অপ্সরা-কথা

অমিত ভট্টাচার্য

বিপুল কাব্য-সংসারে স্বয়ং কবি হলেন প্রজাপতি। তিনিই সৃষ্টিকর্তা। কাব্যসাহিত্যের প্রয়োজনে বিবিধ অতিলৌকিক চরিত্র সৃজন করে পাঠকচিত্তকে বিমোহিত করতে কবির ভূমিকা অতুলনীয়। প্রাচীন সাহিত্যে নিছক মনোরঞ্জনের জন্য কাহিনিকে পল্লবিত করতে যেসব চরিত্র সৃষ্ট হয়েছে তার মধ্যে অপ্সরা চরিত্র অতিমাত্রায় কৌতূহলসঞ্চারী। দেবরাজ ইন্দ্র প্রায়ই স্বর্গে অপ্সরা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন। দেবর্ষি নারদ একদিন এরকম এক মনোরম মুহূর্তে ইন্দ্রের দরবারে হাজির হলেন। যা স্বাভাবিক তা আচরিত হলে আচরণকারীর বিকৃতি বা পরিবর্তন বা ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। এক্ষেত্রেও বলাই বাহুল্য ইন্দ্র খোশমেজাজে অপরিবর্তিত। যদিও গাত্রোত্থান, কুশল বিনিময় সবই যথাযথভাবে অতিথি ধর্মানুযায়ী পালিত হল। অতিথিবরণে ইন্দ্রের ঔৎসুক্য অবলোকন করে উপস্থিত অপ্সরাগণও মহর্ষিকে প্রণামপর্ব সারল এবং বিশাল সুরম্য প্রাসাদের এক প্রান্তে গিয়ে অধোমুখে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ভাবতে চেষ্টা করল ‘প্রণেমুস্তাশ্চ দেবর্ষিং বিনয়াবনতা: স্থিতা:’। (মা. পু. ১। ৩০)

ইন্দ্রের বিনোদন-সভায় যারা ছিলেন তারা প্রত্যেকেই ডাকসাইটে সুন্দরী। নারদ আড়চোখে লক্ষ করেছেন প্রত্যেককে। ইনি সেই নারদ যাঁর জটা পদ্মের কেশরের মতো পিঙ্গল। শরৎকালীন চন্দ্রের মতো তাঁর প্রভা। মৃণালখন্ডের মতো শুভ্রকান্তি নারদ বিচিত্র উজ্জ্বল সূক্ষ্ম লোমে তৈরি একখানা নয়নাভিরাম হরিণ-ছাল পরিধান করেছিলেন। বীণার তারে অবিরত আঘাতের কারণে অঙ্গুষ্ঠের রক্তিম আভায় তাঁর হাতের স্বচ্ছ স্ফটিক মালার পুরোভাগ যেন প্রবালপূর্ণ উপলব্ধ হচ্ছিল। নারদ তাঁর ‘মহতী’ নামের বীণাবাদ্যটিকে ধীরভাবে একপাশে রেখে প্রজাপতির মতো লঘু ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াতে সক্ষম সুন্দরী অপ্সরাদের প্রীতিপূর্ণ বচনে বসতে বললেন। তথাস্তু। ইন্দ্রিয়ের অগোচর জ্ঞানেরও অধিকারী নারদ চতুর্দিকে একুট চোখ বুলিয়ে নিলেন।

উপস্থিত অপ্সরাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল উর্বশী, রম্ভা, ঘৃতাচী, মেনকা, বপু ও তিলোত্তমা। আনন্দানুষ্ঠানে নারদের সম্মানে দেবরাজ নৃত্যের আদেশ করলেন। তবে সমবেত নৃত্যানুষ্ঠান ইন্দ্রের পছন্দ নয় কোনোকালেই। কারণ সমবেত অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট করে কোনো নৃত্যশিল্পীর হাবভাব ও কটাক্ষবিক্ষেপাদি নজর কাড়ে না। এতে ইন্দ্রের নান্দনিক ভাবনা অতৃপ্ত রয়ে যায়। এজন্য ইন্দ্র নারদকে অনুরোধ করলেন অপ্সরাদের মধ্যে থেকে যথেচ্ছ একজনকে তিনি যেন নির্বাচন করেন নৃত্যপ্রদর্শনের জন্য।

মহতী বীণার তার থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন স্বরগ্রামের মূর্ছনা যিনি প্রতিনিয়ত শ্রবণ করেন, তাঁর কাছে নৃত্যপ্রদর্শনের সুযোগ একবার পেলে প্রত্যেকেই যে নিজেকে উজাড় করা অনুষ্ঠান উপহার দেবে—এবিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু নারদ অপ্সরা গ্রহণ-বর্জনের এক অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করলেন। সরাসরি কোনো একজনকে আহ্বান না-করে তিনি ঘোষণা করলেন, অপ্সরাদের মধ্যে যিনি সর্বোত্তমা, অসামান্যা রূপলাবণ্যময়ীরূপে নিজেকে বিবেচনা করেন, তিনিই যেন নৃত্যপ্রদর্শন করেন।

উর্বশী, রম্ভা, ঘৃতাচী, তিলোত্তমা—প্রত্যেকেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সকলেই অপলক নেত্রে তাকিয়ে রয়েছে প্রত্যেক প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর দিকে। আবার যেন নতুন করে মনোযোগ দিয়ে নিজেরাই নিজেদের সৌন্দর্যের বিশ্লেষণে তৎপর হয়ে পড়েছে। সমস্ত সভাকক্ষ স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েকটা মুহূর্ত। লড়াই বাধিয়ে দেবার নৈপুণ্যে নারদ যে কত সিদ্ধপুরুষ—তাঁর অদ্ভুত প্রস্তাবে তিনি তা বুঝিয়ে দিতে বাকি রাখেননি। কস্মিনকালেও অপ্সরারা ভাবেনি যে, তাদের মধ্যে সর্বোত্তমা কে—তা জাহির করতে হবে, নিজের জয়ঢাক নিজেকে বাজাতে হবে। তারা ভাবতে শুরু করল, অতীতে এরকম আনন্দময় পরিবেশে কখনও তারা এতটা অসহায় বোধ করেনি। সব সুন্দরীদের মধ্যে থেকে নারদ যেকোনো একজনকে নৃত্যপ্রদর্শন করতে বললেই পারতেন। সবাই যেখানে অনন্বয় অলংকারে মন্ডিত, যেখানে কেউ কারুর থেকে কোনো অংশে কম বা বেশি বলা যায় না—সেখানে নারদের একটিমাত্র বক্তব্যে সকলে স্তম্ভিত হয়ে রইল:

যুষ্মাকমিহ সর্বাসাং রূপৌদার্যগুণাধিকম।

আত্মানং মন্যতে যা তু সা নৃত্যতু মমাগ্রতঃ।।                       (মা. পু. ১। ৩৪)

শারীরিক ছন্দ এবং আকর্ষণের মাধ্যমে অপ্সরারা কতভাবে দেবাধিপতির ইষ্টসিদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সেই পুরন্দর ইন্দ্রের কি উচিত ছিল না নারদকে বলা যে, এত সুন্দরীদের আর প্রতিযোগিতার বাতাবরণে নামিয়ে আত্মপ্রত্যয়ের পরীক্ষায় ঠেলে দেবেন না। এদের অনেকেই ইন্দ্রকে ভালোবেসে বিশ্বাস করে সুনির্দিষ্ট ঘর বাঁধেনি। উর্বশীর তো শরীরের ভেতরটায় তোলপাড় হচ্ছিল। ইন্দ্রের কামতৃপ্তিতে উর্বশীর ভূমিকা যেখানে সখী অপ্সরাদের ঈর্ষাকাতর করে তুলত সেখানে তিনি স্বয়ং তো নারদের বাক্যের রেশ ধরে উর্বশীর নাম বলেই দিতে পারেন। ইন্দ্র তো বলতেই পারেন, উর্বশী যেহেতু সর্বোত্তমা সেহেতু দেবর্ষির আপ্যায়ন-অনুষ্ঠানে সেই নৃত্যপ্রদর্শন করুক। সমবেত অপ্সরারা প্রত্যেকেই ইন্দ্রের কাছ থেকে সক্ষম কন্ঠের প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে রইল।

আসলে সুন্দরীদের মধ্যে যে নিজেকে শীর্ষস্থানীয়ারূপে ভাবে সেই আজ আমায় (নারদকে) নৃত্যপ্রদর্শন করুক—এই শর্ত অনুসৃত হলে এর মধ্যে একটা আত্মশ্লাঘাও প্রকাশ পাবে। সেরা সৌন্দর্যের মাপকাঠি আজ এতকাল পরে নিজেরা কীভাবে ঠিক করবে—এইসব একরাশ ভাবনায় সবাই অকূলপাথারে। উর্বশী, রম্ভা ঘৃতাচী, মেনকা, বপু, তিলোত্তমা, চিত্রলেখা, সহজন্যা—নারদের কথামতো একজনের এগিয়ে যাবার অর্থই হল, নিজের পরীক্ষার খাতায় নিজের মূল্যায়নে অংশ নেওয়া। দেবতাদের তৃপ্তিসাধনে, মুনিজনের এবং অসুরদের তপস্যায় বিঘ্ন সৃষ্টিতেও এই অপ্সরাদের এত কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি।

দীর্ঘ ভালোবাসার দোসর যারা, অবিচ্ছেদ্য মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ যারা, তারাই আজ একে অন্যকে আড়চোখে দেখছে। কে নিজেকে সর্বোত্তমা ধরে নিয়ে নারদের বচনানুযায়ী অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। উর্বশী, রম্ভা চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। ক্ষণপরেই রম্ভা তাকাল মেনকার দিকে, মেনকা আবার ঘৃতাচীর দিকে, ঘৃতাচী চিত্রলেখার দিকে। একই ঘটনার সরল পুনরাবৃত্তি অলাতচক্রন্যায়ে দ্রুতগতিতে ঘটে গেল। বস্তুত অপ্সরাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এত নিবিড় যে, এদের মধ্যে কেউ যখন সুরদ্বেষীদের হাতে বন্দী হয়েছে তখন অন্যেরা হাপুসনয়নে কেঁদে ভাসিয়েছে। সেদিনের কথাই ধরা যাক, যেদিন কৈলাসপতি কুবেরকে নৃত্যপ্রদর্শন করে উর্বশী ফিরছিল এবং মাঝপথে কেশী নামে এক দৈত্য উর্বশীর পথ আটকাল। অমিতশক্তির অধিকারী দৈত্য তো কেবল পথ আটকায়নি। চিত্রলেখাসহ তাকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিল। সঙ্গী অন্যান্য অপ্সরাদের সমবেত চিৎকার এবং হাহাকার ধ্বনিতেই তো রাজা পুরূরবা ব্যাপারটা অবহিত হন এবং কেশীকে প্রতিস্পর্ধা জানিয়ে পরাস্ত করেন।

উর্বশীর মনে হয় সেদিন সব অপ্সরা-বন্ধুদের অবদানের কথা। কে কোথায় আছেন, রক্ষা করুন, রক্ষা করুন। যদি কোনো দেবতাদের বন্ধু থাকেন বা যদি কেউ এমন থাকেন যিনি আকাশ পথে চলতে অভ্যস্ত প্রিয়সখীদের দৈত্য-কবল থেকে উদ্ধারের জন্য আসুন। উর্বশী চোখ বন্ধ করলেই সেই হাড়-হিম-করা অবস্থাটা অনুমান করতে পারে। আজও তার কানে ধ্বনিত হয়—‘পরিত্রায়তাং পরিত্রায়তাং যঃ সুরপক্ষপাতী যস্য বাম্বরতলে গতিরস্তি’। অপ্সরা সহজন্যাই তো রাজা পুরূরবাকে ঈশানকোণের দিকটায় কেশী উর্বশীকে ও চিত্রলেখাকে নিয়ে যাচ্ছিল—তা জানিয়ে দেয়।

উর্বশীর আরও মনে হয়, অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের অধিকারী নারদ কি উর্বশীর জন্মকথা বিস্মৃত হয়েছেন। নরসুহৃৎ নারায়ণ-মুনির উরুজাত উর্বশী। এত সুন্দর শরীর অভূতপূর্ব। আসলে অপ্সরারা গিয়েছিল ছলাকলায় নারায়ণের ধ্যানে বিঘ্ন ঘটাতে। নারায়ণ ঊরু থেকে রূপোত্তমাকে সৃজন করে সে-যাত্রায় অপ্সরাদের বুঝিয়েছিলেন যে, রূপের অহংকার অশোভন। উর্বশীর রূপে অপ্সরারা লজ্জিত হয়েছিল। কবিকথায় তার জন্ম নিয়ে কতই না আভানক প্রচলিত আছে। পদ্মপুরাণ-এর মতে স্বয়ং কামদেব অপ্সরাদের ঊরু থেকে উর্বশীকে রূপ দেন এবং প্রাণসঞ্চার করেন। কত বিশিষ্ট দেবতার তপোভঙ্গে উর্বশী ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল তা নারদের অজানা থাকার কথা নয়। যেমন বিষ্ণুর তপোভঙ্গে উর্বশীর অবদানে এই ইন্দ্রই তো যারপরনাই প্রসন্ন হয়েছিলেন। তারই রূপদর্শনে বিমোহিত মিত্র-বরুণের স্খলিত বীর্য থেকে অগস্ত্য ও বশিষ্ঠের জন্ম হয় (শ্রী. ভা. ৯। ১৪)। উর্বশী নামের ব্যুৎপত্তিও তার ক্ষমতাকে প্রকাশ করে। যিনি মহান পুরুষদের বশীভূত করতে সক্ষম তিনিই উর্বশী। ঊরান (মহতেহপি) অশ্নুতে (বশীকরোতি) ইতি উর্বশী। তবে কি আজন্ম অর্থহীন এক ছুটোছুটিতে উর্বশীর শক্তিক্ষয় হল।

পৃথিবীর মানুষগুলোই ভালো। অনেক বেশি সমঝদার, সংবেদনশীল। এজন্যই চতুর ইন্দ্রকে দেখা যায় অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলেই পৃথিবীর রাজাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে সেনাপতি পদে বরণ করে নেন। নারীর সম্মান রক্ষায় সেদিনের পৃথিবীর রাজা পুরূরবার ভূমিকা, তার হরিণচিত্রিত পতাকাশোভিত ‘সোমদত্ত’ রথ—দেবলোকের এই সভাকক্ষের থেকে সহস্রগুণ নিরাপদের। কেশীদানবের ভয়ে ভীত মুদ্রিতচক্ষু উর্বশীর নয়ন উন্মীলনের জন্য রাজা পুরূরবার সে কী অস্থিরতা—সুন্দরি সমাশ্বসিহি সমাশ্বসিহি।

গতং ভয়ং ভীরু সুরারিসম্ভবং

ত্রিলোকরক্ষী মহিমা হি বজ্রিণঃ।

তদেতদুন্মীলয় চক্ষুরায়তং

মহোৎপলং প্রত্যুষসীব পদ্মিনী।।                       (বিক্র. ১। ৫)

উর্বশী, আজকের সভার অপ্সরা উর্বশী অনোন্যোপায়। একদিন নারায়ণ তাকে (উর্বশীকে) ইন্দ্রের হাতে অর্পণ করেছিলেন। সেই ইন্দ্রের অতিথি আপ্যায়নে সামান্য নৃত্যপরিবেশন—এ আর এমন কী! কিন্তু নারদের ঘোষণায় উর্বশী আজ যেন জ্যামিতিক ছন্দে একটি বিমূঢ় অবয়ব। কেশী দানবের হাতে বন্দী হওয়া এবং তার পরবর্তী ঘটনার কথা মনে হতেই রম্ভা, মেনকা, চিত্রলেখা, সহজন্যা প্রমুখের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে উর্বশী আজ কোনোমতেই নিজেকে অন্তত সর্বত্তমা বলে স্বমুখে ঘোষণা করবে না। যতক্ষণ না ওদের মধ্যেকার কোনো অপ্সরা সখী আত্মম্ভরিতা প্রকাশে এগিয়ে আসে।

রম্ভার একবার মনে হল, আগন্তুক নারদের ইচ্ছাপূরণে সে এগিয়ে যাবে। সৌন্দর্যের একটা প্রচ্ছন্ন অহংকার রম্ভা বরাবরই পোষণ করে। যে প্রকৃতই সুন্দর সে নিজেকে অন্যের সামনে সুন্দর বলতে এত দ্বিধান্বিত হবে কেন? আপাদমস্তক লাবণ্য বয়ে বেড়াব অথচ তা জাহির করব না—কে কী মনে করবে, দুঃখ পাবে বলে আজন্মলালিত সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য মনের কথাটা খুলে বলব না—এটা ঠিক নয়।

রম্ভার মনে হয়, দেবলোকের গণিকাদের আত্মপ্রকাশে জড়তা অশোভন। সর্বোপরি যাঁরা (দেবতা) জগৎটা পরিচালনা করেন, যাঁদের বিপুল কর্মকান্ডের জেরে জগৎ-জোড়া বৈচিত্র্য তাঁদের সুরলোকে বাস করতে হলে আজ্ঞামাত্রই তার প্রতিপালনে যত্নশীল হওয়াটাই সংগত। এইভাবে রম্ভা যুক্তিনির্ভর হতে চাইল। সর্বতোভাবে আগন্তুক অতিথিকে যথোচিত অভ্যর্থনায় খুশিতে রাখাটাও তো অপ্সরাদের জন্য নির্দিষ্ট কাজের মধ্যেই বর্তায়। রম্ভা এগিয়েও উর্বশীর রূপে দৃষ্টি পড়তেই সাহস হারিয়ে ফেলল। তার নিজেরই মনে হল, উর্বশী তাদের দুজনের মধ্যে অবশ্যই শ্রেয়তরা।

উর্বশীর নয়নভোলানো রূপে দৃষ্টি পড়লেই দ্রষ্টার মনে হবে তাকে সৃষ্টি করতে স্নিগ্ধরশ্মি চন্দ্র হয়তো বা প্রজাপতির ভূমিকা নিয়েছিলেন, অথবা আদিরসের অধিপতি কামদেব তার স্রষ্টা অথবা পুষ্পময় মধুমাসই তার জনয়িতা—নতুবা এই মনোহর তনু নির্মাণ অসম্ভব। রম্ভার আত্মপ্রকাশের উৎসাহ স্তিমিত হল সাময়িক কালের জন্য।

রম্ভা সুরপতি ইন্দ্রকে ভালো মতন চেনে। অনন্তকাল ধরে স্বর্গ শাসন করলেও ইন্দ্র স্বর্গ ছেড়ে কত রাত যে বাইরে থেকেছেন—তা রম্ভা বিলক্ষণ জানে। সুরাধিপ কতবার মানবীর পিছনে অনুসরণ করতে গিয়ে দেবকার্য বিস্মৃত হয়েছেন—এসব বহুচর্চিত বিষয়। তপোবন, ছিটে বেড়ার ঘর, মাটির দাওয়া—এসবেও ইন্দ্র প্রতিহত হননি—এমন ঘটনাও বিরল নয়। যেখানেই রূপবাণী, সেখানেই তাঁর পদচিহ্ন। এই ইন্দ্র স্বর্গ ছেড়ে অন্যত্র গেলে রম্ভা মলিনভাব অবলম্বন করত। ইন্দ্র নিজেই নারদের কাছে রম্ভার নাম ঘোষণা করে দিলে কী এমন রামায়ণ অশুদ্ধ হয়ে যেত! তবে একবার আত্মপ্রত্যয় হারিয়ে ফেললে তার পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে। নানান দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনের মধ্যে পাক দিয়ে যায়। হলও তাই।

রম্ভার এখন আর সব সুন্দরী অপ্সরা বান্ধবীদের সঙ্গে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই মন চায় না। পূর্ণচন্দ্রবদনা রম্ভা দিব্যচন্দনচর্চিতা হয়ে কেশপাশে পারিজাতপুষ্প গ্রথিত করে বাঁকা ধনুকের মতন সুন্দর ভ্রূযুগলে নীলবর্ণের শাড়িতে কোনো সভামঞ্চে যখন দাঁড়ায় তখন তার কেবল স্পর্শসুধা পানের জন্যই অতীতে সে বহুলোলুপ-দৃষ্টির অভিজ্ঞতা পেয়েছে। এই রূপের জন্যই কুবের-পুত্র নলকুবেরকে সর্বস্ব অর্পণে সংকল্পান্বিতা হলেও দশানন রাবণের কামবহ্নিতে তাকে পুড়তে হয়েছে।

শ্বেতকান্তি নির্মল চন্দ্রশোভিত কৈলাসের সেই রাতের দুর্বিষহ ঘটনা—যা নাকি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটেছিল—সেও তো রম্ভার রূপাধিক্যের জন্যই। অলৌকিক কান্তি রম্ভার সর্বাঙ্গ জুড়ে। শুধুমাত্র রূপের বিশেষণেই রম্ভা দ্বিতীয় লক্ষ্মী। এই রূপই সংকল্পিত প্রাণপুরুষের সঙ্গে মিলনের পথে একদিন অন্তরায় হয়েছিল। পরাক্রমী দশগ্রীবের পায়ে পড়ে সেই রাতে সানুনয়ে সাশ্রুনেত্রে নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল রম্ভা। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ‘বলাৎ তেনাস্মি ধর্ষিতা’। ছিন্ন পুষ্পহারে, স্থানচ্যুত অলংকারে, শিথিল কেশবন্ধনে, সর্বস্বখোয়ানো রম্ভা প্রাণপ্রিয় নলকুবেরকে সব জানিয়েছিল। সে যে শক্তি প্রকাশ করেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি তাও ‘ন হি তুল্যং বলং সৌম্য স্ত্রিয়াশ্চ পুরুষস্য হি’ (রা. উত্তর. ২৬। ৫১)। আজ সুরাধিপের সভায় নতুন পুষ্পের আদ্রহারে বিভূষিতা রম্ভা তাই রূপকেই দোষ দেয়। এজন্য নারদের কথামতো রূপের পক্ষ নিতে তার অন্তর সায় দিল না।

এবারে ঘৃতাচী। তুল্যমূল্যের তুলাদন্ডে ঘৃতাচী। কীভাবে সে অপর বান্ধবীদের টেক্কা দিয়ে এগিয়ে যাবে। কিছুতেই সে আত্মম্ভরী ভাব প্রকাশ করবে না। এই অপ্সরা পঙক্তিতে প্রতিযোগীদের মতন ক্রমাঙ্ক লাগাতে হবে—সে কখনও ভাবতে পারেনি। যে নৃত্য পরিবেশনে এগিয়ে যাবে, সেই তো ‘এক’ সর্বোত্তমারূপে নিজেকে জানাতে চাইবে। স্বকন্ঠে আত্মজাহির ‘মৈবম’। ঋষি ব্যাসদেব যেদিন ঘৃতাচীর ভুবনমোহিনী রূপ নিরীক্ষণ করে কামে মোহিত হয়ে উঠেছিলেন সেদিনই তার সৌন্দর্যের চরম প্রাপ্তি হয়ে গিয়েছে। ব্যাসদেব নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন ‘ন শশাক নিয়ন্তুম’। ঘৃতাচীর রূপ ব্যাসদেবকে হরণ করেছিল ‘ঘৃতাচ্যা বপুষা হৃতঃ’ (মহা. শান্তি. ৩২৪।৬, ৭)। বিশাল সভাকক্ষে ইন্দ্র, নারদ যেখানে উপবেশন করে আছেন তাদের থেকে অপ্সরাদের বেশ খানিকটা ব্যবধান চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সখীরা সব পাশাপাশি। এত ঘনিষ্ট বন্ধুত্বের বাতাবরণে নিজে নৃত্য আরম্ভ করবে স্বরচিত করতালিতে নিজের রূপশীর্ষত্ব জাহির করে—এতসব ভেবে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ঘৃতাচীর অন্তর দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। তার জন্মস্মৃতি মনে পড়ে যায়।

পুরুষোত্তম হরি প্রবল বিক্রমে সব দেবতাদের নিয়ে সহস্র বৎসর যাবৎ ক্ষীরসমুদ্র মন্থন করছেন। দীর্ঘ মন্থনের ফলেই অপ্সরাদের পূর্বে পরমধার্মিক আয়ুর্বেদাচার্য ধন্বন্তরির আবির্ভাব হয়েছিল লোককল্যাণে। তখনও অমৃত ওঠেনি। উচ্চৈ:শ্রবা অশ্ব, কৌস্তভ মণি একে একে উঠছে। ক্ষীরসাগর মন্থনের ফলেই তো অপ্সরা-সুন্দরীদের জন্ম। রহস্যঘেরা জন্মস্মৃতিতে ঘৃতাচী আজ আবেগতাড়িত। ক্ষীর রূপ অপ (জল) মন্থনের ফলে যে সারভূত রস উত্থিত হয়েছিল, সেই রস থেকে জন্ম হয়েছিল বলেই উত্তমকান্তিমতী রমণীরা অপ্সরা নামে অভিহিত।

অপ্সু নির্মথনাদেব রসাত্তস্মাদ বারস্ত্রিয়ঃ।

উৎপেতুর্মনুজশ্রেষ্ঠ তস্মাদপ্সরসোহভবন।।                                  (রা. আদিকান্ড, ৪৫। ৩৩)

ঘৃতাচী ভাবে, তারা কোনোকালেই সংখ্যালঘু নয়। বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রকে জানিয়েছেন। ক্ষীরসাগরের মন্থনে ষাট কোটি অপ্সরার আবির্ভাব-গাথা। আবির্ভাবকালেই এদের সঙ্গে ছিল অসংখ্য পরিচারিকা।

ষষ্টি: কোট্যেহভবংস্তাসামপ্সরাণাং সুবর্চসাম।

অসংখ্যেয়াস্তু কাকুৎস্থ যাস্তাসাং পরিচারিকা:।।                             (রা. আদিকান্ড, ৪৫। ৩৪)

এদেরও যদি ‘আমি সর্বোত্তমা’ বলে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করতে হয়—তবে কার-না চোখ ফেটে জল আসে!

ইন্দ্রের ভূমিকায় ঘৃতাচীর অন্তর্বেদনা নেই। দীর্ঘদিন স্বর্গবাসে ঘৃতাচী জানে যে, ইন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কটা নিকট হলেও বড়োই ভঙ্গুর। এর আগেও নারদ ঋষি স্বর্গলোকে ইন্দ্রের কাছে এসেছেন। একবার তো আপ্যায়নপর্ব মিটে যাবার পরে নারদের কাছ থেকে পৃথিবীর যুবকদের আনন্দের খবরে শিহরিত ইন্দ্র নিজেও সেই পরমানন্দ লাভের শরিক হতে চেয়েছিলেন। ঘৃতাচী এসবের সাক্ষী। ভীমরাজকন্যা মৃগনয়না কুমারী দময়ন্তী অসামান্য রূপবতী এখন পৃথিবীতে সকল রাজার ঈপ্সিতা। ক্ষমতাধরদের কলহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে দময়ন্তীকে ঘিরে। দময়ন্তীর রূপমাধুর্যে মুগ্ধ রাজারা তাকে বিয়ে করতে গিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন! ঘৃতাচী জানে, নারদের কাছ থেকে সে-কথা শুনে ইন্দ্রের চিত্তচাঞ্চল্য এসেছিল। কামবাণে সন্তপ্ত হয়ে ইন্দ্র নারদের নিষেধ সত্ত্বেও সেবার পৃথিবীতে দময়ন্তীর স্বয়ংবরে যোগ দিয়েছিলেন। সে-সময়ে ইন্দ্রের সেই মনোবৈকল্য অবলোকন করে ঘৃতাচী ইন্দ্রাণীর জন্য অনুতাপ সংবরণ করতে পারেনি। হাপিত্যেশ করে বসে থাকা ইন্দ্রাণীকে ঘৃতাচী সেবার সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, তাদের অপ্সরাদেরও আর জীবনধারণই বৃথা। ঘৃতাচী দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে মরণের আর্তিও প্রকাশ করে তখন।

জীবিতেন কৃতমপ্সরসাং তৎ প্রাণমুক্তিরিহ যুক্তিমতী নঃ।

ইত্যনক্ষরমবাচি ঘৃতাচ্যা দীর্ঘনি:শ্বসিতনির্গমনেন।।                        (নৈ. চ. ৫। ৪৯)

ঘৃতাচীর মনে হয়, একারণে স্বর্গরাজ্যের অধিপতির কাছে সম্মান প্রত্যাশা বৃথা। অভিমানিনী ঘৃতাচীর দৃঢ় ধারণা হল, অপ্সরারা অনিয়ন্ত্রিত বলেই নারদ তাদের প্রতিযোগিতার পরিমন্ডলে নামিয়ে দিয়েছেন।

মেনকার মনে হল, নারদ অন্যায় কিছু বলেননি এবং দীর্ঘদর্শিতায় তিনি আপন প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু সভার থমথমে পরিবেশ এবং উর্বশী, ঘৃতাচীর নিষ্ক্রিয় ভাব দেখে সেও এগোতে সাহস পেল না। মেনকার বিবেচনায় প্রতিভাত হল যে, নারদের কথাটা তো একশো ভাগ সত্য। কারণ সকলেই সর্বোত্তমা নয়। সুন্দরী আর সেরা-সুন্দরী দুটো স্বতন্ত্র বিষয়। নারদ তাকেই নৃত্যপ্রদর্শনের আজ্ঞা দিয়েছেন, যিনি সর্বোত্তমা। এতে দোষের কোথায়! তবে সমস্যা হল, যখনই অতিথিবরণ বা আপ্যায়নের তাগিদে স্বর্গে নৃত্য পরিবেশন করতে হয়েছে তখন সেটি সমবেত অপ্সরা নৃত্যই হয়েছে। ইন্দ্রের অমরাবতী পুরীতে অর্জুন যেবার অস্ত্রশিক্ষার জন্য অতিথিরূপে এসেছিলেন সেবারেও তো তার অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অপ্সরাদের সমবেত-নৃত্য (Group Dance) হয়েছিল। সেই নৃত্যের অনুষ্ঠানে মেনকার সঙ্গে ছিল ঘৃতাচী, রম্ভা, পূর্বচিত্তি, স্বয়ংপ্রভা, উর্বশী, মিশ্রকেশী, বপু, গৌরী, বরূথিনী, গোপালী, সহজন্যা, কুম্ভযোনি, প্রজাগরা, চিত্রসেনা, চিত্রলেখা, সহা ও মধুরস্বরা এবং অন্য আরও অনেকে—

ঘৃতাচী মেনকা রম্ভা পূর্বচিত্তি: স্বয়ম্প্রভা।

উর্বশী মিশ্রকেশী চ বপুর্গৌরী বরূথিনী।।

গোপালী সহজন্যা চ কুম্ভযোনি: প্রজাগরা।

চিত্রসেনা চিত্রলেখা সহা চ মধুরস্বরা।।

এতাশ্চান্যাশ্চ ননৃতুস্তত্র তত্র সহস্রশঃ।

চিত্তপ্রসাদনে যুক্তা: সিদ্ধানাং পদ্মলোচনা:।।

মহাকটিতটশ্রোণ্যঃ কম্পমানৈ: পয়োধরৈ:।

কটাক্ষহাবমাধুর্য্যৈশ্চেতোবুদ্ধিমনোহরৈ:।।                                     (মহা. বন. ৩৮। ২৯-৩২)

এই মেনকাই উবর্শীকে যখন কেশী দানব অপহরণ করেছিল তখন চিলচিৎকারে ব্যাপৃত রম্ভাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, সে যেন অতিমাত্রায় ভীত হয়ে না-পড়ে। মহারাজ পুরূরবা যখন আর্তনাদে সাড়া দিয়ে দানবের পিছনে ধাওয়া করেছেন তখন দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে গেছে। ‘হলা মা তে সংশয়ো ভবতু। উপস্থিতসংপরায়ো মহোন্দ্রোহপি মধ্যমলোকাৎ সবহুমানমানায্য তমেব বিজয়সেনামুখে নিযুঙক্তে’। মেনকার মনের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা সেদিনের সে বচন সত্য হয়েছিল। সখী উর্বশীকে মুক্ত করে চিত্রলেখাসহ রাজা পুরূরবা যখন রথ থেকে অবতরণ করলেন সেদিন এই মেনকাসহ সব অপ্সরা উদগ্রীব হয়ে হেমকূটে দাঁড়িয়ে। প্রত্যেকেই রাহুর কবলমুক্ত চাঁদের মতো উর্বশীর দিকে তাকিয়েছিল। এই মেনকাই তো সেদিন সানন্দে অন্যদের বলেছিল, দুটো মনের মতো জিনিস তারা আজ পেল—যার মধ্যে একটি হল উদ্ধার করে আনা প্রিয়সখী এবং অন্যটি হল অক্ষতদেহ রাজর্ষি। অতীতের সেইসব সুখস্মৃতি মেনকাকে টেনে ধরেছে।

আসলে দলগতভাবে নৃত্যপরিবেশনে ব্যক্তিনাম বড়ো প্রাধান্য পায় না। কেমন যেন একটা বেশ আমিত্ববিহীন আত্মনিবেদন সেখানে সাহস জুগিয়ে দেয়। সমবেত নৃত্যনৈপুণ্য প্রদর্শন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না-হলে কখন সভাকক্ষ মাতিয়ে নৃত্যের ঐশ্বর্য উজাড় করে ঢেলে দিত। কিন্তু হায়! মেনকার মনে হল, নারদের প্রস্তাবে কোনো অশোভন শর্ত না-থাকলেও নিজেকে প্রকাশ করার অর্থই হল, অন্য বান্ধবীদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া। এর থেকে বরঞ্চ ভালো হত, নারদের ঘোষণামাত্রই ‘তিরস্করিণী’ বিদ্যার প্রভাবে অদৃশ্য থেকে সভায় কী হতে যাচ্ছে তা দেখা।

দুটো বিদ্যা অপ্সরাদের অধিগত। প্রথমটি হল ‘অপরাজিতা’। দ্বিতীয়টি হল ‘তিরস্করিণী’। যথাকালে যথারীতি প্রযুক্ত হলে অপরাজিতা আক্রমণকারীদের হাত থেকে অপ্সরাকে রক্ষা করে থাকে। দৈত্যরা যাতে অপ্সরাদের কোনো ক্ষতি করতে না-পারে সেজন্য সুরগুরু তাদের মাথায় অপরাজিতা গ্রন্থি বাঁধতে শিখিয়েছেন ‘ননু ভগবতা দেবগুরুণা অপরাজিতাং নাম শিখাবন্ধনবিদ্যামুপদিশতা ত্রিদশপ্রতিপক্ষস্যালঙ্ঘনীয়ে কৃতে স্বঃ’ (বিক্র. ২য় অঙ্ক)। উর্বশী সেবার অপরাজিতা গ্রন্থি বন্ধনের কথা মনে না-রাখার ফলে কেশী দানবের খপ্পরে পড়েছিল। বনে, পর্বতে, নদীতটে যথেচ্ছ বিহারে অপরাজিতা অপ্সরাদের সহায়ক রক্ষাকবচের ভূমিকা নেয়। উর্বশীর এই ভুলে যাওয়াটা একটা রোগ ‘অহো বিস্মৃতং মম হৃদয়ম’ (ওই)।

আজ মেনকার বিশেষভাবে মনে পড়ছে ‘তিরস্করিণী’-বিদ্যার কথা। এই ‘তিরস্করিণ্যা বিদ্যয়া’ তারা যে কত অভিপ্রেত বিষয় সিদ্ধ করেছে, কামার্ত, সন্তপ্ত পুরুষহৃদয়ের সংবাদ সংগ্রহ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। মদনবাণে বিদ্ধ পুরূরবার হৃদয়ের হাহাকার তিরস্করিণী-বিদ্যায় প্রচ্ছন্ন হয়ে ওঁর পাশে দাঁড়িয়েই উর্বশী শুনেছিল সখী চিত্রলেখাকে নিয়ে ‘তিরস্করিণীপ্রতিচ্ছন্না পার্শ্বগতাস্য ভূত্বা শ্রোষ্যামি তাবৎ’ (ওই ২য় অঙ্ক)। উর্বশীর বিরহে পুরূরবা সেবার মৃণালের মতো ক্ষীণ হয়ে যাওয়া অঙ্গ দিয়ে বিদূষককে ওঁর মনোবেদনা জানিয়েছেন। সে সবই উর্বশী অদৃশ্য থেকেই শুনেছে। চিত্রলেখাই উর্বশীকে আশ্বস্ত করে তিরস্করিণী প্রত্যাহার করে রাজার কাছে মেঘমালার মতো হাজির হয়েছিল এবং জানাতে চেয়েছিল, বিদ্যুৎলতা (উর্বশী) এরপর অবশ্যই আসবে ‘তিরস্করিণীমপনীয় রাজানমুপেত্য’ (ওই ২য় অঙ্ক)। অমরকোষে বলা হয়েছে ‘তিরোহন্তর্ধানে’। যে বিদ্যার দ্বারা অন্যের অদৃশ্য থাকা যায় তাকেই তিরস্করিণীবিদ্যা বলে।

নানা কথা ভাবতে ভাবতে মেনকার মনে পড়ল অপ্সরা সানুমতীকে। এই সানুমতী মেনকার আরেক প্রাণের দোসর। মহারাজ দুষ্যন্ত যখন শকুন্তলাকে রাজপ্রাসাদে ঠাঁই দিলেন না তখন দুষ্যন্তের ভাবগতিক পর্যবেক্ষণের জন্য মেনকা সানুমতীকে পাঠিয়েছিলেন। মেনকার সঙ্গে সানুমতীর যে সম্বন্ধ তাতে শকুন্তলা যেন তারই শরীরের একটা অংশ বললে অত্যুক্তি হয় না ‘মেনকাসম্বন্ধেন শরীরভূতা মে শকুন্তলা’ (অ. শ. ষষ্ঠ অঙ্ক)। দুষ্যন্তের মনোবেদনা, শকুন্তলার প্রতি মহারাজের অকৃত্রিম অনুরাগ—সবই সে তিরস্করিণীবিদ্যার প্রভাবে অদৃশ্য থেকে জেনেছিল ‘তিরস্করিণীপ্রতিচ্ছন্না পার্শ্ববর্তিনী ভূত্বা উপলপস্যে’ (অ. শ. ষষ্ঠ অঙ্ক)।

তবে নারদের প্রস্তাব নিজের কানে শোনবার পর তিরস্করিণীর প্রয়োগে আত্মগোপন করাটা কোনোমতেই শ্লাঘার হত না। মেনকার স্বাভিমান জাগ্রত হল। কত নামি গুণীজন যে অতীতে একবার দেখামাত্রই তাকে দেহ-মন সমর্পণের বাসনা প্রকাশ করেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। কতজন স্বকন্ঠে বলেছেন ‘দর্শনাদেব হি শুভে! ত্বয়ামেহপহৃতং মনঃ’ (মহা. আদি. ৮৫। ১৩)। এই দেবেন্দ্রর আদেশে সে অতীতে কত অসাধ্য সাধন করেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল মেনকা, সবই তো ইন্দ্রের মঙ্গল সম্পাদনের জন্য। বিশ্বামিত্রের তপস্যায় বিঘ্ন সৃষ্টি করবার জন্য যখন তার ডাক পড়েছিল তখন তো জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। ইন্দ্রেরই আদেশে তাকে সে-কাজ করতে হয়েছে। সূর্যের মতো তেজস্বী ছিলেন বিশ্বামিত্র। তাঁর উগ্র তপস্যায় ইন্দ্রের তখন ‘সীদন্তি মম গাত্রাণি, মুখঞ্চ পরিশুষ্যতি’। ইন্দ্রত্ব লুপ্ত হবার উপক্রম। স্নিগ্ধমধুর সম্বোধনে মন-পাগল করা বাগবিন্যাসে তখন ইন্দ্রের একটাই আর্জি। অনুগ্রহ করে মেনকা যেন অমরাবতীতে থাকার বিনিময়মূল্যরূপে ইন্দ্রের মুখরক্ষায় ব্রতী হয়। সেদিনের সম্বোধনের ভাষা ও বচনবিন্যাস আজও মেনকার কর্ণকুহরে। সেদিন ইন্দ্রের কাছেই মেনকা জেনেছে যে, অপ্সরাদের মধ্যে মেনকাই শ্রেষ্ঠ:

গুণৈরপ্সরসাং দিব্যৈর্মেনকে! ত্বং বিশিষ্যসে।

শ্রেয়ো মে কুরু কল্যাণি! যত্তাং বক্ষ্যামি তচ্ছৃণু।।

অসাবাদিত্যসঙ্কাশো বিশ্বামিত্রো মহাতপা:।

তপ্যমানস্তপো ঘোরং মম কম্পয়তে মনঃ।।

মেনকে! তব ভারোহয়ং বিশ্বামিত্রঃ সুমধ্যমে।

শংসিতাত্মা সুদুর্দ্ধর্ষ উগ্রে তপসি বর্ততে।।

স মাং ন চ্যাবয়েৎ স্থানাত্তং বৈ গত্বা প্রলোভয়।

চর তস্য তপোবিঘ্নং কুরু মে প্রিয়মুত্তমম।।

রূপযৌবনমাধুর্য্যচেষ্টিতাস্মিতভাষণৈ:।

লোভয়িত্বা বরারোহে! তপসস্তং নিবর্তয়।।                           (মহা. আদি. ৮৫। ২২-২৬)

ইন্দ্রের সেই অসহায়তা অমরাবতীতে কান পাতলে শোনা যায়। বিশ্বামিত্রের তপস্যায় বিঘ্ন ঘটানো কী যে-সে কথা! মেনকার মনে পড়ে অপর এক বান্ধবীর কথা। তার নাম বপু। অপ্সরা বপুর নামডাকও ছিল নজরকাড়া। বহুমুনির তপোভঙ্গে তার শংসাপত্র অনেক। কিন্তু এরকমই একবার হিমালয়ের কোলে তপস্যারত দুর্বাসার সাধনকার্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে গিয়ে অভিশপ্ত হয়ে তাকে পক্ষীকুলে জন্ম নিতে হয়েছিল। ‘আগতাসি মদোন্মত্তে মম দুঃখায় খেচরি’—বলেই দুর্বাসা তার অপ্সরাজীবনের চোদ্দোটা বাজিয়ে দেন। বপু সেবার ইষ্টসিদ্ধির অভিপ্রায়ে দুর্বাসার অনতিদূরে পুংস্কোকিলের মতন মনোহর কন্ঠে গান ধরেছিল ‘মুনিক্ষোভণগর্বিতা’ বপুকেও মাশুল গুনতে হল।

মেনকা শিহরিত হল। একারণে বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গের আদেশেও মেনকার মন সায় দেয়নি প্রথমে। মেনকা জানত, বিশ্বামিত্রও ছিল তেজের আকর। ক্ষত্রিয় হয়ে জন্মগ্রহণ করেও পরে ব্রাহ্মণ হবার কৃতিত্ব, বশিষ্ঠের প্রিয়তম পুত্রদের বিনাশ, ক্রোধের বশেই শ্রবণাদি নতুন নক্ষত্র সৃজন, ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে প্রেষণ—কতই না তাঁর দুর্জয় কীর্তিকলাপ! মেনকা শুনেছে বিশ্বামিত্র পৃথিবীকে পদাঘাতে চঞ্চলিত করবার ক্ষমতা ধরেন, মহামেরুকে অনায়াসে ছোটো করে দিতে পারেন। বিশ্বামিত্রের চোখ তো নয়, যেন দুটো জ্যোতির্বলয়। যম-চন্দ্র-মহর্ষি-সাধ্য-বিশ্বদেব-ঋষিগণ যাঁর ভয়ে সন্ত্রস্ত এবং সর্বোপরি ইন্দ্র নিজে যাঁর ভয়ে ত্রস্ত হয়ে বারংবার সোমরস পান করতে থাকেন—তাঁকেও একদিন এই মেনকাই বশীভূত করেছে। তবে মেনকার অনুরোধবশত বায়ু এবং কামও সেবার কার্যকারী ভূমিকা নিয়েছিল। দেবাদেশ পালনে ‘বায়ুমন্মথয়ো:’ ভূমিকাও মেনকা বিস্মৃত হয়নি।

ঘর পোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘকে ভয় পায়। মুহূর্তের ভুলে সব কিছু হারিয়ে যেতে পারে জেনেও মেনকা বিশ্বামিত্রের মুখোমুখি। অনির্বচনীয় রূপযৌবনের অধিকারিণী মেনকা তার কোমল অঙ্গভঙ্গিতে সুমধুর হাস্যযোগে বিশ্বামিত্রকে নমস্কারের পর্ব চুকিয়ে নৃত্য পরিবেশন করেছিল—তারপরের ঘটনা তো সবারই জানা! বিশ্বামিত্র-মেনকার অঙ্গ থেকে অঙ্গ নিয়ে শকুন্তলার জন্মবৃন্তান্ত নতুন করে আর বলার নয়। আজও হিমালয়ের মনোহর সমতল ভূমিতে মালিনী নদীর কাছে গর্ভধারণের সেই মুহূর্ত চিন্তা করলেই মেনকার চমক লাগে ‘জনয়ামাস স মুনির্মেনকায়াং শকুন্তলাম’ (মহা. আদি. ৮৬। ১০)। মেনকার অনুতাপের কারণ হল, বিশ্বামিত্রের মতন উগ্রতেজা ঋষিকে কামাতুর করে যে প্রলুব্ধ করেছিল, তাকেও নিজমুখে ‘সর্বোত্তমা’ ঘোষণা করে তবে কিনা নৃত্য পরিবেশন করতে হবে!

সযত্নরচিত অমরাবতীর আপ্যায়ন কক্ষে একই মুদ্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিলোত্তমা চঞ্চল চোখের প্রান্ত দিয়ে নারদকে দেখছে। সেও আজ সংকটে। তার নিজের জন্মকথা কীর্তিকলাপ অহংকারের উদ্রেক করে বৈ কি! সারা শরীর জুড়ে তিলোত্তমার অদ্ভুত একটা জৌলুশ। অপ্সরাদলে থেকেও সে জন্মগুণে সকলের চেয়ে আলাদা। দেবতাদের ভয়ানক দুর্দিনে সংকটমোচনের ভার তো তার ওপরেই ন্যস্ত হয়েছিল। অতীতের প্রতিটি মুহূর্ত তিলোত্তমা অনুভব করছে। পালিয়ে-বেড়ানো দেবতাদের দুরবস্থায় যন্ত্রণাতুর ব্রহ্মা।

মহাসুর হিরণ্যকশিপুর বংশজাত নিকুম্ভের দুই মহাবলী পুত্র সুন্দ ও উপসুন্দ। ত্রিভুবন জয়ের বাসনা নিয়ে দুই ভাই দীর্ঘকাল যাবৎ নির্নিমেষ নয়নে দুশ্চর তপস্যায় বসেছিল। বিবিধ প্রলোভনেও তাদের তপোভঙ্গ না-হওয়ায় ব্রহ্মা স্বয়ং তাদের ত্রিভুবন জয়ের বাসনাপূরণের বর দিলেন। দৈত্যরা বেজায় খুশি হল তাদের ইচ্ছাপূরণের জন্য। দেবতাদের তারা স্বর্গছাড়া করল, মর্ত্য-পাতাল দাপিয়ে বেড়াল। উভয়ের অত্যাচারে সর্বত্র হাহাকার ধ্বনি শ্রুত হল। সুরলোকে, নরলোকে সর্বত্র ত্রাসের সৃষ্টিতে দেব-নর নির্বিশেষে সকলের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হল। পরিণামে সমবেত দেবতাদের করুণ প্রার্থনায় স্বয়ং ব্রহ্মা বিশ্বকর্মাকে রমণীরত্ন সৃষ্টির আদেশ করেছিলেন। ব্রহ্মারই আদেশে বিশ্বকর্মা পৃথিবীর যাবতীয় রত্নসমূহের তিল তিল সৌন্দর্য আহরণ করে তিলোত্তমাকে সৃষ্টি করলেন:

তিলং তিলং সমানীয় রত্নানাং যদ্বিনির্মিতা।

তিলোত্তমেতি তত্তস্যা নাম চক্রে পিতামহঃ।।                           (মহা. আদি. ২০৪। ১৯)

ত্রিভুবনে তিলোত্তমা সর্বোৎকৃষ্টা। রূপমুগ্ধ ব্রহ্মাই তার নামকরণ করেছিলেন। তিলোত্তমা দেবতাদের রক্ষার জন্যই রাশিকৃত রূপ নিয়ে সুন্দ, উপসুন্দকে প্রলুব্ধ করেছিল। তার রূপে বিভোর দুই দৈত্য কামের উত্তেজনাতেই এ তোমার নয়, এ আমার ‘নৈষা তব মমৈষা’ বলতে বলতে আগে আমি, আগে আমি হুংকারে নিজেরা নিজেদের হত্যা করল ‘অহং পূর্বমহং পূর্বমিত্যন্যোন্যং নিজঘ্নতু:’। তার রূপসৌন্দর্যকে ব্যবহার করেই দেবতাদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার হয়। তবে তিলোত্তমাকে সম্মান জানাতে সেদিন দেবতারা কার্পণ্য করেননি। কাজের মজুরি বাবদ ব্রহ্মারই বরে সে সূর্যলোকে বিচরণের ছাড়পত্র পায়। সাফল্যের চরম মুহূর্তে সুরপতির কন্ঠে নির্মম সত্য ধ্বনিত হয়েছিল:

তারিলে দেবতাকুলে অকূল পাথারে

তুমি; দলি দানবেন্দ্রে তোমার কল্যাণে,

হে কল্যাণি, স্বর্গলাভ আবার করিনু।

আজ অমরাবতীর পবিত্র সভাকক্ষে ইন্দ্র-নারদের সামনে সমবেত অপ্সরাবৃন্দ সংঘবদ্ধ হয়ে জানিয়ে দিল, প্রকৃত রূপ থাকলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয় না। আদিকল্পে তারা অনেক ক্ষমতাধর মান্যগণ্যদের সামলেছে। স্বর্গ থেকে অধঃপতনই ভালো ‘সাধু নঃ পতনমেবমিতঃ স্যাৎ’। নারদ অনুভব করলেন এরা সবাই তাদেরই প্রয়োজনে ‘রূপেণাপ্রতিমা’ (মহা. আদি. ২০৪। ১৪)।

শব্দসংকেত :

অ. শ.

নৈ. চ.

অভিজ্ঞানশকুন্তলম

নৈষধচরিত

বিক্র.

বিক্রমোর্বশীয়

মহা. আদি.

মহাভারত, আদিপর্ব

মহা. বন.

মহাভারত, বনপর্ব

মা. পু.

মার্কন্ডেয়পুরাণ

রা.

রামায়ণ

শ্রী. ভা.

শ্রীমদভাগবত

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%