জয়ন্ত দে
এতক্ষণ আমার অনেক কথা শুনেছেন। এবার মুনিয়ার কথা শুনুন। ওর বয়েস আমি আগেই বলেছি। কিন্তু সেটা আমি বলেছি। আপনি ওকে দেখলে খুব বেশি হলে চব্বিশ পঁচিশ ভাববেন। কেন ভাববেন, ও যখন জিনস টি-শার্ট পরে আপনার সামনে দাঁড়াবে, আপনার মনে হবে কলেছে পড়ে। আর যখন পুরো জামাকাপড় খুলে, ছুঁড়ে দিয়ে, লাফিয়ে উঠবে, বিছানায় তুড়ি লাফ খাবে, তখন মনে হবে ওর শরীরে এখনও কোনও পুরুষের দাঁত পড়েনি। ওর নিটোল স্তন, একটুও টাল খেয়ে নীচে ঝোঁকেনি। স্তনবৃন্ত গোলাপি। চোখ বন্ধ করে হাত দিলে প্রথমে আপনার মনে হবে কোনও পাথরের মূর্তির গায়ে আপনি হাত রেখেছেন। এত শীতল। একটা কুল কুল আমেজ।
মুনিয়া প্রচণ্ড প্রাণোচ্ছল। পাহাড়ি ঝরণার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। খরগোশের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন।
জেলার এক ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করত। ভালো রেজাল্ট করেছিল। শান্তশিষ্ট মেয়ে ছিল মুনিয়া আমাকে তাই বলেছে। সে খুব শান্ত ছিল। যমের মতো ভয় করত বাবাকে।
আমি বললাম, 'মুনিয়া আমাকে তোমার ভয় করে না?'
মুনিয়া হাসে, 'তোমার সঙ্গে খালি সেক্স করতে ইচ্ছে করে।'
'ওফ আবার বাজে কথা!'
'একদম বাজে কথা নয় আমি এখন চোখ বন্ধ করলে তোমাকে দেখতে চাই। তুমি উদোম হয়ে টানটান শুয়ে আছো আর আমি তোমার ওপর বসে ন্যাংটোপুটু! আমার ভিতর তুমি, তোমাকে নিয়ে আমি! তুমি সম্পূর্ণ আমার ভিতর সেঁধিয়ে গেছো। কনডোম ছাড়া আমি তোমাকে ফিল করছি। আহ তোমার প্রতিটা আদর আমার ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।'
আমি চোখ স্থির রেখে আবার জানতে চাই, 'মুনিয়া আমাকে ভয় করো কি না বলো?'
'আমি প্রথম যে দিন, যার কাছ থেকে তোমার কথা শুনি, আমি তাকে ভয় করি। করতাম। তাকে যমের মতো ভয় করতাম। দেখলাম, তোমার সব চাল সে ধরতে পেরেছে, কিন্তু সে তোমাকে ভয় পায়। শত্রুর শত্রু আমার মিত্র।' কথাটা বলে মুনিয়া মাথা ঝাঁকায়। সমস্ত চুলগুলো উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
'তোমার বাবা।' আমি হাসি। কিন্তু আমার মুখে কাঠিন্য বজায় রাখি। এটা আমরা পারি। পুলিশের লোকজন খুব বড় অভিনেতা, যাকে পিটিয়ে ছাতু করবে, তাকেই জামাই আদর করে আগে হয়তো বিরিয়ানি খাওয়াবে। যাকে পিছন ফিরলে গুলি করবে বলে ভেবেই রেখেছে, তাকে শান্ত গলায় বলে তোকে ছেড়ে দিলাম, যা, চলে যা।
মুনিয়া আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ভাবার চেষ্টা করি, ও কত বড় অভিনেত্রী? ও কি বাবার বদলা নিতে এসেছে? কথাটা আমার মাথার ভিতর বন বন করে ঘোরে। কিন্তু মুনিয়া তো ওর বাবার কথা চেপে যায়নি। বরং রাশি রাশি ঘৃণা উগরেছে হাসতে হাসতে। যদি সবই অভিনয় হয় তাহলে?
দীনেশ সান্যাল ছিল মুনিয়ার বাবা।
অত্যন্ত খারাপ লোক এই দীনেশ সান্যাল। কতটা খারাপ তা এক কথায় বলা যাবে না। আমি এত বছরের চাকরি জীবনে এমন কুৎসিত মানুষ দেখিনি। না, না, রূপে কুৎসিত ছিল না। বরং বেশ সৌম্য দর্শন, একটু বেশি রকমই গম্ভীর। সহজে হাসত না, প্রচণ্ড ধূর্ত। ওর একটা নিক নেম ছিল— সাদা বাঘ। ওর একমাত্র টার্গেট মেয়ে। সম্ভ্রান্ত ঘর থেকে একদম শ্রমজীবী মহিলা কেউ দীনেশ সান্যালের খপ্পর থেকে নিস্তার পেত না। সবাই ওর খেলার পুতুল। এ ব্যাপারে ও কারও তোয়াক্কাও করত না। না অফিস, না পরিবার। সিস্টেমের যেখানে যেখানে দীনেশ সান্যাল আটকেছে সেখানেই ও মেয়ে সাপ্লাই করেছে। মেয়ে দিয়েই ও কাজ উসুল করেছে, টাকা করেছে।
মহিলা সংক্রান্ত ভূরি ভূরি কেস ওর নামে ডিপার্টমেন্টের ফাইলে। বছর খানেক আগে মারা গেছে দীনেশ সান্যাল। তার আগেই অবশ্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। শেষ শুনেছিলাম বেডরিটিন। মুনিয়ার কাছে জানলাম বহুত কষ্ট পেয়ে মরেছে। কথাটা বলতে বলতে মুনিয়া হাসত। হাসতে হাসতে বলেছিল— গেছে ভালো হয়েছে, আর সহ্য করা যাচ্ছিল না।
একটা কথা আমি আগে বলিনি। আমার পিছনে যারা লেগেছিল, তার মধ্যে এই দীনেশ সান্যাল একজন। এই লোকটাই আমাকে অন্য এক রূপে আবিষ্কার করে। একটা সত্যি জানতে পারে।
এই কথাটা গল্পের প্রথম দিকে আমি বলতে গিয়েও চেপে গিয়েছিলাম। আমার আর কমলার কোনও সন্তান ছিল না। সবাই জানত সন্তান না হওয়ার জন্য ত্রুটি ছিল আমার। আমার সিমেনে স্পার্ম কাউন্ট খুবই কম। এই জন্য ডিপার্টমেন্টের অনেকে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। বলত, খড়ের সিংহ। বলত, বেচারা ভালো করে লাগাতে পারে না, তাই জন্যে আসামি পেটায়। রেপ কেসের আসামি পেলে মেরে ছেতরে দেয়।
কিন্তু কমলা মারা যাওয়ার পর এই দীনেশ সান্যাল আমার সিমেন টেস্টের রিপোর্ট পায়। হয়তো আমার লকার কোনওভাবে ও খুলেছিল। সেখানেই ওই রিপোর্টটা পেয়ে যায়। পেয়ে অবাক হয়। রিপোর্টে দেখে আমার কোনও ত্রুটি নেই। ত্রুটি কমলার।
এটা দেখেই দীনেশ সান্যাল এমনই মতামত দিয়েছিল ওপর মহলে, বলেছিল আমি স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসি। তার প্রমাণ, আমার স্ত্রীর দোষ ত্রুটিও আমি নিজের করে নিয়েছি। স্ত্রীকে জানতে দিইনি। কিন্তু সে যখন নাম যশের মোহে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। দীনেশ নিশ্চিত ছিল আমিই মেরেছি। কিন্তু আইনের কাছে আবেগ ধোপে টেকে না। আদালত প্রমাণ চায়। দীনেশ সান্যাল প্রমাণ জোগাড় করতে পারেনি। ওর কোনও কথাই গুরুত্ব পাইনি।
তবু দীনেশ আমার পিছন ছাড়েনি। রত্নেশ্বর-উৎপলের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হলে এই দীনেশ আমাকে এসএমএস করেছিল,
—রইল বাকি এক।
আমি কোনও উত্তর দিইনি। প্রতিবাদও করিনি। কুত্তা চিৎকার করবে। তার স্বভাব। করুক ঘেউ ঘেউ।
তারপর যেদিন জানা গেল বিখ্যাত সংগীতগুরু অসীমানন্দ ষাটটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সকালে তাঁর বডি ঘরের দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয়েছে। সেদিনও দীনেশ আমার এসএমএস করেছিল,
—খেল খতম পয়সা হজম!
তার আগে অবশ্য আমি দীনেশ সান্যালের দফারফা করে দিয়েছিলাম। ঘুষের অভিযোগ, অস্ত্র কেনাবেচার অভিযোগ, মেয়ে পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত তার বেশ কিছু প্রমাণ পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ওপরমহলে।
দীনেশের ওপর ইনকোয়ারি বসেছিল। ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল পুলিস ট্রেনিং আকাডেমিতে। সেখানে গিয়েও ওর শান্তি নেই। ওর মতো অসৎ লোক খুব কম আছে। ওকে কেউ নড়তে দিত না। সেখানে গিয়েও একটা মেয়েলি কেস খাওয়ালাম। আমার প্ল্যানে ও ফাঁদে পড়ল। মেয়েটার আমার ফিট করা। দীনেশ যেখানে যেত তার আগে আমি রাস্তায় কাঁটা ফেলে রাখতাম।
শেষে অসুস্থ হয়ে পড়ল। কলকাতা ছেড়ে বাঁকুড়া চলে গেল। অভিষিক্তার ফ্ল্যাট, যেটা ওর লীলাক্ষেত্র ছিল, সেটা পড়ে থাকল। যেখানে এখন মুনিয়া থাকে।
আমি মুনিয়াকে বলেছিলাম, 'তুমি কি তোমার বাবার বদলা নিতে এসেছ? তাহলে আমার যেমন খোঁজখবর নিয়েছ, হোমওয়ার্ক করেছ, তোমার বাবার সম্পর্কেও করো। না, পুলিশ বা কলিগদের থেকে নয়। তারা সব মিথ্যে বলবে। তারা হয় তোমার বাবার মিত্র, নয় আমার মতো শত্রু। আমি তোমাকে কিছু খোঁজ এনে দেব, ঠিকানা এনে দেব। সেই বউ মেয়ে বা তাদের হ্যাজবেন্ডের সঙ্গে একবার গিয়ে কথা বলো। দেখো তাদের কী অবস্থা করেছে তোমার বাবা।'
আমার কথা শুনতে শুনতে মুনিয়া আমার বুকের লোমে বিলি কাটছিল। আমার বুকে মাথা রেখে বলল, 'ওটা একটা পাক্কা শুয়োরের বাচ্চা! আমি জানি।'
আমি হাসলাম। 'তোমার বাবা শুয়োরের বাচ্চা হলে তুমি কিন্তু তার বাচ্চা। তাহলে তুমি কী?'
মুনিয়া বলে, 'আমার মায়ের ডায়লগ জন্ম হোক যথা তথায় কর্ম হোক ভালো। আমি আমার মায়ের সন্তান।'
আমি বুঝতে পারছিলাম না, বাবাকে শুয়োরের বাচ্চা বলার মধ্যে মুনিয়ার কোনও চাল আছে কি না? তবু ওকে আমি শোনালাম। কেমন ছিল ওর বাবা।
তোমার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল না। তোমার বাবার চাকরিজীবনের শেষ প্রান্তে এসে যত ঝামেলা সব আমার জন্য সয়েছিল। তুমি জানো?
মুনিয়া হাসে, 'রিটেয়ার করার পর বাবা সকালে বিকেলে তোমাকে খিস্তি দিত। তখনই আমি জেনে ছিলাম তুমি চারটে খুন করে সাধু সেজে আছো। তুমি নিজের বউকে মেরেছ। বউয়ের প্রেমিকদের মেরেছ। আর দীনেশ সান্যালের হাতে রক্ত লেগে নেই। সে খুন করেনি। তবু তার এত বদনাম।'
'তোমার বাবা আমার থেকে বেশ কিছুটা সিনিয়ার। হ্যাঁ, তোমার বাবা কাউকে খুন করেনি, এটা একদম ঠিক কথা। কিন্তু দীনেশ সান্যাল কত মানুষের মৃত্যুর কারণ তুমি জানো না? কত সংসার ওই লোকটা দখল করে নিয়েছে। সেরেফ বাড়ির মেয়ে বা বউকে পাওয়ার আশায় দীনেশ অপরাধীকে আরও অপরাধী বানিয়েছে। মিথ্যে কেসে কত লোককে ফাঁসিয়েছে সেরেফ তার বউয়ের লোভে। স্বামীকে জেলে পুরে রাখার ভয়ে কত মেয়েকে সে নিজের কাছে টেনে এনেছে। তোমার বাবা রাক্ষস ছিল। ওকে কেউ বধ করতে পারেনি। হয়তো ওর মতো মেয়ে ভোগ করার ইচ্ছে সবারই ছিল, কিন্তু পারত না। তাই তারা এটাকে দীনেশের ম্যাজিক ভাবত। আমি ওর রকমসকম দেখে হাসতাম। ওর কাছে কেস এলেই, কোনও অপরাধী ওর হাতে পড়লেই, দীনেশ তার বাড়ি যেত। তার মেয়ে বউকে দেখে আসত। ডেকে আসত। অদ্ভুত একটা ভাব করত, যেন সে পুলিশ নয়, সে তদন্ত করতে আসেনি। সে উদ্ধারকর্তা। এরপর সবাই দীনেশের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। আর যে ওর চাল বুঝত, ওকে আটকে দিত। দীনেশ তাদের জীবন নরক করে দিত। ওকে কেউ সমঝায়নি। সবাই ওর কীর্তি কাণ্ড দেখে মজা নিত। আর আমার মনে হত, দীনেশ অ্যাডিক্টেড। ও নারী মাংসলোভী একটা জানোয়ার ছাড়া আর কিছু নয়। তখনই একজন এসে আমাকে খবর দিয়েছিল, দীনেশ নিজের স্ত্রী, সন্তানদেরও ভালো করে দেখে না। তাদের বেধড়ক মারে। সারা এলাকায় ওকে কেউ সহ্য করতে পারত না। তখন থেকে আমি ওকে আরও বেশি ঘেন্না করতাম।'
মুনিয়াকে আমি ওর বাবার গুণকীর্তন করছি, আর মুনিয়া আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। চটকাচ্ছে, আদর করছে, জিব দিয়ে আমাকে চাটছে। কামড়াচ্ছে। মুনিয়ার খুব ইচ্ছে কামড়ে আমার নাকে দাগ করে দেবে। আমি সেই দাগ নিয়ে আসামির পিছনে দৌড়াব। আসামি ধরার পর সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারপর ফিক করে হেসে ফেলবে। বলবে— ছার কে আবনার নাকে কেমড়ে দিলে?
আমি মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। এই ছেলেমানুষি ভরা মেয়েটা তিনটি মানুষ মেরে আমার কাছে এসেছে চতুর্থ খুনের প্ল্যান ভাঁজতে।
দয়া করে মুনিয়াকে নিয়ে হাসবেন না। ভাববেন না, ও মিথ্যে বলছে, ও মজাও করছে।
মুনিয়া ডেঞ্জারাস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।