অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
—বুঝলি, আবার সেই ছেলেটা এসেছিল। আমাকে নিয়ে যেতে চাইছিল ওদের দেশে। আমি যাইনি। —ঘরের সব থেকে অন্ধকার কোণের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে বিড়বিড় করে আমাকে বলে উঠল পার্থ।
তারপরে আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ওর চুল উসকোখুসকো, গালে আগাছার মতো গজিয়ে-ওঠা খাবলা খাবলা দাড়ি।
ওর কথা শুনেই বুঝলাম, ওর আবার সেই পাগলামি শুরু হয়েছে।
স্কুলের বন্ধুদের একমাত্র আমিই ছিলাম যে ওকে কখনো পাগলা বলে ডাকতাম না। ওর নাম ধরে ডাকতাম। আমার আরও বেশ কয়েকজন ভালো বন্ধু থাকলেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমিই ছিলাম ওর একমাত্র বন্ধু।
তার একটা কারণ ছিল। মাঝেমধ্যে ও কীরকম যেন অদ্ভুতরকম ব্যবহার করত। আমরা তখন ক্লাস সিক্সে। ওর পাশে কেউ বসতে চাইত না। যদি কেউ বসতে চাইত, সেটা ওকে নিজে মজা করার জন্যেই। সেজন্য ও বসত বেঞ্চির একদম কোণে। তার পাশে আমি।
কেন জানি না সবাই যখন ওকে 'পাগলা' 'পাগলা' বলে খেপাত, আমার খুব খারাপ লাগত। মনে হত ওর পাশে আমার থাকা দরকার। ও তো কারো ক্ষতি করতে চায় না।
তবে খুব নিরীহ হলেও মাঝেমধ্যে এমন কিছু কাজ হঠাৎ করে করত, যা আমাকেও অবাক করে দিত। যেমন একদিন দেখি, লাল কালির একটা ফাউন্টেন পেন এনেছে। পাশে বসেছিলাম বলে খেয়াল করেছিলাম। দেখলাম, সেটা আমি দেখলেও অন্যদের থেকে আড়াল করে রেখেছিল। পরের দিন বুঝলাম কারণটা। আমাদের ক্লাসে রক্তিম আর আনন্দ দুজনেই বেশ খারাপ ছেলে। অন্যদের মারধর, ভালো জিনিস কেড়ে নেওয়া, অহেতুক মাতব্বরি—এসবই দুজনে মিলে করে। সেদিন স্কুলের টিফিনের সময় দেখি, দুজনের মধ্যে মারামারি লেগেছে। পরে জানলাম কারণটা। রক্তিমের সাদা শার্টের পিছনে লাল কালি ছিটিয়েছে আনন্দ। আনন্দ বরাবরই একটা লাল কালির পেন ব্যবহার করে। অন্য কেউ করে না। আনন্দ কিছুতেই সেটা স্বীকার করছে না। অবশ্য সেটা যে আনন্দ করেনি, পার্থ করেছে, সেটা শুধু আমি আন্দাজ করেছিলাম। কাউকে সে কথা বলিনি অবশ্য।

পার্থ পড়াশোনায় ভালো ছিল না। যদিও চেষ্টা খুব করত। ইন ফ্যাক্ট, আমাদের সবার থেকে অনেক বেশি পড়ত। কিন্তু সেভাবে কখনোই ভালো রেজাল্ট করতে পারত না। তবে এত মন দিয়ে পড়াশোনা করত বলে সময়ে সময়ে অনেকের ধারণাই ছিল যে ও বুঝি অনেক কিছু জানে। বিশেষ করে ইতিহাস নিয়ে দেখতাম, বেশ মোটা মোটা বই পড়ত। তা সেবারে ইতিহাস পরীক্ষার সময় ওর পাশে পড়ল সোমনাথের সিট। সোমনাথ ছিল টোকার এক্সপার্ট। পাশ থেকে দেখে টোকা ব্যাপারটাকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। কমা, ফুলস্টপ কিছুই বাদ দিত না।
কিছুদিন আগে সোমনাথ ক্লাসে ওর সেকশনের সবাইকে ওর বাড়িতে জন্মদিনে খাইয়েছিল। শুধু পার্থ বাদে। আমি বলতে বলেছিল, ধুর, ওই পাগলাটাকে আবার বাড়িতে ডাকা যায় নাকি!
কিন্তু পরীক্ষার সময় দেখি, সেসব ভুলে সারাক্ষণ টুকল পার্থর খাতা থেকে। আমি পরীক্ষার পরে বললাম পার্থকে, তুই এভাবে ওকে টুকতে দিয়ে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলি। সারাক্ষণ পুরো তোর খাতার দিকে চেয়ে লিখে গেল।
পার্থ কিছু বলল না। শুধু মুচকি হেসে বলল, ওই ছেলেটা প্ল্যানটা দিয়েছে। মজাটা দেখিস।
—কোন ছেলে?
—তুই তাকে চিনবি না। বলে ইচ্ছে করে এই ব্যাপারে আর কোনো কথা না বলে অন্যদিকে চলে গেল।
কিছুদিন বাদে ইতিহাসের পরীক্ষার নাম্বার জানানোর সময় হরেনবাবু ওদের দুজনকে কাছে ডাকলেন। ওদের খাতা দুটো বার করে বলে উঠলেন, দুজনেরই এক উত্তর, শুধু এক উত্তর নয়, প্রায় সব ভুল উত্তর। বলে না অন্ধ অন্ধকে পথ দেখালে কী হয়! তবু পার্থকে আমি একশোয় কুড়ি দিয়েছি, ও সৎভাবে চেষ্টা করেছে বলে। বলে একটু থেমে এবারে সোমনাথের কান দুটো বেশ জোরে টেনে বলে উঠলেন, বলি, টোকার সময় কার খাতা দেখে টুকছ, কী টুকছ, সেটুকু বোঝার জন্যেও ঘটে বুদ্ধি থাকা দরকার।
বলি, সিপাহি বিদ্রোহে রবীন্দ্রনাথ নেতৃত্ব দিয়েছিল? আর তাজমহল তৈরি করেছে ভগৎ সিং! কাল বাবা-মা-কে স্কুলে আসতে বলবে। হেডস্যারের ঘরে।
পার্থ স্কুল থেকে বেরোনোর সময় শুধু আমাকে বলল, ইচ্ছে করে সব ভুল লিখেছি, যাতে ও ঠিক ধরা পড়ে।
বলে বিড়বিড় করে ফের বলে উঠল,ছেলেটার বুদ্ধি আছে।
পার্থকে কখনো কখনো একদম স্বাভাবিক মনে হত। কিন্তু পরীক্ষা কাছে এলেই যেন সেই টেনশনে ওর পাগলামি বেড়ে যেত। তখন মাঝেমধ্যে ও স্কুলে আসত না। আমি তখন ওর বাড়ি যেতাম। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন।
আসলে উনি জানতেন আমিই ওর একমাত্র বন্ধু। ওকে বুঝি। ও দুঃখ পায় এমন কিছু করি না। সেজন্য আমি ওদের বাড়ি গেলেই খুব খুশি হয়ে আমার জন্যে ভালো ভালো খাবার বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কিন্তু আবার ওর যখন এই আধপাগল অবস্থা হত, তখন মনে হত, মাঝেমধ্যে উনি যেন খুব ভেঙে পড়তেন। যেন খুব অসহায় হয়ে পড়তেন।
পার্থর বাবা মারা গিয়েছিল। সেজন্য পুরো দায়িত্বটাই এসে পড়েছিল মাসিমার উপরে। উনি কোথায় জানি কাজ করতেন। কিন্তু অনেকদিনই যেতে পারতেন না পার্থর এইরকম অবস্থার জন্যে। পার্থের আরেক খুব প্রিয়জন ছিল ওর মামা। মামা ছিল ওর বড়ো গর্বের জায়গা। মামা শুনেছিলাম, পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। পরে বিদেশে চলে যায়। নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও পার্থ কথায় কথায় ওর মামার কথা বলত। মাঝে মাঝেই ওই 'জগ্যিদাসের মামা'র মতো মামাকে নিয়ে নানান গল্পও ফাঁদত। কিছুটা বাড়িয়ে অবশ্যই। মামা মানেই যেন সবেতে ফার্স্ট। সে ১০০ মিটার দৌড় হোক, কি কোনো সর্বভারতীয় পরীক্ষা।
যত উপরের দিকে ক্লাসে উঠছিলাম, পার্থর অস্বাভাবিক ব্যবহার যেন বাড়ছিল। মনে হত যেন ও পড়াশোনার চাপ নিতে পারছিল না। অর্ধেক দিন স্কুলে আসত না। এলেও নিজের মনে বিড়বিড় করে মাঝেমধ্যে কার সঙ্গে যেন কী সব কথা বলত। জানলার বাইরের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকত। টিফিনে আমার পাশে বসে খেতে খেতেও যেন মনে হত, অন্য কিছু ভাবছে। একা একা থাকত বেশির ভাগ সময়। আমি চেষ্টা করলেও দু-একটা কথা বলার পরেই যেন অন্যমনস্ক হয়ে যেত।
একবার ও অনেকদিন স্কুলে এল না। আমিও খোঁজ নিতে পারিনি। খুব ব্যস্ত ছিলাম পড়াশোনা নিয়ে। কয়েক মাস বাদেই মাধ্যমিক।
একদিন দেখি, স্কুলে মাসিমা এসেছেন। আমি ভেবেছিলাম, কোনো টিচারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। পরে জানলাম, আমার সঙ্গে দেখা করতেই এসেছেন। আমি যদি ওদের বাড়িতে যেতে পারি একদিন, সে কথা বলতে।
পরের দিন স্কুলের পরে ওদের বাড়ি গেলাম। ওদের বাড়িতে গিয়ে শুনি, পার্থ নাকি বেশ কয়েকদিন ধরে একটা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে বসে আছে। বেরোতে চাইছে না। শরীর নাকি খুব খারাপ। আমি একা ঢুকতে যাচ্ছিলাম। মাসিমা বারণ করলেন। বললেন, আগে আমার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বলে নিতে চান।
সেদিনই পার্থর অসুখের ডাক্তারি নামটা প্রথম জানলাম। 'স্কিৎসোফ্রিনিয়া'। ও নাকি অনেক কিছু দেখে বা শোনে বা গন্ধ পায়, যার আসল কোনো অস্তিত্ব নেই বাস্তবে। শুনেই বুঝতে পারলাম, ওই কাল্পনিক ছেলেটা যার কথা ও প্রায়শই বলে, সে এই জগতেরই অংশ। শুনলাম, মাঝেমধ্যে নাকি পার্থ খুব ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে। তখন উত্তেজনার বশে অনেক সময় হাতের কাছে যা জিনিস পায়, তা-ই ছোড়ে। এমনকী সেদিন মাসিমাকেও কালির শিশি নাকি ছুড়ে মারতে যাচ্ছিল। সেজন্যই উনি আমাকে একা যেতে দিতে চান না।
আমি মাসিমার সঙ্গে ওর ঘরে ঢুকলাম। দেখি, চারদিকে বই ছড়িয়ে খাটের উপরে বসে আছে পার্থ। পাশের জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছে, আর কী সব যেন বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে।
—আপনার থাকার দরকার নেই মাসিমা, আমি আছি।— বলে উঠলাম।
আমার উপস্থিতি যেন খানিকক্ষণ বাদে লক্ষ করল পার্থ। মনে হল সে দৃষ্টি ঠিক স্বাভাবিক নয়। চোখে পিঁচুটি। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বেশ গরম পড়েছে। তার মধ্যেই পাখা বন্ধ। বেশ কয়েকদিন চান করেনি। গায়ে ঘামের বিশ্রী গন্ধ।
তারপরে হঠাৎ করে আনমনে বলে উঠল পার্থ, এবারে মনে হয় না মাধ্যমিক দিতে পারব। জানি আমার মা-র খুব কষ্ট। আমি যদি তাড়াতাড়ি একটা কিছু করতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার মামার মতো ভালো নই। তোর মতো ভালোও নই। কিছুই মনে রাখতে পারি না। তা ছাড়া কিছুই আজকাল মাথায় ঢোকে না।
কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হল পার্থ বোধহয় এখন স্বাভাবিক।
বলে উঠলাম, পারবি না কেন, নিশ্চয়ই পারবি! তোকে পারতেই হবে। আমাকে বলবি, কোনটা শক্ত লাগে। কোনটাতে সাহায্য লাগবে। আমি বুঝিয়ে দেব।
একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল পার্থ। কিন্তু পরক্ষণেই বলে উঠল, না রে, সেরকম হওয়ার নয়। ছাপা অক্ষরগুলো সব কাঁপে। মাঝেমধ্যে একটা লাইন দশবার করে পড়তে হয়। আমি কোনোভাবেই পারব না। ওই ছেলেটাও তা-ই বলল। বলল, আমি পরীক্ষা দিতে পারব না।
—কোথায় থাকে ওই ছেলেটা? কার কথা বলছিস? আমি তাকে চিনি?— আবার সেই একই প্রশ্ন অধৈর্য হয়ে বলে উঠলাম।
একটু থেমে ও আস্তে আস্তে বলে উঠল, তোকে আজ একটা টপ সিক্রেট বলে দিই। ওই ছেলেটা এখানকার নয়। ওকে সবাই দেখতে পেলেই হইচই পড়ে যাবে। শুধু আমার সামনে আসে। ও বলেছে, একদিন আমাকে ওদের দেশে নিয়ে যাবে। সেখানে নাকি আমার চিকিৎসা সম্ভব। আমি ওখানে গেলেই আবার ভালো হয়ে যাব।
—ছেলেটা কি আমেরিকাতে থাকে না ইংল্যান্ডে? কোথায় সে?
ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু হাসি হেসে পার্থ বলে উঠল, তোকে দেখালে তুই খবরটা পাঁচকান করবি। তখন ওরা বিপদে পড়বে। ওরা চারজন আছে এই পৃথিবীতে।
—মানে ওরা পৃথিবীর নয়?— আমি খুব অবাক হয়ে বলে উঠি। সত্যি বলতে কী, আমি চিরকালই বেশ সহজে অন্যদের কথা বিশ্বাস করে নিই। তখন আরও করতাম। তা ছাড়া ছোটোবেলায় অ্যালিয়েন বা ভিনগ্রহী যে হাতিবাগানের ভিড়ের মধ্যে থাকতে পারবে না, এরকম কথাই ভাবতে শিখিনি।
আমার প্রশ্নে উৎসাহিত হয়ে ও বলে উঠল, না হলে আর বলছি কী? ওরা অনেক দূরের একটা গ্রহ থেকে এসেছে। মাঝেমধ্যে শুধু ছেলেটা জানলার বাইরে এসে উঁকি দেয়। এই খানিক আগেও আমার সঙ্গে লুডো খেলতে এসেছিল। আমার কাছ থেকেই খেলাটা শিখেছে। ওই, ওই দেখ।
দেখলাম সত্যি কিছু দূরে মাটির উপরে একটা লুডোর বোর্ড রাখা। তাতে ঘুঁটিও সাজানো আছে।
সেদিন বেশ কয়েক ঘণ্টা ছিলাম। শুধু ওইদিনই নয়, তারপরে পরীক্ষার আগে আরও বেশ কয়েকদিন গিয়েছিলাম। কিন্তু ও সুস্থ হয়ে ওঠেনি। আমি ও মাসিমা অনেকবার বোঝানোর পরেও ও পরীক্ষা দেবে না।
একদিন মাসিমাই আবার আসতে বারণ করলেন। এতে আমার সময় নষ্ট হচ্ছে পরীক্ষার আগে। তা ছাড়া, মাসিমার মুখেই শুনলাম, বাড়ির কাজের মহিলাকে পার্থ নাকি চায়ের কাপ ছুড়ে মেরেছে। অল্পের জন্য সে বড়োরকম চোট পায়নি।
সে বছর মাধ্যমিক দেয়নি পার্থ। যদ্দূর জানি আর কখনোই দেয়নি। পরীক্ষার পর যখনই গেছি, দেখেছি, ওই ঘরের মধ্যে অন্ধকার করে বিড়বিড় করে কী সব বলে যাচ্ছে। চারদিকে বই ছড়ানো। দেখলে মনে হয়, প্রচুর পড়ছে। আমাকে হঠাৎ হঠাৎ করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলে উঠত। কিন্তু খাপছাড়া কথা। মনে হত যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে।
শুধু ওই ছেলেটার সম্বন্ধে যখন কথা বলত, সেগুলো যেন খুব উৎসাহ নিয়ে বলত। শুনেছিলাম, একদিন রাস্তায় বেরিয়ে না দেখে পার হতে গিয়ে আরেকটু হলে একটা বাসের তলায় চাপা পড়ছিল। সেজন্য ওকে বাইরেও একা বেরোতে দেওয়া হত না।
তা ছাড়া ওর পাগলামির খবরটা তখন শুধু আর বাড়ি আর স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে ছিল না। আশপাশের পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। সবাই ওকে 'পাগলা পার্থ' বলে বলত। শুধু আমি ছাড়া।
বহু বছর কেটে গেছে। আমি আমেরিকায় নাসা-য় কাজ করি। জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী। সেসব নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু রিসার্চে যুক্ত আছি। বেশ নামডাক হয়েছে। মাঝে একবার ভারতে আসার সুযোগ হল কয়েকদিনের জন্য। ঠিক করলাম, পার্থর বাড়িতে যাব। আমার স্কুলের সামান্য কিছু বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কিন্তু তারা কেউই পার্থর খবর বলতে পারল না। যেন পুরো কর্পূরের মতো হারিয়ে গেছে।
কেন জানি না, হঠাৎ করে মনে হল, পার্থর সেই পুরোনো বাড়িটা একবার গিয়ে দেখে আসি। ও কি এখন ওখানে থাকে! নাকি অন্য কোথাও?
উত্তর কলকাতার এক পুরোনো পাড়ার মধ্যে বাড়িটা। কিন্তু খুঁজে পেতে একটু সময় লাগল। এই পাড়াগুলোর কিছু কিছু জায়গা একদম বদলে গেছে। চেনাই যায় না।
না পেয়ে ফিরেই যেতাম, কিন্তু পার্থর নাম বলতেই একজন মাঝারি বয়সি লোক বলে উঠল, ও আপনি 'পাগলা পার্থ'কে খুঁজছেন। —বলে একটু এগিয়ে একটা লাল ইটের শিরদাঁড়া-বেরোনো একটা বাড়ি দেখিয়ে দিল।
বুঝলাম, কেন চিনতে পারছিলাম না। ওর বাড়ির পাশে একটা পানের দোকান ছিল, একটা মিষ্টির দোকান ছিল। সেগুলো উধাও হয়ে এখন একটা ফোনের দোকান হয়েছে।
বাড়িটা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আরেকটু বিবর্ণ হয়েছে। প্রায় ভূতুড়ে বাড়ির মতো চেহারা। চওড়া সিঁড়ির পাশ দিয়ে ভাঙা রেলিং পেরিয়ে দোতলায় উঠে এলাম।
দোতলায় ওরা যে ফ্ল্যাটে থাকত, সেটা যেন এখনও সেই পঞ্চাশ বছর পিছনেই পড়ে আছে। মাঝে কোনো জীবনের স্পর্শ পায়নি। কোনো কলিং বেল নেই। বেশ কয়েকবার দ্বিধা নিয়ে ধাক্কা দেওয়ার পরে একটা চেনা কণ্ঠস্বর শুনলাম। পার্থ। এত বছর পরেও সেই একই রকমভাবে একটা অদ্ভুত সুরে কথা বলা।
আমাকে কি এত বছর পরে চিনতে পারবে? কী বলবে? কোনো বিপদ নেই তো? এখন কি ও সম্পূর্ণ পাগল?
এসব নানান চিন্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি, হঠাৎ দরজা খুলে গেল। সামনে সেই মূর্তিমান পার্থ।
দেখেই চিনতে পেরেছে। মনে হল বেশ খুশি। একটু উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, অনেকদিন পরে। কিন্তু জানতাম, তুই আমাকে ভুলবি না।
ঘরে গিয়ে বসলাম। বেশ ভয়ে ভয়েই বসলাম। কারণ সেই ঘরে শুধু একটা ভাঙা চেয়ার, আর অন্যদিকে খাট। চারদিকে এমনকী খাটের উপরে ছড়ানো নানান বৈদ্যুতিন যন্ত্র, অজস্র তার, আরও অনেক কিছু।
বলে উঠলাম, কী করিস এখন?
—ওই যে দেখছিস না, সব ইলেকট্রনিক জিনিস, ফোন—এসব মেরামত করি। শুধু যেগুলো দেখে মনে হয় বেশি ইন্টারেস্টিং কাজ, সেগুলো নিই। কোনোরকমে চলে যায়।
—মাসিমা?
—অনেকদিন মারা গেছেন।
—তুই বোধহয় কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিস না। কোনো বন্ধু তোর কোনো খবর দিতে পারল না। শেষে এখানে এসে চান্স নিলাম।
—ধুর, তুই ছাড়া স্কুলের আর কেউই বন্ধু ছিল না। আমার এই বিশ্বের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ রইল না। মামা কিছুদিন হল মারা গেছেন। যেটুকু যোগাযোগ শুধু এই বিশ্বের বাইরের মহাবিশ্বের সঙ্গে। তা তুই কী করিস?
বুঝলাম, সেই পাগলামিটা এখনও রয়ে গেছে। আমার পরিচয় দিলাম। কী করি, সেটা খুব হালকাভাবে বললাম। যদিও বলেই বুঝলাম, ও এসব ব্যাপারে কিছুই জানে না। কোনো কিছুর খবরও রাখে না। 'নাসা' নামটার সঙ্গেও ওর কোনো পরিচিতি নেই। তা ছাড়া গতকালও আমার যে সাক্ষাৎকার এখানকার বড়ো একটা কাগজের প্রথম পাতায় বেরিয়েছে, সেটাও ও দেখেনি। 'বিখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী অচিন্ত্য বোস এখন কলকাতায়'।
ওকে বলে উঠলাম, তা তুই এসব কাজ শিখলি কোথায়? তুই তো আর তারপরে স্কুলে যাসনি কোনোদিন?
—সেই যে মাধ্যমিক দিলাম না, তার কয়েক বছর বাদে হঠাৎ করে দু-দিনের জ্বরে মা মারা গেল। তখন ওই ছেলেটাই হল আমার একমাত্র সঙ্গী। ও-ই আমাকে শেখাল। হাতেকলমে কাজ।
—কোন ছেলেটা?
—আরে, সেই যে ছেলেটা, যার কথা তোকে বলতাম না?
—এখনও তার সঙ্গে তোর যোগাযোগ আছে?
—না। এখন আর নেই। কয়েক বছর আগে ও চলে গেছে। ওর এখানে আর থাকার কোনো উপায় ছিল না। ফিল্ড স্টাডিতে এসেছিল, পৃথিবীতে পঞ্চাশ বছর কাটিয়ে চলে গেছে।
এবার আর হাসি সামলাতে পারলাম না।
আমার সেই হাসি দেখে পার্থ একটু যেন ক্ষুণ্ণ হল। বলে উঠল, আমার ছোটোবেলায় শুধু দুজন বন্ধু ছিল, তুই আর ও। কিন্তু তুই কোনোদিন বিশ্বাসই করলি না যে ও আছে। আসলে ও অন্য কারো সামনে আসতে চাইত না। আমি অনেক সময় এই ঘরে—ওই —ওই যে দেরাজটা দেখছিস— তার মধ্যেও ওকে লুকিয়ে রাখতাম। ওরা চারজন এসেছিল, তিনজন ধরা পড়েছে কোথাও। ও তাই ভয়ে ভয়ে ছিল। আমকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করত না। কাউকে না।
বেশ বুঝলাম। বাইরের দিক থেকে শান্ত মনে হলেও ওর পাগলামো আদৌ কমেনি। একই রকম আছে। আমার পক্ষে এখানে একা বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। কখন খেপে যায়।
ও ফের বলে উঠল, দাঁড়া, তোকে একটা ছবি দেখাই। ওর ছবি। আমার হাতে আঁকা।
বলে ও উঠে পুরোনো একটা আঁকার খাতা থেকে একটা পাতা বার করে এনে আমার সামনে ধরল। ফের বলে উঠল, আমার হাতে আঁকা।
তাচ্ছিল্যভরে হাতে নিয়েই চমকে উঠলাম সেই ছবি দেখে।
ঘরে আলো কম ছিল। তাই ভালো করে দেখার জন্য উঠে গিয়ে আবার আলো জ্বাললাম। এই একই ছবি আমি খুব সম্প্রতি দেখেছি।
নাসা-র টপ সিক্রেট ফাইলে রাখা সেই ছবি আমি ও শীর্ষস্থানীয় অন্য দুজন বিজ্ঞানী ছাড়া অন্য কেউ দেখেনি। এমনকী এই ছবির বাইরে আমরাও তাদের সম্বন্ধে কিছুই জানি না। কী জন্য ওখানে রাখা, সেটাও জানি না। যদিও আমাদের আন্দাজ, ওরকম কোনো ভিনগ্রহী পৃথিবীতে এসেছিল। তাদের কোথাও লুকিয়ে রাখা আছে।
কিন্তু হুবহু একই ছবি এত বছর আগে পার্থ কী করে এঁকে ফেলল! সেই প্রাণীকে ঠিকভাবে বর্ণনা করা খুব মুশকিল। মাথায় কোনো চুল নেই। দুটো চোখে নেকড়ে বাঘের চাহনি। পেটের জায়গাটা খুব ছোটো। কোনো হাত নেই। নীচের দিকে চারটে শুঁড়ের মতো পা। এরকম কোনো প্রাণী কারোর পক্ষে ভাবা সম্ভব নয়। কী করে ঠিক একই ছবি ও আঁকল, যা ওর জানার কোনো সম্ভাবনা নেই?
—তুই এখনও বিশ্বাস করছিস না, তা-ই তো? কেউই করবে না। তা ও আমার মতো একজনের কথা শুনে, যার স্কিৎসোফ্রিনিয়া আছে। আসলে ঠিক ওইটা থাকার জন্যেই ছেলেটা আমাকে এত ভালোবাসত। ও বলত আমিই নাকি একমাত্র স্বাভাবিক। তাই সবকিছু দেখতে পাই। তোরা সবাই অস্বাভাবিক, বা ওর ভাষায় পাগল। মনে করিস না, আমি কিন্তু কখনো সেটা মনে করতাম না।
—কেন? সব দেখতে পাস মানে?
—সবরকম। ও বলত, আমি একমাত্র, যে এই বহুমাত্রিক জগতের সব সম্ভাবনা দেখতে পাই। শুনতে পাই। সব সম্ভাবনার কথা ভাবতে পারি। ঠিক যেমন ও দেখতে পায়।
—মানে?
—ধর, আমি যদি চাই, ভেবে নিতে যে আমার মা এখন এখানে আমার সঙ্গে আছে, ভাবতে পারি। ওইদিকে দেখ। এখন তোর দিকে তাকিয়ে হাসছে। অনেকদিন বাদে এসেছিস বলে পিঠে করে এনেছে। কী দেখতে পাচ্ছিস?
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ফের বলে উঠল,—কী, পাচ্ছিস না? আমি কিন্তু পাচ্ছি। ওই ঘরের কোণে সোফায় বসে আছে। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না?
আমি প্রথমবার জীবনে মাথা নেড়ে সায় দিলাম, তোকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করছি, পার্থ। ঠিকই বলেছিস। আমরা সবাই পাগল।
১১ জানুয়ারি ২০২২
কেনিলওয়ার্থ, ইংল্যান্ড
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন