অমিত ভট্টাচার্য
মান্ধাতা-মিথ বড়ো আশ্চর্যজনক কাহিনি। মান্ধাতা পিতার গর্ভজাত সন্তান। মান্ধাতার পিতা যুবনাশ্ব রাজা ছিলেন। সেকালে ট্রান্সজেণ্ডারের বিজ্ঞান ছিল না। লিঙ্গ পরিবর্তনকারী আমেরিকার টমাস যেভাবে সন্তানস্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রসবের দিন গুনেছেন যুবনাশ্বের ক্ষেত্রে (মান্ধাতার পুরুষ-মা) সেই আনন্দ-বিহ্বলতার খবর শোনা যায়নি। বরঞ্চ যুবনাশ্বের গর্ভধারণের চাঞ্চল্যকর সংবাদে রাজা যুবনাশ্ব স্বয়ং কিঞ্চিৎ বিব্রত অনুভব করেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল অপুত্রক যুবনাশ্বের মনমরা ভাব থেকে। অগাধ সম্পত্তির মালিক রাজা যুবনাশ্ব ছেলে-ছেলে করে উন্মত্তপ্রায়। রাজ্যপাট, প্রজাপালন ধর্ম শিকেয় তুলে বনেবাদাড়ে মুনিদের আশ্রমে আশ্রমেই ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। বুক-ভরা বেদনায় চোখে জলের রেখা গোপন থাকেনি। পুত্রহীন যুবনাশ্বের মনে হত পৃথিবীর সমস্ত রূপ-রস থেকে তিনি বঞ্চিত। আসলে এই ব্যাপারে যুবনাশ্বকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। যুবনাশ্ব নামি রাজা হলেও মানুষ তো! আর প্রত্যেক মানুষের অব্যর্থ অভ্যাসে একটা ঐকতানও যে থাকে —সেটি উপক্ষোর নয়। গৃহজীবন, গৃহিণী, পরিবার, সন্তানাদি ইত্যাদিক্রমে সেই ধারা বিঘ্নিত হলেই সংবেদনশীল মানুষ মুষড়ে পড়ে। রাজা যুবনাশ্বের সাধ ছিল রাজ-পরিবারের সমৃদ্ধি। অথচ স্বপ্নপূরণে একশো ভাগ অসফল যুবনাশ্বের ভুবন শূন্যরূপে অনুভূত হয় কষ্টং খল্বনপত্যতা। আশ্রমে আশ্রমে মুনিজন সান্নিধ্য লাভে শশব্যস্ত যুবনাশ্ব আজ কৃপাপ্রার্থী। যুবনাশ্ব কিছুতেই ভুলতে পারছেন না প্রজনার্থং স্ত্রিয়ঃ সৃষ্টা: সন্তানার্থঞ্চ মানবা:।
যুবনাশ্ব কি তবে নির্বংশ হবেন! সন্তানের অভাবে রানি যদি আঁটকুড়ি, বাঁজা হন, রাজা যুবনাশ্ব তবে কী বলে সম্বোধিত হবেন? অতল অন্ধকার যুবনাশ্বকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। রাজৈশ্বর্য ও বিষয়-সম্পত্তির কথা ভেবে যুবনাশ্বের যুক্তিবোধ গুলিয়ে যায়। দিনের পর দিন আশ্রমবাসী হবার ফলে অপুত্রত্ব-নিবন্ধন যুবনাশ্ব নির্বিণ্ণ হতে থাকেন।
আশ্রমবাসী যুবনাশ্ব আর আগন্তুক নন। আশ্রমের সকলেই রাজাকে চেনেন, তার মনোবেদনা জানেন। যখন-তখন কান্নায় ভেঙে পড়া রাজাকে সান্ত্বনাও দেন। পরম্পরাবাহিত প্রথাকে অনুসরণ করে যুবনাশ্বকে পিতৃত্ব দিতে মুনিজনেরা চেষ্টার ত্রুটি করলেন না। শুরু হল সন্তানার্থে যজ্ঞানুষ্ঠান কৃপালুভিস্তৈর্মুনিভিরপত্যোৎপাদনায় ইষ্টি: কৃতা। যুবনাশ্ব আশায় বুক বাঁধেন। মুনিদের অনুষ্ঠিত যজ্ঞকার্যের বেলায়ও যুবনাশ্বের মন ছোটাছুটি করে চলেছে। যুবনাশ্ব পরিসংখ্যান নিতে থাকেন অন্তরের অন্তরে, কোন কোন রাজারা সন্তানহীন ছিলেন। তাদের মধ্যে কতজনই বা এধরনের যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন—ইত্যাদি। বিনা যজ্ঞে যে-সকল রাজারা পুত্রমুখ দর্শন করেছেন, তারা কতই না ভাগ্যবান—ইত্যাদি। যুবনাশ্বের মনে দংশনজ্বালাও শুরু হয়। এটা তার পরশ্রীকাতরতা নয়, বরং নিজেকে অক্ষম মনে হয়। এরই মধ্যে হঠাৎ আবার মুনিদের ‘স্বাহা’ মন্ত্রে আহুতি দানে অন্তরের গোপন ইচ্ছেটুকু সিঞ্চিত হয়। সন্তানের জন্য যুবনাশ্ব চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি যত্নে কৃতে যদি ন সিধ্যতি কোহত্র দোষঃ।
যজ্ঞ যখন শেষ হল, তখন প্রায় মধ্যরাত। মুনিজন ক্লান্ত, যুবনাশ্বও তথৈবচ। ক্লান্ত শরীরে যজ্ঞীয় মন্ত্রপূত জলকলস বেদিতে রেখে মুনিরা নিদ্রারূপেণ সংস্থিতার শরণ নিলেন। এদিকে স্বপ্নে বিভোর যুবনাশ্ব কিছুকাল ঘুমোলেও খানিকবাদে তীব্র তৃষ্ণা অনুভব করেন। পিপাসায় গলা তখন শুষ্কপ্রায়। ছেলে-ছেলে করে সারাদিন জলপানের ফুরসৎও মেলেনি। শেষপ্রহরের অন্ধকারে ঝড়ের গতিতে উঠে রাজা যুবনাশ্ব ঘুমজড়ানো চোখে ভুল করে মন্ত্রপূত জলকলসে চুমুক দেন। এবং পরিণামে একচুমুকেই গর্ভাধান।
সহৃদয় মুনিজন জাগ্রত মন্ত্রপূত জলকলস রেখেছিলেন যুবনাশ্বের স্ত্রীর জন্য। কথা ছিল যুবনাশ্বের স্ত্রী সেই সক্ষম-জল পান করে গর্ভবতী হবেন এবং যথাকালে অমিতপরাক্রমশালী পুত্রের জন্ম দেবেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে বিপরীতটি সম্পন্ন হওয়ায় যুবনাশ্ব স্বয়ং পুরুষ-মাতে রূপান্তরিত হলেন। মুনিরা রাজার কাছ থেকে মন্ত্রপূত জলপানের কাহিনি শুনে বিচলিত হলেন। ছেলে-ছেলে করে যে যুবনাশ্ব হাপিত্যেশ করে বসেছিলেন তার ধারক স্বয়ং যুবনাশ্ব নিজে।
মিথকথার বৈশিষ্ট্য হল, মিথকথা যুক্তিকে মান্যতা দেয় না। আজকের আমেরিকাবাসী টমাসের মতন যদি যুবনাশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তায় লিঙ্গপরিবর্তনকারী হতেন এবং আশ্রমে (ক্লিনিকে) কৃত্রিমভাবে তার গর্ভে শুক্রাণু প্রবিষ্ট হত তবে টমাসের মতন যুবনাশ্বও গর্ভবান হয়ে মাতৃত্বের স্বাদ লাভের চাঞ্চল্যকর খবরে যারপরনাই খুশি হতেন। যদিও যুবনাশ্বের সন্তানধারণের মিথ-কথা যে আমাদের পুরুষ-মার কনসেপ্ট সম্বন্ধে অবহিত করেছে—তা অনস্বীকার্য। যুবনাশ্ব যখন মাতৃত্বের আঁচ পেলেন তখন তার সলজ্জভাব এসেছিল কিনা বা যুবনাশ্বের স্ত্রী স্বামীর আদরযত্ন করেছেন কিনা ইত্যাদি পুরাণকার অব্যক্তই রেখেছেন। অত হাজার বছর আগে যুবনাশ্বের ঘটনা যে সমগ্র বিশ্বে মায়ের নতুন এক রূপ উন্মোচিত করেছিল সে-ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মিথ-কথার দৌলতে ভারতবর্ষের ইতিহাসে পুরুষ-মায়ের এমন ঘটনাই প্রথম।

যুবনাশ্বের গর্ভ ক্রমেণ ববৃধে। প্রাপ্তসময়ে যুবনাশ্বের দক্ষিণ কুক্ষি ভেদ করে শিশুপুত্র ভূমিষ্ট হল। পুত্রকামাতুর যুবনাশ্ব অপলকনেত্রে কেবলই নিরীক্ষণ করেন তার হাসি থেকে হাসি, বাণী থেকে বাণী, প্রাণ থেকে প্রাণ পাওয়া পুত্রকে। আশাহীন অন্ধকারময় অতীত থেকে স্বপ্নময় ভবিষ্যতের পানে তাকিয়ে যুবনাশ্ব আজ তৃপ্ত। মুনিদের সহানুভূতির জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
রাজা যুবনাশ্ব সন্তানের জন্ম দিয়েছেন—এহেন চাঞ্চল্যকর খবরে প্রতিবেশী রাজারা আদৌ খুশি হননি নিশ্চয়ই। পার্শ্ববর্তী রাজ্যের কোনো রাজা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ভেঙে পড়লে বরঞ্চ মনের খুশি-খুশি ভাব বজায় থাকে। এজন্য যুবনাশ্ব পুত্রের জন্ম দিয়ে সম্পত্তির একটা হিল্লে করে ফেলেছেন খবরটা শুনে প্রত্যেকেই নড়েচড়ে বসেন, যেহেতু রাজনীতির লীলাখেলা দেবা: ন জানন্তি। বিশেষ করে পুরোনো সীমাবিবাদের বীজ তো নতুনভাবে উপ্ত হল।
জন্মের পরেই নবজাতকের প্রয়োজন ছিল মাতৃদুগ্ধের। যুবনাশ্ব পুরুষ-মা বলে নবজাতক মাতৃদুগ্ধে বঞ্চিত ছিল। মুনিজনেরা যখন মাতৃদুগ্ধের অভাবে শিশুর জীবনধারণজনিত সমস্যা নিয়ে চিন্তিত ঠিক সেই মুহূর্তে একটা অবিশ্বাস্য কান্ড ঘটে গেল।
যুবনাশ্বের মাতৃত্বের সংবাদ কেবল মরলোকেই নয়, বাতাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে সেই খবর পৌঁছেছিল দেবলোকে। সংবাদ শিরোনামে আশ্চর্যজনক খবর পরিবেশিত হওয়ায় দেবতারা উত্তেজনা চেপে রাখতে পারেননি। পরস্পরে বলাবলি করেন সত্যিই দেখছি ন মানুষাৎ পরং কিঞ্চিৎ। করজোড়ে সকলে অধিপতি ইন্দ্রকে বললেন, দয়া করে তিনি যেন খবরের সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য মরভূমিতে অবতরণ করেন। দেবতারাও নিজের চোখ দিয়ে দেখাটাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন।
পুরুষ-মা যুবনাশ্বকে দেখে দেবাধিপতির ভুরু কপালে। তিনি লক্ষ করলেন যুবনাশ্ব সপরিবারে খুশিতে আছেন। কিন্তু নবজাতকের যথাযথ বিকাশের জন্য মাতৃদুগ্ধজনিত ঝঞ্ঝাট মোকাবিলায় তারা অপারগ। ইন্দ্র খোঁজ নিয়ে জানলেন শারীরিক এবং মানসিক দু-দিক থেকেই শিশুটি সুস্থ। ইন্দ্র চাক্ষুষ করলেন শিশুটির মুখের অভিব্যক্তি ও ভাবপ্রকাশের মুখ্য উপাদানসমূহ।
ইন্দ্রের করুণা হল। ত্বরিতগতিতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পুনরায় একঝলক তাকিয়ে নিয়েই নবজাতকের উদ্ভূত সমস্যা নিবারণে নিজের সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করাকে যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করলেন। তিনি জানেন যে, তিনি যদি মনেপ্রাণে চান তবে সমস্যার সমাধান কোনো ব্যাপার নয়। সম্মিলিত মুনিজন এবং সপরিবার যুবনাশ্ব তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে।
ইন্দ্র বললেন—‘এই শিশু আমাকেই পান করবে মাময়ং ধাস্যতীতি। ইন্দ্র শিশুটির মুখে অমৃতস্রাবিনী প্রদেশিনী অঙ্গুলি ধরলেন। নবজাতক ইন্দ্রের অঙ্গুলি চুষতে লাগল এবং বড়ো হল ব্ক্ত্রে চাস্য প্রদেশিনী দেবরাজেন ন্যস্তা, তাং পপৌ। পীত্বা ব্যবর্দ্ধত। শিশুটির নামকরণে অসাধারণত্ব ছিল। প্রত্যুৎপন্নমতি ইন্দ্রের আচরণমতো শিশুপুত্রের নাম রাখা হল ‘মাং ধাতা’ মান্ধাতা। ইন্দ্র জানতেন, স্থায়ী পদ বা অমরত্ব পেতে হলে কিছু অলৌকিক, ব্যাখ্যার অতীত, বিস্ময় উদ্রেককারী কাজকর্ম পৃথিবীতে রেখে যেতে হয়।
পুরুষ-মা যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতাই পরবর্তীকালে চক্রবর্তী হয়ে সদ্বীপা পৃথিবীর অধীশ্বর হন। ইন্দ্রের অমরত্ব সার্থক হয়। আজও মান্ধাতা নামের সঙ্গে ইন্দ্র বিজয়ীর হাসি হাসেন। গৌণার্থে মান্ধাতার কাল অতিপ্রাচীন কালকে সূচিত করে। তবে ইন্দ্রের সান্ত্বনা, যতদিন মান্ধাতা সমাজের বুকে থাকবেন, ততদিন ইন্দ্রও থাকবেন।
____________________________
৩১-০৩-২০০৮, সোমবারের আনন্দবাজার পত্রিকার ‘সন্তান-স্বপ্নে বিভোর আমেরিকার ‘পুরুষ-মা’ শীর্ষক সংবাদ পাঠ করে পুরাণ-গবেষক অধ্যাপক অমিত ভট্টাচার্য আলোচ্য কাহিনিটি পরিবেশন করেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন