অমিত ভট্টাচার্য
শিরোনাম দেখেই বিষয়ের গভীরতা ও ব্যাপ্তি লক্ষণীয়। বিস্তৃত ভাবনাকে পরিহার করে শাস্ত্রকারদের পরামর্শ অনুসারে কেবলমাত্র দিকনির্ণয়ের পন্থা অনুসৃত হয়েছে:
পুরঃস্থিতে প্রমেয়াব্ধৌ গ্রন্থবিস্তরভীরুভি:।
বিস্তারং সম্পরিত্যজ্য দিঙমাত্রমুপদশ্যাতাম।।
আলোচনার প্রাকমুহূর্তে দুজন মনীষী যাঁরা আমাদের গর্বিত করেছেন তাঁদের মিথসম্পৃক্ত ভাবনার উল্লেখ করা জরুরি বলে আমি মনে করি। এঁদের প্রথমজন হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং দ্বিতীয়জন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। বঙ্কিম তাঁর ‘বিজ্ঞানরহস্য’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদিগের কথা স্বতন্ত্র, তাঁহারা সচরাচর এপাড়া-ওপাড়ার ন্যায় স্বর্গলোকে বেড়াইতে যাইতেন, কথায় কথায় সমুদ্রকে গন্ডূষ করিয়া ফেলিতেন’। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে মিথকথাকে সহজে বুঝিয়েছেন তাঁর ‘পাঁচ ছেলের গল্প’তে—‘আমি আজ একটি গল্প বলিব। সেই-সেই পুরানো গল্প। ঠানদিদিদের কাছে শোনা গল্প, তাঁরা শুনেছিলেন তাদের ঠানদিদিদের কাছে, তাঁরা তাদের ঠানদিদিদের কাছে, তাঁরা তাদের। এইরকম করে গল্প ঠানদিদিতে ঠানদিদিতে চলিয়া আসিতেছিল…এই ঠানদিদিদের গল্প যখন বুদ্ধদেব বলিয়াছেন, তখন হইয়াছে জাতক। যখন মহাযানীরা বলিয়াছেন তখন হইয়াছে অবদান। যখন ব্যাসদেব বলিয়াছেন, তখন হইয়াছে সংবাদ। আবার বিষ্ণুশর্মার মুখে হইয়াছে পঞ্চতন্ত্র। এখনকার পাড়াগাঁয়ের স্ত্রীলোকের কাছে হইয়াছে ব্রতকথা’। শাস্ত্রী মশাইয়ের মতে, সত্যাসত্য নিয়ে অনর্থক মাথা ঘামানোর দরকার নেই। ঐতিহ্যই বড়ো কথা।
বস্তুত লক্ষ করে দেখুন স্বর্গ-নরক, অভিশাপ, সঞ্জীবনীবিদ্যা, মন্ত্রে সন্তানপ্রাপ্তি, স্বপ্নাদেশ, সরস্বতীর বীণাদান, বলিপ্রথা, দেবতার ইচ্ছা প্রভৃতি কতই না আভানক! এসব অতিপ্রাকৃত অলৌকিক জগতে সাহিত্যিক যখন আমাদের নিয়ে যান তখন একবারের জন্যও সেগুলিকে অবাস্তব মনে হয় না। এটিই মিথকথার বৈশিষ্ট্য। ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫। গণেশমূর্তি দুধ পান করছেন এমনই এক রটনায় তোলপাড় গোটা দেশ। ১ ডিসেম্বর, ২০১১। পুকুরের জলে ডোবা সিঁড়িতে একজোড়া পায়ের ছাপ। পুকুরঘাটের বিপরীতেই শীতলার মন্দির। অতএব মা শীতলার পদচিহ্ন নিয়ে ভোর থেকে রাত অবধি হুলুস্থূল বালির ঘোষপাড়ায়। বৃহস্পতিবার ভোরে কয়েকজন মহিলা ওই পুকুরে স্নান করতে গিয়ে প্রথম আবিষ্কার করেন বাঁধানো সিঁড়ির জলে-ডোবা ধাপে একজোড়া সাদা রঙের পায়ের ছাপ। বাতাসের বেগে খবর ছড়িয়ে পড়ে। অলৌকিক কান্ড দেখতে দলে দলে মানুষ ভিড় জমান। বিজ্ঞানীরা কি বলছেন মারো গুলি। পুণ্যির লোভে দৌড় আর দৌড়।
১৯৬৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর, নাগপুরে অনুষ্ঠিত ৪২তম নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিরূপে তারাশঙ্করের ভাষণেও মিথ। মিথময়ং জগৎ সর্বম। তারাশঙ্কর বলেছেন, তিনি বিভ্রান্ত। কেন, তার উত্তরও তিনি দিয়েছেন, মিথকে আশ্রয় করে। উত্তর হল কালধর্ম। কাল হল কলি। সুতরাং কলিকালের ধর্ম। এবার তিনি শ্রীমদভাগবত-এর প্রারম্ভিক উপাখ্যানটি বলতে লাগলেন। রাজা পরীক্ষিৎ তখন ভারতসম্রাট। একবার তিনি মৃগয়ায় বেরিয়ে একটা অনৈতিক কাজ দেখে থমকে দাঁড়ালেন। দেখলেন রাজবেশে সজ্জিত এক শূদ্র একটি মোটা লাঠি দিয়ে গোমিথুনে রত বৃষভটিকে বেদম পেটাচ্ছে। বৃষভটির তিনটি পা ভেঙেছে। অবশিষ্ট যে এক পায়ে ভর দিয়ে বৃষভটি দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনোক্রমে রাজবেশধারী শূদ্র সেই পা-টির উপরেই ক্রমান্বয়ে আঘাত করে চলেছে। উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট, ওই অবশিষ্ট পা-টিকেও ভেঙে সে বৃষভকে বধ করবে। গোমিথুনের জীর্ণা গাভিটি সজল নেত্রে নির্যাতিত বৃষভটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ব্যাসদেবের রচিত রূপকের নায়ক মহারাজ পরীক্ষিৎ বিবিদিষু হয়ে জানলেন, উক্ত রাজবেশধারী শূদ্র হলেন যুগের অধিপতি কলি। গোমিথুনের বৃষভটি হলেন ধর্ম এবং গাভিটি হলেন পৃথিবী। শূদ্রের নিষ্ঠুরতা অসহ্য বিবেচনা করে পরীক্ষিৎ কলিকে হত্যায় উদ্যত হলে কলি করজোড়ে আশ্রয় প্রার্থনা করে। রাজধর্মে নিষ্ঠাবান পরীক্ষিৎ শরণার্থীকে হত্যা না-করে তাকে সাময়িকভাবে স্থান দিয়েছিলেন কয়েকটি অনাচারের ক্ষেত্রে। সেগুলির মধ্যে অন্যতম হল শৌন্ডিকালয়ে মদ্যপানের প্রমত্ততায়, বারনারীর প্রমোদালয়ে, হৃদয়ের নৃশংসতায় এবং তঞ্চকতায়। ধর্মরূপী বৃষভের চারটি পা ছিল যথাক্রমে তপ, শুচিতা, দয়া এবং চতুর্থটি সত্য। আমরা জেনেছি যে, প্রথম তিনটি ভগ্ন এবং চতুর্থটি অর্ধভগ্ন। অর্থাৎ রূপকাশ্রয়ী মিথের অভিপ্রায় হল, ধর্ম কলিকালে অর্ধসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কলিকালটাই নাকি অধর্মের কাল। পাঠককে আখ্যানভাগের উৎসমুখে নিয়ে যাবার জন্য মূল গ্রন্থ উদ্ধৃত করলাম:
তত্র গোমিথুনং রাজা হন্যমানমনাথবৎ।
দন্ডহস্তঞ্চ বৃষলং দদৃশে নৃপলাঞ্ছনম।।
বৃষং মৃণালধবলং মেহন্তমিব বিভ্যতম।
বেপমানং পদৈকেন সীদন্তং শূদ্রতাড়িতম।।
গাঞ্চ ধর্মদুঘাং দীনাং ভৃশং শূদ্রপদাহতাম।
বিবৎসামশ্রুবদনাং ক্ষামাং যবসমিচ্ছতীম।।
পপ্রচ্ছ রথমারূঢ়ঃ কার্তস্বরপরিচ্ছদম।
মেঘগম্ভীরয়া বাচা সমারোপিতকার্মুকঃ।।
… … … … … …
ইতি ধর্মং মহীঞ্চৈব সান্তয়িত্বা মহারথঃ।
নিশাতমাদদে খড়গং কলয়েহধর্মহেতবে।। (শ্রীমদভাগবতম, ১ম স্কন্ধ, সপ্তদশ অধ্যায়)
মিথকথার আলোচনায় একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাদের মনে রাখতে হয় যে, মানুষের সংগ্রাম মানুষের সঙ্গে নয়, এই সংগ্রাম মানুষে প্রকৃতিতে। শ্রীচন্ডীতে দেবীকে প্রকৃতিরূপিণী ভেবেই যেন বলা হয়েছে:
যো মাং জয়তি সংগ্রামে যো মে দর্পং ব্যপোহতি।
যো মে প্রতিবলো লোকে স মে ভর্তা ভবিষ্যতি।।
এই প্রকৃতিকে জয় করতে যত যত দেরি হয়েছে বা হবে তত তত মিথকথা আমাদের অন্তরকে প্লাবিত করবে। দর্শন বিভাগের বিদ্যার্থীরা ‘ভূত নেই’ বলে শূন্যগর্ভ শ্রেণী নিয়ে যতই বিদ্যাচর্চা করুন-না-কেন, কথাকার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ভূতেদের নিয়ে ভূতপুরাণ রচনা করলেন। শাস্ত্রমতে অষ্টাদশ পুরাণ-এর স্থানে উনিশতম পুরাণ জায়গা পেল। ভূতপতি নন্দীর মতে, ‘পুরাণ রচনায় ব্রাহ্মণদের হাতযশ আছে। বেমালুম মিথ্যে কথা সত্যি বলে চালাতে পারে, সুযোগমতো দেবতাদের দোহাই দিতে পারে’। যতীন্দ্রমোহন দত্ত ওরফে যম দত্তের ফরমায়েশে রা. লে. (রাবিশ লেখক) ওরফে তারাশঙ্কর এই পুরাণ লেখায় হাত দেন। স্বয়ং শিবঠাকুরের বডিগার্ড এবং একান্ত সচিব এক কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে ভূতলগ্নে যমদত্তকে গঙ্গার ঘাটে একা পেয়ে ভূতপুরাণ লেখার প্রত্যাদেশ করেন।
আজীবন ছুটে চলা মানুষের যে দুরন্ত গতি তার শেষে গন্তব্য থাকবে না, এ তো হতে পারে না! ঋষিরা বানালেন স্বর্গকথা, নরককথা। পাবলিক খেলেন। ঋষিদের অমৃতনিস্যন্দী লেখনী বহুবিবর্তনের পথশেষে ঘুরে তা একেবারে হালের সাহিত্যেও বর্ণিত। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘নোয়াখালি’ (1947) শীর্ষক প্রবন্ধে গান্ধীজি প্রসঙ্গে বলেছেন ‘যুধিষ্ঠিরের মতন কঠিন শোকাচ্ছন্ন নি:সঙ্গ স্বর্গারোহণ। কোন স্বর্গে? যেখানে সব আলো, সব খোলা, সব সহজ। যেখানে ভয় নেই, বীরত্ব নেই। লোভ নেই, ত্যাগও নেই। ক্রোধ নেই, সংযমও নেই। যেখানে আশ্রয় নেই, তবু নিশ্চয়তা আছে। যেখানে বিফলতা নিশ্চিত, তবু আশা অন্তহীন…স্বর্গকে তিনি পেয়েছেন এতদিনে…সেই স্বর্গ যা মানুষ সৃষ্টি করে একলা তার আপন মনে’। পাঠক লক্ষ করলেন স্বর্গের রূপান্তর।
বুদ্ধদেব বসুর ‘ক্লাইভ ষ্ট্রীটে চাঁদ’ পড়ুন। ‘চাঁদের হাসি’, ‘চাঁদের শান্তি’ পড়তে পড়তে আমাদের মনে হয় না চাঁদের ক্ষমতা। মনে হয়, এই চাঁদ এক পৌরাণিক চরিত্র (বিষ্ণুপুরাণ, ৬। ৪। ৭-১৯)। নারায়ণের নাভিমূল থেকে সৃষ্ট প্রজাপতি ব্রহ্মার পুত্র অত্রি এবং অত্রির পুত্র চন্দ্র। রাজসূয় যজ্ঞ করে সর্বেসর্বা হয়ে দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে অপহরণ করলেন। বৃহস্পতির কাতর অনুনয় এবং সঙ্গে সকল দেবতাদের আবেদন নিষ্ফল হল। বেধে গেল যুদ্ধ। দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হয়ে শেষমেশ তারাকে বৃহস্পতির হাতে তুলে দিলেন। এদিকে বৃহস্পতি দেখলেন, তারা দ্বিহৃদয়া (pregnant)। ভারি বিপত্তি। বৃহস্পতির মিনতিতে গর্ভ পরিত্যক্ত হল। এদিকে সেই পরিত্যক্ত গর্ভ থেকে উৎপাদিত দিব্যকান্তি বিচ্ছুরিত হওয়া শিশুকে বৃহস্পতি ও চন্দ্র উভয়েই দেখছেন। Looked and looked and rubbed their eyes and looked again. দেবতারা জানতে চাইলেন তারার কাছে, সন্তান কার ‘কথয় বৎসে! কস্য অয়ম আত্মজঃ’? চন্দ্রের অথবা বৃহস্পতির? কিছুতেই তারা যখন বলতে চান না, তখন শিশুপুত্রই তারাকে অভিশাপে উদ্যত হল। অবস্থা বেগতিক বুঝে লজ্জাজনিত কন্ঠে তারা জানালেন শিশুপুত্র চন্দ্রের। চন্দ্র পুত্রের প্রাজ্ঞতার জন্য, যেহেতু সে তার মাকে সত্যকথনে বাধ্য করেছিল, তার নাম রাখলেন ‘বুধ’। সেই থেকেই কি প্রাজ্ঞজনেরা ‘বুধমন্ডলী’রূপে সম্বোধিত হলেন। কবির কথায় শুনি ‘ওই তো ছোটো চাঁদ…আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম সে হাসছে আমাদের এই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে…না ভয় নেই; চাঁদ আছে’।
বুদ্ধদেব বসুর ‘দময়ন্তী’—নলের অমর প্রেমকাহিনিকে পার্থিব স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে:
স্বর্গ তোকে চায়, যজ্ঞ তোকে চায়, মৃত্যু তোকে চায়।
কিন্তু যৌবনের জাদু স্বর্গ রচে জন্তুর গুহায়,
… … … … … … …
প্রণাম, প্রণাম,
দেবগণ, ক্ষমা করো, ত্রাণ করো বিপন্নারে
যেন চিনি তারে
সহস্র নলের মধ্যে, এই বর দাও। (দময়ন্তী)
আবার পাঠক চলুন ‘দ্রৌপদীর শাড়ি’ কবিতায়। মহাভারত-এ পাঠক কি পেয়েছেন! যদুনন্দনের অভিপ্রায় পূরণে সহায়শক্তি নিষ্প্রয়োজন ‘বিধীয়তে যদ যদুনন্দনেন নাপেক্ষতে তত্র সহায়শক্তি:’। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু নিজেই বলেছেন—‘অসম্ভব দ্রৌপদীর অন্তহীন শাড়ি। এই রহস্যের উন্মোচন অসম্ভব’। রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে কবি বুদ্ধদেব জানিয়েছেন—‘এখানে মিথ এর প্রতীকায়ন ঘটেছে, মানুষরূপী দুঃশাসন প্রকৃতিকে রিক্ত করতে পারবে না এই ভাবনায়’। অসাধারণ, নম্রং ভবতু মে শিরঃ।
‘শীতরাত্রির প্রার্থনা’ কবিতায় কবি জানিয়েছেন, বারংবার মরতে হয় মানুষকে, নতুন করে জন্ম নেবার জন্য। পূর্বমুহূর্ত মরে পরবর্তী মুহূর্ত আসছে না কি? অথবা জন্মান্তরবাদের প্রতীকায়ন ‘বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন’ (শ্রীমদভগবদগীতা)। কবির নিজের কথায় শুনি, বুদ্ধিমানেরাও পুরাকালে যা বিশ্বাস করতেন, আমি সেগুলিকে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করিনি। বরং সেই বাস্তবাতীত রহস্যের মধ্যেই মর্মকথার সন্ধান করেছি। মহাভারত-ই কাব্যনাট্যের উৎস বুদ্ধদেবের। যেমন কালসন্ধ্যা (১৯৬৯), অনাম্নী অঙ্গনা (১৯৭০), প্রথম পার্থ (১৯৭০), সংক্রান্তি (১৯৭৩)। তবে প্রথম পার্থ থেকে কিছুটা অংশ উদ্ধৃত করতেই হচ্ছে। কর্ণ যে সূর্যের সন্তান, সে-কথা কুন্তীর মুখ থেকে শুনে বললেন:
—কিন্তু কে নয়,
কে নয় সূর্যের সন্তান এই জগতে? যা-কিছু আছে সপ্রাণ
তৃণ, বৃক্ষ, জন্তু, মানুষ—যারা পরস্পরকে আহার করে
বংশপরম্পর বেঁচে থাকে, জন্ম-জন্মান্তরে ঘূর্ণিত হয়—
সূর্য তাদের সকলেরই পিতা, সকলেরই প্রতিপালক।
রবীন্দ্রনাথের কুন্তী কর্ণকে দ্রৌপদীর লোভ দেখাননি। বুদ্ধদেবের কুন্তী তা দেখিয়েছেন। কিন্তু কর্ণের আত্মমর্যাদাবোধের কাছে তিনি পরাস্ত:
যা বিনা চেষ্টায় জন্মসূত্রে প্রাপণীয়,
আমার গ্রাহ্য নয় অনর্জিত কোনো উত্তরাধিকার।
এখন আধুনিক সাহিত্য তো রাতারাতি ঝট করে চলে আসেনি। প্রথাসিদ্ধ পারম্পরিক ঐতিহ্যকে মর্যাদা দিয়ে সেই আভানকগুলি অনেকক্ষেত্রেই আধুনিক সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মেরও অন্যতম উপাদানরূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। তার কারণ পুরা নব চেতি। পুরাতন হয়েও নতুন। তবে লেখকের পরিবেশন দক্ষতায় তার বিবিধ রূপান্তর যে ঘটেছে তা বলাই বাহুল্য। মিথকথা, লোককথা পাঠক পড়েন, শ্রোতা উৎকর্ণ হয়ে শোনেন, আর বলেন, ততঃ কিম, What next?
কবি শঙ্খ ঘোষ ‘কথার পিঠে কথায়’ (পৃ. ২৪৫) বলেছেন, ‘আমাদের ছাত্র বয়সে দর্শনের এক অধ্যাপক একটা গল্প বলতেন ক্লাসে। বলতেন যে, কমিউনিস্ট রাশিয়ায় একটি মেয়েকে নিরীশ্বরবাদের যৌক্তিকতা বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল মৌখিক পরীক্ষায়। সে ভালো বলেছিল। অধ্যাপকরা সে-কথা তাকে জানাতেই সে নাকি বলে উঠেছিল ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ঠিক ঠিক বলেছি’। কিন্তু এসব কথা পুরাতনেরই নবীকরণ।
মীমাংসা দর্শনে দেবতা-অধিকরণে (৯। ১। ৬-১০) বাদরি প্রশ্ন করেছিলেন দেবতা কীভাবে খান? তার সিদ্ধান্ত ‘ন দেবতা ভুঙক্তে। যদি চ ভুঞ্জীত দেবতায়ৈ প্রদত্তং হবি: ক্ষীয়েত। অতো না দেবতা ভুঙক্তে’। এ প্রসঙ্গে পার্থসারথি মিশ্র, খন্ডদেব প্রমুখের মতামত জানলে শ্রোতা উপকৃত হবেন। দিব্যচক্ষু শাস্ত্রে আছে:
ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষু: পশ্য মে যোগমৈশ্বরম।। (শ্রীমদভগবদগীতা)
কিন্তু দিব্যকর্ণের কথা কমলাকান্ত চক্রবর্তী শুনিয়েছেন ‘আফিমপ্রসাদাৎ’ দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়ে তিনি পতঙ্গেরও ভাষা বুঝলেন।
আনন্দ পাবলিশার্স-এর গল্প সংকলনে দৃষ্টি দিলে পাঠক মিথকথা ও লোককথার পারম্পরিক ঐতিহ্য যে ক্রমপ্রবহমান সেই বিষয়ে নি:সন্দিগ্ধ হন। এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষের বিশ্বাস বাচ্চাকাচ্চা ঈশ্বরের দান। ভরসন্ধেয় ঘর অন্ধকার করে রাখতে নেই, সংসারের অকল্যাণ হয়। সন্ধেবেলায় বসুন্ধরাকে আলো দেখাতে হয়। আশ্রয় দেন যিনি তিনিই বসুন্ধরা। আড়াই বছরের ছোট্ট বাচ্চার দাপাদাপিতে শাশুড়ি অতিষ্ট হলে শ্বশুর মনে করিয়ে দেন ‘শিশু নারায়ণ বুঝলে। ওদের কোনও পাপ লাগে না’। আবার কোনো মা যখন ফোনে মেয়েকে মনে করিয়ে দেন ‘ভগবান যা করেন সব মঙ্গলের জন্যই শ্রুতি, একথা কখনও ভুলিস না’—তখন কি মনে হয় না কর্ম মূল্যহীন হয়ে পড়ল!
জীবন ও মৃত্যু, দুটোই একসময় ছিল ভগবানের একচেটিয়া ব্যবসা। আজও প্রায় তাই আছে। তবু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষও একটু-আধটু নাক গলাচ্ছে আজকাল। কিন্তু কপালের দোহাই মানুষ ছাড়তে পারে না। এ তার মজ্জাগত। বাইক অ্যাক্সিডেন্ট সত্ত্বেও বিনয়ের পা যে কেটে বাদ দিতে হয়নি, তার জন্য বিনয়ের কপালের গুণ এবং বাপ-মায়ের পুণ্যের জোরকেই সে মূল্য দেয়। গ্লুকোমায় আক্রান্ত হয়ে অন্ধ সমরেশ সমাদ্দার ছেলের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলেন, বহুজন্মের পুণ্যের ফলেই তার ছেলে বিনয় অমানুষ হয়নি। শুধু তাই নয়, সমরেশবাবুর বিশ্বাস বিনয়ের পুণ্যের জোরেই হয়তো পরের জন্মে সবল দৃষ্টিশক্তি নিয়ে তিনি ওর সন্তান হয়ে জন্মাবেন।
গরিব মনসারামের ছাগী যখন বছরে দু-বার বাচ্চা দেয় তখন তার মনে হয় ‘ছাগীটা খুব লক্ষ্মী’। গ্রামে যুধিষ্ঠির বাদ্যকারকে পাঠক পেয়েছেন যে পাঁচ পুরুষ ধরে পোয়াতি ধানগাছকে বাজনা শুনিয়ে আসছে সারা ভাদ্র মাস। কবের থেকে এই প্রথার প্রচলন মনসারামও জানে না। তবে সে লোকপরম্পরায় শুনেছে, কোনো এক রাজা নতুন ধানের বীজ আনিয়ে প্রতি পরগনায় নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন, ধানগাছ গর্ভবতী হলে ঢাকের বাজনা শোনাতে হবে। সেই থেকে গোয়ালপুজো, মনসাপুজোর মতন সারা ভাদ্র মাস ধরে পোয়াতি ধানগাছের ভেতর দিয়ে বাজনা বাজিয়ে যেতে হয়। ঢাকের কাঠির নরম সুরেলা বোল ছড়িয়ে পড়ে ধানগাছের পরতে পরতে। আনন্দে উদবেলিত গর্ভিণীরা। গর্ভিণী থোড়ের নরম ধানের খোলায় সঞ্চয় করছে আনন্দ, উচ্ছ্বাস, সহমর্মিতা এবং এই অনাবিল আনন্দই চারিয়ে দেবে দুধের ভেতর। এখন এই যে পোয়াতি ধানগাছকে বাজনা শোনানো—এভাবনার উৎস কোথায়! উৎস সেই সংস্কৃতভাষায় লেখা স্মৃতিগ্রন্থে, যেখানে সীমন্তোন্নয়ন সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের স্মৃতিকারেরা জানিয়েছিলেন গর্ভবতী মায়েদের কেন আনন্দে রাখতে হয়। এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানও এই প্রসঙ্গে সহমত পোষণ করে থাকে। গল্পকারও বলেছেন ‘পোয়াতি নারীকে সৎ ভাবনা-চিন্তা, সৎ আলোচনার মধ্যে রাখতে হয়। তাতে গর্ভস্থ সন্তানের উপকার হয়। ধানগাছের মধ্যেও একই ব্যাপার…আমরা ঢাক বাজিয়ে বাজিয়ে পোয়াতি ধানগাছের দেহে আনন্দের তরঙ্গ ঢুকিয়ে দিই’। ধানগাছকে আনন্দে না-রাখলে কী হয় তাও বলা হয়েছে ‘সমাজ পরিবেশের হাওয়ার মধ্যে ঘুরছে লোভ, ক্রোধ, হিংসা আর স্বার্থপরতা। চাষিদের মধ্যেও থাকে সেসব। ধান গাছ সেই বাড়ন্ত দেহে অপগুণগুলি ঢুকিয়ে নিলেই বিপত্তি। অপগুণের কাটান হয় ঢাক বাজিয়ে। বাজনার মাধ্যমে আনন্দতরঙ্গ সৃষ্টি হলে সেই তরঙ্গ গাছের মধ্যে ঢুকে অপগুণকে শুদ্ধ করে। না-হলে অশুদ্ধ চাল খেয়ে মানুষ আরও ক্রোধী, লোভী, স্বার্থপর হয়ে যেত। মানবসমাজ অধিকতর লন্ডভন্ড হয়ে যেত।

অপর একটি গল্পে পাই ডাইনি অপবাদের বীভৎস পরিণাম। বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে সাতকুলে কেউ নেই এমন এক বুড়ি ডাইনি চিহ্নিত হয়েছেন কীভাবে তা গল্পকার শুনিয়েছেন। বিদিশাকে দীপকবাবু বলেন কুসংস্কার ম্যাডাম। গ্রামের এক প্রান্তে যে প্রাচীন অশ্বত্থগাছ আছে লোকে সেখানে পুজো দেয়। সাতকুলে কেউ নেই এমন এক বুড়ি সেই অশ্বত্থগাছের কাছেই থাকে। বুড়ি গতকাল গাছের ঝুরিতে গিট বেঁধে কাপড় শুকোতে দিয়েছিল। তার খানিক পরেই ওই গাছে একটা বাজ পড়লে গ্রামের এক জোয়ান ছেলে মারা যায়। এর ওপর বাজ পড়ার দিনটি ছিল শনিবারের অমাবস্যা। এর আগে তিনটে অমাবস্যায় তিনজন মারা যাওয়ায় বুড়িই এখন ডাইনিরূপে চিহ্নিত। গ্রামের লোকেদের সংলাপ অন্ধকারে নিয়ে যায়। একজন বলে সাতপুরুষের অসসথো গাছ, কুনো দিন বাজ পড়েক নাই…অন্যজন বলে—ও বেধবার ঘরে লাল কানি কী কাজে ছিল…আরেকজন বলে, ও বুড়ির ছায়া পড়ে না—ডাইনি নিশ্চই বটে। অন্যেরা বলে—মাঘ ফাগুনে বাজ পড়ে…কেউ শুনে নাই। গ্রামের শঙ্কর বাগডি গ্রামের সকলকে বলে আমাদের বাপঠাকুরদার সাত কুড়ি বয়সের এই অসসথো গাছ বাজ পড়ে অশুচি হইছে, ক্যানে হইছে তুরা সবাই জানিস। কিন্তু রক্ষে মা মুখ তুইলা চেইছেন। শহরের ভুটবাবু এইছেন আজ। বাবু উঁচু জাতের বামুন বটে। বারোটায় কালযোগ কেইটে গেলে বাবু এইখানে আইবেন। বাবু এই অসসথোর গুড়া সেইমেনট মাটিতে পাকা বেঁইধা দিবেন। আজ বাবু গেরামের মঙ্গলের জন্য পাঁচ কুড়ি দু-গন্ডা মাটির পিদিম জেইল্যা মা অসসথোর কাছে খেমা চাইবেন। বাবু বুড়ির বিচারের সময় থাকবেন। তুরা বাবুকে ভুটের দিন সুবিচার দিবি। ভুটপ্রার্থী শিশির চৌধুরী তো এসেই ইউ উইচ বলে বুড়ির দিকে তেড়ে যায়। এদিকে শিশির চৌধুরীর ছিল পুরোনো সুগারের রোগ। ইনসুলিন নিয়ে কিছু খাবে না, ফলে যখন-তখন সুগারফল। সেমুহূর্তেই কাকতালীয়ভাবে শিশিরবাবু সংবিৎ হারিয়ে মাটিতে পড়তেই বাণ মেরেছে, বাণ মেরেছে বলে চিৎকার শুরু করে দিল সকলে। ওদিকে শঙ্কর বাগডি বলে ওঠে ‘গেরামের মঙ্গল করতে যে আসবে ই মাগি তারে শেষ করবেক। মার শালা ডাইনি মাগিকে’।
নিরুদ্দেশ স্বামীর স্ত্রী সোহিনী স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত না-হয়ে হাত ও কপাল থেকে শাখাসিঁদুর খোলেন বা তোলেন কী করে! কিন্তু ইদানীং তার প্রায়ই মনে হয় সে পাতালগঙ্গায়। পাতালগঙ্গা নেই। কিন্তু যেখানে কেবল ‘কটাক্ষের বিস্তার’ তাকেই পাতালগঙ্গা বোঝানো হয়েছে। এমনকি মজুমদার কাকার হাত দিয়ে নিজের শ্বশুরমশাই নিরুদ্দিষ্ট ছেলের বউমার জন্য মাদুলি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। পূর্ণিমা তিথিতে কৃষ্ণগাইয়ের দুধে ভিজিয়ে সেটি কোমরে ধারণ করলে নাকি সুফল অবশ্যম্ভাবী। মজুমদারকাকার মতে, এই নাকি ফাটা কপাল জোড়া দেবার প্রকৃত ব্যবস্থা। প্রসঙ্গত তিনি এও জানিয়ে দেন যে, ই-ব্লকের দোলা সাহার কপালদোষ মাদুলিতেই খন্ডন হয়েছে।
এসব কাহিনিগুলি থেকে পাঠক উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, মানুষের পূর্বপরিকল্পিত ধারণার ওপর বিশ্বাসের ভিতটা গড়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলে একটা প্রবচন আছে ‘মদন মারবে ভালুক’। সেই কোনকালে মদন নামধারী কেউ ভালুক মারতে গিয়ে কী একটা কেলো করেছিল, সেইথেকে নামটারই বিশ্বাসযোগ্যতা চলে গেছে।
২০০৬-এর ১৭ আগস্ট গল্পে দেখি, অধ্যাপিকা দময়ন্তী রোজই নর্মদাতীরে হাঁটতে হাঁটতে দেখেন অল্পবয়সি একটি মেয়ে বড়ো একখন্ড পাথরের ওপরে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নর্মদার দিকে অনেকটা ধ্যানের ভঙ্গিতে। ওর সিঁথিতে সিঁদুর, চোখে জল। বসে থাকার কারণ জিজ্ঞাসিত হলে সে অধ্যাপিকা দময়ন্তীকে জানায় সন্তান নেই বলে ওর বর-শাশুড়ি ওকে প্রায়ই গঞ্জনা দেয়। এমনকি ভালো করে খেতেও দেয় না। ওর বিশ্বাস মা নর্মদা তো সকলের মনের কথা শোনেন। এজন্য প্রতিদিন সেখানে বসে মা নর্মদার কাছে সে একটি সন্তান কামনা করে।
মহাশ্বেতা দেবীর ‘মানত’ গল্পটিতে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সমাজের অন্ধভক্তি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতা প্রতিফলিত। বস্তিবাসী ঝি-গিরিকরা অনুর মায়ের হতভাগ্য জীবনের ছবি এখানে অঙ্কিত। অনুর কালো পায়খানা হওয়াতে প্রতিবেশী সদামণি অনুর মাকে মা-শীতলার পুজো দিতে বলে, মানত করতে বলে। এদিকে পুজো দিতে হলেও ছোনেকে (এজেন্ট বা দালাল) ধরতে হয়। বাঙুর হাসপাতালে ফ্রি বেডে অনুকে ভর্তিও করেছে আবার ছোনেকে ধরে সে শীতলামায়ের কাছেও যায়। ছোনের ধরানো ফর্দ জোগাড় করা অনুর মা-র পক্ষে অসম্ভব। তবু মানত তো সে ছেলের জন্য করেইছিল। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে অনু একদিন পঞ্চত্বং প্রাপ্তবান। এদিকে অনুর মা ছেলের মৃত্যু সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে শীতলামন্দিরে গিয়ে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালমন্দ শুরু করে দেয়। ভাষার নমুনা: ‘রাক্ষসী! পিশাচী! এই তোমার ক্ষমতা? ভিক্ষেটিক্ষে করে টাকা আনলাম, হত্যে দিলাম, তুমি এই করলে…মরো তুমি মরো, তোমার মন্দির নিপাত যাক, ঘটনায় মন্দিরের প্রাঙ্গণে উপস্থিত জনতা হতচকিত’। সদামণি, যার কথায় অনুর মা হত্যে দিয়েছিল এবং এজেন্ট শয়তান ছোনে কেউ তাকে থামাতে পারেনি। অনুর মা-র আচরণে দেবী শীতলা যেন ‘শাপেনাস্তং গতবতী’। সেবায়েত মন্দিরের দরজা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দেয়। মন্দিরের এককোণে বসে ছোনে কপাল মোছে। ছোনে ভাবে, ঠাকুর-দেবতা যে এমনভাবে ফাঁসাবে তা সে কখনও ভাবেনি। অপর এক আধুনিক সাহিত্যিক এর উত্তর দিয়েছেন ‘দেবতাদের কাছে মাথা খুঁড়লেও বিপদকালে তাঁরা উত্তর দেন না। ওঁদের মানসিকতাটাই আমাদের মিনিস্টাররা নিয়েছেন’।
অপর এক কাহিনিকার আমাদের জানিয়েছেন, দেবাশিস-সায়ন্তনী পেস্তা সবুজ রঙের দক্ষিণমুখী একতলা বাড়ি বানিয়ে গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠান না-করেই থাকতে আরম্ভ করেছিল। দেবাশিসের দুই দাদার বাড়ি থাকলেও তার নিজের কোনো বাড়ি না-থাকায় সে হীনমন্যতায় ভুগত। কাল বাদ পরশু গৃহপ্রবেশ হবে বলে ওদেরও মন জুড়ে খুশিখুশি ভাব। কিন্তু মায়ের তুলসীমঞ্চের ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়েই যত বিপত্তি শুরু হল। মিস্ত্রিরা তুলসীমঞ্চ বানানোর জন্য মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে এল একটি বড়ো হাড়। শুভকাজের শুরুতেই এরকম অঘটন। বড়দা সুনির্মল জানিয়ে দেয়, বাড়িটি কবরস্থানের উপরে হলে চিন্তার বিষয় বৈ কি! অশুভ আত্মা যে আছে তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। বড়ো বউদি তপতীর কথায়, পরিশ্রমের টাকায়ও অমঙ্গলের চিহ্ন। মেজদা সুব্রতও হাড়ের ব্যাপারটাকে দুর্লক্ষণ বলেই সায় দিলেন এবং ভবিষ্যতে যে অশুভ শক্তি সর্বদা এই বাড়িটির উপর ছায়া রাখবে তাও প্রকারান্তরে জানালেন। সীমাহীন উদবেগে প্রত্যেকে যখন তথাকথিত শিক্ষিতজনেরা এঘর-ওঘর করছেন তখন মাঠেঘাটে কাজ করা খেটেখাওয়া এক মানুষ হাড়টিকে পরখ করে স্বস্তির বাতাস বয়ে আনে। সেই জানিয়ে দেয় যে, বাড়িটির সামান্য দূরেই ছিল ভাগাড় যেখানে গোরু মরলে ফেলা হত। এটা গোরুর হাড় ভিন্ন অন্য কিছু নয় এবং গোরুর পাঁজরের হাড়। গোরু গিরস্তের মঙ্গল করে অতএব আতঙ্কের কিছু নেই। জমি খুঁড়ে বেরিয়ে আসা একটা হাড়ের টুকরো দেবাশিসের দাদাবউদি নির্বিশেষে সকলের অন্তরে কী উথালপাথাল ঘটিয়েছিল তার নমুনা এখানে স্পষ্ট।
হাতুড়ে ডাক্তার বুয়ান মুখুজ্জে নামে এক বামুন যাকে আটপটি গাঁয়ের দুলে মেটে বাগদি বাউরিরা ভগবান বলে মান্যি করে সে তার পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতায় জেনেছে, পাড়াগাঁয়ের গরিব মানুষের রোগ অর্ধেক সেরে যায় বিশ্বাসে। মা কালীর দয়ায় তাকে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধুঁধুল চুষতে হয়নি। একদিন গাঁয়ে কলে যাবার সময় আলের পথে সে কালো খরিশ এর সামনে পড়ে। তাগা, রোজা-গুণিনে বা মন্ত্রে যে বিষ নামে না বুয়ান ডাক্তার হাতুড়ে হলেও তা জানে। বুয়ানের মুখে সব বৃত্তান্ত জেনে তার বউ বলে ওঠে ‘মা বিষহরি রক্কে করেচেন। সামনের মঙ্গলবার কালীমাড়ায় মায়ের নামে ষোলো আনা দিয়ে এসবি তো ঝুমি’।
সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘আমি রাইকিশোরী’ উপন্যাসে পাঠক পেয়ে যান বিয়ে-ভাঙা রাইকে—যে মেয়েদের হোস্টেলে থাকে। ক্রিশ্চিন জানতে চেয়েছিল রাই নামের অর্থ। উত্তরে বলা হয়েছিল ‘রাধা’। রাধা আমাদের ধর্মীয় নায়িকা। তার বড়ো দুঃখ ছিল। কৃষ্ণ নামের এক ভগবানের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। হোস্টেলের অপর বোর্ডার—যার নাম ডোমা সে সগর্বে জানিয়ে দেয় ‘আই নো সামথিং অ্যাবাউট ইওর লর্ড কৃষ্ণা। হি ওয়াজ এ গ্রেট ফ্লার্ট’। কৃষ্ণের হাজার এক প্রেমিকা। তবে রাধা বেচারি তাকে ভালোবাসত সব থেকে বেশি। শি ওয়াজ ম্যাড আফটার হিম। কথোপকথন থেকে জানা যায়, রাধাকে ফেলে কৃষ্ণ একদিন রাজা হওয়ার জন্য মথুরা চলে গেল। অ্যাণ্ড হি নেভার কেম ব্যাক। পাঠক জানতে পারেন রাধা কেঁদে কেঁদেই কাটাল জীবনটা। তবে কৃষ্ণনগরে বড়ো হয়ে ওঠা কলকাতায় চাকুরিরতা রাই নিজেই জানিয়েছে যে, সে রাই, শুধুই রাই…রাইকিশোরী। নামটা শুনেই যেন কেউ না-ভাবতে বসেন রাইকিশোরী অপরূপ সুন্দরী, বৃন্দাবনের সেই কৃষ্ণের প্রেমিকাটির মতন। তবে লক্ষণীয় হল, এখানে রাধার বিরহের মতন রাইয়েরও জীবন প্রাণরসের অভাবে শুকিয়ে কালো।
মিথিক চরিত্রের পাশাপাশি লোকসংস্কারও উঠে এসেছে হোস্টেলবাসিনী মঞ্জুদির জীবনে। লেখিকা জানিয়েছেন, মঞ্জুদির এখন সারাদিনের কাজ সকালে পুজো, দুপুরে পুজো, সন্ধেয় পুজো। শনিবার মোড়ের শনিতলায় হত্যে দিতে যায়। স্বামীর মন ফেরাতে বিয়ের পর থেকে মঞ্জুদি চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। শেকড়বাকড়, তাবিজ-কবজ মঞ্জুদির হাতে বুকে ভর্তি। কিন্তু তবুও স্বামীর চরিত্রদোষ সংশোধন তো হলই না, উপরন্তু এক বস্তির মেয়েকে সে ঘরে তোলে। বাবার অর্থের জোরে আজ মঞ্জুদির ঠাঁই হোস্টেলে। এখনও সে চওড়া করে সিঁদুর পরে। হাতে গুচ্ছের শাঁখা, লোহা। পুজোর ফাঁকের সময়গুলো মঞ্জুদির কাটে শুচিবায়ুতায়। কোনও কিছু কাউকে ছুঁতে দেয় না। সমাজকে সচেতন করবার অভিপ্রায়ে লেখিকা রাইয়ের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন ‘কী আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? হ্যাঁ, ইনি এই শতাব্দীরই মহিলা। ভালো করে তাকালে আপনাদের আশেপাশেও এরকম মহিলা পেয়ে যাবেন। এরা সব একঝাঁক বিষাক্ত বিশ্বাসের শিকার’। উক্ত সব বিশ্বাসগুলো যে বিষাক্ত তাকে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য লেখিকার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
দেবীডাঙার সুবল সরকারের ভেতর বাড়ির পুকুরের একেবারে মধ্যিখানে একটা নাকি বিশাল কুয়ো রয়েছে। সে কুয়ো যে কোথায় গিয়ে মাটি ধরেছে, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। আর সেই গভীর সুড়ঙ্গে ঘর পেতেছে এক প্রাচীন কাতলা। দৈবাৎ সে ওপরে ওঠে। তার নাকে নোলক। দু-একজন নাকি তার কপালে সিঁদুরের ফোটাও দেখেছে। এমনকী সে যখন পূর্ণিমার রাতে ওপরে এসে জোছনামাখা এই পৃথিবীকে দেখে, তখন নাকি কোথাও কাঁসরঘণ্টা বেজে ওঠে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ধূপধুনোর গন্ধ, ফুলের গন্ধে চতুর্দিক ম ম করে। শাঁখ বেজে ওঠে। সেই মাছ যদি লীলাচ্ছলে পুকুরের জলে একবার লেজের ঘাই মারে, তবে পুকুরের সব জল এক লপ্তে ডাঙায় ছিটকে উঠে বানভাসি করে দেবে দেবীডাঙার সমস্ত ঘরবাড়ি। মাঝপুকুরের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করাটাই প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুবল নিজে কোনোদিন মৎস্যপ্রতিমা স্বচক্ষে না-দেখলেও এই গল্প যে আকাশপ্রদীপের মতোই তার পুকুরকে উচ্চতা দিয়েছে, তাকে মান্যতা দিয়েছে সে অকপটে তা স্বীকার করে। লোকশ্রুতির মোহনকথায় কোন মানুষ না মুগ্ধ হয়!
তবে উপসংহারে বলি, শিল্পিত মুন্সীয়ানাই মিথকথা ও লোককথার পাথারে তরঙ্গ তুলতে পারে। যন্ত্রণারূঢ় কঠিন বাস্তবের প্রেক্ষাপটে প্রতিদিনের জীবনচর্যায় নির্দিষ্ট বৃত্তরেখার বাইরে সারটুকু গ্রহণ করে এদের সরিয়ে রাখতে পারাটাই শিক্ষাবিস্তারের সার্থকতা। প্রকৃত শিক্ষার প্রতি অনন্যমনা হলেই মিথকথা ও লোককথা উপভোগ্য হয়ে নির্মল, নির্লিপ্ত পবিত্র জীবনের অধিকারী করে থাকে। নতুবা ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’ কথার কথায় পর্যবসিত হয়।
তথ্যসূত্র:
অজড়
শেখর মুখোপাধ্যায়
আমি রাইকিশোরী
সুচিত্রা ভট্টাচার্য
খেজুরকাঁটা
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়
গল্পের খোঁজে
তৃষিত বর্মন
জননী
পাপিয়া ভট্টাচার্য
জাগরকাঠি
সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়
ঢেউ বদলে যায়
মৃদুলকান্তি দে
তারাশঙ্কর রচনাবলি
মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.
তিন ভুবনের কথা
শংকর
দুই দশকের দেশ (১৯৮৩-২০০৩)
আনন্দ
দেশ এর গল্প (২০০৫-২০০৭)
আনন্দ
দেবতার মুখ
শরদিন্দু কর
প্রবন্ধ সংকলন
বুদ্ধদেব বসু
বীজ
বিপুল দাস
বুদ্ধদেব বসু: বৈচিত্র্যের নানা মাত্রা
সম্পাদনা ধ্রুবকুমার মুখোপাধ্যায় ও ঋষি ঘোষ
বুয়ান ডাক্তার ও একটি আল কেউটে
ইন্দ্রাণী লস্কর
মানত
মহাশ্বেতা দেবী
শ্রীমদভাগবত
সম্পাদনা ধনঞ্জয় দাস তর্কব্যাকরণতীর্থ
শ্রীময়ী
জয়ন্ত দে
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন