মিথ-পুরাণ ও দর্শন-ভাবনা

অমিত ভট্টাচার্য

দার্শনিক বলেছেন, ‘যুক্তিহীনে বিচারে তু ধর্মহানি: প্রজায়তে’। অযৌক্তিকভাবে কোনো কিছুকে মেনে নেওয়াই হল অধর্ম। কিন্তু মিথ-পুরাণ এর ব্যতিক্রম। কোনো যুক্তিমনস্ক ব্যক্তি যদি কী, কেন, কীভাবে প্রশ্নে নিজেকে প্লাবিত করেন তবে তিনি আহাম্মক বনে যাবেন। মিথ-পুরাণ আবর্তিত হয় তার নিজস্ব ছন্দে, যে ছন্দ কেবল কবিতার শরীরে থাকে না, নিটোল ডিটেল-এও সেই ছন্দ পূর্ণমাত্রায় লক্ষণীয়। এই ছন্দ শ্রোতার মনকে আহ্লাদিত করে। কৌতূহলী শ্রোতা বক্তা থামলেই জানতে চান—তারপর, তারপর ততঃ কিম, ততঃ কিম। সপ্তম শ্রেণীর কোনো এক ছাত্র মন্ডপে প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় জানতে চেয়েছিল দৃশ্যমান প্রতিমাদি বাহন সমেত জীবিত হল কিনা? অভিভাবকের কাছ থেকে সদর্থক উত্তর পেয়ে অধিকতর কৌতূহলী হয়ে সে জানতে চেয়েছিল দুর্গতিনাশিনীর পদতলে উপস্থিত সিংহটি জীবিত হলে দৌড়ে পালাবার পথও তো ভিড়ের মধ্যে পাওয়া যাবে না! পরিপ্রশ্নের জন্য অভিভাবকের কাছে তার কানমলা জুটেছিল। এইভাবেই মুখ থেকে, বুক থেকে, ঊরু থেকে, পদযুগল থেকে চতুর্বর্ণের জন্মকথা, অমৃতমন্থনকালে দেবাসুরের মধ্যে সম্পাদিত ভদ্রলোকের চুক্তিকথা, স্বজাতির জন্য আত্মমর্যাদার লড়াইতে নিহত অসুরদেরও নরকবাস কথা, লক্ষীর গোময় ও গোমূত্রে প্রবেশ-কথা, রাহু দানবের চন্দ্র সূর্যকে গিলে ফেলার কথা, সন্তানধারণের জন্য গুরুপ্রদত্ত পায়সভক্ষণ-কথা—এইসব বিষয়ে ‘মা অতিপ্রাক্ষী:’। অতিপ্রশ্ন করবেন না।

মিথ গল্প-নির্ভর। গল্পকে উপজীব্য করে মিথ গড়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে কালসমুদ্রে মানুষের মুখে মুখে ভেসে বেড়ানোই এর বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় দার্শনিকেরা বলেন যার নির্দিষ্ট বক্তা নেই, কিন্তু যা পরম্পরাগত প্রবাদবাক্যমাত্র তার কোনো প্রামাণ্য নেই। এর নাম হল ঐতিহ্য ‘প্রবাদপারম্পর্যমৈতিহ্যম’ (বা. ভা. ২। ২। ১)। একমাত্র পৌরাণিকেরা ঐতিহ্যকে প্রমাণের স্বীকৃতি দিয়েছেন। যুগবাহিত ঐতিহ্য সংশয়পূর্ণ বলে প্রমাণের অযোগ্য। মৌখিক ঐতিহ্যকে আমল না-দেবার জন্য ‘বটে যক্ষন্যায়’ নামক লৌকিক কাল্পনিক দৃষ্টান্তেরও উল্লেখ আছে। যেমন একজন বললেন, এই সামনের বটবৃক্ষে যক্ষ বাস করেন, ‘ইহ বটে যক্ষঃ প্রতিবসতীতি’। এক্ষেত্রে সংশয় স্বাভাবিক। নির্দিষ্ট বটগাছে যক্ষ থাকে কিনা কে বলতে পারে? কেউ তো কখনও যক্ষের শরীর অবলোকন করেনি। ‘কো জানাতি কদা চ কেন কলিতং যক্ষস্য কীদৃগ বপু:’ (ন্যা. ম.)। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত অধিকাংশ মিথ-পুরাণ এইরকম ঐতিহ্যের অন্তর্গত।

দর্শনশাস্ত্র হল বিচারশাস্ত্র। বিচার হয় তত্ত্বনির্ণয়ের জন্য। তত্ত্ব বলতে এখানে চেতন-অচেতন বা মূর্ত-বিমূর্ত সকল বস্তুই বোদ্ধব্য। নির্ণয় করবার জন্য বিশ্লেষণের দ্বারা ঊহাপোহ অপেক্ষিত হয়। ঊহাপোহ বাদী-প্রতিবাদীর দ্বারাই হয়ে থাকে। দুঃখের বিষয় মিথ-পুরাণকে অবলম্বন করে বাদী-প্রতিবাদীর ঊহাপোহ যত সূক্ষ্ম হবে, ততই দার্শনিককে মিথ-পুরাণ কথায় প্লাবিত বিপুলসংখ্যক সাধারণের নিন্দামন্দ শুনতে হবে। মিথকে অবলম্বন করলে (পরিশ্রম ব্যতীত) কৃষিজমি ফলবতী হবে, অনাবৃষ্টি দূর হবে যদি কেউ বলেন তখন প্রথাসিদ্ধ দর্শন বলতে আমরা যা বুঝি (আস্তিক, নাস্তিক) তার চোদ্দোটা বেজে যায়।

দার্শনিক বলেন প্রমাণ ব্যতীত বিষয়ের যথার্থবোধ হয় না। বিষয়ের যথার্থজ্ঞান না-হলে প্রবৃত্তির সাফল্য আসে না ‘প্রমাণমন্তরেণ নার্থপ্রতিপত্তি:, নার্থপ্রতিপত্তিমন্তরেণ প্রবৃত্তিসামর্থ্যম। প্রমাণেন খল্বয়ং জ্ঞাতাহর্থমুপলভ্য তমর্থমভীপ্সতি জিহাসতি বা’ (বা. ভা)। প্রমেয়র সিদ্ধি প্রমাণের অধীন বলে ন্যায়দর্শনে উল্লিখিত ষোলোটি পদার্থের মধ্যে প্রথম প্রমাণের স্থান। দার্শনিক যদি মিথ-পুরাণ কাহিনি শ্রবন করে চোখ বড়ো বড়ো করে প্রথমেই বলেন ‘কো হি নাম সুস্থাত্মা প্রমাণশূন্যমভ্যুপগচ্ছেৎ’ তবে মিথ-পুরাণ-এর পাততাড়ি গোটাতে হয়। মুশকিল হল মিথ-পুরাণ-এর চিত্তাকর্ষক কথাশিল্পে প্রবেশ করে যদি ব্যক্তিবিশেষ বলেন, দেখুন, প্রমাণ ছাড়া একজন কিছু বললে প্রমাণ ছাড়াই অপরে তার খন্ডনে প্রবৃত্ত হবে এবং এভাবে চলতে চলতে প্রমাণাভাব ও বিরোধ তুল্যবল হলে পৃথিবীর কোনো বস্তুর নিশ্চয় হবে না—তবে সেই ব্যক্তিবিশেষের কাছে মিথ-পুরাণ বা লোক-পুরাণ কোনো আবেদন রাখে না।

পূর্বের অনুচ্ছেদ পাঠে পাঠকের মনে হতে পারে বক্তা দর্শন-ভাবনা পাননি—এটি তার অনবধানতা। স্থূণানিখননন্যায়ে বারংবার ধ্যান দিলেই তার এই অনবধানতা চলে যেত। সত্যমেতৎ। সোলা যদি জলে না-ডুবতে পারে তবে কি জলের অগভীরতা প্রকাশ পায়। মনন করুন, দর্শন-ভাবনা নিষ্কাশিত হবে। অপবাদের হাত থেকে নিষ্কৃতির জন্য বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতাকে স্মরণ করে আসরে নেমে পড়তেই দেখি মিথ-পুরাণ-এর নান্দনিক এবং সমাজতাত্ত্বিক দিকগুলির মতন দর্শন-ভাবনাও অনেকক্ষেত্রে উপেক্ষণীয় নয়। তবে সুধী পাঠকবৃন্দকে বলে রাখি, বিষয়টি কিন্তু কফোণিগুড়ন্যায়-এর মতন কঠিন কাজ, হাতের কনুইতে গুড় মাখিয়ে লেহনে প্রবৃত্ত হবার তুল্য।

আদিম মানুষের সংস্কৃতিতে যে সমস্ত মিথ-এর জন্ম হয়েছিল তার অধিকাংশই ছিল বৈচিত্র্যমন্ডিত প্রাকৃতিক বিষয়ের কল্পিত আখ্যান। যেমন ভিয়েতনামী মিথ-পুরাণ-এ গোরুর একপাটি দাঁত এর কাহিনি বা হাঙ্গেরীয় মিথ-পুরাণ-এ বর্ণিত গোরুর শিং রহস্যের কাহিনি। ভালুকের লেজ কেন নেই বা বাঘের গায়ে কেন ডোরাকাটা এই ধরনের হালকা প্রশ্ন ভারতীয় দর্শনের একটি সম্প্রদায় (জড়বাদী চার্বাক) তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে নস্যাৎ করেছেন। যেমন কথায় কথায় স্বভাববাদী চার্বাক বলেন, বৈচিত্র্য মন্ডিত জগতে বিচিত্র সব বস্তুপুঞ্জ স্বভাবজাত ‘স্বত এব ভাবা জায়ন্তে’। আগুন কেন গরম, জল কেন ঠাণ্ডা ‘স্বভাবাৎ তদ ব্যবস্থিতি:’। ময়ূর কেন এত চিত্রিত বা কোকিল কেন এমন কুহুরব করে—এসবের স্বতন্ত্র কারণ খুঁজতে যাওয়া বৃথা এবং এদের সিদ্ধান্ত হল ‘স্বভাবব্যতিরেকেণ বিদ্যতে নাত্র কারণম’। সুতরাং আখের মিষ্টতা বা লংকার ঝালকে উপজীব্য করে অতীন্দ্রিয় দেববাদের অবতারণা নেহাতই হাস্যকর। আবার নৈয়ায়িক ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিপাদন প্রসঙ্গে যে পাঁচটি হেতু বা কারণ নির্দেশ করেছেন তার মধ্যে কার্যবস্তুর এই বৈচিত্র্য অন্যতম ‘কার্যং বিচিত্রকারণবৎ বিচিত্রকার্যত্বাৎ’ (ন্যা. কু. হ. টী. ১। ৪)।

ভারতীয় দর্শনে নৈয়ায়িকেরা একটা দারুণ বিষয়কে পদার্থের তালিকায় বসিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে সর্বোত্তম শিরোপা দাবি করতে পারেন। এর নাম হল প্রয়োজন। যে ষোলোটি পদার্থের তত্ত্বজ্ঞান হলে মুক্তি হয় প্রয়োজন তাদের মধ্যে অন্যতম। ন্যায়সূত্রকার গৌতম বললেন ‘যমর্থমধিকৃত্য প্রবর্ততে তৎ প্রয়োজনম’ (ন্যা. সূ. ১। ১। ২৪)। ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন বললেন, যার জন্য মানুষ কর্মে প্রবৃত্ত হয় বা যে পদার্থকে প্রাপ্য বা ত্যাজ্য বলে স্থির করে মানুষ তার প্রাপ্তি বা ত্যাগের উপায় অনুষ্ঠান করে সেটিই হল প্রয়োজন ‘যমর্থমাপ্তব্যং হাতব্যং বা ব্যবসায় তদাপ্তিহানোপায়মনুতিষ্ঠতি, প্রয়োজনং তদ্বেদিতব্যম’ (বা.ভা. ১। ১। ২৪)। অধিকাংশ মিথ-পুরাণ-এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গেল। বস্তুত মানুষের প্রয়োজনটাই সার কথা। প্রয়োজনের শেষে আয়োজনের ছুটি। এবার এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পদের দাত্রী লক্ষ্মীকে স্বাগতম বলুন বা অলক্ষ্মীকে বিদায়-সংবর্ধনা দিন বা লক্ষ্মীর গোময় ও গোমূত্রে প্রবেশের মিথ-পুরাণ পর্যালোচনা করুন, দেখা যাবে প্রয়োজনই মূল। ভারতীয় দার্শনিক এইভাবে আমাদের উৎসমুখে নজর রাখতে বলেন। এই প্রয়োজনের তাগিদেই জলপূর্ণ বা শস্যপূর্ণ ঘট পূর্ণগর্ভের প্রতীক হয়ে যায়, কার্তিক পূজোয় ঘটের পিছনে ফলন্ত মোচাসুদ্ধ কলাগাছ শোভা পায়, বিষ্ণুলোক প্রাপ্তির আশায় এখনও ভাদ্রমাসে তুলসীব্রত উদযাপিত হয়, বৃষ্টি নামানো এবং বৃষ্টি থামানোয় নগ্নতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। বস্তুত প্রয়োজন অনুচ্চারিত হলে মিথ-পুরাণ-এর আকর্ষণই হারিয়ে যায়। কবেই তো দার্শনিক শুনিয়েছেন ‘সম্বন্ধপ্রয়োজনয়োরনভিধানে শ্রোতা ন প্রবর্ততে, প্রয়োজনাধিগতিপূর্বকত্বাৎ সর্বপ্রেক্ষাবৎ প্রবৃত্তে: (ন্যা. ক.)। শূন্যমেধার অধিকারীও প্রয়োজন ব্যতীত কাজ করেন না ‘প্রয়োজনমনুদ্দিশ্য ন মন্দোহপি প্রবর্ততে।’ মীমাংসক কুমারিল তো রাখঢাক না-রেখে সোজাসাপ্টা জানিয়েছেন, প্রয়োজনকে উল্লেখ না-করলে জনতা কোনো বিষয় গ্রহণ করবেন না ‘যাবৎ প্রয়োজনং নোক্তং তাবৎ তৎ কেন গৃহ্যতে’? শাস্ত্রে বর্ণিত অনুবন্ধ চতুষ্টয়ের মধ্যেও প্রয়োজনের মর্যাদা সাড়ম্বরে ঘোষিত।

পৃথিবীর সমস্ত দেশের মিথ-পুরাণ-ই ঘোষণা করে ভগবান আছেন। সৃষ্টির দেবতা, বৃষ্টির দেবতা, বাতাসের দেবতা, আগুনের দেবতা, জলের দেবতা, যৌবনের দেবতা, সম্পদের দেবতা, সন্তান জন্মানোর দেবতা, মৃত্যুর দেবতা—সংক্ষেপে যা কিছু আমাদের প্রয়োজন, বা যা কিছু আমাদের ভাবিত করে সবের স্বতন্ত্র দেবতা আছেন। এখন মিথ-পুরাণ-এর আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ে অনুসন্ধিৎসু পাঠক কতিপয় দেবতার চারিত্রিক গুণের যে পরিচয় পান, তাতে আধুনিক সভ্যতাগর্বী অথচ সৎ মানুষ নিজেকে দেবতার থেকে উন্নততর বলেও দাবি করতেই পারেন। প্রসঙ্গত আমরা সমুদ্রমন্থন ও তার পরবর্তী অমৃতবণ্টন প্রসঙ্গ ও তার পরবর্তী সূর্য, চন্দ্রগ্রাস (গ্রহণ) এবং অহল্যা-ইন্দ্রের মিথ-পুরাণ-এর অবতারণা করতে পারি।

প্রথমটিতে ঈর্ষাকাতর দেবকুলের পরিচয় পাই। দ্বিতীয়টিতে দেদীপ্যমান কামনার লেলিহান শিখা। দর্শনে ঈর্ষা, কামনা প্রভৃতি অবশ্যবর্জ্য। পাঠক যোগদর্শনে দৃষ্টি দিন। দেখা যাবে বিবেকখ্যাতি লাভের সাধনরূপে অষ্টাঙ্গ যোগের নির্দেশ করা হয়েছে। অষ্টাঙ্গ যোগের মধ্যে ‘যম’ বলে যে অঙ্গটি আছে তার আবার অহিংসাদি ভেদে পাঁচটি ক্রম (অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ)। কিন্তু দেববাদনির্ভর মিথ-পুরাণ-এ তো ঈর্ষার ব্যাপকতা। অথচ শ্রীমদভগবদগীতায় বলা হয়েছে—তাঁর প্রিয় হতে গেলে অদ্বেষ্টা হতে হবে ‘অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাম’। অমৃত প্রাপ্তিতে অসুরদেরও শ্রম ছিল। কিন্তু তারা পারিশ্রমিক পেল না, বঞ্চিত হল। যেখানে ভারতের দর্শনই হল ‘ঈশাবাস্যমিদং সর্বম’ (ঈশ. ১) বা ‘একো দেবঃ সর্বভূতেষু’ (শ্বে. ৬। ১১) সেখানে বঞ্চনা কেন? অসুরেরাও অমৃত পাবেন—এরকম ভদ্রলোকের চুক্তিই হয়েছিল ‘সামপূর্বঞ্চ’। সমুদ্রমন্থনের প্রস্তাবটা ছিল এরকম—অসুরদের মিষ্টি ভাষায় বলা হল, সমুদ্রমন্থনের পর যে অমৃতলাভ হবে, তা সমানভাবে বণ্টিত হবে এবং অমৃত পান করে উভয়েই শক্তিশালী হওয়া যাবে:

সামান্যফলভোক্তারো যূয়ং বাচ্যা ভবিষ্যথ।

মথ্যমানে চ তত্রাব্ধৌ যৎ সমুৎপদ্যতেহমৃতম।।                  (বি.পু. ১। ৯। ৭৯)

কিন্তু বিষ্ণুপুরাণ-এ দেখি দেবতাদের নেতা দেবতাদের কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছেন, অপরকে বঞ্চনার কৌশল—‘তথা চাহং করিষ্যামি যথা ত্রিদশবিদ্বিষঃ ন প্রাপ্সন্ত্যমৃতম’ (ওই ১। ৯। ৮০)।

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের নেপথ্যে যে মিথ-পুরাণ সেখানেও কৌশল, মায়া ও অভীষ্টপূরণে হত্যা। মোহিনী মূর্তি ধারণ করে বিষ্ণু যখন দেবতাদের অমৃতবণ্টন করছিলেন সেই সময় দৈত্য রাহু ছদ্মবেশে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে গোপন রেখে সুধাপানের চেষ্টা করতে থাকেন এবং আংশিক সফল হন। কিন্তু রাহুর দুর্ভাগ্য যে সূর্য ও চন্দ্র রাহুকে চিনে ফেলেন এবং বিষ্ণুকে তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেন। দেববৃত্তের বাইরে সুধাবণ্টনে অনিচ্ছুক বিষ্ণু রাহুকে শাস্তিদানে কৃতসংকল্প হয়ে সুদর্শনের সহায়তায় তার মস্তকটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। সুধাপানের ফলে রাহুর মস্তক অমরত্ব প্রাপ্ত হয়। প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করতে রাহু চন্দ্র ও সূর্যকে গিললেও উভয়েই কাটা-গলার নীচ দিয়ে গলে যান। মিথ-পুরাণ-এর এই দৃষ্টান্তটিকে উপজীব্য করে জড়বাদী চার্বাক দেহাত্মবাদ উপস্থাপন করেন। বিবিদিষু চার্বাককে প্রশ্ন করেছিলেন শরীর ও আত্মা অভিন্ন হলে শরীরই অহং-পদবাচ্য হয় না কেন? বক্তা এবং তার দেহ অভিন্ন হলে ‘আমার শরীর’ শব্দের প্রয়োগ কতটা সমীচীন। ভিন্ন বস্তুদ্বয়ের মধ্যেই তো সম্বন্ধ স্বাভাবিক। কবির কাব্য, মালিকের ধন প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেমন বস্তুদ্বয় ভিন্ন, তেমন ‘আমার শরীর’ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ভিন্নতাই কি প্রতিপাদিত হয় না? চার্বাক রাহুর দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, রাহু মস্তক ভিন্ন অন্য কিছু না-হলেও যেমন ‘রাহুর মস্তক’ এই আলংকারিক বা গৌণ প্রয়োগ হামেশাই হয়, তেমন ‘আমার শরীরও’ একধরনের আলংকারিক প্রয়োগ ভিন্ন আর কিছু নয়। অতএব শরীর ও আত্মা অভিন্ন ‘মম শরীরমিতি ব্যবহারো রাহো: শির ইত্যাদিবদৌপচারিকঃ’ (বা. সূ. ৯৩)। উক্ত মিথ-পুরাণ থেকে পাঠক জানতে পারেন শ্রেণীস্বার্থ অটুট রাখতে হিংসা থেকে খুন অবলীলায় চলতে পারে। মারি অরি পারি যে কৌশলে বা নিজের যদি উন্নতি চাও মারতে শেখো ল্যাঙ—ধ্বনি যুগ যুগ জিও।

আমরা যাব স্বর্গের উদ্যান ইডেনে (হিব্রু লোকপুরাণ, বাইবেল বুক অফ জেনেসিস)। সেখানে ঈশ্বরের প্রতিরূপে সৃষ্ট মানুষ, নাম আদম। আদমের একা অসুবিধা হবে ভেবে সৃষ্ট হল মহিলা তনু, নাম ইভ। ইডেনে জ্ঞানবৃক্ষ দেখিয়ে ঈশ্বর বললেন, এই গাছটির ফলে হাত দেবে না। ভুল করেও খাবে না। ইডেনের ঝোপে লুকিয়ে থাকা সাপ ইভকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাবার জন্য প্রলুব্ধ করে। আরে খাও খাও, ঈশ্বরের নিষেধ শুনো না। ওই ফল খেলে তবেই নিজেদের ভালো-মন্দ বিবেচনা করতে শিখবে, তোমরাও দেবতা হয়ে উঠবে। সরলমনা ইভ সাপকে জানাল, ঈশ্বর যে বললেন ওই ফল খেলে মৃত্যু অবধারিত। মৈবম। সাহসে ভর করে সাপের কথামতো ইভ ফল পাড়ল, নিজে খেল এবং আদমকে খাওয়াল। তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হল। দৃশ্যমান জগৎ ভিন্নরূপে প্রতীত হল। স্মরণ করুন শ্রীমদভগবদগীতা ‘সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি’। একদিন ঈশ্বর আবার এলেন তাঁর নির্মিতদের দেখতে। কথোপকথনে উপলব্ধি করলেন আদমদের বোধোদয় হয়েছে, তারা আর বোকা নেই। তখন ঈশ্বর অভিশাপ দিলেন। দর্শনের দৃষ্টিতে বিষয়টিকে ভাবলে অর্থ হয়—জ্ঞান এলে অজ্ঞান যাবে। আলোর উপস্থিতিতে অন্ধকার যেমন অপগত হয় ‘ভাহভাবস্তমঃ’ (প্র.ভা)। অজ্ঞানের অভাবে ভ্রম বা দোষ যাবে। দোষ গেলে প্রবৃত্তি যাবে, প্রবৃত্তি গেলে জন্ম যাবে এবং পরিশেষে জন্ম গেলে দুঃখ যাবে। সুতরাং, জন্ম-মৃত্যুর আবর্তনচক্রে ঘোরাতে হলে জ্ঞানবৃক্ষের ফল ‘মা প্রযচ্ছ’। বিতরণ করো না। সংক্ষেপে উক্ত মিথ-পুরাণ-এর দর্শন হল, নেতৃত্ব চাইবে অজ্ঞতা থাক। কারণ অজ্ঞতা থাকলে বিস্ময় থাকবে, বিস্ময় থাকলেই তার কথায় লোকসমাগম হবে।

চতুর্বর্ণের সৃষ্টিমূলক মিথ-পুরাণ-টিও ঈশ্বরের পক্ষপাতিত্বের পরিচয় বহন করে। ভারতীয় দার্শনিক চার্বাক সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল ঘটনা প্রবাহের আসল রূপ। এদের মতে গুণবিভাগ অনুসারে এবং কর্মবিভাগ অনুসারে চতুর্বর্ণের সৃষ্টি প্রভৃতি বর্ণনা করে শাস্ত্রকারেরা অবর্ণনীয় ক্ষতি করে বসে আছেন। বর্ণসংঘর্ষের মার্গ হয়েছে উন্মুক্ত। বিষ্ণুপুরাণ যেদিন ঘোষণা করলেন—ব্রহ্মার মুখ, বক্ষঃস্থল, ঊরু ও পাদ থেকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের আবির্ভাব সেদিন থেকেই বিভেদের বাতাবরণ সৃষ্ট হল:

ব্রাহ্মণা: ক্ষত্রিয়া বৈশ্যা: শূদ্রাশ্চ দ্বিজসত্তম।

পাদোরু-বক্ষঃস্থলতো মুখতশ্চ সমুদগতা:।।                    (বি.পু. ১। ৬। ৬)

চতুর্দিকে একটা অভাববোধ, দেহি, দেহি কাঙালপনা স্বভাবের থেকে অনেক মিথ-পুরাণ-এর সৃষ্টি। স্বভাবভীতু মানুষ যখন জানতে পারে নানান মিথ-পুরাণ-এ বর্ণিত কাহিনির অন্ধ অনুকরণ করলে অভাব পূরণ হবে তখন ‘সর্বং তুভ্যম’ বলায় সে ভেতরে ভেতরে উজ্জীবিত হয়। এজন্য নানান কাহিনির মোড়কে তিনি আরাধ্য। আরাধ্য-আরাধকের সম্পর্কের মধ্যে একটা অপ্রাপ্তির, একটা না-পাওয়ার বেদনা থাকে। শরীরে অমিত শক্তিলাভের জন্য, প্রভূত ধনলাভের জন্য, সমাজে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য, ডাকাবুকো স্বামী লাভের জন্য, মনের মতন বউ পাবার জন্য, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন নিয়ে দীর্ঘদিন সংসার-সুখে দিনযাপনের জন্য, অসুখ-বিসুখের প্রতিকারের জন্য রত্নধারণ, মন্ত্রপ্রয়োগ, ব্রতাদি উদযাপন, টোটকা ঔষধসেবন প্রভৃতি কতই না আজগুবি আচরণ মানুষের মধ্যে দেখা যায়—যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। মানুষের এই সকল প্রবৃত্তি যুক্তিবিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে। কেউ বলতে পারেন এসবের কি কোনোও ফলই নেই। উত্তরে দার্শনিক বলেন, কোনোক্ষেত্রে ফললাভ ঘটে, কোনোক্ষেত্রে ফললাভ ঘটে না। তবে যেহেতু রত্নধারণ, মন্ত্রপ্রয়োগ, ব্রতোদযাপনের অভাবেও সুখ, সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্যলাভ ঘটে সেহেতু এদেরই ফললাভের উপায় বলা নিরর্থক। রত্নধারণাদি ঐশ্বর্যের কারণ হলে যারাই রত্নধারক তারাই ঐশ্বর্যবান এবং যারাই রত্নহীন তারাই দুঃখে জর্জরিত হতেন। কিন্তু এমনটি কখনই হয় না। বরঞ্চ পাঁচ আঙুলে পাঁচটি রত্নধারণ করেও নার্সিংহোমের বাতানুকূল শয়নকক্ষে বন্দীদশা কাটাচ্ছেন এমন লোকের সংখ্যা নেহাত নগণ্য নয়। কিছু ক্ষেত্রে ফললাভের ঘটনা দেখেই ভ্রান্তিবশত কাকতালীয়ন্যায়ে ফললাভের নেপথ্যে কার্যকারণ-শৃঙ্খলের অনুমান করে থাকেন ‘তত্র ক্বচিৎ কাকতালীয়ন্যায়েন জায়মানং কার্যং দৃ ষ্টহ ভ্রান্তা: কার্যকারণভাবং’ মন্যন্তে। বস্তুতস্তু নৈব তত্র কার্যকারণভাবঃ’ (দ. টী.)।

এক ভারতীয় দার্শনিক প্রশ্ন রেখেছিলেন, কল্পিত ঈশ্বর এক না বহু? যদি সর্বময়কর্তা-রূপে একজন ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া হয় তবে আমাদের শ্রম নিষ্প্রয়োজন। তিনিই সমস্ত সম্পাদন করছেন। পাঁচশো কুড়ি কোটি (কেবল মানুষ) বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব (দর্শনের পরিভাষায়) ছাড়াও অন্ডজ, উদ্ভিজ সকলের সব প্রয়োজন তিনি মেটাচ্ছেন। মৈবম। হতে পারে না। এত সম্পদের অধীশ্বর একজন হলে মাফিয়াচক্র গড়ে উঠতে বাধ্য। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় ঈশ্বর বহু, তবে তাঁদের মতবিরোধ ঘটলে কী হবে? রসিক টিপ্পনীতে বলবেন বহুঈশ্বরবাদে ইউনিয়ন তৈরি হবে ‘কিঞ্চ কিমেকঃ কর্তা সাধ্যতে কিং বা অনেকে। প্রথমে প্রাসাদাদৌ ব্যভিচারঃ স্থপত্যাদীনাং বহূনাং পুরুষাণাং তত্র কর্তৃত্বোপলম্ভাৎ। দ্বিতীয়ে বহূনাং বিশ্বনির্মাতৃত্বে তেষু মিথো বৈমত্যসদ্ভাবনায়া: অনিবার্যত্বাদেকৈকস্য বস্তুনোন্যান্যরূপতয়া নির্মাণে সর্বমসমঞ্জসমাপদ্যেত’ (সর্বদর্শনসংগ্রহে, আর্হতদর্শনম)। কথকঠাকুর নিজেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন দেবতার সংখ্যা পরিগণনে। তিনি এক অথবা বহু? বহু হলে ঠিক কত! তেত্রিশ কোটি দেবতাকে মনোমুকুরে সৃজন করেও (ঋ. স. ১। ৪৫। ২) অমৃতপিয়াসী ভেবেছেন একজন কোনো স্রষ্টাকে। সত্যই যদি ইন্দ্রকে কেউ না-দেখে থাকেন, তবে কার স্তুতি কে করেন (ওই ৮। ১০০। ৩)? হবি: দানের প্রসঙ্গও প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি। সুনির্দিষ্টভাবে না-জেনে কোন দেবতার উদ্দেশ্যে হবি: সমর্পিত হবে ‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম’ (ওই ১০। ১২১)। হব্যের বিনিময়ে দেবতাকে প্রলুব্ধ করে কার্যোদ্ধারের চেষ্টা মিথ-পুরাণ-এর সমগ্র অবয়বে। মিথ-পুরাণ এজন্য আমার আপনার মুখে মুখে আবর্তিত ‘ধরিলাম’ এর চলমান চিত্তাকর্ষক কাহিনি।

চিরায়ত নারী-পুরুষের সম্পর্ককে উপজীব্য করেই সাংখ্যের প্রকৃতি-পুরুষের উপস্থাপনা। পুরুষ ভোক্তা, প্রকৃতি ভোগ্যা। প্রকৃতি তো নিজেকে নিজে ভোগ করতে পারে না। এজন্য তাকে পুরুষের প্রতীক্ষায় থাকতে হয়। গাছের ফলে, গোরুর দুধে, নদীর জলে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবৃত্তির ক্ষমতা থাকলেও ভোক্তার ভোগে সেই ক্ষমতা যেমন ব্যক্ত হয়, তেমন প্রকৃতির পুরুষপ্রয়োজন-সাধকতা থাকলেও পুরুষের সন্নিধানে তা ব্যক্ত হয়। এইভাবে প্রকৃতির অকৃপণ অনুগ্রহে পুরুষ ধন্য হয়। অর্থাৎ প্রকৃতি হল উপকার্য, পুরুষ হল উপকারক। প্রকৃতি ও পুরুষের উপকার্য-উপকারকভাব বোঝাতে ঈশ্বরকৃষ্ণ লৌকিক দৃষ্টান্ত ব্যবহার করেছেন—‘পন্ধবৎ’ (সা. কা. ২১)। পঙ্গু দেখতে পান, চলতে পারেন না। অন্ধ চলতে পারেন, দেখতে পান না। কিন্তু যদি এরা উভয়ে পরস্পরের উপকারে ব্রতী হয়, তবে উভয়েরই ইষ্টসিদ্ধি হয়। বিবিদিষু জানতে চান কীভাবে এটা সম্ভব? উত্তরে বলা হয়েছে, অন্ধ যদি পঙ্গুকে স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেয় তবে অন্ধের কাঁধে চড়ে পঙ্গু গন্তব্যস্থানের পথনির্দেশ দিতে পারে এবং ইপ্সিত স্থানে পৌঁছোতে পারে। অনাদিকাল থেকে প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের সংযোগ হওয়ায় এই সৃষ্টি প্রক্রিয়াও অনাদি। এই তত্ত্বের মাধ্যমেই পরবর্তীকালে যুগল আরাধনা শাস্ত্রগ্রন্থে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। শিব-দুর্গা, নারায়ণ-লক্ষ্মী, রাম-সীতা, কৃষ্ণ-রাধা প্রভৃতি সাংখ্যের যুগলভাবনা সঞ্জাত। সৃষ্টির মূলে চাই প্রকৃতির সহায়তা। প্র শব্দে প্রকৃষ্টা, কৃতি শব্দের অর্থ সৃষ্টি। সৃষ্টির বিষয়ে যে দেবী পরমসমর্থা তিনিই হলেন প্রকৃতি। এই প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মিকা সত্ত্ব, রজঃ ও তমো গুণের সমষ্টি। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ-এর মতে পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণের পাঁচটি মূল প্রকৃতি, যথা—১. দুর্গা ২. লক্ষ্মী ৩. সরস্বতী ৪. সাবিত্রী ও ৫. রাধা। এই পাঁচটি মূল প্রকৃতির অংশ থেকে উৎপন্না অন্যান্যরা হলেন যথাক্রমে গঙ্গা, তুলসী, ষষ্ঠীদেবী, মঙ্গলচন্ডী, কালী ও বসুন্ধরা (পৃথিবী)। পরমব্রহ্ম ঈশ্বর প্রকৃতি ব্যতীত সৃষ্টিকার্যে সমর্থ হন না। মহাকামী কামাধার সনাতন, নিজেরই অংশভূতা স্ত্রীরূপা প্রকৃতিকে অবলোকন করে বিমোহিত চিত্তে রতিসুখ উপভোগ করলেন (ব্র. বৈ. পু. প্রকৃতিখন্ড. প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়)। আবার মার্কন্ডেয়পুরাণ অনুসারে সাংখ্যের পুরুষই হলেন ব্রহ্মা। তিনিই প্রথম শরীরী এবং সমগ্র ভূতপ্রপঞ্চের প্রথম স্রষ্টা। তিনিই ক্ষেত্রজ্ঞ আর প্রকৃতি হলেন ক্ষেত্র ‘ক্ষেত্রজ্ঞো ব্রহ্মসংজ্ঞিতঃ/স বৈ শরীরী প্রথমঃ স বৈ পুরুষ উচ্যতে’ (মা. পু. ৪৫। ৬৩)।

সংস্কৃত সাহিত্য মিথ-পুরাণ-এর আঁতুড়ঘর। অতীন্দ্রিয় দেববাদকে উপজীব্য করে বিবিধ গ্রন্থে অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে মিথ-পুরাণ-এর ধারাবাহিক কার্যক্রম চলেছে। আঁতুড়ঘরে উঁকি দিতেই দেখি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের লাম্পট্য-কাহিনি। বৈদিক যুগে ইন্দ্রের সর্বাতিশায়ী মহিমা প্রতিভাত হলেও পরবর্তীকালে তাঁকে নিয়ে অনেক রসাল গল্প তৈরি হয়েছে (মা. পু. ৫। ২১-২৭)। আদিকান্ডে রামায়ণ-এ চোখ রাখুন। বিশ্বামিত্র বলছেন, শ্রোতা গিলছেন। কথম, কথম? মিথিলার উপবনে গৌতমের আশ্রমে ঋষির অনুপস্থিতির সুযোগে অসামান্যা রূপলাবণ্যময়ী অহল্যার সঙ্গে ইন্দ্র লিভ-টুগেদার-এর বাসনা প্রকাশ করলেন। পদমর্যাদাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মনের অভিপ্রায় অকপটে ঘোষণায় সুরশ্রেষ্ঠ ছিলেন অনন্বয় অলংকারে মন্ডিত ‘সঙ্গমং ত্বহমিচ্ছামি ত্বয়া সহ সুমধ্যমে’ (৪৮। ১৮)। অহল্যাও প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিলেন ‘মতিঞ্চকার’। চলমান জীবন্ত কাহিনি। মঞ্চের সমস্ত আলো অহল্যার উপরে। তৃপ্তা অহল্যা ইন্দ্রকে যথাশীঘ্র ওই স্থানত্যাগের পরামর্শ দিলেন। কেবল এই নয়, ইন্দ্র যেন নিজেকে এবং অহল্যাকে গৌতমের ক্রোধাগ্নি থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হন—এই প্রার্থনাও করলেন। কাহিনিকার ইন্দ্র ও অহল্যার পরিতৃপ্তির সূচক দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। অহল্যা বললেন ‘কৃতার্থাস্মি’। ইন্দ্র বললেন ‘পরিতুষ্টোহস্মি’। কিন্তু হায়, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়। স্বয়ং গৌতম হাজির। পলায়মান ইন্দ্রকে দেখেই তাঁর চারিত্রিক দোষ সুবিদিত বলে পাণিং পাণৌ বিনিষ্পিষ্য দন্তান কটকটায্য চ গৌতম ইন্দ্র ও অহল্যাকে অভিশাপ দিলেন। গৌতমের অভিশাপে ইন্দ্রের অন্ডকোষ ছিন্নমূল হল ‘পেততুর্বৃষণৌ ভূমৌ’ এবং অহল্যা পাষাণে রূপান্তরিত হলেন। তবে অহল্যার কাকুতিতে রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে তার শাপমোচনের বার্তা পরিবেশিত হল।

দার্শনিকেরা এই মিথ-পুরাণ-টির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হলেন। আচার্য কুমারিল এই প্রসঙ্গে শ্রীমদভাগবত-এর উদ্ধৃতি দিয়ে শ্রোতৃবৃন্দের সামনে বোঝানোর চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। তিনি বললেন বহ্নি সর্বভুক হলেও কেউ তাকে যেমন অপবিত্র মনে করে না, তেজস্বীগণেরও তেমন দোষের কিছু নেই ‘তেজীয়সাং ন দোষায় বহ্নে: সর্বভুজো যথা’ (১০। ৩৩। ২৯)। তন্ত্রবার্তিক তো সরাসরি জানিয়েছে—‘সর্বং বলবতাং পথ্যম’। তবে মীমাংসক আচার্য হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন, উত্তর প্রজন্মের তার্কিক পাঠককে উদ্ধৃতি বচনে আশ্বস্ত করা যাবে না। এজন্য তাঁর বিশেষ মন্তব্য—মহাতেজস্বী, ঐশ্বর্যদায়ী ইন্দ্র শব্দে সূর্যকে বুঝতে হবে। আর অহল্যা বলতে দিনের বেলায় লীন বা অপ্রকাশিত থাকেন যিনি (অহনি লীয়মানা) সেই রাত্রিকে বুঝতে হবে। অহল্যার (রাত্রির) ক্ষয়রূপ জরণের হেতু বলে ইন্দ্রকে (সূর্যকে) অহল্যাজার বলা হয়। কবি-দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘যে ভূমি হল চালনের অযোগ্যরূপে অহল্যা হইয়া, পাষাণ হইয়া পড়িয়াছিল ও সেই কারণে দক্ষিণাপথের প্রথম অগ্রগামীদের মধ্যে অন্যতম ঋষি গৌতম যে ভূমিকে একদা গ্রহণ করিয়াও অবশেষে অভিশপ্ত বলিয়া পরিত্যাগ করিয়া যাওয়াতে যাহা দীর্ঘকাল ব্যর্থ হইয়া পড়িয়াছিল, রামচন্দ্র সেই কঠিন পাথরকেও সজীব করিয়া তুলিয়া আপন কৃষিনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছিলেন’ (ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা)। কিন্তু এক্ষেত্রে ম্যাকাইভার এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে যদি বলা হয়, মিথ হচ্ছে কতকগুলো মূল্যবোধ—নিহিত বিশ্বাস, যেগুলো মানুষ পোষণ করে, যেগুলোর জন্য সে জীবনধারণ করে (The Web Of Government p.4) তবে গৌতমের অভিশাপকে অবাস্তব মনে হয় না। গৌতমের প্রতিবাদের ভাষা তখন যথার্থরূপে প্রতিভাত হয়। এদিকে কতিপয় নিন্দুক শ্রোতা ইন্দ্র-অহল্যার মিথ-পুরাণ-এ ভিন্ন স্বাদ পান। এরা বলেন, ইন্দ্র-অহল্যার কাহিনির প্রভাবেই গড়িয়া থেকে ব্যারাকপুর বুলাদির বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি ‘সঙ্গমং ত্বহমিচ্ছামি’।

এবারে আসি লক্ষ্মীর গোময়, গোমূত্রে প্রবেশ-কথায়। গোরু পবিত্র, তার মল-মূত্রও পবিত্র। রচনা করা হল অনুষ্টুপ ছন্দে স্তুত্যর্থক অর্থবাদ। গো-মাহাত্ম্য কথনে কখনও বক্তা ব্যাসদেব, শ্রোতা শুকদেব; বক্তা বশিষ্ঠ, শ্রোতা সৌদাস অথবা বক্তা ভীষ্ম, শ্রোতা যুধিষ্ঠির। মিথ-পুরাণ-এর সহায়তায় লক্ষ্মীকে পৃথিবীতে নামিয়ে কল্পকথায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হল। আভানকটি হল এরকম—‘লক্ষ্মী-গবাং সংবাদঃ, লক্ষ্ম্যা: প্রার্থনয়া গোভির্গোমূত্রে গোময়ে চ তস্যৈ বাসস্থানদানম’। গোময় ও গোমূত্রে লক্ষ্মীর নিবাস প্রসঙ্গে সংশয়ান্বিত যুধিষ্ঠির একদিন পিতামহ ভীষ্মের শরণাপন্ন হলেন। ভীষ্ম জানালেন, কোনো একদিন লক্ষ্মীদেবী নয়নাভিরাম রূপ ধারণ করে গোগণের শরীরে প্রবেশ করতে চাইলেন। লক্ষ্মী ভেবেছিলেন সমৃদ্ধির দেবীরূপে তিনি যেখানেই প্রবেশ করেন সেখানেই যেমন উষ্ণ অভ্যর্থনা পান এখানেও তার ব্যত্যয় হবে না। দেবীর রূপলাবণ্যের ছটায় গো-গণ বিস্মিত। তারা দেবীর পরিচয় জানতে চাইল ‘কাসি দেবি কুতো বা ত্বং রূপেণাপ্রতিমা ভুবি’। দেবী জানালেন তিনি সকল লোকের কামনার ধন ‘লোককান্তাস্মি’। মূলত তাঁরই বদান্যতায় দেবকুল ও ঋষিকুল সমৃদ্ধ। ধর্ম ও কাম দেবীর কৃপাধন্য। সেই লক্ষ্মী স্বয়ং অযাচিতভাবে গোরুদের কাছে আশ্রয়প্রার্থী। লক্ষ্মীর আশ্রয়ে গো-গণ শীঘ্রই শ্রীযুক্ত হবে। ত্রিলোকের কোথাও লক্ষ্মী কখনও প্রত্যাখ্যাতা হন না ‘নাবমান্যা হ্যহং সৌম্যাস্ত্রৈলোক্যে সচরাচরে’। কিন্তু হায়, দেবী লক্ষ্মী গো-গণের থেকে কোনোরকম অভ্যর্থনা বা স্বাগতসূচক ধ্বনি শ্রবণ না-করে মর্মাহত হলেন। খবর হল, গো-গণ কোনোরকম কপটতার আশ্রয় না-নিয়ে দেবীকে তাঁর চঞ্চলা প্রকৃতির জন্য গুরুত্ব দেয়নি। লক্ষ্মী তাঁর চপলস্বভাবের জন্য যেমন নিন্দিত হলেন, তেমন বহুজনের সঙ্গে সংসর্গের জন্য গোরুদের কাছে ভর্ৎসিতও হলেন ‘অধ্রুবা চপলা চ ত্বং সামান্যা বহুভি: সহ’। দেবীর মুখের ওপর গোরুদের সোজাসাপ্টা জবাব—তিনি যেখানে খুশি যেতে পারেন, স্থানান্তর নির্বাচন করুন ‘যথেষ্টং গম্যতাম’।

প্রত্যাখ্যাত হলে ভুবনে বদনামের আশংকায় দেবী অনুনয়ের সুরে বললেন—গোরুদের কোনো কুৎসিত অঙ্গেও যদি ঠাঁই হয়, তাও ভালো। আজ দেবী হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছেন অযাচিতভাবে কেন কোথাও যেতে নেই। দেবীর অনুনয়ে ছিল করুণা ও বাৎসল্যের সুর। এদিকে গো-গণ মিটিং করে ‘সমন্ত্র্য সহিতা: সর্বা:’ স্থির করলে দেবী যেন তাদের গোময়ে ও গোমূত্রে বাস করেন ‘শকৃন্মূত্রে নিবস ত্বং পুণ্যমেতদ্ধি নঃ শুভে’। গো-গণের কল্যাণকামনা করে দেবী গোময় ও গোমূত্রেই নিজের বাসযোগ্য স্থান বিবেচনা করলেন (মহা. অনু. ৮২। ১-২৭)। প্রচারিত হল, গোময় থেকে নির্গত যবের পালো টানা একমাস ধরে খেলে মানুষ ব্রহ্মহত্যার তুল্য পাপ থেকেও শুদ্ধিলাভে সমর্থ হয়। আবার ব্যাসদেব শুকদেবকে বলেছেন, দানবদের হাতে পরাজিত দেবতারা এইভাবে গোময়-নির্গত যবের পালো খেয়েই প্রায়শ্চিত্তানুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এবং পুনরায় হারানো পদ ও মর্যাদা ফিরে পান (ওই ৮১। ৩৯, ৪০)।

এহো বাহ্য। মিথ-পুরাণ অনুযায়ী গো-গণের পূর্বে শিং ছিল না। শিং-এর জন্য প্রয়োজনের তাগিদে তারা ভগবান ব্রহ্মার উপাসনা শুরু করেন। শিং-এর দাবিতে গো-গণের প্রতিবাদের বহর ছিল নজর-কাড়া। শোনা যায় ওরা প্রায়োপবেশন করেছিল। গো-গণের প্রতিবাদে সন্তুষ্ট ব্রহ্মা প্রত্যেককে শিং দিয়েছিলেন (ওই ৮১। ১৩,১৪)। যাই হোক গো-কেন্দ্রিক মিথ-পুরাণ শতকরা একশত ভাগ সফল। মিথ-পুরাণ-এ বিশ্বাসী মানুষ এজন্যই প্রায়শ্চিত্তে পঞ্চগব্যের তালিকায় গোময় ও গোমূত্রকে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানটি দিয়েছেন। গোবর-নাতা বা গোবর-জল-ছড়া দেবার সময় গ্রামের মা-বোনেরা প্রাণীর বিষ্ঠা ঘাঁটছেন বলে নাসিকা-কুঞ্চন করেন না। মূলত লক্ষ্মীর নিবাসের মিথকে আশ্রয় করেই বৃদ্ধিশ্রাদ্ধে বা আভ্যুদয়িক শ্রাদ্ধে দেয়ালে ঘুঁটের পিঠে বসিয়ে পাঁচটি কড়ি ও সিঁদুর লাগানোর রেওয়াজ। এ ছাড়া অলক্ষ্মী পূজায় দেবীর গোময় মূর্তি নির্মাণ ও টুসু পূজায় গোময়-নাড়ুর প্রচলনও উপরিউক্ত মিথকে প্রশ্রয় দিয়েছে। মিথ-পুরাণ-কারের নির্দেশ হল ‘গবাং মূত্রপুরিষস্য নোদ্বিজেত কথঞ্চন’।

অনুসন্ধিৎসু বলেন, খড়-ঘাস-বিচালির বিনিময়ে যে প্রাণী দুগ্ধ, দধি, ঘৃত, মাখন ও ছানার জোগান দেয় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না-করলে অশোভন হয়। গরিব চাষির ভালো উৎকৃষ্ট খাবার বলতে তো তারই যত্নে লালিত গোরু থেকে পাওয়া দিনান্তে এক-ছটাক দুধ। সুতরাং গোরুর গোময়-মূত্রেও লক্ষ্মীর বাস। লোকপ্রবাদেই বলা হয়েছে যে গোরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়াও ভালো। সুতরাং গোময়, গোমূত্রে কিবা যায় আসে। এ ছাড়া গোময় গ্রামাঞ্চলে জ্বালানির প্রকৃষ্ট মাধ্যম। ঘুঁটের মধ্যিখানে একটু শুকনো ছাই দিয়ে তার ওপরে কেরোসিন ঢেলে মা-বোনেরা গ্রামের বাড়িতে উনুন ধরিয়ে থাকেন। সেই উনুনের আঁচের সেদ্ধ রান্না খেয়ে বাড়ির কত্তা থেকে কোলের বাচ্চার জীবনধারণ। সুতরাং গোময়ে লক্ষ্মীর আবাস মিথটিকে জনতা গ্রহণ করে নিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য গোবর-গ্যাস এবং তাতে লাইট জ্বালানোর কলাকৌশল আধুনিক মানুষ রপ্ত করবেন জানতে পারলে অনুষ্টুপ ছন্দে আরও অনেকানেক মিথ-পুরাণাশ্রয়ী শ্লোক রচিত হত। তবে চঞ্চলা লক্ষ্মীকে ‘অধ্রু বা’ বলে নিজেদের অঙ্গে নিতে যারা গররাজি হয়েছিল তাদেরকে নিয়ে আর কি ‘গোমূর্খ’ শব্দপ্রয়োগ বাঞ্ছনীয়? আদিম মিশরীয় সংস্কৃতিতেও গোবরভিত্তিক দেববাদের পরিচয় মেলে। গুবরে-পোকা-দেবতা খেপ্রি বা খেপেরোর জন্মই গোবর থেকে হয়েছিল। আদিম সংস্কৃতিতে মানুষ গুবরে-পোকাকেও খাদ্যতালিকায় নিয়েছে। তবে মূল কথা সেই ‘যাবৎ প্রয়োজনং নোক্তং তাবৎ তৎ কেন গৃহ্যতে’?

নি:সন্তান দাম্পত্যজীবন এবং তার ভয়াবহতার থেকে মুক্তি পেতে কিছু মিথ সৃষ্টি হয়েছে। অনপত্যা নারীর ছন্দ পতন, পালিত পুত্রে অতৃপ্তি, পিন্ডদানের চিন্তা, অনপত্যার গোপালের প্রতি সন্তানভাব, সন্তানহীনার পশুপাখি প্রেম, আঁটকুড়ি অপবাদ শোনা, সমাজবিজ্ঞানের বিদ্যার্থীর গবেষণার বিষয়। কিন্তু এই সমস্যা দূর হবে কীভাবে? ঋষিদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে। ঋষিদের মতে যজ্ঞের মাধ্যমে দেবঋণ, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ঋষিঋণ এবং সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে পিতৃঋণমুক্ত হওয়া যায় ‘ব্রহ্মচর্যেণ ঋষিভ্যো যজ্ঞেন দেবেভ্যঃ প্রজয়া পিতৃভ্যঃ (তৈ. স. ৬। ৩। ১০। ৫; শ. ব্রা. ১। ৭। ২। ১১)। নি:সন্তান দম্পতি কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। ঋণমুক্ত না-হলে পিতৃপিতামহ প্রভৃতি পরলোকগত পূর্বপুরুষদের দুর্গতির বর্ণনা মহাভারত-এর আদিপর্বে জরৎকারু পিতৃসংবাদে পাই। সন্তান কামনায় গুরুপ্রদত্ত পায়স স্ত্রীদের বণ্টন করা হচ্ছে, গুরু-প্রদত্ত ফল খাওয়ানো হচ্ছে, গুরুর আশ্রমে সস্ত্রীক হত্যে দিয়ে উঁচুতলার মানুষ (রাজারাজড়ারা) পড়ে আছে, পুত্রেষ্টি যজ্ঞ হচ্ছে।

ন্যায়সূত্রভাষ্যে বাৎস্যায়ন সন্তানার্থীকে জানিয়েছেন, ব্যাধি প্রভৃতি প্রতিবন্ধকা-ভাববিশিষ্ট দম্পতির অন্যোন্যসংসর্গ নি:সন্তানের সন্তানলাভের মূল। কে কার কথা শোনে! রাজাবাবা এবং রানিমা’রাই যেখানে সন্তানকামনায় হুড়োহুড়ি করছেন সেখানে কা কথা সাধারণানাম? আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ন্যায়সূত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম আহ্নিকের ৫৮তম সূত্রটি ‘ন কর্ম-কতৃ-সাধন-বৈগুণ্যাৎ’ এবং সেই সংক্রান্ত বাৎস্যায়ন ভাষ্য প্রচার পেল না। ভাষ্যকার লোকশিক্ষার্থে বিষয়টিকে সহজবোধ্য করেছেন উপযুক্ত দৃষ্টান্তের সহায়তায়। তিনি বলেছেন, বেদ-এ বলা আছে সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ আগুনের প্রয়োজনে দুটি কাঠে ঘর্ষণ করে ফেললেন। আগুনের ফুলকি নির্গত হল। কিন্তু ঘর্ষণমাত্রেই কি তাই বলে আগুন বেরিয়েছিল? মৈবম। কর্ম-কতৃ-সাধনবৈগুণ্যের অভাব থাকা দরকার। মিথ্যামন্থন বা হালকামন্থন অর্থাৎ যে মন্থনে আগুন নির্গত হয় না তাকে কর্মবৈগুণ্য, বুদ্ধি ও প্রচেষ্টাগত প্রমাদকে কতৃবৈগুণ্য এবং ভেজা কাঠকে সাধন বৈগুণ্য বলা হয়। উল্লিখিত ত্রিদোষরহিত হলেই তবে ঘর্ষণে আগুন মেলে। একইভাবে বলা যায় প্রতিবন্ধকাভাববিশিষ্ট দম্পতির অন্যোন্যসংসর্গের ফলে দম্পতি সন্তানের জন্ম দেন। প্রজননহীনত্ব দূরীকরণে মিথ-পুরাণ-কথার প্রতিশ্রুতিতে মানুষকে বঞ্চনা করা গর্হিত অপরাধ।

সৃষ্টির আদি মুহূর্ত হতে প্রবহমান মিথ-পুরাণ-গুলো স্বর্গ ও নরকের দুটি স্টেশন বানিয়ে দিয়েছে। জীবন-গাড়ি ছুটছে কিন্তু থামবে দুটির একটিতে। মৃত্যুপথযাত্রী দুটির একটিতে অবতরণ করবে। পাপ-পুণ্যের রেকর্ড মিলিয়ে তবেই অবতরণ। মহাভারত ‘নিরয়গামিনঃ’ এবং ‘স্বর্গগামিনঃ’ যারা তাদের আচরিত কর্মের একটা তালিকা পরিবেশন করেছে (মহা. অনু. ২৩তম অধ্যায়)। এখন কথা হল আস্তিক স্বর্গ প্রসঙ্গে কী বলেন? আস্তিকবাদী বলেন, স্বর্গ হল দুঃখবিরোধী একধরনের সুখ। পৃথিবীর যাবতীয় সুখ-দুঃখমিশ্রিত হলেও স্বর্গসুখ দুঃখান্বিত নয়। স্বর্গ হল নিরতিশয় প্রীতি। বাচস্পতিমিশ্র বলেন ‘দুঃখবিরোধী সুখবিশেষশ্চ স্বর্গঃ’ (সা. কৌ.) কুমারিল ভট্ট তাঁর তন্ত্রবার্তিকে স্বর্গের প্রসঙ্গে বলেছেন:

যন্ন দুঃখেন সম্ভিন্নং ন চ গ্রস্তমনন্তরম।

অভিলাষোপনীতঞ্চ তৎ সুখং স্বঃপদাস্পদম।।

স্বর্গে ভয় নেই, যমরাজ নেই, বার্ধক্যভয় নেই, ক্ষুধা ও তৃষ্ণাকে অতিক্রম করে স্বর্গবাসী কেবল সেখানে আনন্দ উপভোগ করেন ‘স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চনাস্তি’ (ক. উ. ১। ১। ১২)। যজ্ঞ, ব্রত, উপবাস এসবের ধকল আছে। তাই মানুষের আগ্রহ যাতে না-কমে যায় সেজন্য গুড়জিহ্বিকান্যায়ে স্বর্গের অবতারণা। পৃথিবীর সব দেশের মিথ-পুরাণ-এই একটা কল্পলোকের চিত্র থাকে—যেখানে নিত্যসুখ, জরা-মৃত্যু-বেদনা-অপূর্ণতার চিরবিদায় ‘যত্রানন্দাশ্চ মোদাশ্চ মুদঃ প্রমুদ আসতে/কামস্য যত্রাপ্তা: কামাস্তত্র মামমৃতং কৃধি।। (ঋ.স. ৯। ১১৪। ১১)।

পক্ষান্তরে নরক সম্বন্ধে বলা হয়েছে পাপীগণ যে স্থানে যাতনা ভোগ করে তার নাম নরক। বিভিন্ন পুরাণ-এ নানা নরককুন্ডের বর্ণনা আছে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ছিয়াশিটি ক্লেশকর নরককুন্ডের বর্ণনা দিয়েছে ‘ষড়শীতিশ্চ কুন্ডানি’ (ব্র.পু. প্রকৃতি খন্ড, ২৯তম অধ্যায়)। প্রেত ও যমদূতের দ্বারা পরিব্যাপ্ত এক বিশাল সুরম্য প্রাসাদ নাকি যমরাজের আছে। উত্তম, মধ্যম ও অধম ভেদে ত্রিবিধ প্রাণীর জন্য যমালয়ে প্রবেশ পথটিও তিন ধরনের, যথা—ক. রমণীয় খ. নিরাবাধ এবং গ. দুর্দর্শ। পুষ্প ও পতাকা শোভিত প্রথম পথটিতে নিত্য ঝাড়ুর ব্যবস্থা আছে। রাস্তায় ধুলো ওড়া বন্ধের জন্য নিত্য জল ঢালার ব্যবস্থা আছে। ধূপের গন্ধে এই রমণীয় পথ ভরে থাকে সর্বদা। সুন্দর পরিপাটি জামাকাপড় গায়ে যমদূতেরা উত্তমশ্রেণীকে এই পথ দিয়ে নিয়ে যান যমরাজের কাছে। দ্বিতীয় নিরাবাধ মার্গটিও মন্দ নয়! মধ্যম শ্রেণীর প্রাণীরা সৈনিকের বেশধারী যমদূতের সাহায্যে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এই দ্বিতীয় পথে যমরাজের নিকটবর্তী হয়ে থাকেন। অধম তৃতীয়শ্রেণীর যারা, তাদের অভ্যর্থনায় নিযুক্ত থাকেন চন্ডালবেশধারী যমদূতেরা। দুর্গন্ধযুক্ত, অন্ধকারময়, কঙ্করাকীর্ণ, হিংস্রজন্তু পরিবেষ্টিত তৃতীয় পথটি বড়ো কষ্টের। যম হলেন লোকপাল। তাঁর এলাকায় প্রবহমানা বৈতরণীতে জলের পরিবর্তে কেবল রক্ত এবং প্রস্রাব। যমালয়ে তৃতীয় শ্রেণীর ভাষা কেবল আর্তনাদ (মহা. অনু.)। এখন উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী হাইটেক সোসাইটির মানুষ যাদের পাতালের গোপন সংবাদও আগোচর থাকে না—তারা এখনো লোকপালের এই সুরম্য ভবনটির হদিশ কেন পেলেন না—এটিই বিস্ময়ের।

স্বর্গে যেতে গেলে যজ্ঞ করতে হবে। যজ্ঞ মানেই দক্ষিণাদান। এর আবার বিচিত্র রকমফের যেমন সহস্রদক্ষিণ (ঋ. স. ১০। ৩৩। ৫), সর্বস্বদক্ষিণ (ক. উ. ১। ১। ১) ইত্যাদি। অর্থ ব্যয় করলেই আপনি-আমি যেতে পারব সেই ঠিকানাহীন আনন্দধামে। জীবিকার স্বার্থে জীবনটাকে গুরুত্বহীন করে তোলার সচেতন প্রয়াস। যজ্ঞে যেমন-তেমন দক্ষিণা দিলে চলবে না। মনু সরাসরি জানিয়েছেন অল্পধন, গরিব-গুর্বো যেন কখনই বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার স্পর্ধা না-দেখান। প্রশ্ন হল কোনো খেটে খাওয়া মানুষ যদি স্বর্গের গল্প শুনে যজ্ঞের লোভ না-সামলাতে পারেন তবে কী হবে? মনু এই ব্যাপারে দুঃখের করুণ ফিরিস্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে সেই ইতর লোকটির ইন্দ্রিয় বিকল হতে পারে, নাম-ডাক-যশ থাকলে সব যাবে, আয়ু কমবে এবং সন্তান ও গৃহপালিত পশুদের ক্ষতি অনিবার্য হবে:

ইন্দ্রিয়াণি যশঃ স্বর্গমায়ু: কীর্তিং প্রজা: পশূন।

হন্ত্যল্পদক্ষিণো যজ্ঞস্তস্মান্নাল্পধনো যজেৎ।।                            (ম.স. ১১। ৪০)

কি সাংঘাতিক রকমের গ্রাম্যগালি। জীবিকার তাগিদে এও জানানো হয়েছে যে অদক্ষিণ যজ্ঞ নিষ্ফল ‘হতো যজ্ঞস্ত্বদক্ষিণঃ, (চাণক্য)। কথা হল স্বর্গ শর্তসাপেক্ষ। সৃষ্টিকর্তার মুখ থেকে যাদের জন্ম তাদের দান করুন। প্রত্যেক কর্মের শেষে দক্ষিণার বিধান আছে। জমি, গোরু অথবা স্বর্ণ দানের প্রসঙ্গ বারংবার এসেছে। লজ্জার মাথা কেটে রাখঢাক না-রেখে বলা হয়েছে স্বর্ণদানই সর্বোৎকৃষ্ট (বর্তমানের বাজারে তিরিশ হাজার টাকার ওপর ভরি)। অতএব একটু-আধটু নয়, বাধ্য সন্তানের ন্যায় ব্রাহ্মণদের ভরি-ভরি স্বর্ণ দান করে সর্ববিধ কুকর্মের হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের পথ প্রশস্ত হোক ‘বিপ্রেভ্যঃ প্রযচ্ছ কনকং বহু’ (মহা. অনু. ৮৫। ১০৮)।

উপসংহার বলি ভারতীয় দর্শনের (জড়বাদী বাদে) মূল্যবান পরামর্শ হল এষণাকে ত্যাগ করতে হবে। বিত্তৈষণা, পুত্রৈষণা, লোকৈষণা হৃদয়পিঞ্জরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মোক্ষের কাঙাল কর্মফল দিয়ে কী করবেন? এষণার তো শেষ নেই। রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি—এইভাবে নিরন্তর আবেদন মানুষকে অর্থী করেই রাখে, অর্থবান হতে দেয় না। মানুষের আমৃত্যু হ্যাংলাপনা স্বভাবই মিথ-পুরাণ-কে সজীব রেখেছে। মিথ-পুরাণ-এর জয় হোক। কারণ মিথ-পুরাণ আমাদের জানতে সাহায্য করে ওপরতলায় যাঁরা পূজা পান, তাঁরাও ঈর্ষাচ্ছন্ন, তৃপ্ত হলেই তাঁরা মর্ত্যের মানুষকে সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে দেন, বন্দে মিথপুরাণম।

শব্দসংকেত :

ঈশ.

ঈশোপনিষদ

ঋ. স.

ঋগবেদসংহিতা

ক. উ.

কঠোপনিষদ

তৈ. স.

তৈত্তিরীয়সংহিতা

দ. টী.

দর্শনাঙ্কুর টীকা

ন্যা. ক.

ন্যায়কন্দলী

ন্যা. কু. হ. টী.

ন্যায়কুসুমাঞ্জলি হরিদাসী টীকা

ন্যা. ম.

ন্যায়মঞ্জরী

ন্যা. সূ.

ন্যায়সূত্র

প্র. ভা.

প্রশস্তপাদভাষ্য

ব্র. পু.

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ

ম. স.

মনুসংহিতা

মহা. অনু.

মহাভারত, অনুশাসনপর্ব

মা. পু.

বা. ভা.

মার্কন্ডেয়পুরাণ

বাৎস্যায়ন ভাষ্য

বা. সূ.

বার্হস্পত্যসূত্র

বি. পু.

বিষ্ণুপুরাণ

শ. ব্রা.

শতপথব্রাহ্মণ

শ্বে.

শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ

সা. কা.

সাংখ্যকারিকা

সা. কৌ

সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%