সুচিত্রা ভট্টাচার্য
অহনার সাইকেলখানা পাশে রেখে নদীর পাড়ে বসে ছিল অর্ঘ্য। সামনে একটা বিকেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। ঘন সবুজে ভরা দ্বীপের আড়ালে একটু একটু করে মুখ লুকোচ্ছে সূর্য। শ্রান্ত আলো তাপ হারিয়ে স্তিমিত ক্রমশ। গাছ-গাছালি রং হারাচ্ছে। বহতা জলে মৃদু একটা ধ্বনি জাগছে বটে, তবে স্রোত বেশি নেই। ভালভাবে লক্ষ না করলে নদীতে এখন জোয়ার চলছে না ভাটা, ঠাহর করা মুশকিল।
বিকেলে আজ সেভাবে কোথাও যায়নি অর্ঘ্য। এমনিতেও যে সে খুব নিয়ম করে গ্রামে গ্রামে ঘুরছে, তা নয়। কাছেপিঠে কোথাও একটা গেল, কোনও একটা বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পরিবারের কর্তা-গিন্নি-ছেলে-মেয়ে যাকে হাতের কাছে পেল তার সঙ্গেই আলাপ জমাল, তাদের সংসারের বিষয়েই হয়তো গল্পগাছা করল খানিকক্ষণ, তারপর ধীরেসুস্থে বেরিয়ে পড়ে আর একটা বাড়ির সন্ধানে। প্রায় সর্বত্রই আশাবরীর পরিচয়টা দিতে হয় অবশ্য, নইলে অজানা অচেনা লোকের কাছে কেউ মুখ খুলতে চায় না বড় একটা। এভাবে পাঁচ-সাতটা বাড়ি ঘুরলেই দিব্যি বেলা কাবার। আর কোনও গপ্পোবাজের পাল্লায় পড়ে গেল তো অর্ঘ্যর পোয়া বারো। একজনেতেই হু হু কেটে যায় সময়। তাতেই যা মালমশলা জোটে, স্বচ্ছন্দে সে ম্যানেজ করে নেয় অহনাকে।
কিন্তু সেরকম কাউকে খুঁজে নিতেও তো ইচ্ছে করল না আজ। এলোমেলো সাইকেল চালাল খানিকক্ষণ, তিন-চারখানা গ্রাম পেরিয়ে একটা শানবাঁধানো পুকুরের ধাপিতে জলে পা ডুবিয়ে বসে রইল কিছুটা সময়। ঘাটে কয়েকজন মেয়ে বউ ছিল, তারা এমন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল! গাঁ-গঞ্জের মানুষজন আর মোটেই গল্পের বইয়ে পড়া সরল গ্রামবাসীটি নেই, অপরিচিত কাউকে তারা সহজে বিশ্বাস করে না, এ সত্যিটা ক’দিনেই টের পেয়ে গেছে অর্ঘ্য। অগত্যা উঠে আসতেই হল, সাইকেল নিয়ে ফিরেই এল আলাইপুর। অস্থায়ী ডেরায় গিয়ে শুয়ে পড়লেই চলত, কিন্তু কেন যে নদীর পানেই ঘুরে গেল সাইকেলের মুখ?
অহনার কাছাকাছি থাকতে অর্ঘ্য কি অস্বচ্ছন্দবোধ করছে? হ্যাঁ, কিছুটা তো বটেই। ক’দিন ধরে এত বেশি প্রশ্ন করছে তার অণুদি! শুধু অর্ঘ্যর দৈনিক কাজ নিয়ে নয়, কখনও দিদি, কখনও আসানসোল, কখনও বা অর্ঘ্যর কলেজ ইউনিভার্সিটি জীবন...। বর্তমানকে ঢেকে, অতীতের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে একের পর এক জবাব দিয়ে যাওয়া যে কী দুরূহ! তাও সামাল দিতে পারে অর্ঘ্য, কিন্তু অণুদির মুড? তার থই পাওয়া বুঝি আরও কঠিন, অর্ঘ্যর পক্ষে বোধহয় অসম্ভব। এই ঠান্ডা, তো এই গরম। এই মোটামুটি হাসিখুশি, তো পর মুহূর্তে তোলা হাঁড়ি।
কাল সন্ধেবেলাই তো কী বিশ্রী কাণ্ডটাই না হল। পুরনো একটা উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা হচ্ছিল টিভিতে। তেমন একটা মনোযোগ দিয়ে নয়, তবু দেখছিল অর্ঘ্য। পাশের সোফায় বসে অহনাও।
হঠাৎ অহনার প্রশ্ন, “হ্যাঁরে, তুই বিয়ে করবি না?”
অর্ঘ্য এড়ানোর ভঙ্গিতে বলেছিল, “ধুস স্টেডি জব কিছু করছি না... এখন ওসব ভাবনার কোনও মানে আছে?”
“গার্লফ্রেন্ড আছে নিশ্চয়ই? কবে তোর সময় হবে সেই প্রতীক্ষায়?”
“সরি। আমি ওসব লাইনে নেই।”
“বাজে বকিস না। তোর এত সুন্দর চেহারা, পেটে বিদ্যে গজগজ করছে, চেষ্টা করলেই সামনে ব্রাইট ফিউচার... কোনও মেয়ে তোকে দেখে পটেনি এ আমায় বিশ্বাস করতে হবে?”
“কোরো না বিশ্বাস। যা সত্যি তাই বলছি।”
“স্টুডেন্ট লাইফেও তোর কোনও মেয়ে বন্ধু ছিল না?”
“হ্যাঁ। অজস্র ছিল। তবে তুমি যা ভাবছ তেমন নয়। তারা স্রেফ বন্ধুই ছিল।”
“তুই কক্ষনও তাদের কারও ওপর অ্যাট্রাকশান ফিল করিসনি?”
“আমি তাদের সে চোখে দেখিইনি কখনও। সত্যি বলতে কী, প্রেম ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝি না। আমার মনে হয়, ও ব্যাপারটা যুক্তিবুদ্ধির একটা অসুখ। মগজের টেম্পোরারি ইনস্যানিটি।”
শুনে অহনার কী হিহি হাসি। অহনাকে এ ক’দিনে কখনও অমনটা হাসতে দেখেনি অর্ঘ্য। পরের মিনিটেই আচমকা সিরিয়াস। রাগরাগ গলায় বলল, “পাগলামি কি সাধে আসে, পাগল বানিয়ে ছাড়ে।”
কথাটার মানে বুঝতে পারেনি অর্ঘ্য। ভ্যাবাচ্যাকা মুখে তাকিয়েছিল অহনার দিকে। অহনার তখন চোখ জ্বলছে। ক্রুদ্ধ নাগিনীর মতো ফুঁসে উঠল, “পুরুষমানুষ জাতটাই নেমকহারাম। আর মেয়েরা বোকার হদ্দ। ফাঁদে তারা পড়বেই।”
অর্ঘ্য নার্ভাস গলায় বলেছিল, “এসব কী বলছ? সব ছেলে খারাপ হবে কেন? মেয়েরাও মোটেই সবাই নির্বোধ নয়। এই তো, তুমিই কি কম ইন্টেলিজেন্ট লেডি? কীভাবে কতজনকে নিয়ে একটা এত বড় প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছ!”
পলকে অহনা আরও ক্ষিপ্ত, “কে চায় এসব চালাতে? যত্তসব রাবিশ।”
বলেই পুরো স্পিকটি নট। মুখে এমন কুলুপ এঁটে রইল, সামনে বসে থাকতে অর্ঘ্যর বুক দুরদুর। সেই অহনাই আবার এক ঘণ্টা পরে স্বাভাবিক স্বরে খেতে ডাকল, বাতচিত করছে টুকটাক...। অর্ঘ্য তো হতবাক। হঠাৎ হঠাৎ কী যে হয় অণুদির! অসুখী দাম্পত্যের কারণেই মনে এত ভাঙচুর!
হতে পারে। হতেও পারে। হতেই পারে।
তা অহনার ক্ষণভঙ্গুর মেজাজ মর্জিই কি এখন নদীতীরে ঠেলে পাঠিয়েছে অর্ঘ্যকে? খানিক তফাতে থাকবে বলেই কি বসে বসে ঢেউ গুনছে সে?
উঁহু, অর্ঘ্যর মনটাই আজ ভাল নেই। আজ কাকভোরে ফোন এসেছিল বাবার, তখন থেকেই। কাল বিকেলে আসানসোলের ফ্ল্যাটে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল মা, হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায়, কোমরে জোর চোট পেয়েছে। কাঁধেও। তার চেয়েও বড় দুঃসংবাদ, মাথায় একটা বিশ্রী আঘাত লেগেছে। পড়ার পরে মা অচেতন হয়ে গিয়েছিল, হাসপাতালে গিয়ে জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু কারওকে চিনতে পারছে না। ডাক্তাররা সন্দেহ করছে, ব্রেন হেমারেজ। আগামীকাল স্ক্যান করা হবে, তারপর প্রয়োজন হলে অপারেশন।
সমাচারটা শোনার পর থেকেই অর্ঘ্য অস্থির অস্থির বোধ করছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ মানে তো এক ধরণের সেরিব্রাল স্ট্রোক। মা বাঁচবে তো? যদি বা প্রাণে রক্ষা পায়, প্রায় অচেতন ভেজিটেবল হয়ে যাবে না তো চিরতরে? যদি পরে আর সুযোগ না মেলে, চুপিচুপি একবার দেখে আসবে মাকে? বাবা অবশ্য বলল, ঝুঁকি নেওয়ার এক্ষুনি দরকার নেই, তবু...। বাবা তার অবস্থান জানে না, হয়তো ভাবছে খোকা এখনও মধ্যপ্রদেশ বা ছত্তিশগড়ের বনে বাদাড়ে বাস করছে। যেমন অহনারা জানে অর্ঘ্যর বাবা-মা এখন সিঙ্গাপুরে, তেমন বাবা-মাকেও অর্ঘ্য ওই রকমই একটা ধারণা দিয়ে রেখেছে কিনা। চরম প্রয়োজন ছাড়া এই নম্বরটায় ফোন করতেও তো নিষেধ করেছিল বাবাকে। তার পুরো পরিচয় সম্ভবত এখনও পুলিশের খাতায় নেই, তবে আসানসোলের অর্ঘ্য রায় নিশ্চয় তাদের সন্দেহের তালিকার বাইরে নয়। সুতরাং মাকে দেখতে যাওয়া মানে বাবাকে বিপন্ন করা। উচিত হবে কি?
যুক্তিবুদ্ধির বাইরে গিয়ে অর্ঘ্য একটা বড়সড় শ্বাস ফেলল। উচিত আর অনুচিতের দ্বন্দ্ব কি অর্ঘ্যকে শোভা পায়? ক্লাস নাইনে চে গুয়েভারার জীবনীটা পড়ার দিনই কি তার বাকি জীবনটা কোন পথে গড়াবে, স্থির হয়ে যায়নি? সেই রাত থেকেই তো উচিত অনুচিতের বোধ একটা মাত্র নির্দিষ্ট অভিমুখে গড়িয়েছে। কলেজে পড়ার সময় যখন সে বাঁধাছকের বাইরের রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি শুরু করল, বাবা তো বটেই, মাও কি কম বাধা দিয়েছে? বলেনি, তুই কি চাস, তোর জন্য আমাদের কোমরে দড়ি পড়ুক? সে তখন বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর, আদৌ মূল্য দেয়নি তাদের আকুতিতে। সঠিক কাজই করেছে সে, কারণ বিপ্লব ওই ধরনের ব্যক্তিগত আবেগকে অনুচিতের লিস্টেই রাখে সর্বদা। এম-এ পরীক্ষার মুখে মুখে সে যখন চলে গেল ওড়িশায়, নয়াগড়ে পার্টির গোপন সম্মেলনে যোগ দিল, তখনই তো পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কটা সে মনে মনে ছিঁড়ে ফেলেছে। তারপর সে বাড়িতে আবার এসেছে ঠিকই, কয়েক বছর হয়তো বাসও করেছে মা বাবার সঙ্গে, কিন্তু ভবিষ্যতের ছবি তো তখন পরিষ্কার। গত আড়াই বছরে এক-দু’বারের বেশি মা-বাবার খোঁজ নেয়নি অর্ঘ্য, উচিত মনে করেছে বলেই নেয়নি, এবং তার জন্য অর্ঘ্যর মনে কোনও পাতিবুর্জোয়াসুলভ পাপবোধও নেই। তা হলে আজ কেন এই দোলাচল? কেনই বা মা’র বিষণ্ণ মুখখানা বারবার হানা দিচ্ছে চোখের পাতায়?
নাহ, এইসব জোলো অনুভূতিকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়। মিছিমিছি মনকে দুর্বল করে লাভ আছে কোনও? বরং এখানে থাকতে থাকতেই ছকে নেওয়া দরকার, আগামী দিনে কী হবে তাদের কর্মপন্থা। পার্টি যে রাস্তা ধরেছে, সেটা কি অভ্রান্ত? শুধু অর্ঘ্য নয়, দলের অনেকের মনেই তো এখন সংশয়। রাজন, সৌরভ, গণেশন তো বলছে হয় স্টিয়ারিং ধরে গাড়ির মোড় ঘোরাও, নয়তো ঝাঁপ মেরে নেমে পড়ো, ক’জন মিলে অন্য একটা গাড়ি বানিয়ে নেব আমরা।
কিন্তু নতুন গাড়িটাও যে ভুল পথে যাবে না তার কী নিশ্চয়তা?
এতেও সেই দোলাচল? উফফ, কী যে করে অর্ঘ্য?
বসে থেকে থেকে হাঁটু ধরে গেছে। অর্ঘ্য উঠে দাঁড়াল। পাশেই এক কালীমন্দির, বেশ চকচকে চেহারা, মেঝেয় টাইলস, দিনের অন্তিম কিরণ মেখে নতুন রং করা দেওয়াল ঝকঝক করছে। ভালই ভিড়। আজ কোনও বিশেষ পুজোটুজো আছে নাকি?
তাকিয়ে থাকায় ব্যাঘাত ঘটল। নদীর ধার থেকে কে একজন ডাকছে। অর্ঘ্য এগিয়ে এল, “আমাকে বলছ কিছু?”
“হ্যাঁ কত্তা।” খাটো মলিন ধুতি পরা খালি গা লোকটা লজ্জা লজ্জা মুখে হাসছে, “তখন থেকে দেখছি, নদীর ধারে ঠায় বসে আছেন। আপনে বুঝি সিন সিনারি ভালবাসেন?”
“ওই আর কী।” হেসেই বলল অর্ঘ্য, “খারাপ লাগে না।”
“চলেন না কত্তা, একটু নৌকো বিহার করে আসবেন। নদী থেকে চারদিক আরও মনোহর লাগবে।”
“তোমার নৌকা আছে বুঝি?”
“এই তো। নীচেই পাড়ে বাঁধা একটা ডিঙি নৌকা দেখাল লোকটা,” আসেন না কত্তা, “গরমকালের সাঁঝবেলায় নদীর হাওয়ায় মনটা তর হয়ে যাবে।”
বড্ড পীড়াপীড়ি করছে তো? সারাদিন ভাল রোজগারপাতি হয়নি সম্ভবত। অর্ঘ্য হেসে বলল, “তা নেবে কত?”
“সে আপনার যা প্রাণ চায়। আপনি হলেন গিয়ে আশাবরী দিদির অতিথি, একটু সেবা করার সুযোগ পেলেই ধন্য হই।”
বিনয়ের অবতার! চালাক লোক, দরাদরির মওকা দিল না। তবে অণুদি আর তার প্রতিষ্ঠান যে এই অঞ্চলে সমার্থক হয়ে উঠেছে তার আরও একটা প্রমাণ পাওয়া গেল। বলতে হবে অণুদিকে। চটে না যায়!
ঘাট বলে কিছু নেই, ভাঙাচোরা পাড় বেয়েই সাবধানে নেমে অর্ঘ্য চড়েছে নৌকায়। পাটাতনে মেলে দিয়েছে পা। লোকটা বাঁশে বাঁধা দড়ি খুলে লগি দিয়ে চাড় দিল পাড়ে। দুলতে দুলতে সরে যাচ্ছে ডাঙা। বাড়ছে ছলাৎ ছল।
মসলিনের চাদর গায়ে জড়িয়ে আঁধার নামছে নদীতে। ভিজে ভিজে বাতাসে ভারী নরম একটা আমেজ। কাঁসর ঘণ্টা বাজছে মন্দিরে, আওয়াজ ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। আয়েসি সুখে মনটা সত্যিই তর হয়ে যাচ্ছিল অর্ঘ্যর।
আচমকাই মগজে হাতুড়ির ঘা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মা এখন পাঞ্জা লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে, আর সে কিনা নদীবক্ষে সান্ধ্যভ্রমণে বেঁচে থাকার মজা চাখছে তারিয়ে তারিয়ে!
পলকে উবে গেছে আনন্দ, ফের সেই বিস্বাদ অনুভূতি। তখনই মাঝির গলা পেল অর্ঘ্য “আরাম হচ্ছে না কত্তা। শরীর যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে, তাই না?”
প্রশ্নটা যেন পরিহাসের মতো বাজল অর্ঘ্যর কানে। জবাব দিল না, তেতো মুখে স্থলভূমির পানে তাকিয়ে আছে শুধু। একটু পরে সামান্য স্থিত হল মন। নৌকা সফর যাতে পুরোপুরি বৃথা না যায়, কেজো কৌতূহলে ব্যস্ত করতে চাইল নিজেকে। ফিনফিনে অন্ধকারমাখা মায়াবী চরাচর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল, “তোমার নামটা কী, ভাই?”
“আজ্ঞে, দুলাল।” লোকটা ঘাড় ফেরাল, “দুলাল দাস।”
“নৌকাটি কি তোমার?”
“আজ্ঞে। গত সনে বলাগড় থেকে বানিয়েছি। খুব মজবুত কাঠ। অন্তত দশ বছর টিকবে।”
“এই মাঝিগিরি করে বুঝি পেট চলে?”
“আমি তো মাঝি নই কত্তা। এ তো মাছের নৌকো। জাল ফেলে নদীতে মাছ ধরি।”
“তা পাও মাছ? শুনি নদীতে আজকাল মাছ নাকি খুব কমে গেছে?”
“হ্যাঁ কত্তা। এত ভুটভুটি চলে হরদম! পোড়া ডিজেলে মাছেদের বংশ নাশ হয়ে যাচ্ছে। এই তো মা ভাগীরথীর জলে, আগে বহরমপুর পর্যন্ত ইলিশ মিলত, এখন আর তেনাদের ঝাঁক নৈহাটি পেরিয়ে আসেই না।” লোকটা মেশিনের মতো দাঁড় টানছে দু’হাতে। ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, “তারপর ধরুন জল তো অনেক কমে গেছে। চোখের সামনে কত যে চর গজিয়ে উঠল। সান্যালের চর, কালিগঞ্জের চর... এই তো সামনেই কেমন একটা গজিয়েছে, এখনও নাম দেয়নি কেউ, তবে এরই মধ্যে সবুজে সবুজ। যে পারছে গিয়ে চাষবাস শুরু করে দিচ্ছে।”
“তুমিও ওখানে চাষ করো নাকি?”
“না কত্তা, জমিজিরেতের কাজ আমার আসে না। বংশের পেশাতেই টিকে আছি কোনওমতে। আর আপনাদের মতো লোকজন জুটে গেলে দুটো বাড়তি পয়সা হাতে আসে।”
“তা লেখাপড়া করেছ কদ্দূর?”
“পেরাইমারির পাশটা দিয়েছিলাম। তারপর বাবা ঘেঁটি ধরে নৌকোয় নিয়ে এল। বলল, ঢের বিদ্যে হয়েছে, এবার মাছ মেরে পেটের জোগাড় করো।”
চিনদেশের সেই মহান বিপ্লবীর কথাটা মনে পড়ে গেল অর্ঘ্যর। মাটির সঙ্গে যাদের নিবিড় যোগ, তাদের আগে চেনো জানো, তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে তৈরি করো বিপ্লবী চেতনা। দুলালও তো সেরকমই একজন, নয় কি?
উৎসাহ নিয়ে অর্ঘ্য জিজ্ঞেস করল, “তা দুলালভাই, পড়াশোনা যে করতে পারলে না, তার জনা আফশোস হয় না?”
“কী হত লেখাপড়া শিখে?” দুলাল দাঁড় টানা থামিয়ে অবাক চোখে তাকাল, “আমি কি আপনাদের মতো প্যান্টশার্ট পরে অফিস যেতাম? মাঝখান থেকে ছেলের মতো দশা হত আমার।”
“তোমার ছেলে? কেন তার কী হয়েছে?”
“সে আর বলবেন না কর্তা। তাকে ইস্কুলে পাঠালাম, খেয়ে না খেয়ে মাস্টার রাখলাম, তিনিই ঠেলে গড়িয়ে স্কুল পার করে দিলেন, কলেজে ভরতি হল ছেলে। তবে কলেজের দরজা আর পেরোতে পারল না, ইতি হয়ে গেছে পড়াশোনায়। লাভের মধ্যে লাভ, জাল ফেলে মাছ ধরার বৃত্তিতে সে আর আসতেই রাজি নয়। নদীতে জাল ছুড়ছে, ভাবতেই নাকি তার মানে লাগে। এদিকে চাকরি জোটানোরও মুরোদ নেই। কিন্তু সারাক্ষণ কানে মোবাইল গোঁজার অভ্যেসটি ধরে গেছে বাবুর। পয়সার ধান্দায় এখন পার্টির বাবুদের পেছনে ল্যাং ল্যাং করছে।”
“কোন পার্টি করে তোমার ছেলে?”
দুলাল কেমন যেন সন্দিগ্ধ চোখে অর্ঘ্যর দিকে তাকাল। তারপর ফের সক্রিয় হয়েছে তার দু’কাঁধ। দাঁড়ে জল কাটতে কাটতে বলল, “সরকারি দলের সঙ্গেই থাকে আর কী।”
“মানে এখন যারা সরকারে আছে?”
“আগের সরকারের সঙ্গেও ছিল।”
“মানে লাল থেকে তেরঙা? ডিগবাজি?”
দুলাল এবার ধূর্তের মতো হাসছে, “আমাদের গরিব ঘরের ছেলেদের কি পতাকার রং দেখলে চলে? সরকারে যে আছে তার সঙ্গে থাকলে তাও দুটো-চারটে পয়সা ঘরে আসে।”
“সরকারের ডোল মেলে বুঝি? মানে সাহায্য?”
“সাহায্য বলেন সাহায্য, ভিক্ষে বলেন ভিক্ষে... সে আপনি যে নামই দ্যান... খুদকুড়ো মেলে বই কী। দেড়শো টাকা রোজে বছরে অন্তত ষাট সত্তর দিন। পুকুর কাটার কাজ, রাস্তা সারানোর কাজ...। তাও অর্ধেক দিন যেতে হয় না। কার্ডে সই করে দিলেই রোজের অর্ধেক হাতে গুঁজে দেয় দাদারা।”
“এটা তো দুর্নীতি। কাজ করো, পুরো পয়সা নাও। এইসব দু’নম্বরিকে তোমরা প্রশ্রয় দিচ্ছ কেন?”
“ছাড়েন কত্তা। যা জোটে তাই কম কী। যারা সরকার গড়ে, তাদের অনেক খরচ-খরচা আছে না? তারা নিজেদের ভাগ নেবে না?”
আশ্চর্য, চলে আসা সিস্টেমটার সর্বাঙ্গে ঘূণ ধরে গেছে, গরিব মানুষের রক্ত চুষছে বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলো, তবু এই দুলালদের কোনও হেলদোল নেই?
অর্ঘ্য সামান্য বিরক্ত স্বরে বলল, “কিন্তু তোমাদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া যে এক ধরনের চুরি, এটা তো মানো?”
“যেতে দ্যান কত্তা। আমাদের কি কিছু করার আছে?”
“কে বলল নেই? তোমরা যদি সবাই মিলে প্রতিবাদ করো, গর্জে ওঠো...”
“কী হবে তাতে? বড়জোর সরকার বদলে যাবে। কিন্তু যারা আসবে, তারা কি সগ্গোভোস্টো দেবতা? আসবে তো নরেনবাবুর বদলে হরেনবাবু। দেবেনের জায়গায় খগেন। আমাদের তাতে বাড়তি কী সুসার?”
“যদি এরকম কারওকেই না আনো...”
“মানে? তা হয় নাকি? কাউকে না কাউকে তো আসতেই হবে। সরকার গড়তেই হবে।”
ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা বোধ করছিল অর্ঘ্য। পার্টির অন্দরে তত্ত্ব আলোচনা অনেক করেছে, কিন্তু পার্টির নিয়মেই তাকে বাস করতে হয়েছে প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে। কচিৎ কখনও মধ্যপ্রদেশ ছত্তিশগড় কিংবা ঝাড়খণ্ডের আধা শহরে পা রাখলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার অনুমতি ছিল না, ভাষার ব্যবধানও ছিল দুস্তর। আলাইপুরে এসে সে প্রথম নিজের মতো করে কথাবার্তা বলতে পারছে সমাজের হ্যাভনটদের সঙ্গে। এদের মাঝে কি পার্টির ভাবনাকে চারিয়ে দেওয়া যায় না?
অর্ঘ্য জোরে একটা শ্বাস টেনে বলল, “ধরো, সরকার ব্যাপারটাকেই যদি উত্খাত করে ফেলা যায়? যেখানে যে পার্টির যত বদলোক আছে সবাইকে নিকেশ করে ফেলা হল? অকারণে উত্পাত করার পুলিশ নেই, ঘুঘুর বাসা পঞ্চায়েত নেই, ঘুষখোর সরকারি অফিস নেই... সমস্ত ক্ষমতা চলে এল তোমাদের হাতে...”
“মানে?”
“তোমরা তখন নিজেরাই সরকার হয়ে গেলে। নিজেদের মতো করে কাজ করছ, দরকার মতো পয়সা পাচ্ছ...”
“কে দেবে?”
“নিজেরাই। ভাগবাঁটোয়ারা করে নেবে।”
“তা হয় নাকি? কী যে আজব বাক্যি কন কত্তা! সরকারটাই বেবাক উধাও হয়ে যাবে? কে সরাবে তাদের?”
“বললাম তো, তোমরা। বন্দুক চালানো শিখবে, তাদের সঙ্গে লড়াই করবে...”
“আমরা...? লড়াই...?”
“আহা, তোমরা সবাই কেন? তার জন্য লোক আছে। তোমাদের হয়ে তারাই লড়বে। তোমরাও তাদের সঙ্গে থাকবে।”
“বুঝেছি। তারাই তখন সরকার হবে। তাই তো?” দুলাল বুঝদারের মতো মাথা দোলাচ্ছে, “এখন যেমন লাল-তেরঙ্গা, তখন তারাই হবে আমাদের প্রভু।”
“না মানে...তুমি ঠিক...”
“বললাম তো কত্তা। বুঝে গেছি।” দুলাল আপনমনে বিড়বিড় করছে, “ঠিকই তো। এদের যদি কেউ লড়ে হঠায়, গদি তো তাদের হকের পাওনা। কিন্তু যাই বলেন কত্তা, আমরা যেমন আছি তেমনই থাকব। মনিব বদলালে কি গরিবের কপাল বদলায়?”
যাহ, দুলাল তো বিশাল ব্যাপারটা উপলব্ধিই করতে পারছে না! অর্ঘ্যদের মহান তত্ত্বে পৃথিবীর চেহারাই যে অন্য রকম হয়ে যাবে, এ যেন গেঁয়ো জেলেটা কিছুতেই মানতে রাজি নয়!
মরিয়া হয়ে অর্ঘ্য বলল, “তোমাদের অত কিছু ভাবতে হবে না। শুধু বন্দুকটা কাঁধে তুলে নাও। নিদেনপক্ষে যারা লড়বে, তাদের পাশে পাশে থাকো।”
“কী দরকার কত্তা লড়াই কাজিয়ায়? এই তো বেশ আছি। যেভাবে যেটুকু, জুটুক, শান্তিতে থাকলেই যথেষ্ট। খুনোখুনি রক্তারক্তি ভাল লাগে না কর্তা। দুনিয়ায় কে কার শত্রু বলেন? পঞ্চায়েত প্রধানই হোক কী, মন্ত্রীই হোক, কী আমার অকালকুষ্মাণ্ড ব্যাটাই হোক, মরলে তো সবাই সমান। যে ক’টা দিন দুনিয়ায় আছি, সবাই মিলে ভাব-ভালবাসা করে থাকলে তো ল্যাটা চুকে যায়।”
“এ কী অদ্ভুত দর্শন? দুলাল যা বলছে তা কি শুধু দুলালেরই কথা? নাকি দেশের গড়পড়তা মানুষ এরকমই ভাবে? এরা কি তবে শ্রেণিসংঘর্ষের আদর্শকে মন থেকেই বিশ্বাস করে না। শোধনবাদী শ্রেণিসমন্বয়ের ধারণা কি এদের রক্তেই মিশে আছে?”
কিংবা এমন নয় তো, ভারী ভারী তত্ত্বগুলোই আদতে ফালতু? মানুষ কোনও তত্ত্বেরই দাস নয়। অতীতেও ছিল না। ভবিষ্যতেও হবে না। শুধু তারা, অর্ঘ্যরাই তত্ত্বের ভারে দূষিত করে ফেলছে পৃথিবীটাকে?
কথাগুলো মনে আসতেই অর্ঘ্য থরথর কেঁপে উঠল। এ কী প্রতিবিপ্লবী চিন্তা মনের কোণে উঁকি দেয় আজ? তার এতগুলো বছর কি তা হলে মিথ্যে? একটা কল্পদুনিয়ার দিকে অন্ধের মতো ছুটেছে নাকি সে?
নৌকো ক্রমশ ফিরছে পাড়ের দিকে। আস্তে আস্তে বাড়ছে কালীমন্দিরের কাঁসরঘণ্টার আওয়াজ। বাড়িঘরের টিমটিম আলোর দ্যুতি উজ্জ্বল এখন।
দুলালকে একখানা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে অর্ঘ্য নেমে এল। ক্ষণিক দেখল অন্ধকার গঙ্গা, চোখ বুজে শুনল নদীর কলকল। তারপর সাইকেলটা নিয়ে ফিরছে। চড়ল না আর, হাঁটছে শিথিল পায়ে। আলাইপুরে এসে আজ পর্যন্ত যত বাড়িতে গেছে, দুলালের সঙ্গে মেলাচ্ছে তাদের কথাবার্তা। না, নিজের আদর্শের কথা তাদের কারওকে বলেনি। তবু কেন যেন মনে হয় সকলেরই সুর এক তারে বাঁধা। বেশি কিছু তাদের আকাঙ্খা নেই, দুলালের মতো তারাও যেন শুধু শান্তি চায়।
উঁহু, ভাবনাটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতেই হচ্ছে। অর্ঘ্য দাঁড়িয়ে পড়ল। মোবাইল হাতে নিয়ে মনে করে করে টিপল একটা নম্বর।
বাজছে ওপারে। ধরেছে। রাজনের গলা।
ইংরিজিতে রাজন বলল, “তুমি এখন কোথায়?”
নিষিদ্ধ প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে গেল অর্ঘ্য। বলল, “আমার একটা কথা ছিল। আমাদের প্ল্যান অফ অ্যাকশন নিয়ে আমরা প্রচুর সময় ব্যয় করি, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনোভাব আমরা খেয়াল করছি কি? আমাদের প্রতি?”
“স্টপ ইয়োর ননসেন্স। তেজস তোমায় পাগলের মতো খুঁজছে। কোরাপুট অপারেশন সফল হয়েছে, দেখেছ নিশ্চয়ই?”
“মৃত্যুর অনুপাত হিসেব করলে সফলই বলা যায়।”
“না। সব দিক দিয়েই সাকসেসফুল। গোটা এলাকা এখন আতঙ্কে কাঁপছে। প্রশাসন চরম হেনস্থা হয়েছে। কিন্তু এই জয়ের পর তেজস দলের সর্বময় ক্ষমতা চায়। ও মনে করছে তুমি তার প্রধান বাধা। আমাকে ফোন করেছিল তেজস। বলছিল অর্ঘ্য একজন রেনিগেড, জলদি জলদি ওর সন্ধান চাই।”
“লোকেশন জানানোর তো নিয়ম নেই।”
“আমিও তাই বলেছি। ও আমায় প্রোভোক করে বলল, তুমি নাকি ঝাড়গ্রাম থেকে কলকাতামুখো ট্রেনে উঠেছ। আমাকে এও শাসাল, তোমার মোবাইল টাওয়ার থেকে তোমায় লোকেট করবে। মনে হল ফাঁকা আওয়াজ নয়, সিরিয়াসলি চেষ্টা করছে।”
“কেয়ার করি না। আমি এখন কয়েকটা আদর্শগত প্রশ্ন নিয়ে...”
“পরে কথা হবে।” রাজন মাঝপথে অর্ঘ্যকে থামিয়ে দিল, “ফোনটা আপাতত বন্ধ রাখো। চটপট সিম বদলাও।”
লাইন কেটে গেল। হতবুদ্ধির মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অর্ঘ্য পা চালিয়েছে। আশাবরীর গেট পেরিয়ে একটু থমকাল। বাড়ি অন্ধকার। অফিসে আলো জ্বলছে। এখনও কাজ করছে অণুদি? কাজে নাকি অণুদির প্রবল অনীহা?
নাহ মানুষকে চেনা মুশকিল। অজস্র দিনরাতের সঙ্গী এক সময়ের হরিহর আত্মা তেজসকে চিনতে পারেনি অর্ঘ্য। কালোকুলো আধবুড়ো অভাব অনটনে জর্জরিত দুলালকেও কি চেনা গেল ঠিকঠাক? আর ক্যালিডোস্কোপের কুচি কুচি পাথরের মতো রং বদলে যাওয়া ওই নারী তো তার অচেনাই।
একটা গরম শ্বাস অর্ঘ্যর পাঁজর ঠেলে উঠে এল। সে নিজেও কি এই মুহূর্তে অচেনা নয়? নিজের কাছেই?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন