সপ্তম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

ঝালকাঠি থেকে ফিরছিল অহনা। পিছনে মায়াকে নিয়ে। অবিরাম বকর বকর করে চলেছে মায়া, কিছু শুনছিল অহনা, বেশির ভাগটাই তুলছে না কানে। মগজে চিন্তা গজগজ করছে যে। তাঁতিপাড়ার মেয়েগুলো ছাড়ল না কিছুতেই। ঋণ নাকি তাদের এক্ষুনি প্রয়োজন, দলবেঁধে নিতে পারলেই নাকি তাদের সুবিধে, সুতরাং স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়া ছাড়া তাদের নাকি উপায় নেই। এদিকে ঝামেলা বাড়ল অহনার। এককাঁড়ি কাগজ তৈরি করো, সরকারি দপ্তরে নতুন গোষ্ঠীর নাম জানাও, মোট কতজন আছে, কে কে আছে তার তালিকা পাঠাও...। সব কাজ একা হাতে করতে হবে। এমনকী সরকারি দপ্তরে হাতে করে দিয়েও আসতে হবে চিঠিগুলো। পোস্টে পাঠালে বেমালুম অস্বীকার করবে হয়তো। কম বখেড়া!

মায়ার প্রশ্ন ঠিকরে এল, “ম্যাডাম, কী নাম ঠিক হল তা হলে?”

“ওরা যা বলেছে তাই। তাঁতিয়া।”

“কেমন যেন শোনাচ্ছে না! কিছু একটা শ্রী ফি দিয়ে নাম হলে ভাল হত। গৃহশ্রী, তন্তুশ্রী, গোছের...”

“আমাদের তো পাকামি করার দরকার নেই। ওদের ব্যাপার ওদেরই বুঝতে দাও।”

“এরা কবে থেকে লোন পাবে ম্যাডাম? মানে আমাকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞেস করছিল কিনা...”

প্রশ্নটা মায়া কেন করল অহনা ভাল মতোই জানে। ধার না পেলে ধার শোধ শুরু হবে না, আর দেনা যখন শুধবে, তখনই তো মায়াদের আসল রোজগার। ঘরে গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসে বলে প্রতি একশোয় আট টাকা করে দিতে হয় মেয়ে বউদের। তার অর্ধেক আশাবরীর প্রাপ্য, বাকি অর্ধেক পায় মায়ারা। কমিশনের ওই বাড়তি টাকাটা আছে বলেই না মাত্র দেড় হাজার মাইনে পেয়েও মাসভর উদয়াস্ত খাটে এরা।

তবু মায়ার এই হাঁকপাকানিটা অহনার পছন্দ হল না। কেঠো গলায় বলল, “এক্ষুনি এক্ষুনি হবে না। কলকাতায় যাই, গভর্নমেন্টের খাতায় এদের নাম তুলে দিয়ে আসি, তারপর।”

“গর্ভমেন্ট তো তখন তাঁতিয়ার জন্য আশাবরীকে একটা টাকাও দেবে, তাই না?”

অহনা এবার একটু বিরক্তই হল। কোত্থেকে কী শুনেছে কে জানে, মায়া শান্তা দেবিকাদের মনে ধারণা জন্মেছে, স্বনিভর্র গোষ্ঠীগুলোর দৌলতে বিস্তর টাকা পায় অহনা। আদতে মোটেই তো তা নয়। সরকার তো দেয় মাত্র একবার। গোষ্ঠী পিছু দশ হাজার। সেই টাকাও আসে চার-পাঁচ দফায়। নাম পাঠানোর পরে কিছু দিল, টাকা ধার নিয়ে কাজ শুরু হল, তখন কিছু দিল...। এভাবেই খেপে খেপে দু’-তিন হাজার করে...। প্রতিবারই কাগজ পাঠাতে হয় গাদাগুচ্ছের। টাকার গন্ধ পেয়েই নাচে মেয়েরা, অহনার এ ঝঞ্ঝাটগুলো থোড়ি বোঝে।

অহনা গম্ভীর মুখে বলল, “ফালতু কৌতূহল কমাও। নিজের কাজ মন দিয়ে করো। মাথায় রেখো, আশাবরী তার কর্মচারীদের কখনও প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে না।”

“আমি কি তাই বলেছি?”

“ভবিষ্যতেও বোলো না। আশাবরী সরকারের কাছ থেকে কী পায়, কেন পায়, কিছুই যখন জানো না, আজেবাজে চিন্তাও মাথায় এনো না।”

বকুনিতে কাজ হল। চুপ মেরে গেছে মায়া। গণেশপোতার মুখটায় নেমে গেল। বাড়ি যাবে সোজা। দুপুর গড়াচ্ছে বিকেলের দিকে। পথে জীবনবাবুর দোকান খুলে গেছে, টুকিটাকি জলখাবারের সরঞ্জাম কিনল অহনা। পাঁউরুটি ডিম মাখন...। এক প্যাকেট চানাচুরও নিল, খানিকটা চিঁড়েও। মা থাকলে এসব নিয়ে ভাবতে হয় না, নিজেই হাঁটতে হাঁটতে এসে কিনে নিয়ে যায়। সে একা থাকলেও সমস্যা নেই, স্রেফ মুড়ি বিস্কুটেই চালিয়ে নিতে পারে এক দু’ সপ্তাহ। অর্ঘ্য রয়েছে বলেই না এসবের বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে, রোজ রোজ তো থোড়-বড়ি-খাড়া খাওয়ানো যায় না। তাও কপাল ভাল, চেনা লোক, মাছটা সবজিটা বাড়িতে এসে দিয়ে যায়, নইলে তো অহনাকে রোজ ছুটতে হত বাজারে।

আশাবরীর কম্পাউন্ডে ঢুকে মৃদু চমক। অফিসের সামনে দু’-দু’খানা গাবদা মোটরবাইক। কে এল রে বাবা?

জিনিসগুলো বাড়িতে রেখে আসবে ভেবেছিল অহনা, সামান্য দোনামোনা করে আগে অফিসেই এল। দেখল, এসেছে মোট তিনজন। এক মধ্যবয়সি আর এক বছর তিরিশের গাঁট্টাগোট্টা অফিসঘরে আসীন। তিন নম্বরটি একেবারে ছোকরা, মেরেকেটে একুশ-বাইশ, পাশের ঘরের দরজায় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে নিরীক্ষণ করছে মেয়েদের কাজকর্ম।

অহনার আগমনে উঠে দাঁড়িয়েছে গাঁট্টাগোট্টা। ঝুঁকে অহনাকে নমস্কার করে পাশের মধ্যবয়সিকে দেখিয়ে বলল, “দাদাকে চেনেন নিশ্চয়?”

“না, মানে...” অহনা সামান্য কুণ্ঠিতভাবে বলল, “আমি তো এখানে তেমন একটা কাউকে... কাজে এমন আটকে থাকি...”

“অত কিন্তু কিন্তু করছেন কেন?” এবার মধ্যবয়সি নড়েচড়ে বসল, “আমরা তো জানি আপনার কর্মকাণ্ড কত সুদূর অবধি বিস্তৃত। আপনার নিরলস নিঃস্বার্থ সেবা পেয়ে ধন্য হয়েছে টিয়াডাঙার আপামর জনগণ। আমরা যে আপনাকে চিনি, এই তো আমাদের পরম সৌভাগ্য।”

কী বলছে রে বাবা! অহনা মহান কিছু করেছে বলে তো মনে হয় না। বরং অর্ঘ্য সেদিন যা বলছিল, সেটাই তো সত্যির অনেক কাছাকাছি। মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য চটজলদি ধারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে বটে, কিন্তু প্রাথমিক সার্ভিস চার্জ, প্রসেসিং ফি, বাড়ি বয়ে টাকা পৌঁছে দেওয়া, বাড়ি গিয়ে মাস মাস কিস্তি সংগ্রহ বাবদ যা নেয়, সব মিলিয়ে সুদের হার গ্রামীণ কুসীদজীবীদের চেয়ে বেশিই হয়, কম তো কিছুতেই নয়। তারপরও কেউ এমন বিশেষণ ঝাড়লে মোটেই গর্ব হয় না, উলটে ধন্দ জাগে মনে।

মধ্যবয়সিটির ওজনদার ভাষণ শুনে গাঁট্টাগোট্টা কিন্তু মোহিত। জুলজুল চোখে দাদাটিকে দেখতে দেখতে অহনাকে বলল, “ইনি তারক মজুমদার। আমাদের টিয়াডাঙা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সত্যেন্দ্র আচার্যের একান্ত কাছের লোক।”

অহনা দু’-এক সেকেন্ড ভেবে পেল না, এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত। তারপরই বাস্তববোধ ফিরেছে। নরম হেসে বলল, “ওয়েলকাম টু আশাবরী। বলুন কী খাবেন? চা না কফি? বাইরে থেকে আনতে হবে না, আমার মেয়েরাই বানিয়ে দেবে।”

“যা খুশি। তবে বিকেলের দিকে... কফি হলেই ভাল।”

বিকেলের সঙ্গে কফির কী সম্পর্ক, অহনার মাথায় ঢুকল না। তবে এঁদের যে তুরন্ত আপ্যায়ন প্রয়োজন, এটুকু বুদ্ধি অহনার ঘটে আছে। উঠে গিয়ে ইলাকে বলে এল কফির সঙ্গে যেন বিস্কুট ফিস্কুটও দেওয়া হয়। অফিসঘরে যখন ফিরল, মধ্যবয়সি আর গাঁট্টাগোট্টা অনুচ্চস্বরে কী যেন আলোচনা করছে। অহনাকে দেখেই ঝুপ করে থেমে গেল দু’জনে।

অহনা অস্বস্তিবোধ করল। এমনিতেই রাজনীতির লোকদের সে এড়িয়ে চলে প্রাণপণ, কিন্তু ঘরের মধ্যে এসে গেলে সে তো নাচার। এদের আজ মতলব একটা আছে নিশ্চয়। কায়দা না মেরে চটপট ঝেড়ে কাশুক না।

মুখে অহনা বলল, “আশাবরীর কাজকর্ম দেখতে এসেছেন বুঝি?”

“না না, আমরা তো সব জানিই।” ফের খোনাখোনা গলা বেজে উঠল, “আর জানি বলেই তো...”

“এম এল এ সাহেব আমাদের পাঠালেন। বললেন, জিজ্ঞেস করে এসো ওঁকে আমরা কীভাবে হেল্প করতে পারি।”

“ভাষাটা ঠিক কর গদা।” তারক মৃদু ধমক দিল, “সত্যেনদা বললেন, ওঁর কী কী লাগবে দেখে এসো।”

“অনেক ধন্যবাদ। মাননীয় এম এল এ সাহেবকে আমার নমস্কার জানাবেন।” অহনা সৌজন্যের সুরে বলল, “তবে আমার ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান... মোটামুটি তো চলেই যাচ্ছে।”

“তা বললে হয় নাকি? বিধায়ক মশাই আপনার জন্য ফান্ড অ্যালট করবেন বলে বসে আছেন।”

সংশয়ের মাত্রাটা বেড়ে গেল অহনার। তবু বিনীত স্বরে বলল, “আমি একা মানুষ, এই যা করছি, আমার পক্ষে যথেষ্ট। বেশি বড় করতে গেলে আমার সাধ্যের বাইরে চলে যাবে।”

“আপনার এই বিল্ডিংটা তো আপনি কমপ্লিট করে নিতেই পারেন ম্যাডাম।” গদাধ্বনি শোনা গেল। গলা চড়িয়ে বলল, “অ্যাই শাঁটুল, কীর’ম পড়বে একটু হিসেব করে দ্যাখ তো।”

“ও আমার মাপা হয়ে গেছে। তিন লাখে ঝকাস নেমে যাবে।” শাঁটুলের বিশেষজ্ঞ মতামত মুহূর্তে হাজির, “তবে বস, পিডব্লুডি তো করবে কাজ, আরও দশ পার্সেন্ট হেসে খেলে ধরে রাখো।”

“ঠিক আছে, সাড়ে তিনই স্যাংশন করিয়ে দেব।” খোনাস্বর অভয় দিল, “ওপাশে আরও দু’খানা ঘর পেলে আশাবরীর তো অনেকটাই সুবিধে...”

সংলাপগুলো অলীক মনে হচ্ছিল অহনার। সে আর্জি জানায়নি, কোথাও কারও কাছে প্রকাশ করেনি তার বাসনা, হঠাৎ আশমান থেকে টাকা ঝরে তৈরি হয়ে যাবে বাড়িটা! রাজনীতির লোকরা কি অন্তর্যামী! উঁহু, ছোটবেলায় কোথায় যেন পড়েছিল না, দেয়ার ইজ় নাথিং কল্‌ড্‌ অ্যাজ় ফ্রি লাঞ্চ। জীবনে তো সে দেখেওছে বিনামূল্যে কিছুই জোটে না, মা-বাবা-দাদার ভালবাসা পেতেও মোটা দাম চুকোতে হয়!

কফি এসে গেছে। অহনাই কাপগুলো বাড়িয়ে দিল হাতে হাতে। নিজেও নিল। স্মিত মুখে বলল, তা আমাকে এর জন্য কী করতে হবে?

“কিচ্ছু না। পি ডব্লু ডি-র ইঞ্জিনিয়রকে পাঠিয়ে দেব, উনিই মেপেজুপে হিসেব করে একটা এস্টিমেট বানিয়ে দেবেন। আপনি সেইটা আর সঙ্গে একটা আবেদনপত্র লিখে রাখবেন। গদা নিজে এসে নিয়ে যাবে।... দু’মাসের মধ্যে আপনার এখানে মিস্ত্রি লেগে পড়বে, শীতের আগেই দেখবেন কাজ শেষ।” তারক একটু দম নিল। তারপর কফিতে একটা বড় চুমুক দিয়ে বলল, “তা ম্যাডাম, আমরা যেমন আশাবরীর জন্য মাঠে নামব, আশা করি আপনিও আমাদের একটু মদত করবেন।”

অহনার স্নায়ু নাড়া খেল সামান্য। সামলে নিয়ে বলল, কীভাবে?

“তেমন কিছু না।” গদা একবার তারককে দেখে নিয়ে বলল, “আপনি নিশ্চয় শ্যামাঙ্গিনীর নাম শুনেছেন?”

“ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি?” অহনা সতর্ক ভাবে বলল, “হ্যাঁ, সাইনবোর্ড বিজ্ঞাপন দেখেছি।”

“খুব জেনুইন প্রতিষ্ঠান, ম্যাডাম। ওরাও গ্রামের লোকদের ভাল চায়। আপনারই মতন। ...তাই বলছিলাম কি... আশাবরীর পাশে পাশে এখানে যদি শ্যামাঙ্গিনীরও একটা অফিস খোলা যায়... আপনিই তার হেড থাকবেন, ...মানে এখানে শ্যামাঙ্গিনীর টাকাপয়সা যা সংগ্রহ করা হবে... আপনি তার থেকে একটা মোটা কমিশনও পাবেন। আপনাকে খাটতেও হবে না... আমাদের লোকই যা করবার করবে...”

শ্যামাঙ্গিনীর ব্যাবসার ধরন মোটামুটি জানে অহনা। জমা টাকার বিনিময়ে চড়া সুদ দেয়। কীভাবে দেয়, সে সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা আছে বই কী। সেই মানুষটাই তো আছে এই ধান্দায়। কোন দিকে নিয়ে যায় এই কারবার, আন্দাজ আছে বলেই না সে আজ আলাইপুরে। জেনেশুনে সেই বিষ পান করবে অহনা। কভি নেহি। আস্ত সংসার ভেঙে সে চলে এল, আর এ তো সামান্য একটা বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার টোপ!

কিন্তু এদের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি তো করা যাবে না, বুদ্ধি করেই ঠেকাতে হবে। পলক ভেবে অহনা সবিনয় তারককে বলল, “সরি স্যার। আশাবরীতে ওরকম কিছু তো করা যাবে না।”

“কেন?”

“জমি বাড়ি সব তো ব্যাঙ্ককে মর্টগেজ করা আছে। সত্যি বলতে কী, আমি এখন মর্টগেজ না ছাড়িয়ে বাড়ির কাজেও হাত দিতে পারব না।”

“তো ছাড়িয়ে নিচ্ছেন না কেন? আমরা কি হেল্প করতে পারি?”

“অনেক টাকার ব্যাপার স্যার। পনেরো-ষোলো লাখ। তা ছাড়া আমার মাও তো মর্টগেজে একজন পার্টি... বুঝতেই তো পারছেন... ওঁর বয়স হয়েছে...”

একেবারেই অর্থহীন যুক্তি, কিন্তু এই মোটা মাথা ধান্দাবাজদের জন্য এটাই যথেষ্ট, একটু ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে পারলেই এরা ভারী বিজ্ঞের মতো মুখ করে গিলে নেবে, অহনার এই অনুমান অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। তুম্‌বো মুখে একটুক্ষণ বসে রইল তিন মূর্তি, তারপর গিয়ে উঠেছে মোটরসাইকেলে। হেলমেট ছাড়াই। স্টার্ট দেওয়ার আগে অহনা ভারী দুঃখী দুঃখী মুখ করে তারককে বলল, “আমার ভাগ্যটাই খারাপ স্যার, কত বড় একটা সুযোগ মিস হয়ে গেল বলুন তো?”

ঢকঢক ঘাড় নেড়ে লোকগুলো চলে যেতেই অহনার পেট গুলিয়ে হাসি এসে গেল। অনেক দিন পর হাসছে প্রাণ খুলে। ইলারাও অবাক। এমন উচ্ছল মূর্তিতে ম্যাডামকে তারা কখনও দেখে না তো।

বেশিক্ষণ আর অফিসে না থেকে বাড়ি এল অহনা। কৃষ্ণা রাতের রান্না বসিয়েছে, এরপর রুটি করবে। তাকে চা বানাতে বলে বিছানায় গড়াগড়ি খেল খানিকক্ষণ। পলকের জন্য মনে হল ব্যাঙ্কে গিয়ে ওভারড্রাফটের লিমিটটা বাড়িয়ে দিয়ে আসবে। পরক্ষণে মত বদলাল। তুৎ, বোকাগুলো থোড়াই ব্যাঙ্ক অবধি গিয়ে খোঁজখবর করবে, মিছিমিছি তার চাপ বাড়ানোর প্রয়োজন কী।

চা শেষ করে বৈকালিক স্নান। ক’দিন খুচরো খাচরা বৃষ্টির কারণে আজ গরমটা বেশ প্যাচপ্যাচে, গায়ে জল ঢেলে আরাম হল খুব। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা ছটফটানিও চলছে। ঘটনাটা কারওকে না বলতে পারলে স্ফূর্তিটা যেন জমছে না। কাকে জানাবে? ফোন করবে মাকে? নাহ মা যা ভিতু, ঘাবড়ে যাবে, উলটে হয়তো জ্ঞান ঝাড়তে আরম্ভ করবে। অর্ঘ্যটা গেল কোথায়? সন্ধে তো নেমে গেল, সে এখনও ফিরছে না কেন?

মোবাইলে অর্ঘ্যর নম্বর টিপল অহনা। যান্ত্রিক ঘোষণা বাজছে... যে নম্বরটি আপনি ডায়াল করেছেন এই মুহূর্তে সেটি সুইচড অফ অথবা মোবাইল পরিষেবার বাইরে...। কী ব্যাপার, অর্ঘ্য তো ফোন বন্ধ রাখে না! কোথায় এমন গেল যেখানে টাওয়ার মিলছে না?

বাইরে মোটরসাইকেলের আওয়াজ। অহনার বুক ধক করে উঠল। মক্কেলরা ফিরে এল নাকি?

শঙ্কিত পায়ে গ্রিলবারান্দায় আসামাত্র অহনার মুখমণ্ডল হাসিতে ভরে গেছে। সুশোভন স্যার।

দরজা খুলে দিয়ে অহনা হাউমাউ করে উঠল, “কোথায় ছিলেন অ্যাদ্দিন? কতবার চেষ্টা করেছি, কিছুতেই আপনাকে ধরতে পারছি না। ফোন কেন বন্ধ রেখেছিলেন? ভাবছিলাম কাল পরশুই আপনার বাড়ি গিয়ে হানা দেব...”

“আস্তে আস্তে। এত প্রশ্নের উত্তর কি একবারে দেওয়া যায়?” দীর্ঘদেহী মানুষটি দু’হাত তুলে থামালেন অহনাকে, “একটু জিরোতে দাও, চা জল খাওয়াও... ওফ, বড্ড থকে গেছি।”

এই বাক্যটি সুশোভনের মুখে কখনও শোনেনি অহনা। বয়স অনেকই হয়েছে স্যারের, চুয়াত্তর পঁচাত্তর তো বটেই, কিন্তু টগবগ করেন সারাক্ষণ। এত জোরে হাঁটেন, অল্পবয়সিরাও পাল্লা দিতে হাঁপিয়ে যায়। মুখেচোখে বয়সের ছাপও নেই তেমন। মাথার চুলগুলো ধবধবে সাদা না হলে স্বচ্ছন্দে পঞ্চান্ন বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

বাইরের ঘরের সোফায় বসেছেন সুশোভন। হেলান দিয়ে। লম্বা পা সামান্য ছড়িয়ে। পরনে আজ পাজামা পাঞ্জাবি নয়, প্যান্ট-শার্ট। হেলমেটখানা রেখেছেন সেন্টারটেবিলে।

তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে জল আনল অহনা। সুশোভনের হাতে গ্লাস ধরিয়ে বলল, “আপনাকে এত টায়ার্ড দেখাচ্ছে কেন স্যার?”

“আই অ্যাম ফাইন।” এক চুমুকে জল শেষ করে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন সুশোভন। দু’হাত সোফার কাঁধে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ব্যক্তিগত কাজে কয়েক দিন কলকাতায় গিয়ে থাকতে হচ্ছিল। আজই ফিরেছি। ভাবলাম তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই। আমার বিশ্বস্ত স্কুটারটা আমায় বিট্রে করল, ব্যাটা স্টার্ট নিল না। অগত্যা ভাইয়ের এই দামড়া মোটরসাইকেল। অনেক দিন অভ্যেস নেই তো... এত ভারী... তার ওপর তোমাদের এই রাস্তা... দম নিকলে গেছে।”

“আপনার ভাই মানে সুশীতলবাবু তো? স্টেশনের ধারে যাঁর ওই বড় ওষুধের দোকান...”

“ভাল নামটা জানো তা হলে?” হাসছেন সুশোভন, “টিয়াডাঙার লোকরা তো ওকে অন্য নামে চেনে। সুশোভনের ভাই অশোভন।”

“এমা ছি ছি কেন?”

“দ্যাখোনি ওর কারবার? কলকাতা থেকে নামকা ওয়াস্তে স্পেশালিস্ট ডাক্তার এনে বসাচ্ছে আর তিন হাতে কামাচ্ছে। ডাক্তারের ফি থেকে কমিশন, তাদের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ বিক্রির লাভ, প্লাস ডাক্তারবাবুরা হেন টেস্ট নেই যা করান না, সেই সুবাদে ওর প্যাথোলজিকাল ল্যাবরেটরিটাও গড়গড়িয়ে চলছে।” সুশোভন একটু দম নিলেন, “জানো, ও এক সময়ে দারুণ মার্কস পেয়ে ডাক্তারি পাশ করেছিল। প্যাথোলজি ছিল ওর স্পেশাল পেপার। বাবার স্বপ্ন ছিল, তখনকার এই অজ টিয়াডাঙার মানুষদের যেন আর রক্তটক্ত পরীক্ষার জন্য দূরদূরান্তরে যেতে না হয়, ছোটন যেন একটা ল্যাবরেটরি খোলে এখানে। মিনিমাম চার্জ় নেবে, দরকার হলে গরিবদের কাছে থেকে পয়সা নেবে না...। ছোটনও সেই মটো মেনে ওই জায়গায় গোড়ায় একটা ডিসপেন্সারি খুলেছিল। নিজে চিকিৎসাও করত, পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালাত নিজের ল্যাবরেটরিতে। দশ বছরও গেল না, চিকিত্সাটা একেবারেই ছেড়ে দিয়ে ব্যাটা পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী বনে গেল। এখন রোগীর গলায় গামছা দিয়ে টাকা কামায়।”

“আপনি স্যার অকারণে নিন্দে করছেন। আজকাল মাগনা কি কিছু হয়?” অহনা ঠাট্টার সুরে বলল, “ওভাবে দেখলে তো স্যার আমিও তো মেয়েগুলোকে চুষছি। ওরা হয়তো টের পাচ্ছে না, কিন্তু আমি তো একশো টাকা ধার দিয়ে দুশো টাকা উশুল করছি।”

“তোমার ব্যাপারটা আলাদা।” সুশোভন দু’দিকে ঘাড় নাড়ছেন, “তুমি জানো না, গ্রামের মেয়ে-বউদের তুমি কতটা ভরসা। ব্যাবসা করতে করতেই কত সহায় সম্বলহীনাকে তুমি পায়ের তলায় মাটি জুগিয়েছ... পরিবারে তাদের ওজন কত বেড়ে গেছে...। আর লাভের পয়সায় তো তুমি ব্যাঙ্কের পাশবই মোটা করছ না, আরেক দল মেয়ের পিছনে ঢালছ।”

সুশোভনের মুখে প্রশংসা শুনলে অহনা যেন গুটিয়ে যায়। সে তো জানে অত কিছু ভেবে সে আশাবরী খোলেনি। শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়ার তাড়নায় স্যারের পরামর্শে এই পথটা বেছে নিয়েছিল। প্রথম প্রথম হয়তো তৃপ্তিও পেত, কিন্তু এখন একঘেয়েমির ফাঁসকলে বিরক্তির গাদ পুরু হচ্ছে ক্রমশ।

কৃষ্ণার কেটে পড়ার সময় হয়েছে। উঠে গিয়ে তাকে চা জলখাবারের কথা বলে এল অহনা। ফের বসতেই সুশোভনের প্রশ্ন, “তোমার মাকে দেখছি না যে?”

“কলকাতা গেছে। দাদার কাছে। সামনের সপ্তাহে ফিরবে।”

“ও। তার মানে তুমি এখন একা?”

“না। অতিথি আছে একজন।”

সংক্ষেপে অর্ঘ্যর পরিচয় দিল অহনা। শুনে সুশোভন বললেন, “বাহ, তোমার তো তা হলে গল্পে আড্ডায় ভালই সময় কাটছে।”

অহনা মনে মনে বলল, সে আর থাকে কতক্ষণ? যদি বা থাকে, নিজের খুপরিতে বেশিটা সময় কাটায়। টিভিতে শুধু খবরের চ্যানেল দেখে, সিনেমা সিরিয়াল খেলাধুলো কোনও কিছুতেই উত্সাহ নেই। অহনাও তো খুব বাকপটু গপ্পো টাইপ নয়, দু’জনের তা হলে জমবে কী করে?

মন্তব্য না করে মৃদু হাসল অহনা। কেজো প্রসঙ্গে ঢুকতে চাইল, “আপনাকে স্যার একটা খবর দেওয়ার ছিল।”

“আমি জানি। সরকারি অর্ডার পেয়েছ তো?”

“হুঁ।”

“সুষ্ঠু ভাবে ডেলিভারিটা দাও, আরও অর্ডার পাবে। বোধহয় শিগগিরি কিছু সোলার প্যানেলও চাইবে। পরিবেশ নিয়ে এখন খুব মাতামাতি চলছে তো... তুমিও তার কিছুটা ফায়দা নাও।”

“কিন্তু স্যার...তা হলে তো কারখানাটা আরও বাড়াতে হয়...”

“কে বারণ করেছে বাড়াতে? বিল্ডিংটা ওভাবে ফেলে রেখেছ কেন, শেষ করো। তেমন হলে ব্যাঙ্কে অ্যাপ্রোচ করো, তারা নিশ্চয়ই তোমায় টাকা দেবে। ব্যাঙ্ক আপত্তি করবে না, আই অ্যাম শিয়োর।”

অহনা কাঁটা হয়ে গেল। সুশোভন যদি শোনেন ব্যাঙ্কের প্রস্তাবে সে না বলে এসেছে... আহত হবেন নিশ্চয়ই। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে লঘু পরিবেশ আনতে চাইল ঘরে। বৈকালিক উপদ্রবের কাহিনি বলল স্যারকে। রসিয়ে রসিয়ে।

সুশোভন তো শুনেই গম্ভীর। বললেন, “কাজটা কিন্তু তুমি ঠিক করোনি।”

“মানে? এখানে শ্যামাঙ্গিনীর অফিস খুলবে, আমি অ্যালাও করে দেব?”

“না। কায়দা করে না এড়িয়ে সরাসরি ওদের প্রস্তাব নাকচ করা উচিত ছিল।”

“ওরা তাতে ছাড়ত? জোরজার করত না?”

“এখনও কি তুমি ছাড় পাবে ভেবেছ? রাজনীতির লোকদের আন্ডার এস্টিমেট কোরো না। ওরা আবার আসবে, আসবেই। আশাবরীর গুডউইল ওরা ব্যবহার করতে চায়। তোমায় ওদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে হবে, তুমি এটা হতে দেবে না। কাজটা হয়তো কঠিন, কিন্তু কৌশল করে তুমি আশাবরীকে বাঁচাতে পারবে না। একমাত্র তুমি রুখে দাঁড়ালেই ওরা হয়তো পিছু হঠতে পারে।”

সুশোভনের যুক্তি একেবারেই মনঃপূত হল না অহনার। স্যারের আর কী, বলেই খালাস, ভুগতে তো হবে অহনাকেই। লোকগুলো মোটেই সুবিধের নয়, আক্রোশের বশে যখন তখন হামলা করতে পারে। অতএব তুইয়ে-বুইয়ে চলাই তো ভাল। কোনও অনৈতিক ব্যাবসার সঙ্গে সে সংস্রব রাখবে না, এতে যদি আশাবরী উঠে যায় তো যাক।

টোস্ট ওমলেট রেখে গেল কৃষ্ণা। চা-ও। প্লেট হাতে তুলে কী যেন ভাবছিলেন সুশোভন। টোস্টে ছোট কামড় দিয়ে বললেন, “যাক গে, কী করবে সেটা তোমার ব্যাপার। তোমার ডিসিশন তো এখন থেকে তোমাকেই নিতে হবে।”

অহনা কথাটা ঠিক বুঝল না। অস্ফুটে বলল, “মানে?”

“কালই কলকাতা ফিরে যাচ্ছি। কবে আসব ঠিক নেই। মে বি এক মাস, মে বি দু’মাস, মে বি এক বছর... অনাথ আশ্রমের জন্য একজন লোক ঠিক করেছি... ইনফ্যাক্ট সেই কারণেই আজ আমার টিয়াডাঙায় আসা।”

অহনা বিস্মিত স্বরে বলল, “কেন স্যার? এখানে থাকবেন না কেন?”

“উপায় নেই বলে।” সুশোভনের লম্বাটে উজ্জ্বল মুখে ফ্যাকাশে হাসি, “আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ। প্রায় মৃত্যুশয্যায়, দুটো কিডনিই তার ফেল করেছে। লাস্ট উইকে অ্যাডমিট করেছি হসপিটালে, পরশু ছাড়বে। জানোই তো টালিগঞ্জে ছোট একটা ফ্ল্যাট আছে আমার। ওখানেই তুলব। তারপর ডায়ালিসিস চলবে রোজ। যে ক’টা দিন বাঁচে।”

প্রায় সহজ স্বরেই বললেন সুশোভন, কিন্তু অহনার বুকে যেন ধক করে লাগল। গীতালি আন্টিকে সে বেশ কয়েকবার দেখেছে। সুশোভনের ঠিক বিপরীত। নির্জীব ধরনের মহিলা। কথাবার্তা বলেন খুব কম। পুজোআর্চা নিয়েই থাকেন সারাক্ষণ। তাঁর এই দশা?

অহনা বিড়বিড় করে বলল। “হঠাৎ ধরা পড়ল বুঝি?”

“ফাইনাল ডায়াগনোসিস এখন হল। তবে অনেক দিন ধরেই তো ভুগছিল। সুগার, হাই প্রেশার...। চিকিৎসা করাতে চাইত না ঠিক মতো। তার যা ফল হয়।” সুশোভনকে কেমন যেন বিমনা দেখাল, “আসলে বহুকাল আগেই তো বাঁচার ইচ্ছেটা চলে গিয়েছিল।”

জিজ্ঞেস করব না করব না করেও অহনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “কেন স্যার?”

“সে এক বিশ্রী উপাখ্যান। আমাকেই তার ভিলেন বলতে পারো।” সুশোভনের প্রাণবন্ত মুখখানা হঠাৎই করুণ, “আমার একমাত্র ছেলেটা... তাতার... ও ছিল একটু অন্য ধাতের। পড়াশোনায় খুব একটা মন ছিল না। কবিতা লিখত, ছবি আঁকত...। গীতালি ওসব একদম পছন্দ করত না। ছেলেকে একটা বড় কিছু হতে হবে, দারুণ ব্রাইট কেরিয়ার গড়বে, এই ছিল তার স্বপ্ন। ছেলের পিছনে এঁটুলির মতো লেগে থাকত সারাদিন।... আমার মনে হত গীতালি ঠিক করছে না। কিন্তু অশান্তির ভয়ে প্রতিবাদ করিনি। বুঝিয়ে বাঝিয়ে ম্যানেজ করতে চেয়েছি গীতালিকে। লাভ হয়নি, গীতালি তার জেদে অনড়। পাঁচটা টিউটর লাগিয়ে রগড়াচ্ছে ছেলেকে... জয়েন্টে বসতে বাধ্য করল... মার গুঁতোয় কেমিক্যালে চান্সও পেয়ে গেল যাদবপুরে। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ার ওঠার পরীক্ষায় ফেল করল তাতার। তারপরই হঠাৎ একদিন সিলিংফ্যান থেকে...”

অহনা প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু স্বরযন্ত্র যেন বিকল। স্যারের ছেলে মারা গিয়েছে শুনেছিল, বটে, তবে এভাবে...? আশ্চর্য, অমন একটা অতীত আছে, স্যারকে দেখে তো বিন্দুমাত্র টের পাওয়া যায় না?

সুশোভন স্যার বলেই চলেছেন, “একটা সুইসাইড নোটও রেখে গিয়েছিল। মা, তোমার আকাঙ্খা পূর্ণ করতে পারলাম না। ক্ষমা কোরো। ...তারপর থেকেই গীতালি ডুবে গেল বিষাদের গহ্বরে। বেঁচে রইল বটে, কিন্তু মৃত্যুকে আহ্বান করে চলেছে এক মনে। প্রায় সাধনার মতো।”

অহনা নিচু স্বরে বলে উঠল, “পাপবোধ...?”

“পাপবোধ কি আমার নেই? দোষ কি আমার কম?” সুশোভনের কণ্ঠ দিয়ে আচমকা আর্তনাদ ছিটকে এল। পরক্ষণেই সামলে নিয়েছেন। অদ্ভুত শান্ত গলায় বললেন, “তোমাকে একটু আগেই বলছিলাম না, যেটাকে ভুল মনে হবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার প্রতিবাদ করবে? বলছি, কারণ সে কাজটা আমি নিজে করতে পারিনি। আমার তো উচিত ছিল গীতালিকে আটকানো। তাতার যাতে স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠে সেটা নিশ্চিত করা। আই ফেইল্ড মাই টাস্ক। ট্যাক্টিক্যালি এড়াতে চেয়েছি অশান্তি। পরিণামটা কী হল? টানা বাইশ বছর ধরে তিলে তিলে আত্মহত্যা করেছে গীতালি। আমারই চোখের সামনে। এ বড় কঠিন সাজা। এরকম ভুল কিন্তু কোরো না।”

অনেকক্ষণ চলে গেছেন সুশোভন। অহনা শুয়ে ছিল বিছানায়। অসম্ভব ভার হয়ে গেছে মনটা। বাইরে মেঘ ডাকছে। মাঝে মাঝেই ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ। কিছুই যেন প্রবেশ করছিল না অহনার চেতনায়। স্যারের শেষ কথাগুলো এখনও যেন ঘণ্টাধ্বনির মতো বাজছে মাথায়।... “যাই, অন্তিম কাজটা সারি, তারপর তো শুরু হবে আমার প্রতীক্ষা। একা একা...।”

সুশোভন স্যার কি ভুলেরই প্রায়শ্চিত্ত করতে কাজে ডুবে থাকেন? কিন্তু অহনা কীসের প্রায়শ্চিত্ত করছে? একটা মানুষকে চিনতে ভুল হয়েছিল, শুধু এইটুকুর জন্য এই তরঙ্গহীন সুখবিহীন জীবনকে টেনে ঘষটে বয়ে নিয়ে যেতে হবে? যতক্ষণ না দেহটা চিতায় ওঠে?

দরজায় ছায়া। অর্ঘ্য ঢুকল ঘরে। কখন এল, অহনা টের পায়নি তো!

অর্ঘ্যর হাতে অহনার মোবাইল। ভুরু কুঁচকে বলল, “কী হল, কখন থেকে বাজছে... ধরছ না...”

অহনা মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে বসল, “কার ফোন?”

“শেফালি মাসির।”

হাত বাড়িয়ে অহনা নিল ফোন, “হ্যাঁ বলো?”

“এই অবেলায় ঘুমোচ্ছিলি নাকি?”

আমার তো দিন রাত সর্বক্ষণই অবেলা। বলতে গিয়েও অহনা সংবরণ করল নিজেকে। গলা ঝাড়ল, “কী বলবে বলো?”

“জানিস কী হয়েছে আজ? সুগত এসেছিল আমার কাছে?”

“তো?” অহনার ক্ষণপূর্বের বিষণ্ণতা সেকেন্ডে খানখান। তপ্ত স্বরে বলল, “আমি শুনতে আগ্রহী নই। অন্য কিছু বলার আছে?”

“আরে শোনই না। ও খুব দুঃখ করছিল। অহনা আমাকে সারাজীবন ভুল বুঝে গেল... আমি কিন্তু অহনাকে মাথায় করেই রাখতে চেয়েছি...”

“আহ মা, থামবে। কতবার তোমাদের বলব আমি ওকে ঘেন্না করি...”

“ও মনে হল ভীষণ অনুতপ্ত। নিজের দোষটা বুঝতে পেরেছে।”

“স্টপ ইট।” অহনা চিৎকার করে উঠল, “আমি শুনতে চাই না, তোমার ভাট বকা বন্ধ করো, প্লিজ়।”

আবার কী যেন বলতে যাচ্ছিল শেফালি, ফোন বন্ধ করে অহনা মোবাইলটা আছড়ে ফেলল বিছানায়। অন্ধ রাগে ফুঁসছে।

হঠাৎ পিঠে কার হাত। চমকে তাকাল অহনা। অর্ঘ্য।

কী আশ্চর্য, হাতটা ঠেলে সরাতে পারছে না কেন অহনা! বরং ছোঁয়াটা যেন ভাল লাগছে! কেন যেন মনে হচ্ছে, এমনই একটা স্পর্শের বড় প্রয়োজন ছিল এখন!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%