নবম অধ্যায়

জয়ন্ত দে

মুনিয়ার কথা মিলিয়ে নেওয়ার জন্য আমি অফিস থেকে দুপুরের দিকে চলে গেলাম সৈকতের বাড়ি।

সৈকতের মা আর বোন থাকেন। সঙ্গে প্রায় পাঁচজন কাজের লোক। বিশাল বাড়ি। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, বেশ শৌখিন আর আভিজাত্যপূর্ণ! চেন দিয়ে বাঁধা বেশ বড় তালা ঝুলছে বাড়ির গেটে। গেটের গায়ে পর পর তিনটে নাম লেখা। সৈকত চ্যাটার্জি, স্বাতীলেখা চ্যাটার্জি, স্বাতীনক্ষত্র চ্যাটার্জি।

Beware of dog কুকুর হইতে সাবধান।

মুনিয়ার কাছেই শুনেছি মা আর বোন। স্বাতীলেখা মা আর স্বাতীনক্ষত্র বোন। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই একজন দৌড়ে এল। দারোয়ানই হবে। বললাম, স্বাতী দেবীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমার কথা শুনে, লোকটা আধভাঙা হিন্দিতে বলল। কৌন? দুজন স্বাতী আছেন।

আমি আবার বললাম, দুজনের সঙ্গেই দেখা করতে চাই। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটার কেমন যেন সন্দেহ হল। স্বাভাবিক হওয়ারই কথা, নাহলেই বুঝতাম আমি পালটে গেছি। একটু ভয়মিশ্রিত গলায় বলল, 'আপ?'

এবার সরাসরি নিজের পরিচয় দিলাম। বললাম, লালবাজার থেকে আসছি। পুলিশ!

লোকটা বিড়বিড় করে কপালে হাত দিল, বলল, কুত্তা।

কুত্তা! আমি বুঝলাম লোকটা আমাকে গালাগালি দিল। কিন্তু আমার মাথা ঠান্ডা। কুত্তা বা শুয়োরে আমার কিছু যায় আসে না। তবু লোকটা গেট না খুলে চলে যাচ্ছিল বাড়ির ভিতর। আমি চাপা গলায় ধমক দিলাম আভি গেট খুলো।

লোকটা ভয় পেয়েই গেট খুলে আমাকে ঢুকিয়েই দৌড়ে চলে গেল বাড়ির ভিতর। নিশ্চিত বলে এল, পুলিশ এসেছে বাড়িতে!

আমি বারান্দার সামনে যেতেই লোকটা বেরিয়ে এসে একটা ঘর দেখাল। 'ইধার আইয়ে সাব!'

সেই ঘরের দরজা খোলা ছিল না। ভিতর থেকে একজন মহিলা দরজা খুলে দিল। শুধু দরজাই খোলা হল, জানালাগুলো সব বন্ধ। ঘরের ভিতর চাপা গুমোট, মনে হল এই ঘরটা রোজ খোলা হয় না। সামনে পাতা সোফা, সেখানেই বসলাম। পরক্ষণেই আরও দুজন কাজের মহিলা ঘুরে গেল। একজন জল দিয়ে গেল। আর একজন বুদ্ধিমতী, সে তীক্ষ্ন চোখে আমাকে মেপে নিল। আমি কে?

ভেবেছিলাম ইনসিউরেন্স কোম্পানির নাম বলে ওই বাড়িতে ঢুকব। কিন্তু হল না। ঢুকতে পারতাম না। অগত্য লালবাজারই! একটু পরেই সৈকতের মা আর দিদি এসে হাজির। দুজনের গায়ে হাউসকোট চাপানো। দুজনের নামের যেমন মিল, দেখতেও একই রকম। দিব্যি বোন বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওঁদের বসতে বললাম। প্রথম যিনি কথা বললেন, তিনি স্বাতীনক্ষত্র। 'দেখুন আমাদের তো ওই ডগ বাইটের কেসটা মিটে গেছে। আমরা সেরকমই জানতাম। পুলিশ থেকে তাই বলা হয়েছে। এখন কী ব্যাপার বলুন তো?'

ডগ বাইট! আমি একটু থমকে গিয়ে বললাম, 'না, না, আমি কোনও কুকুর কামড়ানোর কেস নিয়ে আসিনি।'

'তবে?' পাশের জন যাঁকে বড় মনে হচ্ছে তিনিই বললেন।

আমি বললাম, 'আমার নাম ধূমকেতু রাহা। লালবাজার গোয়েন্দা বিভাগ। এই যে আমার কার্ড। আমি একটা ইনকোয়ারিতে এসেছি।'

'ইনকোয়ারি? কুকুরের ব্যাপার নয়।'

'না।'

'আপনি কী ব্যাপারে এসেছেন একটু বলবেন?'

'আমি সৈকত চ্যাটার্জির বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলতে চাই। অ্যাবাউট সৈকত চ্যাটার্জি।'

'আমি সৈকতের দিদি আর উনি আমাদের মা। আমার নাম স্বাতীনক্ষত্র চ্যাটার্জি, উনি স্বাতীলেখা চ্যাটার্জি।'

আমি হালকা গলা খাকারি দিলাম। বললাম, সৈকতবাবুর মৃত্যু নিয়ে আমাদের কিছু জানার আছে?'

সৈকতের মৃত্যু কেন বলুন তো?' দুজনের মুখই বিষণ্ণ সেইসঙ্গে থমথমে হয়ে গেল।

বাইরে দিন গড়িয়ে বিকেল। খোলা দরজা দিয়ে দু-একটা শুকনো পাতা উড়ে এল ঘরে। ঘরটা আধো অন্ধকার, যদিও আলো জ্বলছে। একমাত্র টিউবের আলো যথেষ্ট নয়, বিশাল উঁচু সিলিং। আগেই মনে হয়েছিল এই ঘরটা খুব একটা খোলা হয় না। আমি বন্ধ জানালাগুলো দেখছিলাম। এত বড় বড় জানালা। অথচ সব বন্ধ! একজন মহিলা ট্রেতে কাপ, টি পট, সুগার, মিল্ক সব নিয়ে হাজির হলেন।

স্বাতীনক্ষত্র আঙুল দিয়ে টি টেবিল দেখালেন। তিনি রেখে দাঁড়ালেন। স্বাতীলেখা বললেন, 'জানালাগুলো সব খুলে দে মালতী।'

পর পর জানালাগুলো খুলে দেওয়া হল।

স্বাতীলেখা বললেন, 'এটা সৈকতের ঘর। মানে বসার ঘর। বাইরে কেউ এলে এখানে বসেই কথা বলত। শেষের দিকে সর্বক্ষণ এই ঘরেই থাকত। আপনি চা খান।'

ততক্ষণে স্বাতীনক্ষত্র চা বানিয়ে ফেলেছেন, বললেন, 'সুগার?'

আমি মাথা নাড়ালাম, 'দরকার নেই।'

স্বাতীনক্ষত্র বলল, 'আপনি কি লিকার খেতেন? আমি কিন্তু মিল্ক মিশিয়েছি।'

'অসুবিধে নেই, দিন।'

তিনি চায়ের কাপ, বিস্কুটের প্লেট এগিয়ে দিলেন। বললেন, 'সরি, আপনি কেন এসেছেন ঠিক বুঝলাম না।'

'আমি সৈকতবাবুর মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাই।'

স্বাতীনক্ষত্র একটু থমকে থাকলেন। বললেন, 'সৈকত আমার ভাই। ও বছর দেড়েক অসুস্থ ছিল, মাস ছয়েক আগে চলে যায়।'

'কী হয়েছিল?'

'স্ট্রোক। দীর্ঘদিন ডানদিকটা প্যারালিসিস হয়ে গিয়েছিল। ফিজিওথেরাপি চলছিল।'

'হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন? তেমন কোনও কারণ জানতে পেরেছিলেন?'

ঘরের ভিতর দুজনেই চুপ। কেউ কোনও কথা বলছে না। কাপের চা প্রায় শেষ হয়ে এল। স্বাতীলেখা বললেন, 'আপনি কেন এসেছেন জানতে পারি? কীসের ইনকোয়ারি, আমরা এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না?'

'একটা ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি আমাদের কাছে কিছু তথ্য দিয়েছে, সৈকতবাবুর মৃত্যু হয়েছে মেডিক্যাল ত্রুটি, ভুল চিকিৎসার জন্য কী না। তাদের সন্দেহ চিকিৎসা ঠিক হয়নি। এই ঠিক না-হওয়াটা কি ইচ্ছাকৃত!'

'ইমপশিবল!' স্বাতীনক্ষত্র ছিটকে উঠল।

'ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি বলতে চাইছে সৈকতবাবুর মৃত্যুর মধ্যে কোনও রহস্য আছে। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ, যাঁর বয়েস বেশ কম, তাঁর হঠাৎ স্ট্রোক হল। তারপর, মাত্র দেড় বছর বেঁচে থাকলেন? কেন? ডাক্তারদের যা রিপোর্ট তিনি বার বার সুস্থ হওয়ার মুখ থেকে আবার অসুস্থ হয়েছেন? কেন? কেউ বা কারা এটা ইচ্ছে করে ঘটায়নি তো? একটা প্রশ্ন রয়েছে।'

স্বাতীনক্ষত্র খুব শান্ত আর ঠান্ডা গলায় কেটে কেটে বললেন, 'দেখুন, কে কী বলে অভিযোগ করেছেন আমরা জানি না। তবে আমাদের কাছে ওর ট্রিটমেন্টের সমস্ত পেপার আছে। আমরা একজন নয়, একাধিক ডাক্তার দেখিয়েছি। কলকাতা শহরের বড় বড় ডাক্তারবাবুরাই দেখেছেন। তাঁরা সবাই বলেছেন, মেন্টাল শক থেকে এই হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে। স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।'

'ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি ঠিক এ কথাটাই বলতে চাইছে, কেন হল না? কীসের এত চিন্তা? উনি অবসাদে ভুগতেন, কেন? কোম্পানি খুলবেন ভেবেছিলেন, পারলেন না বলে?'

'কে বলল, ও কোম্পানি খুলতে পারল না? কোম্পানি তো খুলেছিল, আরও বড় করার ড্রিম ছিল। সেটাও অন প্রসেস ছিল, তারমধ্যেই ও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। আসলে ও মানসিক চাপটা নিতে পারছিল না। সত্যি কথা বলতে, আমার ভাই একটু লেজি। শুয়ে বসে থাকতেই ভালোবাসে। হুটপাট করে ডিসিশন নেয়। ভালো স্টুডেন্ট। চাকরিও করত ভালো। সেটাই ওর ঠিক ছিল। হঠাৎই মাথায় চাপল বিজনেস করবে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে এল। কিন্তু বিজনেস করা দু-দশ লাখ টাকার বিষয় নয়। সে অর্থে ব্যাংক লোন পেতে গেলে যা করতে হয় সে ওই চ্যানেলে যেতে পারছিল না। মাঝে লোন সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু টাকা ফ্রডও হল। আমরা ওকে পরামর্শ দিলাম, ধীরে চলো।'

'তারপরেই কি মানসিক চাপ?'

ঘরের ভিতর আবার নীরবতা।

এবার কথা শুরু করলেন স্বাতীলেখা। বললেন, 'দেখুন, সবার সন্তানই তার মায়ের কাছে ভালো। কিন্তু আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার সন্তান সত্যি খুব ভালো। ও পাঁচবছর ব্যাঙ্গালুরুতে পড়াশোনা করেছে। তারপর চাকরি করেছে। থাকত ওর কুট্টিমাসির বাড়ি। কুট্টি আমার বান্ধবী কাম বোন। সেই কুট্টি ওকে এভরি ডে মনিটারিং করত। কিন্তু কোনওদিন সামান্যরকম কোনও খারাপ কিছু পাইনি। জল-আলো নষ্ট না করা থেকে শুরু করে স্বভাব চরিত্র নিয়ে কোনও অভিযোগ কেউ কখনো করেনি। আগে আমি বিয়ের চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিল, বিয়ে করবে না। আমরা ওকে বিয়ে নিয়ে কখনো চাপ দিইনি। আমাদের পছন্দের একটা পাত্রী ছিল। সেটা ওরও অপছন্দের ছিল না। আমাদের আত্মীয়দের মধ্যেই। কিন্তু কী হল হঠাৎ দেখলাম সেই ছেলে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে বসেছে।'

স্বাতীলেখার থেকে কথা কেড়ে নিল স্বাতীনক্ষত্র। তিনি তাঁর মাকে থামিয়ে বেশ চাপা গলায় বলল, 'ওই বিয়েই ওর কাল হল। একটা গানের অনুষ্ঠানে গিয়েই মেয়েটির সঙ্গে আলাপ। শুনেছি ফোর্থ ডে-তে বিয়ের ডিসিশন এবং তারপরের দিনই বিয়ে। ভাবা যায়! একটা স্ট্যাটাসলেস মেয়ে। মেয়েটির বাবা পুলিশ। আমি জানি না, অন্য কোনও চাপ ছিল কি না? শুনলাম বিয়ে করেছে। যখনই শুনলাম বিয়ে করেছে, আমাদের তরফের যে আপত্তি বা অপছন্দ সেটা যেমন জানিয়েছিলাম, তেমনই বলেছিলাম বউ নিয়ে এসো। তার বেশ কয়েকদিন পরে বউ নিয়ে এল। দেখতে শুনতে খারাপ নয়। শুনেছিলাম একটা প্রাইভেট কলেজে পড়াত, পরে জানলাম একটা এমএনসিতে চাকরি করে। খুব শান্ত, ধীর স্থির ভদ্র। দু দিন এখানে ছিল, বাবার শরীর খারাপের খবর এলে বাড়ি চলে গেল। ওদের বাড়ির কেউ কখনো আসেননি। আমাদের একবারের জন্য কেউ হাই হ্যালো করেননি। বাবা অসুস্থ, কিন্তু মেয়েটির মা ছিলেন, ভাই ছিলেন। এঁরা কারা আমরা জানি না। আমার বিশ্বাস ভাইও ভালো করে জানত না। তবু, আমরা রিসেপশনের আয়োজন করলাম। কিন্তু অভদ্র একটা মেয়ে। মান সম্মানের ধার ধারল না। নাহলে রিপেসশনে কেউ কোনওদিন এমন কাণ্ড করে?'

'কী করেছিল?'

'রিসেপশন পার্টিতে ককটেলের ব্যবস্থা ছিল। ডক্টর দাশগুপ্তের ছেলে নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে হার্ডড্রিঙ্ক নিয়ে এসে খাচ্ছিল। চোদ্দো পনেরো বছরের ছেলে। ও এটা দেখে ছেলেটিকে ধমকায়, শুধু তাই নয় ডক্টর দাশগুপ্তকে ডেকে নালিশ করে। ভদ্র হওয়ার শিক্ষা দেয়। কী এম্বারাসিং বলুন। ডক্টর দাশগুপ্তের কাছে আমাদের মাথা কাটা যায়। ওর স্টান্ডার্ডটাই বড় লো। তারপর থাকেনি এ বাড়িতে। চাকরির সুবিধের জন্য, বাবার ফ্ল্যাটেই থাকত। এ বাড়িমুখো হত না। আমরাও ওকে মেনে নিতে পারতাম না। এই নিয়ে সৈকত চাপে ছিল। এভাবে বছর খানেক কাটল, তারপরেই ঘটল কুকুরের কাণ্ডটা।'

'কুকুরের কাণ্ড?'

'ডগ বাইটের ব্যাপারটা জানেন না? ডগ বাইটের পর সৈকত খুব চাপে পড়ে গিয়েছিল। থানা পুলিশ। কারণ কুকুরটা ছিল আমার।'

'কী হয়েছিল?'

স্বাতীলেখা স্বাতীনক্ষত্র দুজনেই বোবা মেরে বসে।

আমি খুব হালকা গলায় বললাম, 'আমি কী জানি সেটা বড় কথা নয়। আগে আপনারা পুলিশকে যা বলেছেন সেটুকুই আমাকে বলুন। আমরা জাস্ট দু-লাইনের একটা রিপোর্ট দেব। এই ক্লিয়ারেন্সটাই ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি চাইছে। নইলে এই বিশাল অ্যামাউন্টের টাকা রিটার্ন হয়ে যাবে। আর একটা কথা, এই টাকাটা সৈকতের মা-ই পাবেন। স্ত্রী বা অন্য কেউ নয়। সৈকতের চাকরিকালীন পাওনার বড় একটা টাকা। আমাকে রিপোর্ট দিতে হবে সৈকতবাবু মৃত্যুটা স্বাভাবিক, না অস্বাভাবিক?'

টাকার কথায় দুজনেই যেন নড়ে উঠলেন।

স্বাতীনক্ষত্র বললেন, 'হ্যাঁ, মায়ের টাকার খুব দরকার। কিন্তু আমরা না খেতে পেয়ে মরব না। আপনি হয়তো জানেন না আমার হাসবেন্ড পাইলট ছিল। তিনি প্লেন ক্র্যাশে মারা যান। আমার শ্বশুরবাড়ি কোনও টাকাই নেননি। সব আমাকে দিয়ে দিয়েছে। ভাইয়ের টাকার প্রতি আমার কোনও লোভ বা দাবি নেই। আপনাকে আমি সবটাই বলছি, যা সত্যি তা বলছি। কিন্তু এটা টাকার জন্য বলছি না। মায়ের সব দায়িত্বই আমার। আর আমার ভাইয়ের মৃত্যু অসুস্থতাজনিত কারণেই মৃত্যু, শুধু কিছু টাকা না দেওয়ার অছিলায় কালি ছেটাবেন না। প্রয়োজনে ওই টাকার দাবি আমরা করব না। আশা করি মাও করবে না।'

আমি চুপ করে বসি শুরু করেন স্বাতীনক্ষত্র।

'আপনি এ বাড়িতে এলেন, কিন্তু কোনও কুকুর দেখলেন না, কোনও কুকুরের ডাক শুনলেন না। কিন্তু একটা সময়ে আমাদের বাড়িতে কম করে চার পাঁচটা কুকুর থাকত। তারাও এ বাড়ির সদস্য ছিল। এটা আমার বাবার শখ। বাবার থেকে মা। তারপর আমি বা ভাই। আমাদের সবার কুকুর অন্তপ্রাণ!

আমার বাবার পছন্দ ছিল অ্যালসেশিয়ান। অলওয়েজ অ্যালসেশিয়ান। আমার পছন্দ ছোট, স্পিৎস, লাসা। তবু আমার বড় কুকুরের মধ্যে দুটো ল্যাব্রেডরও ছিল একসময়। কিন্তু ভাইয়ের পছন্দ ছিল অদ্ভুত। ও দুটো স্ট্রিট ডগ তুলে এনে পুষেছিল। তারা দিন রাত আমাদের বাগানে থাকত। মানেভঞ্জ থেকে একটা পাহাড়ি কুকুর নিয়ে এসেছিল। একটা গোল্ডেন রিট্রিভার ছিল। তারপর অফিস ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এখানে চলে আসার পর, আমিই একদিন ওকে একটা ডোবারম্যান গিফট করেছিলাম। ভাই মজা করে বলত আমি বেকার তুই আমাকে ডোবারম্যান এনে দিলি। না, না, তোর কুকুর তোরই থাক। কুকুরটা তখন থেকে আমার। ওর সব খরচা আমিই দিতাম। কিন্তু সেই ডোবারম্যান মানে কিং এই ঘরেই দিন রাত থাকত। বড়জোর বারান্দায় বাঁধা থাকত। ওর চেহারার মধ্যে কেমন একটা খুনে ভাব ছিল। সে সময় এই বাড়িতে আরও পাঁচটা কুকুর ছিল। তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাব ছিল। যদিবা কখনো ভাবের ঘাটতি থাকে তবু কেউ কাউকে অন্তত আক্রমণ করত না কিন্তু ওই ডোবারম্যানটা আসার পর সব সমীকরণ যেন বদলে গেল। ভাই অনেকবার বলেছে, কিংকে রাতে খুলে দেব। আমরা রাজি হইনি। তবে হ্যাঁ, কিং খুব কথা শুনত।

আমাদের সব কুকুরেরই হেলথ আর ট্রেনিং প্রপার করা হয়। কিংয়ের জন্যও সেই ব্যবস্থা ছিল।

এই সময় মাঝে মাঝেই ভাই মুনিয়াদের ফ্ল্যাটে যেত। মুনিয়া আমার ভাইয়ের স্ত্রী। মাঝে মাঝে কেন প্রায় রোজই যেত। ওর সঙ্গে কিং থাকত। আমি যা শুনেছি, সে সময়ই কিংয়ের সঙ্গে মুনিয়া বেশ ফ্রেন্ডশিপ হয়ে যায়। এরমধ্যে আমি আর মা লন্ডন গিয়েছিলাম। প্রায় মাসদুয়েক আমরা রোমি মাসির বাড়িতে থাকি। ফিরে আসার পরও সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। এরমধ্যে এল সেই ভয়ংকর দিন। আমাদের বাড়িতেই কিংকে দেখতে এল মুনিয়ার এক ডাক্তার বন্ধু। তিনি একজন পাশ করা, প্রফেশনালি ভেটারেনারি ডক্টর। কিন্তু সে কাছে যেতেই সেকেন্ডের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিং। ভয়ংকর হিংস্র হয়ে ডক্টরের গলার নলি ছিঁড়ে দিল। ভয়াবহ ঘটনা, আপনি নিশ্চয়ই জানেন। সেই মৃত্যু নিয়ে আমাদের খুব হ্যারাসমেন্ট হয়েছে। খুউব খুউব হ্যারাসমেন্ট ভাবা যায় না। তার কিছুদিন পরেই ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ল। দেড় বছর ভুগেছিল। তারপর চলে গেল। ওর চিকিৎসা সংক্রান্ত সব কাগজ আমাদের কাছে আছে। আপনি বললে, আমরা ল-ইয়ারের মাধ্যমে সব কাগজ পাঠিয়ে দেব।'

'তাহলে কি ওই শকটাই সৈকতবাবু নিতে পারেননি?'

'দেখুন আপনি যদি বলেন, পারটিকুলার ওই শক তাহলে বলব, ওটা অর্ধসত্য। ফার্স্ট, চাকরিটা হঠাৎ ছেড়ে দেওয়া। কী সমস্যা হয়েছিল আমরা জানি না। সেকেন্ড, তিন বছরের চেষ্টাতেও সে অর্থে কোম্পনিটা দাঁড় করাতে পারল না। একটা হতাশা তো ছিলই। বলতে পারেন স্বপ্নভঙ্গ! থার্ড, বিয়ে। একটা বাজে মেয়ে। হঠকারী সিদ্ধান্ত, ভুল সিদ্ধান্ত নির্ঘাত পরে বুঝেছিল। শেষে হল ডগ বাইট। আমরা সব কুকুর বিদায় করে দিয়েছি। এই বাড়ি এখন কুকুর শূন্য। যা আমরা ভাবতে পারি না। এটা আমাদের সবাইকেই অবসাদগ্রস্ত করে দিয়েছে। এবার দেখুন আপনি কী রিপোর্ট দেবেন।'

'থ্যাঙ্ক ইউ।'

তবে কি আমি মুনিয়ার দ্বিতীয় খুনটার হদিশও পেয়ে গেলাম। কিন্তু এই ভেটেরিনারি ডাক্তার কে?

মানে তাহলে ভেটেরিনারি ডাক্তার প্রথম শিকার, মুনিয়ার প্রেমিক। দ্বিতীয় শিকার সৈকত চ্যাটার্জি। তৃতীয়...?

দারোয়ানের বলে ওঠা 'কুত্তা' কথাটার মানেও আমার কাছে এখন পরিষ্কার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%