ময়া দত্তবরো দৈত্যঃ

অমিত ভট্টাচার্য

মিথ-পুরাণ লোকশিক্ষার আঁতুড়ঘর। মিথ-পুরাণ-এর দৌলতে পাঠক জানতে পারেন যে—দৈত্যরা (অশুভ শক্তি) বড়ো হয়, ক্ষমতাবান হয়, দেবতাদেরই বরে। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে বা বিনয়পূর্ণ বচনে অথবা স্তোকবাক্যে গলে গিয়ে গদগদচিত্তে প্রভাবশালী দেবতারা আত্মহারা হয়ে যেতেন এবং একবুক প্রত্যয় নিয়ে অশুভ শক্তিকে দিনের পর দিন প্রশয় দিতেন। সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, প্রত্যক্ষ দুর্নীতিপরায়ণদের থেকে পরোক্ষ মদতদাতারা বেশি মারাত্মক। পুরাণ-শাস্ত্রকারদের বৈশিষ্ট্য হল, এরা রাঘববোয়াল দস্যুদের কালো মুখ যেমন চিত্রিত করেছেন, তেমনই পাশাপাশি এদের আশ্রয়দাতারূপে কোনো কোনো দেবতাকেও মানুষের দরবারে হাজির করেছেন।

সহস্রবাহু বাণাসুর ছিলেন স্বয়ং মহাদেবের আশীর্বাদধন্য। বাণাসুর তার কন্যা উষার ভালোলাগার পাত্র অনিরুদ্ধকে অবরুদ্ধ করেছিলেন। এর প্রতিবাদে অনিরুদ্ধের পিতামহ কৃষ্ণ (বিষ্ণু) যে স্পর্ধিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তার পরিণামে ভয়ংকর এক যুদ্ধ বেধে যায়। অনিরুদ্ধকে কাছে পেয়ে শারীরিক আকর্ষণজনিত আবেগ ও উচ্ছ্বাসে উষা যখন অন্তঃপুরে দিশেহারা তখনই বাইরে কন্যার অসুরপিতা ও শ্বশুরের পিতা (প্রদ্যুম্ন-পিতা) অস্ত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ।

কৃষ্ণের অস্ত্রাঘাতে জর্জরিত ছিন্নবাহু বাণাসুরকে দেখে ত্রিপুরারি মহাদেব স্থির থাকতে পারেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণের কাছে উপস্থিত হয়ে প্রতিস্পর্ধা না-দেখিয়ে ভক্তকে বাঁচাতে চিরন্তন এক সত্য সর্বসমক্ষে জানিয়ে দিলেন। তিনি জানালেন যে, তাঁর প্রদত্ত অভয়বাণীর প্রভাবেই বাণাসুর অমিতক্ষমতাসম্পন্ন সহস্রবাহুতে পরিণত এবং তাঁরই আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় বাণাসুরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে এত সময় ও বিপুল অস্ত্রের অপচয় হল।

ঘটনা হল, শিব ও কৃষ্ণ উভয়েই বন্ধুত্বের নিবিড় বন্ধনে বদ্ধ হলেও পারিবারিক স্বার্থে ঘা পড়লে বন্ধুত্বের শর্ত বা ডেকোরাম সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। তখন মানুষের সাধারণ জীবনধারার সঙ্গে ওপরতলার শ্রেণির প্রভেদ ঘুচে গিয়ে সব একাকার হয়ে যায়।

শিব কৃষ্ণকে বুঝিয়ে বলেন কীভাবে তারই অভয়দানে বাণাসুর আজ পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছে এবং স্বয়ং কৃষ্ণকে স্পর্ধা জানানোর সাহস দেখিয়েছে। বাণাসুর আপন শক্তিতে বলীয়ান না-হলেও তার যুদ্ধনৈপুণ্য লোককথায় রূপান্তরিত হবার জোগাড়, যার নেপথ্যকার কৃষ্ণেরই পরমমিত্র শিব। সুতরাং বাণাসুরকে প্রাণে মারা যেন না-হয়। ছিন্নবাহু বাণাসুরকে রক্তস্রোতে ভেসে যেতে দেখে শিব নিজেই অপমানিত বোধ করেছেন। কৃষ্ণ যদি বাণাসুরকে প্রাণে মারেন তবে শিবের অভয়বাণী নিরর্থক হবে এবং আশ্রয় দাতারূপে ভবিষ্যতে তাঁকে কেউ স্মরণ করবে না। অনুগামীর স্বার্থে শিবের বাস্তববাদী অবস্থান অনেকেই সমর্থন করেন। ভয়ংকর যুদ্ধের আঁচ পেয়ে তিনি শঙ্কিত হলে, আত্মগোপন করে থাকলে, পার্বতীর সঙ্গে আলাপচারিতায় রত থাকলে তাঁর ভাবমূর্তি যে কালিমালিপ্ত হবে, সমালোচিত হবে শিব তা বুঝেছিলেন। এজন্য আশ্রিতের রক্ষার্থে বন্ধু কৃষ্ণের কাছে তিনি স্বরূপে হাজির হয়ে বলেন:

তৎ প্রসীদাভয়ং দত্তং বাণস্যাস্য ময়া প্রভো।

তত্ত্বয়া নানৃতং কার্য্যং যন্ময়া ব্যাহৃতং বচঃ।।

অস্মৎসংশ্রয়বৃদ্ধেহয়ং নাপরাধ্যস্তবাব্যয়।

ময়া দত্তবরো দৈত্যস্ততস্ত্বাং ক্ষময়ামহম।।                        (বি. পু. ৫। ৩৩। ৪৩.৪৪)

এদিকে দুজনের কারুরই সাংগঠনিক শক্তি কম নয়। বিপুল সংখ্যক ভক্ত-সদস্যের অর্ঘ্যনৈবেদ্য নিবেদনে দুজনেরই আহ্লাদ ভাব গোপন থাকে না। প্রাণের বন্ধুকে রণক্ষেত্রে এইভাবে দেখবেন কৃষ্ণ তা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি। তাঁরই বন্ধু দৈত্যের আশ্রয়দাতা—একথা ভেবে কৃষ্ণ শিহরিত। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে করমর্দন সেরে শিব নিজের মনস্তাপ প্রকাশ করলেন।

কৃষ্ণ কথায় কথায় নিজের পরিবারের প্রসঙ্গ তুললেন। যুদ্ধের কারণ বিবৃত করে কৃষ্ণ জানালেন তাঁর সমস্ত পুত্রের মধ্যে রুক্মিণীর পুত্র প্রদ্যুম্নই শ্রেষ্ঠ। আর সেই প্রিয়তম পুত্রের পুত্র হলেন অনিরুদ্ধ, যাকে কেন্দ্র করে এই ভয়ংকর যুদ্ধের পরিণতি ‘প্রদ্যুম্নঃ প্রথমস্তেষাং সর্বেষাং রুক্মিণীসুতঃ, প্রদ্যুম্নাদনিরুদ্ধেহ ভূৎ...’। কৃষ্ণের বিরাম নেই বাচনে। বৃদ্ধ বয়সে পৌত্রের জন্য অস্ত্রধারণ করতে হবে তিনি কস্মিনকালেও ভাবতে পারেননি। কৃষ্ণের ধারণা ছিল তাঁকে প্রতিস্পর্ধা জানানোর মতন সাহস ভূমন্ডলে কারুর হবে না। বাণাসুরের মেয়ে উষা যদি তাঁর পৌত্র অনিরুদ্ধকে ভালোবেসেই থাকে তাতে দোষের কী হয়েছে। ক্ষমতাদম্ভে মত্ত বাণাসুর জানে না কার পৌত্রকে কারাগারে আটকে রেখেছে:

অনিরুদ্ধো রণে রুদ্ধো বলে: পৌত্রীং মহাবলঃ।

বাণস্য তনয়ামুষামুপযেমে দ্বিজোত্তম।।                            (বি.পু. ৫। ৩২। ৭)

কৃষ্ণের ক্রোধরক্তিম গ্রিবা শিবের নজর এড়িয়ে যায়নি। বিচক্ষণ শিব উপলব্ধি করলেন, কন্যার পিতা না-চাইলেও ক্ষমতাধারী তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করবেন। পারিবারিক স্বার্থে ঘা পড়লে শক্তিপ্রয়োগ—অপরাধের নয়—এটিই কি কৃষ্ণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করলেন?

আত্মতুষ্টিতে বিভোর শিব কীভাবে বাণাসুরের মতো দৈত্যকে রক্ষার জন্য, তাকে বাঁচানোর জন্য নিজরূপে এলেন—তা ভেবে কৃষ্ণ হতচকিত। বন্ধুর প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য তাঁকে সম্মান দিতে, কৃষ্ণ নিজের ক্রোধপূর্ণ সংহারমূর্তি সংবরণ করলেন।

যুষ্মদ্দত্তবরো বাণো জীবতামেষ শঙ্কর।

ত্বদবাক্যগৌরবাদেতন্ময়া চক্রং নিবর্তিতম।।                       (বি.পু. ৫। ৩৩। ৪৬)

উভয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন থেকে জানা যায়, একজন ক্ষমতাবান যাকে অভয় দেন, অপরজনও তাকে জানতে পারলে ছাড় দিয়ে থাকেন। এদের মধ্যেকার আঁতাত কষ্টকল্পিত নয়।

ত্বয়া যদভয়ং দত্তং তদ্দত্তমেখিলং ময়া।

মত্তোহ বিভিন্নমাত্মানং দ্রষ্টুমর্হসি শঙ্কর।।                           (বি.পু. ৫। ৩৩। ৪৭)

কথায় কথায় কৃষ্ণ মোক্ষম শিক্ষা দিয়েছেন সহৃদয় পাঠককুলকে। ক্ষমতাবানদের ভিন্নতা অজ্ঞ লোকেরাই করে থাকেন। এদের মৈত্রীবন্ধন অটুট। অজ্ঞানে (অবিদ্যায়) আচ্ছন্ন মানুষেরাই কেবল এদের আলাদা করেন, দল বিচার করেন।

যেহ হং স ত্বং জগচ্চেদং সদেবাসুরমানুষম।

অবিদ্যামোহিতাত্মানঃ পুরুষা ভিন্নদর্শিনঃ।।                          (বি.পু. ৫। ৩৩। ৪৮)

মহাদেবের উচ্চারিত বাণী আজকের সমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক—যা আমাদের দেশের নেতৃকুল পৌঁছে দিতে চাইছেন জনগণের কাছে, আমার জোরেই দৈত্যরা শক্তিমান ‘ময়া দত্তবরো দৈত্যঃ’।

পদ্মযোনি পিতামহ ব্রহ্মার বরেই যে রাবণের বাড়বাড়ন্ত তা গোপন থাকেনি। ত্রিকালজ্ঞ সৃষ্টিকর্তা তপস্যায় প্রীত হয়ে যেভাবে রাবণকে বর দিয়ে উৎসাহিত করেছেন পরবর্তীকালে তারই খেসারত দিতে বিশাল যুদ্ধ এবং লোকক্ষয়। রাবণ যে বর (ক্ষমতা) পেয়ে বলীয়ান হয়ে নিজের গোষ্ঠীশক্তি প্রদর্শন করবেন—এত ব্রহ্মার অজানা থাকার কথা নয়! প্রভূত ক্ষমতা অর্জনের জন্য, সকলকে অতিক্রম করবার জন্য, ইচ্ছেমতো কার্য সম্পাদনের জন্য রাবণ যে চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি—এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তার দীর্ঘ পরিশ্রমে, তপস্যায় গদগদ বচনে আহ্লাদিত হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু তাই বলে লোকপালক ‘ব্রহ্মণা লোককর্ত্তৃণা’ যদি মোহিত হন এবং চটজলদি বলে বসেন—তোমার পরিশ্রম ব্যর্থ হবার নয় ‘ন বৃথা তে পরিশ্রমঃ’ তবেই সভ্যতার সংকট তৈরি হয়। পরিণামে সংকট থেকে মুক্ত হবার জন্য যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, প্রাণহানি অবধারিত হয়। অনুসন্ধিৎসু দেখেন কূটনীতির খেলায় দেবতারা জয়ী হলেও সমস্যার নির্মাতা কিন্তু তাঁরাই। পুরাণ-মহাকাব্যের ইতিহাস বহুপুরোনো হলেও সমাজতাত্ত্বিক একারণে এখনও উক্ত গ্রন্থাদির বিষয়বস্তুতে বিভোর হন—কেবলমাত্র বাস্তবের সঙ্গে অচ্ছেদ্য যোগসূত্রে।

মহাকাব্য থেকে জানতে পারি, রাবণ সুবিধেজনক অবস্থায় পৌঁছেছিল ব্রহ্মারই কৃপায় (রা. উত্তরকান্ড)। রাবণ অমরত্ব চেয়েছিল ‘অমরত্বমহং বৃণে’। ব্রহ্মা গররাজি হওয়ায় সভ্যতা রক্ষা পায় ‘বরমন্যং বৃণীষ্ব’। যদিও তাঁরই প্রদত্ত আশীর্বাদের বন্যায় পরবর্তীকালে বহুবিপর্যয় ঘটেছিল সমাজের বুকে। রাবণ অবধ্য হয়েছিল (পড়ুন অবাধ্য)। রাবণের মনোমুগ্ধকর আচরণে লোককর্তা আরও নমনীয় হন। আরও ক্ষমতা দিয়ে দেন, যার দরুন দেবতাদের অবতারপুরুষকে (রামচন্দ্রকে) পর্যন্ত বহুবেগ পেতে হয়েছিল ‘বরঞ্চান্যং দুরাসদম’। রাবণকে ইচ্ছেমতো রূপ পরিবর্তনের অনুমতি দানে সে ক্রমশ অনিয়ন্ত্রিত, অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। একের পর এক অপরাধমূলক কাজে রাবণ জড়িয়ে পড়ে।

ছন্দতস্তব রূপঞ্চ মনসা যদ যথেপ্সিতম।

এবং পিতামহোক্তস্য দশগ্রীবস্য রক্ষসঃ।।                           (রা. উত্তরকান্ড ১০। ২৫)

ব্রহ্মার বরেই যে রাবণ অদম্য, কুমতিগ্রস্ত, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য এবং মদমত্ত হয়েছে রাবণের পিতা বিশ্বশ্রবা মুনিও তা স্পষ্ট করেছেন ‘বরপ্রদানসম্পূয়ো মান্যামান্যং...ন বেত্তি’। ক্ষমতাবান রাবণ কুবেরকে লঙ্কা ছাড়া করলেন। পিতা বিশ্বশ্রবাই কুবেরকে পরামর্শ দেন যে, রাবণের সঙ্গে শত্রুতায় গিয়ে আখেরে লাভ হবে না, যেহেতু সে ব্রহ্মার বরে বলীয়ান ‘জানীষে হি যথানেন লব্ধঃ পরমকো বরঃ’। মহাকাব্যকারের বিবৃতি থেকে পাঠক আরও জানতে পারেন যে, ভূতনাথ শঙ্কর রাবণকে ‘চন্দ্রহাস’ নামে দীপ্তিমান খড়্গ দান করেন ‘দদৌ খড়্গং মহাদীপ্তং চন্দ্রহাসমিতি শ্রুতম’। রাবণ নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠেন এইভাবে দেবতাদেরই বরে। রাজা মরুত্তের আয়োজিত যজ্ঞসভায় যেখানে দেবতারা আমন্ত্রিত সেখানেও রাবণ সশরীরে হাজির হয়ে হুংকার ছাড়ে। হয় হারো, নয় মারো ‘প্রাহ যুদ্ধং প্রযচ্ছেতি নির্জিতোহ স্মীতি বা বদ’। খবরে প্রকাশ, রাবণের ভয়ে দেবতারা তির্যগযোনিতে আশ্রয় নেন। যেমন ইন্দ্র ময়ূররূপে, ধর্মরাজ বায়সরূপে, কুবের গিরগিটিরূপে এবং বরুণ হাঁসরূপে সে যাত্রায় রক্ষা পান। অন্যান্য দেবতারাও তথৈবচ।

দৃষ্ট্বা দেবাস্তু তদ রক্ষো বরদানেন দুর্জয়ম।

তির্য্যগযোনিং সমাবিষ্টাস্তস্য ধর্ষণভীরবঃ।।

ইন্দ্রো ময়ূরঃ সংবৃত্তো ধর্মরাজস্তু বায়সঃ।

কৃকলাসো ধনাধ্যক্ষো হংসশ্চ বরুণেহভবৎ।।                    (রা. উত্তরকান্ড ১৮। ৪, ৫)

যজ্ঞাগারের করুণ পরিণতিতে নিরুপায় রাজা মরুত্ত রাবণকে একহাত নেবেন ভেবেছিলেন ‘রণায় নির্যযৌ ক্রুদ্ধঃ’। কিন্তু ঋষি সংবর্ত মরুত্তকে নিবৃত্ত করেন ‘সংবর্তো মার্গমাবৃণোৎ’। তিনি রাবণের আস্ফালনের নেপথ্য কাহিনি মরুত্তকে স্মরণ করিয়ে দেন ‘রাক্ষসশ্চ সুদুর্জয়ঃ’। রাবণের হাড় হিম করা সন্ত্রাসের মোকাবিলায় দেবতারা তো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন। এমনকি রাবণ মরুত্তের যজ্ঞালয়ে থাকাকালীন কোনো দেবতা নিজের আসল রূপটি পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। রাবণ চলে গেলে তবেই তাঁরা স্বরূপ অবলম্বন করেন ‘রাবণে তু গতে দেবা: সেন্দ্রাশ্চৈব দিবৌকসঃ। ততঃ স্বাং যোনিমাসাদ্য…’।

মহাকবি মাঘও রাবণের বাড়বাড়ন্ত ও মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতির বর্ণনা দিয়েছেন (শিশুপালবধ ১। ৪৯-৬৪)। রাবণ পর্বতশ্রেষ্ঠ কৈলাসকে উৎপাটিত করতে প্রবৃত্ত হয়েছিল, ইন্দ্রের সঙ্গে বিরোধিতা করে স্বর্ণপুরী অমরাবতী অবরোধ করেছিল, নন্দনকানন লণ্ডভণ্ড করেছিল, ধনরত্ন লুঠ করেছিল, স্বর্গের মহিলাদের অপরহণ করেছিল—সংক্ষেপে সে অত্যাচারের শেষ সীমায় পৌঁছেছিল।

পুরীমবস্কন্দ লুনীহি নন্দনং

মুষাণ রত্নানি হরামরাঙ্গনা:।

বিগৃহ্য চক্রে নমুচিদ্বিষা বলী

য ইত্থমস্বাস্থ্যমহর্দিবং দিবঃ।।                             (শিশু. ১। ৫১)

রাবণের পাথরের মতন কঠিন গলদেশে বিষ্ণুর সুদর্শন পর্যন্ত আঘাত করতে ব্যর্থ হয় ‘জগৎপ্রভোরপ্রসহিষ্ণু বৈষ্ণবং ন চক্রমস্যাক্রমতাধিকন্ধরম’। আত্মরক্ষায় ব্যর্থ দেবতাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছিল কেমনভাবে তারও নমুনা মহাকাব্যে পাই। রাবণের হুংকারে ভীত, ত্রস্ত ইন্দ্র সারাটা দিনরাত সুমেরু পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করে থাকতেন ‘প্রবিশ্য হেমাদ্রিগুহাগৃহান্তরং নিনায় বিভ্যদ্দিবসানি কৌশিকঃ’। হায়, দেবতাদেরই একজনের বরে দেবতাদের রাজা দেবতাদেরই নিরাপত্তা দিতে পারেননি। এসব মিথ-কথা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দেবতাদেরই অর্পিত ক্ষমতায় একজন ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে দেবতাদেরই প্রতিস্পর্ধা জানিয়েছে এবং সেই ক্ষমতাবানের রক্তচক্ষুতেই দেবতারা ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচার’ নীতি নিয়ে অন্য যোনিতে রূপ পরিগ্রহ করে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থেকেছেন। আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারই হত্যাযজ্ঞে অংশ নিতে নিজেরা নিরুপায় হয়ে পরিকল্পনা করেছেন।

রাক্ষসরাজের পুত্র ইন্দ্রজিৎও ব্রহ্মার বরে ‘ব্রহ্মশির’ নামক অস্ত্র লাভ করেছিল ‘অস্ত্রং ব্রহ্মশিরঃ প্রাপ্তম’। বিভীষণের থেকে পাঠক জানতে পারেন যে, ব্রহ্মা ইন্দ্রজিৎকে শর্তাধীন মৃত্যুর বর দিয়েছিলেন। সর্বলোকেশ্বর ব্রহ্মাই বলেন যে—নিকুম্ভিলা যজ্ঞগৃহে সমাপ্তযজ্ঞ ইন্দ্রজিৎ অবধ্য হবেন। তবে ব্যতিক্রম ঘটলেই কেবল তার মৃত্যু। ইন্দ্রজিৎকে হত্যা করার ওই কেবলমাত্র একটিই উপায় ছিল—তারও মূলে ব্রহ্মা ‘বরো দত্তো মহাবাহো সর্বলোকেশ্বরেণ বৈ’।

শব্দসংকেত :

রা.

রামায়ণ

বি.পু.

বিষ্ণুপুরাণ

শিশু.

শিশুপালবধ

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%