অমিত ভট্টাচার্য
ভালো কাজে পুরস্কার, মন্দ কাজে তিরস্কার—প্রতিষ্ঠান চালানোর এক অন্যতম শর্ত। এধরনের বিধিব্যবস্থা না-থাকলে প্রতিষ্ঠান লাটে ওঠে। সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার তাগিদে প্রাচীন যুগ থেকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষেরা এসবকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে স্বর্গ-নরক প্রভৃতি কল্পনা করেছিলেন। কর্মক্ষেত্রে যার পারফরম্যান্স ভালো, খুব ভালো, বেশি রকমের ভালো বা অতি-ভালো তাদের যেমন স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা দরকার তেমনই যার পারফরম্যান্স মন্দ, খুব মন্দ, বেশি রকমের মন্দ বা অতিমন্দ তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে বৈ কি। মন্দের সংশোধনের জন্যই ভালোকে পুরস্কৃত করতে হয় এবং প্রকারান্তরে জানাতে হয় যেমন কাজ তেমন লাভ। মূল্যায়নের মাপকাঠি কেবল কর্ম।
প্রাণী ধর্মসমাযুক্তো গচ্ছেৎ স্বর্গগতিং পরাম।
তথৈবাধর্মসংযুক্তো নরকং চোপপদ্যতে।। (মহা. অনু. ১১১। ১৪-১৫)
নরকের কল্পনা যারা করেছিলেন তাদের মাথায় ছিল অপরাধের প্রতিকার করতে গেলে কড়া শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। সমাজ থেকে অকল্যাণকে নির্মূল করাই হল শাস্তির ঐকান্তিক উদ্দেশ্য। শাস্তি, শাস্তির প্রসঙ্গ, শাস্তিমূলক কথা অপরকে সংযমী হতে শিক্ষা দেয় এবং অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করে। পুরাণকারদের বক্তব্য হল, মানুষকে তার স্বেচ্ছা-সম্পাদিত কর্মের জন্য, নিজের ঐচ্ছিক ক্রিয়ার জন্য দায়িত্ব নিতে হবে। অপরাধের ফল অপরাধীকে ভোগ করতে হবে—সে ইহলোকে অথবা পরলোকে। দুঃখময় নরক যন্ত্রণা বা নরকের শাস্তি অপরাধী নিজেই ডেকে আনে। যমরাজের ভূমিকা এখানে গৌণ।
বেদ নামক প্রাচীনতম গ্রন্থে নরকের উল্লেখ নেই। কিন্তু পরবর্তীকালে পুরাণকারেরা ভেবেছিলেন যে, ধর্মকে সম্পূর্ণতা দিতে হলে কু-কর্মকারীদের জন্যও নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত হওয়া দরকার এবং একারণেই নানা রকম নরকের বর্ণনা। কোনো কোনো নরকে জীবকে দু-টুকরো করা হয় এবং তাদের ওপর ক্রম-অত্যাচার চলতেই থাকে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের পর নরকবাস শেষ হয়। স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দু দর্শন-চিন্তা প্রসঙ্গে নরকের বর্ণনায় বলেছেন:
In the Vedas there is no mention of hell. But our Puranas, the later books of our scriptures, thought that no religion could be complete, unless hells were attached to it, and so they invented all sorts of hells. In some of these, men are sawed in half, and continually tortured, but do not die. They are continually feeling intense pain, but the books are merciful enough to say it is only for a period.
বিবিদিষু জানতে চান, কর্মের দ্রষ্টা পুরুষ কোথায়? জীব তার নিজের প্রকৃতিকে অনুসরণ করে থাকে, এখানে নিগ্রহের স্থান কোথায়! বিবিদিষুর কৌতূহল নিবৃত্তিতে বৃহস্পতি বলেছেন—পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, যম, বুদ্ধি ও আত্মা প্রমুখ সকলে একই সঙ্গে মানুষের আচরিত কর্মের প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেয়।
পৃথিবী বায়ুরাকাশমাপো জ্যোতির্মনেহন্তকঃ।।
বুদ্ধিরাত্মা চ সহিতা ধর্মং পশ্যন্তি নিত্যদা।
প্রাণিনামিহ সর্বেষাং সাক্ষিভূতা নিশানিশম।। (মহা. অনু. ১১১। ২১, ২২)
দিন ও রাত্রি এ জগতের সমস্ত প্রাণীপুঞ্জের কর্মের সাক্ষী। সুতরাং সাবধান, অবহিত হোন ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরায় ছবি-বন্দী হচ্ছেন প্রত্যেকে। স্বর্গলোক = আনন্দলোক; নরকলোক = দুঃখলোক। কর্মের ভিন্নতায় লোকের ভিন্নতা। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছেন জিতেন্দ্রিয় এবং ইন্দ্রিয়সর্বস্ব ব্যক্তির জন্য পরলোকে একই ব্যবস্থা হলে তো নিষ্ঠা, সততা, মূল্যহীন হয়ে যায়। অতএব প্রেত্য বা পরলোকে গিয়ে পুণ্যকর্মার আনন্দলোকের ব্যবস্থা এবং পাপকর্মার জন্য যমলোক বা দুঃখলোকের ব্যবস্থা:
কর্মভি: পার্থ নানাত্বং লোকানাং যান্তি মানবা:।
পুণ্যান পুণ্যকৃতো যান্তি পাপান পাপকৃতো নরা:।। (মহা. অনু. ১০২। ২)
সকল প্রাণীর ত্রাস সৃষ্টিকারী যমদূতেরা অধার্মিক, কুপথগামীকে দক্ষিণের দরজা দিয়ে যমের কাছে নিয়ে যায়। পাপীরা যমের আদেশেই নরকে যন্ত্রণা ভোগ করে থাকে:
নীয়তে যমদূতৈস্তু যমং প্রাণিভয়ঙ্করৈ:।
কুপথে দক্ষিণদ্বারি ধার্মিকঃ পশ্চিমাদিভি:।।
যমাজ্ঞপ্তৈ: কিঙ্করৈস্তু পাত্যতে নরকেষু চ।
স্বর্গে তু নীয়তে ধর্মাদ্বশিষ্টাদ্যুক্তিসংশ্রয়াৎ।। (অ. পু. ২০৩। ৪,৫)
অগ্নিপুরাণ-এ বর্ণিত নরকস্থানের নামগুলো হল যথাক্রমে মহাবীচ, আমকুম্ভ, রৌরব, মহারৌরব, তামিস্র, মহাতামিস্র, অসিপত্রবন, করম্ভবালুকা, কাকোল, সুদুর্গন্ধ, তৈলপাক, মহাপাত, মহাজ্বাল, ক্রকচ, গুড়পাক, ক্ষারগৃহ, ক্ষুরধার, অম্বরীষ, বজ্রশস্ত্র, পরিতাপ, কালসূত্র, কশ্মল, উগ্রগন্ধ, দুর্দ্ধর, মঞ্জুষ, পূতিবক্ত্রে পরিলুন্ঠ, করাল, বিলেপ, কুম্ভীপাক, শাল্মল (অ. পু. ২০৩। ৬-২২)।
বিষ্ণুপুরাণ-এ পরাশর বিবিধ নরকের বর্ণনা করেছেনে। কারাগার যেমন সংশোধনাগার, ইহলোকের অপরাধীরা যেমন সেখানে সাজাপ্রাপ্ত জীবনযাপন করেন নরকও তেমন পরলোকের সংশোধনাগাররূপে নির্দেশিত হতে পারে। পাপী, অপরাধী, কুকর্মকারীরাই সেখানে যায়—একথা বারংবার স্মরণ করানো হয়েছে। নরকবাসেরও সময়সীমা থাকে। বিষ্ণুপুরাণ-এ জানানো হয়েছে কুকর্মকারীরা নরকভোগের শেষে যথাক্রমে স্থাবর, তরু, লতা, গুল্ম, কৃমি, জলজ মৎস্যাদি, পাখি, পশু, নর, ধার্মিক মানুষ, দেবতা এবং পুণ্যবিশেষে কেউ বা মুমুক্ষু হয়েও জন্ম নেয়। স্বর্গবাসে যেমন পুণ্যক্ষয় হয়, নরকবাসে তেমনই পাপক্ষয় হয়ে থাকে।
বিষ্ণুপুরাণ-এ উল্লিখিত নামী নরকগুলি হল যথাক্রমে রৌরব, শূকর, রোধ, তাল, বিশসন, মহাজ্বাল, তপ্তকুম্ভ, শ্বসন, বিমোহন, রুধিরান্ধ, ক্রিমীশ, ক্রিমিভোজন, অসিপত্রবন, কৃষ্ণ, লালভক্ষ, দারুণ, পাপ, পূয়বহ, বহ্নিজাল, অধঃশিরা, সন্দংশ, কালসূত্র, তম, অবীচি, শ্বভোজন, অপ্রতিষ্ঠ, অপর ইত্যাদি। এসব উল্লেখযোগ্য নরক ছাড়াও আরও অনেক অনামি নরক রয়েছে। সব নরকস্থানই যমের অধিকারে।
কূটসাক্ষী, পক্ষপাতদুষ্ট, মিথ্যাবাদী, ভ্রূণহত্যাকারী, গোহত্যাকারী, সুরাপায়ী, গুরুপত্নীগামী, ভগিনীগামী, স্ত্রী বিক্রয়ী, পুত্রবধূগামী, কন্যাগামী, গুরুজনের অবমাননাকারী, চোর, শিষ্টাচার-নিন্দক, পিতৃদ্বেষী, নক্ষত্রগণক, পুত্র-কন্যা-বঞ্চক, মিত্রহন্তা, বননিধনকারী, ব্রতলোপকারী প্রভৃতি মানুষজনের জন্য যথানির্দিষ্ট নরকস্থানে অপরিহার্য গতি। পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে উল্লিখিত বীভৎস সব নরকস্থানগুলি যে অপ্রীতিকর হবে তা বলাই বাহুল্য। বিষ্ণুপুরাণ-কার জানিয়েছেন নরক নামক স্থান মনের অপ্রীতিকর (বি. পু. ২। ৬। ১-৪২)। বর্ণাশ্রমবিরোধী কাজকম্মকে প্রতিহত করতে দৃঢ় ভাষায় নিন্দামন্দ করা হয়েছে এবং এসব কাজের অনুষ্ঠাতার জন্য নরকের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্ণাশ্রমবিরুদ্ধঞ্চ কর্ম কুর্বন্তি যে নরা:।
কর্মণা মনসা বাচা নিরয়েষু পতন্তি তে।। (বি. পু. ৬। ২। ২৮)
নরকবাসী অধোমুখ। স্বর্গবাসী অধোমুখ নরকবাসীদের দেখতে পান ‘দেবাশ্চাধোমুখান সর্বানধঃ পশ্যন্তি নারকান’ (বি. পু. ২। ৬। ২৯)।
শ্রীমদভগবদ-গীতায় নরকের উল্লেখ একাধিকবার হয়েছে। যথা—‘সঙ্করো নরকায়ৈব’ (১।৪২), ‘নরকে নিয়তং বাসঃ’ (১।৪৪), ‘পতন্তি নরকেহশুচৌ’ (১৬।১৬) এবং ‘ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারম’ (১৬।২১)। বর্ণসঙ্কর হলে কুলক্ষয় অবধারিত এবং কুলক্ষয়কারীর নরকবাস অবশ্যম্ভাবী। গূঢ়ার্থদীপিকায় টীকাকার বলেছেন এদের পিতৃপুরুষেরাও নরকবাস করেন। টীকাকার এও জানিয়েছেন যে—এসকল ভাবনা তাঁর স্বকপোলকল্পনাপ্রসূত নয় ‘ন স্বাভ্যূহেন কল্পয়াম ইতি’ (১।৪৪)। নরকের আলোচনা প্রসঙ্গে শ্রীমদভগবদ-গীতায় নীতিবিজ্ঞান প্রাধান্য পেয়েছে। দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ নামক অধ্যায়ে মনোনিবেশ করলে পাঠক জানতে পারেন যে, একদল মানুষ রয়েছেন যারা মনে মনে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বিষয়ের উপর সুখী ও দুঃখী হন। এরা মনোময় জগতের বাসিন্দা। আজ আমি মনের প্রীতিকর এই বিষয় পাব—এরূপ ভেবে তারা একদিকে যেমন আহ্লাদিত হন অপরদিকে তেমন অপ্রাপ্তির বেদনায় হাহাকার করেন। বস্তুত এধরনের তৃষ্ণানুবৃত্তি অশুচি নরকে নিয়ে যায়:
অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতা:।
প্রসক্তা: কামভোগেষু পতন্তি নরকেহশুচৌ।। (শ্রী. গী. ১৬। ১৬)
নরকের প্রবেশদ্বার অর্থাৎ সাধন বা উপায়ও নির্দেশিত হয়েছে সতর্কীকরণের জন্য। কাম, ক্রোধ ও লোভ হল আসুরী সম্পদের মূল যেগুলি নরকের প্রবেশদ্বার উন্মোচন করে ‘ইদং ত্রিবিধং ত্রিপ্রকারং নরকস্য প্রাপ্তৌ দ্বারং সাধনম’। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হলে উপলব্ধ হয় যে, আদর্শ জীবন ও সমাজ গঠনের জন্য রিপুগুলিকে প্রতিরোধ করবার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে নিরয়গতি না-হয়। রিপুর প্রাদুর্ভাবে ইহজীবনেই নরকপ্রাপ্তি একথা অস্বীকারের উপায় নেই।
যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকারতঃ।
ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম।। (শ্রী. গী. ১৬। ২৩)
কোনো কোনো গ্রন্থানুযায়ী নরকও ইহলোকেই। দুঃখযন্ত্রণায় তেতেপুড়ে নরকভোগ হয়ে যায়:
অত্রৈব নরকঃ স্বর্গ ইতি মাতঃ প্রচক্ষ্যতে।
যা যাতনা বৈ নারক্যস্তা ইহাপ্যুপলক্ষিতা:।। (শ্রী. ভা. ৩। ৩০। ২৯)
দুর্জন নরকগামী। সুজনকে স্বর্গদ্বারে পাঠিয়ে দুর্জনকে নরকদ্বারে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে শাস্ত্রকারেরা সুজনকে বাঁচিয়ে রেখে দুর্জনকে বর্জন করেছেন। গোড়া থেকেই আচরণবিধি সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়ে স্বর্গের চাবির মতন নরকের চাবিকাঠিও ব্যক্তির নিজেরই পকেটে জন্মলগ্ন থেকে যেন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষেধক ওষুধ খাওয়ালে রোগের সাংঘাতিক উপসর্গগুলি যেমন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব তেমন নরকের সাধন-দুষ্ট ক্রিয়াগুলিকে আগেভাগে মহাভারতকার চিনিয়ে দিয়ে নরকগতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা পাকা করেছেন। মহাভারত-এর অনুশাসনপর্বে যুধিষ্ঠিরের কৌতূহল নিবৃত্তিতে পিতামহ ভীষ্ম পরিষ্কার জোর দিয়েছেন কর্মের উপরে। অপকর্মের অধিকারী নরকগামী। অনধিক ২২টি শ্লোকে ভীষ্মদেব নরকগামীর তালিকা পেশ করেছেন ‘নরা নিরয়গামিনঃ’ বা ‘তে বৈ নিরয়গামিনঃ’ পঙক্তির মাধ্যমে (মহা. অনু. ৩২। ৬০-৮২)। মিথ্যেবাদী, নিন্দুক, প্রতারক, খল, পাষন্ড, পক্ষপাতদুষ্ট, হিংসাশ্রয়ী, বেদবিক্রয়ী, শাস্ত্রবিরোধী, পথ অবরোধকারী, অন্যের ধন লুণ্ঠনকারী বা অপহর্তা, অনাথা-বয়স্কা-তরুণী-বালিকাদের প্রতারণাকারী, অন্যের জীবিকা নষ্টকারী, অপরের ঘর ভাঙায় উৎসাহদাতা, বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদে ইন্ধনকারী, বংশমর্যাদা নষ্টকারী, আশ্রমধর্ম লঙ্ঘনকারী, বালক-বয়স্কঅনুগতদের খাবার বিতরণের পূর্বেই ভোজনকারী প্রভৃতি ব্যক্তিদের নরকগতি অবধারিত। বিশেষ অনুধাবনের বিষয় হল, যাগযজ্ঞাদি বৈদিক কর্মের দোহাই দিয়ে যারা প্রাণীহিংসায় লিপ্ত থাকে তাদেরও নরকভাগী হতে হয়:
ইয্যাযজ্ঞশ্রুতিকৃতৈর্যো মার্গৈরবুধেহধমঃ।
হন্যাজ্জন্তূন মাংসগৃধ্লু: স বৈ নরকভাঙ নরঃ।। (মহা. অনু. ১১৫। ৪৩)
স্কন্দপুরাণ-এ আনর্তের প্রশ্নের জবাবে ভর্তৃযজ্ঞ যুধিষ্ঠির-ভীষ্মের কথোপকথন উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন নরক একুশ রকমের ‘একবিংশৎ প্রমাণা: স্যুর্নরকা যমমন্দিরে’ (স্ক. পু. নাগরখন্ডম, ২২৬। ১৯)। সকল প্রাণী নিজ নিজ কর্মানুসারে পরলোকে কোথায় যাবে তা স্থির হয় ‘প্রাণিনস্তেষু গচ্ছন্তি নিজকর্মানুসারতঃ’ (ওই)। যমের কার্যালয়ে তদারকি করবার জন্য চিত্র ও বিচিত্র নামে দুজন পদাধিকারী আছেন। এদের মধ্যে চিত্রের কাজ হল ধর্মের হিসেব রাখা এবং বিচিত্রের কাজ হল অধর্মের বা অন্যায়ের হিসেব রাখা। দুজনেই হিসেব রক্ষকের অর্পিত দায়িত্ব যে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে থাকেন—সে তথ্যও পাওয়া গেছে:
খ্যাতৌ চিত্রবিত্রিত্রৌ চ কায়স্থৌ যমমন্দিরে।।
চিত্রোহথ লিখতে ধর্মং সর্বং প্রাণিসমুদ্ভবম।
বিচিত্রঃ পাতকং সর্বং পরমং যত্নমাস্থিতঃ।। (ওই ২২৬। ১৯-২১)
আটজন যমদূতের নাম পাওয়া গিয়েছে যারা দিবারাত্র পরিশ্রম করছেন। এদের নাম হল যথাক্রমে করাল, বিকরাল, বক্রনাশ, মহোদর, সৌম্য, শান্ত, নন্দ ও সুবাক্য। উক্ত আটজন যমদূতের মধ্যে প্রথম চারজন ও দ্বিতীয় চারজন সম্পূর্ণ বিপরীত দায়িত্বপ্রাপ্ত। প্রথম দলের যমদূতেরা ভয়ংকর। এদের কোনো দয়া-মায়া নেই। কেবল ভয় দেখানো এবং কর্মানুযায়ী শাস্তি দেওয়াই এদের কাজ। কিন্তু দ্বিতীয় দলের চারজন সৌম্যমূর্তিবিশিষ্ট। এরা ধার্মিকদের দিব্য বিমানে চড়িয়ে ধর্মরাজপুরে নিয়ে যায়। দিব্য বিমানে বিমানসেবিকার কাজে নিযুক্ত রয়েছেন একদল অপ্সরা। তবে পরলোকের এই বৈষম্যের মূল কারণ কিন্তু জীবের ইহলোকের কর্ম—যা কিনা চিত্র ও বিচিত্র নোট করে রেখেছেন ‘লিখিতস্যানুরূপেণ’। পাঠক ভাবতে পারেন যমের এতো বড়ো কর্মযজ্ঞ মাত্র দশজন (২+৮) কীভাবে সামাল দেন? সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ধর্ম-অধর্ম, ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্যের দেখভালের জন্য আরও কর্মচারী নিয়োগ করা হল না কেন? প্রাচীনযুগে জনসংখ্যা কম থাকার দরুন ওই দশজন যথেষ্ট হলেও পরবর্তীকালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যমদূতের সংখ্যা বৃদ্ধি হল না কেন বা অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে করাল, বিকরালদের শ্রেণীতে অন্তত আরও কিছু নিয়োগ করা হল না কেন—তথ্য জানার অধিকার আইনে পরবর্তীকালে স্বয়ং যমকে এই জাতীয় প্রশ্ন কেউ করতেই পারেন কল্পনা করে স্কন্দপুরাণ আগাম সমাধান করে দিয়েছেন। চিন্তা মা করণীয়া। ওদের আবার সাহায্য করবার জন্য অসংখ্য কিঙ্কর রয়েছে—‘এতেষাং কিঙ্করা যে চ তেষাং সংখ্যা ন জায়তে’ (ওই ২২৬। ২৭)। স্বভাবকৌতূহলী বিবিদিষুকে পুরাণকার জানিয়েছেন কিঙ্করদের কাজে সহায়তা করতে জ্বর-যক্ষ্মাদি

একশো আট রকমের ব্যাধি রয়েছে:
অষ্টোত্তরশতং তেষাং ব্যাধীনাং পরিকল্পিতম।
সহায়ার্থং যমেনাত্র জ্বরযক্ষ্মান্তরস্থিতম।।
যমালয়ে যাবার আগে প্রাথমিক পর্বের কাজটুকু ব্যাধিরা সেরে নেয়। পরে অদৃশ্য যমদূতেরা নাভিমূলস্থিত প্রাণবায়ুটিকে অপহরণ করে যমালয়ে নিয়ে যায়:
যমদূতাস্ততো গত্বা নাভিমূলব্যবস্থিতম।
বায়ুরূপং সমাদায় জনৈ: সর্বৈরলক্ষিতা:।।
পরলোকের পথে প্রথমেই বৈতরণী নদী। এই নদী আবার শোণিতস্রাবী ও সলিলস্রাবী ভেদে দ্বিধা বর্ণিত। সহজেই অনুমেয় অন্যায়কারীরা প্রথমটিকে এবং ন্যায়কারীরা দ্বিতীয়টিকে অতিক্রম করেন। বৈতরণী সম্বন্ধে মহাভারত-এ বলা হয়েছে:
নদী বৈতরণী নাম দুর্গন্ধা রুধিরাবহা।
উষ্ণতোয়া মহাবেগা অস্থিকেশতরঙ্গিণী।। (মহা. ৪। ১০৯। ১৪; শ্রী. ভা. ২। ২। ৭)
যমদুয়ার পর্যন্ত এই নদী প্রবাহিত। বাংলার কবি একে যমালয়ের পরিখা বলেছেন ‘বহিছে পরিখারূপে বৈতরণী নদী’ (মে. কা.)। স্কন্দপুরাণে বর্ণিত নরকের কক্ষগুলির নাম হল—অসিপত্রবন, কূটশাল্মলী, দারুণাকৃতি, লৌহকণ্টক, রৌরব, ক্ষারোদ, কুম্ভীপাক, সম্বর্তক, অগ্নিকূট, লৌহকীল, অঙ্গারময় প্রভৃতি। স্কন্দপুরাণ-এরই আবন্ত্যখন্ডে সনৎকুমার ব্যাসদেবের কৌতূহল নিবৃত্তিতে নরক প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। নরকের স্থান, শ্রেণীবিভাগ এবং নরক গমনের বিবিধ কারণ সনৎকুমারের বক্তব্যে পরিবেশিত হয়েছে। জিজ্ঞাসু ব্যাসদেবের নরক-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি ছিল নিম্নরূপ:
কিয়ন্তো নরকাস্তাত কস্মিন স্থানে প্রতিষ্ঠিতা:।
পতন্তি কেন পাপেন পাপিনস্তেষু দুঃখিতা:।। (স্ক. পু. আবন্ত্যখন্ড, ২৯। ২)
অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থের মতোই এখানেও বলা হয়েছে দুষ্কৃতীরাই নরকে অবস্থান করে এবং নরক মানেই দুঃখদায়ক, কষ্টবহুল স্থান। নরকের স্থান এখানে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে ‘পাতালনিলয়া: সর্বে’ অর্থাৎ সব ধরনের নরকই পাতালে অবস্থিত। শাস্তিদানের কতক নমুনা স্কন্দপুরাণ-এর এই খন্ডে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন দুষ্কৃতীদের হাত দুটোকে বেঁধে তপ্ত শঙ্কু (ডাঙস) ও সকণ্টক লৌহদন্ড দিয়ে তাড়না করা হয়। বিচিত্র পদ্ধতিতে যন্ত্রণাদায়কশাস্তিদানের সে-সকল বিধি ত্রাসের উদ্রেক করে থাকে:
যাতনাভির্বিচিত্রাভী রৌদ্রকর্মক্ষয়াদভৃশম।
সুগাঢ়ং হস্তয়োর্বদ্ধাস্তপ্তশৃঙ্খলয়া নরা:।। (ওই ২৯। ১১)
কৃতপাপ ব্যক্তিরা নরকযন্ত্রণায় পচে মরে ‘দুষ্কৃতকর্মাণঃ পচ্যন্তে যাতনাগতা:’।
আচার্য লোমহর্ষণ নাম উল্লেখ করে আঠাশটি নরকস্থানের বিবরণ দিয়ে জানিয়েছেন অন্যান্য আরও নরক-নিকর যমরাজের অধিকারে রয়েছে (ব্র. পু. ২২। ২-৫)। লোমহর্ষণের বিজ্ঞাপন অনুযায়ী নরকস্থানগুলি হল যথাক্রমে রৌরব, শৌকর রোধ, তাল, বিশসন, মহাজ্বাল, তপ্তকুড্য, মহালোভ, বিমোহন, রুধিরান্ধ, বসাতপ্ত, কৃমীশ, কৃমিভোজন, অসিপত্রবন, কৃষ্ণ, লালাভক্ষ, দারুণ, যূপবহ, পাপ, বহ্নিজ্বাল, অধঃশিরা, সন্দংশ, কৃষ্ণসূত্র, তম, অবীচি, শ্বভোজন, অপ্রতিষ্ঠ ও মারীচ প্রভৃতি। ব্রহ্মপুরাণের স্বাতন্ত্র্য হল অন্যান্য গ্রন্থের সঙ্গে বহুবিষয়ে নরকের প্রসঙ্গে সাদৃশ্যের পাশাপাশি এমন অনেক কুকর্মকারীকে নরকে পাঠানো হয়েছে যা কিনা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন ভ্রূণহত্যাকারী (ভ্রূণহা), নক্ষত্রবক্তা (নক্ষত্রসূচকঃ), বন ধ্বংসকারী (বনচ্ছেদী), মদ্যপ(সুরাপো) এদের নরকগমনের পথ প্রশস্ত রাখা হয়েছে। নরক ও স্বর্গে উপস্থিতির হারে কোনো বৈষম্য নেই বললেই চলে। যত জীব স্বর্গে আছে তত পরিমাণ জীবই প্রায় নরকে আছে ‘যাবন্তো জন্তবঃ স্বর্গে তাবন্তো নরকৌকসঃ’ (ব্র. পু. ২২। ৩৪)।
পদ্মপুরাণ যমকার্যের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত চিত্রগুপ্তের নাম উল্লেখ করলেও তাকে সাহায্যকারী আরও অনেকে থাকেন তা স্পষ্টত জানিয়েছে:
শুভাশুভফলং তত্র দেহিনাং প্রবিচার্য্যতে।
চিত্রগুপ্তাদিভি: সর্বৈর্মধ্যস্থৈ: সর্বদর্শিভি:।। (প. পু. ভূমিখন্ড ৬৮। ৪)
যমসদনে যেতে হবে না, এমন কোনো প্রাণী নেই। কৃতকর্মের বিচারিত ফল অবশ্যই পেতে হবে ‘অবশ্যং হি কৃতং কর্ম ভোক্তব্যং তদ্বিচারিতম’। নরকযন্ত্রণা বা যমালয়ের পীড়া এই পদ্মপুরাণের ভূমিখন্ডেই সপ্ততিতম অধ্যায়ে মাতলির কথায় পরিষ্কার হয়েছে (প. পু. ভূমিখন্ড, ৭০। ১-১১)। এই পদ্মপুরাণ-এই সুবাহুর কৌতূহল নিবৃত্তিতে জৈমিনি নরকগামী মানুষের এক দীর্ঘ তালিকা পেশ করেছেন—যার মধ্যে নাস্তিক, মিথ্যাবাদী মানুষের পাশাপাশি সবরকমের অপকীর্তির ধারক ও বাহকদের উল্লেখ রয়েছে (প. পু. ভূমিখন্ড, ৯৬। ২-২০)। এই পদ্মপুরাণ-এর লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, এখানে অন্যের প্রতিকূল আচরণকারীকেও ঘোর নরকে যেতে হয় বলে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে ‘নরঃ পরেষাং প্রতিকূলমাচরন প্রযাতি ঘোরং নরকং সুদারুণম’ (ওই ৯৬। ৫২)। নরকের দুর্গম পথে রাশি রাশি জ্বলন্ত অঙ্গার। দ্বাদশ আদিত্যের মহাতীব্র তাপে সবাই সন্তপ্ত। নরকগামীর পালাবার রাস্তা নেই। গদা, খড়্গ, কুঠার ও চাবুকে যমদূতেরা কর্তব্য পালনে তৎপর। যমের ভয়ংকর রূপের বর্ণনাও সুমনার বক্তব্যে পরিস্ফুট। তাঁর ভীষণ আকৃতিবিশিষ্ট মুখমন্ডলে কেবল কর্তব্য পরিপালনের আভাষ। পীতবস্ত্র পরিবৃত হয়ে গদা নিয়ে হাতে ভয়ংকর রক্তমালায় শোভিত যমরাজ সকলের ত্রাস ‘এবংবিধং মহাকায়ং যমং পশ্যতি দুর্মতি:’ (প. পু. ভূমিখন্ড, ১৬। ১১)।
বৃহন্নারদীয় পুরাণ নরক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। অত্যন্ত দুর্গম যমমার্গ পাপীদের পক্ষে ভয়ংকর ‘যমমার্গং সুদুর্গমম’ ‘পাপিনান্তু ভয়ংকরম’। যমমার্গ নাকি ছিয়াশি সহস্র যোজন বিস্তৃত। কুকর্মকারীরা করুণ স্বরে কাঁদতে কাঁদতে প্রেতশরীর ধারণ করে বিবস্ত্র হয়ে যখন সেই পথ ধরে চলা আরম্ভ করে তখন তাদের গলা, তালু প্রভৃতি ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় ‘শুষ্ককণ্ঠোষ্ঠতালুকা:’। রাস্তার কোথাও পাঁক, কোথাও আগুন, কোথাও কাদা, আবার কোথাও বা তপ্ত বালির রাশি। পথে অনেক রকম বৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
যেমন অঙ্গারবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, শস্ত্রবৃষ্টি, উষ্ণজল বৃষ্টি, ক্ষার-কর্দমবৃষ্টি প্রভৃতি। কন্টকাকীর্ণ পথের মাঝে মাঝেই অতি উচ্চ সব শিলাখন্ড। বহুকষ্টে সেই দুর্গম পথ অতিক্রমের সময় সকলে তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদে। দুর্দান্ত সব যমকিঙ্করের দল চাবুক (প্রতোদ) হাতে ঘোরাফেরা করে ‘হন্যমানা যমভটৈ: প্রতোদাদ্যৈস্তথায়ুধৈ:’ (বৃ. না. পু. ২৯। ৭)। প্রহারের সময় হাত অথবা পা অথবা গলা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। অনেকের আবার মাথায় লোহার ভার চাপিয়ে নিয়ে যাবার সময় বারংবার হোঁচট খেতে খেতে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। ধর্মরাজ যম কালদন্ড হাতে নিয়ে পাপীদের তর্জন করেন ‘আহূয় পাপিনঃ সর্বান কালদন্ডেন তর্জয়েৎ’ (ওই ২৯। ৪৯)। যমের আদেশপ্রাপ্ত হয়ে চিত্রগুপ্ত নিজের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হন। প্রলয়কালীন সমুদ্র গর্জনের তুল্য তার স্বর এবং পর্বতপ্রমাণ অঞ্জনপুঞ্জের তুল্য অঙ্গপ্রভা কার না ভয়ের উদ্রেক করে! চিত্রগুপ্তের শরীর তিন যোজন বিস্তৃত। তার রক্তবর্ণ দুটি চোখ, দীর্ঘ নাক এবং ভয়ংকর দাঁত যখন জরা প্রভৃতি সহচরদের নিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কাজে মন দেয় তখন সর্বত্র ত্রাহি ত্রাহি রব। যমকিঙ্করেরা যমেরই তুল্য ভয়ানক ‘সর্বে দূতাশ্চ গর্জন্তি যমতুল্যবিভীষণা:’। নরকের বাসিন্দাদের প্রত্যেককে চিত্রগুপ্ত মনে করিয়ে দেন যে সেখানে কোনো পক্ষপাত প্রশ্নাতীত, যেহেতু মূর্খ-পন্ডিত, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেকেই নিজেদের কৃত কর্মেরই ফল ভোগ করছেন:
যথা কৃতানি পাপানি যুষ্মাভিস্তু বহূনি বৈ।
তানি প্রাপ্তানি দুঃখস্য কারণং নাস্তি তে জনা:।
ধর্মরাট পক্ষপাতন্তু ন করোতি হি হে জনা:।
বিচারয়ধ্বং যূয়ং তদ যুষ্মাভিশ্চরিতং পুরা।। (বৃ. না. পু. ২৯। ৬০-৬১)
নরক-কথা শুনতে শুনতেই হাড়-হিম করা ভয় এবং চিত্তচাঞ্চল্য আসতে পারে—এরূপ অনুমান করে স্বয়ং কাল জানিয়েছেন এই শ্রুতিপাঠে ধৈর্য একান্ত আবশ্যক। অধিকাংশক্ষেত্রেই কর্ম যখন মানুষের ইচ্ছাধীন তখন সেটি সংশোধন করে নিলেই হল এবং এরকমটি হলে আর সেই ভয়ংকর স্থানে ক্লেশ ভোগ করতে যেতে হয় না ‘শৃণুষ্ব ধৈর্য্যমাস্থায় রৌদ্রা হি নরকা যতঃ’ (বৃ. না. পু. ১৪। ১)। অসাধু নরকে পচে ‘পচ্যন্তে নরকে ঘোরে’। চোর, ডাকাত, গুন্ডা, বদমাইশ, কুচক্রীদের পাশাপাশি আরও কিছু নরকগামী ব্যক্তির উল্লেখ এই পুরাণে লক্ষণীয় যেগুলি আধুনিক সমাজেও সহৃদয় ব্যক্তিকে ভাবনার রসদ জোগায়। যেমন যথাযথভাবে বিষয় নাজেনে যারা ডাক্তারি করে থাকেন বা শাস্ত্রগ্রন্থ না-জেনেই জ্যোতিষচর্চায় অর্থোপার্জন করেন (বৃ. না. পু. ১৪।৩০-৩১) এবং সর্বোপরি অর্থের বিনিময়ে যারা ছাত্র পড়ান (ওই ১৪। ১৪৪) তারা প্রত্যেকেই কল্পকাল পর্যন্ত নরকে যন্ত্রণা ভোগ করে। নরকযন্ত্রণা যে কোটি কোটি রকমের তাও জানানো হয়েছে ‘যাতনা: কোটিকোটিশঃ’ (ওই ১৪। ২২)।
অশুভ কর্মবিপাকেই যে নরক গমন হয় অন্যান্য পুরাণ-এর সঙ্গে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণও এই বিষয়ে একমত। এখানে নরকের বহুবিধ কুন্ডের উল্লেখ করা হয়েছে (সর্বমোট ৮৬টি কুন্ড)। প্রতিটি কুন্ডই বিস্তৃত, গভীর, ভয়ংকর, কষ্টবহুল ও কুৎসিত। ব্রহ্মাবৈবর্তপুরাণ-এ প্রকৃতিখন্ডে সূর্যপুত্র যম সাবিত্রীকে নরককুন্ডের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন:
কুকর্মণা চ নরকং যাতি নানাবিধং নরঃ।।
নরকাণাঞ্চ কুন্ডানি সন্তি নানাবিধানি চ।
নানাপুরাণভেদেন নামভেদানি তানি চ।।
বিস্তৃতানি গভীরাণি ক্লেশদানি চ জীবিনাম।
ভয়ঙ্করাণি ঘোরাণি হে বৎসে কুৎসিতানি চ।।
ষড়শীতিশ্চ কুন্ডানি…।
সশস্ত্র কিঙ্করের দল পিঙ্গলবর্ণ, ঘোরাকৃতি এবং নানা রূপ ধারণে সমর্থ। ছিয়াশিটি প্রসিদ্ধ নরককুন্ড ছাড়াও আরও অনেক অনেক ছোটো ছোটো নরককুন্ড রয়েছে ‘অন্যানি চাপ্রসিদ্ধানি ক্ষুদ্রাণি তত্র সন্তি বৈ’ (ব্র. বৈ. পু. প্রকৃতিখন্ড, ৩১। ৫৯)। নরকের কুন্ডগুলি মন্ডলাকৃতিবিশিষ্ট। এগুলি ঈশ্বরের ইচ্ছায় নির্মিত এবং অবিনশ্বর। যমদূতের অত্যাচারে চতুর্দিকে কেবল ‘ত্রাহি ত্রাহি’ রব ‘ত্রাহীতি শব্দং কুর্বদ্ভির্মম দূতৈশ্চ তাড়িতৈ:’ (ওই ৩৩। ৮)। যমের বচন থেকে পাঠক জানতে পারেন যে, ‘কুম্ভীপাক’ নরক সকল নরককুন্ডের মধ্যে কুখ্যাত। ঘূর্ণায়মান কুম্ভীপাকেই সব থেকে বেশি অসৎ লোকের অবস্থান ‘সর্বকুন্ডপ্রধানঞ্চ কুম্ভীপাকং প্রকীর্তিতম’ (ওই ৩৩। ৮৩)। নাম ধরে ধরে প্রতিটি নরক কুন্ডের আয়তন এবং সেই সেই কুন্ডের অত্যাচার-বর্ণনাও এই পুরাণ-এর প্রকৃতিখন্ডে রয়েছে। তবে পুরাণশাস্ত্র-র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দিক হল, স্বর্গ বা নরক দুই স্থানেই প্রবেশের মূল চাবিকাঠি প্রতিটি ব্যক্তির নিজের হাতেই সমর্পিত আছে। ব্যক্তি নিজে স্থির করবেন তিনি শাস্ত্রকথিত সুকর্ম সম্পাদনে মন দেবেন বা শাস্ত্রনিন্দিত অপকর্ম সম্পাদনে মন দেবেন ‘শুভকর্ম স্বর্গবীজং নরকঞ্চ কুকর্মণা’ (ওই ৩১। ১ প্রকৃতিখন্ড)।
মনুসংহিতা-য় একুশ রকম নরকের বর্ণনা পাই। এগুলি হল যথাক্রমে তামিস্র (অন্ধকার), অন্ধতামিস্র (নিবিড় অন্ধকার), মহারৌরব (অতিমাত্রায় তপ্তভূমি), কালসূত্র (কুলালচক্রের সূত্র দ্বারা ছিন্ন), মহানরক (অতিমাত্রায় কষ্টকর), সঞ্জীবন (বাঁচিয়ে আবার মারা), মহাবীচি (অতিরিক্ত জলের ঢেউবিশিষ্ট), তপন (দহন), সম্প্রতাপন (অতিরিক্ত দহন), সংঘাত (ছোটো জায়গায় অনেককে রাখা), কাকোল (যেখানে কাকে ঠুকরে খায়), কুডমল (দড়ি দিয়ে কষ্ট দেওয়া), পূতিমৃত্তিকা (দুর্গন্ধ যুক্ত), লোহশঙ্কু (ছুঁচবিদ্ধকরণ), ঋজীষ (তপ্ত পিঠেরখোলায় ফেলে দেওয়া), পন্থা (বারংবার গমনাগমন), শাল্মলী (কণ্টকাদিবিদ্ধ), নদী (দুর্গন্ধযুক্ত অস্থি-রক্ত তরঙ্গশালিনী), অসিপত্রবন (পত্র-বিদীর্ণ করণ) এবং লোহদারক (শক্ত করে বেঁধে রাখা) প্রভৃতি (ম. স. ৪। ৮৭-৯০)। মনুসংহিতা-র ভাষ্যকার মেধাতিথি জানিয়েছেন, নরক শব্দটিই অশেষ দুর্গতির সূচক। দুঃখদায়ক স্থানবিশেষের কথা শুনতে শুনতে অর্থাপত্তির সাহায্যে এসবের উপস্থাপনা ‘নরকশব্দো নিরতিশয়দুঃখবচনঃ। কেবলদুঃখশ্রবণার্থাপক্ত্যা বা দেশবিশেষবচনঃ’ (মে. ম. ভা. ৪। ৮৭)।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মেঘনাদবধ কাব্য-এর অষ্টম সর্গে নরক বর্ণনা করেছেন। কৃতান্তনগরের প্রবেশ-পথেই ‘বিকট শমনদূত যত’। মৃত্যুর দরজায় প্রবেশ করতে হলে নানা রোগের মাধ্যম দরকার হয়। এরাই যমদূতরূপে বর্ণিত হয়েছে। যেমন জ্বর, উদরপরতা, প্রমত্তত্ব, কাম, যক্ষ্মা, বিসূচিকা, তৃষ্ণা, অঙ্গগ্রহ (ধনুষ্টঙ্কার), উন্মত্ততা প্রভৃতি—সবই যেন যমদূত ‘নানা বেশে এ সকলে ভ্রমে ভূমন্ডলে/অবিশ্রাম, ঘোর বনে কিরাত যেমতি/মৃগয়ার্থে’। নরকে নারী পাপাত্মাদের শাসন করবার জন্য যমদূতী (কৃতান্তদূতী) রয়েছে—যাদের ‘নখ অসি-সম’। রামচন্দ্র মায়াদেবীর সহায়তায় শিবের অনুগ্রহে লক্ষ্মণের প্রাণ ফিরিয়ে আনবার জন্য সশরীরে নরকপুরে হাজির হয়েছিলেন। কঠোর, নৃশংস সব অত্যাচারের অদ্ভুত নমুনা তিনি দেখেছিলেন ‘কত যে অদ্ভুত কান্ড দেখিনু এ পুরে’। নরকপুর অসীম। দেখে শেষ করা যায় না। মায়াদেবী জানিয়েছেন, বারো বছর ধরে নাকি একটানা ঘুরলেও নরকপুরের সবটুকু দেখে শেষ করা যাবে না:
দ্বাদশ বৎসর যদি নিরন্তর ভ্রমি
কৃতান্ত-নগরে, শূর, আমা দোঁহে, তবু
না হেরিব সর্বভাগ! (মে. কা. অষ্টম সর্গ)
বিবিধ গ্রন্থের আলোচনায় নরকের যে বর্ণনা পাওয়া গেল তার নির্যাস হল, অশুভ কর্ম সম্পাদিত না-হলে নরকের ভয় পাওয়ার কোনো কারণই নেই। বৌদ্ধশাস্ত্র আলোচনাতেও এজন্য কর্মবাদের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মানুষকে বুঝতে হবে যে, অতীতের শৃঙ্খলার ওপরে যেমন বর্তমানের ভালো থাকা নির্ভর করে তেমন ভবিষ্যতের ভালো থাকা নির্ভর করে বর্তমানের কর্মশৃঙ্খলার ওপরে। মানুষের নিজের হাতেই আগামী দিন। ঘড়ি ধরে প্রতিটি ক্ষণের কর্মাচরণই স্বর্গ বা নরক সৃষ্টি করে। Christmas Humphreys তাঁর Buddhism গ্রন্থে মনে করিয়েছেন:
We are building now our tomorrow, creating hour by hour our heaven or hell. There is no such thing as luck or chance, or coincidence, and no such thing as fate.
একদল মানুষ রটনা করেন, ঈশ্বর যেন পূজাপ্রার্থী। তাঁকে যেসকল ভক্তিহীনের দল পূজা দেন না তাদেরই দন্ডদানের জন্য যমদূতেরা আসেন এবং নরকে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ এই জীবিকাসর্বস্ব মানুষজনকে ধিক্কার জানিয়ে বলেছেন যে, এরা প্রকারান্তরে ঈশ্বরেরই নিন্দুক, এরা যথার্থ ভক্ত নয়:
তব পূজা না আনিলে দন্ড দিবে তারে
যমদূত লয়ে যাবে নরকের দ্বারে
ভক্তিহীনে এই বলি যে দেখায় ভয়
তোমার নিন্দুক সে যে, ভক্ত কভু নয়। (নৈ. ৪১)
ডিভাইন কমেডি-র প্রথম ভাগ ‘ইনফারনো’তে দাঁতে (Dante) একজন ফ্লোরেন্সীয় কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ এবং বিত্রিচের প্রেমিক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন। রূপকার্থে তিনি সকল ক্রিশ্চান পাপীর একজন। নরকে তার যাত্রা সকল পাপীর যাত্রা, যে যাত্রার শেষে আছে ভুল-ভ্রান্তির অরণ্য পেরিয়ে ঈশ্বরের দেশে পৌঁছোনোর আনন্দ। আর এক রোমান মহাকবি ভার্জিল দাঁতেকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান নরক (Inferno) এবং Purgatory পার করে দেন এবং অবশেষে বিত্রিচ স্বর্গের পথে নিয়ে যান।
দাঁতে নরককে বর্ণনা করেছেন এমন একটি স্থান হিসেবে যেখানে পতিত আত্মারা মৃত্যুর পরে স্থান পায়। ফানেলের আকৃতি সম্পন্ন এই স্থানটি উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত এবং মর্ত্যের ঠিক মধ্যভাগে অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। যে সকল পাপীদের সেখানে অবস্থান তারা সকলেই ছিল বিকৃত রুচি ও উদ্দেশ্যের প্রতিভূ। নরককে কোনো শাস্তির স্থান না-বলে দাঁতে রূপকার্থে দেখালেন মানুষ কীভাবে অশুভ চিন্তা, কামনা ও কর্মের মাধ্যমে নিজের মূল্যবান আত্মাকে অবমাননা করে এবং এই বিচ্যুতির জন্য পরে নিজেই যন্ত্রণার শিকার হয়। নরক আর নরকের দর্শন কিন্তু এক জিনিস নয়। নরকে আছে পতিত আত্মা, আর নরক দর্শন করেছেন দাঁতে। ঈশ্বরের কার্য থেকে বিচ্যুত হওয়ায় মৃত্যুর পরে নরকে যেতে হয়। Inferno অংশের শুরুতেই মহাকবি দাঁতে বলছেন:
In the midway of this our mortal life,
I found me in a gloomy wood, astray
Gone from the path direct: and e’en to tell, (Canto–I)
এই ‘gloomy wood’ ভুল ও পাপের প্রতীক। যে-সকল জানোয়ার তিনি দেখলেন সেগুলো প্রতীকী অর্থে বিভিন্ন পাপ যেমন Lust, Pride, Avarice প্রভৃতি। নরকের মূল ফটকের মাথায় যে কথাগুলি ভার্জিল ও দাঁতে পড়লেন তা জীবিত মানুষের পক্ষে সতর্কবাণী:
Through me you pass into the city of woe:
Through me you pass into eternal pain:
Through me among the people lost for aye.
..............................................................
All hope abandon, ye who enter here. (Canto–III)
নরকে সূর্য তার শক্তি হারায়, মানুষ হারায় আশা। নরকে যাওয়ার অর্থ চিরস্থায়ী হতাশা ও দুঃখের সাগরে শুধু উদবেগ আর উদবেগ আর উদবেগ। অবশ্য দাঁতে যেহেতু নরক দর্শনে যাচ্ছেন, সেহেতু তাঁর সে ভয় নেই, ভার্জিল তাঁকে আশ্বস্ত করছেন বিশ্বাস ও আনন্দই তাঁকে নরক বাস থেকে বাঁচাবে। যে নরক ঈশ্বর একদিন Satan ও তার অনুগামীদের জন্য বানিয়েছিলেন তা দাঁতের কাছে হল মানুষের স্বীয় পাপ ও কর্মফলের উপসংহার। এই নরকচেতনা দাঁতের মধ্যে যখন এল তখন তাঁর ভীত, চিন্তাগ্রস্ত কম্পিত অন্তর বেছে নিল ঈশ্বরের পথ।
একাদশ সর্গে দাঁতে বিভিন্ন পাপের কথা বলেছেন যা মানুষের নরকযাত্রার পথ প্রশস্ত করে। এখানে দাঁতে অবশ্য অ্যারিস্টটল ও সিসেরোকে অনুসরণ করেছেন। অ্যারিস্টটল Incontinence, Bestiality ও Malice এই তিন শ্রেণীতে মানুষের অসদাচরণকে বিভক্ত করেছেন। সিসেরো বলেছেন Violence এবং Fraud-ই মানুষের সকল অসদাচরণের নিয়ন্তা। দাঁতে তিন শ্রেণীতে পাপকে দেখালেন:
Three dispositions adverse to Heaven’s will,
Incontinence, malice, and mad brutishness, (Canto–XI)
দাঁতের নরকে আছে দশটি মূল বিভাজন। কিন্তু গৌণ বিভাজনগুলি নিয়ে মোট চব্বিশটি বিভাজন লক্ষ করা যায়। পাপগুলির মধ্যে আছে—কাম, জালিয়াতি, খুন, প্রতিবেশীর প্রতি অসদাচরণ, ডাকাতি, লুঠ, জুয়াখেলা, তোষামোদ, প্রতারণা, চুরি, জোচ্চুরি, মিথ্যাচার, জাদুবিদ্যা, সুদের ব্যাবসা ইত্যাদি। ব্যভিচার, সুদের ব্যাবসা ওঈশ্বরনিন্দা মানুষকে ঈশ্বর থেকে বহুদূরে নিয়ে যায়। দাঁতের নরক কল্পনা কাব্যসৌন্দর্য, ধর্মীয় চেতনা, সমাজচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের মিশ্রিত ফসল। সবার ওপরে প্রেমিক দাঁতে খুঁজে ফিরেছেন তাঁর প্রেমিকা বিত্রিচকে। Divine Comedy আসলে আত্মার ঈশ্বরসন্ধানের এক রূপক। নরকের দর্শন (Vision of Hell) না-হলে মানুষ নৈতিকতার পূজারি হবে না। নীতিবোধবিবর্জিত হলে আলো ও সংগীতের মাধুর্য থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে চিরকাল এবং এই সৌন্দর্য, আলো ও সংগীতেই আছে স্বর্গীয় আনন্দের প্রকৃত অনুভূতি, যা বিত্রিচ দাঁতেকে দিতে পেরেছিলেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে আমেরিকার দাঁতে সমালোচক Henry wight sidgwick-এর ভাষায় ‘To Dante this literal Hell was a secondary matter; So it is to us. He and we are concerned with the allegory…Hell is the absence of god…’
মহাভারত-এর কোনো কোনো স্থানে বর্ণিত ‘ভৌম নরকের’ সঙ্গে কবিসাহিত্যিকদের চিন্তার একটা সমন্বয় রয়েছে। নরক এই ভূমিতেই ‘ইমং ভৌমনরকম’ (মহা. আদি, ৯০। ৪)। মহাভারতকার শ্রীকৃষ্ণের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, বানপ্রস্থী হয়েও যিনি মনে মনে সাংসারিক বিষয়ে আসক্ত তিনি যেন মৃত্যুরাজ্যেই বাস করেন এবং সেটিই তার নরকবাস ‘বসতঃ বনে বন্যেন জীবিতঃ মমতা যস্য দ্রব্যেষু মৃত্যোরাজ্যে স বর্ততে’ (মহা. আশ্ব. ১৩। ৭)। আলোকহীন যে অন্ধকার, বৈরাগ্যহীন যে দুঃখ তাই নরকের নামান্তর ‘নরকে দুঃখমেবাহু:’ (মহা. শান্তি. ১৯০। ১৪); ‘নরকং তম এব চ’ (মহা. শান্তি ১৯০। ৩)। মানুষ যখন অনন্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবৃত্তিকূপে পড়ে হাবুডুবু খায় তখন এই পৃথিবীটাই তার কাছে ভৌম নরক বলে মনে হয়। শ্রীঅরবিন্দের মতে নরকের চারিদিকে একটা ভীতিকর জগৎ যেখানে যন্ত্রণার পর আসে তীব্রতর যন্ত্রণা:
Around him grew the terror of a world
Of agony followed by worse agony.
(Savitri, Book–2, Canto–VIII)
তবে ত্রিলোকের যাত্রীকে এর সামনে দাঁড়াতে হয় সাহসে ভর করে। নরকের প্রবেশ পথ আঁধারে আচ্ছন্ন, যার অন্দরে হিংসার রাজ্য। তাঁর মতে নরক হল স্বর্গের দুয়ারে পৌঁছোনোর হ্রস্বতম পথ। নরক অতিক্রম না-করে কেউ স্বর্গে যেতে পারে না ‘None can reach heaven who has not passed through hell’ (Savitri, Book–2, Canto–VIII)।
আধুনিককালের হালকা উপন্যাসেও নরক-কথা স্থান করে নিয়েছে। যেমন নরকে চিত্রগুপ্তের স্ত্রীর ভারি দুঃখ। পাপিনী না-হয়েও তাকে স্বামীর জন্য সারাটা জীবন নরকে কাটাতে হল। গুণ্ডা, বদমাইশদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার জন্য নাকি আরও অসংখ্য যমালয়ের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে এবং যমের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হল মর্ত্যলোকেই কয়েকটি ‘ডিমড নরক’ সৃষ্টি করা হোক। অপরাধীদের টানাহ্যাঁচড়া না-করে নরলোকের কয়েকটা বড়ো শহরকে যমালয়ের স্ট্যাটাস দেওয়া হোক প্রভৃতি। একবার শ্রীভগবানের দপ্তরে কথা উঠেছিল মেয়েদের নরকে নিয়ে যাবার জন্য নারী যমদূত নেই কেন? চিত্রগুপ্ত নাকি উত্তরটা তৈরি করে রেখেছিল। মৃতদের শরীর নেই শুধু আত্মা। আর আত্মার sex (M/F) নেই (তি. ভু. ক.)।

তবে সুপার-হিট করেছেন খুশবন্ত সিং তাঁর Indian Hell লেখায়। মৃত্যুর পর একজন ভারতীয় নরকে গিয়ে দেখলেন পৃথিবীর এক-এক দেশের নাগরিকদের জন্য এক-একটি স্বতন্ত্র নরক। লোকটি বিভিন্ন দেশের নরক ঘুরে জানতে পারলেন সর্বত্রই ব্যবস্থা একরকম। যেমন প্রথম একঘণ্টা বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে রাখা, পরবর্তী একঘণ্টা বড়ো বড়ো নখওয়ালা শয্যায় শুইয়ে রাখা এবং অন্তিম ঘণ্টায় নির্দিষ্ট দেশের বিকটাকৃতি শয়তানের প্রহার। লোকটি বিস্মিত হলেন যেহেতু অন্যান্য দেশের নরকের জায়গায় তেমন কোনো ভিড় নেই বললেই চলে। অথচ ভারতের নরকে লাইনে দাঁড়াবারই উপায় নেই। হুড়োহুড়ি, ধ্বস্তাধস্তি চলছে। আবার সেই লাইনে সব বিদেশিরাও ভিড় করেছে। ভারতীয় ব্যক্তিটিকে জনৈক জার্মানি জানালেন, ভারতের নরকের ‘maintenance is so bad that the electric chair does not work, someone has stolen all the nails from the bed and the Indian devil is a former Govt. Servant. So he only comes and signs the register.’
বক্তব্য হল, শান্তির বাণী যখন হিংসার কাছে পর্যুদস্ত হয়, বহুমানুষের রক্তে যখন সভ্যতা কলঙ্কিত হয়, সন্ত্রাসবাদীদের ক্রিয়াকলাপে যখন শয়ে শয়ে নিরপরাধ মানুষ মারা যায় তখন কবি নরকযন্ত্রণার কথাই ভাবেন। বিষ্ণু দে এজন্যই বলেছেন:
এ নরকে
মনে হয় আশা নেই জীবনের ভাষা নেই,
যেখানে রয়েছি আজ সে কোনো গ্রামও নয়, শহর তো নয়,
প্রান্তর পাহাড় নয়, নদী নয়, দুঃস্বপ্ন কেবল।
দুর্যোধনের মতনই কোনো দুর্দমনীয় সন্ত্রাসকারী পৃথিবীটাকে নরকে পরিণত করতে পারে এবং চরম ক্ষণে তৃপ্ত হয়ে বলতে পারে ‘আমি আজ জয়ী সবার জীবন দিয়েছি নরক করে’। অতএব ‘মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেই সুরাসুর’।
শব্দসংকেত
|
অনু.: অনুশাসন পর্ব |
অ. পু.: অগ্নিপুরাণ |
|
আশ্ব.: আশ্বমেধিকপর্ব |
তি. ভু. ক.: তিন ভুবনের কথা |
|
নৈ.: নৈবেদ্য |
প. পু.: পদ্মপুরাণ |
|
বৃ. না. পু.: বৃহন্নারদীয়পুরাণ |
ব্র. পু.: ব্রহ্মপুরাণ |
|
ব্র. বৈ. পু.: ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ |
ম. স.: মনুসংহিতা |
|
মহা.: মহাভারত |
মে. কা.: মেঘনাদবধকাব্য |
|
মে. ম. ভা.: মেধাতিথিকৃত-মনুভাষ্য |
বি. পু.: বিষ্ণুপুরাণ |
|
শান্তি.: শান্তিপর্ব |
শ্রী. গী.: শ্রীমদভগবদগীতা |
|
স্ক. পু.: স্কন্দপুরাণ |
তথ্যসূত্র:
অগ্নিপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯০
তিন ভুবনের কথা:
শংকর, সাহিত্যম, কলকাতা-৭৩, ২০০৬
পদ্মপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৭
বৃহন্নারদীয়পুরাণ
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৬
ব্রহ্মপুরাণ
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৪০৯
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৪০৯
মধুসূদন রচনাবলি
ড. অজিতকুমার ঘোষ সম্পাদিত, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা-১২, ১৯৭৩
মনুটীকাসংগ্রহ:
দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি। কলকাতা-১, ১৯৮৬
মহাভারত (বেদব্যাস):
নীলকণ্ঠকৃত ভারতভাবদীপটীকা এবং হরিদাসসিদ্ধান্তবাগীশ কৃত ভারতকৌমুদী টীকাসহ, কলকাতা-৪১, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ।
মেঘনাদবধকাব্য:
শ্রী সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, মডার্ন বুক এজেন্সি প্রা. লি. কলকাতা-৭৩, ১৯৮৭
রবীন্দ্ররচনাবলি (প্রথম-চতুর্দশ):
পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৩৮৯, মহাকরণ, কলকাতা-১
বিষ্ণু দে কবিতা সমগ্র:
স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যৎ।
বিষ্ণুপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯০
শঙ্খ ঘোষ:
কবিতাসমগ্র
শ্রীমদভগবদগীতা:
পন্ডিত শ্রীভূতনাথ সপ্ততীর্থ অনূদিত ও ব্যাখ্যাত, কৃষ্ণ ব্রাদার্স, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ
স্কন্দপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৮
Buddhism: Christmas Humphreys, Penguin Books, 1951.
Divine Comedy: Dante, J. M. Dent & Sons Ltd. London, 1909.
Savitri: Sri Aurobindo, Sri Aurobindo Ashram, Pondicherry, 1951.
The Complete works of Swami Vivekanada:
Mayavati Memorial Edition, Advaita, Ashram. Cal-14.
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন