সুচিত্রা ভট্টাচার্য
দুপুর বারোটা চল্লিশে রায় ঘোষণা করলেন বিচারপতি। কী বলবেন তা মোটামুটি জানাই ছিল অহনার। অর্ঘ্য তার প্রতিটি নাশকতামূলক কাজের দায় স্বীকার করেছে, সুতরাং সাজা তো তার হবেই। রাজসাক্ষী হয়ে বাকি কমরেডদের ফাঁসিয়ে দিলে হয়তো বেকসুর খালাসও মিলত, পুলিশ তাকে সেরকম আশ্বাস দিয়েও ছিল, কিন্তু অর্ঘ্য তো সে পথে হাঁটেনি। অতএব দণ্ডের মাত্রা যে নেহাত কমবে না, এও তো অবধারিত।
অরবিন্দও এসেছিল কোর্টে। অর্ঘ্যর মা অনেকটাই সুস্থ, তাই শুনানির সময়ে সে অনেক দিনই থেকেছে অহনার পাশে। আজ ছেলের শাস্তির পরিমাণটা শুনে সে রীতিমতো বিমর্ষ।
উকিলের সঙ্গে কথা সেরে কোর্টের বাইরে এল দু’জনে। অরবিন্দ বলল, “জজটার দয়ামায়া নেই। আরেকটু হালকা পানিশমেন্ট দিতে পারত।”
দীর্ঘ পাঁচ-ছ’মাসের ছোটাছুটির পরিসমাপ্তি হল আজ। একটা বড়সড় অধ্যায় চুকল। শরীরটা ছেড়ে যাচ্ছে যেন। অহনা একটা শ্বাস ফেলে বলল, “কিছু তো করার নেই মেসোমশাই। মেনে তো নিতেই হবে।”
“হায়ার কোর্টে গেলে হয় না? যদি খানিকটা রেমিশন মেলে? নইলে ছাড়া পাওয়ার পর আর কি মায়ের সঙ্গে ওর দেখা হবে?”
“দেখুন কী করবেন?”
“তুমিই বলো না, কী করি?” অরবিন্দর স্বরে অনুনয়, “তোমার ডিসিশনই আসল।... তুমি যা করেছ... ফ্র্যাঙ্কলি বলছি ওর নিজের দিদিও এতটা...”
অহনা মনে মনে হাসল। দিদি নয় বলেই না সে এতটা জড়িয়ে পড়েছে! অর্ঘ্য আর অহনা পরস্পরকে কী চোখে দেখে জানলে এই অরবিন্দই যে তার কৃতজ্ঞ রূপটি বদলে ফেলে ভিন্ন মূর্তি ধরবে, এও তো সত্যি। নিজের মাকে দেখেই তো বুঝছে অহনা? এত মাস হয়ে গেল, মাঝে কত কী ঘটে গেল, এখনও কি মা তার মেয়ের গায়ে কালি ছেটাতে কসুর করছে?
অহনা আলগাভাবে বলল, “আমার মত যদি নেন তো বলব অর্ঘ্যর ইচ্ছেটাকেই মেনে নিন।”
“ও তো অ্যাপিলে যেতে রাজি নয়...”
“ঠিক। ও যখন রেহাই চায় না, কেন মিছিমিছি ওর ওপর জোরজবরদস্তি চালাবেন?”
কথাটা একেবারেই পছন্দ হয়নি অরবিন্দের। পলকে মুখ গোমড়া। বলল, “দেখি, একবার খুকির বরের সঙ্গেও কথা বলি...।”
অহনা আমল দিল না। গত কয়েক মাসে অর্ঘ্যর আপনজনদের নানান চেহারা দেখল কিনা। যে যেভাবে পারে, সম্পর্ক অস্বীকার করছে। পাশে পুলিশের হ্যাপা সইতে হয়! এখন তাদের পরামর্শ যদি মূল্যবান মনে হয়, তো অতি উত্তম। অর্ঘ্যকে এখনও এরা কেউ চিনলই না! এমনকী অর্ঘ্যর বাবাও না? আগ বাড়িয়ে অহনা আর কিছু বলবেই না।
মোবাইলে সময় দেখে অহনা বলল, “আপনি কি আজ আসানসোল ফিরবেন?”
“হ্যাঁ, ইন্টারসিটি ধরব।” অরবিন্দ ঘাড় নাড়ল, “তার আগে একটু কেনাকাটা আছে...”
“বেশ তো। আমি তা হলে আসি।”
বাস ট্রাম নয়, ট্যাক্সি ধরে অহনা সোজা শিয়ালদায়। কপাল ভাল, রানাঘাট লোকাল ছাড়ছে, ভিড়টাও সহনীয়। উঠে বসার সিটও মিলেছে।
ট্রেন দমদম পেরোতেই বাতাসে হালকা ঠান্ডার আমেজ। হেমন্ত অনেকটা গড়িয়ে গেছে, অঘ্রানের শুরুতেই এবার হাওয়ায় হিমকণার আভাস। দোপাট্টাখানা গলায় জড়িয়ে নিল অহনা। বছরের এই সময়টাই মারাত্মক, একটু বেখেয়াল হলেই বিছানায় আছড়ে ফেলবে। পুজোর আগে আগে গীতালিআন্টি চলে গেলেন, স্যার এখনও শোক সামলে পুরনো জোশে ফিরতে পারেননি, অনাথ আশ্রমের অনেকটা দায়িত্ব এখনও অহনার কাঁধে। ওদিকে মিস্ত্রি লেগেছে আশাবরীতে, পুরোদমে চলছে কাজ, শেষ না হলে সোলার প্যানেল তৈরির ইউনিটটা চালু করা যাচ্ছে না। অহনার কি এই সময়ে অসুখ বাধানোর শৌখিনতা সাজে?
একটা মিনি দঙ্গল উঠেছে ব্যারাকপুরে। বোধহয় একই অফিসের, দুপুর না ফুরোতেই অফিস কাটল কী করে কে জানে! ঠেসেঠুসে বসে পড়ল কয়েকজন, চেঁচিয়ে গল্প জুড়েছে নিজেদের মধ্যে। খেলা রাজনীতি ঘুরে ঢুকে পড়ল সুগত চৌধুরীর শ্রাদ্ধকর্মে। উত্তেজিত গলায় পিন্ডি চটকাচ্ছে সুগতর।
অহনার এই হয়েছে এক ফ্যাসাদ। বেশ কিছুদিন ধরেই সুগতর ব্লু হোয়েল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস নিয়ে বাজার গরম হচ্ছিল, কত হাজারে হাজারে লোক নীলতিমির গ্রাসে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে তার খবর বেরোচ্ছিল কাগজে টিভিতে। হল্লাগুল্লার চাপে পড়ে অবশেষে গ্রেফতার করা হয়েছে সুগতকে। চন্দ্রাণীও ছাড়া পায়নি, সেও এখন শ্রীঘরে। এখন রোজই সুগতর নতুন নতুন প্রতারণার কাহিনি উন্মোচিত হচ্ছে জনসমক্ষে। ফলে পথেঘাটে, ট্রেনে বাসে সর্বত্রই সুগত এখন গরম তেলেভাজা। তার রইসি, নারীদোষ, লাখো মানুষকে টুপি পরানোর ফন্দিফিকির, সবই মহানন্দে চিবোচ্ছে জনগণ। মাঝে সাঝে অহনার প্রসঙ্গও আসে বই কী। সুগতর আসলি বউটা কোথায় ঘাপটি মেরে আছে, তাই নিয়েও পাবলিকের কৌতূহল কম নয়। নানান রসালো মন্তব্যও উড়ে আসে। বউটার মাধ্যমে নাকি বিদেশে টাকা পাচার করেছে সুগত কিংবা সেই বউটাই মালকড়ি ঝেঁপে ফোঁপরা করে দিয়েছে ... আরও কত কী...। এবং সুগতর উত্থানের ঢের আগে পালিয়ে আসা অহনাকে এসব গিলতেও হয়। এমনকী বাবার বন্ধু পুলিশের এক প্রাক্তন বড়কর্তার মাধ্যমে লালবাজারের এক জাঁদরেল অফিসারের কাছে আবেদনও করতে হয়েছে অহনাকে, যাতে তাকে টানাহ্যাঁচড়া না করে পুলিশ।
সুগতর ওপর ধকল যাচ্ছেও বটে। আজ এই কোর্ট, কাল ওই কোর্ট, আজ এই জেলা তো কাল ওই জেলা... চরকি খাওয়াচ্ছে পুলিশ। বেচারার ছবি বেরোয় কাগজে, সুন্দর সপ্রতিভ চেহারাটি এখন গাঁজাখোরের মতো দেখায়। অর্ঘ্য ওকে দুর্ভাগা বলেছিল? এই দিনটার কথা অনুমান করেই কি...?
নাহ, সত্যিই আর সুগতর ওপর রাগ নেই অহনার। বরং করুণাই হয়। একটু একটু মায়াও। কত গুণ ছিল, মোহমেঘ সবই ঢেকে দিল!
তবে একটা ব্যাপারে সুগতর কাছে অহনাকে ঋণ স্বীকার করতেই হচ্ছে। নীলতিমির আতঙ্কে ওরকম সমস্ত দু’নম্বরি কারবারেই এখন ভাটার টান। ফলে অহনার আলাইপুরের শ্যামাঙ্গিনীও আপাতত শীতঘুমে। উটকো উত্পাত থেকে জোর বেঁচে গেছে অহনা।
সুগতকে গাল দেওয়া ছেড়ে আবার রাজনীতিতে মত্ত হল দলটা। ঈষৎ কাটা হয়ে ছিল অহনা, স্বস্তি পেল যেন। চোখ মেলে দিয়েছে জানলার ওপারে।
বিকেল বিকেলই টিয়াডাঙা পৌঁছোল ট্রেন। মোপেডে ফিরছে অহনা। জনপদ পেরিয়ে ধরল ভাঙাচোরা রাস্তা। বুকটা চিনচিন করছিল অহনার। আসামির কাঠগড়ায় নতমস্তকে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ঘ্য। রায় শুনেও মাথা তোলেনি। শুধু কোর্ট থেকে নিয়ে চলে যাওয়ার আগে গাঢ় চোখে অহনার পানে তাকিয়েছিল একবার, একবারই। এখনও যেন হৃদয়ের গহিন কুঠুরিতে জমে আছে সেই দৃষ্টি। কতকাল যে থাকবে!
সহসা থেমে গেছে মোপেড। আপনা আপনি। স্টার্ট দিতে চেষ্টা করল অহনা। উঁহু, মোপেড অনড়। হলটা কী?
অহনা নামল মোপেড থেকে। মিটারগুলো দেখতে গিয়েই মাথায় হাত। আজ রায় বেরোবে বলে মনটা ভারী বিক্ষিপ্ত ছিল কাল। প্রতি রাতে নিয়ম করে চার্জ়ে বসায় গাড়ির ব্যাটারি, বেবাক ভুলে গেছে! সর্বনাশ কী হবে এখন? আরও তো প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার বাকি। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যেতে হবে?
উপায়ও তো কিছু নেই আর। পেরোতেই তো হবে পথটুকু। মোপেড ধরে ধরে চলছে ধীরে। একটু গিয়েই টান পড়েছে দমে। একটা কালভার্ট পড়ল, মোপেড দাঁড় করিয়ে বসল অহনা। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
সামনেই এক দিগন্তছোঁয়া ধানখেত। পাকা ধান দুলছে বাতাসে। খেতের ওপারে অস্তগামী সূর্য। সোনালি আলো পড়ে হলুদ ধানও সোনাবরণ। কুয়াশা নামছিল খেতে, বিছিয়ে দিচ্ছিল নরম বিষাদ। নীলাভ বিষণ্ণতায় ভরে উঠছে চরাচর।
শ্রান্ত অহনার বুক নিংড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এখনও কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে। অহনা পেরে উঠবে কি?
ওহ, দিনটাই বড় বিশ্রী যাচ্ছে আজ! দশ দশটা বছরের জন্য অর্ঘ্য চলে গেল গরাদের ওপারে!
তা কেন? আর এক অহনা ফিসফিস করছে কানে। দিনটা কী এমন মন্দ! আর দশটা বছর পরেই তো ফিরে আসছে অর্ঘ্য।
উবে যাচ্ছে ক্লান্তি। অনেকটা স্নিগ্ধ বাতাসে ফুসফুস ভরে নিয়ে অহনা উঠে দাঁড়াল। টানল মোপেড। এইটুকুই তো পথ। মাত্র দশটা বছর।
———
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন