জয়ন্ত দে
কমলা গান নিয়ে মেতে থাকত। সেদিন দেখলাম মুনিয়া কবিতা বলছে। সেদিন হঠাৎ মুনিয়া বলে উঠেছিল, বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে? চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার।
আমি বললাম, তিনটে ইঁদুর তুমি ধরেছ। আমিই কি তোমার চার নম্বর?
মুনিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, 'বাদ দাও, ওটা জীবনানন্দ দাশ।'
'কবি! তোমার খুনোখুনির মাঝে কবি এলেন কোথা থেকে।'
'উনি এলেন না, উনি আমার হৃদয়ে থাকেন।'
মুনিয়ার হৃদয়ে একজন কবি থাকেন। ওর কথামতো তিনটে খুনের রচয়িতার হৃদয়েরও একজন কবি বাসা বাঁধতে পারেন। চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার।
আমি ইঁদুর ধরতে বসি।
শত্রুর শত্রু, আমার মিত্র। মুনিয়া এই কথাটা আমাকে বলেছিল। আমি মাথা নেড়ে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। হয়তো ওর বাবার সঙ্গে ওর সম্পর্ক খারাপ ছিল। আকছারই এমন দেখা যায়। কিন্তু সেই বাবার শত্রুকে নিজের মিত্র বানানোর জন্য কেউ কি আকুল হয়ে ওঠে।
মুনিয়া কিছুদিনের মধ্যে আমার সব কিছু ঘেঁটে দিল। ও যখনই এ বাড়িতে ঢোকে তখনই তোলপাড় হয়। চারদিক ও নাড়িয়ে দেয়। তারপর একসময় ও চলে যায়। তখন আমি স্থির হয়ে বসে ভাবার চেষ্টা করি সত্যিই কি মুনিয়া ওর বাবার শত্রু। নাকি সবই সম্পূর্ণটাই ক্যামোফ্লেজড!
মুনিয়াকে একদিন আমি সরাসরি জিজ্ঞাসা করি।
'আমি মানলাম, আমি তোমার বাবার শত্রু। সত্যি কথা বলতে কি আমাদের সার্ভিসে তোমার বাবার শত্রুর অভাব নেই। তাহলে তাদের বাদ দিয়ে আমাকে কেন বেছে নিলে?'
'ওই যে বললাম, অনেকেই আমার বাবার শত্রু, কিন্তু তারা কেউ খুনি নয়। তুমি একজন না-ধরা পড়া খুনি। পারফেক্ট মার্ডারার!'
আমি স্পষ্ট গলায় বললাম, 'তুমি ভুল করছ, আমি কোনও খুন করিনি। এগুলো আমার নামে প্রচার।'
মুনিয়া স্পষ্ট গলায় বলল, 'কিন্তু আমি যে বিশ্বাস করি।'
'তুমি বিশ্বাস করো, আমি তোমার বাবার শত্রু। হ্যাঁ, এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু দ্বিতীয়টি তোমার মনগড়া। আর তুমি এই কারণে যদি আমাকে পছন্দ করো, তাহলে খুব ভুল করবে। তবে মানুষ আমি মেরেছি, সেটা আত্মরক্ষার জন্য, তাকে না মারলে সে আমাদের অনেকই মেরে দিত। আমার খুন দেশের জন্য, চাকরির জন্য।'
মুনিয়া বলল, 'আমার বাবা আমাদের তিনজনের জিনা হারাম করে দিয়েছিল। ওইরকম খারাপ মানুষ আমি কোনও দিন দেখিনি। তারপরেও বলব আমার বাবার তোমার সম্পর্কে বলা কথাটা ভুল নয়। কেননা, লোকটা বিছানায় পড়ে গোঙাতে গোঙাতে তোমাকে খিস্তি করত। তোমার মা মাসি উদ্ধার করত। আর মাথা নেড়ে বলত, ও মেরেছে, ও খুনি। ওর খুনের প্রমাণ ও নিজেই। বাবার কথা থেকেই আমি বুঝেছিলাম তুমি একজন পারফেক্ট খুনি। তখনও আমি কোনও খুন করিনি। প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ তোমাকে গুরু দ্রোণ সাজিয়ে আমি একলব্য হলাম।'
আমি হাসি, 'যাকে যা নয় তাই সাজালে আমি দ্রোণাচার্য নই।'
মুনিয়া হাসছে, 'কিন্তু আমি তোমাকে গুরু মেনেছি। তারপর একটা একটা করে তিনটে কেস, তিনজন।
আমার বাবার কাছে আমি সাহসী বাচ্চা। একবার আমি বাবাকে কামড়ে দিয়েছিলাম। তারপর থেকেই আমি সাহসী আর ভাই ডরপুক! ভিতু! আমার ভাই এখনও ভিতু। একটা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ায়। সে তার ছাত্রছাত্রীদের মারা তো দূরের কথা, বকেওনি। সে ঠিক করে ক্লাস ম্যানেজ করতে পারে না। তাই জন্য হেডস্যার থেকে সহকর্মীরাও তার ওপর খুব বিরক্ত। এত ভালোমানুষি দিয়ে কিছু হয় না। আমি ভাইকে শেখাই, কিছু না পারিস চিৎকার কর। গলা ফাটিয়ে চিৎকার কর, চিৎকার করলে দেখবি, তোর চারপাশ শান্ত হয়ে যাবে। তুই সবার ওপরে থাকবি। একটু হলেও তোকে সবাই ভয় পাবে।
আমার ভাই মাথা নিচু করে, বলে, আমি পারব না। কিছু ছেলে তো মন দিয়েই আমার ক্লাস করে। আসলে ওরা কিছু ছেলেকে উসকাচ্ছে আমার ক্লাস ভণ্ডুল করার জন্য।
ওরা কারা?
স্কুল সেক্রেটারি। অচিন্ত্য মহাপাত্র। উনি আমাকে তাড়াতে চাইছেন। তারপর আমার জায়গায় ট্রান্সফার করিয়ে ওনার এক আত্মীয়কে নিয়ে আসবেন।
মুনিয়া হাসে।
এরপর অচিন্ত্য মহাপাত্রকে দুদিন ফোন করলাম। আমার নাম হল দেবযানী মহাপাত্র। আমি মহাপাত্র শুনে বুড়ো উল্লসিত। বুড়ো ফাঁদে পড়ার জন্য হাঁ করেই বসেছিল। ফোনে একটু গল্প করতেই বুড়ো গলে গেল। পর পর তিনদিন গল্প করার পর দুটো গরম ছবি পাঠালাম। তারপর আর কী, কিছু কথা রেকর্ড করলাম। মনে শান্তি হল না। শুধু কথায় হবে না, ছবি চাই। একদিন সোনালিকে বললাম, সোনালি বলল, ভিডিও কল কর। বুড়োকে গরম খাইয়ে ধুতি খুলিয়ে নাচাব। বুড়ো নাচল। তারপরই ছবি দেখিয়ে হুমকি দিলাম। দেবাংশু সান্যালের পিছনে লাগবেন না। তাহলে আপনার এই ডান্স ছাত্রছাত্রীদের মোবাইলে পাঠিয়ে দেব। ব্যাস শান্ত।
কিন্তু আমি জানি, আমার ভাই ক্লাস ম্যানেজ করতে পারে না। সর্বক্ষণ কীসের একটা ভয় ওকে জড়িয়ে থাকে। আমি জানি সেই ভয়টা ওর ছোটবেলার। বাবার দেখানো ভয়। যা ও কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারেনি।
তোমার সঙ্গে আমার মিত্রতা একটু বেশি। আমরা দুজনেই মার্ডারার। কিন্তু দুজনেই মনে করি এই খুনের জন্য আমরা দোষী নই। আমরা পাপীকে শাস্তি দিয়েছি।
'মুনিয়া আবারও বলি, তোমার সঙ্গে আমাকে জড়িও না।'
মুনিয়া হাসে, 'না, জড়াচ্ছি না। আমি এই কথাটা শুধু তোমাকেই বলছি। আর কাউকে নয়। আমি তোমার মতো আর একজনের কাছেও আমি স্বীকার করব না। তুমি যেমন শুধুমাত্র নিজের কাছে স্বীকার করো। আর কারও কাছে নয়, এমনকী আমার কাছেও নয়। আমি তেমন শুধু তোমার কাছে স্বীকার করি, আর কারও কাছে নয়।'
আমি হাসি, 'তুমি পাগল। তুমি আমার মুখে কথা বসাচ্ছ।'
মুনিয়া সারা বাড়িতে পাগলা ঝোড়ো হাওয়ার মতো নেচে বেড়ায়। প্রতিটা ছুটির দিন এখন মুনিয়া ছাড়া আমার চলে না। এমনকী অন্য অন্য দিনও নটা দশটা এগারোটা নাগাদ মুনিয়া আমাকে কাতর গলায় ফোন করে— তুমি কোথায়? তুমি কখন ফিরবে? আমি যদি ওর ঘুমিয়ে পড়ার আগে ফিরি, তার একটু পরেই আমি ওর স্কুটির আওয়াজ শুনব নীচে। আমি তৈরি বেল বাজার আগেই দরজা খুলে দিই।
সপ্তাহ খানেক আগে এক সেট চাবি ওকে দিলাম। বললাম, এটা রেখে দাও।
ও অবলীলায় কোনও প্রশ্ন না করেই চাবির গোছাটা নিয়ে নিল। তারপর কতদিন রাতে আমি এসে দেখি ও নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
কিন্তু আমি জানি ও ঘুমাচ্ছে না, ও জেগে। চাদরের নীচে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। মাঝে মাঝে আমার ওকে একজন যৌনকাতর মেয়ে মনে হত। কিন্তু এখন হয় না।
আমি ওর ছ-মাসের মোবাইল কল লিস্ট স্টাডি করেছি। কিচ্ছু পাইনি। আমি ওর পিছনে লোক লাগিয়েছি, ওর যাওয়া-আসা, বাড়ি থাকা, আমার বাড়ি আসা, যাওয়া, এমনকী ওর মর্নিংওয়াকের সময়ও ও আমার চোখের সামনে থাকে। নাথিং কিচ্ছু পাইনি, যাতে সামান্য সন্দেহ হয়। এই বাড়ির ভেতর ওর একা থাকার মুহূর্তগুলো জানার জন্যও আমি ক্যামেরা লাগিয়েছি, কিন্তু সেখানেও ওর পাগলামি, জোরে জোরে কবিতা আওড়ানো ছাড়া আর কিছু পাইনি।
তবু আমি জানি মেয়েটা ডেঞ্জারাস।
একসময় আমি ওকে জানতে চেয়েছি, তুমি ফোর্থ খুনটা কাকে করতে চাইছ?
ও বলল, তাহলে তুমি স্বীকার করলে আমি তিনটে খুন করতে পারি।
আমি বললাম, আমি তোমার কথার সূত্র ধরে জানতে চাইছি। এখানে আমার কোনও কথা নেই।
মুনিয়া ঘাড় ঝাঁকাল, ক্রমশ প্রকাশ্য।
আমি বললাম, 'আমি কিন্তু সে কে বুঝতে পেরেছি?'
মুনিয়া স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কে?'
'আমি!'
মুনিয়া বলল, 'তোমার এত বুদ্ধির প্রশংসা শুনে আমি প্রেমে ফাঁসলাম! তুমি আর একটা নেংটি ইঁদুর আমার কাছে সমান। আমার কাছে এত তীব্র বিষ আছে, মুখ দিয়েই তুমি খাবার টেবিলে মরতে পার। আবার ইঁদুরের মতো টাইম সেট করে দিলে, খাবে ঘরে মরবে বাইরে!'
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিশ্চিত হই, আমি নই। তবে হালকা গলায় ওকে বলি, মৃত্যু নিয়ে আমার কোনও ভয় নেই। সত্যি বলতে কি এই শরীরটা ছাড়া আমার আর কিছু নেই!
মুনিয়া আমার দিকে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে, কেন আমি নেই?
এ প্রশ্নের কী উত্তর হবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।