অমিত ভট্টাচার্য
‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ’। শৈশবে, কৈশোরে যখন শ্রুতি, স্মৃতির নামও শুনিনি তখন থেকেই ‘স্বর্গ’ ব্যাপারটা মায়ের আবৃত্তিতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে লাগল সৎসঙ্গই কি স্বর্গবাসের অন্যতম শর্ত? যেখানে কোনো অভাব নেই, সেই ‘সব পেয়েছির দেশে’ হাজির হওয়ার ছাড়পত্র যদি সৎসঙ্গে মেলে তবে ঐতিহ্যের প্রতি মনোনিবেশ করলে ক্ষতি কী! যে প্রবীণেরা বিশ্বাস করেন বিধাতা স্বর্গে থাকেন, যিনি অতিমাত্রায় সুন্দর-সুন্দরীদের সৃষ্টির পূর্বে ছবিতে এঁকে দেখে নেন ভাবী সৃষ্টিকে, সেই বিধাতা বা পরমেশ্বরের বাসস্থানের হালহকিকত বিবিধ শাস্ত্রীয় গ্রন্থে যেভাবে বর্ণিত আছে সেদিকে নজর দিলে মন্দ হয় না। কারণটিও সূচনাতেই বলা হয়েছে ‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস’ ইত্যাদি।
স্বর্গচর্চায় উপলব্ধ হয়, স্বর্গ কোনো চোখধাঁধানো সভাকক্ষ নয় বা মঞ্চসজ্জা নয়, অথবা আলোর মায়াজাল নয়। সমাজ-শৃঙ্খলা ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার তাগিদে, অন্যায় অধর্মের নিন্দা এবং ধর্মের প্রশংসার জন্যই স্বর্গকে স্বর্গে তোলা হয়েছে। শাস্ত্রকারেরা অতিপ্রশংসা করে অত্যুচ্চ স্থান দেবার জন্যই স্বর্গের সিঁড়ি, স্বর্গগঙ্গা মন্দাকিনী, স্বর্গপুরী অমরাবতী, স্বর্গধেনু সুরভি, স্বর্গদ্বার প্রভৃতির বর্ণনা করেছেন। গুণীজন আগ্রহভরে পরম্পরাবাহী শাস্ত্রগ্রন্থে স্বর্গকথা শুনিয়েছেন। পাঠক উৎকর্ণ, আশাবাদী যেহেতু ‘তবু আনন্দ তবু অমৃত জাগে’।
স্বর্গ-নরক দুটোই পরলোকের ঠিকানা। ইহলোকের বিষয় নিয়ে যেমন বিবাদের অন্ত নেই পরলোকের বিষয় নিয়েও তেমন নানা মুনির নানা মত। বহুশিষ্য পরিবৃত হয়ে থাকা বৃদ্ধাম্ভির মতো পন্ডিতেরাও সংখ্যায় মোটেই নগণ্য নয় যারা পরলোকের বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে কবরে পাঠাতে কৃতসংকল্প। এদের মতে স্বর্গচিন্তার অর্থই হল মরীচিকার জলে স্নান করে আকাশকুসুম বেণীতে লাগানো। এরা মনে করেন, অগ্নিহোত্রের কাজকর্ম বালকদের খেলনাপাতি নিয়ে খেলায় মেতে ওঠার শামিল ‘অগ্নিহোত্রাদিকং কর্ম বালক্রীড়েব লক্ষ্যতে’ (আ. ড. ৩য় অঙ্ক)। ভক্তিতে চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়ে গেলে এসব ভাবনা আসে ‘অহো ভৌতানাং ভক্তিতিমিরহতো ন কিঞ্চিৎ পশ্যতি মুগ্ধা দৃষ্টি:’ (আ. ড. ৩য় অঙ্ক)।
স্বর্গ হল অদৃষ্ট পুরুষার্থ। পুরুষার্থ দৃষ্ট এবং অদৃষ্ট ভেদে দু-রকমের বলা হয়েছে। দৃষ্ট পুরুষার্থ প্রাপ্তির বিষয়ে কোনো ঝামেলা নেই। যেমন খিদে পেলে খেতে বসলেই হল। কেউ অপরকে জিজ্ঞাসা করেন না যে, দাদা খিদে পেয়েছে কী করি বলুন তো। খিদে পেলে খেয়ে নেওয়া, ক্লান্ত হলে ঘুমিয়ে নেওয়া প্রভৃতি দৃষ্ট পুরুষার্থের উপায়। কিন্তু স্বর্গ নামক অদৃষ্ট পুরুষার্থ লাভের জন্য শাস্ত্রের দিকে, সহস্রাব্দ প্রাচীন গ্রন্থের দিকে নজর দিতে হয়। কৈশোর থেকেই মানুষ বুঝে যায় স্বর্গ ওপরে। আর যা কিছু ওপরে সেখানে যেতে হলে সিঁড়িই ভরসা। শাস্ত্র এই সিঁড়ির কাজটি করেছে। শাস্ত্রমতে মানুষের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবে অজ্ঞানে আবৃত বলে তার সাহায্যে স্বর্গে যাওয়া যায় না। অলৌকিক স্থানে, অদৃষ্ট স্থানে যেতে হলে দিব্যচক্ষুর দরকার হয়। শাস্ত্র অলৌকিক তত্ত্ব উপস্থাপনার কাজে দিব্যচক্ষুর ভূমিকায় অবতীর্ণ ‘তদেব সকলসদুপায়দর্শনে দিব্যং চক্ষুরস্মদাদে:’ (ন্যা. ম., ১ম আহ্নিক)।
অধ্যেতা নচিকেতা যমকে বলেন, স্বর্গের একটা অনাবিল আনন্দের দিক হল মৃত্যুভয়ে সেখানে সবাই প্রতিমুহূর্তে শঙ্কিত নয়। যম সেখানে সহসা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। মরজগতের বাসিন্দা যেমন রোগ, জরায় আক্রান্ত হলেই মৃত্যুভয়ে ভীত হয়, স্বর্গলোকবাসীর সে উদবেগ নেই। সেখানকার বাসিন্দা ক্ষুধা ও তৃষ্ণা উভয়কেই অতিক্রম করতে পারে বলে শোকাতীত এবং পরিণামে মানসিক সন্তাপ বর্জিত। পাঠক শাঙ্করভাষ্যে নজর দিন ‘স্বর্গে লোকে রোগাদিনিমিত্তং…দিব্যে’ (ক. উ. ১।১।১২)। পৃথিবীর সকল দেশের সকল ধর্মশাস্ত্রের কথা হল স্বর্গ ভোগের চূড়ান্ত স্থল। লোকসমষ্টিতে স্বর্গশ্রেষ্ঠ ‘লোকস্রজি দ্যৌর্দিবি’ (নৈ. চ. ৬।৮১)। এজন্য স্বর্গে সুখের উপকরণের একটা আদি-অন্তহীন পরিকল্পনা চিরকালই প্রসিদ্ধ। শাস্ত্রমতে যাঁরা জন্মদেব যেমন ইন্দ্র, বরুণ প্রভৃতি তাঁরা চিরকালই স্বর্গসুখ ভোগ করে। পক্ষান্তরে মানুষ স্বর্গে যায় পুণ্যফলে এবং পুণ্যফল ক্ষয় হলে পুনরায় মর্ত্যলোকে প্রত্যাবর্তন করে ‘ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি’ (শ্রী. গী. ৯।২১)।
স্বর্গের নামান্তর ত্রিদশালয় (স্ক. পু. না. খ. ১১৯। ৫৬, নৈ. চ. ৫।১), যেহেতু সেখানকার বাসিন্দারা সকলেই ত্রিদশ। আসলে দেবতাদের তিনটি দশা যথা—শৈশব, কৌমার এবং যৌবন। তাঁদের বার্ধক্য নেই ‘যৌবনাদ ঊর্ধ্বং নাস্তি’। এই স্বর্গ চিরযৌবনের দেশ। স্বর্গকে কামনার মোক্ষধামও বলা হয়েছে যেহেতু স্বর্গ সকল বাসনার পরিপূরণক্ষেত্র ‘যস্মিন প্রাপ্তে সর্বং প্রাপ্তং ভবতি’। স্বর্গ হল অবাস্তব মনোহর এক কল্পলোক। স্বর্গের আরেক নাম ‘নাক’। মহাকবি কালিদাস ‘নাকপৃষ্ঠ’ (অ. শ. ৭।৫) ব্যবহার করেছেন। রাঘবভট্ট তাঁর টীকায় জানিয়েছেন ‘নাকপৃষ্ঠে স্বর্গতলে’। ইন্দ্রের সারথি মাতলি মহারাজ দুষ্যন্তকে সানন্দে জানিয়েছে যে, স্বর্গেও মহারাজের যশোমহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘অবিদ্যমানম অকম অস্মিন’, নঞ তৎপুরুষ। যেখানে দুঃখ নেই, ন অকম (দুঃখম)। অপরাজেয় দানবদের দমনের জন্য ইন্দ্রের আদেশে তাঁরই প্রেরিত রথে যুদ্ধযাত্রায় বেড়ানোর সময় দুষ্যন্ত উদবিগ্ন ছিলেন। ফলে স্বর্গারোহণকালে পথঘাট ভালোভাবে দেখবার সুযোগ পাননি ‘ন লক্ষিতঃ স্বর্গমার্গঃ’। দুষ্যন্ত সবিস্ময়ে জানতে চেয়েছেন, তিনি কোন বায়ুপথে আছেন ‘মরুতাং কতরস্মিন পথি বর্তামহে’ (অ. শ. ৭ম অঙ্ক)। ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী পৃথিবী থেকে দূরত্ব অনুসারে বায়ুর মোট সাতটি স্তর নির্দেশিত, যথা—আবহ, প্রবহ, উদ্বহ, সংবহ, সুবহ, পরিবহ এবং পরাবহ। মাতলির বর্ণিত তথ্য অনুসারে মহারাজ দুষ্যন্ত ‘প্রবহ’ নামক বায়ুপথে বিচরণ করছিলেন। স্বর্গ যে অনির্বচনীয় সুখের রাজ্য বা লীলাভূমি কালিদাস এই ধারণা পোষণ করতেন ‘অনির্দেশ্যসুখঃ স্বর্গঃ কস্তং বিস্মারয়িষ্যতি’ (বিক্র. ৩।১৮)। স্বর্গের সুখৈশ্বর্য নাকি কখনই বিস্মৃত হবার নয়। বিদূষক জানতে চেয়েছেন স্বর্গে মনে রাখবার মতন এমন কী আছে যার জন্য সকলে লালায়িত হয়। বিদূষক এক নিশ্বাসে বলে চলেন স্বর্গে না-আছে নিদ্রা, না-আছে ভোজন। কেবলই অনিমেষ নয়নে মাছের অনুকরণ করা। বলবার উদ্দেশ্য হল, দেবতাদের চোখের পাতা পড়ে না—এরকম প্রবাদ লোকসিদ্ধ।
মহাভারত-এ শুনি, উত্তম বিধি ও শাস্ত্রোক্ত সৎকর্মের অনুষ্ঠানে স্বর্গলোক মেলে, ‘বিধিনা কর্মণা চৈব স্বর্গমার্গমবাপ্নুয়াৎ’ (মহা. অনু. ৬।৪৯)। এই অনুশাসনপর্বেই ১৪৪তম অধ্যায়ে উমা মহেশ্বরের কাছে জানতে চেয়েছেন কারা স্বর্গে আসতে পারে ‘কেন…কৈর্বা স্বর্গং যান্তীহ মানবা:’ (ওই ১৪৪।৩)। উমার বিবিদিষা নিবারণে শ্রীমহেশ্বর মানুষের স্বর্গগমনের অভীপ্সা পূরণের জন্য যে-সকল সদগুণের উল্লেখ করেছেন, তা অনুধাবন করলে উপলব্ধ হয় যে, প্রতিদিনের উজ্জ্বলতর কর্মই স্বর্গ-স্বপ্ন পূরণের সহায়ক। নিশ্চিতভাবে সমাজ-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শ্রীমহেশ্বরের উক্ত ভাষণ প্রজ্ঞার পরিচায়ক। তবে সঙ্গে সঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে যে, শ্রীমহেশ্বর কথিত কর্মসূচির যথার্থ রূপায়ণ হলে পৃথিবীর বুক জুড়েই স্বর্গ নেমে আসবে। হৃদয় থেকে হিংসাকে সম্পূর্ণরূপে যারা নির্মূল করতে পেরেছেন, অপরের সম্পদ এবং অপরের স্ত্রীর প্রতি আসক্তিহীন যারা, বয়স অনুসারে অন্য স্ত্রীকে যারা মা-বোন অথবা মেয়ের দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করেন, শীল-শৌচের যথাবিধি অনুসরণে যারা রাগ-দ্বেষ বর্জিত হয়েছেন এবং জিতেন্দ্রিয়, পবিত্র, সত্যপ্রতিজ্ঞ, শ্রদ্ধালু, দয়ালু যে সকল মানুষ মনে মনেও অন্যের ক্ষতি চিন্তা করেন না ‘তে নরা: স্বর্গগামিনঃ’ তারাই স্বর্গে আসতে পারেন (মহা. অনু. ১৪৪।৫-৪০)। একইরকমভাবে জৈমিনি পদ্মপুরাণে স্বর্গে যাবার জন্য যে সব গুণাবলির অপরিহার্যতা উল্লেখ করেছেন সেগুলো বরাবরই পৃথিবীর সব দেশের শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষের কামনার ধন (প. পু. ৯৬।২১-৫০, ভূমিখন্ড)। কাম, ক্রোধ, লোভ, দম্ভ, মদ, মাৎসর্য্য ভেদে ছয় রিপু স্বর্গের প্রতিবন্ধক ‘অথ সংসেবিতাস্তৈস্তু মানবাশ্চ পরম্পরম/বিরুদ্ধাংশ্চ প্রকুর্বন্তি নাপ্নুবন্তি যথা দিবম’।। (স্ক. পু. না. খ. ২৭২।২৯)।
অর্জুনের ভয়ংকর তপস্যায় দেবতারা প্রীত হলে দেবরাজ মাতলিকে পাঠিয়েছিলেন মায়াময় দিব্য বিমান দিয়ে ‘দিব্যং মায়াময়ং রথম’ (মহা. বন. ৩৭।৭) অর্জুনকে মর্ত্যলোক থেকে দেবলাকে নিয়ে আসবার জন্য। ইন্দ্রের অভিপ্রায় ছিল, দিব্যাস্ত্র দিয়ে অর্জুনকে আরও শক্তিশালী করে দেবেন:
অস্মাল্লোকাদ্দেবলোকং পাকশাসনশাসনাৎ।
আরোহ ত্বং ময়া সার্দ্ধং লব্ধাস্ত্রঃ পুনরেষ্যসি।। (ওই. ৩৭। ১৪)
শোনা যায়, তপস্যা না-করলে সেই দিব্য রথের দেখা মেলে না ‘নাতপ্ততপসা শক্য এষ দিব্যো মহারথঃ’ (ওই ৩৭। ১৭)। অর্জুন দেখলেন স্বর্গদ্বারে শুভ্রবর্ণ, বিজয়ী ঐরাবত দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে, পেছনে দেদীপ্যমান অমরাবতী ‘ততো দদর্শ শক্রস্য পুরীম অমরাবতীম’ (ওই বন. ৩৭। ৪১)। সুসজ্জিত অমরাবতী সকল ঋতুর মরসুমি ফুলে সুশোভিত ‘সর্বর্তুকুসুমৈ: পুণ্যৈ: পাদপৈরুপশোভিতাম’ (ওই ৩৮। ১)। বিস্মিত অর্জুন দেখলেন দিব্যপুষ্পশোভিত এবং অপ্সরাসেবিত মনোহর নন্দনকানন ‘নন্দনঞ্চ বনং দিব্যম’। অর্জুনের উপলব্ধি হল, স্বর্গলোক কেবল পুণ্যবানদের জন্য ‘স লোকঃ পুণ্যকতৃণাম’ (ওই ৩৮। ৪)। দিব্যগীতবিশিষ্ট নন্দনকানন দেখতে দেখতেই তিনি অমরাবতীতে প্রবেশ করলেন। অর্জুনের সংবর্ধনায় অমরাবতীতে যোগ দিয়েছিলেন দেব, গন্ধর্ব, সিদ্ধগণ। অর্জুন কোথায় চোখ রাখবেন! শঙ্খ, দুন্দুভির ধ্বনিতে চতুর্দিক মুখরিত। মাঙ্গলিক সৌজন্য বিনিময়ের পর ইন্দ্রেরই সিংহাসনের একাংশে তার বসবার স্থান নির্দিষ্ট হল। সমবেত অপ্সরাদের নৃত্যানুষ্ঠান অর্জুনকে চরম তৃপ্ত করেছিল। অমরাবতীতে দেবরাজের হাত থেকে অস্ত্রশিক্ষার সৌভাগ্য তার হয়েছিল ‘শক্রস্য হস্তাৎ’। শোনা যায় অর্জুন পাঁচ বছর ইন্দ্রের আদেশে স্বর্গলোকে পরমসুখে অতিবাহিত করেন ‘পঞ্চাব্দানবসৎ সুখী’ (ওই ৩৮। ৩৭)। কেবল অস্ত্রশিক্ষাই নয়, ইন্দ্রের পরামর্শে অর্জুন চিত্রসেন গন্ধর্বের কাছে নৃত্য, গীত ও বাদ্যে পারদর্শী হন ‘স শিক্ষিতো নৃত্যগুণাননেকান বাদিত্রগীতার্থগুণাংশ্চ সর্বান’ (মহা. বন. ৪৮। ৪৩)।
স্বর্গে ক্ষীণপুণ্য লোকেদের দেবদূত জানিয়ে দেয় যে, তাঁর স্বর্গবাসের মেয়াদ শেষ। যযাতি স্বর্গভ্রষ্ট হয়েছিলেন তাঁর দাম্ভিকতার দরুন। নিরভিমান চিত্ত স্বর্গবাসের অন্যতম শর্ত—যা যযাতি বজায় রাখতে পারেননি ‘মানেন ভ্রষ্টঃ স্বর্গস্তে নার্হস্ত্বং পার্থিবাত্মজ! ন চ প্রজ্ঞায়সে গচ্ছ পতস্বেতি তমব্রবীৎ’ (মহা. উদ্যোগ. ১১২। ৭)। যযাতিও জানতেন, পুণ্যক্ষয়ের ফলেই তিনি স্বর্গচ্যুত হচ্ছেন ‘ক্ষীণপুণ্যশ্চ্যুতো দিবঃ (ওই ১১২। ১৭)। মহাভারতকার জানিয়েছেন যযাতি স্বর্গচ্যুত হলেও তাঁর দৌহিত্রদের যজ্ঞ ও দানকৃত পুণ্যের ফলে তিনি পুনরায় স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেন ‘মাতামহং মহাপ্রাজ্ঞং দিবমারোপয়ন্ত তে’ (ওই ১১৩। ১৮)। স্বর্গ গমনের টিকিট প্রাপ্তি যে কেবলমাত্র এবং একমাত্র পুণ্যকর্ম নির্ভর তা মহাভারতকার যযাতির উপাখ্যানে বুঝিয়েছেন। দ্বিতীয়বার স্বর্গে পৌঁছে যযাতি পিতামহ ব্রহ্মাকে প্রশ্ন করেছিলেন কীভাবে তাঁর স্খলন হল ‘কথং নু মম তৎ সর্বং বিপ্রনষ্টং মহাদ্যুতে’ (ওই ১১৪। ১৩)। পিতামহ জানিয়েছিলেন যে অভিমান, বল, হিংসা ও ছলনার বিন্দুবিসর্গ থাকলে স্বর্গলোক কখনও চিরস্থায়ী হয় না:
নায়ং মানেন রাজর্ষে! ন বলেন ন হিংসয়া।
ন শাঠ্যেন ন মায়াভির্লোকো ভবতি শাশ্বতঃ।। (মহা. উদ্যোগ. ১১৪। ১৬)
শ্রীমদভগবদগীতা-য় ‘স্বর্গ’ সংক্রান্ত বিবিধ আলোচনা পাঠক লক্ষ করে থাকেন। সেখানে স্বর্গ (২। ৩৭), স্বর্গদ্বার (২। ৩২), স্বর্গপর (২। ৪৩) এবং স্বর্গলোক (৯।২১) প্রভৃতি পর্যায়ে স্বর্গকথা পরিবেশিত হয়েছে। ক্ষাত্রধর্ম পালনে অর্জুনকে উজ্জীবিত করতে বলা হল, যুদ্ধে জয়ী হলে রাজ্যভোগ এবং পরাজিত হলে নিশ্চিত স্বর্গপ্রাপ্তি। দু-দিকেই লাভ বই লোকসানের নামগন্ধ নেই। জ্যোতিষ্টোমাদি যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হলেও স্বর্গলাভে অনেক বিলম্ব হতে পারে। কারণ যাজ্ঞিক ব্যক্তি কেবল দেহাবসানেই স্বর্গারোহণে সমর্থ হন। প্রাণবায়ু নির্গত না-হলে স্বর্গ দূর অস্ত। কিন্তু ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধে মৃত্যু হলে দেহের বিনাশের দরুন সঙ্গে সঙ্গে ‘স্বর্গদ্বারম অপাবৃতম’ স্বর্গের সদর দরজা উন্মুক্ত। অর্থাৎ যজ্ঞানুষ্ঠানের পরে যাজ্ঞিককে যেমন হাপিত্যেশ করে অপেক্ষা করতে হয়, তেমন পরাজিত যোদ্ধাকে মহাকালের অপেক্ষায় থাকতে হয় না যেহেতু ‘যুদ্ধস্য হি ফলং স্বর্গঃ’ (গূঢ়. দী. ২। ৩২)। যারা অবিবেকী তারা বেদে বর্ণিত কর্মের প্রশংসায় অনুরক্ত। এদের দৃঢ় বিশ্বাস স্বর্গাদি ফলজনক কর্ম ছাড়া অন্য কিছুর সারবত্তা নেই। মূলত বেদের অর্থবাদের উপর নির্ভর করে এরা স্বর্গকেই পরমধামরূপে অন্তরে গ্রহণ করেন। স্বর্গ ব্যতীত অন্য কোনো মোক্ষ যে আদৌ রয়েছে এরা তার অঙ্গীকার করেন না। এর ফলে যার অনুষ্ঠানে স্বর্গসুখপ্রাপ্তি এবং স্বর্গে আধিপত্য লাভ হয় সেই কর্মকান্ডময়ী বেদবাণীকে এরা গ্রহণ করেন। এখানে নিষ্কাম কর্মের প্রশংসার জন্যই এই স্বর্গার্থীদের বিমূঢ়চিত্ত ‘অবিপশ্চিতঃ (শ্রী. গী. ২। ৪২) বলা হয়েছে। আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন—এদের অন্তঃকরণে ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি জাগ্রত হয় না ‘অবিপশ্চিতাং ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধির্ন ভবতি’ (২। ৪৪)। অভিপ্রায় হল, সকামী ব্যক্তি নিজের কামনাকে চরিতার্থ করতে ব্যাকুল হয়ে কাম্যফলই লাভ করেন। কিন্তু তার পরিণামে ঈশ্বর প্রাপ্তি হয় না। যজ্ঞানুষ্ঠানের সহায়তায় শুদ্ধ হয়ে স্বর্গলোকে উপস্থিত হবার সুযোগ এবং কামনানুযায়ী ঐশ্বর্যভোগ হয় ঠিকই, কিন্তু যে পুণ্যের ফলে সেই ভোগ জন্মেছিল সেই ভোগের জনক সেই পুণ্যের ক্ষয়ে দেবদেহ নষ্ট হয়ে যায়।
তখন ‘ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি’ (শ্রী. গী. ৯। ২১)। এদের স্বপ্নপূরণ হয় ঠিকই কিন্তু স্বর্গ থেকে প্রত্যাবর্তন, কর্মপ্রবাহে পুনরায় বন্ধন, গর্ভবাসাদি ক্লেশপ্রবাহ অনুগামী হয় ‘কর্ম কৃত্বা স্বর্গং যান্তি, তত আগত্য পুনঃ কর্ম কুর্বন্তীত্যেবং গর্ভবাসাদিযাতনাপ্রবাহস্তেষামনিশমনুবর্ত্তত ইত্যভিপ্রায়ঃ’ (গূঢ়. দী. ৯। ২১)। পদ্মপুরাণও পুণ্যভোগ সমাপ্ত হলে দেবতাদের স্বর্গচ্যুতির প্রসঙ্গে দ্বিধা করেনি। পুণ্যক্ষয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ দুঃখকর বলে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে, স্বর্গেও দেবতাদের সৌখ্য কিছু নেই—‘অকস্মাৎ পতিতং দুঃখং কষ্টং স্বর্গে দিবৌকসাম। …দেবানাং নাস্তি সৌখ্যং বিচারতঃ’ (পদ্ম. পু. ৬৬। ১৮৮, ভূমিখন্ড)। শ্রীহর্ষের মতে স্বর্গ থেকে অধোগতি বড়োই দুঃখদায়ক। এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি আছেন যিনি অপথ্যের মতো আপাতসুখকর স্বর্গ ভোগ করতে চাইবেন ‘বুভুক্ষতে নাকমপথ্যকল্পং ধীরস্তমাপাতসুখোন্মুখং কঃ’ (নৈ. চ. ৬। ১০০)।
মহাভারত-এর সভাপর্বে দেবর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য যথাক্রমে দেবরাজ ইন্দ্র, যম, বরুণ, কুবের ও পিতামহ ব্রহ্মার স্বর্গীয় সভার বর্ণনা করেছেন। আসলে ময়দানব নির্মিত যুধিষ্ঠিরের অত্যাশ্চর্য সভায় হাজির হয়ে নারদ নিজের বিস্ময় গোপন রাখতে পারেননি। তাঁর নিজের ধারণা হয়েছিল যে, পৃথিবীতে এধরনের মণিময় সভা ‘ন দৃষ্টপূর্বা ন চ শ্রুতা’। তবে কথার পৃষ্ঠে প্রাসঙ্গিকভাবেই তিনি অন্যান্য দেবতাদের উল্লেখযোগ্য যে সমস্ত সভাকক্ষ দেখেছেন তার বর্ণনা করেছেন। স্বর্গ-কথা আলোচনায় সে-সকল সভাকক্ষের উজ্জ্বল রূপবর্ণনায় পাঠক-চিত্ত সমৃদ্ধ হয়। দেবর্ষি একে একে তাঁর দৃষ্ট সভাগুলির বিস্তার, দৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য ক্রমান্বয়ে বলতে থাকেন ‘দিব্যাস্তা: শৃণু মত্তঃ শুভা: সভা: (মহা, সভা. ৬। ১৯)।
প্রথমেই দেবরাজের সভা। দেবতাদের অধিপতি বলে কথা! সূর্যের উজ্জ্বল কান্তিযুক্ত সেই সভাটি বিস্তারে একশো যোজন, দৈর্ঘ্যে দেড়শো যোজন এবং উচ্চতায় পাঁচ যোজন। ইন্দ্রের সভার চমক হল, সভাটি আকাশে ইচ্ছানুসারে চলতে পারে। মরজগতের দুঃখের সব কারণ সেখানে অনুপস্থিত। এককথায় সেখানে জরা নেই, শোক নেই, শ্রান্তি নেই এবং সর্বোপরি ভয়ের লেশমাত্র নেই। আছে কেবল শান্তি, মঙ্গল, মনভোলানো বাড়ি, স্বর্গীয় বৃক্ষ প্রভৃতি। দেবরাজ দেবরানি শচীদেবীকে নিয়ে সেই সভা আলোকিত করে যখন বসেন তখন অন্যান্য দেবতারা প্রত্যেকে সভার চারধারে দাঁড়িয়ে তাদের বন্দনা করেন। সভাকক্ষে উপস্থিত অনেকেই অযোনিজ, কেউ যা যোনিজ; অনেকে আবার বায়ুমাত্র ভক্ষণ করে থাকেন। অপ্সরা ও গন্ধর্বদের পরিচালনায় দেবরাজের আনন্দবিধানের জন্য সেখানে অবিরত নাচ, গান, বাজনা, হাসি-কলতান চলতে থাকে। দেবর্ষি, ব্রহ্মর্ষি, রাজর্ষিরা নানারকম দিব্য বিমানে আরোহণ করে সেখানে যাতায়াত করেন ‘বিমানৈর্বিবিধৈর্দিব্যৈর্দীপ্যমানা… যান্তি চায়ান্তি চাপরে’ (মহা. সভা. ৭। ২৭)। ওই সভায় প্রায়ই যাঁদের দেখা যায় তাঁরা হলেন বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য, চন্দ্র, ভৃগু ও সপ্তর্ষিগণ।
মৃত্যুর অধিপতি যমের সভাটি বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেছিলেন ‘বিশ্বকর্মা চকার হ’। সম্পূর্ণ তৈজস পদার্থ নির্মিত সভাটি বিস্তারে একশো যোজন এবং দৈর্ঘ্যে তার চেয়েও অধিকতর বললে অত্যুক্তি হয় না। সভাকক্ষের অন্দরে না-ঠাণ্ডা, না-গরম, এককথায় চিত্তের আহ্লাদকারিণী ‘নাতিশীতা ন চাত্যুষ্ণা মনসশ্চ প্রহর্ষিণী’ (তবে কি শীততাপনিয়ন্ত্রিত?)। সভার সব অনুকূল। প্রতিকূলতার কোনো চিহ্ন নেই। শোক, জরা, ক্ষুধা, পিপাসা, অপ্রিয়, দৈন্য অথবা বিষাদের নামগন্ধ নেই। যমের রাজসভায় স্বর্গ ও মর্ত্যের সমস্ত উপাদেয় বস্তু ও ভোজ্য বস্তু আছে ‘সর্বে কামা: স্থিতাস্তস্যাং যে দিব্যা যে চ মানুষা:’ (ওই ৮। ৫)। চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য ও পেয় সবের ঢালাও ব্যবস্থা। চিরকালের জন্য স্বর্গে গিয়েছেন এমন সব পুণ্যবান রাজর্ষিরা দলে দলে সেই সভায় ধর্মরাজের উপাসনায় রত। এই সভায় সভ্যসংখ্যা অগুনতি। প্রত্যেকের নামোল্লেখ এক দুঃসাধ্য কাজ ‘ন শক্যা: পরিসংখ্যাতুং নামভি: কর্মভিস্তথা’ (ওই ৮। ৩৩)। এখানেও অপ্সরা ও গন্ধর্বদের দল মিলিতভাবে বিনোদনের স্বার্থে নাচ, গান-বাজনার আয়োজন করে।
বরুণের সভাটিও নজরকাড়া। ইনি প্রাচীন বৈদিক দেবতা। মিত্র দেবতার সঙ্গে এঁর উল্লেখ রয়েছে (মিত্রাবরুণ)। ঋগবেদে বরুণকে সিন্ধুপতি (৭.৪.২.) বলা হয়েছে। ইনি পশ্চিমদিকের দিকপাল এবং দ্বাদশ আদিত্যের অন্যতম। দেবতারা বরুণের কাছে বর প্রার্থনা করেন। দৈর্ঘ্যে ও বিস্তারে যমরাজের সভাকক্ষের তুল্য হলেও বরুণের সভাটির বাইরে শুভ্রবর্ণের প্রাচীর ও তোরণ রয়েছে। বিশ্বকর্মা বরুণের সভাকক্ষটি জলের তলদেশে নির্মাণ করেছেন। চারধারে শোভিত বৃক্ষরাজি রত্নময় হলেও সেগুলি ফুলে, ফলে অবনত। সভ্যরা পাখির মধুর কলরব সভায় বসেই শুনতে পান। সভার নয়নাভিরাম ঘরগুলো এবং বসবার আসন—চিত্তাকর্ষক। দিব্য রত্ন ও বস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে বরুণ-পত্নী বরুণানীও সভা অলংকৃত করে বসেন। জলদেবতা বরুণের উপাসনায় দেবতাদের সঙ্গে বাসুকি, তক্ষকাদি নাগেদের উপস্থিতিও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এ ছাড়া সব সমুদ্র, নদী, পর্বতেরা উপযুক্ত দেহ ধারণ করে বরুণদেবের উপাসনায় ব্যস্ত থাকে। বরুণের পুত্র পুষ্কর, মন্ত্রী সুনাভ প্রমুখের উপস্থিতি আলাপচারিতার মাঝে উল্লেখ্য বিষয়।
যক্ষরাজ কুবেরের সভাটিও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আকাশে সংলগ্ন সভাটি কেবল দিব্যই নয়, সেটি স্বর্ণময় অট্টালিকায় শোভিত। শুভ্র বর্ণের সভাটির কাছে চন্দ্রের প্রভাও ম্লান হয়ে যায় ‘শশিপ্রভাপ্রাবরণা’। এটি দৈর্ঘ্যে একশো যোজন এবং বিস্তারে সত্তর যোজন। নাচে-গানে ওস্তাদ হাজারো অপ্সরা সারা সভাটিকে মাতিয়ে রাখেন। কুবেরের সভাতেও দেবর্ষি একাধিকবার গিয়েছেন। কুবেরের সভায় হরপার্বতীর নিত্য যাতায়াত রয়েছে। এই কুবেরই তপোবলে ব্রহ্মাকে প্রীত করে উত্তরদিকের দিকপালত্ব ও ধনপতিত্বের অধিকার অর্জন করেছিলেন।
পাঠক উৎকর্ণ হয়ে শুনছেন স্বর্গীয় সভার বর্ণনা। সবশেষে প্রজাপতি ব্রহ্মার সভা বর্ণনা। ব্রহ্মার সভা দেখতে হলে তপস্যার প্রয়োজন। দেবর্ষি সেই সভা নিজের চোখে দেখবার অভিপ্রায় প্রকাশ করতেই দেবদিবাকর তাঁকে সহস্রবৎসর ব্যাপী এক ব্রত পালন করতে বলেছিলেন—যার নাম ব্রহ্মব্রত। যথাযথভাবে হিমালয়ের কোলে উক্ত ব্রত সমাপ্ত হলে সূর্যদেব নারদকে নিয়ে ব্রহ্মার সভায় গিয়েছিলেন। অনন্ত নক্ষত্রপথ যাত্রাভূমির শেষে সেই সভা। বক্তা নারদের দু-চোখে যেন স্বপ্নের রেশ তখনও কাটেনি। নারদ জানিয়েছেন ‘সভাটি এরকম’ বলাই ধৃষ্টতামাত্র। ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তনশীল সেই সভা অনির্বচনীয় আকৃতি ধারণ করে:
এবং রূপেতি সা শক্যা ন নির্দেষ্টুং নরাধিপ!
ক্ষণেন হি বিভর্ত্ত্যন্যদনির্দেশ্যং বপুস্তথা।। (মহা. সভা. ১১। ১১)
সভাটি শূন্যে ভাসমান। নীচে কোনো স্তম্ভ না-থাকলেও সভাটি একচুলও টলে না। ব্রহ্মার উপাসনায় সেই সভায় কে নেই! দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, ঊনপঞ্চাশ বায়ু, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, বিশ্বদেবগণ, মনের মতন বেগশালী পিতৃগণ সকলেই ব্রহ্মার উপাসনায় রত। স্বয়ং নারায়ণ, দেবসেনাপতি কার্তিক, ঋষিকুল ও দেবতাদের উপস্থিতিতে সেই সভা অভ্যাগতদের ধন্য করে।
স্বর্গে কেবল সুখ, নরকে কেবল দুঃখ, পৃথিবীতে সুখ ও দুঃখ দুয়ের মিশ্রণ। অবিমিশ্র সুখ বা দুঃখ পৃথিবীতে নেই। এজন্য পৃথিবীতে বসবাসকারী লোকজন সকলেই স্বর্গে যেতে চান। নরকে নৈব নৈব চ। সুবাহু জৈমিনির কাছে জানতে চেয়েছিলেন স্বর্গের গুণাবলি বিস্তারিতভাবে ‘স্বর্গস্য মে গুণান ব্রূহি সাম্প্রতং দ্বিজসত্তম’ (পদ্ম. পু. ৯৫। ১, ভূমিখন্ড)। জৈমিনি বর্ণিত গুণাবলি পাঠ করলে পাঠকের ঔৎসুক্য জেগে ওঠা মোটেই বিচিত্র নয়। স্বর্গে রয়েছে নন্দন কাননের মতন বিবিধ দিব্য উদ্যান, যাদের চতুর্দিকে বৃক্ষরাজি দিব্য ফলে সুশোভিত। দিব্য বিচিত্র বিমানগুলো সবই হেমশয্যা ও হেমাসনবিশিষ্ট—যার প্রত্যেকটিতে অপ্সরাদের উপস্থিতি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দয়ালু ক্ষমাশীল, তপোনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই সেখানে বিচরণ করেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, যে ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য পৃথিবীতে সকল প্রাণীর এত পরিশ্রম এবং ছোটাছুটি স্বর্গে তার কোনো নামমাত্র চিহ্ন নেই:
নন্দনাদীনি রম্যাণি দিব্যানি বিবিধানি চ।
তত্রোদ্যানানি পুণ্যানি সর্বকামযুতানি চ।।
সর্বকামফলৈর্বৃক্ষৈ: শোভনানি সমন্ততঃ।
বিমানানি সুদিব্যানি সেবিতান্যপ্সরোগণৈ:।।
সর্বত্রৈব বিচিত্রাণি কামগানি বশানি চ।
তরুণাদিত্যবর্ণানি মুক্তজালান্তরাণি চ।।
চন্দ্রমন্ডলশুভ্রাণি হেমশয্যাসনানি চ।
সর্বকামসমৃদ্ধাশ্চ সর্বদুঃখবিবর্জিতা:।।
নরা: সুকৃতিনস্তেষু বিচরন্তি যথা ভুবি।
ন তত্র নাস্তিকা যান্তি নস্তেন নাজিতেন্দ্রিয়া:।।
ন নৃশংসা ন পিশুনা ন কৃতঘ্না ন মানিনঃ।
সত্যাস্তপঃস্থিতা: শূরা দয়াবন্তঃ ক্ষমাপরা:।।
যজ্বানো দানশীলাশ্চ তত্র গচ্ছন্তি তে নরা:।
ন রোগো ন জরা মৃত্যুর্ন শোকো ন হিমাতপৌ।।
ন তত্র ক্ষুৎপিপাসা চ কস্য গ্লানির্ন বিদ্যতে।
এতে চান্যে চ বহবো গুণা: স্বর্গস্য ভূপতে।।
(পদ্ম. পু. ৯৫। ২-৯, ভূমিখন্ড)
তবে স্বর্গও যে ত্রুটিমুক্ত নয় সে তথ্য পাঠক জৈমিনির স্বর্গবিবরণী থেকেই জানতে পেরেছেন। ‘দোষাস্তত্রৈব যে সন্তি তান শৃণু চ সাম্প্রতম’ (ওই)। স্বর্গের দু-দুটো ত্রুটির উল্লেখ করেছেন জৈমিনি। যথা—১. ইচ্ছে থাকলেও স্বর্গে পুনরায় কোনো শুভ কর্ম করা যায় না। স্বর্গ যেহেতু কেবল ফলভূমিরূপে চিহ্নিত সেহেতু যা কর্ম করবার তা পৃথিবীতে কর্মভূমিতেই সম্পন্ন করতে পারা যায়। অভিপ্রায় হল, নতুন শুভ কর্ম সম্পাদন করা যায় না বলে শুভ কর্মের অবসানে ‘পুনরাবর্তনম’। ২. অন্যের দীপ্ত সমৃদ্ধি দর্শনে অসন্তোষ জাগলেই স্বর্গ-পতন অবশ্যম্ভাবী হয়:
ন চাত্র ক্রিয়তে ভূয়ঃ সোহত্র দোষো মহান স্মৃতঃ।
অসন্তোষশ্চ ভবতি দৃষ্ট্বা দীপ্তাং পরাং শ্রিয়ম।।
ইহ যৎ ক্রিয়তে কর্ম ফলং তত্রৈব ভুজ্যতে।।
কর্মভূমিরিয়ং রাজন ফলভূমিরসৌ স্মৃতা।।
(পদ্ম. পু. ৯৫। ১১-১২, ভূমিখন্ড)
স্বর্গের অনুপুঙ্খ বিবরণ জৈমিনির কাছ থেকে শুনে রাজা সুবাহু আর স্বর্গে যাবার অভিপ্রায় পোষণ করেননি। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, যেখান থেকে পতনের সম্ভাবনা থাকে সেইস্থানে যাবার জন্য তিনি মোটেই আগ্রহী নন:
নাহং স্বর্গং গমিষ্যামি ন চৈবেচ্ছাম্যহং মুনে।
যস্মাচ্চ পতনং প্রোক্তং তৎকর্ম ন করোম্যহম।।
(পদ্ম. পু. ৯৫। ২০, ভূমিখন্ড)
স্বর্গের ত্রুটির প্রসঙ্গ শ্রীহর্ষও এনেছেন দময়ন্তীর মুখে। স্বর্গে স্বর্গবাসীদের পরমসুখ আছে, কিন্তু ধর্ম নেই। অথচ এই পৃথিবীতে সুখও আছে, ধর্মও আছে ‘স্বর্গে সতাং শর্ম পরং ন ধর্মা ভবন্তি ভূমাবিহ তচ্চ তে চ’। (নৈ. চ. ৬। ৯৮)। স্বর্গ থেকে অধোগতি হওয়ার বিষয়টি দময়ন্তীর মোটেই ভালো লাগেনি ‘সাধোরপি স্বঃ খলু গামিতাধোগামী’ (নৈ. চ. ৬। ৯৯)। তবে সুবাহুর মতে ব্রহ্মলোক থেকে আরম্ভ করে সর্বত্র দোষ বিদ্যমান ‘আব্রহ্মসদনাদেব দোষা: সন্তি চ বৈ নৃপ’ (পদ্ম. পু. ভূমিখন্ড ৯৫। ১৪)।
বিবিদিষু জানতে চান, যেখানে যাবার জন্য পৃথিবীর মানুষ এত পাগল সেখানকার অধিবাসীরা কেমন থাকেন? পদ্মপুরাণ-এ এই ব্যাপারে বিবিদিষুর অনুসন্ধিৎসা নিবৃত্তিতে প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে। দেবতাদের অন্যোন্যাতিশয্য দর্শনে পারস্পরিক ঈর্ষা সুখের প্রবল অন্তরায়। স্বর্গে দেবতাদের সৌখ্য নেই বললেই চলে। ছিন্নমূল বৃক্ষ যেমন পতিত হয় তেমন পুণ্যের অবসানে দেবগণেরও পতন অনিবার্য:
স্বর্গং প্রাপ্তা নিপতিতা: কঃ শ্রিয়া বিন্দতে সুখম।।
স্বর্গেহপি চ কুতঃ সৌখ্যং দৃষ্ট্বা দীপ্তাং পরশ্রিয়ম।
উপর্য্যুপরি দেবানামন্যোন্যেহতিশয়স্থিতাম।।
ছিন্নমূলতরুর্যদ্বদ্বিবসৈ: পততি ক্ষিতৌ।
পুণ্যস্য সঙক্ষয়াত্তদ্বন্নিপতন্তি দিবৌকসঃ।। (পদ্ম. পু. ভূমিখন্ড, ৬৬। ১৮৬-১৮৮)
স্বর্গকথায় পারিজাত বৃক্ষ তার নিজের অলৌকিকত্বের গুণেই জায়গা করে নিয়েছে। দেবতা ও দানবদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ক্ষীরসমুদ্র মন্থনের সময় সমুদ্র থেকে পারিজাত বৃক্ষের উৎপত্তি। ইন্দ্র এটিকে নন্দনে রোপণ করেন। পারিজাতের গন্ধে চতুর্দিক ম ম করত। বলা হয় যে, দেবপত্নীদের আনন্দ বিধানের জন্যই পারিজাতের উৎপত্তি:
কৃতাবর্ত্তাৎ ততস্তস্মাৎ ক্ষীরোদাদ বাসয়ন জগৎ।
গন্ধেন পারিজাতেহভূদ দেবস্ত্রীনন্দনস্তরুঃ।। (বি. পু. ১। ৯। ৯৪)
ক্ষীরসমুদ্র মন্থনে প্রাপ্ত সামগ্রীর তালিকা গ্রন্থান্তরেও লক্ষ করা যায়। (পদ্ম. পু. ৪১। ৪৪, স্বর্গখন্ড)।
এই সেই পারিজাত যাকে কেন্দ্র করে স্বর্গে কৃষ্ণ ও ইন্দ্রের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেধেছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পরিণাম এতদূর গড়িয়েছিল যে, কৃষ্ণকে সুদর্শনচক্র ও দেবরাজকে বজ্র ধারণ করতে দেখে সমগ্র ত্রিভুবনে হাহাকার শুরু হয়েছিল:
ততো হাহাকৃতং সর্বং ত্রৈলোক্যং দ্বিজসত্তম।
বজ্র-চক্রধরৌ দৃষ্ট্বা দেবরাজ-জনার্দ্দনৌ।। (বি. পু. ৫। ৩০। ৬৭)
পারিজাতকে নিয়ে যুযুধান দুই দেব-নেতার কাহিনি জানতে হলে পাঠককে পূর্ববর্তী প্রেক্ষিত সামান্যভাবে জানতেই হয়। সেটি হল, দেবরাজ ইন্দ্রের কাছ থেকে কৃষ্ণ একবার জানতে পারেন যে, দৈত্য নরকাসুর ইন্দ্র-জননী অদিতির অমৃতবর্ষী দিব্য কুন্ডল দুটি হরণ করেছে। ক্ষমতার দম্ভে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী নরকাসুরকে কৃষ্ণ হত্যা করেন এবং তার বধের পর সত্যভামাকে নিয়ে গরুড়ের পিঠে চেপে তিনি স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অভিপ্রায় ছিল, জননী অদিতিকে কুন্ডল দুটি ফিরিয়ে দেবেন ‘অদিত্যা: কুন্ডলে দাতুং জগাম ত্রিদিবালয়ম’(বি. পু. ৫। ২৯। ৩৫)। ‘অতিথিদেবো ভব’ সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী দেবতারাও স্বর্গদ্বারে কৃষ্ণকে দেখামাত্র অর্ঘ্যপাত্র হাতে নিয়ে বন্দনা করলেন সৌজন্যবিধি যথানিয়মে পালন করে। দেবজননী অদিতিকে প্রণামাদির কাজ সেরে কৃষ্ণ তার হৃত কুন্ডল দুটি তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। অদিতির আদেশে দেবরাজ কৃষ্ণের সম্মানে বিবিধ আয়োজনও করেন।
একদিন ইন্দ্রপত্নী শচীদেবী সত্যভামাকে মানুষী মনে করে নিজের সাজের পারিজাত-পুষ্প দিলেন না, অথচ নিজে ওই পাগল-করা গন্ধপুষ্পে সাজলেন। সত্যভামার অন্তরে ক্ষোভের সূত্রপাত তখন থেকেই। ইন্দ্রপত্নী শচীর আহ্লাদ উদ্রেককারী পারিজাতপুষ্প শোভিত বৃক্ষটি নয়নাভিরাম নন্দনে বেড়ানোর সময় কৃষ্ণ-সত্যভামা দেখতে পেলেন। বৃক্ষে নবীন তাম্রবর্ণের পল্লব শোভা পাচ্ছিল এবং বৃক্ষের ত্বক ছিল স্বর্ণময়। সত্যভামা নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি কৃষ্ণের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন বৃক্ষটিকে উৎপাটিত করে দ্বারকায় নিয়ে যাবার জন্য। নন্দনের আনন্দময় পরিবেশে পারিজাত বৃক্ষের সৌন্দর্যে সত্যভামার মনপাখি আনচান করে। মানবী হৃদয়ের একবুক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সত্যভামা কৃষ্ণকে মোক্ষম কথা বললেন। কৃষ্ণ যদি তাকে সত্যিই সবথেকে বেশি ভালোবাসেন তবে দ্বারকায় নিজের বাগানবাড়িতে পারিজাতবৃক্ষটিকে তিনি যেন নিয়ে যান। শচীদেবী সাজের সময় পারিজাতপুষ্প না-দেওয়ায় সত্যভামা যারপরনাই অপমানিত বোধ করেছেন। সত্যভামার কানে বাজে কৃষ্ণের প্রিয়ভাষণ, যে ভাষণে কৃষ্ণ প্রেমনিবেদনকালে প্রায়ই বলে থাকেন, রুক্মিণী বা জাম্ববতী অপেক্ষাও সত্যভামা প্রিয়তমা। আজ নন্দনে সেই বাক্যের সত্যতা আদৌ ছিল কি না তার প্রমাণ মিলবে। অনন্ত প্রত্যাশায় সত্যভামা কৃষ্ণের মুখপানে তাকিয়ে রয়েছেন:
যদি চেত্ত্বদ্বচঃ সত্যং সত্যাত্যর্থং প্রিয়েতি মে।
মদেগহনিষ্কুটার্থায় তদয়ং নীয়তাং তরুঃ।।
ন মে জাম্ববতী তাদৃগভীষ্টা ন চ রুক্মিণী।
সত্যে যথা ত্বমিত্যুক্তং ত্বয়া কৃষ্ণাসকৃৎ প্রিয়ম।।
সত্যং তদ যদি গোবিন্দ নোপচারকৃতং তব।
তদস্তু পারিজাতেহ য়ং মম গেহবিভূষণম।। (বি. পু. ৫। ৩০। ৩৪-৩৬)
সত্যভামা নিজের বেণীতে পারিজাত পুষ্প লাগিয়ে সপত্নীদের মধ্যে বিরাজ করবেন—এধরনের ভাবনায় অধীর হয়ে উঠলেন। পত্নীর আবদার অনুনয়ের তাগিদে এবং কথিত বচনের সত্যতা প্রমাণের জন্য কৃষ্ণ তৎপর হলেন। সত্যভামার চাহিদা পূরণে অক্লেশে পারিজাতবৃক্ষটিকে নন্দন থেকে উঠিয়ে মর্ত্যে যাবার উদ্দেশ্যে গরুড়ের পিঠে চাপালেন। রে রে করে এল রক্ষীর দল। রক্ষীরা জানাল যিনি দেবরাজ পত্নী তিনিই কেবলমাত্র এই পারিজাতবৃক্ষের পুষ্প বিনোদনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। সব জিনিস সকলের জন্য নয়। পারিজাত-হরণকথা দেবতারা কখনই সহ্য করবেন না। তারা সমবেতভাবে কৃষ্ণকে আক্রমণ করবেন। নন্দনের রক্ষীদের কাছে এতসব শুনে ক্রোধে বিরক্তিতে সত্যভামা জ্বলে উঠলেন। দেবরাজ ও রাজপত্নীর ক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ করলেন। প্রশ্ন তুললেন—দেব-দানবের সম্মিলিত প্রযত্নে যে বৃক্ষের উৎপত্তি তা সর্বসাধারণের সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হবে না কেন? ইন্দ্রপত্নী কেনই বা তাকে একা ভোগ করবেন? সমুদ্র থেকে উৎপন্ন লক্ষ্মী, চন্দ্র যদি সাধারণের ভোগ্য হয় তবে কোন যুক্তিতে শচীর জন্য এটি নির্দিষ্ট থাকবে?
ইত্যুক্তে তৈরুবাচৈতান সত্যভামাতি কোপিনী।
কা শচী পারিজাতস্য কো বা শত্রুঃ সুরাধিপঃ।।
সামান্যঃ সর্বলোকানাং যদ্যেষোহমৃতমন্থনে।
সমুৎপন্নঃ সুরা: কস্মাদেকো গৃহ্ণাতি বাসবঃ।।
যথা সুরা যথৈবেন্দুর্যথাশ্রীর্বনরক্ষিণঃ।
সামান্যঃ সর্বলোকস্য পারিজাতস্তথা দ্রুমঃ।। (বি. পু. ৫। ৩০। ৪৪-৪৬)
সত্যভামা বনরক্ষীদের আদেশ করলেন ইন্দ্রপত্নীকে তারা যেন জানিয়ে আসে যে তিনি মানুষী হয়েও পারিজাত হরণ করাচ্ছেন। তাদের ক্ষমতা থাকলে যেন প্রতিরোধ করতে আসেন—‘পারিজাতং তথাপ্যেনং মানুষী হারয়ামি তে’। বনরক্ষীদের কাছে সত্যভামার ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষণের যথোপযুক্ত জবাব দেবার জন্য ইন্দ্রপত্নী শচীদেবী দেবরাজকে দম দিলেন। স্বর্গের বৃক্ষকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে গেল ভয়ংকর যুদ্ধ। আক্রমণ, প্রতি আক্রমণে বাতাস যখন ভারী তখন ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে ইন্দ্রকে পৃষ্ঠ প্রদর্শনে উদ্যতপ্রায় দেখে সত্যভামা নিজেই বললেন ‘নীয়তাং পারিজাতেহয়ং দেবা: সন্তু গতব্যথা:’। সত্যভামার বক্তব্যে প্রীত হয়ে দেবরাজও জানালেন যে, ত্রিলোকের অধীশ্বরের কাছে পরাজয়ে তাঁর চিত্তে কোনো গ্লানি নেই। সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ইন্দ্র কৃষ্ণকে পারিজাতবৃক্ষটিকে দ্বারকায় নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি দিলেন। তবে এও জানালেন যে, কৃষ্ণের দেহত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই পারিজাত মর্ত্যে আর থাকবে না:
নীয়তাং পারিজাতেহয়ং কৃষ্ণ দ্বারবতীং পুরীম।
মর্ত্যলোকে ত্বয়া ত্যক্তে নায়ং সংস্থাস্যতে ভুবি।। (বি. পু. ৫। ৩১। ৭)
আমাদের কল্পনার রাজ্যে স্বর্গ পরমআকাঙ্ক্ষিত স্থান। স্বর্গপ্রাপ্তির উদ্দেশ্য নিয়েই অধিকাংশ কাম্য কর্ম সম্পাদিত হয়। কামনা নিয়ে যে কর্ম করা হয় তাকেই কাম্যকর্ম বলে। যেমন পারত্রিকফলক দর্শপূর্ণ মাসযাগের স্বর্গাদি ফল পরলোকেই ভোগ্য। মৃত্যুর পরে অনুষ্ঠিত শ্রাদ্ধাদি কর্মের লক্ষ্যও হল আত্মার স্বর্গপ্রাপ্তি। মৃত ব্যক্তিকে ‘স্বর্গত’ এবং মৃত্যুকে ‘স্বর্গলাভ’ বলা হয়। তবে আপামর জনতা মৃত ব্যক্তিমাত্রই স্বর্গত বললেও সেটি যে সকলের জন্য নয় এবং অবশ্যই ‘সংরক্ষিত’ তা স্বর্গগমনের প্রয়োজনীয় গুণাবলির তালিকায় নজর দিলেই চোখে পড়ে। স্বর্গ শব্দের মূল অর্থ প্রীতি বা আনন্দ। সম্পূর্ণ আনন্দময় স্থান যেহেতু মরজগতে দুর্লভ তাই মরণের পরেই স্বর্গ। কল্পিত স্থান নিয়ে লোকব্যবহার চলতে পারে না। এজন্য দুঃখ কবলিত সংসারের শেষে ঠিকানাহীন আনন্দলোকই স্বর্গ। যতদিন জীবন ততদিন দুঃখ। জন্ম চলে গেলে দুঃখ চলে যায় ‘জন্মাপায়ে দুঃখমপৈতি’ (বা.ভা. ১। ১। ২)। সুতরাং দুঃখকে চিরতরে যেতে হলে জীবনের পথটুকু পার করতে পারলেই হল—এ ধরনের মন নিয়ে সাধারণেরা থাকেন বলেই বেশির ভাগ মানুষ ভাবেন—মৃত্যুর পরেই স্বর্গলাভ। তবে নানান পুরাণের কল্পকাহিনি স্বর্গকে ‘সংরক্ষিত’ স্থানের মর্যাদা দিয়ে সকলের স্বর্গপ্রাপ্তিতে জল ঢেলে দিয়েছে।
স্বর্গ নিয়ে অতিমাত্রায় আলোচনাকারী মীমাংসকেরাও স্বর্গলোকের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব মানেন না। নিরতিশয় প্রীতিকে স্বর্গ বলা হলে বিষ্ণুপুরাণ-এর সূত্র ধরে বলতেই হয় ‘মনঃ প্রীতিকরঃ স্বর্গঃ’ (বি. পু. ২। ৬। ৪২)। ভট্ট কুমারিল মনে করেন, নিরতিশয় প্রীতি অনুভব করতে হলে শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্ব বর্জিত স্থানের প্রয়োজন হয়। এই পৃথিবীতে মুহূর্তের শতাংশ কালটুকুও দ্বন্দ্বহীন নয়। সুতরাং নিরতিশয়, মাত্রাহীন প্রীতি অনুভব করবার জন্য একটা কল্পিত ভোগের স্থান দরকার হল ‘যা প্রীতির্নিরতিশয়া অনুভবিতব্যা, সা চ উষ্ণশীতাদিদ্বন্দ্বরহিতে দেশে শক্যা অনুভবিতুম। অস্মিংশ্চ দেশে মুহূর্তশত-ভাগোহপি দ্বন্দ্বৈর্ন মুচ্যতে। তস্মান্নিরতিশয়প্রীত্যনুভবায় কল্প্যো বিশিষ্টো দেশঃ’। বিবিদিষু পাঠক এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্বর্গ-ভাবনাকে একাসনে বসানোর লোভ সামলাতে পারেন না। কবি-কল্পনায় স্বর্গ হল কালাতীত, অনাদ্যন্ত, দিকশূন্য ও দিবস-নিশাহীন মানুষের কল্পনাভূমি, শূন্যতায় ব্যাপ্ত এক অর্থহীনতা মাত্র। মানুষের অনুভবে ও অভিব্যক্তিতেই স্বর্গের প্রকাশ:
স্বর্গ কোথায় জানিস কি তা ভাই।
তার ঠিক-ঠিকানা নাই।
তার আরম্ভ নাই, নাই রে তাহার শেষ,
ওরে নাইরে তাহার দেশ,
ওরে নাইরে তাহার দিশা,
ওরে নাইরে দিবস, নাইরে তাহার নিশা। (বলাকা, ২৪ সংখ্যক কবিতা)
একটা প্রাচীন উক্তি থেকে জানা যায়, স্বর্গ ও নরক বলে স্বতন্ত্র কোনো স্থান নেই। স্বর্গ ও নরক এই জগতেই ভোগ্য। সংহিতাকার দক্ষের মতে, স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত থাকলে এজগতেই স্বর্গ-সুখ উপলব্ধি করেন। পক্ষান্তরে উভয়ে সর্বদাই তীব্র বিরুদ্ধ মত পোষণ করলে এসংসারেই নরকের দুঃখ নেমে আসে:
অনুকূলকলত্রো যস্তস্য স্বর্গ ইহৈব হি।
প্রতিকূলকলত্রস্য নরকো নাত্র সংশয়ঃ।। (দ. স. ৪। ৫)
বস্তুত স্বর্গকে মনের প্রীতিকর বলা হলে এই উক্তির যথার্থতা দৃঢ় হয় ‘ইহৈব স্বর্গনরকাবিতি মাতঃ প্রচক্ষ্যতে’। কবি শ্রীহর্ষও স্বর্গকে দিশাহীন বলতে দ্বিধা করেননি। তাঁর অভিপ্রায় হল, যে বিষয়ের প্রতি যার অনুরাগ থাকে, সেই বিষয়টিই তার কাছে স্বর্গ—‘দ্যৌর্ন কাচিদথবাস্তি, নিরূঢ়া সৈব সা চলতি যত্র হি চিত্তম’ (নৈ. চ. ৫। ৫৭)। তবে প্রকৃত মুমুক্ষু স্বর্গপ্রাপ্তি কামনা করেন না। এঁরা স্বর্গপ্রাপ্তিকে বিঘ্নতুল্য বলে অনুমান করেন যেহেতু স্বর্গসীমারও ক্ষয় রয়েছে। বিষ্ণুপুরাণ পরিষ্কার জানিয়েছে, যাঁর মন বাসুদেবে আসক্ত ইন্দ্রত্বাদি ফল তার পক্ষে তুচ্ছ ব্যাপার। কারণ পুনরাবর্তনবিশিষ্ট স্বর্গগমন এবং চরম মুক্তিজনক ‘বাসুদেব’ কোনোমতেই তুল্যমূল্য নয়:
বিষ্ণুসংস্মরণাৎ ক্ষীণসমস্তক্লেশসঞ্চয়ঃ।
মুক্তিং প্রয়াতি স্বর্গপ্রাপ্তিস্তস্য বিঘ্নেহনুমীয়তে।।
বাসুদেবে মনো যস্য জপ-হোমার্চনাদিষু।
তস্যান্তরায়ো মৈত্রেয় দেবেন্দ্রত্বাদিকং ফলম।।
ক্ব নাকপৃষ্ঠগমনং পুনরাবৃত্তিলক্ষণম।
ক্ব জপো বাসুদেবেতি মুক্তিবীজমনুত্তমম।। (বি. পু. ২। ৬। ৩৮-৪০)
আস্তিকমাত্রেই স্বর্গে বিশ্বাসী। মৃত্যুর পর এমন একটা দেহ হয় যাতে স্বর্গ-ভোগ সম্পন্ন হয়। মনুর মতে, বেশি পরিমাণ সদাচরণ ও পুণ্যজনক কর্ম সম্পাদনকারী মানুষ পৃথিব্যাদি সূক্ষ্ম ভূত দ্বারা শরীরী হয়ে স্বর্গে সুখভোগ করেন:
যদ্যাচরতি ধর্মং স প্রায়শেহধর্মমল্পশঃ।
তৈরেব চাবৃতো ভূতৈ: স্বর্গে সুখমুপাশ্নুতে।। (ম. স. ১২। ২০)
তৈত্তিরীয় উপনিষদ-এর মতে ভূ:, ভুবঃ, স্বর প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ ব্যাহৃতি। সপ্তলোকের পরিচায়ক বীজরূপী এই কয়টি মন্ত্রকে ব্যাহৃতি বলে। উক্ত তিনটির সঙ্গে মহঃ, জন, তপঃ ও সত্য নিয়ে সপ্তলোক। তবে প্রথম তিনটিকে মহাব্যাহৃতি বলে। তৈত্তিরীয় থেকে পাঠক জানতে পারেন পৃথিবীলোকই ভূ:, অন্তরিক্ষলোক ভুবঃ এবং দ্যুলোক হল স্বর ‘ভূর্ভুবঃ সুবরিতি বা এতাস্তিস্রো ব্যাহৃতয়ঃ। …ভূরিতি বা অয়ং লোকঃ। ভুব ইত্যন্তরিক্ষম। সুবরিত্যসৌ লোকঃ’ (তৈ. উ. ১। ৫। ১)। পদ্মপুরাণ-এর মতে, দৃশ্যমান পৃথিবী ভূলোক, পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত ভুবর্লোক এবং সূর্যের উপর থেকে ধ্রুবের সংস্থান পর্যন্ত যে স্থান সেটি স্বর্গলোক:
ভূর্লোকাচ্চ ভুবর্লোকঃ সূর্য্যাবধিরূদীরিতঃ।
আদিত্যাদাধ্রুবং রাজন স্বর্লোকঃ কথ্যতে বুধৈ:।। (পদ্ম. পু. ষষ্ঠ অধ্যায়)
বশিষ্ঠের শিষ্য মহারাজ ত্রিশঙ্কু একবার জেদ ধরেছিলেন সশরীরে স্বর্গে যাবেন। পার্থিব শরীরটাকে নিয়ে স্বর্গে যাবার শখ তার বহুদিনের। দীর্ঘদিনের পালিত ইচ্ছাপূরণের জন্য যদি কোনো বিশেষ যজ্ঞের নাম বশিষ্ঠ স্বয়ং করতে পারেন তবে তিনি ধন্য হবেন। যজ্ঞের আবশ্যক উপকরণের কোনো অভাব ত্রিশঙ্কু রাখবেন না তা বলাই বাহুল্য:
ভগবন যষ্টুমিচ্ছামি তেন যজ্ঞেন সাম্প্রতম।
গম্যতে ত্রিদিবং যেন সশরীরেণ সত্বরম।।
তস্মাৎ কুরু প্রসাদং মে সম্ভারানাহর দ্রুতম।
তস্য যজ্ঞস্য সিদ্ধ্যর্থং যথার্হান ব্রাহ্মণাংস্তথা।। (স্ক. পু. নাগরখন্ড, ২। ১২, ১৩)
বশিষ্ঠ কিন্তু কোনোরকম রাখঢাক না-রেখে সহজ সত্যটি প্রকাশ করে দিয়েছেন যে সশরীরে স্বর্গগমন অসম্ভব। এমন কোনো যজ্ঞের বিষয়ে তিনি জানেন না, যে যজ্ঞানুষ্ঠানের দ্বারা সশরীরে আদৌ স্বর্গগমন সম্ভব। যে সকল অগ্নিষ্টোমাদি যজ্ঞের দরুন স্বর্গলাভ হয় সেসবই দেহান্তেই হয়ে থাকে:
ন স কশ্চিৎ ক্রতুর্যেন গম্যতে ত্রিদিবং নৃপ।
অনেনৈব শরীরেণ সত্যমেতদ ব্রবীম্যহম।। (স্ক. পু. ওই ২। ১৪)
ত্রিশঙ্কুও নাছোড়বান্দা। তার দৃঢ় ধারণা ছিল গুরুদেব একটা-না-একটা যজ্ঞের নাম নিশ্চয়ই বলবেন এবং তিনি ধন্য হবেন। বশিষ্ঠ জানালেন, তিনি পরিহাসছলেও কখনও মিথ্যা বলেন না। সুতরাং ত্রিশঙ্কুর উক্ত প্রত্যাশা পরিহার করাই শ্রেয়। কেবল তিনি নন, বিশ্বের তাবড় পুরোহিতবর্গও এই আবদার পূরণে অক্ষম। ত্রিশঙ্কু অধৈর্য্য হয়ে গুরুকে পরিত্যাগের সংকল্প ঘোষণা করে দিলেন। স্বর্গলোভাতুর ত্রিশঙ্কুর ঘোষণায় বশিষ্ঠ নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না এবং প্রত্যুত্তরে ত্রিশঙ্কুকে গুরু পরিবর্তনের অনুমতি দিয়ে দিলেন:
তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা বশিষ্ঠো ভগবাংস্ততঃ।
তমুবাচ বিহস্যোচ্চৈ: কুরুষ্বৈবং মহীপতে।। (স্ক. পু. না. খ. ২। ২৩)
হতোদ্যম না-হয়ে একবুক প্রত্যাশা নিয়ে ত্রিশঙ্কু ইচ্ছাপূরণের জন্যে গেলেন বশিষ্ঠের শতপুত্রের কাছে। কিন্তু তারাও পিতা বশিষ্ঠের বক্তব্যকেই সমর্থন করেন এবং সশরীরে সুরালয়ে যাবার বাসনায় হিতকারী গুরুকে ত্যাগের জন্য ত্রিশঙ্কুকে লোকনিন্দিত বিকৃতকায় চন্ডালে রূপান্তরিত করে দিলেন ‘তস্মাদ্ভবাধুনা পাপ চন্ডালো লোকনিন্দিতঃ’ (স্ক. পু. না. খ. ৩। ৭)। পরবর্তীকালে বিশ্বামিত্র নিজের তপস্যার প্রভাবে ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে পাঠান। চন্ডাল ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে দেখে ইন্দ্র যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে মর্ত্যে নামতে বলেন। কিন্তু বিশ্বামিত্রের তপস্যার প্রভাবে ত্রিশঙ্কু মর্ত্যে নামলেন না। বিবদমান দুই শক্তির টানাপোড়েনে স্বর্গ-মর্ত্যের মাঝামাঝি জ্যোতিষ্করূপে রয়ে গেলেন।
মীমাংসা দর্শনের আলোচনায় পন্ডিত ভূতনাথ সপ্ততীর্থ বলেন, স্বর্গলাভ নানাবিধ কর্মানুষ্ঠানের দ্বারা সম্ভব হলেও সব স্বর্গই একরকম নয়। স্বল্প শ্রমসাধ্য কর্ম থেকে এবং বহুশ্রমসাধ্য কর্ম থেকে লব্ধ স্বর্গ ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের এবং উভয়বিধ কর্মসাধ্য স্বর্গবাসের মেয়াদও স্বতন্ত্র। নিজের মত উপস্থাপনের স্বার্থে তিনি যর্জুবেদের ভাষ্যভূমিকায় উল্লিখিত সায়ণাচার্য্যের মতও উদ্ধৃতি দিয়েছেন ‘উচ্চাবচকর্মণামেকবিধফলাসম্ভবাৎ স্বর্গো বহুবিধঃ’। অর্থাৎ কর্মানুযায়ী স্বর্গবাসের সময়সীমা স্থির হবে। যেমন একশো টাকায় ক্রীত দ্রব্য ও পাঁচশো টাকায় ক্রীত দ্রব্যের গুণগত পার্থক্য অনস্বীকার্য তেমনই কর্মের মহত্ত্ব অনুসারে স্বর্গবাসের সময়সীমা নির্ধারিত হয় ‘ফলস্য কর্মনিষ্পত্তেস্তেষাং লোকবৎ পরিমাণতঃ ফলবিশেষঃ স্যাৎ’ (মী. সূ. ১। ২। ১৭)।
কূর্মপুরাণ স্বর্গসুখ লাভে অধীর মানুষজনের জন্য স্বর্গের একটা স্থির জায়গা চিহ্নিত করেছে। সুমেরুর পূর্বভাগে নাকি যাবতীয় শোভার আধারবিশিষ্ট অমরাবতী নামে ইন্দ্রের এক মহাপুরী আছে। সেই অমরাবতীতে হাজার হাজার অপ্সরা, গন্ধর্ব, সিদ্ধ ও চারণেরা সব সহস্রাক্ষ ইন্দ্রের বন্দনায় রত। কেবলমাত্র ধার্মিক, বেদজ্ঞ, হোমপরায়ণ ব্যক্তিরাই সেই অমরাবতীতে প্রবেশের অধিকারী:
তত্রৈব পর্বতবরে শক্রস্য পরমা পুরী।
নাম্নামরাবতী পূর্বে সর্বশোভাসমন্বিতা।।
তমিন্দ্রমপ্সরসঙ্ঘা গন্ধর্বা: সিদ্ধচারণা:।
উপাসতে সহস্রাক্ষং দেবাস্তত্র সহস্রশঃ।।
যে ধার্মিকা বেদবিদো যাগহোমপরায়ণা:।
তেষাং তৎ পরমং স্থানং দেবানামপি দুর্লভম।। (কূ. পু. পূর্বভাগ, ৪৫। ৯-১১)
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে পৌঁছে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। যুধিষ্ঠির দেখলেন ত্রিভুবনের ন্যায় বিশাল স্বর্গে তার প্রতিপক্ষী দুর্যোধন সভা আলো করে বসে আছেন। প্রভামন্ডলসম্পন্ন মার্তন্ডের মতন একরাশ শোভা বিকীর্ণ করে নিশ্চিন্তে স্বর্গসুখ ভোগ করছেন। যুধিষ্ঠিরের অন্তরাত্মা সেদিন বিষণ্ণ হয়েছিল। তিল তিল করে গড়ে তোলা সভ্যতার বর্তিকাগুলো যারা অনায়াসে ফুৎকারে নিভিয়ে দেয়—সেইরকম নীচজনের নেতারও স্বর্গবাস! কর্ম, কর্মফল—এসবের কি কোনো মূল্যই নেই! এতো লোকক্ষয়, আত্মীয়-পরিজনের জীবনহানি, অন্তঃসত্তা রমণীদের বৈধব্য প্রভৃতি সবের মূলে যে যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধের যিনি মূল কারিগর সেও কিনা স্বর্গলোকে:
ততো যুধিষ্ঠিরো রাজা দুর্যোধনমমর্ষিতঃ।
সহসা সন্নিবৃত্তোহভূচ্ছিয়ং দৃষ্ট্বা সুযোধনে।।
ব্রুবন্নুচ্চৈর্বচস্তান বৈ নাহং দুর্য্যোধনেন বৈ।
সহিতঃ কাময়ে লোকাঁল্লুব্ধেনাদীর্ঘদর্শিনা।।
যৎকৃতে পৃথিবী সর্বা সুহৃদো বান্ধবাস্তথা।
হতাস্মাভি: প্রসহ্যাজৌ ক্লিষ্টৈ: পূর্বং মহাবনে।। (মহা. স্বর্গ. ১। ৬-৮)
যুধিষ্ঠিরের অবস্থানে নারদ হাসি চেপে রাখতে পারেননি। তিনি ধর্মসন্তানকে জানিয়ে দেন স্বর্গে কোনো প্রতিপক্ষী থাকে না। বিরোধ মর্ত্যের ধর্ম। ইষ্টানিষ্ট বিবেচনা স্বর্গলোকের গন্ডির মধ্যে পড়ে না। বৈরিতা মরভূমির জন্য। এখানে অতীত ভাববেন না। সুতরাং দুর্যোধনের মুখদর্শন করব না—এ জাতীয় বৈরিতামূলক চিন্তাগুচ্ছকে বিসর্জন দিন:
সমাগচ্ছ যথান্যায়ং রাজ্ঞা দুর্য্যোধনেন বৈ।
স্বর্গোহয়ং নেহ বৈরাণি ভবন্তি মনুজাধিপ।। (মহা. স্বর্গ. ১। ১৮)
মহাভারত-এর পাঠক জানেন, মৃত্যুর পূর্বে দুর্যোধন কৃতবর্মা, কৃপাচার্য ও অশ্বত্থামাকে শেষবারের মতন আলিঙ্গন করে বলেছিলেন স্বর্গেই তাদের পুনর্মিলন হবে এবং সাময়িক নীরবতার পর স্বয়ং প্রাণত্যাগ করে পুণ্যধাম স্বর্গলোকে গমন করলেন ‘স্বস্তি প্রাপ্নুত ভদ্রং বঃ স্বর্গে নঃ সঙ্গমঃ পুনঃ’ (সৌপ্তিক পর্ব, ৯। ৫৬)।
যজ্ঞকর্মের ফলস্বরূপ স্বর্গপ্রাপ্তির আশাব্যঞ্জক কথা বিবিধ গ্রন্থে বর্ণিত যেমন হয়েছে তেমন এসকল ভাবনার বিরোধিতাও কম হয়নি। স্কন্দপুরাণ স্বর্গপ্রাপ্তির উপায়রূপে যজ্ঞকার্যের মহিমা ব্যক্ত করেছে:
স্বর্গমার্গকৃতে সর্বে চক্রর্যজ্ঞাংস্ততঃপরম।
অগ্নিষ্টোমাদিকাংস্তত্র বহুহোমাদিকাংস্তথা।। (স্ক. পু. না. খ. ২৭২। ১৭)
বৈশেষিক সূত্রকার মহর্ষি কণাদ প্রয়োজনকে দৃষ্ট এবং অদৃষ্ট ভেদে দু-ভাগে বিভক্ত করেছেন। যা কিছু ইষ্ট বা ইষ্টের সাধন তারই নাম প্রয়োজন। কোনো বিষয়ের স্বরূপ এবং তার ফল উভয়ই প্রত্যক্ষবেদ্য হলে তাকেই দৃষ্ট বলা হয়। পক্ষান্তরে যার দৃষ্ট ফল নেই এরকম প্রয়োজনকে অদৃষ্ট প্রয়োজন বলে। এটি অতীন্দ্রিয় অভ্যুদয়ের হেতু ‘দৃষ্টাদৃষ্টপ্রয়োজনানাং দৃষ্টাভাবে প্রয়োজনমভ্যুদয়ায়’ (বৈ. সূ. ৬। ২। ১)। স্বর্গ আমাদের দৃষ্টির বাইরে বলে এবং যাগযজ্ঞাদি তার সাধন হওয়ায় যাগযজ্ঞাদি অদৃষ্ট প্রয়োজন নামে নির্দেশিত হয়েছে।
বৈশেষিক সূত্রব্যাখ্যাকার শঙ্কর মিশ্র বলেছেন ‘যত্র দৃষ্টং প্রয়োজনং নোপলভ্যতে তত্রাদৃষ্টং প্রয়োজনং কল্পনীয়ম’ (উ. টী. ৬। ২। ১)। স্বর্গাদি সুখের ইচ্ছায় যে যাগযজ্ঞাদি ধর্মকার্যে প্রবৃত্তি হয়ে থাকে বৈশেষিকসূত্র ব্যাখ্যায় তা পঞ্চানন তর্করত্নমশাই বিবৃত করেছেন। উপস্কার টীকাকারের মতে, স্বর্গ হল অভ্যুদয় ‘অভ্যুদয়ঃ স্বর্গঃ’ এবং এই অভ্যুদয় হল এক ধরনের উন্নত অবস্থা।
শাস্ত্র থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে তিন ধরনের মানুষ রয়েছে, যথা—উত্তম, মধ্যম ও অধম। যারা উত্তম তারা কিন্তু স্বর্গার্থী নন। এরা মুমুক্ষু। কেবল মুক্তিই এদের ঈপ্সা। বিনিময় এদের কাম্য নয়। এরা এমন কর্মানুষ্ঠান করতে চান না যার দরুন পুনরায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অধম শ্রেণী কেবলই বিষয়াসক্ত। কিন্তু মধ্যম শ্রেণীর অন্তর্গত যারা তারা স্বর্গ, দিব্য মনোরম ভোগ ও যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানের ফলজনিত অপ্সরাসঙ্গ কামনা করেন:
ত্রিবিধা: পুরুষা: সূত জায়ন্তেহত্র মহীতলে।
উত্তমা মধ্যমাশ্চান্যে তথা চান্যেহধমা: স্থিতা:।।
উত্তমা: প্রার্থয়ন্তি স্ম মোক্ষমেব হি কেবলম।
গতা যত্র নিবর্তন্তে ন কথঞ্চিদ্ধরাতলে।।
মধ্যমা: স্বর্গমার্গঞ্চ দিব্যান ভোগান মনোরমান।
অপ্সরোভি: সমং ক্রীড়াং যজ্ঞাদ্যৈ: কর্মভি: কৃতাম।।
অধমা মর্ত্যলোকেহত্র রমন্তে বিষয়াত্মকা:। (স্ক. পু. না. খ. ১৪২। ৩-৫)
পাঠক কঠোপনিষদ থেকেও জানতে পারেন যে, উত্তম স্থানাধিকারী নচিকেতা কেন বারংবার মৃত্যুর দেবতার প্রদত্ত প্রলোভনসামগ্রী গ্রহণ করেননি। তাকে প্রলুব্ধ করা হলেও তিনি মহাহ্রদের মতো স্থির থেকে অবিচলিত চিত্তে জানিয়েছিলেন ‘অনিত্যবিষয়ং বরং নচিকেতা ন বৃণীতে’ (শা. ভা. ক. উ. ১। ১। ২৯)।
পুরাণ পাঠ করে জানা যায়—একটা সময় ছিল দূর অতীতে, যখন মর্ত্যের মানুষ দল বেঁধে তীব্র তপস্যায় দিবস-রজনী অতিবাহিত করে সানন্দে স্বর্গে ভিড় জমাতেন। ক্রমশ ভিড় বাড়তে থাকায় ফাঁকা খোলামেলা পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত দেবকুল আক্ষিপ্ত হন। স্বর্গেও স্থানাভাব প্রকট হতে থাকে। স্বর্গের অধিপতি তাঁর সমস্ত বন্ধুদের নিয়ে সেই দম-আটকানো পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে শঙ্কর ও পার্বতীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। সেদিন দেবতাদের কষ্ট দূর করবার জন্য পার্বতী তার গাত্রমল থেকে ভীষণাকৃতি লম্বোদর পুরুষের সৃষ্টি করেন। দেবী তাকে আদেশ করেছিলেন সে যেন পৃথিবীতে অবতরণ করে স্বর্গকামী ব্যক্তিদের শুভকাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করে:
ততঃ স্বর্গে সমাকীর্ণে কদাচিন্মনুজোত্তমৈ:।
দেবেষু ক্ষিপ্যমাণেষু সমন্তাত্তৎপ্রভাবতঃ।।
তপঃপ্রভাবসংসিদ্ধৈর্মানবৈ: পরমেশ্বর।
অস্মাকং ব্যাপ্যতে সর্বমহিমানং গৃহাদিকম।।
মর্ত্যলোকে নরা যে চ স্বর্গমোক্ষপরা: সদা।
তেষাং বিঘ্নং ত্বয়া কার্য্যং শুভকৃত্যেষু চৈব হি।। (স্ক. পু. না. খ. ১৪২। ১০, ১২, ১৯)
শুভ বা কল্যাণকর কর্মের অনুষ্ঠানে যে বিঘ্ন প্রতিপদে উঁকি দেয়—এ আর আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় বলবার অপেক্ষা রাখে না। স্কন্দপুরাণ-এর আবন্ত্যখন্ডে এজন্য অকপটে এক সত্য ঘোষিত হয়েছে—পৃথিবীতে যতদিন কীর্তি প্রচারিত থাকে কীর্তিমানের স্বর্গবাসের মেয়াদও ততদিন ধরে চলতে থাকে ‘যাবৎ কীর্তির্ভূমিসংস্থা তাবদ্বস সুরৈ: সহ’। সুতরাং ‘ব্যাঘাত আসুক নব নব, আঘাত পেয়ে অটল রব’ বা ‘বেয়ে তরী সব ঠেলে হতে হবে পার’ প্রভৃতি ভাবনায় ভাবিত হয়ে মর্ত্যের মানুষ অমর্ত্য হতে দৃঢ়সংকল্প গ্রহণে পিছপা হবেন না—এই প্রার্থনা শাশ্বত কালের।
বাংলা সাহিত্যেও স্বর্গচর্চা কম হয়নি। মনের প্রীতিকর বা অনুরাগের বিষয়টিকে স্বর্গ বলা হলে কোনো ফেরিওয়ালা তারের পাকানো ঝুরি বিক্রি করে টাকায় চার আনা কমিশন যখন পায় তখন সেটিই তার কাছে স্বর্গ (শংকর, চৌরঙ্গী)। সুনীলের মতে, স্বর্গটর্গ বলে কিছু নেই। কিশোর বয়সে মাথার ঘিলুর মধ্যে অনর্থক, ঘৃণা, ক্রোধ ভরে দিতে পারলে কোনো একজন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে পরধর্মীদের হত্যালীলায় মেতে উঠলে বেহেস্তে যাবে। এরকম অর্থবাদের অনুগামী মানুষজন বিধি পালনে সোৎসাহে স্বর্গলাভে তৎপর হয় (দুটি কবিতা, দেশ পত্রিকা, ২ মে, ২০০৯)। আশাপূর্ণা দেবী ইন্দ্রের পত্নী শচীদেবীকে একবার মর্ত্যে নামিয়েছিলেন। ইন্দ্রপত্নী কোনোরকম রাখঢাক না-রেখেই মর্ত্যভূমিতে বেড়াতে এসে ইন্দ্রকে জানালেন—তাঁর স্বর্গে মৃত্যু নেই সত্যি, কিন্তু জীবনও নেই (স্বর্গ-মর্ত্য)। আবার বামুনের স্বর্গ নীচুজাতের দুলের মেয়ের কাছে সগ্য। শরৎচন্দ্রের মতে, কাঙালীর মায়েরা চিরকালই সদ্য প্রজ্বলিত চিতার ধোঁয়ায় ছোটো একটি চিত্রিত রথের কল্পনা করেন। এদের মনে হয়, আকাশজোড়া ধোঁয়াই হল সগ্যের রথ। রথে চড়ে সগ্যে যেতে গেলে বড়োলোক বামুন-মা হতে হয়। ছোটোজাতের জন্য স্বর্গে রথের ব্যবস্থা আছে কিনা, কিংবা অন্ধকারে পায়ে হেঁটে তাদের রওনা হতে হয়—এ ব্যাপারে নিষ্পত্তি কোনোকালেই হবে না (অভাগীর স্বর্গ)।
পরিশেষে বলি, স্বর্গ থাক আমাদের মানসমন্দিরে। পৃথিবীর প্রত্যেক সভ্য জাতির মধ্যেই স্বর্গ সম্বন্ধে এক প্রবল বিশ্বাস আছে। চমৎকারপুরের সেই স্থানে পৌঁছোনোর তাগিদেই হৃদয়ের অশুভ প্রবৃত্তি ও বাসনার মূলে কুঠারাঘাত হানার দুর্বার ইচ্ছা বলবতী হোক। স্বর্গলাভের ইচ্ছায় হিংস্র প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করতে পারলে পৃথিবীটাই স্বর্গে রূপান্তরিত হবে।
শব্দসংকেত
|
অ. শ.: অভিজ্ঞানশকুন্তলম |
আ. ড.: আগমডম্বর |
|
উ. টী.: উপস্কার টীকা |
উদ্যোগ.: উদ্যোগপর্ব |
|
ক. উ.: কঠোপনিষদ |
কূ. পু.: কূর্মপুরাণ |
|
গূঢ়. দী.: গূঢ়ার্থদীপিকা |
তৈ. উ.: তৈত্তিরীয়উপনিষদ |
|
নৈ. চ.: নৈষধচরিত |
ন্যা. ম.: ন্যায়মঞ্জরী |
|
না. খ.: নাগরখন্ডম |
পদ্ম. পু.: পদ্মপুরাণ |
|
বন.: বনপর্ব |
বা. ভা.: ব্যাৎসায়নভাষ্য |
|
বি. পু.: বিষ্ণুপুরাণ |
বিক্র.: বিক্রমোর্বশীয়ম |
|
বৈ. সূ.: বৈশেষিকসূত্র |
ম. স.: মনুসংহিতা |
|
মহা. অনু.: মহাভারত অনুশাসনপর্ব |
শা. ভা.: শাঙ্করভাষ্য |
|
শান্তি.: শান্তিপর্ব |
শ্রী. গী: শ্রীমদভগবদগীতা |
|
সভা.: সভাপর্ব |
স্ক. পু.: স্কন্দপুরাণ |
|
স্বর্গ.: স্বর্গারোহণপর্ব |
তথ্যসূত্র:
অগ্নিপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯০
আগমডম্বর (জয়ন্ত ভট্ট):
বন্দনা দাশগুপ্ত সম্পাদিত, সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, ২০০৮
উপনিষৎ গ্রন্থাবলি প্রথম-তৃতীয় ভাগ:
স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৩৮৩, ১৩৮৬
কঠোপনিষৎ:
স্বামী জুষ্টানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকতা, ১৯৯৭
কূর্মপুরাণ (বেদব্যাস প্রণীত):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৫
চার্বাক দর্শন:
অমিত ভট্টাচার্য সম্পাদিত, সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, কলকাতা, ১৪১২ বঙ্গাব্দ
ন্যায়মঞ্জরী (জয়ন্ত ভট্ট):
গৌরীনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত, প্রথম-তৃতীয় খন্ড, বারাণসী সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮২-১৯৮৪
পদ্মপুরাণ (বেদব্যাস প্রণীত):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৭
পুরাণপ্রবেশ:
গিরীন্দ্রশেখর বসু, বিবেকানন্দ বুক সেন্টার, কলকাতা-৭৩, ২০০৭
পূর্বমীমাংসা দর্শন:
সুখময় ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা-১৩, ১৯৮৩
প্রিয় গল্প:
আশাপূর্ণা দেবী, সাহিত্যম, কলকাতা-৭৩, ১৪০৫
ব্রহ্মান্ড পুরাণ (বেদব্যাস প্রণীত):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৮
মধুসূদন রচনাবলি:
ড. অজিতকুমার ঘোষ সম্পাদিত, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা-১২, ১৯৭৩
মহাভারত (বেদব্যাস):
নীলকণ্ঠ কৃত ভারতভাবদীপটীকা এবং হরিদাসসিদ্ধান্তবাগীশ কৃত ভারতকৌমুদী টীকাসহ, কলকাতা-৪১, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ। বঙ্গবাসী, ১৩০৭
মার্কন্ডেয় পুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯০
মীমাংসা দর্শনম (প্রথম খন্ড):
পন্ডিত শ্রীভূতনাথ সপ্ততীর্থ অনূদিত ও সম্পাদিত, সংস্কৃত বুক ডিপো, কলকাতা-৬, ১৪১৬
রবীন্দ্র রচনাবলি:
জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৩৬৮
বিষ্ণুপুরাণ (বেদব্যাস):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯০
বৈদিক ধর্ম ও মীমাংসা দর্শন
হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়, অবভাস, কলকাতা-৮৪, জুলাই ২০০৮
বৈশেষিক দর্শন (কণাদ প্রণীত):
পঞ্চানন তর্করত্ন কৃত পরিষ্কার টীকাসহ, শ্রীনটবর চক্রবর্তী দ্বারা মুদ্রিত, ১৩১৩
স্কন্দপুরাণ (বেদব্যাস প্রণীত):
পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা-৯, ১৩৯৮
সংস্কৃত সাহিত্য সম্ভার (প্রথম-অষ্টাদশ খন্ড):
নবপত্র প্রকাশন, ৬ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন