অমিত ভট্টাচার্য
নমো বুদ্ধায়। বৌদ্ধদর্শন আমাদের গৌরবের দর্শন। বেদবিরোধী চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়ে, দীর্ঘ পরম্পরাবাহিত ভাবনাকে সমূলে উৎপাটিত করে আপামর মানুষের অন্তরে যিনি স্থায়ী আসনটি দখল করেছেন তিনিই তো ভগবান বুদ্ধ। শাস্ত্রমতে দশ অবতারের অন্যতম ‘কেশব ধৃতবুদ্ধশরীর, জয় জগদীশ হরে’ (শ্রীগীত. ১।১৩)। ধর্ম থাকলে, গুরু থাকলে, মিথ থাকবেই। যিনি অন্ধকার থেকে আলোয় নেবেন তিনি অলৌকিক প্রতিভাধর হবেন, মাত্র তিনটি পদক্ষেপে তিন ভুবন অতিক্রমের ক্ষমতা রাখবেন এবং ভক্তকুল ‘সগদগদং ভীতভীতঃ প্রণম্য’ বলবেন ‘শিষ্যস্তেহহং শাধি মাম’ আমি আপনার শিষ্য, এবার থেকে যা বলবেন তাই করব। অলৌকিকত্বের বিশ্বাসের ভিত্তিতে মিথকথা সম্পূর্ণ হয়। মুখে মুখে সেই মিথকথা ছড়িয়ে পড়ে, দেশ হতে দেশান্তরে শ্রোতাবন্ধুকে আকৃষ্ট করে।
শ্রোতাকে যদি বলা যায় ধান চুরি করলে ইঁদুর হয়, তেল চুরি করলে তেলাপোকা হয়, সুগন্ধি চুরি করলে ছুছুন্দরী (ছুঁচো) হয় (যা.স ৩। ২০৬) এবং এর পেছনকার যুক্তি উপলব্ধির ক্ষমতা শ্রোতার না-থাকে তবে মিথকথা সার্থক হয়ে গেল। আবার পরিণত শ্রোতা যদি উপলব্ধি করেন চৌর্যবৃত্তি নিষেধের জন্য এধরনের অর্থবাদ প্রযুক্ত হয়েছে তখনও মিথ কম সফল নয়। মিথের ভুবন বহুবিস্তৃত। অধ্যাপক বলছেন, অধ্যেতা শুনছেন—তুমি যখন যাবে তখনও খালি হাতে যাবে না। শ্রোতা উন্মুখ। সে কী! ইহলোক ত্যাগের কালেও সঙ্গে কিছু জিনিস নিয়ে যাব? সদর্থক উত্তর দিয়ে অধ্যাপক জানান, সঙ্গে নিয়ে যাবে বিদ্যা, কর্মের ফল ও অতীত সংস্কার ‘তং বিদ্যাকর্মণী সমন্বারভেতে পূর্বপ্রজ্ঞা চ’ (বৃ.উ. ৪। ৪। ২)। অধ্যেতা অবাক বিস্ময়ে শোনেন, একবারের জন্যও প্রশ্ন করেন না আলোচনার বৈধতা নিয়ে, সত্যতা নিয়ে। কেবল বিস্ময়, কেবল মুগ্ধতা। শৃঙ্গগ্রাহিকন্যায়ে এসব দেখানো সম্ভব নয়।
বৌদ্ধ মিথকথা আমাদের আচ্ছন্ন করে, আমরা অভিভূত হই। ৫৭ কোটি ৬০ লক্ষ বছর তুষিত স্বর্গে একটানা বাস করবার পরে দেবতাদের অনুরোধে মানবকল্যাণের জন্য শুদ্ধোদন-মহামায়ার পুত্রত্ব স্বীকার। মহামায়ার কুক্ষিতে শ্বেতহস্তী প্রবেশের স্বপ্নদর্শন। জ্যোতিষের গণনা, লুম্বিনি উদ্যান, শালবৃক্ষের মূলে বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে সন্তান প্রসব। মুগ্ধ জনতা নয়ন মুদে আলোর বলয়ে উদ্ভাসিত হন। জন্মের পরেই শিশুর সপ্তপদ ভ্রমণ এবং ঘোষণা ‘অগগো-হহম অস্মি লোকসস’ (দীঘ. ২য় খন্ড. পৃ: ১৫)। আমি এ জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ। বিভূতিযোগে বর্ণিত কৃষ্ণের কথা মনে পড়ে ‘অহমাত্মা গূঢ়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ/অহমাদিশ্চ মধ্যঞ্চ ভূতানামন্ত এব চ’ (শ্রী. গী. ১০। ২০)।
বালক সিদ্ধার্থের লিপিশিক্ষার কাহিনি নিয়ে ললিতবিস্তর গ্রন্থে আমরা যে মিথকথার সঙ্গে পরিচিত হই তার প্রভাব পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথের শিশুপাঠ্য সংক্রান্ত রচনার মধ্যে লক্ষ করা গেছে। শোনা যায় বালক সিদ্ধার্থের অ-কারাদি বর্ণ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সেই সেই বর্ণের এক-একটি বৈরাগ্যসূচক রহস্যমন্ডিত অর্থ আকাশ থেকে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। যেমন ‘অ’ উচ্চারণমাত্রই ‘অনিত্যঃ সর্বঃ সংসারঃ’। ‘আ’ উচ্চারণমাত্রই ‘আত্মপরিহিতঃ কার্যঃ’ ইত্যাদি। সিদ্ধার্থের লিপিশিক্ষার আদলেই বহুশত বৎসর ব্যবধানের গ্রন্থেও বর্ণকে মনে রাখার জন্য প্রতি বর্ণের সঙ্গে একটি করে সহযোগী ছড়া রচিত হল। যেমন ‘অ’ বললেই—অজগর আসছে তেড়ে, ‘আ’ বললেই—আমটি আমি খাব পেড়ে (বর্ণ পরিচয়) বা ছোটো খোকা বলে অ-আ/শেখেনি সে কথা কওয়া (সহজপাঠ) ইত্যাদি। বর্ণোচ্চারণের বেলায় আকাশবাণী রূপ মিথকথা যেমন পাঠকের বিস্ময় উদ্রেক করে তেমনই অ-কারাদি পড়তে বসে সেই সেই বর্ণকে নিয়ে ছড়াকাটাও শিশুমনে গভীর রেখাপাত করে।
বুদ্ধকে সর্বত্র দেখা যেত। সমগ্র পৃথিবী তাঁর ভ্রমণসীমায় পরিব্যাপ্ত। একবার তিনি ত্রয়স্ত্রিংশ স্বর্গে দেবতাদের অভিধম্ম শিক্ষা দেবার জন্য তিনটি মাত্র পদক্ষেপে উপস্থিত হন। দেবতাদের ধারণা ছিল, ব্রহ্মপদ (ব্রহ্মলোক) স্থায়ী। বুদ্ধ সেখানে সশরীরে হাজির হয়ে দেবতাদের ভুল ধারণা ভেঙে দেন। তাঁর মতে স্থায়ী কিছুই নয়। (মজ. প্রথম. পৃ: ৩২৬)। এই মিথকথা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দেবতারাও অজ্ঞতার স্বীকার। মর্ত্যের মানুষ দেবতাদের ভ্রান্ত জ্ঞানও সংশোধন করে দেন। বৌদ্ধেরা বলে থাকেন বুদ্ধের জননীর গর্ভ পবিত্র করন্ড তুল্য (পুষ্পভাজন)। অন্য কেউ সেখানে বাস করে যাতে গর্ভের পবিত্রতা নষ্ট করতে না-পারে সেজন্য সন্তান প্রসবের এক সপ্তাহ পরেই মায়াদেবী দেহত্যাগ করে তুষিত স্বর্গে চলে যান।
বুদ্ধের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই হয়েছিল দেবলোকে উল্লাস। ত্রিকালদর্শী অসিতদেবলের আগমন। বুদ্ধ একেবারে অসিতদেবলের জটায় পদার্পণ করলেন। ইনিই ঘোষণা করেন শিশুপুত্র ৩৫ বৎসর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভ করবেন। তথাগত বুদ্ধের সমগ্র জীবন অলৌকিকত্বে ভরপুর। যখন তিনি ভিক্ষায় বের হন তখন মৃদুমন্দ বাতাস তাঁর আগে পথ পরিষ্কার করছে, পথের ধুলো যাতে কোনোভাবেই অসুবিধে না-করতে পারে সেজন্য মেঘমালা হালকা বর্ষণে যেন জলসিঞ্চন করছে, আতপের হাত থেকে বুদ্ধকে রক্ষার জন্য মেঘ মাথার ওপরে চাঁদোয়ার আস্তরণ যেন বিছিয়ে রাখে। তাঁর প্রতি পদক্ষেপে পদ্মের প্রকাশ শ্রীচরণের অলৌকিকত্বের ঘোষক। বায়ুমার্গে দীর্ঘ পথ অতিক্রমে তিনি সক্ষম ছিলেন। পালিগ্রন্থ জানিয়েছে বুদ্ধ ছিলেন অলৌকিক অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন পৃথিবীবেত্তা পুরুষ ‘লোকবিদ’। নিজেরই দেহ থেকে বিচ্ছুরিত প্রভায় তিনি সব দেখতে পেতেন। মূলত তাঁরই প্রত্যক্ষ ভূমিকায় পর্জন্যদেব কোশলের আকাশে আবির্ভূত হন এবং দীর্ঘ অনাবৃষ্টির হাত থেকে প্রাণীকুলকে রক্ষা করেন (মৎস্যজাতক, ৭৫)।
সংযুক্তনিকায় শুনিয়েছে শ্রীবুদ্ধের চরণাশ্রিত বিপদ থেকে মুক্ত হন। চন্দ্র ও সূর্য রাহু নামক অসুর কর্তৃক আক্রান্ত হয়েও বুদ্ধের চরণবন্দনা করেন। দীঘনিকায়ের মতে বুদ্ধ হলেন সকল দেবতার শীর্ষে। এমনকি ব্রহ্মাও তাঁর কাছে নস্যি। বস্তুত তিনিই শ্রেষ্ঠ ও পৃথিবীর নিয়ন্তা। পালি ও সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী দেবতারা বুদ্ধের দর্শনে আসতেন, তাঁর অমৃতকথা শ্রবণের অভিলাষ প্রকাশ করতেন (দীঘ ২য় খন্ড. সদ্ধর্মপুন্ডরীক, প্রথম অধ্যায়)। হীনযান সাহিত্য অনুসারে (সং. প্রথম খন্ড, পৃ. ৪৭ এবং মজ. তৃতীয় খন্ড. পৃ. ১২০) সমগ্র চক্রবাল ভগবান বুদ্ধের দেহ থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় উদ্ভাসিত। মিলিন্দপঞহ জানিয়েছে বুদ্ধ মর্ত্যে অবতরণ করেই পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণে দৃষ্টি রাখলেন। পরিণামে ‘অনেকানি চক্কবালসহহ নি’ দৃষ্টিগোচর হল। ওই দিনই তিনি নিরীক্ষণ করলেন বহুনীচে ‘অবীচি’ নামক ভয়ংকর নিরয়স্থান (নরক) এবং সকলের ওপরে ‘অকনিত্থ’ নামক স্বর্গধাম। শোনা যায়, যখন বোধিসত্ত্ব তুষিত নামক দেবলোক থেকে জননী মায়ার গর্ভে এলেন তখন এক চোখ-ধাঁধানো আলোয় দেবলোক, ব্রহ্মলোক এবং মরলোক উদ্ভাসিত হয়েছিল— যে আলোর তীব্রতার দরুন এক লোকের অধিবাসী অন্য লোক অবলোকন করেছিলেন। মহাযানী বৌদ্ধদের মিথকথাতেও এই অলৌকিক বুদ্ধ-রশ্মির বিবরণ মেলে (শতসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা, সদ্ধর্মপুন্ডরীক দ্রষ্টব্য)।
মিথকথায় স্বর্গ, নরক অবধারিত। স্বর্গ হল ভালো কাজের পুরষ্কার। সকল যুগের মিথসাহিত্যই একই বাণী ঘোষণা করেছে ‘সাধুকারী সাধুর্ভবতি পাপকারী পাপো ভবতি, পুণ্যঃ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি, পাপঃ পাপেন’ (বৃ.উ. ৪। ৪)। হিন্দুশাস্ত্র মতে ‘দুঃখবিরোধী সুখবিশেষশ্চ স্বর্গঃ (সা. কৌ)। কুমারিল বলেছেন, ‘যন্ন দুঃখেন সম্ভিন্নং ন চ গ্রস্তমনন্তরম / অভিলাষোপনীতঞ্চ তৎ সুখং স্বঃ পদাস্পদম’ (ত. বা.)। হীনযান, মহাযান ভেদে উভয়বিধ সম্প্রদায়ই স্বর্গকে দু-শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যথা—১. দেবলোক এবং ২. ব্রহ্মলোক। প্রাসাদের বিভিন্ন তলের ন্যায় স্বর্গও একে অন্যের উপরে। উন্নত পুণ্যকর্মের অধিকারীরাই স্বর্গলোকের বাসিন্দা। দীঘনিকায়ের মতে কায়মনোবাক্যে সম্পূর্ণ সৎ হলে তবেই মৃত্যুর পর স্বর্গগমন হয় (প্রথম খন্ড, পৃ. ৮২)। অঙ্গুত্তরনিকায় জানিয়েছে—নৈতিকতায় বিশ্বাসী, কৃতজ্ঞ, উৎসাহী এবং প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই স্বর্গে হাজির হন (দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ২২৬-২২৭)। চরবগ্গতে বলা হয়েছে, যাঁরা ধর্মকে কলুষিত করেন না তাঁরাই স্বর্গসুখ ভোগে সক্ষম (অঙ্গু. দ্বিতীয়, পৃ. ১৯)। সুমনবগ্গর মতে যাঁরা উদার, অর্থীকে দেখে মুখ ফিরেয়ে নেন না তাঁদের স্বর্গবাস অবধারিত (ওই. তৃতীয়, পৃ. ৩৯-৪০)। এ ছাড়া বুদ্ধানুরাগী, আর্যসত্যানুসারী ব্যক্তিদের স্বর্গ অবধারিত। পঞ্চগতিদীপন শুনিয়েছে চরিত্রগুণে দেবলোক এবং ধ্যানের সহায়তায় ব্রহ্মলোকের অধিকারী হওয়া যায় ‘শীলেন ত্রিদিবং যাতি ধ্যানেন ব্রহ্মসম্পদম’।
দেবলোকের নামান্তর কামলোক। এই দেবলোক ব্রহ্মলোক অপেক্ষা নিম্নমানের। ষড়বিধ দেবলোকের নীচ থেকে উপরের ক্রমটি হল: ক. চতুর্মহারাজিক খ. ত্রয়স্ত্রিংশ গ. যামলোক ঘ. তুষিত ঙ. নির্মাণরতিলোক চ. পরনির্মিতবশবর্তী (অঙ্গু. প্রথম খন্ড. পৃ. ২২৭-২২৮)। পঞ্চগতিদীপনের মতে যাঁরা আত্মসুখের অভিলাষী নন এবং অন্যের সম্পত্তিতে লোভ করেন না তাঁরাই চতুর্মহারাজিক ধামে উপনীত হন (Journal of the Pali text society. 1884 p. 160)। মঘ এবং তাঁর বত্রিশ সঙ্গীকে উপজীব্য করেই ত্রয়স্ত্রিংশ নামকরণ হয়েছিল বলে সংযুক্তনিকায়ের অভিমত। অনেকের মতে ত্রয়স্ত্রিংশ স্বর্গলোকের ধারণা বৈদিক তেত্রিশ দেবতা থেকে ধার করা হয়েছে (বারো আদিত্য, আট বসু, একাদশ রুদ্র এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়)। সুমেরু (সিনেরু) পর্বতের শীর্ষে ত্রয়স্ত্রিংশের অবস্থান। মূলত এটি ছিল অসুরদের বাসস্থান। কিন্তু শক্ররূপী মঘ অসুরদের পর্বতশীর্ষ থেকে বিতাড়ন করেন। অসুরেরাও অবদমিত না-হয়ে পর্বতের পাদদেশে অসুরভবন গড়ে তোলেন। দেবাসুরের মধ্যে সীমাবিবাদ (Boundary dispute) নিশ্চয়ই ছিল। কারণ ত্রয়স্ত্রিংশের সীমানার সূচক ছিল পারিচ্চটক বৃক্ষ (পারিজাত) এবং অসুরভবনের সীমানার সূচক ছিল চিত্তপাটলি বৃক্ষ (সং. পঞ্চম, পৃ. ২৩৮)। ত্রয়স্ত্রিংশের বিস্তার দশহাজার যোজন। পার্ক, লেক কী নেই সেখানে! (জাতক প্রথম, পৃ. ২০৪; ষষ্ঠ, পৃ. ১৩১-১৩২)। হস্তীরাজ ‘এরাবন’ এবং ‘সুধম্মা’ সভাকক্ষ এখানকার নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য।
পার্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নন্দনবন। অধিপতি ইন্দ্র বিনোদনের জন্য দলবল নিয়ে এখানেই খানিকটা সময় অতিবাহিত করেন (অঙ্গু. তৃতীয় খন্ড, পৃ. ৪০)। দর্শনার্থীদের অন্তরের অপরিসীম আনন্দই এই পার্কের নামকরণের সার্থকতা বহন করেছে। কথিত আছে প্রতিটি দেবলোকেই নন্দনবন রয়েছে ‘সব্ব দেবলোকেসু হি নন্দনবনম অত্থি এব’ (জাতক, প্রথম, পৃ. ৪৯)। এই নন্দনবনে নন্দন নামে পাঁচশো যোজন বিস্তৃত একটি লেক রয়েছে। লেকটিতে একশোটি স্নানের ঘাট এবং পাঁচ রকম নয়নাভিরাম পদ্ম লক্ষণীয়। এ ছাড়াও রয়েছে পাঁচশো যোজন বিস্তৃত ‘চিত্তলতাবন’ নামক আরেকটি পার্ক। এখানেই আশাবতী নামে এক বৃক্ষলতা আছে, যার ফল থেকে দৈবপানীয় তৈরি হয়। একবার এই পানীয়ের স্বাদ পেলে দীর্ঘ চারমাসব্যাপী মোহিতাবস্থা থাকে। তবে আক্ষেপের বিষয় হল, হাজার বছরে একবার মাত্র এতে ফলাগম হয়। দেবতারা সাগ্রহে এর জন্য অপেক্ষা করে থাকেন (জাতক, তৃতীয়, পৃ. ২৫০-২৫১)।
অসুরদের পরাস্ত করে বিজয়োল্লাসে উৎফুল্ল শক্র ‘বিজয়ন্ত নামে এক প্রাসাদ নির্মাণ করেন। নশো যোজন বিস্তৃত ‘সুধম্মা’ সভাগৃহ স্বর্ণখচিত। সভার মধ্যভাগে রত্নময় সিংহাসন, যার মাথায় তিন যোজন বিস্তৃত স্বর্ণছত্র। কখনও-সখনও অপর দেবলোক ও ব্রহ্মলোকের অধিবাসীরা সেখানে অতিথিরূপে আসেন। প্রতিটি দেবলোকেই সুধম্মা সভাকক্ষ রয়েছে (থেরগাথা ভাষ্য, দ্বিতীয় পৃ. ১৮৫)। ত্রয়স্ত্রিংশ এবং তুষিত স্বর্গলোকের মধ্যস্থলকে ‘যাম’ বলা হয়। মৃত্যুর দেবতা যমের সঙ্গে একে তালগোল পাকিয়ে ফেললে চলবে না। যারা যুদ্ধবাজ নন তারাই এখানে আসতে সক্ষম। তুষিত নামক দেবলোকের অধিবাসীরা প্রত্যেকেই স্বর্গীয় সম্পদে তৃপ্ত। নির্মাণরতির অধিবাসীবৃন্দ নিজেদের সৃষ্টিতেই আনন্দিত থাকেন। আনন্দের দরুন এঁরা রূপ পরিবর্তনে সক্ষম। এঁদের রাজা সুনিম্মিত। দেবলোকের সর্বোচ্চ স্তরের নাম হল পরনির্মিতবশবর্তী। অপরকে সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা এঁদের মধ্যে থাকার জন্য এই নামকরণ করা হয়েছে।
পালিসাহিত্যে বর্ণিত ব্রহ্মলোকের সঙ্গে ব্রাহ্মণসাহিত্যের সম্বন্ধ খুঁজতে যাওয়া বৃথা। জগতের স্রষ্টারূপে প্রজাপতি ব্রহ্মা এখানে বিবেচ্য নয়। বুদ্ধদেব বহু ব্রহ্মার কথা বলেছেন বটে। কিন্তু তাঁরা কেউই সর্বোচ্চ পদাধিকারী নন। অঙ্গুত্তরনিকায় (পঞ্চম. পৃ. ৫৯) মহাব্রহ্মার কথা শোনালেও তাঁর পদটিও অস্থায়ী। মৈত্রী, করুণা, মুদিতা (সহানুভূতি) এবং উপেক্ষার গুণে ব্রহ্মলোকে জন্ম হয়। কথিত আছে বুদ্ধ তাঁর বিশিষ্ট শিষ্যদের নিয়ে এই অঞ্চলে আসতেন এবং তাঁদের শিক্ষা দিতেন।
কুড়িটি স্বর্গবিশিষ্ট ব্রহ্মলোক দু-ভাগে বিভক্ত, যথা—ক. রূপব্রহ্মলোক (১৬টি) এবং খ. অরূপব্রহ্মলোক (৪টি)। ব্রহ্মলোকের সকল বাসিন্দা ইন্দ্রিয়জ বাসনা মুক্ত। রূপব্রহ্মলোকের দেবতাগণ শরীরী। পক্ষান্তরে অরূপব্রহ্মলোকের দেবতারা অশরীরী—শুদ্ধ জ্যোতির্ময়। বাহাত্তর জন ব্রহ্মার কথা সংযুক্তনিকায় জানিয়েছে (প্রথম খন্ড, পৃ. ১৪২)।
স্বর্গ যেমন আনন্দের, নরক তেমন দুঃখের। মহানরক আটটি, যথা—সঞ্জীব, কালসূত্র, সংঘাত, রৌরব, মহারৌরব, তপন, প্রতাপন এবং অবীচি। বৌদ্ধমতে আরও বহু নরক আছে। এদের মধ্যে কিছু লোকান্তরিক ও কিছু উৎসাদ নামে অভিহিত। হিন্দুদের পুরাণসাহিত্যে নরক বিষয়ে বহুকথা লিখিত আছে। পাপীরা যে স্থানে যাতনা ভোগ করেন তার নাম নরক। পুরাণশাস্ত্রে ছিয়াশিটি ক্লেশকর নরককুন্ডের বর্ণনা পাই ‘ষড়শীতিশ্চ কুণ্ডানি’ (ব্র. পু. প্রকৃতিখন্ড, ২৭তম অধ্যায়)।
মনুষ্যসমাজ ও মানবজীবনের পক্ষে বিপজ্জনক কতিপয় অশুভশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় বৌদ্ধ মিথকথায়। যেমন—অসুর, যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ ও মার প্রভৃতি। অসুর নামের নেপথ্য কাহিনিটি চমকপ্রদ। শক্র তাঁর অনুগামীদের নিয়ে একবার অসুরলোকে জন্ম নেন। অসুরেরা সেখানে দেবতাদের জন্য ‘গন্ধপান’ নামে এক বিশেষ পানীয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। দেবতারা সেটি স্পর্শ করেননি। কিন্তু অসুরেরা সেই ‘গন্ধপান’ পান করেন এবং অব্যবহিত পরেই অচৈতন্য হয়ে পড়েন। সুযোগের সদব্যবহারে অভ্যস্ত দেবতারা অসুরদের সুমেরুর পাদদেশে নিক্ষেপ করেন। যখন অসুরেরা জ্ঞান ফিরে পান তখন শপথ নেন জীবনে কোনোদিন সুরা (Sura) স্পর্শ করবেন না। এইভাবে তখন থেকে অ-সুরা শব্দের প্রচলন হয়ে গেল (P. T. S. প্রথম, পৃ. ৩৩৮)।
যক্ষের বিভিন্ন শ্রেণী ছিল। সর্বোচ্চ ক্ষমতাধিকারী যক্ষ দেবপ্রায় শক্তিসম্পন্ন এবং সর্বনিম্ন যক্ষ প্রেতসদৃশ। যক্ষরা সাধারণত রক্তচক্ষু, ছদ্মবেশী, রাতের গভীরতার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মুখর হয়ে থাকে (জাতক, পঞ্চম, পৃ. ৯১)। যক্ষদের আবার লিঙ্গভেদ আছে (নারী, পুরুষ)। যক্ষিণী বড়ো সাংঘাতিক, এরা পুরুষ যক্ষ অপেক্ষা অধিকতর হিংস্র এবং অশুভসম্পাদনকারিণী। এরা শিশু খাদক। তবে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তও চোখে পড়ে। পদকুশলমানব জাতক (৪৩২) এবং জয়দ্দিস জাতক (৫১৩) যক্ষিণীর স্নেহপ্রেমের নমুনা বহন করে। যক্ষের প্রসঙ্গ কেবল বৌদ্ধ মিথকথাতেই নয়, প্রাচীন ভারতে পৌরাণিক সম্প্রদায় ঐতিহ্য প্রমাণের আলোচনা প্রসঙ্গে বটবৃক্ষে যক্ষ থাকার প্রসঙ্গ এনেছেন ‘ইহ বটে যক্ষঃ প্রতিবসতীতি’। নৈয়ায়িক জয়ন্ত ভট্টের মতে প্রদত্ত উদাহরণ আগমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। ঐতিহ্য হল একধরনের প্রবাদ পরম্পরা যেখানে নির্দিষ্টরূপে বক্তার অভিধান নেই। নির্দিষ্ট বটগাছে যক্ষ থাকে কি-না কে বলতে পারে? কেউ তো কখনও যক্ষের শরীর অবলোকন করেনি:
ঐতিহ্যন্তু ন সত্যমত্র হি বটে যক্ষেহস্তি বা নেতি বা।
কো জানাতি কদা চ কেন কলিতং যক্ষস্য কীদৃগ বপু:।। (ন্যা.ম. প্রথম আহ্নিক)
মহাযানবিংশক বড়ো ভালো কথা শুনিয়েছে:
যথা চিত্রকরো রূপং যক্ষস্যাতিভয়ঙ্করম।
সমালিখ্য স্বয়ং ভীতঃ সংসারেহপ্যবুধস্তথা।। (শ্লোক - ৮)
মার হল শয়তান, সর্বদাই শুভকাজের ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী। সৎসংকল্প ভেস্তে দিতে মারের জুড়ি মেলা ভার। সিদ্ধার্থের বোধিলাভের পূর্বে মার যথাশক্তি প্রতিকূল আচরণ করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। শোনা যায়, ভিক্ষুরা গ্রামে প্রবেশ করলে মার নাকি গ্রামবাসীদের হৃদয় কঠোর করে তোলে। ফলে ভিক্ষাদানের পরিবর্তে ভিক্ষুকদের ভর্ৎসনা করে গ্রামবাসীরা তাড়িয়ে দিত। তিন মেয়ে ও তিন ছেলে নিয়ে মারের ভরা সংসার। এরা হল তৃষ্ণা, রতি ও প্রীতি এবং দর্প, হর্ষ ও বিভ্রম। সাকুল্যে ছ-জন মারের সঙ্গে একত্রিত হলে সব ছারখার হয়। উচ্চাসনে আরোহণের অভিপ্রায় এদের দাপটে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। ব্যতিক্রমী কয়েকজন সিদ্ধ পুরুষ ব্যতীত মারের আস্ফালনের ঢেউয়ে সকলেই হাবুডুবু খান এবং পরিণামে ভয়ার্ত চিত্তে আত্মসমর্পণ করেন। শান্তসংকল্প ভাবটিই উবে যায়। খদিরাঙ্গারজাতকে মারকে ‘কূটকর্মা’ বলা হয়েছে। বৌদ্ধদের মার, হিন্দুদের কন্দর্প ও খ্রিস্টানদের শয়তানের মধ্যে অনেক পারস্পরিক সাদৃশ্য আছে। গৌতমের দিব্যদৃষ্টি লাভে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য মার চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। কিন্তু মার ব্যর্থ হয়। পিতার মনমরা ভাব দূর করতে ছেলে-মেয়েরা মারকে সাহস জুগিয়েছে। পিতার সঙ্গে জোট বেঁধে লড়াই করেছে। ছেলে-মেয়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধের নেতৃত্ব নিজে দিয়েও মার সফল হতে পারেনি (বুদ্ধচরিত, ললিতবিস্তর দ্রষ্টব্য)। মারের বিকট সৈন্যবাহিনী ক্লান্ত, পর্যুদস্ত। বুদ্ধ মারকে প্রাণে মারেননি। তিনি মারকে পরাস্ত করেছেন এবং মানবজাতিকে মারকে হারানোর উপায় শিক্ষা দিয়েছেন। সৈন্যদের নিয়ে মার গৌতমের তপস্যাভঙ্গের আয়োজনে উদ্যত—এই চিত্র অজন্তার গুহায় দেখা যায়। চিত্রের একটি বড়ো আকারের প্রতিকৃতি বিশ্বভারতীর চীনভবনেও রয়েছে। সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ বলেন, তিব্বতীয় গ্রন্থানুসারে মারকে জয় করার জন্যই সিদ্ধার্থ ‘অর্হন’ নাম পান। অরি হন থেকে অর্হন হয়েছে। জীবের মহাশত্রু মারবিজয়ী বলে সিদ্ধার্থ অর্হন।
জাতকে আমরা অপর একটি অশুভ চরিত্রের সন্ধান পেয়েছি যার নাম ‘জুজুক’। বাংলার ঘরে ঘরে এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও শিশুপুত্র-কন্যারা ‘জুজু’ নাম শ্রবণমাত্রেই মাতৃক্রোড়ে ভয়ার্তচিত্তে আশ্রয় নেয়। কল্পিত জুজু-র ভয় দেখিয়ে খেতে না-চাওয়া শিশুদের খাওয়ানো মায়েদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বেসসন্তরজাতকে (৫৪৭) বর্ণিত জুজুক-এর জুজুতে রূপান্তর বিষয়ে জাতকের অনুবাদক ঈশানচন্দ্র ঘোষমশাই মন্তব্য করেছেন। ভীমদর্শন জুজুকের চওড়া পা, লম্বা নখ যে শিশুমনে ত্রাসের সঞ্চারে যথেষ্ট তা বলাই বাহুল্য। ছেলেধরা জুজুকের গল্পের গুণেই শিশুসন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে বহুমায়েরা অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সুযোগ পান।
বৌদ্ধ মিথকথা আমাদের জন্মান্তরে বিশ্বাস উৎপাদন করতে শিখিয়েছে। আজকের সভায় আমার ডানদিকে তৃতীয় সারিতে চতুর্থজন যিনি বসে মনোযোগ সহকারে শুনছেন তিনি এইভাবেই দূর অতীতে বারাণসীতে, তক্ষশীলায় অধ্যয়নে ব্যাপৃত ছিলেন। বহুবার বলা হলে শ্রোতার মনোযোগ তীব্রতর হয়। অন্যেরা কৌতূহলী হন। এজন্য বিবিধ ধর্মগ্রন্থের মিথকথাগুলো একশো ভাগ সফল। কথকঠাকুর যদি জন্মান্তরের কথা শৈল্পিক মর্যাদায় নিয়ে আসতে পারেন তবে পরিণাম বলাই বাহুল্য। শ্রীমদভগবদগীতায় কৃষ্ণকথিত জন্মান্তর প্রসঙ্গের শ্লোকটি আজও বহুমানুষের মনে কম্পন সৃষ্টিতে সক্ষম:
বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।। ৪। ৫
জাতককথা বুদ্ধদেবের অতীত জন্মবৃত্তান্ত। বৌদ্ধদের বিশ্বাস হল, শুদ্ধ এক জন্মের কর্মফলে কোনো ব্যক্তি গৌতমের মতন অপার বিভূতিসম্পন্ন হতে পারেন না। তিনি বোধিসত্ত্ব বা বুদ্ধাঙ্কুর বেশে কোটিকল্পকাল বিবিধ যোনিতে বারংবার জন্ম নিয়ে দানশীলাদি সদাচরণের দ্বারা চরিত্রের ক্রমোন্নয়ন ঘটিয়ে পরিণামে পূর্ণপ্রজ্ঞা লাভ করেন এবং অভিসম্বুদ্ধ হন। লোককল্যাণের জন্যই অতীতকথার অবতারণা। লক্ষ্য জীবের ভাবান্তর ঘটানো, তাকে নির্বাণ অভিমুখী করে তোলা। এজন্য ‘পুরাকালে বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের সময়ে’ বাক্যটি শ্রবণমাত্রই শ্রোতা উৎকর্ণ হন এবং জানতে চান তারপর, তারপর ‘ততঃ কিম, ততঃ কিম’?
বৌদ্ধ মিথকথা নীতিধর্মী। জনৈক ভিক্ষু সংসার ত্যাগ করেও স্ত্রীর কথা ভুলতে পারছেন না। এখনও তার ‘নিশিদিশি অনুক্ষণ প্রাণ করে উচাটন/বিরহ অনলে জ্বলে তনু’ বা ‘সই পিরিতি না জানে যারা / এ তিন ভুবনে জনমে জনমে কি সুখ পেয়েছে তারা’ প্রায়ই বলতে ইচ্ছে হয়। শাস্তা তখন জেতবনে ছিলেন। কামান্ধ ভিক্ষুকের কথা জেনে তিনি বলেন, এ অতীত জন্মেও স্ত্রীর জন্য প্রাণ হারাতে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার করুণায় সেবার রক্ষা পায়।
শুরু হল মিথকথা। পুরাকালে বারাণসীর রাজা ব্রহ্মদত্তের পুরোহিত ছিলেন বোধিসত্ত্ব। একদিন কৈবর্তেরা নদীতে যখন জাল দেয় তখন এক বৃহৎ মৎস্য-মৎসীর সঙ্গে গল্প করতে করতে যাচ্ছিল। মৎসী আগে, মৎস্য পিছনে, যা হয়ে থাকে সচরাচর। মৎসী রক্ষা পেলেও কামান্ধ মৎস্য ‘জালেন বদ্ধঃ’। মৎস্যের অন্তরে বড়ো বেদনা, দুঃখ। অন্যের খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য তার দুঃখ নেই। মৎসী তাকে না-দেখে যদি ভাবে সে অপর মৎসীর সঙ্গে চলে গিয়েছে—এই তার দুঃখ। ‘ন মানিনী সংসহতে অন্যসঙ্গমম’। ঠিক সেই সময় নদীর তট ধরে রাজপুরোহিত বোধিসত্ত্ব যাচ্ছিলেন। তিনি ইতর প্রাণীর ভাষাও বোঝেন। মৎস্যের অশ্রু বোধিসত্ত্বকে চিন্তিত করল। তিনি ভাবলেন, এই কামভাব নিয়ে যদি মৎস্যটি প্রাণত্যাগ করে তবে নরকগমন অবশ্যম্ভাবী। অতএব একে উদ্ধার করতে হবে। দয়াদ্র বোধিসত্ত্ব জেলেদের কাছে জানতে চাইলেন, তারা কি কোনোদিন একটি মৎস্যও বোধিসত্ত্বকে দেবে না। উৎফুল্ল জেলেরা বোধিসত্ত্বকে যেকোনো মৎস্য নিতে অনুরোধ করলেন। বোধিসত্ত্ব সানন্দে কামান্ধ মৎস্যটিকে নিয়ে দূরে নদীতে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন কামভাব পরিহার করো।
রাগাদিজ্ঞানসন্তানবাসনোচ্ছেদসম্ভবা
চতুর্ণামপি বৌদ্ধানাং মুক্তিরেষা প্রকীর্তিতা।। (বি. বি.)
সিদ্ধান্ত হল, পূর্বজন্মের মৎস্য এই জন্মে ভিক্ষু, মৎসী এই জন্মে ভিক্ষুর পত্নী এবং রাজপুরোহিত স্বয়ং বুদ্ধ। এই মিথকথা আমাদের জানতে সাহায্য করে, কালের চক্র অপ্রতিহত গতিতে ভ্রাম্যমান হলেও ‘এক দুজে কে লিয়ে’ ‘বা যদিদং হৃদয়ং তব’ কনসেপ্ট অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে (মৎস্যজাতক, ৩৪)।
কোন মিথকথা শিখিয়েছে যা পাচ্ছ, তাতেই খুশি থাকো। এক স্থূলাঙ্গী কুমারীর প্রণয়াসক্ত জনৈক ভিক্ষুকে শাস্তা জানালেন যে, সে এর জন্য পূর্বেও মরেছিল। শ্রোতা উৎকর্ণ। জেতবনে শাস্তা বলেন, পুরাকালে বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের সময় বোধিসত্ত্ব গোজন্ম নিলেন (মহালোহিত)। সঙ্গে তার ভাই চুল্ললোহিত। উভয়েই বড়োলোক ভূস্বামীর গৃহপালিত। সেই ভূস্বামীর মুনিক নামে একটি শূকরও ছিল। মহালোহিত, চুল্ললোহিতের প্রচুর কাজ, পরিশ্রম অনেক। কাজ নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ ছিল খাবার নিয়ে। মুনিককে দু-বেলা ভাত দেওয়া হত। অথচ মহালোহিত এবং চুল্ললোহিতের জন্য বরাদ্দ ঘাস, বিচালি ইত্যাদি। সহ্যের সীমা অতিক্রম করায় চুল্ললোহিত মহালোহিতকে অভিযোগ জানায়। মহালোহিত সান্ত্বনা দিয়ে বলে ধৈর্য ধরো, যথাকালে সব বুঝবে। হলও তাই। ভূস্বামীর একমাত্র মেয়ের বিবাহ উপলক্ষ্যে বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য মুনিককে একদিন বধ্য ভূমিতে নিয়ে যাওয়া হল। চুল্ললোহিত নিরুত্তর। মহালোহিত বুঝিয়ে দিল যে, মুনিকের খাবার অপেক্ষা ঘাস, বিচালি শতগুণে উৎকৃষ্ট। অভিপ্রায় হল, বর্তমানের কামুক ভিক্ষুই মুনিক, এই কুমারী ছিল সেই ভূস্বামীর কন্যা, আনন্দ (বুদ্ধের কাকার ছেলে) ছিল চুল্ললোহিত এবং স্বয়ং শাস্তা ছিলেন মহালোহিত। কাম হল রিপু। ব্যসন প্রভৃতি গুরুগম্ভীর শব্দ রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে ঘোষণা করলে মানুষ তা গ্রহণ করে না। মানুষের মতো করে আখ্যানসহযোগে ব্যাখ্যাত হলে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং একারণেই মিথকথাগুলো কথাশিল্পের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। এখানে বক্তা ও শ্রোতার গোজন্ম এবং শূকরজন্ম বড়ো কথা নয়।
বৌদ্ধ মিথকথা আমাদের জানিয়েছে, এই জন্মে যে অবাধ্য সে পূর্বজন্মেও অবাধ্য আচরণ করেছে (বেণুক জাতক ৪৩), যিনি নিষ্ঠাবান তিনি কেবল এই জন্মেই নিষ্ঠাবান নন, পূর্বজন্মেও তিনি নিষ্ঠাবান ছিলেন (আম্রজাতক ১২৪), যিনি এই জন্মে অকৃতজ্ঞ তিনি পূর্বজন্মেও অকৃতজ্ঞ ছিলেন (অসম্প্রদান জাতক ১৩১), যিনি এই জন্মে ভন্ড তিনি পূর্বজন্মেও ভন্ডামি করেছেন (মর্কটজাতক ১৭৩, বকজাতক ২৩৬), আবার যিনি বর্তমান জীবনে পরমার্থলাভে আগ্রহী তিনি পূর্বজীবনেও পরমতত্ত্বলাভের জন্য সমানভাবে উদগ্রীব ছিলেন (অসিতাভূজাতক ২৩৪, একপদজাতক ২৩৮)।

আমাদের আলোচনাচক্র যেহেতু আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে মিথকথাকে বিচারের সুযোগ করে দিয়েছে সেহেতু বলা যেতে পারে, চারিত্রিক ক্রমোন্নয়ন আখ্যানগুলোতে ব্যাহত হয়েছে। একজীবনেই পরিবর্তন কাম্য। সেখানে একজীবন তো দূরের কথা—জন্মান্তরেও কামুক, অবাধ্য, ভন্ড, অকৃতজ্ঞ, হত্যাকারী, খুনী যদি নিজেকে সংশোধন করতে না-পারে, তবে তো সংশোধনাগারগুলো নিরর্থক হয়ে যায়! একজন যা ছিলেন, তাই হয়েছেন অপেক্ষা একজন যা ছিলেন তদপেক্ষা হাজারো গুণ উন্নত হয়েছেন বক্তব্যের আকর্ষণ শক্তি অনেক অনেক বেশি। তবে মিথকথার অভিপ্রায় হল, বাপু, পূর্বজীবনেও যেমন ছিলে, এই জীবনেও তেমনই রয়ে গেলে আর কবে নিজেকে সংশোধন করবে। সুতরাং নিরন্তর বলো:
ইহাসনে শুষ্যতু মে শরীরং
ত্বগস্থিমাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু।
অপ্রাপ্য বোধিং বহুকল্পদুর্লভাং
নৈবাসনাৎ কায়মতশ্চলিষ্যতে।। (ললিতবিস্তর)
বৌদ্ধ মিথকথা ছোটো ছোটো কাহিনির মোড়কে নিন্দিত ঘটনার বিরোধিতা করে ভারতীয় দর্শনের আঙিনায় পূর্বপক্ষী চার্বাক অপেক্ষা সহস্রগুণ বেশি মানুষের হৃদয় জয় করেছে। যেমন—পশুবলির প্রেক্ষিতে হিংসাদি অঙ্গসংযুক্ত যজ্ঞের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেই বৌদ্ধ প্রতিবাদে ইতি টানেনি। সমাজকে একটা সুবিন্যস্ত গল্প উপহার দিয়েছে। বলির যৌক্তিকতা নিয়ে জনমানসে প্রশ্ন তোলার অভিপ্রায়ে কথক (শাস্তা) নিজেকে দূর অতীতে বৃক্ষদেবতার ভূমিকায় নিয়েছেন (আয়াচিতভক্তজাতক, ১৯)। গুরু বৃহস্পতি কেবল শুনিয়েছিলেন—জ্যোতিষ্টোমে নিহত পশুর স্বর্গগমন অবধারিত হলে যজমান কেন নিজের পিতাকে যূপকাষ্ঠে চাপাননা (চার্বাকষষ্টি ৫০)? এদিক থেকে বিচার করলে কোনো কোনো বৌদ্ধ মিথকথা প্রতিবাদের নতুন এক মাধ্যম। যারা প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে গবেষণা করবেন তারা নিশ্চয়ই সে বিষয়ে নজর দেবেন। এরকমভাবে পরলোকগত ব্যক্তির তৃপ্তিসাধনের জন্য শ্রাদ্ধের অসারতা প্রতিপাদন করতে জড়বাদী চার্বাক কেবল শ্লোকে প্রতিবাদ করেছেন মাত্র (চার্বাক দর্শন দ্রষ্টব্য)। কিন্তু তথাগত মৃতকভক্তের অপ্রয়োজনীয়তা প্রতিপন্ন করতে মনোগ্রাহী আখ্যান শুনিয়েছেন (মৃতকভক্তজাতক, ১৮)।
উৎসাহী বিদ্যার্থী জানতে চাইতে পারেন, হিন্দু মিথকথার সঙ্গে বৌদ্ধ মিথকথার পার্থক্য কীভাবে সম্পন্ন হয়? উত্তরে খুব সংক্ষেপে বলা যায়, আত্মার স্থায়িত্ব অঙ্গীকার করে কর্ম এবং কর্মকলবাদকে হিন্দু মিথকথা দৃঢ় ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একই আমি অতীতে ছিলাম, বর্তমানে আছি এবং ভবিষ্যতে থাকব ‘যথাকারী যথাচারী তথা ভবতি’ (বৃ.উ. ৪। ৪। ৫)। একারণে ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে (শ্রী. গী.) বারংবার আবৃত্তি করলে পাঠকের মনে সাহস আসে, রোমাঞ্চ হয়। পক্ষান্তরে বৌদ্ধমতে স্থায়ী আত্মা বলে কিছু না-থাকায়, বস্তুমাত্রই ‘জাতনষ্ট’-রূপে প্রচারিত হওয়ায় সবই কেমন নিরালম্ব মনে হয়। বৌদ্ধ দর্শনে কোনো স্থিতিক্ষণ নেই। উৎপত্তির পরক্ষণে বস্তুর বিনাশ ঘোষিত বলে সাধারণ পাঠক দ্বিধাগ্রস্ত হন। নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বা সন্তানধারা অল্পজ্ঞের পক্ষে কঠিন মনে হয়।
হিন্দু মিথকথায় দেবতার বন্দনা, স্তুতি ও উপাসনা। অন্যদিকে বৌদ্ধ মিথকথায় গুরুর উপাসনা, গুরুবন্দনা। ‘বৌদ্ধানাং সুগতো দেবঃ’। বুদ্ধদেবই সর্বশ্রেষ্ঠ। দেবতারা অনেক নীচে। পক্ষান্তরে হিন্দু বলেন, ব্রহ্মপদ দর্শনের জন্যই কেবল গুরু সহায়ক ‘তৎ পদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরবে নমঃ’।
প্রাচ্যতত্ত্ববিৎ হরপ্রসাদশাস্ত্রী উভয়ের পার্থক্য দেখিয়েছেন সুন্দরভাবে। তিনি বলেন—হিন্দুরা কখনও শূন্যমূর্তির ধ্যান করেন না। মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে তাকে দেবতা বানিয়ে হিন্দুরা ধ্যান করেন। পক্ষান্তরে বৌদ্ধদের সবই শূন্যমূর্তি। রূপ, সংজ্ঞা, সংস্কার, বেদনা ও বিজ্ঞান স্কন্ধের পাঁচটি শূন্যমূর্তির নাম পঞ্চধ্যানীবুদ্ধ। বৈরোচন, অক্ষোভ্য, রত্নসম্ভব, অমিতাভ ও অমোঘসিদ্ধি হলেন পাঁচটি স্কন্ধের শূন্যমূর্তি। দ্বিতীয়ত অস্থি এবং কাটা নখ, চুলকে হিন্দুরা অপবিত্র মনে করেন। অথচ বৌদ্ধেরা নখ, চুল ও অস্থিকে পরমপবিত্র সামগ্রী বিবেচনা করেন এবং সেগুলিকে চিরস্থায়ী করবার জন্য তাদের ওপরেই বিশালকায় স্তূপ বানিয়ে ফেলেন।
শব্দসংকেত
|
অঙ্গু. |
অঙ্গুত্তরনিকায় |
|
ত. বা. |
তন্ত্রবার্তিক |
|
দীঘ. |
দীঘনিকায় |
|
ন্যা. ম. |
ন্যায়মঞ্জরী |
|
বৃ. উ. ব্র. পু. |
বৃহদারণ্যকোপনিষদ ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ |
|
মজ. |
মজঝিমনিকায় |
|
যা. স. |
যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা |
|
বি.বি. |
বিবেকবিলাস |
|
শ্রী. গী. |
শ্রীমদভগবদগীতা |
|
শ্রীগীত. |
শ্রীগীতগোবিন্দম |
|
সং. |
সংযুতনিকায় |
|
P.T.S. |
Journal of the Pali Text Society |
তথ্যসূত্র:
অবদানসাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথ:
কল্যাণীশঙ্কর ঘটক, বাংলা আকাদেমি, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, ১৯৯৫
চার্বাক দর্শন:
সম্পা: অমিত ভট্টাচার্য, সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, ২০০৫
জাতক (প্রথম-ষষ্ঠ খন্ড)
শ্রী ঈশানচন্দ্র ঘোষ, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা-৯, ১৩৮৫
জাতকের পটভূমিকায় বাংলা লোকসাহিত্য বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধ উপাখ্যান:
ড. আশা দাস, কলকাতা ১৯৯৫। সুনন্দা বড়ুয়া, বাংলা আকাদেমি, ঢাকা, ১৯৯৩
বিষয়—বৌদ্ধধর্ম:
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা-৯, ২০০২
বুদ্ধচরিত:
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক অনূদিত, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, ১৩৫১
বুদ্ধদেব:
সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা-৯, ১৪০৩
বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা (ক্ষেমেন্দ্র বিরচিত):
শরচ্চন্দ্র দাশ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৩২১
বৌদ্ধদর্শন:
সম্পা^ঃ অমিত ভট্টাচার্য। সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, ২০০৭, কলকাতা-৬
Anguttaranikāya (Vol. I-V):
Published by the Pali Text Society
Avadānasataka:
Edited by Dr. P.L. Vaidya. Buddhist Sanskrit Text No. 19. The Mithila Institute of P.G. Studies & Research in Sanskrit learning, Darbanga, 1958
Buddha: His life, His doctrine, His order. Oldenberg, The Book Company Ltd. 1927
Buddhist Hybrid Sanskrit literature:
Sukumari Bhattacharji. The Asiatic Society, 1 Park St. Kol-16, 1992
Buddhist Legends:
E.W. Burlingame. Munshiram Manoharlal Publishers Pvt. Ltd. 1921
Divyavadana:
Edited by Dr. P. L. Vaidya. The Mithila Institute. 1959
Dighanikaya (Vol. I-III):
Published by the Pali Text Society
Early Buddhist Mythology Jataka:
J. R. Haldar. Vishal Printers, Delhi, 1977. Ed. Fausboll, Vol. I-VI
Mahāvastu-Avadāna (Vol. I-III):
Edited by Dr. Radhagovinda Basak. Sanskrit College, Calcutta, 1963-1968
Milindapānha:
Ed. Treckner, Williams and Norgate.
Myths and Legends of China, Japan and India:
Brian P. Katz. Metro Books. China, 1995
Saddharmapundārika:
Ed. Kern and Nanjio, St. Petersburg, 1912
Satasāhasrikāprajnāpāramita:
Ed. P. Ghosh. Bibliotheca Indica, Calcutta, 1902
The Jātaka (Vol. I-VI):
Ed. Prof. E. W. Cowell. Cambridge University Press, 1895-1897, 1901-1907
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন