নবম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠে অর্ঘ্য একটু যেন ছটফট করছিল। সকাল থেকেই মন আজ ভারী উচাটন হয়ে আছে। কেন যে হঠাৎ হঠাৎ ধড়াস করে উঠছে বুকটা। তেমন কোনও বিশেষ কারণ ছাড়াই। এ কি কোনও বিপদের সংকেত? অনেক সময়েই মন নাকি আসন্ন সংকটের পূর্বাভাস পায়। ধুৎ, এ ধরনের আধিভৌতিক কিংবা দৈব ব্যাপারস্যাপারে কণামাত্র বিশ্বাস নেই অর্ঘ্যর। যে দর্শনে তার প্রগাঢ় আস্থা, তাতেও বলছে এসব স্রেফ মনগড়া কল্পনা। কিন্তু মন যে তার অসম্ভব চঞ্চল হয়ে আছে, তত্ত্বের দোহাই দিয়ে অর্ঘ্য সেটা উড়িয়ে দিতে পারছে কই?

কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই বলেই কি ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি চলছে অর্ঘ্যর? সকালেই অহনার মুখে শুনেছে, রাত্রে ঘুমের ঘোরেও নাকি অর্ঘ্যর গলা দিয়ে বিটকেল আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল...

নাহ, ফোনাফুনি একটু করতেই হবে আজ। বিজয় রত্নম নামের ভোটের কার্ডখানা দিয়ে নতুন একখানা সিম বানাল, এখনও ব্যবহারই হয়নি। নয়া নম্বরটা বেশ কয়েকজনকে দিয়ে রাখা দরকার।

কিন্তু ঘরে বসে তো শান্তিতে কথা বলা যাবে না। আজ অহনাদেবী বাড়িতে মজুত। একটু নিরিবিলি চাই, সামান্য নিভৃতি। সুখের বিষয়, এমন জায়গার এখনও অভাব ঘটেনি আলাইপুরে।

মোবাইল পকেটে নিয়ে, চটি গলিয়ে অর্ঘ্য বেরোতে যাচ্ছে, পিছন থেকে অহনার ডাক, “চললি কোথায়?”

অর্ঘ্য দাঁড়িয়ে পড়ল। আলগা ভাবে বলল, “সকাল থেকে বসে আছি, যাই একটু হেঁটে আসি।”

“এই দুপুরবেলা টো টো করবি?”

“কোথায় দুপুর? প্রায় তিনটে বাজে। বাইরে তো রোদও নেই খুব একটা।”

“বেশি দেরি করিস না। বিকেলে বেরোব একটু। তোকে নিয়ে।”

“কোথায়?”

“তোকে সাইট সিয়িং করাব।”

“মানে?”

“পরে তো আমার নিন্দে করবি, এতদিন রইলাম অণুদি নিজে আমাকে আলাইপুরের আশপাশটাও ঘুরে দেখাল না। চল, তোতে আমাতে আজ চরে যাব।”

“কোন চর?”

“নদীর চর। গঙ্গার মাঝখানে যেটা গজিয়েছে।”

“কী আছে ওখানে? এনিথিং স্পেশাল?”

“জানি না। বহুকাল আগে, সেই যখন এলাম, ওখানে গিয়েছিলাম একবার। তখন বিলকুল ন্যাড়া ন্যাড়া ছিল। এখন তো দেখি সবুজে ছয়লাপ। প্রচুর পিকনিক পার্টিও যায় শীতকালে।” বলতে বলতে অর্ঘ্যকে লঘু ধমক দিল অহনা, “গিয়েই দেখবি কী আছে না আছে। আমার সঙ্গে বেড়াতে কি তোর আপত্তি আছে?”

অর্ঘ্য হেসে ফেলল, “না না, যাব।”

বেরিয়ে এল অর্ঘ্য। চলতে চলতে মনে হল, তার সঙ্গ যেন একটু বেশিই পছন্দ করছে অণুদি। যতটা না ভাইয়ের মতো, তার চেয়ে বেশি বন্ধুর মতো। তারও কি অণুদিকে এখন দিদি গোছের কিছু মনে হচ্ছে। উঁহু। জীবনে এই প্রথম যেন কোনও নারীর সৌরভ পাচ্ছে অর্ঘ্য। যা মা-দিদিদের মতো নয়, সহপাঠীদের মতো নয়, তার মহিলা কমরেডদের মতো তো নয়ই। এই ঘ্রাণ যেন সম্পূর্ণ আলাদা। নিজের সুখ-দুঃখ, গোপন কষ্ট কী অকপট ভাবে বলছে তাকে। মতামত চাইছে। কখনও দুঃখে ভেঙে পড়ছে, আবার অর্ঘ্যর ওপর নির্ভর করেই সুস্থিত হচ্ছে কখনও কখনও। সব মিলিয়ে এক অন্য ধরনের অনুভূতির স্বাদ মিলছে যেন। কী বলে একে?

এই অর্ঘ্য, তুই প্রেমে টেমে পড়ে যাচ্ছিস না তো? মাত্র কয়েক দিন ফাঁকা বাড়িতে এক নিঃসঙ্গ মহিলার সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে তোর জ্ঞানগম্যি লোপ পেল নাকি? দেখিস বাবা, যুক্তিবুদ্ধির অসুখে পড়ে যায় না যেন। বিপ্লবীকে ওটা মানায় না।

আপন মনেই অর্ঘ্য হাসল একটু। যে তিরতিরে অজানা উদ্বেগে ভুগছিল এতক্ষণ, তা যেন কমেছে খানিকটা। ইটভাঁটা পেরোল অর্ঘ্য। আশাবরী থেকে তাকে আর চোখেই পড়বে না। রোববার বলেই জায়গাটা আজ বড় বেশি নির্জন। একফালি ছায়া খুঁজে নিয়ে অর্ঘ্য বসল নিশ্চিন্তে। কাকে ফোন করবে প্রথমে? রাজন? তেজস কী মতলব ভাঁজছে জানাটা ভীষণ জরুরি। কিন্তু তার আগে একবার আসানসোলের খোঁজ নেবে না?

আগে বাবার নম্বরটাই টিপল অর্ঘ্য। বাজছে, বাজছে। বেজে বেজে থেমে গেল। আবার টিপল নম্বরটা। বেজেই গেল ফোন, ধরল না কেউ।

কী হল ব্যাপারটা? বাবা মোবাইলের ধারেকাছে নেই নাকি? এমন অবশ্য হয় মাঝেসাঝে। একটু চিন্তা করে অর্ঘ্য ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছে। বেশি ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে, অন্য কেউ ধরতে পারে ফোন, তবুও...।

নাহ, কপাল ভাল। বাবাই তুলেছে, “হ্যালো?”

“বাবা, আমি খোকা।”

“ওমা, তুই? তোকে পরশু সন্ধে থেকে খুঁজছি, সারাক্ষণ সুইচড অফ...”

বাবার উদ্বিগ্ন গলা শুনে একটু যেন কেঁপে গেল অর্ঘ্য। জিজ্ঞেস করল, “মা আছে কেমন?”

“তার তো যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। স্ক্যানের রিপোর্ট খুব খারাপ। ব্রেনে তিন-চার জায়গায় ব্লাড ক্লট করেছে।”

“অপারেশন করাতেই হবে?”

“কাল একজন স্পেশালিস্টের সঙ্গে কথা হল। উনি কোনও ভরসা দিতে পারলেন না। বলছেন অপারেশন খুব রিস্কি, বরং মেডিসিন দিয়ে ট্রাই করা যেতে পারে। সময় বেশি লাগলেও রিকভার করার চান্স আছে। তোর দিদি তো কাল জামশেদপুর থেকে এসেছে। থাকবে কিছুদিন। তোর মা অবশ্য ওকেও চিনতে পারছে না। চোখটা খোলা, জ্ঞানটা আছে, এইটুকু যা সান্ত্বনা।”

অর্ঘ্যর মুখে কোনও কথা ফুটল না। একটা মৃদু ধ্বনি বেরোল শুধু, “ও।”

“যে জন্যে তোকে আমি খুঁজছিলাম...” অরবিন্দের গলা সহসা খাদে, “পরশু বিকেলে... কে কী খবর দিয়েছে জানি না... দুই পুলিশ অফিসার বাড়িতে হাজির। লোকাল থানার নয়, বেশ হোমরাচোমরা গোছের।”

সেই অস্ফূট ধ্বনিই ফুটল আবার, “ও।”

“তারা প্রায় দু’ ঘণ্টা ছিল বাড়িতে। অনেক অনেক জেরা করল। তুই কোথায় পড়তিস, কতদিন বাড়িছাড়া, শেষ কবে বাড়িতে এসেছিলি, তোর কোন কোন বন্ধুবান্ধবকে আমি চিনি, তাদের কারও ঠিকানা জানি কিনা... তোর মা’র অবস্থা দেখে বোধহয় দয়া হল, নইলে আরও কতক্ষণ যে আমায় রগড়াত, কে জানে।” অরবিন্দের গলা একটু যেন বেশিই ভারী শোনাল, “এক দিকে তোর মা, অন্য দিকে তুই, কী জ্বালায় যে ভগবান ফেললেন আমায়... জানি না জীবনে কী পাপ করেছিলাম।..”

সরল আক্ষেপ, কিন্তু বিষাক্ত তিরের মতোই কথাগুলো বিঁধছিল অর্ঘ্যকে। যেন বাবাকে থামানোর জন্যই বলে উঠল, “এখন তো তা হলে কোনও ভাবেই আমি আসানসোলে যেতে...”

“ভুলেও ও চেষ্টা করিস না। আমার ধারণা, পুলিশ আমাদের বাড়ির ওপর ওয়াচ রাখছে।” অরবিন্দের গলা থেকে ক্ষোভ ঠিকরে এল, “না রাখলেই বা কী? সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। মায়ের এই ক্রিটিক্যাল মোমেন্টে তুমি বাড়তি কোনও উপদ্রব না বাধালেই আমি কৃতজ্ঞ থাকব।”

“মনে থাকবে উপদেশটা।”

“আমার কত উপদেশই না মনে রেখেছ!” অরবিন্দর হতাশ সুরে বুঝি বা বিলাপ এসে মিশল, “কোথায় কোথায় মানুষ মেরে কী দেশোদ্ধার করছ জানি না, কবে যে নিজেও তুমি গুলি খেয়ে মরে পড়ে থাকবে, সেই খবরও বুড়ো বোকা বাপটাকে গিলতে হবে... তাও জানি না। তবে পুলিশ যখন একবার আসা শুরু করেছে, তখন সে বারবার আসবে, আমাদের উত্যক্ত করবে... যতক্ষণ না তোমার সন্ধান পায়। তদ্দিন অত্যাচার তো আমায় সইতেই হবে... তোমার বাপ হওয়ার মাশুল তো গুনতেই হবে...”

সহ্য হচ্ছিল না অর্ঘ্যর। বাবা তো প্রলাপ বকছে না, সশস্ত্র ব্যাটেলিয়নের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে যেন গুলি ছুটে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। বিদ্ধ করছে যত্রতত্র।

গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং মাফিক আড়াল খুঁজল অর্ঘ্য। বলল, “বেশিক্ষণ ফোনে কথা বলা সেফ নয়। আজ রাখছি।”

“এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড।” অরবিন্দের স্বর ঝাপটে এল কানে, “তুমি কিন্তু আমার মোবাইলে আর কল কোরো না।”

“কেন?”

“পুলিশ আমার মোবাইল সিইজ় করেছে। সিম বদলে ভাল করেছ, নইলে হয়তো... আমি অবশ্য সব সময়েই তোমার কল মুছে দিয়েছি... তোমার নম্বরটাও ওতে নোট করা নেই... তবু সাবধান থাকাই তো...”

কথা ফুরোনোর আগেই বাটন টিপেছে অর্ঘ্য। কেটে গেল ফোন। হৃত্পিণ্ড তড়াক তড়াক লাফাচ্ছে। এইমাত্র বাবার মোবাইলেই রিং করেছিল...! অর্থাৎ, তার এই নম্বরটাও হয়তো এখন পুলিশের কবজায়। আগের নম্বরের শেষ কলগুলো থেকে যে টাওয়ার লোকেশন মিলবে, নতুন নম্বরেও তো সেখান থেকেই...

উদাসীন প্রকৃতি মানুষের বিপদ আপদের হদিশ রাখে না। মনোরম একটা বাতাস পাঠাচ্ছে নদীর দিক থেকে। ভিজে ভিজে। ঠান্ডা ঠান্ডা। চিলতে মেঘে ঢাকা পড়েছে সূর্য, ভারী মায়াময় আলোয় সেজে উঠছে আলাইপুরের বিকেল।

অর্ঘ্য ঘামতে শুরু করল। রাজনকে আর ফোন করা যাবে না, রাজনও বিপদে পড়ে যেতে পারে। ধরা পড়ার সম্ভাবনাও যেন বেড়ে গেল অনেকটা। আর কি আলাইপুরে ডুব মেরে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ? যত জলদি জলদি সম্ভব কেটে পড়াই তো শ্রেয়। পারলে কালই। উঁহু, কাল কেন, আজই নয় কেন? যত দেরি করবে, ততই তো বাড়বে বিপদের আশঙ্কা।

কিন্তু এক্ষুনি সে যাবে কোথায়? কলকাতার ডেরাটায় এক দু’দিনের জন্য উঠতে পারে, কিন্তু তার বেশি নয়। মেসের মালিক তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল, এবার হয়তো পুলিশ লেলিয়ে দেবে। একটু ভদ্রস্থ গোছের কোনও বাড়িতে পেয়িংগেস্ট থাকবে, সেও তো আর পেরে উঠবে না। হাতে টাকাপয়সা বেশি নেই যে। তা ছাড়া আইডেন্টিটি হ্যাঙ্গামা তো থাকছেই। সোর্স অবশ্য একটা আছে কলকাতায়, গেলে কিছু মালকড়িও মিলতে পারে, কিন্তু সে তেজসের লোক। তার কাছে যাওয়া মাত্র অর্ঘ্যর অবস্থান জেনে ফেলবে তেজস। বাবার কাছে পুলিশ পাঠানোর বদমাইশিটা কে করল? তেজস? পুলিশের মধ্যেও তাদের পার্টির ইনফর্মার আছে। তাদের কারও মাধ্যমেই কি তেজস পৌঁছে দিয়েছে অর্ঘ্যর আসানসোলের ঠিকানা? অসম্ভব নয়, পার্টির পূর্ণ কন্ট্রোল পাওয়ার জন্য যেভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির শেষ মিটিং-এ ব্যক্তি হত্যার নীতি থেকে সরে আসতে বলেছিল অর্ঘ্য, তার অনুগামীও কম ছিল না। ভোটে হেরে যাওয়ার ভয়ে প্রস্তাবটাই সুকৌশলে বানচাল করে দিল। এত বড় সিদ্ধান্ত নাকি ক’জনে মিলে বসে নেওয়া যায় না, প্রতিটি সদস্যের মতামত যাচাই করা দরকার। সে ভোটেও তেজস হারবে জানে বলেই বোধহয় অর্ঘ্যকে বেমালুম ছেঁটে ফেলতে চাইছে।

ভাল লাগে না। ভাবতেও ভাল লাগে না। মানুষের ভাল করতে এসে নিজেদের মধ্যে লড়াই, এর চেয়ে কুত্সিত আর কী আছে! তারা সব্বাই একই আদর্শে বিশ্বাসী। একটা শোষণহীন সমাজ দেখতে চায়। অথচ মতে সামান্য অমিল হলেই একে অপরের শত্রু! অর্ঘ্যর তো এখন বেশ মনে হচ্ছে তাদের লক্ষটা স্রেফ উপলক্ষ। আসলে অস্ত্রশস্ত্রের জোরে ছোট ছোট এলাকার সম্রাট হওয়াই বুঝি স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্টি নেতাদের। দুলাল সেদিন ভুল বলেনি। ক্ষমতা পেলে তাদের পার্টিও হয়তো দুলালদের বাধ্য চাকর বাকরই বানিয়ে ছাড়বে। অর্ঘ্য কি এটাই চেয়েছিল?

অর্ঘ্যর ফুসফুস নিংড়ে একটা বাতাস বেরিয়ে এল। শিথিল পায়ে ফিরছে আশাবরীতে। নাহ, কলকাতা সে যাবে না। আরও দূরে কোথাও পাড়ি জমাবে। জঙ্গলমহল নয়, ঝাড়খণ্ড নয়, আরও দূরে কোথাও। কিন্তু টাকা? অণুদির কাছে চাইবে? মিলতেও পারে। কিছু একটা গুলতাপ্পি দিতে হবে, এই যা।

অজান্তেই এক চিলতে করুণ হাসি ফুটে উঠল অর্ঘ্যর মুখে। সে নাকি সত্যের সাধনায় নেমেছে, মহান আদর্শের জন্য জীবন উত্সর্গ করাই নাকি তার ব্রত, অথচ পদে পদে তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়! মিথ্যের রাস্তা ধরে আদৌ কি সত্যে পৌঁছোনো যায়?

আনমনা অর্ঘ্য কখন যে আঙিনা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বাড়ির দরজায়। গ্রিলগেট ঠেলতেই অহনার গলা উড়ে এল, “সেই দেরি করলি তো? বিকেল যে প্রায় ফুরিয়ে এল!”

“সরি।”

বলতে বলতে বসার ঘরে ঢুকেছে অর্ঘ্য। সঙ্গে সঙ্গে বুকটা ছলাৎ।

হ্যাঁ, হৃদয়ে ঢেউ তোলার মতোই সাজগোজ করেছে অহনা। সালোয়ার কামিজের বদলে পরনে আজ মেরুন রঙ সিল্কের শাড়ি, শুকনো শুকনো মুখখানায় সুষমা এনেছে প্রসাধনে। মাপসই ওষ্ঠরঞ্জনী, কপালে ছোট্ট টিপ, আর লম্বা বিনুনিতে সে যেন অন্য মানবী আজ। পারফিউম মেখেছে কি? একটা মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভাসে যেন? অচেনা কোনও ফুলের সুরভি?

অহনা মুচকি হেসে বলল, “প্যাটপ্যাট করে কী দেখছিস, অ্যাঁ?”

“ম্যাজিক।” অর্ঘ্য দু’ আঙুলে তারিফের মুদ্রা ফোটাল, “দারুণ ব্রাইট লাগছে।”

“যাক, নজরে পড়েছে তা হলে। ...খুব যে বলিস মেয়েদের দিকে নাকি তাকাসই না...”

“তা বলে অন্ধ তো নই।”

“বটে?” অহনা হাসতে হাসতে গলা চড়াল, “কৃষ্ণা, চটপট চা দিয়ে যা। আমরা বেরোব।”

কৃষ্ণার উত্তর শোনা গেল, “জল বসিয়ে দিয়েছি দিদি।”

“রুটিটাও সেঁকে ফ্যাল। আমি তালা দিয়ে যাব।”

অহনার এই সপ্রতিভ উচ্ছল রূপ অবাক করছিল অর্ঘ্যকে। আজ তো সকালেও এমনটা ছিল না। হাসিমুখেই কথা বলছিল, তবে এখনকার উচ্ছ্বাস যেন একটু বাড়তি। অর্ঘ্য সঙ্গে যেতে রাজি হয়েছে বলে এত খুশি? এখন কি আজই চলে যাওয়ার কথা উচ্চারণ করা যায়? উঁহু, মন থেকে সায় পাচ্ছে না। বরং একটা অন্য রকম বিকেলের সম্ভাবনাই তাকে টানছে যেন।

অহনা হালকা ধমক দিল অর্ঘ্যকে, “হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস যে? তৈরি হয়ে নে।”

অর্ঘ্য কাঁধ ঝাঁকাল, “আমি তো রেডি।”

“ওই বারমুডা পরে যাবি? আমার সঙ্গে? চটি ফটর ফটর করতে করতে? আশাবরীর ম্যাডামের একটা ওজন নেই?” অহনা ঠোঁট টিপে হাসল, “যা, একটু ভদ্রগোছের পোশাক পরে আয়।”

অগত্যা অর্ঘ্য ঘরে এল। পলক ভাবল, কী পরে এখন। ঘিয়েরঙা কর্ডের প্যান্টটা বার করবে? সঙ্গে যা হোক একটা টি-শার্টই যথেষ্ট। ঝুঁকে ঝোলাব্যাগটা খাটের তলা থেকে টানতে গিয়ে দেখল, অনেকটা ভেতরে ঢুকে আছে। নির্ঘাত কৃষ্ণার কাজ। ঝাঁট দিতে গিয়ে কখনও টেনে বাইরে নিয়ে আসে তো কখনও ঠেলে ঢুকিয়ে দেয়।

শার্ট-প্যান্ট চড়িয়ে পায়ে স্নিকার গলাচ্ছিল অর্ঘ্য। ফিতে বাঁধতে বাঁধতে পলকা চিন্তার ঝিলিক। মুডটা ভাল আছে অণুদির, আজই চাইবে টাকাটা। মোটামুটি কত বলবে? তার আগে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ছকে নেওয়া দরকার। কলকাতা নয়, অন্য কোনও বড় শহরে যাবে এখন। অন্তত মাস চারেক কোনও সাড়াশব্দ করবে না। লুকোনোর জন্যে বেঙ্গালুরু সবচেয়ে নিরাপদ শহর। স্কুলের সহপাঠী তাপস আছে বেঙ্গালুরুতে। আই টি সেক্টরে। গত বছর দিল্লি গিয়েছিল অর্ঘ্য, হঠাৎ সেখানে তাপসের সঙ্গে দেখা। ব্যাটা বিয়ে-থা করেনি, করার নাকি বাসনাও নেই। হোয়াইট কলার জব করে তাপস, পাক্কা প্রতিক্রিয়াশীল। তবে খুব আন্তরিক, প্রায় সেই স্কুল লাইফের মতোই। অর্ঘ্যকে বলেছিল, চলে আয় ক’দিন জমিয়ে কাটানো যাবে। ইন্দিরানগরে থাকে তাপস, ওর কার্ডটাও আছে পার্সে, ওখানেই নয় এক দু’মাস...। এরকম রিসার্চের বাহানায় বেশি দিনও থাকা যায়। তেমন খরচ হয়তো কিছু হবে না, তবু হাজার পনেরো-বিশ তো রাখতেই হয় পকেটে।

কিন্তু কী অজুহাত দেখাবে? সত্যি সত্যি তার মা’র অসুখ... কিন্তু মা তো এখন সিঙ্গাপুরে...! মিথ্যে বলার কী বখেড়া! আরও যে কত মিথ্যেকে আঁকড়ে ধরে তাকে থাকতে হবে এখন!

অহনা ডাকাডাকি করছে, “কী রে হল? চা যে জুড়িয়ে যাচ্ছে।”

অর্ঘ্য তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। টেবিল থেকে কাপ-ডিশ তুলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুমুক দিচ্ছে চায়ে। বলল, “বড্ড বেশি ছটফট করছ। জুন মাসের বিকেল, সূর্য ডুবতে এখনও ঢের দেরি।”

“একটু আগে আগে যাওয়াই তো ভাল। ঘুরে ঘুরে চরটা দেখা যাবে।”

“যদি দেখার মতো কিছু থাকে। আছে তো কিছু চাষের খেত আর জংলা ঝোপঝাড়।”

“আলো না থাকলে তাই বা দেখবি কী করে? সন্ধের মধ্যে ফিরে আসব, অন্ধকারে ওখানে কিন্তু থাকব না।”

“যো আপকি মর্জি।”

চা শেষ করে কাপ-ডিশ রান্নাঘরে দিয়ে এল অর্ঘ্য। কৃষ্ণা রুটি বানিয়ে রাখছিল ক্যাসারোলে। পেয়ালা-পিরিচ ধুয়ে এবার তার বেরিয়ে পড়ার পালা।

যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করল, “মাসিমা কবে আসছে গো দিদি?”

“সামনের শনিবার।”

“তুমি আনতে যাবে?”

“ঠিক নেই। দাদাও পৌঁছে দিতে পারে।”

“মাসিমা এলে আমি কিন্তু ক’দিন ছুটি নেব।”

“কেন?”

