মানুষের রূপ-চেহারা দেখনা এই তোরা,
গঠন করা কি সন্ধানে?
মাথা-মুণ্ডু আজব কাণ্ড,
ভাণ্ডের খবর কয়জন জানে।
মানুষ সৃষ্টি আজব কৃষ্টি, কুদরতি এক খেলাঘর,
সাড়ে তিন হাত ঘরখানি তার, জোৎ-গাঁথুনি কি সুন্দর।
আগুন, পানি, হাওয়ার বলে,
দুই দিকে দুই পাখা চলে,
সামনে দুটি বাতি জ্বলে,
মিটার চলে রাত্র-দিনে।
চার নফস, পঞ্চ রুহু এই দেহের ভিতরে রয়,
নাভি মূলে শব্দ ওঠে, জবান ফুটে কথা কয়।
হাড়ে হাড়ে আছে জোড়া,
রক্ত-মাংস, চামড়ায় ঘেরা,
করছে মানুষ চলাফেরা,
নাশিকাতে নিঃশ্বাস টানে।
একুশ হাজার ছয়শো বারে নিঃশ্বাস ছাড়ে দিবা-রাত,
নিঃশ্বাস যেদিন বন্ধ হবে, ফুরাইয়া যাবে হায়াত।
মনসুর কয়, পাইলি না দিশে,
মানুষ চালায় কোন মানুষে?
অচিন মানুষ সঙ্গে মিশে,
ভেবে দেখ সত্য জ্ঞানে।
[রচনাকাল: ১২-০৩-১৯৭৪; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]
ও কি সুন্দর সুন্দর সাজাইলো দেহ-ঘর,
ঘরখানি রইয়াছে খাঁড়া
দুই খাম্বার উপর।
চামের ছাউনি আঁটাপিটা,
চৌদিকে জানালা কাঁটা,
নয় দরজায় কপাট আঁটা,
দেখতে মনোহর।
চার রঙ্গে এক রং বানাইয়া সাজায় দেহ-ঘর,
খুঁজলে পাবি আল্লাহ্-নবি সেই ঘরের ভিতর।
চৌদ্দ পোয়া ঘরখানি,
ঘরে আছে আগুন-পানি,
মনসুর কয়, চলে দিন-রজনী,
হাওয়ায় কইরা ভর।
[রচনাকাল: ১৫-০৪-১৯৭২; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নুরুন্নাহার আউয়াল]
দেহঘড়িটা বানাইছে আজব কারিগরে,
তিনশো চৌষট্টি জোড়া ঘড়িটার ভিতরে।
হাওয়ার বলে ঘড়ি চলে, লাগেনা চাবি আঁটা,
ইচ্ছামত অবিরত চলতেছে ঘড়ির কাঁটা।
নষ্ট হইলে এই ঘড়ি পাবে না তার মিস্তরি,
জিগাইবে না কলের ঘড়ি
অচল হইলে পরে।
ঘড়ির মেকার ঘড়ির ভিতর সদায় বিরাজ করতেছে,
মনটা বুঝে ঘণ্টার কাঁটা, সময় মত ঘুরতেছে।
ময়লা ধরা ঘড়ি যার,
ঠিক পাবে না সময় তার,
ময়লা সাফা রাখলে ঘড়ি চলবে জীবন ভরে।
হিংসার ছালি, রাগের কালি, ময়লা ধরলে ঘড়িটা,
দিনে-রাতে ঘড়ির কাঁটায় বাইজা থাকে বারটা।
মনসুর কয় ভাবিয়া তাই,
বন্ধ ঘড়ির মূল্য নাই,
মন-ঘড়িটা চালাও ভাই, আল্লাহু জিকির করে।
[রচনাকাল: ১৪-১১-১৯৭৩; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: এম. এ. মতিন]
বারটা বাজবে যেদিন দেহঘড়িটায়,
বাড়ি-গাড়ি, টাকা-কড়ি,
বড় কথা, মাতুব্বরি,
সকলি সাঙ্গ হবে রং-রসের এই মেলায়।
বহুরূপী, ছলচাতুরি
করে যারা বাহাদুরি,
মজা করে দিন-দুচারি মনের সাধ মিটায়।
জোয়ার-ভাটায় আইলো-গেলো,
রইলো কোন ব্যাটায়?
যত করো তালবাহানা,
হিসাবে মিল হবে না,
না জানি পরোয়ানা কোন দিনে পাঠায়?
মনসুর কয়, ঠেকবি রে মন
গেলে পারঘাটায়।
[রচনাকাল: ১১-০২-১৯৭৭; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: মান্না মেহেদি]
যে দিন শুকাইবে দিল দরিয়ার পানি,
ঠেইকা যাবে দেহতরী,
লাগবে টানাটানি।
সাত সমুদ্দুর দেহের মধ্যি,
তিনশো ষাইটটি রসের নদী,
জোয়ার-ভাটায় চলে সদায় দেহতরীখানি।
জোয়ার গেলে ভাটা লাগলে শুকায় নদীর পানি,
তখন মাঝি ব্যাটায় হাল ছাইড়া দেয়
হইয়া পেরেশানি।
শুকাইলে সপ্ত দরিয়া, শূন্য দেহ রয় পড়িয়া,
দেহের বাজার যায় ভাঙ্গিয়া, হয় না বেচাকিনি।
মহাজনে বন্ধ করে আমদানি-রফতানি,
মন-মনোরায় পালাইয়া যায়
ছাইড়া দেহখানি।
মাটি হবে মাটির দেহ, জিগাইবে না ডাইকা কেহ,
দেহের প্রতি মায়া-মোহ থাকবে না তখনি।
এই মাটির দেহের বড়াই কেহ কইরো না কখনি,
মনসুর বলে, পরকালে
উপায় কি না জানি?
[রচনাকাল: ০৯-১০-১৯৭১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: নীনা হামিদ]
ধইরাছে দুই ডালে এক ফল
বোঁটা ছাড়া, আলগা ধরা,
হায় কি আজব কল।
এমন যে কুদরতি ফল সৃষ্টি হইলো দুনিয়ায়,
পাকা হইয়া গাছে ধরে, কাঁচা হইয়া ঝইড়া যায়।
সে ফল কেউ পাইলো, কেউ খুঁইজা বেড়ায়
হইয়া যে পাগল।
আসমানে সেই গাছের গোড়া, ডাল মেইলাছে জমিনে,
রং-বেরঙের ফল ধইরাছে বাড়তেছে রাত্র-দিনে।
ভবে সুফল ফলায় দুই-একজনে,
যে জানে কৌশল।
মনসুর বলে, কলকৌশলে ফলের তত্ত্ব জানতে হয়,
কারো ভাগ্যে পাঁচটা-দশটা, কারো ভাগ্যে একটাও নয়।
সে ফলের ভারে এ সংসারে
সব হয় রসাতল।
[রচনাকাল: ০৯-০৫-১৯৮৬; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: লাল মিয়া]
দেহ-জমির ফসল খাইলা
খাজনা দিলা না,
চৌদ্দ পোয়া জমিখানি
মাইপা নিলা না।
জনম ভইরা আবাদ কইরা খাজনা রইল বাকি,
একদিন জমি নিলাম হবে, চলবে না আর ফাঁকি।
নিলাম হইলে সেই জমি আর
ফেরত পাইবা না।
দেহ-জমির খাজনা থেকে রেহাই যদি চাও,
একশত তিরিশ ফরজ আদায় কইরা যাও।
মনসুর বলে, খাজনা ছাড়া
দাখিলা দিবে না।
[রচনাকাল: ০৫-১২-১৯৮১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জি.এম. সাদেক]
আমার এই দেহঘরে বসত করে
হীরামন এক তোতা-পাখি,
ও সে ধরা দেয় না, খুঁইজা পায় না,
করছে শুধু ডাকাডাকি।
সপ্ত তালার উপরেতে থাকে পাখি সব সময়,
নিচের তালায় নামে ওঠে যখন পাখির মনে লয়।
একবার ঘরে আবার বাইরে,
ইচ্ছামত চলে ফিরে,
ধরা যায় না সেই পাখিরে,
কেমন কইরা বাইন্ধা রাখি?
এতো যত্নের পোষা-পাখি, আমার কথা শোনে না,
আমি বলি ‘আমার-আমার’, পাখি আমার হইলো না।
ধরবো পাখি বলছি সবে,
পাখি এই তো না ধরা দেবে,
হঠাৎ একদিন উইড়া যাবে,
জন্মের মতো দিয়া ফাঁকি।
মনসুর বলে, কল-কৌশলে পাখি যদি ধরতে হয়,
গুরুর কাছে মন্ত্র নিয়ে বসে থাকো নিরালায়।
বাহির দরজা বন্ধ করে,
চাবি লাগাও দমের ঘরে,
পাখির কি রূপ দেখবি পরে,
দেখবি রূপের ঝিকিমিকি।
[রচনাকাল: ২১-০২-১৯৭৯; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: জি.এম. সাদেক]
ভেবে দেখছো নি রে দেহঘরে
কে রইলো কোথায়?
চার কুতুব, ষোল প্রহরী আছে পাহারায়,
এই তোমার আছে পাহারায়।
আট কোঠরি, নয় দরজা, আঠারো মোকাম ঘরে,
দমে দমে লা-মোকামে মন-মানুষ বিরাজ করে।
দেহ ঘরে আছে চন্দ্র, সপ্ত তালা, দশটি ইন্দ্র,
ছয় লতিফায় সাধন কেন্দ্র, মুর্শিদে জানায়।
মুর্শিদ-কাবায় সেজদা কর আপন মুর্শিদ জানিয়া,
দেহ-কাবায় উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম চিনিয়া।
দিল-কলবে আল্লাহ্-নবি, মুর্শিদরূপে দেখতে পাবি,
স্বরূপে সেই রূপের ছবি নূরে নূর চমকায়।
মন-মুর্শিদের খবর করো সূক্ষ্ম প্রেমে মজিয়া,
মনসুর বলে, আশেক হলে মাশুক পাবে খুঁজিয়া।
মনে-প্রাণে ডাকবে যারে, জ্ঞান-নয়নে দেখবে তারে,
আপন মানুষ রূপ নিহারে দেহ-পিঞ্জিরায়।
[রচনাকাল: ২১-০২-১৯৯০; সুরকার: জাহিদ মনসুর]
মাথা আর মুণ্ডু কি আজব কাণ্ড,
এই দেহভাণ্ড কেউ এই তো খুঁজলাম না।
ব্রহ্মাণ্ডে আছে যাহা, দেহভাণ্ডে পাবে তাহা,
মুর্শিদের বাক্য ইহা, বুঝলাম না।
নীরে-নূরে দেহ-ঘর, আত্মা রূপে কারিগর,
বিরাজ করে দেহের ভিতর, জানলাম না।
অনন্ত রূপ জ্যান্ত রয়, আপনরূপে পরচয়,
কে কথা কয়, সে রূপ দেখলাম না।
আমি হতে আমিত্ব এক আল্লাহ্ সত্য, সৃষ্টিতত্ত্ব,
কেউ এই তো খুঁজলাম না।
মনসুর কয়, আমি কি, যাবে কি আর রবে কি,
শেষকালে হবে কি, তা বুঝলাম না।
[রচনাকাল: ০২-০৪-১৯৯১; প্রথম কণ্ঠশিল্পী: কুটি মনসুর]
তারে পাইতে যদি চাও,
মনের তারে তার মিলাও।
তারে তারে খবর কইরা
তার কাছে যাও।
তারে তার কইরা মিলন লাগাও, তারে কানেকশন
করো তারে টেলিফোন যোগাযোগ চালাও
লাইন দিয়া ইস্টিশনে লাগাও তার কানে কানে,
মনের কথা সংগোপনে,
তার কাছে জানাও।
আশেক হইয়া মনে-প্রাণে কথা কও, ধ্যানে-জ্ঞানে,
মনসুর কয়, তার সনে রঙ্গে-রঙ্গ মিশাও।
ও রঙের সাথে রং মিশাইয়া, আপন ঘরে দেখো চাইয়া,
চর্ম চক্ষু বন্ধ রাইখা,
জ্ঞান চোখে তাকাও।
[রচনাকাল: ০৪-০৭-১৯৭৬]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন