তৃতীয় অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

...পাহাড়ি এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে হাঁটছে এক সৈনিক। গায়ে জলপাই রং উর্দি। রাস্তার দু’ধারে হালকা হালকা জঙ্গল। যতই এগোচ্ছে সৈনিক, ঘন হচ্ছে অরণ্য। পথের দু’ধারের গাছগুলো যেন জ্যান্ত মানুষ, ড্যাবড্যাব চোখে দেখছে হেঁটে চলা সৈনিককে। হঠাৎ সৈনিক চমকে তাকাচ্ছে চারপাশে। অজস্র বুটের আওয়াজ শোনা যায়, অথচ কেউ কোথাও দৃশ্যমান নয়। আচমকা রাশি রাশি গুলি ধেয়ে এল ডান দিকের জঙ্গল থেকে। বাঁদিক থেকে পালটা গুলি ছুটে গেল ডাইনে। গাছেরা কাঁপছে ঠকঠক, কুঁইকুঁই একটা গোঙানিও ফুটে বেরোচ্ছে তাদের গা দিয়ে। সৈনিক হঠাৎ ছুটতে শুরু করল, ডান-বাঁ কোনও দিকে না তাকিয়ে দৌড়োচ্ছে প্রাণপণ। কোত্থেকে সামনে সাইরেনের শব্দ, পরক্ষণেই কান ফাটানো বিস্ফোরণ। সর্বাঙ্গে আগুন নিয়ে একটা সাদা গাড়ি লাফিয়ে উঠল শূন্যে। সাঁইসাঁই ঝোড়ো হাওয়ায় গাছেরা উথালপাতাল দুলছে, তাদের গোঙানি ক্রমশ বাড়ছে যেন। বাড়ছে বুটের ধ্বনি, গুলি, পালটা গুলি, আগুনে ঝলসে যাওয়া সাদা গাড়িটা ঢেকে যাচ্ছে ধোঁয়ায়। মানুষ পোড়া গন্ধে ভরে গেছে জঙ্গল, সৈনিক দৌড়োতে দৌড়োতেই দু’হাতে টিপে ধরেছে নাক। শ্বাস বন্ধ হয়ে এল সৈনিকের, মুখ থুবড়ে পড়ল রাস্তায়। একটা পাখি দূর থেকে ডেকে উঠল, সৈনিক মুখ তুলে দেখার চেষ্টা করল পাখিটাকে। সঙ্গে সঙ্গে জলপাই রং উর্দির মুখ চেপে ধরল কেউ। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাচ্ছে সৈনিক, মুক্তি পেতে চাইছে, পারছে না, ছটফট করছে...

অর্ঘ্য ধড়মড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়। কী বাজে স্বপ্ন! এখনও যেন শ্বাস আটকে আছে গলায়। ওই সাদা গাড়িটাই তো অ্যাম্বুলেন্স, মাইন বিস্ফোরণে যেটা উড়ে গেল? উফ্‌ফ ওই অ্যাম্বুলেন্সটা কি অর্ঘ্যর পিছু ছাড়বে না?

দু’চোখ রগড়ে দীর্ঘ স্বপ্নটা মনের আড়ালে সরাল অর্ঘ্য। অমনি পলকা ঝাঁকুনি। একটা অচেনা ঘরে নেয়ারের খাটিয়ায় পাতলা চাদরে উপবিষ্ট অর্ঘ্য এখন ঠিক কোথায়?

ছোট্ট একটা জানলা দিয়ে আলো ঢুকছে ঘরটায়। বইয়ের এলোমেলো স্তূপ, ভাঙা টেবিল, কম্পিউটারের মনিটর, গোছাখানেক ইলেকট্রিক তার, কী না রয়েছে ঘরটায়। কাশীপুরের ডেরাটা এমন বদলে গেল কী করে?

হ্যাঁ মনে পড়ে গেছে। এটা তো শেফালিমাসির বাড়ি। কাল রাতে এই ঘরটাতেই তো ঢুকিয়ে দিয়ে গেল অণুদি। হাবিজাবি জিনিসে ঠাসা বলে অণুদি খুব লজ্জা পাচ্ছিল। জানে না তো, অর্ঘ্যকে যেসব জায়গায় রাত কাটাতে হয়, তার তুলনায় এটা স্বর্গ।

নেয়ারের খাটিয়া ছেড়ে অর্ঘ্য জানলায় এল। সূর্য উঠে গেছে অনেকক্ষণ। সামনেটা বোধহয় দক্ষিণ। পাঁচিলের ওপারে ইটভাটায় ঝকমক করছে রোদ্দুর। বাড়িতে সাড়াশব্দ নেই কেন? এখনও কেউ ওঠেনি নাকি? মা মেয়ে জাগার আগে নদীর ধার থেকে একবার চক্কর মেরে এলে হয়। অর্ঘ্যর পরনে শর্টস, খালি গা। এই পোশাকেই অর্ঘ্য দিব্যি বেরিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু অহনা যদি কিছু মনে করে? আশাবরীর কর্ত্রীর অতিথি যেমন তেমন পোশাকে গাঁয়ে চরে বেড়ালে অহনা চৌধুরীর মানে লাগবে না তো? এবং এই মুহূর্তে অহনাকে চটানোর ঝুঁকি নিতে অর্ঘ্য রাজি নয়।

রুকস্যাকখানা খাটিয়ায় তুলল অর্ঘ্য। এখন এই রুকস্যাকই তার সংসার। চেন খুলে একটা টি-শার্ট বার করেছে। সঙ্গে কালো ট্র্যাকপ্যান্ট। দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম রাখল খাটিয়ায়। দাঁত মাজার ব্রাশখানাও। হাত ঢুকিয়ে পরখ করে নিল সব ঠিকঠাক আছে কিনা। সযত্নে বন্ধ করল চেন। ঠেলে পাঠিয়ে দিল খাটের নীচটায়।

প্যান্ট টি-শার্ট গলিয়ে সবে দরজা খুলে বেরিয়েছে, সামনে শেফালি।

কাল প্রচুর বকবক করেছে মহিলা। আসানসোলের এমন এমন লোকদের কথা জিজ্ঞেস করছিল যাদের অর্ধেককে অর্ঘ্য চেনেই না। সে তো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে প্রায় ঘরছাড়া। তার ওপর গত দু’-তিন বছর সে আসানসোলের ত্রিসীমানা মাড়ায়নি...। এমত পরিস্থিতিতে কাঁহাতক মহিলার সঙ্গে সংগত করা যায়! ভাগ্যিস মেয়ে ধমকে-ধামকে চুপ করাচ্ছিল মাকে, তাই না খানিক রক্ষে পেয়েছে অর্ঘ্য। অবিরাম বানিয়ে বানিয়ে বলে যাওয়াটা কি কম ঝকমারি! এখন সাতসকালে কী জিজ্ঞেস করে বসবে কে জানে!

তবু প্রভাতের প্রথম সাক্ষাতে এক টুকরো অমলিন হাসি উপহার দিতেই হয় মহিলাকে। অর্ঘ্য চোয়াল নাড়িয়ে বলল, “গুড মর্নিং মাসি।”

“উঠে পড়েছিস? রাতে ভাল ঘুম হয়েছিল তো?”

“ফার্স্ট ক্লাস।”

“ইঁদুরে কোনও উৎপাত করেনি?”

“আছে বুঝি ইঁদুর? টের পাইনি। একঘুমে রাত কাবার হয়ে গেল কিনা।”

“খুব ভাল। চা খাবি তো? মুখ ধুয়ে নে, জল বসাচ্ছি।”

“ভাবছিলাম...গ্রামটা একটু ঘুরে আসি...”

“চা খেয়ে বেরো। তোর অণুদিও চায়ের জন্য ওয়েট করছে।”

ব্যস, আটকে গেল অর্ঘ্য। গুটিগুটি পায়ে এল বসার ঘরে। দেখল অহনা ম্যাগাজিন গোছের কী যেন একটা পড়ছে মন দিয়ে।

অর্ঘ্য গলা ঝাড়ল, “সুপ্রভাত অণুদি।”

দৃষ্টি ওঠাল অহনা। সামান্য নোয়াল মাথা। মৃদু গলাতেই জিজ্ঞেস করল, “তুই লাঞ্চ করে যাবি তো?”

সরাসরি এমন একটা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না অর্ঘ্য। অণুদির প্রশ্ন করার ভঙ্গিটা যেন কেমন কেমন। রাত্রেই ভাবে-আচরণে মনে হচ্ছিল, তার থাকাটা যেন অণুদির পছন্দ নয়। কিন্তু অর্ঘ্যর তো নড়ার উপায় নেই।

অর্ঘ্য গলা ঝাড়ল, “না মানে... ভাবছিলাম...”

“বিকেল সন্ধেতেও যেতে পারিস। ট্রেন মোটামুটি ফাঁকা পাবি।”

আর তো ধানাইপানাই চলবে না, সোজাসুজি কথাটা পাড়তেই হয়। একটু সময় নিয়ে অর্ঘ্য বলল, “আসলে কী হয়েছে জানো, আমি যে প্রোজেক্টটা হাতে নিয়েছি, তার জন্য গ্রামের মানুষদের বিস্তর ডাটা লাগবে। স্যোশাল ইকনমিক। শুরু করেছিলাম সেই অন্ধ্র থেকে। তারপর মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ডেও প্রচুর তথ্য নিয়েছি, এবার আমার টার্গেট ওয়েস্ট বেঙ্গল। লাল্টুদার মুখে যখন তোমার কথা শুনলাম... তুমি বিশাল কাজকর্ম করছ... এবং সেটা গ্রামের মেয়েদের নিয়ে... তখনই আমার মাথায় প্ল্যানটা আসে।”

“কী প্ল্যান?”

“ওই...মানে...তুমি যখন আছ... মিছিমিছি ডাটার সন্ধানে কেন অন্ধের মতো ঘুরে মরি...”

অহনা গম্ভীর মুখে বলল, “বুঝেছি। ওমনি ভাবলি এখান থেকে কিছু মালমেটিরিয়াল নিয়ে যাবি, তাই তো?”

“উঁহু। আমি নিজেই তথ্য সংগ্রহ করতে চাই। ধরো তোমার কাছ থেকে কিছু ডিরেকশন আর রেফারেন্স নিয়ে নিলাম, তারপর নিজেই গ্রামে গ্রামে ঘুরব।”

“যাহ, তা কী করে সম্ভব? কলকাতা থেকে রোজ অ্যাদ্দুর উজিয়ে এসে...”

“যদি আমি আলাইপুরে থেকে যাই?” অর্ঘ্য ঢিলটা ছুড়েই দিল, “তোমাদের এখানে?”

“মানে?”

“যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে...।” অর্ঘ্য তার পেটেন্ট নির্মল হাসিটা বিস্তার করল, “বেশিদিন জ্বালাব না। প্রমিস। বড়জোর মাস খানেক। যদি খ্যামাঘেন্না করে আশ্রয় দাও, কাজটা তুলে ফেলি।”

অহনা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। বোঝাই যায় এমন একটা প্রস্তাবের জন্য আদৌ তৈরি ছিল না। কী ভাবছে? সন্দেহ করছে না তো অর্ঘ্যকে?

অহনা বিড়বিড় করে বলল, “আমি আর মা এখানে কত কষ্ট করে আছি...”

“আমিও কষ্ট করে থেকে যাব।” গলায় একটা তরল তরল ভাব ফোটাল অর্ঘ্য, “জাস্ট দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন দিয়ো, ব্যস।”

“আর থাকবি কোথায়? ওই গুদামঘরে?” অহনা মাথা দোলাচ্ছে, “এক রাত্তিরের জন্য নয় চলে যায়, কিন্তু টানা এক মাস...!”

“পারব অণুদি। যদি চাও তো তোমাদের দুয়ারের কোণে পাপোশের মতো পড়ে থাকতে পারি।”

থমথমে হয়ে গেছে অহনার মুখখানা। আস্তে আস্তে মেঘ সরে হাসি ফুটল। অর্ঘ্যরও ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন। অণুদি বোধহয় বুঝে গেছে এর সঙ্গে এঁটে ওঠা মুশকিল। হয় চূড়ান্ত অভদ্র হতে হয়, নইলে ঘাড় পেতে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

নিশ্চিন্ততায় পলকা চিড়। ফের অহনার গলা বাজছে, “মাকে বলেছিস?”

“না গো। আমি তো জানি তুমিই হাই কম্যান্ড।” অর্ঘ্যর স্বর মাখন, “তুমি রাজি হলে শেফালিমাসি কখনও না বলবে না।”

ব্যস, পটে গেছে অণুদি। শেফালি চা নিয়ে ঢুকছিল, তাকে জানাল কথাটা। সে তো শুনে মহা আহ্লাদিত। খুশিখুশি গলায় বলল, “থাক না যদ্দিন ইচ্ছে। বয়স হয়েছে তো, আদর-যত্নের ত্রুটি হলে মনে কিছু করিস না বাবা।”

“বেশি যত্নআত্তি আমার সয় না মাসি। বরং থাকার ট্যাক্স হিসেবে আমায় দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নিতে পারো।”

শেফালির বেশ মজা লেগেছে। ভুরু নাচিয়ে বলল, “কী কী পারবি করতে?”

“এনিথিং। শুধু কুটনো কোটা আর রান্নাবান্নাটা বাদে।” বস্তারের জঙ্গলে ক্যাম্প করে থাকার দিনগুলো মনে পড়ল অর্ঘ্যর। তাড়াতাড়ি বলল, “তবে ভাতে-ভাত ফুটিয়ে নিতে পারব। ডিম-আলু দিয়ে।”

“থাক। রাঁধাবাড়ার জন্য আমার কৃষ্ণা আছে।... আর কিছু?”

“এই ধরো, যে ঘরখানা আমায় অ্যালট করেছ, ওটা সাফসুফ করে দিতে পারি। তারপর...” অর্ঘ্য তিলেক ভাবল, “তোমার বাগানে নিড়েন দিয়ে দিতে পারি। মাটি এমন ঝুরো ঝুরো করে দেব, তোমার বেলি ফুল সংখ্যায় ডবল হয়ে যাবে। রঙ্গনের ঝাড় বড্ড ঝাঁকড়া হয়েছে, ওগুলোও একটু ছাঁটাছাঁটি দরকার। আই ক্যান ডু ইট।”

“বাবার কাছে ট্রেনিং নিয়েছিস বুঝি?” শেফালির চোখে যেন স্মৃতির ঝাপটা লেগেছে, দূরমনা স্বরে বলল, “কী দারুণ গোলাপ ফোটাতেন অরবিন্দবাবু। অমন প্রকাণ্ড ডালিয়া আমি আর কোনও বাগানে দেখিনি। কী কী সার লাগবে, সব আমাদের বলে দিতেন, কিন্তু আমাদের হাতে অমনটা হতই না।”

“হুম। বাবার হাতে ম্যাজিক ছিল।”

“এখন তো ফ্ল্যাটে থাকছেন, সেখানেও নিশ্চয়ই টবে বাগান করেছেন?”

“অত স্পেস নেই ফ্ল্যাটে। ওই নিয়মরক্ষের মতো দু’-একটা...”

“এ বছর গোলাপ আমি লাগাবই। গোলাপ না ফুটলে বাগানে শোভা আসে না।” পলক কী যেন ভাবল শেফালি, তারপর রীতিমতো উত্সাহিত স্বরে বলল, “অরবিন্দবাবুর ফোন নম্বরটা দে তো। পুরনো আলাপটাও ঝালানো হবে, তখন গোলাপ ফোটানোর গুপ্ত রহস্যও আর একবার জেনে নেব।”

অর্ঘ্য প্রমাদ গুনল। এমন অজানা অচেনা কোণ থেকে শর এসে যায়, ঠেকানো মুশকিল। অস্বস্তি চাপা দিতে মুখে একটা হাসি টেনে বলল, “আচ্ছা, নিয়োখন।”

“বয়স হচ্ছে, সাত কাজে শেষে ভুলেই যাব হয়তো।” শেফালি ফের আবদার জুড়লেন, “এখনই দে না বাবা। ...অণু, নম্বরটা তোর মোবাইলে তুলে রাখ।”

“এক্ষুনি নিয়ে তো লাভ হবে না মাসি।” অর্ঘ্য ফস করে বলে দিল, “বাবা মা তো এখন আসানসোলে নেই।”

“কোথায় গেছেন?”

“দিদির কাছে। মানে সিঙ্গাপুরে।”

“বেড়াতে?”

“হ্যাঁ। দিদিই প্রায় জোর করে দু’জনকে...” অর্ঘ্য একটা বড় সাইজের দম নিল, কথাটাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বলল, “বাবা মা তো আগে বিদেশ যায়নি, বুড়ো বয়েসে দিদির দৌলতে এবার একটু ঘুরে নিচ্ছে। সেই পুজো অবধি নাকি থাকবে ওখানে।”

“খুব ভাল। ছেলেমেয়েদের কাছে বাবা-মা তো এইটুকুই চায়। শেষ বয়সে একটু শান্তি, একটু হাত পা ছড়িয়ে নাতি-নাতনি সব্বাইয়ের মাঝে হইহই করে অবসর জীবনটা কাটানো...।” শেফালি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তা দুনিয়ায় সবার কপালে কি সব সুখ জোটে? কাউকে কাউকে তো মরণ অবধি জোয়াল টেনে যেতে হয়...”

অর্ঘ্যর নজরে পড়ল, অহনার মুখমণ্ডলে ছায়া ঘনাচ্ছে ক্রমশ। অর্থাৎ, মহিলার আফশোসের লক্ষ তার মেয়েই। অণুদির জীবনটা যে প্রচলিত ছকের একটু বাইরে, এ বুঝতে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু মেয়ে যে মাকেও দুঃখী করে তুলেছে, ভাবতে খারাপ লাগে বই কী। নিজের জীবন-যাপনের ধারা থেকেই তো এই সত্যিটা প্রতিনিয়ত টের পায় অর্ঘ্য। মা কি অর্ঘ্যর চিন্তায় আকুল হয়ে থাকে না দিন রাত? কিন্তু অর্ঘ্য তো নিরুপায়। একটা আদর্শ তাকে ঠেলে বের করে দিয়েছে ঘর থেকে? অণুদিরও কি তাই? লাল্টুদা কি একটা প্রসঙ্গে যেন অণুদির বিয়ের কথা একবার তুলেছিল সেদিন, তারপর ব্যাপারটা এড়িয়েও গেল...। বরের সঙ্গে থাকতে না পারা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া, এসব তো আজকের দিনে কোনও ঘটনাই নয়... অণুদির সমস্যা কি তার চেয়েও গভীর কিছু? যা শুধু মেয়েকে নয়, মাকেও পীড়িত করে চলেছে, বিদ্ধ করছে দু’জনকেই?

ঘরের পলকা গুমোট কাটাতে অর্ঘ্য বলল, “আমার কাজের পুরো লিস্ট কিন্তু এখনও পাইনি মাসি।”

“আমার কোনও সাহায্য লাগবে না। তুমি খাও, দাও, ঘোরো, নিজের কাজ করো...”

“সে তো অতিথির মতো থাকা। ও আমার পোষাবে না।” অর্ঘ্য অহনার দিকে ফিরল, “আমি তোমাকেও সার্ভিস দিতে পারি, অণুদি।”

অহনা সামান্য হাসল। প্রায় না হাসার মতোই। নীরস গলায় বলল, “আমি চাই না, কেউ আমার জন্য খাটুক।”

জবাবটা যেন শুধু অর্ঘ্যকে নয়, শেফালিকেও শোনাল অহনা। চায়ের কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে, মেয়েকে একটা অসন্তোষমাখা ভ্রূকুটি হেনে অন্দরের পানে হাঁটা দিয়েছে।

অপসৃয়মাণ শেফালিকে দেখতে দেখতে অর্ঘ্য গলা একেবারে খাদে নামিয়ে বলল, “তোমাদের মা-মেয়ের মধ্যে সারাক্ষণ একটা লড়ালড়ি চলে মনে হয়?”

অহনার কপালে ঢেউ। খানিক যেন কেঠো স্বরে বলল, “এখন ঘরে থাকছিস? না বেরোবি?”

অর্ঘ্যর সরল কৌতূহল এড়াতে চাইছে অণুদি? প্রসঙ্গটা আর খোঁচাল না অর্ঘ্য, আলগা ভাবে বলল, “রোদ চড়া হওয়ার আগে তোমাদের আলাইপুরটা একটু সফর করে আসি।”

“কাজে বেরোবি কখন?”

“দেখি। আজ ভাবছি বাড়িতে বসে কোশ্চেনেয়ারগুলো রেডি করি।”

“তোদের তো তৈরিই থাকে।”

“তা থাকে। তবে কিনা...।” অর্ঘ্য ঢোঁক গিলল, “আসলে আমাদের একটা ব্রড আউটলাইন দেওয়া হয়। তবে এক এক রাজ্য তো এক এক রকম, রীতিনীতি-কাস্টম-কালচার ফুড-হ্যাবিট, চাষবাসের পদ্ধতি সব আলাদা। এমনকী পারিবারিক কাঠামোও স্টেট টু স্টেট ডিফার করে। সেইজন্য প্রশ্নগুলোও বদলে বদলে যায়।”

“হুম। তা এখানে কতগুলো গ্রাম সার্ভে করবি ভাবছিস?”

“অন্তত গোটা দশেক গ্রাম তো বটেই। তবে এগজ্যাক্টলি কোথায় কোথায় যাব সেটা তুমি আমায় সাজেস্ট করবে।”

“আমার তো মনে হয়...”

অহনা থেমে গেল। বাইরে একটা মেয়ের গলা। ‘ম্যাডাম, ম্যাডাম’ বলে ডাকছে। উঠে গেল অহনা। অর্ঘ্য একটু স্বস্তিবোধ করল। এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করছিল অণুদি, বাপস! বোঝাই যায়, এইসব সমীক্ষার ব্যাপারে অণুদি যথেষ্ট পরিমাণে ওয়াকিবহাল। সুতরাং ভাঁওতাবাজি চলবে না, সত্যি সত্যি কিছু প্রশ্ন বানাতে হবে। এবং ঘুরতেও হবে গ্রামে গ্রামে। মোদ্দা কথা, এমন কিছু করা চলবে না যাতে কণামাত্র সন্দেহ জাগে অণুদির মনে।

বাইরে একটা চেঁচামিচি হচ্ছে না? হ্যাঁ, অণুদি কড়া গলায় ধমকাচ্ছে! অর্ঘ্য সোফা ছেড়ে বাইরের দরজাটায় এল। দেখল গ্রিলগেট খুলে নেমে গেছে অহনা। তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাচ্ছে এক বছর তিরিশের মহিলা। শ্যামলা শ্যামলা রং, গ্রাম্য চেহারা, মুখখানা তেমন সুশ্রী না হলেো চোয়াড়ে মার্কা নয়, সিঁথিতে মোটা সিঁদুর।

অহনা তর্জনী উঁচিয়ে বলছে, “আমি কোনও অজুহাত শুনতে চাই না। কালই তোমার হরিণবাড়ির টাকাটা তুলে ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার কথা ছিল, কি ছিল না?”

“বললাম তো ম্যাডাম, ছিল।” মহিলা মিনমিন করছে, “কাল আমার মেয়েটা এমন...”

“জাহান্নমে যাক তোমার মেয়ে। আমার দিনের কাজ দিনে হবে না কেন? দেরির জন্য ব্যাঙ্ক যদি বাড়তি সুদ দাবি করে সেটা কে দেবে? তুমি? না তোমার মেয়ে?”

“আমার অন্যায় হয়ে গেছে ম্যাডাম। তাই তো মেয়েটাকে জ্বর গায়ে ফেলেও ছুটতে ছুটতে এসেছি। যদি মায়া আজ হরিণবাড়ি গিয়ে টাকাটা তুলে নেয়... শুধু এবারকার মতো...”

“না। যার কাজ সে করবে। মাইনে নেবে তুমি, কমিশন পাবে তুমি, আর কাজটা চাপাবে অন্যের ঘাড়ে, এ আমি অ্যালাউ করব না। আজ চারটের মধ্যে টাকা ডিপোজিট করে ব্যাঙ্ক থেকেই আমায় ফোন করবে। যদি না পারো তো বলো, আজই আমি অন্য মেয়ে খুঁজব।”

শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে মহিলা। আটপৌরে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে সাইকেলে উঠে বসল। বেঁটে পাঁচিল পেরিয়ে ইটভাটার আড়ালে মিলিয়ে গেল সাইকেল।

অর্ঘ্য রীতিমতো বিস্মিত। তার দিদির বন্ধু, আসানসোলের সেই হাসিখুশি তরুণীর যে এমন একটা চণ্ডমূর্তি থাকতে পারে, এ যেন চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না। মাঝে অবশ্য অনেকগুলো বছর কেটেছে, হয়তো সময়ের আঁচে বদল ঘটেছে অণুদির। সে নিজেও কি আর সেই বিন্দাস ছেলেটি আছে এখনও?

অহনা ঘরে ফিরতেই অর্ঘ্য লঘু সুরে বলল, “তোমাকে তো সমঝে চলতে হবে, অণুদি। তুমি তো বহুত রাগী আছ!”

জবাব দিল না অহনা, আবার উলটোচ্ছে ম্যাগাজিন।

অর্ঘ্য ঈষৎ কৌতূহলী স্বরে বলল, “টাকাপয়সা জমা দেওয়ার ব্যাপারটা কী? আশাবরী কি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড?”

“কক্ষনও না। অহনা চিটিংবাজির ব্যাবসা করে না।” অর্ঘ্যকে চমকে দিয়ে অহনার স্বর রুক্ষ সহসা। পরক্ষণেই স্বর নামিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আশাবরী মেনলি একটা মাইক্রোফিনান্স কোম্পানি। আমরা গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তার মেম্বারদের নানান ছোটখাটো কারবারে লোন দিই।”

“তাই বলো।” অহনার আকস্মিক ভাবান্তরে সামান্য থতমত খেয়েও সামলে নিয়েছে অর্ঘ্য। হালকা ভাবে বলল, “তুমি এখন গ্রামের মহাজন। স্মল অ্যামাউন্ট ধার দিয়ে চড়া সুদে পয়সা উসুল করো।”

“হ্যাঁ, সুদটা একটু বেশিই নিই। কারণ, গ্রামের লোককে তো ব্যাঙ্ক সহজে উপুড়হস্ত করে না, করলেও তার ফ্যাকড়া সামলাতে গরিবগুরবোদের যথেষ্ট নাস্তানাবুদ হতে হয়। তাই আশাবরীই ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে গাঁয়ের লোকদের দরকারগুলো মেটায়। তার জন্য মূল্য নেব না?” অহনা টেরিয়ে তাকাল, “ফর ইয়োর ইনফর্মেশন, আমার প্রতিটি দেনাদারই মেয়ে। ফিমেল জেন্ডার। এবং তারা কেউ শহুরে বেওয়াসিদের মতো টাকা মারে না।”

মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসা অর্ঘ্যর মোটেই অজানা নয়, অন্ধ্রে আর ঝাড়খণ্ডে অজ গাঁয়েও দেখেছে এদের কাজ-কারবার। তবে তারাও সেখানে শোষণের যন্ত্র, গরিবদের প্রাণভরে চোষে। অণুদির কারবার কি একটু ভিন্নগোত্রের? কিন্তু অণুদি মেয়েটার সঙ্গে যে আচরণ করল, তাকে তো আসানসোলের এমোড়ে-ওমোড়ে চরে বেড়ানো সুদখোরদের চেয়ে আলাদা কিছু মনে হল না।

অর্ঘ্য কৌতুকের সুরে বলল, “তা হলে লাভ তো তোমার ভালই হয়।”

“তো?”

“বউটাকে অত ঝাড় না দিলেও পারতে। যার বাচ্চা অসুস্থ...”

“আমার দয়ামায়া কম।... আর কিছু বলার আছে?”

ফের পালটা ঠাট্টা জুড়তে যাচ্ছিল অর্ঘ্য, তখনই টের পেল, কম্পন চালে রাখা মোবাইলটা বাজছে পকেটে। প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় হাত চলে গেছে মোবাইলে, বের করে নম্বরটা দেখেই আবার ঢুকিয়ে রাখল পকেটে।

অহনা জিজ্ঞেস করল, “কে রে? ধরলি না যে বড়?”

ভিতরের চোরা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্ঘ্য তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, “সার্ভিস প্রোভাইডারের ফোন। নানান স্কিম শোনায়। বড্ড বিরক্ত করে।”

“ও।”

“আমি তা হলে একটু চরে আসি।”

অনুমতির অপেক্ষায় না থেকে বেরিয়ে এল অর্ঘ্য। হনহন পা চালিয়ে নদীর পাড়ে। ঘোলাটে গঙ্গা, সামনে ডিঙিনৌকোর সার, অদূরে নদীর মধ্যিখানে গজিয়ে ওঠা চমত্কার একটা দ্বীপ... কিছুই চোখে পড়ল না অর্ঘ্যর। কাছাকাছি লোকজন নেই দেখে মোবাইল বার করে অস্থির আঙুলে বোতাম টিপছে। রিং হচ্ছে ওপ্রান্তে। থামল ধরেছে।

“কমরেড, সাড়া পাচ্ছি না কেন? হাইড-অ্যান্ড-সিক গেমটা এবার বন্ধ করা যায় না?”

দেহাতি হিন্দি। তেজসের গলা! সর্বনাশ, তেজস এই নম্বরে কেন! তার নম্বরই বা পেল কী করে তেজস?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%