সুচিত্রা ভট্টাচার্য
জমিটা নেহাত ছোট নয়, প্রায় বিঘা দেড়েক। বেশির ভাগটাই অবশ্য ফাঁকা পড়ে। নির্মাণ বলতে আছে শুধু জমির মাঝ বরাবর একখানা সাদামাটা একতলা বসতবাড়ি, আর চৌহদ্দির নিশান বেঁটে পাঁচিলখানা ঘেঁষে আশাবরীর অর্ধসমাপ্ত কর্মশালা। বাড়ির সামনে অল্প একটুখানি বাগান মতো করেছে শেফালি। ওই বাগান চিরে সারিবদ্ধ কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার গেট থেকে সেই গ্রিলঘেরা বারান্দা পর্যন্ত।
অহনা প্রায় নিঃশব্দে গেট খুলে ঢুকল কম্পাউন্ডে। বেল-কামিনীর সুবাসে বাগান এখন ম ম। মোপেড ঠেলে বারান্দার কাছে পৌঁছোতেই আবার সেই অচেনা স্বর। কী যেন একটা বলল, অমনি বেশ আওয়াজ করে হেসে উঠল শেফালি। মা এমনধারা হাসে না তো বড় একটা। মা’র বাপের বাড়ির কেউ এল নাকি? কোনও দূর সম্পর্কের আত্মীয়?
ব্যাগ থেকে চাবি বার করে অহনা নিজেই হাত গলিয়ে খুলে নিল গ্রিলবারান্দার তালা। সামান্য শব্দ পেয়েই শেফালি বেরিয়ে এসেছে। উচ্ছ্বাসভরা গলায় বলে উঠল, “এত দেরি করলি যে বড়! দেখবি আয়, তোর জন্য কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে?”
ভ্রূকুঞ্চনে কৌতূহল ঢাকল অহনা। মোপেড বারান্দায় তুলে ইচ্ছে করে ধীরেসুস্থে পা রাখল অন্দরে। বেতের সোফায় উপবিষ্ট এক তরুণ। মুখখানা চেনাচেনা লাগে যেন? কোথায় দেখেছে... কোথায়...?
উঠে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা। মিটিমিটি হাসছে, “কী মনে পড়ছে না তো?”
ঈষৎ অপ্রতিভ স্বরে অহনা বলল, “হ্যাঁ,... না... মানে ঠিক প্লেস করতে...”
“আরে, ও তো আমাদের অর্ঘ্য।” শেফালির আর তর সইল না, লঘু ধমকের সুরে বলল, “দ্যাখ ভাল করে, আসানসোলের অরবিন্দবাবুর ছেলে...”
মানে পূজার ভাই! ধাতস্থ হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল অহনার।
চমকিত স্বরে বলল, “তুমি এত বড় হয়ে গেছ?”
“বড় কী বলছ, বুড়ো হয়ে গেছি।” অর্ঘ্য হা হা হেসে উঠল। কোঁকড়া চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, “খুঁজলে দু’-চার পিস পক্ককেশও মিলবে।”
“যাহ, তুই তো পুচকে।” রশিবাঁধা মন ছাপিয়ে হঠাৎ পুরনো দিনের সুবাস উপচে এল অহনার গলায়, “আমার চেয়ে তুই ঢের ছোট। কম করে সাত-আট বছর।”
“উঁহু, মেরেকেটে ছয়। অবশ্য দিদি আর তুমি যদি সেম এজ হও।” অর্ঘ্য গলা খাঁকারি দিয়ে চোখ ঘোরাল, “তোমরা একই ক্লাসে পড়তে নয় কি?”
শেফালি গদগদ স্বরে বলল, “তোর চেহারা কিন্তু একদম পালটে গেছে রে। কোথায় সেই ফোলা ফোলা গাল সাইকেল নিয়ে আসানসোলময় টো টো করে বেড়ানো বিচ্ছু ছেলে, আর কোথায় এই মুশকো জোয়ান! পরিচয় দেওয়ার পরেও তো ওকে দরজা খুলছিলাম না। ওর হাসিটা দেখে তবে মনে পড়ল।”
অর্ঘ্যকে দেখতে দেখতে অহনা বলল, “হ্যাঁ, ওর হাসিটা এখনও একই রকম আছে।”
“ভাগ্যিস আছে। নইলে তো আমার কপালে আজ দুঃখ ছিল। এখানে অনুদির যা ফিল্ড দেখলাম... মাসি একবার চেঁচালে আমি আর জ্যান্ত থাকতাম কিনা সন্দেহ।”
“ফালতু বকিস না।” অহনা ব্যাগ রেখে সোফায় বসল। এককালের ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর ভাইকে দেখে কোথায় সে উচ্ছলই থাকবে, কিংবা, নিদেনপক্ষে স্মৃতিমেদুর, তার বদলে কেন যে বুকে ফের শুঁয়োপোকা নড়াচড়ার অনুভূতি? কেন যে পুরনো পরিচিতদের সান্নিধ্যে স্বস্তি পায় না অহনা? তবুও স্বরে একটু হালকা ভাব রাখল, “প্রভাব প্রতিপত্তি কিস্যু নেই রে ভাই। এ তল্লাটে বছর কয়েক আছি, একটা সমিতি মতো চালাই, সেই সুবাদে দু’-পাঁচজন চেনে, এই যা।”
“বটে? আমার কিন্তু তা মনে হল না। যেভাবে কোলে করে এখানে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল!”
অর্ঘ্যর বলার ঢঙে হেসে ফেলল অহনা। আজকাল স্বতঃস্ফূর্ত হাসি তার আসে না বড় একটা, তবুও। ঠোঁট টিপে বলল, “তা আমার হদিশ পেলি কোত্থেকে?’’
“স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছ নাকি? কেউ তোমার ঠিকানা জানে না?”
“তা নয়। কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে আছি, কারও সঙ্গেই তো তেমন একটা যোগাযোগ নেই...” অহনা একটু থেমে থেকে বলল, “কে? কে দিল আমার অ্যাড্রেস?”
একটুক্ষণ অহনার দিকে তাকিয়ে রইল অর্ঘ্য, যেন পড়তে চাইছে দিদির বান্ধবীটিকে। তারপর সহজ সুরেই বলল, “সে এক গল্প। পরশু বিকেলে কলেজ স্ট্রিটের এক বুকস্টলে পত্রিকা ঘাঁটছি, হঠাৎ দোকানের ছেলেটার সঙ্গে এক ভদ্রলোকের জোর তর্ক বাধল। ভদ্রলোক একটা ম্যাগাজিন কিনেছিলেন, মাঝের কয়েকটা পাতা মিসিং, উনি বদলাতে চাইছেন, ছেলেটা রাজি নয়। ভাল করে লক্ষ করতেই দেখি, আরে এ যে লাল্টুদা।”
“ও, তাই বল। দাদার কাছ থেকে...”
“লাল্টুদাও কিন্তু আমায় প্রথমটা চিনতে পারেনি।” অহনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে অর্ঘ্য বলল, “তবে পরিচয় পেয়ে খুব খুশি। চা-টা খাওয়াল। কথায় কথায় তখনই তো বলল, তুমি এখন খুব হাই-ফাই হয়ে গেছ, বিশাল কর্মকাণ্ড চালাচ্ছ...। শুনে ভাবলাম, যাই, একটু সরেজমিন করে আসি।” তড়বড় করে কথা বলতে বলতে অর্ঘ্য থামল ক্ষণিক। চোখে রহস্যের ভাব ফুটিয়ে বলল, “আমার অবশ্য অন্য ইন্টারেস্টও আছে।”
“কী রে?”
“বলব, বলব। তাড়া কীসের। তুমি নিশ্চয়ই এক্ষুনি আমায় ভাগিয়ে দিচ্ছ না? শুধু চা খেয়েছি, এবার বোধহয় একটু জলখাবারও পাব...। তুমি ততক্ষণে ফ্রেশটেশ হয়ে নাও।”
অহনা অপ্রস্তুত মুখে ঘুরে তাকাল। শেফালিকে বলল, “ওকে এখনও কিছু খাওয়াওনি?”
“আহা, এই তো খানিক আগে এল। চায়ের সঙ্গে ওমলেট দিচ্ছিলাম, ও নিজেই বারণ করল। বলল, তুই ফিরলে একসঙ্গে খাবে।”
“এবার তা হলে বডিটা নাড়াও।”
“লুচি ভাজব? কৃষ্ণা আছে এখনও, মেখে বেলে দেবে।”
“স্ট্রেঞ্জ, জিজ্ঞেস করছ?” ভেতরের শুঁয়োপোকাটা আবার নাড়াচড়া করছে, তাকে দাবিয়ে স্বরে স্নেহশীলা দিদি দিদি ভাব ফোটাল অহনা, “ছেলেটা কতদূর থেকে তেতেপুড়ে এসেছে... এদিকে তুমি এখনও হাত গুটিয়ে...”
“যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি।” শেফালি উঠে দাঁড়াল, “তা তুমিও খাবে নিশ্চয়?”
“রোজ তোমায় এক কথা বলতে হবে? এই গরমে সন্ধেবেলায় স্নান না করে আমি কিছু মুখে তুলি?” অভ্যাসমতোই স্বর রুঢ় হয়েছিল অহনার, সামলে নিয়ে বলল, “আমার শুধু চা।”
“যা তোমার মর্জি।”
পালটা ঝাঁঝ ছুড়ে দিয়ে শেফালি রান্নাঘরে। অহনা আমল দিল না, হেলান দিয়ে বসেছে। মেঝেয় অর্ঘ্যর রুকস্যাক, সেদিকে পলক দৃষ্টি ফেলে বলল, “পূজা এখন কী করছে রে?”
“গড়পড়তা মেয়েরা যা করে। চুটিয়ে সংসার। পিটিয়ে পিটিয়ে ছেলেটাকে গাধা বানাচ্ছে।”
“ওর জামশেদপুরে বিয়ে হয়েছিল না?”
“হ্যাঁ।”
“এখনও কি সেখানেই?”
“ছিল। কিছুদিন আগে পর্যন্ত।” অর্ঘ্য গলা ঝাড়ল, “লাস্ট ডিসেম্বর থেকে সিঙ্গাপুরে।”
“তাই বুঝি?”
“হ্যাঁ গো, ওর বর একটা ভাল অফার পেল...।” অর্ঘ্য একটু থমকে বলল, “বাবা তো দিদির বিয়ের চিঠি পাঠিয়েছিল, তোমরা কেউ এলেই না।”
সে তো আমার বিয়েতেও তোরা... বলতে গিয়েও ঢোঁক গিলল অহনা। অপ্রিয় প্রসঙ্গটা নাড়াঘাঁটা না করাই তো ভাল। আলগোছে বলল, “হয়ে ওঠেনি রে। তা মাসি-মেসোর কী খবর? আছেন কেমন?”
“এই বয়সে যেমন থাকে।” অর্ঘ্য কাঁধ ঝাঁকাল, “ফুটবল খেলা বা নাচার মতো ফিটও নয়, আবার শয্যাশায়ীও নয়। বাত, প্রেশার, থাইরয়েড নিয়ে ভালই আছে দুটিতে।”
“আমার বাবা তো চলেই গেল।” অহনা সামান্য আনমনা, “কীই বা এমন বয়স হয়েছিল? মাত্র চৌষট্টি। কোনও অসুখ নেই বিসুখ নেই, হঠাৎ কোত্থেকে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। এবং এক ধাক্কাতেই শেষ।”
“হ্যাঁ লাল্টুদা বলছিল।... তোমরা নাকি ট্রিটমেন্টেরও সময় পাওনি।”
অহনা সামান্য কুঁকড়ে গেল। আর কী কী গল্প করেছে দাদা? অহনা কেন মাকে নিয়ে আলাইপুর চলে এল জানিয়েছে কি? আশা করা যায় অহনা-সুগতর বৃত্তান্তও ঘটা করে শোনায়নি? অবশ্য জানলেই বা কী ক্ষতি, না জানলেই বা অহনার কী এমন মোক্ষপ্রাপ্তি? চামড়া অনেক পুরু হয়ে গেছে অহনার, লোকলজ্জা আর তেমন গায়ে বেঁধে না। একমাত্র সমবেদনার ভারী ভারী নিশ্বাসই যা গোল পাকায়, বড্ড তেতো করে দেয় মেজাজটা।
কথা ঘোরাতে চাইল অহনা। সোজা হয়ে বসে বলল, “যাক গে, এবার তোর কথা বল? কী করছিস এখন?”
“আমি?” অর্ঘ্য ঘাড় চুলকোচ্ছে, “ধরে নাও, এক ধরনের ভ্যারেন্ডা ভাজছি।’’
“মানে?’’
“ইকনমিক্সে মাস্টার ডিগ্রি করেছিলাম। তারপর একটা চাকরিও জুটেছিল। মাস্টারি। এখন সব ছেড়েছুড়ে একটা প্রোজেক্ট করছি।”
“কী প্রোজেক্ট?”
“ওই একটা...রুরাল ভারতবর্ষ নিয়ে...।”
“তাই বল। কোনও ফেলোশিপ পেয়েছিলি বুঝি?”
“ওই আর কী। মিলে গেছে কপালজোরে।”
“কোন ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ? কলকাতা? যাদবপুর?”
“না না, একটা বিদেশি অর্গানাইজেশন... নানান ধরনের গ্লোবাল স্ট্যাটিসটিক্স তৈরি করে ওরা... গবেষণার কাজে লাগে তো।”
“তা কদ্দিনের প্রোজেক্ট?”
“ধরা বাঁধা কোনও টাইম লিমিট নেই। তবু মোটামুটি দু’-আড়াই বছর।”
“তারপর কী করবি?”
“অত ভাবাভাবি আমার আসে না অণুদি। কে বলতে পারে, তখন হয়তো আমি রইলামই না।”
“কেন? কোথাও যাওয়ার প্ল্যান আছে নাকি?”
“আরে না।...তবে বলা কি যায়, হয়তো দুম করে অক্কাই পেলাম।”
“ও কী ধরনের অলুক্ষুনে কথা।” দরজা থেকেই চেঁচিয়ে উঠল শেফালি। হাতে লুচি-তরকারির থালা, চোখে কঠোর ভর্ত্সনা। গোল সেন্টার টেবিলে প্লেট রাখতে রাখতে বলল, “বাবা-মা বেঁচে থাকতে এমন কথা উচ্চারণ করে কেউ?”
“আরে রেগে যাচ্ছ কেন?” অর্ঘ্য হাসছে, “আমি জাস্ট একটা কথার কথা বলছিলাম।”
“সব কথা মুখে আনতে নেই রে।” কৃষ্ণা চা এনেছে, মেয়েকে কাপ বাড়িয়ে দিয়ে শেফালি অর্ঘ্যকে ফের বলল, “মুখের ভাল ভাল কথা কক্ষনও ফলে না রে ছেলে, কিন্তু খারাপ কথাই আচমকা সত্যি হয়ে যায়।”
অহনার মুখমণ্ডল পলকে ম্লান। মা কেন যে বলল কথাটা বুঝতে অসুবিধে নেই। মাঝেসাঝেই বলে কিনা। সুগতকে বিয়ে করার জন্য যখন খেপে উঠেছিল অহনা, বাবার আপত্তি ছিল খুব। ভয় দেখিয়েছিল, তাড়িয়ে দেবে মেয়েকে। সেদিন জেদাজেদির লড়াইয়ে মেয়েরই পক্ষ নিয়েছিল শেফালি। মা-মেয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে হার মানতে হয়েছিল বাবাকে। কিন্তু সেই সঙ্গে বলেও ছিল, ‘‘এত কাণ্ড করে বিয়ে করছিস, শেষমেশ টিকবে তো?” বাবা হয়তো সুগতর আসল রূপটা আন্দাজ করতে পেরেছিল, কিংবা অনুমান করেছিল মেয়ে-জামাইয়ের স্বভাবের অমিলটা ক্রমশ প্রকট হয়ে একদিন না একদিন চুরমার হয়ে যাবে সম্পর্কটা।
মা কিন্তু এখনও, এত বছর পরেও, বাবার সেই মুখের কথাটাকেই ধরে বসে আছে। যেন ওই বাক্যটি উচ্চারণ না করলে আজও সুখে শান্তিতে সুগতর ঘর করত অহনা। এমন একটা হাস্যকর ধারণায় অহনা একসময় মজা পেত, ইদানীং বিরক্তিবোধ করে। একটা জ্বালাও টের পায় যেন। মনে হয়, ঘর ভাঙার জন্য পরোক্ষে তার দিকেও আঙুল তুলছে মা।
ভার মুখে চায়ে চুমুক দিল অহনা। মেয়ের ভাবান্তর নজরে পড়েনি শেফালির, আবার ফিরে গেছে ঘরোয়া আলাপচারিতায়। সহজ স্বরেই বলল, “তা তোর বাবা মা কি এখনও আসানসোলেই?”
“কোথায় আর যাবে?” আলুচচ্চড়িতে আস্ত লুচি পাকিয়ে মুখে পুরল অর্ঘ্য। চিবোতে চিবোতে বলল, “রিটায়ারমেন্টের মুখে মুখে চেলিয়াডাঙায় একটা ফ্ল্যাট কিনেছিল। ব্যস, ওখানেই থিতু।”
“ফ্ল্যাট কেন? ওঁর না বাড়ি করার খুব শখ ছিল?”
“হয়ে উঠল না মাসি। দিদির বিয়েতে বড্ড বেশি খরচা করেছিল বাবা। পিএফ থেকেও অনেক টাকা লোন তুলেছিল। ফলে যা হয়, প্রপার আসানসোলে জমিই কিনতে পারল না। ওদিকে মা তো কিছুতেই টাউন ছেড়ে নড়বে না। অগত্যা কোনওক্রমে একটা ছোটখাটো ফ্ল্যাট। সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিটের মতো।”
“বুড়ো বয়সে ছোট আস্তানাই ভাল। এই তো দ্যাখ না, এত বড় একটা জায়গা সামলাতে আমার কী হিমসিম দশা! যেদিকে দুটো দিন না তাকাব, অমনি সেদিকে আগাছা-টাগাছা হয়ে... পুরো জঙ্গলের চেহারা নেয়...। সব দায় আমার, অণু, তো ভুলেও কোনও দিকে তাকায় না...।”
“কাঁদুনি গাওয়ার অভ্যেসটা এবার ছাড়ো তো।” অহনা আচমকা ঝেঁঝে উঠল, “কে তোমায় দায় নিতে মাথার দিব্যি দিয়েছে, অ্যাঁ?”
“মানুষের মাঝে থাকলে বাড়িঘরকে একটু ভদ্রস্থ রাখতে হয়।”
“তো রাখো না, ঘ্যানঘ্যান করছ কেন? আমি কি শুয়ে বসে থাকি সারাদিন? ঘরদোরের কাজকর্ম করলে তো তোমারই ভাল, এক্ষুনি অথর্ব হয়ে পড়বে না।” অহনা ভুরু নাচাল, “কী রে অর্ঘ্য, ভুল বলেছি।”
“নেহি। বিলকুল সহি বাত কহি আপ নে।” অর্ঘ্যর গলায় মজার সুর, “কিন্তু একটা কথা বলো তো। তোমরা এখানে জমিবাড়ি কিনতে গেলে কেন? অণুদিই কি পরামর্শ দিয়েছিল মেসোকে?”
“আরে না না।” আবার শেফালির গলাই বেজে উঠল, “এটা তো পাকেচক্রে কেনা। সত্যি বলতে কী, আমরা তখন বেহালার ফ্ল্যাটের পজেশন পেয়ে গেছি। হঠাৎ একদিন অণুর বাবা তার এক সাব-অর্ডিনেটের কাছে খবর পেল, এখানে জলের দরে বাড়িসুদ্ধু জমি বিক্রি আছে। দেখতে এসে জায়গাটা তার এতই পছন্দ হয়ে গেল, ফিরেই বলে, নগরবাস তো অনেক দিন হল, এবার বাকি জীবনটা প্রকৃতির মাঝে কাটাব। সাড়ে তিন লাখ টাকায় এতটা জমিসুদ্ধু বাড়ি... তাও খুব বেশি দিন আগে নয়, মাত্র দশ বছর... ভাবতে পারিস!”
“হুম, খুবই সস্তা।... তা মেসোমশাই এখানে এসে থেকেছেন?”
“কই আর।...প্রথম প্রথম অবশ্য খুব উত্সাহ ছিল। ঘরদোর সারাল, রং করাল, শনি-রোববার ছুটি ছাটায় চলেও আসত। লাল্টু-ঝুমাও তখন এসে থেকে গেছে দু’-চার বার। দেড়-দু’বছর যেতে না যেতেই সকলের এনার্জি খতম। এমনকী তোর মেসোমশাইয়েরও। বলে, ওরে বাবা বড্ড দূর। শেয়ালদা থেকে ট্রেনে লাগে পাক্কা দু’ঘণ্টা, তার পরেও চার-পাঁচ কিলোমিটার ঠেঙিয়ে তবে এই আলাইপুর গ্রাম। তা শখ করতে এত খাটুনি কি শহুরে বাবুদের পোষায়? ব্যস, যে লোকটা পাহারায় থাকত, তার হল পোয়াবারো। লোকাল পিকনিক পার্টিদের ভাড়া দিয়ে শীতের মরশুমে দেদার পয়সা কামাত। অণুর বাবা আর দাদা তো বেচে দেওয়ার কথাও ভাবছিল তখন।” শেফালি ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল, “তা সেও তো আর হল না, তার আগেই উনি পরপারে।”
“মেসোমশাইয়ের কেনাটা বৃথা যায়নি, এটা কিন্তু একটা প্লাস পয়েন্ট। জায়গাটা ছিল বলেই না অণুদি এখানে একটা কাজ করতে পারছে।”
“হুঁহ, তাতে যে কার কী মোক্ষ লাভ হচ্ছে, সে তোমার অণুদিই জানে। এসব কি মেয়েমানুষের কাজ?”
“কী বলছ মাসি? আজকাল মেয়েদের কাজ ছেলেদের কাজ বলে আলাদা কিছু আছে নাকি?”
“খুব আছে। সে তোমরা মানো, ছাই না মানো। তফাত যদি নাই থাকবে, বিধাতা তা হলে দু’ কিসিমের জীব বানালেন কেন?”
মোক্ষম যুক্তি! বাবাও এই কথাটাই বলত না কথায় কথায়! সৃষ্টি টিকে থাকার নিছক জৈবিক নিয়মটা কি সুচতুর ভাবেই না ব্যবহার হচ্ছে, হয়েই চলেছে। আজও। কী আশ্চর্য, মেয়েরাও কথাটা অন্ধের মতোই বিশ্বাস করে। হয়তো ছেলেদের চেয়েও বেশি। নইলে তার আর সুগতর বাদ-বিবাদের সময় মা কি চোখ-কান বুজে সুগতর পক্ষ নিতে পারত?
স্মৃতির ঢেউয়ে দোলা উঠতে দিল না অহনা। মা যেভাবে এগোচ্ছে, থামানো দরকার। নয়তো ঢুকে পড়বে অহনার অপছন্দের সড়কে।
অহনা তাড়াতাড়ি বলল, “মা এখনও ঠাকুমা দিদিমাদের যুগেই পড়ে আছে। দুনিয়া কোথায় পৌঁছে গেছে মা তার খবরই রাখে না।”
শেফালি অপ্রসন্ন গলায় বলল, “অ। আমি বুঝি নিউজ দেখি না?”
“ওফ্, কী কথার কী যে মানে করো? তেষট্টিতেই বাহাত্তরে ধরে গেল!”
অর্ঘ্য লুচি শেষ করে চুমুক দিচ্ছে চায়ে। দাড়িগোঁফহীন চৌকো মুখখানায় পলকা হাসির আভাস। চোখ ঘুরছে ঘরের এদিক সেদিক। কোণের টেবিলে রাখা টিভিটা দেখিয়ে বলল, “ওটা চলে নিশ্চয়ই?”
“খুব চলে।”
“কেব্ল কানেকশনও তো আছে দেখছি? তা শেফালিমাসির টিভির নেশা নেই?”
“ওরে বাবা, নেই আবার...! সাধে কি মগজে জং পড়েছে?” অহনা মুখ বেঁকাল, “অন্তত ছ’-ছ’খানা সিরিয়াল সিন টু সিন মুখস্ত। আজ তোর অনারে বন্ধ রেখেছে মা।”
“এহে, আমি তো তা হলে মাসির সন্ধেটা নষ্ট করে দিলাম।”
বুঝতেই যখন পারছ, এবার কেটে পড়ো না বাপু। স্নান করে শীতল হয়ে শান্তিতে একটু গড়াগড়ি খাই বিছানায়। মনে মনে বলল বটে অহনা, কিন্তু মুখে তো ভদ্রতা বজায় রাখতেই হয়। সভ্য হওয়ার জ্বালা কম! ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখে অহনাকে বলতেই হল, “আরে না। ঠিক সময় করে রিপিট টেলিকাস্ট দেখে নেবে মা। নয় তো কাল থেকেই অম্লশূল-পিত্তশুল-আর্থারাইটিস-স্পন্ডেলোসিস সমস্ত রোগ একসঙ্গে স্টার্ট করে যাবে না!”
“না রে অর্ঘ্য, আমার অত নেশা নেই। সময় কাটে না বলে দেখি একটু-আধটু।” উষ্মা নয়, সহজ স্বরেই বলল শেফালি, “আমাকেও তো কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে, ঠিক কিনা?”
অহনাকে তেরচা চোখে দেখে নিয়ে অর্ঘ্য ঘাড় নাড়ল, “সে তো বটেই।”
সায় পাওয়ামাত্র শেফালি খুশিখুশি মুখে বলল, “তোকে দেখে আমার আজ কী ভাল যে লাগছে।... তুই এখন আছিস কোথায়?”
“আমি?” একটু বিচিত্র ভঙ্গিতে তর্জনী তুলে নিজেকে দেখাল অর্ঘ্য। অল্প কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কেন...। কলকাতাতেই আছি...।”
“কোনও আত্মীয়ের বাড়ি?”
“না না। একটু যেন অনাবশ্যক জোরে মাথা দোলাল অর্ঘ্য, পেয়িং গেস্ট। বউবাজারের দিকটায়।”
“তা হলে তো তোর ফেরার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। আজ রাত্তিরটা এখানেই রয়ে যা। তোর মুখে একটু আসানসোলের লোকজনের গল্প শুনি।”
এই ভয়টাই তো এতক্ষণ পাচ্ছিল অহনা। মা’র এই এক বিচ্ছিরি অভ্যেস, কেউ এলেই তাকে থেকে যেতে বলবে। কিছুদিন আগেই তো মা’র আহ্লাদ পেয়ে বড়মামার ছেলে টানা এক সপ্তাহ গেঁড়ে বসে রইল। যখন তখন আশাবরীর অফিসে ঢুকে পড়ছে, উপদেশ বর্ষণ করছে মেয়েগুলোকে...। পছন্দ হয় না অহনার, একদম সহ্য হয় না। আত্মীয়স্বজন চেনাপরিচিতের গণ্ডি থেকে দূরে থাকবে বলেই না তার এই টিয়াডাঙায় বাস। আশ্চর্য, মা একবার ভেবেও দেখে না মেয়ের প্রাইভেসি বলেও তো একটা বস্তু আছে। তার এই পুরুষবর্জিত সংসারে সে একটু নিজস্ব ঢঙে খোলামেলাভাবে থাকে, সেখানে সারাক্ষণ একটা দামড়া ছেলে, হোক না সে ভাই, ঘাড়ের পাশে ঘুরঘুর করছে... অসহ্য।
শেফালিদেবীর যদি আলাইপুরে এতই নিঃসঙ্গ লাগে, ফিরে যাক না ছেলের সংসারে। উঁহু, তা তিনি করবেন না। কত ধানে কত চাল হয়, দাদা-বউদি সেখানে বুঝিয়ে দেবে না প্রতি পদে। এখানে এত অঢেল স্বাধীনতা, আছেও রানির হালে, তবু কিছুতেই মেয়ের সুবিধে-অসুবিধে বুঝবে না? যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাতৃদেবী এখানে এসেছিলেন, সে তো কবেই চুকেবুকে গেছে। অহনা দিব্যি নিজেকে রপ্ত করে নিয়েছে আলাইপুরে। তার আর কারওকে প্রয়োজন নেই। মাকেও না।
ক্ষোভ চেপে অহনা সতর্ক স্বরে বলল, “দুম করে এমন এক একটা রিকোয়েস্ট করো না লোককে? ছেলেটা আমাদের দেখতে কদ্দুর থেকে ছুটে এসেছে, অমনি তাকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছ?”
“কেন? এক রাত নয় পুরনো মাসির কাছে রয়েই গেল...”
“ও তো আর বাচ্চা নেই। এখানে ওর আনইজি লাগতে পারে...”
“আমার কোনও প্রবলেম নেই।” অর্ঘ্য হেলান দিয়েছে সোফায়, ঠোঁট উলটে বলল, “থেকে গেলেই হয়।”
আর কী বলার থাকতে পারে অহনার। নিভে যাওয়া মুখে উঠে গেল ঘরে। ব্যাগ ট্যাগ রেখে নাইটি কাঁধে বাথরুম যেতে গিয়েও থমকাল। পলক ভেবে হাউসকোটখানাও নিল সঙ্গে। প্রবল অপ্রসন্নতা দূর করতেই বুঝি জোরে চালিয়ে দিয়েছে শাওয়ার। এই ধারাস্নানটুকুই অহনার একমাত্র বিলাসিতা। অবশ্য পিছনে মেহনতও আছে। খুদে একটি জলাধার বানাতে হয়েছে মাটির নীচে, টিউবওয়েলে পাইপ লাগিয়ে সেটিকে ভরা হয় নিয়মিত, পরে টুলু পাম্প ছাদের ট্যাঙ্কে তুলে দেয় সেই জল। বাড়তি লাভ, শেফালির হাঁটুভাঁজ সমস্যার সমাধান, কমোড বসেছে বাথরুমে।
আজ জল বেশ গরম এখনও। শরীর জুড়োচ্ছে না, তবে রোমকূপগুলো খুলে যাচ্ছে যেন। দেহের চ্যাটচেটে ভাব কমছে আস্তে আস্তে। অর্ঘ্যকে কোথায় শুতে দেবে আজ? বাইরের ঘর বাদে তিনটে তো মোটে কামরা, তার মধ্যে ছোটটি তো জিনিসে জিনিসে ঠাসা। সমিতির মাল, অহনার বইপত্র, এ ছাড়া বাড়িতে যা যা বাতিল হয়, সবই তো ওখানে ডাঁই। বাবলা টাবলা এলে এই ব্যাপারটায় মাথা ঘামাতে হয় না, বাইরের ঘরের মেঝেয় তোশক পেতে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অর্ঘ্যকে তো ওইভাবে...। তুৎ, মা যে কী এক একটা ঝামেলা ডেকে আনে!
ছেলেটা এখানে এসেছেই বা কেন? বলল তো শুধু দেখা করতে নয়, অন্য উদ্দেশ্য আছে...। আশ্চর্য, যার সঙ্গে ষোলো-সতেরো বছর যোগাযোগ নেই, তাকে কোন দরকারে লাগতে পারে অর্ঘ্যর। গ্রাম নিয়ে কী পেপার করছে, তার জন্য ডাটা চাইবে? আবার তা হলে অফিস খুলে কম্পিউটার নিয়ে বসতে হবে এখন?
ছোকরা বোধহয় রাতটা থাকার ধান্ধা নিয়েই এসেছিল! ইচ্ছে করে দেরি করছিল, যাতে অহনারা চাপে পড়ে? বহুত মতলবি তো, ঠিক ফাঁদে ফেলল!
ধুস, ভাল্লাগে না। গোটা দিনটাই কেমন উলটোপালটা যাচ্ছে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে অহনা কি নিজের মুখটাই প্রথমে দেখেছিল আজ? আয়নায়? হবে হয়তো!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন