অমিত ভট্টাচার্য
ছায়াময় সে ভুবনখানি
স্বপন দিয়ে গড়া
রূপকথাটি ছাঁদা,
কোন সে পিতামহীর বাণী—
নাইকো আগাগোড়া,
দীর্ঘ ছড়া বাঁধা।
(খেয়া, অনাহত)।
সৃষ্টিকর্তা কবিপ্রজাপতি তাঁর কলমের আঁচড়ে যে চিত্ররূপ অঙ্কিত করেন, পাঠক তাতে উৎকর্ণ হন। অপার কাব্যসংসারে কবি প্রজাপতি যথারুচি বিশ্বের পরিবর্তন সাধনে সক্ষম। অচেতনকে চেতনবৎ এবং চেতনকে অচেতনবৎ ব্যবহারে তিনি সিদ্ধহস্ত। দৈববাণী বা আকাশবাণীর ষোলোআনা কৃতিত্বের দাবিদার এই সিদ্ধকবির দল:
অপারে কাব্যসংসারে কবিরেকঃ প্রজাপতি:।
যথাস্মৈ রোচতে বিশ্বং তথেদং পরিবর্ততে।।
শৃঙ্গারী চেৎ কবি: কাব্যে জাতং রসময়ং জগৎ।
স এব বীতরাগশ্চেন্নীরসং সর্বমেব তৎ।।
ভাবানচেতনানপি চেতনবচ্চেতনানচেতনবৎ।
ব্যবহারয়তি যথেষ্টং সুকবি: কাব্যে স্বতন্ত্রতয়া।। (ধ্বন্যা. তৃতীয়োদ্যোত)
দৈববাণী বা আকাশবাণীকে সংস্কৃত সাহিত্যে অশরীরিণী বাক বলা হয়েছে। বিবিদিষু জানতে চান, প্রতিবন্ধকতাশূন্য শরীর ব্যতিরেকে বাক কীভাবে সম্ভব? তবে এই আঙ্গিকে বিচারে অগ্রসর হলে দৈববাণীর সপক্ষে প্রশ্নচিহ্ন ওঠে। দৈববাণী বা আকাশবাণী প্রসঙ্গে জনৈক লেখক জানিয়েছেন, নরলোকে ভক্তদের কাছে আর্জেন্ট বার্তা পাঠাবার অভিপ্রায়ে আকাশের বজ্রবিদ্যুৎকে ব্যবহার করা হয় যার নামান্তর আকাশবাণী (তি. ভু. ক.)। দৈববাণী প্রসঙ্গে অপর এক ঔপন্যাসিক বোধিসত্ত্বের উপলব্ধি প্রকাশ করে এক সত্যকে উন্মোচন করেছেন। ‘চড়াত করে একটা বিদ্যুতের ঝলকে বিশ্বচরাচর যেন ঝলসে গেল। তারপর গর্জন উঠল সারা আকাশে। সেই মেঘের ধ্বনির মধ্যে শোনা গেল এক কন্ঠস্বর। বোধিসত্ত্ব তাড়াতাড়ি উঠে এসে দরজার কাছে দাঁড়ালেন। অন্ধকার আকাশ থেকে এক অদৃশ্য কন্ঠস্বর বলে উঠল, হে মৈত্রেয়, আপনি কোথায় আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন? হে বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয়, আপনি তুষিত স্বর্গ ছেড়ে এই মাটির পৃথিবীতে এসেছেন লুপ্ত সত্য পুনরুদ্ধারের জন্য। আমরা প্রতীক্ষা করে আছি। আপনি সত্যের প্রকাশ করুন। বোধিসত্ত্ব ভাবলেন, আসলে হয়তো কেউ বলছে না, তিনি নিজেই এর উদ্ভাবন করছেন। তাঁর নিজের চিন্তাই প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশের মেঘগর্জনে’। এখানে এই উপন্যাসে একাধিকবার দৈববাণীর প্রয়োগ করা হয়েছে (ন. জা.)।
কবিসার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিসর্জন নাটকে দেবীর আদেশ, দেবী আজ্ঞা প্রভৃতি স্বার্থান্ধ রঘুপতির মুখে এমনভাবে বসিয়েছেন যার থেকে পাঠকের কাছে এসকল বিষয়ে সত্য-মিথ্যা আর গোপন থাকেনি। সহৃদয় পাঠক গোবিন্দমাণিক্যজয়সিংহের কথোপকথন থেকে জানলেন:
দেবী নহে জয়সিংহ,
কহিলেন রঘুপতি অন্তরাল হতে,
পরিচিত স্বর।
তবে পুরাণ মহাকাব্যাদি গ্রন্থ পাঠে উপলব্ধ হয় যে, অনেক সময় সৎ-নিষ্কলঙ্ক ব্যক্তি অন্তরের অন্তস্থল থেকে যে সত্য উপলব্ধি করেন তাও দৈববাণীরূপে নির্দেশিত হয়েছে। দুর্বিনীত অত্যাচারী কংস, দুর্যোধনের ধ্বংসবার্তা প্রচার যখন সমাজ-সংসারে অপরিহার্য হল তখন নেহাত দৈববাণী ঘোষণা কেবলই সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। দৈববাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বচনটিকে অমোঘ হতে হবে। রক্তমাংসের ক্রান্তদর্শী কবি যখন উপলব্ধি করেন কেবল তার লেখনীনি:সৃত শব্দই যথেষ্ট নয় তখন তিনি অতীন্দ্রিয়, অতিপ্রাকৃত মিথকথাকে অবলম্বন করে মানুষজনকে উক্ত ঘটনার অপরিহার্যতার, অবশ্যম্ভাবিতার নির্দেশ দিতেন দৈববাণীর মাধ্যমে। দৈববাণী আকাশ থেকে উদগীত হয় এজন্য নাট্যকারেরা অভিনয়কালে দৈববাণীকে আকাশমার্গে নির্দেশ করেন। এক্ষেত্রে কালিদাস, ভবভূতি সবাই একই পথের পথিক। সতীত্বের গরিমা প্রকাশের অভিপ্রায়ে ভবভূতি নেপথ্য থেকেই দৈববাণী ঘোষণা করে জানিয়েছেন, সীতা বিশুদ্ধা।
চেদিরাজবংশের শিশুপালের জন্মের সময় সে তিনটি চোখ ও চারটি বাহু নিয়ে জন্মেছিল। সন্তানের বিকৃত রূপ দেখে শিশুপুত্রের বাবা, মা ও বন্ধুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। প্রত্যেকে যখন সন্তানের জীবনের সুস্থতা নিয়ে চিন্তিত তখন দৈববাণী হয়েছিল ‘বাগুবাচাশরীরিণী’। অশরীরিণী বাক জানিয়েছিল শিশুপালের এখন কোনো জীবন সংশয় নেই। যার হাতে ভবিষ্যতে এই সন্তানের প্রাণ যাবে তিনি পৃথিবীতে অনেক আগেই জন্ম নিয়েছেন। তিনি শিশুপুত্রকে কোলে নিলেই এর অতিরিক্ত চোখ ও বাহু দুটি লুপ্ত হবে। লোকমুখে এই বার্তা রটে যাবার পরেই দলে দলে বিশিষ্টজনেরা তাকে দেখতে ও কোলে নিতে ভিড় জমিয়েছিল। হাজারো রাজার কোলে চড়ালেও সেই আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষাৎ যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন একদিন কৃষ্ণ ও বলরাম তাদের পিসির বাড়িতে চেদি রাজধানীতে হাজির হলেন। যথানিয়মে শিশুপালের মা তার ছেলেকে কৃষ্ণের কোলে দিতেই শরীরের অতিরিক্ত অংশগুলি লুপ্ত হল। ‘পেততুস্তচ্চ নয়নং ন্যমজ্জত ললাটজম’ (মহা. সভা. ৪২।১৭)। ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সকলে হকচকিয়ে গেলেও ভাবি অমঙ্গলের আশঙ্কায় মায়ের মন ডুকরে ওঠে। কৃষ্ণ তাঁর পিসিকে জানায় শিশুপাল বধযোগ্য হলেও তার একশো অপরাধ ক্ষমা করা হবে। ‘অপরাধশতং ক্ষাম্যং ময়া হ্যস্য পিতৃষ্বসঃ’ (মহা. সভা. ৪২।২৩)।
যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণপূজার সপক্ষে বিভিন্ন বক্তা তাদের মতদানের পর সহদেব যখন বলেন উপস্থিত সকল সভ্যদের মধ্যেই তিনি কেশব কৃষ্ণকে পূজা করতে চান এবং যার সেই কার্যপদ্ধতি অসহ্য মনে হবে তার মাথায় তিনি নিজের চরণযুগল রাখতে চান তখন ‘সাধু সাধু’ এরকম আকাশবাণী শোনা গিয়েছিল ‘অদৃশ্যরূপা বাচশ্চ নিশ্চেরুঃ সাধু সাধ্বিতি’ (মহা. সভা. ৩৮।৬)।
গাঙ্গেয় দেবব্রত পিতা শান্তনুর সঙ্গে দাসরাজ কন্যা সত্যবতীর বিবাহ সম্বন্ধ পাকা করতে এসে একাধিক ভয়ানক সব প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। যেমন, ১. দাসরাজকন্যার সন্তানই ভবিষ্যতে রাজা হবেন (যোহস্যাং জনিষ্যতে পুত্রঃ স নো রাজা ভবিষ্যতি) এবং ২. দাসরাজকন্যার সিংহাসনকে প্রতিপক্ষহীন করতে তিনি আমৃত্যু ব্রহ্মচারী ব্রত গ্রহণ করবেন (অদ্য প্রভৃতি মে দাস ব্রহ্মচর্য্যং ভবিষ্যতি)। যুবাবস্থায় এই ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা বচনে দেবতারাও শিহরিত হলেন। কোনো প্রশংসাবচনই যখন যথেষ্ট নয় বলে প্রতিভাত হল তখনই আকাশবাণী নেমে এল। এমন ভীষণ প্রতিজ্ঞা যিনি করলেন আজ থেকে তার নাম হোক ভীষ্ম। ‘ভীষ্মোহয়মিতি চাব্রুবন’ (মহা. অনু. ১৩।৪৫)।
ষাট হাজার বছর ধরে পর্যায়ক্রমে সংঘটিত দেবাসুরের সংগ্রামে দেবতারা যখন কোণঠাসা অবস্থায় রক্ষকহীন হয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন আত্মোদ্ধারে কৃতসংকল্প হয়ে তাঁরা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা দেবতাদের নিয়ে বিষ্ণুর কাছে যান। সবেদ বিবিধ মন্ত্রোচ্চারণে বিষ্ণু যারপরনাই প্রীত হন। আসলে অসুরদের কাছ থেকে গদি কেড়ে নিতে দেববাহিনী মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন প্রতিপক্ষের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বার করতে হলে সফল নেতৃত্ব আবশ্যক। এজন্য ব্রহ্মার পরামর্শে অনাগত সাফল্যের আশায় উদ্দীপনাময় কন্ঠে তাঁরা বিষ্ণুর স্তুতিতে মেতেছিলেন। স্তুতিতে কে-না গলে! মেঘতুল্য গম্ভীর স্বরে আকাশবাণী হল ‘ততোহন্তরিক্ষে বাগাসীন্মেঘগম্ভীরনি:স্বনা’ (মহা. অনু. ১৩।১৪)। আকাশবাণীর নির্গলিত অর্থ হল, দিব্যাত্মা পুরুষের সঙ্গে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধে মন দিলে তাঁদের জয় অবশ্যম্ভাবী। নিন্দুকেরা বলেন, কার সাহায্য নিলে জয়ী হওয়া যাবে এরূপ তত্ত্বজ্ঞান অধিগত করতে যদি কোনো পক্ষের এতগুলো বছর লেগে যায় তবে সেই পক্ষের বিড়ম্বনা অবশ্যপ্রাপ্য। দ্বিতীয়বার ওই একই পর্বে আকাশবাণী হয়েছিল, বিনতানন্দন গরুড়ের পরাক্রম নিরীক্ষণের পরে অশরীরিণী বাক জানিয়েছেন, গরুড়ের মনোরথ অবশ্যই পূর্ণ হবে ‘অবৃথা তেহস্তু’ (মহা. অনু. ১৩।৪৫)।
ব্রহ্মপুরাণ-মতে প্রবল প্রতাপান্বিত দৈত্যদের অত্যাচারে পুত্রদের নিয়ত জর্জরিত হতে দেখে দক্ষ-কন্যা অদিতি ভগবান তপনদেবের আরাধনায় ব্রতী হন। সুরমাতা অদিতির দীর্ঘ সাধনায় প্রসন্ন তপনদেব অভিপ্রেত কামনা পূরণের জন্য নিজের সহস্র করের মধ্যে থেকে সুষুম্না নামক একটি করের সাহায্যে সুরমাতার গর্ভে বাস করতে লাগলেন। এদিকে নিত্য উপবাসে তৎপর অদিতিকে কশ্যপ সক্রোধে দ্বিহৃদয়া রমণীর উপবাসের ক্ষতিকর দিকের নির্দেশ করলেন এবং পরিণামে গর্ভান্ড বিনাশের আশঙ্কাও করলেন ‘কিং মারয়সি গর্ভান্ডমিতি নিত্যোপবাসিনী’ (ব্র. পু. ৩২।৩৪)। যা হোক, কশ্যপের আশঙ্কা ব্যর্থ করে যথাকালে দিঙমন্ডল পরিব্যাপ্ত করে এক তেজস্বী পুত্রের জন্ম হল এবং জন্মলগ্নেই শোনা গেল অন্তরিক্ষে দৈববাণী:
অথান্তরিক্ষাদাভাষ্য কশ্যপং মুনিসত্তমম।
সতোয়মেঘগম্ভীরা বাগুবাচাশরীরিণী।। (ব্র. পু. ৩২।৩৯)
উক্ত দৈববাণীর নির্যাস হল, যজ্ঞভাগহর অসুরদের বিনাশ করবেন এই নবজাতক আগামী দিনে। পাঠকের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখি কশ্যপের কুপিত হওয়ার জন্য পুত্রের নাম হল ‘মার্তন্ড’। আকাশবাণীর শ্রবণে দেবতারা আনন্দিত হলেন:
দেবা নিশম্যেতি বচো গগনাৎ সমুপাগতম।
প্রহর্ষমতুলং যাতা দানবাশ্চ হতৌজসঃ।। (ওই ৩২।৪২)
বিষ্ণুপুরাণ-এর পঞ্চমাংশের প্রথম অধ্যায়ে যাই। সেখানে দেখি বসুদেব-দেবকীর বিবাহে ভোজবংশবর্ধন কংস সারথিরূপে দম্পতির রথ চালাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় আকাশে মেঘগম্ভীর শব্দে কংসকে সম্বোধন করে দৈববাণী হয়েছিল—ওরে বোকা! স্বামীর সঙ্গে যে নববধূকে তুমি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছ, তারই অষ্টম গর্ভে যিনি জন্মাবেন তারই হাতে তোমার মৃত্যু অবধারিত:
কংসস্তয়োর্বররথং চোদয়ামাস সারথি:।
বসুদেবস্য দেবক্যা: সংযোগে ভোজবর্ধনঃ।।
অথান্তরীক্ষে বাগুচ্চৈ: কংসমাভাষ্য সাদরম।
মেঘগম্ভীরনির্ঘোষং সমাভাষ্যেদমব্রবীৎ।।
যামেতাং বহসে মূঢ় সহ ভর্ত্রা রথে স্থিতাম।
অস্যান্তে চাষ্টমো গর্ভঃ প্রাণানপহরিষ্যতি।। (বি. পু. ৫।১।৬৮)
দধীচি মুনির অস্থি নির্মিত বজ্র দিয়ে বৃত্রাসুরকে হত্যা করায় ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপে তেজোহীন বিরক্তচিত্ত দেবরাজ ইন্দ্র যখন পর্বতশীর্ষে আরোহণ করে আত্ম-হত্যায় উদ্যত হন তখন ঠিক সেই মুহূর্তে দৈববাণী হয়েছিল এবং আকাশবাণী শ্রবণ করে তিনি আত্মহত্যা থেকে বিরত হন:
যাবৎ ক্ষিপতি চাত্মানং মরণে কৃতনিশ্চয়ঃ।
তাবদ্দেবোত্থিতা বাণী গগনাদ্দ্বিজসত্তমা:।। (স্ক. পু. নাগরখন্ড, ১১৭-১১৮)
বৃহদ্ধর্মপুরাণ থেকে জানা যায়, গণেশের ছিন্ন মস্তক নিরীক্ষণ করে পার্বতী শোকে মুহ্যমানা। শিব পুত্রের জীবনদানে উদ্যত হয়ে ছিন্ন মস্তকটিকে স্কন্ধে সংযুক্ত করবার অভিপ্রায়ে বহুচেষ্টা করেছেন। ঠিক সেই সময় দৈববাণী হয় যে, কেবল মস্তক সংযোগেই শিশুর জীবন স্পন্দন হবে না। উত্তরশিরে স্থিত কোনো জীবের মস্তক যোজনা করলে তবেই পুত্র জীবন পাবে:
এতস্মিন্নেব কালে তু খে বাগাহশরীরিণী।
শম্ভো তবাস্য বালস্য রিষ্টিদৃষ্টং শিরোহভবৎ।।
ততো নৈতেন শিরসা জীবেত তব বালকঃ।
অন্যস্য শির আনীয় স্কন্ধে যোজয় জীবয়।।
পাণৌ তবোত্তরশিরা বাল এষ স্থিতো যতঃ।
অত উত্তরশীর্ষস্য শীর্ষং নীত্বাত্র যোজয়।।
ইত্যাকাশবচঃ শ্রুত্বা দেবীমাশ্বাসয়চ্ছিবঃ।
আহূয় নন্দিনং তত্র প্রেষয়ামাস কর্মণি।। (বৃ. পু. মধ্যখন্ড, ৩০।৪৮৫১)
অশ্বঘোষ তাঁর বুদ্ধচরিত নামক গ্রন্থের প্রথম সর্গেই দৈববাণীর প্রসঙ্গ এনেছেন। মহর্ষি অসিত শাক্যেশ্বরকে বলেছেন যে তিনি স্বয়ং আকাশমার্গে দিব্যবাণী শ্রবণ করেছেন। সেই বাণীতে বলা হয়েছে—বোধিলাভের জন্য মহারাজের এক পুত্র জন্মেছেন। শক্রধ্বজতুল্য সেই শাক্যকুলধ্বজের দর্শনাভিলাষী হয়েই তিনি শাক্যেশ্বরের রাজভবনে উপস্থিত হয়েছেন:
প্রয়োজনং যত্তু মমোপযানে তন্মে শৃণু প্রীতিমুপেহি চ ত্বম।
দিব্যা ময়া দিব্যপথে শ্রুতা বাগবোধায় জাতস্তনয়স্তবেতি।। (বু. চ. ১।৬২)
মহাকবি কালিদাস তাঁর অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকের চতুর্থ অঙ্কে আকাশে দৈববাণী প্রচার করেছেন শকুন্তলার যাত্রাপথের মঙ্গল কামনায়। আকাশে দৈববাণী হল—শকুন্তলার বিদায়বেলায় পথের দু-ধারের সরোবরগুলো প্রস্ফুটিত পদ্মে এবং সবুজ মৃণালে সুন্দর হোক, শীতল ছায়া বিতরণে সক্ষম বৃক্ষগুলো মধ্যাহ্ন সূর্যের তাপ ম্লান করুক, পথের ধুলো হোক পদ্মের রেণুর মতো কোমল, বাতাস হোক শান্ত ও সুখদায়ক এবং পথ হোক উপদ্রবহীন:
(আকাশে)
রম্যান্তরঃ কমলিনীহরিতৈ: সরোভি-
শ্ছায়াদ্রুমৈর্নিয়মিতার্কময়ূখতাপঃ।
ভূয়াৎ কুশেশয়রজোমৃদুরেণুরস্যা:
শান্তানুকূলপবনশ্চ শিবশ্চ পন্থা:।। (অ. শ. ৪।১১)
সোমতীর্থ থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে পিতা কাশ্যপকে দুষ্যন্ত-শকুন্তলার গান্ধর্ব মতে পরিণয়ের বার্তা কীভাবে পরিবেশন করা হবে তা ভেবে অনসূয়া চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছিল। তার অক্ষমতার কথা সে নিজেই জানিয়েছে। সখী শকুন্তলা যে দুষ্যন্তের সন্তান ধারণ করেছেন তা নিজমুখে পিতার সমক্ষে জানানো একপ্রকার ধৃষ্টতাও বটে। নীতিচেতন মহাকবি লোকশিক্ষার প্রয়োজনেই শকুন্তলা ও তার দুই সখীকে এক্ষেত্রে অব্যাহতি দিতে চেয়ে দৈববাণীর অবতারণা করেছেন। সচেতন পাঠক অনসূয়ার অক্ষমতায় নজর দিতে পারেন—‘ননু সখীগামী দোষঃ ইতি ব্যবসিতা অপি ন পারয়ামি প্রবাসপ্রতিনিবৃত্তস্য তাতকাশ্যপস্য দুষ্যন্তপরিণীতাম আপন্নসত্ত্বাং শকুন্তলাং নিবেদয়িতুম। ইত্থংগতে অস্মাভি: কিং করণীয়ম’ (অ. শ. চতুর্থ অঙ্ক)। এই পরিস্থিতিতে প্রিয়ংবদার উক্তি থেকে পাঠক জানতে পারেন যে, কাশ্যপ যখন অগ্নিশালায় প্রবেশ করছিলেন তখন এক অশরীরী ছন্দোময়ী বাণী তাকে এই বৃত্তান্ত জানিয়েছে। ঘোষিত দৈববাণীর বিষয় হল—লোককল্যাণের স্বার্থে শকুন্তলা দ্বিহৃদয়া। সে দুষ্যন্তের বীর্য ধারণ করেছে ‘অগ্নিশরণং প্রবিষ্টস্য শরীরং বিনা ছন্দোময্যা বাণ্যা:
দুষ্যন্তেনাহিতং তেজো দধানাং ভূতয়ে ভুবঃ।
অবেহি তনয়াং ব্রহ্মন্নগ্নিগর্ভাং শমীমিব।। (অ. শ. ৪।৪)
ভবভূতি তাঁর মহাবীরচরিত-এ আকাশবাণীর প্রসঙ্গ এনেছেন। রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, বিভীষণ ও সুগ্রীবকে নিয়ে পুষ্পক বিমান যখন অযোধ্যার উদ্দেশ্যে আকাশপথে পাড়ি দিল তখন অগস্ত্যের আশ্রমস্থান অতিক্রমণের সময় শোনা গেল—হে রাম, অনুজদের সঙ্গে থেকে প্রজাদের শাসন করো। কল্পান্ত পর্যন্ত স্থায়ী হোক তোমার যশ। তোমার নাম যারা জপ করেন তারাও অমৃতত্ব লাভ করুন:
(আকাশে)
সানুজস্ত্বং প্রজা: শাধি কল্পান্তস্থায়ি তে যশঃ।
নামাপি রাম গৃণতামমৃতত্বায় কল্পতাম।। (ম. চ. ৭।১৫)
রামচন্দ্রের ধারণা হয়েছিল যে, তিনি অগস্ত্যের আশ্রমস্থান অতিক্রম করবার সময় তাঁর স্তুতি করেছিলেন বলেই হয়তো বা আকাশবাণীর মাধ্যমে পরম অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে—‘কথমশরীরিণ্যা গিরা পরমনুগৃহীতো মহামুনিবন্দারুঃ’ (ওই)।
গদ্যকাব্যকার সুবন্ধু তাঁর বাসবদত্তা-য় (আকাশবাণীর/দৈববাণীর) উল্লেখ করেছেন, যা নাটকের প্রয়োজনে আবশ্যিক ছিল। রাজা চিন্তামণির একমাত্র পুত্র কন্দর্পকেতু তার স্বপ্নে দেখা অষ্টাদশী অপরূপ লাবণ্যময়ী রাজকন্যা বাসবদত্তাকে বহু মেহনত করে কাছে পেয়েও হারিয়ে ফেলেন। বাসবদত্তার বাবা শৃঙ্গারশেখর বিজয়কেতুর পুত্র পুষ্পকেতুর সঙ্গে কন্যার বিবাহ একরকম স্থির করে ফেলেছিলেন। শৃঙ্গারশেখরের পরিকল্পনা বানচাল করে কন্দর্পকেতু বাসবদত্তাকে নিয়ে পালিয়েছিলেন। পালানোর সময় দীর্ঘ পথ অতিক্রমে ক্লান্ত কন্দর্পকেতু ঘুমিয়ে পড়লেন বিন্ধ্যারণ্যে। মন্দকপাল কন্দর্পকেতু ঘুম থেকে উঠে বাসবদত্তাকে দেখতে পেলেন না। শুরু হল অনুসন্ধান। প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে সারা বনভূমিতে তল্লাশ চালিয়েও বাসবদত্তার চিহ্নমাত্র পাওয়া গেল না। অবসন্ন কন্দর্পকেতু ভেঙে পড়েন। অন্ধকারময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাগরকূলে এসে তিনি আত্মহত্যার সংকল্প নেন। নিজেকে নিমেষে ধ্বংস করা ছাড়া কন্দর্পকেতুর সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। বিরহী কন্দর্পকেতু যখন সাগরে আত্মহননে উদ্যত ঠিক সেই সময় দৈববাণী হল ‘হারানো প্রিয়াকে তিনি পুনরায় ফিরে পাবেন’। সুতরাং তিনি যেন আত্মহত্যার সংকল্প থেকে বিরত হন। ‘আকাশসরস্বতী সমুদচরৎ—আর্য কন্দর্পকেতো! পুনরপি তব প্রিয়য়া সংগতির্ভবিষ্যত্যচিরেণ। তদ্বিরম মরণব্যবসায়াৎ’।
এক দৈববাণীর জোরেই কন্দর্পকেতু নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তীব্র হতাশার ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়েও কেবলমাত্র এই দৈববাণী কত মূল্যবান হয়ে কন্দর্পকেতুর সামনে প্রকাশ পেল। বাসবদত্তাকে শরীর-মন নিবেদনের আকুলতায় কন্দর্পকেতু প্রতীক্ষা করতে থাকেন। দৈববাণী শুনেই প্রিয়াবিরহী মরণের ইচ্ছে পরিত্যাগ করলেন এবং আবার প্রিয়াসমাগমের জন্য একবুক আশা নিয়ে শরীর ধারণের প্রয়োজনে সচেষ্ট হলেন—‘সোহ পি তদুপশ্রুত্য মরণারম্ভাদ বিররাম। ততঃ প্রিয়াসমাগমাশয়া শরীরস্থিতিহেতুমশনং চিকীর্ষু: কচ্ছোপান্তবনং জগাম’!
পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দে রচিত সুভদ্রাপরিণয় নাটকে দৈববাণী আনা হয়েছে নাটকের রূপকল্পনার তাগিদে। নাট্যকার কলচুরি রাজার সভাকবি রামদেব ব্যাস জানিয়েছেন অর্জুন-সুভদ্রা একে অপরকে প্রথম দর্শনেই নিজেদের হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু পারস্পরিক অনুরাগ ফুল্লকুসুমিত না-হবার কারণে উভয়েই চরম অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় অর্জুন জানতে পারলেন সুভদ্রার চাঞ্চল্য নিবারণের জন্য তার আত্মীয়পরিজনেরা দেবী চন্ডিকার মন্দিরে যাচ্ছেন। স্বপ্নপূরণের অভিপ্রায়ে সুযোগ সন্ধানী অর্জুন উদবেলিত হলেন। অর্জুন নয়নে নয়ন রাখবার এত বড়ো সুযোগের সদব্যবহারে তৎপর হলেন। হিতৈষীবেষ্টিতা সুভদ্রার মন্দিরে প্রবেশ মুহূর্তেই দৈববাণী শ্রুত হল ‘একাকিনী সুভদ্রাই যেন মন্দিরে প্রবেশ করে’। দৈববাণী শোনামাত্রই সুভদ্রার হিতৈষীরা তার সঙ্গে মন্দিরে প্রবেশের সাহস করলেন না। মদনবাণে সন্তপ্ত অর্জুন যাবতীয় চিত্রমালা মন থেকে সরিয়ে সুভদ্রাকে হরণ করলেন।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এই দৈববাণী এবং এই দৈববাণীর উপর টীকাটিপ্পনীদান বা ব্যাখ্যাদান করতে গিয়ে সমাজের পুরোহিতদের অবস্থান ও ভূমিকা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছিল। এই দৈববাণীগুলি যেখানে-সেখানে না-হয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গাতেই হত, যেগুলির ধ্বংসাবশেষ এখনও পুরাতত্ত্ববিদদের আকৃষ্ট করে। গ্রিসদেশে ডোডোনা নামক বেদীর কাছে (যেটি এপিরাসে অবস্থিত) গ্রিকদের দেবাদিদেব জিউস তাঁর দৈববাণী শোনাতেন; আর ডেলফিতে শোনাতেন অ্যাপোলোদেব। জিউসের দৈববাণীর কথা মহাকবি হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যে রয়েছে। জিউস-এর দৈববাণীর আরেকটি পীঠস্থান ছিল অলিম্পিয়ায়। তবে সময়ের ব্যবধানে বর্তমান হাইটেকের যুগে অবশ্য এই দৈববাণী তার গ্রহণযোগ্যতার পরিধি অনেকটাই কমিয়ে ফেলেছে।
শব্দসংকেত :
|
অ. শ.: অভিজ্ঞানশকুন্তলম |
তি. ভু. ক.: তিন ভুবনের কথা |
|
ধ্বন্যা.: ধ্বন্যালোক |
ন. জা.: নবজাতক |
|
বি. পু.: বিষ্ণুপুরাণ |
বু. চ.: বুদ্ধচরিত |
|
বৃ. পু.: বৃহদ্ধর্মপুরাণ |
ব্র. পু.: ব্রহ্মপুরাণ |
|
ম. চ.: মহাবীরচরিত |
মহা. অনু.: মহাভারত, অনুশাসনপর্ব |
|
মহা. সভা.: মহাভারত, সভাপর্ব |
স্ক. পু.: স্কন্দপুরাণ |
তথ্যসূত্র:
উপন্যাস সমগ্র:
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা-৯, ২০০৫
তিনভুবনের কথা:
শংকর, সাহিত্যম, কলকাতা-৭৩, ২০০৬
ধ্বন্যালোক (আনন্দবর্ধন):
ড. বিমলাকান্ত মুখোপাধ্যায়, সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, কলকাতা-৬, ১৯৭২
বিষ্ণুপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯০
বুদ্ধচরিত (অশ্বঘোষ):
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনূদিত, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ১৩৫৮
বৃহদ্ধর্মপুরাণ:
শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৮
ব্রহ্মপুরাণ:
শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৪০৯
মহাভারত (বেদব্যাস):
নীলকণ্ঠকৃত ভারতভাবদীপটীকা এবং হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ কৃত ভারতকৌমুদী টীকাসহ, বঙ্গবাসী, কলকাতা-৪১, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ
সংস্কৃত সাহিত্য সম্ভার (প্রথম অষ্টাদশ খন্ড):
নবপত্র প্রকাশন, ৬ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩
স্কন্দপুরাণ:
শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৮
রবীন্দ্র রচনাবলি:
জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৩৬৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন