দশম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

দূর থেকে যেমন শ্যামল সুন্দর দেখায়, চরটা আদতে তেমন নয়। যেটুকু সবুজের সমারোহ তা শুধু নদীর পাড় ধরেই। চরের মধ্যিখানে গাছপালা আছে, তবে তো মোটেই ঘন নয়। ছাড়া ছাড়া। ছ্যাকরা ছ্যাকরা। গাছ বলতে তাল আর নারকেলই বেশি, কিছু বাবলা শিমূল জারুল অপরিকল্পিতভাবে রোপণ করা হয়েছিল কখনও, তারাও বেড়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বাঁশঝাড়ও চোখে পড়ে দু’-চারটে। খেত প্রায় সবটাই ধানজমি, এখন সেখানে এবড়ো খেবড়ো মাঠ। অল্প স্বল্প জায়গা নিয়ে ঝিঙে ঢ্যাঁড়শ বোনা হয়েছে কোথাও কোথাও। তৈরি ফসল তুলে তুলে বস্তাবন্দি করছে চাষিরা, হয়তো আজই সন্ধেয় পৌঁছে যাবে টিয়াডাঙায়। হরেনবাবুর আড়তে।

এমন কিছু নয়নাভিরাম দৃশ্য নয়। তার বহতা জীবনটার মতোই জোলো, অনাকর্ষণীয়। অহনা হতাশ বোধ করছিল। আগে যখন এসেছিল, সেবারও চোখ টানেনি, ভেবেছিল এবার হয়তো...। তা তার কপালই তো এরকম, কোনও কিছুই কি ভালর দিকে এগোয়? বহুকাল পর একটু বা অন্য রকম বিকেল আজ আশা করেছিল, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়ানোর রংটাও যেন ফিকে হয়ে আসছে দ্রুত।

ঘুরে ঘুরে যে চরখানা দেখবে তার হ্যাঙ্গামা কম? রাস্তা বলতে তো প্রায় কিছুই নেই, মাঝে মাঝেই আলপথ ধরতে হয়...। আধা ঘণ্টা হেঁটেই অহনার দম নিঃশেষ। রোদ নেই, তবু ঘামছে দরদর।

অর্ঘ্যরও যেন ভ্রমণে মন নেই। এলোমেলো ঘুরছে এদিক ওদিক, চাষিদের সঙ্গে খানিক গল্প জুড়ল, সবজিখেতে নেমে স্বহস্তে পরীক্ষা করছে ফসল, নিরীক্ষণ করতে গেল লাঙলটানা বলদের গোয়াল, কিন্তু সবেতেই যেন একটা নিয়মরক্ষের ভাব।

অহনা বসে পড়েছিল, ঘাসে, তালগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে। অর্ঘ্যর বুঝি হঠাৎ খেয়াল হয়েছে, অহনা পাশে নেই। খুঁজতে খুঁজতে অর্ঘ্য এল সেখানে। একটু যেন অবাক। বলল, “হল কী? আর যাবে না?”

অহনা শ্রান্ত গলায় বলল, “কোথায় আর ঘুরব? গোটা চরটাই তো এক রকম। ভেবেছিলাম, হয়তো কিছু বদলেছে...”

“কিছুই কি সেভাবে বদলায় দুনিয়ায়? বদলাই শুধু আমরা। আমাদের চারপাশটা কিন্তু একই থেকে যায়।”

অহনা কথাটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারল না। চারপাশ বলতে অর্ঘ্য কী বোঝাচ্ছে? চতুর্দিকের বাড়িঘর গাছপালা...? নাকি মানুষজন সমাজ নিয়ে গড়ে ওঠে আস্ত দুনিয়াটা। না, অর্ঘ্য মাঝে মাঝেই এমন কথা বলে, অহনা ঠিক ধরতে পারে না। সেদিন সুশোভন স্যারের মর্মান্তিক কাহিনি শুনে উদাস মুখে বলল, “দুঃখেই যার আনন্দ, তার দুঃখ কে খণ্ডায়!” দুঃখে কেউ আনন্দ পায় নাকি? কালই তো বলছিল, সুগত নাকি যতটা শয়তান, তার চেয়েও বেশি দুর্ভাগা! কেন এমন মনে হল অর্ঘ্যর কে জানে। তবে ও যে দুনিয়াটাকে একটু অন্য দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করে, এতে অহনার সংশয় নেই।

অর্ঘ্যর কথার অর্থ না খুঁজে অহনা জিজ্ঞেস করল, “তোর ভাল লাগছে এই চরটা?”

“ভালমন্দ মিশিয়েই তো মানুষের ভাল লাগা। ভাল না লাগাটা এক ধরনের অসুখ। আমাকে এখনও ওই রোগে ধরেনি।”

“ও। তার মানে তুই মোটামুটি এনজয় করছিস?”

“জানি না। উপভোগ করছি, কি করছি না তাই নিয়ে সেভাবে ভাবিনি তো।” অর্ঘ্য যেন সামান্য অন্যমনস্ক। তালগাছের মাথাটা দেখতে দেখতে বলল, “আর উপভোগ না করলে যে খারাপ লাগতেই হবে, তারও তো কোনও মানে নেই। অনেকে তো খারাপ লাগাটাকেই উপভোগ করে।”

“কী যে ছাইপাঁশ বকিস!”

“আমাকে বকালে তো এই সবই শুনবে। ...এখন ওঠো ওঠো, চলো...”

“কোথায়?”

“চর হলেও এটা তো আদতে একটা দ্বীপ। ওপ্রান্তে যাবে না একবার?”

“সে কদ্দূর?”

“চাষিরা তো বলছিল কাছেই। পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটাপথ।”

“কী আছে সেখানে?”

“তুমি না বলছিলে চরে কী আছে গিয়েই দেখবি? এখন উলটো গাইছ?”

মোক্ষম কথার প্যাঁচ। অগত্যা অহনাকে উঠতেই হয়। অর্ঘ্যর সঙ্গে সঙ্গে চলেছে খাড়াপশ্চিমে। তিন চারজন চাষি ফিরছে জমি থেকে, মাথায় বস্তা চাপিয়ে। তাদের একজন অহনাদের দেখে দাঁড়িয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “কোথা যাচ্ছেন গো আপনারা?”

অর্ঘ্য উত্তর দিল, “এই তো, চরের ওপাশটায়।”

“বেশি দেরি করবেন না। বড় ঝড় উঠবে মনে হচ্ছে।”

উত্তর-পশ্চিম কোণে চোখ পড়তেই অহনা ঈষৎ সন্ত্রস্ত, “ব্যাক করে গেলে হয় না?”

“অ্যাদ্দুর এলাম...আর তো এইটুকু...”

চাষিটা বলে উঠল, “তাড়াতাড়ি ঘুরে আসেন। আলাইপুরের ঘাটে যাবেন তো? তা হলে আমাদের নৌকোতেই...”

“চিন্তা নেই গো। আমাদের ফেরার নৌকো আছে।”

লোকটা আর দাঁড়াল না। পা চালিয়েছে। দুলে দুলে চলেছে পূবে। অহনারাও গতি বাড়াল। ছোট্ট একটা কলাবন পেরিয়ে পৌঁছেছে চরের কিনারে।

ওপার মোটেই তেমন দূর নয়। বরং আলাইপুরের থেকে যেন কাছেই। নদীও এদিকে যেন অনেকটা মরা মরা। ওপারের বাড়িঘর গাছপালা দেখা যায় স্পষ্ট। একটা মন্দিরও দৃশ্যমান, আলাইপুরের মতো।

অহনা নিরাশ গলায় বলল, “মিছিমিছি এলাম। এদিকেও তো ওপারটা একই রকম।”

“উঁহু। ভাল করে দেখো।” অর্ঘ্য আঙুল তুলল, “লক্ষ করো, ওই একটা জমিদারবাড়ি। এখন প্রায় ভগ্নস্তূপ। তা ছাড়া ঘরবাড়িও মোটেই আলাইপুরের মতো নয়। বোঝা যায়, বেশ পুরনো বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। ওদিকটায় তো হুগলি জেলা, তাই না?”

“তাই তো শুনেছি। তবে চরের পুবপাড় আর পশ্চিমপাড়ে আমি তো কোনও তফাত দেখছি না।”

“তফাত আছে কি নেই, সেটা কোনও বড় ব্যাপার নয় অণুদি। আসল ব্যাপার হল, যে দেখছে তার মনটা।”

“মানে?”

“প্লেন অ্যান্ড সিম্পল। জীবনে একটা সময় সামান্য পার্থক্যও খুব প্রকট লাগে। আবার এমনও সময় আসে, যখন ডিফারেন্সগুলো খোঁজার দৃষ্টিটাই চলে যায়। তখন ভাল মন্দ সুন্দর কুত্সিত সব কিছুই মনে হয় এক রকম। জীবনের রংগুলোও তখন আলাদা করা যায় না। এভরিথিং বিকামস গ্রে। ধূসর।”

অর্ঘ্যর কথাটা মোটেই দুর্বোধ্য ঠেকল না তো? তার দিকেই আঙুল তুলছে যেন। সুগতয় মোড়া অতীতের দিকে ইঙ্গিত করে বোঝাতে চায়, এখন অহনার নজরটাই ভোঁতা হয়ে গেছে! কতটুকু জানে, কী কষ্টটাই যে সয়েছে অহনা? যতটা না শরীরে, তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি মনে। মেয়েরা কত আশা নিয়ে ঘর বাঁধে, অর্ঘ্যর কোনও আন্দাজ আছে? স্বপ্নভঙ্গের অভিঘাত অন্তরাত্মাকে যে কীভাবে চুরচুর করে দেয়, অর্ঘ্য তা অনুভবই করতে পারবে না। তাও তো অহনা আজ নিজেকে প্রাণপণে উজ্জীবিত করতে চেয়েছে। কাল সুগত এসে দিনটাকে বিষিয়ে দিয়ে গেছিল, তার পরেও। এখন যে আর সেই বানানো খুশি খুশি মেজাজটা বজায় রাখতে পারছে না, তার জন্য জ্ঞান দেওয়ার ছলে কটাক্ষ হানা কি সাজে অর্ঘ্যর?

অহনা সামান্য ব্যথিত স্বরে বলল “কী করি বল, আমি মানুষটাই যে এরকম। রসকষহীন, চোখে ন্যাবা, একটা জঘন্য বিরক্তিকর প্রাণী, যার কাছাকাছি থাকলেও অন্যদের জীবন বিষময় হয়ে ওঠে।”

অর্ঘ্য চোখ পিটপিট করল, “যাহ বাবা, আমার কথার তুমি এই অর্থ করলে? আসলে আমি বলতে চাইছিলাম...”

বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা এক দমকা হাওয়া। এমনই এক ঝাপটা দিল, অহনার আঁচল ঠিকরে গেল গা থেকে। বেপথু অহনা কোনওমতে সামলাতে চাইল আবরু। আকাশ চিরে বিদ্যুৎ নেমে এল ধরায়, আরেকটা উলটোমুখো খ্যাপা বাতাস ছিটকে দিল অহনাকে।

পড়েই যাচ্ছিল অহনা, অর্ঘ্য তাকে ধরে ফেলেছে। বলল, “আর এক মুহূর্ত দেরি নয়, দৌড়োও।”

বলার প্রয়োজন ছিল না, ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের তাড়নায় ছুটতে শুরু করেছে অহনা। এক লহমায় ঝুপ করে কমে গেছে দিনের আলো, মেঘের আবরণে নেমে এল আঁধার। দিক ঠিক করতে পারছে না অহনা, দিশাহীন পা এঁকেবেঁকে অর্ঘ্যকে অনুসরণের চেষ্টা চালাচ্ছিল। অর্ঘ্য দাঁড়িয়ে পড়ল, চেপে ধরল অহনার করতালু। আবার ছুটছে দু’জনে। গাছেরা সব ঝাঁকুনি খেয়ে উন্মাদের মতো দোলাচ্ছে মাথা, মড়মড় আওয়াজ তুলে ভেঙে পড়ছে ডাল, ছিন্ন শাখা উড়ছে হাওয়ায়, ভয়ংকর বেগে আছড়ে পড়ল মাটিতে। হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দের সঙ্গে মিলে বিকট রব উঠছে মুহুর্মুহু।

অহনা কাতরভাবে চেঁচিয়ে উঠল, “আমরা বোধহয় আর ফিরতে পারব না।”

অর্ঘ্য ধমক দিল, “আহ, কোনও কথা নয়। আমি তো আছি।”

“এই ঝড়ের মধ্যে আমাদের ঘাট অবধি পৌঁছোতে পারব?”

“না পারার কী আছে? এখনও দিব্যি চারদিক দেখা যাচ্ছে।”

অর্ঘ্য বলল বটে, কিন্তু কিছুই প্রায় দেখতে পাচ্ছে না অহনা। শুধু যে আলোই কমে এসেছে তা নয়, বালি ভরতি শুকনো ধুলোর মত্ত দাপাদাপিতে চোখ খুলে তাকানোই দুঃসাধ্য।

অহনা বলে উঠল, “আমরা কিন্তু তোর সেই মাঝির জন্য ওয়েট করব না। সবজির নৌকাতেই চড়ে পালাব।”

“সে হবেখন। আগে নদীর ঘাট অবধি তো পৌঁছোই।”

মাত্র দশ-বারো মিনিটের দূরত্ব, ঝড়ের তাণ্ডবের সঙ্গে লড়ে ওটুকু পথ পেরোতেই যেন অনন্ত কাল কেটে যাচ্ছে। অবশেষে দেখা দিল নদী। কিন্তু ঘাট তো শুনসান। ক্ষীণ আলোতেও বেশ বোঝা যায় চাষি-ব্যাপারীদের তরী বিদায় নিয়েছে চর থেকে।

অহনা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, “কী হবে এখন?”

অর্ঘ্য বলল, “ঘাবড়াচ্ছ কেন? ঝড়টা কমতে দাও। দুলাল এসে যাবে।”

“যদি না আসে?”

“আরে, আমরা কি জলে পড়ে আছি নাকি? তুফানে ভেসে যাব এমন সম্ভাবনা নেই। এক বেলা খাওয়া না জুটলে খিদেতে মরেও যাব না। তা হলে আর ভয়টা কীসের?”

“তা বলে সারাটা রাত এই জনমানবহীন একটা দ্বীপে...।”

“আগেই অতটা ভেবে নিচ্ছ কেন? একটু ধৈর্য ধরো...”

আঁধার নামছে ভেবেই অহনার বুক ঢিপঢিপ করছিল। সত্যি সত্যি অন্ধকার হয়ে গেলে যে কী হবে অহনার? দুলাল না কী একটা যেন নাম বলল অর্ঘ্য, সে কি ঝুলিয়ে দেবে? অহনাদের রেখে গেল, ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেই তার?

কানে তালা লাগিয়ে বাজ পড়ল একটা। পরক্ষণে আবার একটা। হাওয়ার বেগ কমেছে সামান্য, কিন্তু মেঘের গুড়গুড় ধ্বনি যেন চড়ছে ক্রমশ। পড়পড় শব্দে বড় বড় কয়েকটা ফোঁটা পড়ল গায়ে। চমকে উঠেছে অহনা। উত্তাল ঝড়ের মধ্যে এই সম্ভাবনাটা যেন মাথায় ছিল না এতক্ষণ, জলবিন্দুর স্পর্শমাত্র মগজের স্নায়ু টানটান। কিছু ভাবার আগেই দাপট বেড়ে গেল বৃষ্টির। নূপুরের ছন্দে নয়, বুনো মোষের মেজাজে নেমেছে মুষলধারায়। তেমন ঘন ডালপালাওলা গাছও নেই যে তার নীচে আশ্রয় নেবে। দ্যাখ না দ্যাখ, ভিজে জাব হয়ে গেল অহনা।

অর্ঘ্যই বলে উঠল, “এ তো মহা বিপদ হল। এরকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোকার মতো ভিজব নাকি?”

অহনা করুণ স্বরে বলল, “কী হেল্পলেস সিচুয়েশন। আমাদের কিচ্ছু করার নেই?”

“তাই তো দেখছি। বাড়িটাড়িও তো নেই যে গিয়ে উৎপাত করব।”

“তখন গোয়ালটায় ঢুকেছিলি না? ওর মাথায় ছাউনি নেই?”

“ঠিক বলেছ তো।... হ্যাঁ, আছে বোধহয়... কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যে... অন্ধকারে...”

“মোবাইলটাকে টর্চ হিসেবে ইউজ় করলে...”

“কারেক্ট।...তবে দেখতে হবে যেন জল না লাগে।”

“ভাল করে মুঠোয় চেপে রাখ। আমি আমার মোবাইলটাও জ্বালাচ্ছি।”

একই দাপটে ঝরছে বারিধারা। দু’কুচি ক্ষীণ আলোয় পথ দেখে সন্তর্পণে এগোচ্ছে দু’জনে। বারবার অহনাকে সতর্ক করছে অর্ঘ্য, যেন সে আছাড় খেয়ে বাড়তি বিপদ না বাধায়।

গোয়ালে পৌঁছে একটু যেন স্বস্তি বোধ করল অহনা। তিনটে বলদ রয়েছে গোয়ালে, আঁধারে চকচক করছে ছ’-ছ’খানা চোখ, উত্কট একটা গন্ধ বেরোচ্ছে ঘরটায়, তবু যেন অসহায় বিপন্নতার শঙ্কা কমল খানিকটা। বাইরে থেকে আসা অবিরল বৃষ্টির ধ্বনি যেন এই মুহূর্তে বিপদের সংজ্ঞাটাই পালটে দিয়েছে। আশ্রয়হীনতা থেকে যা হোক কিছু একটা জোটার তফাতটা বুঝি টের পাচ্ছে মর্মে মর্মে।

বাবার রেখে যাওয়া বাড়িটার কথা কি অহনার মনে পড়ল একবার? এই মুহূর্তে? হয়তো না। বর্তমানের বিপন্নতা বুঝি মানুষকে, ক্ষণিকের জন্য হলেও, স্মৃতিহীন করে দেয়।

অহনাও তাই এখন কিছুই ভাবছে না, শুধু চরম অস্বচ্ছন্দ এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার চিন্তায় ব্যাকুল। একটা বলদ হঠাৎ গলা ছেড়ে ডেকে উঠল, ওই নিরীহ ধ্বনিতেও বুঝি বেড়ে গেল ধুকপুকুনি।

আতঙ্ক গোপন করে অহনা বলল, “এভাবেই থাকব নাকি সারা রাত?”

“বললাম তো, ঝড়বৃষ্টিটা কমতে দাও। দুলাল আসবে।”

অহনা একটুও ভরসা পেল না। বড্ড অন্ধকার, দুঃসহ অন্ধকার। অনেক বছর আগে, যখন তারা আসানসোলে থাকত, একবার শাকতোরিয়া কয়লা খনিতে নিয়ে গেছিল বাবা, নীচে খনির গহ্বরে নামার বন্দোবস্তও করে দিয়েছিল তখন। কপালে আলো বাঁধা যে অফিসারটি তাকে আর দাদাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খনির অন্দরটা দেখাচ্ছিল, খেলাচ্ছলে মিনিট কয়েকের জন্য নিবিয়ে দিয়েছিল আলো। চারপাশে ঘন কালো দেওয়াল সহ গোটা পৃথিবীটাই অমনি পলকে উধাও। নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিল না তখন। আজও এই গোয়ালঘরের অন্ধকার যেন তারই কাছাকাছি। অর্ঘ্য প্রায় তাকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে, তার নিশ্বাসটা পর্যন্ত অহনা টের পাচ্ছে, অথচ সেই মানুষটা তার অগোচর, এ যে কী গা শিরশিরে অনুভূতি!

সময় কাটছিল নিজের মনে। অথবা কাটছিল না। বৃষ্টি কিন্তু ক্লান্তিহীন, একই লয়ে আক্রমণ করে চলেছে ধরিত্রীকে।

হঠাৎ খানিক দূর থেকে অর্ঘ্যর গলা, “এদিকটায় এসো।”

অর্ঘ্যর স্বরে চাপা চঞ্চলতা। না নড়েই অহনা বলল, “কেন?”

”গোয়ালের পেছন দিকে একটু যেন ঢাকা স্পেস মতন আছে। মনে হচ্ছে, ওখানে বৃষ্টি লাগবে না।”

“ওমা তাই?”

এক পা এক পা করে বেরিয়ে এল অহনা। মোবাইলের সরু তীক্ষ্ন আলোয় আবছা আবছা দেখতে পেল জায়গাটা। সত্যিই তো খড়ের চালা রয়েছে এদিকটায়। ঘর নয়, তিন দিকে দেওয়ালও নেই, কিন্তু মাথায় খড়ের ছাউনি। কী কাণ্ড, গোটা পাঁচেক দড়ির খাটিয়াও অবিন্যস্তভাবে পড়ে!

কোনও কিছু না ভেবেই একটা খাটিয়ায় বসে পড়ল অহনা। আহ, ক্লান্ত পা দু’খানা যে কতক্ষণ পর বিশ্রাম পেল!

অর্ঘ্য বলল, “কী ব্যাপার বলো তো? খাটিয়া আছে, মানুষ নেই...”

“বোধহয় গোরুর মালিকের অস্থায়ী শেলটার। হয়তো কখনও সখনও রাতে থেকে যেতে হয়...।”

“হতে পারে। চাষবাসের সময় হয়তো দুপুরেও এখানে জিরোয়। ফসল পাহারার জন্যে মাঝেসাঝে নাইট স্টে-ও করতে হয় নিশ্চয়ই। ওইসব ভেবেই হয়তো একটা অস্থায়ী ঠেক বানিয়ে রেখেছে। আজ আমাদের কাজে লেগে গেল।”

“ওরা এক-আধজন আজ রয়ে যেতে পারত।” বাইরে বৃষ্টির ঝাঁঝ বাড়ল হঠাৎ। পাল্লা দিয়ে অহনার গলাও চড়ে গেল সহসা, “বদমাইশের দল। আমাদের ফেলে রেখে নৌকো নিয়ে ভেগে পড়ল? আরেকটু অপেক্ষা করতে পারত না?”

“খামোখা ওদের দুষছ কেন? ভুল তো আমাদের। আরও ঠিকঠাক ভাবে বললে আমার। ওরা তো আমাদের অফার দিয়েছিল। আমিই তো...”

“চুপ কর। বেড়াতে এসে আমাদের ত্রুটি-ভ্রান্তি ঘটতেই পারে। তা বলে ওরা এমন বেয়াক্কেলেপনা করবে?” অহনার গলা আর এক পরদা উঠল, “সব্বাই নেমকহারাম। ওদের ঘরের মেয়ে-বউদের জন্য উদয়াস্ত খেটে মরি, সেইটুকু কৃতজ্ঞতা বোধ যদি ওদের থাকত...”

“কী আজেবাজে বকছ? এরা হয়তো তোমাকে চেনেই না...”

“বললেই হল? আমাকে চেনে না এমন কেউ আছে এ তল্লাটে?” বলেই যেন হোঁচট খেল অহনা। এমন একটা ধারণা তার মনে বাসা বেঁধেছে, জানা ছিল না বলেই বুঝি নিজেই চমকেছে। মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে যেতে রাগ গিয়ে পড়ল সুগতর ওপর। এবং মনে হতেই শরীরে বিশ্রী জ্বালাপোড়া।

মুহূর্ত চুপ থেকে অহনা বলল, “আমি জানতাম একটা খারাপ কিছু ঘটবে আজ। ওই শয়তানটা এল, আমার কাছে ঝাড় খেল, একটা কিছু বিপদ হবে না? উফ, লোকটাকে যদি একটা চরম শিক্ষা দিতে পারতাম...”

কোনও সাড়াশব্দ নেই। অর্ঘ্য কি কথাগুলো নীরবে শুনে যাবে? বিনা মন্তব্যে? আর আঁধারের আবডালে হাসবে মুখ টিপে?

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল অহনার। চালার নীচের স্যাঁতসেতে বাতাসে মিশে গেল নিঃশ্বাসটা। অহনা মৃদু স্বরে ডাকল, “অর্ঘ্য?”

“উঁ?”

“আমি প্রলাপ বকছি...খুব মজা লাগছে, না?”

“নাহ। কষ্ট হচ্ছে। তুমিও বড় কষ্ট পাচ্ছ অণুদি।”

“হয়তো এটাই আমার প্রাপ্য। জীবন তো আমাকে আর কিছুই দিল না। বোকার মতো বেঁচে আছি, কেন বাঁচছি তাও জানি না... আমার মতো একটা হেরো পার্টি...”

“মোটেই না। তুমি একজন হানড্রেড পারসেন্ট উইনার। তোমার মতো একজন সেলফমেড ওম্যান... একা হাতে আশাবরীর মতো একটা প্রতিষ্ঠান গড়েছ... আমার তো তোমাকে দেখে হিংসে হয়।”

“সান্ত্বনা দিচ্ছিস?”

“না গো। মনের কথা বলছি। অন্ধকারের দিব্যি। আজকের এই ঝড়বৃষ্টির দিব্যি।”

“তা হলে আমার কিছু ভাল লাগে না কেন?” অহনার গলা কেঁপে গেল, “কেন মনে হয় সব কিছুর পাট চুকিয়ে কোথাও একটা চলে যাই? যেখানে কেউ আমায় চিনবে না, জানবে না, চেনাজানা কেউ আমার খোঁজ পর্যন্ত পাবে না...”

“সেখানে গিয়ে তুমি শান্তি পাবে? শিয়োর?”

অহনা জবাব দিল না। জবাব কি আছে? তাও সে জানে না।

বৃষ্টি কমেছে সামান্য। অর্ঘ্য হাত বাড়িয়ে পরখ করল বাদলধারা। চোখ সয়ে আসার পর অন্ধকার এখন আর তত গাঢ় নয়, দেখা যায় পরস্পরের অবয়ব। অহনার দিকে ফিরে অর্ঘ্য বলল, “তোমার সমস্যাটা কী জানো? কাজ করার তোমার ক্ষমতা আছে, ব্রেন আছে... দক্ষতা তো আছেই। শুধু হৃদয়টাই তোমার নেই।”

“হোয়াট?”

“হ্যাঁ। কাজটা তুমি করছ জেদের বশে। বিশেষ একজনকে দেখানোর জন্যে। প্রমাণ করতে চাও, সে তোমাকে ঠেলে জলে ফেলে দিতে পারেনি। এবং তুমি তার... শুধু তারই বা বলি কেন, দুনিয়ায় তুমি কারও কৃপাপ্রার্থী হওনি। যা করেছ, নিজের কবজির জোরে করেছ। সত্যি বলতে কী, নিজের অ্যাচিভমেন্টের ব্যাপারে তোমার খানিক অহংকারও আছে।”

অহনা একটু সংকুচিত বোধ করল, “না রে, তুই যা ভাবছিস তা নয়।”

“লজ্জা পেয়ো না। যেভাবে তুমি পরিশ্রম করো, গর্ব করা তোমার সাজে বই কী। কিন্তু এও সত্যি, কাজটাকে তুমি মোটেও ভালবাসতে পারনি। যাদের নিয়ে তোমার আশাবরী, তাদের সম্পর্কে তোমার কোনও আগ্রহ নেই। তারা তোমাকে আপনজনই ভাবে, অথচ তুমি কিন্তু তাদের কাছে ঘেঁসো না। তাদের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না কোনও কিছুর সঙ্গে নিজেকে জড়াওনি। আশাবরী তোমার কাছে স্রেফ একটা রুটিন জব। প্লাস একটা চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষায় তুমি উতরে গেছ, আর কোনও লক্ষ নেই, প্যাশন নেই আবেগ নেই, কাজে তুমি আর উত্সাহ পাবে কী করে!”

“হয়তো তুইই ঠিক।” অহনা বিড়বিড় করল, “তাই তো ভাবছি, আশাবরীর খেলা এবার শেষ করে দেব।”

“তাতেও শান্তি মিলবে কি? বরং... ভেতরের রাগটাকে ঝেড়ে ফ্যালো অণুদি। সুগতবাবুকে ক্ষমা করে দাও।”

“ওকে মাপ করব? আমি?” অহনা প্রায় ফুঁসে উঠল, “কেন? কোন সুকার্যটা সে করেছে শুনি? ইনিয়ে বিনিয়ে আমায় জপাচ্ছিল বলে?”

“না। তোমার নিজের জন্যে।”

“তুই কী রে? আমাকে সুগতর কাছে ফিরে যেতে বলছিস?”

“উঁহু। তা কি আর হয়? তুমি তোমার জায়গাতেই থাকো, সে বাঁচুক তার মতো করে। শুধু তার দোষত্রুটি অনাচার অবিচার সব মন থেকে ক্ষমা করে দাও। দেখবে, তোমার ভেতরটা কত হালকা হয়ে গেছে।”

“তুই হলে পারতিস?”

অর্ঘ্য উত্তর দিল না। ধীর পায়ে এসে বসল অন্য একটা খাটিয়ায়। বসেই আছে। অহনাও নিশ্চুপ। অর্ঘ্যর কথাগুলোই ভাবছিল। নাকি ভাবনার দোলাচলে ভুগছিল? কখন যে বৃষ্টি পুরো ধরে গেছে, তাও ঠিক খেয়াল করেনি।

অর্ঘ্যর স্বরে সংবিৎ ফিরল, “ওঠো, এবার পাড়ে গিয়ে দাঁড়াই।”

টানা বসে থেকে কোমর ধরে গেছিল অহনার। খাটিয়া ছেড়ে সোজা হতে সময় নিল একটু। চালার বাইরে এসে বলল, “প্রায় দশটা বাজে। দুলাল কি আর আসবে বলে মনে হয়?”

“চান্স কম। তবু...গিয়ে দেখি...”

“চল তবে।”

মেঘ সরে গেছে। চাঁদ নেই, এখনও ওঠার সময় হয়নি বোধহয়। দু’-চারটে তারা ফুটেছে আকাশে। ফিকে অন্ধকারে নদীতীরে যাচ্ছিল অহনা। অর্ঘ্য পাশে পাশে। কখনও হাঁটার ছন্দে অর্ঘ্যর বাহু ছুঁয়ে যাচ্ছে অহনাকে, কখনও বা অসমান পথে টাল সামলাতে অহনাই ধরে নিচ্ছে অর্ঘ্যর কবজি। ভিজে ঠান্ডা হয়ে আছে অর্ঘ্যর গা, তবু যেন একটা স্পর্শতাপ সঞ্চালিত হচ্ছে। অহনা টের পাচ্ছিল।

অনেকটা জল ঝরিয়ে বিকেলের গুমোট ভাব নেই আর। দিনের বেলার তাপও কোথায় উধাও। তবে বাতাস বেশ জোরেই বইছে। দিশাহীন ভাবে। ঝাপটা দিচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ।

পাড়টায় এসে থামল অর্ঘ্য। একটু তফাতে অহনা। সামনে শুনশান নদী। ওপারে ছড়িয়ে থাকা আলোর কুচি, ভারী নরম এক আভা ছড়িয়েছে জলে। জোয়ার চলছে, কিনারায় এসে ভাঙছে ছোট ছোট ঢেউ। ওই কোমল বিচ্ছুরণ, তীর ছোঁয়া কল্লোলের ঝংকার আবিষ্ট করে ফেলছে যেন। অহনার অজ্ঞাতেই এক অন্য অহনা দখল নিচ্ছিল অহনার।

দু’হাত কোমরে রেখে অর্ঘ্য নদীকে দেখছিল। মিনিট পাঁচেক স্থির তাকিয়ে থেকে বলল, “কিছু নজরে পড়ছে?”

অহনার চোখে স্বপ্ন স্বপ্ন ঘোর। আধফোটা স্বরে বললল, “কী?”

“কোনও নৌকা? ডিঙি ফিঙি? এদিকে আসছে?”

“আসছে কি?”

অহনার গলার আওয়াজটা কি ফ্যাঁসফেঁসে শোনাল? নাকি পালটা প্রশ্নে অবাক হয়েছে অর্ঘ্য? অহনার চোখ থেকে কেন সরাচ্ছে না স্থির দৃষ্টি?

অর্ঘ্যর প্রশ্ন ধেয়ে এল, “এ কী, তুমি কাঁপছ?”

অহনার স্বর জড়িয়ে গেল, “বড্ড হাওয়া... শীত করছে...”

ফস করে অহনার কাঁধে হাত রাখল অর্ঘ্য। ঠিকরে এল উদ্বেগ, “তোমার শাড়ি-ব্লাউজ় তো সপসপ করছে।”

“হ্যাঁ...খুব ভিজে গেছে।”

“এ পরে থাকলে তুমি তো...।”

আর এগোতে পারল না অর্ঘ্য। হঠাৎই যেন বাকরোধ হয়েছে।

আচমকা অহনা ছুঁল অর্ঘ্যকে, ফিসফিস করে বলল, “তোর টি-শার্টও তো ন্যাতা হয়ে গেছে। ঠান্ডা লাগছে না তোর?”

নারীর মাদক স্বরে অপার্থিব আহ্বান। নাকি চরম পার্থিব? একজোড়া পুরুষালি হাত কখন যে বেড় দিয়ে ঘিরে ফেলল অহনাকে তা কি অর্ঘ্যও জানে! নারীর তৃষ্ণার্ত অধর অর্ঘ্যর বুকে ওম খুঁজছে, অহনার সাধ্য কি তাকে রোধ করে!

নদীতীর থেকে ফিরছিল অহনা। এক পা এক পা করে। অর্ঘ্যর হাত বুকের মাঝে আঁকড়ে। কী আশ্চর্য, কামক্ষুধা জাগছে না, বরং এক মধুর তৃপ্তিতে জুড়িয়ে যাচ্ছে অন্তরের দাবদাহ! দেহের কোনও অচিন কুঠুরিতে যে চুঁইয়ে চুঁইয়ে প্রবেশ করছে প্রশান্তির নীর! প্রেমের গোলাপি দিনগুলোয় সুগতর সঙ্গে অনেক তো শরীরী খেলায় মেতেছিল অহনা, এই অনুভূতির আস্বাদ তো পায়নি কখনও। এরই কি নাম হৃদয়ে হৃদয় যোগ করা?

চালায় ফিরে এক খাটিয়ায় বসেছে পাশাপাশি। অর্ঘ্যর কাঁধে মাথা রেখে। অর্ঘ্যর গাঢ় স্বর কানে এল, “আমাদের সম্পর্কের পরিণতি কি জানো অণুদি?”

“উঁহু।” অহনা ঠোঁট ঘষছে অর্ঘ্যর ঘাড়ে, গলায়। আদুরে স্বরে বলল, “জানতে চাইও না রে।”

“কিন্তু আমাকে যে বলতেই হবে।... আমি আলাইপুর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কালই।”

“হঠাৎ? এত তাড়াতাড়ি?” অহনা সোজা হল, “তোর সমীক্ষার কাজ শেষ?”

“আমার সব কাজই সমাপ্ত হয়েছে অণুদি।... আর বোধহয় আসাই হবে না আলাইপুরে। বোধহয় কেন, আসা হবেই না। আমি নিশ্চিত।”

“কেন?...তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“জানি না। হয়তো এখানকার মতোই কোনও অজ্ঞাতবাসে। কিংবা পরপারে।”

“মানে?” অহনার ঠোঁট নড়ল, “কী বলছিস তুই?”

“হয়তো তোমায় মিথ্যে বলেই পালাতাম। কিন্তু এখন তো আর তা সম্ভব নয়।” অর্ঘ্য কেটে কেটে বলল, “আমি বিশেষ রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী। আমরা চাই সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। পথ একটাই। সশস্ত্র শ্রেণিসংগ্রাম। এখানে ক’টা দিন লুকিয়ে ছিলাম। এবার তো যেতেই হবে।”

“তু...তু...তুই টেররিস্ট?”

“রাষ্ট্র সেরকমই একটা নাম দিয়েছে বটে।... আমাকে কি তোমার অত ভয়ংকর কিছু মনে হয়? আতঙ্কবাদী গোছের?”

“না তো।...তুই কি সত্যিই ভাবিস মানুষ মেরে মানুষের ভাল করা যায়?”

“কয়েক দিন আগেও করতাম। এখন করি না। তোমাকে দেখেই বুঝেছি, রাগ ঘেন্না পুষে রেখে, প্রতিশোধের জন্য ছটফট করে শেষ অবধি কিছুই মেলে না। এখানকার লোকদের সঙ্গে কথা বলেও দেখেছি, অবস্থার বদল হোক ছাই না হোক, হিংসাকেই তারা সবথেকে বেশি অপছন্দ করে। রোজ তারা যতই রক্তপাত দেখুক, খুনোখুনির পথ তারা কখনই মন থেকে মানবে না।”

“তা হলে তো চুকেই গেল। তুই তো তোর ভুল বুঝতেই পেরেছিস। আর কেন পালাবি মিছিমিছি।”

“তো কি এখানে থাকব? খেপেছ? জেনেশুনে তোমায় বিপদে ফেলব?... এমনিতেই তো তোমায় আমি অনেক ঠকিয়েছি। বিস্তর মিছে কথা বলেছি। আমার বাবা মা দিদি কেউ সিঙ্গাপুরে যায়নি, সবাই এখন আসানসোলে। মা প্রায় মরণাপন্ন, বাবা দিদি তার সেবা করছে। পুলিশ আমায় খুঁজছে বলে সেখানেও আমি আর...” অর্ঘ্যর গলা বুজে এল। জোরে নাক টেনে বলল, “বিপ্লবীর তো কান্না সাজে না, তাই না অণুদি।”

“দূর বোকা। দুঃখে যার কান্না আসে না, অন্যের দুঃখ সে ঘোচাতে পারে?” অর্ঘ্যর পিঠে মৃদু চাপড় দিল অহনা। ধমকের সুরে বলল, “তুই কোত্থাও যাবি না, আমার ছায়ায় থাকবি। আমি পাখির মতো তোকে আগলে রাখব। ভালবাসার দিব্যি।”

“তুমি জানো না অণুদি, আমার দলের লোকেরা... ওরা আমায়... লোক পাঠিয়ে...”

“আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। যা বললাম, সেটাই ফাইনাল। নো নড়াচড়া ফ্রম আলাইপুর।... এখন শুয়ে পড়। ভোর ভোর নৌকা ধরে ফিরতে হবে না?”

দড়ির খাটিয়াই শয্যা। অদূরে অর্ঘ্য। ঘুমোচ্ছে? মনে হয় না। অহনাও কি দু’চোখের পাতা এক করতে পারছে? পারা সম্ভব? আজকের এই রাতটায়?

খড়ের ছাউনির ওপরে আকাশের অনন্ত চাঁদোয়া। শলমা-জরি ঝিকমিক করছে চাঁদোয়ার গায়ে। কৃষ্ণপক্ষ পড়েছে সবে, রাঙাভাঙা চাঁদে এখনও জোছনা অপার। বৃষ্টিধোয়া গাছপালা সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। বুনো বুনো। সুখমাখানো। ব্যাং ডাকছিল।

এমন রাত জীবনে মাত্র একবারই আসে। অহনা জানে। বুঝি বা অর্ঘ্যও।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%