সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ঝড়ের গতিতে কম্পিউটারে টাইপ করছিল অহনা। আজ সক্কালবেলায় এসে তাঁতিয়ার ভাবী সদস্যদের পুরো লিস্ট দিয়ে গেছে মায়া, দেরি না করে হাতের কাজটা চুকিয়ে রাখছে। সতেরো জনের বিশদ বায়োডাটা তৈরি, কম ঝকমারি। কাল রোববার, অহনা কাল অফিসের ছায়া মাড়াবে না। সপ্তাহে ছ’-ছ’টা দিন সে বিস্তর খাটে, একটা দিন অন্তত তার নিজস্ব থাকুক। মা কলকাতা যাওয়া ইস্তক কৃষ্ণার হাতের অখাদ্য রান্নাই সোনামুখ করে খেয়ে চলেছে অর্ঘ্য, এক-আধ দিন তো অহনারও উচিত রান্নাঘরে ঢোকা, নয় কি?
তা ছাড়া অহনারও তো ভাল লাগবে। বহুকাল পর আবার কারও জন্যে হাতাখুন্তি ধরতে ইচ্ছে করছে যে। অর্ঘ্য এত ভাল, কাল ওইরকম ভয়ংকর রেগে গিয়েছিল অহনা, কী নরম করে কথা বলে বলে শান্ত করল অহনার মনটাকে। মা’র মুখে ওইসব বাক্য শুনলে দু’চোখের পাতা এক করতে পারে না অহনা, বিচ্ছিরি স্মৃতিগুলো ঝাপটা মারে সারারাত, শেষ পর্যন্ত ঘুমের বড়ি গিলতে হয়। কাল কিন্তু অহনার দিব্যি নিদ্রা এসে গেল, ট্যাবলেট ছাড়াই। এর জন্যই কি একটু বাড়তি যত্ন পেতে পারে না অর্ঘ্য?
ওফ, শেষ হয়েছে কাজ। এবার প্রিন্ট নেওয়ার পালা। প্রিন্টারের ট্রে-তে কাগজ ভরতে গিয়ে অহনার ভুরুতে ভাঁজ। প্যাকেট প্রায় খালি, শেষ দু’-চার পিস মাত্র পড়ে, ওতে তো কুলোবে না। বাজারে মোবাইলের দোকানটায় জেরক্স মেশিন বসিয়েছে, ওদের কাছে থাকতে পারে কাগজ। বিকেল হয়ে এল, অনেকক্ষণ টানা কম্পিউটারে বসে শরীরও আর চলছে না... ইলাকে পাঠিয়ে দেবে? তুৎ, যা ঢ্যাঁড়শ মেয়ে, কী কাগজ এনে হাজির করবে তার ঠিক আছে? কাল রোববার দোকানটা বন্ধ থাকতে পারে... তা হলে সেই সোমবার। ওই দিন কাগজে এনে, ছেপে, আর বোধহয় কলকাতা যাওয়া হবে না। ওদিকে সোলারিসের লোক খানিক আগে ফোন করেছিল। ডেমো দেওয়ার মাল নাকি এসে গেছে। অহনা সোমবার ওদের অফিসে যাবে বলল...
আলস্য ঝেড়ে অহনা উঠেই পড়ল। মোবাইলে মাত্র আট টাকা পনেরো পয়সা ব্যালেন্স আছে, রিচার্জ় করিয়ে নেওয়াটাও খুব জরুরি। মোপেড নিয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছেছে দোকানে।
কাউন্টারে মুখচেনা তরুণ। কানে হেডফোন গোঁজা। সংগীতপ্রেমের হদ্দমুদ্দ! নামটা বোধহয় রাজু। অহনা অবশ্য নাম ধরে ডাকে না কখনও, তাতে একটা বাড়তি ঘনিষ্ঠতার ভাব এসে যায়।
অহনাকে দেখে রাজু উঠে দাঁড়িয়েছে। কান থেকে সরাল হেডফোন। শশব্যস্ত গলায় বলল, “কী লাগবে ম্যাডাম?”
“প্রিন্টারের কাগজ রাখেন নিশ্চয়ই?”
“আছে। তবে আমরা তো বেচি না। নিজেদেরই কাজে লাগে। আপনার ক’টা দরকার?”
“অন্তত খান পঞ্চাশেক। তারপর নয় টিয়াডাঙা থেকে কিনে নেব।”
“হয়ে যাবে।”
গুনে কাগজ প্যাক করে দিল রাজু। মোবাইলেও টাকা ভরে নিল অহনা। একটা পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছে। ফেরত দিতে দিতে রাজু বলল, “ম্যাডাম, আপনার বাড়িতে যিনি এসেছেন, উনি কি আপনার রিলেটিভ?”
এই ধরণের প্রশ্ন অহনা একদম পছন্দ করে না। তার বাড়িতে কে এল গেল তাই নিয়ে গাঁয়ে যেন বড় বেশি কৌতূহল। বাবলা যখন এসেছিল তখনও টুকটাক জিজ্ঞেস করত লোকে। একেই বোধহয় বলে গ্রাম্যতা।
অহনা নীরস স্বরে বলল, “ওই রকমই।”
“বাঙালি?”
“মানে?”
“নাহ...উনি কাল একটা নতুন সিম করালেন... অদ্ভুত এক টাইটেল দেখলাম... রত্নম না কী যেন। বাংলা অবশ্য ভালই বলছিলেন।” রাজুর হাসি চওড়া হল, “কলকাতায় থাকেন বুঝি?”
“হুঁ।”
সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে প্যাকেট হাতে বেরিয়ে এল অহনা। অবাক হয়েছে খুব। ওরকম দু’নম্বরি বাড়তি সিম বানানোর কী অর্থ? ফোনও তো অর্ঘ্য আজকাল বন্ধই রাখে সারাক্ষণ। কোনও গোলমেলে ব্যাপার নেই তো? হয়তো কোনও অপকর্ম করে এসে এখানে গা-ঢাকা দিয়েছে!
না না, ছি ছি, এসব কী ভাবছে সে? অর্ঘ্য মোটেই এরকম ছেলে নয়। হতেই পারে না। অন্যায় কিছু করে লুকিয়ে থাকলে তার ছাপ ফুটে উঠত না অর্ঘ্যর মুখেচোখে? কথায় বার্তায়? গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য সংগ্রহের কাজটাও তো করছে সত্যি সত্যি। অহনা খবর পায় নিয়মিত, তা ছাড়া অর্ঘ্য তাকে ডাটাশিটও দেখিয়েছে। তা হলে...?
এইসব ভাবতে ভাবতেই অহনা চলেছে মোপেডে। আশাবরীতে ফিরল। কাগজ নিয়ে অফিসের দিকেই এগোচ্ছিল, আচমকা মাটিতে গেঁথে গেল পা।
একটা দুধসাদা মহার্ঘ প্রাইভেট কার ঢুকছে কম্পাউন্ডে। চালকের আসনে কে ও? সুগত না?
হ্যাঁ, সুগতই। পরনে সেই চিরাচরিত পোশাক। নেভি ব্লু সুট, গলায় টাই।
মাথায় ঠাঁইঠপাঠপ নেহাই পড়ছিল অহনার। একটুক্ষণ ন যযৌ ন তস্থৌ দাঁড়িয়ে থেকে এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। দাঁতে দাঁত ঘষে চাপা স্বরে বলল, “আবার? বারণ করেছি না এখানে আসতে?”
“তবু এলাম। সুগত যেন নির্বিকার। গাড়িতে হেলান দিয়ে পকেট থেকে বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বার করল। ঠোঁটে রাজা মাপের সিগারেট ঝুলিয়েছে। লাইটার জ্বালিয়ে ধরাল। আলাইপুরের বাতাসে কটু ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “গাড়িখানা দেখেছ? লাস্ট উইকে কিনলাম। এইট্টিন প্লাস পড়ল। ভেরি স্মুথ ড্রাইভিং। রাস্তাঘাটে বাম্প খানাখন্দ কিছু টের পাওয়া যায় না।”
সেই হামবড়া। সেই চালমারা কথাবার্তা। মা বলছিল লোকটার নাকি পরিবর্তন এসেছে! ওহ্, পরিবর্তন শব্দটায় ঘেন্না ধরে গেল!
অফিসের দিক থেকে উঁকিঝুকি আসছে কি না দেখে নিয়ে অহনা তীব্রস্বরে বলল, “আউট। এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাও। ইউ নো, আমি তোমায় এক মুহূর্ত স্ট্যান্ড করতে পারি না।”
“তা বললে চলে ডার্লিং? পাক্কা আড়াই ঘণ্টা ড্রাইভ করে এলাম তা কি এক্ষুনি বিদেয় হওয়ার জন্যে?” সুগতও চারদিকটা একবার দেখে নিল, “আশা করি চেঁচামিচি জুড়ে সিনক্রিয়েট করবে না। তাতে তোমারই কিন্তু লোকসান। আফটার অল আশাবরী ম্যাডামের একটা প্রেস্টিজ় আছে তো।”
“কী চাও তুমি? কেন এসেছ?”
“বাইরে দাঁড়িয়ে কথা হয় নাকি। চলো, ভেতরে গিয়ে বসি।”
“তোমার সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই।”
“সো হোয়াট? আমার তো আছে।” সুগত সিগারেটটা চেপে চেপে নেভাল জুতো দিয়ে। মশমশিয়ে হেঁটে গ্রিলবারান্দা খুলে ঢুকেছে অন্দরে।
অহনার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। দরজা খোলা... কৃষ্ণা এসে গেছে নাকি? সুগত শেষ যেবার হানা দিয়েছিল, দিনটা ছিল রোববার। কৃষ্ণা তখন সবে যোগ দিয়েছে কাজে। অহনার কাছে প্রবল ঝাড় খেয়ে সুগত সেদিন গনগনে মুখে চলে গিয়েছিল তাড়াতাড়ি। কৃষ্ণা ব্যাপারটা পুরো আঁচ করতে পারেনি। তবু তার কত কৌতূহল... “সুন্দর মতো বাবুটা কে গো! তুমি এত বকছিলে কেন! বাবুর গাড়িটা কী ভাল, এস্টাট দিলেও শব্দ হয় না!” সেদিন যা হোক কিছু বুঝিয়ে পরিস্থিতি ম্যানেজ করা গিয়েছিল, আজ কি তা পারবে? কৃষ্ণা এখন অনেকটাই পুরনো, অহনা শেফালির তর্কাতর্কি থেকে কিছুটা হয়তো আন্দাজও আছে তার। আজকের বাদানুবাদের পর আর কি কিছু বোঝার বাকি থাকবে কৃষ্ণার! তারপর গ্রামে গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে যাবে নিশ্চয়ই। চাটনি সহযোগে। কে কী জানল অহনা তার পরোয়া করে না। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লোকজন রসালো চর্চা করছে, এটা ভাবলেই অহনার গা গুলিয়ে ওঠে।
এখন উপায়ও তো নেই। সে বাড়ি না ঢোকা অবধি সুগত গেঁড়ে বসে থাকবে। আত্মপরিচয় ঘোষণা করে কৃষ্ণাকে হুকুমও ছুড়তে পারে। যা দু’কান কাটা লোক, কৃষ্ণার সঙ্গে গল্প জোড়াটাও বিচিত্র নয়। উফ কী জ্বালা। অহনা রে, তোর মান মর্যাদা সব গেল!
অহনা বড় করে একটা শ্বাস টানল ফুসফুসে। শক্ত করল নিজেকে। যা হয় হবে, আজ এমন শিক্ষা দেবে সুগতকে যেন আলাইপুরের ছায়া আর না মাড়ায়।
ভেতরে পা রেখে অহনার বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। রান্নাঘরের শিকল টানা তার মানে কৃষ্ণা আসেনি। তবে কি অর্ঘ্য...? সন্ধে নামার আগে সে ফেরে না সচরাচর, আজ এত তাড়াতাড়ি? ওহ, এ তো আর এক ধরনের অস্বস্তি। তবু কৃষ্ণা এসে পড়ার চেয়ে ভাল। সে শুনল তো শুনল, অহনার তাতে কী এমন ক্ষতি!
সুগত বড় সোফায় বসে। হাতে আবার সিগারেট। একটা খালি কাপ এনে ঠং করে টেবিলে রাখল অহনা, “দয়া করে ঘর নোংরা কোরো না। এটাতে ছাই ফ্যালো।”
কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। একটু যেন জোরে জোরেই টান দিচ্ছে সুগত।
অহনা বসল মুখোমুখি। পলকের জন্য চোখ অর্ঘ্যর দরজায়। বেরিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আছে অর্ঘ্য। কী আশ্চর্য, সংকোচের বদলে যেন একটু ভরসাই পেল অহনা।
ঠান্ডা গলায় অহনা বলল, “কেন তুমি এখনও আমার ওপর অত্যাচার চালাচ্ছ? কী করলে আমায় নিষ্কৃতি দেবে?”
“তোমাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি...।” সুগতর স্বর গম্ভীর, “ফিরে চলো কলকাতায়। আবার নতুনভাবে জীবনটা শুরু করি।”
“তুমি তো ভাল মতোই জানো সেটা সম্ভব নয়।... টাকার জোরে ডিভোর্সের মামলা তুমি ঠেকিয়ে রাখতে পারো, কিন্তু আমি যা ছেড়েছি তা চিরকালের জন্যই ছেড়েছি।”
“সে তো তোমার ছ’বছর আগের ডিসিশন। তারপর তোমারও বয়স বেড়েছে, আমারও। এখন কি আমাদের কারও আর মাথা গরম করা সাজে!” সুগত থামল। বুঝি বা পড়তে চাইল অহনাকে। তারপর গলাটা সামান্য নরম করে বলল, “ডিভোর্স যে তোমাকে দিতে চাইনি তা তো অকারণে নয় অহনা। আমি বিশ্বাস করি একদিন না একদিন আমাদের ভুল বোঝাবুঝির পালা শেষ হবে, আবার আমরা...”
“স্টপ দিস ননসেন্স।” অহনা দুম করে চেঁচিয়ে উঠল, “কীসের ভুল বোঝাবুঝি? পরের পর অন্যায় করে গেছ, থামাতে চেয়েছি, শোনোনি। যা খুশি নোংরামি করে গেছ, চোখের ওপরে, আমাকে মানুষ বলেই গণ্য করোনি। যেই না প্রতিবাদ করেছি, ওমনি প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়েছ আমাকে।”
“থাক না ওসব পুরনো কথা। ভুল তো আমি করেইছি।” সুগত গলা ঝাড়ল, “তবে তুমিও তখন বড্ড টাচি হয়ে গিয়েছিলে, নয় কি? আমি তোমার কোনও অভাব রেখেছিলাম, বলো?... অত বড় একখানা ফ্ল্যাট, শুধু তোমার ব্যবহার করার জন্যে একটা গাড়ি... খরচ করার জন্য অঢেল টাকা... যেভাবে খুশি ওড়াও, কেউ কোনও প্রশ্ন করবে না...। তবু তুমি সেই মিডলক্লাস পিটপিটানি শুরু করলে...”
“আমি তো এখনও সেই রকমই আছি। কেন আসো আমার কাছে? আমি বদলাইনি। সরি, তুমি তোমার টাকা নিয়ে, মেয়েমানুষ নিয়ে, যেভাবে খুশি থাকো। ঈশ্বরের দোহাই, শয়তানের দোহাই, আমাকে আর ডিস্টার্ব কোরো না, প্লিজ়।”
মিনিট খানেক ঘর নিস্তব্ধ। এতই শব্দহীন, মাথার ওপর পাখা ঘোরার আওয়াজও যেন উচ্চকিত লাগে। আচমকাই সুগতর মুখমণ্ডল বদলে গেছে। রাজকীয় ভঙ্গিমা ছেড়ে ঝুঁকেছে টেবিলে। আবার একখানা সিগারেট ধরিয়ে টানছে ফসফস। সেটাও নিভিয়ে দিয়ে করুণ স্বরে বলল, “আমার বড় বিপদ অহনা। এই সময়ে তুমি পাশে না থাকলে...”
“ঢং কোরো না।” অহনা একটুও গলল না, “তোমার আবার কীসের বিপদ? টাকার পাহাড়ে বসে আছ, মুশকিল আসানও তো তুমি তুড়ি মেরে কিনে নিতে পারো।”
“না অহনা, না। তুমি বুঝতে পারছ না। আমি এখন আগ্নেয়গিরির মুখে বসে আছি।”
“হোয়াট?”
“টাকাপয়সা কালেক্ট করে যে ক’টা বিজনেসে লাগিয়েছিলাম, সব ডুবে গেছে। আমার লোকেরাই ডুবিয়েছে। কত লাখ টাকা আমার নাম করে তুলেছে এজেন্টরা, জমাই পড়েনি। যাদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা তারা এখন তাগাদা দিচ্ছে। আমি যে কীভাবে কী করব...”
“তাতে তো তোমার ঠাঁটবাটের কিছু কমতি দেখছি না। গাড়িটা গত সপ্তাহে কিনেছ বললে না?”
“তুমি তো মানি মার্কেটের ব্যাপার-স্যাপার বোঝো অহনা। টাকা আসছিল বলেই স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং একভাবে চলছিল। এখন যদি সেটা হঠাৎ বদলাই, সঙ্গে সঙ্গে বাজার বুঝে যাবে আমার কী হাল। ওমনি চারপাশটা ক্র্যাশ করে যাবে।”
“পন্জি সিস্টেমের এটাই তো নিয়ম। তোমাকে তো আগেও বলেছি।”
“ভেবেছিলাম আমি একটা এক্সেপশন। হয়তো সারভাইভ করে যাব। সুগত ঢোক গিলল। মৃদু গলায় বলল, হয়তো এখনও পারি। যদি বিশ্বাস করার মতো কেউ একজন পাশে থাকে... আমাকে গাইড করে...”
“আছে তো। তোমার সেই চন্দ্রাণী।”
“আহ, ডোন্ট টক অ্যাবাউট দ্যাট ডার্টি হোর।”
“খবরদার। আমার বাড়িতে বসে কোনও মেয়ের সম্পর্কে নোংরা মন্তব্য করবে না।” অহনা প্রায় গর্জে উঠল, “ওই মেয়ের সঙ্গেই না তুমি থাকতে এক সময়ে! বিজনেস বাড়বে বলে তাকে আনলে, তারপর তুমিই তাকে বিছানায় তোলোনি? সটান বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমার মুখের সামনে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দাওনি? সে যদি হোর হয়, তবে তুমি কী? ক্রিমিকীট? না নর্দমার পোকা?”
“তুমি জানো না অহনা, চন্দ্রাণী আমাকে কীভাবে চিট করেছে। কত পারসোনাল অ্যাসেট বানিয়ে ফেলেছে, আমায় টের পেতে দেয়নি।... তুমি শুধু আমার সঙ্গে চলো, দেখবে ওকে আমি কেমন লাথি মেরে তাড়িয়ে দিই।”
রাগে বিরক্তিতে রগের শিরা দপদপ করছিল অহনার। তবু কেন যে অহনা হেসে ফেলল! বিদ্রূপের সুরে বলল, “সে এখনও আছে তা হলে? তোমার সঙ্গে?”
“উপায় কী? ও ব্যাবসার এত কিছু সিক্রেট জেনে ফেলেছে...।” সুগত অস্থির ভাবে দু’হাত ঝাঁকাল, “তাই তো বলছি তুমি চলো। আমি যদি একটু ভরসা পাই তা হলে ওকে...”
“আমার মতো করে বিদেয় করতে পারো, তাই তো? তারপর চন্দ্রাণীর পরিবর্তে আমাকে সেই সার্ভিসটা দিতে হবে? বোথ ইন বেড অ্যান্ড বিজ়নেস!”
“কী বলছ তুমি? কোথায় তুমি আর কোথায় চন্দ্রাণী? তুমি হলে আমার বিয়ে করা বউ আর সে একটা...। তোমার মাকেও আমি বলেছি, তোমার সম্মান আর আমি ক্ষুণ্ণ হতে দেব না। সোনাদানা দলিল দস্তাবেজ কিচ্ছু আর ওই নচ্ছার মেয়েমানুষটার জিম্মায় রাখব না। সব চলে আসবে তোমার কাছে।”
আবার অহনার ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল। সুগত সেই একই রকম আছে। নিজের স্বার্থজ্ঞান টনটনে। কোনও একটা ধান্দায় এখন চন্দ্রাণীকে ছেড়ে অহনাকে দরকার। সম্ভবত দু’ নম্বরি কারবারে অহনাকে বেশি নিরাপদ সহযোগী ভাবছে। মা ওসব আহ্লাদিপনায় ভুলতে পারে, কিন্তু অহনা তো বহু বছর আগেই বুঝে গেছে, মাংসলোলুপ ওই সুগতর চোখে তার আর চন্দ্রাণীর কোনও তফাত নেই।
অহনা রূঢ় স্বরে বলল, “তুমি ডিভোর্স দাও না দাও, তোমার সঙ্গে সব চুকেবুকে গেছে। সে সিদ্ধান্তের আর নড়চড় হবে না।”
“কেন এক জেদ আঁকড়ে আছ? বি সেন্সেবল।” আবার একটা সিগারেট ধরাল সুগত। বছর পঁয়তাল্লিশের সুদর্শন মানুষটার চকচকে মুখখানা বেশ নিষ্প্রভ এখন। সিগারেট ধরা আঙুলগুলো যেন কাঁপছে অল্প অল্প। কেমন ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, “তুমি যা বলবে, যেভাবে চাইবে, সেভাবেই নয় বদলাব নিজেকে।”
“হাসিয়ো না। আমি বললেই ওমনি আপাদমস্তক জালি সুগত চৌধুরী সাধুসন্ত বনে যাবে!”
“চেষ্টা তো করতে পারি। ব্যাবসার ঝাঁপ গুটিয়ে দু’জনে মিলে নয় অন্য কোথাও চলে যাব। যেটুকু যা থাকবে, তাতেই আমাদের বাকি জীবনটা স্বচ্ছন্দে...”
ওফ, সেই দু’ নম্বরি চিন্তা। রাশি রাশি লোককে পথে বসিয়ে পালানোর তাল করছে নাকি? আর অহনা তার সঙ্গী হবে? ভাবল কী করে সুগত?
ধারালো গলায় অহনা বলল, “তোমার কোনও মতলববাজিতে আমি ভুলছি না। তুমি কী করবে না করবে তা তুমি ভাবো। আমি তোমার সঙ্গে নেই, থাকবও না কোনও দিন। মা দাদা বউদি যাকে খুশি জপাতে পারো, আমার সিদ্ধান্তে নড়চড় হবে না।”
“একটু ভাবো। ক’দিন সময় নাও।”
“না। এবং কোনও অছিলাতেই তুমি আর আলাইপুরে আসবে না। বিয়ের পর কয়েকটা বছর তো আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি। জ্ঞানত আমি তোমার কোনও ক্ষতি করিনি। কোনও মেটিরিয়াল লস ঘটাইনি। তার বিনিময়ে এইটুকু তো পেতে পারি। শান্তিতে তোমাকে ঘেন্না করার সুযোগটুকু অন্তত দাও।”
সপাং করে যেন চাবুকের ঘা পড়ল সুগতর গায়ে, কেঁপে উঠল সোফায় আসীন দেহকাণ্ড। ঝলসে উঠল সুগতর চোখের মণি। তর্জনী উঁচিয়ে কী যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল। ঘাড় নামিয়ে বসে রইল মিনিটখানেক। তারপর উঠে দাঁড়িয়েছে। বিড়বিড় করে বলল, “একটু বাথরুমে যেতে পারি?”
বারণ করতে পারল না অহনা। এবং যে আশঙ্কাটা পিনপিন করছিল মাথায় সেটাই ঘটল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে সুগতর দৃষ্টি আটকেছে অর্ঘ্যর ঘরে। একটুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে এগিয়ে এল পায়ে পায়ে। ভুরু কুঁচকে বলল, “ও কে?”
পলকের জন্য থমকে গিয়েছিল অহনা। কেন যে...? পরক্ষণে অবশ্য কুণ্ঠা ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক। পালটা ভুরু কুঁচকে বলল, “জেনে কী করবে?”
“ও কি এখানেই থাকে?”
“দেখতেই তো পাচ্ছ, আছে। বাড়তি প্রশ্ন কোরো না, জবাব পাবে না।”
“এখানে যে কেউ একজন থাকে... কই, মা তো কিছু বললেন না...?”
“প্রয়োজনবোধ করেনি। তোমার বাড়িতে তুমি কাকে এনে তোলো, রাখো, মাকে জানিয়েছ কখনও?”
“ও।”
নিজের মনেই মাথা দোলাল সুগত। তারপর চলে গেল। বুঝি বা একটু দ্রুতই। গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিতে একটু বুঝি বেশি সময় লাগল। আশাবরীর চৌহদ্দি ছেড়ে আস্তে আস্তে মিলিয়েও দেল দুধসাদা।
অহনা সোফা ছেড়ে নড়েনি। বসে ছিল কপাল টিপে। বুঝি শান্ত করছিল রক্তকণিকার অবাধ্য ছোটাছুটি। চোখ না তুলেই টের পেল অর্ঘ্য এসেছে।
অর্ঘ্যর স্বর কানে এল, “আই অ্যাম সরি অণুদি।”
অহনা মুখ তুলল, “কেন?”
“ঘরের দরজাটা বন্ধ রাখলেই বোধহয় ভাল হত। ভদ্রলোক এমন ভাবে দেখছিলেন...”
“তাতে আমার কী এসে যায়?” অহনা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আমি কি ওকে কেয়ার করি?”
“তবু... যা সত্যি নয়... হয়তো তেমন একটা ধারণা নিয়ে চলে গেলেন।”
কোনটা সত্যি, আর কোনটা যে সত্যি নয়, কে বলতে পারে? অহনাও কি জানে ঠিকঠাক? এ বাড়িতে অর্ঘ্যর ক’দিনের উপস্থিতি যে তাকে একটা অন্য ধরনের পুরুষের সাহচর্য দিচ্ছে, সর্বদা অহনার স্মরণেও থাকছে না অর্ঘ্য তার বান্ধবীর ভাই, এই সত্যিটাকে কি অহনা অস্বীকার করতে পারে জোর গলায়?
অহনা ঠোঁট উলটে বলল, “ছাড় তো। ভাবুক যা খুশি।”
কৃষ্ণা ঢুকছে হেলেদুলে। দু’জনকে একসঙ্গে বাইরের ঘরে দেখে একটু যেন অপ্রস্তুত। কাঁচুমাচু মুখে বলল, “চায়ের জন্য বসে আছ, না?”
কৃষ্ণার দেরিতে আসায় অহনা স্বস্তিই পেয়েছে। তবু গম্ভীর সুরে বলল, “দয়া করে তাড়াতাড়ি জলটা চড়াও।”
কৃষ্ণা প্রায় দৌড়োল রান্নাঘরে। সে দিকে তাকিয়ে অহনা হাসিহাসি মুখে বলল, “তা কী বুঝলি আজ, অ্যাঁ?”
অর্ঘ্যর চোখ পিটপিট, “কী ব্যাপারে বলো তো?”
“আমরা তো কেউ আস্তে কথা বলছিলাম না। সবই তো গিলেছিস নির্ঘাত। লোকটাকে কেমন টাইট দিলাম বল?”
“একটা কথা বলব? রাগ করবে না?”
“কী?”
“ভদ্রলোককে এতটা হিট না করলেই পারতে।”
“বেশ করেছি। জানিস ও আমায় কত জ্বালিয়েছে?”
“হতে পারে। তবে এও তো হতে পারে, তোমার হাজ়ব্যান্ডের মধ্যে একটা চেঞ্জ এসেছে? গলার স্বর শুনে যথেষ্ট বিচলিত মনে হচ্ছিল। হয়তো সত্যি আন্তরিক ভাবে চাইছেন...”
“থাম তো। ওকে তুই কতটুকু চিনিস? কথা দিয়েই তো লোককে মোহিত করেছে চিরকাল।” অহনার গলায় ঝাঁঝ, “কথার কায়দায় ভুলেই তো আমি ফেঁসেছিলাম।”
“তাই বুঝি?”
“না তো কী। প্রথম ওর সঙ্গে মোলাকাত আমাদের বাড়িতে। বাবা কোল ইন্ডিয়ার বড় অফিসার ছিল, তুই তো জানিসই। সুগত বাবার কাছে এসেছিল। বাবাকে দিয়ে কিছু ইনভেস্ট করাতে। শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, চার-পাঁচটা ইন্সিওরেন্স কোম্পানির ব্রোকারি, একসঙ্গে চালাত। পরিচয় দেওয়ার সময়ে বলত, আমি হেঁজিপেঁজি দালাল নই, বিনিয়োগ পরামর্শদাতা। কার্ডে লেখা থাকত, ইনভেস্টমেন্ট কন্সালটেন্ট। কত যে ডিগ্রি ডিপ্লোমার লিস্ট ছিল সেই কার্ডে।”
“অর্থাৎ প্রচুর পড়াশোনা করা মানুষ।”
“তুৎ, সব মিথ্যে। মানুষটাই তো ভুয়োর ডিপো। তবে কথাবার্তায় অতি অতি চৌখস। তখনই সুট-প্যান্ট-টাই পরত। ফিল্মস্টারদের মতো ঝকঝকে চেহারা, এখন তো তাও মাথার সামনেটা অনেক ফাঁকা হয়ে গেছে, তখন চুলের কী বাহার, মুখে অনর্গল ইংরিজির খই ফুটছে... এমন ভাবে বোঝাবে, মনে হবে সর্বস্ব এর হাতে তুলে দেওয়া যায়। তবে বাবা ছিল হার্ড নাট টু ক্র্যাক। সুগতকে তাই আসতে হচ্ছিল বারবার। শেষমেশ বাবা বোধহয় কিছু টাকা রেখেছিল, কিন্তু আমি তদ্দিনে পুরো মোহিত হয়ে গেছি। সুগতর দিক থেকেও সাড়া পেয়ে আমি তো আত্মহারা। এম.এস.সি করে তখন সবে নেটে বসব বসব ভাবছি, ও হঠাৎ তাড়া লাগাতে শুরু করল বিয়ের জন্য। বাবা তখনই আমাকে সাবধান করেছিল। বলত, সুগতর ভেতর একটা মেকি ব্যাপার আছে, ওর দেখনদারিতে ভুলিস না...। কানে তুললাম না। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা অগ্রাহ্য করে সেরে ফেললাম বিয়েটা। প্রথম তিন-চার মাস তো কিছুই টের পাইনি। দিব্যি একটা সাজানো গোছানো ফ্ল্যাটে নিয়ে তুলল আমায়। আমিও সুখের সাগরে ভাসছি। তারপর তো বিকশিত হল বাবুর স্বরূপ। যে বাবা মা ভাই টাইকে দেখেছিলাম সুগতর, তাদের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই, শুধু ওই দিনগুলোতে কোনওভাবে পটিয়ে পাটিয়ে বরানগরে এনে রেখেছিল। কয়েকটা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মেম্বরশিপ ছিল, সেগুলোকেই ডিগ্রি বলে চালাত। আদতে লেখাপড়ার দৌড় মোটে বি.কম।”
“ও...তার মানে তোমায় ঠকিয়ে বিয়ে করেছিল?”
“সুগত তা কখনই মানতে চায় না। বলে, তুমি যদি আমার সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে নাও, তার জন্য আমি দায়ী? তখন মনে হয়েছিল যুক্তিটা মিথ্যে নয়। ও তো কখনও গলা ফুলিয়ে দাবি করেনি, বোঝার ভুলটা আমারই গলতি।”
কৃষ্ণা চা বিস্কুট দিয়ে গেছে। অর্ঘ্য কাপ টানল। বিস্কুট চিবোতে চিবোতে নিচু গলায় বলল, “তারপর বুঝি ওই মহিলা... কী যেন নাম...”
“না রে। সে অনেক পরে। তার ঢের আগে থেকেই আমাদের সম্পর্কটা...।” অহনা দূরমনস্ক মুখে চুমুক দিল চায়ে, “হঠাৎ একদিন শুনলাম, ও আর অন্য কোম্পানির কাজ করবে না, নিজেই কারবার খুলবে। যারা যারা ওর টিমে কাজ করত, তাদের নিয়ে। কী ব্যাবসা? এক বছর, দু’ বছর, পাঁচ বছর, দশ বছরের জন্যে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট রাখবে, চড়া সুদ সমেত ফেরত দেবে সময় মতো। বিশেষ কায়দায়। বেশি সময়ের জন্য যারা রাখবে, তাদের টাকার একটা অংশ দিয়ে যারা কম সময়ের জন্য রাখছে, তাদের টাকাটা মিটিয়ে দেবে। আর বছরের পর বছর ব্যাবসাটা চলতে থাকলে লং টার্ম ডিপোজ়িটারদের ফেরত দেওয়ার কোনও সমস্যা নেই। টাকার একটা অংশ রিয়েল এস্টেটে লাগাবে, জমি কিনবে বেচবে, তাতেই নাকি লাল হয়ে যাবে সুগত।”
“তা হয় নাকি? ওভাবে টাকা তোলা, চড়া সুদ দেওয়া তো একেবারে বেআইনি।”
“সে তো জানি। তা ছাড়া ওটা অসম্ভবও। অঙ্কে তো আমি নেহাত মূর্খ নই, হিসেব কষে ওকে দেখিয়েও দিলাম। পাত্তাই দিল না, উলটে রেগে গেল। নেমে পড়ল বিজ়নেসে। কী কাণ্ড, ওর ক্যারিশমার জোরে হোক, কী ওর টিমের কেরামতি, হু হু করে টাকা আসতে লাগল। স্যাটাস্যাট ফ্ল্যাট কিনছে, গাড়ি কিনছে, আর আমি শিউরে শিউরে উঠছি। অন্য নেশাও ধরল ক্রমশ। আগে ড্রিঙ্ক-ট্রিঙ্ক করত... শুরু হল বেহেড মাতলামি। যত্র তত্র পড়ে থাকা, আজ এই হোটেলে রাত কাটাচ্ছে তো কাল ওই হোটেলে...। এবং একলা নয়, সর্বদাই কোনও নর্মসহচরী মজুত। এতই নির্লজ্জ সেটা আবার সগর্বে ঘোষণা করে।”
“তখনই তুমি চলে আসোনি?”
“পারিনি আসতে। সংকোচে পা আটকে ছিল যে। শুধু মনে হত, বাপের বাড়ি ফিরলেই তো প্রমাণ হয়ে যাবে, আমি হেরে গেছি। অবশেষে সিনে এন্ট্রি নিল চন্দ্রাণী। প্রথম প্রথম বলত, ও আমার বিজ়নেস এগজ়িকিউটিভ। তারপর ওকে নিয়ে এমন লোচ্চামি শুরু করল... ফিরে আসতেই হল একদিন। এমনই কপাল, একটু সুস্থির হয়ে বাঁচব তার উপায় নেই। বাবা দুম করে মারা গেল। দাদা তখন অবিরাম ঘ্যানাচ্ছে, ভুল করিস না। সুগত যাই করুক, যে ব্যাবসাই করুক, তার টাকায় তোর ন্যায্য অধিকার আছে, তোর পাওনা তুই ছাড়বি কেন...।”
“লাল্টুদা এ কথা বলেছিল?”
“দুনিয়ায় স্বার্থ বড় বিষম বস্তু রে। আলাইপুরের জমিবাড়ি বাবা আমার নামে লিখে দিয়েছে, যদি সুড়সুড়িয়ে সুগতর কাছে ফিরে যাই, তা হলে ক’দিন পরে দাদা এটাকে বেচার কথা বলতে পারে। আর বিক্রি হলে বোন কি দাদাকে বখরা দেবে না!” অহনার গলা সামান্য ধরা ধরা শোনাল, “সাধে কি বলি, জীবনে ঘেন্না ধরে গেছে... ওই সব দেখেশুনেই না...”
অর্ঘ্য নিশ্চুপ। খোলা জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখছে। নাকি ভাবছে কিছু? হঠাৎ বলল, “তবু... মানুষ তো বদলায়... তোমার হ্যাজ়বেন্ডের হয়তো অনুতাপ এসেছে...”
“সুতরাং ফিরে গিয়ে তুমি তার সংসার করো!” অহনার মুখ বিদ্রূপে বেঁকে গেল, “তুই এটা বলতে পারছিস? এ কি সম্ভব? ওই আদ্যন্ত অসৎ ডিবচ লোকটার সঙ্গে আবার এক ছাদের নীচে কাটাব? স্রেফ পুরুষমানুষ বলে ও জগৎ সংসারের কাছে ছাড় পেয়ে যাবে? আমি তাকে ক্ষমা করব না। পদে পদে যে আমায় অপমান করেছে, আমার বিশ্বাস ভেঙেছে, তার সঙ্গে কীসের আপস?”
অর্ঘ্য আর কিছু বলল না। উঠে আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে ঘরে। জীবনে এই প্রথম মনের কথাগুলো উগরে দিতে পেরে একটু যেন হালকা বোধ করছিল অহনা। যেন গুহার মুখে আটকে থাকা পাথরের চাঁই একটু একটু করে সরছে।
কেন অহনা এত কথা বলল অর্ঘ্যকে? অর্ঘ্য তার কে? সুগত যখন এল, কাকতালীয় ভাবে অর্ঘ্য উপস্থিত ছিল বলেই কি? নাকি অন্য এক অহনা ছটফট করছিল অর্ঘ্যকে শোনানোর জন্যে? কিন্তু অর্ঘ্যই বা সুগতর হয়ে ওকালতি করল কেন? নাকি পরখ করছিল অহনাকে? আশ্চর্য, কেন অহনার এমন মনে হচ্ছে?
অহনা বুঝতে পারছিল না। রাতে শুয়েও ঘুরে ঘুরে আসছিল ভাবনাটা। আধো তন্দ্রায় আরও নানান চিন্তা এলোমেলো পাক খাচ্ছে মাথায়। সুগত আজ ঠিক কেন এসেছিল? তাকে ফেরানোর জন্যই বা এত আকুল কেন? কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে সুগতর? সত্যি কি কোনও ঝামেলায়...? বড্ড সিগারেট খাচ্ছিল...
কীসের একটা শব্দ হচ্ছে না? ঘোরটা ছিঁড়ে গেল অহনার। হালতা রাতবাতি জ্বলছে ঘরে, কিন্তু কিছুই যেন ঠিক ঠিক ঠাহর হয় না। মশারি সরিয়ে নামল বিছানা ছেড়ে। টলমল পায়ে টিউব লাইটটা জ্বালাল। ফ্যাটফেটে আলোয় আওয়াজটা আরও যেন উচ্চকিত। অর্ঘ্যর ঘর থেকে আসছে কী?
হ্যাঁ, তাই তো। একটা গোঙানির শব্দ। যেন বোবায় ধরেছে অর্ঘ্যকে। দুঃস্বপ্ন দেখছে কি কোনও?
অহনা ডাকতে যাচ্ছিল, ঝুপ করে থেমে গেল শব্দটা। আবার নিয়মিত লয়ে শ্বাস পড়ছে অর্ঘ্যর।
অহনা স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে। এগোতেও পারছে না, পিছোতেও না। শিরশির করছিল বুকটা। হঠাৎই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন