শ্যামদাস দে

মধুমতী আজ একটি হারিয়ে-যাওয়া অতীত। যে অতীতের দৈর্ঘ্য পঞ্জিকা দিয়ে মাপা যাবে না। পঞ্জিকার হিসেবে উনিশ-শ সাতচল্লিশ থেকে সাতষট্টি আর ক'টা দিন? মহাকালের খাতায় একটা বৎসর তো মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু আমার মনের খাতায় মধুমতী আজ বহুযুগের ওপারে। সেই বহুযুগের ওপার থেকে দূর অতীত আজ কথা কয়ে উঠল এক ভিখারীর কণ্ঠে।
রাস্তা দিয়ে আপন মনে একতারা বাজিয়ে গান গাইছিল লোকটা। চমকে উঠলাম গানের শেষ দুটো লাইন শুনেঃ
মধুর রসে টলোমলো হায় রে মধুমতী
তোরে ছাইড়্যা পরান কান্দে পতি-বিহন সতী।
আমার মনও বলে উঠল, 'হায় রে মধুমতী!' ওই মধুমতীর পাড়ে যে আমিও হারিয়ে এসেছি আমার জীবনের অনেক গুলি গ্রীষ্ম-বর্ষা--শরৎ-হেমন্ত-শীত-বসন্ত।
পড়ে রইল সব জরুরি কাজ। চোখের সামনে ভেসে উঠল কাকচক্ষুজল চৈত্রের মধুমতীর অপরূপ মায়াময় ছবিটা।
তপ্ত গ্রীষ্মের দুপুরে ঘাটে ঘাটে স্নান করতে নেমেছে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা, গ্রামের বধূরা, পাড়ার জোয়ানরা, বুড়ো বুড়িরা। 'মধুর রসে টলোমলো' স্নিগ্ধ-শীতল গন্ধে নেমে সহজে আর উঠতে চায় না কেউ। স্নান করতে করতেই গল্প-হাসি মস্করা হচ্ছে। বাচ্চারা জলে ছুটোছুটি করছে। মাঝে মাঝে এক এক গণ্ডুষ জলও খেয়ে নিচ্ছে। ভারি মিঠে জল যে।
কেবল তো মানুষ নয়, গ্রীষ্মের মধুমতীতে স্নান করতে নামে ক্লান্ত কুকুর, তৃষ্ণার্ত পাখি, আর সারা গাঁয়ের সমস্ত গরু ছাগল। কিন্তু সবচেয়ে মজার স্নান হল শালিখ পাখির। ওরা জলে নামে জোড়ে জোড়ে। তারপর পাখা ঝাপটে এ ওর গায়ে জল ছিটিয়ে দেবে। তখন ওদের কী খুশির কিচির-মিচির। স্নান সেরে গিয়ে বসবে কোনো গাছের ডালে। তারপর কিছুক্ষণ চলবে পাখা ঝাপটান। ওই হল ওদের গা মোছা। স্নান করেছে, গা মুছতে হবে না!
অর্ধশতাব্দী আগের এক গ্রামের ছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মধুমতীর নয়া চরের উপর একটা নয়া বসত। নয়া চর মানে অবশ্য একেবারে হালের নয়। এ চরের বয়সও প্রায় পঞ্চাশ বছর হল বৈকি। মধুমতীর এই নয়া বসতটার নাম গোবরার চর। আসল গোবরা গ্রাম অতি প্রাচীন গ্রাম। সাবেক মধুমতী তার শয্যা বদল করে অনেক পশ্চিমে চলে এসেছে। পুব পারে বিশাল চর। এ চরের এক এক জায়গার এক এক নাম। গোবরার চরের উত্তরে মানিকদার চর। দক্ষিণে বিশাল চরটার নাম গিরিশনগর। জমিদার গিরিশবাবুর নামেই চরের নাম। সাবেক মধুমতীর শয্যাটা এখন সবুজ মাঠ। এখনও সে মাঠের নাম ছোট গাঙ। ছোট গাঙের পুব পাড় বরাবর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঁচা রাস্তা। উত্তরে গোপালগঞ্জ থেকে দক্ষিণে গিরিশনগর পর্যন্ত বরাবর একটানা প্রায় ছয় মাইল রাস্তা। এই রাস্তার পুব দিকে গোবরা গ্রাম।
গোবরার আদি বাসিন্দে হল জেলে আর মুসলমান। কয়েক ঘর ধোপা-নাপিত, কামার-কুমোর জোলাও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
নয়া চরের মাঝখানে কায়েত পাড়া। উত্তরে হাটখোলা ছাড়িয়ে কয়েক ঘর মুচি আর দক্ষিণ দিকটায় কাপালীপাড়া আর বুনোপাড়া।
কায়েতপাড়ার মধ্যে আম কাঁঠালের বাগান ঘেরা সবচেয়ে বড় বাড়িখানা শ্রীনাথ পণ্ডিতের। শ্রীনাথ পণ্ডিত আজকের মানুষ নন। সেই মহারানীর রাজত্বকালের লোক। আঠারো বছর বয়সে বাংলা ছাত্রবৃত্তি পাশ করে পাঠশালার পণ্ডিতি শুরু করেছিলেন। আজ তাঁর বয়স সত্তরের কোঠায়। আজও পাকা বাঁশের মতো শক্ত সমর্থ। আজও পণ্ডিতি করছেন তিনি পূর্ব গোবরা উচ্চ প্রাইমারি পাঠশালায়। পণ্ডিতমশাই নামে তিনি বিখ্যাত ও অঞ্চলে।
রুনু পণ্ডিতমশাইয়ের কনিষ্ঠপুত্র। পণ্ডিতমশাই নাম রেখেছিলেন রণজিৎ। সে নাম রয়ে গেল কোষ্ঠীতে আর কাগজে। রুনু নামেই স্বীয় পরিচিতি বহন করে পাঁচ বছরে পা দিয়েছে রুনু। এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হাতেখড়ি হয়নি রুনুর, কিন্তু ইতিমধ্যেই মায়ের কাছে অ-আ-ক-খ থেকে ঔ-তে ঔষধ পর্যন্ত মুখস্থ হয়ে গেছে। মুখস্থ হয়ে গেছে এক থেকে একে শূন্য-দশ দশে-শূন্য-শ পর্যন্ত। এতখানি বিদ্যা পেটে নিয়ে রুনু তার চার বছরের বড় দাদা ইন্দ্রজিতের হাত ধরে একদিন পাঠশালা যাবার অনুমতি পেল মায়ের কাছে।
রুনুকে নতুন লালপাড় কাপড় কোঁচা দুলিয়ে পরিয়ে দিয়েছেন মা। কপালে দিয়েছেন দইয়ের ফোঁটা। মাথায় ছুঁইয়ে দিয়েছেন ঠাকুরের আসনের ফুল। ঠাকুর ঘরে প্রণাম করেছে রুনু। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ করেছে সরস্বতী স্তব। তারপর মায়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে চলে এসেছে উঠোনের প্রান্তে ডালিমতলা পর্যন্ত। ওইখানেই মায়ের এলাকা শেষ। ওইখানে দাঁড়িয়েই মা নানা উপদেশ দিলেন ইন্দ্রকে।
রুনুর ডান হাতে ঝুলোনো সুতোয় বাঁধা মাটির দোয়াত। বগলে তাল পাতার বান্ডিল। বাঁ-হাতে খাগের কলম আর খেজুর পাতার চাটাই।
হাত ধরাধরি করে স্কুলের পথে পা বাড়ায় দুই ভাই। ইন্দ্র অবশ্য তিন বছর আগে থেকেই স্কুলে যাচ্ছে। রুনুর আজ প্রথম।
পেছন থেকে মা বলছেন ইন্দ্রকে, 'রনুর হাত ছাড়বি নে, ইনু। পথে কুকুর টুকুর দেখলি আবার ভয় দিস না ওরে। জল খাতি চালি নিয়ে যাস সুশীলাগে বাড়ি। একা একা যায় না যেন কোনোহানে। কান্নাকাটি করলি বাড়ি দিয়ে যাবি।'
কান্নার কথায় হেসে ফেলে রুনু। বলে, 'ইস্কুলে যাইয়ে আবার কেউ কাঁদে নাকি?'
পথে চলতে চলতে বিজ্ঞ ইন্দ্রজিৎ অবোধ রুনুকে নানা বিষয়ে জ্ঞান দান করছে। প্রথমেই বোঝাতে শুরু করেছে হাতেখড়ির ব্যাপারটাঃ 'তারপর সেই মস্ত এক ধামা মুড়কি আর বাতাসা সবাই আমোদ করে খাবে। খাওয়ার পরই ছুটি। সেদিন হাফ স্কুল। হাতেখড়ির দিন খুব মজা।'
'আমার হাতেখড়ি কবে হবে?' প্রশ্ন করে রুনু।
'বাবা পঞ্জিকায় ভালো দিন দেখে দেবে তো?'
'ভালো দিন কবে হবে?'
'জানি নে যা! চল তাড়াতাড়ি।'
বিরক্ত বড়দা মায়ের প্রথম আদেশ অমান্য করে হাত ছেড়ে দিল রুনুর। স্বাধীনতা পেয়ে খুশিই হয় রুনু। কিন্তু মুশকিল হয়েছে, ওর দুই হাতে ও বগলে বিদ্যার্জনের প্রচুর উপকরণ। আর এক বোঝা হয়েছে নতুন কাপড়ের দোদুল্যমান কোঁচাটা। বারে বারে জড়িয়ে যাচ্ছে পায়ে। এক সময় কোমর ছেড়ে কাপড় নেমে চলল নীচের দিকে। কালির দোয়াত সহ বেসামাল কাপড় সামলাতে গিয়ে এক দোয়াত কালিই ঢেলে ফেলে রুনু। জামা-কাপড় হাত পা মসীময় হয়ে গিয়ে তাকে ওই 'মেঘে ঢাকা শিশু শশী'র মতোই দেখায়। নষ্ট জামা-কাপড় আর অপচয়িত কালির শোকে ভেউ-ভেউ করে কেঁদে উঠল রুনু। কান্নায় আকৃষ্ট হয়ে পিছন ফিরল দাদা। দৃশ্যটি দেখে ইন্দ্র একখানি কড়া চড় কষিয়ে দেয় রুনুর পিঠের উপর। তারপর কাপড়খানা পুঁটলি পাকিয়ে তুলে দেয় রুনুর আর এক বগলে।
কাপড়ের ফুটবল বগলে নিয়ে দিগম্বর বেশেই রুনুর প্রথম পদার্পণ হল পাঠশালে। একদল ছেলেমেয়ে ওকে দেখে কলরব করে ওঠে হাততালি দিয়ে। উপহাস বুঝবার মতো বুদ্ধি হয়েছে রুনুর। সুতরাং কাপড়ের পুঁটলি এবং বিদ্যার্জনের মালমশলা সব ছুড়ে ফেলে দিয়ে শুরু হল উচ্চস্বরে ক্রন্দন। 'ইস্কুলে যাইয়ে আবার কেউ কাঁদে নাকি?' কথাটা আর মনে পড়ল না তখন।
সেই মুহূর্তে ষোলো-সতেরো বছরের একটি মেয়ে ছুটে এসে ওকে কোলে তুলে নিল। তার শাড়ির আঁচলে ওর লজ্জা নিবারণ করে সস্নেহে মুছে দিল চোখের জল, দেহের কালি। ঘুচে যায় রুনুর সব লজ্জা অভিমান। বিজয়ীর গর্বে মেয়েটির গলা জড়িয়ে ধরে সে। রুনু চেনে না তাকে। কিন্তু সে চিনেছে রুনুকে। শুধু সে-ই নয়, এই নবাগত খুদে ছাত্রটিকে চিনেছে আরও অনেকেই। পণ্ডিতমশাইয়ের ছোট ছেলে রুনু।
মেয়েটির নাম সুশীলা। বয়সে সে পাঠশালার সকলের বড়। সবাই তাকে ডাকে সুশীলাদি বলে। ভয়ও করে সবাই।
'দ্যাহো, ওরে নিয়ে বেশি ফাজলেমি করবা না। ও কার ছোয়াল জানো? খুড়োমশায়েরে কয়ে দিলি এট্টারও পিঠির চামড়া থাকবে না।' সুশীলাদির এক ধমকেই সব হাসি ঠাট্টা বন্ধ হয়ে গেল।
প্রথম দিনেই সুশীলাদির বিশেষ স্নেহ লাভ করেছিল রুনু। আর তার মূল্য তাকে দিতে হয়েছে চোখের জলে সারা পাঠশালা-জীবন ভরে। ফাজিল ছেলেদের ফাজলামি সুশীলাদির ধমকে বরাবর বন্ধ হয়ে থাকেনি। তারা আড়ালে-আবডালে কত ভাবে যে ক্ষেপিয়েছে রুনুকে!
'তুই সুশীলাদি কতি পারবি না, তুই কবি মা!'
'কেন, তোমরা যে সুশীলাদি কও?' প্রতিবাদ করেছে রুনু।
'আমাগে তো আর তোর মতো কোলে করে নিয়ে বেড়ায় না।'
সুশীলাদির সঙ্গে পণ্ডিতমশাইয়ের সম্পর্কটাও বিচিত্র। সকলে ডাকে 'পন্নিমশায়' ও ডাকে 'খুড়োমশায়'। পণ্ডিতমশাইও আর সবাইকে ডাকে নাম ধরে, ওকে ডাকেন 'সুশীলা মাসি' বলে। আর সকলের বেলায় চড়, কানমলা, বেত, নীল ডাউন, কান ধরে ওঠ-বস, বেঞ্চির তলায় ঘাড়—এমনি কত রকম শাস্তির ব্যবস্থা, সুশীলাদির বেলায় কিচ্ছু না। এক-আধদিন পড়া না পারলে পণ্ডিতমশাই হেসে বলেন, 'কাল বুঝি বই থুয়ে বাপের ব্যবসা শিখছিলে মাসি? ওরে বেটি, ক্ষুরের চেয়ে বিদ্যার ধার অনেক বেশি। ওটায় নাপিত, এটায় পণ্ডিত।'
ওইটুকু কথাতেই সুশীলাদির কী কান্না!
প্রচুর অভিজ্ঞতা আর উত্তেজনা নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরল রুনু। দাদার জ্ঞানের পরিধি দেখে রুনু একদিনেই দারুণ ভক্ত হয়ে পড়েছে দাদার। পথে পথেই দাদার কাছ থেকে জানা হয়ে গেছে ধোপাদের বাগানের কাঁচামিঠে আম গাছ কোনটা। চিনে ফেলেছে সেই বিখ্যাত বরই (কুল) গাছ, যার এক ডালের বরই একেবারে চিনির মতো মিঠে, আর এক ডালের বরই ছাগলেও ছোঁয় না। শুধু কি ফলের খবর? অবোধ রুনুকে জ্ঞানদানের মহৎ প্রেরণায় আরও অনেক গূঢ় খবরও বলেছে ইন্দ্র।
'ঘামাচি লতা চিনিস? ঠিক পাকানো সুতোর মতো। তা দিয়ে ঘুড়ি উড়োনো যায়।''
রাস্তার ধারে একটা শক্ত বেড়া-ঘেরা ফুল-বাগান দেখিয়ে ইন্দ্র বলে, 'দেখিছিস কত ফুল! সরস্বতী পুজোর সময়...অনেক রাত থাকতি...'
