জয়ন্ত দে
এই কাহিনি আমার নয়। এই কাহিনি মুনিয়ার।
ওই যে মেয়েটা প্রায় নগ্ন হয়ে আমার টেবিলের ওপর বসে আছে, যার হাতে সিগারেট, গ্লাসে মদ, মুখে হাসি, বিছানার চাদরটা কোনওক্রমে যার কোমরে জড়ানো, ওর নাম মুনিয়া। এটা ওর ডাক নাম। এই নামেই আমি ওকে ডাকি।
আমি ওকে ভালোবাসি।
মুনিয়া পাখির নাম। খুব ছোট্ট পাখি। চুনিয়া মুনিয়া। আমি কোনওদিন পাখি-টাখি পুষিনি। সত্যি বলতে কি কোনওদিন পাখি-টাখির দিকে নজর করেও দেখিনি। আমার প্রিয় পাখি কাক। কী চমকে উঠলেন! কাক কারও প্রিয় পাখি হয় না কি? কেন আমার তো হয়েছে। অথচ কাককে কেউ পাখিই বলে না। কারণ, ওইরকম একটা কেলোকুষ্টি পাখিটা তার বুদ্ধিতেই কামাল করে দেয়। কী বুদ্ধি! বানচোতগুলো ওই রূপ নিয়ে শহরের সিরিয়ালখেকো ফ্যাশানদুরস্ত বউদিদের সঙ্গে কিতকিত খেলে, গান্ডুবাবুদের ঘাড়ে ইচ্ছেমতো অ্যা করে, সুইটি বিউটি পচার মায়েদের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে চুরি করে বাসা সাজায়।
সব চকচকে জিনিস নাকি ওদের পছন্দ। ওদের বাসাতে সার্চ করুন, রেইড করুন, বহুত চকচকে জিনিস পাবেন। সিগারেটের প্যাকেটের রাংতা, কাঁটা-চামচ, ছুরি, গ্যালভানাইজড তার। যা চকচক করিবে তাহাই সোনা হয়ে ওদের বাসায় চমকাইবে! কাকের বাসা মানেই চমকাইতলা!
আমি মাঝে মাঝে জানলার সামনে আমার চকচকে কালো গ্লক সেভেনটিন রিভলভারটা রেখে দিয়ে দেখি। হ্যাঁ, একটা না একটা এসে গরাদের ভিতর মুখ গলিয়ে মেশিনটাকে ঠোকরায়। আমি বলি, যা, পারলে নিয়ে যা, নিয়ে গিয়ে বাসায় রাখ। সবাই খুব চমকাবে। এরকম জিনিস অনেকে কিনে রাখে। সারাজীবন ধরে তারা শো করে ইউজ করে না। তুইও নয় ইউজ করবি না। চমকাবি!
একদিন মুনিয়াও দেখি দৌড়ে গিয়ে রিভলভারটা তুলে নিয়েছে হাতে। বলল, এটা আমাকে দাও।
'কেন, তুমি কি কাক!'
মুনিয়া হি হি করে হাসে। বলল, আমি সাদা কাক!
মুনিয়া ফরসা। খুব ফরসা। ওর নগ্ন শরীরে নীল নীল শিরাগুলো মানচিত্রের নদীর মতো লাগে। ওর ছোট ছোট গোলাপি আভার স্তনের ভিতরও নীল শিরা। দুরন্ত নদীর মতো খেলা করে। দুর্দান্ত!
আমি ওর শরীর দেখি, খুব বেশি ঝাঁপাঝাঁপি, হামলাহামলি করি না। দু-চোখ ভরে দেখি। দেখার জিনিস দেখি। আমাকে কেউ দেখায়নি। এমন করে কাউকে সামনে থেকে দেখিনি।
এমনকী আমি কোনওদিন আমার বিয়ে করা বউকে কমলাকে এমন করে দেখিনি। মুনিয়ার থেকেও কমলা সুন্দরী ছিল। আমি ওকে আদর করে বলতাম কমলাসুন্দরী! ঈশ্বর ওকে সবকিছু পুরো মেপে মেপে দিয়েছিলেন। শুধু বুদ্ধিটা ছাড়া। একবার এক পার্টিতে ওকে দেখে আমাদের সার্ভিসেরই এক সিনিয়র কর্তা বলেছিলেন সামলে রাখবেন। আড়ালে বলেছিলেন, এ তো জ্যোৎস্না!
সে কথাও এক কলিগের মুখ ঘুরে আমার কাছে এসেছিল। তাই শুনে আমি হেসে বলেছিলাম, শালা আজকাল পুলিশও কাব্য করছে।
সত্যি ওর মুখটা ছিল খুব শান্ত। একদম জ্যোৎস্না! ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে। কারও নজর লাগতে পারে।
আমি উলটে আমার সেই কলিগকে বলেছিলাম, 'উনি তো শুধু ফেস দেখে এই মন্তব্য করেছেন। বুক তো দেখেননি। আমি পুরো ফেস-বুক দেখেছি। বলে দেবেন, ধুমকেতু বলল ওর বউয়ের যেমন মাই, তেমন পাছা। ধূমকেতু রাতে ওর কাছে বাছা!' কথাটা বলে নিজেই একটু হাসলাম, বলল, 'পুলিশের বড়বাবু কাব্যির উত্তরে কাব্যি করলাম!'
সত্যি আমিও যেটা বললাম সেটাই ঠিক, কমলার যেমন মাই, তেমন পাছা! কোথাও একটু বেশি নয়, একটু কমও নয়। ওর পেট যেন পাতা দই! ওর দুই উরু দেখলেই অনেক পুরুষমানুষ হাপসে মরে যাবে। কোমরের খাঁজে পড়লে দম ছুটে যাবে। দুধে-আলতা স্কিন, মোমের শরীর!
হয়তো এসব কারণেই ও নিজেকে নিজেই সামলে রাখতে পারল না, মোম তো জ্বালিয়ে দিল। নিজেও জ্বলল, আমাকেও জ্বালাল।
কমলাকে আমি বিছানায় পেলেই উদোম করে দিতাম। বিশ্বাস করুন, ওকে নগ্ন করলে, আমার খারাপ কিছু করতে ইচ্ছে করত না. মনে হত কটা শিউলি ফুল নিয়ে ওর গায়ে ছড়িয়ে দিই। এই দেখুন আবার ফুলের কথা বললাম। ভাববেন না, আমি কাব্য করছি। পুলিশ কাব্য করলে পেঁদাবে কে? ওই মিনমিনে ঢ্যামনাদের জিনিস আমার আবার আসে না। আমি দুটো ফুল জানি। জবা আর শিউলি। একশো আটটা জবার মালা আমি নিজের হাতে থানায় কালীপুজোর দিন কালী মাকে দিই। মাইনের টাকা দিয়ে মালা কিনি। তোলা বা বখরার টাকা নয়। থানায় থানায় কালীপুজো হয়, দেখবেন ডাকাতরা আগে ডাকাতি করতে বেরুনোর সময় কালীপুজো করত। এই সময়ে ডাকাত নেতা-নেত্রীর শাগরেদ আমরা, তাই থানায় থানায় কালীপুজো করি। আর শিউলি চিনি, আমাদের বাড়ির উঠোনে ছিল। আমার মা শরৎকালে কুড়িয়ে কুড়িয়ে কাঁসার রেকাবিতে রাখত। ব্যস। আমি পলাশ আর শিমুল গোলমাল করে একবার বেশ খোরাক হয়েছিলাম। ওসব ফুল পাখি আমার সাবজেক্ট নয়। আমি আমার লাইনে আসি। আমার চোর ডাকাত, গুলি, বোমা নিয়ে কাজ। বেশ ছিলাম জানেন। কিন্তু অভাবী বিক্রিতে একটা দামি মাল কিনে বসলাম। ব্যস! সেদিন থেকেই বাঁশ ছিল ঝাড়ে, এল আমার গাঁড়ে!
সেই বাঁশটি হচ্ছে কমলা। কমলা সুন্দরী।
শুনুন, আপনাকে ছোট্ট করে একটা কথা বলে রাখি। এই কাহিনি কমলার নয়। আমারও নয়। এই কাহিনির নায়িকা হচ্ছে মুনিয়া। ওই যে, যে এখন বাপের বয়েসি একটা লোক, মানে আমার সামনে আধ-ল্যাংটা হয়ে ঘুরছে। মালটা কিন্তু ডেঞ্জারাস। আমি বাপের জন্মে, হোল পুলিশি লাইফে এইরকম একটা খতরনাক মেয়ে দেখিনি। পচা মাগি অনেক দেখেছি। কিন্তু ডেঞ্জারাস মেয়ে ইন্টারেস্টিং!
ওই মুনিয়াই এখন আমার প্রেমিকা!
থাক, ওর কথা পরে হবে। আমি আগে আমার কথা বলে নিই, নয়তো সব গুলিয়ে ফেলবেন। প্রথম কথা আমি কে?
আমি, ধূমকেতু রাহা।
সাহা নয়, রাহা! সাহারা ব্যবসায়ী হয়, রাহারা কী হয় জানি না। রাহাজানি করতে পারে। কী জানি! তবে আমি ব্যবসায়ী নই, ব্যবসায়ী হলে কমলাকে বিক্রি করে বহুত কামিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু কোনওদিন ওর গায়ে সামান্য কাদাটুকু লাগতে দিইনি। কমলা খানকিগিরি করলেও আমি সেটাকেও শিল্পীর যন্ত্রণা বলে গ্লোরিফাই করেছি। যখন পারিনি, খেল খতম করে দিয়েছি।
খেল খতম টেনশন হজম।
কিন্তু টেনশন আমার কাটেনি। কমলাকে তো খতম করে দিলাম, বাদবাকি তিনজন? ওর গানের গুরুদেব যে প্রেমের নামে ওকে ঘর থেকে টেনে বের করে ভোগ করল।
আচ্ছা, করলি তো করলি। আমি তখন চোখ বন্ধ করে ভেবেছি, ওদের মিলনে নিশ্চয়ই নতুন সুরসৃষ্টি হবে। ওরা সাধনা করছে। শিল্পীদের ওটা প্রাণের আরাম। যা করেছে বেশ করেছে, তাতে অন্য লোকের কী আছে। আমার বউ শিল্পী সংগীতাচার্য অসীমানন্দের সঙ্গে প্রেম করছে, প্রেম-সাধনা, সুর-সাধনা করছে। যা মানসিকভাবে অনেকদিন আগেই ঘটে গিয়েছিল, তা নয় শারীরিকভাবেও হচ্ছে। নো আপত্তি। আমার ভিতর ভিতর কষ্ট হলেও কমলাকে কখনো বুঝতে দিইনি। ও যদি বলত, আমি গুরুজিকে বিয়ে করব, আমি ওকে ছেড়ে দিতাম। সত্যি কমলাকে তো আমার সঙ্গে মানায় না। আমি একটা পাক্কা হারামি, হাঁড়িচাঁচা!
কিন্তু ওই গুরুজি অসীমানন্দ একটি পাক্কা ঢ্যামনার বাচ্চা। তিনি কমলাকে ভোগ করে অনন্যা রেকর্ড কোম্পানির রত্নেশ্বর সমাজপতিকে ভেট দিয়ে দিলেন। কমলাকে বোঝালেন, রত্নেশ্বরবাবুকে খুশি করতে পারলে রেকর্ড হবে। রেকর্ড হলেই নাম হবে।
কমলা রত্নেশ্বরবাবুকে খুশি করা শুরু করল। এটার নাম খানকিগিরি। পাক্কা খানকিগিরি। তখন সন্দেহ করেছি, কিন্তু কমলা বা অসীমানন্দ এত নীচে নেমেছে বিশ্বাস করতে পাচ্ছিলাম না। ভেবেছিলাম আমি সারাদিন বিষ্ঠা ঘাঁটি তাই আমার মনে সন্দেহ। কিন্তু একসময় বিশ্বাস পাকা হল, যখন বড় কাগজের হাফ পাতা জুড়ে ওর ছবি আর গানের রিপোর্টিং ছাপা হল।
মনের ভিতর কাঁটা খচখচ করছে। টোপ দিলাম খবরের কাগজের সেই রিপোর্টারকে, প্রেস ক্লাবে মাল নিয়ে বসলাম। বললাম, তোমার শনিবারের লেখাটা দারুণ হয়েছে। আমাকেও অমন একটা করে দিতে হবে। আমার একজন আছে, তারও ছবি দিয়ে ওভাবেই গুণকীর্তন করতে হবে তোমাদের খবরের কাগজের শনিবারের পাতায়।
তখন আঁতকে উঠে সে বলল, আমি পারব না দাদা। আপনি টাকা দিলেও পারব না। কেন না যেটা বেরিয়েছে এটা আমার বসের অ্যাসাইনমেন্ট। ওই কমলা মেয়েটি সুরঙ্গমা রেকর্ড কোম্পানির উৎপলবাবুর কেপ্ট। তারপর শুনেছি, আমার বসও নাকি ওই মহিলার স্পেশাল বন্ধু। মানে প্রসাদ পেয়েছেন। তাইজন্যেই এত বড় লেখা।
আমি সব শুনে টুনে, আরও তিন পাত্তর মদ খেয়ে টনটনে বুকে বাড়ি এলাম।
কমলাকে বললাম, তোমার নামে বাজারে কী সব কথা রটছে। তুমি গিয়ে একবার গুরুজির সঙ্গে কথা বলো এ সব কথা বন্ধ করো। পাবলিসিটির নামে এসব কী? তোমার ট্যালেন্ট আছে, আপসে হবে।
আমার কথায় ও ঠোঁট ওলটাল। বলল, সব গসিপ! ঈর্ষা! তুমি বরং আমার পরিচয় কাউকে দিও না।
আমার তখন পাগলপারা অবস্থা। একজনকে ফিট করলাম। সে রত্নেশ্বরের কাছ থেকে সব পাক্কা খবর এনে দিল। গুরুজির সঙ্গে কমলার প্রেম পিরিতির সম্পর্ক ছিল। কমলা গুরুজির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। কিন্তু ততদিনে ওর ওপর গুরুজির নেশা কেটে গেছে। গুরুজির কাছে কমলার মতো মেয়ের দল লাইন দিয়ে আছে। গুরুজির নিত্য নতুন চাই। গুরুজি ওকে ভেট দিয়েছিলেন রত্নেশ্বরকে।
রত্নেশ্বরের থেকে কমলা জোগাড় করেছে উৎপলবাবুকে।
ইদানীং কমলাকে নিয়ে রত্নেশ্বর আর উৎপলবাবুর মধ্যে খুব ঝামেলা হয়েছিল। যে কোনও ঝামেলার উৎস অর্থ, ক্ষমতা নয়, নারী। ওদের অর্থ ছিল, ক্ষমতা ছিল, নারী এসে ঝামেলা লাগিয়ে দিল। এই ঝামেলা মেটাতে ওরা একদিন দুজনেই গিয়েছিল গুরুজির কাছে। গুরুজি নাকি হাসতে হাসতে বলেছিলেন— কমলার স্বামী জানতে পারলে আপনাদের দুজনকে, সঙ্গে আমাকেও খুন করে রাখবে। অবশ্য কমলাকে সবার আগে মারবে। ঘর থেকেই সাফাই অভিযান শুরু করবে ওর স্বামী। সাবধান! দখলি মাল নিয়ে এত ঝামেলা করবেন না।
গুরুজির কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে মেনেছি। আমি ধূমকেতু রাহা, আগে মেরেছি কমলাকে। দুর্দান্ত স্কিম ছিল। পাক্কা প্ল্যান। এক মারেই কমলা টপকে গেল। ওকে বেশি কষ্ট দিইনি। জাস্ট সরিয়ে দিলাম।
কেসটা খেতাম না, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতাম। চাল ঠিকই দিয়েছিলাম, কিন্তু আমার কয়েকজন কলিগ আমাকে ধরিয়ে দিল। কাকের মাংস কাক খায় না, কিন্তু পুলিশের মাংস পুলিশের কাছে হেব্বি টেস্টি। কিন্তু অত করেও তারা আমার বাল ছিঁড়েছে। সাসপেন্ডেড ছিলাম। কেস চলল। তারপর বেকসুর খালাস। আবার জয়েন করলাম সার্ভিসে। ক'দিন ঘাপটি মেরে থাকলাম, কিন্তু দিন-রাত তিনজনের খবর রাখছি। গুরুজি, রত্নেশ্বর, উৎপল কে কোথায় যাচ্ছে? কে কোথায় যাবে? আতিপাতি সব খবর। নরম খবর, গরম খবর। কমলা খুন হয়ে যাওয়ার পর ওদের মধ্যে সব গোলমাল মিটে গিয়েছিল। হয়তো ওরা ভয় পেয়েই সব সময় একসঙ্গে থাকত।
শেষে আসানসোল থেকে ট্যালেন্ট হান্টের শো করে ফিরছিল রত্নেশ্বর সমাজপতি আর উৎপলবাবু। হাইওয়েতে ওদের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করল। স্পটেই খেল খতম!
অ্যাক্সিডেন্টটা আমিই করিয়েছিলাম।
সে দিন, যখন অ্যাক্সিডেন্ট হল খবরটা নিয়েই তখন আমি গুরুজি অসীমানন্দের বাড়িতে, ওর সামনে। আমার সামনেই উনি খবর পেলেন কমলার পরে দুজন মানে রত্নেশ্বর আর উৎপল গেছে। আমি বললাম, এবার আপনার পালা গুরুজি। আপনাকে মারার বঢ়িয়া প্ল্যান রেডি আছে আমার কাছে।
আমার কথা শুনে উনি ঢোঁক গিললেন।
আমি বললাম, গুরুজি আপনার শেষ ইচ্ছে যদি কিছু থাকে আমাকে বলতে পারেন।
গুরুজি তবু তড়পালেন, আমি পুলিশকে জানাব।
আমি বললাম, আমি এখন আবার পুলিশ। সার্ভিসে ফিরে এসেছি। বউ খুনের দায়ে সাসপেন্ড ছিলাম, বেকসুর খালাস হয়ে ফিরেছি। তাই আপনি আমাকে জানান। আপনি ফাঁসির আসামি— আপনার হ্যাং টিল ডেথ ঘোষণা হয়ে গেছে। আমি আপনার শেষ ইচ্ছে পূরণ করব কথা দিলাম। কী জানাতে চান বলুন।
গুরুজি কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, 'ক্ষমা চাইছি।'
আমি বললাম, 'গুড। আপনি শুধু কোর্টে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলেছিলেন তা ফিরিয়ে নিন।'
উনি বললেন, 'কোন কথা?'
'ওই যে আপনি বলেছিলেন না, কমলা উচ্চাভিলাষী, গায়ে-পড়া, কিন্তু কখনো বলেননি কমলা প্রতিভাময়ী! এবার একবার বলুন কমলা প্রতিভাময়ী। আমি আপনার বয়ান পুরো পড়েছি। আপনি বলুন গায়ে-পড়া, কিন্তু ওকে প্রতিভাময়ী বলুন। বলুন, ওর সঙ্গে আপনার প্রেমের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। স্বীকার করুন। বলুন, কমলা তোমাকে আমি ভুলতে পাচ্ছি না। ব্যস।'
আপনি বললেন, 'এসব কথা বলে কী হবে, ও তো নেই।'
'ও নেই তো কী হয়েছে, আমি তো আছি। আমি আপনার কথা রেকর্ড করে নিয়ে যাব। রোজ রাতে শুনব।'
আমার কথা শুনে আপনি ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, 'ধূমকেতু, আপনি আমার কথা রেকর্ড করে আমাকে ব্ল্যাকমেল করবেন।'
আমি বললাম, 'ঠিক আছে আপনিও আমাকে ব্ল্যাকমেল করবেন, আমি আপনাকে সে অস্ত্র দিচ্ছি। আমি কমলাকে কীভাবে মেরেছি তা সম্পূর্ণ বলে দেব। দোষ স্বীকার করে নেব।'
আপনি চালাক মানুষ টোপ গিললেন। বললেন, 'ঠিক আছে, আপনি আপনার কথাগুলো ভয়েস রেকর্ড করে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। আমিও আপনাকে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু তারপর আমাদের দুজনের আর কোনওদিন দেখা হবে না, আপনাকে এই কথা দিতে হবে।'
আমি রাজি। আমি বললাম, 'হোয়াটঅ্যাপস কেন গুরুজি আমরা সামনাসামনি বসে রেকর্ড করি।'
আপনি বললেন, 'আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না ধূমকেতু। আপনি আমারটা রেকর্ড করে নিয়ে রুদ্র মূর্তি ধরতে পাবেন। জোর করে নিজেরটা ডিলিট করে দিতে পারেন। আপনি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে ওটা আমি বিদেশে থাকা আরও দুজনকে ফরোয়ার্ড করে রাখব। আমার কিছু হলে তাঁরা ওটা থানায় পাঠিয়ে দেবেন। নতুবা ভদ্রলোকের চুক্তি। আপনি আপনার মতো, আমি আমার মতো।'
আমি রাজি।
রাতে আমি রেকর্ড করে পাঠালাম। যেটা পাঠালাম। সেটা উনিশশো আশি সালের একটা বধূহত্যায় ধৃত কার্তিক সামন্ত নামে এক মৃতার স্বামীর জবানবন্দি। থানায় আরও পাঁচজন পুলিশ সহকর্মীর সামনে বসে ভিডিও সহকারে রেকর্ড করলাম। গুরুজিকে পাঠালাম শুধু অডিও।
পালটা গুরুজিও পাঠালেন। কিন্তু কথাগুলো আমার তেমন পছন্দ হল না। দুদিন ছাড়া ছাড়া ওর বাড়ি যাই, যখন তখন যাই। বলি, গুরুজি আমি সব বলে দিলাম গলগল করে, আপনি চেপে চুপে একটুখানি ফুস করলেন। না, এমন হবে না। বেশি করে ওর প্রতিভার কথা বলুন। ওর গানের কথা বলুন। আপনাদের প্রেমের কথা বলুন। আমি তো গুরুজি খুনের কথা বলতে কোনও কৃপণতা করিনি, কীভাবে খুন করেছি পুরোটা বলেছি। তবে আপনি কেন বলবেন না, আমাকে ঠকাবেন?
গুরুজি আমার কথা যেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। বেশ আতান্তরে পড়ে কতটা বলবেন, কী বলবেন, রোজ মাপছেন। আমি চিৎকার চেঁচামেচি করিনি কোনওদিন, শুধু দাবি জানিয়ে এসেছি। রোজ নতুন নতুন কথা বলছেন। আমি সেগুলো রোজ গুছিয়ে রাখছি। সব যখন গোছান হল, তখন পাক্কা কুড়ি মিনিটের কথা। একদিন নিয়ে গিয়ে পুরোটা একসঙ্গে শোনালাম। উনি শুনে হাঁ। বার বার বলার চেষ্টা করলেন কিছু, কিন্তু আমি শুনলাম না। উনি স্বীকার করলেন হ্যাঁ সব কথা ওনার। উনি একবার তেড়েফুঁড়ে বলে উঠলেন আপনার সব কথাগুলো আমার কাছে আছে।
আমি তখন সত্যিটা বলে দিলাম।
বললাম, ওটা গুরুজি আমার কথা নয়। আমি রিডিং পড়েছি মাত্র। ওটা আশি সালে ঘটা একটা কেস। মালা সামন্তকে খুন করেছিল তার স্বামী কার্তিক সামন্ত। ওটা গুরুজি কার্তিক সামন্তের নিজের হাতে লেখা জবানবন্দি। আমি তখন গুরুজিকে আমার ভিডিওটা দেখালাম। ব্যস। গুরুজি কাঁপছেন। গাঢ় গলায় বললেন, 'বিশ্বাস করুন, আমি কমলাকে খুন করিনি।'
আমি বললাম, সে তো আমি জানি। আপনি খুন করেননি, আপনি খুন করাননি, ওটা আমি করেছি। আপনি আমাকে দিয়ে করিয়েছেন।
গুরুজি বললেন, 'তুমি কী চাও?'
অসীমানন্দ সেদিন নার্ভ হারিয়ে 'আপনি' ছেড়ে 'তুমি'তে নেমে এলেন।
আমি হাসলাম, 'আপনি ফাঁসির আসামি। আমি আপনার মৃত্যু চাই। এবার বলুন কীভাবে মরবেন? এই যে ঘুমের ওষুধের পাতা টপাটপ খুলে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ুন।'
উনি বললেন, 'আমি পারব না।'
আমি বললাম, 'তাহলে আপনি কাল থেকে সব গান বাজনা ছেড়ে দিন। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে নির্বাসনে থাকুন। ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলবেন না। বাইরে কোথাও যাবেন না। বাইরে গেলেই আপনার মৃত্যু। কীভাবে হবে, আপনি জানতে পারবেন না। তিনমাস আপনার শাস্তি। আমি তিন মাস জেলে ছিলাম। চার বছর সাসপেন্ড ছিলাম। আপনারও তাই। তারপর বেকসুর খালাস হয়ে বের হবেন। উনি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, 'ঠিক আছে।'
আমি বললাম, আপনার ফোন কল আমি ট্র্যাপ করব। দেখব, কারও সঙ্গে কথা বলছেন কি না? ধরা পড়লে, আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। আবার তিন মাস। বাইরের লোক এ বাড়িতে আসবে না, আপনিও কারো সঙ্গে দেখা করবেন না। উনি সব মেনে নিলেন।
আমি বললাম, কবে থেকে শুরু করবেন?
উনি বললেন, 'পরশু থেকে। কাল সবাইকে জানিয়ে দেব তিন মাস আমি নীল সরস্বতীর ব্রত নিয়েছি। কারও সংস্পর্শে আসব না।'
ঠিক আছে। সেই পরশু থেকে গুরুজি ঘরে ঢুকলেন। আর আমি একটু একটু করে প্রচার করে দিলাম, ওঁর এইডস হয়েছে। ক্রমশ কলকাতা শহরের সবাই জেনে গেল অসীমানন্দের এইডস হয়েছে। এর মধ্যে আমি মাঝে মাঝে যাই। গিয়ে একটু গল্পগুজব করি। একদিন সঙ্গে করে সোনাগাছির একটা মেয়ে নিয়ে গেলাম। বললাম, গুরুজি অনেকদিন নারী সঙ্গ করেননি, এই মেয়েটি আজ রাতে রইল।
গুরুজি চিৎকার করলেন, 'এটা নির্ঘাত তোমার কোনও চাল।'
আমি বললাম, একদম নয়। কাল সকালে এসে আমি ওকে নিয়ে যাব। সারা রাত আপনার। আপনি ফুর্তি করুন।
মেয়েটা সে রাতে থেকে গেল। গুরুজির 'না' আমি শুনলাম না।
মেয়েটা সকালে হাসতে হাসতে বলল, 'বুড়োটা লাগাবে কি? সারা রাত আমাকে দেখে ঠকঠক করে কেঁপেছে।'
দুদিন পড়ে আর একজনকে নিয়ে গেলাম। গুরুজি আগের মতো চিৎকার চেঁচামেচি করলেন, বললেন, 'তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না, এটা তোমার কোনও ফাঁদ।'
সেই মেয়েটাও সকালে হেসে কুটোপাটি হল, বলল, 'আমি সবকিছু খুলে বললাম, গুরু এসো। বুড়ো বলে কি না, তুমি আমার মা! আমাকে ছেড়ে দাও। আরে আমি বুড়োকে ধরলাম কোথায়। শেষে আপনার কথামতো ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে ল্যাংটা নাচ নাচলাম। বুড়ো কিন্তু পাথর!'
চতুর্থ দিনের দিন গুরুজি আমার নিয়ে যাওয়া একটা মেয়েকে টেনে নিল। বললেন, 'তুমি থেকে যাও। আর এভাবে একা একা থাকতে পারছি না। সবে একমাস একুশদিন। এখনও পুরো একটা মাস পরে। এখানে এভাবে থাকলে আমি মরে যাব।'
'মেয়েটা বলল, সে তো আপনি এমনিও মরে যাবেন। আপনার কাছে যতগুলো মেয়ে এসেছে সবার এইডস আছে। আপনি এখন গুনতিতে চলে এসেছেন।'
গুরুজি বললেন, 'আমি কাউকে ছুঁইনি।'
মেয়েটা বলল, 'ছুঁলে এইডস হয় না, শুলে হয়।'
'আমি কারও সঙ্গে শুইনি।'
'এই তো আমার সঙ্গে শুয়েছেন।'
'তোমার এইডস আছে?' গুরুজি আকাশ থেকে পড়লেন।
'হ্যাঁ মরার জন্য লাইন দিয়ে আছি। আপনিও তো এইডস রুগি, বাড়ির সবাই আপনাকে আলাদা করে রেখে দিয়েছে। কদিন আর, মরার আগে আনন্দ করে নিলেন।'
মেয়েটা চলে এসেছিল সকালে। তার দুদিন পরে ঘুমের ওষুধগুলো সব খেয়ে নিয়েছিলেন অসীমানন্দ। একটা মেয়েরও এইডস ছিল না, বুড়ো ঢ্যামনাটা ভয়ে লজ্জায় মৃত্যু বেছে নিল। পাপ বিদায় হল।
আমার সব কাজ শেষ। কমলা এবং তিনজন। পর পর। বেশ ভালো ছিলাম। কিন্তু তখনই এই মেয়েটা এসে জুটল। ওর নাম মুনিয়া।
মেয়েটা একদিন সাতসকালে আমার বাড়ি চলে এল। এসে বলল, 'আমার নাম মুনিয়া।'
'আপনি কাকে চাইছেন?'
'তোমাকে।'
'আমাকে? আমি কে জানেন?'
'তুমি ধূমকেতু রাহা। চারটে মার্ডার করেছ। ঠান্ডা মাথায়। তোমার সার্ভিসের সব লোকজনই জানে। কেউ বলে ঠিক করেছে। কেউ বলে আইন হাতে নেবে কেন? কিন্তু আইন তোমার টিকি ছুঁতে পারেনি। পারফেক্ট প্ল্যান। তুমি সেই ধূমকেতু রাহা। এখন দরজা থেকে সরো, আমি ভিতরে যাব।'
আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম, মেয়েটাকে কে পাঠাল? কার ছক? বুঝলাম, নতুন খেলা শুরু হল। দেখাই যাক। কত খেলাই তো সারা জীবনে খেললাম, আর একটা নয় শুরু হল। দেখাই যাক না— খেলা শুরু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।