অমিত ভট্টাচার্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ফাইনাল বেল পড়তে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলে দিলাম খাতা জমা দেবার জন্য চরম প্রস্তুতি নিতে। সতর্কীকরণের কাজ শেষ হতেই দেখি বেশ কয়েকজন তাদের জ্যামিতি বক্সের থেকে কেউ বা জবা, কেউ বা বেলপাতা বা তুলসীপাতা বের করে পরীক্ষাপত্রের সবটুকুতে বুলিয়ে নিচ্ছে। ধারণা হল, ওই ফুল বা পাতার কোনো এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, যা কিনা পরীক্ষককে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবে অথবা খাতায় কোনো ভুলত্রুটি থাকলেও যার ফলে পরীক্ষকের চোখ এড়িয়ে যাবে অথবা আরও কতই না কল্পনা। এই ক্রিয়ার নেপথ্যে বিশেষ বিশেষ মন্ত্রপূত দ্রব্যের স্পর্শমূলক জাদু সম্পর্কিত ধারণা কার্যকারী হয়েছে।
ক্রান্তদর্শী কবি যখন সচেতনভাবে তার কাব্যে অতিলৌকিক জাদুশক্তির ঘটনা আনেন তখন কিন্তু পাঠক বাস্তবের মাটিতে থেকেও তাকে অবিশ্বাস করতে পারেন না ‘Shadows of imagination that willing suspension of disbelief for the moment, which constitutes poetic faith.’ ইন্দ্রজাল বা জাদু সমগ্র অথর্ববেদ সংহিতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এগুলির লক্ষ্য ও প্রকরণ বহুধা। আমরা জানি যে, অতিলৌকিক শক্তিযুক্ত মন্ত্রপূত শব্দোচ্চারণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই হল জাদু বা ইন্দ্রজালের উদ্দেশ্য। অথর্ববেদ-এর যে ভাগ ঐন্দ্রজালিক ও আভিচারিক ক্রিয়াবর্গ নিয়ে গঠিত সেই ভাগ ‘অঙ্গিরস’ নামে পরিচিত। কৌশিক সূত্রে (১৩৫.১) আঙ্গিরস বৃহস্পতিকে জাদুবিদ্যার দেবতারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। জাদুবিদ্যা বা মায়াপ্রভাবে কেবল শত্রুদের ধ্বংস সাধনই নয়, তাদের সম্পাদিত অভিচারক্রিয়া থেকে রেহাই পাবার উপায়ও রয়েছে। কোনো সূক্তে ‘বরুণ’ নামক মণির প্রতাপ, বীর্য, শত্রুক্ষয়ের সামর্থ্য, মণি-ধারকের সবরকম দুঃখের সমাপ্তি প্রভৃতি বর্ণিত হয়েছে—যথা দেবেষ্বমৃতং যথৈষু সত্যমাহিতম/এবা মে বরণো মণি: কির্ত্তিং ভূতিং নিযচ্ছতু তেজসা / মা সমুক্ষতু যশসা সমনক্তু মা।। (অ.স. ১০। ২। ১। ২৫)। কোথাও বা ‘জঙ্গিড়’ মণিকে উদ্দেশ্য করে করুণ আর্তি ঘোষিত ‘স নো রক্ষতু জঙ্গিড়ো ধনপালো ধনেব’। শোনা যায়, অঙ্গিরা প্রমুখ ঋষিরা দেবরাজ ইন্দ্রের নাম উচ্চারণ করে, সেটিকে অতিশয় শক্তিশালী করে রক্ষাকামী পুরুষদের দিয়েছিলেন। সেজন্য এখনও রক্ষাবন্ধনকালে ইন্দ্রের নাম করে জঙ্গিড় মণি বন্ধন করতে হয়। জঙ্গিড় একজাতীয় বৃক্ষ-নির্মিত মণি বিশেষ ‘জঙ্গম্যতে শত্রূন বাধিতুম ইতি জঙ্গিড়ঃ’। এই মণি আভিচারিক কর্মের বিনাশক, সবরকম ভয়ের ত্রাতা, অন্যের উৎপাদিত কৃত্যার ধ্বংসকারী। সংক্ষেপে ‘সর্বং রক্ষতু জঙ্গিড়ঃ’। এরকম ‘দর্ভমণি’ ‘উদুম্বর-নির্মিত-মণি’ অভিমত ফলদায়কের ভূমিকায় প্রশংসিত হয়েছে বারংবার।
মায়াবিদ্যার চর্চায় পেয়েছি মায়াবী স্থলভূমি ও জলভূমিকে বিপরীতে পরিণত করবার ক্ষমতা রাখেন ‘মায়াং স্থলজলাদৌ জলস্থলাদিজ্ঞানং করোতীতি মায়াকারঃ’ (শ.ক.)। মায়াকে আশ্রয় করে যারা জীবিকানির্বাহ করেন তারা মায়াজীবী বা বাজিকর। মায়াকর্মকে ‘ভোজবাজি’ ‘ভেলকি’ প্রভৃতি লোকশব্দেও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। হেমচন্দ্রের মতে, যুদ্ধে প্রাচীনযুগে রাজারা মায়ার আশ্রয় নিলেও এটি প্রশংসিত নয় ‘যুদ্ধে ক্ষুদ্রোপায়বিশেষঃ’।
মারীচের সুবর্ণময় মৃগরূপ ধারণ মায়াবিদ্যার আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খর, দূষণ, ত্রিশিরার হত্যায় এবং সর্বোপরি শূর্পণখার নাক-কান কাটা যাওয়ায় সক্রোধে দশানন মারীচকে মায়াবলে স্বর্ণমৃগ রূপ ধারণ করে সীতাকে প্রলুব্ধ করতে বলেন। সীতাকে আকৃষ্ট করতে মারীচও রজতবর্ণ রোমযুক্ত মণিচিত্রিত দেহ নিয়ে রামের আশ্রমের আশেপাশে বিচরণ করতে লাগলেন:
প্রলোভনার্থং বৈদেহ্যা নানাধাতুবিচিত্রিতম।
বিচরন গচ্ছতে সম্যক শাদ্বলানি সমন্ততঃ।। (রা. অরণ্যকান্ড, ৪২। ২১)
এদিকে সীতাও অদ্ভুত চিত্রাঙ্গবিশিষ্ট মৃগের পাগলকরা রূপ দেখে দেবর লক্ষ্মণ ও রামচন্দ্রকে বললেন ‘হৃদয়ং হরতীব মে’। জীবিত বা মৃত একে আমার চাই-ই চাই। জীবিত ধরে আনলে বনবাসের মেয়াদ ফুরোলে অন্তঃপুরের শোভা বর্ধন করবে এই মৃগ। সকলের অর্থাৎ শ্বশুর, শাশুড়ি ও ভরতেরও বিস্ময়ের কারণ হবে। পক্ষান্তরে মৃত আনতে পারলেও একটি নয়নাভিরাম অজিন (মৃগচর্ম) তো পাওয়া যাবে—যে স্বর্ণময় চর্মের ওপর রামচন্দ্র উপবেশন করলে তিনিও সেখানে রামচন্দ্রের পাশে উপবিষ্ট হতে পারবেন। মায়ামৃগটি ছিল তরুণ সূর্যের মতো বর্ণবিশিষ্ট। তার শৃঙ্গ ছিল মণিময়, রোম ছিল স্বর্ণময় এবং দীপ্তি ছিল নক্ষত্রপুঞ্জের ন্যায় (রা. অরণ্যকান্ড, ৪৩। ২২-২৪)। স্বর্ণমৃগটি যে-কোনো মায়াবী রাক্ষস লক্ষ্মণ তা ধরে ফেলেছিলেন এবং রামচন্দ্রকে বলেছিলেন মায়াবী রাক্ষসই মায়ার দ্বারা এরকম গন্ধর্বনগরতুল্য রমণীয় উজ্জ্বল রূপ ধারণ করেছে। পৃথিবীতে এরকম রত্নচিত্রিত মৃগ অসম্ভব। এ নিশ্চিতভাবে মায়ারই খেলা:
অস্য মায়াবিদো মায়ামৃগরূপমিদং কৃতম।
ভানুমৎ পরুষব্যাঘ্র গন্ধর্বপুরসন্নিভম।।
মৃগো হ্যেবংবিধো রত্নবিচিত্রো নাস্তি রাঘব।
জগত্যাং জগতীনাথ মায়ৈষা হি ন সংশয়ঃ।। (রা. অরণ্যকান্ড, ৪৩। ৭-৮)
লক্ষ্মণ শেষরক্ষা করতে পারেননি। আমরা সবাই জানি, রামচন্দ্র মায়ামৃগটিকে জীবিত অথবা মৃত আনবার জন্য প্রস্থান করেছিলেন ‘অহমেনং বধিষ্যামি গ্রহীষ্যাম্যথবা মৃগম’। দিব্য ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগে মারীচ নিহত হয়েছিল এবং লক্ষ্মণ কথিত মারীচ-রাক্ষসের মায়ার কার্য সত্যরূপে প্রমাণিত হয়ে মহাকাব্যের গতিতে প্রাণ সঞ্চার করেছিল।
পবননন্দন হনুমানের রহস্যময় গতিবিধি, আচার-আচরণ আজও কৌতূহল সঞ্চারী। রামায়ণ-এর পাঠক তার কাজকম্মের বহর দেখে ভাবেন মায়া কিংবা দৃষ্টিভ্রম। মারুতি কখনও ‘ব্যবর্ধত মহাকায়ঃ’ কখনও বা ‘সংক্ষিপ্য মুহুরাত্মানম’ অলৌকিক প্রভাবে অভিপ্রায় পূরণ করেন। নিজের বিশাল রূপ নিয়ে লঙ্কায় প্রবেশ করলে বিপত্তির আশঙ্কায় দিবাবসানে শরীরটাকে সংকুচিত করে মার্জার সদৃশ ক্ষুদ্রকায় ও অদ্ভুতদর্শন হন:
সূর্যে চাস্তং গতে রাত্রৌ দেহং সংক্ষিপ্য মারুতি:।
বৃষদংশকমাত্রোহথ বভূবাদ্ভুতদর্শনঃ।। (রা. সুন্দরকান্ড, ২। ৪৯)
মায়াপ্রকটে ওস্তাদ ইন্দ্রজিৎ মায়া-নির্মিত সীতাকে তো প্রকাশ্যে বধ করলেন ‘সীতাং মায়াময়ীং নিজঘান’। সীতার হত্যাসংবাদে শোকে মুহ্যমান রামচন্দ্র মূর্ছা গেলেন। মায়ার অদ্ভুত প্রভাবে বাস্তবের মাটিতে ক্রন্দনের রোল পড়ে গেল। শেষমেশ বিভীষণের থেকে ইন্দ্রজিতের মায়ারহস্যবিদ্যার বৃত্তান্ত অবগত হয়ে রামশিবিরে স্বস্তি ফেরে:
বানরান মোহয়িত্বা তু প্রতিযাতঃ স রাক্ষসঃ।
মায়াময়ীং মহাবাহো তাং বিদ্ধি জনকাত্মজম।। (রা. যুদ্ধকান্ড, ৮৪। ১৩)
ইন্দ্রজিতের মায়াবিদ্যায় নৈপুণ্য বিভীষণের অজানা ছিল না ‘অভিজ্ঞস্তস্য মায়ানাং পৃষ্ঠতোহনুগমিষ্যতি’ (ওই ৮৫। ২৩)। এজন্য ‘ঘরশত্রু বিভীষণ’ প্রবাদটির এত বহুল প্রয়োগ।

পাঠক সভাপর্বে চলুন। যুধিষ্ঠির সর্বস্ব পণ করে পাশাখেলায় হেরে যাবার পর সভায় টানটান উত্তেজনা। অন্তঃপুর থেকে দ্রৌপদীকে আনা হচ্ছে। অধোবদনে বসে আছেন ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর। দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রাঞ্চলে হাত রেখে জোর করে টানছেন ‘দ্রৌপদ্যা বসনং বলাৎ’। দ্রৌপদী শেষ ভরসার স্থল নরমূর্তিধারী কৃষ্ণ নামক বিষ্ণুকে মনে মনে ডাকতে লাগলেন। তখন মহাত্মা ধর্ম এসে বস্ত্ররূপ ধারণ করে বিবিধ বস্ত্রে দ্রৌপদীকে আবৃত করলেন। দুঃশাসন যতই দ্রৌপদীর বস্ত্র টানছেন ততই নতুন নতুন বস্ত্রের আবির্ভাব হচ্ছে। সমবেত রাজন্যবর্গ সেই অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। মহাভারতকার জানিয়েছেন ‘বিক্রোশতি যাজ্ঞসেনী’ অর্থাৎ লজ্জা নিবারণের জন্য মনে-প্রাণে কৃষ্ণাখ্য হরিকে ডাকতেই সেই অদ্ভুততম ঘটনা ঘটে গেল। পাঠক বারেকের জন্যও জানতে চান না তন্তু কোথা থেকে এল। তন্তুবায় কোথায় ইত্যাদি। কেবল বিস্ময় আর বিস্ময় ‘তদদ্ভুততমং লোকে বীক্ষ্য’। পরিশেষে যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রসমূহ সভার মধ্যে স্তূপাকার হল তখন দুঃশাসন ক্লান্ত হয়ে লজ্জায় বসে পড়ল:
যদা তু বাসসাং রাশি: সভামধ্যে সমাচিতঃ।
ততো দুঃশাসনঃ শ্রান্তো ব্রীড়িতঃ সমুপাবিশৎ।। (মহা. সভাপর্ব, ৬৫। ৫০)
সূর্য-কুন্তীর রমণ-জাত কর্ণ স্বাভাবিক কবচ-কুন্ডলে জন্মলগ্ন থেকেই শোভিত ছিলেন ‘সহজং কবচং বিভ্রৎ কুন্ডলদ্যোতিতাননঃ’ (মহা. আদিপর্ব, ১০৫। ২২)। স্বর্ণকুন্ডল নিয়ে জন্মানোর জন্য কর্ণের নামান্তর বসুষেণ। দেবদিবাকর ব্রাহ্মণের বেশে স্বপ্নাদেশে জানিয়েছিলেন যে, দেবরাজ ইন্দ্র কপট মায়ায় তার কবচ ও কুন্ডলদ্বয় অপহরণ করতে আসবেন। ইন্দ্র নিজ পুত্র অর্জুনের কল্যাণের জন্যই একাজ করবেন। হয়েছিলও তাই ‘কবচং প্রার্থয়ামাস ফাল্গুনস্য হিতে রতঃ’ (মহা. আদিপর্ব, ১০৫। ৩৭)।
দেবতারা দিব্য বিমানে যাতায়াত করেন। অর্জুনের ভয়ংকর তপস্যায় দেবতারা প্রীত হলে দেবরাজ ইন্দ্র মাতলিকে মায়াময় দিব্য বিমান দিয়ে পাঠিয়েছিলেন অর্জুনকে অভ্যর্থনা করে দেবলোকে নিয়ে আসার জন্য। ইন্দ্রের অভিপ্রায় ছিল, দিব্যাস্ত্র দিয়ে অর্জুনকে আরও শক্তিশালী করে দেবেন। ইন্দ্রকীল পর্বতে অর্জুনের দুশ্চর তপস্যায় প্রীত হয়ে মহাদেব তাকে ভয়ংকর দিব্য ‘পাশুপত অস্ত্র’ নামান্তর ‘ব্রহ্মশির’ দান করলেন। এই পাশুপত অস্ত্র অভিমন্ত্রিত করা হলে তার থেকে সহস্র সহস্র শূল, ভয়ংকর গদা এবং সর্পাকৃতি বাণ আবির্ভূত হয় (মহা. বনপর্ব, ৩৫। ৯৬)। একে একে বরুণ, কুবের, যম প্রমুখ দিকপালগণ অর্জুনের সামনে এলেন এবং তাকে দিব্যদৃষ্টি বিতরণ করে ‘দৃষ্টিং তে বিতরামোহদ্য’ যথাক্রমে ‘বারুণপাশ’ ‘অন্তর্ধান অস্ত্র’ এবং ‘দন্ড’ দান করলেন। কেবল অস্ত্রদানই নয়, তাদের যথাবিধি মন্ত্র, ইতিকর্তব্যতা, প্রয়োগ ও উপসংহার প্রক্রিয়াও জ্ঞাপিত হল।
সুত্তপিটকের দীঘনিকায় নামক অংশের কেবট্ট সুত্ত থেকে জানা যায়, গৃহপতিপুত্র কেবট্ট কোনো ভিক্ষুকে দিয়ে অলৌকিক বিভূতি প্রদর্শনের জন্য ভগবানকে অনুরোধ করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, অলৌকিক বিভূতি প্রদর্শিত হলে নালন্দাবাসীরা ভগবানের প্রতি অধিকতর প্রসন্ন হবেন। উত্তরে ভগবান তিন ধরনের প্রাতিহার্যের (অলৌকিক বিভূতি) কথা বিবৃত করেন। পালিতে অলৌকিক কার্য বা miracle তা ‘পাটিহারিয়ং’ (প্রাতিহার্য) নামে অভিহিত। প্রাতিহার্য ত্রিবিধ, যথা—ক. ঋদ্ধি প্রাতিহার্য খ. আদেশনা প্রাতিহার্য এবং গ. অনুশাসনী প্রাতিহার্য। ঋদ্ধি প্রাতিহার্যের সহায়তায় কোনো ভিক্ষু এক থেকে বহু বা বহু থেকে একে পরিণত হতে পারেন, আকাশে বিচরণ করতে পারেন, জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন ইত্যাদি। স্পর্শ করা এমনকি সশরীরে ব্রহ্মলোকে যাওয়া কোনোটিই তার পক্ষে অসম্ভব নয়। অপরদিকে আদেশনা প্রাতিহার্যের সহায়তায় অন্যের মনোবীক্ষণ সম্ভব হয়। কে, কোন বিষয়ে তার চিত্তকে নিবিষ্ট করে রেখেছে এই ঋদ্ধির মাধ্যমে ভিক্ষু তা জানতে পারেন। পরিশেষে অনুশাসনী প্রাতিহার্য গ্রহণ-বর্জনের বিতর্কে দক্ষ করে তোলে। তবে ঋদ্ধি প্রাতিহার্য ‘গান্ধারী’ বিদ্যার দ্বারা এবং আদেশনা প্রাতিহার্য ‘মণিকা’ বিদ্যার দ্বারাও সম্পন্ন হতে পারে। বিদ্যান্তরের সাহায্যে উক্ত দুই প্রাতিহার্য সম্পাদিত হতে পারে বলে ওইগুলি নগণ্য বা তুচ্ছ। দুঃখ দূরীকরণে অনুশাসনী প্রাতিহার্যই সর্বোত্তমরূপে গৃহীত।
প্রসঙ্গত বেদ জাতক (প্রথম খন্ড, ৪৮ সংখ্যা) উল্লেখ্য। বারাণসীর রাজা ব্রহ্মদত্তের সময় কোনো এক গ্রামে বেদ মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ থাকতেন। সেই মন্ত্রের একটা অদ্ভুত শক্তি ছিল। বিশেষ নক্ষত্র যোগের সময় মন্ত্রপাঠ করে আকাশপানে তাকালেই রত্নবষর্ণ শুরু হত। বোধিসত্ত্ব বিদ্যাশিক্ষার জন্য সেই ব্রাহ্মণের শিষ্য হয়েছিলেন। একদিন ব্রাহ্মণ বোধিসত্ত্বকে সঙ্গে নিয়ে দেশান্তরে যাবার বেলায় বনের মধ্যে ‘প্রেষণক’ নামক দস্যুদের হাতে বন্দী হলেন। দস্যুরা সংখ্যায় ছিল পাঁচশো জন। এদের ‘প্রেষণক’ নামের তাৎপর্য হল, এরা দুজনকে ধরলে একজনকে ‘নিষ্ক্রয়’ (মুক্তিপণ) আনবার জন্য লোকালয়ে পাঠাত। পিতা-পুত্রকে ধরলে পুত্রকে আটকে রেখে পিতাকে পাঠাত। প্রেষণকেরা প্রথানুযায়ী ব্রাহ্মণকে আটক রেখে বোধিসত্ত্বকে নিষ্ক্রয় আনবার জন্য গ্রামে পাঠাল। বোধিসত্ত্ব যাবার সময় আচার্যকে বলে গেলেন যে, তিনি দু-একদিনের মধ্যে অবশ্যই ফিরে আসবেন। কিন্তু তিনি যেন তার কথানুসারেই চলেন। এতে ভয়ের কোনো কারণ হবে না। আজ রত্নবর্ষণের যোগ আছে। আচার্য যেন কোনোভাবেই মন্ত্রপাঠ করে রত্নবর্ষণ না-ঘটান। রত্নবর্ষণ করালে কেবল আচার্যই নয়, সঙ্গে পাঁচশো দস্যুর বিনাশও অবশ্যম্ভাবী। বোধিসত্ত্ব চলে গেলেন। এদিকে সন্ধেবেলায় পূর্ণিমার চন্দ্রোদয়। গাছের তলদেশে বন্ধনরজ্জুতে আটক আচার্য। ব্রাহ্মণ নক্ষত্রযোগ দেখে ভাবলেন, দু-দিন এভাবে আটক থেকে বিড়ম্বনা ভোগ নিরর্থক। বিশেষত তার যখন রত্নবর্ষণের ক্ষমতা রয়েছে। তিনি দস্যুদের বললেন, তোমাদের ধনলাভই যখন মুখ্য উদ্দেশ্য তখন আমাকে স্নান করিয়ে নববস্ত্র পরিয়ে গন্ধপুষ্প শোভিত করে একটু একাকী বসতে দাও। শীঘ্র মুক্তির লোভে বোধিসত্ত্বের বারণ উপেক্ষা করে মন্ত্রপাঠ করে তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। দৃষ্টিমাত্রই রাশি রাশি রত্নবৃষ্টি হতে লাগল। দস্যুরা রত্ন লাভ করে বেজায় খুশি হল এবং আচার্যকে মুক্তি দিল। এদিকে অদৃষ্টের পরিহাসে অপর পাঁচশো দস্যুর হাতে প্রেষণকেরা বন্দী হল। তাদেরও রত্ন চাই। দস্যুরা ব্রাহ্মণকে দেখানো মাত্রই ব্রাহ্মণ বললেন রত্নবর্ষণের যোগ ফিরে আসতে আরও এক বৎসর অপেক্ষা করতে হবে। অধৈর্য হয়ে দস্যুরা ব্রাহ্মণের গলা কেটে ফেলল এবং রত্নলোভে দ্বিতীয়দল প্রথমদলকে আক্রমণ করল। পাঁচশো বনাম পাঁচশো দস্যুর লড়াই বেধে গেল। দ্বিতীয় দল জয়ী হল। তারা আবার দ্বিদলে বিভক্ত হয়ে বিবাদে লিপ্ত হল। রত্নলোভে মারামারির পরিণতিতে অবশিষ্ট রইল দুই। শেষমেশ একজন ধনরত্ন পাহারার কাজে থেকে অপরজনকে শহরে ভাত আনতে পাঠাল। এদিকে যে দস্যু রত্ন পাহারায় বসেছিল সে ভাবল, সঙ্গী এসে খাবারের পাত্র নামানোর মুহূর্তেই তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলে প্রভূত রত্নের মালিক সে একাই হবে। অন্যদিকে যে দস্যু ভাত আনতে গিয়েছিল সে ভাবল, নিজে পেট পুরে খেয়ে সঙ্গীর খাবারে বিষ মিশিয়ে দিলে বিনা শ্রমেই রত্নের মালিক সে হতে পারবে। ভাবনানুযায়ী দুজনেই অভিপ্রায় পূরণে কৃতসংকল্প হল। যার পরিণামে দুই দস্যুর কেউই অবশিষ্ট রইল না। এইভাবে রত্নবর্ষণের যোগ এবং তার থেকে উদ্ভূত লোভ সর্বনাশের মূল হল।
আম্রজাতক-কথা (৪৭৪) আমাদের জানিয়েছে যে, এক ব্রাহ্মণ কোনো চন্ডালের কাছে মন্ত্রবিদ্যা লাভ করে সেই মন্ত্রের প্রভাবে সুগন্ধ, মিষ্টি, রসাল আম উৎপাদন করতে পারত। একটা আমগাছের থেকে সাত পা দূরে দাঁড়িয়ে বিশেষ মন্ত্রটি আবৃত্তি করে গাছটির ওপরে অর্ধাঞ্জলি জল নিক্ষেপ করলেই কেল্লা ফতে। মন্ত্রপাঠ সমাপ্ত হতেই গাছটির পুরোনো পাতাগুলি ঝরে নতুন পাতার আবির্ভাব হত, মুকুল আসত, তার থেকে আম হত এবং সুদৃশ্য দিব্য সেই আমগুলি মুহূর্তের মধ্যেই রং হয়ে পেকে নীচে পড়ত। এইভাবে সেই মায়ামন্ত্র প্রভাবে মানবক বহুসম্পত্তির মালিক হয়েছিল। সুরুচি জাতক (৪৮৯) থেকে জানা যায় যে, শক্রের প্রসাদে সুমেধা মহাপ্রণাদ নামে যে পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন তার জন্য বিশ্বকর্মা বর্দ্ধকীর (স্থপতি) বেশে উপস্থিত হয়ে কেবলমাত্র একটি দন্ড দিয়ে মাটিতে আঘাত করেই সপ্তভূমিক প্রাসাদ সৃষ্টি করেছিলেন। অয়োঘর জাতক (৫১০) থেকে জানা যায়, মারণ, উচ্চাটনাদি ক্রিয়ার জন্য ‘ঘোর বিদ্যা’ নামে একধরনের বীভৎস অনুষ্ঠানের রেওয়াজ ছিল (অথর্ববেদ ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এও উল্লিখিত)। ‘ঘোরা বিদ্যা শিখি না কি বিদ্যাধরগণ/মন্ত্রৌষধিবলে হতে পারে অদর্শন’।
ঋষি দেবশর্মা যজ্ঞ সম্পাদনের অভিলাষে আশ্রম ত্যাগের পূর্বে ভৃগুবংশীয় বিপুল নামে এক শিষ্যকে ডেকে পাঠালেন। অতুলনীয়া সৌন্দর্যের আকর স্ত্রী রুচিকে কীভাবে রক্ষা করা যাবে এই চিন্তায় তিনি উদবিগ্ন হলেন। ঋষির ভয় মরজগতের কাউকে নিয়ে নয়। ভয় ইন্দ্রকে নিয়ে। ইন্দ্রের বিশেষণ ‘বহুমায়ঃ’ (মহা. অনুশাসনপর্ব, ৪০। ২৮)। ‘মায়াবী হি সুরেন্দ্রোহসৌ’ (মহা. অনুশাসনপর্ব, ৪০। ৪৩)। ইন্দ্র কখনও হন বিশাল পুষ্ট শরীরের অধিকারী, কখনও বা দুর্বল ক্ষীণতনু। কখনও ইচ্ছামাত্রেই কিরীট-মুকুটশোভিত, হস্তে বজ্র ও ধনু, কর্ণে কুন্ডল, আবার কখনও বা শিখা, জটা, কৌপীনধারী ঋষি। কখনও যুবক, কখনও বৃদ্ধ, কখনও কুৎসিত, কখনও রূপবান। ব্রাহ্মণাদি বিশেষ বর্ণ ইচ্ছামাত্রেই তিনি অবলম্বন করেন। বাঘ, সিংহ, হাতি, শুক, কাক, হাঁস কোকিল, মাছি, মশা—এসব ইন্দ্রের বহুচর্চিত রূপ। যেকোনো দেবতা, দানব ও রাজাদের কলেবর তার করায়ত্ত। প্রয়োজনে ইন্দ্র নিজেকে বায়ুরূপে পরিবর্তিত করতেও সক্ষম ‘বায়ুরূপেণ বা শক্রো গুরুপত্নীং প্রধর্ষয়েৎ, (মহা. অনুশাসনপর্ব, ৪০। ৪৪) ইন্দ্র যে কল্পতরুর অধিকারী তা শ্রীহর্ষ নৈষধেও জানিয়েছেন (নৈ.চ. ৫। ১২২)।
কোটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র-এ মায়াযোগবিদ (অ.শা. ৪। ৩। ৩; ৪। ৩। ১১), কুহক (অ.শা. ৪। ৪। ১) প্রভৃতি পদের বহুল প্রয়োগ করেছেন। মায়াযোগজ্ঞানী শৈব মান্ত্রিকেরা (experts in the practice of magic) অতিবৃষ্টির প্রশমনের জন্য জপহোমাদির দ্বারা বিবিধ অভিচারক্রিয়ার অনুষ্ঠান করতেন। রাক্ষস এবং দুষ্ট প্রেতের কবল থেকে আত্মরক্ষার্থে প্রতিকারের বিধান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মায়াযোগবিদ নিপুণ ব্যক্তিবর্গ যেহেতু শৈবাদি তন্ত্রে প্রতিপাদিত মারণ, উচাটন প্রভৃতি কর্মে দক্ষ সেহেতু তারা রাক্ষসনাশক (রক্ষোঘ্ন) ক্রিয়ানুষ্ঠান করবেন ‘মায়াযোগবিদঃ দৈবাপৎপ্রতিকারিণঃ’ (অ.শা. ৪। ৩। ১১)। প্রজাপীড়নকারীদের বিষেয়ে বিশদ তথ্যাদি সংগ্রহের কাজে বিভিন্ন ব্যক্তির বেশধারী যেসব গুপ্তচর নিয়োগ করা হত তাদের মধ্যে কুহক বা ঐন্দ্রজালিক ছিল অন্যতম (অ.শা. ৪। ৪। ১)। অথর্ববেদ-এ উল্লিখিত ‘কৃত্যাশীল’ ব্যক্তিরা ছিলেন পিশাচাদির আবেশনকারী (Practiser of black magic)। কৃত্যা নামক দেবী যজ্ঞীয় ক্রিয়াকলাপ বা আভিচারিক ক্রিয়ার মাধ্যমে পূজিতা হতেন। কৃত্যাশীলের একমাত্র লক্ষ্য থাকত ধ্বংসমূলক কাজে সাফল্য অর্জন করা (অ.শা. ৪। ৪। ৫)। এ ছাড়া বিজিগীষু নৃপতি প্রতিপক্ষীকে চাপে রাখবার জন্য প্রতিপক্ষীর উদবেগ বৃদ্ধিতে বিবিধ উপায় অবলম্বন করতেন—যার মধ্যে ইন্দ্রজালবিদ্যাও নির্দিষ্ট ছিল ‘মায়াভি:’ (অ.শা. ১০। ৬। ৬)।
ইন্দ্রজাল পদটি সংস্কৃত বাঙময়ে বহুচর্চিত। বাণভট্ট কাদম্বরী-তে বলেছেন পৃথিবীতে ধনের দেবী লক্ষ্মী যেন স্পষ্টভাবে ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করে থাকেন। মুদ্রা বিতরণ করে অর্থ দিয়ে যেমন পকেট গরম রেখে উষ্ণস্পর্শ দেন, তেমনই পকেট খালি করে শৈত্যবোধ জাগরিত করেন ‘পরস্পরবিরুদ্ধশ্চেন্দ্রজালমিব দর্শয়ন্তী প্রকটয়তি জগতি নিজং চরিত্রম’। টীকায় বলা হয়েছে ‘ইন্দ্রজালমিব কুহকমিব পরস্পরবিরুদ্ধম’। এই তো Reality।
অতিশয়োক্তি এবং অতিলৌকিকতার আশ্রয়েই লোকসাহিত্য প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কালিদাস সযত্নে অতিলৌকিক উপাদানকে বিবিধরূপে তাঁর রচনায় মেলে ধরেছেন। বিক্রমোর্বশীয়ম নাটকে পাঠক ‘সংগমনীয় মণি’ নামক এক অতিলৌকিক বস্তুর পরিচয় পান—যা কিনা স্পর্শমণিরই রূপান্তর। এই সংগমনীয় মণির সাহায্যে পুরূরবার আলিঙ্গনে লতারূপিণী উর্বশী নারীদেহ পুনরায় ফিরে পেলেন। কালিদাস বলেছেন পার্বতীর চরণে দেওয়া লাক্ষারস থেকে সংগমনীয় মণির উদ্ভব। এই মণি শরীরে ধারণ করলে অচিরেই প্রিয়জনের সঙ্গে মিলন ঘটে:
সংগমনীয় ইতি মণি: শৈলসুতাচরণরাগযোনিরয়ম।
আবহতি ধার্যমাণঃ সংগমমচিরাৎ প্রিয়জনেন।। (বিক্র. ৪। ৩৬)
পুরূরবা উর্বশীর মিলনে এই মণির কার্যকারী ভূমিকার জন্য এটি মহারাজের অত্যন্ত প্রিয় সামগ্রী ছিল। এরকম অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকে ‘রক্ষাকরন্ডক’ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভগবান মারীচ রক্ষাকরন্ডকটি (অপরাজিতা নামে ওষধি) সর্বদমনের জাতকর্মের সময় তার মণিবন্ধে বেঁধে দিয়েছিলেন। শোনা যায়, কবচটি মা, বাবা এবং যার হাতে থাকবে সে নিজে ছাড়া অপর কেউ মাটি থেকে তুলতে পারত না। অন্যথায় কবচ সর্পে রূপান্তরিত হয়ে তাকে দংশন করত। ‘এষা অপরাজিতা নাম ঔষধি: অস্য জাতকর্মসময়ে ভগবতা মারীচেন দত্তা। এতাং কিল মাতাপিতরৌ আত্মানং চ বর্জয়িত্বা অপরঃ ভূমিপতিতাং ন গৃহ্ণাতি’ (অ.শ.সপ্তম অঙ্ক)। জীবনের দ্বিতীয় পাদের গোড়ায় মহারাজ দিলীপের সন্তানাদি হচ্ছিল না। রানি সুদক্ষিণাকে নিয়ে দিলীপ চলে এলেন গুরু বশিষ্ঠের তপোবনে। সেখানে কামধেনু নন্দিনীর পরিচর্যায় (the fulfiller of desires) তাদের অভিপ্রায় সিদ্ধ হয়েছিল। ইষ্টপূরণে দিলীপকে কম কাঠ-খড় পোড়াতে হয়নি। একদিন এক মায়া-সিংহ নন্দিনীকে আক্রমণ করেছিল। নন্দিনীর পরিচর্যায় ব্যাপৃত রাজা মায়াসিংহকে প্রতিআক্রমণে উদ্যত হলে সে মানুষের মতো কথা বলে রাজাকে বিস্মিত করে দিল ‘মনুষ্যবাচা বিস্মায়য়ন নিজগাদ’ (রঘু. ২। ৩৩)। চোখের সামনে আহিতাগ্নি গুরুদেবের গোধন ধ্বংস হবে রাজা তা ভাবতেই পারেন না। মহারাজ দিলীপ নিজের প্রাণের বিনিময়ে গোধন মোচনের জন্য তৎপর হলেন ‘স্বদেহার্পণনিষ্ক্রয়েণ’। মায়াসিংহের ‘তথেতি’ অর্থাৎ তাই হোক সম্মতি পেয়ে মহারাজ মায়াসিংহকে নিজের শরীর সমর্পণ করলেন ‘হরয়ে স্বদেহমুপানয়ৎ’। অধোমুখে উপবিষ্ট রাজার মাথায় বিদ্যাধরেরা পুষ্পবৃষ্টি করলেন ‘পুষ্পবৃষ্টি: পপাত বিদ্যাধরহস্তমুক্তা’ (রঘু. ২। ৬০)। প্রসিদ্ধ লোকেদের অতিমানবিক কাজের অনুমোদন বা প্রশংসা জ্ঞাপনার্থে এই পুষ্পবৃষ্টির মিথকাহিনি। বিদ্যাধরেরা হলেন—মন্ত্রাদিবিদ্যানাং ধরা:। পালি সাহিত্যে বিদ্যাধর শব্দটি মায়াবী (magician) অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। পুষ্পবৃষ্টি শেষ হতেই মহারাজ শুনলেন অমৃতময়ী বাণী ‘উত্তিষ্ঠ বৎস’। চমকের পর চমক মহারাজের প্রতি অঙ্গে। নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। চোখ মেলে দেখলেন তার সামনে শুধুমাত্র দুগ্ধস্রাবিণী নন্দিনী। সে মহারাজকে জানায় মায়াসিংহ তারই সৃষ্টি। মহারাজকে পরীক্ষার জন্যই মায়াসিংহের উদ্ভাবন। ‘তং বিস্মিতং ধেনুরুবাচ সাধো! মায়াং ময়োদ্ভাব্য পরীক্ষিতোহসি’ (রঘু. ২। ৬২)। নন্দিনী বলে যে, সে কেবল দুগ্ধ-প্রদাত্রী নয়, প্রসন্ন হলে সে সর্বকামদাত্রী হতে পারে ‘ন কেবলানাং পয়সাং প্রসূতিমবেহি মাং কামদুঘাং প্রসন্নাম’ (ওই ২। ৬৩)। সন্তানকামী রাজার মনস্কামনা পূরণ হল।

মেঘনাদবধ কাব্য-এর পঞ্চম সর্গেও পাঠক ‘মায়াসিংহ’ পেয়েছেন। লক্ষ্মণকে ভয় দেখাবার জন্য মায়াসিংহের অবতারণা। তবে অগ্নিতেজে অন্ধকার যেমন পালিয়ে যায় লক্ষ্মণের ‘জয়রাম’ ধ্বনিতে মায়াসিংহ তেমনই পালিয়েছিল:
ঘোর সিংহনাদ বীর শুনিলা চমকি!
কাঁপিল নিবিড় বন মড় মড় রবে
চৌদিকে। আইলা ধাই রক্ত-বর্ণ আঁখি
হর্য্যক্ষ, আস্ফালি পুচ্ছ, দন্ত কড়মড়ি।
‘জয় রাম’ নাদে রথী উলঙ্গিলা অসি।
পলাইল মায়া-সিংহ, হুতাশন তেজে
তমঃ যথা।
গন্ধর্বরাজ প্রিয়দর্শনের পুত্র প্রিয়ংবদ মতঙ্গমুনির অভিশাপে হস্তীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। প্রিয়ংবদ’র শাপমুক্তির উপায়রূপে মহারাজ অজ কর্তৃক বাণবিদ্ধ হতে হবে—এরূপ বলা হয়েছিল। ঘটনাপ্রবাহে যখন সেই সুদিন এল তখন প্রিয়ংবদ পুনরায় দিব্য শরীর প্রাপ্ত হয়ে কৃতজ্ঞতার নির্দশন স্বরূপ ‘সম্মোহন’ নামক গান্ধর্ব অস্ত্র দিয়েছিলেন। সম্মোহনের প্রয়োগ ও প্রতিসংহারের বিভিন্ন মন্ত্রও শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই গান্ধর্ব অস্ত্র প্রযুক্ত হলে বলপ্রয়োগ করে শত্রুহত্যা করতে হয় না। বিনা প্রযত্নেই জয়লাভ হয়:
সম্মোহনং নাম সখে মমাস্ত্রং প্রয়োগ-সংহার-বিভক্তমন্ত্রম।
গান্ধর্বমাদৎস্ব যতঃ প্রযোক্তুর্ন চারিহিংসা বিজয়শ্চ হস্তে।। (রঘু. ৫। ৫৭)
গন্ধর্বদের সম্মোহন অস্ত্র প্রসিদ্ধ ছিল। মহাভারত-এ অর্জুন গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের থেকে সম্মোহন অস্ত্র পেয়েছিলেন। ভবভূতি তাঁর উত্তররামচরিত-এ প্রয়োগসংহারবিভক্তমন্ত্র সম্মোহন অস্ত্রকে সরহস্য জৃম্ভকাস্ত্র বলেছেন। নিশ্চিত জয় বা অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করবার জন্য কিছু অব্যর্থ অলংকারের নাম পাওয়া যায়। শ্রীরামচন্দ্র অগস্ত্যমুনির কাছ থেকে জয়াবহ ‘জৈত্রাভরণম’ অলংকার লাভ করেছিলেন। এই আভরণ জয়শ্রীর ‘বশীকরণোপায় স্বরূপ’ ছিল। কুশকে রাজ্যভার হস্তান্তরের সময় তিনি সেটি সমর্পণ করেছিলেন (রঘু. ১৬। ৭২)।
বাকশিল্পের প্রবাদপুরুষ শ্রীহর্ষ (খ্রি. দ্বাদশ শতাব্দী) তাঁর নৈষধচরিত মহাকাব্যে মায়াবিদ্যার প্রসঙ্গ এনেছেন। ইন্দ্র, যম, অগ্নি ও বরুণ দময়ন্তীর স্বয়ংবর সভায় বহু আশায় বুক বেঁধে নলের অনুরূপ করে নিজেদের রূপান্তর করেছিলেন ‘কল্পয়ন্তি স্ম নলানুকল্পম’ (নৈ.চ. ১০। ২২)। দময়ন্তী তো বিস্মিত। চারজন দেবতা নলের আকার নিয়ে স্বয়ংবর সভায় বসে থাকায় সাকুল্যে পাঁচজন নলকে দেখা যাচ্ছিল। আসল, নকল চেনা দায় হয়ে ওঠে। চারজন অলীক নল ও একজন সত্য নলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দময়ন্তী আসল নলকে চিহ্নিত করতে পারছেন না। শেষে দেবতাদের স্তবে খুশি করলে তারা নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ করেন।
দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কাছ থেকে মৃতসঞ্জীবনীবিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন। শোনা যায়, দৈত্যেরা দু-বার কচকে বধ করলে শুক্রাচার্য তাকে পুনর্জীবিত করেন। দৈত্যেরা তৃতীয়বার তাকে হত্যা করে তার ভস্মমিশ্রিত সুরা শুক্রাচার্যকে পান করায়। তখন শুক্রাচার্য নিজেকে বধ না-করে তাকে আর বাঁচাতে পারবেন না—এই অবস্থায় কন্যা দেবযানীর প্রার্থনায় শুক্রাচার্য কচকে সঞ্জীবনীবিদ্যা দান করেন। পরিণামে শুক্রাচার্যকে বিদীর্ণ করে কচ নির্গত হয়ে তারই দেওয়া বিদ্যার প্রভাবে তাঁকে পুনর্জীবিত করেন (নৈ.চ. ১৯। ১৫)। পুনর্জীবন লাভের আগে শুক্রাচার্যের সেই আর্তি মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ তাঁর অনুবাদে বিবৃত করেছেন—‘বাবা কচ! আমি তোমাকে বাঁচাইয়া দিলাম; তুমিও পুত্ররূপে আমার উদর হইতে নির্গত হইয়া আমাকে বাঁচাইয়া দিও। দেখো গুরুর নিকট হইতে বিদ্যালাভ করিয়া, বিদ্বান হইয়া ধর্মের দিকে দৃষ্টি রাখিও’ (মহা. আদি. ৩৪। ৩৫ অনুবাদ দ্রষ্টব্য)। মৃতসঞ্জীবনীবিদ্যা শুক্রাচার্য লাভ করেছিলেন দেবাদিদেব শঙ্করকে তুষ্ট করে। সুরশ্রেষ্ঠ শম্ভু এই বিদ্যা শুক্রকে দিয়েছিলেন—এই তথ্য ব্রহ্মপুরাণ-এ লিপিবদ্ধ আছে:
মৃতসঞ্জীবিনীং বিদ্যামজ্ঞাতাং ত্রিদশৈরপি।
তাং দত্তবান সুরশ্রেষ্ঠস্তস্মৈ শুক্রায় যাচতে।। (ব্র.পু. ৯৬। ২৬)
ষষ্ঠ বা সপ্তম শতকের বৈয়াকরণ কবি ভট্টি জানিয়েছেন—তপোবিঘ্নকারী মায়াবী রাক্ষসদের বধের জন্য বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রকে জয়া ও বিজয়া নামক দুটি বিদ্যা শিখিয়েছিলেন ‘বিদ্যামথৈনং বিজয়াং জয়াঞ্চ’। তবে বাল্মীকি-কৃত রামায়ণ-এ এই বিদ্যা দুটিকে ‘বলা’ ও ‘অতিবলা’-রূপে নির্দেশ করা হয়েছে (রা.ম.ব. ২। ২১)।
নাট্যকার ভাস রচিত অবিমারক নাটকে মেঘনাদ নামে এক বিদ্যাধরকে পাঠক পেয়েছেন যিনি সস্ত্রীক মলয়পর্বতে এক উৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। তার কাছ থেকেই জানা যায়, আরও অনেক বিদ্যাধর সেই উৎসবে যোগ দেবেন ‘মলয়পর্বতে বিদ্যাধরৈরুৎসবঃ প্রারব্ধঃ। তত্র বয়মপি সঙ্কেতিতা: (অবি. ৪র্থ অঙ্ক)। বিদ্যায়া গুটিকাঞ্জনাদিবিষয়িন্যা ধরা: বিদ্যাধরা:। বিদ্যাধর হল দেবযোনিবিশেষ:
বিদ্যাধরোহপ্সরোযক্ষরক্ষোগন্ধর্বকিন্নরা:।
পিশাচো গুহ্যকঃ সিদ্ধো ভূতোহমী দেবযোনয়ঃ।।
অলৌকিক শক্তির অধিকারী বিদ্যাধরদের হাতে সর্বদা একটি তরবারি থাকে। নায়ক অবিমারক যখন প্রিয়তমার জন্য আত্মবিসর্জনে অধীর ঠিক তখনই বিদ্যাধরের সান্নিধ্যলাভে তার কাছ থেকে জাদু-আংটি পেয়ে প্রেমের সুখকর পরিণতির সুযোগ এসে যায়। অলৌকিক ঘটনার অবতারণায় মর্ত্যের নায়ক-নায়িকার প্রেমের মর্যাদায় পাঠকও স্বস্তি পায়। অবিমারকের যথাযথ আত্মপরিচয় বিদ্যাধর অলৌকিক বিদ্যার সাহায্যেই জেনেছিল ‘বিদ্যামাবর্তয়তি’। বিরহের জ্বালায় অবিমারকের মনোবিকার যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই কন্যাপুরে প্রবেশের মোক্ষম চাবিকাঠি হাতে এসে গেল—জাদু-আংটি ডান হাতের আঙুলে পরলে অদৃশ্য হওয়া যায়, আর বাম হাতের আঙুলে পরলে স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে যায় ‘এতদঙ্গুলীয়কং দক্ষিণাঙ্গুল্যা ধারয়ন্নদৃশ্যো ভবতি, বামেন প্রকৃতিস্থঃ’ (অবি. চতুর্থ অঙ্ক)। মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হয়েও বিদ্যাধরের বচনে অবিমারক প্রথমটায় বিশ্বাসই করতে পারেনি। এও আবার হয়! বিদ্যাধর অবিমারকের প্রত্যয় উৎপাদনের জন্য প্রয়োগবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে অবিমারককে একেবারে তাক লাগিয়ে দেন। বিস্মিত অবিমারক দেখেন ডান হাতের আঙুলে আংটি পরা মাত্রই শরীর অদৃশ্য। অবিমারকের হৃদয় নেচে ওঠে। দৈবগুণে এই আংটি পরেই সে অদৃশ্য অবস্থায় কুন্তিভোজের কন্যা কুরঙ্গীর কক্ষে অবাধে প্রবেশ করতে পারবে। বিদ্যাধর অবিমারককে আরও জানিয়ে দেয় যে, জাদু-আংটির প্রভাবে যে অদৃশ্য হবে তাকে যে ছুঁয়ে থাকবে সেও অদৃশ্য হবে। আবার তাকেও যে ছুঁয়ে থাকবে সেও অদৃশ্য হবে ‘অন্তর্হিতশ্চান্তর্হিতস্পৃষ্টশ্চ তৎস্পৃষ্টশ্চান্তর্হিতা ভবন্তীতি নিশ্চয়ঃ’ (অবি. চতুর্থ অঙ্ক)। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বসিত আনন্দে অবিমারক বললেন, তার জীবনে এটি এক সৌভাগ্যের পর অপর সৌভাগ্যের ইঙ্গিতবাহী ‘অয়মভ্যুদয়াদভ্যুদয়ঃ’। জাদু-আংটির গুণে শুদ্ধ অবিমারক আজ হতে মায়াবী অবিমারক। অবিমারকের আর সবুর সয় না। বয়স্য বিদূষককে নিয়ে সে প্রিয়াকে দেখার জন্য দিনের বেলায় মায়াবলে রাজপ্রাসাদের কন্যাপুরে অসংকোচে প্রবেশ করল।
মন্ত্রপূত জলকলসে চুমুক দিয়ে যুবনাশ্বের গর্ভধারণের চাঞ্চল্যকর কাহিনি না-বললেই নয়। কথা ছিল যুবনাশ্বের স্ত্রী মন্ত্রপূত সক্ষম জল পান করে গর্ভবতী হবেন। Magic-realism-এর মিথকথা আমাদের পুরুষ-মা’র কনসেপ্ট সম্বন্ধে অবহিত করেছে। মিথকথার দৌলতে ভারতবর্ষের ইতিহাসে পুরুষ-মায়ের এমন ঘটনাই প্রথম (পৃ. ১৭০-১৭৪ দ্রষ্টব্য)।
দুটো বিদ্যা অপ্সরাদের অধিগত। প্রথমটি হল অপরাজিতা। দ্বিতীয়টি হল তিরস্করিণী। যথাকালে যথারীতি প্রযুক্ত হলে অপরাজিতা আক্রমণকারীদের হাত থেকে অপ্সরাদের রক্ষা করে থাকে। দৈত্যরা যাতে অপ্সরাদের ক্ষতি করতে না-পারে সেজন্য সুরগুরু তাদের মাথায় অপরাজিতা গ্রন্থি বাঁধতে শিখিয়েছেন ‘ননু ভগবতা দেবগুরুণা অপরাজিতাং নাম শিখাবন্ধনবিদ্যামুপদিশতা ত্রিদশপ্রতিপক্ষস্যালঙ্ঘনীয়ে কৃতে স্বঃ’ (বিক্র. ২য় অঙ্ক)। উর্বশী সেবার অপরাজিতা গ্রন্থি বন্ধনের কথা মনে না-রাখার ফলে কেশী দানবের হাতে আক্রান্ত হয়েছিল। বনে, পর্বতে, নদীতটে যথেচ্ছ বিহারে অপরাজিতা অপ্সরাদের সহায়ক রক্ষাকবচের ভূমিকা নেয়।
পক্ষান্তরে যে বিদ্যার দ্বারা অন্যের অদৃশ্য থাকা যায় তাকেই তিরস্করিণীবিদ্যা বলে। এই ‘তিরস্করিণ্যা বিদ্যয়া’ অপ্সরারা যে কত অভিপ্রেত বিষয় সিদ্ধ করেছে, কামার্ত, সন্তপ্ত পুরুষহৃদয়ের সংবাদ সংগ্রহ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। মদনবাণে বিদ্ধ পুরূরবার হৃদয়ের হাহাকার তিরস্করিণীবিদ্যায় প্রচ্ছন্ন হয়ে ওঁর পাশে দাঁড়িয়েই উর্বশী শুনেছিল সখী চিত্রলেখাকে নিয়ে—‘তিরস্করিণীপ্রতিচ্ছন্না পার্শ্বগতাস্য ভূত্বা শ্রোষ্যামি তাবৎ’ (ওই ২য় অঙ্ক)। উর্বশীর বিরহে পুরূরবা সেবার মৃণালের মতো ক্ষীণ হয়ে যাওয়া অঙ্গ নিয়ে বিদূষককে ওঁর মনোবেদনা জানিয়েছেন। সে সবই উর্বশী অদৃশ্য থেকেই শুনেছে। চিত্রলেখাই উর্বশীকে আশ্বস্ত করে তিরস্করিণী প্রত্যাহার করে রাজার কাছে মেঘমালার মতো হাজির হয়েছিল এবং জানাতে চেয়েছিল, বিদ্যুৎলতা (উর্বশী) এরপর অবশ্যই আসবে—‘তিরস্করিণীমপনীয় রাজানমুপেত্য’ (ওই ২য় অঙ্ক)। মেনকার প্রাণের দোসর সানুমতী দুষ্যন্তের মনোবেদনা জেনেছিল তিরস্করিণী-বিদ্যার প্রভাবে অদৃশ্য থেকে ‘তিরস্করিণীপ্রতিচ্ছন্না পার্শ্ববর্তিনী ভূত্বা উপলপস্যে’ (অ.শ. ষষ্ঠ অঙ্ক)। আবার কামার্ত বীরশেখর তিরস্করিণীবিদ্যায় অদৃশ্য হয়েই মালবরাজের অন্তঃপুরে প্রবেশ করে অবন্তীসুন্দরীকে দেখেছিল (দ.কু. প্রথম উচ্ছ্বাস)।
Magic realism কীভাবে কাহিনিতে প্রাণ সঞ্চার করে তার নমুনা স্কন্দপুরাণ-এর নাগরখন্ডে ষটষষ্টিতম অধ্যায়ে পাওয়া যায়। মৃগয়াক্লান্ত মহারাজ সহস্রার্জুন কার্তবীর্য একবার জমদগ্নির তপোবনে উপস্থিত হয়েছিলেন। মুনি জমদগ্নি অতিথিসেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে মহারাজ তার শতসহস্র সৈন্যদের ক্লান্তির কথা জানালেন। জমদগ্নি নিজের কামধেনুর অলৌকিক মায়াশক্তির প্রভাবে বিপুল সংখ্যক সৈন্যসামন্তের জন্য চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য ও পেয় আহারাদির ব্যবস্থা করলেন:
ততঃ স প্রার্থয়ামাস তাং ধেনুং মুনিসত্তমঃ।
যো যৎ প্রার্থয়তে দেহি ভোজ্যার্থং তস্য তচ্ছুভে।। (স্ক. পু. ৬৬। ৩৪)
তেতো দিয়ে শুরু করে চাটনিতে শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিলেন কার্তবীর্যের সাঙ্গোপাঙ্গরা। কামধেনুর এই অলৌকিক কীর্তিকলাপ দেখে কার্তবীর্যের চক্ষু চড়কগাছ। তিনি প্রথমে বিনীতভাবে কামধেনুটিকে প্রার্থনা করলেন এবং পরে সামবাক্যে কাজ না-হওয়ায় ধারালো অস্ত্রে জমদগ্নির শিরশ্ছেদ করে কামধেনুটিকে নিয়ে গেলেন। এর পরিণাম কত ভয়ংকর হয়েছিল, জমদগ্নি তনয় পরশুরামের হাতে কার্তবীর্যের করুণ পরিণতির সে-সব কথা ভিন্ন প্রসঙ্গ বলে আলোচনায় আনছি না।
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের বিশিষ্ট গদ্যকাব্য রচয়িতা দন্ডী তাঁর দশকুমারচরিত-এ ঐন্দ্রজালিক বিদ্যেশ্বরকে নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন—যিনি ইন্দ্রজালবিদ্যায় মালবরাজকে মুগ্ধ করে সমস্ত পুরবাসীদের সামনে তার কন্যার বিবাহ সম্পন্ন করেছিলেন। বিদ্যেশ্বর স্বয়ং ইন্দ্রজালবিদ্যায় নিজের কৃতিত্বের কথা একবুক প্রত্যয়ের সাথে ঘোষণা করতেন ‘বিদ্যেশ্বরনামধেয়োহ হমৈন্দ্রজালিকবিদ্যাকোবিদঃ’ (দ.কু. পূর্বপীঠিকা, পঞ্চম উচ্ছ্বাস)। ইন্দ্রজাল অর্থে ম্যাজিক। ইন্দ্রস্য পরমেশ্বরস্য জালং মায়েব জালং যত্র অর্থাৎ ঈশ্বরেরই মতন যিনি মায়াজাল সৃষ্টিতে সক্ষম। উদ্দেশ্য সিদ্ধির আশায় প্রফুল্লবদন বিদ্যেশ্বর মোহসঞ্চারী কাজল চোখে দিয়ে যখন মালবরাজার সভায় চারিদিকে দৃষ্টিপাত করলেন তখন সভাশুদ্ধ সকলে ইন্দ্রজালের ক্রিয়ায় বিভোর ‘সকলমোহজনকমঞ্জনং লোচনয়োর্নিক্ষিপ্য পরিতো ব্যলোকয়ৎ। সর্বেষু তদৈন্দ্রজালিকমেব কর্ম ইতি সাদ্ভূতং পশ্যৎসু…’ (ওই)। বিদ্যেশ্বরের সঙ্গে ইন্দ্রজালবিদ্যায় অভিজ্ঞ আরও কয়েকজন সহকারী ছিলেন, যারা অভিপ্রায় পূরণের পরে বিদ্যেশ্বরের আদেশে স্থানত্যাগ করেছিলেন ‘ক্রিয়াবসানে সতি ইন্দ্রজালপুরুষা: ‘সর্বে গচ্ছন্তু ভবন্তঃ’ ইতি দ্বিজন্মনোচ্চৈরুচ্যমানে সর্বে মায়ামানবা যথাযথমন্তর্ভাবং গতা:’ (দ. কু. পূর্বপীঠিকা পঞ্চম উচ্ছ্বাস)। মায়াবিদ্যা প্রসঙ্গে দন্ডী আরও জানিয়েছেন যে, রাজবাহন মাতঙ্গের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার নিদর্শনরূপে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা হরণকারী এক মণি উপহার পেয়েছিলেন। পাতালরাজকন্যা কালিন্দীকে বিবাহ করে পাতালের অধীশ্বর হবার সুবাদে মাতঙ্গ এই মণি লাভ করেছিলেন। মাথার চুলের মধ্যে ‘ক্ষুৎপিপাসাহর’ মণি থাকার ফলেই কোপণস্বভাব চন্ডবর্মা যখন কাঠের পেটিকায় রাজবাহনকে বন্দি করেন তখন তার কোনো অসুবিধে হয়নি।
মায়ার বলে বলীয়ান মায়াবী অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারলেও শাস্ত্রচর্চায় লক্ষণীয় যে, এই শ্রেণীর অধিকারী কিন্তু প্রশংসিত হননি। শঙ্করের ভাবনায় পরিষ্কৃত হয়েছে, মায়াবী কুটিলতার প্রশ্রয়দাতা। এজন্য অসুরপ্রকৃতি মায়ার আশ্রয়কারীতে ব্রহ্মবিদ্যা কখনও স্থিত হয় না। যারা অমায়াবী অর্থাৎ কুটিলতা রহিত, সজ্জন তাদেরকেই ব্রহ্মবিদ্যা আশ্রয় করে ‘সত্যমিতি অমায়িতা-হকৌটিল্যং বা'নঃকায়ানাম। তেষু হ্যাশ্রয়তি বিদ্যা, যেহমায়াবিনঃ সাধবঃ নাসুরপ্রকৃতিষু মায়াবিষু। ‘ন যেষু জিহ্মমনৃতং ন মায়া চ’ ইতি শ্রুতে:, (কেন. উ. শা. ভা. ৪। ৮)।
তবে লৌকিক জগতের মানুষেরা ভাবেন, ক্ষেত্রবিশেষে অদৃশ্য হওয়ার বা রূপান্তর গ্রহণের বিদ্যায় সিদ্ধ হতে পারলে অথবা অপরকে নিদ্রিত করাবার, অন্তর্ধান ঘটাবার ও বন্ধ দরজা খোলাবার মন্ত্র আয়ত্ত করতে পারলে সকাল থেকে সন্ধে উদয়াস্ত খেটে মরতে হত না। বৈচিত্র্য ভরা নানা আখ্যানের সমাহার থেকে পাঠক তাই মায়াবন্দরে নিরন্তর নোঙর করতেই চান।
শব্দসংকেত
|
অবি. |
অবিমারক |
|
অ.শ. |
অভিজ্ঞানশকুন্তলম |
|
অ.শা. |
অর্থশাস্ত্র |
|
অ.স. |
অথর্ববেদ-সংহিতা |
|
কেন. উ. |
কেনোপনিষদ |
|
দ. কু. |
দশকুমারচরিত |
|
নৈ. চ. |
নৈষধচরিত |
|
বিক্র. |
বিক্রমোর্বশীয় |
|
ব্র. পু. |
ব্রহ্মপুরাণ |
|
মহা. |
মহাভারত |
|
রঘু. |
রঘুবংশ |
|
রা. |
রামায়ণ |
|
রা. ম. |
রাবণবধমহাকাব্য |
|
শ.ক. |
শব্দকল্পদ্রুম |
|
শা. ভা. |
শাঙ্করভাষ্য |
|
স্ক.পু. |
স্কন্দপুরাণ |
তথ্যসূত্র:
অথর্ববেদ:
সম্পা: শ্রী বিজনবিহারী গোস্বামী, হরফ, প্রকাশনী, ১৯৭৮
অথর্ববেদসংহিতা:
নাগ প্রকাশক, দিল্লি, ১৯৯৪
অভিজ্ঞানশকুন্তলম:
রমেন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত, মডার্ন বুক এজেন্সি প্রা. লি. কলকাতা, ১৯৭০
অভিজ্ঞানশকুন্তলম:
ড. সত্যনারায়ণ চক্রবর্তী সম্পাদিত, সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, কলকাতা-৬, ১৯৮৮
অর্থশাস্ত্র:
ড. মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, কলকাতা-৬, ২০০১
ইতিহাসের আলোকে বৈদিক সাহিত্য:
সুকুমারী ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা-১৩, ২০০১
জাতক:
ঈশানচন্দ্র ঘোষ অনূদিত, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা-৯, ১৪০৮
দশকুমারচরিত:
জীবানন্দবিদ্যাসাগর ভট্টাচার্য সম্পাদিত, কলকাতা-১৯১০
দীঘনিকায়:
ভিক্ষু শীলভদ্র অনূদিত, মহাবোধি বুক এজেন্সি, কলকাতা-৭৩, ১৪১৪
ভারতসংস্কৃতির উৎসধারা:
অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, ভারতী লাইব্রেরি, কলকাতা-১২, ১৩৭২
মহাভারত:
হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ সম্পাদিত, ১৩৪২
রঘুবংশম:
সত্যেন্দ্রনাথ সেন, সেন অ্যাণ্ড সেন, কলকাতা-৬, ১৯২৪
রামায়ণ:
আর্যশাস্ত্র, শ্রীসীতারাম বৈদিক মহাবিদ্যালয়, কলকাতা-৩৫
রামায়ণের চরিতাবলী:
সুখময় ভট্টাচার্য, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৪১৬
লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ:
পল্লব সেনগুপ্ত, পুস্তক বিপণি, কলকাতা-৯, ২০০২
শব্দকল্পদ্রুম:
স্যার রাজা রাধাকান্ত দেববাহাদুর, কলকাতা, ১৮৫০
সংস্কৃত সাহিত্য সম্ভার:
নবপত্র প্রকাশন, কলকাতা-৭৩, ১৩৭৯
স্কন্দপুরাণ:
শ্রীপঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৪১২
Kautilya’s Arthasastra:
R. Shamasastry, Mysore, 1967
Kenopanisad:
Ed. by Dr. Sitanath Goswami, Sanskrit Pustak Bhandar, 1964.
Magic, Science and Religion:
B. Malinowsky, New York, 1954
Myth and Reality:
D. D. Kosambi, New Delhi, 1962
Selections from Wordsworth:
Ed. Sir Ifon Evans, Methueu & Co. Ltd., Great Britain, 1966
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন