শান্তনু বসু

টিনের নলটার একদিক সরু, আরেক দিক একটু মোটা। ভূতোদা নলের সরু দিকে এক চোখ লাগিয়ে, আরেক চোখ বুজে, মুখ কুঁচকে জানালা দিয়ে আমবাগানের দিকে তাক করেছে। আমরা হাঁ করে দেখছি। আমরা বলতে, আমি, টুকাই আর রিঙ্গো। পাশে পড়ে রয়েছে বড়-ছোট-মাঝারি বিভিন্ন রকম সাইজের কতকগুলো আতশ কাচ আর আঠার কৌটো।
আমি বললাম, 'এটা কী বানাচ্ছ ভূতোদা?'
ভূতোদা মৃদু ধমকে বলল, 'কানা নাকি? দেখে বুঝতে পারছিস না?'
পাশ থেকে রিঙ্গো বলল, 'টেলিস্কোপ। তাই না?'
চোঙাটা টেবিলের উপর রেখে, ভূতোদা খুশিতে ভুরু নাচিয়ে বলল, 'কারেক্ট। এমন এক টেলিস্কোপ বানাচ্ছি যে গোটা দেশ বোমকে যাবে। এটায় চোখ লাগালে দেখবি গ্রহ, তারা, নক্ষত্র একেবারে তোর নাকের ডগায় লাউ-কুমড়োর মতো ঝুলছে।'
আমি চমকে উঠে বললাম, 'বলো কী?'
রিঙ্গো বলল, 'তুমি তো তাহলে নোবেল পাবে ভূতোদা!'
সঙ্গে সঙ্গে একটা শব্দ হল ঠকাস। কালোয়াতি গানের আগে তবলচিরা যখন হাতুড়ি ঠুকে তবলা বাঁধে, তখন এমন শব্দ হয়। রিঙ্গো গাঁট্টার অভিঘাতে লাফ দিয়ে তিন হাত পিছিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলোতে লাগল। ভূতোদা কটমট করে রিঙ্গোর দিকে তাকিয়ে বলল, 'ফাজলামো হচ্ছে?'
রিঙ্গোর দশা দেখে আমার বেশ মজা লাগল। গতকাল ভূতোদার ভুঁড়ির সঙ্গে পামির মালভূমির তুলনা টানতে গিয়ে আমি একটা গাঁট্টা খেয়েছিলাম। রিঙ্গোটা খিকখিক করে হাসছিল। আমি মনে মনে বললাম, 'খুব তো হাসা হচ্ছিল কাল, এবার বোঝো।'
ভূতোদার ভালো নাম, ভূতনাথ রায়চৌধুরী। ওর পূর্বপুরুষরা একসময় এ-গ্রামের জমিদার ছিলেন। লোকে বলে এখনও রায়চৌধুরীদের যা আছে, তাতে আগামী তিনপুরুষ বসে খেতে পারে। তাই বোধ হয় ভূতোদাকে রুজি-রোজগারের মতো মামুলি ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। ভূতোদা নিজেকে বলে, একজন স্ব-শিক্ষিত বিজ্ঞানী। সারাদিন সে ঘরে বসে গবেষণা করে।
ভূতোদার বাবা করালীবাবুকে আমরা বেশ ভয় পাই। স্কুলে বাংলা পড়াতেন। রিটায়ার করেছেন। আমাদের দেখলেই সন্ধি-সমাস-কারক-বিভক্তি, কঠিন কঠিন শব্দের অর্থ জিগ্যেস করে জেরবার করে তোলেন। গোঁফের ফাঁকে খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলেন, 'ইশকুল থেকে আজকাল লেখাপড়ার পাঠ উঠে গেছে নাকি রে? তার উপরে ভূতোর স্কুলে নাম লিখিয়েছিস। সব গোল্লায় যাবি।'
পুরোনো আমলের বড়সড়ো বাড়িটার নীচের তলায় পুবদিকের কোনার ঘরটা হল ভূতোদার ল্যাবরেটরি, আমাদের বিজ্ঞান ক্লাব। 'ল্যাবরেটরি' কথাটা দরজার উপরে চক দিয়ে ঘটা করে লেখাও আছে। সেই সঙ্গে রয়েছে একটা বিধিবদ্ধ সতর্কতা—'বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ।'
ল্যাবরেটরি বলতে ইশকুলে যেমন সাজানো গোছানো ল্যাবরেটরি থাকে, সেরকম একটা কিছু ভেবে বসলে ভুল হবে। ভূতোদার বাবার কথায়, যত রাজ্যের 'হাবর-জাবর' জিনিসে ঘরটা বোঝাই। ভূতোদার কাছে এগুলো সবই মহা মূল্যবান বস্তু—যেমন সাইকেলের অকেজো চাকা, টিউবওয়েলের খারাপ হয়ে যাওয়া ওয়াসার, একটা আদ্যিকালের ঢাউস অচল রেডিয়ো, এই সব।
জানালার পাশে একটা কাঠের তাকের ওপর রাখা আছে কয়েকটা জলভরা কাচের বোতল। তার মধ্যে ডোবানো আছে নানারকম গাছগাছড়া। ছোট একটা লোহার তারের খাঁচার মধ্যে রয়েছে চার-পাঁচটা গোদা গোদা ব্যাং। এক কোনায় রয়েছে একটা কাচের পাল্লা দেওয়া কাঠের আলমারি। আলমারিটা বইয়ে ঠাসা। বেশিরভাগই পোকাধরা পুরোনো বই।
ভূতোদা একাধারে পদার্থবিদ, রসায়নবিদ, উদ্ভিদবিদ, জৈবপ্রযুক্তিবিদ সবকিছু। সারাদিনই সে নানারকম নতুন জিনিস আবিষ্কারের ফন্দি আঁটে। মামুলি কোনও জিনিসকে কাজে লাগিয়ে অসামান্য কোনও কিছু তৈরি করা তার মূল লক্ষ্য। এখন যেমন টেলিস্কোপ তৈরি নিয়ে মেতেছে, কিছুদিন আগে নাইট ভিশন চশমা তৈরি নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল।
করালীবাবুর ছানি অপারেশনের পর কয়েকদিন যে কালো চশমাটা ব্যবহার করেছিলেন, সেটা বাতিল হওয়ার পর ভূতোদার ল্যাবরেটরিতে স্থান পায়। ওটাই ছিল নাইট ভিশন চশমা তৈরির পরিকল্পনার উৎসকেন্দ্র।
অনেক চিন্তাভাবনার পর ভূতোদা ঠিক করে ব্যাঙের ছাতার সঙ্গে জিওল গাছের আঠা মিশিয়ে একটা স্বচ্ছ লেই তৈরি করে চশমার কালো কাচের উপর লাগিয়ে দিলেই নাইট ভিশন চশমা তৈরি হয়ে যাবে। সেই চশমা দিয়ে রাতের অন্ধকারে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাবে।
নাইট ভিশন চশমা তৈরির এত সহজ ফর্মূলার কথা শুনে আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। ভূতোদা বলল, 'দাঁড়া, কাজটা আগে হোক, তারপরে সারা বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা এই হরিদেবপুরে এসে ভূতনাথ রায়চৌধুরীর পায়ে গড় হয়ে প্রণাম করে যাবে।'
টুকাই বলল, 'আইনস্টাইনও কবর ছেড়ে উঠে আসবেন।'
ভূতোদার হাতটা উপরে উঠে টুকাই-এর পিঠের উপর আছড়ে পড়ার আগে সহসা থেমে যায়। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন করালীবাবু, বিরক্তির সঙ্গে বললেন, 'হ্যাঁ রে ভূতো, আমার কালো চশমাটা দেখেছিস?'
এই বুঝি নাইট ভিশন চশমা তৈরির প্রচেষ্টা বানচাল হয়ে যায়, রিঙ্গো টেবিলের উপর পড়ে থাকা চশমাটা তাড়াতাড়ি চালান করে দিল গেঞ্জির ভিতরে। ভূতোদা বাবাকে বেজায় ভয় পায়। আমতা আমতা করে বলল, 'আমি তো জানি না। দ্যাখো ঘরে কোথাও আছে।'
হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়ায় করালীবাবুর গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসি খেলে গেল। শিকার ফাঁদে পড়লে শিকারি যেমন হাসে, অনেকটা সেরকম। এই হাসির মানে আমি জানি। আবার একটা শক্ত প্রশ্ন ধেয়ে আসছে। করালীবাবু গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসির রেশটা ধরে রেখে বললেন, 'বলো তো দেখি ''ভৃঙ্গরোল'' মানে কী?'
আমি মাথা চুলকোতে শুরু করলাম। এগরোল, চিকেনরোল, মাটনরোল, ক্রিমরোল—এসব জানি। কিন্তু 'ভৃঙ্গরোল?' হঠাৎ আমার মাথায় বিদ্যুতের ঝলকের মতো কী একটা খেলে গেল। প্রত্যয়ের সঙ্গে বললাম, 'স্টেশনবাজারের ভিরিঙ্গি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ক্ষীরের পুর মালপোয়া দিয়ে পেঁচিয়ে, যে মিষ্টিটা বানায় তার নাম ভৃঙ্গরোল।'
করালীবাবু হাসি থামিয়ে বললেন, 'তোর বুদ্ধিশুদ্ধি দেখি ভূতোর মতোই হয়েছে।' আমি অপদস্থ হয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
নিজের বুদ্ধির উপর ভূতোদার অগাধ আস্থা। আমাদের মতো তিন নাবালকের সামনে তার বুদ্ধি নিয়ে তাচ্ছিল্য করাটা ভূতোদার মোটেই পছন্দ হয়নি। সে বলে উঠল, টিটোটা যে গাধা সে তো সবাই জানে। ওর সঙ্গে আমার তুলনা টানছ কেন?'
করালীবাবু ধমকের সুরে ভূতোদাকে বললেন, 'তুই বল ''ভৃঙ্গরোল'' মানে কী?'
ভূতোদা মিইয়ে গিয়ে মিনমিন করে বলল, 'অত শক্ত বাংলা আমি বুঝি না। আমার বিজ্ঞান নিয়ে কারবার।'
করালীবাবু ঝনঝন করে বলে উঠলেন, 'কত বড় বিজ্ঞানী এয়েছেন রে? তিন-তিনবারে বি.এসসি-র বেড়াটা ডিঙোতে পারিসনি—সে খেয়াল আছে?'
করালীবাবু আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, থেমে গেলেন ভূতোদার মাকে দেখে। ভূতোদার মায়ের হাতে বড় একটা রেকাবির উপর চারটে বাটি। মুড়ি আর নারকেল কোরা। আমাদের মনটা খুশিতে ভরে উঠল। করালীবাবুকে দরজায় দেখে ভূতোদার মা চোখ কুঁচকে বললেন, 'তুমি আবার ছেলেদের মাঝে কী করছ?' দাপুটে করালীবাবু সুড়ুৎ করে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন।
আমরা জানতাম ভূতোদা সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে। অঙ্কে কোনওদিনও একশোর কম নম্বর পায়নি। আমরা ভুতোদার সমকক্ষ নই। তাই আমাদের জন্য অঙ্কে বরাদ্দ হয়েছে আশি। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় আমরা কেউ আশির তলায় নম্বর পেলে কান ধরে ওঠবোস করতে হয়, আশি থেকে যত নম্বর কম, ততবার।
আমাদের গ্রেট ভূতোদা বি.এসসি-তে তিন-তিনবার ফেল, এটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হাটে হাঁড়ি ভেঙে যাওয়ায় ভূতোদাও ভিজে মুড়ির মতো মিইয়ে গেছে। বিরস মুখে নারকোল কোরা আর মুড়ি চিবোতে চিবোতে ভূতোদা বলল, 'বাবার কেমন ভুলো মন দেখেছিস? আমি যে বি.এসসি-তে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলাম, সেটা ভুলেই গেছেন।' বুঝলাম, ভূতোদা আবার ফর্মে ফিরে আসছে।
যাই হোক, সেবার নাইট ভিশন চশমার জন্য জিওল গাছের আঠা ও ব্যাঙের ছাতা সংগ্রহের ভার পড়েছিল আমাদের উপর। আমরা বহু কষ্ট করে জল-জঙ্গল ছেঁচে সেসব জোগাড় করে এনেছিলাম।
হামান দিস্তায় ব্যাঙের ছাতা থেতো করতে করতে ভূতোদা বলেছিল, 'গোটা পৃথিবীকে এবার ভেলকি দেখিয়ে দেব।' যত্ন করে চশমার কাচের উপর ভূতোদা যখন থকথকে জেলির মতো প্রলেপ লাগাচ্ছিল, আমরা অসীম কৌতূহলের সঙ্গে তাকে ঘিরে বসেছিলাম।
যেদিন সন্ধেবেলা চশমাটা পরীক্ষা করা হবে, সেদিন আমাদের উৎসাহের আর অন্ত নেই। ভূতোদা চশমা চোখে লাগিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের আমবাগানের দিকে তাকিয়ে বলল, 'চমৎকার, সবকিছু দেখা যাচ্ছে। গাছের মগডালে বসে একটা বাদুড় বাতাবি লেবুর খোসা ছাড়িয়ে খাচ্ছে।'
চশমাটা চোখে লাগানোর জন্য আমাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। আমরা সবাই একবার করে চশমাটা চোখে লাগালাম। ঘনকালো অন্ধকার ছাড়া আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না। সেকথা ভূতোদাকে বলাতে, বিরক্তির সঙ্গে রিঙ্গোর হাত থেকে চশমাটা কেড়ে নিয়ে বলল, 'দেখবি কী করে, তোরা সবাই তো রাতকানা। বাড়ি গিয়ে বেশি করে ভিটামিন-এ-র বড়ি খা গে যা।'
পরের দিন এসে দেখলাম ভূতোদা একটা টিনের চোঙা নিয়ে টেলিস্কোপ তৈরিতে মেতেছে।
রিঙ্গো বলল, 'তোমার নাইট ভিশন চশমাটা কোথায়?'
ভূতোদা ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, 'তা দিয়ে তোর কী হবে?'
রিঙ্গো নিরীহ চোখ-মুখ করে বলল, 'আমার রাঙাকাকা একবার চশমাটা দেখতে চেয়েছেন। বাড়ি গিয়ে গল্প বলেছিলাম কিনা।'
রিঙ্গোর রাঙাকাকা একজন নাম করা বিজ্ঞানী। আমরা ভাবলাম ভূতোদাকে জব্দ করার ফন্দি এঁটেছে রিঙ্গো। একটা স্কেল দিয়ে লেন্সের ব্যাস মাপতে মাপতে আক্ষেপের সুরে ভূতোদা বলল, 'ওটা চুরি হয়ে গেছে।'
আমি অবাক হয়ে বললাম, 'কে চুরি করল?'
'আর বলিস কেন, কাল রাতে ঘুলঘুলি দিয়ে একটা ভাম ঢুকে পড়েছিল ল্যাবরেটরিতে। সে ব্যাটাই নিয়ে গেছে বোধহয়।' স্কেল সরিয়ে রেখে, মেরি বিস্কুটের সাইজের লেন্সটা চোখের সামনে ধরে ভূতোদা বলল, 'বড্ড মুশকিলে পড়ে গেলাম বুঝলি। কয়েকদিন পরে আমেরিকা থেকে তিন বিজ্ঞানী আসবে চশমাটা দেখতে। আমার আবিষ্কারের কথাটা ওদের ই-মেল করে জানিয়েছিলাম। ওরা উত্তর দিয়েছে। চশমাটা তো খোয়া গেল। এখন এই টেলিস্কোপটা দেখিয়ে ম্যানেজ করতে হবে।' কিন্তু সেদিনই ভূতোদার টেলিস্কোপ তৈরির গবেষণায় বাধা পড়ল। কারণ একটা ভিমরুল।
বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ভিমরুলটা কখনও ওপরে উঠে, কখনও নীচে নেমে, কখনও গোঁত্তা খেয়ে কারও দিকে ধেয়ে এসে নানারকম ভাবে কসরত দেখাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর কেন জানি না, ভূতোদাকে ভিমরুলটার খুব পছন্দ হয়ে গেল। নানারকম ভঙ্গিমায় ভূতোদার দিকে নেচে নেচে যেতে লাগল। ভূতোদা কথার তুবড়ি দিয়ে অনায়াসে আলেকজান্ডার কি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে হারিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ভিমরুলের আক্রমণে একেবারে বেসামাল হয়ে পড়ল।
আমাদের ওপর নানারকম নির্দেশের ঝড় আছড়ে পড়তে শুরু করল। 'ভিমরুলটাকে মার। কেটে ফেল। থেতলে দে। খতম কর। অপদার্থ কতকগুলো, একটা ভীমরুলকে ঠ্যাঙাতে পারিস না?'
ওদিকে ভূতোদা ঘরের মধ্যে 'বাবাগো-মাগো' বলে এদিক-ওদিক সরে যাচ্ছে। আর ভূতোদা যতই সরে সরে যাচ্ছে, ভিমরুলটা ততই গতি বাড়িয়ে ধেয়ে যাচ্ছে ভূতোদার দিকে। শেষে ভাবী টেলিস্কোপের চোঙাটাকেই গদার মতো বাগিয়ে ধরে ভূতোদা আক্রমণ করল ভিমরুলকে। সাঁই সাঁই বেগে চোঙাটাকে ঘোরাতে শুরু করল।
আমরাও হাতের কাছে যে যা পেলাম, সেটা নিয়ে ভিমরুল নিধনে মেতে উঠলাম। আমার হাতে একটা ভাঙা তালপাতার পাখা, রিঙ্গোর হাতে একটা হাতুড়ি, আর টুকাই-এর হাতে ভূতোদার লাল-রং-এর খেরোর খাতা—যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণার ফলাফল লেখা হয়।
হঠাৎ ভিমরুলটা তিরবেগে ভূতোদার নাসিকা লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। ভূতোদা সর্বশক্তি দিয়ে চোঙাটাকে ঘোরাল। ভিমরুলটা চকিতে বাঁদিকে সরে যাওয়ায়, চোঙাটা এসে আছড়ে পড়ল আমার মাথায়।
আচমকা এই আঘাত পেয়ে আমার মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। তবে পরক্ষণেই দেখি ভূতোদা নাক চেপে শুয়ে পড়েছে মাটিতে। নচ্ছাড় ভিমরুলটা ওর নাকে হুল ফুটিয়ে জানালা দিয়ে পালিয়েছে। ভূতোদার নাকের ডগাটা ফুলে পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল।
পরের দিন ভূতোদাদের বাড়ির আমবাগানে ভিমরুলের ডেরাটা আবিষ্কার করলাম আমরা। একটা আমগাছে, দেড় মানুষ সমান উঁচু ডালের গা থেকে ঝুলছে বড়সড়ো গোলাকার একটা ভিমরুলের চাক। চাকের গায়ে থিকথিক করছে ভিমরুল। ভূতোদা ভিমরুলের চাকটার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে, ডানহাত দিয়ে বাঁ-হাতের তালুতে সজোরে ঘুষি মেরে বলল, 'যুদ্ধ। সবক'টাকে সাফ করে দেব।'
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, 'ওগুলো যদি তেড়ে আসে?'
ভূতোদা করুণার চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুই একটা ভীতুরাম। দ্যাখ না কী করি—'
আমাদের বাড়িতে কাজ করে দীনদয়াল, বাড়ি সুন্দরবনের দিকে। আমি তাকে বললাম, 'ভিমরুলকে ঢিট করার কোনও উপায় জানো?'
সে বলল, 'এ আবার এমন শক্ত কী ব্যাপার, ভিমরুলের চাকটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলেই হল। কাজটা রাতের দিকে করতে হবে। ভিমরুল, মৌমাছি এরা তো রাতে ভালো দেখতে পায় না। তাই চাকে যে আগুন দেবে, তাকে চট করে তাড়া করতে পারবে না। তবে যে এটা করবে, তাকে খুব ওস্তাদ হতে হবে, সাবধানে কাজটা করতে হবে। তেড়ে এসে যদি সবক'টা একসঙ্গে কামড়ে দেয় তাহলে লোকে মরেও যেতে পারে। তুমি আবার এসব করতে যেও না যেন খোকাবাবু।'
আমি বললাম, 'তুমি কখনও করেছ এ কাজ?'
দীনদয়াল বলল, 'জঙ্গলে গিয়ে কত মৌচাক পুড়িয়েছি, মৌ সংগ্রহ করেছি।'
পরের দিন ভূতোদাকে বললাম, দীনদয়ালের কথা। শুনে ভূতোদা বলল, 'ব্রিলিয়ান্ট।'
আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, 'দীনদয়ালকে বললে সে এসে চাক পুড়িয়ে ভিমরুলদের তাড়িয়ে দেবে। তুমি এসব করতে যেও না যেন ভূতোদা। দেখলে তো, কাল এক ব্যাটাই আমাদের কেমন নাকাল করে দিল।'
আগুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ভূতোদা বলল, 'বেশি জ্যাঠামো করিস না তো! তোদের দীনদয়াল যা পারে, সেটা আমি পারব না? জানিস আমার পূর্বপুরুষরা বাঘ-ভল্লুক মারত।'
টুকাই বলল, 'ভিমরুল তো মারেনি। ভিমরুল কিন্তু বাঘ-ভল্লুকের চেয়েও ডেঞ্জারাস।'
চটাস করে টুকাই-এর মাথায় একটা চাটি মেরে ভূতোদা বলল, 'বেশি ডেঁপোমি করিস না। এমন কায়দা করব না, ভিমরুল আমাকে ছুঁতেই পারবে না। ভালো কথা, তুই তো উইকেটকিপিং করিস। তোর দস্তানাটা কাল একবার নিয়ে আসিস।'
আমার উপর দায়িত্ব পড়ল, ক্রিকেটের প্যাড জোড়া নিয়ে আসার।
রিঙ্গো ফিক করে হেসে বলল, 'ভিমরুলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলবে নাকি ভূতোদা?'
ঠকাস শব্দে একটা গাট্টা রিঙ্গোর মাথায় নেমে এল। সঙ্গে ভূতোদার ধমক, 'ছ্যাবলামো হচ্ছে?'
পরের দিন সকালে ভূতোদার বাবা, করালীবাবুর চিৎকার চেঁচামেচিতে পাড়ার লোক জড়ো হয়ে গেল। চেঁচামেচির বিষয় হল, গ্রামে চোরের বড় উপদ্রব হয়েছে।
দুঃশাসন দত্ত, দুঁদে উকিল ছিলেন। এখন ওকালতি ছেড়ে শখের গোয়েন্দাগিরি করেন। তিনি বললেন, 'চোর এসেছিল বুঝি?'
করালীবাবু চোখ বড় বড় করে বললেন, 'এসেছিল মানে? আমার বৈঠকখানা থেকে রেনকোট আর গামবুট উধাও।'
দুঃশাসন দত্ত মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন, 'চোর ঢুকল কোথা দিয়ে?'
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে করালীবাবু হকচকিয়ে গেলেন। সত্যিই তো! চোর ঢুকল কোথা দিয়ে? বৈঠকখানা ঘরের দরজা-জানালা সবই তো বন্ধ ছিল।
ব্যাপারটাকে হালকা ভাবে নেবেন না করালীবাবু। রহস্যের নেচারটা মনে হচ্ছে খুবই সিরিয়াস। দরজা বন্ধ, জানলা বন্ধ—গামবুট গায়েব!'
করালীবাবু ভয়ে একেবারে গুটিয়ে গিয়ে বাড়ি ঢুকে পড়লেন।
ভিড়টাও পাতলা হয়ে গেল।
বিকেলবেলা ভূতোদার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে করালীবাবুর গামবুট আর রেনকোট উধাও হওয়ার রহস্যটা পরিষ্কার হল আমাদের কাছে। এ কী পোশাক? ভূতোদাকে যে চেনাই যাচ্ছে না। মাথায় চামড়ার হ্যাট। মুখটাকে চারপাশ দিয়ে ঢেকে রেখেছে হ্যাটের সঙ্গে সেলাই করে লাগানো মশারির নেট, সেটা বুকের কাছে জড়ো হয়ে রেনকোটের ভিতর ঢুকে গেছে। গায়ে আজানুলম্বিত রেনকোট। হাতে টুকাই-এর উইকেটকিপিং গ্লাভস। পায়ে গামবুট। রেনকোট আর গামবুটের মাঝের সামান্য ফাঁকাটা ভরাট করে দিয়েছে আমার ব্যাটিং প্যাড।
আমরা এই অদ্ভুত কিম্ভূতকিমাকার পোশাক দেখে হাঁ হয়ে গেলাম। আমি বললাম, 'আরিব্বাস! ব্যাপার কী?'
তৃপ্তির হাসি হেসে ভূতোদা বলল, 'মাথা খাটিয়ে কেমন পোশাকখানা বানিয়েছি বল?' এ হল যুদ্ধের আয়োজন। পোশাক-আশাক পরে একটু সড়গড় হয়ে নিচ্ছিলাম। যাতে কাজের সময় গড়বড় না হয়।'
টুকাই অবাক হয়ে বলল, 'কার সঙ্গে যুদ্ধ?'
ভূতোদা একগাল হেসে বলল, 'কেন? ভিমরুল! এবার দেখি কোন ব্যাটা ভিমরুল আমাকে কামড়ায়? আজ রাতেই আগুন দিয়ে ঝাড়ে বংশে নিকেশ করে দেব।'
সত্যিই। আমরা মনে মনে ভূতোদার বুদ্ধির তারিফ না করে পারলাম না। কী উদ্ভাবনী ক্ষমতা! ভূতোদার গায়ের একটা জায়গাও আবরণহীন নয়। ভিমরুলের সাধ্য কী তাকে আবার কামড়ায়?
আমি বললাম, 'কখন চাকটা পোড়াবে?'
ভূতোদা বলল, 'ন'টার পরে। বাবা শুয়ে পড়ার পর। বাবা গামবুট আর রেনকোটের খোঁজ পেলে, সব পণ্ড হয়ে যাবে।
মনটা দমে গেল। এমন একটা রোমহর্ষক কাণ্ড নিজের চোখে দেখতে পাব না। অত রাত অবধি বাইরে থাকার অনুমতি নেই। সন্ধে থেকে লেখাপড়ায় আর মন বসছে না। মনটা পড়ে রয়েছে ভূতোদাদের আমবাগানে।
বেলি একটা ড্রয়িং খাতা আর পেনসিল নিয়ে কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে। 'দাদা, রবিঠাকুরের ছবিটা এঁকে দাও না। ইশকুলে জমা দিতে হবে।' আমার মাথার মধ্যে তখন শুধু ভিমরুল ভোঁ-ভোঁ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রেগেমেগে বেলিকে বললাম, 'নিজের কাজ নিজে করগে যা।' বেলি হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে গেল।
মা আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'খামোখা কাঁদাচ্ছিস কেন ওকে? কী হয় একটু এঁকে দিলে।
আমি বিরক্তির সঙ্গে বেলির ড্রয়িং খাতাটা টেনে নিলাম। কিন্তু ছবি আঁকা হল না। ভয়ানক একটা হই-চইয়ের শব্দে পাড়া একেবারে তোলপাড়িয়ে উঠল।
সব গোলমাল ছাপিয়ে শোনা গেল দুঃশাসন দত্তের আর্ত চিৎকার। 'দানো। দানো। বাপরে খেয়ে ফেলল।'
ভূতোদাদের বাড়িটা আমাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। শব্দটা ওদের বাড়ির দিক থেকেই আসছে। বাড়ির বড়রা ছুটল ওদিকে। আমিও বড়দের দলে মিশে গিয়ে এক ছুটে রায়চৌধুরী বাড়িতে এসে হাজির হলাম।
সবাই টর্চ হাতে আমবাগানের দিকে ছুটছে। টুকাই আর রিঙ্গোও এসে পড়েছে। ভূতোদাদের বাগানে যে আমগাছটায় ভিমরুলের চাক ছিল, সেটার কাছে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। সেই কিম্ভূতকিমাকার ভিমরুল নিধনের পোশাকে পরাজিত সেনাপতির মতো মাটিতে শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে ভূতোদা। অদূরে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁত-মুখ ছেতরে, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে দুঃশাসন দত্ত। আর ভিমরুলের চাকটা যেমন ছিল তেমনই আছে।
পরদিন শুনলাম, ভূতোদাদের আমবাগানে মশাল জ্বলতে দেখে গামবুট রহস্যের সমাধানে বেরিয়েছিলেন দুঃশাসন দত্ত। আমবাগানের অন্ধকারের মধ্যে অদ্ভুতুড়ে পোশাকধারী ভূতোদাকে দেখে দানো ভেবে অজ্ঞান হয়ে যান।
ভিমরুলের কামড় খেয়ে ভূতোদার ধুম জ্বর এসেছে। মাথায় আইস ব্যাগ চাপিয়ে শুয়ে আছে। হরেন ডাক্তার বলেছে চিন্তার কিছু নেই, সেরে উঠবে। যাই হোক, করালীবাবু গামবুট আর রেনকোট ফিরে পেয়ে খুব খুশি।
ভূতোদা সেরে উঠলে জিগ্যেস করলাম, 'এমন হল কী করে?'
ভূতোদা বেজার মুখ করে বলল, 'ওই দুঃশাসন উকিলই তো সব গুলিয়ে দিলে। হঠাৎ 'দানো দানো' বলে এমন হাউমাউ করে উঠল যে, আমার হাত থেকে মশালটা খসে গেল। ভিমরুলগুলোও ঘাবড়ে গিয়ে একযোগে আমাকে আক্রমণ করে বসল।'
টুকাই বলল, 'তোমার তো সারা গা-হাত-পা ঢাকা ছিল। ভিমরুল কামড়াল কী করে?'
ভূতোদা জবাবে যা বলল, তা হল রেনকোটের গায়ে একটা ফুটো ছিল, ভূতোদা সেটা খেয়াল করেনি। ওটা নাকি করালীবাবু বৈঠকখানায় গেড়ে বসা জনৈক বেআক্কেলে ইঁদুরের কীর্তি। সেই ছিদ্রপথে ভিমরুলবাহিনী ভূতোদার দেহবর্ম ভেদ করে ঢুকে পড়ে।
তবে এত কিছুর পরেও ভূতোদা দমে যাওয়ার পাত্র নয়। বলল, 'দাঁড়া না, এক মাঘে শীত যায় না। বাছাধনদের এবার দেখাচ্ছি মজা।' একথা শুনে আমরা আঁতকে উঠলাম। আবার ভিমরুল-নিধন অভিযান? তবে ভূতোদাকে আর ভিমরুলের মুখোমুখি হতে হয়নি। পরের দিন দীনদয়াল, সুকৌশলে চাকটা পুড়িয়ে দিয়েছিল। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা—'ভৃঙ্গরোল' শব্দটার মানে অভিধান দেখে জেনে নিয়েছি। 'ভৃঙ্গরোল' মানে হল ভিমরুল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন