সুচিত্রা ভট্টাচার্য
সকালে আজ জলখাবার খেয়েই জরুরি কাজে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল অহনাকে। গিয়েছিল সেই বিলাসডাঙা। মোপেডেই আলাইপুর থেকে প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ। বিলাসডাঙা ছোট গ্রাম, মেরে কেটে পঞ্চান্ন-ষাট ঘর মানুষের বাস, সমস্ত পরিবারই মুসলমান। বছর খানেক হল, গ্রামের মেয়ে বউরা নিজেদের উদ্যোগে একটা স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়েছে, তাদের সদস্যরা আশাবরী থেকে ধার নিচ্ছে নিয়মিত, ঋণশোধেও তাদের কোনও গাফিলতি নেই। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাজিয়া আহমেদ নামের এক বউ আশাবরীর টাকায় বেশ কিছু হাঁস-মুরগি কিনে পুষেছিল, দিব্যি ডিম বেচছিল, মিনি পোলট্রিও বাড়ছিল ধাপে ধাপে। হঠাৎ ধসা রোগে তিন দিনে হাঁস-মুরগি খতম। সেই শোক ছাপিয়ে রাজিয়ার এখন চিন্তা, আশাবরীর দেনা শুধবে কী করে।
এমন ধারার বিপত্তি অহনার কাছে নতুন কিছু নয়। আগাম সতর্কতাও নেওয়া থাকে কিছু। রাজিয়াদের দলটার সঙ্গে কারবার শুরু করার সময়েই বলে দিয়েছিল, গোষ্ঠীর মেয়েরা নিজেরাই যেন মাস মাস টাকা জমিয়ে একটা ফান্ড তৈরি করে। বেশি নয়, বিশ-পঁচিশ টাকা দিলেই যথেষ্ট। আজ গিয়ে অহনা দেখল সেই টাকাই জমে এখন প্রায় ছ’হাজারে দাঁড়িয়েছে। মেয়েদের জড়ো করে অহনা বুঝিয়ে এল, ওই টাকা থেকেই একলপ্তে শোধ করে দিক অহনার প্রাপ্য, তা হলেই আবার নতুন করে ধার মিলবে, আবার রাজিয়া শুরু করতে পারবে পোলট্রির ব্যাবসা। অবশ্য নিজেদের ফান্ড থেকে নেওয়া টাকাও তাকে শুধতে হবে মাসে মাসে। বিশ-পঁচিশের জায়গায় দিতে হবে চল্লিশ-পঞ্চাশ।
এত সহজ সমাধান পেয়ে রাজিয়ার দুঃখ উবে গেছে। বাকি মেয়েরাও বেশ পুলকিত। ঘর থেকে মিষ্টিমাষ্টা এনে অহনাকে আপ্যায়ন করতে যাচ্ছিল, তবে আশাবরীর ম্যাডাম সে সুযোগ দিলে তো। মুখে মেয়েগুলো যতই গদগদ ভাব দেখাক, আসলে তো এরা আশাবরীর ক্লায়েন্ট। যাদের সঙ্গে সম্পর্কটাই কেজো, তারা হঠাৎ আশাবরীর ম্যাডামকে ঘরের লোক ঠাউরে বসবে, এমনটা অহনা হতেই দেবে না। দুনিয়াটাকে চিনে গেছে অহনা, তার আপনজন বাড়ানোর কোনও সাধ নেই।
সুতরাং কাজ ফুরোতেই ফের মোপেড। সকাল হাঁই হাঁই করে এগোচ্ছে দুপুরের পানে। সূর্যদেব গনগনে চোখে আগুন ঝরাচ্ছেন যেন। মাঝে অনেকটা পথ, দু’ধারে কোনও গাছপালা নেই। রোদের দাপটে জ্বলে যায় গা-হাত-পা। মাঝে তারকনগরে পিচ পড়ছে রাস্তায়। বোধহয় আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রস্তুতি। একটা মিনি রোড রোলার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে। নেমে মোপেড ঠেলতে ঠেলতে হাঁটতে হল বেশ খানিকটা। যখন বাড়ি এসে পৌঁছোল, ঘামে ধুলোয় চ্যাটচ্যাট করছে অহনার সর্বাঙ্গ।
এক্ষুনি একটা স্নান দরকার। তার আগে রুটিন মাফিক আশাবরীর অফিসে ঢুঁ দিল অহনা। বাইরে থেকে মেয়েলি গলার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, অহনা ঢোকামাত্র অখণ্ড নীরবতা। সাতজন মেয়েই ভারী মন দিয়ে কাজ করছে। ম্যাডামের মর্জি মালুম না হওয়া পর্যন্ত তাদের মুখ থেকে কুলুপ হঠবে না।
অহনা নিজের ঘরটিতে এল। নেহাতই ছোট অফিসকক্ষ। খান চারেক চেয়ার, একটা সাদামাটা টেবিল আর একখানা স্টিলের ক্যাবিনেটেই ঘরের অর্ধেকটা ভরে আছে।
স্ট্যান্ড ফ্যানখানা চালিয়ে দিয়ে অহনা বসল নিজের আসনে। অন করল কম্পিউটার, টানল বিল চালানের ফাইল। কাল আবার যাবে কলকাতায়। মেহতা অ্যাসোশিয়েটসে দেড় মাস আগে মাল ডেলিভারি হয়েছে, সম্ভবত কাল পেমেন্ট মিলবে, বিলের কপিটা ব্যাগে রাখা দরকার।
ইলা দরজায়। পাশের গ্রাম ঈশ্বরপুরের মেয়ে, আলাইপুরের বউ। আশাবরীতে সৌরবিদ্যুৎ চালিত যন্ত্রপাতি তৈরির জন্মলগ্ন থেকে কাজ করছে ইলা। কাজেকর্মে যেমনি দড়, গল্পগাছায় তেমনি ওস্তাদ। তবে সবচেয়ে বড় গুণ, খুব বিশ্বাসী। আশাবরীর স্টোরের মালপত্র ইলার জিম্মাতেই রেখেছে অহনা।
অহনা স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষ স্বরে বলল, “উঁকি মারছ কেন? কী চাই?”
“একটা চিঠি এসেছে। বিডিও অফিস থেকে।”
ভ্রূকুটি করল। সরকারি চিঠি মানেই কোনও বখেড়া নির্ঘাত। সরকার তো ভাল কাজে লাগে না, শুধু ঝামেলা পাকানোর জন্যই মুখিয়ে থাকে। অহনা কী অপরাধ করল কে জানে!
অহনা জিজ্ঞেস করল, “কখন এল?”
“এই তো, আধ ঘণ্টাও হয়নি।” আঁচলের আড়াল থেকে বাদামি খামটা বার করে বাড়িয়ে দিল ইলা, “সাইকেল মেসেঞ্জার এনেছিল, দেওয়ার সময় কাগজে সই করিয়ে নিল।”
ধুকপুকুনিটা আরও বেড়ে গেল যেন। লেফাফার মুখটা ছিঁড়ে চোখ রেখেছে সরকারি পত্রে। পড়তে পড়তে চোখ বড় বড়। চিঠির প্রেরক কৃষ্ণনগর ডি-এম অফিস। দিল্লির পরিবেশ দপ্তর নাকি গ্র্যান্ট পাঠিয়েছে। অফিসে অফিসে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য। আশাবরীর উপর হঠাৎ নেকনজর পড়েছে জেলাশাসক দপ্তরের, তারা আশিখানা সোলার ইমার্জেন্সি লাইট সাপ্লাই দিতে বলছে আশাবরীকে। দামটা বেশ ভালই দেবে, ডিলারদের অহনা যে রেটে বেচে, তার চেয়ে প্রতিটি পিসে একশো সাঁইত্রিশ টাকা বেশি। তবে চিঠি পাওয়ার একুশ দিনের মধ্যে ডেলিভারি শেষ করতে হবে, মাল কৃষ্ণনগরে পাঠাতে হবে নিজের খরচায়... ইত্যাদি ইত্যাদি।
চিঠি শেষ করে অহনা থম মেরে বসে। আশিটা আলো বিক্রি করে ফেলে ছড়িয়ে চল্লিশ হাজার টাকা লাভ থাকবে অর্থাৎ দু’মাস কারখানা চালানোর প্রায় যাবতীয় খরচ উঠে আসবে, তবু যেন আনন্দ হচ্ছে না কণামাত্র। শুধু মনে হচ্ছে আরও যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল। কেন যে কোনও সমাচারেই হৃদয়ে প্রফুল্লতা জাগে না।
ইলা দাঁড়িয়েই আছে। একটু যেন ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “খারাপ খবর আছে নাকি কিছু?”
“নাহ।” অহনা শ্বাস ফেলল, “গুড নিউজ। একটা বড় অর্ডার পেয়েছি।”
“আমি জানতাম, আমি জানতাম।” ইলার গলায় উচ্ছ্বাস, “আগেই বুঝেছি ভাল খবরই এসেছে।”
“এমনটা ভাবার কারণ?”
“বিডিও অফিসের লোকটা বলল যে।”
“কী বলল?”
“তোমার ম্যাডামকে বলে রেখো, একদিন এসে মিষ্টি খেয়ে যাব।”
এমন আবদারে হেসে ফেলাটাই ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু অহনা ঝপ করে রেগে গেল। ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “বায়নার বলিহারি। পরিশ্রম করবে আশাবরী, আর মিষ্টি খাবেন ওঁরা!”
অহনার মুড দেখে সরে পড়ছিল ইলা, পেছন থেকে ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। গম্ভীর সুরে অহনা বলল, “আমাদের ক’খানা ইমার্জেন্সি লাইট রেডি আছে?”
“আট পিস। চারটে রানাঘাট যাবে, চারটে কল্যাণী।’’
“একটাও ছাড়বে না এখন। আর কাল থেকে অন্য মাল তৈরি স্টপ। যদ্দিন না বলি, শুধু ওই একটা আইটেমই বানাও।”
“অনেকগুলো টর্চ আর সোলার কুকারের অর্ডার ছিল যে?”
“আহ যা আমি বলছি, তাই করবে। পাকামি মেরে নিজেরা কোনও ডিসিশন নেবে না।”
ঘাড় নেড়ে চলে গেল ইলা। অহনাও উঠি উঠি করছিল, কী ভেবে মোবাইলটা নিল হাতে। সুশোভন স্যারের নম্বরটা টিপছে।
ওফ কী জ্বালা, আউট অব রিচ! গেলেন কোথায় স্যার!
কিন্তু এই অর্ডার পাওয়ার খবরটা তো এক্ষুনি দিতে হবে স্যারকে। নিজের কাজের সূত্রে এখানকার প্রায় সব সরকারি অফিসেই স্যারের নিত্যদিন যাতায়াত, কেউ না কেউ আশাবরীর সুসমাচার ওঁকে শোনাবেই। তারা বলার আগে অহনা যদি না জানায়, স্যার দুঃখ পেতে পারেন। আর ওই মানুষটিকে আহত করা অহনার মোটেই সাজে না।
সত্যি, স্যার অনেক কিছু করেছেন অহনার জন্য! অহনা যখন আলাইপুরে পা রাখল, তখন তো সে মানসিক ভাবে যথেষ্ট বিধ্বস্ত। মা সঙ্গে রয়েছে বটে, কিন্তু মা তখন অহনার সঙ্গী নয়, স্রেফ বাস করে একত্রে। অবশ্য শেফালিকে কবেই বা মনের প্রাণের সঙ্গী ভাবতে পেরেছে অহনা! যাই হোক, অহনা তখন মানসিক ভাবে ভীষণ রকম একা। অথচ ভিতরে একটা ভয়ংকর ক্রোধ, উঁহু শুধু রাগ নয়, একটা তীব্র আক্রোশও যেন তাকে দগ্ধাচ্ছে দিনরাত। সে হেরে গেছে, তাকে চরম অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে, অথচ সে কিছুই করে উঠতে পারছে না, নিদেনপক্ষে নিজের মতো করে বাঁচার উপায় পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছে না, এই অসহায়তা যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে জ্বালাপোড়া। কান্না পর্যন্ত আসে না তখন, টের পায় অশ্রুর উত্সটাই শুকিয়ে মরুভূমি...।
তখনই স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ হয় অহনার। সুশোভন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের অধ্যাপক, অহনা তাঁর ছাত্রী ছিল এক সময়ে। টিয়াডাঙা স্টেশনের ওপারে সুশোভনের পৈত্রিক বাড়ি, রিটায়ারমেন্টের পর সেখানে একটা এনজিও খুলে অনাথ শিশুদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। গোটা অঞ্চলটাই চষে বেড়ান বলে কীভাবে যেন ছাত্রীর আলাইপুরে আগমনের খবরটা বোধহয় পৌঁছে গেছিল সুশোভনের কানে। নিজেই একদিন বাড়িতে এসে হাজির। অহনাকে দেখে, তার সঙ্গে কথা বলে কিছু বোধহয় আন্দাজ করেছিলেন সুশোভন, তবে ছাত্রীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাড়তি কৌতূহল দেখাননি। উলটে সুচতুর ভাবে কিছু একটা করে দেখানোর জেদ গেঁথে দেন অহনার মাথায়। শুধুই পাখিপড়ার মতো করে বোঝাতেন, জীবনটা অলস খাতে বয়ে যেতে দিয়ো না, কিছু একটা করো। অঙ্কে ছাত্রীর মাথা যথেষ্ট সাফ, জেনেই বুঝি মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসা করার বুদ্ধি দিলেন অহনাকে। আশাবরী নামটা অবশ্য অহনার পছন্দ। ঠাকুমা, ছোট্টবেলায় যে ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়জন, তার নামেই কারবার শুরু হল আলাইপুরে। যতটা না আলাইপুরের আশপাশের মানুষের জন্য, তার চেয়েও বেশি নিজের জন্য।
প্রথম প্রথম কথাটা মানতে চায়নি অহনা। নানান অছিলায় বন্ধ করে দিতে চেয়েছে আশাবরী। সুশোভন ছাড়েননি, অহনার প্রতিটি অসুবিধের জট সযত্নে ছাড়িয়েছেন। নিজেই খুঁজে দিয়েছেন আশাবরীর কয়েকজন মহিলা কর্মী, স্বনির্ভরগোষ্ঠী তৈরিতে সাহায্য করেছেন, যোগাযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ব্যাঙ্কের সঙ্গে, হয়েছেন অহনার গ্যারান্টার...। আশাবরী যে এখন সৌরবিদ্যুতের নানান যন্ত্রপাতি বানাচ্ছে, এও তো সুশোভনের প্ল্যান। সুশোভন বলেছিলেন, লাভের আশা কোরো না, তোমার মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসায়ে যতটুকু যা বাড়তি হাতে আসবে, তার একটা অংশ এই কাজে লাগাও। তোমার টর্চ-কুকার-হিটার ইমারজেন্সি ল্যাম্পই হবে আশাবরীর বিজ্ঞাপন। এর জোরেই তোমার মেন ব্যাবসায়ের গুডউইল তৈরি হবে।
কী আশ্চর্য, তাই হয়েছে কিন্তু! তার ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা কিন্তু ওই সোলার ইউনিটের সঙ্গে দিব্যি হাত ধরাধরি করে চলছে! যা একটা অর্ডার এল, এবার সোলারই না এগিয়ে যায়!
কিন্তু আরও গভীরভাবে কাজের জগতে গেঁথে যাচ্ছে অহনা, নয় কি? একসময়ে ভেবেছিল কোনও একটা কিছুতে ডুবে থেকে মনের ক্লান্তি কাটাবে, অথচ কাজই যেন বোঝার মতো চেপে বসছে। অহনার তো বিশেষ কোনও চাহিদা নেই, তা হলে ব্যাবসা বেড়েই বা লাভটা কী?
একটা বাজে। খিদে পাচ্ছে অল্প অল্প। চেয়ার ছেড়ে উঠল অহনা। পাশের ঘরে গিয়ে দাঁড়াল একটু। তার ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে। কিছুই অবশ্য বানানো হয় না আশাবরীতে, যন্ত্রাংশ কিনে এনে শুধু জোড়া লাগায় মেয়েরা। বাঁধা গতের কাজ, তবু শিখতে হয়েছে। ট্রেনিং দেওয়ার জন্য সুশোভন স্যারই একটা ছেলেকে জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এখনও সে মাসে একদিন করে এসে চোখ বুলিয়ে যায় কাজকর্মে। মেয়েরা যদিও ভালই শিখে নিয়েছে। এবং করেও যথেষ্ট নিপুণ হাতে।
ফাইবার গ্লাসের ফ্রেমে সরু টিউবলাইট আটকাচ্ছিল স্বপ্না। কাজ থামিয়ে একটু যেন উসখুস করছে। অহনা ভুরু কুঁচকোল, “কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ ম্যাডাম।” বছর পঁয়ত্রিশের শ্যামলা বউটি স্ক্রু-ডাইভারখানা রাখল পাশে, “আমাকে ক’দিন ছুটি দিতে হবে।”
“কেন?”
“ছোট জায়ের পেটে ক’দিন ধরেই বড় বেদনা হচ্ছিল। আমার দেওর বউকে রানাঘাট নিয়ে গিয়ে পেটের ছবি তুলিয়েছে। ডাক্তার বলছে পাথর হয়েছে, শিগগিরি অপারেশন করাতে হবে। তাই বলছিলাম...”
“অপারেশন তো তোমার হবে না?”
“বা রে, জা বিছানায় পড়ে থাকলে সংসার দেখবে কে? রান্নাবান্না, বাচ্চাদের সামলানো, ঘরদোরের আরও হাজারও রকম কাজ...”
“বুঝেছি, বুঝেছি।... তা কবে থেকে কামাই করবে? কদ্দিনের জন্য?”
“সামনের সোমবার যুথি ভরতি হবে হাসপাতালে। ওই দিন থেকে ধরুন আরও দু’সপ্তাহ। পারলে তার আগেই কাজে লেগে যাব।”
“থাক, বাজে কথা বোলো না। এক মাসের আগে তোমার টিকি দেখা যাবে না।” অহনা গজগজ করে উঠল, “যেই না একটা বড় কাজ এল, অমনি তোমাদেরও বায়নাক্কা শুরু হল।... তা তোমার কাজ কে তুলবে?”
দিলারা বলে উঠল, “আমি করে দেব। দরকার হলে ওভারটাইম খাটব।”
মিতা বলল, “তুমি তো চারটে বাজলেই ঘনঘন দড়ি দ্যাখো, বাড়তি সময় তুমি থাকবে কী করে? বরং আমি...”
বাকি মেয়েরাও স্বপ্নার হয়ে খেটে দিতে রাজি। কেউই তেমন উচ্চকিত নয়, তবে চাপা একটা রেষারেষির ভাব বেশ টের পাওয়া যায়। স্বপ্নার মজুরিটাই লক্ষ, কাজটা উপলক্ষ, অহনা জানে।
অহনা অবশ্য অন্য কথা ভাবছিল। বিশ্বজিতের মেজদি খুব ঘ্যানাচ্ছে, পরশুও শুকনো মুখ করে অনেকক্ষণ বসে ছিল অফিসে। ওকে যদি এই সময়টায় নেওয়া যায়, মেয়েটা কাজ শিখে যাবে মোটামুটি। একটা কাজ জানা বাড়তি মেয়ে সর্বদাই হাতে থাকা দরকার, এতে বাকিদের কামাই করার প্রবণতা কমবে।
তুৎ, আবার সেই লাভ লোকসানের চিন্তা! এসব ভেবে কী হবে রে অহনা?
নিজেকে আলগা ধমক দিয়ে স্বপ্নার ছুটি মঞ্জুর করে অহনা বাড়িতে ঢুকল। অর্ঘ্যও ফিরেছে, মধ্যাহ্নভোজ সেরে গড়াচ্ছে ছোট ঘরটায়। আবার বোধহয় বিকেলে বেরোবে।
শেফালি মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল। গায়ে মাথায় জল ঢেলে এল অহনা। মা-মেয়ে বসেছে আহারে।
খেতে খেতে শেফালি বলল, “ঝুমা আজ সকালে ফোন করেছিল। অনেকক্ষণ গল্প হল।”
অহনা খুব একটা গুরুত্ব দিল না। আলগা ভাবে বলল, “ও।”
“টুকাইয়ের তো গরমের ছুটি চলছে। ঝুমারও।”
“তোমার ছেলের বউ আর নাতির স্কুলে গরমকালে সামার ভেকেশন হয়, এটাই ঘটা করে শোনাল বুঝি?’’
মেয়ের বাঁকা মন্তব্যে শেফালি যেন একটু গুটিয়ে গেল। সামান্য চুপ থেকে বলল, “তা নয়...। ঝুমা বলছিল সামনের সপ্তাহে বাপের বাড়ি যাবে। টুকাইকে নিয়ে। পুজোর সময়ে যাওয়া হয়নি, এবারও নাকি লাল্টু অক্টোবরে সাউথ ইন্ডিয়া যাওয়ার প্ল্যান করছে, তাই এখন দিন দশ-বারোর জন্য ঘুরে আসবে।”
“খুব ভাল। এই সময়ে জলপাইগুড়ির আবহাওয়া নিঃসন্দেহে কলকাতার চেয়ে মনোরম। চাইলে ছেলেকে প্রাণ ভরে হাতি-গন্ডার দর্শন করিয়ে আনতে পারবে।”
“সে যা খুশি করুক। কিন্তু আমাকে ভারী বিপদে ফেলছে যে।”
সুরটা বিপন্নতার না আহ্লাদিপনার ঠিক ধরতে পারল না অহনা। ঝুমার সঙ্গে মা’র সম্পর্ক বিশেষ মধুর নয়, আবার তেমন একটা তেতোও নয়। ঝুমা অত্যন্ত চালাক মেয়ে, সামনাসামনি মা’র সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করে না। কিন্তু আড়ালে আবডালে যে টিপ্পনিগুলো ভাসায় তা যথেষ্ট জ্বালা ধরানো। মেয়ের ঘাড়ে চেপে মজাসে আছে মা, ছেলে-ছেলের বউয়ের সংসারের প্রতি শেফালি তার দায়িত্ব পালন করল না...। অহনার ওপরেও মোটেই সন্তুষ্ট নয় ঝুমা। তার বদ্ধমূল ধারণা, দাদা-বউদিকে জাঁতা দেওয়ার জন্যই নাকি মাকে আটকে রেখেছে অহনা। যাতে বউদি টেনশনমুক্ত হয়ে স্কুলের চাকরিটা করতে না পারে, ছেলেকে ঠাকুমার ঘাড়ে চাপিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাটা আটকে যায়...। তবে ঝুমা তো মুখমিষ্টি টাইপ, এসব ক্ষোভ কখনও উষ্মার আকারে প্রকাশ করবে না। মিছরি মাখিয়ে ছাড়ে হঠাৎ হঠাৎ।
ঈষৎ কৌতূহল নিয়ে অহনা প্রশ্ন করল, “কেন? কী করল বউদি?”
“বলছে, জানেনই তো আপনার ছেলে কেমন ক্যালাস, ওকে একা একা রেখে যেতে ভরসা হয় না। তাই আমি গিয়ে যদি ক’দিন বেহালায় থাকি, ও নাকি নিশ্চিন্ত হয়।”
“ভালই তো। যাও। দাদাকে ক’দিন আদরযত্ন করে এসো।”
শেফালি ভৎসনার সুরে বলল, “যাহ, তা হয় নাকি?”
“না হওয়ার কী আছে? যাও তো মাঝেসাঝেই।” অহনা টেরিয়ে তাকাল, “আমি কি তখন জলে পড়ে থাকি?”
“কী যে বলিস না!” শেফালি হঠাৎ স্বর নামাল, “এখন কি আমার নড়ার উপায় আছে?”
“মানে? নেই কেন?”
গলা আরও খাদে নামিয়ে শেফালি প্রায় ফিসফিস করে বলল, “বা রে, ছেলেটা আছে না?”
“তো? ও ওর মতো থাকবে। যতটুকু যত্নআত্তি করার করব। মনে হয় ও কিছু মাইন্ড করবে না।” অহনা ঠোঁট ওলটাল, “আর করলেই বা আমার কী যায় আসে?”
“তুই দিনকে দিন আবোধা হচ্ছিস।” শেফালি যেন এবার বেশ বিরক্ত, “একটা ফাঁকা বাড়িতে তুই আর ওই ছেলেটা থাকবি... আমি দিব্যি ড্যাংডেঙিয়ে চলে যাব...”
এতক্ষণে শেফালির আপত্তির কারণ মগজে সেঁধিয়েছে অহনার। ওমনি যেন আগুন জ্বলে উঠেছে মাথায়। তীক্ষ্ন স্বরে বলল, “কী বলতে চাও তুমি? শুধু অর্ঘ্য আর আমি এখানে থাকলে কী হবে?”
“মুখ করছিস কেন? অনায্য কথাটা কী বলেছি?” শেফালিরও গলা চড়ে গেছে, “এমন একটা অস্বৈরণ ব্যাপার আমি ঘটাব? মা হয়ে?”
অপমানে কান ঝাঁ-ঝাঁ করছিল অহনার। অজানা অচেনা নয়, অহনারই বান্ধবীর ভাই, অহনার ভ্রাতৃতুল্য ভেবেই নাচতে নাচতে থাকতে দিল এখানে, অথচ এক বাড়িতে দু’জনকে ছেড়ে গেলে সর্বনাশ ঘটে যাবে। অহনা একটা আটত্রিশ বছরের মেয়ে, তাকে মেয়ে না বলে আধবুড়ি বললেই হয়তো বেশি মানায়, জীবনের চরম চরম কুত্সিত মুহূর্ত দেখে পুরুষ সম্পর্কে তার ভেতরটা কবেই শীতল হয়ে গেছে, তবু তার মতো এক প্রায় বিবাহবিচ্ছিন্না মেয়েকেও ভাইয়ের মতো একটা পুরুষের সঙ্গে ছেড়ে রাখতে মা’র বুক কাঁপে? তবে শেফালিও কি তাকে একটা ক্ষুধার্ত মেয়েমানুষ ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না? নাকি ধরেই নিয়েছে, নারী আর পুরুষ সারাক্ষণ জৈবিক লালসায় লকলক করে? মা তো নিজেও মেয়েমানুষ, বোঝে না এই অবিশ্বাস তার নিজের নারীসত্তারও অসম্মান?
অহনা বরফকঠিন স্বরে বলল, “তোমার কী ধারণা, তুমি না থাকলেই আমি অর্ঘ্যর সঙ্গে নষ্টামি শুরু করব? সেই কাজটা তো আমি তোমার সামনেও করতে পারি। পারবে আটকাতে?”
“আহ অহনা, আমি ওসব ভেবে বলিনি।” শেফালির গলা কাঁপছে, “তোকে নিয়ে ফের কথা উঠবে, পাঁচজনে কে কী বলবে, কানাকানি করবে... এই আলাইপুরে সবাই তোকে মান্যিগন্যি করে,... সেখানে যদি তোর চরিত্রে কাদার ছিটে লাগে... বুঝিসই তো, এরা গাঁয়ের মানুষ... শহরে যা চলে, তার অনেক কিছুই এদের চোখে দৃষ্টিকটু...”
“থাক মা, নিজের কথার সাফাই গাইতে গিয়ে এখানকার লোকদের তুমি ইনসাল্ট কোরো না।” অহনার গোলচে মুখখানা বিদ্রূপে বেঁকে গেল, “তোমরা শহরের লোকরা কী চিজ তাও তো জানতে আমার বাকি নেই? আমাকে নিয়ে যে ভয়টা তুমি পাচ্ছ, সেই কাজটাই তো শহরে বুক ফুলিয়ে করছে কেউ কেউ, আর এই তোমরা গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে দেখতে হাততালি দিচ্ছ।”
“আমাদের তুই অকারণে দুষছিস।” শেফালির গলা এবার ভিজেভিজে শোনাল, “আমরা কেউই অন্যায়কে সাপোর্ট করিনি।”
“শুধু যে অন্যায় করছে, আমাকে তার পা চাটতে বলেছিলে। একটা ভুল করেছি বলে সারাজীবন ভুলটাকে মাথায় করে বইতে বলেছিলে।” অহনা সরু চোখে তাকাল, “সেই বোকাসোকা ভালমানুষ মেয়েটা, যে মরিয়া হয়ে তার আপনজনদের আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল, মরে গেছে মা। সে এখন কী করতে পারে তুমি জানো না। দেখতে চাও?”
“কী করবি তুই?”
“দেখতে চাও কি না বলো?”
“তুই কোনও পাগলামির কথা বলবি নির্ঘাত।”
“না, মোটেই খ্যাপামি নয়। যে সংশয়টা তোমাদের মন থেকে কিছুতেই মোছে না, সেটাই হাতে কলমে করে দেখাতে চাই।” অহনার নাক দিয়ে হলকা বেরুচ্ছে, “এক্ষুনি ছোট ঘরে ঢুকে জামাকাপড় খুলে অর্ঘ্যকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি?’’
“আহ অণু, চুপ কর। শান্ত হ।” শেফালি প্রায় ককিয়ে উঠলেন, “আমার ঘাট হয়েছে। তুই এবার মুখে লাগাম দে।”
“দিতে পারি। যদি লাগাম ধরার অভ্যাসটা ছাড়ো।”
“তোমার ভালর জন্যেই বলা।... মা হয়ে আমি তো তোমার খারাপ চাইতে পারি না।”
“আবার? আবার সেই সেন্টুমারা ডায়লগ? কেন বোঝো না...”
অহনা ঝুপ করে থেমে গেল। অর্ঘ্য বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। পরনে বারমুডা আর টি-শার্ট। খাওয়ার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মা-মেয়ের থালায় চোখ বুলিয়ে বলল, “খুব সিরিয়াস টপিক নিয়ে আলোচনা চলছে বুঝি? ডালমাখা ভাত তো শুকিয়ে কাঠ?”
মুখে একটা হাসি টানতে হল অহনাকে। তরল করতে হল স্বর, “মাতাশ্রী মহোদয়াকে একটু কাউন্সেলিং করছিলাম।”
“কী বিষয়ে?”
“অ্যাডাল্ট সাবজেক্ট। বাচ্চাদের বলা যাবে না।” ঝটপট খাবারে হাত লাগাল অহনা। মুখে বড় গরাসে ভাত তুলে বলল, “আজ কোন দিকে গেছিলি?”
“কাছেই। ঈশ্বরপুর।”
“কাজ এগোচ্ছে?”
“শনৈঃ শনৈঃ মেন তথ্য যেটা পাচ্ছি, সর্বত্র আশাবরীর সুখ্যাতি।”
একটু যেন বেশি বেশিই প্রশংসা করে অর্ঘ্য। কিন্তু সত্যিই কাজ তেমন করছে কি? অহনার সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়েও গত তিন দিনে একবারও ছ’-সাত কিলোমিটার দূরের গ্রামে যেতে পারেনি এখনও। এক মাসে শেষ হবে তো কাজ? নয়তো এ ছেলে নড়বে না। এমন সুখের গৃহ পেয়েছে!
ফোন বাজছে অহনার। মায়া অফিসে এসেছে, কী যেন কথা আছে ম্যাডামের সঙ্গে। থালা শেষ করে চটপট উঠে পড়ল অহনা। আঁচাতে আঁচাতে শেফালিকে বলল, “তুমি তা হলে যাচ্ছ কলকাতা? নো মোর বাহানা?”
তাকে নিয়েই কথা, কিন্তু অর্ঘ্য যেন বুঝল না। একবার শেফালিকে দেখছে, একবার অহনাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন