পুষ্পবৃষ্টি

অমিত ভট্টাচার্য

পুষ্পবৃষ্টি লোকসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শুভঙ্কর আনন্দদায়ক পরিবেশ সূচিত করতে কবি পুষ্পবৃষ্টির আশ্রয় নেন। মানুষের মুখ থেকে আনন্দের বার্তা পরিবেশিত হলে সম্পূর্ণ দেহমন এমন উদবেলিত হত না এবং সমবেত জনতা সেই আনন্দে মেতে উঠতেন না, যেটা পুষ্পবৃষ্টিতে হয়। আধুনিক কালের কাব্যে, নাটকে পুষ্পবৃষ্টি বর্ণিত হয় না। কারণ লেখকদের যুক্তিবাদী মন একে স্বর্গলোকের বিষয়রূপে মানতে নারাজ। তবে পুষ্প বরাবরই মঙ্গলজনক হয়। অনুষ্ঠানের শুভ সূচনার ঈঙ্গিতবাহী পুষ্পবর্ষণ মানুষই করে থাকেন। কল্যাণ কামনায় বৃষ্টির অধিপতিকে আকুল নয়নে ডেকে পুষ্পবর্ষণ করানো যাবে না—তা মানুষের উপলব্ধ হয়েছে। অনুষ্ঠানের ময়দানে হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবর্ষণের রীতি প্রাচীনের পুষ্পবৃষ্টিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পুষ্পবৃষ্টি যেমন শুভস্মারক তেমন অশুভ ঘটনা প্রকাশ করতে কবি প্রাচীনযুগে রুধিরবৃষ্টি বা রক্তবৃষ্টি এনেছেন। নিপপাতান্তরিক্ষাচ্চ পুষ্পবৃষ্টিস্তদা ভুবি (বা. যুদ্ধকান্ড, ১০৮। ২৮; ববর্ষ রুধিরং দেবো রাবণস্য রথোপরি—বা. যুদ্ধকান্ড ১০৬। ২১)।

স্বর্গবাসিনী অপ্সরা রম্ভাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে রাবণ ধর্ষণ করেন। রম্ভা সবিনয়ে রাবণকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি কুবেরপুত্র নলকুবেরকে মন বিনিময় করেছেন। কিন্তু হাজারো অনুনয়েও দশাননের কবল থেকে রম্ভা নিষ্কৃতি পাননি। রম্ভার মুখ থেকে রাবণের কুকীর্তির খবর পেয়ে নলকুবের রাবণকে অভিশাপ দেন যে, পরবর্তীকালে রাবণ যদি অপর কোনো নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্ভোগ করেন তবে সেই মুহূর্তে তার মাথা সাত খন্ডে বিভক্ত হবে। বাল্মীকি জানিয়েছেন নলকুবেরের অগ্নিতুল্য শাপবচন উচ্চারিত হওয়া মাত্রই দেবদুন্দুভি বেজে ওঠে এবং আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হয়:

দেবদুন্দুভয়ো নেদুঃ পুষ্পবৃষ্টিশ্চ খাচ্চ্যুতা।

পিতামহমুখাশ্চৈব সর্বে দেবা: প্রহর্ষিতা:।।                      (বা. উত্তরকান্ড, ২৬।৫৭)

শঙ্করের পার্ষদ নন্দীশ্বরের মুখ ছিল বানরাকৃতি। রাবণের জয়যাত্রায় নন্দীশ্বর প্রতিস্পর্ধা জানালে সে উপহাসের পাত্র হয়। রাবণের কাছে বিদ্রূপ সহ্য করতে না-পেরে নন্দী রাবণকে শাপ দিলেন। বানররূপ দেখে অবজ্ঞা করবার জন্য রাবণ অভিশপ্ত হয়েছিলেন যে, বানরদের হাতেই তার দর্প চূর্ণ হবে। নন্দীর বাক্য শ্রবণে দেবদুন্দুভি বেজেছিল, শুরু হয়েছিল পুষ্পবৃষ্টি। রাবণের হাতে ধর্ষিতা বেদবতীর প্রজ্বলিত অগ্নিতে আত্মাহুতির কালে স্বর্গ থেকে চতুর্দিকে দিব্য পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল—‘পপাত চ দিবো দিব্যা পুষ্পবৃষ্টি: সমন্ততঃ’ (বা. উত্তরকান্ড ১৭।৩৫)। শোনা যায় বিভীষণ এক পায়ে পাঁচ হাজার বছর ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করায় পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল। আবার ইন্দ্রজিতের মৃত্যুতেও দুন্দুভিধ্বনির সঙ্গে পুষ্পবৃষ্টি সম্পন্ন হয়। ববর্ষু: পুষ্পবর্ষাণি তদদ্ভুতমিবাভবৎ (ওই যুদ্ধকান্ড, ৯০।৮৬)।

অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় কোনো বড়ো মাপের ঘটনা ঘটে গেলে, মহানকীর্তি স্থাপিত হলে কবিকল্পনায় আকাশ থেকে দেবতাদের আশীর্বাদ নেমে আসে পুষ্পবৃষ্টি হয়ে। কবিক্রতু প্রায়শই দেখিয়েছেন সেই সময় গন্ধর্ব, অপ্সরা দল বেঁধে নৃত্যানুষ্ঠানে মেতে ওঠেন। কাশীরাজের সামনে গাঙ্গেয় দেবব্রত-র ভয়ানক প্রতিজ্ঞাবচন উদগীত হওয়ার পর আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল ‘অভ্যবর্ষত কুসুমৈ:’। আবার ইচ্ছামৃত্যুর অধিকারী পিতামহ ভীষ্মদেব যখন পুরুষোত্তম কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে যোগবলে প্রাণত্যাগ করছিলেন এবং আত্মার উৎক্রান্তির সঙ্গে সঙ্গে যখন তার দিব্যদেহের শরগুলি দেহচ্যুত হচ্ছিল তখন স্বর্গ থেকে দেবতারা একযোগে পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। মহাভারত-এর বনপর্বে পাঠক দেখেছেন, তপস্যার জন্য কৃতনিশ্চয় অর্জুন যখন কণ্টকাকীর্ণ ভয়ংকর অরণ্যে প্রবেশ করেন তখন আকাশে শঙ্খধ্বনি এবং পৃথিবীতে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল ‘পুষ্পবর্ষঞ্চ সুমহন্নিপপাত মহীতলে’ (মহা. বন. ৩৪।১৭)। নরশ্রেষ্ঠ যযাতি স্বর্গচ্যুত হলেও দৌহিত্রদের অনুষ্ঠিত যজ্ঞ ও দানকর্মের গুণে পুনরায় স্বর্গে যখন প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তখন তার উপর পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল:

অভিবৃষ্টশ্চ বর্ষেণ নানাপুষ্পসুগন্ধিনা।

পরিষ্বক্তশ্চ পুণ্যেন বায়ুনা পুণ্যগন্ধিনা।।                    (মহা. উদ্যোগ. ১১৪।২)

কুরুপান্ডবের মধ্যে শান্তি স্থাপনে প্রয়াসী কৃষ্ণ দৌত্যকার্যে কৌরবসভায় এলে দুর্যোধন তাকে যখন বন্দী করবার সংকল্প নেন তখন সভায় তিনি যে অলৌকিক ও দিব্য রূপ প্রদর্শন করেছিলেন তা দেখে দেবদুন্দুভি বেজেছিল এবং সভার উপরে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল :

তদদৃষ্ট্বা মহদাশ্চর্য্যং মাধবস্য সভাতলে।

দেবদুন্দুভয়ো: নেদুঃ পুষ্পবর্ষং পপাত চ।।                    (মহা. উদ্যোগ, ১২২।২৪)

পরমর্ষি শুকদেবের জন্মের পরে তার উদ্দেশ্যে আকাশ থেকে দন্ড ও কৃষ্ণবর্ণ মৃগচর্ম পতিত হয়। সেই অদ্ভুত ঘটনা দেখে গন্ধর্বেরা গানে এবং অপ্সরার দল নৃত্যে মেতে ওঠেন। দেবতাদের দুন্দুভি বেজে ওঠে। চরাচর যখন আনন্দে উদবেলিত তখন বায়ুদেব দিব্যপুষ্প বর্ষণ করতে থাকেন:

অন্তরিক্ষাশ্চ কৌরব্য দন্ডঃ কৃষ্ণাজিনঞ্চ হ।।

পপাত ভূমিং রাজেন্দ্র শুকস্যার্থে মহাত্মনঃ।

জেগীয়ন্তে স্ম গন্ধর্বা ননৃতুশ্চাপ্সরোগণা:।।

দেবদুন্দুভয়শ্চৈব প্রাবাদ্যন্ত মহাস্বনা:।

… … … … … …

দিব্যানি সর্বপুষ্পাণি প্রববর্ষ চ মারুতঃ।।                        (মহা. শান্তি ৩২৪।১৫-১৭)

আবার পরমপদ প্রাপ্তির সময় শুকদেব যখন হিমালয় ও সুমেরুর শিখর লঙ্ঘন করছেন তখন দিব্য পুষ্পবর্ষণে চারদিক আচ্ছন্ন হয়েছিল ‘দিব্যৈ: পুষ্পৈ: সমাকীর্ণমন্তরীক্ষং সমন্ততঃ’ (মহা. শান্তি. ৩৩৩।১৫)।

পদ্মপুরাণ পাঠ করে জানা যায়, দুষ্ট দুরাত্মা হুন্ড সপ্তদ্বীপের অধিপতি আয়ু রাজার পুত্রকে অপহরণ করে হত্যার ছক কষেছিল। কিন্তু তার ইচ্ছাপূরণ হয়নি। পরিণামে পুষ্পবৃষ্টি হয়। ঘটনাটা ছিল এরকম—আয়ুর পুত্র অসামান্য রূপের অধিকারী ছিল। শিশু পুত্রকে দেখামাত্রই আদরের ইচ্ছে হলেও হুন্ড তাকে অপহরণ করে খুন করতে চাইল। এমনকি রাঁধুনিকে উত্তমরূপে রান্নার ব্যবস্থাও করতে বলা হয়। কিন্তু পাচক এবং সৈরিন্ধ�র কোমল হৃদয় এতে সায় দেয়নি। তারা শিশুটিকে বশিষ্ঠের পুণ্যাশ্রমের কুটিরদ্বারে ফেলে আসেন এবং একটি হরিণ মেরে হুন্ডকে পরিবেশন করেন। ধর্মাত্মা বশিষ্ঠ ধ্যাননেত্রে ঘটনার অনুপুঙ্খ জেনে শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নেন। পুরাণকার জানালেন, ঠিক তখনই শিশুর ওপর পুষ্পবৃষ্টি বর্ষিত হল:

কৃপয়া ব্রহ্মপুত্রস্তু সমুত্থায় সুবালকম।

করাভ্যামথ গৃহ্ণাতি যাবদ্বিজবরোত্তমঃ।।

তাবৎ পুষ্পসুবৃষ্টিঞ্চ চক্রুর্দেবা সুতোপরি।

ললিতং সুস্বরং গীতং জগুর্গন্ধর্বকিন্নরা:।।                         (প.পু. ভূমিখন্ড, ১০৫।৫৫,৫৬)

বশিষ্ঠ শিশুপুত্রের নাম রাখলেন নহুষ। শৈশবেই কেউ তাকে হুষিত বা পরাভব করতে পারেনি বলেই তার নাম রাখা হল নহুষ:

হুষিতো নৈব কেনাপি বালভাবৈর্নরাধিপ।

তস্মান্নহুষ তে নাম দেবপূজ্যো ভবিষ্যসি।।                        (ওই ৫৮, ৫৯)

পরবর্তীকালে নহুষ বড়ো হয়ে যখন হুন্ডবধে কৃতসংকল্প হলেন তখন দেবতারা সহর্ষে দুন্দুভির ধ্বনিতে তার মাথায় পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন:

আকাশে দেবতা: সর্বা জঘ্নুর্বৈ দুন্দুভীন্মুদা।

পুষ্পবৃষ্টিং প্রচক্রুস্তে নহুষস্য চ মূর্দ্ধনি।।                            (ওই ১১০।৩,৪)

স্কন্দপুরাণ পাঠ করে জানা যায়, মহেশ্বর ভবানীকে খুশি করতে যখন নৃত্য আরম্ভ করেছিলেন তখন ব্রহ্মা মৃদঙ্গ বাজাচ্ছিলেন। সমবেত দেববৃন্দের উপস্থিতিতে সেই মনোজ্ঞ নৃত্যানুষ্ঠানে কিন্নরগণ পুষ্পবর্ষণে দর্শকবৃন্দ ও ঋষিমন্ডলীকে আনন্দ বিতরণ করেছিল। দীর্ঘ চার মাস ব্যাপী নৃত্যানুষ্ঠানটি চলেছিল:

কিন্নরা: পুষ্পবর্ষাণি সসৃজু: স্বৈর্গুণৈরিহ।

এবং চতুর্ষু মাসেসু যদা নৃত্যমজায়ত।                            (স্ক.পু. নাগরখন্ডম, ২৫৪।৩৫,৩৬)

তারকাসুরের উপদ্রবে দেবতারা ত্রস্ত হয়ে পড়েন। দেবদেব শঙ্করকে স্তুতিবন্দনায় প্রণাম নিবেদন করে যখন জাহ্নবীর তীরে কুমার কার্তিককে সৈনাপত্যে দেবতারা বরণ করলেন তখনও দেববাদ্য ধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল ‘সস্বনুর্দেববাদ্যানি পুষ্পবর্ষং পপাত হ’ (স্ক. পু. নাগরখন্ডম, ২৬৪।৬)। ভয়ংকর যুদ্ধের শেষে তারকাসুর নিহত হলে কুমারের বিক্রমে দেবতারা যারপরনাই আহ্লাদিত হলেন। দেবদুন্দুভি বেজে উঠল এবং পুষ্পবৃষ্টি হল ‘দেবদুন্দুভয়ো: নেদুঃ পুষ্পবৃষ্টিস্তথাভবৎ’ (ওই ২৪৬।১৬)।

মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে আরো অনেক অসুরদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল দেবীকে। আক্রমণ প্রতিআক্রমণে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। একশো বছরের যুদ্ধে প্রথমদিকে যারা পরাজয় বরণ করেছিল তারা হল চামর, উদগ্র, মহাহনু, অসিলোমা, বাস্কল, বিড়ালাক্ষ প্রমুখ। এদের পরাজয়েই দেবতারা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। অপারগ দেবতারা দেবীকে উজ্জীবিত করতে থাকেন। পৃথিবীতে নতুন অধ্যায়ের শুভারম্ভের আর বিলম্ব যে নেই তা দেবতাদের মানসনেত্রের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেতে থাকে ‘তুতুর্ষুর্দেবা:’। শুরু হয় পুষ্পবৃষ্টি ‘পুষ্পবৃষ্টিমুচো দিবি’ (মা. পু. ৮২।৬৯)।

অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত-এ পাই, পুষ্পকেতু যখন সপরিবারে পরাজিত হয়ে বুদ্ধের কাছ থেকে পালাতে বাধ্য হল তখন সেখানে জলকণাপূর্ণ সুগন্ধি পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল:

দ্রবতি সপরপক্ষে নির্জিতে পুষ্পকেতৌ জয়তি জিততমস্কে নীরজস্কে মহর্ষৌ।

যুবতিরিব সহাসা দ্যৌশ্চকাসে সচন্দ্রা সুরভি চ জলগর্ভং পুষ্পবর্ষং পপাত।।                              (বু.চ. ১৩।৭২)

দুর্দমনীয় অন্ধকারলোকের অধিপতির পরাজয়ে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নির্মল আকাশ থেকে অবিশ্রাম ধারায় পুষ্পবৃষ্টি ঝরে পড়ে ‘দিবো নিপেতুর্ভুবি পুষ্পবৃষ্টয়ো ররাজ যোষেব বিকল্মষা নিশা’ (বু.চ. ১৩।৭৩)। অধ্যাপক E.B. Cowell বুদ্ধচরিত-এর অনুবাদে শুনিয়েছেন: When the wicked one thus fled vanquished, the different regions of the sky grew clear, the moon shone forth, showers of flowers fell down from the sky upon the earth, and the night gleamed out like a spotless maiden.

রঘুবংশম মহাকাব্যের দ্বিতীয় এবং ষোড়শ সর্গে পাঠক পুষ্পবৃষ্টি পেয়েছেন। কামধেনু নন্দিনীর পরিচর্যায় নিযুক্ত মহারাজ দিলীপ যখন সিংহের কবল থেকে গুরুদেবের গোরূপ (কামধেনু) সম্পত্তিও নষ্ট হতে দেননি এবং তার রক্ষার জন্য ক্ষাত্রধর্ম স্মরণ করে পাঞ্চভৌতিক শরীরটার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে নিজেকে মাংসপিন্ডের ন্যায় নিবেদন করলেন তখনই মন্ত্রাদিবিদ্যায় পারদর্শী বিদ্যাধরেরা পুষ্পবর্ষণ করেছিল:

তস্মিন ক্ষণে পালয়িতু: প্রজানামুৎপশ্যতঃ সিংহনিপাতমুগ্রম।

অবাঙমুখস্যোপরি পুষ্পবৃষ্টি: পপাত বিদ্যাধরহস্তমুক্তা।।                           (রঘু. ২।৬০)

বিদ্যাধরেরা ছিলেন দশ রকম demigod এর অন্যতম:

বিদ্যাধরোহপ্সরো-যক্ষ-রক্ষো-গন্ধর্ব-কিন্নরা:।

পিশাচো গুহ্যকঃ সিদ্ধো ভূতোহমী দেবযোনয়ঃ।।                                   (অমর.)।

এই মহাকাব্যেরই ষোড়শ সর্গে কবি পুনরায় পুষ্পবৃষ্টি এনেছেন। রামতনয় কুশ একবার গ্রীষ্মকালে সরযূর জলে জলকেলিতে মেতে ওঠেন। স্নান শেষে তাঁবুতে পরিধেয় পরিবর্তনের সময় তিনি লক্ষ করেন পিতৃপ্রদত্ত জয়াবহ অলংকার (জৈত্রাভরণ) যেটি অগস্ত্যমুনি রামচন্দ্রকে দিয়েছিলেন তা অসাবধানতাবশত হারিয়েছেন। দিব্যবলয়বিরহিত কুশ যারপরনাই ক্ষুব্ধ হলেন। ভালো সাঁতার জানা জেলেদের ডাক পড়ল। কিন্তু সরযূনদী আলোড়িত করে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও দিব্যবলয় পাওয়া যায়নি। তবে জেলেদের মুখ থেকে সরযূনিবাসী কুমুদনাগের খবর পেয়ে কুশ গারুড়অস্ত্র গ্রহণ করতেই সমস্যার সমাধান হয়েছিল। ভুজঙ্গরাজ কুমুদ তার কনিষ্ঠা ভগিনী কুমুদ্বতীকে নিয়ে কুশের কাছে উপস্থিত হয়ে দিব্যবলয় প্রাপ্তির বিবরণ দেন এবং সেটি যথোচিত মর্যাদায় প্রত্যর্পণ করেন। কেবল দিব্যবলয়ই নয়, কুশ-কুমুদ্বতীর মিলনে দিগন্ত ব্যাপ্ত করে দিব্য তূর্যধ্বনি হল এবং তারপর আশ্চর্য মেঘসমূহ সুগন্ধি পুষ্পবৃষ্টি করতে থাকল:

তস্যা: স্পৃষ্টে মনুজপতিনা সাহচর্যায় হস্তে মাঙ্গল্যোর্ণাবলয়িনি পুরঃ পাবকস্যোচ্ছিখস্য।

দিব্যস্তূর্যধ্বনিরুদচরদব্যশ্নুবানো দিগন্তান গন্ধোদগ্রং তদনু ববৃষু: পুষ্পমাশ্চর্যমেঘা:।।                            (রঘু. ১৬।৮৭)

কবি কালিদাস বিরহী যক্ষের মুখ দিয়ে মেঘকে বলেছিলেন, দেবগিরিবাসী কার্তিককে আকাশগঙ্গার জলে সিক্ত পুষ্পবৃষ্টি দ্বারা স্নান করাতে ‘পুষ্পাসারৈ: স্নপয়তু ভবান ব্যোমগঙ্গাজলাদ্রৈ:’ (মেঘ. পূর্বমেঘ, ৪৪)।

নাট্যকার ভবভূতি তাঁর উত্তররামচরিত-এর সপ্তম অঙ্কে আনন্দের বাতাবরণ সৃষ্টির অভিপ্রায়ে পুষ্পবৃষ্টির আশ্রয় নিয়েছেন। লক্ষ্মণ জানিয়েছেন, আর্যা অরুন্ধতী প্রজাদের তিরস্কার করেছেন, সমস্ত প্রাণীবর্গ সীতাকে নমস্কার করছে এবং ইন্দ্রাদি দিকপালেরা ও মারীচাদি সপ্তর্ষি পুষ্পবৃষ্টির দ্বারা সীতার অর্চনা করছেন, ‘লক্ষ্মণঃ—আর্য এবমার্যয়ারুন্ধত্যা নির্ভৎসিতা: প্রজা:, কৃৎস্নশ্চ ভূতগ্রাম আর্যাং নমস্করোতি। লোকপালাশ্চ সপ্তর্ষয়শ্চ পুষ্পবৃষ্টিভিরুপতিষ্ঠন্তে’ (উ.রা. ৭ম অঙ্ক)।

শতকের পর শতকের ব্যবধানেও পুষ্পবৃষ্টি বন্ধ হয়নি। রাবণবধ মহাকাব্যের দ্বিতীয় সর্গে ভট্টি পুষ্পবৃষ্টি এনেছেন মারীচ বধের অব্যবহিত পরে। স্বাভাবিকভাবে যজ্ঞবিঘ্নকারীদের দলপতি মারীচের নিধনে ব্রাহ্মণেরা প্রসন্নতা গোপন রাখেননি। তাদের চোখে-মুখে ভাবে-ভঙ্গিমায় তা অভিব্যক্ত হয়েছিল। সংঘবদ্ধ ব্রাহ্মণদের তৃপ্তিতে বিহ্বল কবি পুষ্পবৃষ্টি না-নামিয়ে পারেননি। স্বর্গলোক থেকে অঝোর ধারায় নেমে এল পুষ্পবৃষ্টি। কবি বলেছেন ‘জগ্মু: প্রসাদং দ্বিজমানসানি দ্যৌর্বর্ষুকা পুষ্পচয়ং বভূব’ (ভ.কা. ২।৩৭)। পুষ্পবৃষ্টিতে মেঘ আবশ্যক নয়। এ বৃষ্টি বিশেষ শ্রেণীর প্রীতির জন্য, কল্পিত শুভ ঘটনার ইঙ্গিতবাহী। জয়মঙ্গলা টীকায় বলা হয়েছে ‘দ্যৌ: পুষ্পচয়ং বর্ষুকা বর্ষণশীলা বভূব ভবতি স্ম’ (ওই)।

আলোচনার উদ্দেশ্য হল, বহুসংখ্যক মানুষের ধারণা পুষ্পবৃষ্টি হয়তো স্বর্গ থেকে নেমে আসে মঙ্গলের বার্তা বহন করে। পাঠককে বুঝতে হবে পুষ্পবৃষ্টির উদ্ভাবক মানুষ। বৃষ্টির আকারে অগণিত ফুল বা ফুলের পাপড়ি ওপর থেকে ছড়িয়ে দিলেই পুষ্পবৃষ্টি নান্দীর ভূমিকা নেয়। ইটবৃষ্টি করে যেমন যুযুধান দু-দল ক্ষোভ বা অসন্তোষ প্রকাশ করেন তেমন বিপরীতভাবে পুষ্পবৃষ্টি করে শান্তিকামী মানুষ ভাবী মঙ্গলের সূচনা করেন। মানুষই ঠিক করে অমা-উমার মধ্যে কোনটি গ্রাহ্য এবং কোনটি ত্যাজ্য। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ প্রস্ফুটিত কুসুমকেই জীবনের চলার পথে বিকীর্ণ করতে চান। অতিলৌকিক কথাকাহিনির মোড়কে প্রাচীনভারতের কবিসাহিত্যিকগণ পুষ্পবৃষ্টির নেপথ্যে এই তত্ত্বই ঘোষণা করেছেন।

শব্দসংকেত :

অমর:

অমরকোষ

উ.রা.:

উত্তররামচরিত

প.পু.:

পদ্মপুরাণ

ভ.কা.:

ভট্টিকাব্য

মহা.উদ্যোগ:

মহাভারত, উদ্যোগপর্ব

বন.:

বনপর্ব

শান্তি:

শান্তিপর্ব

মা.পু.:

মার্কন্ডেয়পুরাণ

রঘু.:

রঘুবংশ

বা.:

বাল্মীকিরামায়ণ

বু.চ.:

বুদ্ধচরিত

স্ক.পু.:

স্কন্দপুরাণ

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%