পল্লীগীতি – কুটি মনসুর

৫৯

আইলাম আর গেলাম পাইলাম আর খাইলাম
ভবে দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ যেজন
চিনলাম না সে কেমন
একদিন মন তারে খুঁজলাম না॥

নিয়া সাধের জন্ম বুঝলাম না তার মর্ম
ধর্ম কর্ম কিছই করলাম না
এই দুনিয়া খেলাঘর
ভেঙ্গে যাবে কয়দিন পর
শেষের খবর আগে করলাম না।।

আগে এই তো বুঝি নাই বিফলে দিন কাটাই
এখন কোথায় যাই বলো না
মনসুর কয় ভবে
কেবা কয়দিন রবে
শেষে হবে মাটির বিছানা।।

[রচনাকাল: ২৫-০২-১৯৬৪ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নীনা হামিদ ]

৬०

প্রেমের মরা সহজ নয়
মইরাও সে জিন্দা রয়
আশেকের কাছে মাশুক ধরা পইড়াছে
প্রেমের মরা যেজন মইরাছে ॥

মোরাকাবার করণ কইরাছে যেজন
মরণের আগে সে জন জিন্দা মইরাছে
নয় দরজায় মাইরা খিল
মোশাহেদায় হয় দাখিল
আপনার আপন কর্ম হাসিল কইরাছে।

আয়নাল হক ছিল প্রেমের মরা মরিলো
পোড়াইয়া ছাই বানাইলো প্রমাণ রইয়াছে
পোড়া ছালিতে আয়নাল হক কয়
প্রেমের মরা জিন্দা রয়
মনসুর কয় সে প্রেম করতে কয়জন পাইরাছে।

[রচনাকাল: ০২-০১-১৯৭৬ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

৬১

আমি কি এই তোর আপন ছিলাম না রে জরিনা
ছোট্টকালে গাছতলাতে
পুতুল খেলার ছলনাতে
আম কুড়াইতে যাইতাম দুইজনা
রে জরিনা।

খেলার সাথী যখন ছিলাম
অপন হইয়া কাছে রইলাম
সেই কথা কি মনে পড়ে না?
ভালবেসে আদর করে
এখন কেন রইলি দূরে
সময়কালে কাছে পাইলাম না।

ভালবাসা কঠিন ব্যধি
জ্বালায় পোড়ায় নিরবধি
এই ব্যধি জীবনে সারে না
প্রেম-বিরহ আর এই তো সয় না
অন্তর পোড়ায় দেখা যায় না
মনসুর বলে দারুণ যন্ত্রণা।

[রচনাকাল: ১১-০২-১৯৭৮ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

৬২

প্রেম কইরা যে প্রেমিক মরে
হায় গো প্রেম এই তো মরে না
প্রেমিকেরা দিশাহারা
তারা মরণের ভয় করে না।

প্রেমের এই তো নাই বসত বাড়ি
তবে কেন প্রেমবিচারী গো
আমি জনম ভইরা খুঁইজা ফিরি
তবু না পাই প্রেমের ঠিকানা।

প্রেম যে এমন ছলনাময়
পাগল কইরা লুকাইয়া রয় গো
সে যে পরের মনটা কাইড়া নিয়া
নিজের মন এই তো দিল না।

অজানাকে জানতে গিয়া
অহরহ কান্দে হিয়া গো
সাধক মনসুর বলে প্রেম করিয়া
শুধু পাইলাম দুঃখ-বেদনা।

[রচনাকাল: ০৪-০৩-১৯৭০ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: ধনু সাত্তার]

৬৩

যৌবন জোয়ার একবার আসে রে বন্ধু
চলে গেলে আর আসে না
যৌবনকালে বন্ধু মিলে
শেষকালে ভালোবাসে না।।

নদীর জোয়ার চলে যায়
ফিরে পায় শ্রাবণে
যৌবন জোয়ার একবার গেলে
পায় না জীবনে
ফুল শুকাইলে সেই ফুলে আর
ভ্রমর এই তো কভু বসে না।।

এ রূপও যৌবনের গৌরব
মিছে যারা করে
অবশেষে পতন ঘটে
ভাটায় যখন পড়ে
হৃদয়ে যার ব্যথা ভরা
তার মুখে হাসি ফোটে না।।

ভ্রমর যেমন মধু ছাড়া
যায় না কোনো ফুলে
কলসি কাংখে যায় না বধূ
শুকনা গাঙের কূলে
মনসুর বলে মরণ কালে
আমারে ফেলে যেও না।।

[রচনাকাল: ০২-০৭-১৯৭৬ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

৬৪

ফুলবানু তুই
মনের আগুন জ্বালাইস না
ও তুই রঙের শাড়ি অঙ্গে পইরা
আমায় পাগল করিস না।

পড়শি হইয়া ভুইলা রইলি
না করলি স্মরণ
আসতে যাইতে দেইখা এই তোরে
রয় না ঘরে মন
ও তুই রূপের আগুন জ্বাইলা মনে
সুখের ফাগুন হারাইস না।

ভালোবাসা পাবো বলে
আশায় রইলাম পড়ে
আশার পথে কাঁটার জ্বালা
সইবো কেমন করে
প্রেমের জালে আমায় ফেলে
অকালে আর মারিস না।

[রচনাকাল: ১১-০৩-১৯৭৫ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

৬৫

ময়না পাখি গেল রে খাঁচার বাঁধন কাটিয়া
ও সে পাখির শোকে মনের দুঃখে রে
কাইন্দা বক্ষ যায় ফাটিয়া।

সেই পাখিটি অতি চঞ্চল
কাইটা যায় তিন প্যাঁচের শিকল মায়া ছাড়িয়া
ও সে খাঁচা হতে আচম্বিতে রে
একদিন যাবে উড়াল দিয়া।

এমনও সেই নিঠুর ময়না
কোনো দিন সে আপন হয় না দেখলাম ভাবিয়া
পাখি যাইবার কালে কেউ দেখে না রে
রাখতে পারবে না বান্ধিয়া।

জনম ভইরা পুষলাম পাখি
তবু যায় সে দিয়া রে ফাঁকি শেল হানিয়া
কুটি মনসুর কয় সে পাখির লাইগা রে
কি ফল হবে আর কান্দিয়া।

[রচনাকাল: ২১-০২-১৯৭৬ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নীনা হামিদ]

৬৬

সাদা কাপড় পরলে কিন্তু মনটা সাদা হয় না
চিমটা হাতে জটা মাথায়
থাকলেই সাধু কয় না।

কলম ছাড়া যায় না লেখা কালি না থাকিলে
মনের ময়লা যায় না গায়ে সাবান মাখিলে
মানুষ কুলে জন্ম নিলে সবাই মানুষ হয় না।

সিরাজ সাঁই লালনের গানে নিগূঢ় তত্ত্ব শুনি
ধন-সম্পদ থাকলে মানুষ হয় না জ্ঞানী-গুণী
নীতিগত মনুষত্ব যার ভিতরে রয় না।

[রচনাকাল: ১২-০৪-১৯৮৩ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: ফকির আলমগীর]

৬৭

আমি এই তো আমার ইচ্ছায় আসি নাই
পাঠাইয়াছো তুমি দয়াল, পাঠাইয়াছো তুমি
চন্দ্র-সূর্যের আলো দিলা
আগুন-পানি-বাতাস দিলা
আরো বীজ কুনাইয়া খাইতে দিলা
কতই সুন্দর ভূমি।

আমাকে করিতে তৈয়ার
কিসের অভাব ছিল এই তোমার?
তুমি বুঝ এই তোমার দরকার তুমি অন্তরজামি
আমার মরণ হলে পরে
তুমি রবে কার ভিতরে?
জীবনভরে জীবের তরে বসত করো তুমি।

তোমার আশা পূর্ণ হলে
আমি কেন যাব চলে?
সুন্দর এই পৃথিবী ফেলে কোথায় যাব আমি?
মনসুর বলে পরপারে
যাইতে হবে কি দরকারে?
এই পারে আর সেই পারে সকল পারেই তুমি।

[রচনাকাল: ২১-০৫-১৯৯১ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মনির খান]

৬৮

মাটির দেহ এই মাটিতে যাবে রে মিশিয়া
পাকা বাড়ি লোহার খুঁটি পড়বে রে খসিয়া।

সাত রাজার ধন মানিক পাইয়া মজা কইরা খাইলি
কামিনী কাঞ্চনও লইয়া সুখে দিন কাটাইলি
সাধের দিন ফুরাইয়া গেলে
কানবি রে বসিয়া।

লোভ-লালসায় রং-তামাশায় কাইটা যায় রে দিন
আইসা ভবে যাইতে হবে ভাবলি না একদিন
কবর আজাব দিবে যেদিন
ফেরেস্তায় আসিয়া।

পুত্র-কন্যা বাড়ি-গাড়ি সুন্দর নারী পাইয়া
এক পলকে যাইতে হবে যাইবা কি ধন লইয়া?
মনসুর বলে সমন আইলে
ধরবে রে কষিয়া।

[রচনাকাল: ০৩-০৩-১৯৮০ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: সৈয়দ গোলাম আম্বিয়া]

৬৯

সখী রে ইচ্ছা হয় ডুবিয়া মরি নদীর জলে
মনেতে প্রেমের আগুন জ্বলে দ্বিগুণ
নিভে না গো কোনো ছলে।

কেন রে মন প্রাণ দিলাম
জেনে শুনে বিষ খাইলাম
এখনে বাঁচবো আমি কিসের বলে
তোরা বল গো সখী বন্ধুকে মোর
আনা যায় কি কল কৌশলে।

তোরা সখী জানিস না ভাই
কেমনে রাত-দিন কাটাই
কি করে মিশি সই গো এই তোদের দলে?
নদীর জল ডাকে মোরে আদর করে
শান্তি পেতে শীতল কোলে।

বল গো সখী বল গো এই তোরা
আমার সেই মনোচোরা
দেয় না দেখা বুক ভাসাই দুই নয়ন জলে।
মনের মানুষ ছাড়া দিশাহারা
কুটি মনসুর ভেবে বলে।

[রচনাকাল: ১৫-০৮-১৯৭৬ ইং]

৭০

ওরে যদি রে মন আমি হইতাম তার
আমি যদি তার হইতাম,
সে হইতো আমার।

এই মন দিলে সেই মন পাইতাম
দেওয়ার মতো যদি দিতাম রে
তার মনেতে মন মিশাইতাম রে
আমি হইতাম একাকার।

মাটির দেহ কইরা মাটি
হইলে দেহ পরিপাটি রে
মন যদি মোর হইতো খাটি রে
আমি পাইতাম তার দিদার।

লাভ করিতে ভবে আসি
লোকসান দিয়া হইলাম দোষী রে
মনসুর কয় মোর প্রাণ উদাসী রে
বৃথা জনমও আমার।

[রচনাকাল: ২৬-০৬-১৯৭২ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কিরণ চন্দ্র রায়]

৭১

মনের মানুষ দেখতে চাই
বলো কোথায় তারে পাই?
না জানি কোথায় আছে
তার তালাশে কোন বা দেশে যাই।

মনের মানুষ মনে মনে
বিরাজ করে সংগোপনে
দেখা দেয় নয়ন কোণে,
পলকে হারাই।

মনের মানুষ বনের টিয়া
উড়াল দিয়া যায়
তবু তারে এই অন্তরে
ধইরা রাখতে চায়।

মন-মানুষের খবর লইয়া
কে দিবে আমারে কইয়া?
মনসুর কয় অবুঝ হইয়া
খুঁজিয়া বেড়াই।

[রচনাকাল: ০৩-০২-১৯৭৮ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: এম. এ. মতিন]

৭২

লাল টুকটুক শাড়ি পইরা গো
কোন রূপসী যায়?
বাঁকা গাঁয়ের পথে কন্যা
হেইলা দুইলা পাও বাড়ায়।

রূপ-লাবণ্য অঙ্গে ভরা
দুই চোখে তার কাজল পরা গো
তার বিরহে মন পাখিটা দিবা-নিশি ছটফটায়।

যদি আমি সেই রূপসীর চোখের কাজল হইতাম
চোখে চোখে থাইকা আমার মনের কথা কইতাম।

ঝলমল করে রঙিন শাড়ি
হাতে চুড়ি বেলোয়ারি গো
মুচকি হাসি দিয়া কন্যা পিছন পানে ফিরা চায়।

[রচনাকাল: ১২-১১-১৯৭৯; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

৭৩

শিশুকালের প্রেম-পিরিতি
আমি এই তোর পর
এই তোর লাগিয়া পাগল হইয়া
বন্ধু ছাড়লাম বাড়িঘর।

ক্যান পিরিতি কইরাছিলাম
এই তোর বিচ্ছেদে জইলা মইলাম রে
কাইন্দা কাইন্দা বুক ভাসাইলাম
বন্ধু হইলাম দেশান্তর।

মাতা ছাড়লাম পিতা ছাড়লাম সর্বস্ব ত্যাগিয়া
দেশ-বিদেশে ঘুইরা বেড়াই কেবল এই তোর লাগিয়া।

কত আশা দিলি মোরে
তবে কেন রইলি দূরে রে
দেখা দিয়া একবার মোরে
বন্ধু না নিলি খবর।

[রচনাকাল: ১৪-০৪-১৯৬৬ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: সুরজিৎ রায়]

৭৪

বন্ধুরে অন্তরে এই তোর দয়া হইলো না
আমি এই তোর জ্বালাতে জ্বইলা মরলাম
শান্তি পাইলাম না।

বন্ধুরে তুই পরাণ পাখি
এই তোরে অন্তরে অন্তরে রাখি
ও তুই কাছে রইলি কথা কইলি
ধরা দিলি না।

ভেবেছিলাম পাব এই তোরে জীবন যৌবন দিয়া
আমার মন দিয়া এই তোর মন পাইলাম না
কঠিন রে এই তোর হিয়া।

বন্ধু এই তোরে পাবো বলে
আমি ঘর বান্ধিলাম বৃক্ষতলে
মনসুর বলে অন্তিম কালে
ভুইলা যাইও না।

[রচনাকাল: ২২-১০-১৯৬৭ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জহির আলীম]

৭৫

এই তোমরানি কেউ জানো গো
বলে দাও বন্ধুর ঠিকানা
আমায় একা ফেলে গেছে চলে
যাইবার কালে জানি না।

দিন ফুরাইলো মাস কাটিলো
বৎসর গেল তবু আইলো না
আমার বন্ধুর পরান এমন নিষ্ঠুর
একদিন খবর নিল না।

নিশীথে একেলা প্রেমজ্বালা নিদ্রা নাই যে চক্ষে
এমন নিদারুণ বিচ্ছেদের আঘাত লাগাইলো মোর বক্ষে।

বন্ধু নাই মোর খালি বাসর
কাইন্দা ভিজাই বিছানা
কোন ভাবিনি পাইয়া তারে
কইরা নিলো আপনা।

[রচনাকাল: ১৩-০৩-১৯৬১ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আজগর আলীম]

৭৬

ওরে ও কন্যা প্রাণে ব্যথা দিও না
তুমি আমারে ছাড়ি বাপের বাড়ি
যাইতে চাইও না।

শাড়ি-গয়না চাইলে কন্যা দেবো লাগে যত
চুল বান্ধিতে রঙিন ফিতা পাইবা মনের মতো
এই তোমায় আলতা-পাউডার দিয়া রাখিবো সাজাইয়া
বেজার হইও না।

মাঘ মাসেতে নাইওর নিতে যদি কেহ আসে
নিষেধ কইরা দিও তারে এই না শীতের মাসে
এমন শীত বসন্তে আমার অজান্তে নাইওর যাইও না।

[রচনাকাল: ১২-০১-১৯৮২ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: বিপুল ভট্টাচার্য্য]

৭৭

এই তোরা আইনা দে
ও তারে আইনা দে
আইনা দে গো আমার প্রাণবন্ধুরে
এই তোরা আইনা দে।
কোথায় যাই কি করি কেমনে ধৈর্য ধরি
জইলা মরি বন্ধুর প্রেম বিচ্ছেদে।

একে এই তো ফাল্গুন বসন্তের জ্বালাতন
মন আমার উচাটন দিবা-নিশীথে
বন্ধুয়ার লাগিয়া জ্বলে আমার হিয়া
এই মনটা কি দিয়া রাখি বেঁধে।

কি রূপ হেরিলাম তার
ভুলিতে পারিনা আর
পড়িলাম বন্ধুয়ার পিরিতের ফান্দে
পিরিতি করিয়া মন-প্রাণ হরিয়া
বন্ধু যায় ছাড়িয়া কোন অপরাধে।

করে ভালোবাসা মিটিলো না আশা
একি দুর্দশায় পড়িলাম বিপদে
পিরিতির এমনি গুণ কাঁচা বাঁশে ধরলো খুন
মনসুর কয় কত জীবন যায় মনের খেদে।

[রচনাকাল: ০৩-০২-১৯৬১ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জহুরা আলীম]

৭৮

কোথায় যাই বলো তার তালাশে
বন্ধু নাই মোর দেশে।
জ্যেষ্ঠি না আষাঢ়ে বর্ষার জোয়ারে
নদীর পাড়ি ভাইসা রে গেছে।

নতুন জোয়ার পাইয়া কত রসিক নাইয়া
নাও বাইয়া যায় নানান দেশে
আমার ঘাটে বাঁধা নাওখানি
মাঝির খবর না জানি
অভাগিনী আমি কান্দি গো বসে।

আশ্বিনা ভাটায় বর্ষার পানি চইলা যায়
ফিরা তারে পায় শাওন মাসে
আমার যৌবনের জোয়ার
আসে মাত্র একবার
সোনার যৌবন কি আর ফিরা গো আসে।

পিরিতি করিয়া আমারে ছাড়িয়া
বন্ধু রইয়াছে পরবাসে
ভবে বন্ধুহারা যে জন
জ্বলছে তার মনের আগুন
মনসুর কয় সে আগুন জুড়ায় না বাতাসে।

[রচনাকাল: ০৬-১০-১৯৬০ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জহুরা আলীম]

৭৯

আমার কার লাইগা প্ৰাণ
হইয়াছে উতলা কি জ্বালা গো
কার লাইগা প্রাণ হইয়াছে উতলা
আমার এমন কেন হইলো প্ৰাণ
কোথায় গেলে পাবো ত্ৰাণ
আমি ভাবি সদা বসিয়া নিরালা।

ঘুমেতে প্রাণ বিভোর ছিলো
কে যেন এসে দেখা দিলো
দিয়ে গেল প্রেম-পিরিতের জ্বালা
অচেনা সে রূপনাগরী
মনটা যে করিলো চুরি
হায় কি করি যায় না তারে ভোলা।

যারে দেখলে আমার প্রাণ জুড়াবে
কেবা তারে আইনা দিবে
আর কতকাল থাকিবো একেলা?
মনসুর কয় এ সংসারে
প্রেমজ্বালা কেউ দেখে না রে
যার জ্বলে তার পুইড়া অন্তর কালা।

[রচনাকাল: ১০-১০-১৯৭২ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নুরুন্নাহার আউয়াল]

৮০

আমি কেমন সুখে আছি রে বন্ধু
দেইখা যাও আসিয়া
আমার বুকে এই তোমার নামটি লেইখা রে
কান্দি নিরলে বসিয়া রে
বন্ধু দেইখা যাও আসিয়া।

সুখের আশায় ভালোবাসিয়া
এখন দুঃখে জ্বলে হিয়া
আমি খুঁইজা এই তোমায় না পাই যদি রে
আশা মিটাইবো কি দিয়া রে
বন্ধু দেইখা যাও আসিয়া।

চাইনা রাজ্য রাজসিংহাসন
একবার দেখা দাও আসিয়া
আমি এই তোমায় লইয়া কাল কাটাবো রে
বন্ধু গাছতলায় বসিয়া রে
বন্ধু দেইখা যাও আসিয়া।

কোথায় যাইয়া এই তোমায় পাবো
আমায় কে দিবে বলিয়া
মনসুর কয় মোর কর্মদোষে রে
দুঃখ ফুরায় না কান্দিয়া রে
বন্ধু দেইখা যাও আসিয়া।

[রচনাকাল: ০৬-০২-১৯৬৪ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: এম. এ. মতিন]

৮১

ও বসন্তের কোকিল রে
এই তোর ডাক শুইনা প্রাণ উথাল-পাথাল করে
অমন কইরা ডাকিস না রে
মন যে না রয় ঘরে।

বন্ধু আমার নাই দেশে
দুঃখ জানাই কার কাছে?
কান্দি শুইয়া পালঙ্কের উপরে।
রাত দুপুরে জাইগা দেখি
চান্দের আলোর ঝিকিমিকি
থরথর কইরা পরান-পাখি
কাঁইপা ওঠে ডরে।

যারে কোকিল উইড়া যা
পাইলে মোর প্রাণসখা
একবার আইনা দেখাবি আমারে।
সুখের ফাগুন কাটাই দুঃখে
প্রেমের আগুন জ্বলে বুকে
বন্ধুর লাগি দিবানিশি
চোখের পানি ঝরে।

[রচনাকাল: ০১-০৮-১৯৮৮ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নীনা হামিদ]

৮২

মনের মানুষ কোথায় গো পাবো
তার তালাশে যাবো
যাবো উদাসিনী হইয়া
এ ঘর-বাড়ি থুইয়া
বাউল বেশে তারে আমি খুঁইজা বেড়াবো।

একতারাটা সঙ্গে করি
বন্ধুর নামের মালা গলায় পরি
দেশান্তরি হবো
সেই প্রাণবন্ধুরে একবার
দেখা যদি পাই গো তার
বক্ষে নিয়া তারে আমার প্রাণ জুড়াবো।

আশার জীবন যায় বিফলে
মনের মতো মানুষ পাইলে
তার দাসী হইয়া রব
আমি তাইতো বাউল সাজিয়া
বেড়াই তারে খুঁজিয়া
মন দিয়া নি আমার বন্ধুর মন পাবো।

[রচনাকাল: ০৫-০৫-১৯৭০ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নীনা হামিদ]

৮৩

কুল-মান হারাইলাম পাগল হইলাম
সোনাবন্ধুর লাগিয়া
আমি ঘর ছাড়িলাম দেশ ছাড়িলাম
বন্ধুর ছলনাতে পড়িয়া।

শোন্ গো সখী এই তোরে বলি
কেমন কইরা তারে ভুলি
আমায় মারিয়াছি ভাবের গুলি
তাতে অঙ্গ যায় মোর জ্বলিয়া।

ঘুমের ঘোরে দেখা দিলো
পরান আমার কাইড়া নিলো রে
আবার যখন আমার ঘুম ভাঙ্গিলো
তারে পাইলাম না আর জাগিয়া।

মনসুর বলে যদি পাইতাম
পিঞ্জিরায় ভরিয়া রাখতাম রে
আমার জীবন গেলে না ছাড়িতাম
মন-প্রাণ দিতাম তারে ঢালিয়া।

[রচনাকাল: ২৭-০৩-১৯৬১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: করিম খান]

৮৪

বর্ণ দেখে স্বর্ণ চেনা বড়ই কঠিন
মানুষ দেখে মানুষ চেনা
যায় না কোনো দিন।

স্বর্ণ চিনে স্বর্ণকারে
যাচাই ক’রে কষ পাথরে
মানুষ চিনি কি প্রকারে ভাবি রাত্রদিন।

এই দুনিয়ার রং-বাজারে
সাধু সাজে দোকানদারে
সাদা জিনিস নানান রঙ্গে করে দেয় রঙিন।

ছলচাতুরি মিছে আশা
ছাড়ো রে মন রঙ-তামাশা
মনসুর বলে লোভ-লালসা কর রে বিলীন।

[রচনাকাল: ০৭-০৩-১৯৭৮ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়, জহির আলীম]

৮৫

নিমের পাতা খাইতে তিতা
মরিচ খাইতে ঝাল
সূক্ষ্ম প্রেমে দঃখ বেশি
কান্দায় চিরকাল।

প্রেমের আগুন হয় না বারণ প্রেমের চিঠি লেইখা
মনের মানুষ কাছে পাইলে পরান ভরে দেইখা
রাজার রাজ্য ত্যাজ্য করে
হয় প্রেমের কাঙ্গাল।

সাতটি সাগর পাড়ি দিয়ে পাগলেরই বেশে
মদনকুমার গিয়েছিলো মধুমালার দেশে
মরণের ভয় ত্যাগ করে হয়
পিরিতের মাতাল।

[রচনাকাল: ১০-০৭-১৯৯২ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: সৈয়দ আব্দুল হাদি]

৮৬

সাপ ধরতে মন্তর লাগে
প্রেম করতে অন্তর লাগে
এমন একটা অন্তর যদি পাই
স্বর্গসুখ চাই না, তার ভালোবাসা চাই।

ভালোবাসা মিটায় আশা প্রেমের অসীম সুধা
যে প্রেমে ভয় করে না দোজখের আগুন
ভালোবাসা অমূল্য ধন
তুলনা যার নাই।

মনের আয়নায় বন্ধুর ছবি দেখতে পাই যখন
আমি আর আমার মাঝে থাকি না তখন
মনের মাঝে মন হারাইয়া
খুঁজিয়া বেড়াই।

[রচনাকাল: ২০-০৮-১৯৯৩ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আফরোজা আক্তার]

৮৭

আমি যারে খুঁইজা বেড়াই
সে এই তো মোরে খোঁজে না
তবু তরে ভালবাসি
অবুঝ মন তো বোঝে না।

যার লাইগা প্রাণ হয় উদাসী
তারে ছাড়া কেমনে বাঁচি গো
বাদক ছাড়া বাঁশের বাঁশি
কোনো দিন এই তো বাজে না
অবুঝ মন এই তো বোঝে না।

জনমদুঃখী কইরা মোরে
পরম বন্ধু রইলো দূরে গো
পাগল বেশে ঘুরায় মোরে
নিজে পাগল সাজে না
অবুঝ মন এই তো বোঝে না।

[রচনাকাল: ২৬-০৭-১৯৭৪ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: দিলরুবা খান]

৮৮

এই অবেলাতে জল ভরিতে কে গো আইলো ঘাটে?
রূপ দেইখা তার পরাণ আমার
উথলিয়া উঠে রে।

পিতলের কলশিতে কন্যা জল ভরিয়া নিল
যাইবার কালে আঁখিঠারে আমার মন-প্রাণ হরিল
তার পিরিতে কলিজাতে
জইলা জইলা উঠে রে।

অঙ্গে যে তার রূপের বাহার কালো বরণ কেশ
রূপ দেখাইয়া মন ভুলাইয়া পাগল করলো দেশ।

ডাগর চোখে যখন কন্যা ডাইনে-বামে চায়
না জানি সে কি যেন কি বলছে ইশারায়
তার লাইগা প্রাণ কান্দে সদায়
দুঃখে অন্তর ফাটে রে।

[রচনাকাল: ১৮-০৫-১৯৭৯ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জি.এম. সাদেক]

৮৯

ভয়াবহ সন্দেহ রোগে যারে পায়
বনের বাঘে খায় না তারে
মনের বাঘে খায়।

কঠিন রোগ সন্দেহ যদি ঢোকে কারো মনে
সুখ-শান্তি নষ্ট হয় তার সন্দেহের কারণে
চিরতরে ভুইগা মরে জীবন যন্ত্রণায়।

নারী যদি হাইসা কথা কয় পুরুষের সাথে
তার স্বামী সন্দেহ করে সদায় দিনে-রাতে
না বুঝিয়া ভুল-ভ্রান্তিতে সংসার ভেঙ্গে যায়।

ঘরের কথা পরের কাছে কইয়া যে পায় শান্তি
মনের ঘোর যায় না তার কাটে না ভুল-ভ্রান্তি
মনসুর বলে ভুলে জীবন রসাতলে যায়।

[রচনাকাল: ১৬-০১-১৯৮৬ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আফরোজা আক্তার]

৯০

এমন একটু পানি এই তোমরা আইনা দাও আমারে
যে পানিতে প্রেমের আগুন
নিভাইতে পারে।

এমন একটু শীতল বাতাস কোথাও যদি পাইতাম
সেই বাতাসে বন্ধুর প্রেমের এই জ্বালা জুড়াইতাম
প্রেমযন্ত্রণা কেউ দেখলো না
অন্তর পুইড়া মারে।

বন্ধুহারা পাগল মনটা কেমনে রাখি বাইন্ধা
প্রেমের আগুন বুকে লইয়া নিশি পোহাই কান্দা
মনের মাঝে মন হারাইয়া
খুঁইজা বেড়াই তারে।

[রচনাকাল: ১৮-০৩-১৯৯১ ইং]

৯১

প্যাট্রল দিলি মাখাইয়া
আগুন দিলি জ্বালাইয়া
সেই আগুনে মনটারে তুই পোড়াইল
পোড়া মনটা লইয়া রে
কেমনে থাকি সইয়া রে
অন্তরে পিরিতের আগুন ধরাইলি।

ভালোবাসিয়া ফাইসা গেলাম হইলো রে কি যন্ত্রণা
পাগল কইরা তুই আমারে দিলি না রে সান্ত্বনা
কি দিয়া কি নিয়া রে
দিওয়ানা বানাইলি রে
তুই আমারে দেশে দেশে ঘুরাইলি।

নকল প্রেমের এমনি ধারা অন্তর কাইড়া নিয়াছে
চোখে প্রেমের অ্যাসিড মাইরা অন্ধ কইরা দিয়েছে
হইলো না প্রেম খাটি রে
জীবন করলি মাটি রে
প্রেম খেলাইয়া চোখের পানি ঝরাইলি।

[রচনাকাল: ১৩-১১-১৯৯৩ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জানে আলম]

৯২

ভালোবাসার বড়শি আমার বিধিলো বুকে
না পারি সইতে ব্যথা কইতে নারি মুখে।

সন্ধ্যাবেলায় পুকুর ঘাটে দেইখাছিলাম তারে
মাছ ধরিতে আইসা বন্ধু ধইরাছে আমারে
কত যে পাড়াপড়শি
খুলিতে না পারে বড়শি
না জেনে হায় কি করেছি কেঁদে মরি দুঃখে।

বড়শির সুতা ধইরা বন্ধু যখন টান মারে
খোলার চেষ্টা যতই করি ততই ব্যথা বাড়ে
প্রেমের বড়শি বিন্ধাইয়া
মারলো মোরে কান্দাইয়া
এত দুঃখ আমায় দিয়া বন্ধু রইলো সুখে।

[রচনাকাল: ০৩-০১-১৯৮৯ ইং]

৯৩

কাজলা দিঘীতে কন্যা নিত্য আসো যাও
একবার কেন দুই নয়নে ফিরিয়া না চাও।

জল ভরিতে আইলা ঘাটে নীল শাড়ি পরিয়া
রূপের ছটায় মনটা আমার নিলা যে হরিয়া
এখন কি যে করি ভাইবা মরি
মুখ ফুটে না কথা কও।

ঝুনুর ঝুনুর বাজে এই তোমার হাতে রেশমি চুড়ি
মন ভরে না দেইখা এই তোমায় উপায় কি যে করি
দেখাদেখি হইলে কেন
ঘোমটা টেনে মান বাড়াও।

[রচনাকাল: ১০-০৭-১৯৬৭ ইং]

৯৪

মন মরা হইয়াছো কন্যা
মলিন এই তোমার মুখখানি কন্যা গো
চক্ষু ভরা টলমল করে পানি।

কন্যা গো আউলা কেশে পাগল বেশে
কোথায় চলছো কি উদ্দেশে
কার তালাশে হইলা পাগলিনী।
একা পথে কেউ নাই সাথে
পিছের কাপড় নাইকো মাথায়
বাতাসেতে উড়ে এই তোমার শাড়ির আঁচলখানি।

কন্যা গো পিছের দিকে ফিরা চাও
একটা কথা শুইনা যাও
খুঁইজা বেড়াও কারে বলো শুনি।
তুমি ভালোবাসিয়াছিলে যারে
আর কি দেখা পাবে তারে
শুধু কেবল সে এই তোমারে করছে কলঙ্কিনী।

কন্যা গো ছলনাময় ভালোবাসা
যে করে তার এমনি দশা
আশায় আশায় কাটায় দিন-রজনী।
না জাইনা প্রেম যেজন করে
প্রেমআগুনে জইলা মরে
মনসুর বলে তার মতো নাই জনমও দুঃখিনী।

[রচনাকাল: ০৮-০৫-১৯৬১ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: সুরজিৎ রায়]

৯৫

গোলাপী রে গোলাপী
ও সোনার গোলাপী
তুই যে আমার ছিলি প্রাণ পাখি
এত ভালোবাসিয়া মোরে
ছাইড়া গেলি কোন সুদূরে
তুই ছাড়া কেমনে বেঁচে থাকি।

চান্দের আলো ছাড়া যেমন আন্ধার হয় রাতি
দম ফুরাইলে নিভে যায় এই দেহ ঘরের বাতি
পাখি ছাড়া শূন্য খাঁচার মূল্য আছে কি।

পানি ছাড়া নদীর কভু হয় না জোয়ার-ভাঁটা
অন্তর কান্দে বিধিলে এই তোর প্রেম-পিরিতের কাঁটা
এই তোর পিরিতে পোড়া জীবন কোথায় যে রাখি।

[রচনাকাল: ২০-১০-১৯৯৩ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মুজিব পরদেশি]

৯৬

নিঝুম কুঞ্জবনে শ্যাম কালিয়ার সনে
খেলবো পাশা মনের আশা
মিটাবো দুই জনে।

অন্তরে-বাহিরে শ্যামের প্রেমের জ্বালাতন
মিলন বাঁশি বাজাইয়া শ্যাম পাগল করছে মন
জীবন নদীর যৌবন জোয়ার ফিরাবো কেমনে।

ভালোবাসার আশায় থাকি নিশিতে জাগিয়া
অনুরাগী গৃহত্যাগী শ্যামেরও লাগিয়া
পোড়া মন জুড়াবো জ্বালা শ্যামের আলিঙ্গনে।

প্রাণের প্রাণ শ্যাম কালাচান বাজায় বাঁশের বাঁশি
শুনিয়া সেই মধুর সুর মন হলো উদাসী
মনসুর কয় মোর বৃথা জীবন
শ্যামকালিয়ার কারণে।

[রচনাকাল: ১৬-০৪-১৯৮০ ইং]

৯৭

রাখাল বন্ধুরে পরাণ বন্ধুরে
বাঁশিটি বাজাইয়া পাগল
কইরো না আমারে।

মাঠে মাঠে গরু চড়াও
পাগল করা বাঁশি বাজাও রে
প্রেমজ্বালা দিয়া কেন জ্বালাও অবলারে।

তল্লা বাঁশের বাঁশির ভিতর কি মোহিনী আছে
মনে কয় জিজ্ঞাসি গিয়া রাখাল বন্ধুর কাছে।

বন্ধু এই তোমার বাঁশির সুরে
পরান আমার রয় না ঘরে
হাতের কাম ফেলিয়া দূরে খুঁজি গো এই তোমারে।

[রচনাকাল: ১০-০২-১৯৭৮ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আনোয়ারা বেগম]

৯৮

বাঁশিওয়ালা কৃষ্ণ কালা আমার মনোচোরা
কি জাদু করিলো মোরে
বল গো সখী এই তোরা।

আপন মনে গহীন বনে যখন বাজায় বাঁশি
মনে বলে যাই গো চলে দেইখা তারে আসি
বাজায় যে জন এমন বাঁশি
কেমন সেই নাগরা।

পাক করিতে পাক ঘরেতে নিরলে বসিয়া
ধোঁয়ার ছলে নয়ন জলে বক্ষ যায় ভাসিয়া
বাঁশির সুরে কাইন্দা মরে
আমার মন-মনোরা।

মনসুর বলে নিঠুর কালা দয়া নাই তার প্রাণে
কি ছল ছলিয়া আমার বুকে আঘাত হানে?
কি যে করি ভাইবা মরি
দিল না সে ধরা।

[রচনাকাল: ২৩-০৭-১৯৭৯ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: তামান্না নিগার তুলি]

৯৯

আমার তালাশ নেক বা না নেক সই
আমি তারে তালাশ করি
আমার অন্তরের ধন আপন সেজন গো সখী
তারে আর কেমনে পাসরি।

জাত-কুল-মান জীবন-যৌবন
সর্বস্ব করেছি অর্পণ
এখন উপায় কি করি?
সে যে মন ভুলাইয়া যায় পালাইয়া গো
বক্ষেতে মারিয়া ছুরি।

পিরিতের ফান্দে পইড়াছি
পরান কান্দে দিবা-নিশি
ঐ রূপ কেমনে হেরি
এখন কোন পথে যাই ঘুইরা বেড়াই গো সখী
হইয়াছি গো দেশান্তরী।

তার দেখা পাইলে বক্ষে নিবো
না পাই যদি প্রাণ ত্যাজিবো এই প্রতিজ্ঞা করি
বন্ধুর নামের মালা গলায় পরি গো
অধম মনসুর কয় যেনো মরতে পারি।

[রচনাকাল: ১৭-০৯-১৯৭৮ ইং; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: শাহাবুদ্দিন]

১০০

ওমন তুই কারে পাইয়া
হইলি এতো খুশি
বেলা গেলো সন্ধ্যা হলো
আইলো কালের নিশি।
ও বিদেশি পরবাসী।

পরবাসে আইলিরে মন
এদেশ যে এই তোর নয় রে আপন
যাইবার বেলায় কেউ নাই রে মন
আপন দেশের দেশী।

মহাজনের পুজি লইয়া করলি বেচাকেনা
হিসেবেতে মিল হবে না হইয়া গেলে দেনা।

লাভ করিতে আইসা ছিলি
কর্মদোষে লোকসান দিলি
মনসুর বলে গলায় নিলি
মায়াজালের ফাঁসি।।

[রচনাকাল: ৭-১০-১৯৭৮ ইং]

১০১

আমার মনের মানুষ কোথায় যাইয়া পাই
আমি প্রাণের ব্যথা কার কাছে জানাই।
উদাস পরান লইয়া আমি
নিরাশ হইয়া দিন কাটাই।

রাত্রি কাটাই হা হুতাশে
নিদ্রা চোখে নাহি আসে
মনে যারে চায় তারে আমি
খুঁজিয়া না পাই।

নবযৌবন ভাঁটার টানে
ফল কি আর বাঁচিয়া প্রাণে
প্রেমের জ্বালা সদায় মনে
জ্বইলা হইলো ছাই।

[রচনাকাল: ২৫-০২-১৯৮৩ ইং]

১০২

পিরিতের ভাব না জেনে
পিরিত করিস না এই তোরা
ওরে আমার মতো কেহ
ভবে হইস না রে কপাল পোড়া।

পিরিতি বাড়াইয়া বন্ধু মন নিয়াছে হরে
এখন কইতে নারি সইতে নারি ভুলি কেমন করে।
কি ছল ছলিয়া মোরে
মন নিলো সেই মনচোরা।

যার জ্বালা সেই জানে সখি অন্যে এই তো জানে না
কেমন কইরা সইব জ্বালা প্রাণেতে মানে না।
আমি কার কাছে কই এই বেদনা
পাইলাম না রসিক নাগরা।

বুঝলাম না সে প্রেমের রীতি এই কি প্ৰতিফল
কানতে কানতে জনম যায় মোর ফুরায় চোখের জল।
মনসুর কয় পিরিতের অনল
যার জ্বলে তার জীবন সারা।।

[রচনাকাল: ০৮-০২-১৯৭৪ ইং]

১০৩

কোনবা দেশে রইলারে বন্ধু না নিলা খবর
এই তোমার লাগি গৃহত্যাগী হইলাম দেশান্তর।

বন্ধু এই তোমার প্রেমের ছলে
বক্ষ ভাসে চোখের জলে
এই তোমায় খুঁজলাম কত বন জঙ্গলে
আমি ছাড়লাম সুখের বাড়িঘর।

বিরহ জ্বালা জ্বলছে বুকে
জুড়াইব প্রাণ কারে দেখে
আমার যাইতো জ্বালা থাকতাম সুখে
এই তোমায় দেখতাম যদি এক নজর।

[রচনাকাল: ১৬-০৬-১৯৭৫ ইং]

১০৪

রূপের নদী নিরবধি রুপালি চমকায়
কি চমৎকার রূপের জোয়ার ভাসিয়া বেড়ায়।

পদ্মা মেঘনা রূপবতী
ঝিলমিল করে রূপের জ্যোতি
বাঁকায় বাঁকায় মধুমতী
স্বরূপেতে রূপ ছড়ায়।

নিশি ভোরে রূপের কিরণ নদীর বুকে পড়ে
ঢেউ খেলে যায় রূপের বরণ ঝিকিমিকি করে।

কুটি মনসুরের গন
নদীর বুকে রূপ ধরে না
দেইখা সে রূপ মন ভরে না
মনসুর কয় রূপের বর্ণনা
কইলে না ফুরায়।

[রচনাকাল: ১৮-০৮-১৯৮০ ইং]

১০৫

সোনা বন্ধুরে আমার
কইয়া গেছ বারেবার
শনিবারে আইবা না হয় আইবা রবিবার।
আমার আশায় আশায় হপ্তা গেল
খবর নাই এই তোমার।

এই তোমার লাইগা দিনরজনী
হই যে আমি উদাসিনী
আমার ঘরে বাইরে মন টিকেনা
রাস্তা দেখি বারেবার।

যাইবার কালে দু’হাত ধইরা দিলা মাথার কিরা
ভাইবো না গো প্ৰাণসজনী জলদি আইবো ফিরা।

এই তোমার কথায় বিশ্বাস কইরা
জীয়ন্তে আছি যে মইরা
আমি দিন গুনিয়া দেখি এবার
হইয়া গেল মাস কাবার।

[রচনাকাল: ১০-০১-১৯৭৩ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মীনা বড়ুয়া, নুরুন্নাহার আউয়াল]

১০৬

সখিরে দারুণ প্রেমজ্বালা কি দিয়া নিভাই
আমার ধিকি ধিকি জ্বলছে অন্তর
জ্বইলা পুইড়া হইলো ছাই।

ভালোবাসার ছলেরে বন্ধু কেড়ে নেয় পরাণ
না জানি সেই ভালোবাসার এই কি প্রতিদান।
কি কবো সেই বন্ধুর কথা
আমার মন দিয়া তার মন না পাই।

যে যন্ত্রণা দিয়ারে বন্ধু রইলো গিয়া দূরে
আমার পাখা থাকলে যাইতাম সখি বন্ধুর কাছে উড়ে।
বন্ধু বিনে একা ঘরে
আমি কেমনে রাত দিন কাটাই।

[রচনাকাল: ০৬-০৪-১৯৭৪ ইং]

১০৭

নিঠুর বন্ধুরে ওরে ও বন্ধু এই ছিল কপালে
পিরিত কইরা গেলা ছাইড়া রে
আমার ভরা যৌবনকালে।

আমায় ভুইলা কেমনে রইলারে
ওরে ও বন্ধু দূর বৈদেশে যাইয়া
এই তোমার লাইগা নিশি জাইগা রে
থাকি আসার পন্থে চাইয়া।

তুই বন্ধুয়ার প্রেমে মইজা রে মন বসে না ঘরে
এমন দারুণ পিরিতের জ্বালা রে জ্বালা সহে না অন্তরে।

আমারে কান্দাইয়া বন্ধুরে তুমি রইলা সুখে
এই তোমার কথা মনে হইলো রে
কান্দি বালিশ লইয়া বুকে।

[রচনাকাল: ১৯-১১-১৯৮০ ইং]

১০৮

নানা গো নানা কেনে বুঝো না
ময়না আমার জানের জান
ময়না আমার চান্দের বাতি
ময়না আমার প্রাণের প্রাণ।

ময়নার প্রেমেতে আমি হইলাম দিশেহারা
তবুও এই তো নিঠুর ময়না দেয় না কোনো সাড়া
স্বপনেতে দেখি ময়না বইসা আমার পাশে
আমার দিকে চাইয়া ময়নায় মিটিমিটি হাসে।

রূপসিনি ময়নার কথা ভুলিব কেমনে
ময়না বিনে শান্তি নাই আমার জীবনে
ময়নার লাইগা কাইন্দা বক্ষ ভাসাই নয়ন জলে
সেই কান্দনে ময়নার মনটা একটুও না গলে।

যার জ্বালা সেই জানে ভবে অন্যেতো জানে না
মনের আগুন মনে জ্বলে পানিতে নিভে না।
মন যারে চায় তারে যদি কাছে নাহি পায়
মনসুর বলে প্রেমের ছলে জীবনটা তার যায়।

[রচনাকাল: ১৬-০৩-১৯৭২ ইং]

১০৯

পানির মতো পাতলা পিরিত কইরো না
প্রেম করিয়া কামসাগরে
ঝাঁপ দিয়া কেউ মইরো না।

জলের সঙ্গে মাছের পিরিতি
জল বিহনে মাছ বাঁচে না
যেমন গাছ তলায় এক পিরিতি
লতা জড়াইলে আর ছাড়ে না।

লাইলি মজনু প্রেমিক ছিলো হয় নাই তাদের লেনাদেনা
সেই সূক্ষ্ম প্রেমের এমন রীতি মইলে সে প্রেম ভাঙে না।

কুটি মনসুর বলে এ প্রেমরতন
হাটবাজারে বিক্রি হয় না
ও সেই প্রেমের মানুষ প্রেমবাজারে
প্রেমিক ছাড়া চিনে না।

[রচনাকাল: ১৮-০১-১৯৯৩ ইং]

১১০

আমার প্রাণের প্রাণ মোর বন্ধুয়ায়
ব্যথা দিয়া যায়
আমার জীবন যৌবন করলাম অর্পণ
এখন পইড়াছি গো বিষম দায়।

বন্ধুর আশার আশে রই কত হাতে ধইরা কই
দুঃখ কেমনে সইয়া রই
আমি আশার কূলে নিরাশ হই
আমি মইলাম গো তার প্রেম জ্বালায়।।

বন্ধু কত আশা দেয় আমার পরাণ কাইড়া নেয়
এখন করি কি উপায়
অধম মনসুর কয় প্রাণ কান্দে সদায়
প্রাণে বাইচা থাকা হলো দায়।

[রচনাকাল: ০১-০১-১৯৬৭ ইং]

১১১

না জেনে তারে কেন ভালবাসিলাম
তারে ভালবেসে মনের সাধে
মরণফাঁদে পড়িলাম।

অতি আপন ভাবলাম যারে
দেখা দেয় না সে আমারে
তার বিরহে জীবনটারে
বিফলে ক্ষয় করিলাম।

তার কথা মোর ভাবতে ভাবতে
জীবন গেল বইয়া
এমন সোনার দেহ আমার
গেল মাটি হইয়া।

আমি জেনে শুনে ভুল করি
খাইয়া ছিলাম বিষের বড়ি
এখন যে বিপদে পড়ি
বিষের ব্যথায় মরিলাম।

[রচনাকাল: ১২-১২-১৯৭৫ ইং]

১১২

গহীন জলের নদীরে
এই তোর আর এক নাম জীবন
এই তোর জলেতে লুকাইয়া রয়
কত যে অমূল্য ধন।

গহীন নদী এই তোর জলেতে শীতল হয় পরান
মাটি পানির অবদানে ফলে রে পাট ধান
পানিতে রুপালি ফসল
মিটায় খাদ্যের প্রয়োজন।

নদীরে এই তোর গুণের কথা কে বলিতে পারে
পাতালপুরী হতে পানি দিলিরে সংসারে
নদীরে এই তোর জোয়ার ভাটায়
মোরা ভেসে বেড়াই সৰ্বক্ষণ।

[রচনাকাল: ০৯-০১-১৯৭৫ ইং]

১১৩

ওরে ও কালো পাখি কাক
আমার দুঃখের খবর লইয়া
আগডালে তুই ডাক।

বিষের পরে বিষ পড়িলে পানি হয় তা জানি
অল্প দুঃখের চাইতে ভালো অনেক দুঃখ মানি
কাতর করার চাইতে আমায়
পাথর কইরা রাখ।


এই তোর ডাকে মোর নিশি পোহায় অশ্রু লইয়া চোখে
ঘরের বাহির হই না ভয়ে গঞ্জনা দেয় লোকে।

যারে ভালো বাইসা করলাম আমার সব উজাড়
সেই যে প্রেমের ক্ষুধায় জ্বলে রক্ত মাংস হাড়।
তার দেওয়া কলঙ্ক আমার
সারা জীবন থাক।

[রচনাকাল: ১০-০৭-১৯৮২ ইং]

১১৪

ও সে কোন রূপসী ময়না
তারে দেইখা প্রাণে সয় না
রূপসিনী কথা কয় না রূপের গৌরবে।

মুখ ফুটে না কইলো কথা
বুঝলো না সে মনের ব্যথা
কথা কয় না মুখে
আমার প্রাণ বাঁচে না দুঃখে।
ও তার মুখ ফোটেনা লাজে কন্যা
দাঁড়িয়ে রয় নীরবে।

গায়ের বাঁকা পন্থের ধারে
রূপের কন্যা দেইখা তারে
প্রাণ ছটফট করে
আমার মনটা কাইন্দা মরে।
না জানি সেই গরবিণী
কোনদিন আমার হবে।

[রচনাকাল: ০৮-০৫-১৯৭৪ ইং]

১১৫

মানুষ ধরার মতো ধর
ও প্রেম করার মতো কর
প্রেমের মাঝে মরণ হলে
হবি রে অমর।

দেখ না এসে প্রেমের মেলায়
আসল বস্তু প্রেমের বেলায়
পঞ্চ রঙ্গে প্রেম খেলায়
আসল প্রেমকে ধর।

ভন্ড প্রেমের কান্ড দেখে
পালাইস না তুই প্রেমকে রেখে
প্রেম শিখে নে তারে ডেকে
যেজন প্রেমের কারিগর।

স্বর্গ থাকে প্রেমের মাঝে
যা লাগে এই তোর সকল কাজে
ধন্য হয় ঐ প্রেমের মাঝে
কত নারী নর।

[রচনাকাল: ১৩-০৩-১৯৮০ ইং]

১১৬

পাকাবাড়ি রঙিন গেট
বসার জন্য সোফা মেট
পায়ের নীচে কার্পেট করেছো ফিটিং
মইরা গেলে পইরা রবে দশতালা বিল্ডিং।

বালাখানা পইরা রবে
রাজার রাজ্য ছাড়তে হবে
গাড়ির ড্রাইভার পালিয়ে যাবে করবে না ড্রাইভিং
মইরা গেলে পইরা রবে দশতালা বিল্ডিং।

এফডিসির ভিতরে যাইয়া
নায়ক আর নায়িকা লইয়া
রঙ্গেঢঙ্গে মন মজাইয়া করতেছো সুটিং
মইরা গেলে পইরা রবে দশতালা বিল্ডিং।

মনসুর বলে হাসান মতি
শেষকালে কি হবে গতি
পাপ-পূণ্য হবে সাথী করেছো যা মার্কেটিং
মইরা গেলে পইরা রবে দশতালা বিল্ডিং।

[রচনাকাল: ১৭-০৮-১৯৯৩ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মমতাজ]

১১৭

মিয়া ভাই যে আইলো না
বাবায় খবর নিলো না
শীতের কালে মায়ের হাতের
রসের পিঠা খাইলাম না।

পরের ঘরে জীবন কাটাই মাথা কইরা নিচু
শাশুড়ি ননদীর ডরে কইতে নারি কিছু
খেজুর গুড়ের ভাঁপা পিঠা
খাইতে লাগে বেজায় মিঠা
ভাগ্যেতে মোর হইলো না।

ছোট বেলায় মায়ের সাথে মামাবাড়ি যাইয়া
মনের সাধ মিটাইছি গাছের পাকা বরই খাইয়া।
আদর কইরা নানী বুড়ি
খাইতে দিতো চিড়া মুড়ি
সেই মুড়ি আর পাইলাম না।

[রচনাকাল: ০৮-০২-১৯৭৩ ইং]

১১৮

এই তোরা শোন রে শোন
প্রেম করিস না না কইরা ওজন।
ওরে যার তার সাথে প্রেম করিলে
অকালে তার হয় মরণ।

প্রেম করা নয় সহজ ধারা
জাতি সাপের লেজে পারা
ঘাড় ফিরাইয়া ছোবল দিলে
তখন যে তার যায় জীবন।

ইলিশ মাছ বিলে থাকে না
কিলাইয়ে কাঁঠাল পাকে না
ওরে বল্লার চাকে মউ পাবে না
পাবে শুধু জ্বালাতন।

অল্পশিক্ষার প্রেম-পিরীতি
দিন দুপুরে হয় ডাকাতি
মনসুর কয় জীবনের ক্ষতি
না হইলে মনের মতন।

[রচনাকাল: ০২-০২-১৯৮০ ইং]

১১৯

অল্প বয়সে ফাল্গুন মাসে
প্রাণবন্ধু রয় দূর বৈদেশে
আমি সুখের নিশি কাটাই দুঃখে
বন্ধু না আসিলো দেশে।

পরানটা মোর আনচান করে
মন যে মরে কাইন্দা
অবুঝ মনে বুঝ মানে না
কেমনে রাখি বাইন্দা
বন্ধু পত্র দেয় না খবর নেয় না
না জানি কোন দোষে।

বন্ধু যদি হইতো রে বৃক্ষ
আমি হইতাম লতা
জড়াইয়া থাকিতাম সঙ্গে
কইতাম মনের কথা
আমার প্রেমজ্বালা কেউ দেখেনা
জ্বালা জ্বলে ঘুসে ঘুসে।

[রচনাকাল: ২০-০১-১৯৮০ ইং]

১২০

আমার কলিজাতে জ্বলছে অনল
ঘসিয়া ঘসিয়া রে বন্ধু এই তোর লাগিয়া।

আমি পইড়াছি এই তোর প্রেমফান্দে
দিবানিশি পরান কান্দে
এই তোর দেখা না পাই খুঁইজা বেড়াই
দেশান্তরী হইয়া।

তুই যদি মোর হইতি রে ময়না আমি হইতাম এই তোর
মিটাইতাম মনের আশা যত ছিলো মোর।

নিঠুর বন্ধু কঠোর হইয়া
ভুইলা রইলি কোন দোষ পাইয়া
এই তোর লাইগা মোর জীবন গেলো
কান্দিয়া কান্দিয়া।

[রচনাকাল: ১৯-১০-১৯৬৭ ইং]

১২১

বল গো এই তোরা প্রাণসখি
আমি আর কতকাল বন্ধুর আশায় থাকি
আমার আশার জীবন নিরাশ হইলো রে সখি
আমার সোনার যৌবন কেমনে রাখি।

এই যৌবন বয়সে বন্ধু রইলা কোন বিদেশে
তারে আইনা দে গো প্ৰাণসখি
আমার বন্ধুর জন্য দিবানিশি রে সখি
সদায় ঝরে আমার দুটি আঁখি।

বসন্তকাল দিলো দেখা না আসিলো প্ৰাণসখা
ভবে আমার মতো আর নাই রে দুঃখী
আমি জগত ভইরা দেখতাম ঘুইরা রে
সখি হইতাম যদি আমি উড়াপাখি।

যদি বন্ধুর দেখা পাইতাম
তারে বক্ষে নিয়া আমার প্রাণ জুড়াইতাম
সখি হইতাম আমি চির সুখি
অধম মনসুর বলে অন্তিমকালে রে
বন্ধু এই তোমায় যেন আমি সামনে দেখি।

[রচনাকাল: ১৭-০১-১৯৫৭ ইং]

১২২

এই তোরা বলে দে গো সই
আমার মনের মানুষ কই
সে বিহনে কেমনে রই বাঁচিয়া।

আমার কাঞ্চা বয়সে রইলাম বন্ধুয়ার আশে
পোড়া মনটা বুঝাইব কি দিয়া।
আমার কেউ নাই সংসারে দুঃখ সয় না অন্তরে
কেউ এই তো মোরে জিগায় না ডাকিয়া।

সই গো আইলো ফাল্গুন মাস মন করে হা হুতাশ
কেউ এই তো তালাশ নেয় না আসিয়া।
আমার উদাসিনী প্রাণ যৌবন কারে করবো দান
বিফল হবে এই জীবন রাখিয়া।

[রচনাকাল: ০৫-০৪-১৯৭৩ ইং]

১২৩

ও রূপের কন্যা গো
মনের কথা আমার কাছে কও
আউলা চুল বাতাসে উড়ে
চুলের খোঁপা বাইন্দা লও।

খালি পায়ে গায়ের পথে চইলাছ কোথায়
প্রেমের কাঁটা পায় বিঁধিলে খোলা বিষম দায়
প্রেমের কাঁটার দারুণ ব্যথা
কেমনে সইয়া রও।

বলো কন্যা কার তালাশে উদাসিনী হইলা
না জানি হায় মুখখানি কেন মলিন কইরা রইলা
কন্যা আমি এই তোমার হইতাম
যদি তুমি আমার হও।

[রচনাকাল: ০৭-০২-১৯৮৩ ইং]

১২৪

চাইয়া দেখো ফুলের বাগিচায়
কোন রূপসী কন্যা এলো
রূপে তার বিজলী চমকায়
ওগো সূর্যের আলো মিশে গেল
সেই রূপসীর গায়।

ও তার সর্ব অঙ্গে রূপে ভরা
নীলাম্বরী শাড়ি পরা
শাড়ির আঁচল হাতে ধরা
আড় নয়নে চায়
তার কপালে কাজলের ফোঁটা
গোল খারু তার পায়।

কন্যা কালো কেশে বানছে বেণী
যেমন জাতি সাপে ধরছে ফনি
মনে হয় আপন সঙ্গী
খুঁজিয়া বেড়ায়।
কত যোগী-ঋষি দেখলে তারে
ধ্যান ভাঙ্গিয়া যায়।

দেইখা তারে ফুল বাগানে
আমার মন প্রাণ টানে।
রূপের কন্যা সে বিহনে
ঘরে থাকা দায়
ওসে মন ভুলাইয়া যায়
পালাইয়া কোন সে অচিন গায়।

[রচনাকাল: ০২-০২-১৯৭৪ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জিএম সাদেক]

১২৫

ব্যথা কইতাম ও ব্যথা কইতাম
ব্যথার ব্যথী যদি কেউরে পাইতাম
যে ব্যথা প্রাণে কেউ এই তো না জানে
বুক চিরিয়া দুঃখ কারে দেখাইতাম।

রূপের ব্যথা চোখেতে প্রেমের ব্যথা বক্ষেতে
কলিজার ব্যথায় আমি জ্ঞানহারা হইলাম
প্রেমের ব্যথার ডাক্তার নাই
ঔষধ বড়ি কোথায় পাই
যাইতো ব্যথা যদি মনের মানুষ পাইতাম।

ভবে প্রেমের ব্যথা আছে যার চিকিৎসা হয় না তার
সেই ব্যথা অন্যেরে আর কেমনে বুঝাইতাম।
প্রেম-পিরীতের ব্যথায়
কত জনার জীবন যায়
মনসুর কয় অন্তরের ব্যথা কেমনে দেখাইতাম।

[রচনাকাল: ০৯-০১-১৯৭২ ইং]

১২৬

ঘরে আমার মন বসে না
পরাণ বাঁচে না বন্ধু বিহনে
কি যে করি জ্বইলা মরি
বন্ধুর প্রেম-আগুনে।

ছাইড়া গেছে প্রাণের বন্ধু আমার মনচোরা
কই গেলে তার দেখা পাবো
বল গো সখি এই তোরা।
আইলো না আর বন্ধু আমার
লুকাইলো কোন বনে।

মনের কথা কইতাম সখি পাইতাম যদি তারে
জীবনের সাধ মিটাইতাম এ ভব সংসারে।

ভরা যৌবন কালে আমার বন্ধু নাই রে কাছে
আমার মত কপালপোড়া সখি আর কি ভবে আছে।
বন্ধু বিনে সোনার যৌবন
গেল অকারণে।

[রচনাকাল: ০৯-০৯-১৯৫৮ ইং]

১২৭

বন্ধুর চানবদন হেরিবো গো কবে
সেই দিন আমার কোনদিন গো হবে
আশার জীবন অসার হইলো
প্রাণবন্ধু মোর কোথায় রইলো
সোনার যৌবন যায় বিফলে
প্রেম জ্বালায় অন্তর জ্বলে
পোড়া কপাল জোড়া লাগবে কবে।

বন্ধুর কথা মনে হইলে বক্ষ ভাসে নয়ন জলে
বন্ধু একবার কাছে আসিয়া আমায় ভালো বাসিয়া
নয়নের জল নি বন্ধু মুছিয়া নিবে।

বক্ষ ভরা দুঃখ লইয়া ঘুইরা বেড়াই পাগল হইয়া
আমি যে হইয়াছি তার সে যদি হইত আমার
কাছে থাইকা কবে টাইনা পাশে রাখিবে।

[রচনাকাল: ০৮-০১-১৯৬৭ ইং]

১২৮

বন্ধুর সনে প্রেম করিয়া
সখি এখন কি যে করি
দিনে রাতে কলিজাতে
ব্যথায় জ্বইলা মরি।

প্রেম করিয়া মন ভুলাইয়া
মন নিয়া সে যায় পালাইয়া
প্রেমের আগুন দেয় জ্বালাইয়া
জ্বালা সহিতে না পারি।

নিশি যোগে বন্ধুর কথা যখন মনে পড়ে
কাইন্দা কাইন্দা পোহাইলো নিশি মানে না অন্তরে।

বন্ধুয়ার পিরিতের জ্বালা
অন্তর পুইড়া হইলো কালা
মনসুর কয় মন হয় উতলা
তারে কেমনে পাশরি।

[রচনাকাল: ০২-১০-১৯৭০ ইং]

১২৯

এ দুঃখ জানাবো কারে
মনের মানুষ নাই সংসারে।

সখি গো এই কি ছিলো বিধির লিখন
বৃথা গেল জীবন যৌবন
কি দিয়া মন বাইন্ধা রাখি ঘরে।

আমার মনের মানুষ চিন্তামণি
সে এই তো বড় গুণের গুণী গো
বলো এই তোমরা সখি দেখছনি কেউ তারে।

আমার বলতে কেউ নাই ভবে
প্রাণে বাইচা কি লাভ হবে
প্রাণ তেজিব ঝাঁপ দিয়া সাগরে।

আশা দিয়া প্রেম করিয়া
নিঠুর বন্ধু যায় ছাড়িয়া গো
ভবে কেউ ডাকিয়া জিগায় না আমারে।

[রচনাকাল: ০৭-০২-১৯৭০ ইং]

১৩০

প্রেম জ্বালা জ্বলে প্ৰাণে
কেউ এই তো জানে না
তুষের আগুন ঘুসে জ্বলে
বাঁধা মানে না।

ভ্রমর বিনে ফুলে যেমন মধু যায় শুকাইয়া
বন্ধু বিনে জীবন আমার যায় গো ফুরাইয়া
আমার মন নিয়া সেই মনচোরা
একবার ধরা দিলো না।

পিরিত কইরা প্রাণবন্ধুয়া আমায় ছাইড়া যায়
অভাগিনীর পোড়া কপাল না দেখি উপায়।
যৌবন জোয়ার থামে না আর
বুঝাইলে মন বুঝে না।

[রচনাকাল: ০১-০৯-১৯৭৭ ইং]

১৩১

এত কইরা বন্ধু এই তোমার মন পাইলাম না
মনের কথা রইলো মনে
বলা হইলো না।

মন দিলাম প্রাণ দিলাম দেব কত আর
কি আর এমন আছে বাকি এই তোমারে দিবার
নিদয়া নিঠুর রে বন্ধু দয়া হইলো না।

জহুরি জহর চিনে মানি বুঝে মান
স্বর্ণকারে সোনা চিনে শিল্পী চিনে গান।
আমি এই তোমার কি যে ছিলাম আমায় চিনলা না।

[রচনাকাল: ০১-১১-১৯৮৩ ইং]

১৩২

প্রেম করিয়া বন্ধুর সনে রইল দুঃখ মনে
ও তুই কত আশা দিলি
জনম ভইরা কান্দাইলি
দুঃখ দিলি বন্ধু সারা জীবনে।

বন্ধুরে এই তোর লাগিয়া সকলি ত্যাগিয়া
খুঁজিয়া বেড়াই বনবাসে।

এই তোরে কত দেশে খুঁজিলাম
তবু দেখা না পাইলাম
কলঙ্কিনী হইলাম বন্ধু এই তোর কারণে।

ভালোবাসার প্রতিদান দিয়াছি রে কুলমান
জীবন যৌবন করলাম দান এই তোর চরণে
আমার আশার কূলে হইলো ছাই
কইবার এই তো জায়গা নাই
দুঃখের ব্যথা ভবে জানে দুঃখীজনে।

[রচনাকাল: ১০-০৪-১৯৮২ ইং]

১৩৩

সময়কালে এই তোমায় পাইলাম না রে বন্ধু
আমার মনের ব্যথা মনে রইলো রে বন্ধু
কোনদিন এই তোমার কাছে কইলাম না।

ব্যথা বলবো বলে আশা ছিলো
আজকাল বলে দিন ফুরাইলো
এ হেন সোনার যৌবন মাটি হইলো রে বন্ধু
তুমি একবার আইসা দেখলা না।

কি যে দারুণ প্রেম শিখাইয়া
ছল কইরা মোর মন ভুলাইয়া রে
এখন কারে পাইয়া সুখে রইলা রে বন্ধু
আমার দুঃখ বুঝলা না।

[রচনাকাল: ০৮-০১-১৯৭৮ ইং]

১৩৪

জ্বালা সহে না আর প্রাণেতে
জনম গেলো কান্দিতে
পারলাম না ঐ নিঠুর বন্ধুর
মন দিয়া মন বান্ধিতে।

ঘরের বন্ধু পরকে লইয়া
রইয়াছে কার আপন হইয়া
আমার দুঃখ একবার
চাইয়া দেখলো না দুই চোখেতে।

প্রেম জ্বালা মোর জ্বলছে বুকে
দেখলো না তা অন্য লোকে
সুখের নিশি কাটাই দুঃখে
বন্ধু রয় প্রবাসেতে।

[রচনাকাল: ১৭-০৩-১৯৭৯ ইং]

১৩৫

শোনেক এই তোরা সই গো সই
এই তোদের কাছে মনের কথা কই
বন্ধুর একখান পত্র পাইলাম
পত্র পাইয়া খুশি হইলাম
বাড়ি আসবে বন্ধু আমার
আমি যে তার আশায় রই।

মাঘের পরে ফাল্গুন মাসে
বন্ধু যদি বাড়ি আসে
তারে শুধু ভালবেসে
আমি যেন পাগল হই।

বসন্তের এই মিষ্টি হাওয়া
আদায় করবো চাওয়া পাওয়া
বন্ধু আমার প্রাণের মায়া
সে বিহনে কেমনে রই।

[রচনাকাল: ০১-০৬-১৯৮৩ ইং]

১৩৬

মন না জেনে মনের মানুষ চেনা বড় দায়
ভাব না জেনে ভাবের মানুষ কভুও না পায়।

মনের মত মন পাওয়া সহজ কথা নয়
প্রেমিক ছাড়া প্রেম করা বোকার পরিচয়।
মনে খুঁজে মনের মানুষআর কিছুই না চায়।

প্রেম-পিরীতি মনে মনে যায় না চোখে দেখা।
ছন্দ ছাড়া কবিতা যেমন হয় না কভু লেখা
একহাতে বাজে না তালি দুই হাতে বাজায়।

[রচনাকাল: ২৯-০৬-১৯৮৬ ইং]

১৩৭

আমার প্রাণ কান্দে রে সখি সদায় এই তোর লাগি
সখি এই তোর বিচ্ছেদে মনের খেদে
আমি হইয়াছি অনুরাগী।

আমার কোন ব্যথা নাই এই তোরে যদি পাই
এই তোর পিরীতের মরা আমি মরতে চাই।
সখি এই তোরে পাইতে নিশি রাইতে
আমার ঘুম নাই চোখে রই জাগি।

আমি দুহাত জুড়ে নতশিরে
এই তোর কাছে দোষ স্বীকার করি
অধম মনসুর বলে আমার অন্তিমকালে
আমি হই যেন এই তোর সঙ্গের সঙ্গী।

[রচনাকাল: ০৪-০৭-১৯৬৬ ইং]

১৩৮

বসন্তের এই শান্ত হাওয়ায় জুড়ায় না পরাণ
ফাগুনের আগুনে পুইড়া
হইলাম পেরেশান।

প্রেমের জ্বালা বুকে লইয়া
সোনার খাটে থাকি শুইয়া
সুখের নিশি কাইন্দা আমার
হইলো অবসান।
যার লাগিয়া নিশি জাইগা বক্ষ ভাসাই কাইন্দা
কোন প্রেমিকে প্রেমের ছলে রাখছে তারে বাইন্ধা।

কার পিরিতে বন্দী হইলো
আমার কথা ভুইলা রইলো
প্রেমের ব্যথা না বুঝিলো
বন্ধু যে নিঠুর পাষাণ।

[রচনাকাল: ০৫-১১-১৯৮৩ ইং]

১৩৯

বন্ধু তুমি আমার হইলা না
আমায় ভালো বাইসা কাছে আইসা
এই তোমার মনের কথা কইলা না।

যে ব্যথা লইয়া বুকে সইয়া থাকি আমি
মুখ দেখিয়া দুঃখ আমার না বুঝিলা তুমি
জল বিহনে চাতকিনী কেমনে বাঁচে বলো না।

ভাবতে ভাবতে এই তোমার কথা অন্তর হইলো কালা
তুমি এই তো না জানো বন্ধু পিরিতের কি জ্বালা
ছল করে মন কেড়ে নিলা মন নিয়া মন দিলা না।

জ্বালাইয়া পিরিতের আগুন নিভাইতে জানোনা
তবে কেনে পিরিত কইরা বাড়াইলা যন্ত্রণা
এখন ঘরে আমার মন বসে না একবার আইসা দেখলা না।

[রচনাকাল: ০৪-০১-১৯৭৯ ইং]

১৪০

যার জ্বালা সেই জানে গো
অন্যে এই তো জানে না
আমি আর কতকাল সইবো জ্বালা
প্রাণে এই তো আর মানে না।

ঘরের কোণে রূপপিনী
জ্বালায় মোরে দিন রজনী
ও সে কুলের কুলিন সোহাগিনী
আমার কথা শোনে না।

আপন ভেবে পরকে লইয়া বাইন্ধা সুখের ঘর
এখন দুঃখেরই আগুনে জ্বইলা ছাই হইলো অন্তর।

এই কি ছিল বিধির লিখন
ভেঙে যায় রে আমার স্বপন
ভাবলাম যারে অতি আপন
সে আমাকে চিনল না।

[রচনাকাল: ০৭-১০-১৯৮১ ইং]

১৪১

বাঁকা গায়ের মেঠো পথে কোন রূপসী যায় 
কার ঘরের দুলালী কন্যা
চইলাছে কোথায়।

ঝনঝনাইয়া হাতের চুড়ি ভনভনাইয়া চলে
একা পথে কারও সাথে কথা নাহি বলে।
তার রূপের নেশায় হারাই দিশা
প্রাণে বাইচা থাকা দায়।

নাম জানি না ধাম চিনি না অপরূপ সুন্দরী
রূপ দেখাইয়া সে যে আমার মন কইরাছে চুরি।
এখন কি যে করি ভেবে মরি
না দেখি উপায়।

[রচনাকাল: ০৬-১১-১৯৮৩ ইং]

১৪২

ভাবিজানের ছোট বোন কমলা সুন্দরী
পুকুর পাড়ে দেইখা তারে হোঁচট খাইয়া পড়ি।

মিয়া ভাইয়ের শালিকা এমন সুন্দর বালিকা
চালচলনে আধুনিকা আমার মন নিয়াছে কাড়ি।

পুকুর হইতে নাইয়া ধুইয়া যায় কমলা ঘরে
মুখের উপর রোদের আলো ঝিলমিলাইয়া পড়ে।

নামটি তার কমলা গায়ের রঙটি শ্যামলা
তার লাইগা প্রাণ উতালা জ্বইলা পুইড়া মরি।

[রচনাকাল: ০১-০৭-১৯৮২ ইং]

১৪৩

একটা কালো মেয়েও দেইখা মোরে
ভালো বাসলো না
ও সে চোখ রাঙ্গাইয়া চইলা গেলো
ফিরা আসলো না।

সে মেয়ে পছন্দ করলো না আমারে
এত যে নির্গুণী আমি হইলাম এ সংসারে
আমার নাই রূপের বাহার বাবড়ি চুল নাই মাথার
তবু কেন অবুঝ মনটা বুঝলো না।

লাবণ্য চেহারা নাই শরীরের গঠন
ঠোঁট মোটা ঘাড় খাটো হাত পাও চিকন।
মুখে বসন্তেরই দাগ মেয়েরা দেখলেই হয় রাগ
তাইতো ভবে প্রেম-পিরীতি ভাগ্যে আমার জুটলো না।

[রচনাকাল: ০৪-০৩-১৯৮৩ ইং]

১৪৪

শোন গো সঙ্গিনী শোন প্ৰাণসজনী
সকল কথা কইও তুমি
নায়র যাইবার চাইও না।

একে এই তো পৌষ মাসে বইছে হিমেল হাওয়া
সামনে আছে ফাগুন মাস কোকিলের গান গাওয়া।
এমনো সোহাগ ক্ষণে আমায় থুইয়া যাইও না।

শীতের খ্যাতা রইদের ছাতা কে দিবে যোগাইয়া
সাজাইবে কে পানের খিলি মিষ্টি মুখে হাসিয়া।

যাহা চাইবে তাহা পাইবে আলতা সাবান চুড়ি
ভালোবাসার মনপিঞ্জরে রাখবো সাজন করি।
চোখের পানি মুছো কন্যা মুখখানি ভার কইরো না।

[রচনাকাল: ১৮-০১-১৯৮০ ইং]

১৪৫

আমার মন নিয়াছে নিঠুর বন্ধু মিঠা কথা কইয়া
কেমন কইরা রইবো ঘরে উদাস পরাণ লইয়া।

কই লুকাইলো মনচোরা জানলে সখি বল গো এই তোরা
আমি হইলাম কপাল পোড়া বন্ধু হারা হইয়া।

ফাঁকি দিয়া গেলো বন্ধু আসার কথা বইলা
পিরিতের শেল মাইরা বুকে যায় রে বন্ধু চইলা।

আমি যে অবলা নারী তার কথা না ভুলতে পারি
আমি প্রেম আগুনে জ্বইলা মরি কেমনে থাকি সইয়া।

[রচনাকাল: ০৭-০২-১৯৮২ ইং]

১৪৬

কারো চোখের আদরিণী হইলাম না সংসারে
সোহাগিনী বলে কেউ এই তো ডাকলো না আমারে।

নারীকুলে জনম নিয়া হইলাম অভাগিনী
কেউ এই তো মোরে ভালোবাইসা করলো না সঙ্গিনী।
জীবন গাঙের সুজন মাঝি
সখি কোথায় পাবো তারে।

বুঝলো না কেউ খুঁজলো না কেউ ব্যথার ব্যথী হইয়া
বল গো সখি এ যন্ত্রণা কেমনে রইবো সইয়া
দিন কাটে এই তো রাত কাটে না
সখি দুঃখ জানাই কারে।

[রচনাকাল: ০৮-০৭-১৯৮৩ ইং, সুরকার: সুরুজ মিয়া, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নীনা হামিদ]

১৪৭

আদর সোহাগ পাইবা কন্যা
বেজার তুমি হইও না
সকল কথা কইও কিন্তু
নায়র যেতে চাইও না।

কন্যা তুমি নায়র গেলে কেমনে রইবো এই তোমায় ফেলে
শীত বসন্ত সুখের কালে প্রাণে ব্যথা দিও না।

তুমি আমার জীবন সাথী অন্তরের অন্তর
এই তোমায় নিয়ে এ সংসারে বাঁধবো সুখের ঘর।

শাড়ি গয়না অলংকারে রাখবো এই তোমায় খুশি করে
তুমি ছাড়া একা ঘরে কেমনে থাকি বলো না।

[রচনাকাল: ২০-০৮-১৯৮৩ ইং]

১৪৮

জরিনা এই তোর মন ভালো না
না না জরিনা এই তোর চলন ভালো না
এই তোরই দোষে চান মিয়া এই তোরে
আপন কইরা নিলো না।

আষাঢ় মাসে বাঁশ বাগানে মশার কামড় খাইয়া
পিরিত করলি জরিনা তুই চান মিয়ারে পাইয়া।
পতির মনে দিয়া জ্বালা
গলায় নিলি মতির মালা
অবশেষে বুঝবি ঠ্যালা ধরা পড়লে ছলনা।

বসের কালের রসের পিরিত করলি দুনিয়ায়
পাতলা পিরিত কইরা কেনে পড়লি দুর্দশায়।
আপন থুইয়া পরকে লইয়া
লবণ খাইলি চিনি থুইয়া
নিজের দোষে দোষী হইয়া কলঙ্ক নাম ঘুচলো না।

[রচনাকাল: ১০-০৭-১৯৮৩ ইং]

১৪৯

এই তোর কথা ভুলিতে পারিনারে কমলা
এই তোরই সাথে সরিষা ক্ষেতে
যাইতাম মটর সিম তুলিতে
সেই কথা তুই মনে রাখলি নারে কমলা।

আমারে ঢাকায় রাখিয়া
তুই রইলি কোলকাতায় যাইয়া
সুখ দুঃখের খবর নিলি না
কমলা তুই নিঠুর হইলি
কোন দোষে ভুলিয়া রইলি
একবার আইসা দেইখা গেলি নারে কমলা।

ঐ পার বাংলায় রইলি যাইয়া
আমি মরি ছটফট হইয়া
এপার বাংলায় ফিরা আইলি না
কুটি মনসুর কয় ভাবিয়া
শোন কমলা এই তোর লাগিয়া
প্রেমে কভু ধর্ম মানে নারে কমলা।

[রচনাকাল: ০৪-০৯-১৯৮৫ ইং]

১৫০

কাঁচা বরই গাছে বন্ধু ঝাকি দিও না
পাকলে খাইও পরান ভইরা ধৈর্যহারা হইও না।

কাঁচা ফলের শক্ত বোঁটা
পাইড়া খাইতে ভাঙে কোটা
খাইতে সে ফল কষ্টি তিতা মিঠা লাগে না
ফুলের কলি না ফুটিলে রসের মধু মিলবে না।

পাকা ফলের বাগে যাইও
মনের সাধ মিটাইয়া খাইও
মাকাল ফলের রঙ দেখিয়া ভুইলা যাইও না।
ওরে বসন্ত না আসলে কভু
বনের কোকিল ডাকবে না।

বটবৃক্ষ বড় গাছটি
সে গাছে নাই রে মিষ্টি
মনসুর বলে সে গাছের ফল কেউ এই তো খাইলো না।
দই ভাবিয়া ঘোল খাইলো যে
দইয়ের সাধ সে পাইলো না।

[রচনাকাল: ১৫-০৩-১৯৭৬ ইং]

১৫১

কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না
অন্তরে যার গরল ভরা
সে এই তো সরল কথা বুঝতে চায় না।

লাল টুকটুক মাকাল ফলটি
দেখতে সুন্দর পরিপাটি
উপরে লাল ভিতরে ছাই
সে ফল এই তো ভাই কেউ খায় না।

হজ্ব করিতে যাইয়া মক্কা
খাইয়া কত ঠ্যালা ধাক্কা
বুইড়া কালে ঘুইরা পড়ে
তবু খুইজা খোদার দিদার পায় না।

[রচনাকাল: ২৪-০৪-১৯৮৫ ইং]

১৫২

হায় কি মজা দেখলাম পথে আসিতে
গর্তে পইড়া ফূর্তি কইরা
লাগলাম আমি হাসিতে
হায় কি মজা দেখলাম পথে আসিতে।

কাম-কামিনীর ইচ্ছামতে
মদনগঞ্জের পিছলা পথে
হোচট খাইলাম বন্দি হইলাম ভবের মায়ারশিতে
হায় কি মজা দেখলাম পথে আসিতে।

রসের মধ্যে রইলাম ভাইসা
সিন্ধুনীরে আবার আইসা
বিন্দু রূপে ডিম্বের ভিতর লাগলাম আমি ভাসিতে
হায় কি মজা দেখলাম পথে আসিতে।

প্রথম ছিলাম নীরাকারে
তারপর রইলাম অন্ধকারে
দশ মাস পরে খুয়া করে পাইলাম কিছু দেখিতে
হায় কি মজা দেখলাম পথে আসিতে।

কুটি মনসুর বলে আপন দোষে
জেল খাটিলাম ঘরে বসে
খালাস পাইয়া দেখলাম চাইয়া আইসাছি ভিনদেশেতে
হায় কি মজা দেখলাম পথে আসিতে।

[রচনাকাল: ০১-০৮-১৯৭৯ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রাজু মন্ডল]

১৫৩

বুঝলাম না রে বুঝলাম না
বাঁইচা থাকতে খুঁজলাম না
মানিকগঞ্জের মানিক রতন
কেউ তো চিনলাম না।

কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীম গাইছেন পল্লীগান
ওস্তাদ যে তাঁর মানিকগঞ্জের মমতাজ আলী খান।
মানিকগঞ্জের কৃতি সন্তান হালিম চৌধুরী ওসমান খান
কালু শাহ ফকির মরমি গান করছেন বহু রচনা।

সিনেমাতে খান আতার গুণের সীমা নাই
লোকসাহিত্যে দীনেশ চন্দ্রের জুড়ি কোথায় পাই
গুণী শিল্পী আরো আছেন মানিকগঞ্জে জন্ম নিছেন
কোকিলকণ্ঠী নীনা হামিদের কথা কেউ তো ভুলবে না।

রশীদ ফকির নাজির ফকির ছিলেন তারা গুণী
জারি গাইছেন মেঘু বয়াতি লোকের মুখে শুনি।
বদরউদ্দীনের আছে ক্ষ্যাতি দারোগা আলী গেন্দু বয়াতি
দোতারাতে ফেলু শেখ আর চান মিয়ার নাই তুলনা।

মানিকগঞ্জে জন্ম আমার আমি মমতাজ
গান শুনিয়ে সবার মন জয় করেছি আজ।
কুটি মনসুরের লেখা গানে মমতাজের কণ্ঠদানে
মানিকগঞ্জের শিল্পীরা সব অমর থাকবে মরবে না।

[রচনাকাল: ০১-০৪-২০০১ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মমতাজ]

১৫৪

ওরে ও দরদের আম্মাজান
এই তোমার কলিজার টুকরা
আদরের কন্যা আমি কমলা সুন্দরী।

না জানিয়া দিলা বিয়া রইলাম পরের বাড়ি
ঘরে জন্মাইদা শাশুড়ি
সকালের ভাত বিকালে দেয়
কইতে না পারি/ আমি
ননদী দেবরের জ্বালা
কইতে বাড়ে দ্বিগুণ জ্বালা
ও মা গো জ্বালায় জ্বালায় জ্বইলা মরি
আমি কমলা সুন্দরী।

আম ফুরাইলো জাম ফুরাইলো খাইলাম না কাঁঠাল
আমার দুঃখেরই কপাল
দুইটা বছর কাটাই মা গো
না খাই পাকা তাল/ মা গো
ভাইধন আমার নাই যে ভবে
কে আইসা মোর খবর নিবে
ও মা গো কেউ নাই নিতে আমার নাইওরি
আমি কমলা সুন্দরী।

[রচনাকাল: ২০-০৭-১৯৫৪ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: অনিমা মুক্তি গমেজ]

১৫৫

আম্মা যায় তার বাবার বাড়ি
বাবা যায় তার শ্বশুড়বাড়ি
আমি যাই কোথায়
মামার বাড়ি যাইয়া দেখি
সবই এক জায়গায়।

হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান
সব মানুষ এক মায়ের সন্তান
একই রকম সৃষ্টির বিধান চলছে দুনিয়ায়।
শাস্ত্রমতে সবাই জানি
যাহা জল তাহাই পানি
একই সূর্যের আলো যেমন জগতে ছড়ায়।


আল্লাহ ইশ্বর ভগবান
রাম রহিমের ভেদ বিধান
একজনারই অবদান স্রষ্টা বিধাতায়।
আগুন পানি বাতাস মাটি
সাগর নদীর উজান ভাটি
মনসুর কয় মানুষ খাঁটি কর্ম সাধনায়।

[রচনাকাল: ২২-০১-১৯৯৪ ইং]

১৫৬

যে জন করে মধুর পিরিতি
জানে তার পরানে রে
ওরে হাজার বাঁধা থাকে যদি
সেই বাঁধা না মানে রে।

কৃষ্ণপ্রেমে পাগল রাধা
মানে না সে কারো বাঁধা
দিবা-নিশি থাকতো রাধা কৃষ্ণ ধ্যানে
সেই প্রেমের বাঁধন ছিড়ে না কখন
জীবনে মরণে রে।

চম্পার প্রেমে গাজি পাগল
গাজির প্রেমে চম্পা পাগল
চম্পাবতী গাজির দেখা পায় স্বপনে
শেষে বাঘে কুমিরে লড়াই করে
গাজি চম্পারো কারণে রে।

রজকিনী প্রেম কইরাছে
এমন প্রেমিক কয়জন আছে
চণ্ডীদাসে মইরা বাঁচে দেখছে নয়নে।
মনসুর কয় প্রেম হয় না বিলীন
থাকে প্রেমিকার অধীনে রে।

[রচনাকাল: ০১-০৩-১৯৭৩ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

১৫৭

তুমি আমার হইলে পরানবন্ধুরে
আমি এই তোমার হইবো
কাছে রাইখা পাশে থাইকা
মনের কথা কইবো।

হারমণি আর শিল্পী যেমন সুরে কণ্ঠ সাধা
তুমি আমি রইবো তেমন একই সুতায় বাঁধা।
আমার দুঃখ সইলে তুমি গো
আমি এই তোমার দুঃখ সইবো।

এই তোমার প্রেমের ফান্দে পইড়া কান্দে আমার মন
না পাই যদি এই তোমার দেখা বৃথা এ জীবন।
এই তোমার প্রেমে হইলে মরণ গো
আমার আত্মা সুখে রইবো।

ফুল ফুটিলে খোঁজে ভ্রমর রসের মধু খাইতে
প্রেমিক খোঁজে দিবা-নিশি প্রেমিকারে পাইতে।
মনে খোঁজে মনের মানুষ গো
আমি তেমনি খুঁইজা লইবো।

আত্মা ও হৃদয়ের বন্ধু হৃদমন্দিরে থেকো
অঙ্গেতে অঙ্গ মিশাইয়া বুক পাইতা দুঃখ দেখো।
কুটি মনসুর বলে চরণতলে গো
এই তোমার সাথী হইয়া রইবো।

[রচনাকাল: ০১-০৭-১৯৮৫ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: ভুলো না]

১৫৮

আমার মন নিলো হরিয়া গো
ঐ দোতরা বাজাইয়া
সুজন মাঝি নাও বাইয়া যায়
ভাইটালি গান গাইয়া।

ভাইটালি গান শুইনা পরান উদাসিনী হয়
সুরের সাথে দোতারাতে মনের কথা কয়।
গানের সুরে দুঃখ সুখের
মর্ম দেয় বুঝাইয়া।

জোয়ার ভাটায় চলে নদী রূপে ঝলমলাইয়া
ঢেউয়ের দোলায় সুজন মাঝির নৌকা চলছে ধাইয়া।
নীল বাদাম উড়াইলো মাঝি
পুবাল বাতাস পাইয়া।

[রচনাকাল: ২৭-০৭-১৯৮৫ ইং]

১৫৯

কলের ঘড়ি ঘণ্টা বাজে চলে রাত্রদিন
জীবন ঘড়ির শেষ ঘণ্টা
বাজবে রে একদিন।

ঘড়ির কল বিকল হলে জিগাইবে না কেউ
দিল দরিয়ায় উঠবে তুফান মরণ জ্বালার ঢেউ।
অকূলের কূল দয়াল মুর্শিদ
সময় থাকতে চিন।

ইঞ্জিনকলে গাড়ি হাঁকায় তাকায় না কেউ পিছে
দিন দুচারি রংতামাশায় মন মজাইলি মিছে।
মন তুমি কার কেউ নয় এই তোমার
সব হবে অচিন।

[রচনাকাল: ০২-১০-১৯৮১ ইং]

১৬০

কে বলে পিরিত ভালো
আমার ভালো হইলো কই
বুকে জ্বলে দুঃখের আগুন
এই জ্বালা আর কেমনে সই।

মনের সাধে পিরিত কইরা মরণ ফাঁদে পড়িলাম
প্রেমে মইজা পাগল সাইজা পথে পথে ঘুরিলাম।
সর্বহারা কপাল পোড়া সমাজের কলংক হই।

আমারে পাগল বানাইয়া নিজে পাগল হইলা না
আমার কথা শুইনা গেলা এই তোমার কথা কইলা না
সুখের আশায় পিরিত কইরা জনম-দুঃখী আমি হই।

[রচনাকাল: ১৮-১১-১৯৯৩ ইং, প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জানে আলম]

১৬১

প্রেম করা জিন্দা মরা, এই তো প্রেমের নীতি।
লাভ-লোকসানের হিসাব করলে
হয় না রে পিরিতি।।

মাটির মানুষ খাঁটি প্রেম করছে ভবে যারা,
এক মরণে দুইজন মরে, ভয় করে না তারা।
প্রেমের স্বপন নিদ্রা ছাড়া দেখে দিবারাতি।

প্রেমের খেলা খেলছে কত প্রেমিক-প্রেমিকায়,
আশেক হইয়া গগনের চাঁদ পাতালে নামায়।
শাহজাহানের খাঁটি প্রেম, তাজমহল তার স্মৃতি।।

[রচনাকাল: ০১-০১-১৯৯৪]

১৬২

কয়েক দিনের ভিসা নিয়ে এসেছিলি ভবে।
ভিসার তারিখ শেষ হলেই
চলে যেতে হবে।

কিসের দোকান করলিরে এই ভবের হাটে এসে
আমল খাইয়া দেনা হইয়া কাঁদবি অবশেষে
মহাজনের হিসাব-নিকাশ করবি রে তুই কবে।

অবৈধ মাল পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে যাবি
কাস্টমেতে ধরা পড়লে কঠিন সাজা পাবি
শেষে চিরতরে কারাগারে আটকা পড়ে রবে।।

[রচনাকাল: ০২-১২-১৯৯৩]

১৬৩

বন্ধুর প্রেমো-জ্বালায় অঙ্গ কালারে,
জ্বালা নিভাই কি দিয়া?
সে যে কি দিয়া, কি নিয়া গেছে চলিয়া,
তারে না পাই খুঁজিয়া।

জ্বালাইয়া পিরিতের অনল,
মনোপ্রাণ কইরাছে পাগল গো,
বন্ধুর দেখা না পাইয়া দিশা হারাইয়া,
নিশি পোহাই কান্দিয়া।

জীবন-যৌবন অমূল্য ধন
সকলি কইরাছি অর্পণ গো,
আমি তবু বন্ধুর হইলাম না আপন,
আমায় রইছে ভুলিয়া।।

[রচনাকাল: ১৮-১১-১৯৮৩]

১৬৪

পিরিতে এই জগতে জাতিকুলের ধার ধারে না।
ওরে, পিরিত করে বাদশাই ছাড়ে,
কেউ তারে রুখতে পারে না।।

যেমন গাছে লতায় পিরিত করে,
গাছ মরিলেও লতা মরে,
তবুও এই তো লতায় কিন্তু গাছ ছাড়ে না।
ও সেই সূক্ষ্ম পিরিত করে যারা,
বাঁচা-মরার ভয় করে না।

ধোপার মেয়ে পাইবার আশে
পিরিত করে চণ্ডীদাসে,
বার বছর বড়শি বায় তবু মাছ ধরে না।
শেষে এক মরণে দুইজন মরে,
এমন মরণ কেউ মরে না।

এক পিরিতে বেহেস্তো পায়,
এক পিরিত দোযখে যায়।
ভবের পিরিত লোভ-লালসায় পাপ ছাড়ে না এই।
তোমরা জেনে-শুনে পিরিত কর,
মনসুর কয় যেন ভুল পড়ে না।।

[রচনাকাল: ১৮-১১-১৯৬৭; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]

১৬৫

দুঃখের দিনে বন্ধু হইয়া
আদর দেয় যে বুকে লইয়া,
তারে কোথায় পাই
আমি সেই মানুষটি চাই।

পথে-ঘাটে-মাঠে মানুষ করে থৈ-থৈ,
মানুষের ভীড়ে খুঁজি সেই মানুষটি কই
এই মনে চায়, দেইখা তারে
প্রেমজ্বালা জুড়াই।

ভালোবেসে এসে যে জন প্রেমের মূল্য দেয়,
দুঃখ-সুখের ভাগি হইয়া কোলে তুইলা নেয়।
কুটি মনসুর বলে হিংসা-বিদ্বেষ
যার ভিতরে নাই।।

[রচনাকাল: ২১-০৫-১৯৯৯]

১৬৬

আমি এই তোমার হইতাম বন্ধু,
তুমি আমার হইলে,
আমার কথা কইতাম বন্ধু,
এই তোমার কথা কইলে।

কাছে আইসা ভালোবাসিয়া আদর-সোহাগ দিলে,
প্রাণ জুড়াইতাম সুখী হইতাম বুকে তুইলা নিলে
দুঃখ-ব্যথা মনের কথা
কইতাম পরান খুলে।

কাছে পেলে বুকে তুলে দিতাম ভালোবাসা,
সোহাগ দিয়া পুরাইতাম মনের যত আশা।
থাকতো না জ্বালা-যন্ত্রণা,
এই তোমায় কাছে পাইলে।।

[রচনাকাল: ১৬-১০-১৯৯৬]

১৬৭

বিজলি বাতি চইলা গেলে জ্বইলা ওঠে পরে,
দম গেলে আর আসবে না দম
এই দেহের ভিতরে।

চোখের আলো নিভে যাবে, দিবস হবে রাতি,
হাজার বন্ধু থাকলে সেদিন কেউ হবে না সাথী।
তাই জীবনখাতার হিসাব মিলাও
আন্তরে-অন্তরে।

ডুবলে বেলা রঙের মেলা খেলা হবে বন্ধ,
কুটি মনসুর কয় ফুরাইয়া যাবে দুনিয়ার আনন্দ।
সেদিন পাকা বাড়ি ছাইড়া যাবে
কাঁচা মাটির ঘরে।।

[রচনাকাল: ১০-১০-১৯৯১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: এম. এ. মতিন]

১৬৮

বাঁইচা থাকতে কইরো না ধন-সম্পত্তির বড়াই,
মইরা গেলে এই মানুষটার
এক পয়সার দাম নাই।

কত মানুষ আইলো-গেলো, রইলো কোন ব্যাটায়?
রাজা-প্রজা এই না মাটির ধুলাতে লুটায়।
সাদ্দাতে বেহেস্ত বানাইয়া
নিজেই যাইতে পারে নাই।

মনসুর বলে বাদশা-ফকির কাউরে এই তো ছাড়বে না,
লোহার সিন্দুকে পালাইয়া কেউ থাকতে পারবে না।
মৃত্যুর স্বাদ যে পাইতে হবে
কোরআনেতে জানতে পাই।।

[রচনাকাল: ২৫-০৩-১৯৯৪; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আবুল হাসেম]

১৬৯

কত সাধ করিয়া সাধের মানুষ বানাইলা,
সৃষ্টির সেরা কইরা তারে
কেন কান্দাইলা।

সুখের পাহাড় ভেঙ্গে গড়াও দুঃখের আঙিনা,
দুঃখেরই সাগরে বানাও বেহেস্তখানা।
ভাঙ্গা-গড়ার না পাই কিনার,
কি রঙের খেলা দেখাইলা।

বুকে দিলা সুখের আশা তুলনা যার নাই,
সুখের ঘরে আগুন দিয়া পুইড়া করো ছাই।
কত রাজার রাজ্য কাইড়া নিয়া
ফকির সাজাইলা।।

[রচনাকাল: ০৪-১০-১৯৯০; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আবুল হাসেম]

১৭০

পিরিত কারে কয়, পিরিতের মানুষ পাইলাম না,
প্রেম-পিরিতির নাম শুনিলাম
আসল-নকল চিনলাম না।

পিরিতের নাই বসত বাড়ি,
নাই পিরিতের কোর্ট-কাচারি,
পিরিতের পত্র দিতে পোস্ট অফিস লাগে না।
মনের মানুষ মনে মনে
দেখা দেয় সংগোপনে,
কথা কয় কানে কানে
অন্যজনে শোনে না।

পিরিতের নাই শাস্ত্ৰ-বিধান,
নাই পিরিতের জাত-কুলোমান,
পিরিতে প্রাণেতে প্রাণ হয় রে বেচাকেনা।
মনসুর কয়, প্রেম করিলে
আসল প্রেম রয় নিরলে,
প্রেমিক মরিয়া গেলে
প্রেম কোনোদিন মরে না।।

[রচনাকাল: ২৭-০৬-১৯৯৫; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নুরুন্নাহার আউয়াল, আবুল হাসেম]

১৭১

ব্যাংকের ক্যাশিয়ার প্রেম এই তো আমার,
জমা নিলো না, জমা নিলো না।
টাকা নিলো, রশিদ দিলো,
প্রেমের রশিদ দিলো না।

ভাবি যারে সে আমারে করলো না আপন,
একবার ফিরে চাইলো না সে, করি কি এখন।
তার নয়নে রাখলাম নয়ন,
দেইখাও সে দেখলো না।

ফুল হইয়া থাকতাম যদি ফুলের বাগিচায়,
ভ্রমর হইয়া আসতো বন্ধু উইড়া পরতো গায়।
আমার মনে কি যে ব্যথা,
বুইঝাও সে বুঝলো না।

[রচনাকাল: ২৯-০১-১৯৯২; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আফরোজা আক্তার]

১৭২

ময়না ও ময়নারে,
তুই আমারে ঘরে থাকতে দিলি না।
ও তুই মুচকি হাইসা পরান নিলি,
মনের কথা কইলি না।

মামার বাড়ি সখীপুরে যাইবার সময় দেখি এই তোরে,
আউলা চুল বাতাসে ওড়ে, ঘোমটা ছিলো না,
ও মাথায় ঘোমটা ছিলো না।
ও এই তোর রূপের আগুন লাগলো চোখে,
বাড়লো বুকে যন্ত্রণা।

এই তোর কথা মোর মনে পড়ে, পরানটা যে ছটফট করে,
স্বপ্ন দেখি ঘুমের ঘোরে, জাইগা দেখিনা,
ও এই তোর জাইগা দেখিনা,
আমি এই তোরে খুঁইজা ফিরি,
তুই এই তো মোরে খুঁজলি না।

[রচনাকাল: ২২-০৫-১৯৯৫; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আবুল হাসেম]

১৭৩

পোষ মনে না পোষা পাখি, কথা না শোনে,
পিঞ্জিরা ভাঙ্গিয়া পাখি উইড়া
যায় কোন অচিন বনে।

সেই পাখিটি কেউ দেখে না,
ধরতে চাইলে ধরা দেয় না,
থাকে গোপনে,
তার আসা-যাওয়া এক পলকে
যাইবার কালে কেউ না জানে।

দই, দুগ্ধ আর মাখন,
ঘৃত পাখিরে খাওয়াইছি কত
সারা জীবনে,
এখন ফাঁকি দিয়া গেলো পাখি,
তারে বাইন্ধা রাখি কেমনে।

মনপাখি তার নাই রে দয়া,
ভুইলা যায় সে খাঁচার মায়া,
দয়া নাই প্ৰাণে।
মনসুর কয়, এই সোনার খাঁচা
পইড়া রবে পাখি বিহনে।

[রচনাকাল: ১৭-০৮-১৯৫৬]

১৭৪

খাঁচার দাম কি আছে বল, পাখি বিহনে?
কিসের আশায় আপন থুইয়া
ভাব করলি মন পরের সনে।

যেই ফুলেতে নাই রে মধু,
কি করে তার রূপে
যেই কূপেতে নাই রে পানি,
কেউ যায় না সেই কূপে
দম ফুরাইলে কেউ জিগায় না
পুত্র-কন্যা আপনজনে।

রাজা, প্রজা, ধনী,
মানি যতই লোকে কয়,
এক পলকে যাইতে হবে,
কেউ এই তো কারো নয়।
মনসুর কয়, মন পাইয়া রতন,
হারাইলি তা অযতনে।

[রচনাকাল: ০৫-০৪-১৯৭৮; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: রথীন্দ্রনাথ রায়]

১৭৫

ও মন, ভেবে দেখ না।
দিন থাকিতে ভাব রে মন পারের ভাবনা।।

যেদিন হাশরও ময়দান হবে,
গোর ছাইড়া মুদ্দার উঠিবে,
সেদিন কড়ায়-গন্ডায় হিসাব নিবে,
কাউরে ছাড়বে না।

ইয়া নফসি বলে কান্দিবে আল্লাহ্র বান্দায়,
হাশরে উম্মতের জামিন দিবেন মস্তোফায়।

আখেরাতে পুলছিরাতে
কঠিন হবে পার হইতে,
ও মন, সেই দিনেতে কারো সাথে
কেউ এই তো রবে না।

[রচনাকাল: ০২-০৯-১৯৭২]

১৭৬

কোথায় পাবো তারে?
ও মন, কোথায় পাবো তারে?
নুর মোহাম্মদ পেয়ারা নবি
দোস্ত কয় পরোয়ারে।

আওয়াল-আখের সব জায়গাতে
যার নাম মিশাইলো নামের সাথে,
প্রথম কলেমা তৈয়বেতে
যুগল মিলন সংসারে,
কোথায় পাবো তারে।

হায়াতুল মুরসালিন নবি,
তার নুরে হয় দুনিয়া খুবী,
মনসুর কয়, তার উম্মত হবি,
ত্বরাইবে ভব পারে,
কোথায় পাবো তারে।

[রচনাকাল: ১১-০৪-১৯৮৬]

১৭৭

যতই করো চালাকি,
শেষে বুঝবে জ্বালা কি,
রঙ্গের খাঁচা ছাইড়া যেদিন
উইড়া যাবে পাখি।।

কইরা পাখি নৈরাশা, ভাইঙ্গা যাবে সুখের বাসা,
যে করে পাখির আশা,
তারে দিয়া যায় ফাঁকি।

যে পাখি এই তোর খাঁচার ভিতর আসা-যাওয়া করে,
একদিন সেই পাখির কথা
ভাবলি না অন্তরে।

দমের দ্বার বন্ধ হলে তখন পাখি যাবে চলে,
মনসুর বলে, শূন্য খাঁচার
বলো মূল্য আছে কি।

[রচনাকাল: ২০-০৬-১৯৮০; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: আবুল হাসেম]

১৭৮

মনে-প্রাণে আমরা শুধু একটি কথাই জানি,
এদেশ মোদের মায়ের হাতের
আদরের ফুলদানি।।

জোসনা রাতে সোহাগ করে চুম দিয়ে ঘুম পাড়ায়,
সাত সকালে পাখি হয়ে রাতেরই ঘুম তাড়ায়।
শীতল হাওয়ার পরশ মেখে
ঢালে আদরখানি।

ছয়টি ঋতুর প্রাণ দোলানো অনেক ছবি দেখায়,
ভালো হয়ে গড়তে জীবন কত যাদু শেখায়।
বুকের ফসল উজাড় করে
ঘুচায় ক্ষুধা-গ্লানি।।

[রচনাকাল: ১৮-০৮-১৯৭৮]

১৭৯

লালন শাহের মত যদি ভাবের বাউল হইতে চাও,
মনের তারে তার লাগাইয়া
একতারা বাজাও।

গুরুর বাক্য কানে লইয়া মনে-প্রাণে এক হইয়া,
একতারাতে সুর মিলাইয়া
মুর্শিদ রূপে নয়ন দাও।

একতারে এক নাম জপো মধুর কণ্ঠস্বরে,
দমে দমে জিকির কর একতারার ভিতরে।

অন্তর ধ্যানে গুরু বলো, জ্ঞানের বাতি প্রাণে জ্বালো,
তার নাম স্বরণে ধ্বণী এই তোলো,
ফানাফিল্লা হইয়া যাও।

[রচনাকাল: ১০-০৪-১৯৯০; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: এম. এ. মতিন]

১৮০

আমি এত জ্বালা কেমনে থাকি সইয়া,
দিবানিশি মনের আগুন জ্বলে রইয়া-রইয়া।
আগুন কে দিলো জ্বালাইয়া।

বক্ষ ভাসে নয়ন-নীরে, বন্ধু না আসিল ফিরে,
আমার মন বসে না একা ঘরে
উদাস পরান লইয়া।

অন্তরে লাইগাছে আগুন কলিজা জুড়িয়া,
দেহ-পরান ছাই হইলো সেই আগুনে পুড়িয়া।

বন্ধু যদি আপন হইতো, নিঝুম রাইতে দেখা দিতো,
আমার তাপিত প্রাণ শীতল হইতো
বন্ধুরে দেখিয়া।।

[রচনাকাল: ০২-০৬-১৯৭৫]

১৮১

সোনা বন্ধুরে, এই তোর বিরহ-জ্বালা সহে না রে,
পানিতে নিভেনা মনের অগুন,
বাতাসে জুড়ায় না রে।

আইলো রে বসন্ত-ঋতু আরো যৌবনের যন্ত্রণা,
এমনও দরদী নাই রে আমায় কে দিবে সান্তনা?
পিরিত কইরা গেলা ছাইড়া,
বন্ধু আর ফিরা আইলা না রে।

রাইত-দুপুরে করুন সুরে যখন ডাকে কোকিল পাখি,
উথলিয়া উঠে পরান, কেমনে ঘরে থাকি?
একা বসি পোহাই নিশি,
কাইন্দা ভিজাইলাম বিছানা রে।।

[রচনাকাল: ২০-০৬-১৯৫৭]

১৮২

চলো মাঠে চলো চাষী ভাই
মনের সুখে ধানের ক্ষেত নিড়াই,
মাঠে যাইয়া সবুজ রঙ্গের
ফসল দেইখা প্রাণ জুড়াই।

নাস্তা করে পান্তা ভাতে,
ভাই-ভাতিজা যাই একসাথে,
কাঁচি হাতে মাথলা মাথে,
রোদ-বৃষ্টিরে না ডরাই।

আগাছা-ঘাস নিড়াই যত
ক্ষেত্রের যুবা পাইলে,
মাঝে মাঝে বিশ্রাম করি
বইসা ক্ষেতের আইলে।

ভীষণ ক্ষরায় জ্যৈষ্ঠ মাসে
আম-কাঁঠাল পাকে গাছে,
ক্ষেত নিড়াইয়া বাড়ি এসে
কাঁঠাল দিয়া মুড়ি খাই।।

[রচনাকাল: ১১-১২-১৯৫৫]

১৮৩

মেয়ে: আমি এই তোমার ভাত খামু না,
এই তোমার বাড়ি আর যামু না।
ছেলে: ওগো ও সুন্দরী প্রাণেশ্বরী,
ক্যান বা তুমি যাইবা না
অমন কথা আর কইয়ো না।

ছেলে: ভাত না খাও রুটি খাইবা,
ও সুন্দরী আমায় ছাইড়া কেমনে যাইবা গো?
বলো এমন মানুষ কোথায় পাইবা
যাইতে আমি দিমু না,
অমন কথা আর কইয়ো না।

মেয়ে: এই তোমার সংসারেতে খাইটা মইলাম
কত, দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাইলাম গো,
তবু পরনেতে ভালো একখান
ছাপার শাড়ি দিলা না,
এই তোমার বাড়ি আর যামু না।

ছেলে: এইবার আমি চাকরী পামু,
ও সুন্দরী এই তোমায় লইয়া ভিন্ন খামু গো,
অনেক শাড়ি, গয়না, চুড়ি দিমু,
চিন্তা তুমি কইরো না,
অমন কথা আর কইয়ো না।

মেয়ে: যামু না আর এই তোমার বাড়ি।
ছেলে: ও সুন্দরী আইনা দিমু ছাপার শাড়ি গো।
মেয়ে: কমু না কমু না কথা।
ছেলে: ও সুন্দরী আইনা দিমু টেডি জুতা গো,
আরো চুল বান্ধিতে রঙ্গীন ফিতা
দিমু গলায় চিদানা,
অমন কথা আর কইয়ো না।।

[রচনাকাল: ২৫-০৭-১৯৮১; কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর ও নুরুন্নাহার আউয়াল]

১৮৪

স্ত্রী-পুত্র-কন্যা লইয়া সোনার খাট-পালংকে শুইয়া,
পরম সুখে মন মজাইয়া কাটাইলা দিন-রজনী।
অবহেলায় দিন ফুরাইলা, ভাইবা দেখছোনি,
ও মন ভাইবা দেখছোনি।

যেদিন সমন আইসা ধরবে কইষা, ছাড়বে না, ছাড়বে না
কেউ এই তোমারে ধইরা রাখতে পারবে না, পারবে না।
টাকা-পয়সা, পাকা বাড়ি যাইতে হবে সকল ছাড়ি,
পুত্র-কন্যা, সুন্দর নারী থাকবে না সঙ্গিনী,
ও মন ভাইবা দেখছোনি।

মাতা-পিতা পইরা রবে, যাইতে হবে একা,
ভাই-বেরাদর হইবো রে পর, কেউ দিবে না দেখা।
মনসুর বলে মাটির ঘরে একা একা থাকবে পড়ে,
সময় থাকতে চিনলি না মন আল্লাহ্ কাদের গনি,
ও মন ভাইবা দেখছোনি।।

[রচনাকাল: ২৫-০৪-২০০৮]

১৮৫

যেমন কর্ম তেমন ফল, সর্বশাস্ত্রে কয়,
দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি কর্মগুণে হয়।।

এই তোমার-আমার একই আল্লাহ্ জানিবে অন্তরে,
এক আল্লাহ্ দুই জনের দুই রকম কাজ করে।
ভাগ্য গড়ে কর্মগুণে
এই কথাটা রেখো মনে,
যা করে যাই তারই ফল পাই, কথা মিথ্যা নয়।
দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি কর্মগুণে হয়।।

একই আল্লাহ্ গড়ছে মানুষ, এমন কেন দেখতে পাই,
তুমি খাও পোলাও-কোর্মা, আমি ডাইল-খিচুড়ি খাই।
আল্লাহ্ কাউরে রাখে দশ তালাতে,
কেউবা থাকে গাছতলাতে,
মনসুর বলে, কর্মফলে সবার পরিচয়।
দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি কর্মগুণে হয়।।

[রচনাকাল: ২৮-০৪-২০০৮]

১৮৬

মানুষ পাইলাম মনের মত, মন পাইলাম না,
মনের ভিতর আর একটা মন,
সেই মনটা চিনলাম না।

দুনিয়াতে হাজার-হাজার মানুষ ঘোরে-ফিরে,
মনমানুষ লুকাইয়া রইছে সেই মানুষের ভিড়ে।
কত ঘুইরা বেড়াই, খুঁইজা না পাই
মন-মানুষের ঠিকানা।

বুকের মাঝে সুখের বাসর কি কইরা সাজাই?
আশার বাসনা সব পুইড়া হইলো ছাই।
তার কথা সে কইয়া গেছে,
আমার কথা কইলাম না।।

[রচনাকাল: ১৮-০৮-১৯৯৭]

১৮৭

নতুন চোর দেশে আইলো রে,
সাবধানে-সাবধানে মানুষ, সাবধানে থাকিও রে।
নতুন চোর দেশে আইলো রে।

চোর ছিল বাইট্টা-বাইট্টা, ঘরে ঢুকলো বেড়া কাইট্টা,
ছোট বউ ধরলো আইট্টা, ছুইট্টা দৌড় দিল রে।
সুবিধা না পাইয়া চোরে দৌড়াইয়া যায় অনেক দূরে,
চুয়াডাঙ্গার রাঙ্গা মিয়ার ভাঙ্গা কোঁদাল নিল রে,
নতুন চোর দেশে আইলো রে।

ড্যাংরার মায়ের পাটা-পুতা, মাইজা বউয়ের পুরান জুতা,
ময়নার মায়ের ছেড়া কোর্তা বাইরে থাইকা নিল রে।
তারপরে সেই চোরা ব্যাটা চইলা যায় কমলাঘাটা,
জাইলা বাড়ির তামাক কাটা খাইট্টা লইয়া গেল রে,
নতুন চোর দেশে আইলো রে।

এ সকল ছ্যাঁচরা চোরে জ্বালাইয়া খায় ঘুমের ঘোরে,
কামরাঙ্গির চর ধরা পড়ে কিলগুতা খাইলো রে।
মাইর খাইয়া সেই লক্ষ্মীছাড়া আবার যায় মাইজপাড়া,
গোয়ালবাড়ির আন্ডাপাড়া মুরগি লইয়া গেল রে,
নতুন চোর দেশে আইলো রে।

কলিকালের ভদ্র চোরে চুরি করে দিনদুপুরে,
কলমের খোঁচায় তারা পুকুর চুরি করে রে।
ভেবে কয় কুটি মনসুর, কলিকালের এসব চোর
শক্ত কইরা ধইরা-ধইরা সায়েস্তা করো রে।।

[রচনাকাল: ০৪-০১-১৯৭২; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]

১৮৮

চাবি ঘুরাইলে পানি পড়ে
দেখলাম রে ভাই ঢাকার শহরে।

পানির কল বসাইছে, কলে পাইপ লাগাইছে,
চৌদ্দ গজ উপরে পানির টাংকি বসাইছে।
পানি জালাম কইরা দিবে ছাইড়া
কি সুন্দর সাপ্লাই করে।

কল-কৌশলে চালায় কত তারে তার মিলায়,
রাস্তায়-রাস্তায় ইলেক্টরি বাত্তি জ্বালায়।
কলে টিপ দিলে বাতি জ্বলে,
সারাটি শহর ভরে।

শিশু-ছেলে-মেয়ের দল মোদের শিক্ষা, শক্তি, বল,
আনন্দ উৎসবের জন্য করতেছে কৌশল।
শিশুপার্কে যাইয়া সকল শিশুর
খেলাধুলায় মন ভরে।

গান গাওয়া হইলো শেষ, আমি বলবো কি বিশেষ?
কুটি মনসুর বলে, সবাই গড়ে তুলবো দেশ,
সব গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দর
গড়বো রে সুন্দর করে।।

[রচনাকাল: ১২-০২-১৯৮৮]

১৮৯

পায়ে পাড়া দিয়া ঝগড়া করে
ঝগড়াইতা বউ থাকলে ঘরে।।

দিন-রজনী প্যাঁচর-প্যাঁচর, ক্যাঁচর-ক্যাঁচরে মাথা ধরে,
ঝগড়াইতারা লক্ষ্মীছাড়া,
আয়-উন্নতি নাই সংসারে।

বিয়ার স্বামী তালাক দিছে ঝগড়াইতা স্বভাবের দোষে,
শেষে ঝগড়া কইরা স্বাদ মিটাইতে
সতীন দেইখা নিকা করে।

কথা দিয়া প্যাঁচ লাগাইতে ছাইড়া কথা বেইড়া ধরে,
সত্য কথা মিথ্যা কইয়া
মাথা খাইয়া কসম করে।

দুই সতীনে রাত্রি-দিনে কথায়-কথায় ঝগড়া করে,
সেই ঝগড়ার চোটে মুদ্দার উঠে
কবর ছাইড়া পালায় ডরে।

ঝগড়াইতা বউ একজন থাকলে দশজনারে নষ্ট করে,
মনসুর বলে, ঝগড়া শিখে
ঝগড়াইতানির তালে পড়ে।।

[রচনাকাল: ০৮-১১-১৯৮২]

১৯০

সুখে জীবন কাটাও রে মন, ভেবে দেখছোনি,
একদিন এই তোমার যাইতে হবে, মনে রাখছোনি।

রংবাজারে রঙের মেলায় কাটাইলা জীবন,
আইসা ভবে যাইতে হবে, ভাবলি না রে মন।
কবরখানায় একা রবে,
ফেরেস্তা এসে জিজ্ঞাসিবে,
হিসাব দিতে পারবানি।

বাড়ি-গাড়ি, দালান-কোঠা সবই পড়ে রবে,
মাতা-পিতা, ভাই-বন্ধু ছেড়ে যেতে হবে,
সঙ্গী-সাথী কেউ রবে না,
কবর আজাব মাফ হবে না,
সেই কথা কেউ ভাবছোনি।

[রচনাকাল: ২১-০৮-২০০৫]

১৯১

ভালোবাসার বন্ধু আমার
নাই রে কাছে নাই,
ভালোবেসে চলে গেছে,
কোথায় তারে পাই।

আমি তার, সে আমার, এমন হইতো যদি,
তার কাছে পাশে পাশে থাকতাম নিরবধি।
খুঁজে পেতে সেই দরদী
বলো কোথায় যাই।

ভেবেছিলাম চিরদিনই ভালোবাসবো তারে,
ছল করিয়া যায় ছাড়িয়া, খুঁজলো না আমারে।
তুষের আগুন এই অন্তরে
কি দিয়া নিভাই।

[রচনাকাল: ২৪-০১-২০০৮]

১৯২

ও আমার প্রাণের বন্ধু, মনের কথা কইলা না।
সাথি হইলাম, পাশে রইলাম, তবু আপন হইলা না।
প্রাণের বন্ধু, মনের কথা কইলা না।

সুখের জীবন করলাম মাটি তবু প্রেম হইলো না খাঁটি,
দেহখানি পরিপাটি করতে পারলাম না।
জীবন ভইরা আশা দিলা,
বুকে তুইলা নিলা না।

এই তোমার-আমার ভালোবাসা দুটি মনের একটি আশা,
মিটাইবো প্রেম-পিপাসা আমরা দুইজনা।
এই তোমার মন যোগাইতে
দিনে-রাইতে সুযোগ দিলা না।।

[রচনাকাল: ০৪-০৫-২০০৪]

১৯৩

একদিন ছটকা কলে আটকা পইড়া যাবে,
উপায় না পাবে।
একদিন আটকা পইড়া যাবে।

জীবনে যৌবন পাইয়া আনন্দে মন মজাইয়া,
মাতাল হইয়া কতকাল কাটাবে?
এই আনন্দে দিন যাবে না,
পাপের ভাগি কেউ হবে না,
যেদিন হিসাব দিতে হাসরেতে যাবে।

একা রবে কবরখানায় শুইয়া মাটির বিছানায়,
সেথায় কাথা-বালিশ কিছুই তো না পাবে।
সঙ্গী-সাথী কেউ পাবে না,
কবর আজাব মাফ হবে না,
মনসুর কয়, অনন্তকাল জীবন্ত কাটাবে।

[রচনাকাল: ০৬-০৫-২০০৪]

১৯৪

দেওরা রে, এই তোর ভাইয়ের কাছে পত্র লেইখা দে,
পরান আমার আই-ডাই করে,
পাইলো কোন রোগে।

দেওরা, এই তোর ভাই বৈদেশেতে চাকরি করতে গেছে,
অনেকদিন এই তো গত হইলো, আইলো না আর দেশে।
আমার দুঃখের আগুন বুকে জ্বলে
এই তোর ভাইয়ের বিচ্ছেদে।

প্রেমরোগের ঔষধ-বড়ি বল না কোথায় পাবো?
দেওরা রে, এই তোর ভাইয়ের খোঁজে কোনবা দেশে যাবো।
আমি রোগী হইলাম, ভুইগা
মইলাম কোন সে অপরাধে।

পালংকেতে শুইয়া রাইতে বালিশ ভিজাই কাইন্দা,
অবুঝ মনটা কেমন কইরা রাখি এখন বাইন্ধা?
না জানি সে মইজা রইছে
কার পিরিতের ফান্দে।

[রচনাকাল: ১২-১১-২০০৩]

১৯৫

প্রাণে/ ঘুন ধইরাছে অল্প না বয়সে,
কর্মদোষে ঘুন ধইরাছে অল্প না বয়সে।
গাল-চোপড়া ভাইঙ্গা পড়ে, পরানটা যে ধরফর করে,
আমার/ পাক ধইরাছে চুল, দাড়ি আর মোচে।

বইসা থাকলে মাঞ্জা ধরে, দাড়াইলে মাথা ঘোরে,
কাজে-কর্মে মনটা তো না বসে।
ঠান্ডা পানি দাতে ধরে, গিড়ায়-গিড়ায় ব্যথা করে,
আমার অঙ্গ ছাইয়া ধরলো বাতের বিষে।

যৌবনকালে ভুল করিলাম, অকালে বুইড়া হইলাম,
দুই চোখের নজর কইমা গেছে।
কি করিতে কি করিলাম, মিছে কাজে দিন ফুরাইলাম,
আমি না বুঝিয়া হারাইলাম দিশে।

কুটি মনসুর ভেবে কয়, বৃথা কাজে জীবন ক্ষয়,
ভুল করিলাম হিসাব আর নিকাশে।
ভবের কামাই রাইখা ভবে খালি হাতে যাইতে হবে,
আমার আপন যারা পর হইবে শেষে।

[রচনাকাল: ১১-০৩-১৯৮৮; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মুজিব পরদেশী]

১৯৬

কও রে মন, কও গো এই তোমার
আসল বাড়িঘর কোথায়
নকল বাড়ি দখল কইরা
দিন কাটাইলা দুনিয়ায়।

কয়েকদিন এ পৃথিবীতে রইলা পরবাসে,
রঙ্গে-ঢঙ্গে মন মজাইলা আনন্দ-উল্লাসে।
করবে সেদিন সমনজারি, ছাড়তে হবে এ ঘরবাড়ি,
টাকা-পয়সা, তালুকদারি
সব যাবে বৃথায়।

দালান ঘরে সুন্দর করে সাজাও ফুল বিছানা,
এ বাড়িঘর নয় গো এই তোমার আসল ঠিকানা।
অন্ধকার মাটির ঘরে একা একা থাকবে পড়ে,
কুটি মনসুর কয়, বালিশ-কাথা
পাবে না সেথায়।

[রচনাকাল: ১৬-১১-১৯৮৮]

১৯৭

দুই নিয়ে দুনিয়া সৃষ্টি করেন বিধাতায়,
কালি ছাড়া কলম দিয়ে
লেখাতো যায় না খাতায়।।

দুই নিয়ে দুনিয়াদারি
ভালো-মন্দ, পুরুষ-নারী,
কেউ রাজা, কেউ প্রজা তারই
দুইয়ের খেলায় মন মাতায়।

পাপ-পুণ্য দুইয়ের তরে
বেহেস্ত-দোজখ সৃষ্টি করে,
সুখে রয় কেউ এ সংসারে,
কেউ কান্দে দুঃখ-ব্যাথায়।

দুই নিয়ে দুনিয়া গড়ে,
রাত্রি আসে দিনের পরে,
আল্লাহ্-রাসুল এক অন্তরে
গাঁথা যেমন সুই-সুতায়।

কুটি মনসুর কয়, পৃথিবীতে
খেলতে গেলেও হারে-জিতে,
দুই ছাড়া সৃষ্টি নাই জগতে
জন্ম দেয় পিতা-মাতায়।।

[রচনাকাল: ০৪-০৪-২০০৫]

১৯৮

আমার প্রাণের বন্ধু প্রাণ প্রিয়া
রইলা কতই দূরে,
আমি এই তোমার প্রেমে মজিয়া
না পাইলাম খুজিয়া,
রইয়াছো কোন অচিনপুরে।

একবার কাছে আসিয়া একটু ভালবাসিয়া,
প্রাণে বাচাইয়া যাও গো মোরে।
এই তোমাকে না পেলে তবে
নির্ঘাত আমার মরণ হবে,
এই তোমার প্রেমাগুনে মরি জ্বলে-পুড়ে।

পিরিতি শিখাইয়া কোথায় আছো লুকাইয়া,
দেখা দাও, থাইকো না আর দূরে।
আমারই বুকের মাঝে
এই তোমার প্রেমের বাঁশি বাজে,
সে বাঁশি বাজে করুণ সুরে।

[রচনাকাল: ১৫-০৫-২০০৫]

১৯৯

ঈমানদারকে যাইতে হবে বেঈমানের বাড়ি,
না চিনিলে বেঈমানকে হয় না ঈমানদারি।

হয় যদি কেউ ঈমানদার এই দুনিয়ার পরে,
বেঈমানকে দেইখা তার ঈমান ঠিক করে।
ভক্তি-বিশ্বাস আছে যার সেই তো হয় ঈমানদার,
পুরুষ মানুষ খুঁজে নেয় ঈমানদার নারী।

দিনের আলো দেখা যায়, রাত্রি কলো বুঝে,
দোজখে কষ্ট আছে বলেই বেহেস্তের সুখ খোঁজে।
কুটি মনসুর ভেবে কয়, ভুলে-ভুলে যায় সময়,
বেঈমান চিনে ঈমানদার হতে যেন পারি।

[রচনাকাল: ১২-০৫-২০০৪]

২০০

বাড়িঘর করছো পাকা, ঈমান পাকা করছোনি?
বেঈমানের বিচার হবে ভেবে দেখছোনি।

দুই কান্ধে দুই ফেরেস্তায় চার চোখে দেখিয়া,
ভালো-মন্দ রাখেন সব ডাইরীতে লিখিয়া।
জীবন খাতার হিসাব নিবে,
কেমন করে হিসাব দিবে,
ছলচাতুরি যতই করবে ধরা পড়বে জানোনি।

হালাল থুইয়া হারাম খাইয়া আরাম পাবে না শান্তি,
আরাম-হারাম হবে, ভুইলা যাইও না।
মনসুর বলে, হাসান-মতি
ঠিক রাখিলে বিশ্বাস-ভক্তি,
কোথা গেলে পাবে মুক্তি, হিসাব করে দেখছোনি।

[রচনাকাল: ১৫-০৩-২০০৪]

২০১

এমন একজন মানুষ কোথায় পাই
 যে মিথ্যা কথা বলে না,
আল্লাহ্র হুকুম ছাড়া চলে না
ধর্ম মেনে কর্ম করে, তারেই আমি চাই,
এমন একজন মানুষ কোথায় পাই।

যে অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না এ ভব সংসারে,
অসৎ পথে পা বাড়ায় না, খুইজা বেড়াই তারে।
ব্যবহার মিষ্টি যার, সেই মানুষটি চাই,
এমন একজন মানুষ কোথায় পাই।।

যে বাবা-মাকে দেয় না কষ্ট, করে না বেয়াদবি,
পারো যদি এনে দাও সেই মানুষটার ছবি।
মনে-প্রাণে তাকে শ্রদ্ধা করতে আমি চাই,
এমন একজন মানুষ কোথায় পাই।।

[রচনাকাল: ১২-০৮-২০০৫]

২০২

ও রোজিনা, বুঝি না,
আমার কথা আছে কি এই তোর মনে?
এই তোরে থুইয়া গ্রাম ছাড়িয়া
আইলাম ঢাকা টাউনে।

ঢাকায় এখন বেকার জীবন, চাকরি-বাকরি নাই,
রাস্তায়-রাস্তায় ঘুইরা চিনাবাদাম বেইচা খাই।
পুলিশের পিটানি খাইয়া বারেবারে যাই পালাইয়া,
রাত হলে থাকি শুইয়া
কমলাপুর ইষ্টিশনে।

রোজিনা, এই তোর প্রেম-যন্ত্রণায় বুকটা ছটফট করে,
পকেটে নাই খাওয়ার টাকা, পরান কাইন্দা মরে।
এসেছিল গায়ের মাতবর, তার কাছে পাই এই তোর খবর,
সে বলেছে গতরে এই তোর
ছেড়া কাপর পিন্দনে।

[রচনাকাল: ১০-০৮-২০০৪]

২০৩

পাকা ফল বেশি দামে সবাই কিনে খায়,
চুল-দাড়ি পাকলে মানুষের
দাম কইমা যায়।

যৌবনকালে তাল-বেতালে প্রেমের মূল্য বাড়ে,
গাল-চোপড়া ভেঙ্গে গেলে কেউ জিগায় না তারে।
চামড়া ঢিলা হলে পরে নায়করাও ভুইগা মরে,
তাদেরকে অভিনয় করতে
ডাকেনা আর সিনেমায়।

প্রেমের সখ তেতুলের টক, জিহ্বায় পানি আসে,
যৌবনকালে প্রেম করিলে বেশি ভালোবাসে।
পাকনা চুলে কলব দিলে প্রেম-পিরিতি নাহি মিলে,
কুটি মনসুর কয়, প্রেমের মজা
যৌবনকালেই পায়।

[রচনাকাল: ৩০-০৫-২০০১]

২০৪

প্রেম-পিরিতে চায় না কভু বাড়ি-গাড়ি-টাকা,
মন যারে চায়, সে ছাড়া মন
যায় না বেঁধে রাখা।

অন্তরেতে অন্তর মিশে, মনের ভিতর মন,
ভাবেতে মজিয়া করে প্রেমের আলাপন।
কাউরে কেউ না দেখলে তখন
একা যায় না থাকা।

আমি তার, সে আমার, মনের ময়না পাখি,
আমার প্রেমের খাঁচায় তারে সদায় বেঁধে রাখি।
কুটি মনসুর বলে, দূরে গেলে
বুকটা লাগে ফাকা।

[রচনাকাল: ০৫-০৫-২০০১]

২০৫

সুনামগঞ্জে শুইনা আইলাম সোনাবন্ধু নাই,
বল গো সখি, তার তালাশে
কোনবা দেশে যাই।

মদনগঞ্জের কদম গাছে কদম ফুল ফুটে,
পরান বন্ধুর লাইগা আমার পরান কাইন্দা উঠে।
ভাবি তারে হৃদয়পুরে, কেমন কইরা পাই।

ঘুমের ঘোরে স্বপ্নপুরে ছিলাম অচেতন,
নয়নপুরে দেইখা তারে ছটফট করে মন।
রূপ নগরে ঘুরেফিরে জীবনটা কাটাই।

[রচনাকাল: ২০-০৬-২০০২]

২০৬

নিঠুর বন্ধুরে,
ভালোবাসার আগুনে আর মাইরো না জ্বালাইয়া,
পারো যদি জীবন থেকে
মনটা দাও বদলাইয়া।।

সর্বক্ষণ আমার মন এই তোমার কথা বলে,
বুকের মাঝে প্রেমের আগুন খা-খা কইরা জ্বলে।
চক্ষু দুইটা অন্ধ হইলে
দেখতাম না আর চাইয়া।

তুমি আছো বলে আমি বাইচা আছি ভবে,
এই তোমার মরণ হলে সেদিন আমার মরণ হবে।
এই প্রেম-কারাগার ছাইড়া
আমি কেমনে যাই পালাইয়া।

কুটি মনসুর বলে, প্রেম বড়ই কঠিন,
মন ছাড়া মন পাওয়া যায় না কোনদিন,
মনের ভিতর আরেকটি
মন রয়েছে লুকাইয়া।।

[রচনাকাল: ০৯-০৯-১৯৯৬]

২০৭

মধু ছাড়া ফুলে কভু ভ্রমর বসে না,
পানি ছাড়া শুকনা গাঙ্গে
নৌকা ভাসে না।।

গন্ধ ছাড়া শিমুল ফুল রঙে পাগল করে,
প্রেম হয় না মনের মত মন না হলে পরে।
মন দিয়া মন নিয়া বন্ধু
কাছে আসে না।

আমি যারে খুঁজি তারে বলো কোথায় পাই?
অন্তরের অন্তর জ্বালা কইবার মানুষ নাই।
রূপের যৌবন মেষ হলে
কেউ ভালোবাসে না।

[রচনাকাল: ০২-০৩-১৯৯৩]

২০৮

ও সখী গো,
কে দিলো টেলিফোনের তার কাটিয়া
আমার বন্ধুর খবর কেমনে লইবো,
অন্তর যায় ফাটিয়া,
কে দিলো টেলিফোনের তার কাটিয়া।

চট্টগ্রামে যাইয়া নতুন চাকরি লইছে,
সকাল-বিকাল টেলিফোনে কত কথা কইছে
তিন-চার দিন গত হয়,
টেলিফোন যে বন্ধ রয়,
রিসিভারটা মনে কয় ভাঙ্গি আছাড় দিয়া।

না জানি সে পরান বন্ধু কোন মানুষের সনে,
মধুর আলাপ করছে নাকি অন্য টোলফোনে
বল গো এই তোরা প্রাণ-সই,
বন্ধুর খবর কেমনে লই?
তারে ছাড়া বিফল হই প্রাণেতে বাচিয়া।

[রচনাকাল: ০১-০৭-১৯৯০; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মীনা বড়ুয়া, নুরুন্নাহার আউয়াল]

২০৯

নানি গো পানি দাও,
ভাবি গো বাতাস দাও,
শুকাইয়া যায় গলা,
ভাবি নাই পিরিতের এতো জ্বালা।

বসন্তকাল ফাগুন মাসে যৌবনেরই জোয়ার আসে,
বন্ধু রয় ক্যান দূর বৈদেশে, কও গো ফুপু-খালা,
ভাবি নাই পিরিতের এতো জ্বালা।

বন্ধু আমার বাজায় বাঁশি, কাইড়া নিলো মুখের হাসি,
তারে ছাড়া কেমনে বাঁচি, মনটা হয় উতলা,
ভাবি নাই পিরিতের এতো জ্বালা।

বন্ধুর লাইগা হই উদাসী, জাইগা রইলাম সারা নিশি,
বাসি হইয়া গেল আমার গাঁথা ফুলের মালা,
ভাবি নাই পিরিতের এতো জ্বালা।

[রচনাকাল: ১০-১০-১৯৮৮]

২১০

সুখে ছিলাম মায়ের বুকের
দুগ্ধ যখন খাই,
এই দুনিয়ায় পাপ কারে কয়
কিছুই বুঝি নাই।

মায়ের কোল থেকে ফুপু-খালায় নিতো আমায় কোলে,
কান্নাকাটি করছি তখন মা গো মা বলে।
মায়ের কোলের শান্তি-আরাম
খালার কোলে নাই।

দশ মাস দশ দিন সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে,
নিজের রক্ত দিয়ে মা সন্তান বাচিয়ে রাখে।
পৃথিবীতে মায়ের মত
আপন কেহ নাই।

[রচনাকাল: ০৬-১০-১৯৯৪]

২১১

এই তোমার কথা ভুলতে পারি নাই রে কাঞ্চন,
ভাই, এই তোমার কথা ভুলতে পারি নাই।
তুমি-আমি একইসাথে
বইসা ছিলাম এক কামরাতে,
রেলগাড়িতে রংপুর যখন যাই।

রেলগাড়িতে সারারাতি তুমি ছিলে সঙ্গের সাথী,
সেই কথা কি এই তোমার মনে নাই
এই তোমার কাঁধে মাথা রাইখা,
প্রেম-সোহাগের পরশ মাইখা,
ইষ্টিশনের কমলা কিনা খাই।

এই তোমার গায়ের চাদর দিয়া রাইখাছো আমায় ঢাকিয়া,
অন্য লোকে কিছুই দেখে নাই।
ইষ্টিশনে থামলে গাড়ি,
পইরা যায় মোর ঘোমটার শাড়ি,
তখন এই তোমার মুখের পানে চাই।।

[রচনাকাল: ১২-১২-১৯৮৮; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মীনা বড়ুয়া]

২১২

ডালিম গাছে ডালিম পাকে,
সে কেন বৈদেশে থাকে?
গাছে পাকা ডালিম খাইলো না,
বন্ধু কেন দেশে আইলো না?

মনে ছিলো অনেক আশা,
বুকের ভিতর ভালোবাসা,
আমার মনের প্রেম-পিপাসা
কেউ মিটাইলো না।

কত কথা শত ব্যথা জইমা রইছে প্রাণে,
আইলে বন্ধু পাইলে তারে কইবো কানে কানে।

কাইন্দা-কাইন্দা তার কারণে
ঘা হইয়াছে চোখের কোনে,
তারে মাসে মাসে চিঠি দিলাম,
পাইলো কিনা জানলাম না।

[রচনাকাল: ০৭-০৫-১৯৮৬]

২১৩

ও দরদের বন্ধুরে,
সময়কালে এই তোমার দেখা পাইলাম না।
চৈত্র মাসের খরায়
জ্বলে আগুন কলিজায়,
চোখের দেখা একবার দেইখা গেলা না।

বৈশাখ গেলো, জ্যৈষ্ঠ যায়, রইলাম এই তোমার আশায়,
গাছে পাকা আম-কাঁঠাল খাইলা না।
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নতুন জোয়ার আসে,
শুকনা গাঙ্গে ভেসে বেড়ায় পানা।

ভাদ্র আর আশ্বিনে রাত্রি পোহায় কান্দনে,
আমার কথা বন্ধুর মনে পড়ে না।
কার্তিক গেলে অঘ্রাণ মাস, মনটা করে হায়-হুতাস,
একদিন বন্ধু আমার তালাশ নিলা না।

পৌষ মাইসা শীতে দুঃখে কাটাই নিশিতে,
কাথা-কম্বলে শীত মানে না।
কুটি মনসুর কয়, বুঝলা না মাঘ মাসেও আইলা না,
ফাগুনে বসন্তের জ্বালা বুঝলা না।।

[রচনাকাল: ১২-০৮-১৯৮৪]

২১৪

এই তোমায় পাইলাম না রে বন্ধু
শ্রাবণ মাসে এই তোমার দেখা পাইলাম না।

শ্রাবণ মাসে জোয়ার আইসা
নদীর দু’কুল গেল ভাইসা,
বন্ধু তুমি একবার আইসা দেখলা না।

প্রেম শিখাইয়া রইলা দূরে,
এই তোমায় পাবো কেমন করে?
কাছে আইসা একবার মোরে দেখা দিলা না।।

[রচনাকাল: ১৫-০৮-১৯৮৪]

২১৫

বন্ধুরে, তুই আইলি না,
প্রেমের মধু খাইলি না,
আশার জীবন কেমনে বাইন্ধা রাখি
ও বন্ধু, এই তোরে ছাড়া কেমন করে থাকি।

আশার জীবন অশার হয় বন্ধু, এই তোরে ভালোবেসে,
যৌবনকালে রইলি বন্ধ কোন সে দূর বৈদেশে।
এই তোর লাইগা প্রাণ উদাসীনি,
কেমনে কাটাই দিন-রজনী
তুই যে আমার মনের ময়না পাখি।

সর্বনাশা ভালোবাসা, দেখা যায় না চোখে,
ব্যথার জ্বালা এই অন্তরে জ্বলে শুধু বুকে।
আমার প্রাণে ব্যথা দিয়া,
কি সুখ পাইলি কারে নিয়া
বিনা দোষে আমায় দিলি ফাঁকি।।

[রচনাকাল: ২৩-০৭-২০০৮]

২১৬

ঢাকায় যাইবা কোনদিন,
আইবা কও না বন্ধু আগে,
তুমি ঢাকা গেলে বুকটা
আমার ফাকা-ফাকা লাগে।

উত্তর ভিটায় ছনের ঘরে একা থাকতে ভয়-ভয় করে,
এই তোমার কথা এই অন্তরে দিবানিশি জাগে।

পূর্ণিমাতে জোছনা রাইতে বিলাই মেও-মেও করে,
অমাবস্যার আন্ধার রাইতে পরান কাঁপে ডরে।

ঘরের পিছে তাল গাছে তালপাতা নড়ে বাতাসে,
তখন আমি মরি হা-হুতাসে প্রেমের অনুরাগে।।

[রচনাকাল: ১৬-০৩-১৯৯৭]

২১৭

চাই না বন্ধু দালান-কোঠা, রঙিন পাকা বাড়ি,
এই তোমার সাথে গাছতলাতে
কাল কাটাইতে পারি।

মিষ্টি কথা শুইনা শুধু মনের ব্যথা যায় না,
সোনার খাট-পালংকে শুইয়া প্রেমের মজা হয় না।
যাইও না বৈদেশে বন্ধু,
তুমি আমায় ছাড়ি।

লোকে বলে যৌবনকালে পুরুষ গলার কাঠি,
বন্ধুহারা অভাগিনীর সুখের জীবন মাটি।
পোড়া কপাল তাদের যারা
পুরুষ ছাড়া নারী।।

[রচনাকাল: ১৮-০৮-১৯৯৭]

২১৮

ও সুজন বন্ধুরে,
ভালোবাসা লক্ষ টাকায় খরিদ করা যায় না।
মন না দিলে মনের মানুষ
কেউ কখনো পায় না।

মনের মানুষ পেলে তারে ভালোবাসে মনে,
ইশারায় কথা কয় সে নয়নে-নয়নে।
আশেকী না হলে মাশুক
খুঁজে পাওয়া যায় না।

অন্তরে প্রেম-জ্বালা যদি জ্বলে কারো বুকে,
সোনার খাট-পালংকে শুইয়া ঘুম আসে না চোখে।
পাকা বাড়ি, দালান-কোঠায়
মনের শান্তি পায় না।

ভালোবাসার মনটা যদি না হয় কভু খাঁটি,
জীবন-যৌবন বিফল হয়, তার সোনার দেহ মাটি।
কুটি মনসুর বলে, প্রেমিক ছাড়া
প্রেমের মজা পায় না,

[রচনাকাল: ২৪-০৭-১৯৯৮]

২১৯

খাওয়াইয়া খিলি পান,
ভালোবাসা করলি দান,
আসতে চাইয়া আইলি না কেন
করলি অবহেলা
সোনাবন্ধু, তুই আমারে মাইরা ফালা।।

স্বপ্নে আইসা বুকের মাঝে বাসর ঘর সাজাইলি,
জাইগা এই তোরে পাইলাম না রে, কই যাইয়া লুকাইলি
বুঝলাম আমি খেলবি না তুই
মধুর প্রেমের খেলা।

আশা ছিলো ভালোবাসিয়া সুখে বাস করিবো,
এই তোরে লইয়া প্রেম-সাগরে ঝাঁপ দিয়া মরিবো।
মরণ হলেও সাগর জলে
ভাসবে প্রেমের ভেলা।

মনসুর বলে, প্রেম করিলে ভুলিতে পারে না,
এক মরণে দুইজন মরে, কাউরে কেউ ছাড়ে না।
ইতিহাসে প্রমাণ আছে
এই তো প্রেমের খেলা।

[রচনাকাল: ২০-০১-১৯৯৫]

২২০

বুকের ভিতর আপন মানুষ
গোপন হইয়া রয়,
মন-মানুষের দেখা পাইলে
চোখে কথা কয়।

মনের ভিতর আরো একটি মন আছে লুকাইয়া,
জ্ঞানের চোখে মনের মানুষ দেখে সে তাকাইয়া।
যৌবন জোয়ার যখন আসে,
মন-মানুষকে ভালোবাসে,
আশুক হইয়া মাশুক লইয়া খেলছে ভুবনময়।

মনসুর কয়, প্রেম অহরহ জ্বলে মনে-প্রাণে,
প্রেমের জ্বালা কেউ দেখে না, যার জ্বলে সে জানে।
প্রেমের নাই বিধি-বিধান,
ভয় করে না জাত-কুলোমান,
পুইড়া ছাই হইয়া তবু আয়নাল হক নাম কয়।।

[রচনাকাল: ০১-০২-১৯৯১]

২২১

মা লো, মা,
এইবারকার ইরি ধানের মুড়ি খাইলাম না।
আমার মনের দুঃখ কইতে
মনের মানুষ পাইলাম না।
এইবারকার ইরি ধানের মুড়ি খাইলাম না।

ছোট্টবেলায় পাইলা-নাইলা, সেয়ানা করিলা,
কত আদর কইরাছিলা,
তবে কেন পরের হাতে আমায় সইপা দিলা?
কাল-সাপিনি ননদ ঘরে,
সইমু জ্বালা কেমন করে?
কত দিন হয় আরতো মোরে নায়র নিলা না।

খাইছি কত মায়ের হাতের মোয়া ও মিঠাই,
কাঁচা রসের খির খাইয়াছি তাও তো ভুলি নাই,
মা গো, তাও তো ভুলি নাই।

শশা-কুমড়া গাছ লাগাইয়া নতুন শশা খাইলা,
মা গো, আমারে না দিলা।
আমায় থুইয়া উস্তা-পটল কেমন কইরা খাইলা?
পাঠাইলা না ঝিঙা-তরুই,
খাইলাম না আর মিষ্টি বড়ুই,
বাড়ির গাছের পাকনা তেতুল চোখেই দেখলাম না।।

[রচনাকাল: ১৬-০৬-১৯৬৭; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: অনিমা মুক্তি গমেজ]

২২২

তুই যে আমার পরানের পরান রে মেহেরজান,
তুই যে আমার পরানের পরান।
এই তোর পিরিতে বুকের মাঝে ডুগুডুগু তবলা বাজে,
এই তোর লাইগা মোর অন্তর পেরেশান রে মেহেরজান,
তুই যে আমার পরানের পরান।

কলেজেতে পড়তাম যখন, কাউরে কেউ ছাড়তাম না তখন,
তুই আর আমি ছিলাম জানের জান।
এত নিষ্ঠুর কেমনে হইলি,
আমার কথা ভুইলা রইলি,
ভালোবাসার এই কি প্রতিদান রে মেহেরজান।

সময়কালে না পাই এই তোরে,
এখন রইলি দূরে-দূরে,
কেন হইলি নিদয়া পাষাণ
আমি এই তোরে কত ভালোবাসতাম, দেখাইতে যদি পারতাম,
বুক চিরিয়া দেখাইতাম প্রমাণ রে মেহেরজান।।

[রচনাকাল: ১২-০২-২০০৩]

২২৩

প্রেম করিয়া সুখী হয় না এমন কথা বলে যারা,
নকল প্রেমিক তারা,
ভবে নকল প্রেমিক তারা।

ছলনাতে মন মজালে সুখ হয় না তার কোনকালে,
ভেজাল প্রেম করতে চাইলে কেউ দিও না সাড়া।
আসল প্রেম যারা করে, স্মৃতি রয় তার জগত জুড়ে,
রাজ্য ছেড়ে মনের মানুষ খুঁজে ফিরে তারা।
মাটির মানুষ খাঁটি প্রেমে থাকে মাতোয়ারা,
ভাব ছাড়া প্রেম করে যারা হবে তারা দিশেহারা,
নকল প্রেমিক তারা, ভবে নকল প্রেমিক তারা।
পিতা-পুত্রে ভালোবাসা না থাকলে হয় দুর্দশা,
ত্যাজ্যপুত্র করে পিতায়, সন্তান গৃহছাড়া।
আসল প্রেম এ সংসারে বেহেস্তের সুখ বলে তারে,
ধর্ম-কর্ম কিছুই হয় না প্রেম-পিরিতি ছাড়া।
ভবে আল্লাহ্র প্রেমিক না হলে পাবে না কুল-কিনারা,
আশা দিয়া প্রেম করিয়া ফাঁকি দিয়া পালায় যারা,
নকল প্রেমিক তারা, ভবে নকল প্রেমিক তারা।

ভালোবাসা, প্রেম-পিরিতি না থাকলে হয় দূর্গতি,
শোনো বলি হাসান-মতি, এই তো প্রেমের ধারা।
ছেলে-মেয়ে, বউ-পরিবার আপন কেউ থাকবে না আর,
বাড়ি-গাড়ি সবই এই তোমার পরের জন্য করা।
প্রেমিক ছাড়া প্রেমের মজা পায় না প্রেমিকেরা,
কুটি মনসুর বলে, পৌষ মাইসা প্রেম চৈত্রে করে যারা,
নকল প্রেমিক তারা, ভবে নকল প্রেমিক তারা।

[রচনাকাল: ২৪-০৫-২০০২]

২২৪

আমি কেমন কইরা শ্বশুরবাড়ি যাই?
সারাদিন বৃষ্টি পরে, ঘরে একখান ছাতা নাই,
কেমন কইরা শ্বশুরবাড়ি যাই।

আষাঢ় মাসের প্যাঁক-পানিতে রাস্তাঘাট হয় নষ্ট,
শ্বশুরবাড়ি খাইতে মজা, যাইতে বড় কষ্ট।
আকাশে মেঘ ডাইকাছে ডুম-ডুমা-ডুম
সুম-সুমা-সুম শব্দ পাই।

বউ যে আমার শীতের কাথা উদাম ঘরের ছাউনি,
বউ যে আমার পিপাসার জল, শীতল করে প্রাণই।

জোয়ার আইলো বর্ষা হইলো, নৌকা ঘাটে নাই,
তবুও আমি গামছা পইরা শ্বশুরবাড়ি যাই।
কত উচানিচা পিছল রাস্তা,
খোঁচো পইরা আছাড় খাই।।

[রচনাকাল: ১৫-০৩-১৯৬৮; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]

২২৫

লঞ্চ-স্টিমার, নৌকায় যাইবা
অকুল সাগর পাড়ি দিবা,
ভাইবা দেখছোনি
পারঘাটাতে পার হইতে টিকিট পাইবানি।

বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা দুনিয়ার কারবার,
আখেরাতে এসব কিছুর পড়বে না দরকার।
শূন্য হাতে যাইতে হবে,
জমিদারি পইরা রবে,
মওলার দিদার পাইবার মত কামাই করছোনি।

রং-তামাশায় দিন কেটে যায় আনন্দ করিয়া,
যে দিন গেলো সে দিনগুলি পাইবা না ফিরিয়া।
চিন্তা কইরা দেখছো নাকি
মরণের আর কয়দিন বাকি
কুটি মনসুর বলে, মরণ কথা স্মরণ রাখছোনি।

[রচনাকাল: ১২-০২-২০০১]

২২৬

মন নিয়েছো, প্রাণ নিয়েছো, আর নিবে কি?
জীবন-যৌবন সব নিয়েছো,
নাই কিছু বাকি।

আছে শুধু দেহ-খাঁচা, বাঁচার উপায় নাই,
সব হারিয়ে তবু আমি এই তোমাকে না পাই।
ভালোবাসা বুকে নিয়ে এই তোমার আশায় থাকি।

তুমি আমার, আমি এই তোমার, অন্য আশা নাই,
দুটি মনের একটি আশা, মধুর মিলন চাই।
এই তোমাকে না পেলে মনটা কেমনে বেঁধে রাখি?

[রচনাকাল: ১৪-০৯-২০০৩]

২২৭

রাজশাহিতে আম থাকতে বন্ধু তুমি আইলা না,
চ্যাংড়া বন্ধু ল্যাংড়া আম খাইয়া গেলা না।

ঝুইলা রইছে গাছে পাকা থোকা-থোকা আম,
কও না বন্ধু, তুমি ছাড়া কারে খাওয়াইতাম?
সময়কালে না খাইলে আম,
কাকে পাইলে ছাড়বে না।

পৌষ মাসে আইলে এই তোমায় পাইলে,
শীতের রাইতে নরম হাতের গরম এককাপ চা দিতাম খাইতে।
ভালোবাসা মনের আশা
মিটাইয়াতো গেলা না।

[রচনাকাল: ০৫-০৮-২০০৬]

২২৮

মনের মানুষ কোথায় গো পাবো?
তার তালাশে যাবো,
যাবো উদাসী হইয়া এ ঘরবাড়ি থুইয়া।
বাউল বেশে তারে আমি খুঁইজা বেড়াবো,
তার তালাশে যাবো।।

একতারাটা সঙ্গে করি,
বন্ধুর নামের মালা গলায় পরি,
দেশান্তরি হবো।
সেই প্রাণবন্ধুরে একবার
দেখা যদি পাই গো তার,
বক্ষে নিয়া আমার প্রাণ জুড়াবো।

আশার জীবন যায় বিফলে,
মনের মত মানুষ পেলে,
প্রাণ সপিয়া দেবো।
আমি তাইতো বাউল সাজিয়া
বেড়াই তারে খুঁজিয়া,
মন দিয়া নি আমার বন্ধুর মন পাবো।

[রচনাকাল: ২১-০২-১৯৫৪; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]

২২৯

মনের ভিতর লুকিয়ে থাকে আরো একটি মন,
যে মনটায় বন্ধুর কথা ভাবে সারাক্ষণ।।

যতই কষ্ট হোক না তবু প্রেমের স্বপ্ন লইয়া,
সুখের আশায় জীবন কাটায় গাছতলাতে শুইয়া।
চায় না প্রেমে জাত-কুলোমান
পাইলে প্রিয়জন।

জীবন গাঙ্গে যৌবনের জোয়ার যখন আসে,
প্রেমিক মনটা সেই জোয়ারে ছল-ছলাইয়া ভাসে।
মনের টানে প্রাণে-প্রাণে হয় মধুর মিলন।

[রচনাকাল: ১১-১১-২০০২]

২৩০

বাঘ বন্দী কল-কৌশলে,
ইঁদুর বন্দী কেঁচিকলে,
আমি এই তোমার প্রেমের জালে বন্দী হইতে চাই।
তুমি ছাড়া বন্ধু আমার বাঁচার উপায় নাই।

তুমি বন্ধু বৃক্ষ হইলে, আমি হইবো লতা,
বুকেতে জড়াইয়া এই তোমায় বলবো মনের কথা।
মধুর মিলন হইলে দুইজন,
আর কিছু না চাই।

কাছে আসো, ভালোবাসো, থাইকো না আর দূরে,
এই তোমার-আমার মিলনবাঁশি বাজবে মধুর সুরে।
দুঃখ আমার থাকবে না আর,
এই তোমায় যদি পাই।

[রচনাকাল: ১০-১০-২০০৩]

২৩১

মীর, সৈয়দ, মোল্লা সাব,
চৌধুরী আর কাজি সাব,
যতই করো জাতির গৌরব, কিছুই রবে না।
কুলীন বংশ বিলীন হবে,
খুঁইজা পাবে না।

জাতি-কুলের গৌরব নিয়া যতই থাকো মুগ্ধ,
রং-বেরঙের গাভীর কিন্তু একই রকম দুগ্ধ।
রং ধরিয়া সং করিলেও মাফ হবে না।

সূর্য যেমন একই আলো ছড়ায় পৃথিবীতে,
একই পানি ভেসে বেড়ায় খাল-বিল নদীতে,
যে পাত্রে যায় সেই পরিচয়, ভিন্ন আর পাবে না।

হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, নানান জাতি কয়,
জন্ম-মৃত্যুর কলা-কৌশল একই রকম হয়।
মনসুর বলে, মরণ হলে জাতিভেদ রবে না।

[রচনাকাল: ১৫-১০-২০০৩]

২৩২

সৃষ্টির সেরা মানুষ, এই তোমরা ভাল যদি চাও,
সৎ পথে থাইকা,
হালাল রুজি কইরা খাও।

জাইনা-শুইনা পাপের পথে কেউ যাইও না,
কেউ কোনোদিন ভুলেও পরের জিনিস খাইও না,
নেশাযুক্ত হইও না, ঘুষের টাকা লইও না,
মিথ্যা কথা কইও না, সত্য কইয়া মইরা যাও।

অসৎ পথে রুজি কইরা খাওয়াইবা যারে,
সে কি এই তোমার পাপের ভাগী হইবে না সংসারে?
যার পাপ তারই লাগি, কেউ হবে না পাপের ভাগী,
সত্যের পথে আত্মত্যাগী, কোরবান হইয়া যাও।

কুটি মনসুর বলে, আমার বয়স ঊনআশি,
দেখছি বহু, শুনছি প্রচুর, গানও লিখিয়াছি।
কোরানেতে সত্য জানি আল্লাহ্ ও রাসুলের বাণী,
মরার আগে খাঁটি একজন মানুষ হইয়া মইরা যাও।

[রচনাকাল: ১১-০৪-২০০১]

২৩৩

একদিন জামাই সাইজা যাইবা শ্বশুরবাড়িতে,
সেদিন নায়রিরা বিয়ার গান
গাইবে করুণ সুরেতে।

আতর-গোলাপ, গরম জলে গোসল করাইয়া,
জামাইকে সাজাবে সাদা বসন পরাইয়া।
চার বেহারায় কাঁধে নিবে,
কাঁচা বাঁশের কঞ্চিতে।

বরযাত্রী এগিয়ে দিবে, সাথে কেউ যাবে না,
বাসরঘরে থাকবে শুয়ে, স্ত্রীকে এই তো পাবে না।
স্ত্রী ছাড়া একা জামাই
থাকবে মাটির ঘরেতে।

মনসুর বলে, বাপ ও দাদার বাড়িঘর থুইয়া,
জন্মের মতো যাইবা সেদিন ঘরজামাই হইয়া।
মাতা-পিতা, ভাই-বোন কাঁদবে,
কপাল ঠুকে মাটিতে।

[রচনাকাল: ১১-০১-২০০১]

২৩৪

রঙের এই দুনিয়া একদিন ছেড়ে যেতে হবে,
টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ সবই পড়ে রবে।

সাত তালা দালান-কোঠা, পাকা ঘরবাড়ি,
এক সেকেন্ডের নাই ভরসা যাবে সব ছাড়ি।
আযরাইল এসে ধরবে কষে,
প্রাণ কাড়িয়া নেবে।

হায় হায় করে ফাটাফাটি, কান্নাকাটি চলবে,
‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিছে’ পড়শীরা সব বলবে।
মাটির ঘরে অন্ধকারে,
একাই সেদিন রবে।

কুটি মনসুর কয়, মরণ কথা আগে স্মরণ করো,
সময় থাকতে দুনিয়াতে কামেল মুর্শিদ ধরো।
মানুষ হইয়া মানবধর্ম
পালন করো সবে।

[রচনাকাল: ২১-০৯-২০০৩]

২৩৫

পরম বন্ধুরে পাইতে দিনে রাইতে,
বক্ষ ভাসাই কান্দিয়া।
আমার এই পোড়ামন হইয়াছে উচাটন,
কেমনে রাখি বান্ধিয়া।

আমি তারে ভালবাইসা বোবা হইয়াছি,
ব্যথার জ্বালা সইয়া বুকে আশায় রইয়াছি।
বন্ধু একবার ধরা দিলো না,
আপন কইরা নিলো না,
সুখ হইলো না তারে প্রাণ দিয়া।

নিঠুর বন্ধুর দয়া নাই, নিদয়া হইলো,
আমায় ভুইলা ক্যামনে পাষাণ বাইন্ধা রইলো?
আমি ক্যান পিরিতি করিলাম,
জ্বইলা-জ্বইলা মরিলাম,
কলংকের বসন রইলাম পিন্দিয়া।

[রচনাকাল: ৩০-১১-১৯৮৮; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]

২৩৬

প্রেম-পিরিতি হয় না থাকলে বাড়ি, গাড়ি, টাকা,
মনের মিলন না হলে তার
বুকটা করে খা-খা।

পাকা ঘরে শুইয়া পরে ঘুম আসে না চোখে,
মনের আগুন ধুকধুকাইয়া জ্বলে সদায় বুকে।
দুরু দুরু করে পরান, বেধে যায় না রাখা।

প্রেম-আগুনে জ্বইলা মরে, কারো কাছে কয় না,
ধন-সম্পদ যতই থাক, তাতে সুখ হয় না।
যে ঘরে আগুন জ্বলে সে ঘরে যায় না থাকা।

[রচনাকাল: ১১-০৯-২০০১]

২৩৭

প্রেম রসের রসিক আমার মাওলা কাদের গনি,
ডাকলে তার দয়া পাই,
না ডাকলেও দূরে নাই,
সে যে নয়ন মনি।

এক ফোঁটা পানির ভিতরে খেলছে খেলা জীবন ভরে,
একবার ভাঙ্গে একবার গড়ে কুদরতেরই খনি।
মেহেরবান সে অসীম দাতা,
তার তরে যে নোয়ায় মাথা,
ভক্তি রসে মিশে কর্তা দিতেছে জয়ধ্বনি।

সৃষ্টির তরে শ্রেষ্ঠ হইয়া,
কাটায় সৃষ্টি জীবন লইয়া,
জীবের সঙ্গে রয় মাতিয়া,
ভেবে দেখছনি।
কুটি মনসুর ভেবে কয়,
সেইতো পরম দয়াময়,
ভাল-মন্দের সাথী হয় সারা দিন-রজনী।

[রচনাকাল: ১২-১২-২০০২]

২৩৮

পরোয়ানা পাঠাইলে,
গ্রেফতার করবে আযরাইলে,
তখন কারো দোহাই দিলে পাবে না জামিন,
গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়ে যাবেরে একদিন।

বাবুগিরি, ছলচাতুরি যা করছো যেখানে,
জবাবদিহি করতে হবে হাসরের ময়দানে।
পাইয়া সাধের জমিদারি,
করছো কত বাহাদুরি,
দুনিয়ার এই মাতুব্বুরি থাকবে না সেইদিন।

বাড়ি-গাড়ি, জমিদারি, ধন-সম্পদ ফেলে,
সঙ্গী-সাথী কেউ রবে না, একা যাবে চলে।
পুত্র-কন্যা, পরিবার
সবই এই তোমার হবে পর,
সুখ-ছন্দ, আনন্দের ঘর সব হবে বিলীন।

দিন পাইয়া দ্বীন ভুইলা রইলা, যখন হবে রাতি,
অন্ধকার কবরে যাইবা, কেউ হবে না সাথী।
মনসুর কয় ভাবিয়া তাই,
মুর্শিদ বিনে গতি নাই,
নিদানকালে না হই যেন মুর্শিদ বিহীন।

[রচনাকাল: ১০-০৯-২০০৩]

২৩৯

দামি-দামি পোষাক পইরা,
মার্সিডিজ গাড়িতে চইড়া,
ঘুরলা কত ভাই।
মরার পরে এই তোমার আমার
এক পয়সার দাম নাই।

সময় হইলে দিল-দরিয়ায় উঠবে ব্যথার ঢেউ,
রাজা-বাদশা চইলা যাবে, রবে না আর কেউ,
তাই টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদের
কইরো না বড়াই।

মানুষকুলে জন্ম নিয়া কইরো না কেউ ভুল,
হিংসা, নিন্দা, অহংকার সব পতনেরই মূল।
মনসুর কয়, মাটির মানুষ,
মাটিতে মিশে যাই।

[রচনাকাল: ১০-০৯-২০০৩]

২৪০

বন্ধু আমি এই তোমার প্রেমে পাগল হয়েছি,
এই তোমার জন্য মনের দুয়ার
খুলে রেখেছি।

এই তোমায় পেতে দিনে-রাতে ঝরে চোখের জল,
কাছে এসে ভালবেসে প্রাণ করো শীতল,
জীবন-যৌবন এই তোমার কাছে সপে দিয়েছি।

বন্ধু এই তোমার রূপের ছবি বুকের মাঝে রয়,
তুমি ছাড়া মনটা আমার সদা ব্যকুল হয়,
এই তোমার জন্য জীবন দিতে বাজি ধরেছি।

[রচনাকাল: ১৫-১০-২০০৩]

২৪১

ও বন্ধুরে, মোবাইল ফোনটা
কেন রাখলা বন্ধ করিয়া,
ফেসবুকেতে বসোনা,
টুইটারেও পাইনা,
মনটা বলে ছুইটা আসি
সবকিছু ছাড়িয়া।

বন্ধু তুমি দূরে যাইয়া নতুন চাকরি লইছো,
এত দিনতো মোবাইল ফোনে কত কথা কইছো।
কল করো না সাত-আট দিন,
মনটা যে করে চিন-চিন,
তুমি ছাড়া ঘুম নাই চোখে, রাত কাটাই জাগিয়া।

বন্ধু তুমি বুকের মধ্যে বাসর ঘর সাজাইয়া,
না জানি কার পিরিতে আছো মন মজাইয়া।
ভেবে কুটি মনসুর কয়,
পিরিতি ছলনাময়,
প্রেম-পিরিতে জ্বালায়-পোড়ায় প্রাণে ব্যথা দিয়া।

[রচনাকাল: ১৯-০৯-২০০১]

২৪২

ও কাদিরা শোন শোন, আমি এই তোরে কই,
আমার সাথে প্রেম করিতে সাহস পাইলি কই।
আমার চাচা এমপি,
আমি তার ভাতিজি হই,
আমার সাথে প্রেম করিতে সাহস পাইলি কই।

কাদিরা এই তোর জন্য আমার মনে দুঃখ লাগে,
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, বুঝলি না ক্যান আগে?
চাচা আমার ভীষন ভালা,
চায় একটা শিক্ষিত পোলা,
কারণ আমি এই তোর মতো অশিক্ষিত নই,
আমার সাথে প্রেম করিতে সাহস পাইলি কই।

তুই কাদিরা গন্ডমূর্খ, অশিক্ষিত হইয়া,
কোন মুখেতে আইলি আমার বিয়ার প্রস্তাব লইয়া?
বিদ্বান মেয়ের স্বামি হতে,
সম্ভব না এই তোর কোন মতে,
চাচা জানলে কাবিনেতে করবে না রে সই,
আমার সাথে প্রেম করিতে সাহস পাইলি কই।

[রচনাকাল: ০৭-০৩-২০০১]

২৪৩

ও বন্ধুরে,
তুই আমারে বাইচা থাকতে দিলি না,
ও তুই এক পলকে দেখা দিলি,
পরানটারে কাইড়া নিলি, আরতো ফিরা আইলি না।

দেইখা এই তোরে নদীর ঘাটে,
মন-মনোরায় চইমকা ওঠে,
বুকের ভিতর চিড়া-কোটে,
সইতে পারি না, জ্বালা সইতে পারি না।

রাখলাম এই তোরে চোখে চোখে,
তাকাইলি না আমার দিকে,
ও এই তোর বাঁকা ঠোঁটে,
হাসি মুখে একটা কথাও কইলি না।

ভুলিতে পারি না এই তোরে,
অহরহ মনে পড়ে,
রূপের আলো এই অন্তরে
বাড়ায় যন্ত্রণা, বুকে বাড়ায় যন্ত্রণা।

পইরা এই তোর পিরিতের ফাঁদে,
মনটা আমার সদায় কাঁদে,
ভালবাইসা তুই আমারে
আপন কইরা নিলি না।

[রচনাকাল: ০৭-০৩-২০০১]

২৪৪

সইগো, বইলা দে আমায়,
আসল প্রেমের মানুষ পাই কোথায়?
নকল প্রেমের ছড়াছড়ি সাধের দুনিয়ায়,
আসল প্রেমের মানুষ পাই কোথায়?

চুরি কইরা মনটা নিয়া নিজের মনটা দেয় না,
সরল প্রাণে দুঃখ দিয়া আপন কইরা নেয় না।
প্রেম-জ্বালা, যন্ত্রণা দিয়া
পরান নিয়া চইলা যায়।

পৌষ মাসে ভালবাসে, চৈত্র মাসে পাই না,
এমন ভালবাসা আমি কোনোদিনই চাই না।
লোভ দেখাইয়া স্বাদ মিটাইয়া,
না কইয়া পালাইয়া যায়।

[রচনাকাল: ১১-০৮-২০০৩]

২৪৫

কি দিয়া মন বাইন্ধা রাখি ঘরে?
জ্বালা সয় না অন্তরে,
বন্ধুর কথা সদায় মনে পড়ে রে,
জ্বালা সয় না অন্তরে।

বাজায় বন্ধু বাঁশের বাঁশি,
মনে বলে দেইখা আসি,
বাঁশির সুরে প্রাণ উদাসী করে রে।

রানতে বইসা ধোঁয়ার ছলে,
কান্দি তার বিচ্ছেদ অনলে,
দিবানিশি চোখের পানি ঝরে রে।

গলায় বাইন্ধা প্রেমের রশি,
টানে বন্ধু দূরে বসি,
তার কথা আর ভুলি কেমন করে রে?

[রচনাকাল: ১০-০২-১৯৮৭]

২৪৬

দয়াল আমি এই তোমার চরণের কাঙাল,
আমার থাকতে জীবন না পাই চরণ
কেন এ পোড়া কপাল।

হইলো না মোর সাধন-ভজন
না পাইলাম এই তোমার দরশন
নিজের ভুলে নিজেই এখন
কাইন্দা মরি চিরকাল।

মিছে কাজে দিন ফুরাইলাম,
এই তোমার নাম ভুইলা রইলাম,
মনসুর কয় না পারিলাম
ছাড়তে মায়াজাল।

[রচনাকাল: ১৮-০৯-১৯৮৭]

২৪৭

মন তুই দিন ফুরালে বসে বসে কানবি,
ইসরাফিল শিংগা ফুকিলে
কানে যখন শুনবি।

‘আজ ভাল না কাল ভাল’,
ভাবতে ভাবতে সময় গেল,
গুনতে গুনতে দিন ফুরালো,
আর কতকাল গুনবি।

কাল-সমন এই তোর পিছে পিছে লইতেছে খবর,
সময় হলে বাইন্ধা নিবে পলকের ভিতর।

কুটি মনসুর বলে, সামনে চলতে
সুযোগ নাই রে কথা বলতে,
কেয়ামতের আলামত কি
একা-ই সেদিন জানবি।

[রচনাকাল: ০৮-০১-১৯৮৯]

২৪৮

দুনিয়া মিছে গোলকধাঁধা,
বুঝলি না হায়রে খোদার বান্দা।

বহুরূপী রং বাজারে,
মন থাকে না মনের ঘরে,
রূপ দেখাইয়া পাগল করে,
চোখ থাকতে হয় আন্ধা।

কাটিয়া এই মায়ার বাঁধন,
সঠিক পথে চলোরে মন,
হইলে পরে মানুষ রতন,
সে জন থাকে জিন্দা।

কুটি মনসুর বলে, মনরে আমার,
ছাড়তে হবে এ রং বাজার,
নিজের বাড়ি চলো এবার,
ঘনাইয়াছে সন্ধ্যা।

[রচনাকাল: ০৯-০১-১৯৬১]

২৪৯

মাটির মানুষ মাটির কোলে যাবিরে একদিন,
চেনা মানুষ মইরা গেলে
হবিরে অচিন।

মইরা গেলে পইরা রবে দালান-কোঠা, ঘর,
পুত্র-কন্যা, আপন মানুষ হইয়া যাইবো পর।
অন্ধকারে মাটির ঘরে
থাকবীরে সেইদিন।

সময় থাকতে ভাবলি নারে ওরে মনা ভাই,
রঙের বাজার ভেঙ্গে গেলে সঙ্গের সাথী নাই।
কুটি মনসুর বলে, রং-তামাশা
হইবো রে বিলীন।

[রচনাকাল: ২৩-১১-১৯৮৭]

২৫০

মন তুমি কার, কেবা এই তোমার খবর নিলা না,
কোথায় ছিলা কোথায় আইলা,
ভাইবা দেখলা না।

আপন বইলা বুকে তুইলা নিয়াছিলা যারে,
ভালবাইসা জীবন-যৌবন সইপা দিলা তারে।
অবশেষে দোষী হইলা,
মন পাইলা না।

আন্ধার মেলা, ধান্ধার খেলা খেলবে কতদিন?
আজ বুঝবে না, সময় গেলে বুঝবে রে একদিন।
কুটি মনসুর বলে, দম ফুরাইলে
সঙ্গী পাইবা না।

[রচনাকাল: ১০-০১-১৯৮৯]

২৫১

বন্ধু যদি বৃক্ষ হইতো, আমি হইতাম লতা,
অঙ্গেতে জড়াইয়া থাকতাম,
কইতাম মনের কথা।

বন্ধু আমার চিকন কালা, বাজায় বাঁশের বাঁশি,
মনে বলে যাইগো চলে দেইখা তারে আসি।
শুইনা তার ঐ মধুর বাঁশি,
জুড়াইতাম ব্যথা।

প্রাণো বন্ধু যদি আমার চোখের কাজল হইতো,
মনের আদর সোহাগ দিতাম, চোখে চোখে রইতো।
বাসনা পুরাইতো, জীবন
যাইতো না আর বৃথা।

[রচনাকাল: ২২-১০-১৯৮৬]

২৫২

বয়সকালে রসের বন্ধু কাছে আইলা না,
দূর বৈদেশে রইলা বন্ধু, হইলো যন্ত্রণা।

যৌবন এইতো জোয়ারের পানি, আজ আছে কাল নাই,
বন্ধুহারা দিন-রজনী কি কইরা কাটাই?
ফুলের মধু রইলো ফুলে,
ভ্রমর আইসা খাইলো না।

বন্ধুর আশায় পন্থের দিকে চাইয়া রইলাম,
কত দিন গেল, মাস গেল, বছর হইলো গত।
অভাগিনির মনের দুঃখ
বন্ধু বুঝতে চাইলো না।

[রচনাকাল: ২২-১০-১৯৮৬]

২৫৩

পথে বইসা পথিক যেমন কান্দে পথ হারাইয়া,
আন্ধার ঘরে অন্তর কান্দে
বন্ধুরে না পাইয়া।

পানি ছাড়া কান্দে নদী, কান্দে পুকুর-ডোবা,
মনহারা বুক কাইন্দা মরে হইয়া যায় রে বোবা।
আগুন জানে না পোড়ার ব্যথা,
ছাই বানায় পোড়াইয়া।

চণ্ডিদাস আর রজকিনী, প্রেমিক-প্রেমিকায়,
এ জগতে খাঁটি প্রেমের শিক্ষা দিয়া যায়।
প্রেম কইরা প্রেমিক মইরা,
প্রেম রাখে বাচাইয়া।

[রচনাকাল: ০৭-০১-১৯৮৯]

২৫৪

ওগো বন্ধু, এই তোমরা আমার শেষ যাত্রায়,
বিদায় দিতে যাইও।
চার জনাতে কাঁধে নিয়া,
মাটিতে শোয়াইও।

পাক জলে গোসল করাইয়া,
সাদা বসন গায় পরাইয়া,
এই তোমরা কালেমা পড়িয়া আমায়
কবরে পৌঁছাইও।

পুত্র-কন্যা, সবাই এই তোমরা শিয়রে বসিয়া,
কানেতে শুনাইয়া দিও কোরান পড়িয়া।

দোয়া কইরো আমার জন্য,
মইরাও যেন হই ধন্য,
কুটি মনসুর বলে, বিদায়কালে
আমার আত্মার শান্তি চাইও।

[রচনাকাল: ২৫-০২-১৯৮৪]

২৫৫

এমন সাধের মানব-জনম আর না হবে,
কোন কাজে কাটাইলিরে দিন
আইসা ভবে।

খাঁটি মানুষ হইয়া সঠিক পথে থাকলি না,
কোন শপথে আইলি মনে রাখলি না।
পাইলি কত মানিক-রতন,
তবু আশা হয় না পূরণ।
দালান-কোঠা, রাজ-সিংহাসন সবই পইড়া রবে।

রঙের মেলায় সং এর খেলায় খেলবি কতদিন
আজ বুঝবি না, সময় গেলে বুঝবীরে একদিন।

ষোল আনা পুঞ্জি দিয়া পাঠাইয়াছে এই তোরে,
হিসাব দিতে হইবো রে মন অন্ধকার কবরে।
ফেরেস্তা যখন আসিবে,
ডাইকা এই তোরে জিজ্ঞাসিবে,
কুটি মনসুর কয়, জীবনের হিসাব সবই দিতে হবে।

[রচনাকাল: ১৯-০৩-১৯৮৯]

২৫৬

ভবে রইয়াছো মন পরবাসী হইয়া,
আপন দেশে যাইতে হবে,
যাইবা কি ধন লইয়া।

দেশের কথা ভুইলারে মন, হইলা পরবাসী,
এ দেশে আর কেউ নাই এই তোমার আপন, দেশের দেশী।
পরের ঘরে কাল কাটাইলা,
খাট-পালঙ্কে শুইয়া।

যত ছিল পুঞ্জি এই তোমার, করলা বেচাকেনা,
মহাজনের পুঞ্জি খাইয়া হইলারে মন দেনা।
সমন আইলে যাইতে হবে,
এ ঘরবাড়ি থুইয়া।

[রচনাকাল: ২৭-০৮-১৯৬৪]

সকল অধ্যায়
১.
ভাষার গান – কুটি মনসুর
২.
দেশের গান – কুটি মনসুর
৩.
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গান – কুটি মনসুর
৪.
আধুনিক গান – কুটি মনসুর
৫.
ছড়াগান – কুটি মনসুর
৬.
পল্লীগীতি – কুটি মনসুর
৭.
ভাটিয়ালী গান – কুটি মনসুর
৮.
আধ্যাত্মিক গান – কুটি মনসুর
৯.
দেহতত্ত্ব – কুটি মনসুর
১০.
মুর্শিদি গান – কুটি মনসুর
১১.
মারফতি গান – কুটি মনসুর
১২.
ভান্ডারী গান – কুটি মনসুর
১৩.
জারিগান – কুটি মনসুর
১৪.
পালাগান – কুটি মনসুর
১৫.
বাংলা নববর্ষের গান – কুটি মনসুর
১৬.
বর্ষার গান – কুটি মনসুর
১৭.
ইসলামী গান – কুটি মনসুর
১৮.
হাম্‌দ্‌ – কুটি মনসুর
১৯.
নাত্‌ – কুটি মনসুর
২০.
শবে-বরাতের গান – কুটি মনসুর
২১.
শব-এ-ক্বদরের গান – কুটি মনসুর
২২.
রোজার গান – কুটি মনসুর
২৩.
ঈদের গান – কুটি মনসুর
২৪.
বিষয়ভিত্তিক উন্নয়নমূলক গান – কুটি মনসুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%