তারপর একটা ইঙ্গিতময় চোখ-টিপুনি। ওতেই বুঝেছে রুনু। মাথা খুলে গেছে যে ওর।
প্রথম দিনেই জানা হয়ে গেল, কোন গাছে ঝুটকুলী পাখির বাসা, কোন শেওড়া গাছে রাত্রে পেত্নীর কান্না শোনা যায়, কোন গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়েছিল রাজুর খুড়ি। সবচেয়ে আশ্চর্য জিনিস হল সাতমাথাওয়ালা একটা খেজুর গাছ। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটাকে দেখেছে রুনু। বারবার গুণে দেখেছে, সত্যিই সাতটা মাথা।
মুখচোরা রুনুর মুখ খুলে গেল বাড়ি এসেই।
'এই দ্যাখ দিদি, ধোপাদের বাগানের কাঁচামিঠে আম। রসময়দা পেড়ে দিল এক ঢিলে। উঃ, রসময়দার হাতের কী তাক! রসময়দা আমারে খুব ভালোবাসে।'
'কী সর্ব্বনাশ! পেত্থোম দিনিই সেই বদমাসটার সাতে ভাব করিছো! ওমা-আ, শোনে শোনো...' সেজদি ছুটল নালিশ করতে।
সব শুনে চোখ রাঙিয়ে মা বললেন, 'ফেলে দে, ফেলে দে ও আম। ওই সব খারাপ ছেলেদের সাতে আর কক্ষণো মিশবি না। পেত্থোম দিনিই আম চুরি করলি! পণ্ডিত জানলি তো আস্ত রাখবে না। ফ্যাল ফ্যাল, শীগগির ফ্যাল। তুই হলি পণ্ডিতির ছেলে। তুইও চুরি করবি ওগে মতো?'
'পণ্ডিতের ছেলে' কথাটা যেন একটা শাণিত তিরের মতো রুনুর বুকে এসে বিঁধল। এই কথাটা জীবনে বহুবার বহুভাবে ওকে দুঃখ দিয়েছে। আর মনে মনে প্রার্থনা করেছে রুনু, পরজন্মে যেন ওকে পণ্ডিতের ছেলে হয়ে না জন্মাতে হয়।
পাঠশালার অনতিদূরে সুশীলাদিদের ছোট্ট ঘরখানা। টিফিনের সময় প্রতিদিন রুনু একবার যাবেই সুশীলাদির বাড়ি। রুনুদের মস্ত বাড়ি, অনেক ঘর। অনেক জিনিসপত্র ঠাসা সব ঘরে। কিন্তু সুশীলাদির ছোট্ট ঘরখানায় জিনিসপত্র বেশি নেই। অথচ সব যেন ছবির মত সাজানো। মাটির দাওয়া, মাটির দেয়াল আর খড়ের চালের ছোট্ট ঘর। মেঝে দাওয়া দেয়াল যেন আয়নার মতো পালিশ করা। ঘরের এক কোণে তাজা ফুলে সাজানো লক্ষ্মীর আসন। আসনে লক্ষ্মীর পট, রাধাকৃষ্ণের পট। তার পাশেই একখানা জলচৌকিতে পুতুলের বিছানা। তিনচারটে পুতুল সেজেগুজে ঘুমিয়ে আছে সে বিছানায়। ঘরের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে বাঁশের মাচা। মাচার উপর জীর্ণ বিছানা, কিন্তু বেশ পরিষ্কার। বিছানার একধারে দুটো টিনের স্যুটকেস। একটা বড়, একটা খুব ছোট। বড়টা সুশীলাদির বাবার। ছোটটা সুশীলাদির। ঘরের সামনে ছোট্ট দাওয়া। তার সামনে উঠোন। উঠোনটাও ধপধপে। উঠোনের এক কোণে তুলসী পিড়ি আর অনেকখানি জুড়ে লাউয়ের মাচা। সেই ঘর দাওয়া উঠোন লাউমাচা আর সজনে গাছের মাথার উপর খানিকটা আকাশ নিয়ে একখানা সুন্দর ছবি। এই ছবির পটভূমিকায় আর একখানা ছবিও আছে। সে ছবি শশীদার।
সুশীলাদির বাবা শশীদা। দেশশুদ্ধ মানুষের শশীদা। রুনুরও শশীদা। শশীদার ডান পাখানা খোঁড়া। সেই খোঁড়া পা নিয়েই লাঠি ভর দিয়ে প্রতিদিন ভোরে বেরিয়ে পড়ে শশীদা একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স হাতে ঝুলিয়ে। চুল কেটে বেড়ায় পাড়ায় পাড়ায়। সেই সময়টা সুশীলাদি ঘরের কাজকর্ম সারে, রান্না করে। দশটার মধ্যেই ফিরে আসে শশীদা। তখন শশীদার উপর সংসার ফেলে সুশীলাদি যায় স্কুলে।
টিফিনের সময় সুশীলাদির সঙ্গে এসে প্রতিদিনই দেখা যায় একই ছবি। শশীদা দাওয়ায় বসে হয় কারও চুল কাটছে, না হয় ক্ষুর কাঁচিতে ধার দিচ্ছে। একসঙ্গে শশীদার হাতও চলে মুখও চলে। ওদিকে হাতের কাঁচিতে কিচ কিচ শব্দ, এদিকে মুখে গুনগুন গান। না হয় গল্প।
শশীদা গল্প বলে যায় এর-ওর কাছে। রুনু পাশে বসে বসে শোনে। সে গল্পে শশীদার আত্মকাহিনীই বেশি। শুনে শুনে শশীদার অনেক কথাই জেনে ফেলেছে রুনু।
বারো বছর বয়স থেকেই শশীদা ঘরছাড়া। দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছে যাত্রার দলে পার্ট করে। প্রথমে শ্রীরাধা বিষু�প্রিয়া, পরে সীতা সাবিত্রী যশোদা। অবশেষে সব চেয়ে সম্মানিত পার্ট—বিবেকের পার্ট।
গানের গলা আজও আছে শশীদার। আজও গুনগুনটুকু শুনতে হয় কান পেতে। গান গেয়ে মেডেলও পেয়েছে শশীদা অনেক। দেখেছে সে সব মেডেল রুনু। দেখিয়েছে সুশীলাদি। কালো ভেলভেট কাপড়ের উপর মালার মত করে গাঁথা তেইশখানা মেডেল। তার মধ্যে একখানা আবার সোনার!
একটা গল্প শশীদা প্রায়ই বলে।
'জানো ছোটো কত্তা, (রণুকে শশী ডাকে ''ছোটো কত্তা'' বলে) সেবার নীল পুজোর সময় আমাগে দলের বায়না হলো বাজুনের জমিদারবাড়ি। পেথোম রাত্তির ''নিমাই সন্ন্যাস'' পালা শুনে বাবুরা এহেবারে মোহিত হয়ে গেলেন। মাইয়েছেলেরা আবদার ধরলো—আবার গাতি হবে ওই পালা।'
'আবার ওই নিমাই সন্ন্যাস গালে?'
'হ, গালাম। সে রাত্তিরির আসরের মতো অত বড় আসর, কি কবো ছোটো কত্তা, জেবনে দেহিনি! গানও গালাম এহেবারে মোন প্রাণ সমপ্পণ করে। চাদ্দিকিত্তে জয়জয়াকার পড়ে গেল। দেখতি দেখতি আট-দশটা মেডেল। ওই আসরেই বায়না হয়ে গেল চার-পাঁচ জাগায়।
'সেই বায়নার ব্যাপারেই বেধে গেল কুরুক্ষাত্তোর কাণ্ড। কাজুলে আর বাজুনে পাশাপাশি গ্রাম। দুই জমিদারে আজন্ম রেষারেষি। দুই রাত্তির তো বাজুনে হলো। কাজুলের জমিদারবাবু বলেন, পরের রাত্তির আসর হবে কাজুলে। গাতি হবে ঐ পালাই। বাজুনের করমশায় হুঙ্কার ছাড়ে কলেন, তা হবে না, কালকের আসরও বাজুনে হবে। কাজুলে কয়, ডবল দেব। কালকের বায়না একশ টাহা। আমাগে তখন বায়না ছিল পঞ্চাশ টাহা। বাজুনেরা কয় দুই শো।'
'কারা জেতল?' উৎসাহিত হয়ে ওঠে রুনু।
'জেতলো বাজুনেরাই। করমশায় আসরের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে সিংহীর গজ্জন ছাড়লেন, ''আয় দেহি কোন শালার এত টাহার গরম!'' গজ্জন শুনে আমাগে তো পিলে চমকালো, অধিকারী মশারও কম্মো হয়ে গেছে। এহেবারে ব্যাতপাতার মত কাঁপতি লাগলেন। সেই কাঁপা হাতেই একখানা একশ টাহার নোট ধরায়ে দেলেন করমশায়। আমাগে অধিকারী মশায় তেনার পা জড়ায়ে ধরে কলেন, 'গোলমাল হলি যে ধনে-পানে মারা যাব বাবু।' করমশায় হুঙ্কার ছাড়লেন, 'কোন শালা কি করতি পারে দ্যাখ্যা যাবে। আসরে একশ পাইক পাহারা দেবে। খালি লাঠি সড়কি নয়, বন্দুকও থাকবে। তোমাদের গায়ে নখের আঁচড়টা লাগুক দেখি।'
শুধু নখের আঁচড় নয়, একটা কুরুক্ষেত্র কাণ্ডই হয়ে গেছিল সে রাত্রে।
'জন্মের মতো খোঁড়া হয়ে গেলাম, ছোটো কত্তা। আগে মায়না পাতাম দশ টাহা। সে রাত্রি অধিকারী মশায় এহে ঠেলায় ডবল পেমোশান দিয়ে দেলেন বিশ টাহার। আর তার পরের রাত্তিরিই হয়ে গেল চৌডবল পেমোশান! খোঁড়া শশীর দাম রলো না কানাকড়িও। কি কও ছোট কত্তা, পেমোশান হলো না? ছেলাম বিবেক, হলাম নাপিত। ছেলো দুই পা, হল তিন পা।'
'তোমারে যে মারল তারে ধরতি পারলে না?' রুনু উত্তেজিত।
'তারে কি আর নাগুল পালাম?' ঊর্ধ্বে হাত তুলে শশীদা বলে, 'সব তেনার ইচ্ছে। ঘরের মানুষরি ঘরে আনার জন্যি খোঁড়া বানালেন। তা না হলি কেডা দ্যাখতো আমার সুশীরে?'
একটু থেমে আবার বলতে থাকে শশীদা, 'বড় দুঃখীর কপাল আমার সুশীর। আমিও খোঁড়া হয়ে আলাম, আর মাসখানেকের মধ্যি সুশীও আলো কপাল-টপাল মুছে! আট বছরও পোরেনি ওর বয়স তখন...'
শশীদা থেমে যায়। চিক চিক করে ওঠে ওর চোখ দুটি। তাড়াতাড়ি গামছায় চোখ মুখে বিষণ্ণভাবে হাসে। বিড়-বিড় করে বলে, 'কোনো শালারে ভয় করি নাকি আমি! কোনো কথা শোনব না, পাঁচকুড়ি টাহা জোগাড় করতি পারলি আমার আমি সুশীরি...'
কিচ কিচ কাঁচির আওয়াজে পরের কথাগুলি আর বুঝতে পারে না রুনু।
চারচালা টিনের ঘর। তিনদিকে টিনের বেড়া, দক্ষিণ দিকটা খোলা। সামনে মেলার মাঠ তথা খেলার মাঠ। উপরে অনেকখানি আকাশ জুড়ে স্নিগ্ধ ছায়া বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক অতি প্রাচীন বটগাছ। এই হলো গোবরা পাঠশালা।
তালপাতা থেকে স্প্লেটওয়ালারা পর্যন্ত দক্ষিণের খোলা বারান্দায় বসে যার যার চাটাই পেতে। বারান্দায় সকলের স্থান হয় না বলে একদল বসে বটের ছায়ায়। বেঞ্চে বসে উপরের ক্লাশের ছেলেরা। নামতা জলের মতো মুখস্থ হবে, বাল্যশিক্ষার সব কটি বানান শেখা হবে, ফলা বানান, বুড়ি-কড়া-সের-কাঠা সব এক টানে লিখতে হবে, লিখতে হবে ক্লাসের সবক'টি ছেলের নাম স্প্লেটে, তবে না বেঞ্চে প্রমোশন। বেঞ্চে বসলেই তুমি হলে প্রথম শ্রেণির ছাত্র। তার আগে শিশু শ্রেণি।
প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেণি সহ শিশু শ্রেণি নিম্ন প্রাইমারি শাখা। তৃতীয় আর চতুর্থ শ্রেণি উচ্চ প্রাইমারি।
এ পাঠশালার জন্মের পরে পনের বছর একা শ্রীনাথ পণ্ডিতই চালিয়েছেন। তারপর ছাত্রসংখ্যা অসম্ভব বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন প্রাইমারি শাখার জন্যে নিতে হয়েছে জব্বর শেখকে। ছাত্ররা তাকে বলে 'মাস্টার ছাপ' আর শ্রীনাথ পণ্ডিতকে বলে 'পন্নিমশা'। দ্বিতীয় শিক্ষক যদিও একজন আছেন,—তিনিও একদা শ্রীনাথ পণ্ডিতেরই ছাত্র ছিলেন—তবু প্রতিটি ছাত্রের প্রতি সমান নজর পণ্ডিত মশাইয়ের। প্রথম ভর্তির দিন থেকেই সে শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছাত্র।
শ্রীনাথ পণ্ডিতের পাঠশালা এ জেলার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। শ্রীনাথ পণ্ডিত এ জেলার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত।
সুশীলাদির পরেই পাঠশালায় রুনুর প্রিয়বন্ধু যে ছেলেটি, তার নাম হরেকেষ্ট। মহাগুণী ছেলে হরেকেষ্ট। বয়সে রুনুর চেয়ে হয়তো বছর দুই বড় হবে। স্কুলে আসবার আগেও হরেকেষ্টকে দেখেছে রুনু। দেখেছে বালকৃষ্ণ বেশে নিতাই বৈরাগীর সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে ভিক্ষা করতে।
কালো ছিপছিপে ছেলেটি। মাথায় শ্রীকৃষ্ণের মতো কাঁধ ঢাকা বাবরি চুল। নাকে কপালে বাহুতে বুকে তিলক কেটে বাল গোপাল বেশে ওকে সাজিয়ে দেয় ওর মা, যেদিন সে নিজে বেরুতে পারে না নিতাই-এর সঙ্গে। বৈষ্ণবীর গানের গলার তো তুলনাই হয় না। পণ্ডিতমশাই বলেন কোকিলকণ্ঠী। হরেকেষ্টও কিন্তু গান গায় চমৎকার। নিতাই এক কালি গায়, হরেকেষ্ট আর এক কলি। শেষ দিকে সরু মোটা দুটি গলা মিশে যায়। তেহাই পড়ে একসঙ্গে খঞ্জনী আর করতালে।
স্কুলে কিন্তু হরেকেষ্টর অন্য বেশ। কেবল একখানি ছোট ধুতি। আর কিচ্ছু নয়। ফোঁটা তিলক নেই, গলায় মালা নেই, তবু যে কী সুন্দর দেখায় ওকে। গায়ের কালো রঙটা যেন চিকচিক করে। বালগোপালরূপী হরেকেষ্টকেই মনে মনে ভালোবেসেছিল রুনু। কিন্তু কথা বলার সুযোগ হয় নি। কথা বলার সুযোগ দিচ্চে না স্কুলে হরেকেষ্ট। খুব গম্ভীর। প্রায় কারও সঙ্গেই ও কথা কয় না।
প্রতিদিন রুনু চাটাই পাতে হরেকেষ্টর পাশে। প্রতিদিনই চেয়ে থাকে হরেকেষ্টর মনোযোগী মুখের দিকে। হরেকেষ্ট একমনে খস খস করে লিখে যায় তার স্লেটে ফিরেও তাকায় না।
রুনু এখনও তালপাতায়। হরেকেষ্ট স্লেটে উঠেছে। এর পরেই ওর প্রমোশন হবে বেঞ্চে। রুনুর এখনও বেঞ্চে উঠতে অনেক দেরি।
সেই হরেকেষ্ট যেদিন প্রথম কথা বলল রুনুর সঙ্গে, সেদিন ওর আনন্দটা কলম্বাসের প্রথম তীরভূমি দেখার আনন্দের চেয়ে একটুও কম নয়।
'তুমি নাম লেকতি পারো?' রুনুর দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছে হরেকেষ্ট।
কৃতার্থ হয়ে গেছে রুনু। সগর্বে বলেছে 'হু-উ পারি। দাও না তোমার স্লেট, লিখে দিচ্ছি।'
সত্যিই একেবারে শ্রী সমেত পুরো নামটা লিখে ফেলল রুনু। হরেকেষ্ট কিন্তু খুশি হল না রুনুর এই সাফল্যে। গম্ভীর হয়ে বলল, 'কি করে শিখলে? তুমি তো নাম লেখা কেলাশে ওঠো নাই।'
'সুশীলাদি শিখোয় দেছে।' স্বীকার করতে লজ্জা নেই রুনুর।
হরেকেষ্ট একটানে ওর হাত থেকে স্লেটখানা টেনে নিয়ে ওর লেখাটা মুছে ফেলল। তারপর খসখস করে কি সব লিখে তুলে ধরল রুনুর চোখের সামনে।
'পড়ো তো কি লেখিছি?'
'পড়তি তো পারি না।' রুনুর অসঙ্কোচ স্বীকারোক্তি।
হরেকেষ্টর গম্ভীর মুখে হাসি ফোটে, 'লেখতি পারো, আর পড়তি পারো না?'
'আমি নিজির নাম ছাড়া আর কিছু লিখতি পারি না। আমারে শিখোয় দেবা?'
প্রসন্ন চিত্ত হরেকেষ্ট রণুর গুরু হয়ে বসল। ভাব হয়ে গেল ওদের। এমন একটা গুণী ছেলের বন্ধুত্ব লাভ করে যেন ধন্য হয়ে গেল রুনু।
হরেকেষ্ট ছাড়াও আর একটি ছেলে রুনুকে দারুণ আকর্ষণ করত। প্রথম দিনই তার হাতের তাক দেখে বিস্মিত হয়ে গেছিল সে। সুশীলাদির পরেই পাঠশালায় বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছেলে সে। তার নাম রসময়। কিন্তু রসময়ের সঙ্গে তো রুনুর মিশতে মানা। মিশতে মানা অবশ্য সকলেরই। মেশেও না কেউ। রসময়ের তাতে বয়েই গেল। ও আপন মহিমায় আপনিই উজ্জ্বল।
স্কুলে আসে রসময় সবার আগে। নির্দিষ্ট স্থানটিতে বই রেখেই চড়ে বসে বটগাছে। কত যে বয়স হল ও বুড়ো বটের, বুড়োরাও জানে না। চারিদিকে অসংখ্য ঝুরি নেমে নেমে ক্রমে তারাই এক একটা কাণ্ড হয়ে গেছে। ও গাছের কোন ডালে কোন পাখির বাসা, কোথায় কোথায় আছে কখানা মৌচাক, আছে মোট কতগুলি কাণ্ড—সব খবর রাখে একমাত্র রসময়। রসময় বটগাছ বিশেষজ্ঞ। সেই রসময় যখন বলে —বুড়ো বটের মোট একশ আটটা কাণ্ড আছে, তখন সে কথা বিনা বিতর্কে বিশ্বাস করে রুনু।
বটগাছে চড়েই প্রথমে একগাদা বটফল পেড়ে নেয় রসময়। তারপর এক একজন ছাত্র আসে, আর একটি করে বটফলের ঠোক্কর খায় মাথায়। কিন্তু কোথায় রসময়? খুঁজে বের করার সাধ্য আছে কারও? হাতের তাক ওর মোক্ষম। রসময়ের অদৃশ্য হাতের এক-একটি ঠোক্কর হলো স্কুলে প্রবেশের ছাড়পত্র। শেষ পর্যন্ত একদিন স্বয়ং পণ্ডিতমশাইকেও এই ছাড়পত্র মাথায় করে স্কুলে প্রবেশ করতে হল! সেদিনের বস্তুটি কিন্তু বটফল নয়, রসময়ের বিখ্যাত ড্যাগা মার্বেল।
মার্বেলটাকে সকলেই সনাক্ত করল, কিন্তু মার্বেলের মালিককে আর খুঁজে পাওয়া গেল না এক সপ্তাহের মধ্যে। শুধু পণ্ডিত মশাইকেই রসময়ের মার্বেলের চেয়েও বৃহত্তর একটা মার্বেল মাথায় করে বেড়াতে হল কয়েকদিন। ঘটনার পূর্বদিন রসময় দারুণ মার খেয়েছিল। তাই বোধহয় একটু শোধ নিল।
চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে স্কুলের সামনের মাঠটায়। সারা বছরের সেরা উৎসব। বছরের শেষ উৎসব। শুধু গোবরার মানুষ নয়, আশপাশের আর দশ-বিশটা গ্রামের মানুষ চৈত্রের ভর দুপুরেও সপ্তাহখানেক ধরে আমোদে মেতে থাকে এই মেলার মাঠে।
গভীর আগ্রহে মেলার বর্ণনা সুশীলাদির মুখে শুনেছে রুনু। পুতুল নাচ, বাইস্কোপ বাক্স, নাগরদোলা, সাপখেলা, বাঁদর নাচ, ভালুক নাচ, আরও কত কি।
'এই স-অ-ব দেখিছো তুমি?' রুনুর চোখ বিস্ফারিত হয়।
'দেহিছি, স-অ-ব দেহিছি। পিতি বছরই তো মেলা হয়।'
'এবার কবে মেলা হবে?'
'এই তো চত্তির পড়লো সংক্রান্তির তিন দিন আগেত্তেই শুরু হয়ে যায়। তহোন তো সাত দিন ছুটি থাহে ইস্কুল। মেলার মাঠে যেমন হাজার হাজার দোকান পাট, তেমনি ইস্কুল ঘরের মধ্যেও বসে যায় কাপড়-চোপড়ের দোকান।'
'আমি মেলা দেখতি পারব না?' রুনুর যেন সবুর সইছে না।
'ক্যান পারবা না? তোমার দাদার সাতে চলে আসবা। ইন্দির তো সব বারই মেলায় আসে।'
'দাদা আমারে নেবে না। বলে আমি ক্যাবলা, আমি ভিড়ের মধ্যি হারায়ে যাব।' কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে রুনু।
'কানতি হবে না। ষাট। মেলায় সময় আমিই তোমারে নিয়ে আসব খুড়ো মশায়রে কয়ে।'
পাঠশালার সামনে তো মেলার মাঠ, কিন্তু পেছন দিকটা গভীর জঙ্গল। বেত, শেওড়া, ডুমুর, গাব, হিজল, কুল, করমচা ইত্যাদি কত রকম যে গাছ আছে সে জঙ্গলে আর কত জাতের লতা যে গাছগুলিকে জড়িয়ে ছেয়ে ফেলেছে, তার আর ইয়ত্তা নেই। ভর দুপুরেও সেখানে ঘোর অন্ধকার। ওদিকে তাকালেই গা-ছম-ছম করে রুনুর। শোনা যায় অদ্ভুত সব পাখির ডাক, পোকার ডাক, ভয়ঙ্কর গা-শিউরোনো শোঁ-শোঁ শব্দ। ওর মধ্যে নাকি বাঘ আছে আর আছে অসংখ্য ভূত-প্রেত। মধ্যিখানে নাকি আছে কবরখানা। সেই সব কবর থেকে যখন-তখন বেরিয়ে পড়ে ভূতেরা।
দুঃসাহসী রসময় কিন্তু একাই ঢুকে পড়ে ঐ জঙ্গলে টিফিনের সময়। সংগ্রহ করে আনে বিচিত্র সব ফলমূল। সবগুলির নামও জানে না রুনু।
ও জঙ্গলের খবর হরেকেষ্টও কম রাখে না। হরেকেষ্ট জানে, কোন দিকটাতে আছে পাকা বেতফল, ডুমুর গাছের কোন গোপন গর্তে বাসা বেঁধেছে কাঠঠোকরা, কোন বাসায় ডিম পাড়ে শালিখ পাখিরা। হরেকেষ্ট আরও জানে পোষাপাখি দিয়ে কি করে বনের পাখি ধরতে হয়।
ওই জঙ্গল থেকেই সংগ্রহ করা পাকা বেতফল একদিন বাড়ি থেকে নুন লঙ্কা সহযোগে মেখে এনেছিল হরেকেষ্ট। কলার পাতার ছোট্ট একটি মোড়ক রুনুর হাতে তুলে দিয়ে সে বলে, 'কও তো কি জিনিস?'
রুনু খুলে দেখল ছোট ছোট কালো কালো ফল। টক টক মিষ্টি মিষ্টি গন্ধে জিভে আপনিই জল এসে যায়। সে বলে, 'চিনি নে তো।'
'ঝামানো বেতফল। খাইয়ে দ্যাহো কি মজা।' চোখে মুখে লোভী-লোভী ভাব করে বলে হরেকেষ্ট।
হরেকেষ্টর পাশে বসে সেদিন সেই মহামূল্য সামগ্রী একটু একটু করে দুই বন্ধুতে চক চক করে খেয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে। কি অপূর্ব স্বাদ! আর কি ভালোই যে লেগেছিল সেদিন হরেকেষ্টকে!
পাঠশালার পূবদিকে জেলেদের মস্ত পুকুর। কয়েকখানা জেলেডিঙি ডোবানো থাকে প্রায়ই। পুকুর পাড়ের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ পাশাপাশি দুটো পঞ্চরত্ন মন্দির। একটির সামনের দিকে খোদাই করে লেখা 'মাতৃদেবী ৺রী চারুবালা।' নীচে আরও অনেক কথা লেখা। সন তারিখ ইত্যাদি। অন্যটিতেও অনুরূপভাবে পিতৃদেবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে কোন ভক্ত সন্তান।
চন্দ্রবিন্দুর পরে র-এ দীর্ঘ ঈ-কার দিলে উচ্চারণটা কি দাঁড়ায়, তা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছে রুনু। শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করেছে সুশীলাদিকে।
'ও মা, তাও জানো না? পড়তি হয় ঈশ্বরী চারুবালা।'
সুশীলাদি সেদিন কেবল পড়তেই শেখায় নি, বলেছিল আরও অনেক কথা। মানুষ মরলে নাকি ঈশ্বর হয়, আর মেয়েরা হয় ঈশ্বরী। ঈশ্বর মানে ভগবান।
'আমি মরলিও ঈশ্বর হব?' প্রশ্ন করে রুনু।
'ষাট, তুমি মরবা ক্যান? আমি মরবো। আমি মরলি হবো ঈশ্বরী সুশীলা দাসী।'
'তোমার নামেও ওইরকম মন্দির হবে?' রুনু কৌতূহলী।
'তুমি বানায়ে দেবা। আমাগে তো টাহা নাই। তুমি বড় হলি জজ মাজিস্টর হবা। কত টাকা পাবা।'
সুশীলাদি মরে যাবার পরও মন্দির বানাবার জন্যে বেঁচে থাকতে রুনুর ঘোরতর আপত্তি আছে। সে বলে, 'তার চে ভালো দুজনে আমরা এক সাতে মরবো। ওমনি জোড়া মন্দির হবে।'
সুশীলাদি সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে, 'ষাট ষাট!'
ভূগোল পড়া মুখস্থ হয়নি সেদিন রুনুর। রুনু তখন হরেকেষ্টকে ধরে ফেলেছে। দুজনেই একসঙ্গে উঠেছে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। পড়া মুখস্থ হয়নি হরেকেষ্টরও। হরেকেষ্টর পরামর্শে রুনু সেদিন টিফিনের সময় চলে এল ওর সঙ্গে ধোপাদের বাগানে। হরেকেষ্টর বুদ্ধির উপর রুনুর অটুট আস্থা। আশা ছিল, দুপুরটা বাগানের আম, জাম, লিচু কুড়িয়ে ওরা ফিরবে একেবারে ছুটির সময়। তখন 'পন্নিমশা'র কাছে কি কৈফিয়ৎ দিতে হবে সে জানে হরেকেষ্ট।
নির্ভয়েই অনেক দূর এগিয়ে পড়েছিল ওরা। এমন সময় হঠাৎ চোখের সামনে একেবারে দুর্গাপ্রতিমার অসুরের আবির্ভাব।
'ওরে বাবা, ওই যে দ্বিজু গোসাঁই আসতিছে!' আর্তনাদ করে ওঠে হরেকেষ্ট।
'দ্বিজু গোসাঁই!' রুনুর বুকের কাঁপুনি আর থামে না।
এই তাহলে সেই দ্বিজু গোসাঁই। দ্বিজু গোসাঁই-এর অনেক কাহিনী অনেকের মুখে শুনেছে রুনু। নীল পূজার সময় সেই কোন তালপুকুর থেকে একডুবে একটা গাছ তুলে আনা, অমাবস্যা রাতে গভীর জঙ্গল থেকে ন্যাংটো হয়ে কোন গাছের ফলসমেত ডাল ভেঙে আনা। আস্ত এক খানা নৌকো মাথায় দিয়ে ছাব্বিশ সালের ঝড়ের রাতে পথ চলা, ইত্যাদি অনেক রোমহর্ষক কাহিনীর নায়ক দ্বিজু গোসাঁই।
ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে রুনু। রাক্ষসটা এগিয়ে আসছে ওদের দিকেই। একমাথা ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল। একখানা লাল গামছা দিয়ে জড়ানো সেই বিশাল বাবরী। রক্ত-রাঙা বড় বড় চোখ। কপালেও বুঝি রক্তের ফোঁটা। হাতে তার সিঁদুর মাখা বিরাট ত্রিশূল।
ঠকাস করে ত্রিশূলটা মাটিতে ঠুকে রাক্ষসটা বুক টান করে এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে। ভয়ঙ্কর মুখভঙ্গী করে বলল, 'কেডা? পণ্ডিতির বেটা না? ইস্কুল পালানো হইছে?'
হরেকেষ্টর মাথায় একটা থাবড়া মেরে বলে, 'হারামজাদা বোরোগীর পো, পণ্ডিতির ছলডার মাথা খাতি চাও?'
চড় খেয়ে ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলে হরেকেষ্ট। রুনুর কি জ্ঞান আছে তখন! ওর অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে না!
দুহাতে দুটিকে ধরে দ্বিজু গোসাঁই টানতে টানতে নিয়ে এল স্কুলে। ভাগ্য ভাল, পণ্ডিতমশাই তখন একটু ঝিমুচ্ছিলেন টেবিলে মাথা রেখে।
'নাকে ত্যাল দিয়ে ঘুমোনো হচ্ছে পণ্ডিত?' দ্বিজু গোসাঁই-এর কড়া ধমকে ঘুম ভাঙল পণ্ডিতমশাইয়ের। ব্যস্তভাবে গোসাঁইজিকে অভ্যর্থনা করে বললেন, 'আসুন, আসুন গোসাঁইজি।'
গোসাঁইজি সে কথায় কান না দিয়ে ক্রন্দনরত অপরাধী দুটিকে বললেন, 'যা তোরা কেলাসে বয় গে।'
বলেই পেছন ফিরে চলতে শুরু করেন। যেতে যেতে বলেন, 'দিবে নিদ্দেডা এট্টু কমাও পণ্ডিত। ওয়াগে দোষ কি? ওরা পোলাপান, ফাঁক পালিই পলাতি চাবে। আমরাই বলে বুড়ো বয়সে ফাঁক পালি বাঁধন ছিড়ে পলাতি চাই! বন্ধন থেকে মুক্তি চায় সগুলি। তোমার এ বন্ধন কি যে সে বন্ধন! হাঃ হাঃ হাঃ। ছাড়াতি চাবেই তো। ওয়াগে আবার মারধোর করবা না কিন্তু।'
এত বড় অপরাধীদের একেবারে বেকসুর খালাস দিয়ে গেলেন গোসাঁইজি! যাবার মুহূর্তে রুনু যেন দেখেছিল—গোসাঁইজির ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটু হাসি। সে হাসির দক্ষিণাটুকু যেন কেবল রুনুর জন্যেই। সঙ্গে সঙ্গে রুনুর ভয়ের রাক্ষসটা ভালবাসার বন্ধু হয়ে গেল।
গোসাঁইজিকে নিয়ে অনেক কাহিনী।
তিনতলা উঁচু এক তালগাছ। দড়াদড়ি নিয়ে কয়েকজন লোক এসেছে তালশাঁস পাড়তে। হঠাৎ কোথা থেকে গোসাঁইজির আবির্ভাব। হুট করে ওদের হাত থেকে দড়ি কাটারি নিয়ে তরতর করে খালি হাতেই তালগাছে চড়ে বসলেন গোসাঁইজি। ওরা হাঁ করে গোসাঁইজির ছেলেমানুষী কাণ্ড দেখছে। দক্ষ হাতে এক এক কাঁদি তাল কেটে দড়ি বেঁধে নীচে নামিয়ে দিচ্ছেন গোসাঁইজি। মাঝে মাঝে উপর থেকেই হাসি-মস্করা করছেন। তালের ডালে বসেই এক একটা তালশাঁস কেটে খাচ্ছেন বাচ্চাদের মত করে। একটা যেন ভারী মজার খেলা।
'উঃ, এহানতে যে তামাম দুনিয়াডাই দেহা যাচ্ছে। এক নজরে পিথিবীর ও-পিঠ পর্যন্ত। তিন তিনডে জেলা—খুলনে, যশোর, ফরিদপুর। ওই তো পচ্চিমি নদীর ওপরে যশোর, দক্ষিণি আঠারোবাকীর ওধারে খুলনে জেলার মোল্লারহাট। নাওগুলন যাচ্ছে যানি এক ঝাঁক হাঁস। বাহা রে বাহা!'
'সাবধান, সাবধান গোসাঁইজি! এট্টা ঘুন্নি ঝড় আসতিছে।' বাতাসের লক্ষণ দেখে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নীচ থেকে সাবধান করে।
'থাম দেহি শালারা। পেরায় তো সগ্গে উঠে আইছি।'
খোশমেজাজে স্বর্গদর্শন করছেন গোসাঁইজি। মর্তবাসীর কথায় কানও দিলেন না। হঠাৎ প্রাণে বুঝি একটু কাব্য এসে গেল ঊর্ধ্বলোক থেকে মর্তের মধুমতীকে দেখে। গলা ছেড়ে গান ধরলেন, 'ও কালোবরণ মাঝিরে-এ। তুমি কালো যমুনার জলে...'
ঘূর্ণি হাওয়াটা কিন্তু সত্যিই এল। পাশাপাশি আট দশটা তালগাছ। গাছের মাথাগুলি নিয়ে হঠাৎ একটা দৈত্য যেন পাগলামিতে মেতে উঠল। ধূলোয় ধূলোয় জগৎ সংসার অন্ধকার। নীচের মানুষগুলি সকলেই দু হাতে চোখ ঢাকে।
হঠাৎ কে একজন একটা মর্মান্তিক চিৎকার করে উঠল। চিৎকার শুনে চোখ খুলল অনেকে। দেখে, মস্ত একটা কি যেন শূন্য পথে শোঁ-শোঁ করে নেমে আসছে। মুহূর্তেই বজ্রপাতের মত আওয়াজ করে বস্তুটি পড়ল তালতলায়। সেই আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ও থামল। যেন অদৃশ্য বিধাতা বললেন, 'হল্ট!' আর মুহূর্তে শান্ত হল প্রকৃতির যুদ্ধক্ষেত্র।
অদ্ভুত স্তব্ধতা।
সেই স্তব্ধ পরিবেশে সবাই চোখ মেলে দেখল, গাছতলায় পড়ে আছে গোসাঁইজি। যেন ঘুমিয়ে আছে শান্তিতে।
একদল ছুটে এসেছিল গোসাঁজিকে তুলতে। বুড়োদের নিষেধে কেউ সাহস পায় না ও পবিত্র দেহ স্পর্শ করতে। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে সবাই গোসাঁইজিকে ঘিরে।
দাবানলের মতো সেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। দেখতে দেখতে যেন মেলা বসে গেল তালতলায়। সবাই গম্ভীর মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
গোপালগঞ্জের এম-বি ডাক্তার যোগেনবাবু তখন সাইকেলে চড়ে যাচ্ছিলেন কোনো দূরের 'কল'-এ। ভিড় দেখে নেমে পড়লেন। দেখেই চিনলেন গোসাঁইজিকে। ঘটনাটা শুনে এগিয়ে গেলেন চিকিৎসকের দায়িত্ববোধে।
'ছোঁবেন না, ছোঁবেন না ডাক্তার বাবু।' হই-হই করে বাধা দিল বৃদ্ধেরা।
ডাক্তারবাবু প্রথমটা একটু থমকে গেলেন। একটু পরেই ধমক লাগালেন সবাইকে, 'হাঁ করে সব সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? চেষ্টা করে দেখতে হবে না?'
'ইচ্ছে হলি আপনিও দাঁড়ায়ে দ্যাখেন। গোসাঁইজির ইচ্ছে মিত্যু। আমাগে করবার কিছু নাই। এমনি আগেও অনেকবার দেহিছি আমরা। ওনারই ইচ্ছে হলি...'
এ সব অবৈজ্ঞানিক আজগুবি গল্প শুনে বিচলিত হবেন কেন একজন এম-বি ডাক্তার! তবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে হল অদ্ভুত অবিশ্বাস্য সব গল্প। একবার নাকি এক ডাকাতের সড়কি ওঁর বুক ভেদ করে পিঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। নিজ হাতেই টেনে বের করলেন সে সড়কি নাড়ি-ভুড়ি মাংস সমেত। তারপর নিজেই কি সব শিকড় বাকড়ের চিকিৎসা করে তিনদিনে খাড়া হয়ে উঠলেন। আর একবার নাকি বন্দুকের গুলি...
মুচকি হেসে সিগারেট ধরান যোগেন ডাক্তার।
ঘটনা যখন ঘটে, বেলা দশটা তখন। তারপর ভিড় কখনও বেড়েছে, কখনও কমেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কেটে গেছে। গোসাঁইজি তেমনই ঘুমোচ্ছেন।
সন্ধ্যার দিকে তালগাছের মাথা থেকে বেশ মোটাসোটা একটা টিকটিকি ঢিপ করে পড়ল গোসাইঁজির ঠিক বুকের উপর। এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ সেটা যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।
লক্ষণটা শুভ, না অশুভ—এই নিয়ে যখন গবেষণা হচ্ছে বুড়োদের মধ্যে, তখন হঠাৎ একজনের নজরে পড়ে, গোসাঁইজীর নীচের ঠোঁটটা যেন একটু একটু নড়ছে। ঘন হয়ে এল ভিড়। নড়ে উঠল এবার বুকখানাও। গোসাঁইজি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন। এতক্ষণ যেন দম বন্ধ করে ছিলেন।
ঘন ঘন হরিধ্বনিতে মাতাল হয়ে উঠল জনতা। কীর্তনীয়ার দল প্রস্তুতই ছিল। আটটা খোল আর দশজোড়া করতালির গগন-বিদারী শব্দেই বুঝি ঘুম ভেঙে গেল গোসাঁইজির। ঠিক যখন মধুমতীর ওপারে পাটে বসলেন সূর্যদেব, শান্তভাবে তখন উঠে বসলেন গোসাঁইজি। তাকালেন মধুমতীর ওপারে ঝাউবনের আড়ালে অস্তগামী সূর্যের পানে। হাত জোড় করে প্রণাম করলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
মুহুর্মূহুঃ হরিধ্বনি, প্রণাম আর কীর্তন চলল কিছুক্ষণ ধরে। গোসাঁইজি শান্ত অবিচল। প্রণামের পালা শেষ হতেই এগিয়ে চললেন তার তেঁতুলতলার আখড়ার দিকে।
সাইকেলে হেলান দিয়ে তখনও বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছেন যোগেন ডাক্তার।
সেই ছাব্বিশ সালের ঝড়ের রাতে অন্ধকারে পথ হারিয়ে, ছাতার অভাবে নিজের ছোট ডিঙিখানা মাথায় দিয়ে বুঝি এই গ্রামটার ডাকেই এসে পড়েছিলেন গোসাঁইজি গ্রাম-প্রান্তের একটা বিশাল তেঁতুল গাছের তলায়। তেঁতুলতলার ডোবায় আজও ডোবানো আছে গোসাঁইজির সেই ডিঙি।
বুড়োদের বিশ্বাস, উনি আসার পরেই এ গ্রামের সব দিকে শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। ক্ষেতের ফসল বেড়েছে, গরুর দুধ বেড়েছে, অকালমৃত্যু কমেছে। বুড়োরাই যত্ন করে তেঁতুলতলায় বানিয়ে দিয়েছে গোসাঁইজির আখড়া। সাজিয়ে দিয়েছে চমৎকার ফুল বাগান করে। চাঁদা করে কিনে দিয়েছে দু-ধেলা গাই।
গোসাঁইজি তাবিজ দেন না, কবচ দেন না, মিষ্টি মুখে কথাও বলেন না সকলের সঙ্গে, তবু কিন্তু আখড়ায় ভিড় লেগেই আছে। একটু চরণামৃত, এক টুকরো বাতাসা কিংবা একটু ফুল-বেলপাতা। তাতেই কত জনের কত আপদ কেটে যায়। কারও হারানো ছেলে ফিরে আসে, কারও বা মামলার জিত হয়, কারও মরুঞ্চে গাই দুধ দিতে শুরু করে দুই সের করে। ভক্ত বাড়ে, ভক্তি বাড়ে, বিশ্বাস বাড়ে। সবাই প্রাণ দিয়ে আঁকড়ে রাখে গোসাঁইজিকে।
এত করেও কিন্তু সারা বছর বেঁধে রাখা যায় না গোসাঁইজিকে। শীত পড়তেই সব মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে হঠাৎ একদিন অদৃশ্য হয়ে যান। কখনও দু-তিন মাস কখনও ছ মাস ধরে নানা তীর্থ ঘুরে আবার একদিন ফিরে আসেন।
ফিরে না আসা পর্যন্ত কারও মনে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। চোখে ঘুম নেই।
'তোরা শালারা বড় মায়ায় বান্দিছিস। ছাড়াতি পারলাম না।' হেসে বলেন গোসাঁইজি ফিরে এসে।
সকাল আটটায় গরম মাছের ঝোল ভাত খেয়ে মাকে প্রণাম করে রওনা হল রুনু আর নটবর। নিম্ন প্রাইমারি টেস্ট পরীক্ষা দিতে চলেছে ওরা গোপালগঞ্জ।
যদিও গোবরা পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণিতে সেবার সাত জন ছাত্র ছিল, পণ্ডিতমশাই তাদের মধ্যে থেকে ওই দুইজনকেই বৃত্তি পরীক্ষার জন্যে নির্বাচন করেছেন। অবশ্য শেষ নির্বাচন করবেন গোপালগঞ্জের স্কুল ইনস্পেক্টর সাহেব। সেই জন্যই তো টেস্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা।
রাস্তা তো কম নয়—প্রায় বারো মাইল। টেস্ট পরীক্ষা হবে পাবলিক স্কুলে। সেখানে পৌঁছতে হবে দশটার আগেই।
শ্রীনাথ পণ্ডিত একদিন আগেই চলে গেছেন ইনস্পেক্টর সাহেবের বিশেষ অনুরোধ-পত্র পেয়ে। এই নির্বাচন-পরীক্ষার পরীক্ষকদের মধ্যে শ্রীনাথ পণ্ডিতও একজন। আর সকলে অবশ্য গোপালগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষক।
গোপালগঞ্জ থানার প্রায় সব পাঠশালা থেকেই দু-একজন করে ছাত্র টেস্ট পরীক্ষা দিতে এসেছে। সব মিলে প্রায় দেড়শো। তার থেকে পরীক্ষা করে মনোনীত করা হবে মাত্র পঁচিশ জন। বৃত্তি পরীক্ষা দেবে কেবল সেই মনোনীত ছাত্ররাই।
রুনু গোপালগঞ্জ যাচ্ছে এই প্রথম। এতটা পথ একনাগাড়ে হাঁটা ওর এই প্রথম। মা বলেছিলেন নৌকোর ব্যবস্থা করতে। নৌকোর পথ অবশ্য অনেক ঘুর-পথ। যেতে হয় মধুমতী দিয়ে লাইনের খাল ধরে হরিদাসপুর ঘুরে। জলপথে প্রায় দশ-বারো মাইল।
'একটানা হাঁটা পথ থাকতি সাতরাজ্যি ঘুরে নৌকোয় যাতি হবে ক্যান? নটবরের সাথে গল্প করতি করতি চলে যাবে।' পণ্ডিতমশাই এক কথায় নাকচ করে দিলেন।
'নটবর শক্ত সমর্থ ছেলে। রুনুর প্রায় ডবল বয়স। ওর সঙ্গে রুনুর তুলনা? ও তো শত শত বার গোপালগঞ্জে গেছে আইছে।' মা প্রতিবাদ করেন। 'রুনুর দুর্বল শরীর। অতো পথ হাটলে...'
ধমক দিয়ে মাকে থামিয়ে দেন পণ্ডিতমশাই, 'তুমি নিজে যেমন তিন পাও হাঁটতি পারো না, দুনিয়াসুদ্ধ সবাইয়ে ভাবো তোমার মত। এইটুকু পথ হাঁটলি পায়ে ফোসকা পড়বে না তোমার ছলের।'
ফোসকা কিন্তু সত্যিই পড়ল। রুনুর নতুন জুতো আধ মাইল যেতে না যেতেই ওর দুই পায়ে নানা সাইজের অনেকগুলি ফোসকা বানিয়ে দিয়ে পা ছেড়ে হাতে চড়ল। পণ্ডিতের ছেলের বৈশিষ্ট্য বিসজর্ন দিয়ে কাপালীর ছেলে নটবরের সঙ্গে ধূলো পায়ে গোপালগঞ্জ যখন পৌঁছল, তখন ও ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেছে।
পাকা রাস্তা, টিউব কল, কোর্ট-কাছারী, দালানকোঠা সবই দেখল রুনু সারা পথ ধরে যেমন শুনেছিল নটবরের কাছে। কিন্তু না বিস্ময়, না আনন্দ। পরীক্ষার দুর্ভাবনাটাই সব আনন্দ শুষে নিয়েছে ওর। তার উপর আবার জুতোর জ্বালা। শহরে এসেই নটবরের পরামর্শে আবার জুতো পরতে হয়েছে। নটবরের অবশ্য জুতোর বালাই নেই। তাই আছে বেশ খুশ-মেজাজে।
পরীক্ষার হলে একটি ছেলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সকলের। রুনুরও।
ভারী চটপটে ছেলে। চমৎকার সাজগোজ। দেখতেও খুব সুন্দর। এর ওর কথা থেকেই জানা গেল, সে নাকি গোপালগঞ্জের এস.ডি.ও.-র ছেলে। নাম অমিতাভ।
দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে রুনুও অনেকের। কেবল সারা হলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলে বলেই নয়, বিখ্যাত শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছেলে বলেও। অনেকেই প্রশ্ন করেছে, 'তুমি শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছেলে?'
রুনু বিনীতভাবে মাথা নেড়েছে। কোন কোন শিক্ষক বলেছেন, 'গোবরা পাঠশালা থেকে এসেছ? তবে তো ফার্স্ট হবেই।'
সেই এস.ডি.ও.-ও ছেলেও এসে একবার কথা কয়ে গেল রুনুর সঙ্গে।
'তুমি শ্রীনাথ পণ্ডিতমশাইয়ের ছেলে?'
'হ্যাঁ!'
'তুমি তো তাহলে নিশ্চয় বৃত্তি পাবে। মায়ের কাছে শুনেছি সাংঘাতিক পণ্ডিত তোমার বাবা। তাঁর সব ছাত্র বৃত্তি পায়!'
'আমি পাব না।' মুখ কালো করে বলেছে রুনু, 'আমার ভয় করতিছে।'
'আমি তো ফেল করব।' হেসে বলে অমিতাভ, 'আমার তো ভয় করছে না।'
শুরু হয়ে গেল পরীক্ষা ঠিক দশটায়।
কেবল অঙ্ক আর বাংলা লিখিত পরীক্ষা। আর সব বিষয়েই মৌখিক পরীক্ষা। বিকেল পাঁচটার আগেই পরীক্ষা শেষ। বিশ-পঁচিশজন শিক্ষক মিলে একসঙ্গে খাতা দেখে রাত আটটায় পরীক্ষার ফল ঘোষণা করলেন।
পরীক্ষার পর ছাত্ররা প্রায় সকলেই চলে গেছে। রয়েছেন শিক্ষকেরা। কিছু কিছু দূরের ছাত্রও রয়ে গেছে যারা যাবে তাদের শিক্ষকের সঙ্গে। রয়ে গেছে রুনু আর নটবরও।
পরীক্ষার শুরু থেকেই রুনুর মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করছিল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল বারবার। কাগজে কোন প্রশ্নের কি জবাব লিখল কিছুই খেয়াল নেই। গুরুগম্ভীর সব অচেনা মাস্টার মশাইদের কাছে কোন মৌখিক প্রশ্নের কি জবাব দিল, কিছুই মনে করতে পারছে না। আটটা বাজার আগেই কম্প দিয়ে জ্বর এল রুনুর।
একটা হলঘরে গম্ভীর মুখে সকলে প্রতীক্ষা করছে। এমন সময় একটি লোক এসে বলল, 'রণজিৎকুমার কে? তাকে ইনস্পেক্টর সাহেব ডাকছেন। এস আমার সঙ্গে।'
কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল রুনু। লোকটির পিছনে পিছনে এল স্কুলের অফিস ঘরে। যে ঘরে তখন ইনস্পেক্টর সাহেবের সামনে বসে আছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। আশে পাশে রয়েছেন আরও প্রায় পনের-বিশজন শিক্ষক।
রুনুকে হাতের ইঙ্গিতে কাছে ডাকলেন ইনস্পেক্টর সাহেব।
পাংশু মুখে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি রুনুকে একটি কড়া কানমলা দিয়ে বললেন, 'শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছেলে হয়ে তুই ফেল করলি!'
সেই থেকে যে কান্না শুরু হয়েছে রুনুর সে কান্না চলেছে সারা পথ। বাড়ি এসেও সে কান্না থামেনি। কানের ব্যথাই বড় ব্যথা নয়, ওর আসল ব্যথা হল, টেস্ট পরীক্ষায় মনোনীত পঁচিশজনের মধ্যে প্রথম হয়েছে নটবর।
তিনদিন বাদে ইনস্পেক্টর অফিস থেকে একখানা চিঠি পেলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। তাতে জানানো হয়েছে, মনোনীতের সংখ্যা পঁচিশ থেকে তিরিশ করা হয়েছে। এবং সেই অতিরিক্ত পাঁচজনের মধ্যে রুনুও একজন।
পণ্ডিতমশাই এটা চাননি। আশাও করেননি। খুশিও হলেন না। এ যেন শ্রীনাথ পণ্ডিতের মুখ চেয়ে একটু কৃপাভিক্ষা। এ ভিক্ষা উনি নেবেন না। আহত অভিমানে চিঠি লিখতে বসলেন ইনস্পেক্টরকে। হাত চেপে ধরে বাধা দিলেন রুনুর মা, 'শোনেন, আমার কথা শোনেন। ইনস্পেক্টর সাহেবের উপর রাগ করবেন না। তিনি আপনার অসম্মান করতি চান নাই। বরং সমস্ত পণ্ডিতির মধ্যে আপনারই সবচেয়ে বেশি সম্মান করেন। আপনি তো জানেন, রুনু খারাপ ছাত্র না। নতুন জাগায় পড়ে পেত্থোম দিন একটু ঘাবড়ায় গিছিল। তিনি হয়তো সেডা বুঝেই ওরে নেছেন। এখন এই সব লেখালেখি করতি গেলি তাঁরে অসম্মান করা হবে।'
চিন্তিত হলেন পণ্ডিতমশাই। উত্তেজনার মুখে এদিকটা ভাবেননি।
রুনুর মা আবার বললেন, 'এবার যেমন ভয় ভাঙল, তেমনি লজ্জাও পাইছে খুব। শ্রীমানের আবার আত্মসম্মানজ্ঞান খুব কড়া। দ্যাখবেন, শ্যাষ পরীক্ষায় নটবররে ও হারাবেই। খুব জেদী ছেলে রুনু।'
হার মানলেন পণ্ডিত মশাই।
মায়ের কাছে উৎসাহ পেয়ে রুনু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, নটবরকে ও হারাবেই। হয়তো পণ্ডিত মশাইও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন রুনুকে দিয়ে বৃত্তি পাওয়াবেনই।
প্রকাশ্যে যেটুকু পড়ত, সেটুকু তো রইলই। এ ছাড়াও শুরু হল গোপন পড়া। গোপন পাঠের স্থান হল বাড়ির উত্তর দিকের আম বাগান। একটা আম গাছের তিনখানা ডাল এমন কায়দায় সাজিয়েছেন ভগবান, যেন রুনুর জন্যেই তৈরি একখানা ইজি চেয়ার। চারিদিকে আগাছা জঙ্গলে বেশ সুরক্ষিত একটি গুহা যেন। ওই গোপন গুহাই হল রুনুর দ্বিতীয় পড়ার ঘর। এ পড়ার খবর কেউ জানবে না কোনো দিন। নটবর তো নয়ই।
গোপন পাঠের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে স্কুলের সাপ্তাহিক পরীক্ষার খাতায়। পণ্ডিত মশাই পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে যাচ্ছেন। রুনুর খাতায় একেবারে যে কলম ছোঁয়ানো যায় না।
ফাইন্যাল পরীক্ষা হয়ে গেল নভেম্বরের মাঝামাঝি।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে একদিন শ্রীনাথ পণ্ডিত নিজে কাঁধে করে বয়ে আনলেন এক ঝুড়ি কমলা আর এক হাঁড়ি মিষ্টি। বোঝা নামিয়েই পলায়মান রুনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'আমার মুখ রাখিছিস ব্যাটা! বৃত্তি পাইছিস। ফার্স্ট হইছিস।'
পণ্ডিত মশাইয়ের মুখে আশ্চর্য সুন্দর একটা হাসি। ও মুখে এমন হাসি আর দেখেনি রুনু কোনো দিন। সারা দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে রুনুর।
ইতিমধ্যে মা এসে পড়েছেন। তাঁর মুখেও সেই হাসি। বলেন, 'আমি কইছিলাম না, রুনু নিশ্চয় বিত্তি পাবে!' একটানে রুনুকে পণ্ডিত মশাইয়ের কাছ থেকে লুফে নিলেন মা। তারপর বললেন, 'নটবরও বৃত্তি পাইছে তো? সে বুঝি সেকেণ্ড হইছে?'
'নাঃ, হতভাগাডা কি যে করল এবার!' বলতে বলতে পণ্ডিত মশাই ব্যস্তভাবে বেরিয়ে পড়লে 'যাই, সবাইরে খবর দিয়ে আসি। হরির লুট দিতে হবে। মিষ্টিমুখ করাতি হবে আজ সবাইরে। ফল মিষ্টিডা তুলে রাহো।'
বৃত্তি পাওয়ার অর্থটা তখনও স্পষ্ট হয়নি রুনুর কাছে। এ পরীক্ষার ও যে নটবরের চেয়ে ভাল ছাত্র হতে পেরেছে এইটুকুও ওর কামনা ছিল। মা সরস্বতী ওর সে প্রার্থনা যে মঞ্জুর করেছেন, তাতেই কৃতার্থ হয়ে গেছে রুনু।
পরীক্ষা হয়েছিল নভেম্বরের মাঝামাঝি, পরীক্ষার ফল বের হল জানুয়ারি প্রথম দিকে। মাঝে প্রায় দু-মাস সময়। এই সময়টা রুনুর জীবনের একটা যেন অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
পরীক্ষার পড়া নেই, স্কুলে বাবার তাড়া নেই, নেই পণ্ডিত মশাইয়ের রক্তচক্ষু শাসন। দাদার ব্যবহারে বন্ধুসুলভ প্রশ্রয় আর অন্তরঙ্গ সখা হরেকেষ্ট তো প্রায় সারাক্ষণই সাথে সাথে।
হরেকেষ্টকে তো চিনতই, এবার চিনল ওদের পুরো সংসারটাই।
নিতাই বৈরাগীর ক্ষুদ্র সংসার। বৈরাগী বৈষ্ণবী আর পুত্র হরেকেষ্ট। আগে রুনুর মেলামেশায় যে সব বাধানিষেধ ছিল, এই ছুটির সময়টা সে সব যেন আস্তে আস্তে উঠে গেল। মুক্তপক্ষ পাখির অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় সে। কখনও দাদার সঙ্গে, কখনও হরেকেষ্ট সঙ্গী। প্রায় প্রতিদিনই যায় হরেকেষ্টদের বাড়ি। বৈরাগী বৈষ্ণবী দুজনেই রুনুকে খুব ভালবাসেন। নানান গল্প করেন।
জীর্ণ নীলকুঠী বাড়িটাকে লোকে বলে 'হাউস।' সব ভেঙে চুরে এখন একটা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে হাউজ। লোকে বলে হাউজের জঙ্গল। সেই হাউজের জঙ্গলের ধারেই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তার পূব দিকে নিতাই বৈরাগীর ক্ষুদ্র কুঁড়েঘরখানা। রুনুদের বাড়ি রাস্তার পশ্চিম ধারে নতুন চরের উপর। মাঝে পড়ে ছোট গাঙ। সে ছোট গাঙ তো বর্ষার কয়েক মাস ছাড়া সারা বছরই সবুজ মাঠ! ছোট গাঙ পেরিয়ে আসে রুনু এক দৌড়ে। দু-মিনিটও লাগে না। এসেই গড়িয়ে পড়ে ওদের ধপধপে মেঝের উপর। আর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে বৈষ্ণবী। ওকে কোলে তুলে নিয়ে অদৃশ্য ধুলো ঝেড়ে দেয় আঁচল দিয়ে। এই আদরটুকুর লোভেই বুঝি মেঝেয় গড়াবার খেলাটা এত ভাল লাগে রুনুর।
দাদার যেমন পাকা হাত মৎস্য শিকারে, পক্ষী শিকারে তেমনি হরেকেষ্টর পাকা হাত। দুজনেরই শিকার সঙ্গী হয় রুনু যখন যেমন খুশি।
হরেকেষ্টর হাতে থাকে রাবারের গুলতি, রুনুর দু'পকেট ভরতি গুলি। দুই বন্ধুতে পাখির পেছনে পেছনে ঘুরতে ঘুরতে চলে যায় দূর দূর বনে জঙ্গলে। শুধু কি গুলতি, হরেকেষ্টর একটা বন্দুকও আছে। একেবারে নিজের হাতের তৈরী বাঁশের বন্দুক। হিজল ফল যে বন্দুকের গুলি। সে বন্দুকের আওয়াজ হয় প্রায় আসল বন্দুকের মতই। কেবল ধোঁয়াই হয় না। পাখি মারলেও মরতে পারে সে বন্দুকে, কিন্তু পোকা-মাকড় মাছি-টাছি নির্ঘাত মরবে যদি ঠিক মত গুলি লাগে।
গুলতি দিয়ে পক্ষী শিকারের ব্যাপারে একটা প্রস্তুতি পর্ব আছে। অর্থাৎ গুলি পাকানো, শুকোনো, আগুনে পোড়ানো ইত্যাদি।
যে-সে মাটিতে তো আর গুলি হবে না, সে জন্যে চাই আসল এঁটেল মাটি। আগে কেবল হরেকেষ্টই জানত কোথায় আছে সেই বিশেষ মাটি। এবার রুনুকেও চিনিয়ে দিল জায়গাটা।
ঘুম ভাঙতেই দুটিতেই চলে যায় মাইলখানেক দূরের সেই গোপন জায়গায়। মহা উৎসাহে কড়া রোদ মাথায় করে দুজনে গুলি পাকায়, তারপর রোদে শুকোয়। তার পর আঁচল ভরতি করে নিয়ে আসে বাড়িতে। এরপরে বৈষ্ণবীর হাতে পায়ে ধরতে হয় উনুনে সেগুলি পুড়িয়ে পোক্ত করার জন্যে। বাস, তৈরী হল পাকা মাল। এ গুলির একটা তোমার চোখে লাগলে তুমি কানা! কুকুরের গায় লাগলে কেঁউ কেঁউ করে কাঁদবে এক ঘণ্টা ধরে। আর পাখির গায়ে যদি লাগাতে পার, ব্যাস খতম!
হরেকেষ্ট অবশ্য আস্ত একটা পাখি এখনও শিকার করতে পারেনি। কিন্তু পাখির পালক শিকার করেছে বেশ কয়েকটা। স্বচক্ষে দেখেছে রুনু। ওর হাতে দারুণ তাক। প্রায় গুলিই যায় পাখিদের গা ঘেঁষে। কয়েকটা তো ডানায় পর্যন্ত লেগেছে। আর তাইতেই তো পালকগুলি শিকার করা গেছে। আর একটু সরে বুকে অথবা চোখে লাগলেই তো হয়েছিল বাজি মাত। একদা ও যে একটা আস্ত পাখি শিকার করবেই, তাতে রুনুর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
মাঝে মাঝে দয়া করে রুনুর হাতেও গুলতিটা দেয় হরেকেষ্ট। সে সব ক্ষেত্রে রুনুর গুলিতে তার তাক-করা পাখি হয়তো নড়েও না, ঠিকও পায় না। কিন্তু রুনু হাড়ে হাড়ে টের পায় তার গুলির তেজ। ওর বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলটা থেঁতলে যায়। তখন গুলতি ফেলে আঙুল টিপে বসে পড়ে রুনু। বীর পুরুষ রুনু যদিও কাঁদে না, কিন্তু চোখ মুখের যা চেহারা হয়, তা দেখে না হেসে পারে না হরেকেষ্ট।
এই আনাড়ী রুনুই কিন্তু একদিন এক কাণ্ড করে বসল।
খেজুর গাছের নালিতে বসে তখন ফোঁটা ফোঁটা রস খাচ্ছে বাচ্চা বুলবুলিটা। গভীর মনোযোগ তাক করে গুলি ছুঁড়ল রুনু। পাখিটা কেন যেন তখনই ফুবুৎ করে উড়ে গেল। হাত দশেক উড়ে যেতেই সে, পড়বি তো পড়, একবারে পাকা গোলন্দাজের গুলির মুখে। মুহূর্তে একটা ঘুরপাক খেয়ে ঝুপ করে মাটিতে পড়ে গেল বুলবুলিটা। পাখিটা তখনও একেবারে বাচ্চা। পাখা ভাল মত শক্ত হয়নি। উড়তে শেখেনি ভাল করে। দৌড়ে গিয়ে খপ করে ধরে ফেলল হরেকেষ্ট। বিজয় গর্বে নেচে উঠল রুনু।
'আমি মারিছি, আমি মারিছি। ওডা আমার পাখি, আমারে দ্যাও।'' রুনু লাফাতে থাকে।
'হ। তুমি মারিছ না আরও কিছু।'' হরেকেষ্ট ছাড়বার পাত্র নয়। তারপর পাখিটা নিয়ে কাড়াকাড়ি চলল কিছুক্ষণ। শেষে এক সময় পাখির বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গম্ভীর হয়ে গেল হরেকেষ্ট। একটানে রুনুর হাত থেকে গুলতিটা ছিনিয়ে নিয়ে সোজা চলে গেল তাদের বাড়ি। ফিরেও তাকায় না।
যাক চলে। রুনুর ভারী বয়ে গেল! পাখিটা পরম যত্নে দু-হাতে তুলে নিয়ে রুনু ছুটল বাড়ির দিকে। এই কৃতিত্বের খবর দেশসুদ্ধ মানুষকে জানাতে হবে না?
পথেই দাদার সঙ্গে দেখা।
'কি রে দৌড়োচ্ছিস ক্যান? হাতে ওডা কি?' ইন্দ্র হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিল রুনুকে।
রুনু ততক্ষণে ঘেমে নেয়ে উঠেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, 'দ্যাখো, কি সুন্দর পাখিডা। আমি মারিছি। গুলতি দিয়ে মারিছি।'
'তুই মারিছিস? ইস! মিথ্যে কথা।'
'সত্যি, তিন সত্যি কলাম। মাইরি, বিদ্যের কিরে।' রুনু তখন বিষম উত্তেজিত।
'দেহি দেহি। সত্যি তো খুব সুন্দর রে। ময়না পাখির বাচ্ছা। ঠিক মত পুষতি পারলি দেহিস, কথা কবে। ঠিক মানুষের মত কথা কবে।' উৎসাহিত হয়ে ওঠে ইন্দ্রও।
'দূর, এডা তো বুলবুলি। হরেকেষ্টদা যে কলো।'
'দূর বলদা! এডা তো ময়না।' রুনুর হাত থেকে বাচ্চাটা নিতে নিতে বলল ইন্দ্র।
এটা ময়না হোক বা বুলবুলি হোক, রুনু তা নিয়ে ভাবছে না। ও যে একজন যথার্থ শিকারি হয়েছে, এই গর্বেই ওর বুক ফাটার দশা।
হাতের উপর পাখিটা একটু নাড়াচাড়া করেই ইন্দ্র মুখ বিকৃত করে বলে, 'ইস পুষবি কি রে! এডা তো মরে কাঠ হয়ে গেছে। এ রামঃ!'
ঘেন্নায় ছুঁড়ে ফেলে দিল খানিক দূরে।
কেমন এক রকম অদ্ভুত চোখে মরা বাচ্চাটার দিকে চেয়ে থাকে রুনু। দাদার উপর রাগ হয় না, হরেকেষ্টর উপর রাগ হয় না। একটা অসহ্য ব্যথায় আর আক্রোশে নিজেরই হাত কামড়াতে ইচ্ছে হয় কেবল। সহসা ওর দু-চোখ ভরে গেল জলে।
'মরে গেছে? সত্যি মরে গেছে।' কেঁদে ফেলল রুনু।
'দূর বোকা, কাঁদিস ক্যান? আয় ওডারে আমরা কবর দেই। ওডারও তো এট্টা আত্মা আছে।' পরম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলে ইন্দ্র।
আত্মাতত্ত্ব শুনবার মত মনের অবস্থা তখন রুনুর নয়। ও মুখ ভার করে বসে থাকে গাছতলায়। দাদার পকেটে ছুরি থাকে সব সময়। সেই ছুরি দিয়ে দক্ষ হাতে কবর খুঁড়তে শুরু করেছে সে।
এই ছুটির দিনগুলিতে ছোট গাঙকেও যেন নতুন করে চিনল রুনু। উত্তর দক্ষিণে প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ সবুজ মাঠটা মধুমতীর সাবেক শয্যা। শুকনোর সময় ছোটো গাঙের বুকে দাগ কেটে কেটে ফুটবল খেলার মাঠ, দেড়ে বাঁধার কোট, হা-ডু-ডুর কোট তৈরী হয়ে যায়। ওখানে খেলার অন্ত নেই। সারা দিন খেলা। কেউ ঘুড়ি উড়োয়, কেউ ডাংগুলি খেলে, কেউ বা খেলার দর্শক শুধু।
বর্ষার সময় এই মাঠই হয়ে যায় ছোটখাট এক নদী। উত্তরে বুড়ো বটতলায় গিয়ে ছোট গাঙ মিলিত হয় বড় গাঙের সাথে। দক্ষিণেও গিরিশনগরের কাছে কোথায় যেন মধুমতীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তখন বড় বড় নৌকা পাল তুলে, লগি বেয়ে যায় ছোট গাঙ দিয়ে। তখন নতুন চরের মানুষ ডিঙি নৌকোয় ছোট গাঙ পাড়ি দিয়ে বড় রাস্তায় ওঠে। রুনুদেরও স্কুলে যেতে হয় ডিঙি নৌকা করে।
রুনুর শৈশব স্মৃতির অনেকক্ষণ জুড়ে আছে এই ছোট গাঙ।
বর্ষা নামতেই ছোট গাঙে দেখা দেয় উজোনে মাছ। মাছ ধরার যেন উৎসব লেগে যায় তখন। গামছা, চালুনী ইত্যাদি যার যা অস্ত্র আছে তাই নিয়ে নেমে পড়ে সব। এ ব্যাপারে ইন্দ্রর অতিশয় পাকা হাত। রুনু তখন হয় দাদার শিকারসহচর। মাছ ধরার চেয়ে মাছের লুকোচুরি খেলা দেখতেই রুনুর আমোদ বেশি। সবুজ ঘাসের উপর অল্প একটু জলস্রোত। তার মধ্যে মাছের ছোটাছুটি, এর হাত ফসকে ওর হাতে গিয়ে ধরা পড়া —যেন মাছেদের এক মজার খেলা।
কত বিচিত্র রঙের ফড়িং আর প্রজাপতি যে ঘুরে বেড়ায় ছোট গাঙের ঘাসফুলে আর ঝোপজঙ্গলে, তার আর লেখাজোখা নেই। তাদের একটাকে ধরবার জন্যে কত দুপুর কেটে গেছে রুনুর রোদে রোদে ঘুরে!
বড় রাস্তার ধারে ধারে ছোট ছোট ডোবা। দু-একটা ডোবা বেশ বড়ও। বর্ষার পরেও সেগুলি ভরা থাকে টল টলে জলে। জলের উপর কলমিলতা, লজ্জাবতী লতা, আরও কত রঙ-বেরঙের শেওলা। কলমি ফুলকে ঘিরে ঘিরে প্রজাপতির নাচ দেখা, লজ্জাবতীকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে লজ্জা দেওয়া, জলের নীচে মাছেদের খেলা দেখা,—হারানো শৈশবের কত ছবি যে মনে পড়ে!
নিম্ন প্রাইমারিতে বৃত্তি পেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছে রুনু। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। পূজোর ছুটির আগে যে পরীক্ষা হয়েছে, তাতে রুনু হয়েছে প্রথম, আর হরেকেষ্ট দ্বিতীয়। কথা হয়েছে, আসছে বছর উচ্চ প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষা দেবে রুনু আর হরেকেষ্ট। নটবরের পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। তার বাপ মরে যাওয়ায় বড় ভাইরা তাকে বাপের কাজে লাগিয়েছে।
অন্যান্য বারের মত এবারও পণ্ডিতমশাই পুজোর ছুটিতে পুব দেশে গেছে। ও দেশে উনি ওস্তাদজিরূপে পরিচিত। বড় বড় গানের আসরে নিমন্ত্রণ থাকে প্রতিবারই।
পণ্ডিত মশাইয়ের অনুপস্থিতিতে স্বাধীনতার স্বাদটুকু মা-ও উপভোগ করতে চাইতেন। ছেলেমেয়েদের তো কথাই নেই। দিবারাত্র পণ্ডিতমশাইয়ের শাসনটা এত প্রত্যক্ষ যে, মাকে ওরা আর গুরুজনই ভাবে না। ভাবে বন্ধু—ওদের খেলার সাথী। সেবার তাই মায়ের নিষেধ অমান্য করে কবিগান শুনল রুনু দাদার সঙ্গে সারা রাত জেগে।
একে কার্তিকের হিম, তায় রাত জাগা। ধাক্কাটা কিন্তু পড়ল একা রুনুর উপরেই। সকাল থেকেই সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। জ্বরের সঙ্গে প্রবল কাশি। বুকের মধ্যে ঘড় ঘড় আওয়াজ। বিছানায় কোনোভাবেই স্থির থাকতে পারছে না রুনু।
দুবেলা আসতে শুরু করলেন পঞ্চানন ডাক্তার। নাড়ী ধরে, বুক ঠুকে, পেট টিপে, জিভ দেখে ওষুধ দিলেন অনেক। কিন্তু জ্বর ছাড়ার নামও নেই। ভয় পেয়ে গেলেন রুনুর মা।
'উনি ফিরে আসার আগে রুনু সারে না উঠলি আমাগে আর রক্ষে থাকবে না। ভাল করে দ্যাখো বাবা।' ডাক্তারকে বলেন তিনি।
'ভয় পাবেন না, মা। সামান্য সর্দিজ্বর। আরও দিন দুই হয়তো ভোগাবে।'
ভয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেলেন ডাক্তারই। লক্ষণটা যেন টাইফয়েডের। নিজেই ছুটলেন তিনি গোপালগঞ্জে বড় ডাক্তার ডাকতে। পথেই পণ্ডিত মশাইয়ের সঙ্গে দেখা। খবর যা দেবার পাঁচু ডাক্তারই দিলেন পণ্ডিত মশাইকে।
পণ্ডিত মশাই ধূলো পায়ে এসে দাঁড়ালেন রুনুর শিয়রে।
আতঙ্কে শিউরে উঠল রুনু। একশ অঙ্ক, ইংরাজী বাংলা পঁচিশখানা করে হাতের লেখা। তার যে কিছুই করা হয়নি।
কিন্তু কী দেখছে রুনু পণ্ডিত মশাইয়ের চোখে? আশ্চর্য স্নেহমাখা একজোড়া অপরাধী চোখ। কোমলভাবে হাত রাখেন রুনুর মাথায়। গম্ভীরভাবে নাড়ী ধরে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার তাকান ওর মুখের দিকে। এ চোখ বুঝি শাসন রুক্ষ সেই নির্মম পণ্ডিত মশাইয়ের চোখই নয়। সেই নরম স্নেহাতুর চোখের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে রুনু।
'ভয় নাই বাবা। এই তো আমি আইছি। কোনো ভয় নাই।'
রুনুর মন বলল, ভয় নেই। আর কোনো ভয় নেই। মরতেও ভয় নেই।
গোপালগঞ্জ থেকে বড় ডাক্তারও এলেন। ডাক্তারে জ্বরে যুদ্ধও চলল সমানে। কিন্তু থার্মোমিটারের পারা আর লাল দাগে নামে না। ভয় পেলেন বুঝি বড় ডাক্তারও। পণ্ডিতমশাই দিবারাত্র জপ করছেন। সন্ধ্যায় রুনুর শিয়রে বসে শিবাষ্টক, আদ্যাস্তব, নবগ্রহস্তর পাঠ করছেন। মা কাঁদছেন দিনরাত। সে কান্না কখনও কখনও রুনুর কানেও আসছে।
আর রুনু?
থেমে গেছে ওর সব অস্থিরতা। কাঁদবারও আর শক্তি নেই। ক্ষীণ চামড়ায় ঢাকা একটা কঙ্কাল বিছানায় পড়ে আছে একটা ভয়ঙ্কর প্রতীক্ষায়!
সন্ধ্যায় রোগীর ঘরে ধূপ-ধুনো দেওয়া হয়ে গেছে। পণ্ডিত মশাই রুনুর শিয়রে বসে তাঁর সাধা গলায় শিবাষ্টক পাঠ করছেন। মনে মনে রুনুও পাঠ করে চলেছে। শুনতে শুনতে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। এমন সময়—
'পণ্ডিত বাড়ি আছো?' বারান্দা থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠের ডাক ভেসে এল।
'আসুন আসুন গোসাঁইজি। কী সৌভাগ্য!' পণ্ডিত মশাই শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালেন।
'সৌভাগ্য! সৌভাগ্যডা হলো কিসি? তয় কি তোমার ছলডা ভাল হয়ে গেছে?'
'না না গোসাঁইজি, ভালো তো কিছু বুঝি না। ঐ তো বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইছে। জানি নে ঈশ্বরের কি ইচ্ছা!' ধরা গলায় বলেন পণ্ডিত মশাই।
গোসাঁইজি ত্রিশূল হাতে বসলেন এসে রুনুর শিয়রে।
ক্লান্ত চোখ মেলে দেখছে রুনু। মাথায় বিশাল জটাজাল। কপালে জ্বলজ্বলে সিঁদুর। বাহুতে রুদ্রাক্ষের বলয়। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। মালা নয়, যেন শিবকণ্ঠে বেষ্টিত ভুজঙ্গ। রুনুর শিয়রে বসেছেনও ধ্যানস্তিমিত নেত্রে শিবেরই মত যোগাসনে।
রুনুর তপ্ত ললাটে হাত রাখলেন তার শিবঠাকুর। মুহূর্তে যেন একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে গেল ওর সারা দেহে। ইতিমধ্যে শিবঠাকুর বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়ছেন আর হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রুনুর গায়ে, আশ্চর্য শীতল সেই হাত ওর মাথা থেকে ধীরে ধীরে নেমে এল পায়ের তলা পর্যন্ত। আঃ কী আরাম, কী আরাম! ঘুম এসে যাচ্ছে রুনুর। মন্ত্রপাঠ শেষ করে তিনটে ফুঁ দিলেন, 'ফুঃ-ফুঃ-ফুঃ!'
একটু পরে ডাকলেন 'খোকাবাবু?'
'আজ্ঞে।' রুনু নিজেই বিস্মিত হল ওর গলা দিয়ে এত সহজে কথাটা বেরিয়ে আসতে দেখে। তিন-চারদিন ধরে তো ও একটা কথাও বলতে পারেনি।
'বল, জ্বর নাই।'
'জ্বর নাই।' যন্ত্রচালিতের মত বলল রুনু।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন গোসাঁইজি। পণ্ডিত মশাইয়ের কাঁধে একটা চাপড় মেরে বললেন, 'তুমি খালি খালি ভয় পাইছিলে, পণ্ডিত। তোমার ছল তো ভাল আছে। কাল ওরে ভাত দিও।'
'কাল ভাত দেব! বলেন কি? ওর যে টাইফয়েড।'
'হাঃ হাঃ হাঃ, তুমি তো এট্টু কবিরাজী জানো। নাড়ী ধরে দ্যাহো না!'
রুনুর নাড়ী ধরে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন পণ্ডিত মশাই। একেবারে স্বাভাবিক।
ততক্ষণে দ্বিজু গোসাঁই অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেছে রুনু।
ইতিমধ্যে দাদা ও হরেকেষ্টর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে ওর পৃথিবীর পরিধি অনেক বেড়ে গেছে। দেখেছে ঋতুতে ঋতুতে পৃথিবীর রঙ ফেরা, মধুমতীর চেহারা বদল।
রুনুর সবচেয়ে ভালো লাগে গ্রীষ্মকালে মর্নিঙ স্কুলের দিনগুলি। সকালে কয়েক ঘণ্টা কোনো রকমে স্কুলে কাটানো। তারপর তো সারা দুপুর স্বাধীনতা। বৈশাখের দুপুরে বুড়োরা একটু না ঘুমিয়ে পারে না, আর সেই সুযোগেই বেরিয়ে পড়ে ছোটরা। বেরিয়ে পড়ে দাদার সঙ্গে রুনুও।
কবে কোন বাগানের আম চুরি করা হবে, কোথায় মাখা হবে, কিভাবে ভাগ হবে—সমস্ত ব্যাপারটা পরিচালনা করে ইন্দ্র। কেবল কায়েত পাড়ায় নয়, ইন্দ্রজিতের নেতৃত্ব বুনোপাড়া, কাপালীপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
গাছে চড়তে ইন্দ্রর জুড়ি নেই। সাবধানতা সতর্কতা ওর অসাধারণ। তাছাড়া ওর আছে একখানা চার আনা দামের ক্ষুরধার চাকু। ঘসা ঝিনুক একখানা অবশ্য অনেকের হাতেই থাকে। আমের খোসা ছাড়ানোটা তাতে ভালই হয়। কিন্তু আমমাখা খেতে হলে, আমকে যে কাটতে হবে কাগজের মতো পাতলা করে। সেই মহান কর্মের জন্যেই ইন্দ্রর ওই চকচকে চাকু। ওর মতো আম কুচোতে আজও পর্যন্ত পারেনি কেউ। তার পরেও আছে নুন, লঙ্কা ধনে পাতার নিখুঁত পরিমাণ-জ্ঞান। সবদিক ঠিক থাকলে তবেই হবে আসল আমমাখা। সে যেন রীতিমত একটা শিল্প। আম মাখার শিল্পে ইন্দ্র আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এমন কি মা পর্যন্ত প্রশংসা করেন ইন্দ্রকে এ বাবদে।
কথায় আছে—চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন। এক দিন শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তে হল ইন্দ্রজিৎকে। একে-বারে হাতে-নাতে ধরা। ধরে নিয়ে এসেছে মেছের পিয়ন। ইন্দ্রর পকেট ভরতি তখন আমের গুটি, হাতে সেই বিখ্যাত চাকু।
ধরে এনে সরাসরি পণ্ডিত মশাইয়ের সামনে ছেড়ে দিয়ে বলে, 'ইন্দির আমাগে টিয়েঠুঁটি গাছের আম চুরি করিছে। আগেও অনেকবার করিছে। ধরতি পারি নাই।'
মুহূর্তে পণ্ডিত মশাই ইন্দ্রর কানটা ধরে এমন একটা টান মারলেন যে, তিন হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল ইন্দ্র। ঘরময় রক্তের বন্যা। সেই বন্যায় ভাসতে থাকে ছড়িয়েপড়া আমের গুটিগুলি। আবার হাতের সেই ধারানো ছুরিখানাও কপালের মধ্যে বিঁধে গেছে ইঞ্চিখানেক। কানখানা পণ্ডিত মশাইয়ের হাতেই রয়ে গেল নাকি কে জানে!
ঘর ফাটানো আর্তনাদ জুড়ে দিল ইন্দ্র। তার উপরও চলতে থাকে প্রহার কিছুক্ষণ। শারি পরিমাণ দেখে ভয় পেয়ে যায় ফরিয়াদী মেছেরও। এক ফাঁকে পালিয়ে গেল সে।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই টোটকা-টুটকী চিকিৎসা করে ইন্দ্রর ছেঁড়া কান জুড়ে ফেললেন মা। আর সেই কদিন শুয়ে শুয়েই মেছেরকে সমুচিত শিক্ষাদানের পরিকল্পনাটা পাকা করে ফেলল ইন্দ্রজিৎ।
হঠাৎ একদিন দেখা গেল চিঠির থলি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেছের ছুটছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। ছুটছে আর চিৎকার করছে, 'ও আল্লা, গেলাম রে! ও আল্লা মলাম রে!'
ছুটছে আর দাড়ি উড়ছে, লুঙ্গি উড়ছে, জামা উড়ছে ফৎ-ফৎ করে। ছুটতে ছুটতে গা থেকে জামাটা খুলে ফেলল, লুঙ্গিটাও একসময় ছিঁড়ে দুভাগ হয়ে গেল। তবু তার ছোটার বিরাম নেই। ওকে যে এক ঝাঁক মৌমাছি তাড়া করেছে। শেষ পর্যন্ত মাইল দুই ছুটে একটা চষা ক্ষেতের মধ্যেই ভীষ্মের শরশয্যা নিল মেছের। ওর চুল দাড়ির জঙ্গলে তখন আটকা পড়ছে শত শত মৌমাছি।
কোন পথে মেছেরের নিত্য পোস্ট অফিসে আসা যাওয়া, কোথায় কোন রাস্তার উপর হেলা শিমুল ডালে আছে মস্ত মৌচাক—সব খবর ইন্দ্রর জানা। কেবল মোক্ষম মুহূর্তে মৌচাকে একটা ঢিল মারা। ইন্দ্রর পরিকল্পনা ছিল পাকা। হাতের তাকও পাকা। সুতরাং—
দু-সপ্তাহ বাদে চুল কামিয়ে, দাড়ি কামিয়ে আবার যেদিন চিঠির থলি কাঁধে দর্শন দিল মেছের, তখন আর তাকে চেনা যায় না।
অবসর পেলেই মধুমতীর পাড়ে ঘুরে বেড়ানো রুনুর একটা প্রিয় নেশা। কোনো সঙ্গী নয়, কোনো কথা নয়, শুধু একাকী দাঁড়িয়ে থাকা আর চোখ মেলে দেখা। দেখতে দেখতে গ্রীষ্ম গেল, বর্ষা গেল। বর্ষার মধুমতী বড় ভয়াল ভয়ঙ্করী। তখন আর টলটলে জল নয়। কানায় কানায় ভরে যায়, কখনও পাড় ছাপিয়ে তীরের গ্রামের মধ্যে এসে পড়ে ঘোলা কাদাজল। প্রচণ্ড ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে সে কী মত্ত প্লাবন মধুমতীর। আর কী ভয়াল গর্জন। সে গর্জন শুনে রাত্রে মায়ের বুকের মধ্যে শুয়েও বুক কাঁপে রুনুর। ভাদ্র আসতেই মধুমতী শান্ত। আশ্বিনে তো মধুমতীর বুকেও উৎসব লেগে যায়। পাল তুলে, গুণ টেনে, দাঁড় বেয়ে, মধুমতীর উজান ঠেলে বিরাট বিরাট বোঝাই নৌকা তখন চলে যায় উত্তর দিকে। খুলনা, বরিশাল, কলকাতা থেকে নারকেল, সুপারী, তেল-মসলা, কাপড়-চোপড়, বাসনপত্র সব আসছে পূজার বাজারের জন্যে। উত্তরে গোপালগঞ্জ, ভেড়ার হাট, মাদারীপুর ইত্যাদি অনেক বন্দর। যেখানেই যাও, যেতে হবে এই পথ দিয়ে। আকাশে বাতাসে মাঠে বনে জঙ্গলে সর্বত্র যেন একটা পূজো-পূজো খুশির ঝিলিক।
পুজোর দিন পনের আগে থেকেই ওপারের এক পূজামণ্ডপ থেকে ভেসে আসে নাগরার গুরুগুরু আওয়াজ। আশ্চর্য একটা সুরের মায়া ছড়িয়ে যায় দিকে দিগন্তে। কত হিম-পড়া ভোরে, কত সোনা-মেঘ সন্ধ্যায় রুনু একা একা দাঁড়িয়ে শুনেছে ওপারের সেই মনকাড়া বাজনা। মন ছুটে গেছে ওপারের ঝাউ বনের আড়ালে সেই না দেখা পূজামণ্ডপে।
এ পারের গোপাল মালোর বাড়ির পুজোতেও খুবই আমোদ হয়, কিন্তু ওপারের মত এখানে তো নাগরা বাজে না। সে যেন কোনো এক মায়াপুরীর দিব্যসঙ্গীত।
রুনুর এবার উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষার বছর। গতবার পূজোর ছুটিতে পণ্ডিতমশাইয়ের অনুপস্থিতিতে রাত জেগে কবিগান শুনে যা কাণ্ড করে বসেছিল রুনু, তাই ভেবে এবার আর পূজোর ছুটিতে পণ্ডিতমশাই বাইরে গেলেন না।
রুনুর এবার সব বারণ। গান শোনা বারণ, দুর্গা প্রতিমার ভাসান দেখা বারণ, রাত জেগে কালীপূজা দেখা বারণ, বাড়ির বার হওয়াও বারণ, পড়তে বারণ নেই শুধু।
কিন্তু বিড়ালের ভাগ্যে এবার হঠাৎ শিকে ছিঁড়ল। তার জন্যে অবশ্য মায়ের কাছে ও কৃতজ্ঞ।
গোপালগঞ্জে হয় কালীপূজার ভাসানের মেলা। সে মেলা দেখতে সারা গ্রামের, সারা দেশের বোধহয় সব মানুষই যাবে একমাত্র রুনু ছাড়া। দাদা, হরেকেষ্ট এবং পাড়ার আরও অনেক ছেলে সকাল থেকেই দল বেঁধেছে, আর সকাল থেকেই কেঁদে চলেছে রুনু।
শেষ পর্যন্ত মা গিয়ে আপিল করলেন পণ্ডিতমশাইয়ের দরবারে।
'না না ও সব মেলা-টেলা দ্যাখ্যা হবে না। এবার ওর পরীক্ষার বছর।' এক কথায় মিটিয়ে দিলেন তিনি।
'পরীক্ষার বছর বলেই তো কচ্ছি। ও একবার হাঁটা ওবোশ করে আসুক। আমোদে আমোদে যাবে সগুলির সাথে। ওব্যেশ হবে। সেবার হঠাৎ হাঁটায়ে নিয়ে কী কাণ্ডটা হলো মনে নাই?' আবার আবেদন করেন মা।
যুক্তিটা শেষ পর্যন্ত মানলেন পণ্ডিতমশাই।
'সন্ধ্যের আগেই কিন্তু বাড়ি আসা চাই।' হুকুম হল ইন্দ্রর উপর।
মেলা বসেছে গোপালগঞ্জ নদীর পাড়ে। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে স্টিমার স্টেশন। স্টেশন থেকেই বাঁধান পাড় বরাবর রাস্তা চলে গেছে উত্তরে।
প্রায় আধমাইল সোজা উত্তরে গিয়ে শহরের দিকে বাঁক নিয়েছে রাস্তা মিশন স্কুলের গা ঘেঁসে। মিশন স্কুলের সামনে প্রকাণ্ড মাঠ। মেলার কেন্দ্রটা যদিও ঐ মাঠে, কিন্তু দোকানপাট শুরু হয়ে গেছে স্টেশন থেকেই।
সারাপথ ধরে মেলার গল্প শুনেছে রুনু দাদার কাছে। এ মেলা দাদা দেখেছে অনেকবার। রুনুর জীবনে এই প্রথম। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটখানা কালী প্রতিমা নাকি আসে আর সারা মাঠ জুড়ে ঢাক বাজে হাজার হাজার। কোথাও লাঠি খেলা, কোথাও সড়কি খেলা। তারপর আছে নৌকা বাইচ। একশো দাঁড়ি, দুইশো দাঁড়ি সব বিশাল বিশাল বাইচের নৌকা। এক একখানা বাইচের নৌকার গলুই-ই নাকি তিরিশ-চল্লিশ হাত-লম্বা। মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো রাত্রে। রাত্রে হয় বাজি প্রতিযোগিতা। বাজিতে বাজিতে সারা আকাশ ছেয়ে যায়। সে যে সব কী আশ্চর্য বাজি, তা না দেখলে মুখে বলে বোঝানো যাবে না।
নদীর পাড় দিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগোচ্ছে ওরা।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা শিশু কণ্ঠের ডাক শোনা গেল: 'রণজিৎ ও রণজিৎ।'
কে কোনদিক থেকে ডাকছে বুঝতে পারে না রুনু। দেখিয়ে দিল দাদা।
'তোরে বোধহয় সেই এস.ডি.ও.-র ছেলে ডাকতিছে। ওই তো এস.ডি.ও.-র বাংলো। দ্যাখ তো ওই বারান্দায় যে ছেলেডা সে-ই বোধহয়...।'
দেখল রুনু। চোখাচোখি হতেই অমিতাভ ওকে হাতের ইশারা করল বারান্দা থেকে।
'তুই যা। তাড়াতাড়ি আসিস। আমি ওই টেলিগ্রাফের থামের কাছে থাকব।'
রুনুর হাত ধরে ওদের ড্রইংরুমে নিয়ে এল অমিতাভ। ওকে একখানা গদিমোড়া চেয়ার দেখিয়ে বলল, 'তুমি বসো, আমি মাকে ডাকছি। মা তোমাকে চেনে।'
অমিতাভ ভিতরে চলে গেল চিৎকার করতে করতে, 'ওমা, দেখে যাও কাকে এনেছি।'
কী সর্বনাশ, ওই চেয়ারে বসবে রুনু! জীবনে তো ও কোনদিন চেয়ারেই বসেনি। চেয়ারে তো বসে গুরুজনেরা। তাছাড়া অমন চেয়ার তো ও দেখেও নি। এমন সাজানো গুছোনো ঘর, এমন চকচকে আলমারি, চেয়ার টেবিল সোফা এসব কি রাজবাড়িতে থাকে? এই কি রাজপুরী? অমিতাভ কি রাজপুত্র? আর ওর বাবা মা রাজারানি?
ও বোকা-বোকা চোখে দেখছে সব কিছু।
চার মাইল রাস্তার যতো ধুলো সব জড়িয়ে এনেছে রুনু তার দোদুল্যমান কোঁচায়। ঘেমে ওর জামাটা হয়েছে আরও কদর্য। হাঁটু পর্যন্ত ধূলোর পুরু আস্তরণ পড়ে গেছে। এই ঘরে যে অত্যন্ত বেমানান ও সেটা নিজেই বুঝতে পারছে। দারুণ অস্বস্তিতে আরও ঘেমে যাচ্ছে।
হঠাৎ যেন একটা পরী এসে ঢুকল সেই ঘরে। পরীটা ঘেন্না ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, 'এই ছোঁড়া, কেরে তুই? বেরো বেরো।'
পেছন থেকে অমিতাভ চিৎকার করে বলল, 'এই দিদি, কাকে কি বলছিস? ও যে আমার বন্ধু।'
'এখন বুঝি এই সব মুচি ম্যাথর বন্ধু জোটানো হচ্ছে! বহুত আচ্ছা। বলে দেব বাপিকে।'
কথা বলতে বলতে প্রজাপতির মত উড়ে বেরিয়ে গেল পরীটা। পেছনে দেখা গেল অমিতাভর মা আসছেন দু-হাতে দু-ডিশ খাবার নিয়ে।
'দাঁড়িয়ে আছ কেন বাবা? বোস।' ভারী মিষ্টি করে বললেন তিনি।
কিন্তু কোনো মিষ্টি খাবার আর চোখে পড়ছে না রুনুর। কানে ঢুকছে না কোনো মিষ্টি কথা। বুঝি চোখের জল গোপন করতেই নত হয়ে প্রণাম করল অমিতের মাকে।
মাথা তুলতেই তিনি বললেন, 'একি তোমার চোখে জল? কী হয়েছে?'
দুই হাতে চোখ ঢেকে পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল রুনু। পেছনে অমিতের ডাক, মায়ের স্নেহ কণ্ঠ, মিষ্টির লোভ, কিছুই আর ফেরাতে পারে না ওকে।
মেলা দেখার সব আনন্দ মুছে গেল মুহূর্তে। দৌড়ে গিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরেই এতক্ষণের অবরুদ্ধ কান্নাটা একেবারে বন্যার বেগে বেরিয়ে এল।
নানাভাবে প্রশ্ন করেও কিছুই বুঝতে পারল না ইন্দ্র। ওর এক কথা, 'আমি বাড়ি যাব। এক্ষুনি বাড়ি যাব। মেলা দেখব না।'
শেষ হয়ে গেল চারদিনব্যাপী উচ্চ প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষা। এবার পাঠানো হয়েছিল রুনু আর হরেকেষ্টকে।
পরীক্ষা ভালোই দিয়েছে রুনু। মন্দ হয়নি হরেকেষ্টরও। কিন্তু অঙ্কের উত্তর মেলাতে গিয়ে দেখা গেল দুটো অঙ্কই ভুল হয়ে গেছে হরেকেষ্টর। কেঁদে ফেলল হরেকেষ্ট।
তাই বলে পরীক্ষার পরের লম্বা ছুটিটাই তো আর কেঁদে কাটায় না কেউ। দুদিনেই ভুলে গেল পরীক্ষার কথা। দেখা যাবে ফল বেরুলে কি হয়।
বই খাতাপত্র সব তাকে উঠল। আর পড়তে হবে না এ সব বই। শেষ হল এ পাঠশালার পড়া।
খেলার সামগ্রীগুলি অনেকদিন ধরে পড়ে ছিল খাটের তলায়। অনেকদিন তাদের ছোঁয়া হয়নি। তাকানো যায়নি পৃথিবীর দিকেও।
ইতিমধ্যে শীত এসে গেছে। মাঠের সোনাবরণ ধান ক্ষেতগুলি রুক্ষ হয়ে গেছে। রুক্ষ হয়ে গেছে ঘন সবুজ কলাইশাকের ক্ষেতগুলিও। রুক্ষ হয়ে গেছে বুঝি সারা পৃথিবীটাই শীতের আগমনে। আনন্দ নেই কোথাও।
কে বলে আনন্দ নেই?
ওই যে খেজুর রস জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। তার মিষ্টি গন্ধে সারা বাড়ি ম ম। ধান উঠে গেছে গোলায়। ঢেঁকিশালে অহরহ ঢেঁকির পার পড়ছে। দারুণ কর্মব্যস্ত মা আর সেজদি। ধান কুটতে বুনোপাড়ার ভবি বুড়িকেও ডাকা হয়। সারাদিন ধান ভেনে ও পায় ভরপেট খাওয়া আর এক সের চাল।
মা আর সেজদি ব্যস্ত আছে চিড়ে কোটা, মুড়ি ভাজা, আর চালের গুঁড়ো করার কাজে।
দেখতে দেখতে অগ্রহায়ণ কেটে গেল। এসে পড়ল পৌষ। পৌষ এল কৃষকবধূর মুখে হাসি ফুটিয়ে। সেই খুশির বার্তা বয়ে নিয়ে এল হোলোই গাওয়ার দল। আটদশটি কৃষক ছেলের এক একটি দল। গায়ে জীর্ণ জোলাই চাদর না হয় শুধু একখানা গামছা। মাথায়ও গামছার পাগড়ি। প্রত্যেকের হাতে এক একখানা লাঠি। সন্ধের পরেই হোলোই গাওয়ার দল আসতে থাকে গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি। উঠোনে পা দিয়ে ওরা চিৎকার করে ধ্বনি দেবে, 'বাস্তে-এ-র বর, ধান চাল দে গোলা ভর।'
এই প্রায় দিগম্বর কৃষক-নন্দনেরাই বাস্তু ঠাকুরের প্রতীক। ওদের আশীর্বাদেই বুঝি সবার গোলা ভরে ওঠে ধান চালে। একের পর এক শ্লোক গেয়ে যায় ওরা। কোন পল্লী-কবি কবে এইসব শ্লোক রচনা করেছিল ওরা জানে না। মুখে মুখে শুনে শুনেই ওদের মুখস্থ হয়ে গেছে।
...পৌষ মাসের একাদশী, খড়গ আনো চন্দন ঘষি।
চন্দন পড়ে টোপে টোপে, বুড়ীরে কাটলাম এক্কে কোপে।।
শীতবুড়িকে এক কোপে কেটে ফেলল ওরা। এর পর আর শীত ওদের ভয় দেখাতে পারবে না। শীতকে গ্রাহ্য করে না পল্লীগ্রামের কোনো শিশুই। গ্রাহ্য করে না রুনুও।
শীতের প্রথম পরব নবান্ন। নতুন চালের পায়েসের সে কি স্বাদ! তার পরেই আসল উৎসব পৌষ পিঠে। কত রকম পিঠে পায়েস। তাছাড়াও আছে নতুন গুড় দিয়ে গরম গরম মুড়ি। গুড়ের পাটালী। এতসব ব্যাপারের মধ্যে শীতের কথা মনেও পড়ে না।
এত আনন্দের মধ্যেও একটা অবসাদ, একটা অসহ্য বিষণ্ণতা ঘিরে আছে রুনুকে সারাক্ষণ। তাই কোনো আনন্দেই সাড়া দেয় না ওর মন।
নিম্ম প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষার পর একবার বেজেছিল ছুটির ঘণ্টা। দু-বছর পর আবার বাজছে সেই ছুটির ঘণ্টা। তখন ও ভোর হতেই ছুটে আসত নদীর পাড়ে, দেখত মাছ ধরা। এখনও আসছে। দেখছে মাছ ধরা। তখনও ছিল নিত্যসঙ্গী হরেকেষ্ট, এখনও আছে। কিন্তু এবারের বাঁশির সুরটা যেন আলাদা। সেবারের বাঁশিতে ছিল ঘর ছড়ানো মন-মাতানো আনন্দের সুর, এবারের বাঁশিতে আসন্ন বিচ্ছেদের করুণ সুর।
সাঙ্গ হল গোবরা পাঠশালার পড়া। শুধু তো হরেকেষ্ট নয়, নয় শুধু সুশীলাদিও। পাঠশালার সব কটি ছাত্রের সঙ্গেই যেন একটা নাড়ী টান সৃষ্টি হয়ে গেছে। ওই স্কুলঘর, বেঞ্চির সেই নির্দিষ্ট কোণটা যেখানে ও ছুরি দিয়ে কেটে কেটে নিজের নাম লিখে রেখেছে, সেই বটগাছ, জোড়া মন্দির, এমন কি পেছনের সেই ভয়-ভয় বাগানটাও যেন ওর কত আপন হয়ে গেছে। সব ছেড়ে চলে যেতে হবে। প্রতিদিন যে পথে হেঁটেছে, যে পথের প্রতিটি গাছপালা ধূলোকণা পর্যন্ত ওর চেনা, সে-পথ দিয়ে আর ওকে হাঁটতে হবে না।
ও শুনেছে এবার ওকে ভর্তি করা হবে বাজুনিয়া মাইনর স্কুলে। বাজুনিয়ার কোন বাড়িতে থাকতে হবে-টবে সে সবও ঠিক করে এসেছেন পণ্ডিত মশাই। এখন পরীক্ষার ফলটা বের হতে যা দেরি।
পরীক্ষার ফলটা কোনোদিনই যদি না বেরোয়? অথবা যদি ফেল করে রুনু? ভাবতেই যে গা শিউরে ওঠে। সর্বনাশ রুনু ফেল করলে যে ওর পিতৃকুল কলঙ্কিত হবে। ও পণ্ডিতের ছেলে না?
বাজুনিয়ার কথা শুনেছে রুনু শশীদার কাছে। বাজুনিয়া বিলে দেশ। সেখানে নদী নেই। ওর ভূগোল পড়া বিদ্যায় যে দেশে নদী থাকে না সে দেশ তো মরুভূমি। সেই মরুভূমির দেশেই ওকে নির্বাসন দেবে বাবা। সেই গ্রাম থেকেই তো জন্মের মত খোঁড়া হয়ে এল শশীদা। ও গ্রামটা ভালো না। রুনুর মন বলে।
কথা বলেছিল রুনু নিতাই বৈরাগী আর বৈষ্ণবীর সঙ্গে। বলেছিল হরেকেষ্টকেও যদি বাজুনিয়া স্কুলে ভর্তি করা হয়, তো খুব ভালো হয়। ওরা দুজনে এক সঙ্গে বেশ পড়াশুনো করবে। যেমন করেছে এই কয় বৎসর।
শুনে দুজনেই যেন একেবারে চমকে উঠেছে, 'কও কি ছোটকত্তা? ওরে কোল ছাড়া করে থাকতি পারবে ক্যান ওর মা। পণ্ডিত মশায় দয়া করে এদ্দিন ফিরি পড়াইছেন তাই এইটুকু হল। এর পর কী আর হবে?'
সুশীলাদি তো এখন থেকেই কাঁদতে শুরু করেছে।
'তুমি বড় হবা। জজ ম্যাজিষ্টর হবা। দুঃখী দিদিরি কি আর মনে থাকবে?'
কথা শুনেই কান্না পেয়ে যায় রুনুর। সুশীলাদিকে কি ও ভুলতে পারবে এ জীবনে?
মুখ ভার হয়ে গেছে হরেকেষ্টরও। বিকেলে নদীর পাড়ে বসে বসে দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা নেই, কেবল রুনুর বিদেশে যাওয়ার কথা ছাড়া। একটা আসন্ন বিচ্ছেদবেদনা দুটি ছোট্ট বুকের মধ্যে মুচড়ে মুচড়ে গুমরে গুমরে ওঠে। কেউ কোনো কথা গুছিয়ে বলতে পারে না।
একদিন হঠাৎ এক বোঝা নতুন বই এনে পণ্ডিতমশাই তুলে দিলেন রুনুর হাতে। পেছনে নগরবাসীর মাথায় মস্ত কমলার ঝুড়ি আর পণ্ডিত মশাইয়ের মুখে সেই আশ্চর্য মিষ্টি হাসি দেখেই বুঝেছে রুনু। সঙ্গে সঙ্গে প্রণাম করল পণ্ডিত মশাইকে।
'মাত্র দুডো নম্বরের জন্যে সেকেন্ড হয়ে গেলি ব্যাটা। ফার্স্ট হয়েছে কোটালপাড়ার একটা পাঠশালা থেকে।'
মুখ কালো হয়ে গেল রুনুর।
'থাক, ও নিয়ে দুঃখু করিস না। মাইনরে ফার্স্ট হওয়া চাই। বই সব নিয়ে আলাম। এক ইংরেজি ছাড়া আর সব তো আমিই শিখেয়ে দিছি। এখনেত্তেই মনে উচ্চ আশা রাখতি হবে। এর পরে ম্যাটিকে বৃত্তি পাতি হবে। তার পর...'
ওসব বড় বড় বক্তৃতা শুনবার আর মন নেই রুনুর। ওর কানের মধ্যে একেবারে ঢঙ-ঢঙ-ঢঙ-ঢঙ করে বেজে উঠল বিদায় ঘণ্টা।
সারারাত আর ঘুমোতে পারল না রুনু। ছুঁয়েও দেখল না একবার বইগুলি।
সেই রাতেই পাঁজি দেখে যাত্রার শুভদিন স্থির করে ফেললেন পণ্ডিতমশাই। দুদিন পরেই সর্বসিদ্ধি ত্রয়োদশীর দিন যাত্রা করতে হবে বাজুনিয়া।
পাঁচ বছর আগে এক শুভদিনে রুনুর কপালে সাঁচি দই-এর ফোঁটা আর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে ঠাকুরের নির্মাল্য মাথায় ছুঁইয়ে ওকে পাঠশালে পাঠিয়ে ছিলেন মা। আজও এক শুভদিনে ওর কপালে এঁকে দিয়েছেন পবিত্র চন্দন আর শুদ্ধ দধির ফোঁটা। সেদিন মা ওকে চুমু খেয়েছিলেন হাসিমুখে, আজ মায়ের বিদায় চুম্বন চোখের জলে ভেজা। রুনুর চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে মা বলেন, 'কাঁদিস না বাবা। যাত্রার সময় কানতি নাই। মাস খানেক পরেই তো সরস্বতী পুজোর ছুটি। তখন....'
কথা শেষ না করেই চোখের জল গোপন করতে মুখ ফেরান মা।
পণ্ডিত মশাইয়ের ডিঙিতে ছই বাঁধা হয়ে গেছিল কালই। আজ নগরবাসী যথাসময়ে এসে মালপত্র সব তুলে ফেলেছে। পড়ে আছে শুধু দু একটা টুকি-টাকি।
হাল ধরে প্রস্তুত হয়ে বসে আছে নগরবাসী। পণ্ডিত মশাই আগেই উঠেছেন। ছই-এর মধ্যে বিছানা-টিছানা পেতে মালপত্র গুছিয়ে এবার হাঁক দিলেন, 'এবার উঠে আয় রুনু। আর দেরি করলি ভাটা পড়ে যাবে।'
স্নেহের বাঁধনটা আলগা হয়ে গেল। রুনু তাকাল মায়ের জলভরা চোখের দিকে। তাকাল একবার তীরে দাঁড়ানো সবক'টি মানুষের চোখের দিকে। সবগুলি চোখ যেন নীরব ভাষায় বলছে, 'যেতে নাহি দিব।'
সবাই এসেছে নদীর পাড়ে। হরেকেষ্ট এসেছে। সেজদি এসেছে। শশীদাকে নিয়ে সুশীলাদিও এসেছে। এসেছে স্কুলের অনেক ছাত্র। আসেনি কেবল দাদা। কেন এল না দাদা? অভিমান হয় রুনুর।
ন্যাকড়ায় বেঁধে কতকগুলি পেয়ারা এনেছে হরেকেষ্ট। ওদের বাড়ির সেই বিখ্যাত পেয়ারা, যার ভিতরটা লাল রঙের আর কি দারুণ মিষ্টি।
'মা তোমাকে খাতি দেছে এই পেয়ারা কয়ডা। আর এই চাকুখানা আমি তোমাকে দেলাম।' বেদনাভরা গলায় বলে হরেকেষ্ট।
হরেকেষ্টর সেই আশ্চর্য চাকু যার দুদিকে দু'খানা ফলা। সেই জিনিস সত্যিই দিয়ে দিল হরেকেষ্ট! রুনু যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
ধন্যবাদের ভাষা জানা নেই রুনুর। ওর কেবল আছে চোখের জল। সেই জলভরা চোখে মুগ্ধ বিস্ময়ে ও তাকিয়ে থাকে হরেকেষ্টর দিকে।
'তোমার জন্যি মোয়া আনিছি রুনু ভাই। কাল রাত ভো-ও-রে বানাইছি।' আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলে সুশীলাদি, 'মুড়ির মোয়া, চিড়ের মোয়া, তিলির মোয়া। যখন যেডা মন চায় খাবা।'
মোয়ার হাঁড়িটা শশীদার হাতে দিতে গিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল সুশীলাদি। শশীদা খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে রেখে এল হাঁড়িটা নৌকার উপর।
'চলে আয় রুনু। মাকে প্রণাম কব।' এবার পণ্ডিত মশাইয়ের গলায় বেশ ধ্মকের সুর।
স্নেহের বাঁধন ছিঁড়তে একটু জোরেই টান দিতে হয় যে।
মাকে প্রণাম করল রুনু। সুশীলাদিকেও প্রণাম করতে মাথা নুইয়েছে আর সঙ্গে সঙ্গে সুশীলাদি আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে গেল।
'কী সব্বোনাশ, আমারে না, আমারে না।'
রুনু তবু প্রণাম না করে ছাড়বে না। প্রণাম করবে ও শশীদাকেও।
শশীদা সে সুযোগই দিল না। মুহূর্তে ওকে কোলে তুলে নিয়ে খোঁড়া পায়েই এগিয়ে গেল ডিঙির কাছে। ওকে নৌকোর উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, 'খুব বিদ্বান হও। দ্যাশ জোড়া নাম-ডাক হোক।'
জলেই দাঁড়িয়ে রইল শশীদা।
জোয়ারের স্রোতে আর বাতাসের বেগে ছোট্ট ডিঙিখানা ছোট্ট রুনুকে বুকে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল উত্তর দিকে।
এত দিনের এত ভালবাসার মধুমতী, দুই তীরের মায়াময় রূপ, কিছুই আর চোখে পড়ছে না রুনুর। সব ঝাপসা, ছায়া-ছায়া। তীরের মানুষগুলি অস্পষ্ট। চারিদিক অস্পষ্ট যেন ঘষা কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখা একটা বৃষ্টি ভেজা পৃথিবী।
শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৭১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন