দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

গঙ্গার ধারে বটতলায় বসে আছি অমনি কেউ পেছন থেকে বলল— “কী হবে?”
অমনি দেখি বটতলার দার্শনিক ছাগলটা। ঢুলু ঢুলু চোখে চুইংগামের মতো বটপাতা চিবিয়ে খাচ্ছে। আর বলছে “কী হবে বলো তো?”
আমি অবাক হয়ে বললাম— “কীসে কী হবে?”
— “দুঃখ পেয়ে কী হবে?”
— “দুঃখ? কার দুঃখ?”
— “তোমার আমার সবার এই জগৎ সংসারের। কথায় আছে— “দুঃখম ফলতি সর্বত্র।”
— “দুঃখম তো নয়, ওটা ভাগ্যম।”
— “ওই একই হলো! ভাগ্য থেকেই তো দুঃখ আসে। আর যা ভাগ করা যায় তাই ভাগ্য। তাই দুঃখ ভাগ নিতে হয়।”
কথাটা মাথায় ঢুকল না। বললাম— “তুমি সংস্কৃতও জানো?”
ছাগলটা মাথা নেড়ে বলল— “পাণিনীয়ম জানিনিয়ম।”
— “দূর এ আবার কেমন সংস্কৃত?”
— “নিয়ম আর জানি সন্ধি করে ‘জানিনিয়ম’ হয়। তোমার দুঃখ পাওয়ার কারণ আছে দেখছি। নিশ্চয়ই অঙ্কে ফেল করেছ।”
— “কী করে জানলে যে অঙ্কেই ফেল করেছি?”
— “মানুষ তো অঙ্কেই ফেল করে। যে যোগ করতে পারেনা তাকে কী বলে?"
— “কী বলে?”
— “অযোগ্য।” বলে ছাগলটা এ হে হে করে বিশিষ্ট সাংবাদিকের মতো হাসল।
যাই হোক দুঃখ পেও না, বুঝলে। জীবনে যখনই দুঃখ পাবে নিজেকে প্রশ্ন করবে— “কী হবে?”
— “যেমন আমি ফেল করলে কী হবে? আমি মরে গেলে কী হবে? কিছুই হবে না। সূয্যি উঠবে, মেঘ করবে, আকাশে তারা ফুটবে, জলে নৌকো ভাসবে। সব কিছুই আগের মতো।”
আমি বলতেই যাচ্ছিলাম যে হ্যাঁ “রোব্বার রোব্বার খাসির মাংস হবে।” বলতে গিয়েই থেমে গেলাম। মনটা ভারী খারাপ ছিল। অঙ্কে সত্যিই চল্লিশে পাঁচ পেয়েছি।
উত্তরমালার একটা উত্তরও আমার উত্তরের সঙ্গে মেলে না। মাঝে মাঝে মনে হয় উত্তরমালাতেই ভুল আছে।
ছাগলটা যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বলে উঠল। উত্তরমালায় উত্তর ভুল থাকলে দক্ষিণ মালায় যেতে হবে।
— “দক্ষিণ মালা? সেটা আবার কী?”
— “পূর্ব মালা, পশ্চিম মালা কিছুই শোনোনি নাকি? ভূগোল পড়োনা?”
আমি মাথা চুলকিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম।
— “গুয়াতেমালার দক্ষিণে দক্ষিণ মালা। আমাদের যা ঠিক ওদের সেটাই ভুল ওদের যা ঠিক আমাদের তাই ভুল। মানে তুমি এখানে অঙ্কে শূন্য পেলে, ওখানে ঠিক একশো পেয়ে যেতে। মায়া সভ্যতার নাম শুনেছ?”
আমি বললাম— “হ্যাঁ, গল্পে পড়েছি।”
— “এরকম নিষ্ঠুর সভ্যতা নয়। দয়া মায়া আছে লোকের প্রাণে।”
বলতেই যাচ্ছিলাম যে হেডস্যার খুবই নিষ্ঠুর। কথায় কথায় স্কেল আর রাস্কেল।
ছাগলটা চুক চুক করে মাথা নেড়ে বলল— “একটু মিষ্টি কথা বললেই হয়। বচনে কা পতিব্রতা।”
— “পতিব্রতা? কথাটা তো “বচনে কা দরিদ্রতা।”
— “ও দরিদ্রতা বুঝি?” ছাগলটা আবার হেঁ হেঁ করে দাড়ি নেড়ে মন্ত্রীদের মতো হাসল।
আমার অবশ্য ছাগলটার ওপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। রোজ গঙ্গার ধারে বসে দার্শনিক ছাগলের কথা শুনলেই মন ভরে যায়।
সেবারে গরমের ছুটিতে হোস্টেল থেকে ফিরে বটতলায় আর তার দেখা পেলাম না।
শুনলাম, গঙ্গার ধারে কোন এক মনীষীর জন্মদিনে কাঙাল ভোজন হয়েছে মাংস খাইয়ে। শুনে খুব কান্না পেল।
হতভাগারা, আর কাউকে পেলি না? ওর কথাগুলো বার বার মনে পড়তে লাগল। ওই হৃষ্টচিত্তের নয়ন ভুলানো রূপ ভোলা যায় না।
বটতলার আসন খালি। দু একটা, মাতাল আর পাগল ছাড়া ওখানে কেউ বসে না।
কী করবো। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে শ্মশানকালীর দর্শনে গেলাম।
হঠাৎ দেখি যজ্ঞবেদীর পাশে, গাছের ছায়ায় সে বসে আছে। খেয়েদেয়ে বেশ নধর হয়েছে মনে হচ্ছে।
আমাকে দেখে বলল— “ব্যাটারা রসগোল্লা খাইয়ে কাতুকুতু দিয়ে নিয়ে চলে এল।”
প্রথমে তো কেটেই ফেলবে ভেবেছিল কিন্তু ‘মা মা’ করে এমন ভক্তিগীতি শোনালাম।
গুরুমহারাজ বললেন— “এ মায়ের পরম ভক্ত। একে কিচ্ছু করা যাবেনা। কপালে একটা তিলক কেটে দিলেন।”
তারপর থেকে ভক্তরা সন্দেশ, ক্ষীরমোহন, চমচম খাওয়ায়। ঘাসপাতা আর খেতে হয়না।”
দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার হাতে একজন একটা লিফলেট দিয়ে গেল। তাতে কিছু চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। কোন এক মন্ত্রী দর্শন করতে আসবেন।অনুষ্ঠান হবে। পোলাও, মাংস দিয়ে ভুরিভোজের ব্যবস্থা হচ্ছে।
এবারে ছাগলটাকে সত্যি করেই ছাগল মনে হলো।
বললাম— “লোচনাভ্যাং বিহীনস্য দর্পণঃ কিং করিষ্যাতি।”
ছাগলটা রসগোল্লা খেতে খেতে বলল— “কী বললে?”
আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম— “কী হবে!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন