সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ট্রেন থেকে নেমে শ্রান্ত পায়ে হাঁটছিল অহনা। কলকাতা গেলে সারাদিন এত ধকল যায়, ফিরতিপথে শরীর যেন আর চলতেই চায় না। বিশ্রী একটা হাঁপ ধরে বুকে, মাত্র এই আটত্রিশ বছর বয়সেই। তারপর ক’দিন ধরে যা গরম! জৈষ্ঠ্যের এই রুটিসেঁকা তাতে প্রাণশক্তি তো এমনিই নিঃশেষ।
কলকাতার কাজটাজগুলো ঠিকঠাক মতো হলে তাও সান্ত্বনা থাকত খানিকটা। তা সে গুড়েও তো বালি। রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্কের সদর দপ্তরের যে অফিসারটির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া, তিনি আজ ডুব। অফিসের অন্য কোনও কর্মচারীও হয়তো সমস্যাটার সমাধান করতে পারত, কেউই তেমন গা দেখাল না। এ ওকে আঙুল দেখায়, ও একে। সরকারি অফিসের তো এটাই রেওয়াজ। অগত্যা চলো অন্য কাজে, অফিসপাড়া ছেড়ে থিয়েটার রোডে। পুনের সোলারিস কোম্পানির পূর্বাঞ্চল শাখায়। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কয়েকটা নতুন ডিজাইনের প্যানেল দেখানোর কথা ছিল আজ। কপাল খারাপ থাকলে যা হয়, এখনও নাকি নমুনাই এসে পৌঁছোয়নি। মিলল খালি একটি তথ্যজ্ঞাপক পুস্তিকা যা নাকি ইন্টারনেট থেকেই ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। অর্থাৎ পুরো পরিশ্রমটাই বৃথা, অহনার আজ দিনটাই বরবাদ। কোনও মানে হয়?
অহনার ঠোঁটে একচিলতে কষ্টের হাসি ফুটে উঠেও মিলিয়ে গেল। প্রতিটি পরিশ্রমই যার কাছে পণ্ডশ্রম, বেঁচে থাকাটাই যার নিছক সময়ের অপব্যবহার বলে মনে হয়, একটা নিষ্ফলা দিনে তার কীই বা যায় আসে?
প্ল্যাটফর্মে সার সার সেলুন। সবে বৈকালিক ঝাঁপ খুলছে একে একে। মফস্সলের এক স্টেশন চত্বরে কেন যে এত চুল কাটার জায়গা কে জানে! টিয়াডাঙায় ডেরা বাঁধার পর প্রথম প্রথম উঁকি দিত প্রশ্নটা, এখন অহনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। জীবনের বড় বড় প্রশ্নগুলোরই তো উত্তর মেলেনি, এই অকিঞ্চিত্কর কৌতূহলের জবাব খোঁজার কী প্রয়োজন। বরং মনটাকে প্রশ্নবিহীন করে রাখতে পারলে বোদা বোদা ভাবটায় স্বস্তি তো মেলে যা হোক।
সেলুনের সারি পেরিয়ে, টিকিট কাউন্টারের পাশ কাটিয়ে অহনা প্ল্যাটফর্মের বাইরে এল। স্টেশনের লাগোয়া রামুর গ্যারেজ, নিত্যযাত্রীদের দ্বিচক্রযানে বোঝাই। পয়সা মিটিয়ে নিজের মোপেডখানা সেখান থেকে নিল অহনা। অন্য দিন পাহারাদার ছেলেটার সঙ্গে হাবিজাবি কথা বলে দু’-চারটে, আজ ইচ্ছে করছে না। ব্যাটারিচালিত বাহনটি নিয়ে সটান রাস্তায়। স্টার্ট দিয়েছে।
সামনেই টিয়াডাঙার পাইকারি বাজার। মরশুমি সবজির। হরেনবাবুর আড়তে প্রকাণ্ড পাল্লায় ঝিঙে-পটল ঢেঁড়শের স্তূপ। উঠছে, নামছে, ঝপাঝপ বস্তাবন্দি হচ্ছে খেতের ফসল, ট্রেনে-ট্রাকে-ভ্যানে-অটোয় বোঝাই হয়ে পাড়ি দেবে কাছাকাছি বাজারে। দূর-দূরান্তরেও। টিয়াডাঙার ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চিরে ধীর গতিতে এগোচ্ছে অহনার দুধসাদা মোপেড। দু’পাশে দোকানের পর দোকান, কেউ বা নিজের নিয়মে ব্যস্ত, কেউ বা অলস আড়মোড়া ভাঙছে। এখনও শিবানী ফার্মেসি খোলেনি, আজ শুক্রবার বোধহয় একবেলা বন্ধ, বাইরেটায় চাটাই পেতে তাসে মগ্ন প্রবীণের দল। অল্পবয়সি ছেলে-ছোকরারা আড্ডা মারছে উচ্চকিতে, ছোট ছোট জটলায়। বড্ড পরিচিত দৃশ্য, বড় একঘেয়ে।
জমজমাট জনপদটা অতিক্রম করে এসে অহনা একটা আলগা শ্বাস ফেলল। তার নিজের জীবনই বা কী এমন বৈচিত্র্যময়। ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে শুতে যাওয়া, সবটাই কি ছকে বাঁধা নয়? শুধুই তো গোটাকতক রুটিনমাফিক কাজ, যা সে করে চলেছে গত সাড়ে পাঁচ বছর। মাঝেমধ্যে কোনও উত্তেজনার কারণ ঘটে হয়তো, তবে সেও তো ছকেরই অঙ্গ। সমিতির মেয়েদের সমস্যার অন্ত নেই, নানান ঝঞ্ঝাটের সাতকাহন তারা শোনায় বটে, কিন্তু তার মধ্যেও কোনও বৈচিত্র্য আছে কি? একই কাহিনি যেন আলাদা আলাদা মুখ থেকে শোনা! আচমকা চিন্তায় ছেদ। সর্বনাশ, শেফালিদেবীর প্রেশারের ট্যাবলেটটা তো ভুলে মেরে দিচ্ছিল প্রায়! একবার শুধু জানিয়ে দিয়েছে ওষুধ শেষ, এখন সারাক্ষণ শুধু তক্কে তক্কে থাকবে মা। অহনা না নিয়ে গেলে খুশিই হবে সম্ভবত। উদাস মুখে বাক্যবাণ ভাসিয়ে দেওয়ার অপ্রাকৃত সুখটুকু মিলবে যে!
কী আশ্চর্য মানসিকতা! যে মেয়েকে ছাড়া শেফালিদেবীর চলবে না, সেই মেয়েকেই কিনা হেনস্তা করবেন প্রতি পদে? চটেমটে অহনা যদি দুটো কড়া কথা শুনিয়েই ফেলে, আর রক্ষে আছে? এমন একটা আচরণ করবেন, যেন টিয়াডাঙায় এনে তাঁর উপরে চরম অত্যাচার চালাচ্ছে অহনা! শুধু তাই নয়, মেয়ের সঙ্গী হয়ে টিয়াডাঙায় বসবাস করে তিনি যে হতভাগিনী দুঃখিনী অহনার লাগাতার উপকার করে চলেছেন এবং করতেই থাকবেন, এটিও স্মরণ করাতে ভোলেন না কখনও।
অথচ সত্যিটা হল এই যে, অহনা খুব একটা চায়নি মা তার লেজে লেজে টিয়াডাঙায় আসুক। ভেবেছিল, এখানে সে একা থাকবে, একা একাই নাড়াচাড়া করবে তার ঘেঁটে যাওয়া অতীত, একা একাই সাজাবে ধূসর ভবিষ্যৎ। এবং যে কাজটা সবচেয়ে বেশি জরুরি, মুখোমুখি হবে নিজের। কোনওটাই যে সে ঠিকমতো করে উঠতে পারল না, সে তো ওই শেফালিদেবীর কারণেই।
ব্রেক চেপে থামল অহনা। মোপেড সাইড করে ঢুকেছে পপুলার ড্রাগ হাউসে। দোকানটার স্টক ভাল, পাঁচ থেকে দশ পারসেন্ট ডিসকাউন্ট দেয়, এখান থেকেই সে ওষুধ নেয় সাধারণত।
“কাউন্টারের টাকমাথা লোকটি একগাল হেসে বলল, দিদি বুঝি ফিরছেন?”
“হুঁ।...প্রেশারের ওষুধটা দেবেন তো। তিন পাতা।”
তাক থেকে বাক্স নামাল লোকটা। ডালা খুলে হাতড়াতে হাতড়াতে বলল, “এ মাসে ঘুমের ট্যাবলেট তো নিলেন না দিদি?”
অহনা বলতে পারত গত মাসে বেশি করে নিয়েছিল, এখনও ফুরোয়নি। জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। ঢাউস ব্যাগ খুলে টাকা বের করছে।
লোকটা ফের বলল, “কলকাতা গিয়েছিলেন বুঝি?’’
অহেতুক কৌতূহল। অহনা তো এখানে নতুন নয়, সে কী করে, না করে তাও জানে সব্বাই, নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াতও লোকচক্ষুর অগোচরে ঘটে না, তবু যে কেন এই গায়ে পড়ে খাজুরা? নাকি তাদের মা-মেয়ের টিয়াডাঙায় এসে বসবাসের মধ্যে এখনও রহস্যের গন্ধ রয়ে গেছে?
লোকটার প্রশ্নমালা শেষ হয়নি, আবার বলল, “আজ নাকি শিয়ালদার কাছে কী সব গোলমাল হয়েছে? দুপুরে টিভিতে দেখাচ্ছিল... পুলিশ নাকি লাঠি চালিয়েছে...?’’
তাই কি মৌলালির মোড়টায় একটা ভিড়মতো ছিল। রাজনৈতিক কোনও বখেড়া? হবে বা। রাজনীতির যা চেহারা হয়েছে এখন, ও নিয়ে ভাবতেও গা গুলোয়।
প্রসঙ্গটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে দু’খানা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল অহনা। নীরস স্বরে বলল, “কত হল দেখুন।’’
“হ্যাঁ, এই তো...।’’ টাকাটা নিল লোকটা। হিসেব করে বাকি পয়সা ফেরত দিতে দিতে বলল, “আপনার গাড়িখানা কিন্তু খাসা হয়েছে দিদি। ধোঁয়া নেই, ভটভট শব্দ করে না, শাঁ শাঁ নাই ছুটুক, দিব্যি ফুরফুর যাচ্ছে...”
অহনা ব্যাগের চেন লাগাচ্ছিল। অস্ফুটে বলল, “হুঁ।’’
“একটা কথা বলি দিদি?”
ওফ, এখনও একটা কথা ফুরোয়নি! মানুষ কেন যে বোঝে না, কখন থামতে হয়?
অহনা চোখ তুলে তাকাতেই লোকটা বলল, “আপনি মাঝে একটা সাইকেল নিয়ে ঘুরতেন, কেমন চোখে লাগত। এই বাহনটি কিন্তু বেশ, আপনাকে ভারী মানাচ্ছে।”
শুনতে মন্দ লাগল না অহনার। মনে মনে হাসলও একটু। সাইকেল কি সে অকারণে চাপত? মোপেড না কিনলে আর চলছিল না বলেই তো সেই আসানসোলের বালিকা বয়সে সাইকেল চালানোর অভ্যেসটা ক’দিন ঝালিয়ে নিচ্ছিল অহনা। তবে এই আধবুড়ি বয়সে সাইকেল আরোহিণী হিসাবে সে মোটেই তেমন দৃষ্টিলোভন নয়, এটা শুনে মোটেই প্রীত হল না।
অহনা কেঠো স্বরে বলল, “মানাক, না মানাক, আমার তো কাজের জন্য কেনা।”
“সে তো বটেই দিদি। আপনার তো আমাদের মতো এক জায়গায় বসে দাঁড়িয়ে কাজ নয়। অবিরাম চক্কর কাটছেন। আজ সাঁঝের হাট ছুটছেন, তো কাল মাজুলি...।” লোকটার কপালে এবার মৃদু কুঞ্চন, “তা ব্যাটারি কেমন খাচ্ছে দিদি?”
“কোম্পানি তো বলেছে তিন বছর যাবে। তার বেশি চললে কপাল।”
“ওইটাই আসল কথা দিদি। কপাল। কার যে কী আয়ু নির্দিষ্ট করা আছে কে জানে।”
লোকটা বড্ড বেশি বকছে তো? এক্ষুনি হয়তো গেঁয়ো দার্শনিক বুলি আওড়ানো শুরু করে দেবে। অহনারই বা কী আক্কেল, তালে তাল দিয়ে সে বকবক করছে কেন?
তাড়াতাড়ি দোকান ছেড়ে মোপেডে ফিরল অহনা। পুচকে খোপ থেকে বের করেছে হেলমেট। স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা রাস্তা মোটামুটি মসৃণ, তবে রাজ্য সড়কে পড়লে শিরস্ত্রাণের প্রয়োজন হবে।
অহনা সওয়ার হয়েছে মোপেডে, হঠাৎ লোকটা বেরিয়ে এল দোকান ছেড়ে। লজ্জা লজ্জা মুখে বলল, “দিদি, একটা দরকারি কথা আপনাকে জানাতে ভুলে গেছি।”
অহনা বিরক্তি চেপে বলল, “আবার কী হল?”
“আপনাকে একজন খুঁজছিল।”
“আমাকে?” অহনা ভুরু কোঁচকাল, “কে? কেন?”
“তা তো জানি না। দীপু-বাপি-সান্টুরা দাঁড়িয়েছিল... ওদের জিজ্ঞেস করছিল আপনার বাড়িটা কোথায়... কতদূরে... কীভাবে যেতে হয়...”
“অ। কখন?”
“এই তো...পাঁচটা নাগাদ। আমি সবে তখন দোকান খুলছি।”
“কোনও মেয়ে?”
“না দিদি। ইয়ং ম্যান। হাট্টাকাট্টা। পিঠে মোটা ব্যাগ। ওই যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা যেমনটা নিয়ে ঘোরে...”
কিঞ্চিৎ অবাকই হল অহনা। সমিতির কাজে তার কাছে হরবখত লোক আসে বটে, কিন্তু পিঠে রুকস্যাক চাপিয়ে...? সুশোভন স্যার পরশু বলছিলেন, কোনও একটা খবরের কাগজ নাকি অহনার সমিতির কাজকর্ম নিয়ে স্টোরি করতে চায়। আপত্তি ছিল অহনার, তার ছোট্ট সমিতির অতি সামান্য কাজকম্মো নিয়ে গপ্পো ফাঁদায় সে বরাবরই অনাগ্রহী, কিন্তু সুশোভন স্যারের নিশ্ছিদ্র যুক্তিজালের সামনে পড়লে অহনার অনিচ্ছে যে কুটোর মতো ভেসে যাবে এও তো অবধারিত। পরে অবশ্য অহনার মনে হয়েছে, তার আশাবরীর একটু-আধটু প্রচার হওয়া মন্দ নয়, প্রচারের আলো থাকলে সরকারি দফতরে অপরিচিতির লক্ষণরেখা পেরোতে তো সুবিধা হয়।
তা তারাই কেউ হানা দিল নাকি? ক্যামেরা ট্যামেরা সহ? কিন্তু তারা বিকেলে আসবে কেন? সদা ব্যস্তবাগীশ সুশোভন স্যার যতই বেখেয়ালি মানুষ হন না কেন, নিশ্চয় অহনার মোবাইল নম্বর তাদের দেবেন এবং তারাও আগে অ্যাপয়ন্টমেন্ট করে তবেই না লোক পাঠাবে?
তা হলে আর কে হতে পারে? স্যারের ছাত্রটাত্র কেউ? ডাটা কালেকশনে এসেছে? উঁহু, তা হলেও তো স্যার একটা ফোন করতেন। তা ছাড়া, তারাই বা এই অবেলায়, বিনা নোটিশে, কেন হাজির হবে? একমাত্র সেই মানুষটাই আচমকা এভাবে আসে...
ভাবনাকে বেশি গড়াতে দিলেই মুশকিল। চলতে থাকবে, বইতে থাকবে, অনন্ত ধারায় বিভাজিত হয়ে ঢুকে পড়বে অচেনা অপ্রিয় খাতে। বালি সরিয়ে তুলে আনবে এমন সব স্মৃতি, যেগুলো মগজের খোপে মরে গেলেই স্বস্তি পায় অহনা।
সুইচ টিপে অহনা চালু করল মোপেড। এবার ধীরে ধীরে ক্ষীণ হচ্ছে লোকালয়। ঈশানবাবুর বড় কাঠগোলা ছাড়িয়ে সামান্য বাঁয়ে হেলেছে পিচঢালা পথ, বটতলার তেমাথায় পৌঁছে ঘুরতে হবে ডাইনে। রাস্তা বলে আর প্রায় কিছুই থাকবে না তখন। এককালে হয়তো ইট পড়েছিল, এখন ভেঙেচুরে একশা। এমন এবড়োখেবড়ো ভাবেই চলে গেছে সেই গঙ্গায়। আলাইপুর ঘাটে।
বিকেল মরে আসছে ক্রমশ। দেখেশুনে সামনে-সুমলে এগোচ্ছিল অহনা। টাল খেতে খেতে। তবে নিয়মিত সাইকেল মোপেড চালিয়ে চালিয়ে তার হাত এখন মোটামুটি পোক্ত। একটু সমতল পেলেই তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে সামনের আকাশে, প্রায় অভ্যাসের মতোই দেখছে বিশ্বচরাচর। পশ্চিম দিগন্তে আজ অল্প অল্প মেঘ। জলহীন। শেষ সূর্যের রশ্মি মেখে গাঢ় রক্তিম। বিষণ্ণ এক আলো ছড়িয়ে আছে দু’ধারের মাঠে, ছুঁয়েছে দূরের গাছ-গাছালিকে। দেখে মনে হয়, পাতলা রংজ্বলা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কেউ। বিস্তীর্ণ ভূমি বিচ্ছিরি রকমের ন্যাড়া এখন। বোরো ধান শেষ, আউশ রোয়া হয়নি, এ যেন এক বিচিত্র বন্ধ্যা সময়। তৃষ্ণার্ত মাটি এখন বর্ষণের প্রতীক্ষায়।
ছোট্ট একটা কালভার্ট পার হল অহনার মোপেড। খানিকটা ঢাল বেয়ে নেমে অল্প একটু চড়াই। তার পরেই আলাইপুর মৌজা শুরু। বেশ বড় গ্রাম, স্থানীয় লোকরা এদিকটাকে বলে পূর্ব আলাইপুর। গোড়াতেই ডাইনে পর পর কয়েকটা দোকান। মুদিখানা, চা-তেলেভাজার ঠেক, জীবনবাবুর স্টেশনারি শপ। মোবাইল কোম্পানির ঝকঝকে সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে দোকান আর মালিকের নাম। বাড়িঘরও চলছে দু’পাশে। পাকা বাড়িই বেশি, কাঁচাও আছে মাঝে মাঝে। একটা দোতলা বাড়ির দেওয়ালে শ্যামাঙ্গিনী ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের অতিকায় সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপিত হচ্ছে সততা, নির্ভরতা। বাড়িগুলোর পেছন ভাগে ছোট বড় সবজির খেত। পটল, ঝিঙে, শসা, কাঁচালঙ্কা...। নদীর ধারের ইটভাটায় দিনের কাজ ফুরোল, দলবেঁধে ফিরছে মেয়েরা। কলকল করতে করতে লুটিয়ে পড়ছে অকারণ হাসিতে। নিম-শিমুল-আম-কাঁঠালের ডালে আঁধার ঘনিয়ে এল।
এইসব মেয়ে বউদের দেখে অহনার ভারী অদ্ভুত লাগে। এদের প্রত্যেকের জীবনকাহিনি প্রায় এক, সেখানে আনন্দের খোরাক নেই বললেই চলে। ঘরে অকম্মা বর, গাদাখানেক এন্ডিগেন্ডি, ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই জুতে যায় হাড়ভাঙা খাটুনিতে, ইটভাটার মালিকও মজুরিতে দেদার ঠকায়, বাড়তি কিছু লোভের ইশারাও চলে অবিরাম। এক্ষুনি বাড়ি ঢোকামাত্র সংসারের ফাঁসকল চেপে বসবে গলায়, তবু যে এত পুলক আসে কোত্থেকে? অশিক্ষা, অজ্ঞতা কি দুঃখবোধকে ভোঁতা করে দেয়?
কিন্তু অহনার শিক্ষাদীক্ষা কি তীক্ষ্নতর বিষাদ সঞ্চার করে কোনও মুক্তি দিতে পেরেছে? অহর্নিশ জ্বালাপোড়া আর সেভাবে নেই হয়তো, কিন্তু আনন্দের জন্মদাতা কোষগুলো যে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে, এতে তো কোনও সন্দেহ নেই? সুতরাং নিজেকে ওই সরল মেয়েগুলোর তুলনায় উচ্চতর কিছু ভাবাটা কি নেহাতই মনকে চোখ ঠারা নয়?
অহনার মোপেডকে ভারী সম্মান করে মেয়েগুলো। আরোহিণীকেও। রঙ্গ তামাশা থামিয়ে সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দাঁড়িয়েছে। আবছা হাসি বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে দলটাকে পেরোল অহনা। বাহনের গতি সামান্য বাড়িয়েছে। শ’খানেক মিটারও এগোতে পারল না, থামতে হয়েছে অচিরেই। গোটা রাস্তা জুড়ে ইট বোঝাই লরি আসছে। পাশ দেওয়ার জায়গা নেই, মোপেড টেনে নামাতে হল প্রান্তে। লরি চলে যেতেই চতুর্দিকে ধুলোর ঝড়। অহনাও ধুলোয় মাখামাখি।
বিরক্ত মুখে হেলমেট খুলল অহনা। আঁটোসাঁটো জড়ানো দোপাট্টার খুঁটে মুছল ঘাড়গলা। কামিজ থেকে ঝাড়ছে ধুলোর আস্তরণ।
তখনই সামনে এক সাইকেল। চেনা মুখ, বিশ্বজিৎ। আলাইপুরেই বাড়ি, বছর কুড়ি-বাইশ বয়স, রানাঘাট কলেজে বি এ পড়ছে। কথাবার্তায় উদ্ধত নয়, বরং বেশ নম্রই। সম্ভবত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্রব নেই বলেই সভ্যতা ভব্যতার সাধারণ বোধগুলো হারায়নি এখনও।
সিট থেকে নামল বিশ্বজিৎ। ঈষৎ কুণ্ঠিত স্বরে বলল, “লরির জ্বালায় রাস্তা চলা দায়।”
“কী আর করা।” অহনা হালকা ভাবে বলল, “তোমরা তো রাস্তাঘাট সারাবে না।”
“আমরা কি রাস্তা সারানোর মালিক, দিদি? যারা কাজকর্ম করায়, তারা নিজেদের সময় মতো লোক লাগাবে। ক’টা দিন যাক... এই বর্ষার মুখে আবার ইট ফেলবে।”
“যাতে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়?”
“সবই তো বোঝেন দিদি। ধুয়ে না গেলে সামনের বছর ঠিকাদার বরাত পাবে কোত্থেকে?”
আর সে বরাত না পেলে পার্টির দাদাদের পেট ভরাবে কে? বলতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করল অহনা। বিশ্বজিৎ ছেলে যেমনই হোক, তার সামনে বেশি প্রগল্ভ হওয়া কি অহনার সাজে? বিশেষত রাজনীতির লোকজনদের সম্পর্কে মন্তব্য না করাই ভাল। অনেক কাল পরে সরকার বদলেছে, কিন্তু যারা এসেছে তারাও আগের দাদাদের থেকে আলাদা কিছু নয়। আগে একাধিকবার তার সঙ্গে স্থানীয় নেতার আমচা-চামচাদের ঠোকাঠুকি লাগার উপক্রম হয়েছে, কোনওভাবে সামাল দিয়েছে অহনা, নতুন করে ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে পড়ার তার কোনও বাসনা নেই। নিজের কাজটুকু তার গড়িয়ে গড়িয়ে চলুক, তা হলেই যথেষ্ট।
অহনা আলগা ভাবে বলল, “তোমার পরীক্ষা চুকল?”
“এই তো সবে...।” বিশ্বজিৎ সাইকেল টেনে রাস্তার পাশটিতে এল। খানিক সংকুচিত স্বরে বলল, “আপনার সঙ্গে একটা দরকার ছিল দিদি। বাবাও হয়তো আপনাকে বলবে...।”
অহনার ভুরুতে প্রশ্নচিহ্ন।
আমতা আমতা করে বিশ্বজিৎ বলল, “শুনেছেন নিশ্চয়ই মেজদি শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছে?”
আশাবরীতে কাজ করতে আসা মেয়েদের কল্যাণে আলাইপুরের কোনও গৃহেরই ভালমন্দ সমাচার অহনার অবিদিত থাকে না। কাল না পরশু কবে যেন পুব পাড়ার নীতা বলছিল খবরটা। অভ্যাস মতোই সেভাবে কানে তোলেনি অহনা। আজও খুব একটা উত্সাহ দেখাল না। দায়সারা ভঙ্গিতে বলল, “তাই বুঝি। কেন?”
“সে অনেক ব্যাপার দিদি। বিয়ের পর থেকেই টাকার জন্য মেজদির ওপর খুব চাপ দিচ্ছিল জামাইবাবু। বাবা দফায় দফায় কিছু জুগিয়েছে। এখন জামাইবাবু টু হুইলারের ডিলারশিপ নেবে বলে খেপেছে। বেশ কয়েক লাখ টাকার ধাক্কা। ওই খাঁই মেটানো কি আমার বাবার পক্ষে সম্ভব, বলুন? মেজদির ওপর তাই ওরা ভীষণ টর্চার শুরু করেছিল। বাধ্য হয়ে মেজদি...”
“তোমার মেজদির তো দুটো বাচ্চা, তাই না?”
“দুটোই মেয়ে। ওই কারণেই তো শাশুড়িটা মেজদির ওপর আরও চটা। ছোটটা এবার ক্লাস ফোরে উঠেছে, আর বড়টা নাইন। তাদের পড়াশুনোরও তো এখন দফারফা হওয়ার জোগাড়। কীভাবে ওদের মানুষ করবে সেই চিন্তাতেই তো মেজদির পাগল পাগল দশা।”
“শ্বশুরবাড়ি আর ফিরবে না?”
“এবার গেলে মেজদিকে ওরা মেরে ফেলবে। যা একখানা চশমখোর ফ্যামিলি, বাব্বাহ্। মা বাপ ছেলে সকলেই টাকার পিশাচ।”
বিয়ে দেওয়ার আগে কি কিছুই টের পাওনি? প্রশ্নটা জিভে এলেও গিলে নিল অহনা। নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে ভেবেই তো বাবা মা সর্বস্ব পণ করে বিয়ে দেয় মেয়ের। পরে কী ঘটবে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি কী রূপ দেখাবে, তা কি অগ্রিম অনুমান করা সম্ভব? উচ্চশিক্ষিত, সজ্জন বলে পরিচিত পরিবারের মানুষরাও একেক সময়ে যা ভেলকি দেখান! আপাদমস্তক সভ্য মানুষটাই কেমন যেন আজব একখানা মূর্তিতে পরিণত হয় তখন। অচেনা সেই রূপ তো এখনও অহনার দুঃস্বপ্ন।
ফুসফুসে অনেকটা বাতাস টেনে অহনা বলল, “বুঝলাম। তা আমাকে কী করতে হবে?”
“আপনার তো অনেক চেনাজানা। দেখুন না মেজদিটার যদি একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন।”
“কীভাবে?”
“বাবা বলছিল, আশপাশের কয়েকটা ব্লকে নাকি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী নেওয়া হবে। মেজদি তো হায়ার সেকেন্ডারি পাশ, যদি কোনওভাবে মেজদিকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়...”
অহনা অস্বস্তিবোধ করল। টুকুন থেমে থেকে কেজো সুরে বলল, “দ্যাখো বিশ্বজিৎ, এইসব চাকরি কীভাবে হয় তুমি ভাল মতোই জানো। এও জানো, আমি কোনও দলবাজিতে নেই। সুতরাং আমার রিকোয়েস্ট কেউ রাখবেও না, আমিও কাউকে বলে মুখ নষ্ট করতে পারব না।”
চুপ হয়ে একটু ভাবল বিশ্বজিৎ। তারপর বলল, “আপনার আশাবরীতেও তো অনেক মেয়ে কাজ করে দিদি। যদি সেখানেও কিছু হয়...”
“তুমি তো দেখেছ, আমরা কী তৈরি করি। সোলার টর্চ, এমার্জেন্সি লাইট... এসব বানানো তো জানতে হয়, শিখতে হয়...। তা ছাড়া এক্ষুনি নতুন মেয়ে নেওয়ার মতো আমার অবস্থাও নেই। বুঝতেই তো পারো, আশাবরী আর পাঁচটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়... আমাদের রিসোর্স লিমিটেড...” বলতে বলতে অহনা থমকাল। বেশ টের পেল ভাষণটা বৃথা যাচ্ছে, মোটেই প্রীত হচ্ছে না ছেলেটা। পাছে ফের ঘ্যানঘ্যানানি শুরু করে, অহনা গলা নামিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তোমার মেজদিকে পাঠিয়ে দিয়ো। দেখি কী করতে পারি।”
বিশ্বজিতের মুখখানা বেশ উজ্জ্বল দেখাল, “কবে যেতে বলব?”
“যেদিন খুশি। তবে সকালে নয়, দুপুরের দিকে।”
“থ্যাঙ্ক ইউ দিদি। মেজদিটার একটা হিল্লে হলে মা বাবার একটু টেনশন কমে।” বিশ্বজিৎ সাইকেলের প্যাডেলে পা ছোঁয়াল।
হঠাৎ কী মনে পড়ে গেছে বিশ্বজিতের। বলে উঠল, “ও হ্যাঁ দিদি, আপনার বাড়িতে কে যেন এসেছে।”
“শুনছিলাম বটে।” অহনার ভুরুতে ভাঁজ, “কে বলো তো?”
“চিনি না দিদি। আগে কখনও দেখিনি। জিন্স টি-শার্ট পরা, মাথাভরতি কোঁকড়া চুল, পায়ে স্নিকার। বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে ঘাট অবধি চলে গিয়েছিল। আমিই ডেকে দেখিয়ে দিলাম।”
পলকের জন্য অহনার মনে হল, জয় নয় তো? সুগতর মামাতো ভাই? মাঝে একদিন দেখা হয়েছিল জয়ের সঙ্গে। মাল ডেলিভারি দিতে গিয়ে। কলকাতার বাগড়ি মার্কেটে। অহনা এখন থাকে কোথায়, কী করছে, জিজ্ঞেস করছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। যা খ্যাপা ধরনের ছেলে, দুম করে চলেও আসতে পারে। কিন্তু জয়ের চুল তো কোঁকড়া নয়। তবে? যাক গে যাক, পৌঁছে বোঝা যাবে।
ছায়া ছায়া অন্ধকারে বাকি পথটুকু পেরোল অহনা। বেঁটে পাঁচিল ঘেরা কম্পাউন্ডটার কাছে এসে মোপেড থামাতেই কানে এল এক অপরিচিত কণ্ঠস্বর। গলাটা বেশ গমগমে, বাড়ি কাঁপিয়ে হেসেও উঠল আচমকা।
বিস্ময় বাড়ছিল অহনার। বিস্ময়বোধ ভোঁতা হয়ে গেছে বহুকাল, তবুও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন