শিশির বিশ্বাস
‘মাছের কথা যখন উঠল তখন বলতেই হয় চিতলপেটির কথা৷ স্বাদে সবার উপরে৷ আর সেই মাছ যদি হয় ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঘা চিতল তাহলে তো কথাই নেই৷’
‘বাঘা চিতল!’ অবাক হয়ে টুলটুলি বলেই ফেলল৷
‘হ্যাঁ রে৷ মাথা থেকে লেজের ডগা কম করেও ফুট তিনেক লম্বা৷ চওড়ায় ফুট খানেক৷ গুয়াহাটি শহরে যখন ছিলাম দারুণ এক ভাতের হোটেলের সন্ধান পেয়েছিলাম৷ দুপুরে ওদের স্পেশাল মেনু ছিল সেই বাঘা চিতলপেটির ঝোল৷ এতটাই বড় যে, থালায় আঁটত না৷ বেরিয়ে পড়ত প্রান্ত৷ আর স্বাদ? আহ, মুখে লেগে আছে এখনো! সেবার ওই চিতলপেটির লোভেই দুপুরের বাস ছাড়তে হল৷ উপযুক্ত মাছ না মেলায় সেদিন দুপুরের মেনুতে চিতলপেটির ঝোল হয়নি৷ তবে রাতে পাওয়া যাবে৷ তা স্রেফ ওই মাছের লোভেই দিনের বাসে আর ফেরা হল না৷ ধরতে হল রাতের বাস৷ আর তারপর যে কাণ্ড হল, বাপ রে, ভাবা যায় না!’
‘কী, ভূত?’ বিনুমামা থামতে প্রশ্ন ছুঁড়ল টুলটুলি৷
অনেক দিন পর বিনুমামাকে পেয়ে ঘিরে ধরেছিলাম সবাই৷ তারপর হঠাৎ মাছের প্রসঙ্গ উঠতেই বিনুমামার বোমা৷ বেচারা টুলটুলিকে দোষ দেওয়া যায় না৷ বিনুমামা আসলে গল্পের ভাণ্ডার৷ হরেক অভিজ্ঞতায় ঝুলি ভরতি৷ ভূতের গল্প হলে তো কথাই নেই৷
টুলটুলির প্রশ্নে বিনুমামা অবশ্য ঝেড়ে কাশলেন না৷ সামনে শ্রোতাদের উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘গোড়া থেকেই বলি শোন৷ সেবার অরুণাচলের পাহাড় জঙ্গলে কাজ করার পর মন আর টিকছিল না ওখানে৷ সব ছেড়ে-ছুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আসামের নানা শহরে৷ তারই ভিতর কিছু খুচখাচ কাজকর্মও চলছে৷ জোড়হাট দিয়ে শুরু করেছিলাম৷ তারপর একে একে গুয়াহাটি, শিলং, তুরা হয়ে একদিন লঞ্চে বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ি দিয়ে এসে পৌঁছোলাম ছোট এক শহরে৷ জুড়িয়ে গেল চোখ৷ একাধিক নদী, খাল-বিল নিয়ে প্রায় যেন ফেলে আসা আর এক পূর্ববাংলা৷ আসাম রাজ্য হলেও পথে-ঘাটে বাঙালির সংখ্যাই বেশি৷ মন খুলে কথা বলা যায়৷
‘প্রথম দিনই দেখা রাখাল ঘোষের সঙ্গে৷ বয়স্ক মানুষটির সঙ্গে গুয়াহাটি থাকতেই আলাপ হয়েছিল৷ শহরে ভদ্রলোকের ছোট এক লেদ কারখানা রয়েছে৷ জনা ছয়েক কর্মচারী কাজ করে৷ কাজের খোঁজে, কাঁচা মাল বা সাপ্লাইয়ের কাজে মাঝেমধ্যেই তাঁকে যেতে হয় বিভিন্ন জায়গায়৷ বছর দেড়েক আগে গুয়াহাটি শহরে পরিচয়৷ দেখা হয়েছে তুরা শহরেও৷ বড় বাজারের কাছে তাঁর লেদমেশিনের কারখানা৷ প্রথম দিন দেখা হতেই প্রায় জড়িয়ে ধরলেন৷
‘ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হতে একটু থমকেই গিয়েছিলাম অবশ্য৷ বয়স হলেও রাখালবাবু শক্তসমর্থ মানুষ৷ কিন্তু এবার কেমন যেন সুস্থ মনে হল না৷ শরীর অনেক রোগা, ভেঙে পড়েছে৷ সেকথা জিজ্ঞাসা করতেই উনি কাষ্ঠ হেসে বললেন, আর বলবেন না স্যার৷ শরীরটা একেবারেই ভালো নেই৷ শিলিগুড়ি, গুয়াহাটি ডাক্তার দেখাতে বাকি রাখিনি কোথাও৷ কোনো উন্নতি হয়নি৷ তা ছাড়া বয়সও তো হল৷
‘রাখালবাবুর ছেলে নেই৷ একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে৷ জামাই মুম্বাইতে ভালো চাকরি করে৷ স্ত্রীকে নিয়ে ভদ্রলোক একাই পড়ে আছেন এখানে৷ বললাম, তাহলে মুম্বাইতে মেয়ের কাছে তো যেতে পারেন৷ আর কিছু না হোক প্রপার চিকিৎসাটা হবে৷
‘উনি বললেন, মেয়ে-জামাইও সেই কথা বলছে৷ তাগাদা স্ত্রীরও৷ কিন্তু—
‘কিন্তু কী?
‘আসলে ব্যাপারটা কী জানেন, মুম্বাই গেলে এই কারখানার কী হবে সেই ভাবনায় জেরবার হয়ে রয়েছি৷ প্রায় শূন্য থেকে এই কারখানা বড় করেছি৷ তারপর জনা ছয়েক কর্মচারী৷ বহুদিন রয়েছে এখানে৷ বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যায় পড়বে ওরা৷
‘তা কী আর করা যাবে৷ আগে শরীর৷ ওটা ঠিক থাকলে কারখানাও—
‘তা ঠিক স্যার, কথার মাঝখানেই রাখালবাবু বললেন, মুম্বাই গেলে মেয়ে-জামাই সহজে ছাড়বে না জানি৷ তাই ঠিক করেছিলাম ভালো খদ্দের পেলে বেচে দেব কারখানাটা৷ খদ্দেরও পেয়েছিলাম কয়েকজন৷ একজন বেশ ঝুলোঝুলিও করেছিলেন৷ কিন্তু দেইনি৷ তাই নিয়ে বউয়ের সঙ্গে বিবাদও হয়ে গেছে৷
‘তা বেচলেন না কেন?
‘আসলে খদ্দেরটির কথাতেই বুঝেছিলাম, উনি এই কারখানা রাখবেন না৷ তুলে দিয়ে মাল রাখার গুদাম করবেন৷ ছেলেগুলো বেকার হয়ে যাবে৷
‘তা কী আর করবেন বলুন৷
‘আমার কথায় ভদ্রলোক বিন্দুমাত্র সান্ত্বনা পেলেন না৷ অল্প নীরব থেকে বললেন, সার, আপনাকে তো চিনি, তাই বলতে ভরসা হচ্ছে না৷
‘কী?’
‘স্যার আপনি যদি কারখানাটা নেন, বিনা পয়সায় দিয়ে দেব৷ শুধু রেজিস্ট্রি খরচ ছাড়া একটি পয়সাও লাগবে না৷ জানব, আমার কারখানা বহাল তবিয়তে শুধু থাকবে না, দিন দিন আরো ফেঁপে উঠবে৷ আরো নতুন ছেলে কাজ পাবে৷ কিন্তু আপনাকে চিনি বলেই বলতে ভরসা হয় না৷
‘কথাটা এক বিন্দু মিথ্যে নয়৷ এক জায়গায় বেশি দিন থিতু হওয়া আমার চরিত্রে নেই৷ নইলে অরুণাচলে যথেষ্ট বড় নতুন কন্ট্রাক্টের কাজ পেয়েও চলে আসতাম না৷ ফস করে বলে ফেললাম, তাহলে এক কাজ করুন দাদা৷ এই মুহূর্তে আমার হাতেও তেমন কাজ নেই৷ যদি বলেন, দিন কয়েক আপনার কারখানা দেখাশুনো করতে পারি৷ ধরুন ম্যানেজারি৷ আপনি চিকিৎসা করে ফিরে এলে মাস হিসেবে কিছু একটা মাইনে দেবেন৷ আপনার শরীরের যা অবস্থা, সঠিক চিকিৎসা দরকার৷ আর মুম্বাই শহরে ভালোই হবে সেটা৷ ভেবে দেখতে পারেন৷
‘প্রস্তাব শুনে ভদ্রলোক খানিক হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে৷ তারপর টেবিলে ঝুঁকে পড়ে আমার হাত ধরে বললেন, মাইনের কথা বলবেন না সার৷ যতদিন না ফিরি, কারখানায় লাভ যা হবে, সবটাই আপনার৷ নিজের মতো করেই দেখবেন সব৷ আমার লাভ, অনেক পরিশ্রমে গড়ে তোলা কারখানাটা আমারই থাকবে৷ ছেলেগুলোর কাজও৷
‘তো তাই হল৷ পরের দিনই গুয়াহাটি গিয়ে প্লেনের টিকিট কেটে আনলাম৷ দিন কয়েক পরেই নির্দিষ্ট দিনে ওনারা রওনা হয়ে পড়লেন৷
‘চালু কারখানা৷ কর্মচারীরা সবাই বিশ্বস্ত৷ আমার কাজ বলতে সামান্য দেখাশোনা ছাড়া কাস্টমার, সাপ্লায়ারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ৷ আর সেই কাজেই ঘন ঘন পাড়ি দিতে হত গুয়াহাটি, শিলং, তুরা ছাড়াও কোচবিহার আর শিলিগুড়ি শহরে৷ বলা বাহুল্য, বেশি কাজ পড়ত গুয়াহাটিতেই৷ সপ্তাহে দু-একবার যেতেই হত৷ রাত দশটা নাগাদ বাস ছাড়ত৷ ভোরের আগেই পৌঁছে যেত গুয়াহাটি৷ বাস স্ট্যান্ডের কাছেই এক লজে উঠে সামান্য বিশ্রামের পর স্নান সেরে দিনের কাজ৷ এক ফাঁকে খাওয়াটাও সেরে ফেলতাম৷ তারপর দুপুরের বাস৷ আর কাজ সারতে বিকেল হয়ে গেলে লজে ফিরে ছোট এক ঘুম লাগিয়ে দিতাম৷ তারপর বেরিয়ে পড়তাম সন্ধে সাতটা সাড়ে-সাতটা নাগাদ৷ খাওয়া সেরে রাতের বাস৷ সে যাই হোক, গল্প ছেড়ে বাঘা চিতলের প্রসঙ্গে ফের আসতে হবে একটু৷ গল্পের কারণেই৷’
অল্প থেমে বিনুমামা শুরু করলেন আবার, ‘তা ছাড়া ব্যাপার কী জানিস, পুরনো সেই সব দারুণ ব্যাপারগুলো এড়িয়ে যাওয়াও সহজ নয়৷ চিতলমাছ তো খেয়েছিস৷ বাজারে কালেভদ্রে পাওয়া যায় এখনো৷ কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঘা চিতল চোখে দেখা দূরের কথা, শোনেওনি অনেকে৷ অথচ সেসময় ব্রহ্মপুত্র নদীর এই বাঘা চিতলের কদর ছিল৷ পুরোনো দিনের এক ভদ্রলোকের কাছে শুনেছি, দেশভাগের আগে তিনি যখন কাজের প্রয়োজনে আসামে যেতেন, ধুবড়িতে লঞ্চ থেকে নেমেই আগে খোঁজ নিতেন, কোন হোটেলে সেদিন চিতলপেটির ঝোল-ভাতের ব্যবস্থা আছে৷ পেট ভরে খেয়ে তারপরে ট্রেন ধরতেন স্টেশনে৷
‘তা সেকালে ব্রহ্মপুত্রের বাঘা চিতলমাছের অভাব ছিল না৷ কিন্তু আমাদের সময় চাইলেই মিলত না৷ গুয়াহাটি শহরে চেনা এক ভাতের হোটেল ছিল৷ উপযুক্ত মাছ পাওয়া গেলে চিতলপেটির স্পেশাল ঝোল রান্না হত সেখানে৷ তখন মোবাইলের যুগ নয়৷ তবু গুয়াহাটি গেলেই ফোনে বুক করে রাখতাম৷ না পাওয়া গেলে ইলিশের ঝোলভাত৷ ওটা সব সময়েই পাওয়া যেত৷
‘সেবার ওই কাজের ব্যাপারেই গুয়াহাটি গিয়েছিলাম৷ পরের দিন দুপুরের বাসে ফেরার কথা৷ কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের চিতল পেটির লোভে মত যে পালটে গেল, সে তো আগেই বলেছি৷ তা নিরাশ হতে হয়নি৷ বাঘা চিতলপেটির ঝোল-ভাত দিয়ে রাতের ভোজটা হয়েছিল সুপার৷ খাওয়া সেরে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে এরপর চেপে বসেছিলাম এক সুপার লাক্সারি বাসে৷
‘সে-সময় বাসে সবে ভিডিও দেখাবার চল শুরু হয়েছে৷ প্যাসেঞ্জারের দল হাঁ করে গিলত৷ কিন্তু ওই দারুণ ভোজের পর সিনেমা দেখার ইচ্ছে কারো থাকে না৷ আমারও হয়নি৷ বাস ছাড়তে আরামে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ সেই ঘুম ভাঙল কন্ডাকটরের ঝাঁকুনিতে৷
‘স্যার, ঝগড়ার চর সামনেই৷ উঠে পড়েন৷
‘ঝগড়ার চর আমার স্টপেজের নাম৷ ধড়মড়িয়ে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তিনটের মতো৷ তীব্র বেগে বাস ছুটছে৷ বাইরে পথের ধারে মস্ত ঝগড়ার বিল অন্ধকারেও বেশ নজরে পড়ছে৷ সেদিকে এক পলক তাকিয়ে চটপট তৈরি হয়ে নিলাম৷ একটু পরে যথাস্থানে নেমেও পড়লাম৷
‘এখানে বলে রাখি ঝগড়ার চর স্টপেজটা টাউনে ঢোকার কিছু আগে৷ রাখালবাবুর বাড়ি টাউনের ভিতর৷ আমাকে সেখানেই থাকতে বলেছিলেন৷ কিন্তু রাজি হইনি৷ শহরের কিছু বাইরে ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের পাঁচিল ঘেরা মস্ত ডিস্ট্রিবিউশন অফিস, স্টাফ কোয়ার্টার৷ তারই গায়ে ছোট হলেও চমৎকার এক বাংলো গোছের বাড়ি৷ কাজ তখনো সম্পূর্ণ না হলেও দুটো ঘর আর লাগোয়া বারান্দা থাকার উপযুক্ত করা হয়েছে৷ মালিক টাউনেই থাকেন৷ মাঝে-মধ্যে অল্প সময়ের জন্য ভাড়া দেন৷ রাখালবাবুই কথা বলে ঠিক করে দিয়েছিলেন৷ শহরের চৌহদ্দি থেকে দূরে চমৎকার পরিবেশ হওয়ায় আমিও পছন্দ করেছিলাম৷ তুলনায় ভাড়াও বেশি নয়৷
‘বাড়িটা সত্যিই চমৎকার৷ এক দিকের জানলা আর বারান্দায় বসে তাকালে দিগন্ত বিস্তৃত সর্ষে আর ধানখেত৷ সর্ষেখেতে সবে হলুদ ফুল ধরতে শুরু করেছে৷ চোখ জুড়িয়ে যায়৷ অন্য দিকে খানিক দূরে দিগন্তবিস্তৃত জলায় হোগলা আর নলখাগড়ার জঙ্গল৷ তারই ফাঁকে কোথাও ঝিকমিক ঢেউ৷ এমন জায়গা বলা বাহুল্য যথেষ্টই নিরিবিলি৷ কথা বলার সঙ্গী তেমন জোটে না৷ কিন্তু চোখের সামনে এমন দৃশ্য থাকলে সঙ্গীর দরকার পড়ে না৷ তা ছাড়া দিনের বেশির ভাগ সময় তো কারখানায়৷
‘এমন যখন থাকার ঠেক, হাইওয়ের উপর বাস স্টপটাও যে বেশ নির্জন, তা বলাই বাহুল্য৷ আসলে যেখানে বাস থেকে নামতে হয়, তার একপাশে বিশাল বিল৷ অন্যদিকেও সেই বিল, তবে মাঝখান দিয়ে উঁচু হাইওয়ের দরুন মজে শীর্ণকায়৷ বাস স্টপ থেকে তারই মাঝ দিয়ে সরু এক রাস্তা সোজা গিয়ে পড়েছে ইলেকট্রিসিটি অফিসের রাস্তায়৷ সেই রাস্তার দুই পাশে বাড়িঘর থাকলেও কানেকটিং রোডের অংশ একেবারেই শুনশান৷ অনেক বদনামও আছে৷ রাস্তাটা নাকি একেবারেই ভালো নয়৷ রাত বাড়লে ছায়াময় কারা চলে বেড়ায় ওই পথে৷ মজা বিলের কচুরিপানার উপর দিয়েও দিব্যি হেঁটে যায়৷ অনেকেই দেখেছে৷ তাই বেশি রাতে ঝগড়ার চর স্টপেজে নামে না কেউ৷ চলে যায় টাউনের দিকে৷ সেখানে রিক্সা পাওয়া যায়৷ তাতে পাড়ার পথে ঘরে আসে৷
‘হুঁশিয়ারিটা প্রথম দিন রাখালবাবুও দিয়ে রেখেছিলেন৷ শুধু ভূত-প্রেত নয়, চরের দিকে কিছু বসতি রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই নাকি সীমান্তের ওপার থেকে আসা মানুষ৷ তাদের অনেকেই নানা দুষ্কর্মের সঙ্গে যুক্ত, খুনখারাপিতেও অভ্যস্ত৷ ঝগড়ার চরের কাছেও কিছু বসতি রয়েছে তাদের৷ রাতের অন্ধকারে ওই পথে খুনও হয়েছে কয়েকটা৷
‘সেই কারণে রাতের বাস ধরলে চলে যেতাম টাউনের দিকে৷ কিন্তু আগের দফায় রিক্সা না পাওয়ায় হেঁটে আসতে হয়েছে৷ অনেকটা পথ৷ কতকটা সেই কারণে সেদিন কন্ডাকটরকে ঝগড়ার চরে নামিয়ে দেওয়ার কথা বলে রেখেছিলাম৷
‘বাস তো নামিয়ে দিয়ে চলে গেল৷ ফাঁকা রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে বুকের ভিতর কেঁপে উঠল সামান্য৷ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হনহন করে পা চালালাম৷ মজা বিলের মাঝ দিয়ে আধকাঁচা পথ নিশুতি রাতে থম হয়ে পড়ে আছে৷ দুই ধারে আগাছার জঙ্গল, ঝোপঝাড়ের পরেই মজা বিলের কাদায় কচুরিপানার জঙ্গল৷ তারই ফাঁকে কোথাও সামান্য জমা জল৷ এছাড়া নির্জন রাতে শুধু ঝিঁঝির কোরাস আর পথের দু’পাশে ঝোপঝাড়ের ভিতর থোকা থোকা জোনাকি৷ হঠাৎ তাকালে মনে হয় অন্ধকারে কোনো দানো বুঝি চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে৷ এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে৷
‘দুর্ভাগ্য, বাস আজ কিছু আগেই চলে এসেছে৷ এসব জায়গায় ভোর হবার অনেক আগেই পুব আকাশে আলো ফুটে ওঠে৷ বেশ নজর চলে৷ কিন্তু আজ বাস কিছু আগে চলে আসায় পুব আকাশে আলো এখনো ফোটেনি৷ ঘন অন্ধকার৷ সামান্য আলো বলতে কৃষ্ণপক্ষের চিলতে এক ফালি চাঁদ আর তারার মেলা৷ কিন্তু শেষ রাতে এসব বিল অঞ্চলে কখনো হালকা কুয়াশার আস্তর দেখা যায়৷ অন্ধকার তাই আরো জমাট৷ কাঁচা পথ পার হয়ে ওদিকের পাকা রাস্তায় পড়তে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে৷
‘ঘাড় নামিয়ে হনহন করে হেঁটে চলেছি৷ হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে কাছ থেকে কেউ চাপা গলায় বলল, স্যার, থোড়া শুনিয়ে প্লিজ৷
‘নির্জন অন্ধকার পথে হঠাৎ ওই কণ্ঠস্বরে যে ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়েছিলাম তা বলাই বাহুল্য৷ তবু ঘাড় তুলে তাকালাম৷ উলটো দিকে পথের ধারে হালকা ঝোপের কাছে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে৷ প্রায় ছয় ফুটের উপর লম্বাচওড়া বলিষ্ঠ শরীর৷ আমি তাকাতেই লোকটা হাতছানি দিয়ে ডাকল৷
‘বরাবরই ভয়ডর কম৷ তবু ওই দৃশ্য দেখে বুকের ভিতর কেমন ধক করে উঠল৷ অথচ শুধুমাত্র এই অসময় ছাড়া অন্য কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই৷ অদূরে মানুষটাকে তখন আরো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে৷ গায়ে ছাই রঙের আঁটো টি-শার্ট৷ পরনে ঢিলে প্যান্ট৷ মুখটা সেভাবে দেখা না গেলেও খাকি প্যান্ট দেখে মনে হল হয়তো ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের কেউ৷ আমার আস্তানার পাশেই ওদের পাঁচিল ঘেরা মস্ত কম্পাউন্ড৷ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়ও আছে৷ কিন্তু এই রাতে লোকটা এখানে কী কাজে এসেছে বুঝে উঠতে পারলাম না৷ আর ডাকছেই বা কেন?
‘আলো এমনিতেই কম৷ হয়তো কোনো কারণে আরো কমে গিয়েছিল, লোকটাকে হঠাৎ আগের মতো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না৷ অন্ধকারে কেমন আবছা একটা মূর্তি৷ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ফের হাতছানি দিয়ে ডাকল৷ ততক্ষণে সাহস কিছু বেড়েছে৷ লোকটার ডাকে সাড়া দিয়ে কাছে যাওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবছি৷ হঠাৎ হা-হা করে এক ঝলক দমকা বাতাস মজা বিলের দিক থেকে ছুটে এলো৷ তারপরেই খেয়াল হল, মানুষ কোথায়, ঝোপের পাশে মাঝারি এক কলাগাছ! সামনের একটা পাতা শুধু বাতাসে নড়েছে৷ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷’
‘অ্যাঁ, ভূত নয়!’
‘তাহলে কথা বলল কে?’
অনেকক্ষণ কথা বলে বিনুমামা থামতেই সামনে নিরাশ শ্রোতাদের দিক থেকে সমানে প্রশ্নবাণ৷ সামান্য দম নিয়ে উনি বললেন, ‘হ্যাঁরে তাই৷ কে কথা বলল সেই প্রশ্ন আমার মনেও জেগেছিল৷ কিন্তু উত্তর দেবে কে? অগত্যা সুটসুট করে ঘরে ফিরে এলাম৷ ভিতরের প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই গেল৷ চোখ কী এতটাই খারাপ যে, একটা কলাগাছকে মানুষ ভাবব? আর ওই কণ্ঠস্বর?
‘চিন্তায় বাকি রাতটা জেগেই কাটল৷ বাসা থেকে দূরে নয়৷ ভোর হতেই ছুটে এলাম অকুস্থলে৷ ফের অবাক হবার পালা৷ মাত্র ঘণ্টা কয়েক আগে দেখা কলাগাছের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে৷ হাওয়ায় উপে গেছে৷ গাছটা ইতিমধ্যে যে কেটে নেওয়া হয়েছে তাও নয়৷ তেমন চিহ্ন নেই৷ সন্দেহ নেই, সব চোখের ভুল বা মনের বিভ্রম৷
‘লজ্জায় ব্যাপারটা বলতে পারিনি কাউকেই৷ কিন্তু দিন কয়েক পর একটা ব্যাপার ঘটল৷ সেদিন দুপুরে হঠাৎ দেখি পাশে ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের অফিসে মানুষের ভিড়, হইচই৷ জনাকয়েক পুলিশও রয়েছে৷ একজনকে ধরে মারধোর করা হচ্ছে৷ অফিসের এস.ডি.ই-র সঙ্গে পরিচয় ছিল৷ জিজ্ঞাসা করতে তিনি জানালেন, দিন কয়েক হল ওদের একজন কর্মচারী রামব্রিজ রাম হঠাৎ নিখোঁজ৷ অথচ কাউকেই বলে যায়নি৷ অফিসের লাইন স্টাফ বেশিরভাগই বিহার আর ইউপির মানুষ৷ রামব্রিজ অফিসের কোয়ার্টারে একাই থাকত৷ ঘর সেই থেকে বন্ধ৷ এভাবে কামাই করে না ওরা৷ দেশে গেলে আগাম ছুটি নিয়েই—
‘সেদিনের ব্যাপারটা সেই থেকে মাথায় ঘুরছিল৷ হঠাৎ যেন একটা দিশা খুঁজে পেলাম৷ উনি থামার আগেই বললাম, রামব্রিজ লোকটা দেখতে কেমন বলুন তো? চেহারা?
‘আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এস ডি ই তৎক্ষণাৎ এক কর্মচারীকে ডাকলেন৷ সে কাছে এসে জানাল, রামব্রিজ লম্বা-চওড়া মানুষ৷ যেদিন নিখোঁজ হয় সেদিন পরনে ছিল খাকি প্যান্ট আর ছাই রঙের টি-শার্ট৷ সেদিন ওকে শেষ দেখা গিয়েছিল কাছেই চরবস্তির আসরাফ নামে একজনের সঙ্গে৷ লোকটা সেই থেকে নিপাত্তা ছিল৷ আজ দেখতে পেয়ে ধরে আনা হয়েছে৷ তাই নিয়ে ঝামেলা৷
‘আসরাফ কী বলছে?
‘আমি প্রশ্ন করতে এস. ডি. ই বললেন, লোকটার এক কথা৷ সেদিন দুপুরে ওদের দেখা হয়েছিল ঠিকই৷ পরিচিত মানুষ৷ খানিক গল্পও হয়েছিল৷ তারপরে যে যার পথে চলে গিয়েছে৷ আর দেখা হয়নি৷ এর মধ্যে খবর পেয়ে চরবস্তির একদল লোক এসে হইচই শুরু করেছে৷ পুলিশ ডাকা হলেও লোকটা হয়তো ছাড়াই পেয়ে যাবে৷
‘আমি তাড়াতাড়ি বললাম, এ ব্যাপারে সামান্য সূত্র দিতে পারব বোধ হয়৷ পুলিশ আর লোকটাকে নিয়ে আমার সঙ্গে একটু চলুন৷ খুব দূরে নয়৷’
বিনুমামা থামলেন৷ আমি নিজেই ঢোঁক গিলে বললাম, ‘তারপর?’
‘তারপর আমার ভাবনায় কিছুমাত্র যে ভুল নেই বোঝা গিয়েছিল যথাস্থানে যেতেই৷ সেই রাতে যেখানে লোকটাকে দেখেছিলাম, তার পিছনে কচুরিপানা কিছু এলোমেলো অবস্থায় ছিল৷ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি৷ কচুরিপানার নীচের কাদা সামান্য খোঁড়াখুঁড়ি করতেই বের হয়ে পড়েছিল রামব্রিজ রামের ফুলে ওঠা লাস৷ গলায় ক্ষতচিহ্ন৷ পরনে সেই খাকি প্যান্ট আর ছাই রঙের টি-শার্ট, ঠিক যেমন দেখেছিলাম৷ পুলিশের জেরায় আসরাফ খুনের কথা স্বীকারও করেছিল এরপর৷’
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন