সুচিত্রা ভট্টাচার্য
হালকা একটা উদ্বেগ নিয়ে ফিরেছিল অহনা। কলকাতায় কাজ শেষ করে একবার সুশোভন স্যারের স্ত্রীকে দেখে আসবে ভেবেছিল আজ। হল না। স্যারই নিষেধ করলেন। গীতালি আন্টিকে নিয়ে এখন রোজই যেতে হচ্ছে হাসপাতালে, কখন ফিরবেন তার ঠিক নেই। সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন চলছে ডায়ালিসিস, উন্নতির সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর ক্রমশ। স্যার একটা অনুরোধ জুড়লেন আজ। স্যারের অনাথ আশ্রমটা যদি মাঝে মাঝে অহনা একটু দেখে আসে, উনি নাকি খানিকটা নিশ্চিন্ত হতে পারেন।
নিজের কাজকর্ম সামলে কখন যাবে? নাকি অর্ঘ্যকেই দেবে দায়িত্বটা? এই নিয়েই দোটানা চলছিল অহনার মনে। কিন্তু বাড়িতে পা দিয়েই যা শুনল, অনাথ আশ্রম উবে গেল মগজ থেকে। উলটে দুম করে তেতে গেল মাথা।
অহনা বিরক্তিতে ফেটে পড়ল, “তুমি অর্ঘ্যকে যেতে দিলে? আটকালে না?”
“আমি তাকে বারণ করার কে অণু?” শেফালির স্বর নির্বিকার, “সে নিজের ইচ্ছেয় এখানে এসেছিল, দরকার ফুরোতেই চলে গেছে। এতে আমার কী করার আছে?”
“তুমি আমায় একটা ফোন করেও তো জানাতে পারতে, নয় কি?”
“সে তোমার অর্ঘ্যও তো ফোন করতে পারত, নয় কি? তা ছাড়া আমার মনেও হয়নি, অর্ঘ্য চলে গেলে তোমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে।”
“ওফফ মা, তুমি বুঝতে পারছ না।” অহনা অস্থির ভাবে মাথা ঝাঁকাল। উত্তেজিত ভাবে বলল, “ও কি এমনি এমনি এখানে ছিল? ও কত বিপদের মধ্যে আছে জানো?”
শেফালি সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল, “কেন? কী করেছে ছেলেটা? খুন-জখম? চুরি রাহাজানি?”
অহনা ভুরু কোঁচকাল, “ওকে দেখে কি ওই ক্লাসের ছেলে মনে হয়?”
“দেখে কি আর আজকাল মানুষ চেনা যায়? যাকে সভ্য-ভব্য বলে মনে হয়, পরে দেখা যায় সে একটি আস্ত শয়তান।”
বলতে না চেয়েও অহনার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “সুগতকে দিয়ে সবাইকে বিচার কোরো না মা।”
“সুগতকে টানছ কেন? তুমি ভাল করেই জানো, আমি সুগতর কথা বলিনি।” শেফালি এবার রীতিমতো গম্ভীর, “তা তোমার অর্ঘ্যবাবুটি কী মহান কাজ করেছেন শুনি? যার জন্য তাকে এখানে ঘাপটি মেরে থাকতে হয়েছিল?”
অহনা ব্যাখ্যাতে গেল না, তর্কতেও নয়। মা অর্ঘ্যকে বুঝতে পারবে না, উলটে ওর রাজনীতির কথা শুনলে হয়তো ভির্মি খাবে। অহনা সোফায় হেলান দিয়ে ভাবার চেষ্টা করল, হঠাৎ কেন এই প্রস্থান। আসানসোল থেকে কোনও খারাপ খবর পেয়ে...। কিন্তু কালও তো অহনার ফোন থেকে বাবাকে কল করেছিল অর্ঘ্য, তখন পূজার সঙ্গে কথাও হল অহনার। পূজা বলল, ওষুধে মা সাড়া দিচ্ছে, মাঝে মাঝে চিনতেও পারছে আপনজনদের। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এমন কী খারাপ হতে পারে? মোবাইলে তো নম্বরটা আছেই, একবার ফোন করে দেখবে অহনা? তা হলে খানিকটা অন্তত নিশ্চিন্ত হতে পারে।
মোবাইল হাতে নিয়েও অহনা মত বদলাল। যদি আসানসোলে কিছু না ঘটে থাকে? অর্ঘ্য আলাইপুরে অহনার বাড়িতে আছে জেনে বহুকাল পর একটু স্বস্তি পেয়েছেন মেসোমশাই, ছেলে আবার নিরুদ্দেশ শুনলে প্রতিক্রিয়া শুভ হবে কি? কিন্তু সিম কার্ডটা রেখে গেল কেন? নিজের সিম ব্যবহার করতে পারছে না, ডুপ্লিকেটটাও না, তাই তো অহনা তার পড়ে থাকা একটা সিম কার্ড অর্ঘ্যকে দিয়েছিল। এখন তার মানে অর্ঘ্য প্রায় বিনা মোবাইলেই...। এমন অবস্থায় বেরিয়ে গেল আলাইপুর ছেড়ে? কী এমন জরুরি প্রয়োজন পড়ল?
শেফালি পাশেই বসে। অহনা ঘাড় বেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখান থেকে কোথায় গেল, কিছু বলেনি?”
“হেঁয়ালিমার্কা কী একটা যেন বলেছিল বটে।” শেফালি ভাবল দু’-এক সেকেন্ড। তারপর বলল, “হ্যাঁ... যেখান থেকে এসেছিলাম, সেখানেই ফিরে যাচ্ছি।”
ভুরুর ভাঁজ বাড়ল অহনার। কলকাতা থেকে এসেছিল অর্ঘ্য, মানে ফের কলকাতায়। কিন্তু কলকাতার ডেরায় নাকি আর যাওয়া সম্ভব নয়... অর্ঘ্যই তো বলছিল...।
কে যেন দিদি দিদি করে ডাকছে বাইরে থেকে? অহনা প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এল। বিশ্বজিৎ।
অহনা বুকের শ্বাসটা চেপে বলল, “কী হয়েছে?”
বিশ্বজিৎ কাঁচুমাচু মুখে বলল, “মেজদি এখন কয়েক দিন কাজে আসতে পারবে না।”
“কেন?”
“রোজ সন্ধের সময়ে জ্বর আসছিল। আজ রক্ত পরীক্ষা করানো হয়েছে। একটু আগে রিপোর্ট এল। ম্যালেরিয়া। ডাক্তারবাবু ওষুধ দিয়েছেন। উনিই বললেন মেজদিকে ক’দিন বিশ্রাম নিতে।”
“ও। কেমন আছে জানিয়ে যেয়ো।”
বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে চলে যেতে গিয়েও ঘুরল বিশ্বজিৎ। ঈষৎ কৌতূহলী মুখে বলল, “অর্ঘ্যদা আজ চলে গেলেন বুঝি?”
ধক করে অহনার বুকে বাজল প্রশ্নটা। আলাইপুরের সব্বাই বোধহয় খবরটা জানে, একমাত্র অহনা ছাড়া। কেন? অহনা কী অক্টোপাস হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে অর্ঘ্যকে বাঁধছিল? কেটে পালিয়ে মুক্ত হল অর্ঘ্য? কী অপমান!
নাহ, নিজের কষ্ট নিজের বুকেই থাক, অন্যকে তা কেন টের পেতে দেবে অহনা?
স্মিতমুখে অহনা বলল, “তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বুঝি?”
“উনি বোধহয় আমাকে খেয়াল করেননি। নদীর ধারের কালীমন্দিরে গেছিলাম, দেখলাম উনি পিছনে ঝোলা নিয়ে নৌকোয় উঠছেন।”
“ও।”
“নৌকা পার হয়ে কোথায় গেলেন? হুগলি? ওদিকে ওনার কেউ থাকে?”
অহনার গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছে করছিল, আমি জানি না। কিন্তু সুভদ্র স্বরই ফুটল, “হ্যাঁ, ওর মামার বাড়ি।”
“জিরাটের দিকটায়? নাকি সোমরা বাজার সাইডে?”
অল্প হেসে হ্যাঁ না এড়িয়ে অহনা বলল, “এইমাত্র কলকাতা থেকে ফিরেছি, খুব ক্লান্ত... একটু জিরিয়ে নিই...?”
ইঙ্গিতটা বুঝেছে বিশ্বজিৎ। অপ্রতিভ মুখে বলল, “সরি দিদি। আসছি।”
ছেলেটা চলে যাওয়ামাত্র মগজে দপদপ। এবার যেন অর্ঘ্যর কথার অর্থটা স্পষ্ট হচ্ছে। কলকাতা যায়নি অর্ঘ্য। তার মানে আবার সেই পুরনো পথে...? এত প্রতিশ্রুতি, এত ডায়লগবাজি, সব ভান? ওইসব বলে কয়েকটা দিন কাটিয়ে গেল শুধু? অহনা কিচ্ছুটি বুঝতে পারল না? তার ভালবাসা এইভাবে প্রত্যাখ্যান করল সেটা বড় কথা নয়, নিজের জীবনটাকে সেই সর্বনাশের দিকেই ছোটাল শেষমেষ। এটাই বোধহয় অহনার সবচেয়ে বড় হার। ওহহ, বাঁচাতে পারল না অর্ঘ্যকে সে কোনও মতেই!
মাথা নিচু করে শোওয়ার ঘরে এল অহনা। দরজায় শেফালি। তীক্ষ্নচোখে নিরীক্ষণ করছে মেয়েকে। বলল, “ফালতু ফালতু ছেলেটাকে নিয়ে কেন ভাবছিস? যা স্নান করে নে।”
অহনা নিরুত্তর। কী তার ভাবনা, মা বুঝবে কেমন করে?
শেফালি আবার বলল, “গেছে তো আপদ চুকেছে। যে দুষ্কর্মই সে করে থাকুক, আমাদের এখানে থাকলে তো আমরাও জড়িয়ে যেতাম। ঠিক কিনা? তা ছাড়া...”
“গোঁৎ খেলে কেন? তা ছাড়া কী?”
“আমরা মায়ে-ঝিয়ে এখানে দিব্যি ছিলাম। একটা উটকো দামড়া ছেলে এসে ঘাড়ে বসে অন্ন ধ্বংস করছিল...”
“বাজে বোকো না মা। ও আমার আশাবরীর অনেক কাজ করে দিচ্ছিল।”
“আহা রে মরে যাই।... অর্ঘ্য আসার আগে আশাবরী বুঝি চলছিল না?”
“আরও ভাল করে চলত। ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল, ও পাকাপাকি ভাবে এখানে থাকবে, আমরা দু’জনে মিলে আশাবরীকে অনেক বড় করব...”
“অ্যাদ্দুর গড়িয়েছে, অ্যাঁ।” শেফালি ঝনঝন করে উঠল, “সুগত তা হলে ঠিকই আন্দাজ করেছিল। সাধে কি আমি ঘি-আগুন পাশাপাশি রেখে যেতে চাইনি।”
অহনা ধাক্কা খেয়েছে একটা। কড়া গলায় বলল, “হঠাৎ সুগত পিকচারে এল কোত্থেকে?”
“তুই ভাবিস, কলকাতা গেছি বলে আলাইপুরের কোনও খবর রাখি না? সুগত এখানে এসেছিল? অর্ঘ্যকে দেখে গেছে?”
“হ্যাঁ। তো?”
“পর দিনই বেহালায় গিয়েছিল। দুঃখ করে বলল, আপনার মেয়ে কিন্তু কাজটা ঠিক করছে না। আমার ওপর রাগ দেখিয়ে ও কিন্তু একটা কেলেঙ্কারি বাধাতে চলেছে।”
কী স্পর্ধা! কী সীমাহীন নির্লজ্জতা? মা কি অন্ধ? বোবা? কালা? ওই কথাটা বলার সময় ঠাস ঠাস করে চড় কষাতে পারল না? অবশ্য মা তো বোধহয় সুগতর নোংরামিতে দোষ দেখে না? সুগত পুরুষমানুষ যে! অর্ঘ্যকে সে ভালবাসে এতে তো মা পাপ দেখবেই?
বেশ কয়েক দিন পর হিংস্র রাগটা মাথা চাড়া দিয়েছে। স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল অহনা। কীভাবে আক্রমণ শানাবে, ঠিক করতে পারছিল না।
মোবাইল বাজছে। এই সময়েই কল আসতে হয়?
মনিটরে অচেনা নম্বর। বিরক্ত ভাবেই অহনা বলল, “কে? কী চাই?”
ওপারে চাঁচাছোলা স্বর, “টিয়াডাঙা পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি। আপনি কী অহনা চৌধুরী?”
“হ্যাঁ। কেন বলুন তো?”
“খানিকক্ষণ আগে একজন উগ্রপন্থী নেতা আমাদের থানায় এসে সারেন্ডার করেছেন। নাম অর্ঘ্য রায়। আপনি কি তাকে চেনেন?”
ক্ষণপূর্বের রাগ, বিরক্তি পলকে নিশ্চিহ্ন। অহনা উদগ্র ভাবে বলল, “হ্যাঁ চিনি, ভীষণ ভাবে চিনি।”
“উনিও তাই দাবি করছেন। ফোনটাও উনিই করতে বললেন।”
“ও। অর্ঘ্য এখন...”
“আমাদের হেপাজতে। অর্ঘ্যবাবু আপনার সঙ্গে একবার মিট করতে চাইছেন। ইউজ়ুয়ালি এই ধরনের কেসে আমরা কাউকে দেখা করতে দিই না। তবে আমরা আপনাকে চিনি... সো ইউ মে কাম। আপনাকে আমাদের কিছু কোশ্চেনও আছে... আশা করি আপনার কো-অপারেশন পাব...।”
“আমি এক্ষুনি আসছি।”
“তাড়া নেই। ইনফ্যাক্ট, রাত্রে কোনও মহিলাকে থানায় আসার জন্য বলতেও পারি না। কাল ফার্স্ট আওয়ারে অর্ঘ্য রায়কে রানাঘাট কোর্টে তোলা হবে। সো... সকাল আটটার মধ্যে এলেই চলবে।”
অসম্ভব। সারা রাত সে এখন অপেক্ষা করতে পারবেই না। যদি আজ রাতেই অহনা মরে যায়, জীবনে তো আর দেখাই হবে না! অহনা এত বড় ঝুঁকি নেয় কোন ভরসায়? তা ছাড়া এক রাতের নিদ্রাহীন প্রতীক্ষা তো হাজার বছরের চেয়েও দীর্ঘ, এ কি পুলিশ অফিসারটির ঘিলুতে আছে!
অদ্ভুত এক শিহরন বইছে অহনার সর্বাঙ্গে। পারেনি, অর্ঘ্য তাকে ছেড়ে যেতে পারেনি। পুরনো পথে ফিরতেও না। পুলিশ স্টেশন আর নদী যে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ, অহনার চেয়ে বেশি কে জানে!
এই রাত্রিবেলায় কোথায় যাবে, কেন না গেলেই নয়, ঠান্ডা গলায় শেফালিকে বলল অহনা। শেফালির বিমূঢ় দৃষ্টি মেখে বেরিয়ে পড়ল মোপেড নিয়ে।
চলেছে অহনার মোপেড। আঁধার চিরে। অভিসারে। পুলিশের গুহায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন