ভঙ্গাস্বন

অমিত ভট্টাচার্য

ঋজু, সুঠাম দেহের অধিকারী রাজা ভঙ্গাস্বন। অগাধ সম্পত্তি। ভোগের উপকরণের কোনো অভাব না-থাকলেও মনটি সর্বদাই দুঃখে ভারাক্রান্ত। কারণ রাজা সন্তানহীন। তাই রাজকার্য পরিচালনার ফাঁকে দু-দন্ড ফুরসত পেলেই মনে তুমুল আলোড়ন ওঠে। কাজের চাপ হালকা হলেই তিনি সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। ভঙ্গাস্বনের মনে হয় তিনি রাজা ছাড়াও একজন পুরুষ, একজন স্বামী। রাজা হিসেবে কোনো নিন্দামন্দ না-শুনলেও অন্য দুটিকে উপজীব্য করে চাপা কানাকানি, ফিসফাস তাকে আহত করে।

অপুত্রক পুরুষব্যাঘ্র ভঙ্গাস্বন তীব্র মানসিক যন্ত্রণার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের আশায় অগ্নিষ্টুত যজ্ঞের আয়োজন করলেন। যথাবিধি যজ্ঞকার্য সম্পন্ন হওয়ায় রাজা চিন্তামুক্ত হলেন। যথাকালে ভঙ্গাস্বন শত পুত্রের পিতাও হলেন। রাজা আহ্লাদে আটখানা। আর রাজকার্য চালানোর মাঝে-মাঝেই অন্যমনস্ক হতে হবে না, নিজের ওপর কোনো রাগ, অভিমান বা ধিক্কারও আসবে না। রাজা ভাবলেন এতজন রাজপুত্রের উপস্থিতিতে অনাগত বিপদের আশঙ্কায় কখনই উদবিগ্ন হতে হবে না। আসলে সিংহাসনের চারপাশে কোষবদ্ধ অসি হাতে শতপুত্র দাঁড়ালে ভবিষ্যতের কোনো আতঙ্কই থাকবার কথা নয়। ভেতরে ভেতরে উজ্জীবিত রাজা দর্পণে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে থাকেন। মনে মনে বলেন ‘মধু বাতা ঋতায়তে, মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ’।

সমাপ্তযজ্ঞ রাজা ভঙ্গাস্বন ইপ্সিত ফললাভে মনের সুখ গোপন রাখেননি। অঢেল দানধ্যান করেছেন। পাঠক মনে করতেই পারেন যে, সুখের আতিশয্যে রাজা যথাসাধ্য জলদান, ভূমিদান, শয্যাদান, অন্নদান, সুবর্ণদান, সবৎস গোদান সবই সম্পন্ন করেছেন। রাজ্যের যত গুণবান সবাই ধন্য ধন্য রব তুলেছেন। বিপদ-সম্ভাবনাহীন নিরুপদ্রব ভবিষ্যৎ কার-না পছন্দ। রাজকার্য পরিচালনার পাশাপাশি রাজা সংসারে আসক্ত হয়ে পড়লেন।

এদিকে স্বর্গলোকে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র ভঙ্গাস্বনের ওপর বেজায় চটেছেন। ইন্দ্রের চটে যাবার কারণটি কিন্তু একেবারেই লৌকিক। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতনই দেবতারাও নিজের স্তুতি শুনতে ভালোবাসেন বলেই ইন্দ্র দেবতাদের অধিপতি হয়েও রিপুর বশীভূত হয়ে পড়লেন। আশয় হল, অগ্নিষ্টুত যজ্ঞে ইন্দ্রের কোনো প্রাধান্যই ছিল না। রাজা হবার সুবাদে ইন্দ্রের যে শ্লাঘা সেখানে ভঙ্গাস্বন স্বেচ্ছাকৃত আঘাত করেছেন বলে অভিযুক্ত হলেন। মর্ত্যের রাজা ভঙ্গাস্বনকে জব্দ করতে দেবতাদের রাজা উঠে পড়ে লাগলেন। ভঙ্গাস্বনের ছিদ্রান্বেষণে ইন্দ্রের ছিল যুদ্ধকালীন তৎপরতা।

প্রতীক্ষিত সুযোগ ইন্দ্র পেয়ে গেলেন। যজ্ঞে প্রাপ্য মর্যাদা না-পেয়ে ইন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে আধবোজা চোখে যে অপেক্ষারত ছিলেন তা ভঙ্গাস্বনকে কড়ায়-গন্ডায় বুঝিয়ে ছাড়বেন বলে স্থির করলেন। দেবরাজ হবার সুবাদে ইন্দ্রেরও হয়তো অবেচতন মনে এরকম বোধ হয়েছিল যে, কোনো ব্যক্তিবিশেষ স্তুতি না-করলেই মাথা গরম করাটা সমীচীন নয়। কারণ একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত সমস্যা দূরীকরণে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেই যে সকল ঊর্ধতনকে সমান মর্যাদা দেবেন—এরকম কোনো জবরদস্তি ঠিক নয়। এটা সম্পূর্ণই ব্যক্তির নিজস্ব অভিরুচি। এই ঘটনায় ক্রোধী বা অভিমানী হওয়াটা নিজের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র কুলের পদমর্যাদাকেও নষ্ট করে। কিন্তু চেতন মনে ইন্দ্র বিপরীত আচরণেই নজর দিলেন। কোনো রকম দোনামনা না-করে ঠাণ্ডা মাথায় ভঙ্গাস্বনকে জব্দের জন্য কার্যসিদ্ধির ত্রুটি রাখলেন না।

এদিকে নিরন্তর প্রজাদের অভাব-অভিযোগ শোনা, আর তা যথাশক্তি দূর করা এবং অন্তঃপুরে যজ্ঞলব্ধ শতপুত্রের সঙ্গে বিনোদনের গতানুগতিক দিনপঞ্জিতে রাজা ভঙ্গাস্বন হাঁফিয়ে উঠলেন। একঘেয়েমির হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে তিনি চললেন মৃগয়ায়। মায়াবী ইন্দ্র রাজাকে ছায়ার মতন অনুসরণ করলেন। তাঁর সুবিস্তৃত জালে ভঙ্গাস্বন হলেন মোহগ্রস্ত। মৃগয়ানিপুণ হওয়া সত্ত্বেও অশ্বারোহী রাজা দিগভ্রান্ত হলেন। পরিশ্রম ও তৃষ্ণায় ব্যাকুল হয়ে রাজা নিজেকে অসহায় অনুভব করলেন। কোথায় মৃগয়া শেষে সসম্মানে রাজ্যে ফিরবেন, তা না বনের বিষয়ে নিখুঁত পথজ্ঞানের অধিকারীও আজ চরম অস্বস্তিতে। ভয়ংকরের কল্পনায় মৃগয়াব্যসনী অশ্রুসিক্ত।

পিপাসার্ত ভঙ্গাস্বন হঠাৎই সামনে পেলেন এক স্বচ্ছ সরোবর। নিজের অপেক্ষাও অধিকতর ক্লান্ত অশ্বের প্রতি তার প্রথম নজর গেল। সাদরে অশ্বটির গলায় দু-হাত বুলিয়ে ভঙ্গাস্বন সেটিকে স্নান করালেন। দীর্ঘক্ষণ বাদে জলপান করে অশ্বটিও যেন তার তৃপ্তি গোপন রাখেনি। মাথা দুলিয়ে, লেজ নাড়িয়ে সেই তৃপ্তির বহি:প্রকাশ ভঙ্গাস্বনের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।

সরোবরের পাড়ে বৃক্ষের সঙ্গে অশ্বটিকে বেঁধে রাজা নিজে স্নানে নামলেন। সারা শরীরের ক্লান্তি যেন দূর হল। স্নান করতে করতেই রাজা স্থির করলেন এরপর নতুন উদ্যমে পথ খোঁজা শুরু করবেন। মনে মনে চতুর হাসিটি ইন্দ্র হেসে নিলেন। ইন্দ্রজালের প্রভাবে রাজা রূপান্তরিত হলেন স্ত্রীরূপে। পুরুষের জীবনে এর চেয়ে বেশি বিপদ আর কী হতে পারে—এসব ভেবে স্নান থেকে উঠে লজ্জায় সংকোচে ভঙ্গাস্বন নতুন সমস্যায় জর্জরিত হলেন, যার সমাধান সম্পূর্ণ আয়ত্তের বাইরে। অন্তরের গভীরে উথালপাথাল অবস্থা, ভঙ্গাস্বন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে। যজ্ঞানুষ্ঠানের পর শতপুত্রের অধিকারী হয়েও সম্পূর্ণ উটকো এক সীমাহীন বিপন্নতায় ভঙ্গাস্বন আচ্ছন্ন হলেন, যেখান থেকে তাকে উদ্ধারের ক্ষমতা কারুর নেই। নির্মল, নিরাপদ রাজজীবন শেষ। ভঙ্গাস্বনের খুব চিৎকার করে দাপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল নিশ্চয়ই।

রাজ্যের বিস্মৃত পথ ভঙ্গাস্বনের মনে পড়ে গেল। দীর্ঘ বনপথ অতিক্রম করে রাজমার্গের ঠিক প্রবেশদ্বারে তিনি অন্তরের অন্তরে দুর্বলতা অনুভব করলেন। একবুক সংশয় ভঙ্গাস্বনকে যেন চেপে ধরে। রানি, প্রজা, অমাত্য, সন্তান সকলেই এত কাছের জন কেমন করে এক লহমায়, কত দূরে চলে গেলেন। ভঙ্গাস্বনের চেহারার কঠোরতা, বৃষস্কন্ধ কোথায় মিলিয়ে গেছে। আজ তার স্বভাব মৃদু প্রকৃতির, চাহনিতে ব্যাকুলতা।

ছেলেবেলায় রাজা ভঙ্গাস্বন ‘ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি’ বহুবার পড়েছেন। কিন্তু নিজের অন্তরে সেই পঙক্তির সত্যতা উপলব্ধি করলেও রানি, প্রজা, অমাত্য, সন্তানরা তো তা বুঝবে না। বাইরের প্রকাশটিই মানুষ গ্রহণ করে থাকে। হলও তাই। স্ত্রীরূপী একজনকে অশ্বপৃষ্ঠে রাজ্যে প্রবেশ করতে দেখে যথাস্থানে বার্তা পৌঁছে গেল। প্রত্যেকেই বিস্মিত, হতচকিত। ভঙ্গাস্বন সত্য গোপন না-করে অকপটে সমস্ত ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিলেন সকলের সামনে। সকলকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন যে, দৈব দুর্বিপাকেই তার এই মর্মান্তিক পরিণতি। রাজপুত্ররা সাবালক হওয়া পর্যন্ত অভিজ্ঞ অমাত্যরা যেন রানির পরামর্শ মতোই রাজকার্য পরিচালনা করেন এবং যথাকালে রাজপুত্রদের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। স্ত্রীরূপী রাজা চিরকালের জন্য বনগমনের অভিলাষে কৃতসংকল্প হলেন। রাজা ভঙ্গাস্বন এখন অতীত।

রাজ্য ছেড়ে বহুপথ পার হয়ে নিষ্পাপ স্ত্রী চলে এলেন এক আশ্রমে। আশ্রয় জুটেছিল ঘর থেকে বাইরে, আবার বাইরে থেকে ঘরে। শান্ত আশ্রম পটে আঁকা ছবিটির মতন। চারদিকে পূজার উপকরণ, গোময়ে নিকানো মেঝে, হোমাগ্নিপ্রজ্বালন সামগ্রী, কলাপাতায় নানান রকমের ফল-ফুল, কমন্ডলু, ঘড়া-ভরা জল। এসব নিয়েই সেই আশ্রমে বাস করতেন এক তাপস। দিন যায়, মাস যায়। আশ্রমের কাজে নিজেকে মানিয়ে নেয় রূপান্তরিত নারী শরীর। আশ্রমের কাজ করতে করতেই নয়নকোণে পুষ্পধনু বাঁকিয়ে ফেলেন কোনো এক সময়। আশ্রিতার অর্থপূর্ণ চাহনি তাপসকে নিরন্তর বিদ্ধ করতে থাকে। মদনবাণে তাপস সন্তপ্ত হলেন। আশ্রমেও তাপস-সম্ভোগে শতপুত্রের জননী হলেন সেই নারী। তপোবনে তখন উদগীত হচ্ছে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা’।

তপোবনে শতপুত্রের খাওয়া-পরা, বেড়ে ওঠা প্রভৃতি অসুবিধাজনক বিবেচনা করে সেই নারী তাপসকে তার বর্তমান রূপের নেপথ্য কাহিনি শোনালেন। শুচিস্মিতা নারীর সত্যভাষণে তাপস নিজেকে রোমাঞ্চিত অনুভব করলেন। নারী নিজে অবগুন্ঠনবতী হয়েও সত্যকে অকপটে অনাবৃত করবার গুণে তাপস স্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। অবশেষে তাপসের অনুমতি নিয়ে নিজের হাতে গড়া রাজ্যে আগের রানির কাছে শতপুত্রের সঙ্গে তাপসের শতপুত্রকেও দেখভালের দায়িত্ব অর্পণ করলেন। রানি জানালেন, পুরুষরূপী রাজা ভঙ্গাস্বনের শতপুত্র এবং স্ত্রীরূপিণীর শতপুত্র ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বদ্ধ। ভঙ্গাস্বনের রাজ্যে সাকুল্যে দুশো পুত্র একে অপরকে ঈর্ষা না-করে, ঘৃণা না-করে বড়ো হতে লাগল।

ইন্দ্র গেলেন বেজায় চটে। ভঙ্গাস্বনের ক্ষতি করবার পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে দেখে ইন্দ্র অধীর হয়ে পড়লেন। তিনি ভেবেছিলেন, ভঙ্গাস্বন নারীর অবয়ব লাভ করে বাকি জীবনটুকু বোধহয় বরাবরের জন্য যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েই থাকবেন। অথচ তা তো হলই না। উপরন্তু প্রথম জীবনে গর্ভাধান এবং দ্বিতীয় জীবনে গর্ভধারণের মতন মনুষ্যজীবনের আকাঙ্ক্ষিত কাজগুলি কেমন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করে ফেললেন। মানুষের জয়ে (পুরুষ ও নারী ভেদে দুই রূপেই) দেবরাজ পাগলপ্রায় হলেন। ‘উপকারেহস্য রাজর্ষে: কৃতো নাপকৃতং ময়া’ (মহা. অনু. পর্ব ১২। ২৭)। তাঁর অস্থিরতা তাঁকে অধিকতর কুটিল করে তুলল। নিজের অপচিকীর্ষায় ভরা অন্তর বিপরীত ফল প্রসব করায় সক্রোধে ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশে পৃথিবীতে নামলেন।

ইন্দ্রের গন্তব্য ভঙ্গাস্বনের রাজ্য। তাঁর সংকল্প হল দুরন্তগতিতে বেড়ে ওঠা রাজকুমারদের অন্তরে পারস্পরিক বিভেদের বীজবপন।

ততো ব্রাহ্মণরূপেণ দেবরাজঃ শতক্রতু:।

ভেদয়ামাস তান গত্বা নগরং বৈ নৃপাত্মজান।।                         (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ২৮)

ব্রাহ্মণরূপী ইন্দ্র কুমারদের অজ্ঞানতা ও সারল্যের সুযোগে তাদের সামনে বসিয়ে অধ্যাপনা শুরু করে দিলেন। যেন-তেন প্রকারেণ ভঙ্গাস্বনকে বোঝাতেই হবে ইন্দ্রের মহিমা। এর জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি কুমারদের মগজধোলাই। কারণ বিভেদের বীজ কচি-কাচাদের মধ্যে সঠিকভাবে উপ্ত হলে কুমারদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার ব্যর্থ হবে এবং বিভেদ-দানবই একে অপরকে ধ্বংস করবে। এর দরুন সব থেকে যে লোকটা শাস্তি পাবে তার নাম ভঙ্গাস্বন বৈ কি।

ইন্দ্র বললেন দেখো বাপু, দেবতা ও দানব সকলেই কিন্তু ভাই-ভাই। এদের স্বতন্ত্র গোষ্ঠীতে বিভক্ত করলেও আদপে এঁরা একই পিতার পুত্র। এঁদের মা কেবল আলাদা। দেবতা ও দানবদের পিতা একজন হলেও উভয়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কোনোকালেই ছিল না। পিতা কশ্যপ বড়ো অসহায়। রাজ্যের জন্য পুত্রদের বিরোধ লেগেই থাকত। দেবাসুরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম তোমরা বইতেই পড়েছ। সুতরাং, একই পিতার পুত্ররাই গলায় গলায় ভাব-ভালোবাসা নিয়ে থাকতে পছন্দ করে না।

ভ্রাতৃণাং নাস্তি সৌভ্রাত্রং যেষ্বেকস্য পিতু: সুতা:।

রাজ্যহেতোর্বিবাদিতা: কশ্যপস্য সুরাসুরা:।।                        (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ২৯)

আর তোমাদের কথা ভাবলে তো বিনিদ্র রজনী অবধারিত। এই যে সামনে উপবিষ্ট দুশো ভাই, তোমরা একই সঙ্গে বড়ো হচ্ছো, তোমাদের তো পিতাই আলাদা, ভিন্ন ভিন্ন। ডানদিকে উপবিষ্ট একশো কুমারের পিতার নাম ভঙ্গাস্বন। আবার বামদিকে উপবিষ্ট একশো কুমারের পিতা হলেন একজন তাপস। তোমাদের দেখেও কষ্ট হচ্ছে। এক পিতার পুত্রদের মধ্যেই নানা পারিবারিক ঝামেলা যেখানে অবধারিত সেখানে ভিন্ন পিতার পুত্রদের মিলমিশ থাকে কীভাবে! তোমাদের ভবিষ্যৎ ভয়ংকর নিরাপত্তাহীন। উপবিষ্ট কুমারদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু হল। অতজনের একসঙ্গে ফিসফাসে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে যেন কোলাহল হচ্ছে মনে হল। বরাবর প্রবৃত্তির অন্ধকারে যিনি ডুবে থেকেছেন তিনি অন্যদেরও প্রবৃত্তির জালে জড়িয়ে দিতে পারছেন দেখে ভেতরে ভেতরে তৃপ্ত হলেন। ভঙ্গাস্বনের পুত্রদের উদ্দেশ্য করে ব্রাহ্মণ বললেন—তোমাদের পিতার রাজ্য অন্য লোকের পুত্রেরা (তাপস-পুত্ররা) ভোগ করছে। দিন এসেছে, উপলব্ধি করতে হবে যে তোমরা এবং ওরা ভিন্ন। তোমরাও আলাদা, ওরাও আলাদা। অন্য লোকের পুত্রদের সঙ্গে ওঠাবসা, খেলাধুলা, খাওয়া-পরা করলেও ভবিষ্যতে তারাই যে অধিকতর শক্তিশালী হয়ে আক্রমণ করবে না—তার বিষয়ে কে হলফ করে বলতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন লোকের পুত্ররা এখন থেকে সতর্ক না-হলে সমূহ বিপদ ধেয়ে আসবে।

ব্রাহ্মণকে আর বেশিক্ষণ বক্তৃতা করতে হয়নি। নরম মাটিতে বিভেদের বীজ অঙ্কুরিত হতে সময় লাগল না বললেই চলে। শুরু হয়ে গেল ‘আমরা’ ও ‘তোমরা’ বয়ম, যূয়ম। আমাদের, তোমাদের থেকে ঠেলাঠেলি, ধ্বস্তাধ্বস্তি, সংঘর্ষ। একে অন্যের জুলপি ধরে টানা, হাতের মুঠোয় অনেকেরই অন্যের মাথার উঠে আসা চুল, চারিদিকে হা-হা ধ্বনি। ব্রাহ্মণ অদৃশ্য থেকে তৃপ্ত হলেন যখন শোনা গেল অনেকেই একত্রিত হয়ে অনেককে পিতা তুলে গাল দিতে দিতে মারমুখী হচ্ছে ‘ইন্দ্রেণ ভেদিতাস্তে তু যুদ্ধেহন্যোন্যমপাতয়ন’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৩১)। ঐন্দ্রজালিকের মতো ব্রাহ্মণরূপী ইন্দ্রের মায়াজালে হিংসার তীব্রতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেল। সকলের অন্তিম কাল স্বচক্ষে না-দেখে ইন্দ্র নিবৃত্ত হলেন না।

ভঙ্গাস্বনের রাজ্য থেকে কুমারদের বিনাশ-বার্তা তাপসীর (রূপান্তরিত ভঙ্গাস্বন) কাছে উল্কাগতিতে ছুটে এল। বিদ্বেষের বিষে আচ্ছন্ন হয়ে কুমারেরা দুটো দলে ভাগ হয়ে কীভাবে একে অপরকে হত্যা করল—তা ভেবে তাপসী কুলকিনারা পেল না। উপযুক্ত সময় বিবেচনা করে অঝোরধারায় ক্রন্দনরতা তাপসীর সামনে ব্রাহ্মণ ইষ্টসিদ্ধির অভিপ্রায়ে হাজির হলেন এবং জানতে চাইলেন তাপসীর এই বাধভাঙা কান্নার কারণ কী ‘কেন দুঃখেন সন্তপ্তা রোদিষি ত্বং বরাননে’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৩৩)?

শোকার্ত তাপসী তার জীবনের অনুপুঙ্খ বিবরণ দিলেন ব্রাহ্মণকে। পূর্বের রাজজীবন, শতপুত্রের পিªতত্ব, মৃগয়া, পথভ্রম, ক্লান্তি, অবগাহন, রূপান্তর, মনের বেদনা, তাপসের আশ্রমে আগমন, তাপসের দৃষ্টিসুখ, পাণিগ্রহণ, বিবাহ এবং সর্বোপরি বিবাহোত্তরজীবনে পুনরায় গর্ভধারণ ও শতপুত্রের মাতৃত্ব। নিজের জীবনটাকে তাপসীর চলমান চিত্রশালা বলে ভাবতে ইচ্ছে করছে। এক পুত্রই পুন্নামক নরক থেকে উদ্ধারকারী হয়—একথা শাস্ত্রেই বলা আছে। সেখানে প্রথম রূপে শত পুত্র, আবার দ্বিতীয় রূপেও শত পুত্র—এ কী কম আনন্দের কথা ছিল। প্রত্যেকের সুখ-শান্তির জন্য তাঁর যে চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না তাও শোকার্ত তাপসী বিবৃত করলেন। ব্রাহ্মণের সামনে সন্তানদের মধ্যে হিংসা, প্রতিহিংসার জন্ম কীভাবে এল, কীভাবেই তা এরকম উগ্র রূপ ধারণ করল—তা উপলব্ধির ক্ষমতা তাপসীর নেই। ব্রাহ্মণরূপী ইন্দ্র ভাবলেন, তাপসীর জীবনের সমস্ত কষ্টের জন্য দায়ী একমাত্র তিনি নিজে। নিজের স্তুতি যথাযথভাবে হয়নি বিবেচনা করেই তো একটা মানুষের সমগ্র জীবন নয়-ছয় করেছেন তিনি। সরল আত্মপ্রত্যয়ী ভঙ্গাস্বন ও তাপসী সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে যখনই নতুনভাবে জীবন গঠনে প্রয়াসী হয়েছে এবং তাতে সফল হয়েছে তখনই তিনি তার ভেতরের নীচতা দিয়ে সমস্ত সংকল্প ছারখার করেছেন। যজ্ঞে নিজের আবাহন সঠিক পন্থায় হয়নি—এই অজুহাতে একজনের সুখ-স্বপ্ন চুরমার করে বিকট রূপটি প্রকাশিত না-করলেই কি শোভন হত না!

ব্রাহ্মণ আত্মপ্রকাশ করলেন। ‘ইন্দ্রোহহমস্মি’। তুমি আমায় দুঃখ দিয়েছিলে। সেই দুঃখদানের ফল আজ তোমার ফলেছে। নিজের প্রশংসায় কে না সুখী হয়? কিন্তু তুমি আমার স্তুতি না-করায় অন্তরের ক্ষোভ থেকেই সেই জ্বালা মেটানোর জন্য তোমার সর্বনাশ করেছি ‘বৈরং তে পাতিতং ময়া’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪০)। এখন আমি তৃপ্ত। প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করে আমি বেজায় খুশি।

স্ত্রীরূপধারী ভঙ্গাস্বন ভাবতে থাকেন দেবতারাও মানুষের মতন তবে কি একইরকম ভাবে নামের কাঙাল, স্তুতিপাগল। ইন্দ্রের নিজমুখে স্বীকারোক্তি ভঙ্গাস্বনকে শিহরিত করে। কত কষ্ট যে সে জীবনে করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। নানান পরিস্থিতির সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কী সহজ কথা! ভঙ্গাস্বনের মনে হয়, মানুষ আশা করে ন্যায়, সত্যপরায়ণতা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতির গুণেই তো একজন দেবপদে উন্নীত হতে পারে। অথচ ইন্দ্রের নীচতায় দেবলোকের ভাবমূর্তি কীরকম ক্ষুণ্ণ হল। সন্তানদের মুখগুলো মনে করে আবেগে ভঙ্গাস্বনের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়।

ক্ষমতাবান ইন্দ্রের কাছে ভঙ্গাস্বন মাথা নোয়ালেন ‘রাজর্ষি: পাদয়ো: শিরসা গতঃ’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪১)। সন্তানকামনায় যদি ভঙ্গাস্বন কোনো ভুলভ্রান্তি করে থাকেন যথোচিত মর্যাদায় ইন্দ্রকে স্তুতি না-জানিয়ে তবে তার জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী ‘প্রসীদ ত্রিদশশ্রেষ্ঠ’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪১)। অশ্রুসিক্ত ভঙ্গাস্বন ভাবেন একেবারে গোড়ায় এসব জানলে শয়ে শয়ে কুমারদের প্রাণ যেত না। কেবল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করবার বাসনায় ইন্দ্র নিষ্পাপ, নিরপরাধ এতগুলো শিশুপুত্রকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছেন।

স্তুতিতে যথারীতি ইন্দ্র নরম হলেন। পুনরায় ক্ষমতা প্রকাশে তৎপর ইন্দ্র এবারে বরদানে উদ্যত ‘প্রণিপাতেন তস্যেন্দ্রঃ পরিতুষ্টো বরং দদৌ’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪২)। ইন্দ্রেরও আজ অভিমানের পালা শেষ। ইন্দ্র জানতে চাইলেন—রাজা ভঙ্গাস্বনের পুত্রদের তিনি জীবন ফিরিয়ে দেবেন অথবা তাপসীর পুত্রদের জীবন ফিরিয়ে দেবেন?

পুত্রাস্তে কতমে রাজন জীবস্ত্বেতৎ প্রচ মে।

স্ত্রীভূতস্য হি যে জাতা: পুরুষস্যাথ যেহভবন।।                        (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪৩)

কৃতাঞ্জলি তাপসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বললেন, তার স্ত্রীরূপ প্রাপ্তির পরে যে শতপুত্র হয়েছিল অর্থাৎ যাদের জন্য তিনি মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন সেই শতপুত্র যেন জীবন ফিরে পায় ‘স্ত্রীভূতস্য হি যে পুত্রাস্তে মে জীবন্তু বাসব’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪৪)।

বিস্মিত ইন্দ্র কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না-পেরে তৎক্ষণাৎ জানতে চাইলেন তাপসীর এই পক্ষপাতমূলক আকুতির কারণটা কী? পুরুষ ভঙ্গাস্বনের শতপুত্র কেনই বা বিদ্বেষের পাত্র হয়ে উঠল। তাপসী নিজের পঞ্চাশ ও ভঙ্গাস্বনের পঞ্চাশ মিলিয়ে জীবন প্রার্থনা করতে পারতেন। অথবা কেবল ভঙ্গাস্বনের শত পুত্রকে বাঁচানোর কথাও বলতে পারতেন মহৎ দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু উভয়ের কোনোটিই না-চেয়ে কেবল স্ত্রীরূপে যাদের জন্ম দিয়েছেন, তাদেরই বাঁচিয়ে দিতে বললেন কেন? কীভাবে এই সন্তানদের জন্য তার এত নিবিড় ভালোবাসা?

স্ত্রীভূতস্য হি যে জাতা: স্নেহস্তেভ্যেহধিকঃ কথম।

কারণং শ্রোতুমিচ্ছামি তন্মে বক্তুমিহার্হসি।।                             (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪৬)

জিজ্ঞাসিত হয়ে তাপসী নির্মম সত্য প্রকাশ করে বসলেন। তিনি বললেন, সন্তানের ওপরে মাতার স্নেহ পিতার স্নেহ অপেক্ষা শতগুণে অধিক হয়ে থাকে—যা ঢাক পিটিয়ে প্রকাশ করতে হয় না। স্ত্রী এবং পুরুষের মধ্যে সন্তানস্নেহ স্ত্রীদেরই অধিক। সুতরাং স্ত্রী হবার পরে যে সকল পুত্রের জন্ম হয়েছিল তারা একারণে তার অনেক অনেক আদরের।

স্ত্রিয়াস্ত্বভ্যধিকঃ স্নেহো ন তথা পুরুষস্য বৈ।

তস্মাৎ তে শক্র জীবন্তু যে জাতা: স্ত্রীকৃতস্য বৈ।।                    (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৪৭)

কোনোরকম রাখঢাক না-রেখে খোলা মনে সত্যকথনের ফল হাতে-নাতে মিলে গেল। ইন্দ্র খুশিতে তাপসীকে সকল পুত্রেরই পুনর্জীবনের বচন দিলেন ‘সর্ব এবেহ জীবন্তু’। কেবল এই নয়, দ্বিতীয় বরদানের জন্য ইন্দ্র উদগ্রীব হলেন। তিনি জানতে চাইলেন অবশিষ্ট জীবনটা ভোগের জন্য তাপসী কোন রূপটিতে থাকতে চান? ইন্দ্রের ধারণা ছিল নিশ্চয়ই তাপসী তপোবনের নারীজীবনের ঝঞ্ঝাটের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য ভঙ্গাস্বনের পুরুষ জীবনটিই ফিরে পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন। মৈবম। এমনটি হল না।

ইন্দ্র পুনরায় বিস্মিত হলেন। তাঁর ধারণা ছিল, নারী-পুরুষের মধ্যে পুরুষের জীবনটি নিশ্চয়ই অভিপ্রেত হবে তাপসীর। কিন্তু তাপসী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, তিনি স্ত্রীরূপেই থাকতে চান। তার ভঙ্গাস্বনের রূপে প্রত্যাবর্তনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই ‘স্ত্রীত্বমেব বৃণে শক্র পুংস্ত্বং নেচ্ছামি বাসব’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৫০)।

বিস্মিত ইন্দ্র নিষ্ঠাবান শ্রোতা। তাঁর যেন আর কিছুই বলবার নেই। তাপসীর কাছে তিনি সবই নতুনভাবে শিখছেন, নতুন অনেক তথ্য পাচ্ছেন। তাপসী নিয়ে এলেন নারী-পুরুষের সংসর্গ-কথা। অধোমুখ ইন্দ্র কেবল শুনছেন তাপসীর অন্তরের কথা, যে কথায় কোনো অভিনয় ছিল না। স্ত্রী-পুরুষের সংসর্গে পুরুষের অপেক্ষা স্ত্রীরই অনেক অনেক বিষয়-সুখ লাভ হয়—যা অনির্বচনীয়। একারণে পুরুষজীবন তাপসীকে আর আকর্ষণ করে না। স্বেচ্ছায় তাপসী (রূপান্তরিত ভঙ্গাস্বন) স্ত্রী রূপেই থাকতে চান। লৌহমানব ভঙ্গাস্বনের থেকে মমতাময়ী স্ত্রীরূপী তাপসী অধিকতর পছন্দের।

স্ত্রিয়া: পুরুষসংযোগে প্রীতিরভ্যধিকা সদা।

এতস্মাৎ কারণাৎ শক্র স্ত্রীত্বমেব বৃণোম্যহম।।                           (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৫২)

শেষমেশ মুগ্ধ ইন্দ্র মর্ত্যের রাজা ভঙ্গাস্বনকে জব্দ করতে এসে নিজেই অনেক কিছু শিখে দেবলোকে পাড়ি দিলেন। তাঁর নিজের ঘরের দিকে মন গেল। শচীদেবীও কী ভাবেন ‘স্ত্রীভাবেন হি তুষ্যামি’ (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব ১২। ৫৩)।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%