মান্ধাতার মেয়ে-জামাই

অমিত ভট্টাচার্য

সদ্বীপা পৃথিবীর অধীশ্বর মান্ধাতা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন। শশবিন্দু-র কন্যা বিন্দুমতীর সঙ্গে মান্ধাতার ঘটা করে বিবাহ হয়েছিল। তখনকার দিনে অতিথি নিয়ন্ত্রণ বিধির কোনো বালাই ছিল না। তবে মান্ধাতা নিয়ন্ত্রণ বিধির ঊর্ধ্বে বলাই বাহুল্য। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, চতুরঙ্গ বাহিনী, লোকলশকর পাইক-পেয়াদা নিয়ে যার দিন অতিবাহিত হয় তার ক্ষেত্রে নিয়মের বালাই নেই। বিবাহের রাতেই মান্ধাতার মনে হয়েছিল এক আকাশের নীচে কেবল দুজন বিন্দুমতী ও সে। আনন্দে, আবেশে মান্ধাতা-শরীর মুগ্ধ।

প্রজানুরঞ্জক মান্ধাতার সারাদিন কাজ। কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম। এই বিশ্রামটুকুর মধ্যেই মান্ধাতা নিয়ম করে বিন্দুমতীকে সময় দেন। আসলে প্রকৃতির আকর্ষণ যে এত দুর্নিবার হতে পারে মান্ধাতা তা ভাবতেই পারেননি। বিবাহোত্তর মান্ধাতা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করে চলেছেন। রাজ-কর্তব্য পালনের ফাঁকে ফাঁকেই মান্ধাতার ভেতরটায় কেমন যেন সব গুলিয়ে যায়। একটা তীব্র আবেগানুভূতিতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলার জোগাড়!

মান্ধাতা-বিন্দুমতীর আকাঙ্ক্ষা-সৃষ্ট তিন পুত্র ও পঞ্চাশটি কন্যা। বিন্দুমতী কতকাল ঋতুমতী ছিলেন বা প্রতিবার গর্ভসঞ্চারের পর মায়ের স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য অটুট ছিল কিনা—এসকল প্রশ্ন মিথকথায় অবান্তর। বহুবিবাহ প্রবর্তিত সমাজব্যবস্থায় শত পুত্র (যেমন রেবতের ছিল), পঞ্চাশ কন্যা প্রভৃতি অসম্ভব নয়, যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু মান্ধাতার বারংবার দারান্তর পরিগ্রহের কোনো সংবাদ মেলেনি। যাক, পুরুষ-মা যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতা আত্মবিস্তারে যে আজীবন সক্রিয় ছিলেন পাঠক তা জানতে পারেন।

রাজারাজড়াদের জীবনচর্চা পাঁচটা সাধারণের থেকে স্বতন্ত্র। ফলে ক্রমান্বয়ে কন্যা-সন্তানের জন্মদাত্রী বিন্দুমতীকে গঞ্জনা সইতে হয়নি। অসংখ্য দাস-দাসী, পরিচারিকা থাকলে বাচ্চাদের সর্দিকাশি, পেটের গোলমাল, প্রভৃতি রোজকার রোগজ্বালা নিয়ে মাকে উতলা হতে হয় না। যথোপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠার মধ্যেই কীভাবে যে এতজনের শৈশব, কৈশোর কেটে গেল, তা উপলব্ধির অগোচরেই রয়ে গেল। আচার্য-শিক্ষকদের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হয়ে যখন প্রত্যেকে রাজঅন্তঃপুরে পা রাখত তখন সে এক অনাবিল আনন্দের হট্টমেলা। মান্ধাতা সেই চাঁদের হাট পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভাবেন আনন্দ সৃষ্টি করতে হয়। আনন্দ কেনবার ধন নয়।

মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক বিবর্তন লক্ষ করে মান্ধাতা-বিন্দুমতী উপলব্ধি করলেন তাদের সংসার আরও প্রসারিত হবে। এক থেকে দুই, দুই থেকে তিপ্পান্ন হয়েছে (তিন পুত্র, পঞ্চাশ কন্যা)। মান্ধাতা-বিন্দুমতী একে অন্যের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার পরেই বিস্তৃতির যাত্রা শুরু। এখন রাজপ্রাসাদ ভরতি সন্তান-সন্ততি। রাজকার্যের বাইরেও নিজের সৃজনশীল সত্তা মান্ধাতাকে আনন্দ দেয়। বিন্দুমতী এখন আর রাজাবাবুর আগমনে অধোমুখী হন না। উভয়ের স্বভাবসুন্দর দৃষ্টি বিনিময়ই জানিয়ে দেয় যে তাদের সংসার গড়ার বাসনা ষোলো আনা পূর্ণ।

তিন পুত্রের ব্যাপারে রাজা-রানির বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। অগাধ ঐশ্বর্য, ভোগ করে শেষ করতে তিনজন পারবে না। এজন্য ওদের নিয়ে অস্থির হওয়া অর্থহীন। জন্মস্বত্ববাদ অনুযায়ী পুত্র-সন্তানেরা প্রভূত সম্পদের অধিকারী। দুজনেই লোকান্তরিত হলে বাপ-মায়ের পরলোকগমনের পরে, উপরমস্বত্ববাদ অনুসারে মোট সম্পদের পরিমাণ! সে তো বিস্ময়, করুণাময় ঈশ্বরের কথা ভেবে মান্ধাতা-দম্পতি শান্তভাব বজায় রেখে চলেন।

কিন্তু এতগুলো কন্যার বিবাহের ব্যাপারে ইদানীং উভয়ে মাঝে-মধ্যেই সুযোগ পেলে ভাবতে বসেন। যদিও তাদের কন্যাকেন্দ্রিক ভাবনাগুলো সবই সদর্থক এবং আনন্দময়। মনের ভাবে সে আনন্দের প্রকাশ অনভিব্যক্ত থাকেনি। বস্তুত অভাব যেখানে নেই সেখানে এতোগুলো কন্যার একসঙ্গে উপযুক্ত শিক্ষায় বড়ো হয়ে ওঠা সত্যই চিত্তাকর্ষক বৈ কি! মান্ধাতা-দম্পতির কন্যাদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্কটা রীতিমতো উপভোগ্য।

মান্ধাতা-বিন্দুমতী ভাবেন পঞ্চাশটি কন্যার বর কেমন হবে, বরদের পরিবারগুলো কেমন হবে, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যই কি কেবল জামাতা নির্বাচনের একমাত্র মাপকাঠি হবে, না রুচিশীল সংস্কৃতিমনস্ক জামাতা পেলে আর্থিক দিকটা উপেক্ষিত হবে? যদি এমন হয় যে, সব অভিপ্রেত চাহিদা পূরণ করলেও কোনো পাত্র সংক্রামক ব্যাধি কবলিত ‘সঞ্চারিরোগদোষসমন্বিত’—সেক্ষেত্রে কী হবে? তবে যাই হোক একাদিক্রমে পঞ্চাশটি গুণবান জামাতার সন্ধান যে সহজসাধ্য নয় তা দুজনেই উপলব্ধি করেছিলেন। মান্ধাতা বিন্দুমতীকে এমন পর্যন্ত বলেন যে, রাজা রৈবতক কন্যা রেবতীর বিবাহের জন্য জামাতার খোঁজে ব্রহ্মলোকে হাজির হয়েছিলেন। এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মার কাছে করজোড়ে রৈবতক কন্যার উপযুক্ত পাত্রের তত্ত্বতালাশ করেন। কস্যেয়মর্হতীতি। কার হাতে কন্যা সমর্পিতা হবে—এ সমস্যা চিরন্তন। কস্মৈ কন্যামিমাং প্রযচ্ছামীতি (বি. পু. ৪। ১। ২২)।

মান্ধাতা-বিন্দুমতীর দাম্পত্যজীবনের বড়ো আকর্ষণীয় দিক হল উভয়েই দেখা হলে গল্পগুজবে সময় দিতেন। মান্ধাতা নিজেও রাজপুত্র। তার ওপরে স্বয়ং ইন্দ্রের কৃপাধন্য। ছেলেবেলা থেকেই উপযুক্ত শিক্ষাতে বড়ো হয়ে ওঠা মান্ধাতা প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন যার সুবাদে রাজকার্য চালানোর পাশাপাশি সুখী সমৃদ্ধ পারিবারিক জীবনও অতিবাহিত করেছেন। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর চোখেমুখে যে ক্লান্তি ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা তা কোনোকালেই মান্ধাতার হয়নি। বিবাহের এতোগুলো বছর পার হলেও এখনও মান্ধাতা বলেন, বিন্দুমতী শোনেন। একদিন কথায় কথায় মান্ধাতা বললেন, বৃহস্পতির পুত্র ব্রহ্মর্ষি কুশধ্বজের ইচ্ছে ছিল অসামান্যা রূপ-লাবণ্যময়ী কন্যা বেদবতীকে ত্রিলোকের স্বামী বিষ্ণুর সঙ্গে বিবাহ দেবেন। বেদবতীর রূপমুগ্ধ দেব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস নির্বিশেষে সকলেই কুশধ্বজের কাছে কন্যার জন্য অর্থীরূপে হাজির হয়েছিল। কিন্তু কুশধ্বজ কারুর আবেদনে কর্ণপাত করেননি। তার অনমনীয় মনোভাবের জন্যই দৈত্যরাজ শম্ভু নিদ্রিত অবস্থায় তাকে হত্যা করে। তেন রাত্রৌ শয়ানো মে পিতা পাপেন হিংসিতঃ (রা. উত্তরকান্ড ১৭। ১৪)। কন্যার বিয়ে দিতে সংকল্পবদ্ধ কুশধ্বজ নিজের জেদের জন্যই নিহত হলেন। বিন্দুমতী বিচলিত হন, স্বয়ং রানি হলেও তার বুকের মধ্যেটা ধড়াস করে ওঠে।

বিন্দুমতীর মনে হয়, মান্ধাতা বড্ড বেশি ভাবেন। রাজ্যে বসবাসকারী এত প্রজা, তাদের প্রত্যেকেরই পরিবারে কন্যা-সন্তান রয়েছে। তাদের কি বিবাহ হয় না! প্রজাদের তো আর রাজ-ঐশ্বর্য নেই। অনেকেরই বার্ষিক খাজনা দিয়ে পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদন করে কোনোরকমে দিন গুজরান হয়। তাদের কি কন্যার বিবাহ আটকে থাকে! সংবেদনশীল মান্ধাতাকে বিন্দুমতী বোঝান, কেবল বর্তমান নিয়ে ভাবতে। অতিকথা-নির্ভর নানান কথা উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি ঘটিয়ে নিশ্চিত মহারাজের অনিদ্রার কারণ হয়ে উঠবে। বিন্দুমতী মান্ধাতাকে বোঝান যে, তিনি তার কাছেই শুনেছেন নারদ কন্যার পিতাকে স্মরণ করিয়েছেন, বিবাহের পূর্বে যেন পাত্রের পুংস্ত্ব বিষয়ে পরীক্ষা করা হয়—পরীক্ষ্য পুরুষঃ পুংস্ত্বে (না. স্মৃ. ১২। ৮)। কিন্তু এত সব ভাবতে বসলে জীবন কঠিন হয়ে উঠবে। এ যাবৎ চলে আসা সেই সুখের দিন অচিরেই শেষ হবে।

তবে বিন্দুমতী বুদ্ধিমতী। সংসারের মাথায় যিনি থাকবেন তিনি চিন্তাগ্রস্ত হবেন—এমনটি কখনই কাম্য না-হলেও তাকে চিন্তাশীল হতে কোনো বাধা নেই। বিন্দুমতী প্রচ্ছন্ন গর্ব চেপে রাখতে পারেন না। তিনি এমন এক রাজার মহিষী যিনি হাজারো রাজকর্তব্য পালন করেও নিজের পরিবারের কন্যাদের জন্য কত কিছু ভাবেন। মান্ধাতা রাজা হলেও সার্থক পিতা। বিত্তবৈভবে পরিবেষ্টিত ক-জন পিতা কন্যাদের নিয়ে এত পাহাড়-প্রমাণ চিন্তা করেন—তা নিয়ে বিন্দুমতীর যথেষ্ট সংশয় আছে। কন্যা মানেই পরের ধন, বন্ধকী দ্রব্য—অন্তত এজাতীয় ভাবনায় যে মান্ধাতা আচ্ছন্ন নন, তা ভেবে বিন্দুমতী সকল মহিলার পক্ষ থেকে মান্ধাতাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানান।

ইতিমধ্যে বিয়ে-পাগল সৌভরি নামে জনৈক প্রৌঢ় ঋষি মান্ধাতার দর্শনার্থী হয়ে রাজপ্রাসাদে এলেন। এতদিন পর্যন্ত সৌভরির জীবনটা ছিল তপোময়। শোনা যায় বারো বছর একটানা তিনি জলের মধ্যে তপস্যা করেছেন। দীর্ঘ তপস্যায় তার অনেক ক্ষমতাও অধিগত হয়েছে। সৌভরির জীবনচর্যা দেখে ভাবা যায়নি যে, তিনি আবার কোনোদিন বিবাহ করতে অভিলাষী হবেন। কিন্তু সঙ্গ-প্রভাব জীবন গঠনে মুখ্য ভূমিকা নেয়। গভীর দীর্ঘ জলাশয়ে ধ্যানের সময় এক বৃহদাকার সুখতৃপ্ত মৎস্যের প্রভাব সৌভরির তপোভঙ্গের কারণ হল। সৌভরি লক্ষ করেন মৎস্যের অজস্র শিশু মৎস্য (চারাপোনা)। সমগ্র শরীরে অর্থাৎ মাথা থেকে পুচ্ছ পর্যন্ত তারা ঘোরে-ফেরে, গায়ে পুট কাটে, আদর করে, চারপাশে কেমন খেলা করে। অসংখ্য শিশু মৎস্যের সানন্দে ছোটাছুটি সৌভরির ধ্যানে ব্যাঘাত ঘটায়।

যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ। সৌভরির অসতর্কতার সুযোগে কামবহ্নি প্রকাশ পায়। তার মনে হতে থাকে অপকৃষ্ট মৎস্যরাই এত সন্তানাদি নিয়ে বেশ সুখে দিনাতিপাত করে। আসলে সৌভরির প্রতিজ্ঞায় খামতি ছিল। বিকারের হেতু থাকলেও বিকৃত হব না—এজাতীয় দৃঢ়তার অভাব নিশ্চয়ই সৌভরির এসেছিল। যোগীকে বাড়তি সতর্কতার বাস্তব প্রয়োজনের দিকটা মাথায় রাখতে হয়, নতুবা সন্তোষের অধিকার মেলে না।

যাক, যা হবার নয়, তা হবার নয়। ভবিতব্যের লঙ্ঘনকারী কেউ নেই ‘ভবিতব্যং তথা তচ্চ ন তচ্ছক্যমতোহ ন্যথা (মহা. শান্তি. ৩১। ৪১)। বৃহৎ মৎস্যের সন্তানদের তার চারপাশে খেলতে দেখে সৌভরিও নিজের সন্তানদের সঙ্গে খেলবেন, ঘুরবেন, ফিরবেন এই অভিপ্রায়ে দ্বিতীয় আশ্রমে, গৃহজীবনে প্রবেশ করবেন—এরকম স্পষ্ট বার্তা অন্তরের অন্তর থেকে লাভ করলেন। বারো বছরের ধ্যানধারণা বৃহৎ মৎস্যের প্রভাবে নস্যাৎ হয়ে গেল। তবে যেসব অতিলৌকিক ক্ষমতা সৌভরি অর্জন করেছিলেন তা যথাপূর্ব রয়ে গেল।

সৌভরির আগমনবার্তা পেয়ে শশব্যস্ত মান্ধাতা অর্ঘ্যাদি নিয়ে তাকে বরণ করলেন। প্রৌঢ়, প্রাজ্ঞ সৌভরির মূল্যবোধ ভিক্ষুপাদপ্রসারণন্যায়-এর বিরোধী। প্রথমে মনের ভাব গোপন করে আলাপচারিতায় সময় কাটানো হোক, পরে অভিপ্রায় ব্যক্ত করা যাবে—এসব দ্বিচারিতায় সৌভরি বিশ্বাসী নন। এজন্য বরণপর্ব শেষ হতেই সরাসরি মনের অভিলাষ জ্ঞাপন করলেন মান্ধাতার কাছে। নিবেষ্টুকামোহস্মি নরেন্দ্র কন্যাং প্রযচ্ছ মে। মা প্রণয়ং বিভাঙ্ক্ষী:। সৌভরির প্রস্তাবটা শোনামাত্রই মান্ধাতা নিজের হৃৎস্পন্দন অনুভব করলেন। নৃপতি মান্ধাতাকে একবার অন্তঃপুরে বিন্দুমতীর কাছে যাবার সুযোগটুকুও সৌভরি দিতে নারাজ। সৌভরি রাজসভায় সকলের সামনেই একনাগাড়ে বলে যান যে, পৃথিবীতে কন্যার অভাব কোনোকালেই হয়নি, হবে না। বিশেষত তার মতো ঋষিকে পতিত্বে বরণ করতে পারলে যেকোনো রাজকন্যাই ধন্য হবেন। তবে মান্ধাতার বংশমর্যাদা বিবেচনা করেই সৌভরি অর্থীরূপে হাজির হয়েছেন। মান্ধাতা তার পঞ্চাশটি কন্যার মধ্যে যেন অন্তত একজনকে সৌভরির পাণিগ্রহণের সুযোগ দেন। শতার্ধসংখ্যাস্তব সন্তি কন্যাস্তাসাং মমৈকাং নৃপতে প্রযচ্ছ।

রাজসভা থমথমে। মান্ধাতা আপাদমস্তক সৌভরিকে অবলোকন করলেন। পাত্রের বয়স, গাত্রবর্ণ, দীর্ঘ জলবাসের ফল—রীতিমতো অবাক হয়ে তিনি দেখছেন। প্রাণপ্রিয়া কন্যাদের মুখ মান্ধাতার সামনে ভেসে ওঠে। বয়সের ব্যবধান ইত্যাদি চিন্তা করে আত্মজাদের কথা ভেবে মান্ধাতা ঠিক করলেন যে, মেয়েদের তিনি তো হাত-পা বেঁধে জলবাসে পাঠাতে পারবেন না। অথচ প্রকাশ্যে তা বলতে পারছেন না, যেহেতু সৌভরি কোনো ওজর-আপত্তি শুনবেন না। মান্ধাতা নিশ্চিত যে, তেজোদীপ্ত সৌভরির প্রার্থনায় নিমরাজি হলে অভিশম্পাত অনিবার্য। নিজের ভেতরের আলোড়ন মান্ধাতা গোপন রাখার চেষ্টা করলেন।

সোজাসুজি ‘না’ বলতে অপারগ হলেও মান্ধাতা সৌভরিকে প্রত্যাখ্যানের অন্য উপায় বের করলেন। মান্ধাতা জানালেন, তাদের পরিবারের একটা অলিখিত নিয়ম আছে। সৌভরি শ্রোতা। তিনি মান্ধাতার মুখের রেখায় অকথিত কথাগুলো অন্বেষণ করতে থাকেন। সে নিয়মটা হল কন্যা স্বয়ং যে সৎবংশজাত পাত্রকে নির্বাচন করেন তার সঙ্গেই বিবাহবন্ধন হয়ে থাকে। এখানে মনোনয়ন-উত্তর পিতার ভূমিকা অতিনগণ্য। ভগবন! অস্মৎকুলস্থিতিরিয়ং য এব কন্যায়া অভিরুচিতোহভিজনবান বরঃ তস্মৈ কন্যা প্রদীয়তে (বি. পু. ৪। ২। ২৬)।

মান্ধাতার অভিপ্রায় ছিল, একবার কন্যান্তঃপুরে পাঠাতে পারলে সৌভরি অবশ্যই প্রত্যাখ্যাত হবেন। কারণ তার কন্যারা একা কখনই খুব একটা থাকে না। সংঘবদ্ধ হয়ে থাকার ফলে পারস্পরিক মত বিনিময়ে এধরনের প্রৌঢ়কে কেউই পছন্দ করবে না। সৌভরি মান্ধাতার ভেতরটা দেখতে পেলেও ইষ্টসিদ্ধির তাগিদে বাইরে একটা অদ্ভুত শান্তভাব বজায় রাখলেন এবং মান্ধাতার বংশরীতিকে মর্যাদা দিতে প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন। মান্ধাতার অবস্থা ন যযৌ ন তস্থৌ। উষ্ট্রলগুড়কন্যায়ে তিনি নিজেই নিজের অবস্থার জন্য দায়ী। কেবল উত্তম পাত্রে কন্যাদের বিবাহ দেবেন ভেবে তিনি ও বিন্দুমতী কতই না সুখরজনী যাপন করেছেন। অথচ একী গ্রহের ফের! ডাক পড়ল অন্তঃপুরের রক্ষক ক্লীব বর্ষবরের। এদিকে সৌভরি মান্ধাতার অভিসন্ধি যোগবলে উপলব্ধি করে পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করে ফেলেন। অন্তঃপুরে প্রবেশমার্গেই সেরা সিদ্ধ-গন্ধর্ব-মানুষদের রূপ একত্রিত করে তিনি পরমরমণীয় দিব্য স্বর্ণকান্তি রূপ ধারণ করলেন।

বর্ষবর মান্ধাতা-কন্যাদের জানালেন, পিতার আদেশেই তিনি এই ব্রহ্মর্ষিকে এখানে এনেছেন। যদি তাদের মধ্যে কেউ একে বিবাহের জন্য পছন্দ করেন তবে তিনি সেই ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করবেন না। যদি অস্মৎ কন্যকা কাচিদ ভগবন্তং বরয়তি, তৎকন্যায়াশ্ছন্দে নাহং পরিপন্থানং করিষ্যামি। সৌভরি বিস্ফারিত চোখে দেখলেন, বর্ষবর চলে যেতেই পানপাতার মতন সুন্দর মুখবিশিষ্ট পঞ্চাশটি কন্যা মদন বাণে সন্তপ্ত হয়ে পরস্পরের দিকে চেয়ে ইঙ্গিতে হেসে লুটিয়ে পড়ছে। তারা প্রত্যেকেই শালবৃক্ষে আশ্রিতা সঞ্চারিণী হিরণ্ময়ী লতার মতন, অন্তরিক্ষচ্যুতা স্থায়ী বিদ্যুতের মতন। সেই অপরূপ লাবণ্যময়ী প্রত্যেক কন্যাই দিব্যকান্ত সৌভরিকে দেখামাত্রই যেন স্পর্শসুখ অনুভবে আত্মহারা হল। সানুরাগা কন্যাদের প্রত্যেকে বলতে আরম্ভ করল যে, সে-ই ব্রহ্মর্ষিকে বরণ করেছে। বিধাতা যেন কেবল তার, তার জন্যই ব্রহ্মর্ষিকে প্রেরণ করেছেন। অলং ভগিন্যোহহমিমং বৃণোমি। ইনি আমার জন্য, তোমার জন্য নয়।

এদিকে কন্যান্তঃপুরের ঘটনা জানতে উদগ্রীব হয়ে আছেন মান্ধাতা। তার দ্রুত পদচারণা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, তিনি অত্যন্ত উদবেগে সময় কাটাচ্ছেন। অন্তঃপুররক্ষক বর্ষবর ঝড়ের গতিতে রাজকন্যাদের অভিলাষ-বার্তা মান্ধাতাকে জানালেন। বিস্মিত মান্ধাতা কন্যাদের ইচ্ছাকে যথোচিত মর্যাদা দিতে তৎপর হলেন। সৌভরি নিজেকে প্রজাপতিরূপে কল্পনা করতে থাকলেন। তার মনে হল বৃহৎ মৎস্যের জীবনের মতন সুখময় দিনগুলো দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে।

গৃহী জীবনে প্রবেশ করেই মান্ধাতা-জামাতা সৌভরি অশেষশিল্পী বিশ্বকর্মাকে প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য স্বতন্ত্র পঞ্চাশটি নয়নাভিরাম প্রাসাদ নির্মাণের আদেশ করলেন। আদেশমাত্রই তা নির্মিত হল। প্রতিটি প্রাসাদ সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হল নয়নাভিরাম পদ্মশোভিত জলাশয় যেখানে কূজনশীল কলহংস অবাধে বিচরণ করতে থাকল। বৃহৎমৎস্যকথা সৌভরিকে যে নবজীবন দিয়েছে সেখানে সুখ, কেবল সুখ। একপাল সন্তানের (১৫০) জন্মদাতা সৌভরি আজ সত্যই প্রজাপতি। কালেন গচ্ছতা তস্য রাজতনয়াসু তাসু পুত্রশতং সার্দ্ধমভবৎ।

শব্দসংকেত

না. স্মৃ.

নারদস্মৃতি

মহা. শান্তি.

মহাভারত, শান্তিপর্ব

রা.

রামায়ণ

বি. পু.

বিষ্ণুপুরাণ

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%