সুচিত্রা ভট্টাচার্য
কাগজের স্তূপ নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিল অর্ঘ্য। আশাবরীর রাশি রাশি ভাউচার। প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতিবার টাকা কালেকশনের চার্জ়, ব্যাঙ্কে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ, রাহা খরচের বিল, এজেন্টদের কমিশন পেমেন্টের অতি দীর্ঘ তালিকা, আশাবরীর কর্মচারীদের মাইনে, মালপত্র কেনাবেচার অজস্র ডকুমেন্ট... কী আছে আর কী নেই। প্রতিটি সংখ্যা নিখুঁত ভাবে ভরতে হবে কম্পিউটারের মগজে। সোজা কাজ! চলছে আঙুল, উঠছে ফিগারের পর ফিগার। বেশিক্ষণ টানা চোখ রাখা যায় না মনিটরে, মিনিট চল্লিশেই মাথা প্রায় থান ইট।
কাজটা যে অর্ঘ্য ধীরেসুস্থে করবে, তারও কি জো আছে। যা ডেটলাইনের খাঁড়া ঝুলিয়ে দিয়েছে অণুদি! যত খাটুনিই হোক, কালকের মধ্যে শেষ হওয়া চাইই চাই। রানাঘাটে কে এক জয়ন্তবাবু আছেন, আশাবরী তথা অহনা ম্যাডামের ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন জমা করেন ভদ্রলোক। পরশু সূর্য মাঝ গগনে পৌঁছোনোর আগে ওই গন্ধমাদন সাজিয়ে গুছিয়ে জয়ন্তবাবুর হাতে তুলে দিতেই হবে, নইলে নাকি উনি আর আশাবরীর ফাইল স্পর্শই করবেন না। কী জ্বালা! আর এমন একটা ঝামেলার কাজ কিনা অর্ঘ্যর ঘাড়েই চাপল। পাহাড় প্রমাণ কাগজ সমেত তাকে কম্পিউটারে বসিয়ে দিয়ে দিব্যি নাচতে নাচতে কলকাতা চলে গেল আশাবরী ম্যাডাম!
ইলা উঁকি দিচ্ছে দরজায়। কী বোর্ডে আঙুল থামল অর্ঘ্যর। চোখ তুলে বলল, “কী বক্তব্য? বলে ফ্যালো।”
“টিফিনে যাব...দাদা।”
অর্ঘ্য খুশি হল। রোজই খানিকক্ষণ এখানে বসতে হচ্ছে, মেয়েগুলো তাকে স্যার স্যার করছিল, ধমকে ধামকে অভ্যাসটা ছাড়ানো যাচ্ছে তা হলে। প্রসন্ন স্বরে বলল, “তোমরা সকলেই যাবে নিশ্চয়? বেশি দেরি কোরো না।”
“এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরব।”
ইলা বেরিয়ে যাচ্ছিল, আচমকা জরুরি কথাটা মনে পড়ে গেল অর্ঘ্যর। পেছন থেকে ডাকল, “এক সেকেন্ড। স্টকের খাতাটা তোমার কাছে রয়েছে না?”
“হ্যাঁ দাদা। লাগবে আপনার?”
“একটু। দিয়ে যাও তো।”
বাঁধানো রুলটানা খাতাটা টেবিলে রেখে চলে গেল ইলা। পাতা উলটে দেখল অর্ঘ্য। বিল চালানের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে এই খাতাটাও পরীক্ষা করতে হবে আজ, এই কাজটাও নাকি খুব জরুরি। কাগজের সমুদ্র ঘেঁটে প্রতিটি এন্ট্রি চেক... অর্ঘ্যর আজ কালঘাম ছুটে যাবে।
সত্যি, অহনা খাটাচ্ছে বটে অর্ঘ্যকে! যেই না সেদিন কাকভোরে একটা জেলে নৌকা ধরে চর থেকে আলাইপুর ফিরল, অমনি জারি হয়ে গেল নির্দেশ। অর্ঘ্যর তো আর সমীক্ষার ছলে গাঁয়ে গাঁয়ে চরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই, বসে বসে অহনার অন্ন ধ্বংস করাও চলবে না, আশাবরীর জন্য মেহনত দিক অর্ঘ্য।
ব্যস, ডিউটি চালু। গ্রামে গ্রামেই ঘোরো, কিন্তু আশাবরীর কাজে। দ্যাখো, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানো যায় কি না। অর্ঘ্যর মতো সবল জোয়ান সঙ্গী পেলে অহনার কীসের ভাবনা, স্বচ্ছন্দে সে আশাবরীকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারে। সুতরাং দিনভর শুধু চরকি খাও। মেয়ে বউদের জড়ো করো, মিটিং বসাও, বোঝাও আশাবরীর ঋণ দেওয়ার নিয়ম কানুন। শত সহস্র প্রশ্ন থাকে মেয়েদের, গুছিয়ে গাছিয়ে তাদের উত্তর দিয়ে তাদের সংশয় নিরসন কি মুখের কথা। এক এক সময় তো অর্ঘ্যর মনে হয়, এর চেয়ে তাদের বিপ্লব করাটা ঢের সোজা কাজ ছিল। কোথায় কখন কীভাবে শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করবে, তার প্ল্যান ছকাটাই যথেষ্ট, নিজেদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, কাউকে জবাবদিহি করার কোনও দায় নেই। ভুল হলে নিজেরা মরবে, ঠিক হলে প্রতিপক্ষ খতম, এর কোনও মাঝামাঝি ব্যাপারই নেই। আর এই আশাবরীতে এত ফ্যাকড়া, প্রতিটি গোষ্ঠীর পরিবারে পরিবারে এত আজব আজব সমস্যা, শুনতে শুনতে সাত দিনেই অর্ঘ্যর মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, তার বিপ্লবী হওয়ার চেয়ে মানুষকে নিয়ে মানুষের মাঝে নেমে কাজ করাটা অনেক বেশি কঠিন।
তবে হ্যাঁ, আশাবরীর জন্য খেটে এক ধরনের তৃপ্তিও মিলছে বই কী। মস্তিষ্কের অনেক গাদ যেন সরে যাচ্ছে। শ্রান্ত শরীরটা যখন বিছানায় পড়ে, পলকে নিদ্রা এসে যায়। কী আশ্চর্য, দুঃস্বপ্নও আর দেখছে না!
অহনাও ভারী মজায় আছে যেন। তার সেই দিবারাত্র হাঁড়ি মুখ উধাও, কারণে অকারণে চোটপাট নেই, ইলা-মায়াদের সঙ্গেও হেসে হেসে কথা বলছে। অর্ঘ্যর খেটে খেটে নাকাল হওয়ার গল্পে ব্যথিত তো হয়ই না, উলটে মুচকি মুচকি হাসে। গত শুক্রবার কী খেয়াল হল, মোপেডে চড়ে প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে ব্যাঙ্কে গিয়ে ওভারড্রাফ্টের ঊর্ধ্বসীমা এক লপতে ডবল করে এল! শেফালিকে পরশু নিয়ে এল কলকাতা থেকে, তার সঙ্গেও লড়াই-ঝগড়া বাধছে না! বয়সটাও যেন ঝুপ করে কমে গেছে অনেকটাই।
অর্ঘ্য রয়ে গেছে বলেই কি? নাকি অর্ঘ্যর কথামতো সুগতকে ক্ষমা করে দিয়ে মনটা সমে ফিরেছে? এমনও কি হতে পারে দুটোই মিলেমিশে অহনার এই পরিবর্তন?
স্ট্যান্ড ফ্যানটা ঝপ করে থেমে গেল। লোডশেডিং। গত কয়েক দিন খুব বেড়েছে, ঘনঘন যাচ্ছে বিদ্যুৎ। বেশিক্ষণের জন্য নয় অবশ্য, এসেও যায় অল্প সময়ে।
ডাটা সেভ করে কম্পিউটার বন্ধ করল অর্ঘ্য। দুটো বাজে, খিদেটা ভালই পেয়েছে। ছোট্ট একটা আড়মোড়া ভেঙে চেয়ার ছাড়ল। বেরিয়ে আসার আগে একবার তাকাল যন্ত্রপাতি তৈরির ঘরখানায়। মেয়েরা ফেরেনি এখনও, মেঝেয় ছড়িয়ে আছে মালপত্র। নাটবল্টু, স্ক্রুডাইভার, প্লাস, রেঞ্জ, শোল্ডারিং স্টিক...। গত পরশু এখানে কী কাণ্ডটাই না ঘটিয়েছিল সে! অহনা মাকে আনতে কলকাতায় গেল, তার হঠাৎ সাধ জেগেছিল ওই মেয়েগুলোর সঙ্গে বসে বানাবে সোলার ল্যাম্প। নিজের হাতে। কিন্তু ওই চেনা যন্ত্রপাতিগুলোও ঠিকঠাক ব্যবহার করা যে কী কঠিন, একটা ল্যাম্প বানাতে গোটা দিনটাই কাবার। তুলনায় মাইন পাতা কি কয়েকটা ডেটোনেটর ফিট করা তো নেহাত জলভাত। ইলা-মিতা-দিলারা-কেয়ারা পর্যন্ত তার নাজেহাল দশা দেখে মুখ টিপে হাসছিল সেদিন।
অর্ঘ্যর ঠোঁটে আবছা হাসি ফুটে উঠল। চোরা একটা শ্বাসও পড়ল যেন। একখানা সামান্য আলো বানানোর চেয়ে আস্ত একটা গ্রাম উড়িয়ে দেওয়া যে ঢের ঢের সোজা কাজ, এটুকু জানতে যে জীবনের কতগুলো বছর কেটে গেল!
ছোট্ট মাঠখানা পেরিয়ে বাড়ি ঢুকল অর্ঘ্য। শেফালি গ্রিল-বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সামান্য ভারভার গলায় বলল, “এত দেরি করো কেন? তুমি খেয়ে নিলে আমি একটু বিছানায় টানটান হতে পারি।”
অর্ঘ্য পরশু থেকেই দেখছে, শেফালির হাবভাবে যেন বদল ঘটেছে অনেকটা। সহজ আপ্যায়নের সেই সুরটা আর নেই। বরং ঈষৎ অসন্তোষই যেন প্রকট হয়ে উঠছে হঠাৎ হঠাৎ। অণুদির সামনে অবশ্য স্বাভাবিকই থাকে, আড়ালে আবডালে একটু যেন অন্যরকম হয়ে যায়। তাকে আর অণুদিকে নিয়ে কিছু সন্দেহ করে কি? তারা তো কোনও বেচালপনা করেনি বাড়িতে। কোথাওই করেনি, কখনই অসংযত হয়নি। তা হলে?
অর্ঘ্য অবশ্য হাসিমুখেই বলল, “সরি মাসি। অণুদি এত ডিউটি চাপিয়ে গেছে...”
“কাঁধে নিয়েছ কেন? তোমার নিজের কাজকর্ম শেষ?”
মৃদু হেসে উত্তরটা এড়িয়ে অর্ঘ্য সোজা নিজের খুদে গলতায়। সেখান থেকেই শেফালির ডাক শুনতে পেল, “স্নান পরে কোরো। আমি কিন্তু ভাত বেড়ে দিয়েছি।”
অগত্যা বাথরুম গমন স্থগিত। সুড়সুড় করে ডাইনিং টেবলে হাজির। ডাল, পটলভাজা বাটামাছের ঝাল সহযোগে সারছে ভোজন।
শেফালি টেবিলের ওপারে। খাওয়া দেখছিল অর্ঘ্যর। জিজ্ঞেস করল, “আর ভাত নেবে?”
শেফালিমাসির এই তুই থেকে তুমিতে উত্তরণ বড্ড কানে লাগে। দূরত্ব বাড়ানোর সচেতন প্রয়াস? অণুদিকে জানাতে হবে। থাক, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অণুদিকে বিব্রত করার কী দরকার। মা-মেয়েতে এখন অশান্তি নেই, দুম করে হয়তো বেঁধে যাবে।
মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে অর্ঘ্য বলল, “না গো মাসি। যা দিয়েছ তাতেই তো পেট জয়ঢাক হয়ে যাচ্ছে।”
“আমার মেয়ের জন্য খাটছ... না হয় দু’মুঠো বেশিই খেলে।” মোটেই হালকা নয়, বরং বেশ বিরস স্বরে বলল শেফালি, “যাক গে, আমি শুতে গেলাম। খাওয়া হলে থালা টেবিলে ফেলে রেখো না, রান্নাঘরে নামিয়ে দিয়ো।”
শেফালি চলে গেল। আঁচিয়ে উঠে অর্ঘ্য ঢুকেছে স্নানে। বৃষ্টিবাদলা হচ্ছে প্রায়ই, দুপুরের দিকে জলটা আর তত তেতে থাকে না, গা-মাথা ভিজিয়ে ভালই আরাম হয়। ঝাঁকড়া চুল তোয়ালেতে মুছতে মুছতে অর্ঘ্য বেরিয়ে দেখল ডাইনিং টেবলের পাখাটা ঘুরছে আপন মনে।
অর্থাৎ কারেন্ট এসে গেছে। উফ, কী স্বস্তি। ভরপেট খাওয়ার পর এখন একটা ভাতঘুম দিলে কেমন হয়? পাখা চালিয়ে বিছানায় গড়াতে গিয়েও মত বদলাল অর্ঘ্য। সারা সকাল বসে বসে গত বছরের এপ্রিল-মে শেষ হয়েছে, সবে আরম্ভ হয়েছে জুন, আরও ন-ন’টা মাস বাকি। এখন ঘুমোনো মানে অন্তত ঘণ্টা দেড়েকের জন্যে কাজের দফারফা। সন্ধেবেলা অণুদি ফিরলে তখন কী কৈফিয়ত দেবে অর্ঘ্য?
তার চেয়ে বরং সোফায় হেলান দিয়ে খানিক জিরোনো যেতে পারে। বাইরের ঘরে এসে অর্ঘ্য টিভি চালিয়ে দিল। ভলিউম কমিয়ে। পাছে শেফালির নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে। রিমোট হাতে আধশোওয়া হয়েছে। ঘুরছে এ চ্যানেল ও চ্যানেল।
আচমকা আঙুল স্থির। খবরে কী দেখাচ্ছে ওটা? তেজসের ছবি না? কী করেছে তেজস? তড়াক করে উঠে বসল অর্ঘ্য। অজান্তেই বাড়িয়ে দিয়েছে টিভির আওয়াজ।
সমাচারটা শুনে, ভিডিও ক্লিপিংস দেখে, অর্ঘ্য বজ্রাহত। গোয়েন্দা সূত্রে নাকি খবর মিলেছিল, ওড়িশার নয়াগড় জঙ্গলে আস্তানা গেড়েছে উগ্রপন্থীরা, আজ সকালে কমান্ডো বাহিনী সেই গুপ্ত ঘাঁটিতে হানা দেয়, বিপুল সংঘর্ষ হয়েছে দু’ পক্ষের, গোলাগুলি চলেছে বিস্তর, আটজন উগ্রপন্থী নিহত হয়েছে। জখমের সংখ্যা চার। কম্যান্ডো বাহিনীর কেউই মারা যায়নি, তিনজন মাত্র আহত হয়েছে সংঘর্ষে। মৃত উগ্রপন্থীদের তালিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম তেজস সিং ওরফে বাবুরাম মারান্ডি ওরফে রামু ভার্গব ওরফে শংকরন নায়ার। সরকারের দাবি, উগ্রপন্থী দমন অভিযানে গত চব্বিশ মাসে এটাই নাকি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তেজস সিং-এর কর্মকাণ্ডেরও বর্ণনা দিচ্ছে টিভি রিপোর্টার। গত বছরে ট্রেনলাইনে নাশকতামূলক কাজ চালিয়ে আঠাশ জনের প্রাণহানি ঘটানো, আট মাস আগে মধ্যপ্রদেশে পুলিশফাঁড়ি আক্রমণ করে সাতজন পুলিশ খুন, দেড় মাস আগে ঝাড়খণ্ডে অ্যাম্বুলেন্স উড়িয়ে চালক-রোগী সমেত পাঁচজনকে হত্যা, অতি সম্প্রতি কোরাপুটে...
শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল অর্ঘ্যর। তার মাইন পেতে অ্যাম্বুলেন্স ওড়ানোর কেসটাও তেজসের ঘাড়ে চেপে গেছে! এ তো এক দিক দিয়ে ভালই হল, নয় কি? কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, তার দীর্ঘদিনের কমরেড, অনেক সুখদুঃখের সাথী, তেজস আর নেই! দিল্লির জে-এন-ইউতে প্রথম পরিচয়, তেজসের ডাকেই পার্টিতে যোগ দিয়েছিল অর্ঘ্য, বস্তারের জঙ্গলে একসঙ্গে দু’জনে অস্ত্রচালনার ট্রেনিং নিল, কত লড়াইয়ে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছে...। কয়েক মাস ধরে তেজস অবশ্য কেমন পালটে যাচ্ছিল। পার্টিতে অর্ঘ্যর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে, কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং-এও অর্ঘ্যর কথা বেশি গুরুত্ব পায়... এতে যেন বিরক্ত হচ্ছিল তেজস। শেষমেশ তো অর্ঘ্যকে পয়লা নম্বর শত্রু ঠাউরে...। তবু... তেজসের নিথর শরীর... জঙ্গলের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে..., গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে...! তেজস তাকে যাই ভাবুক, একসঙ্গে অনেকটা পথ তো তারা পাশাপাশি হেঁটেছিল।
তেজসের মৃতদেহ দেখাচ্ছে বারবার। ভাল লাগছে না। একটুও ভাল লাগছে না। টিভি অফ করে ঝুম বসে রইল অর্ঘ্য। দু’ আঙুলে টিপছে রগ। আপন মনে মাথা ঝাঁকাচ্ছে জোরে জোরে।
সহসা মগজে বিদ্যুতের ঝিলিক। তেজসকে নিয়ে তো শোক করা বৃথা। বরং যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এ তো শাপে বর। তেজসের মৃত্যু কি নতুন সম্ভাবনা খুলে দেয়নি? রাজন, সৌরভ, গণেশন, পানিক্কাররা নিশ্চয় এখন দিশেহারা, অর্ঘ্যকে তারা সম্ভবত মেনেও নেবে...। দলটাকে যদি আবার নতুন করে গড়া যায়...? অর্ঘ্য নিশ্চিন্তে নিজের মতো করে দল চালাবে...। তত্ত্বে বদল ঘটিয়ে... শ্রেণিসংঘর্ষ থেকে ব্যক্তিহত্যার অংশটা ছেঁটে ফেলে...?
নাহ, মতাদর্শ নিয়ে লড়ালড়ি পরে হবে, বাকি সব্বাইয়ের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করাটাই এখন মুখ্য কাজ। পার্টির বিপন্ন দশায় সে যদি কমরেডদের পাশে না দাঁড়ায়, তাদের ভরসা না জোগাতে পারে, কী করে তাদের নেতা হবে অর্ঘ্য? আর এক মুহূর্ত নষ্ট করা নয়, আজই বেরিয়ে পড়া দরকার। এক্ষুনি। বেলপাহাড়ির উদ্দেশে। ওখানকার ঘাঁটিতে পৌঁছে একে একে সকলকেই বার্তা পাঠাবে সে, আবার বাঁধবে জোট...।
ঝটিতি ঘরে গেল অর্ঘ্য। খাটের নীচ থেকে টানল ঝোলা, ঝটাঝট পুরছে নিজের জিনিসপত্র। ঢোকাল ল্যাপটপ, বই, ছড়ানো জামাকাপড়, এমনকী ভিজে তোয়ালেটাও পলিথিনে মুড়ে চালান করল অন্দরে। হাত চালিয়ে পরখ করে নিল, রিভলভারখানা ঠিক জায়গায় রাখা আছে কি না। ভাগ্যিস অণুদিকে মেশিনটা জমা করে দেয়নি!
জিন্স-টি-শার্ট গলিয়ে, ঝোলা পিঠে চাপিয়ে অর্ঘ্য প্রস্তুত। নিঃশব্দে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কী ভেবে ঘুরে এল। শেফালি-অহনা তার প্রতীক্ষায় অনেক রাত অবধি গালে হাত দিয়ে বসে থাকবে, উদ্বিগ্ন হয়ে চতুর্দিকে খোঁজাখুজি শুরু করবে... সে ভারী বিশ্রী ব্যাপার।
শেফালির দরজায় এসে কণ্ঠগ্রাম সামান্য উঁচুতে তুলে অর্ঘ্য ডাকল “মাসি...।”
ফল হয়েছে। চোখ খুলে তাকাল শেফালি, “কী হল?”
অর্ঘ্য বিনা ভূমিকায় বলল, “আমি চলে যাচ্ছি।”
শেফালি উঠে বসল। চোখ রগড়ে বলল, “কোথায়?”
“যেখান থেকে এসেছিলাম, সেখানেই। আমার এখানের কাজ ফুরিয়ে গেছে তো।”
শেফালি সামান্য থতমত, “আমার ওপর রাগটাগ করে যাচ্ছ না তো? আমি কিন্তু তোমায় যেতে বলিনি।... তুমি হলে গিয়ে এখন অণুর স্পেশাল অতিথি...”
“ছাড়ো না মাসি।...তুমি কি আমার কম আদরযত্ন করেছ... আমার চিরকাল মনে থাকবে...”
“আমার সৌভাগ্য। সাবধানে যেয়ো।”
বাধ্য ছেলের মতো অর্ঘ্য ঘাড় নাড়ল। ঘুরতে গিয়েও থমকাল। পকেট থেকে কাগজের একটা ছোট্ট মোড়ক বার করে দিল শেফালির হাতে।
শেফালি অবাক স্বরে বলল, “কী এটা?”
“অণুদির একটা পুরনো সিমকার্ড। আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছিল। ওটা আর আমার লাগবে না। অণুদিকে ফেরত দিয়ে গেলাম।”
“ও।...ঠিক আছে, দিয়ে দেব।”
“অণুদিকে বোলো, তাড়া ছিল বলে ওয়েট করতে পারলাম না। অণুদি যেন কিছু না মনে করে...।”
“বলে দেব’খন। এসো।” কপালে হাত ঠেকাল শেফালি। “দুগ্গা, দুগ্গা...।”
অর্ঘ্যর জন্য শুভকামনা? নাকি অর্ঘ্য বিদেয় হলে বাঁচে মহিলা? ঠিক বুঝতে পারল না অর্ঘ্য। বোঝার তার সময়ও নেই। স্নিকার পরা পা চালিয়ে আশাবরীর কম্পাউন্ড ছাড়ল। মুহূর্ত ভাবল কী যেন, তারপর ধরেছে নদীর পথ।
সাড়ে তিনটে বাজে। রাস্তায় লোকজন নেই। চেনামুখের সঙ্গে এখন সাক্ষাৎ না হওয়াই মঙ্গল, পালানোর চিহ্ন থেকে যাবে। লাভ একটাই, পরে কখনও পুলিশ এলেও তার রুট আন্দাজ করতে গিয়ে খানিক ঘোল খাবে।
নদীতে আজ তিন-চারটে নৌকা। দুলাল নেই, থাকলেও তার নৌকায় উঠত না অর্ঘ্য। কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা নেমে এল প্রথম নৌকার পাটাতনে। বুড়োমতো মাঝিকে বলল, “কী গো ভাই, যাবে তো?”
মাঝি হাই তুলল, “কোথায় কত্তা?”
“ওপারে।”
“ওই চরে?...তিরিশ টাকা পড়বে।”
পলকে চিন্তার টোকা। টাকার জন্য নয়। ভেবেছিল, চরে পাক মেরে সরাসরি ওপারে গিয়ে উঠবে। এখন মনে হচ্ছে, এই মাঝিকে নিয়ে চর অবধি যাওয়াই নিরাপদ। চরের ওপার থেকে ফের নৌকা ধরবে, লোকটা আর হদিশ দিতে পারবে না অর্ঘ্যর।
অর্ঘ্য ঘাড় নাড়তেই মাঝি নৌকা ছাড়ল। পার্স খুলে তিনখানা দশ টাকার নোট বার করে অর্ঘ্য রাখল পকেটে, সেই সঙ্গে একবার নিরীক্ষণ করে নিল পয়সাকড়ির হাল। হাতখরচা বাবদ ক’দিন আগে হাজার টাকা পকেটে গুঁজে দিয়েছিল অণুদি। বলেছিল, মাগনা তোকে খাটাব কেন, কিছু অন্তত রাখ। বোঝহয় পার্সের হাল দেখে অণুদির মায়া হয়েছিল। যাই হোক, ওই টাকার পুরোটাই আছে এখনও। এতেই অর্ঘ্য দিব্যি বেলপাহাড়ি পৌঁছে যাবে। কিন্তু তারপর? বেলপাহাড়ির শিবিরে খরচা নেই বটে, কিন্তু সেখান থেকেও যদি কোথাও যেতে হয়? বেলপাহাড়িতে এখন টাকার জোগাড় কেমন কে জানে! ডাক্তার, উকিল, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা টাকাই আদায় হচ্ছিল, এখন অর্ঘ্যদের ছত্রভঙ্গ দশায় তারাও না বেঁকে বসে। ভয় না পেলেই তো বিপদ, অর্ঘ্যদের অস্তিত্ব ঝুরঝুর হয়ে যাবে।
চিন্তাটা বাজল অর্ঘ্যর মাথায়। ভবিষ্যৎ রাস্তা স্থির করার আগে এই কথাটা প্রথম মনে পড়ল কেন? আদর্শ নয়, ভয় দেখানোর ক্ষমতাই কি তাদের একমাত্র মূলধন এখন? রাজনদের কি অর্ঘ্য বলতে পারবে, সেস আদায় বন্ধ করো? টাকা আসবেই বা কোত্থেকে? অস্ত্র, গোলাবারুদ, মাইন, ডিনামাইটের খরচা নেই? প্লাস, এতজন কমরেডের খাওয়া-দাওয়া, এখানে ওখানে ছোটা, নিয়মিত বুলেটিন প্রকাশ, পোস্টার ছাপানো...
নৌকা কখন যে মাঝনদী পেরিয়ে গেছে অর্ঘ্য টেরই পায়নি। আষাঢ় মাস পড়েছে আজ। মেঘলা আকাশ, মায়া ছড়ানো আলো, নদীর টলটলে শোভা, আজও সবই মজুত, অথচ অর্ঘ্যর নজরে পড়ছে না। একটা বড় নৌকা গেল পাশ দিয়ে, ঢেউ এসে দুলিয়ে দিল অর্ঘ্যদের, মালুমই হল না অর্ঘ্যর। হৃদয়ের অস্থিরতা বুঝি অনেক স্বাভাবিক অনুভূতিকেও অসাড় করে দেয়।
মাঝিকে ভাড়া মিটিয়ে চরে নামল অর্ঘ্য। তরতরিয়ে উঠে এল উঁচু পাড়ে। ঘুরে একবার দেখল আলাইপুর। তখনই অর্ঘ্যর মনে পড়ে গেল সেদিন রাতে ঠিক এখানটাতেই এসে দাঁড়িয়েছিল না? আবছা দুলে গেল স্মৃতি। পা যেন সহসা অবশ। এখনও যেন সেই ছোঁয়া লেগে আছে শরীরে। ভেজা নরম এক দেহ অর্ঘ্যর বুকে আশ্রয় খুঁজছিল!
ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে অর্ঘ্য এগোল আবার। দল তাকে ডাকছে, ছিঁড়তে হবে পিছুটান। কিন্তু গিয়ে সে পৌঁছোবে কোথায়? পুরনো সেই জীবনে কি তার আস্থা অটুট আছে এখনও? বিশ্বাসই তো চিড় খেয়ে গেছে, নয় কি?
আবার অর্ঘ্যর পা আটকে গেল। ওই তো সেই গোয়ালঘরের লাগোয়া চালা! ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দড়ির খাটিয়া! এখানে বসেই না অর্ঘ্য উচ্চারণ করেছিল, সে খুন-খারাবির পথ ত্যাগ করতে চায়? তবে আজ সে কেন চলেছে? দলপতি হওয়ার সুযোগ মিলতে পারে বলে? তেজসের সঙ্গে অর্ঘ্যর ফারাকটা কোথায়? মারণযজ্ঞের নিষ্ঠুর পুরোহিত সাজার উত্কট মোহ আবার কি তার চেতনাকে ঘুলিয়ে দিচ্ছে না?
অর্ঘ্য দাঁড়িয়েই আছে। কোনটা বাছবে সে? হিংসা না ভালবাসা? ধ্বংস না নির্মাণ? এক অলৌকিক রাত তাকে নতুন স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল, সেই রাতটাকেই অর্ঘ্য মিথ্যে করে দেবে?
অর্ঘ্য হঠাৎ দৌড়োতে শুরু করল। চরের ওপার পানে নয়, উলটো মুখে। পাড়ে পৌঁছে হাঁপাচ্ছে। মাঝি আর ঘাটে নেই, তাকে পৌঁছে দিয়ে চলে যাচ্ছে আলাইপুর।
অর্ঘ্য প্রাণপণে চেঁচাল, “অ্যাই, শুনছ? শুনছ...?”
নৌকা প্রায় নাঝনদীতে, তবু বুঝি মাঝির কানে গেছে ডাক। লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে পাটাতনে। দু’হাত তুলে জানতে চাইছে কেন এই আহ্বান।
চিৎকার করতে গিয়ে অর্ঘ্যর গলা প্রায় চিরে গেল, “আমি ফিরতে চাই, মাঝি। আমি ফিরতে চাই।”
অর্ঘ্যর আর্তি ছড়িয়ে গেল চরাচরে। ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে দুলছে। জলকে ছুঁয়ে মিশে যাচ্ছে প্রথম আষাঢ়ের মেদুর বাতাসে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন