার। কে যেন মেঝের উপরে বসে আছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। কিন্তু তার আগেই লোকটা যেন ওই অন্ধকার ছায়ার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর ঢুকতেই যেটা হল, সে ভয়ানক দৃশ্য আমি মুখে বলতে পারব না। ছায়াটা যেন ঢেউয়ের মতো নড়ে উঠল। আর তার পরক্ষণেই লোকটার চিৎকার শুনলাম। তীব্র আর্তনাদ, কিন্তু সে আর্তনাদ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে থেমে গেল। টর্চের আলো অতদূরে ফেলে কিছু লাভ হল না। যেটুকু দেখা যাচ্ছে, সেটা ওক রুমের সামান্য আলোতেই। আর তাতে দেখলাম, লোকটার রক্তে ভাসা ক্ষতবিক্ষত দেহটা পড়ে আছে। ঘন কালো ছায়াটা এবার দেহটাকে ছেড়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে অর্থাৎ আমার দিকে এগিয়ে এল। বুঝতে পারলাম আমার সময় নেই। আমি ওই আত্মার পরবর্তী শিকার হতে চলেছি।

যেদিকে অন্য লোকটার মৃতদেহ পড়ে ছিল, সেদিকে ছুটে গেলাম। মৃতদেহটা পেরিয়ে হলঘরের শেষের দিকে একটা ঘর, তার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজা টেনে দিলাম।

বিশাল কাঠের দরজা খিল দিয়ে বন্ধ করে দিলাম। এটা যদিও কোনো প্রেতাত্মার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়বে না, তবু এই দূরত্ব যদি কোনোভাবে আমাকে প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝলাম, বাইরে সে এসে গেছে। অর্থাৎ দরজার ঠিক বাইরেই এমিলি।

যেন ঘরের দরজায় হাতড়ে হাতড়ে ঢোকার পথ খুঁজছে। বেশ বুঝতে পারছি দরজার উলটোদিকে এ কোনো জীবিত মানুষের উপস্থিতি নয়। একটা অদ্ভুত হিজ হিজ আওয়াজ শুরু হয়েছে। কেউ যেন অনেকগুলো হাত দিয়ে দরজার বিভিন্ন জায়গা ছুঁয়ে দেখছে। কাঠের দরজাটা উচ্চতায় প্রায় চোদ্দো ফুটের হবে। দরজার উপরের প্রান্তে কোনো জীবিত মানুষের পক্ষে পৌঁছোনো সম্ভব নয়। কিন্তু বাইরের সে যেই হোক না কেন, তার হাত যে দরজার উপরের প্রান্ত অব্দি অনায়াসে পৌঁছোচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে, ঢোকার উপায় খুঁজছে, বেশ বুঝতে পারছি। সঙ্গে সেই অদ্ভুত আওয়াজ। হিজ হিজ।

কেন জানি না কী করব, তা বুঝে উঠতে পাচ্ছিলাম না। নিজেকে ফিরে পেতে কয়েক মিনিট লেগে গেল। বাইরে তখনও যেন সেই প্রেতাত্মা দরজার উপরে চূড়ান্ত আক্রোশে আঁচড়ে যাচ্ছে। মুখে সেই অদ্ভুত আওয়াজ। মাঝেমধ্যে সামান্য নীরবতা। যেন ঘরে ঢোকার নতুন কোনো উপায় খুঁজছে।

হঠাৎ ভারী কাঠের দরজা কাঁপতে শুরু করল। কারোর অমানুষিক শক্তি না থাকলে এভাবে কাঁপাতে পারে না। খিল ভেঙে যাবে না তো! এরপরে যেটা হল, সেটার জন্য আমি আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না। মনে হল যেন অন্যদিক থেকে মোটা কাঠের দরজার মধ্যে কেউ ধারালো নখ বার বার ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

টর্চ জ্বেলে ঘরের চারদিকে ফেললাম। বিশাল ঘরের এককোণে কিছু পানীয়ের বোতল রাখা আছে। তার মধ্যে কয়েকটা অ্যাপেল সাইডার ভিনিগারের বোতলও আছে। ঘরে একটা জানলা আছে। কিন্তু সেটা আশ্চর্যরকম ছোটো। তার মধ্যে দিয়ে বেরোনো অসম্ভব। সেরকম কিছু হলে জানলা খুলে যে লাফ দেব নীচে, সে উপায়ও নেই। ফোন করতে গিয়ে দেখলাম, নেটওয়ার্ক নেই। যখন দরকার, ঠিক তখনই নেটওয়ারক নেই।

ঘরে কোন ফায়ারপ্লেস নেই।

বাইরে যে-ই থাকুক-না কেন, সে এখনও যে যায়নি তা বেশ টের পাচ্ছিলাম। সে যেন তার পরের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করছে।

হঠাৎ করে সেই হিজ হিজ আওয়াজটা আবার শুরু হয়ে গেল। একই সঙ্গে কেউ যেন ছেনি দিয়ে দরজার কাঠ কাটতে শুরু করেছে নীচ থেকে। তাহলে কি দরজার নীচটা কেটে ফেলে ঢোকার চেষ্টা করছে যাতে সে ঘরে ঢুকে আসতে পারে?

কী মনে হল জানি না। অ্যাপেল সাইডার ভিনিগারের বোতলগুলো এক-এক করে খুলে দরজার দিকে লক্ষ করে ঢেলে দিলাম।

আশ্চর্যভাবে বাইরের আওয়াজটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। কিন্তু বাইরে যে ছিল, সে চলে গেল কি না তা বুঝতে পারলাম না।

হঠাৎ করে এর মধ্যে আমাকে খানিকটা চমকে দিয়ে ফোনটা বেজে উঠল। চারদিকের এসব অপার্থিব ঘটনার মধ্যে এ পার্থিব শব্দটা যে কতটা স্বস্তি দিল, তা বলে বোঝাতে পারব না। কখন জানি নেটওয়ার্ক ফিরে এসেছে। এরিকের ফোন।

—অনিলিখা, কোথায় তুমি? তোমায় কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। ফোনেও পাচ্ছি না।

আমি ফিসফিস করে বলে উঠলাম, আমি ওক রুমে আটকে আছি। সে এখানে আমার ঘরের বাইরে বসে আছে।

উলটোদিক থেকে এরিকের দুর্বল গলা শুনলাম— শুনতে পাচ্ছি না। তোমার গলা শোনা যাচ্ছে না। জোরে বলো। কোথায় তুমি?

এবারে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম। লাভ হল না। ওদিক থেকে শুনতে পাচ্ছে না। আবার নেটওয়ার্ক চলে গেছে।

আরও মিনিট পনেরো বসে থাকলাম। কিন্তু সে পনেরো মিনিট যেন পনেরো ঘণ্টার সমান। মনে হচ্ছিল বাইরে যে ছিল, সে আর নেই। অন্তত তার উপস্থিতি বোঝার কোনো উপায় নেই।

হাতে তখনও একটা ভিনিগারের বোতল ধরে আছি। এর মধ্যে কি কিছু আছে, যা দরজার উলটোদিকের প্রেতাত্মাকে ভয় পাওয়াল? নিজের প্রশ্নে নিজের হাসি পেল।

সাইডার মানে অ্যাসেটিক অ্যাসিড। একটা কথা সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এল। তাহলে কি...?

নাহ, ভয় পেলে চলবে না। যা ভাবছি, সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তার সমাধান খুব শক্ত নয়।

পর পর কয়েকটা জিনিস মাথায় চলে এল। এ ঘটনা প্রায় ২২০ বছর পর পর হয়েছে। ১৩ আর ১৭ গুণ করলে হয় ২২১। দুটোই প্রাইম নাম্বার।

মাই গড!

তবে তাতে আততায়ীরা যে কম হিংস্র হবে তা তো নয়। তারা আমাকে সামনে পেলে এক মুহূর্তের মধ্যে কেটেছিঁড়ে ফেলবে।

—তারা মানে? এতক্ষণ তো একটা প্রেতাত্মার কথা বলছিলে। —প্রতীক আর ধৈর্য না রাখতে পেরে বলে উঠল, ওখানে কি একাধিক প্রেতাত্মা ছিল? অবশ্য তা না হলে একসঙ্গে এতজনকে মারত কীভাবে!

—উঁহু, সব তো আর এত সহজে বলে দেওয়া যাবে না। শোন। গল্পের সামান্য বাকি আছে।

অনিলিখা ফের বলে উঠল—দরজা খুলে আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরে কেউ নেই। কিন্তু সাইডার ফেলার জন্য সারা ঘরে একটা বিচ্ছিরি গন্ধ হয়ে রয়েছে। গন্ধ পাচ্ছি মানে নিশ্চিন্ত। তারা এখানে থাকবে না।

সত্যি নেই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে ওক রুমের থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে বেরিয়ে দেখি চারদিকে অনেক সিকিউরিটি। সুইডিশ পুলিশফোর্শ এসে গেছে। হঠাৎ করে যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে এ ক্যাসল।

এরিককে খুঁজে বার করতে বেশি সময় হল না। দুটো বাস ইতিমধ্যেই স্টকহোমের উদ্দেশে বেরিয়ে গেছে। বাকি আরও কয়েকটা বাসে সবাই তাড়াহুড়ো করে উঠছে।

এরিক আমার জন্য দুশ্চিন্তা করছিলেন। আমাকে দেখে অবাক হয়ে এগিয়ে এলেন।—কী ব্যাপার? তোমার সারা গায়ে রক্ত! কী হয়েছে? আমি তোমার জন্য খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, তোমার কোনো বিপদ হল কি না।

পুরো ঘটনাটা এরিককে বললাম। আর এও বললাম যে এখানে কোনো প্রেতাত্মা নেই। যা আছে, তার একটাকে আমি মরে পড়ে থাকতে দেখেছি ওই বন্ধ ঘরের সামনে।

—মানে সেটা কী?— মিলন বলে উঠল।

—মাকড়সা। একটা নতুন প্রজাতির মাকড়সা, যার মতো হিংস্র মাকড়সা খুব কমই হয়। যারা হাজারে হাজারে একসঙ্গে ঘোরে। একসঙ্গে শিকার খুঁজে বার করে আক্রমণ করে। যারা এ আইল্যান্ডে আসে ঠিক ২২১ বছর পর পর। তারপরে বিচিত্র কোনো কারণে হয়তো আবার সব মারা যায়।

—কিছুই বুঝলাম না। এ কি নতুন কোনো মাকড়সা! তুমি তো দু-ধরনের মাকড়সার কথা বলেছিলে। এর কথা তো বলোনি?

—হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। এ আইল্যান্ডে দু-ধরনের বিরল প্রজাতির মাকড়সা হত। কিন্তু একটা জন্মাত প্রতি ১৩ বছর পরে পরে, অন্যটা আসত প্রতি ১৭ বছর বাদে বাদে। ১৩ আর ১৭ দুটোই প্রাইম নাম্বার। অর্থাৎ এমনিতে ওই দু-ধরনের মাকড়সা কখনোই একসঙ্গে দেখা যায় না। এরিক ঠিকই বলেছিলেন যে উনি কখনোই ওদের একসঙ্গে দেখেননি। কিন্তু ২২১ বছর বাদে বাদে একটা সময় আসত, যখন ওই দুই মাকড়সার প্রজাতি একই সঙ্গে আসত। যেটা এবারে হয়েছিল। আগেও ক্যাসলের ইতিহাসে দুবার হয়েছে। এই দুই প্রজাতি যখনই একসঙ্গে আসত, এদের মধ্যে প্রজননের বা ইন্টারব্রিডিং-এর জন্য জন্মাত এক নতুন তৃতীয় প্রজাতির মাকড়সা, যাদের মতো হিংস্র মাকড়সা খুব কম হয়। যারা দলে মিলে আক্রমণ করে। খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতে পারে। সেজন্যই দেখলে মনে হত যেন কোনো ছায়াশরীর হঠাৎ করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যাচ্ছে। ধারালো পায়ের সাহায্যে এরা মানবশরীর চিরে টুকরো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। একই সঙ্গে যথেষ্ট বুদ্ধি রাখত।

—তার মানে এমিলির প্রেতাত্মা কোনোদিন ছিল না?— সহেলি বেশ হতাশ হয়ে বলে উঠল।

—না, ছিল না। ছিল শুধু হাজারে হাজারে জন্মানো এক সাংঘাতিক মাকড়সা, যারা একরাতের মধ্যে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখত। আমরা তাই আইল্যান্ড ছেড়েছিলাম সেইরাতেই। আমার ধারণা যে ভুল ছিল না, তা পরে প্রমাণিত হয়েছিল। পুরো আইল্যান্ডকে ওই মাকড়সামুক্ত করতে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সেগুলো কাজও করেছিল। ওই বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা নিয়ে এখন অনেক রিসার্চও হচ্ছে।

আমার ধারণা, অস্কারের মেয়ে উইলমাও আসল কারণটা বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্যেই ওই ল্যাব তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সে ধারণা প্রমাণ করার কোনো উপায় পাননি। কারণ ওরা তখন এই আইল্যান্ডে আর ছিলেন না। ওরা ফিরে আসেন প্রায় পঁচিশ বছর পরে, যখন ওই প্রজাতির মাকড়সারা আর আইল্যান্ডে ছিল না। প্রশ্ন— কেন ছিল না? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে অবশ্য এখনও অপেক্ষা করতে হবে। আশা করি, ওই প্রেতাত্মার কথা ইতিমধ্যেই সুইডেনের ইতিহাসের বই থেকে বাদ পড়ে গেছে। তবে মানুষের মন থেকে যে অত সহজে মুছে যাবে না তা আমি জানি।

আমরা ভয় পেতে চাই। সত্যি বলতে কী অ্যাপেল সাইডার ভিনিগারের বোতলগুলো থেকে ভিনিগার ঢালার সময়ও আমি কিন্তু ওই প্রেতাত্মাকে সত্যি বলে ভাবতে শুরু করেছিলাম। ঘরের বাইরে এসে ওই একটা মৃত মাকড়সা দেখেই প্রথম বুঝতে পারি, বাইরে কারা এসেছিল আর কেন তারা অ্যাপেল সাইডার ঢালার পরে সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। ওতে অ্যাসেটিক অ্যাসিড থাকে, যা মাকড়সারা সহ্য করতে পারে না।

অনিলিখা একটু থেমে ফের বলে উঠল, এর পরেও তোরা বলবি সংখ্যা মানে নিছকই কিছু সংখ্যা!

আমরা সবাই চুপ করে থাকলাম।

তন্ময় শুধু বলে উঠল, ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, আজ এখানে আমরা ঠিক সতেরোজনই আছি। আর আঠেরোটা মাছের কচুরি। তাই একটা আমি আজ বেশি নিলাম।—বলে আমরা ভদ্রতা করে যে শেষ কচুরিটা অনিলিখাদির জন্য রেখে দিয়েছিলাম, সেটা ও তুলে নিল।

৮ এপ্রিল ২০১৯

আরলি, ইংল্যান্ড

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%