“বাবার শরীরটা ভাল নেই। হার্টের খুব ব্যামো। মাঝে তো যায় যায় হয়েছিল, কোনও গতিকে সামলেছে। ক’দিন বাপের বাড়ি গিয়ে থেকে আসব ভাবছি। কবে পুট করে মরে যায়...”

অহনা বলল, “আচ্ছা সে দেখা যাবেখন।”

কৃষ্ণার আর্জি শুনতে শুনতে অর্ঘ্য সামান্য উদাস। মা’র কথা মনে পড়ল কি? আর কি দেখা হবে মা’র সঙ্গে?

কৃষ্ণার প্রায় পিছু পিছুই বেরোল অর্ঘ্যরা। হাঁটছে দু’জনে, অলস মেজাজে। ফুরফুরে হাওয়াটা বন্ধ হয়ে গেছে, কেমন যেন চাপা গুমোট চরাচরে। প্রকৃতি যে কখন কীভাবে মেজাজ মর্জি বদলায়!

ঘাটের কাছাকাছি এসে দুলালের সঙ্গে দেখা। ছাতা বগলে কোথায় যেন যাচ্ছিল, অর্ঘ্য ধরেছে তাকে, “কী গো, চললে কোথায়?”

“আজ্ঞে মেয়ে-জামাই এসেছে। তাই একটু বাজারের দিকে...”

“সে কী? তোমার ভরসাতেই যে বেরোলাম।”

দুলাল অবাক মুখে বলল, “কেন কর্তা?”

“আমি আর তোমাদের আশাবরী ম্যাডাম একটু চরে বেড়াতে যাব যে।”

“কিন্তু কর্তা আজ যে আমি...। দেখেন না, ঘাটে আরও নৌকো আছে।”

“না না, তোমাকে ছাড়া যাবই না।” দুলালের পিঠে আলগা চাপড় দিল অর্ঘ্য, “এসো এসো। কতক্ষণই বা লাগবে? গিয়ে হয়তো ঘণ্টা খানেক থাকব, ফিরে তার পরে নয় বাজার যেয়ো।”

দুলাল তবু যেন দোলাচলে। ঘাড় চুলকোচ্ছে।

“কী হল, অত ভাবনার কী আছে?” অর্ঘ্য চোখ টিপল, “আমাদের ঘুরিয়ে আনলে তোমার মেয়ে-জামাইয়ের বাজার খরচাটা কিন্তু উঠে যাবে।”

অব্যর্থ দাওয়াই। ধরেছে ওষুধ। দুলাল রাজি।

নৌকোয় উঠতে বেশ কসরত করতে হল অহনাকে। বিপদও ঘটছিল প্রায়। অসমান পাড়, ঘাটে নামতে একবার খামচে ধরছে অর্ঘ্যর হাত, পরক্ষণে দুলালকে। পাটাতনে পা রাখতেই বিশ্রীভাবে দুলে উঠল নৌকো, টলে গেল ব্যালেন্স। দু’ কাঁধ চেপে ধরে কোনও ভাবে অহনাকে স্থিত করল অর্ঘ্য। বসিয়েছে।

অহনা হাঁপাচ্ছিল অল্প অল্প। যত না পরিশ্রমে, তার চেয়ে বেশি নার্ভাসনেসে।

বাবু-বিবিদের এমন বেপথু হাল দেখে অভ্যস্ত দুলাল, টেরিয়ে হেসে ছাড়ছে নৌকো। অহনার পাশে বসে অর্ঘ্য বলল, “খুব ভয় পেয়েছ মনে হচ্ছে?”

অহনা ফ্যাকাশে হাসল, “খুব নয়। একটু। জলে পড়লে কী কেলেঙ্কারিটাই না হত।”

“অমন টলমল করছিলে কেন? আগে তো চড়েছ নৌকোয়।”

“সে কবে... কত দিন হয়ে গেল...। তখন শাড়িও পরা ছিল না।”

“হ্যাঁ ম্যাডাম, সালোয়ার কামিজেই সুবিধে।” দুলাল এবার ফুট কাটল। পাড় থেকে নৌকো সরাতে সরাতে বলল, “সব্বাই বলে, ওই ডেরেসেই ম্যাডামকে বেশি এস্মাট দেখায়।”

অর্ঘ্য গলা নামিয়ে বলল, “দেখেছ তো, তোমাকে কোন পোশাকে কেমন লাগে তাই নিয়েও লোকেরা...”

অহনা ভ্রূকুটি হানল, বুঝি মন্তব্যটা তার পছন্দ হয়নি। চুপ করে গেল অর্ঘ্য। তাকিয়ে আছে পাড়ের দিকে। আগের দিন ছিল পড়তি বেলা, আজ সূর্যের আলো এখনও মরেনি খুব একটা। তীরভূমির রূপও তাই আজ অন্য রকম। মায়াবী মায়াবী নয়, বড্ড বেশি বাস্তব।

শুধু এই অহনার পাশে বসে থাকাটাই যা অলীক। একটু আগে সে অহনার কাঁধদুটো ধরেছিল, এখনও যেন স্পর্শটা লেগে আছে হাতে। এত কোমল হয় রমণীদেহ? যে বাতাস অহনাকে ছুঁয়ে তার গায়ে এসে লাগছে, তারও রূপ রস গন্ধ যেন আলাদা রকম। মেয়েদের স্পর্শ পেয়ে বাতাসও কি আপনা আপনি বদলে যায়?

দুলালের গলা শোনা গেল, “জলের বেশ টান আছে কর্তা। জোয়ার চলছে তো, তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবেন।”

অর্ঘ্যর আগে অহনাই বলল, “ভালই তো। একটু বেশিক্ষণ থাকা যাবে।”

“আমি একটা কথা বলব ম্যাডাম? যদি অনুমতি দেন?”

“কী?”

“যদি আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আমি একবার বাড়ি ঘুরে আসি? মানে বাজারটা যদি...?” দুলাল কাঁচুমাচু মুখে বলল, “আমার হয়েছে বিপদ। ছেলেটা কোন ভুবনে চরে বেড়াচ্ছে কে জানে, এদিকে জামাই মানুষটা ঘরে এল... ষষ্ঠীতে সে এবার থাকবে না... আজ তাকে বিশেষ আপ্যায়ন না করলে চলে? রাতদুপুরে বাজার নিয়ে গেলে মেয়ের মা কখন রাঁধবে, কখন খেতে দেবে...”

“হয়েছে হয়েছে। আর সাতকাহন শোনাতে হবে না।” হাত তুলে অহনা থামাল, তা আমাদের কী হবে? আমরা পড়ে থাকব?

“না ম্যাডাম। আপনারা একটু ঘুরুন, সন্ধে নামতে না নামতে আমি এসে যাব।”

“দেখো, ঝুলিয়ো না যেন। অন্ধকার হলে আমাদের তখন আর কিচ্ছু করার নেই। তার ওপর সাপখোপ...”

“মোটে ভাববেন না। আমি ঠিক চলে আসব।”

দুলাল ভারী আহ্লাদিত হয়েছে। দাঁড় টানছে জোরে জোরে। এগিয়ে আসছে সবুজ।

জল আর নারীর গন্ধ নিতে নিতে ঊর্ধ্বপানে তাকিয়েছিল অর্ঘ্য। ফস করে জিজ্ঞেস করল, “আকাশের গতিক কেমন বুঝছ দুলাল?”

ভুরু কুঁচকে দুলাল ঈশানকোণটা দেখল। বিজ্ঞের মতো রায় দিল, “বৃষ্টি এক-দু’ পশলা হবে।”

“মুষলধারে নামবে না তো?”

“মনে হয় না। এ বছর কবেই বা তেমন ঝমরঝমর নামল! তবে একটু ঝড়ও উঠতে পারে।”

“তুমি তার আগে আসছ তো?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। জল নামতে এখনও ঢের দেরি।”

অর্ঘ্য তবু পুরোপুরি স্বস্তি পেল না। আবার যেন টিপটিপ দুশ্চিন্তাটা ফিরে আসছে। হৃদয়ের কোনও এক গোপন কোণে জমছে মেঘ। শুধু মেঘের উত্সটা বুঝতে পারছিল না অর্ঘ্য।

মা’র অসুখ? বাবার মোবাইলে সেই ফোন? তেজস? পুলিশ? নাকি অন্য কিছু?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%