ত্রয়োদশ অধ্যায়

জয়ন্ত দে

হো হো করে হাসছে মুনিয়া। মাথার ওপর দু-হাত তালি দিচ্ছে। ওর আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে হঠাৎ আমার মনে হল, আমি কী তৃতীয়জনের নামটা ভুল বললাম? গুরুর এই পরাজয়ে কি ওর এত খুশির কারণ? গাড়ির গতি বাড়িয়ে বাড়ি ফিরলাম। বোতল তুলে মদ ঢাললাম গলায়। মুনিয়াও আজ বোতল থেকে মদ খেল।

বিড়বিড় করলাম দীনেশ সান্যাল।

মুনিয়া চিৎকার করল— আমার বাপ! আমার জন্মদাতা বাপ! তোমাদের সাদা বাঘ!

আমি বললাম, আমি ভুল বলিনি। তোমার তৃতীয় শিকার তোমার বাবা, দীনেশ সান্যাল।

হো হো করে আবার হাসিতে ফেটে পড়ল মুনিয়া। 'ভুল কেন বলবে দ্রোণাচার্য? তুমি কি ভুল বলতে পারো? একদম ঠিক। তৃতীয়জন আমার বাবা।'

'কেন মারলে?'

'ওই লোকটার বেঁচে থাকার অধিকার নেই। কিন্তু ওপরওয়ালা ঘেন্নায় মালটাকে তুলে নিচ্ছে না। আমি একটা সিঁড়ি শুধু ওর কাছে এগিয়ে দিলাম, তরতর করে ওই লোকটা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল?'

'আমি সিঁড়ির কথা জানতে চাইছি।'

মুনিয়া শান্ত হয়ে বসল,

বাবাকে মারার প্ল্যান ছিল। সেই ছোটবেলা থেকে ভাবতাম, একদিন না একদিন ওই রাক্ষসটাকে মারব। যেভাবেই হোক রাক্ষসটাকে বধ করব। তারপর রাক্ষসই একদিন তোমার কথা বলল। তোমার প্ল্যানগুলো বলল। আমি তারমধ্যে থেকে রাক্ষসের জন্য অসীমানন্দের প্ল্যানটা বেছে নিলাম।

আমি মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। ও সোফার ওপর পা গুটিয়ে বসে। স্থির, শান্ত! এক মাথা এলোমেলো চুল। চুলগুলো অশান্ত। কিছুক্ষণ আগে অশান্ত মুনিয়া আমার সঙ্গে ওই বিছানায় শুয়েছিল। তখন ও ভয়ংকর অশান্ত ছিল। বিছানায় মুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন। অনেক সময় আমি হাঁপিয়ে যাই। মুনিয়া তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে, বৃদ্ধস্য তরুণ ভার্যা! আমি তোমাকে আদর করতে হেল্প করব। কিন্তু কখনো তুমি ওষুধ খাবে না। কক্ষনও না।

মুনিয়া বলল, আমি বাবাকে ওষুধ দিতাম। যৌবনউদ্দীপক। যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি। সিলডেনাফিল।

শান্ত মুনিয়া মাথা নিচু করে বসে।

আমার থেকে ভাই চার বছরের ছোট। খুব শান্ত ছিলাম আমরা দুজনেই। কখনো মাকে জ্বালাতন করতাম না। একবাটি মুড়ি দিলে ভাই চুপ করে বসে খেত। আর আমি ওর পড়ে যাওয়া, উড়ে যাওয়া মুড়ি কুড়িয়ে দিতাম। কিন্তু বাবা এলেই আমাদের শান্তির সংসারে অশান্তি শুরু হত। এই অশান্তি করত একজন দীনেশ সান্যাল। সকাল থেকে শুরু হত বহু রকম রান্নার পাট। তিনরকম শাক, পাঁচরকম মাছ, মাংসের মেলা বসত। দুপুর থেকেই বন্ধুবান্ধব আসত, শুরু হত মোচ্ছব। তখন বাড়ির একতলা হয়ে যেত রান্নাঘর আর দোতলা হয়ে যেত শুঁড়িখানা।

ওপর থেকে হাঁক আসত, জল দাও, মাছ দাও, লংকা পেঁয়াজ দাও। মা রান্না করতে করতে পড়িমরি করে দোতালায় দৌড়াত। মাঝে মাঝে কাজের মহিলা রাখত। কিন্তু তারা এই উৎপাতে থাকতে চাইত না। বাবা এবং বাবার বন্ধুরা অবলীলায় তাদের গায়ে হাত দিত, টেনে নিয়ে কোলে বসাত। তার ভয়ে আতঙ্কে কাউকে কিছু না বলে কাজ ছেড়ে দিত। অবশ্য কাউকে কিছু বলে হবে না তারা জানত।

আমার বাবা ছিল নামী দামি পুলিশ অফিসার। নেতা মন্ত্রীরাও বাবাকে চিনত। কত দরকারে তারা আলো লাগানো গাড়ি নিয়ে আমাদের বাড়ি আসত। বাবার নামে তখন এই এলাকায় বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায়। ফি সপ্তাহেই বাবা আসত।

বাবাকে দেখে ভাই খুব ভয় পেত। বাবা ওকে দেখলেই ছুঁড়ে দিত বিছানায়। বলত, তোমার এটা ছেলে, না মেয়ে। এমন ভয় পায় কেন! ওর ভয় কাটাতে হবে। ওকে একবার দিঘা বা পুরীতে নিয়ে যেতে হবে। সমুদ্রের জলে চুবিয়ে, লোনা জল গিলিয়ে ওর ভয় কাটাতে হবে।

আমরা ছোটবেলা থেকে জানতাম দীঘা বা পুরী মানে একটা ভয়ানক জায়গা, সেখানে গেলে আমাদের জন্য ভয়ংকর শাস্তি অপেক্ষা করে আছে।

তার আগে দিনের পর দিন ভাই দেখেছে, আকণ্ঠ মদ খেয়ে বাবা নীচে নেমে এসেছে। একতলার একটা ঘরে আমরা দু-ভাইবোন গুটিশুটি মেরে পড়ে আছি। বাবা নীচে নেমে মাকে টেনে নিয়ে আসত সেই ঘরে। আমাদের দুর দুর করে তাড়াত, তারমধ্যেই কামতাড়িত বাবা চিৎ করে ফেলেছে আমার মাকে বিছানায়। ভাই কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যেতে চাইত মায়ের কাছে। আমি তাকে জোর করে টেনে নিতে যেতে চাইতাম বাইরের উঠোনে।

বাবা বলত, ওকে ছেড়ে দে মুনিয়া, ও বাচ্চা, ও কিছু বুঝবে না।

মা কাতর গলায় বলত, যা, যা, তোরা উঠোনে যা। উঠোনে গিয়ে খেল।

বাবা হা হা করে হাসত, বলত, তোরা উঠোনে গিয়ে খেল। আমরা দুজনে এখানে একটু খেলে নিই।

আমরা দু-ভাইবোন নীচে এসে উঠোনের আমগাছের তলায় ঠাঁয় বসে থাকতাম। আমি ভাইকে লাল পিঁপড়েদের চলাচল দেখাতাম। আমার দু-চোখ বেয়ে দরদর করে জল পড়ত। অপেক্ষা করতাম মা কখন আসবে। ভাই একটু বড় হয়ে ও সব বুঝতে পেরেছিল।

আমাদের এমনও দিন গেছে, বাবা বাড়িতে অন্য মহিলা নিয়ে এসেছে। তারপর মা আমাদের দু-ভাইবোনকে নিয়ে ছাদে উঠে জড়িয়ে ধরে বসে থেকেছি। নীচে-ওপরে বাবার বন্ধুবান্ধবদের উল্লাস। মাসে দু-একদিন, বাবা বাড়ি এলেই আমাদের খারাপ থাকা শুরু হত। আমি শান্ত ছিলাম, কিন্তু সাহসী ছিলাম।

বাবা একবার আমাকে ছুঁড়ে দেবে বলে তুলেছিল, আমি শূন্যে উঠে বাবার হাত কামড়ে দিয়েছিলাম। বাবা আমাকে ছেড়েছিল, আমিও বাবার হাত থেকে এক খাবলা মাংস নিয়ে নীচে নেমেছিলাম। তবু আমি শান্ত ছিলাম। সেদিন যা করেছিলাম, সেটা হয়তো ভয় পেয়ে করেছিলাম। যেমন ভাবে ভয় পেয়ে পশু পাখি কামড়ায়। দেখো, আমার বাবা সারাজীবন নারী আর নেশায় ডুবেছিল। সেই নারী কখনো আমার মা। কখনো দেখেছি, বাইরের মহিলা। তার যে কেউ হতে পারে। খিদের মুখেও মানুষের পছন্দ অপছন্দ থাকে। কিন্তু আমার বাবার বাই চাগাড় দিলে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যেত। আমাদের সামনেই আমার মাকে কুকুর বেড়ালের মতো ঘরের বিছানায় টেনে নিয়ে যেত। আমার বাবা একজন রেপিস্ট ছাড়া আর কিছু না। এই আমার বাবা। এই বাবার যে শত্রু সেই আমার মিত্র।

'তোমার থেকেও তোমার বাবাকে আমি অনেক অনেক বেশি জানি। যা জানি না সেটা বলো। খুনটা কীভাবে করলে?'

'সিম্পল। খুব সিম্পল। ওর তাসেই ওকে বাজিমাত করলাম!'

'কী করে সেটাই আমি জানতে চাই।'

'চাকরি থেকে রিটেয়ার হবার মুখে লোকটা অসুস্থ হয়ে পড়ল। এদিকে আমি স্বামী ছেড়ে ফিরে এসেছি বিদেশ থেকে। একটা চাকরির জন্যে এখানে সেখানে ইন্টারভিউ দিচ্ছি। একটা চাকরি পেয়ে গেলাম প্রাইভেট কলেজে। বাড়িতে অসুস্থ বাবা। মা দিনরাত তার সেবা করছে। অসুস্থ হয়ে বাবা বাড়িতে ঢুকতেই ভাই চলে গেছে ওর চাকরির জায়গায়। সপ্তাহে সপ্তাহে মাকে চোখের দেখা দেখতে একবার বাড়ি যায়। আমি বাড়ি থেকে চলে এসে ভাড়াবাড়িতে আছি। আমি শনিবার যাই, একরাত থেকে ফিরে আসি। বাবাকে দেখার জন্য দুবেলা দুজন মহিলাকে রেখেছি। নার্স নয়, আয়া, কিন্তু তারা হাসপাতালের সঙ্গে অ্যাটাচ থাকার জন্য ওষুধ দিতে পারে, ইঞ্জেকশনও দিতে পারে।

এমনই একদিন বাড়ি গেছি সেই আয়া মহিলাটি বলল, দিদি তোমার বাবা কাল রাতে যে মহিলাটি আসে তাকে টানাটানি করেছে। সে আজ থেকে আসবে না।

সে আরও বলল, দিদি আমার সঙ্গে যদি এমন করে আমি কিন্তু ফেলে পালাব।

আমি তাকে বললাম, তোমরা চলে গেলে মা বড় বিপদে পড়ে যাবে। দয়া করে তুমি যেও না। তেমন কিছু করলে এক ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে, পা ভাঙুক, কোমর ভাঙুক ঠিক হবে।

সে ভয়ার্ত গলায় বলল, উনি পুলিশের বড়বাবু। শুনেছি কদিন আগেও নাকি ওর নামে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত। ও আমার দ্বারা হবে না। তুমি বরং রুবিকে রাখো। ওর স্বভাব চরিত্র ভালো নয়। শুনেছি, অনেক পেশেন্ট পার্টির সঙ্গেই ওর দহরম মহরম।

আমি বললাম, তুমি রুবিকে বলো আমার সঙ্গে দেখা করতে।

রুবি এল, বলল, কোনও চিন্তা করতে হবে না, আমি আছি।

রুবিই থাকল। দু-সপ্তাহ পর একদিন রুবি বলল, তোমার বাবার খুব রস দিদি। পারে না, কিন্তু ইচ্ছে ষোলোআনা! সেদিন আমাকে বলে, যা ওষুধ কিনে নিয়ে আয়। কী অসভ্য! একটা কাগজে আবার ওষুধের নামটা আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে। আমি বললাম, সেই ওষুধ কি তুমি এনেছ? রুবি জিব কাটল, ও দিদি ওই ওষুধ খাওয়ালে আর দেখতে হবে না, বুড়ো নির্ঘাত আমার ওপর বা তোমার মায়ের ওপর চড়বে।

আমি বললাম, দেখি কী ওষুধ?

দেখলাম সিলডেনাফিল গ্রুপের ওষুধ, জাস্ট লাইক ভায়াগ্রা। আমি কাগজটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে দিলাম। বললাম, ভাগ্যিস ওষুধটা কিনে খাওয়াওনি। খেলে কী যে হত।

রুবি হাসল, বলল, ও দিদি এরকম কত পেশেন্ট আমি সামলেছি। তোমার বাবা তো অনেক ভালো। আমার এই বুড়ো ঢ্যামনা পেশেন্ট ছিল, যে ব্লাউজের ভিতর হাত ঢুকিয়ে তবে মুখের ভাত পেটে চালান করত। মাইয়ে না হাত দিতে দিলে ভাতই খেত না।

আমি ফিরে এলাম, ইন্টারনেটে দেখলাম ওই ওষুধের সাইড এফেক্ট মারাত্মক। যে কোনও সময় রক্তচাপ বেড়ে হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। পরিচিত এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে আরও ডিটেলস জানলাম। তাকে বললাম, আমার হাজবেন্ড এই ওষুধ খায়।

সে বলল, ইমিডিয়েট বন্ধ করতে বলো। নইলে যে কোনওদিন বিপদ ঘটে যাবে। সব শুনে আমি সেই ওষুধ কিনলাম এক পাতা। রুবিকে বললাম, উনি যে ওষুধটা লিখে দিয়েছেন, সেটা এনেছি, সপ্তাহে একটা করে খাওয়াবে। আর খাটের সঙ্গে হাত পা বেঁধে রাখবে। তুমি পারবে?

রুবি বলল, খুব পারব। এরপর প্রতি শনিবার একটা করে ওষুধ খাইয়ে খাটের সঙ্গে হাত পা বেঁধে রাখা হত। উনি কাম তাড়িত হয়ে, বিছানায় গোঁ গোঁ আওয়াজ করে রুবিকে ডাকত। মাকে ডাকত। শুনতাম। আমার ভিতর বলির বাজনা বাজত। এই ওষুধ খেয়ে কত মেয়ের উনি সর্বনাশ করেছেন, ওই ওষুধ তখন একটু একটু করে ওঁকে মরণের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আমার খুব মজা হচ্ছিল। এক শনিবার রুবি ওঁর হাত পা বেঁধে একটা ওষুধ খাইয়ে চলে গেল। উনি শুয়ে শুয়ে গোঁ গোঁ করছিলেন, আমি এক রাশ ঘেন্না নিয়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, এমন করছ কেন? বলল, রুবি ফি শনিবার কী একটা ওষুধ খাওয়াচ্ছে, ওই ওষুধটা খেলে আমার খুব কষ্ট হয়। ওষুধটা দিতে ওকে বারণ কর।

আমি বললাম, ওষুধটা তুমি লিখে দিয়েছ রুবিকে। এটা কোনও ডাক্তারের ওষুধ নয়। শুনে বললেন, না, না, ওই ওষুধ আর আমি খাব না। তোর মাকে একবার আমাকে কাছে ডেকে দে। বল, আমি ডাকছি।

আমি বললাম, মা আসবে না। আমার কথা শুনে উনি একটা নোংরা খিস্তি দিল।

আমি বললাম, আমি তোমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি, ঘুমিয়ে পড়ো।

উনি রাজি হয়ে গেলেন। আমি তখন ঘেন্নায় গা হাত পা জ্বলছে। আমি আবার ওই ওষুধ আর একটা দিয়ে দিলাম। ওষুধটা দিয়ে ওর দু-হাতের বাঁধন খুলে দিলাম। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দেখলাম, সারারাত ধরে ছটফট করছেন। সকালে দেখলাম মরে পড়ে আছে। ডাক্তার আমার খুব পরিচিত। তার হয়তো একটু অস্বাভাবিক লেগেছিল, কিন্তু অসুস্থ মানুষের মরণ স্বাভাবিকই ঘটনা। ঝামেলা মিটে গেল।

আমি মুনিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। 'তুমি ঘুমাও।'

মুনিয়া বলল, 'হ্যাঁ, আমি আজ একটু শান্তিতে ঘুমাব। আমার আর কারও প্রতি শত্রুতা নেই।'

টং করে মুনিয়ার মোবাইলে একটা মেসেজ ঢুকল। মেসেজ খুলে মুনিয়া হাসল, বলল, 'অংশুমান।'

মুনিয়া হাসল।

অংশু লিখেছে ও খুব তাড়াতাড়ি ফিরছে। আমাকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে।

আমি আলগোছে মুনিয়াকে বুকের ভিতর টেনে নিলাম।

মুনিয়া হাসল, 'আমি রেডি! কাম অন অংশু!'

মুনিয়া লিখল, 'ওয়েলকাম!'

অধ্যায় ১৩ / ১৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%