দ্বাদশ অধ্যায়

জয়ন্ত দে

আমার পাশে বসে মুনিয়া কাঁদছে। মুনিয়া নিজের জন্য কাঁদছে না। কাঁদছে অংশুমানের বাবা-মা'র কষ্ট দেখে, অংশুমানের বাবা-মায়ের কান্না দেখে।

আমরা যখন ওদের বাড়ি গেলাম, ওঁরা আমাদের দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আমাকে চেনেন না, আমি পরিচয় দিয়েছিলাম, মুনিয়ার বাবার কলিগ। এবং অবশ্যই লালবাজার। তবে তার আগেই ওঁরা মুনিয়াকে আর আমাকে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমরা বসি চা খাই। তারপর কথা শুরু করে মুনিয়া, আমার শেখানো মতোই ও শান্তভাবে বলে, আপনারা আবার অংশুমানের বিয়ের ঠিক করছেন। আমি সেই প্রসঙ্গে কটা কথা আপনাদের বলতে এসেছি। অংশুমান শারীরিকভাবে সুস্থ নয়। ও আপনাদের কথায় বিয়ে করছে। প্রথম বারও করেছে। না করলে আপনারা কষ্ট পেতেন। তাই বিয়ে করেছে। আমি বিয়ের পর আপনার ছেলের কাছে যখন যাই, তখন ও আমাকে সবটা বলেছে। আপনারা হয়তো জানেন না, জানার কথাও নয়, আপনার ছেলের মেয়েদের প্রতি টান তৈরি হয় না। তার ছেলেদের প্রতিই টান। আপনাদের কাছে বলতে খুব খারাপ লাগছে, ওর ছোটবেলা থেকে এই প্রবৃত্তিটা আছে। এটাকে হোমোসেক্সচুয়াল বিহেবিয়ার বলে। আমি আমেরিকায় অংশুকে ডাক্তার দেখাতে চেয়েছিলাম। অংশু রাজি হয়নি। তার কারণ, ওদেশে এটা কোনও অসুখ নয়, স্বাভাবিক।

যেটা আবার এদেশে অস্বাভাবিক। এখন অবশ্য খবরের কাগজে মাঝে মাঝে দেখবেন, এইসব নিয়ে খবর করে। ছেলে ছেলে বিয়ে হচ্ছে। ওখানে ছেলে ছেলে বিয়ে হয়, মেয়ে মেয়ে বিয়ে হয়, একসঙ্গে থাকে। আপনার ছেলের আমেরিকাতে এরকম একজন পুরুষ-বন্ধু আছে। সে খুব ভালো। দীর্ঘদিন ওদের মধ্যে সম্পর্ক আছে। আমি তাকে চিনি। এই কারণেই আপনার ছেলের সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়। এছাড়া আমাদের দুজনের মধ্যে কোনওদিন কোনও গোলমাল হয়নি। আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। এখনও আমার সঙ্গে ওর মাঝে মাঝেই ফোনে কথা হয়। আমি ওকে কাল ফোন করে এই বিয়ে করতে বারণ করেছিলাম। কিন্তু ও বলল তাতে আপনারা কষ্ট পাবেন। আমি ওকে বলেছি, মানে আমি দায়িত্ব নিয়েছি, আজ ফোনে আপনাদের সব কথা শোনাব। শুধু আপনারা কোনও কথা বলবেন না।'

মুনিয়াকে ঠিক এই জায়গায় আমি থামাই।

পরিষ্কার করে অংশুমানের বাবা-মাকে বলি আপনার ছেলে পুলিশের চোখে একজন ক্রিমিনাল। সে তার নিজের শারীরিক অসুস্থতা জেনে শুনে একজন বিয়ে করেছিল। পরে ডিভোর্স হয়। সে এখন আবার সেই কাজ করতে যাচ্ছে। এই কাজ আমরা করতে দেব না। ওকে অ্যারেস্ট করে জেল খাটাব। মুনিয়া লালবাজারে অংশুমানের নামে বিয়ের নামে প্রতারণা, তাকে এবং তাদের পরিবারকে ঠকানো, বিদেশে নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলা, দাম্পত্যে অসহযোগিতা সহ অনেক অভিযোগ এনেছে। আমি তদন্ত করতে এসেছি। এখন তদন্তের স্বার্থে আমরা অংশুমানের নিজের মুখ থেকে সব কথা শুনতে চাই। তাই, মুনিয়া যখন কথা বলবে, আমরা কেউ কথা বলব না। একমাত্র মুনিয়াই কথা বলবে। কিন্তু আমরা অসাবধানতায় কথা বলে ফেলতে পারি। তাই এই ঘরে আপনাদের দুজনের মুখে মুনিয়া লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে দেবে। যাতে অংশুমান ঘুণাক্ষরেও না জানতে আমরা যে ফোনের এপারে আছি, সেটা জানলে ও খুব কষ্ট পাবে। এমনকী সুইসাইডও করে ফেলতে পারে। আমরা কেউ অংশুর মৃত্যু চাই না। তাই মুনিয়া আপনাদের মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে দিক। আর যদি আপনারা না লাগাতে চান, তবে লাগাবেন না। কিন্তু আপনারা সামান্য একটা কথা থেকে কী ভয়ংকর বিপদ হতে পারে সেটার দায়িত্ব নিজেদের নিতে হবে।

অংশুমানের বাবা বললেন, তিনি কোনও কথা বলবেন না। আর মুখের লিউকোপ্লাস্টও লাগাবেন না।

অংশুমানের মা বললেন, তিনি মুখে কাপড় গুঁজে নিচ্ছেন।

ঘড়িতে সাতটা পাঁচ। মুনিয়া অংশুমানকে ফোন করে। বলল,

অংশু তাহলে কী ঠিক করলে, তুমি আবার বিয়ে করবে?

আমি কী করি বলো তো? বাবা-মাকে এতদিন আটকে রেখেছিলাম, ওনারা আবার পাগলামি করছেন।

অংশু তুমি বলে দাও, তুমি বিয়ে করতে পারবে না। তুমি সুস্থ নও।

মুনিয়া, এটাই তোমাদের ভুল ধারণা। আমি সম্পূর্ণভাবে সুস্থ। এটা তোমাদের ট্যাবু। এখানে একটি ছেলে আর একটি ছেলের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারে। ওটা তোমাদের ওখানে অসুস্থতার লক্ষণ। এখানে নয়।

অংশু, তুমি যে মেয়েটিকে বিয়ে করছ, তার তো কোনও দোষ নেই। সে তোমাকে স্বামী হিসেবেই চাইবে। তুমি স্বামীর পুরো দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।

তাকে আমি সব দেব। প্রয়োজনে সে অন্য ছেলের সঙ্গে ডেট করলে আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি তো তোমাকেও এই অফার দিয়েছিলাম মুনিয়া।

এভাবে কি হয় অংশু? প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন থাকে স্বামী সন্তান। ঠিক আছে, তুমি নয় স্বামী সেজে থাকলে, কিন্তু সন্তান?

দেখো সন্তান নিয়ে এত চিন্তার কিছু নেই। কারও সঙ্গে না শুয়েও তুমি মা হতে পারতে। এখানে স্পার্ম ব্যাংক আছে। তুমি চাইলে আমি তোমাকে ব্যবস্থা করে দিতাম। এছাড়াও অন্যের থেকে বাচ্চা কনসিভ করলেও আমার আপত্তি নেই। শুধু আমি কোনও মেয়ের সঙ্গে ফিজিকালি ইন্টিমেড হতে পারব না। কোনও মেয়ের সঙ্গে ইন্টারকোর্স চ্যাপটারটাও আমার জীবনে নেই। এটুকু ছেড়ে দিলেই হবে। আমি নিজের আত্মাকে রেপ করতে দেব না। মুনিয়া আমি অ্যালেক্সকে নিয়েই থাকব। আমি ওকে ভালোবাসি। দীর্ঘদিন তো আছি, আমাদের দুজনের মধ্যে কোনও সমস্যা নেই।

ঠিক এইসময় অংশুর মা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ডুকরে ওঠে। যা অংশুমানের শোনার কথা নয়। কিন্তু মুনিয়া প্ল্যান মাফিক অংশুমানকে বলে— আমি তোমাদের বাড়ি এসেছি। তোমার বাবা-মায়ের সামনে বসে ফোন করছি। আমার ফোন স্পিকারে। তোমার বাবা-মা তোমার সব কথা শুনেছে। তুমি কে? কী ব্যাপার সব জেনে গেছে। অ্যালেক্স-এর কথাও বললে। এবার তুমি ঠিক করো কী করবে?

ফোনের ভিতর থেকে আর্তনাদ করে ওকে অংশুমান। কী বলছ তুমি?

আমি ঠিক বলছি। প্রয়োজন পড়লে তুমি ভিডিও কল করো। আমি লালবাজারে তোমার নামে কমপ্লেনও লজ করেছি। এফআইআরে পরিষ্কার করে লিখে দিয়েছি, তুমি আর একজন মেয়ের সঙ্গে, তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করছ, এর সঙ্গে তোমার বাবা-মাও জড়িত। আশা করি আমি আমার সব অভিযোগ প্রমাণ করতে পারব। তুমি নয় মিথ্যে বলবে, কিন্তু তোমার বাবা-মা লালবাজারে গিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারবেন তো? ওনারা এই মুহূর্ত থেকে পুরো ব্যাপারটা জানলেন। আমি ওনাদের নামেও ডায়েরি করেছি।

না, না, তুমি এটা করতে পার না!

কে বলল, পারি না। নাও, তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলো।

দুজনেই চুপ করে আছেন।

মুনিয়া বলল, 'নিন, ছেলেকে বলে দিন, আপনাদের কাছে আমি বসে আছি, আপনারা সব শুনেছেন।'

অংশুমানের বাবা ঢোঁক গেলেন।

আমি বলি লালবাজারের ফ্রড সেকশান থেকে আমি ধূমকেতু রাহা এসেছিলাম কেসটা ইনভেস্টিগেট করতে। আমাদের সামনেই আপনার বাবা-মা বসে। আপনি ওনাদের সঙ্গে কথা বলুন। ওনারা কথা বলতে চাইছে।

ফোনের ওপার থেকে অংশুমান ডুকরে কেঁদে ওঠে। অংশুমানের মাও খুব জোরে কেঁদে ওঠেন। অংশুমানের বাবা কান্না চাপতে চাপতে বলেন, আজই আমরা বিয়ে ক্যানসেল করে দিচ্ছি। তুই আর এখানে আসবি না।

মুনিয়া গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে, বলে, অংশু আমি লাইন কেটে দিচ্ছি। এবার তুমি আর তোমার বাবা-মা ঠিক করে নাও, কীভাবে তিনজনে জেলে গিয়ে ঘানি টানবে। আমি চলে যাচ্ছি, টা টা, বাবা-মাকে কষ্ট দিতে চাওনি, তাই আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছ। আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আমি সেই কষ্ট তোমাদের ফিরিয়ে দিলাম। আমার আর কোনও আপশোস নেই। তুমি অ্যালেক্সকে নিয়ে এসো। তোমার বাবা মা দেখুক, তার একমাত্র ছেলের বউয়ের কী সুন্দর সোনালি দাড়ি। পারলে অ্যালেক্সের সঙ্গেই ওরা ঘটা করে বিয়ে দিক।

অংশুমান ফোনের ওপর থেকে শান্ত গলায় বলল, তুমি তোমার নোংরা বাবার গল্প আমাকে বলেছিলে। বলেছিলে তোমার সাহস থাকলে তোমার বাবাকে খুন করতে। তুমি সাহসের অভাবে তোমার বাবাকে মারতে পারনি, কিন্তু আজ আমার বাবা-মাকে খুন করে রেখে গেলে। আমি তোমায় ছাড়ব না।

থ্যাঙ্কু অংশু, আমার কষ্ট আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম। আজ আমার আনন্দ করার দিন। চলি।

ফোন অফ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। পিছনে শুনলাম হাহাকার করে অংশুমানের মা কাঁদছে।

বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে বসে কেঁদে উঠল মুনিয়া। অংশুর বাবা-মা বড্ড ভালো মানুষ, আমি ওঁদের কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু আর কিছু আমার করার ছিল না।

গাড়ি নিয়ে বেশ কিছুটা আসার পর মুনিয়া শান্ত হল। তখনই আমি মুনিয়াকে বললাম, তৃতীয় খুনটার হদিশ আমি করে ফেলেছি। তোমার বাবা তো চার মাস আগে মারা গেছেন। তাকে কী ভাবে মারলে?

মুনিয়া দু-চোখে জল, কিন্তু হেসে উঠল।

আমি সিগারেট বের করে একটা নিজের ঠোঁটে, আর একটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। বললাম, 'আগুন দাও। আর শুরু করো অমন একটা জাঁদরেল, দোর্দণ্ড পুলিশ অফিসার বাবাকে কীভাবে মারলে?'

মুনিয়া চিৎকার করে কবিতা বলছে

আমার গাড়ির স্পিড বাড়ছে, ভিতর ভিতর কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। বললাম, বলো মুনিয়া দীনেশ সান্যালকে মারলে কীভাবে?

মুনিয়া কবিতা উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়।

আমি আবার বললাম, দীনেশ সান্যাল সাদা বাঘ! তুমি কীভাবে সাদা বাঘ শিকার করলে? আমি শিকারের গল্প শুনতে চাই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%