অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
প্রথম আলাপ
গোলবাড়ির পাশের মাঠে ফুটবল খেলা হয়। সেখানেই যাচ্ছিলাম। পথে 'দত্যির মাঠ' পড়ল। সন্ধের পর থেকে এই মাঠে আমরা কেউ আসি না। এখানে নাকি বেশ কয়েকবার ব্রহ্মদৈত্য দেখা গেছে। সেই থেকে এই মাঠের নাম 'দত্যির মাঠ'। এখন সেখানে দুপুরবেলায় চড়কের মেলা বসেছে। চারদিকে প্রচুর লোকের ভিড়।
মাটির পুতুলের দোকান, নাগরদোলনা। কোথাও জিলিপি বিক্রি হচ্ছে, কোথাও বেলুন ফাটানোর লক্ষ্য পরীক্ষা হচ্ছে। এসবের মধ্যে হঠাৎ একটা জায়গায় খুব ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
একটা ছোটো ছেলে, আমার থেকেও ছোটোখাটো চেহারা, দুপুর রোদে মাঠের মধ্যে পাগলের মতো দৌড়োচ্ছে। মাথা ভরতি ঝাঁকড়া চুল। চারধার দিয়ে গোল করে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকজন—ছেলে-বুড়ো সবাই ওকে লক্ষ করে বল ছুড়ছে। যেন মারতেই হবে। দু—একজন দুষ্টু-ছেলে আশপাশে পড়ে-থাকা নুড়িপাথরের টুকরোও ওকে লক্ষ করে ছুড়ে মারছে।
কোনো দোষ করেছে ছেলেটা? তা না হলে সবাই এভাবে মারবে কেন? কাছেই বা এগিয়ে যাচ্ছে না কেন?
পরে বুঝলাম এটাও একটা আজব খেলা। যে যে খেলতে চায়, তাদের টাকা দিয়ে বল নিতে হয়েছে। ক্রিকেটের ক্যাম্বিসের বল। কুড়িজন একসঙ্গে খেলতে পারে। সবার তাতে ভারী আগ্রহ।
ছেলেটা অদ্ভুতভাবে সবার ছুড়ে-মারা বল কাটিয়ে, কখনো লাফ দিয়ে বা কখনো মাটিতে শুয়ে পড়ে, কখনো দারুন জোরে ছুটে, স্পিড বাড়িয়ে-কমিয়ে, কখনো বা নানান শারীরিক কসরত করে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে, সেসব এড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ যে এরকম করতে পারে তা না দেখলে ভাবা যায় না। মনে হয় যেন খুব বড়ো কোনো জিমন্যাস্ট খেলা দেখাচ্ছে। প্রায় দশ মিনিট বাদে যখন সবার বল ফুরিয়ে গেল, তখন ও থামল। একজনও ওর গায়ে বল দিয়ে মারতে পারেনি। যদি কোনো একজন মারতে পারত, তাহলে ওকে সবার টাকা ফেরত দিয়ে দিতে হত।
সবাই হাততালি দিচ্ছিল। বিশেষ করে যারা বল ছোড়েনি।
যারা যারা খেলা দেখছিল, তারাও কিছু কিছু টাকা দিচ্ছে। ছেলেটা ও একটা লোক সবার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করছে। আমার কাছে একটা কুড়ি পয়সা ছিল। হজমি খাব বলে রেখে দিয়েছিলাম। এত ভালো লেগেছিল যে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে দিলাম। আমার বয়সি বা আমার থেকেও কিছুটা ছোটো হবে হয়তো। আমার তখন দশ বছর বয়স।
কথা হয় নি সেদিন।
সেই আমার প্রথম দেখা ঋককে। তখনই যেন মনে হয়েছিল ও বাকি সবার থেকে আলাদা। অন্যরকম। ওর মধ্যে এমন কিছু ক্ষমতা আছে, যা আর কারো মধ্যে নেই।
একসঙ্গে স্কুলে
এর প্রায় এক বছর বাদে আবার হঠাৎ করে দেখা। আমাদের স্কুলে ক্লাস সিক্সেও ভরতি হয়েছিল। প্রথমে অবশ্য আমি চিনতে পারিনি।
একটা দিনই তো দেখা।
প্রথম দিনে আমার পাশে এসে বেঞ্চিতে বসেছিল। আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে আমাকে বেশ অবাক করে বলে উঠল, মনে পড়ে? আমার খেলা দেখে তুমি আমায় কুড়ি পয়সা দিয়েছিলে।
ও আরেকটু মনে করাতে খেয়াল করতে পারলাম। সেদিনের সেই মেলার ছেলেটা। সে এখানে কী করছে? চোখে-মুখে সেদিনের মতোই সারল্য। গভীর চোখে অজস্র প্রশ্ন।
আমি একটু লজ্জা পেয়ে বলে উঠলাম, আমার কাছে তো আর টাকা ছিল না।
ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না, না, আমি সেজন্য বলিনি। কুড়ি পয়সাই বা ক-জন দেয়।
—তুমি এখনও খেলা দেখাও?
—হ্যাঁ, তা না হলে আমাদের চলবে কী করে?— খুবসহজ ভাবে বলল ও।
—কিন্তু তোমার মেমারি তো খুব ভালো? কী করে মনে থাকল, আমি কী দিয়েছিলাম? কতদিন আগের কথা!
ও বলে উঠল, আমার সব মনে থাকে। আপনা থেকেই। সেজন্যেই লাইব্রেরিদাদু এখানে পড়তে আসতে বলল।
—তোমার নাম কী?
—ঋক।
ওর থেকেই শুনলাম, এর আগে ও নাকি স্কুলেই পড়েনি। বাড়িতে পড়াশোনাও করেনি। লাইব্রেরিতে গিয়ে রোজ নানান বই ওলটাত। কিছুদিন আগে আমাদের গ্রামের লাইব্রেরিয়ান মোহিতকাকু নাকি ওকে স্কুলে ভরতি হতে বলেন। আর তারপরেই এখানে এসে ভরতি হয়।
—কিন্তু একেবারে ক্লাস সিক্সে ভরতি! পারবে?
ও খুব সরল চোখে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলে উঠল, চেষ্টা করব। তুমি না হয় আমাকে বলে দেবে, কী করতে হবে। আমাদের বাড়ির কেউ আগে স্কুলে পড়েনি। মা বলল, বেঞ্চির উপরে বসে হাতে বই নিলে নাকি বুদ্ধি খুলে যায়।
খুব অবাক হয়েছিল শুনে।
জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে কী, তোমার বাবা-মা-ও স্কুলে পড়তে বলেনি?
ও বলে উঠল, বাবা নেই। অনেকদিন মারা গেছে। মা আছে। তবে ওরাও কেউ পড়েনি। ওদের স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হত না। তাই জানেও না ঠিক স্কুলে কী হয়!
এরকমও কেউ থাকে, যারা জানে না স্কুলে কী হয়।
এখানে বলে রাখি, আমি যেখানে থাকতাম, সেটা খুব বড়ো শহর ছিল না। বজ্রধরপুর মফসসল শহর। বেশির ভাগ লোকজনই কলকাতায় কাজ করতে যায়। তা ছাড়া এখানে বেশ কিছু ছোটো লোহালক্কড়ের কারখানা আছে। সেখানেও বেশ কিছু লোক কাজ করে।
এখানে আমাদের দুটো স্কুল আছে। এটা ছেলেদের। আরেকটা মেয়েদের স্কুল আছে। ভালোই রেজাল্ট হয় এই দুটো স্কুল থেকে।
কিছুদিন বাদেই বুঝলাম ও অসম্ভব মেধাবী। আমি ওকে দেখাব কী, ও ই আমাকে দেখিয়ে দেয়। তবে ক্লাসে খুব কম কথা বলে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিচারদের প্রত্যেকটা কথা শব্দ শুনতে থাকে। আর শুরু থেকে শেষ কী কী বলেছে, সব মনে রেখে দিতে পারে।
অন্যদের সঙ্গে মেশে না তেমন। যেন ইচ্ছে করেই সবার থেকে দূরে সরে থাকে। হয়তো অন্যদের দিক থেকেও খানিকটা একই রকম প্রবণতা ছিল ওকে এড়িয়ে চলার।
এমনকী আমাদের সঙ্গে খেলাধুলোও করে না তেমন। স্কুল শেষের পরেই বাড়ি চলে যায়। সারাক্ষণ একটা ছোটো চামড়ার স্যুটকেস নিয়ে ঘোরে। অনেকেই হাসাহাসি করে ওটা দেখে। আমি একবার জিজ্ঞেস করতে কোনো দ্বিধা না করেই বলেছিল যে ওর মা নাকি কোনো জঞ্জালের স্তূপে খুঁজে পেয়েছিল ব্যাগটা।
শুধু আমার সঙ্গেই যা একটু কথা বলত। সব কথার স্পষ্ট উত্তর দিত। সে উত্তর শুনে আমি যতই অবাক হই-না কেন।
সবাই কেন ওকে এড়িয়ে চলে, সে কারণটা অবশ্য পরে বুঝেছিলাম।
একটু একটু করে বন্ধু হয়ে ওঠা
আমাদের এই বজ্রধরপুরে নানান ধরনের লোক থাকে। খুব বড়োলোকও যেমন আছে, তেমনই বেশ খারাপ অবস্থা—সেরকম লোকও আছে। তাদের ছেলেরাও এই স্কুলে পড়ে। আমরা সবাই একসঙ্গে মিশি, গল্প করি। কে কোন পরিবার থেকে এসেছে, কীরকম অবস্থা, সেসব আমরা কেউ জানি না।
কিন্তু তারপরেও প্রথম দিন থেকেই যেটা আমাকে অবাক করত, তা হল ঋকের সঙ্গে কেন জানি কেউ কথা বলে না। এড়িয়ে যায়। আর ও লাস্ট বেঞ্চির এককোণে গিয়ে বসে। আমি ছাড়া পাশে কেউ বসে না।
সুবোধ একদিন বলেছিল আমাকে, খবরদার ওর পাশে গিয়ে বসিস না। খুব নোংরা ওরা। ওরা কী করে, জানিস?
—কী আবার করে? তাতে আমার কী এসে যায়?
—এসে যায়। ওরা মেথর। নর্দমা, বাথরুম, পায়খানা পরিষ্কার করে। ভাবতে পারিস। ইসস, ছি! তোর গায়েও পাঁকের গন্ধ হয়ে যাবে।
আমি সেদিন থেকেই আরও ইচ্ছে করে ওর পাশে গিয়ে বসতে শুরু করলাম। কেন জানি, আমার খুব খারাপ লাগত ওর কথা ভেবে। একটা লাস্ট বেঞ্চির এককোণ ঘেঁষে বসত। মনে হত, ওর যেন অন্যদের কাছে কোনো অস্তিত্বই নেই।
এমনকী যখন টিফিন হত বা স্কুল শেষ হত, ও একা একাই থাকত। আমাকেও জোর করে ওর সঙ্গে কথা বলতে হত। তখন আমরা দুজনে বসে গল্প করতাম।
অনেক সময় বেশ বুঝতে পারতাম, ও শুধু সুবোধের কাছে নয়, অনেকের কাছেই অস্পৃশ্য। এটা নিয়ে অবশ্য ওর কোনো আপত্তি ছিল না। যেন মেনেই নিয়েছিল। তবে দু-একজন শিক্ষক ছাড়া সবাই ওকে ওর শান্ত-ভদ্র স্বভাবের জন্য স্নেহ করত, ভালোবাসত।
তবে সবাই সমান ছিলেন না। স্কুলে যখন সরস্বতীপুজো হল, তখন পুজোর দায়িত্বে ছিলেন আমাদের অঙ্কের শিক্ষক বিধুবাবু। উনি ওকে ডেকে বলেই দিলেন পুজোর ঘরে না ঢুকতে। আমার শুনে এমন রাগ হয়েছিল, আমিও সেবার সরস্বতীপুজোয় যাইনি।
একবার ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওর চোখ ছলছল করে উঠেছিল। শুধু বলেছিল, ওর বাবা বেশ কয়েক বছর হল মারা গেছে।
কীভাবে জিজ্ঞেস করতে ও আর কিছু বলল না।
কিন্তু সেটা জেনেছিলাম দীপ্তেশের কাছ থেকে। একবার ওদের বস্তির কয়েকজনের সঙ্গে এখানকারই এক ক্ষমতাশালী পরিবারের বড়োরকম গণ্ডগোল হয়। তারা ফ্যাক্টরিতে টাকা বাড়ানোর দাবি করছিল।
ওরা নাকি নিচু জাত দলিত হওয়ার জন্য এমনিতেই ওদের উপরে রাগ ছিল। এসব নিয়ে গণ্ডগোল শুরু হয়। ঋকের বাবার সঙ্গে নয়, কিন্তু ওখানকার অন্য কয়েকজনের সঙ্গে।
শেষে বস্তিতে গুন্ডা দিয়ে আগুন যখন লাগানোর চেষ্টা করা হয়, তখন ওর বাবা বাধা দিয়েছিল। তখনই ওরা বাবাকে খুব মারে। আরও দুজনকে মেরেছিল। তিনজনই বাঁচেনি। পুলিশের তদন্তে শেষ অব্দি কেউই ধরা পড়েনি।
কেন জানি, এটা জানার পর থেকেই ঋক আমার আরও আপনার হয়ে উঠেছিল। মনে হত, ওর আর ওর পরিবারের প্রতি যত অন্যায়-অবিচার হয়েছে, সেসব ভুলিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব যেন আমার। এটা আমি জোর করে করতাম না। আপনা থেকেই হত।
ওর এত বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম বলেই, ওর কিছু কিছু অন্য ক্ষমতার পরিচয় পাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে।
একদিন দেখি, বোর্ডে লেখা কয়েকটা নাম্বার দেখে খাতায় কী সব ছবি আঁকছে। আমাকে দেখিয়ে ও যা বলছিল তা শুনে আমি একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ও নাকি প্রত্যেকটা নাম্বারকে ছেলে বা মেয়ে হিসেবে দেখতে পায়। আবার বাংলা ও ইংরেজি শব্দের বিভিন্ন অক্ষরকে রং হিসেবে দেখে। কোনোটাকে লাল দেখে, তো কোনোটা নীল, কোনোটা সবুজ। সেজন্যে ওর কাছে কোনো সংখ্যা বা কোনো বাক্য আসলে নানান রঙের নানান রকমের মানুষের মিছিল। কোনোটা আমার মতো তো কোনোটা সুবোধের মতো।
সেভাবে দেখে বলেই কি না জানি না, সবকিছু এত সহজে ওর মনে থাকে। ওর এই অসম্ভব স্মৃতিশক্তির পরিচয় আমি আগেই পেয়েছিলাম। সে নিয়ে নানান মজার খেলাও খেলতাম নিজেদের মধ্যে। তবে আমার মনে হত, আমি যেমন মনে রাখতে চাই, ও অনেক কিছু জোর করে ভুলতে চায়।
ঋকের আশ্চর্য ক্ষমতা
আমাদের থেকে দু-ক্লাস উপরে পড়ত বাবলুদা। খুব খারাপ ছেলে। গায়ে খুব জোর, কিন্তু বুদ্ধি কম, যেটুকু আছে তা হল দুর্বুদ্ধি। সবার উপরে সারাক্ষণ মাতব্বরি, খবরদারি, গুন্ডামি করে বেড়াত। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নানানরকম বদমায়েশি, নেশা করে বেড়াত।
এখানকার এক বড়োনেতার ছেলে হওয়ায় ওর বিরুদ্ধে কেউ কিছু করারও সাহস পেত না।
এমনকী শিক্ষকরাও ওকে একটু ভয় পেত। একবার কোনো টিচার ওকে ক্লাসে বকায়, সে টিচারকে নাকি সবার সামনে হুমকি দিয়েছিল। তার দশ দিন বাদে সেই টিচারকে স্কুলে যাওয়ার পথে দুজন লোক বেদম পিটিয়ে একটা পা ভেঙে দিয়েছিল। শোনা যায়, তাদের নাকি বাবলুদা ভাড়া করেছিল।
একদিন আমি ও ঋক স্কুলে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি, বাবলুদা আর ওর দুই বন্ধু একটা কুকুরের বাচ্চা ধরে একটা গর্তের মধ্যে ফেলে তাকে ধারালো একটা লোহার শিক দিয়ে খোঁচাচ্ছে। কুকুরের বাচ্চাটা যন্ত্রণায় কেঁউ কেঁউ করে চেঁচাচ্ছে। আর ওরা আনন্দ পাচ্ছে সেটা দেখে। কিছু দূরে আরও দুটো ছোটো কুকুরের বাচ্চা রক্তাক্ত হয়ে মরে পড়ে আছে। মনে হয়, ওরাই মজার জন্যে মেরেছে।
ঋক এগিয়ে গিয়ে কী যেন বলল বাবলুদাদের। তারপর হঠাৎ করে কুকুরের বাচ্চাটাকে নিয়ে ছুটে পালাল। ওরা ছুটল ওর পিছু পিছু। আমিও ছুটলাম। দেখি, কিছু দূরে গিয়ে ওকে ওরা ধরে ফেলেছে। যদিও কুকুরের বাচ্চাটাকে ওর হাতে দেখলাম না। কোথায় চলে গেছে।
পরক্ষণেই দেখি, ওরা তিনজন মিলে ঋকের উপরে সাংঘাতিকরকম খেপে গিয়ে চড়থাপ্পড় মারতে শুরু করল। বাবলু হঠাৎ এর মধ্যে ওর মুখ লক্ষ্য করে একটা ঘুসি মারল। ও মাটিতে পড়ে গেল। এমনভাবে কেন মারল, বুঝতে পারলাম না!
আমি ছুটে গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম, বললাম, সব কথা টিচারদের বলে দেব। বলার পর দেখি, আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ওরা বেরিয়ে গেল। ওরাও বোধহয় ঋকের অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল, অজ্ঞান হয়ে গেছে বা মারা গেছে।
দেখি, ঋক মাটিতে পড়ে আছে। জামা ছিঁড়ে গেছে।
আমার গায়ে অত জোর নেই, তা না হলে আমার ইচ্ছে করছিল, ওদের গিয়ে মারি।
ওরা চলে যাওয়ার পরে ঋক আস্তে আস্তে উঠে বসল।
দেখি, ঋকের ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। ওর যে একটামাত্র স্কুলের জামা, সেটাও ছিঁড়ে গেছে।
—বললাম, তুই এত জোরে ছুটিস, পারলি না পালাতে?
ও এর মধ্যেই হেসে বলে উঠল, সে তো শুধু খেলা দেখানোর সময়।
—মানে?
—সব সময় ওসব দেখাতে নেই।
ওর কথা কিছুই বুঝলাম না।
কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে শুধু বাবলু নয়, অনেকেই ওকে নানান কারণে-অকারণে ঘৃণা করে। হয়তো ওরাও ওদের বাবা-মা-র কাছ থেকে এটাই শিখেছে যে ওর সঙ্গে মিশতে নেই। সেটার জন্যই ওরা ওকে এতদূরে সরিয়ে রাখে।
এই স্কুলে ওর মতো আগে কেউ পড়েনি।
এর কয়েক মাস বাদে আরেকটা কাণ্ড হল ঋককে নিয়ে। ও ব্রতীনের টিফিনের খাবার চুরি করে খেয়েছিল। এরকম অনেকেই করে। ব্রতীনের বাবার খুব বড়ো ব্যাবসা। চাল ও আরও অনেক কিছু বিদেশে পাঠায়। অনেক টাকা। ব্রতীনের দেমাক সেজন্য এমনিতেই বেশি। নানান ধরনের খাবার নিয়ে আসে। ও যা খেতে পারে, তার থেকে অনেক বেশি।
যা-ই হোক, ও গিয়ে নালিশ করল হেডস্যারের কাছে। ঋকের ডাক পড়ল। ঋকটা এমন হাঁদা-একবারে স্বীকারও করে নিয়েছিল। নাকি খিদে পেয়েছিল বলে খেয়েছে।
এমনিতে এটা হয়তো খুব বড়ো কিছু ব্যাপার নয়, আমরা অনেকেই এর ওর থেকেখেয়ে থাকি। কিন্তু ও ছোট জাতের বলে এটা নিয়ে সেবারে খুব বড় গণ্ডগোল হয়েছিল। পরের দিন ব্রতীনের বাবা স্কুলে চলে এল।
কিছুক্ষণ বাদে ঋকের ডাক পড়ল। যখন ও বেরোল হেডস্যারের ঘর থেকে, ওর মুখ-চোখ দেখে বুঝলাম, বেশ ভালোরকম বকা খেয়েছে। হেডস্যার বলেছেন, এরকম আবার হলে ওকে স্কুল থেকে বার করে দেওয়া হবে।
আমাকে এসে বলল, না, আমার এটা করা উচিত হয়নি। ওরা স্যারকেও খুব খারাপ খারাপ কথা বলল, আমাকে এই স্কুলে ভরতি করার জন্য। আমাকে দেখিয়ে বলছিল, আমার মতো নিচু জাতের লোকেদের নাকি এখানে পড়তে দিয়ে স্কুলের মান খারাপ করে দিয়েছেন হেডস্যার।
—কিন্তু তুই খেলি কেন চুরি করে?
ও দেখি অম্লানবদনে বলে উঠল, সে তো আমি আগেও অন্যদের থেকে খেয়েছি। তন্ময়, অর্ণব, প্রতীকের থেকে। আসলে যেকোনো খাবার দেখলে আমার খিদেটা খুব বেড়ে যায়। আর করব না। আর হেডস্যারের কাছেও ক্ষমা চেয়ে আসব।
আমি ওকে থামালাম, চুপ চুপ। এ কথা আর কাউকে বলতে হবে না।
কিছুদিন বাদে আমাদের স্কুলে বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল। আমার খেলাধুলো খুব ভালো লাগে। যদিও কোনোটাতেই আমি ভালো নই। আমি দৌড়ে, লং জাম্পে নাম দিলাম। ভেবেছিলাম, ঋক নাম দেবে। আমি সেইদিনের কথা এখনও ভুলিনি। কীভাবে সবার ছোঁড়া বল এড়িয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছিল। নিশ্চয়ই ও খুব ভালো ছুটবে।
কিন্তু ও দেখি, কিছুতেই কোনো প্রতিযোগিতায় নাম দিল না। জিজ্ঞেস করতে বলল, ভালো লাগে না।
কিন্তু মনে হল না ঠিক বলছে। দেখি, স্পোর্টসের দিন পুরোটা সময় বসে খুব আগ্রহ নিয়ে সব ইভেন্ট দেখল। খুব উৎসাহ।
আমাদের ক্লাসের সৌমিত বলে একটা ছেলে লং জাম্পে খুব ভালো। সে এমন লাফ দিল যে স্পোর্টসের টিচার রমাপদবাবু পর্যন্ত এসে জড়িয়ে ধরলেন। শুনলাম, স্কুলের বহু দিনের লং জাম্পের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
পরের দিন স্কুল-ফেরত বাড়ি যাওয়ার পথে দেখি, ঋক ওখানে একা লাফ দেওয়া প্র্যাকটিস করছে। আমি হেসে বললাম, কী রে, কাল সাহস হল না, আর আজ প্র্যাকটিস করে কী লাভ!
ও হেসে বলে উঠল, আমি আসলে এতে অংশগ্রহণ করলে অন্য কেউ কিছু পেত না। সেজন্যে করিনি।
কথাটা মনে হল, মজা করেই বলছে।
—লাফ দিয়ে দেখাব?
পরক্ষণেই আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ও ছুটে এসে গতকাল সৌমিত যা লাফ দিয়েছিল, তার প্রায় দু-গুণ দূরত্ব লাফ দিল।
আমার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেউ যে ওরকম লাফ দিতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। বলে উঠলাম, তোর তো ভারতের হয়ে লাফানো উচিত। তুই ভারতের হয়ে লাফালে একটা গোল্ড মেডেল ভারত পেয়ে যেত।
ও বলে উঠল, আমার কেন জানি, এরকম প্রতিযোগিতা ভালো লাগে না। আমার মতো যারা আছে, তাদের এমনিতে শুধু বেঁচে থাকার জন্যই রোজকার কত প্রতিযোগিতা, তা-ই না! তার উপরে আবার অন্য প্রতিযোগিতা ভালো লাগে!
আমি সেদিন না বুঝলেও পরে অবশ্য কারণটা বুঝেছিলাম। ও যেন ওর সব ক্ষমতা লুকিয়ে রেখে আমাদের মতো সাধারণ হয়ে উঠতে চায়। ওর এই অসাধারণ ক্ষমতাগুলো শুধু আমার চোখেই ধরা পড়ত। আমি সেটা কারো কাছে প্রকাশ করতাম না। কে জানে, ওর অবস্থাও হয়তো এর জন্য ওর বাবার মতো হতে পারে।
আমি যখন ক্লাস নাইনে, তখন আমার দিদির বিয়ে হল। বাড়ির সামান্য আপত্তি সত্ত্বেও আমি ওকে বিয়েতে আসতে বলেছিলাম। ও এসেছিল। হয়তো ছোটো বলেই তখনও এতটা বুঝিনি। সেদিন আমি বুঝেছিলাম যে ওকে ডেকে আমি ভুল করেছি। আমাদের সমাজ খুব জটিল। আমাদের মফসসল শহর খুব বড়ো জায়গা নয়। সবাই একে অপরকে চেনে। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের মধ্যেও বুঝতে পারছিলাম যে, ও যে আমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির মধ্যে সব জায়গায় যাচ্ছে, এটাতে যেন অনেকের একটা অলিখিত আপত্তি আছে। ও যেন এই সমাজে আমাদের সঙ্গে মেশারই উপযুক্ত নয়। সবাই যেভাবে ওকে দেখছিল, তাতে আমারই একরকম অপরাধবোধ হচ্ছিল।
কিন্তু সেদিনই ওর আরেকটা ক্ষমতার পরিচয় পেলাম। সেদিন ওই অনুষ্ঠানে আমার বাবার এক বন্ধুকে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করল, কে হয় রে তোদের?
বললাম আমার বাবার বন্ধু। ব্যাঙ্কে একসঙ্গে কাজ করে।
—তুই তোর বাবাকে সাবধান করে দিস, লোকটা কিন্তু ভালো নয়।
আমি হেসে বলে উঠলাম, তুই কি মুখ দেখে সব বুঝতে পেরে যাস? উনি বাবার ব্যাঙ্কে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। খুব বড়ো অফিসার। ব্যাঙ্কে খারাপ লোক হলে কাজ করতে পারে না।
—কেন জানি, খারাপ লোকেদের আমি ঠিক বুঝতে পারি। কীরকম যেন একটা অন্য রকমের গন্ধ পাই, তারা কাছে এলে। সেই গন্ধ সব লোকের মধ্যেই কম-বেশি থাকে। এই লোকটার থেকে সেরকম একটা জোরালো গন্ধ পাচ্ছি। মনে হয় বেশ খারাপ।
আমি হেসে উঠেছিলাম। কিন্তু কথাটা যে সত্যি, তার পরিচয় পেলাম এক মাস পরে। হঠাৎ বাবার ওই বন্ধুকে পুলিশ ধরেছে। আরও কয়েকজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কী একটা বড়ো রকমের অপরাধ করেছে ওই কাকু। অনেক গ্রাহকের ফিক্সড ডিপোজিটের টাকা চুরি করেছে। বাবা কিছুই জানত না।
আমি তখন ঋককে ফের জিজ্ঞেস করেছিলাম এ ব্যাপারে। ও খুব সহজ ভাবেই বলে উঠল, খুব ভালো বোঝা যায়। আমি যখন মেলায় তোকে দেখেছিলাম, তখনই জানতাম তুই খুব ভালো। এসব খুব সোজা ব্যাপার বোঝা। শুধু গন্ধটাকে ঠিকভাবে পেতে হয়। কেউ সেন্ট মাখলে ওই গন্ধটা আর পাওয়া যায় না।
অন্য স্কুলে
আমার বাবার ব্যাঙ্কের বদলির চাকরি। ক্লাস টেনে থাকতেই হঠাৎ বদলি হয়ে যেতে হল একটা বড়ো শহরে। তারপরে আরেক শহরে।
খুব খারাপ লেগেছিল ঋককে ছেড়ে যেতে। মনে হচ্ছিল আমাকে ছাড়া ওর পক্ষে এই সমাজে টিঁকে থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না।
যাওয়ার কয়েকদিন আগে ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। ও নিয়ে যেতে চাইছিল না। বলছিল, ওখানে গেলে তোর খুব খারাপ লাগবে। আমরা যেখানে থাকি— খুব নোংরা। বিশ্রী গন্ধ।
আমি বললাম, কিন্তু জায়গাটা দেখে তো রাখতে হবে। ফিরে এসে তোকে তা না হলে খুঁজে বার করব কী করে!
শেষে ও রাজি হল। ওর সঙ্গে গেলাম।
শহরের একদম বাইরের দিকে একটা ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। কিছু দূরে নোংরা ফেলার ধাবার মাঠ। মনে হয়, শহরের সব বর্জ্যপদার্থ যেন সেখানে এসে জড়ো হয়েছে। তার পাশ দিয়ে সরু সরু অলিগলি। অনেক বাচ্চা ছেলে-মেয়ের ভিড়। মনে হয়, কেউই পড়াশোনা করে না। ঋক ব্যতিক্রম।
ওখানে ঢোকামাত্র ঋক যেন একেবারে পালটে গেলো। হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল। বুঝলাম, স্কুলে—এ জায়গার বাইরে ও সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকে। এখানে সবাই ওকে দেখে এগিয়ে আসছে, কথা বলছে। বাচ্চারা ওকে খেলতে ডাকছে। সবাইকে ডেকে ডেকে ঋক আমার পরিচয় করাচ্ছিল ওর বন্ধু বলে।
আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন অন্য কোনো গ্রহের জীব। ভুল করে এসে পড়েছি এখানে। আমার মতো কাউকে আগে ওরা এখানে আসতে দেখেনি। ঋকেরা একটা মাটির ঘরে থাকে।
ঘরে ঢুকে নিচে মাটিতে বসেই গল্প হল। ওর মা আর বোনও থাকে ওর সঙ্গে। আমি কিছুক্ষণ কথা বলেই বুঝলাম এ যেন এক অন্য পৃথিবী, আমার গ্রহের থেকে অনেক অনেক দূরে। প্রায় দু-ঘণ্টা ছিলাম ওখানে।
আমি যেদিন চলে যাচ্ছি শহর ছেড়ে, সেদিনও ঋক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। গাড়ি ছাড়া পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। কান্নায় বুজে আসছিল আমার গলা—আমার সব থেকে বড়ো বন্ধুকে ছেড়ে যাওয়া। ওরও তা-ই, বুঝলাম, ওর মধ্যে যত বড়ো ক্ষমতাই থাকুক-না কেন, ও কান্না চাপতে শেখেনি।
ধরা গলায় আমার হাত জড়িয়ে শুধু বলে উঠল, আমি ঠিক খুঁজে পেয়ে যাব তোকে। খুব ভালো থাকিস।
বেশ কয়েক বছর পরের কথা
ঋকের সঙ্গে ফের দেখা
আজ সকালে কাগজটা খুলে আবার মন খারাপ হয়ে গেল। সরকারি চাকরির যে পরীক্ষা আগামী মাসে হওয়ার কথা ছিল, সেটা আবার ছয় মাস পিছিয়ে গেছে। এতদিন ধরে প্রিপেয়ার করছিলাম। আগেও একবার আট মাস পিছিয়ে গিয়েছিল। আবারও পিছিয়ে গেল।
দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল। মাস্টার্স করার পরে একের পর সরকারি পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করছি। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা এত দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ, চারদিকে এত দুর্নীতি যে এখন মনে হচ্ছে, শুধু পড়াশোনা করে এই পরীক্ষায় সাফল্য কোনোদিন আসবে না। শুধু যে পরীক্ষাই ইচ্ছেমতো পিছিয়ে যায় তা-ই নয়, পরীক্ষার উপরেও অনেক কিছু নির্ভর করে না। চার বছর আগে যারা কোনো পরীক্ষা দিয়েছে, তাদেরই পুরো প্রসেস এখনও কমপ্লিট হয়নি।
এসব ভেবে এখন আর তাই কারো উপরে রাগ হয় না, মাঝেমধ্যে শুধু বুকের মধ্যে জমাট-বাঁধা চাপা কান্নাটা বেরিয়ে আসতে চায়, যখন এই পথের শেষ কোথায়, তার সন্ধান পাই না। মনে হয়, পুরো জীবনটাই এভাবে চাকরির আশায় কেটে যাবে।
এসব সরকারি পরীক্ষায় নানানরকম অনিয়মের কথা প্রায়শই শুনি। অনেকে অন্যায়ভাবে টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে এরকম কথাও প্রায়শই শোনা যায়। র্যাঙ্ক অনুযায়ী যাদের পাওয়ার কথা, তাদের জায়গায় অন্যরা পেয়েছে। এরকম অনেক তথ্য গত কয়েক মাসে সামনে এসেছে।
আমাদের সংসার বাবার পেনশনেই কোনোমতে চলে। আমার এক বন্ধুর মুখে গতকাল শুনলাম, এসবের প্রতিবাদে কিছু ছেলে-মেয়ে শহরের একটা জায়গায় জমায়েত হবে। আমাকে সে যেতে বলল। আমিও গেলাম সেখানে প্রতিবাদ জানাতে।
গিয়ে দেখি, অনেক ছাত্রছাত্রী জমায়েত হয়েছে শহরের কেন্দ্রে। সবাই আমার মতো। বছরের পর বছর চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেকে বেশ কয়েক মাস ধরে এখানে প্রতিবাদে আছে। সারাদিন বেশ গরম ছিল। তার মধ্যেই সারাদিন ওখানে বসে ছিলাম।
বিকেলে হঠাৎ করে ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। সারাদিন খাওয়া নেই। শরীর এই গরমে রোদে খারাপ লাগছিল। উঠে পড়লাম। আমার মনে হয় না এই প্রতিবাদে কিছু হবে। অন্যদের কারো কিছু এসে যায় না।
ফিরছি, হঠাৎ দেখি, দূর থেকে কে যেন ডেকে উঠল—পার্থ।
যেদিক থেকে ডাক এল, সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, একটা রোগা ছোটোখাটো চেহারার লোক আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল। কাঁধ অব্দি ঝাঁকড়া চুল। ঋক।
এত আনন্দ বহুদিন পাইনি। ঋক। কিছুটা পরিবর্তন হলেও একবার দেখলেই চেনা যায়। আমার হাত ধরে সেই আগের ছেলেমানুষি ভাবের সঙ্গেই বলে উঠল, চল, আমার বাড়িতে যেতেই হবে।
—না, না। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। তার উপরে আজ এরকম ঝড়বৃষ্টি। বাড়িতেও চিন্তা করবে।
—ঠিক আছে। তাহলে অন্য একদিন আসতেই হবে। আজকের জন্য তোকে ছেড়ে দিলাম। আজ এখানে কাছাকাছি কোথাও খেতে যাই। তোর বেশ খিদে পেয়েছে, বেশ বুঝতে পারছি। আমার কাছে টাকা আছে।
বুঝলাম, ও ঠিক আগের মতোই সহজ সরল আছে।
আমরা দুজনে কাছের একটা মাঝারি মানের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম।
শুনলাম, ও এক বছর হল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটা নামকরা আই. টি. কোম্পানিতে কাজ করতে ঢুকেছে। মা-র সঙ্গে থাকে।
আমার সরকারি চাকরি চেষ্টার সব কথা শুনে বলল, তুই আর ক-বছর এসব চাকরির অপেক্ষায় থাকবি? অন্য কিছু করার চেষ্টা কর।
—সবাই তোর মতো সবকিছু পারে না। আমি খুব সাধারণ। তা ছাড়া এত পরিশ্রম করেছি গত চার বছর ধরে এসব পরীক্ষার পিছনে, এখন মনে হয়, ছেড়ে দিলে সব চেষ্টাই জলে যাবে।
—তুই না হয় ব্যাবসা কর।
—চাইলেই কি আর করা যায়! তোর কি আমাকে দেখে মনে হয় যে আমি ব্যাবসা করতে পারব? ভেবেছিলাম, এই সরকারি স্কুলে শিক্ষকের চাকরিটা পাব। বছরের পর বছর চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু খবর তো দেখছিসই। সব ব্যাপারে দুর্নীতি। কতজনের জীবন যে এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কে জানে। আমার কথা ভেবে ভেবে বাবা-মা-র শরীর খারাপ হয়ে গেছে।
—ওদের শরীর খারাপ?
—বাবা ব্রেন স্ট্রোকের পর থেকেই শয্যাশায়ী। মা-র মাঝেমধ্যে খুব জ্বর আসে। খুব রোগা হয়ে গেছে। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কেউ ঠিক অসুখটা ধরতে পারছে না।
আমি একটু থেমে ফের বলে উঠলাম,— মাঝেমধ্যে আমার খুব রাগ হয় জানিস। মনে হয় যদি এসব দপ্তরের দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের হাতের কাছে পেতাম। সবকিছু টাকা দিয়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, শিক্ষা, যোগ্যতার কোনো দামই নেই। আমি যেন একটা কানাগলির মধ্যে আটকে গেছি। বেরোনোর পথ পাচ্ছি না।
—এদের বিরুদ্ধে কিছু করা অত সহজ নয়। ওসব ভুলে যা। এসব ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে-থাকা লোকেদের বিরুদ্ধে তুই কিছু করতে পারবি না।
—তা আমার কথা ছাড়, তোর বাড়ির খবর কী বল। তোর বোনের কি বিয়ে হয়ে গেছে?
ও দেখি, চুপ করে আছে। খানিক বাদে বলে উঠল, গত বছরে আমার বোন কলেজ থেকে ফিরছিল। একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। আমি অনেক দেরি দেখে খুঁজতে বেরিয়ে কোনো খবর পেলাম না। থানায় জানালাম। পরের দিন ভোরে খবর পেলাম। আমার বোনের দেহ কাছাকাছি এক নালায় পাওয়া গেছে। পরে জানা গিয়েছিল—
ও আর কিছু বলল না। আমার বুঝতে অসুবিধে হল না কী হয়েছিল। ওর চোখে যেন একটা আগুন জ্বলে উঠে নিভে গেল।
—পুলিশ এসবের পিছনে যারা ছিল, তাদের কাউকে ধরতে পারেনি?
—শুনেছিলাম, একদল ছেলে একটা নাইট ক্লাব থেকে মদ্যপ হয়ে ফিরছিল। পথে ওকে দেখে ওকে উত্তক্ত করতে শুরু করে। তারপরে ওদের গাড়িতে তুলে নেয়। বেশ কয়েকজন দেখেছিল। কিন্তু কেউ বাধা দিতে সাহস করেনি। লোকাল এক নেতা ইনভলভড ছিল। সেজন্য সাক্ষ্য দেওয়ার লোকও পাওয়া যায়নি।
এসব কথা বলার সময়ে মনে হল, আমাদের পাশের টেবিলে একজন লোক যেন আমাদের কথা শুনছে। লোকটা কে জানে! দুজনেই চুপ করে গেলাম। আমরা বড়ো বেশি সাধারণ। সবেতেই ভয় পাই।
আমরা দুজনেই খাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল একটা কিছু করা দরকার। বেশির ভাগ লোক চুপ করে অন্যায় মেনে নেয় বলেই আজ এই অবস্থা।
দেখলাম ওর চোখে জল। আমি ওকে বলে উঠলাম, চল, ওঠা যাক।
উঠতে যাব, দেখি, পাশের টেবিলে বসে-থাকা লোকটা আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে উঠল, কতদিন আর পালিয়ে বেড়াবে নিজেদের থেকে? তোমরা চুপ বলেই শুধু ওদের কথা, খারাপ লোকেদের কথা শোনা যায়।
লোকটা এরপরে আর কোনো কথা না বলে উঠে বেরিয়ে গেল। গায়ের রং বেশ কালো, ছোটোখাটো চেহারা।
আমি বলে উঠলাম, কে লোকটা, চিনিস? পাগল মনে হয়।
—হ্যাঁ, চিনি। হয়তো আমাদের মতো সাধারণ নয় বলেই পাগল লাগছে। আমাদের মধ্যেই থাকে লোকটা। লুকিয়ে থাকে। খুঁজে পাওয়া যায় না।
অজামিল
আজ মন খারাপ সুচিত্রাদেবীর। আজ ওর একমাত্র ছেলের জন্মদিন। কতদিন ছেলেকে দেখেননি। ছেলে আমেরিকায় থাকে। অনেক বয়স হয়েছে ওর। গত বছর আশি পেরিয়েছে। স্বামী মারা গেছেন বহুদিন। সকাল থেকে মোবাইল ফোনটার যে কী হয়েছে, ফোনও করতে পারছেন না। ফোনও পাচ্ছেন না।
স্বামী মারা গেছে বহু বছর। সল্ট লেকে বিশাল বাড়ি। বহু বছর ধরে সব সময়ের যে কাজের মেয়েটা ছিল, সে গত এক মাস ছুটিতে গেছে। বলেছিল, কয়েক দিনের জন্য যাচ্ছে। কিন্তু ফিরে আর আসার নাম নেই। শেষে কয়েক দিনের জন্য একটা অন্য কাজের মেয়েকে রেখেছেন।
সন্ধে সাতটা নাগাদ বাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠল। কেউ দেখা করতে এসেছে— এটা ভেবে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তবু কারো সঙ্গে কথা বলা যাবে। তা না হলে কী আছে এই একঘেয়ে জীবনে?
রাতের সময়টা সল্ট লেক যেন অচেনা শহর হয়ে ওঠে। ভয় লাগে। এমনিতেই চারদিকে এখন যেভাবে চুরি-ডাকাতির ঘটনা বেড়ে গেছে।
কাজের মেয়েটা দরজা খুলতে এগিয়ে গেল।
খুলতেই তিনজন লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। বেশ ষণ্ডা টাইপের লোক। একটা লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে এসে প্রথমেই ওর গলার কাছে ছুরি ধরে বলে উঠল, কোনোরকম ট্যাঁ ফোঁ করলে ছুরি চালিয়ে দেব।
কাজের মেয়েটাকে কিন্তু কিছু করল না। একটু বাদেই উনি বুঝলেন, মেয়েটাও ওদের দলে আছে। হয়তো প্ল্যান করেই কাজারে মেয়ে সেজে ঢুকেছিল। মেয়েটা অন্য দুজনকে নিয়ে ঘরের কোথায় কী আছে, কোথায় আলমারির চাবি থাকে— এসব দেখাচ্ছে।
কী হচ্ছে বুঝতে পেরে হঠাৎ উনি ভয়ে জোরে চিৎকার করে উঠলেন।
সঙ্গে সঙ্গে ওই লোকটা ছুরির ধারালো ডগার দিকটা গলায় বেশ চাপ দিল।
যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন সুচিত্রাদেবী। রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ল গলা দিয়ে।
লোকটা পরমুহূর্তে ওর মুখ চেপে ধরল, যাতে ওর চিৎকার কেউ না শুনতে পায়। ওর নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসতে শুরু করল।
কিন্তু তারপরেই কী হল, বুঝতে পারলেন না। দেখলেন, সামনে দাঁড়ানো লোকটা আর্তনাদ করে উঠল। মুঠো আলগা হয়ে ছুরিটা পড়ে গেল।
লোকটাকে ঘাড় ধরে টেনে সরিয়ে কেউ একটা লোকটার মুখে একটা ঘুসি মেরেছে। আর একটা ঘুসিতেই ওই বিশালকায় গুন্ডাটা ছিটকে মাটিতে গিয়ে শুয়ে পড়ল। অন্য যে দুজন লোক ছিল, তারাও বেশ গুন্ডা টাইপের। শক্ত-সমর্থ পালোয়ানি চেহারা। আওয়াজ শুনে ছুটে এল। একজনের হাতে বড়ো একটা ছোরা।
যে লোকটা ঘুসি মারল, তার মুখটা ভালো করে দেখতে পেলেন না সুচিত্রাদেবী। কিন্তু দেখে মনে হল লোকটার রং বেশ কালো। মুখে যেন কী একটা মুখোশ পরে আছে। অন্য দুটো লোক তার দিকে ছুটে আসতেই যেটা হল, তা দেখে ভারী অবাক হলেন সুচিত্রাদেবী।
একজনের পেটে লাথি মারতেই লোক দুটো ছিটকে গিয়ে পড়ল ঘরের অন্য প্রান্তে। অন্যজনের ঘাড়ের কাছে খুব জোরে আঘাত করতেই লোকটা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এবারে লোকটা মাটিতে পড়ে-থাকা বাকি দুজনকেও আবার করে কাছে গিয়ে ঘাড়ের কাছে মারল। অবাক হয়ে সুচিত্রাদেবী দেখলেন, বাকি দুজনেও মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। কাজের মেয়েটা এসব দেখে ভয়ে পালিয়ে যেতে চাইছিল।
লোকটা গর্জে উঠল, চুপ করে বোস।
লোকটা এবারে সুচিত্রাদেবীর দিকে এগিয়ে এসে বলে উঠল, ভয় নেই। আমি আপনার ছেলের মতো। গলার ক্ষতটা গভীর নয়।
বলে ঝড়ের বেগে অন্য ঘরে গিয়ে রক্তপাত বন্ধ করে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে দিল। মাটিতে পড়ে-থাকা তিনটে গুন্ডাকে ঘরের গ্রানাইট ডিনার টেবিলের পায়ার সঙ্গে বেঁধে সুচিত্রাদেবীর অচল ফোনকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সচল করে পুলিশে খবর দিল।
—আচ্ছা বাবা, তোমার নাম কী? —সুচিত্রাদেবী সস্নেহে বলে উঠলেন।
একটু যেন ভেবে নিয়ে লোকটা বলে উঠল,অজামিল। আজ আসি। ভালো থাকবেন।
আবার সেই অজামিল
—আচ্ছা দাদু, আর কতদিন বলব যে এখানে কিছু হবে না। এসব প্রোটেক্টেড ওয়েট ল্যান্ড। এখানে বাড়ি হয় না। দেখছেন না, চারদিকে জলাজঙ্গল।
—এখন আর এখানকার অফিসে কোনো লোক আসে না?
—না, গত চার মাস আমি কাউকে এখানে ঢুকতে দেখিনি। তবে মাঝেমধ্যে আপনার মতো আরও অনেকে আসে। খোঁজ নিতে। তারপরে আবার ফিরে যায়।
—কিন্তু ওরা তো বলেছিল এটাই ওদের অফিস।
—কে জানে! লোক ঠকানোর জন্যই করেছিল। আপনার মতো বোকা লোকেদেরই ওরা খোঁজে।
এখানে এলেই কিছু দূরের পানের দোকানের লোকটার সঙ্গে কথা বলেন রতনবাবু। কী আর করবেন!
বাইরে ঠা ঠা রোদ। চুপ করে বেশ খানিকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন বারুই হাইস্কুলের শিক্ষক রতনবাবু। যাবেনই বা কোথায়? সব পথই তো বন্ধ হয়ে গেছে। কত কষ্টের টাকা। সারাজীবনের সঞ্চয়। তারপরে ব্যাঙ্ক থেকে যা লোন নিয়েছেন, তা এখনও শোধ করে যাচ্ছেন। সবকিছু এই জমিটা কেনার জন্য। পাঁচ বছর আগে। বলা হয়েছিল, এখানে ওরা বাড়ি করে দেবে। জমি ছাড়া, বাড়ির জন্যও কিছু টাকা নিয়েছিল। সব কাগজপত্র আছে। কিন্তু যাদের কাছ থেকে কিনেছিলেন, তাদের কারো আর নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না গত দেড় বছর। যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। মধ্য কলকাতায় যে ঝাঁ-চকচকে অফিসটা ছিল এদের, সেটাও বন্ধ। বহুদিন ধরে।
সত্যি তিনি বোকা। পাঁচ বছর আগে যখন এই টাকা দিয়েছিলেন, তখন এদের বিজ্ঞাপন থাকত বড়ো বড়ো কাগজের প্রথম পাতায়। অন্যদের মতো ভেবেছিলেন, এটা বোধহয় খুব ভালো কোনো কোম্পানি হবে। রিটায়ারমেন্টের আগে অবশেষে একটা নিজের বাড়ি হবে।
বুকের কাছটা যেন কীরকম করে উঠল। স্ত্রী-কেও এসব কথা বলা হয়নি যে এভাবে ঠকে গেছেন। হয়তো শুনে অসুস্থই হয়ে পড়বে।
এসব ভেবে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন। কে একজন ধরে নিল।
কমবয়সি একটা ছেলে। একটা জায়গায় রাস্তার পাশে বসিয়ে জল খেতে দিল। তারপরে রতনবাবু একটু কথা বলার অবস্থায় এলে জিজ্ঞেস করল, আপনার কি কোনো অসুবিধে হয়েছে? আমাকে বলুন, আমি দেখব কী করতে পারি।
এই এতদিন বাদে যেন প্রথম একজনের কাছে এ ব্যাপারে সহানুভূতির স্বর শুনতে পেলেন। সবাই কি চারদিকের অন্যায় দেখে দেখে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে তারা এখন সবকিছু চুপ করে মেনে নেয়? সরকার কি কিছুই করতে পারে না এসব সংস্থার বিরুদ্ধে? নাকি তারাও জড়িত আছে এসবের সঙ্গে?
ছেলেটা রতনবাবুর কাছ থেকে সব শুনল। রতনবাবুর সঙ্গে জমি সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র ছিল। সেগুলো দেখল। শুধু একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
তারপর রতনবাবুর অ্যাড্রেস নিয়ে বলে উঠল, আপনার চিন্তার কিছু নেই। আমি দেখব, কী করতে পারি।
—তুমি কে?
—আমি অজামিল। একজন অতি সাধারণ মানুষ। তেমন কিছু ক্ষমতা নেই অবশ্য আমার, তবু চেষ্টা করব। আজ আসি, ভালো থাকবেন।
ভজুলালের অপহরণ
ভজুলাল জীবনে কোনো কাজ সৎভাবে করেনি। সবসময় ও ভাবে, কীভাবে কোনো কাজ সৎভাবে না করে অন্য কীভাবে করা যায়, যাতে মুনাফা বেশি থাকে। পড়াশোনা করে বেশি সময় নষ্ট করেনি। এটুকু বুঝেছিল, শিক্ষা যত হবে, তত ভালো কাজে আগ্রহ বাড়বে। সে পথে হাঁটার ইচ্ছে ওর কোনোদিনই ছিল না।
স্কুলে থাকতেই গুন্ডামি, লোক ঠকানো শুরু করেছিল। তারপরে ওর বাবার মুদির দোকানে গিয়ে বসল।
ওর বাবার সারাজীবন কেটেছে এই মুদির দোকানে। কিন্তু ভজুলাল জানত এই মুদির দোকান শুধু কিছুদিনের জন্য। চাল-ডাল এসব বিক্রি করত। তখনও যারা দোকানে আসত, তাদেরও সুযোগ পেলেই ঠকাত।
তবে ও জানত, এসব ছোটো কাজ করার জন্যে ও জন্মায়নি। আরও বড়োভাবে অনেককে ঠকানোর জন্য ওকে রাজনীতিতে নামতে হবে।
ভজুলাল সে উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হয়নি। কয়েক বছরের মধ্যেই মুদির দোকান ছেড়ে বাড়ি তৈরির প্রোমোটারি ব্যাবসা শুরু করল। সেখানে যাতে লোক ঠকিয়ে তাড়াতাড়ি বড়োলোক হওয়া যায়, তার জন্য রাজনীতিতেও যোগ দিল। খারাপ লোকেদের বন্ধুর অভাব হয় না। ওর ক্ষেত্রেও তা-ই হল। এখন এই তল্লাটে ওর মতো দাপুটে নেতা আর নেই। এখন ওর এত সম্পত্তি হয়েছে যে মাঝেমধ্যে কোথায় কোনটা তাও ভুলে যায়।
মাঝেমধ্যে খুব সুন্দর বাড়ি দেখে যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, বাহ বাড়িটা তো বেশ। পাশ থেকে ওর শাগরেদ বিল্টু বলে ওঠে, এ তো আপনারই। গত বছর যে বাইশটা বাড়ি কিনলেন, এটা তার মধ্যে একটা।
ব্যাবসা ফুলেফেঁপে এখন অনেক বড়ো হয়েছে। কুড়িটার মতো সংস্থার মালিক উনি। তার মধ্যে 'স্বপ্নসৌধ' বলে একটা সংস্থাও আছে। বহু বোকা লোকজনকে জমিবাড়ি বিক্রি করেছে এই সংস্থা। সংস্থার নামটা বেশ। স্বপ্ন দেখানো ছাড়া অন্য কিছু এখনও অব্দি তৈরি করেনি এই সংস্থা। বেছে বেছে এমন সব জমি জলের দরে কেনে, যেখানে কিছুই হবে না, অথচ নানারকম প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে বিক্রি করে দেয়।
যারা কোর্টে যাবে, মামলা করবে, এসব মামলায় সিদ্ধান্ত পেতে পেতে হয় তারা মারা যাবে, না হয় পাগল হয়ে যাবে। হয়েছেও তা-ই।
আর ওর মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার বিরুদ্ধে কোর্টে যাবার সাহসই বা পাবে কজন? তা ছাড়া পুলিশ তো সব ওরই দিকে।
আজ নিজের মার্বেলের প্রাসাদের লাগোয়া বাগানে ছুটছিল ভজুলাল। ছোটা মানে জগিং। কয়েক একর জুড়ে এই বাড়ি। দু-পাক খেলেই কয়েক মাইল ছোটা হয়ে যায়। বাড়ির চারদিক দিয়ে উঁচু পাঁচিল।
সেজন্য নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই। তবু একা ছুটতে ভালো লাগে না ভজুলালের। তা ছাড়া সেটা দেখতে ঠিক রাজকীয়ও লাগে না। সেজন্য চারজন দেহরক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে ছোটে। এক বন্ধু-মন্ত্রীকে ফোন করতে করতে ছুটছিল ভজুলাল। সামনে একটা অনুষ্ঠান আসছে। সে ব্যাপারে কিছু হালকা কথাবার্তা, চটুল ঠাট্টা-ইয়ারকি হল।
বেশ খানিকক্ষণ বাদে ফোন শেষ করে ভজুলাল হঠাৎ খেয়াল করল ওর সঙ্গে ওর চার বিশাল চেহারার দেহরক্ষী নেই। একটা ছোটোখাটো চেহারার ঘন কৃষ্ণবর্ণ ছেলে ওর সঙ্গে ছুটছে, যাকে ও আগে কস্মিনকালেও দেখেনি।
—কে, কে হে তুমি? আর আমার গার্ডেরা গেল কোথায়? থেমে দাঁড়িয়ে পিছনের দিকে তাকাল ভজুলাল। কোথায় গেল তারা? সব ক-টা অলস।
—ওরা সব ঘাসের উপরে শুয়ে আছে।
—মানে? আমি দৌড়োচ্ছি। আর ওরা ঘাসে শুয়ে ফুর্তি করছে?
—না, তা নয়, আসলে অজ্ঞান হয়ে ঘাসের উপরে শুয়ে আছে।
—মানে? অজ্ঞান হল কী করে?
—আসলে আপনি যখন ফোন করছিলেন, তখন আমি ওদের মেরে অজ্ঞান করে ফেলে দিয়েছি।
—মানে? তুমি?—ছেলেটার চেহারা দেখে বেশ হাসিই পেল ভজুলালের। ওর চারজন বডিগার্ড ছুটছিল, তাদের প্রত্যেকের বিশাল চেহারা। বেছে বেছে সেরা পালোয়ানদের নিয়েছে ওর বডিগার্ড হিসেবে, যাতে স্ট্যাটাস বজায় থাকে।
তারা প্রত্যেকে একাই দু-তিনজন লোককে ধরে পটকে দিতে পারে। আর এই ছেলেটা বলে কী?
গর্জে উঠল ভজুলাল, ফাজলামির জায়গা পাওনি! তুমি এখানে কী করে এলে?
ওই পাঁচিল টপকে। আমি আসলে আপনার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বলতে এসেছি। এবারে ছেলেটা ভজুলালের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আপনাকে ঠিক দশ দিন টাইম দেব। তার মধ্যে যতজন লোককে ঠকিয়েছেন, যাদের কাছ থেকে জমিবাড়ির জন্য টাকা নিয়ে কিছুই করেননি, তাদের সবাইকে টাকা ফেরত দিয়ে দিতে হবে। তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তা ছাড়া যত অপরাধ করেছেন, তার সবকিছুর সঠিক বিচার হবে।
ভজুলালের চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। ছেলেটার সাহস আছে বলতে হবে। ভজুলালের চোখে চোখ রেখে এরকম কথা বলার হিম্মত খুব কম লোকের আছে। আর তা ছাড়া ভজুলালও কম পালোয়ান নয়। একটা বিশ্রী গালাগাল দিয়ে খেপে গিয়ে চড় মারতে গেল ভজুলাল। কিন্তু হাতটা মাঝপথে ধরে ছেলেটা সামান্য মোচড় দিতে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল ভজুলাল। ছেলেটার একটা জোরালো ঘুসি এগিয়ে এল ইতিমধ্যে ওর চোয়াল লক্ষ করে। পরক্ষণেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল ভজুলালের চোখের সামনে।
ভজুলালের ঘোর বিপদ
জ্ঞান ফিরতে ভজুলাল দেখল, একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে মেঝের উপরে শুয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ কিছুই মনে করতে পারল না ভজুলাল, কোথা থেকে এল, কী করছিল—সবকিছুই যেন ভুলে গেছে। সবই যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে কি?
কিন্তু চোয়ালের কাছে অসহ্য যন্ত্রণা। হাত দিতে বুঝল, মুখ এখনও রক্তে ভিজে আছে।
যন্ত্রণায়, রাগে চিৎকার করে উঠল ভজুলাল। একটা অকথ্য গালাগাল দিয়ে বলে উঠল, তুই চিনিস না ভজুলালকে। তোকে শুধু নয়, তোদের পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেব।
দরজা ইতিমধ্যে খুলে গেল। দরজার কাছে একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছে। সেই ছেলেটা কি?
কিন্তু আলো লোকটার পিছন থেকে এমনভাবে পড়েছে যে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
—কে, কে তুমি?
—আমি অজামিল। ঠিক দশ দিন টাইম দেব, যাদের যাদের ঠকিয়েছিস, তাদের সব টাকা ফেরত দিয়ে দিতে হবে। তবে তাতেও কিছু হবে না। একটা একটা করে সব শাস্তির বিচার হবে। সব কৃতকর্মের।
—তুই কে? তোর মাথা যদি না আমার নিজের হাতে কাটি, আমার নাম ভজু নয়।
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মুখ থেকে একটা চিৎকার ছাড়া আর কিছু বেরোল না। লোকটা একটা লাথি মেরেছে ওর শরীর লক্ষ করে। আর তার জন্যে ওর বিশাল দেহটা ছিটকে গিয়ে পড়েছে প্রায় চার ফুট দূরে। মনে হল যেন কোমরের, ডান পায়ের উপরের দিকের হাড় সব ভেঙে গেল একটা লাথিতে।
কোনোরকমে উঠে বসতে গেল। কিন্তু ছেলেটা এসে বাঁ হাতের আঙুলের উপরে একটা পা রেখেছে। আর সেই চাপে আঙুলগুলো ভাঙতে শুরু করেছে। ডান হাত দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ছেলেটার পায়ের একটা ঘুসি মারল ভজু। কিন্তু তাতে মনে হল, হাতের সব ক-টা আঙুল যেন ভেঙে গেল— ঠিক যেমন লোহায় ঘুসি মারলে হয়। এবার ছেলেটা একটু নিচু হয়ে অন্য হাতটাও ধরে মুচড়ে দিল। আবার যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল ভজুলাল। এ কে যে এরকম নিষ্ঠুর হতে পারে!
এবারে ভজুলাল বুঝতে পারল, এ ছেলেটার গায়ে অমানুষিক শক্তি। অন্যভাবে কিছু করতে হবে।
গলার স্বর একটু নামিয়ে বলে উঠল, কী-কী চাই তোর? টাকা? ভাগাভাগি?
ক্রুদ্ধ গলায় উত্তর শুনতে পেল, আমার কিছু লাগবে না। শুধু যাদের কাছ থেকে চুরি করেছিস, তাদের সব টাকা ফেরত দিতে হবে। এই নে তোর ফোন। ফোন কর তোর লোকদের। প্রত্যেকটা টাকার হিসেব আমার কাছে আছে। সেভাবে মিলিয়ে নেব।
এবারে ছেলেটা ঘরে একটা আলো জ্বালল।
হ্যাঁ, এই তো সেই ছেলেটা। গায়ের রং বেশ কালো। মুখে মাস্ক পরা। শুধু উজ্জ্বল চোখ দুটো যেন বেড়ালের চোখের মতো জ্বলছে।
ছেলেটা বলতে শুরু করেছে, হরলাল মান্না ২০১৪-তে জমি কেনার জন্যে দু-লাখ পঞ্চাশ হাজার দিয়েছিল, নিশীথ বড়াল ২০১৩-তে দেড় লাখ, পঞ্চানন ঘোষাল ২০১৫-তে চার লাখ...
প্রায় কুড়িটা নাম বলার পর ছেলেটা থামল। ইস্পাতকঠিন গলায় বলে উঠল, মনে পড়ছে? এরকম হাজার হাজার নাম আছে। এদের মধ্যে চারজন আত্মহত্যাও করেছে। সর্বস্ব খুইয়ে রাস্তায় নেমে ভিক্ষা করতেও বাধ্য হয়েছে কেউ কেউ।
কীভাবে টাকাটা ফেরত দেবে, সে বিষয়ে শুধু ভেবে নাও। কাকে কাকে ফোন করতে হবে, সেটাও ভেবে নাও। আমি ঠিক এক ঘণ্টা বাদে ফিরে আসব।
ভজুলাল এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল যে ওর জন্যে তৈরি স্পেশাল জুতোর মধ্যে একটা ছোটো ছোরা থাকে। সুইস নাইফ। দারুণ ধারালো।
ছেলেটা বেরোতে যাবে। পিছন থেকে বাঘের মতো ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ছেলেটার যেন পিছনেও চোখ আছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে ডান হাতটা ধরে এবারে এমনভাবে ঘুরিয়ে দিল যে হাত থেকে ছোরাটা পড়ে গেল। তারপরে নেংটি ইদুরের মতো ভজুলালের ছ-ফুটের শরীরটা এক হাতে ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল ঘরের অন্য কোণে প্রায় দশ ফুট দূরে। মাথায় চোট পেয়ে দ্বিতীয়বার জ্ঞান হারাল ভজুলাল।
ফিরে এলো ভজুলাল
ব্রেকিং নিউজ
ফিরে এলেন জনদরদি নেতা ভজুলাল
কিছুক্ষণ আগেই আমাদের বিশেষ সংবাদদাতা পাঁচু মিত্র জানিয়েছেন যে জনদরদি নেতা ভজুলাল কথা বলার অবস্থায় কিছুটা ফিরে এসেছেন। প্রায় দশ দিন তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। গতকাল বাড়ির গেটের সামনে তাঁকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। শুরুতে কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। সারা শরীরে ব্যান্ডেজ। হাত আর পায়ের অনেক হাড় ভেঙে গেছে। মাথায়ও সিরিয়াস চোট আছে। মাঝেমধ্যেই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন আর 'গোঁজামিল' 'গোঁজামিল' বলে কী যেন বলতে চাইছেন। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভরতি করা হয়েছে। দশজন ডাক্তারের এক বিশেষ টিম ওর চিকিৎসার দায়িত্বে আছে। শোনা গেছে, উনি তাঁদের চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন।
—পাঁচুদা, পুলিশ এ ব্যাপারে কী বলছে?
—পুলিশ এখনও পুরোপুরি অন্ধকারে। দশ দিন আগে ভজুলালবাবুকে একদল দুষ্কৃতী বাড়ির বাগান থেকে কিডন্যাপ করে। তারপর থেকে বিভিন্ন জায়গায় চিরুনিতল্লাশি চালিয়েও এদের কোনো খোঁজ পায়নি পুলিশ। সেখানে হঠাৎ করে গতকাল ফিরে আসাটা খুব বিস্ময়জনক।
—তা ওর কোনো বক্তব্য কি এখনও পাওয়া গেছে?
—হ্যাঁ, কিন্তু সে বক্তব্যের মধ্যে অনেক ধোঁয়াশা আছে। শোনা যাচ্ছে, উনি নাকি এখনও এক ঘোরের মধ্যে আছেন, বার বার বলছেন, আর কোনো লোককে ঠকাবেন না, এমনকী বলছেন যে যত লোককে ঠকিয়েছেন, তাদের সব টাকা ফেরত দিয়ে দেবেন। ইতিমধ্যেই অনেককে তাদের প্রাপ্য টাকা নাকি ফেরত দিয়ে দিয়েছেন, এরকমও শোনা যাচ্ছে।
—কিন্তু ওঁকে কে বা কারা কিডন্যাপ করেছিল, সে ব্যাপারে কিছু জানা যাচ্ছে?
—না, সে ব্যাপারে শোনা যাচ্ছে, গোঁজামিল নামের কোনো একজন নাকি তাঁকে কিডন্যাপ করেছিল। পুলিশ তাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে। ওই গোঁজামিল নামের লোকটাই নাকি ভজুলালবাবুকে বেদম মারধর করেছে। অসহায় মানুষদের ঠকিয়ে ভুয়ো সংস্থার নামে তোলা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করেছে।
পুলিশের ধারণা, গোঁজামিলের সঙ্গে কোনো টেররিস্ট গ্রুপের যোগাযোগ আছে। লোকটার গায়ে অসম্ভব জোর। ভজুলালের মতো পালোয়ানকে যে এরকম মারতে পারে, বুঝতেই পারছ তার গায়ে কীরকম জোর। একটা সম্ভাব্য স্কেচ পুলিশ খানিকক্ষণের মধ্যেই রিলিজ করবে।
—কিন্তু একা একজন কীভাবে এরকম সুরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে থেকে ভজুলালবাবুকে নিয়ে চলে গেল?
—হ্যাঁ, পুলিশের কাছেও এটাই প্রশ্ন। তা ছাড়া ভজুলালবাবুর মতো স্বাস্থ্যবান লোককে কীভাবে একজন এরকম সুরক্ষিত একটা বাড়িতে এসে সব সুরক্ষাকর্মী আর ভজুলালবাবুর গার্ডদের মেরে ভজুলালবাবুকে নিয়ে যেতে পারে! এত একার পক্ষে অসম্ভব কাজ। শোনা যাচ্ছে, ভজুলালবাবু নাকি এখনও মাঝেমধ্যে ভয়ে ভয়ে গোঁজামিল বলে ভেউ ভেউ করে কাঁদছেন। বলছেন, কোনো অন্যায় করলে আবার তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারবে গোঁজামিল। কেউই নাকি সেটা আটকাতে পারবে না।
—ঠিক আছে, পাঁচুদা। আমি অনন্যা বলছি। সঙ্গে থাকুন, শুনতে থাকুন আমাদের চ্যানেল। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকে, সবার থেকে এগিয়ে থাকে, সবার দুঃখ বাড়িয়ে থাকে—দুঃখ চ্যানেল।
এবার পালা হরিহরবাবুর
শিক্ষামন্ত্রী হরিহরবাবু ওঁর পড়ার ঘরে ঢুকেই লক্ষ করলেন যে, যে ছেলেটা ওঁর ঘরের আসবাব পরিষ্কার করছে, তাকে উনি আগে কখনো দেখেননি।
নতুন কাজের লোক?
ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করে, ওঁকে এরকম না জানিয়ে উটকো লোক রাখা একদম ঠিক কথা নয়। এই ব্যাপারে বাড়ির লোকজনকে, মানে স্ত্রী-কে বাদ দিয়ে, বেশ কড়া কিছু কথা বলবেন ঠিক করলেন। স্ত্রী মণিদীপা ওণার থেকে বেশি দাপুটে। বেশ ভয়ই পান তাঁকে।
কত দরকারি কাগজপত্র আছে এখানে। কেউ যদি কিছু নিয়ে যায় বা যদি কোনো গুপ্তচর হয়!
ইতিমধ্যে ছেলেটা ওঁর দিকে ঘুরে তাকিয়েছে। উনি কিছু বলার আগে ছেলেটাই ওকে বলে উঠল, আপনার সম্বন্ধে কত খারাপ কথা শুনেছি। কিন্তু দেখার পর মনে হচ্ছে ততটা খারাপ নন।
—কী—কী বললে? আমার সম্বন্ধে কে খারাপ কথা বলেছে?
—সে তো চারদিকেই লোকজন বলে বেড়াচ্ছে। আপনার সামনে বলার সাহস করে না। বলে চোর, শুধু চুরি করে টাকা করেছেন, এসব কথা শুনলে কি আর মাথা ঠিক থাকে! বলে, পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছেন। আপনি নিজেও যেমন মাধ্যমিকে অঙ্কে বারো পেয়েছিলেন, বিজ্ঞানে আঠেরো পেয়েছিলেন, ঠিক সেরকমই চান, সবার শিক্ষার মান হোক। এরকম আরও কত কী শুনি!
কী আশ্চর্য! এইসব মাধ্যমিকের নাম্বার পর্যন্ত জানে, যা মণিদীপা পর্যন্ত জানে না।
—সব রাবিশ! বিরোধীদের প্রচার। আমার সামনে এসব কথা বলার সাহস কে দিল?
—না, না, ছি ছি, আমি কেন বলব? আমি শুধু যা শুনেছি, তা-ই বললাম। সে তো আপনাকে অনেকে মোটা হোঁদল কুতকুতও বলে থাকে, আমি কি আর সে কথা বলতে গেছি? বা বলতে গেছি যে আপনাকে স্কুলে আপনার ক্লাসমেটরা গবাদি বলে ডাকত, আপনি সব সময় মা-র কথা শুনে চলতেন বলে।
আশ্চর্য, এই ছেলেটা এত কিছু জানল কী করে!
এই যে গত পরশু আপনি পার্টিতে এক সুন্দরী রমণীকে দেখে শুধু হেসেছিলেন, যার জন্য আপনার স্ত্রী আপনাকে বাড়ি আসার পর ঝাঁটা দিয়ে মেরেছিল, সে কথা কি বলেছি?
গলা খাঁকরে হরিহরবাবু বলে উঠলেন, তা কে রেখেছে তোমাকে? মণিদীপা?
—না, কেউ না। ওই দেওয়াল বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে ঢুকে এসেছি।
হরিহরবাবু সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের ড্রয়ারের থেকে রিভলভার বার করতে গিয়ে দেখলেন সেখানে নেই।
ছেলেটা ফের বলে উঠল, যেটা খুঁজছেন, ওটা অন্যদিকের মাঝের ড্রয়ারে আছে।
ছেলেটা এবারে নিজের নাম বলে উঠল, আমার নাম অজামিল। শুনেছেন বোধহয়। ওটাকেই গোঁজামিল বলে বলছে অনেকে।
চমকে উঠলেন হরিহরবাবু। একেই তো সবাই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াছে। এত মারাত্মক লোক।
উনি এমনি সামনে যতই সাহস দেখান, ভিতু সংসারী মানুষ। এই যদি সেই ছেলেটা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই ওঁকে মারতেই এসেছে। ভজুলালের যদি ওই অবস্থা করে থাকে, তাহলে ওর কী অবস্থা করবে—কে জানে!
কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, আ—আমি কিছুই অন্যায় করি নি। দেখলে তো, ওইসব তদন্তকারী সংস্থা আমার বিরুদ্ধে কিছুই না পেয়ে ছেড়ে দিল।
—তদন্তকারী সংস্থা আপনার বিরুদ্ধে কী পেল বা না পেল, সেটা বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা, আপনি নিজে জানেন আপনি কত বড়ো অপরাধী। আপনি এমন এক সিস্টেম তৈরি করেছেন, যেখানে টাকার বিনিময়ে আপনি যোগ্য ছাত্রকে সুযোগ না দিয়ে অন্যদের চাকরি দিয়েছেন। এতে শুধু তাদের প্রতি অন্যায় নয়, এভাবে আপনি শুধু যে হাজার হাজার ছাত্রের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছেন তা-ই নয়, শিক্ষার মান এই রাজ্যে খারাপ করে দিয়েছেন, যার প্রভাব আজ থেকে কুড়ি বছর বাদেও থাকবে।
—আমি অন্যায় কোনো কিছু করিনি।
—আমাকে আপনি যতই বোঝান-না কেন, আমি সব জানি। তা ছাড়া নিজের মনকে কি বোঝাতে পারবেন? তবে মানুষটা আপনি ততটা খারাপ নন। সেজন্য আমি আপনাকে মারধর করব না। আপনার জন্যে শুধু কিছু স্বপ্ন রেখে গেলাম, যাতে আপনার মধ্যের ভালো মানুষটা আবার জেগে ওঠে। আর মনে রাখবেন, আমার হাত থেকে কেউ নিস্তার পায় না।
বলে ছেলেটা ঘরের জানলা খুলে টপ করে বাইরে চলে গেল।
হরিহরবাবু কিছুক্ষণ পাথরের মতো বসে থাকলেন। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পরে পাশের বেলটা টিপে সিকিউরিটিকে ডাকলেন।
পুরো বাড়ি বাগান তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ছেলেটাকে আর পাওয়া গেল না।
সেদিন রাতে উনি প্রথম একেবারে অন্য ধরনের একটা স্বপ্ন দেখলেন। ক্লাস সিক্সের অঙ্কের পরীক্ষার। অঙ্কের শিক্ষক বরুণবাবু ওর দিকে দেখিয়ে বাকিদের বলছেন, এবারে পরীক্ষায় তোরা সবাই একে অন্যের খাতা থেকে টুকেছিস। কোনো গার্ড ছিল না। আমি খাতা দেখেই বুঝেছি। কিন্তু একজন যেরকমই করুক-না কেন, অঙ্কে যত খারাপই হোক-না কেন, নিজের মতো করে চেষ্টা করে পরীক্ষা দিয়েছে। সে হল আমাদের হরিহর। হরিহরের মতো সৎ হওয়ার চেষ্টা করিস সবাই।
রাত তিনটের সময় পর পর তিনবার স্বপ্নটা দেখে উঠে বসলেন। বুকের ভেতর থেকে যেন কীরকম একটা চাপা কান্না উঠে এল। উনি এভাবে পালটে গেলেন কেন? কী করে? এখন কি আর পরিবর্তন সম্ভব?
পারবে কি গোয়েন্দা রজত?
গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান রজত সমাদ্দারের চাকরি যেতে বসেছে। শহর জুড়ে একের পর এক কাণ্ড। সবের মূলে অজামিল। ছেলেটা একের পর এক খারাপ লোক খুঁজে বার করছে। তাদের মারধর করে ভয় দেখিয়ে সব গোপন কথা বার করে নিচ্ছে। অনেক অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের উপকার করাই যেন ছেলেটার ব্রত। এখনকার দিনে এরকম খারাপ উদ্দেশ্য কার থাকতে পারে?
স্বাভাবিকভাবে একটা বড়ো জনসমর্থন ওর দিকে। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সাধারণের কাছে, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চায়, কিন্তু অসহায়তার জন্য করতে ভয় পায়।
কিন্তু একই সঙ্গে কীভাবে যে পুলিশ আর আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে,সেটাও অদ্ভুত। হয় বড়ো কারো সাপোর্ট আছে। বিরোধী দলগুলো অবশ্য কেউ একে চেনে না বলে জানিয়েছে। কিছু অস্বাভাবিক ক্ষমতা যে ছেলেটার মধ্যে আছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তা না হলে একার পক্ষে এসব করা সম্ভব হয় না।
এখন রজতের ঘাড়ে সব দায়িত্ব। জীবিত বা মৃত যেভাবে হোক-না কেন ওই অজামিলকে ধরতে হবে। যেভাবে একের পর এক দুর্নীতি ফাঁস করছে, তাতে উপরের বিল্ডিং যতই ঝাঁ-চকচকে হোক-না কেন, ভিত নড়ে গেছে। সরকারের সবাই পুলিশের অপদার্থতায় একেবারে খাপ্পা। কী করে পুলিশ থাকতে এসব দুর্নীতি বাইরের কেউ ফাঁস করতে পারে?
রজত দিনেদুপুরে অজামিলকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছেন। গত রাতে দেখেছেন যে উনি ওর প্রিয় গলদাচিংড়ির মালাইকারি খেতে বসছেন। খেতে যাচ্ছেন, ছেলেটা এসে পুরো বাটিটা তুলে নিয়ে মাথার উপরে ঢেলে দিল। এরপরে আর ঘুম আসে?
একবার ছেলেটাকে হাতের কাছে পেলে হয়। দেখাবেন মজা। এতদিন নিশ্চিন্তে কাজ করা গেছে। রিটায়ারমেন্টের আগে যত অশান্তি!
এসব নিয়ে এতটাই অন্যমনস্ক ছিলেন যে স্ত্রী-র বার বার বলা সত্ত্বেও বাজারে গিয়ে ভুলে চিংড়ির বদলে মৌরলা কিনলেন, পাঁচ কেজি আলুর বদলে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনলেন, এমনকী পাশের বাড়ির বিপিনবাবু যখন ওকে বারকয়েক ডাকলেন, তখনও উনি সেটা খেয়াল করলেন না।
বহু বছর পান খান না। আজ অজামিলকে নিয়ে যাতে মাথাটা ঠিকভাবে কাজ করে, সেজন্য একটা গোপাল জর্দাপানও কিনে খেলেন। বাড়িতে ঢোকার সময় যে কাগজে পান মোড়া ছিল, সেই কাগজটা দেখে-চক্ষু চড়কগাছ। তাতে লেখা শুধু শুধু আমার পিছনে সময় নষ্ট করছেন, এত কষ্ট করে খোঁজাখুঁজি করছেন, তার থেকে ঠিকভাবে ডাকলে বাড়ি এসে দেখা করব। সেটা অবশ্য আপনার জন্য মঙ্গল হবে কি না জানি না। সত্যিকারের অপরাধীদের খোঁজ করুন।
তার মানে অজামিল ওখানেই ছিল। কী সাংঘাতিক!
হরিহরবাবুর পরিবর্তন
হরিহরবাবুর আজ কাজে মন নেই। কাল সারারাত স্বপ্ন দেখেছেন ছোটোবেলার। স্কুলে পড়ার সময় ওদের অবস্থা একদম ভালো ছিল না। কিন্তু তার জন্য কখনো অন্যদের মতো ট্রেনে বা বাসে টিকিট না কেটে ওঠার কথা ভাবতে পারতেন না। হেঁটে পাঁচমাইল পথ একদিকে যেতেন। যতই কষ্ট থাকুক-না কেন, কত আনন্দ ছিল সেসব দিনে।
নয়নবাবু ছিলেন অঙ্কের শিক্ষক। সাংঘাতিক সব কঠিন অঙ্ক দিতেন। উনি ছিলেন অঙ্কে সব থেকে দুর্বল। ওর বাবার সঙ্গে নয়নবাবুর ভালো বন্ধুত্ব ছিল। দুজনে বসে দাবা খেলতেন। একবার অঙ্কের পরীক্ষার আগে বাড়ি গিয়ে যখন ওঁরা দাবা খেলছিলেন, তখন অন্য ঘরে গিয়ে হরিহরবাবু দেখেন যে ওঁদেরই ক্লাসের অঙ্কের প্রশ্নপত্র টেবিলের উপরে পড়ে আছে। অন্য যে কেউ হলে হামলে পড়ত, কিন্তু উনি কিছু করেননি। প্রশ্নপত্র চোখের সামনে থাকলেও এরকমভাবে অন্যায় একটা কাজ করবেন, তা তখন ভাবতেও পারেননি।
আর সেই তৃপ্তিপিসি? কী স্নেহ করত ওঁকে। মা-র বন্ধু ছিল। সেজন্য জানত ওর সম্বন্ধে সব কথা। খুব ভালোবাসত ওঁকে ওঁর স্বভাবের জন্য। বলতেন, সবার আগে হরিহরের মতো ভালো মানুষ হতে হয়।
এসবই স্বপ্নে দেখছেন শেষ ক-টা দিন।
আর অপূর্ববাবু? ওঁর তো বাংলা একেবারে খারাপ লাগত। ভয় পেতেন। কিন্তু সেই বাংলাকে এত ভালোবাসতে শিখলেন বাংলার শিক্ষক অপূর্ববাবুর জন্যে। ক্লাসে পড়াতেন, যেন কবিতা বলতেন। শব্দের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে উনি ওই বাংলা ভাষার প্রেমেই পড়ে গেলেন। কিন্তু আজ যদি হত, তাহলে হয়তো অপূর্ববাবুর মতো মানুষ সরকারি স্কুলে শিক্ষকই হতে পারতেন না।
আর এজন্য কে দায়ী? উনি নিজে।
কিন্তু কীভাবে কবে বদলে গেলেন? আবার সেই চাপা কান্নাটা পেল। সত্যিই তো, ছেলেটা তো ঠিকই বলেছে। ওর অপরাধ না-ধরা পড়লে কি আর উনি অপরাধী নন? যেকোনো দেশে যেকোনো রাজ্যে উন্নতির মূল বীজ লুকিয়ে থাকে শিক্ষায়। সেই শিক্ষাকে উনি নষ্ট করে দিয়েছেন।
—কী, মনে হচ্ছে তো আপনি অপরাধী? খুব খারাপ লাগারই কথা। ভাবুন তো, কত অভাবী সংসারে কতজন বছরের পর বছর ধরে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যাতে তারা ভালো শিক্ষক হতে পারে। আর আপনি সেটাই হতে দিচ্ছেন না?
চমকে উঠলেন হরিহরবাবু। অজামিল ঘরের ভেতরে এল কখন?
ফের অজামিল বলে উঠল, ভাবুন, আপনার জন্য হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে আজ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক হতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, আপনার জন্যই অত্যন্ত খারাপ শিক্ষক, যাদের কোনো যোগ্যতা নেই, তারা এখন স্কুলে পড়াচ্ছে আর আরেকটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে, যার জন্য আমাদের সবাইকে ভুগতে হবে আগামী কুড়ি বছর। আপনার মা তো খুব আদর্শবাদী মহিলা ছিলেন। খুব খুশি হয়েছিলেন, যখন আপনি ভালো চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। উনি কি এখন আপনার এই পরিচয় পেলে খুশি হতেন? হয়তো লজ্জায় আত্মহত্যা করতেন।
হরিহরবাবু লজ্জায় আরও কুঁকড়ে গেলেন। সত্যি তা-ই, মা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর হল। মা-র পড়াশোনা ছিল স্কুল অব্দি। তারপরে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর পড়াশোনা করতে পারেননি। পরে দেশভাগের পরে এ দেশে এসে ফের পড়াশোনা শুরু করে শেষে প্রফেসর হন। সব সময় মনে করতেন, শিক্ষাই সমাজ বদলে দিতে পারে, একটা জাতিকে উন্নত করতে পারে। মা সেজন্য সব সময় শিক্ষার উপরে জোর দিতেন। প্রকৃত শিক্ষা। ঘরে রাখা মা-র বড়ো ছবিটা দেখে হরিহরবাবুর মনে হল, পালিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আজ যা কিছু, সবকিছুই মা-র জন্যই। মা নিজে পড়াশোনা করে শিক্ষা পেয়েছিলেন বলেই জেনেছিলেন শিক্ষার গুরুত্ব, সে শিক্ষা দিতে পেরেছিলেন ওর সন্তানদের। কিন্তু হরিহরবাবু কী করে সেই শিক্ষা ভুলে গেলেন? তা না হলে কি এভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিতে পারতেন? রেগে হাত দিয়ে নিজের পায়ের উপরে জোরে আঘাত করলেন। আত্মহত্যা করার মতো সাহস ওর নেই। পারলে সেটাই করতেন। কী করে বেরোবেন এখন এখান থেকে? অন্যায় যে অজগরের মতো গ্রাস করে নিয়েছে সবকিছু।
আবার সেই স্বপ্নের ঘোরে হারিয়ে গেলেন হরিহরবাবু। স্কুলে অঙ্ক পরীক্ষা হচ্ছে। খুব শক্ত একটা অঙ্ক। আস্তে আস্তে উনি অঙ্ক ভালোবাসতে শুরু করেছেন। পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে নয়নবাবুও গর্বিত মুখে ওঁর সেই চেষ্টা দেখে যাচ্ছেন। এই তো চাই।
হরিহরবাবুর সারাদিনের সব দরকারি মিটিং বাতিল হয়ে গেল।
ঋকের বাড়ি যাওয়া
আরও একদিন ঋকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তখনও অনেক আড্ডার পরে সেই একই কথা। কবে আসবি?
এদিকে বলতে নেই, কিছু আশার আলো দেখছি। সহজে সবকিছু মেনে নিই আমরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই না। কিন্তু যেটা পারি না করতে, সেটাই করে দেখাচ্ছে একজন। অজামিল। অজামিল নামের এক বছর পঁচিশেকের ছেলে। ছোটোখাটো চেহারা। ঘন কালো রং। দিনের বেলায় নাকি মুখে মুখোশ পরে থাকে। আবার কখনো সে নাকি এমন মেকআপ করে যে অন্যরা যারা তাকে দেখেছে, তাদেরও বর্ণনা মেলে না। কেউ বলে অজামিলের নাক শিঙাড়ার মতো, তো কেউ বলে আহা, নাকই নেই বলা চলে, বোঁচামতো। কেউ বলে মাথায় মস্ত টাক, তো কেউ বলে, মাথা ভরতি অমন কোঁকড়ানো চুল আজকালকার দিনে দেখাই যায় না। কেউ বলে ডান গালে তিল, তো কেউ বলে, ধুর, ভুল দেখেছেন। ওটা তো ডান চোখের পাশে আঁচিল।
পুলিশের ধারণা, লোকটা খুব ভালো মেকআপ আর্টিস্ট, নানান ধরনের ভেক চট করে ধরতে পারে। হয়তো নাটক, সিনেমার সঙ্গেও তাই যোগ থাকতে পারে। শুধু গায়ের ঘন কালো রঙের কথাটা, আর রোগা ছোটোখাটো চেহারাটা সবার কাছেই কমন। কে সে এখনও কেউ জানতে পারেনি। সরকারের মতে সে একজন বড়ো ক্রিমিন্যাল। নিজের বিশেষ কিছু স্বার্থে এসব কাজ করে বেড়াচ্ছে।
তবে সাধারণের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই ঠিক উলটো। জমি প্রতারণার জন্য অনেক নিরীহ মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছিল। তাদের অনেকে সে টাকা ফেরত পেয়েছে। বেশ কিছু লোক ও সরকারি আধিকারিককে, রাজনীতির ছোটো বড়ো নেতাকে ঘুস খাওয়ার সময় বা অন্যায় করার সময় অজামিল ধরেছে। শুধু ধরেছে না, এমন উত্তম-মধ্যম দিয়েছে যে তারা আর সেরকম কাজ করতে সাহস করবে না। তারা স্বীকারও করে নিয়েছে সবকিছু।
ভয়টা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে কিছুদিন আগে তিনজন পাড়ার ডাকসাইটে গুন্ডা এক ছোটো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায় করতে গিয়ে দেখে, তার পাশে এক কৃষ্ণকায় ছোটোখাটো লোক বসে আছে। তা দেখে তারা কিছুক্ষণ 'অজামিলদা কেমন আছেন, চা খাবেন, আমরা আপনার খুব ফ্যান, আপনার পায়ের ধুলো দেন'—এসব বলার পর পাড়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেই যে পগারপার হয়েছে, এখনও তাদের দেখা মেলেনি।
পরে জানা গিয়েছিল ওই লোকটি দক্ষিণভারতের চেন্নাই নিবাসী অনন্ত কৃষ্ণন, এক স্থানীয় ইলেকট্রিক কোম্পানির হয়ে মিটার বসাতে এসেছিল, ও জীবনে লেমন রাইস খাওয়ার বাইরে দুঃসাহসী কোনো কাজ করেনি।
অন্যদিকে দু-দিন আগের ঘটনা। রাধানাথ পাইন নামে এক কমবয়সি ছেলে দমদম এয়ারপোর্টে এসে প্রিপেড ট্যাক্সি বুক করেছিল। তারও একই রকম চেহারা। কৃষ্ণকায়, ছোটোখাটো চেহারা, পুলিশের সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এয়ারপোর্টের বাইরে যেই না তাকে জেরা শুরু করা হয়েছে, প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক ঘিরে ধরে ও সেই পুলিশকে বেদম প্রহার শুরু করে।
পরে জানা যায়, সেই যুবক মুম্বইতে কাজ করে ও অফিসের কাজে কলকাতায় এসেছিল।
সবার আশা এখন অজামিলকে ঘিরে। সবার প্রার্থনা, যাতে অজামিল ধরা না পড়ে। তাকে ধরার জন্য অবশ্য পুলিশ সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েছে। ভয় হয়, কবে তাকে ধরে ফেলবে। সেক্ষেত্রে আমাদের সবার আশাভঙ্গ হবে।
কবে যে আবার ঠিকভাবে সরকারি স্কুলের চাকরির পরীক্ষা হবে, কবে তার ঠিকভাবে বিচার হবে, সেই অপেক্ষায় দিন গুনছি। বাবার আর তেমন সেন্স নেই, মা যদি মারা যাওয়ার আগে আমাকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে পারে, শান্তি পাবে।
ঋকের বাড়ি উত্তর কলকাতার একটা পুরোনো পাড়ায়। সরু অলিগলির মধ্যে। তবে যে গলি দিয়ে ঢুকলাম, সেটা বেশ পরিষ্কার। এরকম পরিষ্কার রাস্তা খুব কমই দেখেছি।
পুরোনো দিনের বাড়ি। ওরা এখানে ভাড়া থাকে। এখন একজন আই. টি.-তে কাজ করা কর্মী যেরকম প্রাচুর্যের মধ্যে থাকে, সেরকম কিছুই চোখে পড়ল না বাড়িতে। ঢুকে একটা ছোটো দালান। সরু লাল সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় দুটো ঘর। তারপরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে ছোটো ছাদ। মাসিমা আমাকে দেখে খুব খুশি। এতদিন বাদেও আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমাকে দেখে বলে উঠলেন, আসলে ঋকের তো একজনই বন্ধু ছিল, সে হলে তুমি। তোমাকে ভুলব কী করে? তুমি চলে আসার পরে ঋকের যে কী খারাপ লেগেছিল, কী বলব। ও তো মাঝেমধ্যে কাঁদত। আসলে আমাদের মানুষ বলেই মনে করে না অনেকে। তোমাকে বলেনি নিশ্চয়ই?
মাসিমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পরে ঋকের ঘরে গিয়ে বসলাম। আসলে ঋকের বলা কথাটা যাতে না ওঠে, সেটারই চেষ্টা করছিলাম। এ তো আমারই লজ্জা, আমাদের সবার লজ্জা।
ঋকের ঘরে বসে আড্ডা মারতে মারতে এসব সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
বলে উঠলাম,অজামিল ছেলেটা কী ধাতুতে গড়া কে জানে? একা এসব কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে। তবে কবে যে ধরে ফেলবে, কে জানে? আচ্ছা, তোর কী মনে হয়, সেদিনের যে লোকটা আমাদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে ছিল, সেই লোকটা হতে পারে কি? ওরকম ঘন কালো রং এখন চট করে দেখা যায় না। অজামিল সম্বন্ধেও একই জিনিস শুনছি। লোকটার সঙ্গে দেখা হলে জাস্ট ঢিপ করে প্রণাম করব। তোর কী মনে হয়? ওই লোকটা?
ঋক বলে উঠল, আসলে সবার আগে ভালো কাজ করার জন্যে গভীর ইচ্ছে লাগে। সেটা হয়তো আমাদের মধ্যে নেই, ওর মধ্যে আছে। সেজন্যই ও স্পেশাল। হ্যাঁ, সেদিনের সে লোকটা তো হতেই পারে!
—কিন্তু তুই বল ঋক, তুই তো আমাদের সবার থেকে ছোটোবেলাতে অন্যরকম ছিলিস। কী জোরে দৌড়োতিস, কতদূর অব্দি লাফাতিস, কিন্তু কিছুই করলি না তারপর। জাস্ট একটা আই. টি.-র চাকরি করছিস। সে তো আরও অনেকে করতে পারে। পারলে তুই অজামিলের পাশে দাঁড়াস। ও আমাদের সবার আশা, সবার গর্ব।
ও এ ব্যাপারে আর কথা না বাড়িয়ে অন্যদিকে কথা পরিবর্তন করল, এই পাড়াটা দেখে তোর কী মনে হয়েছে?
—কী পরিষ্কার।
—ঠিক বলেছিস। শুধু এই পাড়া নয়, এর পাশের পাড়াও।
—হ্যাঁ, আমারও সেটা দেখে খুব অবাক লাগছিল। এরকম পরিষ্কার রাস্তা দেখাই যায় না।
—আমি রোজ পরিষ্কার করি। সকাল পাঁচটায় উঠে।
—মানে? তুই কেন করিস?
—আরে ওটাই তো আমার বাবা-মা-র পেশা ছিল। এটা লজ্জার কী? এখনও আমি সে পেশা বজায় রেখেছি। পরিষ্কার করতে আমার বেশ ভালো লাগে। লোকে কী ভাবল বা বলল, তাতে কী এসে যায়! কোনো পেশাই ছোটো নয়।
আমার খুব খারাপ লাগত যখন ছোটোবেলায় সবাই আমাদের এজন্য অপমানিত করত। বলা যায়, প্রতিমুহূর্তে অপমান করত। এমনকী স্কুলে তুই চলে যাওয়ার পরে একদিন আমার জামা সামান্য নোংরা ছিল বলে আমাকে একদিন সারারাত স্কুলে একটা ঘরে আটকে রেখে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। আর বাইরে থেকে সবাই, যাদের মধ্যে কিছু শিক্ষকও ছিল, তারা সবাই আমার জাত, আমার বাবা-মা সবাইকে নিয়ে নোংরা কথা বলছিল। আমি সেদিন সারারাত শুধু কেঁদেছি, আর ভেবেছি, একদল মানুষ কেন সব সময় অন্যদের ছোটো করে আনন্দ পায়।
—আমি যদি ওদের হাতের কাছে পেতাম না—আমি উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠলাম।
—এভাবে কতজনের বিরুদ্ধে তুই লড়বি? তার থেকে এই ধরনের কাজ যারা করে, তাদের যাতে সবাই ভালোবাসতে শেখে, এই কাজের গুরুত্ব বোঝে, সেজন্য আমাদের সবার এ ধরনের কাজ করতে এগিয়ে আসা উচিত।
—ঠিক বলেছিস ঋক।
আরও বেশ খানিকক্ষণ আড্ডার পরে আমি উঠলাম। আমি চাইছিলাম, ঋক যেন অজামিলের পাশে থাকে। সেটা মনে হয়, ও থাকবে।
হরিহরবাবুর আজ খুব বড়ো মিটিং ভগবানপুরে। কয়েক লক্ষ লোকের জমায়েত হয়েছে।
কোনো তদন্তকারী সংস্থা হরিহরবাবুর বিরুদ্ধে শেষে কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। একেবারে ক্লিন চিট।
হরিহরবাবু জানেন, ওকে কী বলতে হবে। এ তো শুধু ওর একার জয় নয়, ওনার জয় মানে দলেরও জয়। বলতে হবে, ওকে ফাঁসানো হয়েছিল। বলতে হবে, এটা পুরোটাই বিরোধী দলের ষডযন্ত্র। ওর মতো অভিজ্ঞ নেতা জানেন, এটা কীভাবে বলতে হয়, একটু নাটক করে, একটু জনতাকে উসকিয়ে দিয়ে।
কিন্তু আজ ওর নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। মনের মধ্যে কে যেন বার বার সেই ছোটোবেলার কথা মনে করে দিচ্ছে যখন উনি সামান্যতম অন্যায়ের কথা ভাবতে পারতেন না!
আর আজ!
তবু উনি সেসব সামলে বেশ নাটকীয়ভাবেই শুরু করলেন—
ওরা ভেবেছিল, আমি জেলেই থাকব। আমি বাইরে থাকলে ওদের মুশকিল। তোমরা যে আমায় ভালোবাসো তা ওরা চায় না। তোমরা আমাকে ভোট দিলে ওদের অসুবিধে। তাই জেলে ভরো। যে করে হোক, যেভাবে হোক, প্রমাণ করো, আমি অন্যায় করেছি। জেলে ঢোকাও। কিন্তু শেষে কি কিছু প্রমাণ করতে পারল? পারল না। উলটে ওদের মুখে চুনকালি পড়ল। ফাইনালি কীসের জয় হয়? সত্যের।
বলতে বলতে আর কান-ফাটানো হাততালির শব্দের মধ্যে হঠাৎ খেয়াল করলেন, স্টেজের সামনে সেই ছেলেটা বসে আছে। ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
শুধু তা-ই নয়, উনি দেখলেন, প্রথম সারির একটা চেয়ারে ওর মা বসে আছেন। বসে আছেন ওর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা, যাঁরা ওকে ভালো মানুষ, ভালো ছাত্র বলে ভাবতেন। স্নেহ করতেন। আজ তাদের সবার মুখ যেন বড়ো গম্ভীর।
ছেলেটা যেন ওর দিকে তাকিয়ে বলছে, আর লুকোবেন না। আপনার সব চুরি সবার কাছে ধরা পড়ে গেছে। যারা হাততালি দিচ্ছে, তারাও জানে। লুকিয়ে কী লাভ?
উনি মাইকের সামনে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলেন, আমি খুব দুঃখিত। একটা বড়ো ভুল করে ফেলেছি। আমার ও আরও কিছু মানুষের লোভের জন্য আমরা আজ লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর জীবন বিপদে ফেলে দিয়েছি। একটা বড়ো অংশের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিয়েছি।
জনতার আনন্দ চিৎকার যেন থেমে গেল। উনি ফের বলে উঠলেন, আমি খুব দুঃখিত আমার সব অপরাধের জন্য।
উনি একটু থামলেন। একটা চাপা গুঞ্জন উঠল জনতার মধ্যে। হরিহরবাবু কি পাগল হয়ে গেছেন, তদন্তকারী সংস্থা তো কিছুই অন্যায় খুঁজে পায়নি। এসব কী বলছেন!
উনি ফের বলতে শুরু করেন, আমি আমাদের করা সমস্ত অপরাধের প্রমাণ তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেব। এই অন্যায় আমি আর লুকোব না। এখনও হয়তো সময় আছে। নিশ্চয়ই ভুলগুলো শোধরানো যাবে। যেভাবে শিক্ষাকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি, তাতে আগামী প্রজন্মের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
আমি গত কয়েক দিন শুধু এটাই ভেবেছি যে কী করে আবার সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচার ফিরিয়ে আনা যায়। ভেবেছি, কীভাবে যারা যোগ্যতা সত্ত্বেও সুযোগ পায়নি, তাদের কীভাবে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া যায়! কীভাবে যারা অন্যায়ভাবে অযোগ্য হয়েও ঘুস দিয়ে চাকরি পেয়েছে, তাদের চাকরির থেকে বাদ দেওয়া যায়। একই সঙ্গে যারা যারা এর সঙ্গে যুক্ত আছে, তাদের সবার নাম কীভাবে জানানো যায়।
মাইকের তার কেটে গেল। জনতার মধ্যে চূড়ান্ত শোরগোল শুরু হয়েছে। এসব কী বলছেন হরিহরবাবু!
দলের কয়েকজন জোর করে টেনেহিঁচড়ে হরিহরবাবুকে স্টেজের থেকে বাইরে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে এল।
হরিহরবাবুর স্বীকারোক্তি
ব্রেকিং নিউজ
অজামিলের ভয়ে সব দুর্নীতি স্বীকার করে নিলেন হরিহরবাবু।
—এক্ষুনি জানা গেছে যে শিক্ষামন্ত্রী হরিহরবাবু শিক্ষা ও অন্য সরকারি চাকরিতে দুর্নীতির সব অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন উনি একা নন। আরও যাঁরা ইনভলভড আছেন, তাঁদের সবার নাম প্রকাশ্যে আনবেন।
প্রশ্ন, আর কারা এতে যুক্ত আছেন! তাঁরা কী এ কথা মেনে নেবেন? কী হবে দলীয় অবস্থান?
আমরা এখনই চলে যাচ্ছি ভগবানপুরে। সেখানে আছেন আমাদের বিশেষ সংবাদদাতা গোবিন্দ নস্কর।
—কী খবর, গোবিন্দদা?
—শোনা যাচ্ছে না। কীসের খবর জানতে চাইছ রূপা?
—এখন তো একটাই খবর, গোবিন্দদা। হরিহরবাবু। উনি কী বলছেন? কী করতে চলেছেন উনি?
—সেটা আমিও জানি না। তবে হরিহরবাবু নাকি বার বার বলছেন, উনি আবার ভালো হয়ে যেতে চান। চরিত্র সংশোধনের জন্য জেলে যেতে চান। পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে চান। সবকিছু যাতে ঠিকভাবে হয়।
—কিন্তু সেটা কি সত্যি হবে? এ প্রশ্ন আমাদের সবার। অন্যদের কথা কি কিছু বলেছেন? অন্য কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল?
—হ্যাঁ, বলেছেন, সেটা করতে গেলে গাঁ বাছতে ঠগ উজাড় হয়ে যাবে। অনেকেই জড়িত আছে এর সঙ্গে।
—কথাটা বোধহয় ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে।
—আমাকে ভুল ধরাতে যেয়ো না রূপা। তুমিও সেদিন খবরে মুক্তোবনে উলু ছড়ানো বলেছিলে। আরও বলব?
—আপনার কথা শোনা যাচ্ছে না। একদম শোনা যাচ্ছে না, গোবিন্দদা।
—চালাকি কোরো না। দিব্যি শোনা যাচ্ছে। বাংলায় মাধ্যমিকে নাকি খুব ভালো করেছিলে? টুকে?
লাইন কেটে দিল রূপা।
—যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য আমাদের বিশেষ সংবাদদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। রূপার সঙ্গে থাকুন। দুঃখে থাকুন। দুঃখ চ্যানেলে।
তন্ময়বাবুর বোধোদয়
কেরিয়ারে এত তাড়াতাড়ি পদোন্নতি খুব কম পুলিশ অফিসারের হয় যেমন তন্ময় ঘাটির হয়েছে। তার প্রথম কারণ অবশ্যই ওর মতো দক্ষ পুলিশ অফিসার খুব কম হয়। দ্বিতীয় কারণ উনি টাকার জন্যে কোনোরকম অন্যায় করতে সামান্যতম দ্বিধা করেন না। ভালো লোকদের মধ্যে জট হয় না। খারাপ লোকেদের মধ্যে হয়। খুব শিগগিরি খারাপ লোকেরা, রাজনীতির কিছু নেতা বুঝল তাদের তন্ময়ের মতো একজনের খুব দরকার।
এতে তন্ময় যে শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে আছেন তা-ই নয়। ওঁর কাছে অনেক গোপনীয় তথ্য আছে। সেজন্য ওঁকে সবাই বেশ ভয় পায়। বড়ো নেতা থেকে অর্থবান ব্যবসায়ী সবাই সমঝে চলে ওঁকে।
এখন আর তন্ময়ের অপরাধ করতে সামান্যতম দ্বিধা হয় না। যেকোনো স্ক্যাম বা দুর্নীতিকে কীভাবে আড়াল করতে হয়, সেটা উনি খুব ভালো জানেন।
বলা যায়, পুলিশের কাজটার বাইরে দুর্নীতির কনসালট্যান্সি চালান।
সেই লোকটাই আজ চিঠিটা পেয়ে খুব অবাক হলেন। ওর নামে চিঠি। লেখা আছে—যেখানেই থাকুন-না কেন, আগামীকাল রাত বারোটার মধ্যে মারা হবে। অন্যায়কে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন, তার জন্য।
নীচে লেখা— অজামিল।
মুচকি হাসলেন তন্ময়বাবু। তাহলে তাঁকেও ভয় দেখানোর মতো কোনো লোক আছে। উনি চাইলেই খুব ভালো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেন। তাহলে কি তাঁকে ধরতে গিয়ে অজামিল ফাঁদে পা দেবে?
ঠিক করলেন, আগামী চব্বিশ ঘণ্টা কোথাও বেরোবেন না। কিন্তু যত সময় যেতে লাগল, কীরকম একটা অজানা ভয় যেন তাঁকে গ্রাস করতে শুরু করল। কীভাবে জানি, মিডিয়ার কাছেও খবরটা পৌঁছে গেছে। অনেকেই জানে তন্ময়বাবুর মতো দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসার কমই হয়।
প্রত্যেকটা ঘণ্টার সঙ্গে সঙ্গে তন্ময়বাবুর ভয়টা যেন আরও বাড়তে লাগল। এমনকী দুপুরে ঘরে কাজ করার সময়ও চারজন গার্ডকে ঘরের মধ্যেই থাকতে বললেন।
শেষে রাত বারোটা বেজে গেলে আনন্দে একটু নেচেও নিলেন। তাহলে অজামিল ঢুকতে পারেনি। পারবেই বা কীভাবে? চারদিকে যেরকম নিরাপত্তা বেষ্টনী।
পরের দিন সকালে দেখা গেল, তন্ময়বাবুর দেহ ফ্যানের থেকে ঝুলছে। মারা গেছেন ভোর চারটে নাগাদ। কীভাবে মারা গেছেন, সেটা ঘরের বাইরে থাকা দুজন গার্ডও বুঝতে পারেনি। জানলা দিয়ে ঢুকে কীভাবে জানি হত্যা করে গেছে। কিন্তু এত পাহারার মধ্যে দিয়ে তিনতলার ঘরে দেওয়াল বেয়ে উঠল কী করে?
আরেকটা চিঠিও পাওয়া গেল ঘরে। অজামিলের লেখা।
তাতে লেখা—ঠিক করলাম গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড টাইমটাই ফলো করা উচিত। সেভাবেই হিসেব করে মারলাম। যে বা যারা অন্যায় করবে, লোক ঠকাবে, সাধারণকে বঞ্চনা করবে, তাদের আমি মারব। কেউ আটকাতে পারবে না। এখনই পালান। নয়তো আপনার হাতে সময় খুব কম।
কে অজামিল?
নিউটাউন লাইব্রেরিতে ঋকের সঙ্গে আজ সাম্প্রতিককালের বাংলা বই নিয়ে অনেক আলোচনা হল। ও গল্পের বই পড়তে খুব ভালোবাসত। এখনও দেখলাম, নিয়মিত পড়ে।
তারপরে ও আমাকে একটা কাছাকাছি ক্যাফেতে খাওয়াতে নিয়ে গেল। এসব জায়গায় আমি কোনোদিন আসিনি আগে।
বেশ বড়ো ক্যাফে। অনেক ধরনের খাবার, কফি। অনেক আড্ডা হল।
ওকে বললাম, যা-ই বলিস, একটা ছেলে কিন্তু আমাদের সমাজটা অনেক পাল্টে দিয়ে গেল। যেটা বিরোধী দলগুলো করতে পারেনি, কোনো শক্তিশালী নেতা করতে পারেনি, সেসব কাজই করে দেখাল ওই ছেলেটা। মনে হয়, এবার থেকে আবার স্বচ্ছভাবে ঠিকভাবে পরীক্ষা হবে। দেখি, এবারে আমার কী হয়! তবে যা পরিশ্রম করেছি গত চার বছর ধরে, এবারে হওয়া উচিত।
—তোর এবারে অবশ্যই হবে। নিজের উপরে ভরসা রাখ। আশা করি, সবকিছুর মূল্যায়ন ঠিকভাবে হবে। এখন লোকে অন্যায় করতে ভয় পাচ্ছে। তবে এ ভয় কতদিন থাকবে, সেটা জানি না। আসলে একটা বড়ো অংশের মানুষ এখনও মুখে যা-ই বলুক-না কেন, অন্যায়কে মেনে নিতে অভ্যস্ত। শুধু তা-ই নয়, তারা নিজেরাও যে কোনো বিষয়ে নিজের সুবিধের জন্য অন্যায় করতে দ্বিধা করা না। সেজন্য এরকম দুর্নীতির ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠে।
—হ্যাঁ, সেটাই সমস্যা। এই যে শিক্ষা নিয়ে এত বড়ো দুর্নীতি হল, এ তো সাধারণ মানুষের একটা অংশের অংশগ্রহণ ছাড়া হতে পারে না। তুই ভাব, সামান্য একটা চাকরি অন্যায়ভাবে পাওয়ার জন্য সব মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুস দিতে তারা প্রস্তুত। অজামিলের জন্য যদি তাদের মনোভাবে পরিবর্তন হয়, তবে এ পরিবর্তন স্থায়ী হবে।
একটু থেমে ফের বলে উঠলাম, আচ্ছা, সেদিনের সে লোকটাকে তোর মানে আছে?
—কোন লোকটা?
—সেই যে আমরা খাচ্ছিলাম, পাশ থেকে একটা লোক বলে গেল, অন্যায়কে প্রতিবাদ করার ব্যাপারে, তার গায়ের রং কিন্তু বেশ কালো ছিল। ছোটোখাটো চেহারা ছিল। হয়তো সেই লোকটাই অজামিল?
—হ্যাঁ, সে তো হতেই পারে! আসলে আমরা প্রত্যেকে যদি ওই লোকটার মতো হতে পারতাম, অজামিলের মতো হতে পারতাম, তাহলে আমাদের সমাজে কোনোদিন এরকম সমস্যা হত না।
এরকম আরও অনেক কথা হল আমাদের মধ্যে।
কথা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। হাতঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা। ও বলে উঠল, চল, এরপরে বাস পাব না। বেরোনো যাক।
দুজনে মিলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। বেরিয়েই বুঝতে পারলাম, এত রাত করাটা একদম ঠিক হয়নি। সন্ধে সাতটার সময় যে জায়গাটা জমজমাট ছিল, এখন এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেসব জায়গা একদম শুনশান হয়ে গেছে। আশপাশের আই.টি. পাড়া যেন হঠাৎ করে ঘুমিরে পড়েছে।
আমরা ছাড়াও একটা কমবয়সি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাস স্টপেজে। বেশ ভালো দেখতে। মুখ-চোখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা বেশ চিন্তিত ও বেশ খানিকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
মনে হল, কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ফোন ছাড়ার পর আমাদের দিকে একবার এগিয়ে এসে বলল, আজ অফিসে অনেক দেরি হয়ে গেল। এখন অনেকক্ষণ ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। জানি না কখন আসবে।
আমরা আশ্বস্ত করলাম যে বাস নিশ্চয়ই আসবে। আমরা অবশ্য অন্যদিকে যাব। বাস না পেলে ট্যাক্সি ধরব। হয়তো কিছুটা দূর অব্দি আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে সেক্ষেত্রে। সেটাও জানালাম। মেয়েটা ফের দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
মিনিট দশেক পরে একটা বেশ দামি গাড়ি এসে দাঁড়াল বাস স্টপেজে। একটা ছেলে, যে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছিল, জানলা নামিয়ে মেয়েটাকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, লিফট লাগবে?
মেয়েটা একটু অবাক হয়ে এগিয়ে গেল গাড়িটার দিকে। আশাতীত অফার। বলে উঠল, কোনদিকে যাচ্ছেন?
আমরা দূর থেকে লক্ষ করছিলাম। গাড়ির মধ্যে চারজন ছেলে। তাদের কাউকেই দেখে অভিসন্ধি ভালো মনে হল না। জোরে একটা হিন্দি গান চলছে। গাড়ির মধ্যে ভুরভুর করছে মদের গন্ধ।
ছেলেটা মেয়েটার প্রশ্নের উত্তরে সিগারেটের ধোয়া ছেঁড়ে একটু কুটিল হাসি হেসে বলে উঠল, যেদিকে বলবে, সেদিকে যাব।
মেয়েটা বুঝল, এরা অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে জিজ্ঞেস করছে। পিছিয়ে এল। বলে উঠল, না, না। আমি বাসের জন্য অপেক্ষা করব। ধন্যবাদ।
গাড়িটা তবু গেল না। গাড়ি থেকে এবারে নেমে এল দুটো ছেলে। বেশ লম্বা চওড়া চেহারা। দেখেই বোঝা যায়, ভালো টাইপের নয়।
এগিয়ে এসে মেয়েটার হাত ধরে টানতে টানতে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করল।
আমি প্রতিবাদ করতে এগিয়ে গেলাম। বলে উঠলাম, কী করছেন আপনারা? ওকে জোর করে তুলছেন কেন?
দুজনের মধ্যে একজন হঠাৎ করে একটা রিভলভার বার করে আমার মাথায় ঠেকিয়ে বলে উঠল, সর—সর, বেশি দরদ হচ্ছে, তা-ই না? একদম মাথা লক্ষ করে ট্রিগার চালিয়ে দেব। হিরোগিরি হচ্ছে আমাদের সঙ্গে? কে জানিস আমরা?
মেয়েটাকে আবার দুজন টানতে টানতে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা ভয়ে কাঁদতে শুরু করছে। চেঁচাচ্ছে। কিছু গাড়ি না থামিয়ে পাশ দিয়ে হাইস্পিডে চলে গেল।
আমি অবাক হলাম, আমার পাশে ঋক চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে এখনও। যেন ও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আমি যদ্দূর জানি ও খুব সেন্সিটিভ, খুব ভালো স্বভাবের, সাহসী। ওকে অন্তত আমি অন্য সবার থেকে অন্যরকম ভেবেছিলাম। ওরও আমার মতো এগিয়ে আসা উচিত ছিল। ভুল ভেবেছিলাম।
মেয়েটার জামা টানাহ্যাঁচড়ায় ছিঁড়ে গেছে। তবু সেই অর্ধনগ্ন অবস্থায় ওকে টেনে তোলা হচ্ছে গাড়িতে। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। ছুটে গিয়ে ধাক্কা দিলাম ওই দুজনের একজনকে। সে ঘুরে দাঁড়াতে আমার গায়ের সব জোর একত্র করে মুখে মারলাম এক ঘুসি। বলা যায় জীবনের প্রথম ঘুসি।
কিন্তু ছেলেটা সেটা সামলে কনুই দিয়ে আমার মুখে জোর আঘাত করল। গায়ে বেশ জোর। আমি ছিটকে মাটিতে পড়লাম। ইতিমধ্যে আরও একটা লোক গাড়ি থেকে নেমে এল। দেখি, সে একটা রড নিয়ে তেড়ে আসছে আমার দিকে। আমার মাথা লক্ষ করে জোরে লোহার রডটা চালাল। কিন্তু আমার মাথায় লাগার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখি, ওটা থেমে গেল।
কোনো একজন অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় রডটা ধরে ফেলেছে। কুচকুচে কালো তার গায়ের রং। মুখে একটা মুখোশ। অজামিল।
কোত্থেকে এল! তারপর যেটা হল, সেটা আমি কোনোদিন সামনে থেকে দেখব ভাবিনি। রডটা কেড়ে নিয়ে সেটা দিয়ে সজোরে আঘাত করল গাড়ির থেকে নেমে-আসা সেই লোকটার কোমরে। লোকটা আঁক করে একটা আওয়াজ করে পরে গেল। আরেকজন রিভলভার চালানোর আগেই পা দিয়ে অজামিল তাকে আঘাত করল। রিভলভারটা ছিটকে গিয়ে দূরে পড়ল। গাড়ির ড্রাইভার ইতিমধ্যে নেমে এসেছে। তার হাতে একটা ধারালো ছোরা।
তারপর শুরু হল অসম লড়াই। হ্যাঁ, অসমই বলব কারণ অজামিল একই সঙ্গে চারজনকে যেভাবে পেটাতে শুরু করল, সেরকম মার আমি আগে কখনো দেখিনি। একজনকে আকাশে প্রায় পনেরো ফুট উপরে ছুড়ে দিল। লোকটা মাটিতে পড়ে আর নড়ল না। দুজনের হাত মটমট করে আমার সামনেই ভাঙল। কিছুক্ষণ বাদেই দেখলাম রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে আছে চারজনের দেহ। একজন অজ্ঞান, বাকি কজন মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে। মনে হয়, হাত আর পায়ের বেশ কয়েকটা হাড় ভেঙে গেছে ইতিমধ্যেই।
আমি ও মেয়েটা অবাক হয়ে দেখছিলাম। কথা বলার অবস্থাতেও ছিলাম না।
অজামিল এবারে ওদের গাড়িতে উঠে আমাকে ও ওই মেয়েটাকে ওই গাড়িতে উঠতে নির্দেশ দিল। অবাক হয়ে দেখলাম ঋক নেই। কোথায় গেল? এখানেই ও ছিল।
চাবি গাড়িতেই ছিল।
—তাড়াতাড়ি গাড়িতে বোসো।—ফের বলে উঠল অজামিল।
এবারে বুঝতে পারলাম। চেনা গলা। ঋকের গলা।
মেয়েটা অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, থ্যাঙ্কস অজামিল। থ্যাঙ্কস দাদা, তোমাকেও। তোমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ। আজ তোমাদের জন্যই জীবন ফিরে পেলাম। আমি তোমার খুব বড়ো ফ্যান, অজামিলদা। কোনোদিন এভাবে দেখা পাব আশা করিনি।
অজামিল কোনো উত্তর দিল না। গাড়ি চালাতে চালাতে পুলিশকে ফোন করে বলল এই ঘটনার কথা। জানাল, যাতে অপরাধীদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।
আমরা চুপ করে বসে ছিলাম। আমি ইচ্ছে করে কথা বলছিলাম না। আমিও চাইনি ঋকের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাক। মেয়েটাকে ওর বাড়ির সামনে ড্রপ করে গাড়িটা কিছু দূরে একটা অচেনা রাস্তায় ছেড়ে দিল অজামিল ওরফে ঋক। আমাকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
মুখোশ ফেলে দিল। এবারে হঠাৎ করে দেখলাম ওর রং আর কালো নেই। ফরসা হয়ে গেছে। যেটা ওর স্বাভাবিক রং।
হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠল, জানি, তোর উপর ভরসা করা যায়। কিন্তু তবু বলছি, আমার কথা তোর বাবা-মা-কেও বলবি না। গায়ের রং বদলানোর ক্ষমতাটা আমার ছোটোবেলা থেকেই ছিল। কিন্তু আমি নিজে জানতাম না। আমার আরও বেশ কিছু ক্ষমতা আছে, যা তুই কিছুটা জানিস।
এতক্ষণে বলে উঠলাম, কিন্তু তুই আসলে কে? কী করে এসব ক্ষমতা পেলি?
ও মুচকি হেসে বলে উঠল, আমার মা-র কাছে গল্পটা শুনেছিলাম। আমাকে আমার বাবা একটা নর্দমার ধারে খুঁজে পেয়েছিল। আমাকে নিয়ে আসে। আমার গায়ে একটা ছোটো নীল রঙের চাকতি ছিল। খুব অন্যরকম বলেই ওটা সরিয়ে যত্ন করে রেখেছিল। আমি একটু বড়ো হয়ে ওই চাকতিটা বাড়িতে খুঁজে পাই। আমার মনে হয়, আমার সব রহস্য ওই চাকতির মধ্যেই লুকোনো আছে। কিছুটা জেনেছি। হয়তোপুরোটা ভবিষ্যতে জানব।
আরেকটা কথা। তুই ঘুসিটা কিন্তু ভালোই চালিয়েছিলি। একটু প্র্যাকটিস করিস।
আমি আমার মুখের ব্যথা আর ভাঙা দাঁত নিয়ে হেসে উঠলাম। ওই ছেলেটার কনুইয়ের গুঁতোয় ছিটকে পড়েছিলাম।
বলে উঠলাম, কিন্তু তুই শুরুতে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেন?
ও হেসে বলে উঠল—আমি তোর কাছে ধরা দিতে চাইনি। সেজন্যে একটু দ্বিধা করছিলাম। মনে রাখবি, তুই একাই আজ এই রহস্য জানলি। আর কেউ কোনোদিন জানবে না যে ঋক আর অজামিল এক লোক। এটা জানলেই আমি ধরা পড়ে যাব। আমি চাই একদম সাধারণ হতে। তোর মতো। তবে সাধারণ হয়েও যে সবার অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে, ক্ষমতা আছে, সেটা আমি দেখিয়ে দিতে চাই। আর কতদিন আমরা চুপ করে থাকব?
এই যেমন তুই আজ জেগে উঠলি। ভয় না পেয়ে মেয়েটাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলি। আমি চাই, এভাবেই সবাই অন্যায় সহ্য না করে জেগে উঠুক, প্রতিবাদ করুক। তার জন্য অজামিলকে লাগবে না। লাগবে না অন্য গ্রহ থেকে আসা কোন ভিনগ্রহীর সাহায্যও।
শেষ লাইনটা বলার সময় মনে হল, ঋকের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ছিল। আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফের বলে উঠল, আমি যেই হই-না কেন, মনে রাখবি আমার একজনই বন্ধু, সে হলি তুই। কিন্তু তোকে আমি অন্যায়ভাবে কোনোদিন সাহায্য করব না। জানি, তুই একাই পারবি।
২৯আগস্ট২০২২
লুবেক, জার্মানি
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন