জয়ন্ত দে
মুনিয়া কি আমার প্রেমিকা? আমার উত্তর, না। কিন্তু এই না বলার মধ্যে আমার তেমন জোর নেই। জোর দিয়ে কী বলব, না। অথচ মুনিয়াকে যদি এই প্রশ্ন কেউ করে, সে কিন্তু স্পষ্ট করে, জোর গলায় বলে দেবে, হ্যাঁ।
এই হ্যাঁ, একবার নয়। বেশ কয়েকবার বলতে পারে। হয়তো আরও অনেক অনেক এগিয়ে অনেক অনেক কথা বলতে পারে। আমি ওর দৌড় জানি না, আমি ওর পাগলামি জানি না, আমি ওর ওড়া কিংবা তলিয়ে যাওয়াও জানি না। আমি শুধু দু-চোখ ভরে ওকে দেখি। মুনিয়া দেখার জিনিস। কেননা ও কখন কী করতে পারে আমার ধারণা নেই। ভাবতেও চাই না। মাঝে মাঝেই ও আমার কাছে বড্ড ঝাপসা।
আমি জানতাম, ওর বিয়ে হয়েছিল। সাড়ে তিনবছরের বিবাহিত জীবন। মাস ছয়েক আগে ওর স্বামী মারা গেছে। বিয়ের এক বছর পরই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ক্রমশ পক্ষাঘাত হয়, শেষে হার্ট অ্যাটাক। মৃত্যুর কারণ টানা দু-বছরের অসুস্থতা।
মুনিয়া রহস্যময় হাসি হাসে। কুটকুট করে আমার কানের লতি কামড়ায়। ফিসফিস করে আমাকে বলে, 'ওর মৃত্যুর কারণ অসুস্থতা। কিন্তু অসুস্থতার কারণ কী? সেই কারণ কেউ জানে না। জানতেও পারবে না। সেই কারণ একমাত্র আমি জানি।'
মুনিয়া জানে। জানতেই পারে। কিন্তু কেন এত রহস্য করে বলছে? আমি ওর খোলা শরীরে হাত বোলায়। আমার মুঠোর মধ্যে ওর স্তন ঘাপটি মেরে আছে। তাহলে কি মুনিয়া...
'ও মারা যাওয়ার পর আমি খবর পেয়েছিলাম। জানতাম যাবে, কিন্তু কবে যাবে, জানতাম না। যেতে তো হবেই। ওর নিস্তার নেই।' মুনিয়া আবার হাসে, হালকা শব্দ আমার কানের পাশে গুমগুম করে বাজে। 'আমাকেও ওর বাড়ির কোনও লোক খবর দেয়নি। ডুকরে উঠে কেঁদে বলে নি মুনিয়া তুমি বিধবা হলে। আমি নিজেকে নিজেই বললাম মুনিয়া এতদিন ডিভোর্সি ছিলে, এবার বিধবা হলে। একই অঙ্গে তোমার কত রূপ! নিউ ভার্সন!
খবর দিয়েছিল ওর এক বন্ধু। আমি তো প্রত্যেক দিনই রেডি থাকতাম। সুসংবাদটা কখন আসে। শুনেই কাতর গলায় বললাম, ওই বাড়িতে তো আমি ঢুকতে পারব না। শ্মশানে রওনা দিলেই আমাকে জানাবেন।'
মুনিয়া আমার শরীরে আঙুল দিয়ে বোলায়। আঙুলে লিখেছে কেওড়াতলা। একবার, দুবার।
ওর লেখা আমি পড়ে নিয়েছি। বললাম, 'তারপর কেওড়াতলায় গেলে?'
'হ্যাঁ গেলাম। আসলে আমি কোনওদিন শ্বশুরবাড়ি ঢুকতে পারেনি। আমাকে নিয়ে যাওয়ার সাহস ওর নেই। বিয়ের দিনই শুধু নিয়ে গিয়েছিল। ওর মা দিদিকে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম। তারা মানেনি। আমাকে ওদের পছন্দ নয়। আমি মফসসলের মেয়ে। আমার শিক্ষার কোনও দাম নেই। কলকাতায় আমার ফ্ল্যাট ওদের কাছে বস্তি। আমি কোনও কথা বলিনি, এক রাত কাটিয়ে মাথা নীচু করে চলে এসেছি।
তারপরেও আমাকে দু-একবার হোটেলের খরচ বাঁচাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেদিনগুলোতে ওর দিদি ছিল না, ওর মা ছিল না। সেই সুযোগে। একটা সাঁইত্রিশ বছরের লোক, বিয়ে করেছে, বিয়ে করার আগে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমাকে বলেছিল আমার মা দিদি অন্য মেয়ে ঠিক করেছিল, আমি রাজি হইনি বলে তারা একটু বেঁকে আছে, তোমাকে দেখলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।'
'সাঁইত্রিশ বছর! বিয়ে করেনি কেন? আমার মতো দেখতে খারাপ? নাকি তেমন রোজগার ছিল না?'
'না, দেখতে তো খারাপ নয়। ইঞ্জিনিয়ার। আগে চাকরি করত। বিয়ের আগে আগে চাকরি ছেড়ে দিল, একটা মেশিন টুলস কোম্পানি খুলল। পারিবারিক পয়সা প্রচুর। সেই টাকাপয়সার কন্ট্রোল নিয়ে মা আর দিদির সঙ্গে সংঘাত।'
মুনিয়ার সঙ্গে আমার যখন এ কথাগুলো হচেছ তখন আমার দু-হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে খাটের গায়ে বাঁধা। মুনিয়া আমার ওপর শুয়ে। মুনিয়া বলছে—
'আমি বলেছিলাম, যা রোজগার করো তাতেই আমাদের চলে যাবে। আমিও তো কম টাকা স্যালারি পাই না। তারপর আমার বাপের পাহাড় প্রমাণ ঘুষের টাকা জমানো, চারদিকে এত জায়গা জমি। কলকাতার শহরে দুটো ফ্ল্যাট, বাঁকুড়ায় বাড়ি, হাওড়ায় বাড়ি। হাইওয়ের পাশে বিশাল জমি। আমাদের হয়ে যাবে। তার ওপর আমার চাকরি আছে, হয়ে যাবে। তোমার পারিবারিক টাকার লড়াই ছাড়ো। সেরেফ টাকার জন্য ওখানে পড়ে থেকো না। এসো, আমরা ভালো করি বাঁচি। ও বলল, টাকা না থাকলে প্রেম পালাবে। আরে আমাদের প্রেম কোথায়? যা ছিল তা সেক্স। আমার ফ্ল্যাটে ও এসেই জামাকাপড় খুলত, নানা ফ্লেভারের কনডোম এনে স্টোর করত। তারপর বড়জোর দশ মিনিটেই ওর কাজ শেষ। আসলে প্রচণ্ড হাইপার হয়েই ঢুকত। আমি বলতাম, চলো এভাবে হবে না, সংসার করি। দিন রাত একসঙ্গে থাকব। ও রাজি নয়। ওর মা দিদি ঝামেলা পাকাবে। তাহলে? ও বলল, কেন তোমার ফ্ল্যাটে আসব, যাব, এই তো বেশ আছি। আমি বললাম, তা হবে না। এই ফ্ল্যাট আর লীলাক্ষেত্র করতে দেব না। ও বলল, তবে হোটেলে চলো। হোটেলে গিয়েই ও কেমন পালটে গেল ওর সেক্স তুমুল শব্দবাজি হয়ে গেল, খিস্তির বন্যা বইত। লাফালাফি, কামড়াকামড়ি, মারামারি। অথচ বাড়িতে দেখেছি ভিন্নরূপ শব্দহীন, যেন ওষুধ খাচ্ছে। আমি ফ্ল্যাট আর হোটেলে দু-জায়গার বিছানায় শুয়ে শুয়ে আবারও ব্যর্থ সম্পর্ক দেখতাম।'
'বিয়ে করলে কেন? দ্বিতীয় বার বিয়ে তোমার ভালোভাবে বুঝে ডিসিশন নেওয়া উচিত ছিল।'
'ও খুব ভদ্র। শান্ত। ভালোমানুষ মনে হত। আলাপ হয়েছিল এক বন্ধুর গানের অনুষ্ঠানে। তিনদিন আলাপের পরই বলল ভেবেছিলাম, সারাজীবন অবিবাহিত থাকব। কিন্তু আপনাকে দেখে ডিসিশন পালটাতে ইচ্ছে করছে। হেল্প করবেন? আমি বললাম, আমি ডিভোর্সি। আমার বাবা একজন ঘুষখোর, লম্পট, দুশ্চরিত্র পুলিশ অফিসার। আমার মা অপমানে নির্যাতনে ধুকপুক করে বেঁচে আছে। আমার শৈশব ভালো নয়। প্রচণ্ড জটিল। আমি ডিভোর্সের পর একটা হারামির বাচ্চার সঙ্গে জড়িয়েছিলাম। সে আমাকে ভালো জীবন দেবে বলেছিল। তারপর সে আমাকে লুকনো বউ বানাতে চেয়েছিল। আমি রাজি হইনি। সে নানা ভাবে এখনও আমাকে ফাঁসাতে চায়। আমি তার ভয়ে, সেই জটিলতায় কাতর। সামলাতে পারছি না। আমার কপালে মানুষ নেই। সে বলল, আপনার কপালে না থাক, আমার কপালে আছে। তাকে আমি পেয়ে গেছি, আর হারাব না। আমি আপনাকে বিয়ে করব। কোনও প্রেম নয়। আমি বললাম, এত সাহস আপনার? চলুন। আমি ভিতু নই। ফোর্থ ডে সেই সন্ধেবেলায় বিয়ে করলাম। তার আগে আমার বন্ধুটির কাছে শুনেছি, সৈকত খুব ভালো ছেলে। ব্যাঙ্গালোরে বড় চাকরি করত। সব ছেড়ে চলে এসেছে। এখানে কোম্পানি খুলেছে, কিছু মানুষের কর্ম সংস্থান করবে, অনেক স্বপ্ন ওর। কিন্তু বিয়ের পর পর বুঝলাম, সব বিগ বিগ টক। সত্যি ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্গালোরের চাকরিটা টেকাতে পারেনি। এখানে কোম্পানির চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আর একটা জিনিস বুঝলাম, ও বাস্তবে থাকে না পুরোটাই স্বপ্নে স্বপ্নে ঘোরে। পরিশ্রম করতে পারে না, তাই নানা অজুহাত খোঁজে।'

'ও অসুস্থ হয়ে পড়ল কবে?' আমি জানতে চাইলাম।
'আমরা যে হোটেলে যেতাম, সব খরচ হাফ হাফ শেয়ার হত। ঘর ভাড়া থেকে খাবার। ও হার্ড ড্রিঙ্কস নিত। আমাকে অফার করত। আমি খেতাম না। কিন্তু যেহেতু অফার করেছে, তাই ড্রিঙ্কসের দামও হাফ দিতে হত। শুধু কনডোমটা ও কিনে নিয়ে আসত। ওর পছন্দের ফ্লেভারে। তার দাম নিত না।
ওর যুক্তি, দুজনে মস্তি নিচ্ছি, তাহলে একজন টাকা দেবে কেন?
আমি ওর সবকিছু হ্যাঁ করে দেখতাম। এমন মানুষও হয়। কখনো কখনো আমার নিজেকে মনে হত, আমি কোনও কলগার্ল। ওর কাজ শেষ হয়েছে, এবার পার্স খুলে আমাকে পেমেন্ট করবে।
আবার, কখন মনে হত, আমি শরীরী সুখের জন্য একটা পুরুষ ভাড়া করে এনেছি। এবার তাকে পেমেন্ট করব।
একদিন বললাম, এভাবে চলতে পারে না। এটা কী খেলা হচ্ছে সৈকত?
ও স্পষ্ট বলল, আমার কিন্তু খারাপ লাগছে না। এত বছর তো হোটেলেই সেক্স করেছি। বাড়িতে কোনও মেয়েকে মা দিদি অ্যালাউ করত না। বাঙ্গালোরে যেখানে থাকতাম, সেটা মায়ের বান্ধবীর ফ্ল্যাট। কড়া নজরদারি ছিল। তাই সবই হোটেল। কিন্তু সেখানে সব খরচ আমার ছিল। এখানে দুজনের সুখ, দুজনেই ভাগ করে নিচ্ছি। ওর কথা শুনে আমার বমি উঠে এল।
তারপর ওকে বললাম, আমি আর পারছি না, আমাকে মুক্তি দাও। মিউচুয়াল ডিভোর্স চাই।
অদ্ভুতভাবে ও বলল, তোমার নামে হাইওয়ের ধারে যে জমি আছে, সেটা আমাকে দাও। আমি কারখানা খুলব। আমি সে অর্থে কিছু করি না। এটা মনে করো খোরপোষ! আমি তখন পাগল হয়ে যাচ্ছি। একদিকে সেই কুত্তার-ডাক্তার, আমার প্রেমিক, এদিকে দ্বিতীয় স্বামী। আমার কোনও আশ্রয় নেই। বাবার রিটেয়ার করার আগেই স্ট্রোক হল। তখন বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। কিন্তু তার এখন দাপ মরেনি। মাকে টানছে, কাজের মহিলাকে টানছে। আমি চারদিক থেকে জ্বলছি। হঠাৎ একদিন মনে হল, সব আগুন নেভাতে হবে।'
আমি হালকা গলায় বলি, 'তখন কি ফায়ার ব্রিগেড ডাকলে?'
'বাবা একদিন তোমার নাম করে কাউকে গালাগাল করছিল। তার আগে অনেক বার বাবার কাছে তোমার নাম শুনেছি। সেদিন তোমার কথা মনে এল। ধূমকেতু রাহা। তোমার নামটা এমন একবার শুনলে মনে থেকে যায়। হঠাৎ সেদিন ওই বাজে লোকটা জিজ্ঞেস করে বসলাম, এই ধূমকেতু রাহা কী করেছে। তখনই পর পর শুনলাম তোমার কথা। আগেও শুনেছিলাম। কিন্তু সেটা ছিল খবরের কাগজের খবর। কিছুটা বাবার বমি করা কথা থেকে। সেদিন যেটা শুনলাম সেটা বেশ ডিটেলসে। এমনকী তোমার পত্নী প্রেম কমলার ত্রুটি নিজের কাঁধে নেওয়ার গল্পও। শুনলাম কমলার শারীরিক ত্রুটির জন্য বাচ্চা হচ্ছে না, অথচ তুমি সবাইকে বলেছ, তোমার দোষ। শুনে তোমাকেই গুরু মানলাম। আমি একলব্য আর তুমি দ্রোণাচার্য!'
মুনিয়া মাঝে মাঝেই আদর করার সময় আমার হাত হ্যান্ডকাফ করে দেয় খাটের সঙ্গে। সেই হ্যান্ডকাফ পুলিশ ডিপার্টমেন্টের নয়। ফ্যান্সি হ্যান্ডকাফ, অন লাইনে আনিয়েছে। এগুলো নাকি সেক্স অ্যাক্সেসারিজ। এখন আমার ইচ্ছে হলেও ওকে আদর করতে পারব না। আমার হাত বাঁধা!
'তারপর কী করলে?'
'মাস ছয়েক ধরে শান্ত করলাম নিজেকে। ছমাসে অন্তত বার দশেক হোটেলে গেছি। হাফ হাফ টাকা নিয়ে মস্তি কিনে এনেছি। ও ড্রিঙ্কস করেছে। আমি শুয়ে দেখেছি। খাবার খাওয়ার পর হাতে লবঙ্গ দিয়েছি। ফেরার সময় লবঙ্গ ভরা কৌটোটা ওর পকেটে দিয়ে দিয়েছি। রেখে দাও। বলেছি, মাঝে মাঝে খাবে। রোজ খেও না।'
'লবঙ্গ!' আমি সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করি।
মুনিয়া কোনও জবাব দেয় না। আমার পিঠে আঙুল ছুঁয়ে আঁক কাটে। বটুলিনাম টক্সিন।
আমি ফিসফিস করি, 'বটুলিনাম টক্সিন! কোথায় পেলে?'
মুনিয়া হাসল, 'খুব পড়াশোনা করেছি। মাত্রা জেনেছি। ব্যবহার জেনেছি। সহজ পন্থায় আমি জোগাড় করেছিলাম। কারও সাহায্য দরকার পড়েনি। একটা লবঙ্গ। দেখা হলেই আমার তরফ থেকে। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্যারালিসিস। তখন আমার স্বামী আমি চোখের দেখা দেখতে বাড়ি যাব। এটাই স্বাভাবিক। যেতাম। একটু গল্প, কথা, আসার সময় একটা লবঙ্গ। কখনো কখনো দু-চারটে লবঙ্গ রেখেও আসতাম। খুব কাজ দিল। একটু সময় লাগল। কিন্তু। আমি একদম ছটফট করিনি দ্রোণাচার্য।'
'তাহলে একটা আগুন নিভল?' আমি শান্ত গলায় বললাম।
মুনিয়া আমার ওপর শুয়েছিল, এবার উঠে বসল আমার ওপর। আমার দুদিকে ওর পা। বলল, 'টাটকা জোয়ান মদ্দ। একটু বেশি সময় নিল। প্রায় সতেরো মাস।'
'সতেরো মাস!'
'হ্যাঁ, তাড়া ছিল না, ধীরে সুস্থে। তখন আমি নিজেই আগুন। খালি মনে হচ্ছে, না, না, জল ঢেলে নেভাবো না, আমি পোড়াব!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।